📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আকিদার পরিচয়

📄 আকিদার পরিচয়


আকিদা আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো বিশ্বাস। ইসলামের মূলনীতিগুলোর ব্যাপারে অন্তরের দৃঢ় এবং অনড় বিশ্বাসকে আকিদা বলা হয়।১ তবে এটা কেবল বিশুদ্ধ আকিদার সঙ্গেই নির্দিষ্ট নয়; বরং যেকোনো বিষয়ে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসকে আকিদা বলা হয়। সুতরাং আকিদা সত্য-মিথ্যা ও হক-বাতিল দুই রকমই হতে পারে। মুসলমানদের বিশ্বাসের বিষয়গুলোকে যেমন ইসলামি আকিদা বলা হয়, তেমনই অমুসলিমদের বিশ্বাসগুলোকে অমুসলিমদের আকিদা বলা হয়। যেমন: খ্রিষ্টানরা তিন

টিকাঃ
১. দেখুন: আল-মাওয়াকিফ, আজুদুদ্দিন ইজি (১/৩১); শরহু আকিদাতিল ইমাম আত তাহাবি, সিরাজুদ্দিন গজনবি (২৫)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরিচয়

📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরিচয়


খোদায় বিশ্বাসী। ফলে সেটা খ্রিষ্টানদের আকিদা। আবার মুসলমানদের আকিদাও বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটোই হতে পারে। যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী, তারা সহিহ তথা বিশুদ্ধ আকিদার অধিকারী। আর যারা কবরপূজা-সহ বিভিন্ন কুফর, শিরক ও বিদআতের মাঝে নিমজ্জিত, তারা বাতিল তথা ভ্রান্ত আকিদার অনুসারী।
অনেকে মনে করেন, 'আকিদা' শব্দটি বিদআত। কারণ, কুরআন-সুন্নাতে এটি আসেনি, পরবর্তী লোকেরা উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু উক্ত ধারণা সঠিক নয়। হ্যাঁ, কুরআনে 'আকিদা' শব্দটি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে হাদিসে এর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে মুসলিমের হৃদয়ে তিনটি বিষয় দৃঢ়ভাবে গেঁথে যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে: আমলে নিষ্ঠা, শাসকদের জন্য কল্যাণকামনা এবং মুসলিম জামাতের সঙ্গে থাকা।১ পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাতের ইমামগণ উক্ত নামটি ঈমানের সমার্থক হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের গ্রন্থাবলিতে ব্যবহার করেছেন। হ্যাঁ, এটার পাশাপাশি যুগে যুগে ইসলামি আকিদা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল এবং সেসব নামে ইমামগণ একাধিক গ্রন্থ লিখেছেন। তন্মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য নাম ও সেসব নামের গ্রন্থ হচ্ছে:
এক. 'তাওহিদ'। উক্ত নামে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে: ইমাম আবু মানসুর আল- মাতুরিদির 'কিতাবুত তাওহিদ', ইজ ইবনে আবদুস সালামের 'রাসাইল ফিত তাওহিদ', ইবনে মানদাহর 'কিতাবুত তাওহিদ', ইবনে রজবের 'কিতাবুত তাওহিদ' এবং মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাবের 'কিতাবুত তাওহিদ' ইত্যাদি।
দুই. 'আল-ফিকহুল আকবার'। ইমাম আবু হানিফা রাহি.-এর 'আল-ফিকহুল আকবার'।
তিন. 'সুন্নাহ'। যেমন: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহি.-এর 'উসুলুস সুন্নাহ' এবং আবু বকর খাল্লালের 'আস-সুন্নাহ'।
চার. 'শরিয়াহ'। আজুররির 'আশ শরিয়াহ'।
পাঁচ. 'ঈমান'। যেমন: আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লামের 'কিতাবুল ঈমান', ইবনে মানদাহর 'আল-ঈমান' এবং ইবনে তাইমিয়ার 'আল-ঈমান'।

ছয়. 'উসুলুদ্দিন'। যেমন: ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরির 'আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা', আবদুল কাহের বাগদাদির 'উসুলুদ্দিন'। ফখরুদ্দিন রাজির 'মাআলিমু উসুলিদ্দিন', আবুল ইউসর বাজদাবির 'উসুলুদ্দিন' এবং নাসাফির 'তাবসিরাতুল আদিল্লাহ ফি উসুলিদ্দিন'।
সাত. 'আকিদাহ'। যেমন: ইমাম তহাবির এই গ্রন্থ 'আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ', নাসাফির 'উমদাতু আকিদাতি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ', তাফতাজানির 'শরহুল আকাইদ আন নাসাফিয়্যাহ', সাবুনির 'আকিদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদিস', সানুসির 'আকিদাহ সানুসিয়্যাহ', শারানির 'আল ইওয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির ফি বায়ানি আকায়িদিল আকাবির' এবং 'ইবনে তাইমিয়ার 'আল-আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়্যাহ'।
আট. 'ইতিকাদ'। যেমন: বাইহাকির 'আল-ইতিকাদ ওয়াল হিদায়াহ ইলা সাবীলির রাশাদ', গাজালির 'আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ, বাকিল্লানির 'আল-ইনসাফ ফি মা ইয়াজিবু ইতিকাদুহু ওয়ালা ইয়াজুজুল জাহলু বিহি' এবং লালাকায়ির 'শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'।
নয়. ইলমুল কালাম।' যেমন: শাহরাস্তানির 'নিহায়াতুল ইকদাম ফি ইলমিল কালাম', আবুল কাসেম আনসারির 'আল-গুনইয়াহ ফি ইলমিল কালাম', আজুদুদ্দিন ইজির 'আল-মাওয়াকিফ ফি ইলমিল কালাম'।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরিচয়: 'সুন্নাহ' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো পথ ও পদ্ধতি। মোটা দাগে দ্বীনের পথকেই সুন্নাহ বলা হয়। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পথই সুন্নাহর পথ। হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত

খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো'। 'জামাত' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো দল ও গোষ্ঠী। এখানে 'জামাত' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের সত্য অনুসারীগণ।২ সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা বলতে বোঝানো হয়: কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, সালাফে সালেহিন এবং প্রত্যেক যুগে উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ হকপন্থি ইমাম ও আলিমদের অনুসৃত আকিদা, যা সকল বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি, সকল বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িমুক্ত মধ্যপন্থি বিশ্বাস।৩
এ ব্যাপারটি ইমামদের বানানো নয়; বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত; বিশেষত 'উম্মতের তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত'-বিষয়ক হাদিসটি। সেখানে কেবল একটি সম্প্রদায়কে নাজাতপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর তারা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর উপর অবিচল 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত'।৪ সুতরাং যেসব ফিরকা তাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে, তারা গোমরা ও বিদআতি ফিরকা হিসেবে গণ্য হবে। যেমন: খারেজি, মুরজিয়া, শিয়া, কাদারিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ, মুতাজিলা ও সকল বাতেনি সম্প্রদায়। পিছনে আমরা আহলে সুন্নাতের আকিদা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি। সামনে এগুলোর উপর বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১. মুসনাদে দারেমি (২৩৫)।
১. আকিদাকে ইলমুল কালাম সাব্যস্ত করা আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মতামত নয়। বিশেষত আশআরি-মাতুরিদি ধারার উলামায়ে কেরাম 'আকিদা'কে 'কালাম' আখ্যা দেন। এখানে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। কারণ, ইমাম তহাবি তাঁর গ্রন্থে 'আকিদা' এবং 'উসুলুদ্দিন' পরিভাষা দুটো ব্যবহার করেছেন; কালাম পরিভাষাটি কোথাও ব্যবহার করেননি, কিংবা এটা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তাই যে সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণের মাঝে আমরা সীমাবদ্ধ থাকতে চাচ্ছি সেটা হলো, ইলমুল কালামকে ঘিরে অধিকাংশ মানুষ দুই ধরনের প্রান্তিকতার শিকার। একদল কালামের মাধ্যমেই আকিদা বুঝতে চান; আরেক দল কালামকে সর্বোতভাবে বর্জনীয় ও নিন্দাযোগ্য মনে করেন। কিন্তু মুহাক্কিক ও মুতাদিল আহলে সুন্নাতের অবস্থান দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি। আকিদার ভিত্তি ও বিচরণক্ষেত্র (মাসদার ও মারজি) হবে কুরআন ও সুন্নাহ। প্রয়োজনে কালামকে সহায়ক ইলম হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, ঠিক যে উদ্দেশ্যে এর প্রকাশ ঘটেছিল।
১. সুনানে আবু দাউদ (৩৯৯১); সুনানে তিরমিজি (২৬০০); সুনানে ইবনে মাজা (৪২); জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ইবনে রজব (২/১২০)।
২. দেখুন: আল ইতিসাম, শাতেবি (২/২৬১-২৬৫); গজনবি (২৬)।
৩. দেখুন: শরহুল আকিদাহ আত তহাবিয়্যাহ, আবদুল গনি আল-গুনাইমি (৪৪); নুরুল ইয়াকিন ফি উসুলিদ্দিন ফি শরহি আকায়িদিত তহাবি, হাসান কাফি আকহাসারি (১০৬)।
৪. হাদিসটি আবু হুরাইরা, মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, আনাস ইবনে মালিক রাজি.-এর সূত্রে আবু দাউদ (৪৫৮৬), তিরমিজি (২৭৭৮), ইবনে মাজা (৩৯৯১) মুসনাদে আহমদ (৮৩৭৭)-সহ অসংখ্য গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। তবে এর শেষাংশ 'একটি দল ব্যতীত সবাই জাহান্নামে যাবে' এটার উপর ইবনে হাজাম, ইবনুল উজীর-সহ কিছু আলিম আপত্তি করেছেন। কিন্তু তাদের আপত্তি শক্তিশালী নয়। তিয়াত্তর দলের একটি দল ব্যতীত বাকি সবাই কাফের কিংবা চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে হাদিসে এমন বলা হয়নি। বরং তারা একাধিক ভাগে বিভক্ত। তাদের মাঝে যারা কুফর ও সুস্পষ্ট শিরকের উপর মৃত্যুবরণ করবে, তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামি। আর যারা বিদআতপন্থি ও গোমরাহ, কিন্তু ঈমানের গণ্ডিভুক্ত, তারা সাময়িকভাবে জাহান্নামে যাবে কিংবা আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। দেখুন: আকহাসারি (৯৯-১০০), গুনাইমি (৪৪-৪৫), আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম, (১/১৮৬)। আরও দেখুন আবদুল্লাহ জুদাই'কৃত আজওয়া আলা হাদিসি ইফতিরাকিল উম্মাহ।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ

📄 ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ


মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে ইমাম তাহাবির আগে অসংখ্য বড় বড় ফকিহ গত হয়েছেন। তাদের মাঝে ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর শিষ্যদ্বয়ের নাম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো আলো ছড়াচ্ছে।
ইমাম আবু হানিফা (৭০-১৫০হি.): 'ইমাম আজম' তথা সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। নাজর ইবনে শুমাইল বলেন, 'মানুষ ফিকহ সম্পর্কে নিদ্রামগ্ন ছিল। আবু হানিফা এসে তাদের জাগ্রত করেছেন।' ইমাম শাফেয়ি বলেন, 'ফিকহের ক্ষেত্রে মানুষ আবু হানিফার উপর নির্ভরশীল।' শাফেয়ি ইমাম মালেককে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি আবু হানিফাকে দেখেছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমি দেখেছি এমন এক ব্যক্তিকে, চাইলে তিনি কাঠের খুঁটিকেও স্বর্ণ বানিয়ে ফেলতে পারেন'।১ ইবনুল মুবারককে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কে বড় ফকিহ? মালেক নাকি আবু হানিফা?' তিনি বললেন, 'আবু হানিফা।' মক্কি ইবনে ইবরাহিম বলেন, 'আবু হানিফা তার যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ছিলেন।' আলি ইবনে আসেম বলেন, 'আবু হানিফার ইলমকে যদি তার যুগের সবার ইলমের সঙ্গে তুলনা করা হতো, তবে তার ইলম ভারী হতো'!২
ইমাম আবু হানিফা রাহি. সাহাবাদের শেষ যুগে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তাদের কয়েকজনকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বিখ্যাত সাহাবি আনাস ইবনে মালেক রাজি। তিনি তাবেয়িদের হাতে বড় হয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে ইলম শিখেছেন, মুনাজারা করেছেন। ফলে তিনি সেই শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত, যাদের ব্যাপারে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষ্য দিয়েছেন, 'তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম হচ্ছে আমার সঙ্গে বিদ্যমান প্রজন্ম। এরপর যারা তাদের পরে আসবে। এরপর যারা তাদের পরে আসবে'।
ফলে কেবল ইলম নয়, আমলের ময়দানেও তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে। আলি ইবনে ইয়াজিদ বলেন, 'আমি আবু হানিফাকে এক রমজানে ষাটবার কুরআন কারিম খতম করতে দেখেছি; ত্রিশ খতম দিনে, ত্রিশ খতম রাতে।' হাফস ইবনে গিয়াস বলেন, 'আবু হানিফা চল্লিশ বছর ইশার ওজু দ্বারা ফজরের নামাজ পড়েছেন'। ৪ খলিফা হারুনুর রশিদ আবু ইউসুফ রাহি.-কে আবু হানিফা রাহি, সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তু থেকে তিনি ছিলেন অনেক দূরে। দুনিয়াদারকে তিনি এড়িয়ে চলতেন। অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন। গভীর চিন্তার মাঝে ডুবে রইতেন। তিনি বেশি কথা বলতেন না। যদি কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করত এবং তিনি সেটা জানতেন, তবে জবাব

দিতেন। আমিরুল মুমিনিন, আমি তাকে সর্বদা তার নিজেকে ও নিজের দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখতে দেখেছি। তিনি মানুষের পিছনে পড়তেন না। কারও মন্দ আলোচনা করতেন না!' হারুনুর রশিদ বললেন, 'এটাই সালেহদের চরিত্র!' আবু আসেম নাবিল বলেন, 'অত্যধিক নামাজের কারণে আবু হানিফা রাহি.-কে 'আওতাদ' নামে ডাকা হতো।' আবু ইউসুফ রাহি. বলেন, 'আবু হানিফা রাহি, প্রত্যেক রাতে নামাজে কুরআন খতম করতেন।' আবু ইউসুফ আরও বলেন, 'একদিন আমি ইমামের সঙ্গে হাঁটছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বলল, তিনি আবু হানিফা। তিনি রাতে ঘুমান না। তখন ইমাম বললেন, তারা আমার ব্যাপারে কেন এমন কথা বলে যা আমি করি না? (এভাবে তিনি লুকোতে চাইলেন)। বাস্তবে তিনি সারা রাত নামাজ, দোয়া ও মুনাজাত করে কাটাতেন'!১ তিনি ছিলেন উম্মাহর শ্রেষ্ঠ জাহেদদের অন্তর্ভুক্ত। শাসকদের দরবার থেকে অনেক দূরে। তাদের বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি সম্পর্কে সরব সংগ্রামী মুজাহিদ।
আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রাhi, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বিভিন্ন ভ্রান্ত দল তথা নাস্তিক (মুলহিদ), জিন্দিক, খারেজি, কাদারিয়্যাহ, মুরজিয়া, শিয়া, জাহমিয়্যাহ-সহ বিভিন্ন ফিরকার বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন। প্রায় সময়ই তাদের খণ্ডন করতেন। কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তি দিয়ে ইসলামবিরোধীদের পরাভূত করার ক্ষেত্রে সে যুগে ইমাম আবু হানিফা রাhi.-এর মতো ব্যক্তিত্ব বিরল ছিল।২ এ কারণে তার একাধিক শাগরিদ তাঁর আকিদাকে 'আল-ফিকহুল আকবার', 'আল ফিকহুল আবসাত', 'আর-রিসালাহ', 'আল-ওসিয়্যাহ'-সহ বিভিন্ন কিতাবে সংরক্ষণ করেছেন। ইমাম তহাবি রাhi. সেই ধারাবাহিকতাকে পূর্ণতা দান করেছেন। এভাবে ইমাম আবু হানিফা রাhi.-কেবল ফিকহের নয়; বরং সহিহ আকিদার ইমাম হিসেবেও প্রথম সারিতে রয়েছেন।
হাদিসের ময়দানেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী অশ্বারোহী। হাদিসের প্রতি তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধাশীল। হ্যাঁ, তিনি অনেক প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসদের মতো কেবল হাদিস বর্ণনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না; বরং হাদিস থেকে ফিকহ ইসতিমবাতের কাজেই অধিক সময় ব্যয় করতেন। এ কারণে তাঁর হাদিসের রেওয়ায়াত তুলনামূলক কম। কিন্তু এতে অনেকের ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন না। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এত বড় মাপের একজন ফকিহ ইমাম মুহাদ্দিস হন না কী করে? এ কারণে

ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন-সহ অনেক বড় বড় মুহাদ্দিস তাকে 'সিকাহ' বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, 'আল্লাহ মালেককে রহম করুন। তিনি ইমাম ছিলেন। আল্লাহ আবু হানিফাকে রহম করুন। তিনি ইমাম ছিলেন'!' তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো 'মাসানিদ' আকারে একাধিক মুহাক্কিক আলিম সংকলন করেছেন। তাতেই হাদিসশাস্ত্রে তার অবস্থান নির্ণয় করা যায়। ইমাম ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ইবনে আবদুল বার, নববি, ইবনে কাসির, ইবনে হাজার সবাই তাকে 'তাওসিক' করেছেন। তিনি হাদিসের হাফেজ ও নাকেদ ছিলেন। জারহ ও তাদিলের অধিকারী ছিলেন। হ্যাঁ, অনেক মানুষ হিংসা ও বিভিন্ন কারণে তাঁর উপর আক্রমণ করেছেন। অতীত ও সমকালের কেউ কেউ হাদিসের ক্ষেত্রে তাকে জয়িফ বলেছেন। এগুলো গ্রহণযোগ্য বক্তব্য নয়।² বিভিন্ন মুহাদ্দিস কর্তৃক তাঁর সমালোচনাকে ইমাম ইবনে আবদুল বার 'বাড়াবাড়ি' ও 'সীমালঙ্ঘন' আখ্যা দিয়েছেন।³
ইমাম কাজি আবু ইউসুফ (মৃ. ১৮২ হি.): তিনি ইমাম আবু হানিফা রাhi.-এর শীর্ষ শাগরিদ। দীর্ঘ প্রায় সতেরো বছর তাঁর সোহবত ও সান্নিধ্যে কাটান। ফলে কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ হয়ে ওঠেন। তিনি একাধারে ফকিহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলতেন, 'ফকিহদের মাঝে আবু ইউসুফের চেয়ে বড় কোনো ফকিহ আমি দেখিনি।' মুজানি বলেন, 'তিনি হাদিসের অনুসরণে সবার অগ্রগামী ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার লালসা ও ব্যস্ততা থেকে সারা জীবন দূরে ছিলেন।' মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ বলেন, 'কাজির দায়িত্ব গ্রহণের পরেও আবু ইউসুফ প্রতিদিন দুই শত রাকাত নামাজ পড়তেন।' স্বীয় ওস্তাদের মতো তিনিও আকিদার ক্ষেত্রে সালাফের মানহাজে অবিচল ছিলেন। কাদারিয়‍্যাহ, জাহমিয়‍্যাহ, মুরজিয়া-সহ ভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও সরব ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের পিছনে নামাজ পড়তেও নিষেধ করতেন। কাদারিয়‍্যাহদের মাঝে যারা গুলু করত, তাওবা না করলে হত্যার ফতোয়া দিয়েছিলেন। অতিরিক্ত তাকওয়ার কারণে মৃত্যুর সময় বলে যান, 'আমি জীবনে যত ফতোয়া দিয়েছি, তাতে কুরআন ও মুসলমানদের ইজমাবিরোধী কিছু থাকলে,

সেগুলো প্রত্যাহার করে নিলাম!' ফিকহের ক্ষেত্রে তাঁর কিতাব 'আল-খারাজ' আজও বিখ্যাত ও বহুলপঠিত।
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি (মৃ. ১৮৯ হি.): কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহ তিন শাস্ত্রের ইমাম ও মুজাদ্দিদ ছিলেন। আবু উবাইদ বলেন, 'আমি মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের চেয়ে আল্লাহর কালাম সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি!' ইমাম শাফেয়ি বলেন, 'তিনি এমনভাবে কুরআন পড়তেন, মনে হতো আল্লাহ তাঁর ভাষায় কুরআন নাজিল করেছেন।' শাফেয়ি আরও বলেন, 'আমি মুহাম্মাদের চেয়ে অধিক জ্ঞানী, বড় ফকিহ, বড় জাহেদ, অধিকতর মুত্তাকি আর কাউকে দেখিনি।' আমলের ক্ষেত্রেও তিনি তার সালাফদের মতো অগ্রগামী ছিলেন। তহাবি বর্ণনা করেন, 'মুহাম্মাদ রাহি, প্রত্যেক দিন কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করতেন।' ফিকহের ক্ষেত্রে তার একাধিক কিতাব দ্বারা আজও ফুকাহা ও উলামায়ে কেরাম প্রতিনিয়ত উপকৃত হয়ে চলেছেন।২
দ্বীনের ক্ষেত্রে এই ইমামত্রয়ের বিপুল খেদমত, অন্য সকল ইমামের মাঝে তাদের শীর্ষ অবস্থান এবং তাদের আকিদার বিশুদ্ধতার ফলেই ইমাম তহাবি নিজে একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলিম, ফকিহ ও ইমাম হওয়া সত্ত্বেও এবং আবু হানিফা ও তাঁদের সঙ্গীদ্বয়ের যুগ না পাওয়া সত্ত্বেও বিশুদ্ধ পন্থায় সংরক্ষিত তাদের বিশুদ্ধ আকিদা গ্রহণ করেছেন, প্রচার করেছেন এবং যুগ যুগ ধরে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এই গ্রন্থটি সেই ধারাবাহিকতারই ফলাফল।৩
তবে যেমনটা পূর্বে বলা হয়েছে, এখানে কেবল এই তিন ইমামের নাম আনার অর্থ এটা নয় যে, এগুলো কেবল তাদেরই আকিদা। বরং উক্ত তিন ইমামের আকিদা মূলত আহলে সুন্নাতের অনুসারী সকল ইমামের আকিদা। শাখাগত কিছু মাসআলাতে মতানৈক্য থাকলেও ইমাম আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি, আহমদ, বুখারি, মুসলিম- সহ উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের সবার আকিদা এক ও অভিন্ন- আকিদায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত।৪

ইবনে তাইমিয়া লিখেন: 'শাফেয়ি, মালেক, সাওরি, আওজায়ি, ইবনুল মুবারক, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ সবার আকিদা ছিল এক ও অভিন্ন।
এই একই আকিদা লালন করতেন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ, আবু সুলাইমান দারানি, সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুসতরি প্রমুখ মাশায়েখে কেরাম। দ্বীনের মৌলিক আকিদার ক্ষেত্রে এসব ইমাম মতভেদ করেননি। একই আকিদা পোষণ করতেন ইমাম আবু হানিফা। তাওহিদ, তাকদির ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর থেকে বর্ণিত আকিদা অন্যান্য ইমামের আকিদার মতোই। আর এটাই সাহাবি ও তাবেয়িদের আকিদা, কুরআন ও সুন্নাহর আকিদা'। ১

টিকাঃ
১. দেখুন: তারিখে বাগদাদসূত্রে গজনবি (২৮)।
১. মানাকিবু আবি হানিফা, জাহাবি (৩২); দেখুন: ইলাউস সুনান (১৯/৩০৭-৩৩৮)।
৩. বুখারি (২৪৫৭); মুসলিম (৪৫৯৯); তিরমিজি (২১৪৭)।
৪. দেখুন: তারিখে বাগদাদসূত্রে গজনবি (২৮)।
১. মানাকিবু আবি হানিফা, জাহাবি (২০-২১)।
২. দেখুন: কামালুদ্দিন বসনবি কৃত 'ইশারাতুল মারাম'।
১. মানাকিবু আবি হানিফাহ, জাহাবি (৪৫-৬)।
২. বিস্তারিত দেখুন: ইমাম ইবনে আবদুল বার কৃত 'আল-ইনতিকা'; ইলাউস সুনান, জফর আহমদ উসমানি (২১/৩০- ৩৬); শাইখ আবদুর রশিদ নুমানিকৃত 'মাকানাতুল ইমাম আবি হানিফা ফিল হাদিস'; ড. কাসেম হারেসিকৃত 'মাকানাতুল ইমাম আবি হানিফা বাইনাল মুহাদ্দিসিন'।
৩. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি (২/২৮৯)।
১. আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহি, সাইমারি (৯৯-১১০); মানাকিবু আবি হানিফা, জাহাবি (৬২-৬৭, ৭৩)।
২. আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহি, সাইমারি (১২৭-১২৮); মানাকিবু আবি হানিফা, জাহাবি (৮০, ৮৭, ৯৪)।
৩. দেখুন: গজনবি (২৯)।
৪. দেখুন: আত-তালিকাতুল মুখতাসারাহ আলা মাতনিল আকিদাহ আত তহাবিয়্যাহ, সালেহ ফাওজান (২০); আত- তাওজিহাতুল জালিয়্যাহ আলা শরহিল আকিদাহ আত তহাবিয়্যাহ, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আল-খুমাইয়িস
(৩০-৩১); আশ শারহুল কাবির আলাল আকিদাহ আত তহাবিয়্যাহ, সাইদ ফুদাহ (২৯-৩০)। আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর একজন সমকালীন ব্যাখ্যাকার হাসান সাক্কাফ দাবি করেছেন, তহাবির আকিদা কেবল তহাবিরই প্রতিনিধিত্ব করে, আবু হানিফা-সহ অন্যান্য ইমামের আকিদার প্রতিনিধিত্ব করে না। এটা ভিত্তিহীন দাবি। দেখুন: সহিহু শারহিল আকিদাহ আত তহাবিয়‍্যাহ, হাসান ইবনে আলি আস সাক্কাফ (২১)।
১. মাজমুউল ফাতাওয়া ৫/২৫৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00