📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা
মূলপাঠ :
وَالمُؤْمِنُونَ يَرَوْنَ حَقًّا رَبَّهُمْ ... وَ إِلَى السَّمَاءِ بِغَيْرِ كَيْفَ يَنْزِلُ
মুমিনগণ সত্যিকারার্থেই তাঁদের রবকে দেখবেন। যিনি (মহান আল্লাহ) আসমানে নেমে আসেন; যার (নেমে আসার) ধরন আমাদের অজানা।
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ কেয়ামতের দিন মুমিনগণ তাঁদের রবকে দেখবেন; যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে অসংখ্য হাদিসে। সেসবের অন্যতম হলো বুখারি-মুসলিমে উল্লিখিত জারির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিস, যেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
سترون ربكم كما ترون الشمس في الظهيرة ليس دونها سحاب، وكما ترون القمر ليلة البدر ليس دونه سحاب.
“নিশ্চয় তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে, যেমনভাবে তোমরা দুপুরবেলায় সূর্য দেখতে পাও, যখন তার নিচে কোনো (আড়াল সৃষ্টিকারী) মেঘ থাকে না। এবং যেমনভাবে তোমরা পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে পাও, যখন তার নিচে কোনো (আড়াল সৃষ্টিকারী) মেঘ থাকে না।”⁵⁰
কেয়ামতের দিন যে মুমিনগণ তাদের রবকে দেখবেন, সে ব্যাপারে অনেক এবং প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম বলেছেন,
وَ إِلَى السَّمَاءِ بِغَيْرِ كَيْفَ يَنْزِلُ
“মহান আল্লাহ আসমানে নেমে আসেন; যার ধরন আমাদের অজানা।”
অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ.
“মহান আল্লাহ প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।”⁵¹
আহলুস সুন্নাহ এই সিফাতের প্রতি ইমান রাখে এবং তাঁদের রবের জন্য উক্ত সিফাত সেভাবে সাব্যস্ত করে, যেমনভাবে তা মানানসই হয় আল্লাহর জন্য।
টিকাঃ
৫০ অনুবাদকের টীকা: বুখারি-মুসলিমে সরাসরি এই শব্দরূপে হাদিসটি নেই। বুখারি-মুসলিমে হাদিসটি এসেছে এই শব্দরূপে- عَنْ جَرِيرٍ، قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم فَنَظَرَ إِلَى الْقَمَرِ لَيْلَةً - يَعْنِي الْبَدْرَ - فَقَالَ : «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ لَا تُضَامُّونَ فِي رُؤْيَتِهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لَا تُغْلَبُوا عَلَى صَلَاةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا فَافْعَلُوا». জারির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি রাতে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঐ চাঁদকে তোমরা যেমন দেখছ, ঠিক তেমনি তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। তাঁকে দেখতে তোমরা কোনো ভীড় বা জুলুমের সম্মুখীন হবে না। কাজেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাজ (জামাতে) আদায় করতে সমর্থ হলে তোমরা তাই করবে।” দ্রষ্টব্য: সহিহুল বুখারি, হা. ৫৫৪, সহিহ মুসলিম, হা: ৬৩৩। টীকা সমাপ্ত।
৫১ সহিহুল বুখারি, হা. ১১৪৫; সহিহ মুসলিম, হা. ৭৫৮।
📄 দাঁড়িপাল্লা ও হাউজ বিষয়ক আকিদা
মূলপাঠ :
وَأُقِرُ بِالْمِيزَانِ وَالْحَوضِ الَّذِي ... أَرجُو بِأَنِّي مِنْهُ رَيَّا أَنْهَلُ
আমি আল-মিজান (দাঁড়িপাল্লা) সাব্যস্ত করি; এবং সাব্যস্ত করি হাওজকেও, যেই হাওজের ব্যাপারে আশা রাখি, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আমি সেখান থেকে পানি পান করব।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি মিজান তথা দাঁড়িপাল্লার প্রতি ইমান রাখেন, যার মাধ্যমে আমলকে ওজন করা হবে। এটি এমন মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা হবে, যার দুটি পাল্লা এবং একটি জবান (মাপনির্দেশক) থাকবে।⁵²
ভালো আমলসমগ্র এক পাল্লায় রাখা হবে, আর মন্দ আমলসমগ্র আরেক পাল্লায় রাখা হবে। যদি মন্দ আমলের পাল্লা ভালো আমলের পাল্লার চেয়ে বেশি ঝুঁকে যায়, তাহলে এসব আমলকারী ব্যক্তি আজাবে নিপাতিত হতে পারে।⁵³ কিন্তু পরবর্তীতে (মুমিন হওয়ার কারণে) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; হয় শাফায়াতকারীদের শাফায়াতে, আর নয়তো স্রেফ সর্বাপেক্ষা দয়ালু আল্লাহর দয়ায়।⁵⁴
আর হাওজ বলতে উদ্দেশ্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাওজ। যা দৈর্ঘ্যে এক মাসের পথ, আবার প্রস্থেও এক মাসের পথ। কেয়ামতের দিন (এই উম্মতের) মুমিনগণ এই হাওজ থেকে পানি পান করবেন। যে ব্যক্তি উক্ত হাওজ থেকে এক ঢোক পানি পান করবে, সে আর কখনোই পিপাসিত হবে না। এই হাওজের পানপাত্রের সংখ্যা হবে তারকারাজির সমান।⁵⁵
টিকাঃ
৫২ অনুবাদকের টীকা : ইমাম সাফফারিনি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১১৮৮ হি.) বলেছেন, فَقَدْ دَلَّتِ الْآثَارُ عَلَى أَنَّهُ مِيزَانٌ حَقِيقِيٌّ ذُو كِفَّتَيْنِ وَلِسَانٍ كَمَا قَالَ ابْنُ عَبَّاسِ وَالْحَسَنُ الْبَصْرِيُّ، وَصَرَّحَ بِذَلِكَ عُلَمَاؤُنَا وَالْأَشْعَرِيَّةُ وَغَيْرُهُمْ، وَقَدْ بَلَغَتْ أَحَادِيثُهُ مَبْلَغَ التَّوَاتُرِ، وَانْعَقَدَ إِجْمَاعُ أَهْلِ الْحَقِّ مِنَ الْمُسْلِمِينَ عَلَيْهِ. “হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়েছে, এটা সত্যিকারের মিজান (দাঁড়িপাল্লা), যার দুটো পাল্লা ও একটি জবান (মাপনির্দেশক) আছে। যেমনটি ইবনু আব্বাস ও হাসান বাসরি বলেছেন এবং আমাদের উলামাগণ, আশারি সম্প্রদায়ের লোকজন ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ সম্পর্কিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির (বিপুলসংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত এমন) পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং এ বিষয়ে হকপন্থি মুসলিমরা একমত পোষণ করেছে।” দ্রষ্টব্য: আবুল আওন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আস-সাফফারিনি আল-হাম্বালি, লাওয়ামিউল আনওয়ারিল বাহিয়্যা ওয়া সাওয়াতিউল আসরারিল আসারিয়্যা লি শারহিদ দুর্রাতিল মুদিয়্যা ফি আকদিল ফিরকাতিল মারদিয়্যা (দামেস্ক : মুআসসাসাতুল খাফিকিনা ওয়া মাকতাবাতুহা, ২য় প্রকাশ, ১৪০২ হি./১৯৮২ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ১৮৫। টীকা সমাপ্ত।
৫৩ সুরা মুমিনুন : ১০২, ১০৩।
৫৪ সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৩৯; সহিহ মুসলিম, হা. ১৮৩।
৫৫ সহিহুল বুখারি, হা. ৬৫৭৯; সহিহ মুসলিম, হা. ২২৯২।
📄 পুলসিরাত বিষয়ক আকিদা
মূলপাঠ :
وَكَذَا الصِّراطُ يُمَدُّ فَوْقَ جَهَنَّمٍ ... فَمُسَلَّمْ نَاجٍ وَآخَرَ مُهْمَلُ
তদ্রুপ (স্বীকৃতি দিই), জাহান্নামের ওপরে বিস্তৃত পুলসিরাত থাকবে; কেউ কেউ সেখান থেকে নিরাপদে পরিত্রাণ পাবে, আবার কেউ কেউ হবে পরিত্যাক্ত।
ব্যাখ্যা : পুলসিরাত এমন একটি ব্রিজ বা সাঁকো, যা জাহান্নামের পৃষ্ঠের ওপর স্থাপিত থাকবে।⁵⁶ প্রকৃতপ্রস্তাবে পরকালের এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পুলসিরাত ইহকালের অ-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সিরাত তথা পথের প্রতিনিধিত্ব করবে।⁵⁷
ইহকালের সিরাত তথা পথের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ.
“নিশ্চয় এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ পথের অনুসরণ করো।”⁵⁸
তিনি আরও বলেছেন,
وَ إِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ.
“নিশ্চয় আপনি সরল পথের দিকে পথপ্রদর্শন করে থাকে।”⁵⁹
ইহকালে যেই সিরাত তথা পথের অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটা আল্লাহর কিতাব এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহয় বিবৃত শরিয়ত। যে ব্যক্তি ইহকালে এই পথের ওপর সুদৃঢ় থাকবে, কেয়ামতের দিন পুলসিরাত অতিক্রমের সময়ও সুদুঢ় থাকবে। আল্লাহর শরিয়তের প্রতি যে যত দ্রুত ধাবমান থাকবে, সে জাহান্নামের ওপরে বিস্তৃত পুলসিরাতও তত দ্রুত অতিক্রম করবে।
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে জানা যায়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পুলসিরাতের ওপর মুসলিমদের পারাপার একইরকম হবে না, বরং সেখানে বিরাট তারতম্য ঘটবে। কেউ কেউ চোখের পলকে অতিক্রম করবে, কেউ কেউ বিজলির গতিতে, কেউ কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ কেউ উৎকৃষ্ট অশ্বের গতিতে, আবার কেউ কেউ মানুষের দৌড়ের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ কেউ হেঁটে হেঁটে যাবে, আবার কেউ কেউ হামাগুড়ি দিয়ে যাবে, এমনকি কেউ কেউ পেটের ওপর ভর দিয়ে অতিক্রম করবে।⁶⁰ আল্লাহর শরিয়ত অনুযায়ী চলা এবং শরিয়ত পালনে দ্রুত ধাবিত হওয়ার তারতম্য অনুযায়ী পুলসিরাতের এই তারতম্য ঘটবে।
এরপর শাইখুল ইসলাম বলেছেন,
فَمُسَلَّمْ نَاجٍ وَآخَرَ مُهْمَلُ
“কেউ কেউ সেখান থেকে নিরাপদে পরিত্রাণ পাবে, আবার কেউ কেউ হবে পরিত্যাক্ত।”
অর্থাৎ ইহকালে সরল পথের ওপরে যে ব্যক্তির 'অ-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পথচলা' সুদৃঢ় ও সঠিক হবে, সে পুলসিরাতে পরিত্রাণ লাভ করবে। পক্ষান্তরে ইহকালে যার পথচলা দোদুল্যমান হবে, পুলসিরাত থেকে তার পতন ঘটবে। আল-ইয়াজু বিল্লাহ; আল্লাহর পানা!
টিকাঃ
৫৬ সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৩৯।
৫৭ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য : পঞ্চেন্দ্রিয়ের কোনো একটি দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় এমন। মানবদেহের পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো- শ্রবণ, দর্শন, গন্ধ, স্বাদ ও স্পর্শ। পক্ষান্তরে অ-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য : পঞ্চেন্দ্রিয়ের কোনোটি দিয়েও সরাসরি অনুভব করা যায় না এমন। – অনুবাদক।
৫৮ সুরা আনআম : ১৫৩।
৫৯ সুরা শুরা : ৫২।
৬০ সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৩৯।
📄 জান্নাত ও জাহান্নাম বিষয়ক আকিদা
মূলপাঠ :
والنَّارُ يَصْلَاهَا الشَّقِيُّ بِحِكْمَةٍ ... وَكَذَا التَّقِيُّ إِلَى الْجِنَانِ سَيَدْخُلُ
আল্লাহর হিকমা (প্রজ্ঞা) অনুযায়ী হতভাগা ব্যক্তি প্রবেশ করবে জাহান্নামে। তদ্রুপ মুত্তাকি বান্দাও প্রবেশ করবে জান্নাতে।
ব্যাখ্যা : মহান আল্লাহ জান্নাতের জন্য তার অধিবাসী প্রস্তুত করেছেন এবং জাহান্নামের জন্যও তার অধিবাসী প্রস্তুত করেছেন।⁶¹ এটা কেবল তাদের আমলের প্রতিদান হিসেবে এবং মহান আল্লাহ তাদের জন্য যেই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তাকদিরে লিপিবদ্ধ করেছেন, সে অনুযায়ী সংঘটিত হবে। হে আল্লাহ, আপনার রহমত দিয়ে আপনি আমাদেরকে পরিত্রাণপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং সাফল্যবান হিসেবে আমাদেরকে লিপিবদ্ধ করুন; যারা লাঞ্ছনার আজাব থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে, যেই লাঞ্ছনার আজাব মূলত কুফরকারী ও পাপাচারীদের জন্য নির্ধারিত, যেই আজাব তারা ভোগ করবে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে। আল-ইয়াজু বিল্লাহ; আল্লাহর পানা চাই!
টিকাঃ
৬১ সহিহ মুসলিম, হা. ২৬৬২।