📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 তাওহিদের প্রকারভেদ

📄 তাওহিদের প্রকারভেদ


অর্থ: 'সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার জন্য।' তাওহিদের এই গুরুত্বের ফলে ইমাম তহাবি তাঁর বইয়ে সর্বপ্রথম তাওহিদের আলোচনাই এনেছেন।¹
তাওহিদের শাব্দিক অর্থ হলো এক সাব্যস্ত করা, একত্ববাদে বিশ্বাস করা। পরিভাষায় তাওহিদ বলা হয়: আল্লাহর সত্তা, তাঁর সকল নাম, গুণ ও কর্মে তাকে একক ও অদ্বিতীয় বলে ঘোষণা করা। তাকে একমাত্র প্রতিপালক ও বিধানদাতা হিসেবে বিশ্বাস করা। একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা।²
তাওহিদের প্রকারভেদ: কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফের গ্রন্থাবলিতে তাওহিদের সুস্পষ্ট কোনো প্রকারভেদ দেখা যায় না। অর্থাৎ তাওহিদ মানে সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেওয়া—চাই সেটা বিশ্ব সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হোক, আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে হোক, কিংবা তাঁর সত্তা, কর্ম, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে হোক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কিছু আলেম তাওহিদকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে তাওহিদের তিনটি ভাগ: এক. রবুবিয়্যাহ তথা আল্লাহর সকল কাজের (যেমন সৃষ্টি করা, রিজিক, জীবন ও মৃত্যু দেওয়া ইত্যাদি) ক্ষেত্রে একমাত্র তাকেই প্রভু হিসেবে মেনে নেওয়া। দুই. উলুহিয়্যাহ তথা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। তিন. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত অর্থাৎ আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে অন্য কাউকে শরিক না করা। এ ব্যাপারে কিছু কিছু ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায় ইবনে বাত্তার লেখায়।³ ইমাম ইবনে তাইমিয়া এই চিন্তাকে আরও সামনে এগিয়ে নেন ও প্রতিষ্ঠিত করেন।⁴ পরবর্তীকালে তাঁর চিন্তাধারা ও আকিদার অনুসারীদের মাঝে এটা প্রশ্নাতীত ও অকাট্য বিষয়ে পরিণত হয়।
বস্তুত তাওহিদের উক্ত প্রকারভেদ কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কিছু নয়; বরং এটাকে মানুষের আকিদা শেখা ও বোঝার সহজ পদ্ধতি বলা চলে। ফলে ইজতিহাদ হিসেবে এটাতে সমস্যা ছিল না। এ কারণে দেখতে পাই, অন্যান্য ধারার আলিমগণও এর কাছাকাছি বক্তব্য দিয়েছেন, যেমন তহাবিয়্যার ব্যাখ্যাকার সিরজুদ্দিন গজনবি, ⁵ আল-

টিকাঃ
১. শরহুল আকিদাহ আত তহাবিয়্যাহ, শুজাউদ্দিন হিবাতুল্লাহ তুর্কিস্তানি, পৃ. ৪৮; গজনবি (৩২)।
২. গজনবি (৩২)।
৩. আল-ইবানাতুল কুবরা, ইবনে বাত্তা (৬/১৪৯)। এখানে তিন প্রকারের প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হুবহু তিন প্রকার নয়, যা পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধ হয়েছে।
৪. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া (১০/২৪৯)
৫. গজনবি (৩৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরিক নেই

📄 আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরিক নেই


ফিকহুল আকবারের ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলি কারি।¹ কিন্তু সমস্যা হলো, আগের যুগের আলিমদের কাছ থেকে তাওহিদের এই প্রকারভেদ পাওয়া গেলেও তারা এক্ষেত্রে বিচ্যুতির শিকার হননি, যার শিকার পরবর্তী লোকেরা হয়েছেন। তারা তাওহিদুল উলুহিয়্যাহকে রবুবিয়্যাহ থেকে আলাদা করে এই দ্বিতীয় প্রকারের তাওহিদকেই মূল তাওহিদ ধরে প্রথমটাকে গৌণ মনে করেন। বরং সময় যত অতিক্রান্ত হয়েছে, তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ তাদের কাছে তত গৌণ হয়ে গিয়েছে। তাদের ধারণা, দুনিয়ার সকল লোক প্রথম প্রকারের তাওহিদে বিশ্বাসী। কিছু নগণ্য লোক বাদে কেউ তাওহিদুর রবুবিয়্যাহকে অস্বীকার করেনি! আরবের মুশরিকরাও প্রথম প্রকারের তাওহিদে বিশ্বাসী ছিল! কেবল প্রথম প্রকার নয়, বরং তারা তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাতেও বিশ্বাসী ছিল! ফলে তাদের মতে, 'নবিগণ এই তাওহিদ শেখাতে আসেননি; তারা এসেছেন তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ শেখাতে।' উপরন্ত তারা তাদের মানহাজের আলোকে তাওহিদকে ভাগ না করার ফলে অন্যদের সমালোচনাও করেন।
এমন ধারণার সূত্রপাত মূলত রবুবিয়্যাহ বোঝার ক্ষেত্রে জটিলতা থেকে। তারা রবুবিয়্যাহ বলতে কেবল বুঝেছেন পৃথিবী ও পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি এবং পরিচালনা। কুরআনে এ ব্যাপারে কাফেরদের বিশ্বাস সম্পর্কে বলা হয়েছে: وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۚ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ অর্থ: 'আপনি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে সৃষ্টি করেছে আকাশ ও মাটি, আর কার হাতে রয়েছে সূর্য ও চন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ! সুতরাং তারা কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে?' [সুরা আনকাবুত: ৬১]
এ থেকে তারা বুঝেছেন, মক্কার মুশরিকরা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাস ছিল। বরং সকল মানুষ প্রাকৃতিকভাবে এই তাওহিদে বিশ্বাসী। সুতরাং এটা মূল তাওহিদ নয়; মূল তাওহিদ আল্লাহর উলুহিয়্যাহ প্রতিষ্ঠা।
এ কথা কতটুকু সঠিক? আমরা যদি কুরআন ও সুন্নাহে সামগ্রিক দৃষ্টি দিই, তা হলে দেখতে পাই যে, তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ মোটেই গৌণ নয় এবং সকল মানুষ তো দূরের কথা, মক্কার কাফের ও আগেকার বিভিন্ন নবির উম্মতরা আল্লাহর রবুবিয়্যাহর কিছু অংশের আংশিক স্বীকৃতি দিলেও সেটা কখনোই তাওহিদ ছিল না। বরং এ স্বীকৃতি জগতের সকল কাফের-মুশরিক দেয়। 'সৃষ্টির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ' যা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহর

টিকাঃ
১. মিনাহুর রাওজিল আজহার ফি শরহিল ফিকহিল আকবার, মোল্লা আলি কারি (৪৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 কালিমা ও শাহাদাহ

📄 কালিমা ও শাহাদাহ


মর্ম, কাফেররা সেটা অস্বীকার করত। প্রাচীন মিশর, গ্রিস, রোম, ইউরোপ, ভারত ও চীন-সহ অসংখ্য জাতির ইতিহাস রবুবিয়্যাহ অস্বীকৃতির ইতিহাসে ভরপুর।¹ হ্যাঁ, তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। কিন্তু সেগুলো মোটেই তাওহিদ নয়। অসংখ্য সৃষ্টিকর্তা, অসংখ্য রিজিকদাতা, অসংখ্য পালনকর্তায় বিশ্বাস করত তারা। আবার অনেক জাতি আল্লাহ বলতে কিছুতে বিশ্বাসই করত না। যেমন: গ্রিস ও ভারতে অসংখ্য সম্প্রদায় সরাসরি নাস্তিক ছিল। আবার যারা নামকাওয়াস্তে একজন সৃষ্টিকর্তা মানত, তারা রবুবিয়্যাহর সবকিছু অস্বীকার করত। বৌদ্ধ, জৈন, কনফুসীয় ধর্মে তাওহিদ তো দূরের কথা, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে তেমন কিছুই নেই। ফলে সেগুলো এক প্রকারের নাস্তিক্যবাদী ধর্ম-দর্শন।² কোটি কোটি মানুষ প্রাচীন কাল থেকে এসব ধর্ম- দর্শনে বিশ্বাসী। ফলে অধিকাংশ জাতিই তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ অস্বীকারকারী ছিল। 'জগতের অধিকাংশ মানুষ তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাস রাখে'-এমন বক্তব্য তাওহিদের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলেন, ‏اَلَا لِلّٰهِ الدِّيْنُ الْخَالِصُ ط وَالَّذِيْنَ اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِةٍ اَوْلِيَاءَ ۘ مَا نَعْبُدُهُمْ اِلَّا لِيُقَرِّبُوْنَآ اِلَى اللّٰهِ ‏زُلْفٰى ۗ اِنَّ اللّٰهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِيْ مَا هُمْ فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ ۗ اِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِيْ مَنْ هُوَ كٰذِبٌ كَفَّارٌ অর্থ: 'নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীন কেবল আল্লাহরই জন্য। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে এবং বলে, আমরা তাদের উপাসনা এ জন্য করি, যেন তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে হিদায়াত দান করেন না।' [জুমার: ৩] উক্ত আয়াতে প্রতিমাপূজা কেবল উলুহিয়্যাহর লঙ্ঘন নয়; বরং রবুবিয়্যাহরও লঙ্ঘন। কারণ, তারা মনে করত এসব প্রতিমার তাদের উপকার করার ক্ষমতা আছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
‏وَلَا يَأْمُرَكُمْ اَنْ تَتَّخِذُوا الْمَلٰۗىِٕكَةَ وَالنَّبِيّٖنَ اَرْبَابًا ۗ اَيَأْمُرُكُمْ بِالْكُفْرِ بَعْدَ اِذْ اَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ অর্থ: 'তা ছাড়া তার পক্ষে তোমাদের এমন নির্দেশ দেওয়াও সম্ভব নয় যে, তোমরা ফেরেশতা ও নবিগণকে নিজেদের রব হিসেবে গ্রহণ করে নাও। তোমাদের

টিকাঃ
১. Battling the Gods: Atheism in the Ancient World, Tim Whitmarsh.
২. History and Literature of Buddhism, Thomas Rhys Davids. Exploring Buddhism, Christmas Humphreys. An Introduction to Indian Philosophy, Satischandra Chatterjee. Confucianism And Taoism, Robert Kennaway Douglas.

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 শিরকের পরিচয় ও উৎপত্তি

📄 শিরকের পরিচয় ও উৎপত্তি


মুসলমান হওয়ার পরে তিনি কি তোমাদের কুফরি শেখাবেন?' [আলে ইমরান: ৮০] এখানে ফেরেশতা ও নবিদের রব অভিহিত করার কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা আরেক জায়গায় ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে বলেন, ٱتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَنَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلْمَسِيحَ ٱبْنَ مَرْيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓا۟ إِلَّا لِيَعْبُدُوٓا۟ إِلَٰهًا وَٰحِدًا ۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشْرِكُونَ
অর্থ: 'তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং পাদরিদের তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আর গ্রহণ করেছে মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র ইলাহের ইবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তারা তাঁর ব্যাপারে যা শরিক করে তা থেকে তিনি পবিত্র।' [তাওবা: ৩১]
এসব আয়াতে দেখা যাচ্ছে, তারা রবুবিয়্যাহকে কেবল আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করত না; অন্যদেরও তারা তাদের 'রব' হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
হুদ আলাইহিস সালাম যখন আদ সম্প্রদায়ের কাছে দাওয়াত নিয়ে গেলেন, তারা বলল, قَالُوا۟ يَٰهُودُ مَا جِئْتَنَا بِبَيِّنَةٍ وَمَا نَحْنُ بِتَارِكِىٓ ءَالِهَتِنَا عَن قَوْلِكَ وَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ إِن نَّقُولُ إِلَّا ٱعْتَرَىٰكَ بَعْضُ ءَالِهَتِنَا بِسُوٓءٍ ۗ قَالَ إِنِّىٓ أُشْهِدُ ٱللَّهَ وَٱشْهَدُوٓا۟ أَنِّى بَرِىٓءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ
অর্থ: 'তারা বলল, হুদ, তুমি আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নিয়ে আসোনি, আমরা তোমার কথায় আমাদের ইলাহদের বর্জন করতে পারি না। আর আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনয়নকারীও নই। বরং আমরাও তো বলি যে, আমাদের কোনো ইলাহ তোমার উপরে মন্দ কিছু চাপিয়ে দিয়েছে। হুদ বললেন, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করেছি আর তোমরাও সাক্ষী থাকো যে, তোমরা যা-কিছু শিরক করছ, আমি তা থেকে মুক্ত।' [হুদ: ৫৩-৫৪]
উক্ত আয়াতে স্পষ্ট যে, আদ সম্প্রদায় তাদের দেব-দেবীদের কেবল ইবাদতই করত না; বরং তাদের ব্যাপারে আল্লাহর অনেক গুণে বিশ্বাস রাখত। যেমন: তারা বিশ্বাস করত যে, দেব-দেবীরা উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। আর এটাই তো স্বাভাবিক। দেব-দেবীদের ব্যাপারে এমন আকিদা না রাখলে তাদের পুজো করেই-বা কী লাভ? বরং তারা তাওহিদুর রবুবিয়্যাহতে বিশ্বাসী ছিল না বলেই তো তাওহিদুল

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00