📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 সিরাতে মুস্তাকিম

📄 সিরাতে মুস্তাকিম


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মুসলিম উম্মাহর সুরক্ষাপ্রাচীর, ঐক্যের প্রতীক। ফলে তাঁর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম তথা সকল মুসলমান এক দেহ ও এক আত্মায় লীন ছিলেন। তাদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ ছিল না। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলেন। ফলে কোনো বিষয়ে দ্বিমত দেখা দিলে আসমান থেকে সরাসরি ফয়সালা চলে আসত। সকল দ্বিমতের অবসান ঘটত। অতঃপর যখন তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে স্বীয় পালনকর্তার কাছে চলে যান, তখনও সাহাবায়ে কেরাম তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীন, কুরআন ও সুন্নাহকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরেন এবং সত্য ও সরল পথে অবিচল থাকেন। হ্যাঁ, রাসুলের চলে যাওয়ার পর থেকে তাদের মাঝে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। যেমন: তাঁর দাফন কোথায় হবে সেটা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়।

টিকাঃ
১. জামে তিরমিজি (১০১৮); সুনানে ইবনে মাজা (১৬২৮)।
২. সহিহ বুখারি (৩৬৬৭); মুসনাদে আহমদ (৩৯৮)।
৩. বুখারি (৩০৯২); সহিহ মুসলিম (১৭৫৯); সুনানে আবু দাউদ (২৯৬৮)।
৪. বুখারি (৭২৮৪); মুসলিম (২০); তিরমিজি (২৬০৭)।
৫. বুখারি (৩৭০০); সহিহ ইবনে হিব্বান (৬৯১৭); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৬৬৭৬)।
৬. এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী দেখুন: ইবনে হিব্বান (৬৭৩৫); আল- মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাকেম (৫৭৪০); আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির (৭/২৮১); এই কিতাবের শেষাংশে বিস্তারিত দেখুন।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 বিদ‘আতির সূচনা ও বিদ‘আত সম্প্রদায়:

📄 বিদ‘আতির সূচনা ও বিদ‘আত সম্প্রদায়:


আকিদার কিছু বিষয় নিয়েও সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মতপার্থক্য দেখা যায়। যেমন: মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন কি না, সেটা নিয়ে তারা মতভেদ করেছেন। আয়েশা রাজি. মনে করতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেননি। তিনি বলতেন, যে দাবি করবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবকে দেখেছেন, তার দাবি ভুল। বিপরীতে ইবনে আব্বাস রাজি. ও তাঁর শাগরিদরা মনে করতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন। একইভাবে জীবিতদের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয় কি না, সেটা নিয়ে সামান্য মতভেদ হয়েছে। উমর ও তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর মনে করতেন, জীবিতরা কাঁদলে মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু আয়েশা রাজি. মনে করতেন, রাসুলুল্লাহর উদ্দেশ্য এটা নয়। কারণ, মৃতের জন্য আত্মীয়দের স্বাভাবিক কান্নার কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া হয় না।
কিন্তু এসব মতপার্থক্যের সবগুলোই ছিল রাজনীতি, ফিকহ কিংবা আকিদার শাখাগত বিষয়ে মতভিন্নতা (ইখতিলাফ)। দ্বীন ও আকিদার মৌলিক বিষয় নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে কোনো বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা, দলাদলি-হানাহানি (ইফতিরাক) ছিল না। আর প্রথমটি বৈধ, পরেরটি অবৈধ। প্রথমটি রহমত, পরেরটি গজব। ফলে সকল সাহাবা একটি এক ও অভিন্ন আকিদার উপর ছিলেন। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ
অর্থ: 'তোমাদের এই উম্মত এক উম্মত। আর আমি তোমাদের রব। অতএব, তোমরা আমার ইবাদত করো।' [আম্বিয়া: ৯২]
বিচ্যুতির সূচনা ও বিচ্যুত সম্প্রদায়: এভাবেই সাহাবায়ে কেরামের প্রথম যুগ শেষ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অন্যান্য লোক ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে, যাদের মাঝে অনেক রুগ্ন ও অসুস্থ হৃদয়ের মানুষ ছিল, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোহবত ও হিদায়াত এবং সাহাবায়ে কেরামের মানহাজ ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত ছিল। ফলে অনিবার্যভাবেই ভ্রান্তির সূচনা হয়। আকিদার অনেক মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে বিভেদ তৈরি হয়। অগণিত গোমরাহ ফিরকার

টিকাঃ
১. বুখারি (৪৮৫৫); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৪৯০০)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৩২৫৩); ফাতহুল বারি (৮/৬০৮)।
৩. বুখারি (১২৮৬, ১২৭৮); মুসলিম (৯২৯)।
৪. বুখারি (১২৮৮); মুসলিম (১৩২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 বিচারের কারণ

📄 বিচারের কারণ


আত্মপ্রকাশ ঘটে, যারা ঈমান ও আকিদার বিভিন্ন বিষয়ে রাসولুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। ইসলামে বিভিন্ন আকিদাগত বিদআতের উদ্ভাবন ঘটায়। এভাবে তারা 'ফিরাকে বাতিলা' বা ভ্রান্ত সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ভ্রান্ত ফিরকা হিসেবে খারেজি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। অতঃপর আসে রাফেজি-শিয়া সম্প্রদায়। সাহাবায়ে কেরামের শেষ যুগে প্রাদুর্ভাব ঘটে মুরজিয়া ও কাদারিয়্যাহ (মুতাজিলা), নামে আরও দুটো সম্প্রদায়ের। সাহাবাদের পরে তাবেয়িদের যুগে আবির্ভাট ঘটে জাহমিয়্যাহ (জাবরিয়্যাহ), মুআত্তিলাহ, মুশাববিহাহ, মুজাসসিমাহ নামে অসংখ্য ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের। ইবনুল জাওজি লিখেন, 'ভ্রান্ত ফিরকাগুলোর মূল হলো ছয়টি: খারেজি, কাদারিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া, রাফেজা ও জাবরিয়্যাহ'।
বস্তুত এগুলো ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ভবিষ্যদ্বাণীর অনিবার্য বাস্তবায়ন, যাতে তিনি বলেছিলেন, 'ইহুদিরা একাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে। খ্রিষ্টানরা বাহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মত তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। সবগুলো ফিরকা জাহান্নামে যাবে। কেবল একটি জান্নাতে যাবে।' জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তারা কারা, হে আল্লাহর রাসুল?' তিনি বললেন, 'যারা আমি ও আমার সাহাবাদের পথে থাকবে'। অন্য হাদিসে তিনি বলেন, 'বনু ইসরাইলের যা হয়েছিল, আমার উম্মতের মাঝেও ঠিক তা-ই হবে। এমনকি তাদের কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে থাকে, তবে আমার উম্মতেরও কেউ কেউ তাতে লিপ্ত হবে। বনু ইসরাইলরা বাহাত্তর সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়েছে আর আমার উম্মত বিভক্ত হবে তিয়াত্তর সম্প্রদায়ে। এদের একটি মিল্লাত ছাড়া সবাই হবে জাহান্নামি।' সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'তারা কারা?' তিনি বললেন, 'যারা আমার এবং আমার সাহাবাদের পথের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে'। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের পথে না চললে বিচ্যুতি অনিবার্য।
বিচ্যুতির কারণ: প্রশ্ন হতে পারে, একই কুরআন ও সুন্নাহ, এক আল্লাহ, এক কিবলা ও এক রাসুলকে মানার পরেও মুসলিম উম্মাহ এতগুলো ভাগে কেন বিভক্ত হলো?

টিকাঃ
১. মাকালাতুল ইসলামিয়িয়ন, আশআরি (৫)।
২. তালবিসু ইবলিস, ইবনুল জাওজি (১৯)।
৩. তিরমিজি (২৬৪০); ইবনে মাজা (৩৯৯২); আবু দাউদ (৪৫৯৬)।
৪. তিরমিজি (২৬৪১); হাকেম (৪৪৩); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪৬৪৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা > 📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত

📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত


সংক্ষেপে এর উত্তর দেওয়া জটিল। তবে কিছু মৌলিক কারণে মুসলিম উম্মাহ শতধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এসব মৌলিক কারণগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো:
এক. প্রবৃত্তির অনুসরণ। যেসব ফিরকা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে, তাদের বিচ্যুতির অন্যতম কারণ ছিল প্রবৃত্তির অনুসরণ। ফলে কুরআন-সুন্নাহ তাদের বিচ্যুতি প্রতিহত করেনি। কারণ তারা কুরআন-সুন্নাহকে হিদায়াতের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেনি; বরং বিচ্যুতির হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা নিজেরা মনগড়া মতবাদ (বিদআত) বানিয়ে কুরআন-সুন্নাহকে সেগুলোর মাঝে খাপ খাওয়াতে চেয়েছে, নিজেদের কুরআন-সুন্নাহর আলোকে গড়তে চায়নি। ফলে বিচ্যুতির শিকার হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে বলেন, 'অতি শীঘ্রই আমার উম্মতের মাঝে এমন সম্প্রদায় বের হবে, প্রবৃত্তি তাদের সেভাবে তাড়িয়ে বেড়াবে যেভাবে জলাতঙ্ক রোগ মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়'। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. বলে গিয়েছেন, 'তোমরা (দ্বীনের) অনুসরণ করো। বিদআত উদ্ভাবন করো না। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহি'। সুফিয়ান সাওরি রাহি. বলেছেন, 'শয়তানের কাছে গুনাহের চেয়ে বিদআত প্রিয়। কারণ, গুনাহগার ব্যক্তি তাওবা করে, কিন্তু বিদআতি তাওবা করে না'।
দুই, অন্যান্য ভ্রান্ত ধর্ম ও মতবাদের অনুসরণ। ইসলামের বাইরে অন্যান্য ধর্ম যেমন ইহুদিবাদ, খ্রিষ্টবাদ ও বিভিন্ন পৌত্তলিক ধর্ম ও মতাদর্শের অনুসরণ বিভিন্ন ইসলামি ফিরকার আকিদাগত বিচ্যুতির অন্যতম কারণ ছিল। তারা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দ্বীনকে বুঝতে না চেয়ে অন্যান্য ধর্মের আলোকে বুঝতে চেয়েছে। কাদারিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ, রাফেজি ও অনেক ভ্রান্ত সুফিবাদী তাদের ভ্রান্ত মূলনীতিগুলো অন্যান্য ধর্ম থেকে ধার করে ইসলামে ঢুকিয়েছে। ফলে পদস্খলন ঘটেছে। এটাও একটা হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে যান: 'আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! অতি শীঘ্রই তোমরা পূর্ববর্তী জাতিদের রীতিনীতি অনুসরণ করা শুরু করবে। পদে পদে তাদের অনুকরণ করবে। বরং তারা যদি 'দব্ব' (সান্ডাজাতীয় প্রাণী)-এর গর্তে প্রবেশ করে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, (পূর্ববর্তী জাতি বলতে) তারা কি ইহুদি ও খ্রিষ্টান?' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু

টিকাঃ
১. আবু দাউদ (৪৫৯৭)।
২. আল-ইবানা, ইবনে বাত্তা (১/৩২৭)।
৩. হিলইয়াতুল আউলিয়া (৭/২৬); শুআবুল ঈমান, বাইহাকি (১২/৫৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00