📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 কুরআন বিষয়ক আকিদা

📄 কুরআন বিষয়ক আকিদা


মূলপাঠ :
وَأَقُولُ فِي القُرْآنِ مَا جَاءَتْ بِهِ ... آيَاتُهُ فَهُوَ الْكَرِيمُ الْمُنزَلُ
কুরআনের আয়াতসমূহ যা আনয়ন করেছে, কুরআনের ব্যাপারে আমি সেটাই বলি। বস্তুত কুরআন মহিমান্বিত নাজিলপ্রাপ্ত কিতাব।⁴¹
وَأَقُولُ قَالَ اللهُ جَلَّ جَلالُهُ ... وَالْمُصْطَفَى الْهَادِي وَلَا أَتَأَوَّلُ
আমি বলি, 'মহান আল্লাহ বলেছেন, আর সুপথপ্রদর্শক মুস্তাফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন।' (এর বাইরে গিয়ে) আমি (তাঁদের কথার) তাবিল বা ভিন্নার্থ করি না।
ব্যাখ্যা : কবিতার এই দুই চরণে শাইখুল ইসলাম জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, কুরআন আল্লাহর কথা, যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা সৃষ্ট নয়। আমরা সেটাই বলি, যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ.
“মুশরিকদের মধ্য হতে যদি কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তাহলে তুমি তাকে আশ্রয় দান করো, যাতে সে আল্লাহর কথা (কুরআন) শুনতে পায়।”⁴²
মহান আল্লাহ কুরআনকে 'কালামুল্লাহ তথা আল্লাহর কথা' বলেছেন, যদিও তা কোনো মাখলুক থেকে শোনা হয়। এখানে মুতাজিলি সম্প্রদায়ের মতাদর্শকে বাতিল সাব্যস্ত করা হয়েছে, যারা বলে, কুরআন হলো মাখলুক। আবার লাফজিয়্যা সম্প্রদায়ের মতাদর্শকেও বাতিল সাব্যস্ত করা হয়েছে, যারা বলে, আমাদের উচ্চারিত (পঠিত) কুরআন মাখলুক। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত সাব্যস্ত করেছে, যে ব্যক্তি বলে, 'কুরআন হলো মাখলুক,' সে কাফির। আবার যে ব্যক্তি বলে, 'আমাদের উচ্চারিত কুরআন মাখলুক,' সে জাহমি বিদাতি। এক্ষেত্রে হক সেটাই, যা আমরা স্পষ্ট করেছি যে, কুরআন আল্লাহর কালাম তথা কথা; আর আল্লাহর কথা তাঁর একটি অন্যতম সিফাত বা বৈশিষ্ট্য। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত আকিদা পোষণ করে, মহান আল্লাহ এমন কথা দিয়ে কথা বলেন, যা সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (কথার) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'।⁴³ আল্লাহ যখন ইচ্ছে, যা ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে কথা বলেন। কথা বলতে না পারা মাখলুকের ক্ষেত্রে ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত, তাহলে স্রষ্টার ক্ষেত্রে 'কথা না বলা' কীভাবে ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত হবে না?!
ইলমুল কালামের (তথাকথিত ইসলামি দর্শন) আলোকে আকিদা সাব্যস্তকারী লোকদেরকে আল্লাহ অপদস্থ করুন। আর তাদেরকেও আল্লাহ অপদস্থ করুন, যারা ভ্রষ্টকারী বিদাত আনয়ন করেছে এবং ইসলামের মধ্যে সেসব বিদাত ঢুকিয়ে দিয়েছে।⁴⁴

টিকাঃ
৪১ অনুবাদকের টীকা: 'লামিয়্যার' যেসব নুসখা পাওয়া যায়, সেসবের মধ্যে এই চরণে 'আল-কারিম' শব্দের জায়গায় আছে 'আল-কদিম' শব্দ। অর্থাৎ এসব নুসখা অনুযায়ী কুরআনকে 'কদিম (শুরুহীন আদি)' বলেছেন শাইখুল ইসলাম। অথচ আমরা দেখতে পাই, শাইখুল ইসলাম এই আকিদার বিরোধিতা করে গেছেন তাঁর অসংখ্য কিতাবে। জানিয়ে গেছেন, কুরআন শুরুহীন আদি নয়, বরং আল্লাহ কুরআন বলেছেন বিভিন্ন সময়ে, যার শুরু আছে। এই জটিলতার সমাধান হিসেবে বলা যেতে পারে, এখানে কদিম বলতে 'আল-কদিম আল-হাকিকি' (সূচনাহীন প্রকৃত প্রাচীন) উদ্দেশ্য নয়, বরং 'আল-কদিম আন-নিসবি' (আপেক্ষিক প্রাচীন) উদ্দেশ্য। কারণ আমরা জানি, শরিয়তে দুটো অর্থেই কদিম শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ খেজুর গাছের ডালকে 'কদিম' বলেছেন। (সুরা ইয়াসিন : ৩৯) খেজুর গাছের ডাল আপেক্ষিকভাবে প্রাচীন, অর্থাৎ অন্য কোনো পরবর্তী খেজুর-ডালের বিবেচনায় আগেরটা প্রাচীন; এমন না যে, খেজুর গাছের ডালের কোনো শুরু নেই। আবার মহান আল্লাহর 'সুলতান তথা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে' কদিম বলা হয়েছে হাদিসে। (আবু দাউদ, হা. ৪৬৬, বর্ণনার মান : সহিহ) আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সূচনা নেই, সুতরাং এটা কদিম হাকিকি তথা সূচনাহীন প্রকৃত প্রাচীন। কিন্তু প্রাথমিক আকিদা শেখানোর কিতাবে এরকম দ্ব্যর্থবোধক শব্দ নিয়ে আসা শাইখুল ইসলামের কর্মপদ্ধতির সাথে মেলে না। এজন্যই যেসব বিদ্বান 'লামিয়্যা' কবিতাকে শাইখুল ইসলামের লেখা হিসেবে মানতে অস্বীকার করেছেন, তারা এই চরণটিকে নিজেদের মতের পক্ষে অন্যতম প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। ভিন্নপক্ষের বিদ্বানগণ দুভাবে তাঁদের আর্গুমেন্টের জবাব দিয়েছেন। যথা : ১. কিছু কিছু নুসখায় 'আল-কদিম' শব্দের জায়গায় 'আল-কারিম' শব্দই আছে। যেমন ইমাম সালিহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ (জ. ১৩৫৪ হি.) এমন দাবি করেছেন 'আল-লাআলিল বাহিয়্যা' কিতাবের টীকায়; এবং আল্লামা ইবনু জিবরিন (মৃ. ১৪৩০ হি.) ও আল্লামা আব্দুল কারিম খুদাইর (জ. ১৩৭৪ হি.) এ দাবি করেছেন তাঁদের স্ব স্ব 'শারহুল লামিয়্যা' গ্রন্থে। দ্রষ্টব্য : আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-মাদাওয়ি, আল-লাআলিল বাহিয়্যা ফি শারহি লামিয়্যাতি শাইখিল ইসলাম ইবনি তাইমিয়্যা, টীকা : সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান (রিয়াদ : দারুল মুসলিম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ৪৬; আল-জিবরিন, শারহু লামিয়‍্যাতি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আল-খুদাইর, শারহু লামিয়্যাতি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৬৮। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, যেহেতু শাইখুল ইসলামের আকিদা-মানহাজের সাথে 'আল-কারিম' শব্দটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেহেতু এই শব্দকেই প্রাধান্য দিতে হবে। ২. এই কবিতা শাইখুল ইসলামের প্রথমদিকের লেখা ছিল, পরবর্তীতে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। এরকম সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২১ হি.)। তাঁর বরাতে এই জবাব দিয়েছেন শাইখ ড. আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-আকল হাফিজাহুল্লাহ। দ্রষ্টব্য: শারহুস সাফফারিনিয়্যা (প্র. দারুল বাসিরা), পৃ. ৪২৭; গৃহীত : আল-আকল, বাদরুত তামাম, পৃ. ১৬। অবশ্য ইমাম সুলাইমান বিন সিহমান রাহিমাহুল্লাহর (মৃ. ১৩৪৯ হি.) একটি বক্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে তিনি দাবি করেছেন, যদি শাইখুল ইসলাম থেকে এই শব্দসংবলিত চরণ বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিতও হয়, তবুও 'কদিম' শব্দটি 'আল্লাহ যে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী কথা বলেছেন' – তার বিরোধী নয়। কিন্তু এ কথা বলার পরে তিনি আর ব্যাখ্যা করেননি, ঠিক কোনদিক থেকে দুটো বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। দ্রষ্টব্য: ইবনু সিহমান, তাম্বিহু জাবিল আলবাব, পৃ. ২১। আর আল্লাহই সম্যক অবগত। টীকা সমাপ্ত।
৪২ সুরা তাওবা : ৬।
৪৩ অনুবাদকের টীকা: আল্লাহর যত কর্মর্গত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, সবগুলো বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদা ছিল, এগুলো সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এর মানে মহান আল্লাহ এসব বৈশিষ্ট্য কোনো একটা সময়ে অর্জন করেছেন, বিষয়টা এমন নয়; বরং সূচনাহীন অতীত থেকে আল্লাহ সর্বদাই এসব গুণে গুণান্বিত হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহান আল্লাহর এসব গুণ সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেন, তখন এসব বৈশিষ্ট্যের একক সংঘটন করেন। যেমন আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন মুসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন, আবার যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন প্রিয় নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলেছেন। এভাবে তিনি অনেকের সাথে কথা বলেছেন। এগুলো একেকটি একক এবং তাঁর কথার অংশ। এসব একক তো আর সুপ্রাচীন নয়, যার কোনো শুরু নেই। বরং এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে এবং প্রত্যেকটি এককের শুরু আছে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ জাতীয় কর্মর্গত গুণ 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। দ্রষ্টব্য : আব্দুর রহমান বিন নাসির আলু সাদি, আত-তাম্বিহাতুল লাতিফা ফিমা ইহতাওয়াত আলাইহিল ওয়াসিতিয়‍্যাতু মিনাল মাবাহিসিল মুনিফা (রিয়াদ : দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি.), ৪৮। টীকা সমাপ্ত।
৪৪ অনুবাদকের টীকা : আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা বিষয়ক মূলনীতি হলো-আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলিকে প্রকৃত ও প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে; রূপক অর্থ কিংবা ভিন্ন অর্থ বলে তাবিল তথা অপব্যাখ্যা করা যাবে না। যারা বিনা দলিলে সিফাতের তাবিল করে, তারা পথভ্রষ্ট। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সবাই একমত। তাই এ বিষয়ে ভিন্ন মত গ্রহণের কোনো সুযোগ ও বৈধতা নেই। ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৪৬৩ হি.) বলেছেন : أهل السنة مجمعون على الإقرار بالصفات الواردة كلها في القرآن والسنة، والإيمان بها، وحملها على الحقيقة؛ لا على المجاز، إلا أنهم لا يكيفون شيئًا من ذلك، ولا يَحُدُّون فيه صفة محصورة. وأما أهل البدع والجهمية والمعتزلة كلها والخوارج فكلهم ينكرها، ولا يحمل شيئا منها على الحقيقة، ويزعمون أن من أقر بها مشبه، وهم عند من أثبتها نافون للمعبود والحق فيما قاله القائلون بما نطق به كتاب الله وسنة رسوله وهم أئمة الجماعة والحمد لله. “আহলুস সুন্নাহ এ মর্মে একমত পোষণ করেছে যে, কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত সকল সিফাত তথা আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করতে হবে, সেগুলোর প্রতি প্রতি ইমান রাখতে হবে এবং সেগুলোকে প্রকৃত অর্থ অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে, মাজাজ তথা রূপক অর্থে নয়। তবে আহলুস সুন্নাহ এসব গুণের কোনো ধরন নির্দিষ্ট করে না এবং কোনো গুণের ক্ষেত্রেই সেটা 'সীমাবদ্ধ সিফাত' এমনভাবে ব্যক্ত করে না (অর্থাৎ কোনো সিফাতকে সীমাবদ্ধ করে না)। পক্ষান্তরে বিদাতি গোষ্ঠী, জাহমিয়া সম্প্রদায়, সমুদয় মুতাজিলা ও খারেজি সম্প্রদায় এদের সবাই এসব সিফাতের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং এসবের কোনোকিছুকেই প্রকৃত অর্থানুযায়ী ব্যাখ্যা করে না। বরং তারা মনে করে, যে ব্যক্তি এসব সিফাতের স্বীকৃতি দেয়, সে সাদৃশ্যবাদী মুশাব্বিহ। কিন্তু যারা সিফাতকে সাব্যস্ত করে, তাদের কাছে ওরা এমন ব্যক্তিবর্গ, যারা মাবুদের প্রতিই অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে এক্ষেত্রে হক রয়েছে তাদেরই বক্তব্যের মাঝে, যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসুলের সুন্নাতের বক্তব্য মোতাবেক কথা বলেছে। আর তারাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমামগণ। আলহামদুলিল্লাহ।” দ্রষ্টব্য : আবু উমার ইউসুফ ইবনু আব্দিল বার আল-মালিকি, আত-তামহিদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মায়ানি ওয়াল আসানিদ (মরক্কো : মরক্কোর ধর্ম-মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, প্র. ১৩৮৭ হি.), খ. ৭, পৃ. ১৪৫। ইমাম ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৬২০ হি.) বলেছেন, وأما الإجماع فإن الصحابة أجمعوا على ترك التَّأْوِيل بِما ذكرناهُ عَنْهُم وَكَذَلِكَ أهل كل عصر بعدهم ولم ينقل التَّأْوِيل إِلَّا عَن مُبْتَدع أو مَنسُوب إلى بدعة. “আর সর্ববাদিসম্মত অভিমতের ব্যাপারটি হলো, সাহাবিগণ শরিয়তের দলিলের প্রকাশ্য অর্থ থেকে ফিরিয়ে দিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা তথা তাবিল বর্জনের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন; আমরা তাঁদের নিকট থেকে যা বর্ণনা করেছি তা থেকেই বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়। তদ্রুপ তাঁদের পরবর্তী সকল যুগের (হকপন্থি) অধিবাসীগণ এমনটিই মনে করেছেন। কেবল বিদাতি কিংবা বিদাতের সাথে সম্পৃক্ত লোেক ছাড়া অন্য কেউ তাবিল করেছেন বলে জানা যায়নি।” দ্রষ্টব্য: আবু মুহাম্মাদ মুওয়াফফাকুদ্দিন আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ ইবনু কুদামা, জাম্মুত তাবিল, তাহকিক : বাদর বিন আব্দুল্লাহ আল-বাদর (কুয়েত : আদ-দারুস সালাফিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪০৬ হি.), পৃ. ৪০। জ্ঞাতব্য যে, আমরা দলিলবিহীন তাবিল তথা অপব্যাখ্যার বিরোধিতা করি। কিন্তু কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা তথা উলামাদের সর্ববাদিসম্মত অভিমত থেকে প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে তাবিল বা ভিন্নার্থ করা হলে তার বিরোধিতা করি না। যেমন ওজুর আয়াতে এসেছে, 'তোমরা যখন নামাজে দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত করবে...।' (সুরা মায়িদা : ৬) এ আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী আমরা কেউ নামাজে দাঁড়ানোর পরে ওজু শুরু করি না, বরং হাদিস থেকে প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করি, 'এর মানে, তোমরা যখন নামাজ পড়ার ইচ্ছে করবে, তখন ওজু করে নাও।' বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ ইবনু বাজ, আত-তালিকাতুল বাজিয়্যা আলা শারহিত তাহাবিয়্যা (রিয়াদ : দারু ইবনিল আসির, ১ম প্রকাশ, ১৪২৯ হি./২০০৮ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৯৯; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, শারহু ফাতহি রব্বিল বারিয়‍্যা বি তালখিসিল হামাবিয়্যা (কাসিম : মুআসসাসাতুশ শাইখ ইবনি উসাইমিন, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৬ হি.), পৃ. ৪৪৬-৪৪৭; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, আত-তালিক আলা মাওয়াদি মিন শারহিল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা (কাসিম : মুআসসাসাতুশ শাইখ ইবনি উসাইমিন, ১ম প্রকাশ, ১৪৪০ হি.), পৃ. ৬৫-৬৭; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, শারহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (রিয়াদ: দারু ইবনিল জাওজি, ৬ষ্ঠ প্রকাশ, ১৪২১ হি.), খ. ১, পৃ. ৮৯-৯০। অনুরূপভাবে বলা যায়, হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেছেন, 'আমিই হলাম যুগ।' (সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৯১) আমরা এই বাক্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা করে বলি, এর মানে, আমি হলাম যুগের মালিক, নিয়ন্ত্রক ও পরিবর্তক। কারণ আমাদের ব্যাখ্যার পক্ষে দলিল আছে। যেহেতু একই হাদিসে ওই কথা বলার পরে আল্লাহ বলেছেন, 'আমার হাতেই সকল কিছুর কর্তৃত্ব রয়েছে। আমি রাত ও দিনকে পরিবর্তন করে থাকি।' দ্রষ্টব্য: মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, তালিকুন মুখতাসার আলা লুমআতিল ইতিকাদ, তাহকিক : আশরাফ বিন আব্দুল মাকসুদ (মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ, ৩য় প্রকাশ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রি.), পৃ. ২২। টীকা সমাপ্ত।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহর গুণাবলি বিষয়ক আয়াতসমগ্রের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর আকিদা

📄 আল্লাহর গুণাবলি বিষয়ক আয়াতসমগ্রের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর আকিদা


মূলপাঠ :
وَجَمِيعُ آيَاتِ الصَّفَاتِ أُمِرُّهَا ... حَقًّا كَمَا نَقَلَ الطَّرَازُ الأَوَّلُ
আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত সকল আয়াত আমি সত্যসত্যই সেভাবে সাব্যস্ত করি (ও ইমান রাখি), যেভাবে বর্ণনা করেছেন (এই উম্মতের) প্রথম প্রজন্ম।
وأَرُدُّ عُهْدَتَها إِلَى نُقَالِهَا ... وَأَصُونُها عَنْ كُلِّ مَا يُتَخَيَّلُ
আমি এই আকিদার জিম্মাদারি প্রত্যার্পণ করি উক্ত আকিদার বর্ণনাকারীদের (সালাফদের) কাছে। আর উক্ত আকিদাকে আমি হেফাজত করি যাবতীয় কল্পনাপ্রসূত বিষয় থেকে।
قُبْحاً لِمَنْ نَبَذَ القُرَانَ وَرَاءَهُ ... وَإِذَا اسْتَدَلَّ يَقُولُ قَالَ الأَخْطَلُ
সুতরাং ধিক সেই ব্যক্তির প্রতি, যে কুরআনকে নিজের পেছনে ছুঁড়ে ফেলে। আর দলিল পেশ করার সময় বলে বসে, “আখতাল বলেছেন এই কথা।”
ব্যাখ্যা: এই তিনটি চরণে শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ সাব্যস্ত করেছেন, তিনি কিতাব-সুন্নাহয় উল্লিখিত আল্লাহর সকল বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইমান রাখেন। তিনি এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইমান রাখেন এবং আরবি ভাষার দাবি অনুযায়ী সিফাতগুলোকে এমন অর্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যা আল্লাহর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং তিনি 'আল-ওয়াজহ তথা চেহারা' সাব্যস্ত করলে বলেন, “আমি আল্লাহর জন্য চেহারা সাব্যস্ত করি, যা আল্লাহর মর্যাদার সাথে মানানসই।” 'আল-ইয়াদ তথা হাত' সাব্যস্ত করলে বলেন, “আমি আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করি, যা আল্লাহর মর্যাদার সাথে মানানসই।” 'আল-আইন তথা চোখ' সাব্যস্ত করলে বলেন, “আমি আল্লাহর জন্য চোখ সাব্যস্ত করি, যা আল্লাহর মর্যাদার সাথে মানানসই।”
অনুরূপভাবে যত সিফাত বর্ণিত হয়েছে, সবগুলোর ক্ষেত্রেই এই কথা বলা হবে। চাই সেসব সিফাত সত্তাগত গুণাবলি হোক, যেমনটি কিছুপূর্বের উদাহরণে বলা হলো; আর চাই সেসব সিফাত কর্মগত গুণাবলি হোক, যেমন আরশের ওপরে আরোহণ, দুনিয়ার আসমানে অবতরণ প্রভৃতি।⁴⁵
প্রথম প্রজন্ম তথা সাহাবিবর্গ, তাবেয়িবৃন্দ ও তাবে তাবেয়িগণ-প্রথম তিন যুগের মানুষ, যাঁদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-যা সাব্যস্ত করতেন এবং যেই আকিদা পোষণ করতেন, সেই আকিদা অনুযায়ীই সমুদয় সিফাত সাব্যস্ত করতে হবে।
শাইখুল ইসলাম বলেছেন,
وَأَصُونُها عَنْ كُلِّ مَا يُتَخَيَّلُ
“আর উক্ত আকিদাকে আমি হেফাজত করি যাবতীয় কল্পনাপ্রসূত বিষয় থেকে।”
অর্থাৎ মানবমস্তিষ্ক (আল্লাহর সিফাতকে) সৃষ্টিকুলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো যেসব কল্পনা করে, তা থেকে আমি সিফাত বিষয়ক আকিদাকে হেফাজত করি।
আলোচ্য চরণত্রয়ের তৃতীয় লাইনে শাইখুল ইসলাম ওই ব্যক্তির নিন্দা করেছেন, যে দলিলগ্রহণের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ বর্জন করে খ্রিষ্টান কাফির কবি 'আখতালের' কথা দিয়ে দলিল দেয়! যে ব্যক্তি এই কাজ করেছে, সে নিন্দিত হওয়ার এবং নিকৃষ্টতা ও কদর্যতার গুণে গুণান্বিত হওয়ারই উপযুক্ত। কেননা সে হক বর্জন করে বাতিল গ্রহণ করেছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এখানে আখতালের কথা দিয়ে দলিল দেওয়া বলতে বোঝানো হয়েছে, আশারিদের কর্মকাণ্ডকে। যেহেতু তারা 'ইস্তিওয়া আলাল আরশ তথা আরশের ওপর আরোহণ' সিফাতের তাবিল তথা ভিন্নার্থ করে বলে, এর মানে 'আরশ দখল করা' (আরশের ওপর আরোহণ করা নয়)। তারা এই তাবিলের পক্ষে আখতালের কথা দিয়ে দলিল দেয়; যেখানে আখতাল বলেছে—
قَدِ اسْتَوَى بِشْرٌ عَلَى الْعِرَاقِ ... مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ أَوْ دَمٍ مِهْرَاقِ
“কোনো তরবারি কিংবা প্রবহমান রক্ত (রক্তপাত) ছাড়াই বিশর ইরাকের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন (অর্থাৎ ইরাক দখল করেছেন)।”⁴⁶
এই দলিলগ্রহণ বাতিল। কারণ বিশর বিন মারওয়ানের ক্ষেত্রে যদি বলা হয়, তিনি ইরাক দখল করেছেন, কেননা তিনি ইতঃপূর্বে ইরাকের দখলদারিত্ব নেননি; তাহলে বলতে হয়, এই কথা মাখলুকের ক্ষেত্রে সঠিক হলেও স্রষ্টার ক্ষেত্রে সঠিক হবে না। কারণ আল্লাহর পূর্বে তাঁর আরশ অন্য কারও দখলে ছিল না। এটা একদম স্পষ্ট বিষয়। কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, দৃষ্টিশক্তি অন্ধ না হলেও বক্ষস্থিত অন্তর অন্ধ হয়ে যায়। কে আছে এমন, যে আল্লাহর বিরোধী হয়ে তাঁর পূর্বে তাঁরই আরশ দখল করে রাখবে?! আল্লাহর কাছে ভ্রষ্টতা থেকে পানা চাইছি।
আল্লাহ বলেছেন,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا.
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যদি আল্লাহ ছাড়া একাধিক মাবুদ থাকত, তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।”⁴⁷
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,
قُل لَّوْ كَانَ مَعَهُ عَالِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَّابْتَغَوْاْ إِلَىٰ ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا * سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَقُولُونَ عُلُوًّا كَبِيرًا * تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ، وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا * وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْءَانَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا.
“বলুন, তাদের কথা মতো যদি তাঁর সাথে আরও মাবুদ থাকত, তাহলে তারা আরশ অধিপতির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষণ করত। তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং তারা যা বলে তা হতে তিনি বহু ঊর্ধ্বে রয়েছেন। সাত আকাশ, পৃথিবী এবং এ দুয়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং এমনকিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে না। কিন্তু ওদের পবিত্রতা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না; তিনি অতিশয় সহনশীল, অধিক ক্ষমাপরায়ণ। আপনি যখন কুরআন পাঠ করেন, তখন আপনার এবং পরকালে অবিশ্বাসীদের মধ্যে আমি এক প্রচ্ছন্ন পর্দা টেনে দিই।”⁴⁸ ⁴⁹

টিকাঃ
৪৫ অনুবাদকের টীকা: যেসব গুণে আল্লাহ সীমাহীন অতীত থেকে সদা বিশেষিত আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন, সেগুলোকে সত্তাগত গুণাবলি (الصفات الذاتية) বলা হয়। যেমন : আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা প্রভৃতি। পক্ষান্তরে যেসব গুণ আল্লাহর ইচ্ছের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, আল্লাহ ইচ্ছে করলে তা কার্যকর করেন, আবার ইচ্ছে করলে তা কার্যকর করেন না, সেগুলোকে কর্মর্গত গুণাবলি (الصفات الفعلية) বলা হয়। যেমন : দুনিয়ার আকাশে মহান আল্লাহর অবতরণ। দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, মুজাক্কিরাতুন আলাল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (রিয়াদ : মাদারুল ওয়াতান, প্রকাশের ক্রমধারাবিহীন, ১৪২৬ হি.), পৃ. ১০। টীকা সমাপ্ত।
৪৬ অনুবাদকের টীকা: আশারি-মাতুরিদিদের অসংখ্য কিতাবে খ্রিষ্টান কবি আখতালের এই পঙ্ক্তি পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে তারা 'ইস্তিওয়া আলাল আরশ' সিফাতের অর্থ 'আরশ দখল করা' সাব্যস্ত করে; আর আল্লাহ যে আরশের ওপর আরোহণ করেছেন বা উঠেছেন-সেই অর্থ অস্বীকার করে। এই জায়গায় আশারি-মাতুরিদিরা বিলকুল মুতাজিলিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। কারণ মুতাজিলিরা এই পঙ্ক্তি ব্যবহার করে উক্ত সিফাতের তাবিল করত। এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন বিখ্যাত আশারি বিদ্বান আল্লামা আব্দুল কাহির আল-বাগদাদি রাহিমাহুল্লাহু ওয়া গাফারা লাহু (মৃ. ১০৩৭ হি.)। দ্রষ্টব্য : আব্দুল কাহির বিন তাহির আত-তাইমি আল-বাগদাদি, উসুলুদ দিন (ইস্তাম্বুল : মাদরাসাতুল ইলাহিয়্যাত বি দারিল ফুনুনিত তুর্কিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৩৪৬ হি./১৯২৮ খ্রি.), পৃ. ১১২। ইমাম ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেছেন, وَالْجَهْمِيَّةُ تَسْتَدِلُّ عَلَى الاسْتِوَاءِ عَلَى الْعَرْشِ بِأَنَّهُ الِاسْتِيلَاءُ بِبَيْتِ الْأَخْطَلِ، فِيمَا مَدَحَ بِهِ بِشْرَ بْنَ مَرْوَانَ، وَهُوَ قَوْلُهُ: قَدِ اسْتَوَى بِشْرٌ عَلَى الْعِرَاقِ ... مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ وَدَمٍ مُهْرَاقٍ وَلَيْسَ فِيهِ دَلِيلٌ : فَإِنَّ هَذَا اسْتِدْلَالٌ بَاطِلٌ مِنْ وُجُوهِ كَثِيرَةٍ، وَقَدْ كَانَ الْأَخْطَلُ نَصْرَانِيًّا. “জাহমি সম্প্রদায়ের লোকেরা কবি আখতালের পঙ্ক্তি দিয়ে 'ইস্তিওয়া আলাল আরশ' মানে 'আরশ দখল করা'-র পক্ষে দলিল দেয়; যেই পঙ্ক্তিতে মূলত সে (আখতাল) বিশর বিন মারওয়ানের প্রশংসা করেছিল। পঙ্ক্তিটি হলো— قَدِ اسْتَوَى بِشْرٌ عَلَى الْعِرَاقِ ... مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ أَوْ دَمٍ مِهْرَاقِ 'কোনো তরবারি কিংবা প্রবহমান রক্ত (রক্তপাত) ছাড়াই বিশর ইরাকের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন (অর্থাৎ ইরাক দখল করেছেন)।' এই পঙ্ক্তিতে (তাদের দাবির পক্ষে) কোনো প্রমাণ নেই। কেননা অনেক দিক থেকে এই দলিলগ্রহণ বাতিল। আর আখতাল একজন খ্রিষ্টান ছিল।” দ্রষ্টব্য : আবুল ফিদা ইসমায়িল বিন উমার ইবনু কাসির আল-কুরাশি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তাহকিক: আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (দারু হাজার, প্র. ১৪২৪ হি./২০০৩ খ্রি.), খ. ১২, পৃ. ২৪১। টীকা সমাপ্ত।
৪৭ সুরা আম্বিয়া : ২২।
৪৮ সুরা ইসরা : ৪২-৪৫।
৪৯ অনুবাদকের টীকা: আখতালের আরেকটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি দিয়ে আশারি-মাতুরিদিরা দলিল দেয়; যা ব্যাখ্যাকার রাহিমাহুল্লাহ এখানে উল্লেখ করেননি। আল্লাহর কথা বলা গুণের ব্যাপারে আশারি-মাতুরিদিদের আকিদা হচ্ছে—আল্লাহর কথা মূলত কালামুন নাফসি তথা নফসের কথা; তাঁর কথা একটিই, যা কখনো বিভাজিত হয় না, এবং তাঁর কথায় কোনো বর্ণ ও আওয়াজ নেই। সোজাকথায়, তাদের আকিদা অনুযায়ী আল্লাহর সত্তা থেকে কোনো কথা বের হয় না; সুতরাং কথা মানে মনের কথা, বা মনের ভাবনা! নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক। তারা তাদের এই বাতিল আকিদার পক্ষে খ্রিষ্টান কবি আখতালের পঙ্ক্তি দিয়ে দলিল দেয়। আখতাল বলেছে, إِنَّ الْكَلَامَ لَفِي الْفُؤَادِ وَ إِنَّمَا ... جُعِلَ النِّسَانُ عَلَى الْكَلَامِ دَلِيلًا “নিশ্চয় 'কথা' তো তাকেই বলে, যা অন্তরে থাকে। মানুষের জবানকে তো কেবল (অন্তরস্থ কথার) দলিল বানানো হয়েছে।” এ প্রসঙ্গে ইমাম জাহাবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৪৮ হি.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। শাফিয়ি মাজহাবের এক বিদ্বান ছিলেন আবুল বায়ান রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর সাথে জনৈক আশারি বিদ্বানের পর্যালোচনা হয়। তিনি সেখানে ওই আশারি বিদ্বানের উদ্দেশে বলেছিলেন, “ধিক তোমাদেরকে, তোমরা কতইনা হতভাগা! হাম্বালিদেরকে (এখানে হাম্বালি মানে আহলুস সুন্নাহ – অনুবাদক) যখন জিজ্ঞেস করা হয়, 'কুরআন যে বর্ণ ও আওয়াজ-সহ বলা হয়েছে, তার দলিল কী?” তখন তারা উত্তরে বলে, 'আল্লাহ বলেছেন, আর রসুল বলেছেন (শুধু কুরআন-সুন্নাহ থেকে দলিল দেয়)।' আর তোমাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, 'কুরআন যে স্রেফ নফসে থাকা একটি বিষয় (আল্লাহ কোনো বর্ণ ও আওয়াজ-সহ কুরআন বলেননি), তার দলিল কী?” তখন তোমরা বল, 'আখতাল বলেছেন, নিশ্চয় কথা তো তাকেই বলে, যা অন্তরে থাকে!” আশ্চর্য! সে একজন নিকৃষ্ট খ্রিষ্টান। তোমরা কুরআন-সুন্নাহ পরিত্যাগ করে তার মতো লোকের কবিতার ওপর নির্ভর করে তোমাদের আকিদা নির্ধারণ করতে পারলে?!” দ্রষ্টব্য : আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আজ-জাহাবি, তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফাইয়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম, তাহকিক : উমার আব্দুস সালাম আত-তাদমুরি (বৈরুত : দারুল কিতাবিল আরাবি, ২য় প্রকাশ, ১৪১৩ হি./১৯৯৩ খ্রি.), খ. ৩৮, পৃ. ৬৮। এই পঙ্ক্তি দিয়ে আশারি-মাতুরিদিদের দলিল দেওয়ার এই কদর্য বিষয় প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু আবিল ইজ আল-হানাফি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯২ হি.) বলেছেন, “(আকিদা বিষয়ে সুন্নাহপন্থি) কোনো দলিলগ্রহণকারী বুখারি-মুসলিমের হাদিস দিয়ে দলিল দিলে তারা বলে, 'এটা তো খবরে আহাদ (বিপুলসংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত নয়)!' যদিও ওই হাদিসকে সত্যায়ন করা, সেটাকে সাদরে গ্রহণ করে নেওয়া এবং সে অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে উলামাগণ একমত হয়ে থাকেন (তবুও তারা এমন কথা বলে হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করে)। তাহলে কীভাবে এই পঙ্ক্তি দিয়ে দলিল দেওয়া সঙ্গত হতে পারে, যা কিনা বানোয়াট এবং আখতালের নামে চালিয়ে দেওয়া কথা, যা তার কাব্যসমগ্রে নেই?! ... পরন্তু এই কবিতার সূত্রকে বিশুদ্ধ ধরে নেওয়া হলেও এটা দিয়ে দলিল দেওয়া জায়েজ হবে না। কারণ খ্রিষ্টানরা 'কথার' মর্মার্থ কী (কথা কাকে বলে), সে বিষয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মনে করে, ইসা আলাইহিস সালাম স্বয়ং আল্লাহর কথা!” দ্রষ্টব্য : ইবনু আবিল ইজ, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ১৯৯। টীকা সমাপ্ত।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা

📄 আল্লাহকে দেখা এবং আল্লাহর অবতরণ বিষয়ক আকিদা


মূলপাঠ :
وَالمُؤْمِنُونَ يَرَوْنَ حَقًّا رَبَّهُمْ ... وَ إِلَى السَّمَاءِ بِغَيْرِ كَيْفَ يَنْزِلُ
মুমিনগণ সত্যিকারার্থেই তাঁদের রবকে দেখবেন। যিনি (মহান আল্লাহ) আসমানে নেমে আসেন; যার (নেমে আসার) ধরন আমাদের অজানা।
ব্যাখ্যা : অর্থাৎ কেয়ামতের দিন মুমিনগণ তাঁদের রবকে দেখবেন; যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে অসংখ্য হাদিসে। সেসবের অন্যতম হলো বুখারি-মুসলিমে উল্লিখিত জারির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিস, যেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
سترون ربكم كما ترون الشمس في الظهيرة ليس دونها سحاب، وكما ترون القمر ليلة البدر ليس دونه سحاب.
“নিশ্চয় তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে, যেমনভাবে তোমরা দুপুরবেলায় সূর্য দেখতে পাও, যখন তার নিচে কোনো (আড়াল সৃষ্টিকারী) মেঘ থাকে না। এবং যেমনভাবে তোমরা পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে পাও, যখন তার নিচে কোনো (আড়াল সৃষ্টিকারী) মেঘ থাকে না।”⁵⁰
কেয়ামতের দিন যে মুমিনগণ তাদের রবকে দেখবেন, সে ব্যাপারে অনেক এবং প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম বলেছেন,
وَ إِلَى السَّمَاءِ بِغَيْرِ كَيْفَ يَنْزِلُ
“মহান আল্লাহ আসমানে নেমে আসেন; যার ধরন আমাদের অজানা।”
অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ.
“মহান আল্লাহ প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।”⁵¹
আহলুস সুন্নাহ এই সিফাতের প্রতি ইমান রাখে এবং তাঁদের রবের জন্য উক্ত সিফাত সেভাবে সাব্যস্ত করে, যেমনভাবে তা মানানসই হয় আল্লাহর জন্য।

টিকাঃ
৫০ অনুবাদকের টীকা: বুখারি-মুসলিমে সরাসরি এই শব্দরূপে হাদিসটি নেই। বুখারি-মুসলিমে হাদিসটি এসেছে এই শব্দরূপে- عَنْ جَرِيرٍ، قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم فَنَظَرَ إِلَى الْقَمَرِ لَيْلَةً - يَعْنِي الْبَدْرَ - فَقَالَ : «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ لَا تُضَامُّونَ فِي رُؤْيَتِهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لَا تُغْلَبُوا عَلَى صَلَاةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا فَافْعَلُوا». জারির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি রাতে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঐ চাঁদকে তোমরা যেমন দেখছ, ঠিক তেমনি তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। তাঁকে দেখতে তোমরা কোনো ভীড় বা জুলুমের সম্মুখীন হবে না। কাজেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামাজ (জামাতে) আদায় করতে সমর্থ হলে তোমরা তাই করবে।” দ্রষ্টব্য: সহিহুল বুখারি, হা. ৫৫৪, সহিহ মুসলিম, হা: ৬৩৩। টীকা সমাপ্ত।
৫১ সহিহুল বুখারি, হা. ১১৪৫; সহিহ মুসলিম, হা. ৭৫৮।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 দাঁড়িপাল্লা ও হাউজ বিষয়ক আকিদা

📄 দাঁড়িপাল্লা ও হাউজ বিষয়ক আকিদা


মূলপাঠ :
وَأُقِرُ بِالْمِيزَانِ وَالْحَوضِ الَّذِي ... أَرجُو بِأَنِّي مِنْهُ رَيَّا أَنْهَلُ
আমি আল-মিজান (দাঁড়িপাল্লা) সাব্যস্ত করি; এবং সাব্যস্ত করি হাওজকেও, যেই হাওজের ব্যাপারে আশা রাখি, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আমি সেখান থেকে পানি পান করব।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি মিজান তথা দাঁড়িপাল্লার প্রতি ইমান রাখেন, যার মাধ্যমে আমলকে ওজন করা হবে। এটি এমন মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা হবে, যার দুটি পাল্লা এবং একটি জবান (মাপনির্দেশক) থাকবে।⁵²
ভালো আমলসমগ্র এক পাল্লায় রাখা হবে, আর মন্দ আমলসমগ্র আরেক পাল্লায় রাখা হবে। যদি মন্দ আমলের পাল্লা ভালো আমলের পাল্লার চেয়ে বেশি ঝুঁকে যায়, তাহলে এসব আমলকারী ব্যক্তি আজাবে নিপাতিত হতে পারে।⁵³ কিন্তু পরবর্তীতে (মুমিন হওয়ার কারণে) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; হয় শাফায়াতকারীদের শাফায়াতে, আর নয়তো স্রেফ সর্বাপেক্ষা দয়ালু আল্লাহর দয়ায়।⁵⁴
আর হাওজ বলতে উদ্দেশ্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাওজ। যা দৈর্ঘ্যে এক মাসের পথ, আবার প্রস্থেও এক মাসের পথ। কেয়ামতের দিন (এই উম্মতের) মুমিনগণ এই হাওজ থেকে পানি পান করবেন। যে ব্যক্তি উক্ত হাওজ থেকে এক ঢোক পানি পান করবে, সে আর কখনোই পিপাসিত হবে না। এই হাওজের পানপাত্রের সংখ্যা হবে তারকারাজির সমান।⁵⁵

টিকাঃ
৫২ অনুবাদকের টীকা : ইমাম সাফফারিনি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১১৮৮ হি.) বলেছেন, فَقَدْ دَلَّتِ الْآثَارُ عَلَى أَنَّهُ مِيزَانٌ حَقِيقِيٌّ ذُو كِفَّتَيْنِ وَلِسَانٍ كَمَا قَالَ ابْنُ عَبَّاسِ وَالْحَسَنُ الْبَصْرِيُّ، وَصَرَّحَ بِذَلِكَ عُلَمَاؤُنَا وَالْأَشْعَرِيَّةُ وَغَيْرُهُمْ، وَقَدْ بَلَغَتْ أَحَادِيثُهُ مَبْلَغَ التَّوَاتُرِ، وَانْعَقَدَ إِجْمَاعُ أَهْلِ الْحَقِّ مِنَ الْمُسْلِمِينَ عَلَيْهِ. “হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়েছে, এটা সত্যিকারের মিজান (দাঁড়িপাল্লা), যার দুটো পাল্লা ও একটি জবান (মাপনির্দেশক) আছে। যেমনটি ইবনু আব্বাস ও হাসান বাসরি বলেছেন এবং আমাদের উলামাগণ, আশারি সম্প্রদায়ের লোকজন ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ সম্পর্কিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির (বিপুলসংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত এমন) পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং এ বিষয়ে হকপন্থি মুসলিমরা একমত পোষণ করেছে।” দ্রষ্টব্য: আবুল আওন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আস-সাফফারিনি আল-হাম্বালি, লাওয়ামিউল আনওয়ারিল বাহিয়্যা ওয়া সাওয়াতিউল আসরারিল আসারিয়‍্যা লি শারহিদ দুর্রাতিল মুদিয়্যা ফি আকদিল ফিরকাতিল মারদিয়্যা (দামেস্ক : মুআসসাসাতুল খাফিকিনা ওয়া মাকতাবাতুহা, ২য় প্রকাশ, ১৪০২ হি./১৯৮২ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ১৮৫। টীকা সমাপ্ত।
৫৩ সুরা মুমিনুন : ১০২, ১০৩।
৫৪ সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৩৯; সহিহ মুসলিম, হা. ১৮৩।
৫৫ সহিহুল বুখারি, হা. ৬৫৭৯; সহিহ মুসলিম, হা. ২২৯২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00