📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি বর্জন

📄 বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি বর্জন


শুরু করা, সালাফ যে বিষয়ে কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করে গিয়েছেন। ইসলামে আল্লাহ, তাকদির-সহ ঈমানের জটিল ও নিগূঢ় (মুতাশাবিহাত) বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। একটি হাদিস দ্বারাও মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের কাছে সঁপে দেওয়ার নির্দেশনা বোঝা যায়। আমর ইবনে শুআইব তাঁর বাবা তাঁর দাদা (আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস) থেকে বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সাহাবি কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে বিতর্ক করছিলেন। তারা রাসুলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরজার কাছেই বসা ছিলেন। একপর্যায়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এলেন। তাঁর মুখমণ্ডল ক্রোধে রক্তিম ছিল। তিনি তাদের প্রতি কিছু মাটি ছুঁড়ে বললেন, 'থামো! এভাবেই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগুলো ধ্বংস হয়েছে। তারা নবিদের ব্যাপারে মতভেদ করেছে। কিতাবের একটা আয়াতকে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। কুরআনের এক আয়াত তো অন্য আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না। বরং এক আয়াত অন্য আয়াতকে সত্যায়ন করে। সুতরাং যা জানো সেটার উপর আমল করো। আর যা জানো না, তা যিনি জানেন তাঁর কাছে সঁপে দাও'। আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের মাঝে বের হলেন। তখন আমরা তাকদির নিয়ে বিবাদ করছিলাম। তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তাঁর মুখ লাল হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল সেখানে ডালিম নিংড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, 'তোমাদের কি এটা করতে বলা হয়েছে? আমি কি এটা নিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি? তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন এটা নিয়ে তারা বিতর্ক শুরু করেছিল। তাই আমি তোমাদের কঠোরভাবে এ ব্যাপারে বিতর্ক করতে নিষেধ করে দিচ্ছি'। আরেক হাদিসে রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি তিনটি বিষয় আমার উম্মতের ব্যাপারে ভয় করি—তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা, শাসকদের অত্যাচার এবং তাকদির অস্বীকার করা'। পরবর্তীকালে তা-ই ঘটেছে, যা তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। সাহাবাদের শেষ যুগেই তাকদির অস্বীকারকারী কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে!
উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি. বলেন, 'অতি শীঘ্রই এমন একটি দলের আবির্ভাব ঘটবে, যারা তোমাদের সঙ্গে কুরআনের বিভিন্ন সন্দেহপূর্ণ ও অস্পষ্ট বিষয়

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (৬৮১৭); খালকু আফআলিল ইবাদ, বুখারি (৬৩)।
২. তিরমিজি (২১৩৩); মুসানদে আবু ইয়ালা (৬০৪৫); বাজ্জার (১০০৬৩); মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (১৭৩৭)।
৩. মুসনাদে আহমদ (২১১৮৫); বাজ্জার (৪২৮৮); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭৪৬২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 ইমাম আবু জাফর তাহাবি

📄 ইমাম আবু জাফর তাহাবি


(মুতাশাবিহাত) নিয়ে বিরোধ করবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হবে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা'। ইবনে আব্বাস রাজি.-এর সূত্রে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, 'তোমরা সবকিছু নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করো, কিন্তু আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করো না'।২ ইবনে মাসউদ রাজি. বলেন, 'অতি শীঘ্রই অনেক অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য বিষয় নিয়ে বিতর্ক হবে। তখন তোমরা স্থিরভাবে কাজ করবে। পথভ্রষ্টদের ইমাম হওয়ার চেয়ে হকের মুক্তাদি হওয়া উত্তম'।৩ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রাহি. বলেন, 'দ্বীন নিয়ে যারা বিবাদ করে, তোমরা তাদের সঙ্গে বসো না। কারণ, তারা আল্লাহর আয়াত নিয়ে (কুরআনে নিষিদ্ধ) বিতর্কে লিপ্ত হয়'।৪ ইমাম বাগাবি রাhi. বলেন, 'আহলে সুন্নাতের সালাফের সকল আলিম এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহর সিফাতের ব্যাপারে বিতর্ক করা যাবে না'।
কিন্তু সালাফের এই নিষেধাজ্ঞায় কান না দিয়ে তারা আল্লাহকে নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। আজও সেই বিতর্ক চলছে। ইমাম আওজায়ি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো সম্প্রদায়ের অনিষ্ট চান, তখন তাদের বিতর্কে লিপ্ত করে দেন আর আমল থেকে বঞ্চিত করেন'!৬ আজ উম্মাহর দিকে তাকিয়ে দেখুন তাদের অধিকাংশ বিতর্ক আমলকেন্দ্রিক, নাকি বিতর্কের জন্যই বিতর্ক! আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলি, যেগুলো আমাদের শিক্ষা দেওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হচ্ছে আল্লাহকে ডাকা, তাঁর নিকটবর্তী হওয়া, আজ সেগুলো উম্মাহকে শতধাবিভক্ত করার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। অথচ সাহাবাগণ এসব বিষয়ে নীরব থেকেছেন। ইমাম মালেক রাহি. বলেন, 'তোমরা বিদআত থেকে বিরত থাকো।' তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'বিদআত কী?' তিনি বললেন, 'আহলে বিদআত হলো, যারা আল্লাহর আসমা (নাম), সিফাত (গুণাবলি), তাঁর কালাম, তাঁর ইলম ও কুদরত নিয়ে কথা বলে। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িরা যেসব বিষয়ে নীরব থেকেছেন, সেসব বিষয়ে নীরব থাকে না'। মুসলমানদের ঈমান ও ইসলামের সুরক্ষার জন্য এটা এক বিশাল মূলনীতি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত: ভ্রান্ত ফিরকাগুলো ও যারা তাদের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা আহলে বিদআত। বিপরীতে যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি

টিকাঃ
১. মুসনাদে দারেমি (১২১)।
২. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (২/৪৬)।
৩. আল-ইবানা (১/৩২৮)।
৪. তাফসিরে তাবারি (৯/৩১৪)।
৫. শরহুস সুন্নাহ, বাগাবি (১/২১৬)।
৬. জাম্মুল কালাম, হারাভি (৫/১২৩); শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১/১৬৪)।
৭. জাম্মুল কাلام, হারাভি (৫/৭০); সাওনুল মানতিক, সুযুতি (৯৬); শরহুস সুন্নah (১/২১৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 'আকীদাহ ওহাবিয়্যাহ' গ্রন্থ

📄 'আকীদাহ ওহাবিয়্যাহ' গ্রন্থ


ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত, সালাফে সালেহিনের পথে অবিচল, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নামে পরিচিত।' আল্লাহর অনুগ্রহে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানই (সাওয়াদে আজম) বিশুদ্ধ দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িন তথা সালাফে সালেহিনের অনুসারী। চার ইমাম তথা ইমাম আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ-সহ সকল মুহাদ্দিস ও ফকিহ এবং তাদের অনুসারী আলিম-উলামা ও সাধারণ মুসলমানদের সকলে উক্ত মানহাজের উপর প্রতিষ্ঠিত। শাখাগত বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য, চিন্তাগত বৈচিত্র্য, কুরআন-সুন্নাহর বিস্তারিত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মতের অমিল থাকলেও মৌলিক বিষয়গুলোতে তারা সবাই এক ও অভিন্ন। সামগ্রিক অর্থে তারা রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের মতের অনুসারী ও তাদের পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা সকলে আহলে সুন্নাত, 'ফিরকায়ে নাজিয়াহ' তথা মুক্তিপ্রাপ্ত দল।
এ কারণে কেবল নামে মুসলিম হলেই যথেষ্ট নয়। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের দাবিদার হলেই শেষ নয়। বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী মুসলিম হতে হবে। সালাফে সালেহিনের মানহাজের আলোকে কুরআন ও সুন্নাহ বুঝতে হবে। কারণ, প্রত্যেক ভ্রান্ত সম্প্রদায়ই কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের দাবি করে। প্রত্যেক ফিরকাই নিজেদের ইসলামের প্রকৃত ও খাঁটি প্রতিনিধি মনে করে। অথচ সবাই তা নয়। ফলে বিশুদ্ধ দ্বীন মানতে হলে সালাফের মানহাজে মানতে হবে। সহিহ আকিদার অনুসারী হতে হলে সালাফ ও খালাফের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমামদের অনসরণ করতে হবে। তাদের মূলনীতির আলোকে কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত আকিদা গ্রহণ করতে হবে। এটাই মুক্তির পথ। এ কারণেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতকে 'মুক্তিপ্রাপ্ত' দল বলা হয়। কারণ সালাফে সালেহিনের ইমামগণ কুরআন- সুন্নাহর শিক্ষাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের দেখানো পথে বাস্তবায়ন করেছেন। দ্বীন ও ঈমানকে তারা সাহাবাদের মানহাজের আলোকে বুঝেছেন। উপরন্তু তারা রাসুলুল্লাহর রেখে যাওয়া দ্বীনকে যুগে যুগে ধেয়ে আসা ভ্রান্তির তুফানের সামনে সুরক্ষিত রেখে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের কুরবানির বদৌলতেই আজ চৌদ্দশো বছর পরেও ইসলাম আমাদের কাছে সেভাবেই রয়েছে, যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে

টিকাঃ
১. দেখুন: আল ইতিসাম, শাতেবি (২/২৬১-২৬৫); গজনবি (২৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00