📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা

📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা


মূলপাঠ :
يَا سَائِلِي عَنْ مَذْهَبِي وَعَقِيدَتِي ... رُزِقَ الهُدَى مَنْ لِلْهِدَايَةِ يَسْأَلُ
ওহে আমার মতাদর্শ ও আকিদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারী, যে ব্যক্তি হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুন।
ব্যাখ্যা : এখানে শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহু তাআলা (তাঁর আকিদা সম্পর্কে) জিজ্ঞাসাকারী ব্যক্তির জন্য দোয়া করেছেন, যেন আল্লাহ তাঁকে হেদায়েত দান করেন। কেননা যে ব্যক্তি এ ধরনের প্রশ্ন করে, সে অবশ্যই দুজনের একজন হবে :
• হয়তো সে পরীক্ষাকারী; জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির আকিদা জানতে চায় এবং উক্ত আকিদা অনুযায়ীই তার সাথে (যথোপযুক্ত) আচরণ করতে চায়।
• আর নয়তো সে একজন প্রাথমিক জ্ঞানান্বেষণকারী; যে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির মাঝে হেদায়েতের আলামত প্রত্যক্ষ করার ফলে তাঁকে সম্মান করে এবং মর্যাদা দেয়। এ ধরনের জিজ্ঞাসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিজ্ঞাসাকারীর অবস্থা এমন হয়ে থাকে। আর আল্লাহই তৌফিকদাতা।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 সুদৃঢ় আকিদা

📄 সুদৃঢ় আকিদা


মূলপাঠ :
اسْمَعْ كَلامَ مُحَقَّقٍ فِي قَولِه ... لَا يَنْثَنِي عَنْهُ وَلَا يَتَبَدَّلُ
আপন মতাদর্শের ক্ষেত্রে সুদৃঢ় গবেষক আকিদাধারীর কথা শুনুন; যিনি নিজের মতাদর্শ (আকিদা) থেকে সরে আসেন না এবং (সালাফদের মতাদর্শ পরিবর্তন করে) আদর্শের ক্ষেত্রে পরিবর্তিতও হন না।
ব্যাখ্যা : এখানে শাইখ জানিয়ে দিচ্ছেন, গবেষণা, অনুসন্ধান এবং দলিলপ্রমাণের দিকে ফিরে যাওয়ার পরেই তাঁর এই আকিদা সাব্যস্ত হয়েছে। সেজন্য তিনি এই আকিদার ওপরে সুদৃঢ় রয়েছেন; যা থেকে তিনি কখনোই সরে আসবেন না, যতই বাধাবিপত্তি আসুক না কেন। এবং এই আকিদা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন আকিদায় যাবেন না, যতই প্ররোচনাদায়ক বিষয় আসুক না কেন।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা

📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা


মূলপাঠ :
حُبُّ الصَّحَابَةِ كَلِّهِمْ لِي مَذْهَبٌ ... وَمَوَدَّةُ القُرْبَى بِهَا أَتَوَسَلُ
সমুদয় সাহাবিকে ভালোবাসা আমার আদর্শ। আর নবিপরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করি।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ এখানে ইঙ্গিত করেছেন, কোনোরকম ব্যত্যয় না করে সকল সাহাবিকে ভালোবাসা তাঁর মতাদর্শ। কারণ মহান আল্লাহ সুরা হাশরে মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণের²² কথা উল্লেখ করার পর বলেছেন,
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ.
“যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, 'হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইদেরকেও ক্ষমা করুন, যাঁরা ইমান আনয়নে আমাদের অগ্রগামী হয়েছেন'।”²³
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ.
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল; তার সঙ্গীবর্গ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।”²⁴
তিনি আরও বলেছেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا.
“মুমিনরা যখন গাছের নিচে তোমার নিকট বায়াত (আনুগত্যের অঙ্গীকার) করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত ছিলেন; তাদেরকে তিনি দান করলেন প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।”²⁵
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
“আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ইমান আনয়নে) প্রথম সারির অগ্রণী, আর যেসব লোক উত্তমরূপে তাদের অনুসরণকারী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যেমনভাবে তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়, সেখানে তারা চিরদিন অবস্থান করবে। এটাই হচ্ছে মহাসাফল্য।”²⁶
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ * وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحْبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.
“নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর) নবি এবং মুহাজির ও আনসারদের তওবা কবুল করলেন, যারা নবির অনুগামী হয়েছিল এমন সংকটময় মুহূর্তে, যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর (হক থেকে) বিচ্যুত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করলেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি স্নেহশীল, করুণাময়। আর ঐ তিন ব্যক্তির তওবাও তিনি কবুল করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।²⁷ এমনকি ভূপৃষ্ঠ নিজের প্রশস্ততা সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের নিজেদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল; আর তারা বুঝতে পেরেছিল, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন, যাতে তারা (নিজেদের) তওবায় অটল থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবা-কবুলকারী, অসীম দয়ালু।”²⁸
এ জাতীয় আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, সাহাবিগণকে ভালোবাসা ওয়াজিব; যাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থেকে উত্তমরূপে বালা-মুসিবত সহ্য করেছেন। আর এটাই ছিল তাঁদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। কেননা তাঁরা হকের ক্ষেত্রে তাঁদের নবির পৃষ্ঠপোষকতায় অটল ছিলেন। অনুরূপভাবে সকল সাহাবিকে ভালোবাসা এবং কোনো একজন সাহাবিদের ব্যাপারেও খারাপ মন্তব্য না করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব।²⁹ কেননা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
فَهَلْ أَنْتُمْ تَارِكُوا لِي صَاحِبِي.
“তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাহাবিকে (কষ্ট থেকে) অব্যাহতি দিবে?”³⁰
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهُ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ.
“তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি এক উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা দান করে, তবুও তা তাদের কারও এক মুদ (মধ্যম মাপের দু হাতের এক অঞ্জলি পরিমাণ) বা তার অর্ধেক পরিমাণ দানের সমপর্যায়ে পৌঁছবে না।”³¹
এরপর শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
وَمَوَدَّةُ القُرْبَى بِهَا أَتَوَسِّلُ.
“আর নবিপরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করি।”
অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এবং আল্লাহর কাছে আশা করি, যেন তিনি আমার পাপ মোচন করে দেন এবং কেয়ামতের দিন আমাকে এমন সাহাবিবর্গ ও নবিপরিবারের প্রবেশস্থলে প্রবিষ্ট করেন, যাঁদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন।³²
মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى.
“(হে নবি,) আপনি বলে দিন, আমি এর বিনিময়ে (হেদায়েতের বাণী প্রচারের বিনিময়ে) তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদান চাই না; কেবল আত্মীয়ের প্রতি সৌহার্দ্য ব্যতীত।”³³
অর্থাৎ তোমাদের কাছ থেকে শুধু এটাই চাই যে, তোমরা আমার আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসবে এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে; আমার সাথে তাদের নিকটবর্তিতা ও সাহচর্য থাকার কারণে।
হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أنا خيار من خيار من خيار إن الله اختار العرب من بني آدم واختار كنانة من العربي واختار كريش من كنانة واختار بني هاشم من كريش واخترني من بني هاشم فأنا خيار من خيار من خيار.
“আমি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। নিশ্চয় আল্লাহ বনু আদমের মধ্য থেকে আরব জাতিকে চয়ন করেছেন। আরবদের মধ্য থেকে কিনানাকে চয়ন করেছেন, কিনান থেকে কুরাইশদেরকে চয়ন করেছেন, কুরাইশদের থেকে বনু হাশিমদেরকে চয়ন করেছেন, আর আমাকে চয়ন করেছেন বনু হাশিম গোত্র থেকে। সুতরাং আমি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”³⁴
মূলপাঠ :
وَلِكُلِّهِمْ قَدْرٌ عَلا وَفَضَائل ... لَكِنَّمَا الصِّدِّيقُ مِنْهُمْ أَفْضَلُ
আর তাঁদের (সাহাবিবর্গের) প্রত্যেকেরই সুউন্নত সম্মান ও মর্যাদা আছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন আস-সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
ব্যাখ্যা : এই কথার মাধ্যমে শাইখুল ইসলাম সাহাবিগণের মধ্যকার মর্যাদাগত তারতম্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন; যদিও তাঁদের সবাইকে ভালোবাসতে হবে। কারণ দলিলপ্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্য সাহাবিদের চেয়ে উত্তম, এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্য সাহাবিদের চেয়ে উত্তম। এরপরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তম, তারপরে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তম।³⁵
তারপরে উত্তম হলেন (একই সময়ে) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবিদের বাকি ছয়জন। তাঁরা হলেন- জুবাইর বিন আওয়্যাম, তালহা বিন উবাইদুল্লাহ, সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস, আব্দুর রহমান বিন আওফ, সায়িদ বিন জাইদ এবং আবু উবাইদা ইবনুল জারাহ।³⁶
এরপরে ইসলামের প্রতি অগ্রগামিতার দিক থেকে সকল সাহাবির মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য হয়েছে। এজন্য দুবার হিজরতকারী সাহাবিগণ অন্যান্য মুহাজির সাহাবির চেয়ে উত্তম।³⁷
অপরদিকে আকাবায় বায়াতকারী সাহাবিগণ অন্যান্য আনসার সাহাবির চেয়ে উত্তম। এরপর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিগণ উত্তম,³⁸ তারপর বাইআতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিগণ উত্তম।³⁹ তারপর যাঁরা হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে ইমান এনেছেন এবং হিজরত করেছেন। এরপর যাঁরা হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে ইমান এনেছেন এবং ইসলামের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন।⁴⁰ এরপর হলেন ছোটো সাহাবিগণ। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে সাহাবিগণের ক্রমধারা এমনই।
এই আলোচনায় শিয়া ও নাসিবি সম্প্রদায় থেকে অব্যাহতির ঘোষণা আছে। কেননা শিয়া সম্প্রদায় সাহাবিগণকে কাফির বলার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় করে না (সবাইকে কাফির বলে দেয়); কেবল আলি বিন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং সামান্য কয়েকজন সাহাবি ব্যতীত, যাঁদের সংখ্যা চোদ্দো বা পনেরো অতিক্রম করবে না (অর্থাৎ চোদ্দো বা পনেরোজন ছাড়া সকল সাহাবিকে কাফির ফতোয়া দেয় তারা)। পক্ষান্তরে নাসিবি সম্প্রদায় (শিয়াদের বিপরীত করতে গিয়ে) সাহাবিবর্গের সাথে মিত্রতা বজায় রাখে এবং নবিপরিবারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। উভয় ফের্কাই পথভ্রষ্টতার ওপরে রয়েছে। এক্ষেত্রে হক কথা হলো- আমরা তাঁদের সবার সাথে মিত্রতা বজায় রাখি, তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং আল্লাহ তাঁদের জন্য যেই মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন, আমরা তাঁদেরকে সেই মর্যাদা প্রদান করি।

টিকাঃ
২২ যারা নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন তাঁদেরকে মুহাজির বলা হয়। আর মদিনার স্থানীয় মুসলিমদের বলা হয় আনসার, যাঁরা হিজরত করে আসা মুহাজির সাহাবিদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন সর্বতোভাবে। – অনুবাদক।
২৩ সুরা হাশর : ১০।
২৪ সুরা ফাতহ : ২৯।
২৫ সুরা ফাতহ : ১৮।
২৬ সুরা তাওবা : ১০০।
২৭ অনুবাদকের টীকা: যাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, তাঁরা তিনজন সাহাবি ছিলেন; কাব বিন মালিক, মুরারা বিন রাবি ও হিলাল বিন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাঁরা তিনজনই ছিলেন মুখলিস সাহাবি। তাবুক যুদ্ধে অবহেলাবশত তাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শরিক হননি। পরে তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন ও ভাবেন, জিহাদে শরিক না হয়ে পিছিয়ে থাকার একটি অপরাধ করেছি, কিন্তু পুনরায় মুনাফিকদের মতো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আরেকটি অপরাধ আমরা করব না। ফলে তাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন এবং অপরাধের শাস্তির জন্য নিজেদেরকে পেশ করেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বিষয় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দেন, যেন আল্লাহ তাঁদের বিষয়ে কোনো ফয়সালা করেন। এরপরেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে উক্ত তিন সাহাবির সাথে কোনো সামাজিক সম্পর্ক রাখতে, এমনকি কথাবার্তা বলতেও নিষেধ করে দেন এবং চল্লিশ দিন পর তাঁদেরকে নিজ নিজ স্ত্রী থেকেও পৃথক থাকার আদেশ দেন। সুতরাং তাই করা হয়। আরও দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, মোট পঞ্চাশ দিন পর তাঁদের তওবা কবুল করা হয় এবং আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়। বিস্তারিত ঘটনা জানতে দেখুন : সহিহুল বুখারি, হা. ৪৪১৮। টীকা সমাপ্ত।
২৮ সুরা তাওবা : ১১৭-১১৮।
২৯ অনুবাদকের টীকা : সালাফদের যুগের বিশিষ্ট ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৪১ হি.) বলেছেন, ومن انتقص أحدا من أَصْحَابِ رَسُول الله ﷺ أَو بغضه بِحَدَث مِنْهُ أو ذكر مساويه كَانَ مبتدعا حَتَّى يترحم عَلَيْهِم جَمِيعًا ويكون قلبه لهم سليما. “যে ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো একজন সাহাবিরও মর্যাদাহানি করে, কিংবা সাহাবি কর্তৃক সংঘটিত কোনো ঘটনার কারণে তাঁকে অপছন্দ করে, অথবা তাঁর দোষত্রুটি আলোচনা করে, সে ব্যক্তি বিদাতি হয়ে যায়; যতক্ষণ না সে সকল সাহাবির জন্য রহমতের দোয়া করছে এবং তাঁদের সবার ব্যাপারে তার অন্তর প্রশান্ত হচ্ছে (ততক্ষণ পর্যন্ত সে বিদাতি হিসেবে বিবেচিত হবে)।” দ্রষ্টব্য : আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানি, উসুলুস সুন্নাহ (আল-খার্জ : দারুল মানার, ১ম প্রকাশ, ১৪১১ হি.), পৃ. ৫৪। টীকা সমাপ্ত।
৩০ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৬১।
৩১ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, হা. ২৫৪০।
৩২ অনুবাদকের টীকা: কোনো কিছুকে অসিলা বা মাধ্যম সাব্যস্ত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা নিঃশর্তভাবে বৈধ নয়। বরং কিছু বিষয়কে অসিলা গণ্য করা বৈধ, আবার কিছু বিষয়কে অসিলা গণ্য করা অবৈধ। প্রধানত তিনটি বিষয়কে অসিলা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা শরিয়তসম্মত। যথা: ১. মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অসিলায় দোয়া করা। দলিল : সুরা আরাফ : ১৮০; সুরা নামল : ১৯। ২. নিজে কোনো ভালো আমল করলে, সেই ভালো আমলের অসিলায় দোয়া করা। দলিল : সুরা আলে ইমরান : ১৬, ৫৩, ১৯৩-১৯৪; সহিহুল বুখারি, হা. ২২৭২; সহিহ মুসলিম, হা. ২৭৪৩। ৩. সৎব্যক্তির দোয়ার অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করা। দলিল : সহিহুল বুখারি, হা. ১০১০। এই তিনটি বিষয়ের অসিলায় দোয়া করতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এগুলো ব্যতীত অন্যকিছুকে অসিলা করা-হয় শির্ক কিংবা বিদাত, আর নয়তো সেগুলো মতভেদপূর্ণ, যেসবের সিদ্ধতা নিয়ে সুন্নাহপন্থি উলামাগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, আত-তাওয়াসসুল আনওয়াউহু ওয়া আহকামুহ, তাহকিক : মুহাম্মাদ ইদ আল-আব্বাসি (রিয়াদ : দারুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.), পৃ. ২৯-৪২। শাইখুল ইসলাম 'লামিয়্যা' কবিতায় জানিয়েছেন, নবিপরিবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে অসিলা করে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এটা ভালো আমলকে অসিলা করে দোয়া করার অন্তর্ভুক্ত; যা বিলকুল শরিয়তসম্মত। টীকা সমাপ্ত।
৩৩ সুরা শুরা : ২৩।
৩৪ অনুবাদকের টীকা : কাছাকাছি শব্দে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আত-তাবারানি, আল-উকাইলি, ইবনু আদি, আবু নুআইম, হাকিম-সহ আরও অনেকে। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফা ওয়াল মাওদুআ ওয়া আসারুহাস সাইয়্যিউ ফিল উম্মাহ (রিয়াদ : দারুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৪১২ হি./১৯৯২ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫১২, হা. ৩৩৮। হাদিসটির বর্ণনাগত মান প্রসঙ্গে ইমাম আলবানি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২০ হি.) বলেছেন, “এ হাদিসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল।... জ্ঞাতব্য যে, হাদিসের শেষাংশে আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে; যা বিশুদ্ধ হাদিসগুলোতে সুসাব্যস্ত হয়েছে।” দ্রষ্টব্য : আল-আলবানি, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফা, খ. ১, পৃ. ৫১২-৫১৩। যেমন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ. “নিশ্চয় আল্লাহ ইসমাইলের বংশধর থেকে কিনানাকে চয়ন করেছেন, কিনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করেছেন, আর কুরাইশ থেকে বনু হাশিমকে বাছাই করেছেন এবং বনু হাশিম থেকে আমাকে চয়ন করেছেন।” দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিম, হা. ২২৭৬, মর্যাদা অধ্যায়, অধ্যায় নং : ৪৪, পরিচ্ছেদ : ১। টীকা সমাপ্ত।
৩৫ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৫৫, ৩৬৭১।
৩৬ তিরমিজি, হা. ৩৭৪৭, বর্ণনার মান : সহিহ; সদরুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আলাউদ্দিন ইবনু আবিল ইজ, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, তাহকিক : শুয়াইব আল-আরনাউত ও আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১০ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৭৩৩।
৩৭ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৭৭৯।
৩৮ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৯৯২।
৩৯ আবু দাউদ, হা. ৪৬৫৩, বর্ণনার মান : সহিহ।
৪০ সুরা হাদিদ : ১০।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 কুরআন বিষয়ক আকিদা

📄 কুরআন বিষয়ক আকিদা


মূলপাঠ :
وَأَقُولُ فِي القُرْآنِ مَا جَاءَتْ بِهِ ... آيَاتُهُ فَهُوَ الْكَرِيمُ الْمُنزَلُ
কুরআনের আয়াতসমূহ যা আনয়ন করেছে, কুরআনের ব্যাপারে আমি সেটাই বলি। বস্তুত কুরআন মহিমান্বিত নাজিলপ্রাপ্ত কিতাব।⁴¹
وَأَقُولُ قَالَ اللهُ جَلَّ جَلالُهُ ... وَالْمُصْطَفَى الْهَادِي وَلَا أَتَأَوَّلُ
আমি বলি, 'মহান আল্লাহ বলেছেন, আর সুপথপ্রদর্শক মুস্তাফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন।' (এর বাইরে গিয়ে) আমি (তাঁদের কথার) তাবিল বা ভিন্নার্থ করি না।
ব্যাখ্যা : কবিতার এই দুই চরণে শাইখুল ইসলাম জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, কুরআন আল্লাহর কথা, যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তা সৃষ্ট নয়। আমরা সেটাই বলি, যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ.
“মুশরিকদের মধ্য হতে যদি কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তাহলে তুমি তাকে আশ্রয় দান করো, যাতে সে আল্লাহর কথা (কুরআন) শুনতে পায়।”⁴²
মহান আল্লাহ কুরআনকে 'কালামুল্লাহ তথা আল্লাহর কথা' বলেছেন, যদিও তা কোনো মাখলুক থেকে শোনা হয়। এখানে মুতাজিলি সম্প্রদায়ের মতাদর্শকে বাতিল সাব্যস্ত করা হয়েছে, যারা বলে, কুরআন হলো মাখলুক। আবার লাফজিয়্যা সম্প্রদায়ের মতাদর্শকেও বাতিল সাব্যস্ত করা হয়েছে, যারা বলে, আমাদের উচ্চারিত (পঠিত) কুরআন মাখলুক। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত সাব্যস্ত করেছে, যে ব্যক্তি বলে, 'কুরআন হলো মাখলুক,' সে কাফির। আবার যে ব্যক্তি বলে, 'আমাদের উচ্চারিত কুরআন মাখলুক,' সে জাহমি বিদাতি। এক্ষেত্রে হক সেটাই, যা আমরা স্পষ্ট করেছি যে, কুরআন আল্লাহর কালাম তথা কথা; আর আল্লাহর কথা তাঁর একটি অন্যতম সিফাত বা বৈশিষ্ট্য। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত আকিদা পোষণ করে, মহান আল্লাহ এমন কথা দিয়ে কথা বলেন, যা সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (কথার) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'।⁴³ আল্লাহ যখন ইচ্ছে, যা ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে কথা বলেন। কথা বলতে না পারা মাখলুকের ক্ষেত্রে ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত, তাহলে স্রষ্টার ক্ষেত্রে 'কথা না বলা' কীভাবে ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত হবে না?!
ইলমুল কালামের (তথাকথিত ইসলামি দর্শন) আলোকে আকিদা সাব্যস্তকারী লোকদেরকে আল্লাহ অপদস্থ করুন। আর তাদেরকেও আল্লাহ অপদস্থ করুন, যারা ভ্রষ্টকারী বিদাত আনয়ন করেছে এবং ইসলামের মধ্যে সেসব বিদাত ঢুকিয়ে দিয়েছে।⁴⁴

টিকাঃ
৪১ অনুবাদকের টীকা: 'লামিয়্যার' যেসব নুসখা পাওয়া যায়, সেসবের মধ্যে এই চরণে 'আল-কারিম' শব্দের জায়গায় আছে 'আল-কদিম' শব্দ। অর্থাৎ এসব নুসখা অনুযায়ী কুরআনকে 'কদিম (শুরুহীন আদি)' বলেছেন শাইখুল ইসলাম। অথচ আমরা দেখতে পাই, শাইখুল ইসলাম এই আকিদার বিরোধিতা করে গেছেন তাঁর অসংখ্য কিতাবে। জানিয়ে গেছেন, কুরআন শুরুহীন আদি নয়, বরং আল্লাহ কুরআন বলেছেন বিভিন্ন সময়ে, যার শুরু আছে। এই জটিলতার সমাধান হিসেবে বলা যেতে পারে, এখানে কদিম বলতে 'আল-কদিম আল-হাকিকি' (সূচনাহীন প্রকৃত প্রাচীন) উদ্দেশ্য নয়, বরং 'আল-কদিম আন-নিসবি' (আপেক্ষিক প্রাচীন) উদ্দেশ্য। কারণ আমরা জানি, শরিয়তে দুটো অর্থেই কদিম শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ খেজুর গাছের ডালকে 'কদিম' বলেছেন। (সুরা ইয়াসিন : ৩৯) খেজুর গাছের ডাল আপেক্ষিকভাবে প্রাচীন, অর্থাৎ অন্য কোনো পরবর্তী খেজুর-ডালের বিবেচনায় আগেরটা প্রাচীন; এমন না যে, খেজুর গাছের ডালের কোনো শুরু নেই। আবার মহান আল্লাহর 'সুলতান তথা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে' কদিম বলা হয়েছে হাদিসে। (আবু দাউদ, হা. ৪৬৬, বর্ণনার মান : সহিহ) আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সূচনা নেই, সুতরাং এটা কদিম হাকিকি তথা সূচনাহীন প্রকৃত প্রাচীন। কিন্তু প্রাথমিক আকিদা শেখানোর কিতাবে এরকম দ্ব্যর্থবোধক শব্দ নিয়ে আসা শাইখুল ইসলামের কর্মপদ্ধতির সাথে মেলে না। এজন্যই যেসব বিদ্বান 'লামিয়্যা' কবিতাকে শাইখুল ইসলামের লেখা হিসেবে মানতে অস্বীকার করেছেন, তারা এই চরণটিকে নিজেদের মতের পক্ষে অন্যতম প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। ভিন্নপক্ষের বিদ্বানগণ দুভাবে তাঁদের আর্গুমেন্টের জবাব দিয়েছেন। যথা : ১. কিছু কিছু নুসখায় 'আল-কদিম' শব্দের জায়গায় 'আল-কারিম' শব্দই আছে। যেমন ইমাম সালিহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ (জ. ১৩৫৪ হি.) এমন দাবি করেছেন 'আল-লাআলিল বাহিয়্যা' কিতাবের টীকায়; এবং আল্লামা ইবনু জিবরিন (মৃ. ১৪৩০ হি.) ও আল্লামা আব্দুল কারিম খুদাইর (জ. ১৩৭৪ হি.) এ দাবি করেছেন তাঁদের স্ব স্ব 'শারহুল লামিয়্যা' গ্রন্থে। দ্রষ্টব্য : আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-মাদাওয়ি, আল-লাআলিল বাহিয়্যা ফি শারহি লামিয়্যাতি শাইখিল ইসলাম ইবনি তাইমিয়্যা, টীকা : সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান (রিয়াদ : দারুল মুসলিম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ৪৬; আল-জিবরিন, শারহু লামিয়‍্যাতি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আল-খুদাইর, শারহু লামিয়্যাতি শাইখিল ইসলাম, পৃ. ৬৮। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, যেহেতু শাইখুল ইসলামের আকিদা-মানহাজের সাথে 'আল-কারিম' শব্দটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেহেতু এই শব্দকেই প্রাধান্য দিতে হবে। ২. এই কবিতা শাইখুল ইসলামের প্রথমদিকের লেখা ছিল, পরবর্তীতে তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। এরকম সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন ইমাম ইবনু উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২১ হি.)। তাঁর বরাতে এই জবাব দিয়েছেন শাইখ ড. আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-আকল হাফিজাহুল্লাহ। দ্রষ্টব্য: শারহুস সাফফারিনিয়্যা (প্র. দারুল বাসিরা), পৃ. ৪২৭; গৃহীত : আল-আকল, বাদরুত তামাম, পৃ. ১৬। অবশ্য ইমাম সুলাইমান বিন সিহমান রাহিমাহুল্লাহর (মৃ. ১৩৪৯ হি.) একটি বক্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে তিনি দাবি করেছেন, যদি শাইখুল ইসলাম থেকে এই শব্দসংবলিত চরণ বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিতও হয়, তবুও 'কদিম' শব্দটি 'আল্লাহ যে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী কথা বলেছেন' – তার বিরোধী নয়। কিন্তু এ কথা বলার পরে তিনি আর ব্যাখ্যা করেননি, ঠিক কোনদিক থেকে দুটো বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। দ্রষ্টব্য: ইবনু সিহমান, তাম্বিহু জাবিল আলবাব, পৃ. ২১। আর আল্লাহই সম্যক অবগত। টীকা সমাপ্ত।
৪২ সুরা তাওবা : ৬।
৪৩ অনুবাদকের টীকা: আল্লাহর যত কর্মর্গত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, সবগুলো বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদা ছিল, এগুলো সামষ্টিকভাবে সুপ্রাচীন (যার কোনো শুরু নেই), কিন্তু (এসবের) বিভিন্ন এককের বিবেচনায় এগুলো 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। এর মানে মহান আল্লাহ এসব বৈশিষ্ট্য কোনো একটা সময়ে অর্জন করেছেন, বিষয়টা এমন নয়; বরং সূচনাহীন অতীত থেকে আল্লাহ সর্বদাই এসব গুণে গুণান্বিত হয়ে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহান আল্লাহর এসব গুণ সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেন, তখন এসব বৈশিষ্ট্যের একক সংঘটন করেন। যেমন আল্লাহ যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন মুসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন, আবার যখন ইচ্ছে করেছেন, তখন প্রিয় নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলেছেন। এভাবে তিনি অনেকের সাথে কথা বলেছেন। এগুলো একেকটি একক এবং তাঁর কথার অংশ। এসব একক তো আর সুপ্রাচীন নয়, যার কোনো শুরু নেই। বরং এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে এবং প্রত্যেকটি এককের শুরু আছে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ জাতীয় কর্মর্গত গুণ 'নতুন করে সংঘটিত হওয়া বিষয়'। দ্রষ্টব্য : আব্দুর রহমান বিন নাসির আলু সাদি, আত-তাম্বিহাতুল লাতিফা ফিমা ইহতাওয়াত আলাইহিল ওয়াসিতিয়‍্যাতু মিনাল মাবাহিসিল মুনিফা (রিয়াদ : দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি.), ৪৮। টীকা সমাপ্ত।
৪৪ অনুবাদকের টীকা : আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা বিষয়ক মূলনীতি হলো-আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলিকে প্রকৃত ও প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হবে; রূপক অর্থ কিংবা ভিন্ন অর্থ বলে তাবিল তথা অপব্যাখ্যা করা যাবে না। যারা বিনা দলিলে সিফাতের তাবিল করে, তারা পথভ্রষ্ট। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সবাই একমত। তাই এ বিষয়ে ভিন্ন মত গ্রহণের কোনো সুযোগ ও বৈধতা নেই। ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৪৬৩ হি.) বলেছেন : أهل السنة مجمعون على الإقرار بالصفات الواردة كلها في القرآن والسنة، والإيمان بها، وحملها على الحقيقة؛ لا على المجاز، إلا أنهم لا يكيفون شيئًا من ذلك، ولا يَحُدُّون فيه صفة محصورة. وأما أهل البدع والجهمية والمعتزلة كلها والخوارج فكلهم ينكرها، ولا يحمل شيئا منها على الحقيقة، ويزعمون أن من أقر بها مشبه، وهم عند من أثبتها نافون للمعبود والحق فيما قاله القائلون بما نطق به كتاب الله وسنة رسوله وهم أئمة الجماعة والحمد لله. “আহলুস সুন্নাহ এ মর্মে একমত পোষণ করেছে যে, কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত সকল সিফাত তথা আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করতে হবে, সেগুলোর প্রতি প্রতি ইমান রাখতে হবে এবং সেগুলোকে প্রকৃত অর্থ অনুযায়ীই ব্যাখ্যা করতে হবে, মাজাজ তথা রূপক অর্থে নয়। তবে আহলুস সুন্নাহ এসব গুণের কোনো ধরন নির্দিষ্ট করে না এবং কোনো গুণের ক্ষেত্রেই সেটা 'সীমাবদ্ধ সিফাত' এমনভাবে ব্যক্ত করে না (অর্থাৎ কোনো সিফাতকে সীমাবদ্ধ করে না)। পক্ষান্তরে বিদাতি গোষ্ঠী, জাহমিয়া সম্প্রদায়, সমুদয় মুতাজিলা ও খারেজি সম্প্রদায় এদের সবাই এসব সিফাতের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং এসবের কোনোকিছুকেই প্রকৃত অর্থানুযায়ী ব্যাখ্যা করে না। বরং তারা মনে করে, যে ব্যক্তি এসব সিফাতের স্বীকৃতি দেয়, সে সাদৃশ্যবাদী মুশাব্বিহ। কিন্তু যারা সিফাতকে সাব্যস্ত করে, তাদের কাছে ওরা এমন ব্যক্তিবর্গ, যারা মাবুদের প্রতিই অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে এক্ষেত্রে হক রয়েছে তাদেরই বক্তব্যের মাঝে, যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসুলের সুন্নাতের বক্তব্য মোতাবেক কথা বলেছে। আর তারাই হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমামগণ। আলহামদুলিল্লাহ।” দ্রষ্টব্য : আবু উমার ইউসুফ ইবনু আব্দিল বার আল-মালিকি, আত-তামহিদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মায়ানি ওয়াল আসানিদ (মরক্কো : মরক্কোর ধর্ম-মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, প্র. ১৩৮৭ হি.), খ. ৭, পৃ. ১৪৫। ইমাম ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৬২০ হি.) বলেছেন, وأما الإجماع فإن الصحابة أجمعوا على ترك التَّأْوِيل بِما ذكرناهُ عَنْهُم وَكَذَلِكَ أهل كل عصر بعدهم ولم ينقل التَّأْوِيل إِلَّا عَن مُبْتَدع أو مَنسُوب إلى بدعة. “আর সর্ববাদিসম্মত অভিমতের ব্যাপারটি হলো, সাহাবিগণ শরিয়তের দলিলের প্রকাশ্য অর্থ থেকে ফিরিয়ে দিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা তথা তাবিল বর্জনের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন; আমরা তাঁদের নিকট থেকে যা বর্ণনা করেছি তা থেকেই বিষয়টি প্রতিপন্ন হয়। তদ্রুপ তাঁদের পরবর্তী সকল যুগের (হকপন্থি) অধিবাসীগণ এমনটিই মনে করেছেন। কেবল বিদাতি কিংবা বিদাতের সাথে সম্পৃক্ত লোেক ছাড়া অন্য কেউ তাবিল করেছেন বলে জানা যায়নি।” দ্রষ্টব্য: আবু মুহাম্মাদ মুওয়াফফাকুদ্দিন আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ ইবনু কুদামা, জাম্মুত তাবিল, তাহকিক : বাদর বিন আব্দুল্লাহ আল-বাদর (কুয়েত : আদ-দারুস সালাফিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪০৬ হি.), পৃ. ৪০। জ্ঞাতব্য যে, আমরা দলিলবিহীন তাবিল তথা অপব্যাখ্যার বিরোধিতা করি। কিন্তু কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা তথা উলামাদের সর্ববাদিসম্মত অভিমত থেকে প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে তাবিল বা ভিন্নার্থ করা হলে তার বিরোধিতা করি না। যেমন ওজুর আয়াতে এসেছে, 'তোমরা যখন নামাজে দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত করবে...।' (সুরা মায়িদা : ৬) এ আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী আমরা কেউ নামাজে দাঁড়ানোর পরে ওজু শুরু করি না, বরং হাদিস থেকে প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করি, 'এর মানে, তোমরা যখন নামাজ পড়ার ইচ্ছে করবে, তখন ওজু করে নাও।' বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ ইবনু বাজ, আত-তালিকাতুল বাজিয়্যা আলা শারহিত তাহাবিয়্যা (রিয়াদ : দারু ইবনিল আসির, ১ম প্রকাশ, ১৪২৯ হি./২০০৮ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৯৯; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, শারহু ফাতহি রব্বিল বারিয়‍্যা বি তালখিসিল হামাবিয়্যা (কাসিম : মুআসসাসাতুশ শাইখ ইবনি উসাইমিন, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৬ হি.), পৃ. ৪৪৬-৪৪৭; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, আত-তালিক আলা মাওয়াদি মিন শারহিল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা (কাসিম : মুআসসাসাতুশ শাইখ ইবনি উসাইমিন, ১ম প্রকাশ, ১৪৪০ হি.), পৃ. ৬৫-৬৭; মুহাম্মাদ বিন সালিহ ইবনু আল-উসাইমিন, শারহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা (রিয়াদ: দারু ইবনিল জাওজি, ৬ষ্ঠ প্রকাশ, ১৪২১ হি.), খ. ১, পৃ. ৮৯-৯০। অনুরূপভাবে বলা যায়, হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেছেন, 'আমিই হলাম যুগ।' (সহিহুল বুখারি, হা. ৭৪৯১) আমরা এই বাক্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা করে বলি, এর মানে, আমি হলাম যুগের মালিক, নিয়ন্ত্রক ও পরিবর্তক। কারণ আমাদের ব্যাখ্যার পক্ষে দলিল আছে। যেহেতু একই হাদিসে ওই কথা বলার পরে আল্লাহ বলেছেন, 'আমার হাতেই সকল কিছুর কর্তৃত্ব রয়েছে। আমি রাত ও দিনকে পরিবর্তন করে থাকি।' দ্রষ্টব্য: মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন, তালিকুন মুখতাসার আলা লুমআতিল ইতিকাদ, তাহকিক : আশরাফ বিন আব্দুল মাকসুদ (মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ, ৩য় প্রকাশ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রি.), পৃ. ২২। টীকা সমাপ্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00