📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 ব্যাখ্যাকারকের ভূমিকা

📄 ব্যাখ্যাকারকের ভূমিকা


আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। সালাত ও সালাম ধার্য হোক আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি।
বক্ষ্যমাণ পুস্তিকা শাইখুল ইসলাম আহমাদ বিন আব্দুল হালিম বিন আব্দুস সালাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বিরচিত 'লামিয়‍্যা' কবিতার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা

📄 হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা


মূলপাঠ :
يَا سَائِلِي عَنْ مَذْهَبِي وَعَقِيدَتِي ... رُزِقَ الهُدَى مَنْ لِلْهِدَايَةِ يَسْأَلُ
ওহে আমার মতাদর্শ ও আকিদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারী, যে ব্যক্তি হেদায়েত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুন।
ব্যাখ্যা : এখানে শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহু তাআলা (তাঁর আকিদা সম্পর্কে) জিজ্ঞাসাকারী ব্যক্তির জন্য দোয়া করেছেন, যেন আল্লাহ তাঁকে হেদায়েত দান করেন। কেননা যে ব্যক্তি এ ধরনের প্রশ্ন করে, সে অবশ্যই দুজনের একজন হবে :
• হয়তো সে পরীক্ষাকারী; জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির আকিদা জানতে চায় এবং উক্ত আকিদা অনুযায়ীই তার সাথে (যথোপযুক্ত) আচরণ করতে চায়।
• আর নয়তো সে একজন প্রাথমিক জ্ঞানান্বেষণকারী; যে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির মাঝে হেদায়েতের আলামত প্রত্যক্ষ করার ফলে তাঁকে সম্মান করে এবং মর্যাদা দেয়। এ ধরনের জিজ্ঞাসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিজ্ঞাসাকারীর অবস্থা এমন হয়ে থাকে। আর আল্লাহই তৌফিকদাতা।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 সুদৃঢ় আকিদা

📄 সুদৃঢ় আকিদা


মূলপাঠ :
اسْمَعْ كَلامَ مُحَقَّقٍ فِي قَولِه ... لَا يَنْثَنِي عَنْهُ وَلَا يَتَبَدَّلُ
আপন মতাদর্শের ক্ষেত্রে সুদৃঢ় গবেষক আকিদাধারীর কথা শুনুন; যিনি নিজের মতাদর্শ (আকিদা) থেকে সরে আসেন না এবং (সালাফদের মতাদর্শ পরিবর্তন করে) আদর্শের ক্ষেত্রে পরিবর্তিতও হন না।
ব্যাখ্যা : এখানে শাইখ জানিয়ে দিচ্ছেন, গবেষণা, অনুসন্ধান এবং দলিলপ্রমাণের দিকে ফিরে যাওয়ার পরেই তাঁর এই আকিদা সাব্যস্ত হয়েছে। সেজন্য তিনি এই আকিদার ওপরে সুদৃঢ় রয়েছেন; যা থেকে তিনি কখনোই সরে আসবেন না, যতই বাধাবিপত্তি আসুক না কেন। এবং এই আকিদা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন আকিদায় যাবেন না, যতই প্ররোচনাদায়ক বিষয় আসুক না কেন।

📘 আকিদা লামিয়্যা ও তার ব্যাখ্যা > 📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা

📄 সাহাবি বর্গ ও নবি পরিবার সংক্রান্ত আকিদা


মূলপাঠ :
حُبُّ الصَّحَابَةِ كَلِّهِمْ لِي مَذْهَبٌ ... وَمَوَدَّةُ القُرْبَى بِهَا أَتَوَسَلُ
সমুদয় সাহাবিকে ভালোবাসা আমার আদর্শ। আর নবিপরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করি।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ এখানে ইঙ্গিত করেছেন, কোনোরকম ব্যত্যয় না করে সকল সাহাবিকে ভালোবাসা তাঁর মতাদর্শ। কারণ মহান আল্লাহ সুরা হাশরে মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণের²² কথা উল্লেখ করার পর বলেছেন,
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ.
“যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, 'হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইদেরকেও ক্ষমা করুন, যাঁরা ইমান আনয়নে আমাদের অগ্রগামী হয়েছেন'।”²³
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ.
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল; তার সঙ্গীবর্গ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।”²⁴
তিনি আরও বলেছেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا.
“মুমিনরা যখন গাছের নিচে তোমার নিকট বায়াত (আনুগত্যের অঙ্গীকার) করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি অবগত ছিলেন; তাদেরকে তিনি দান করলেন প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।”²⁵
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
“আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ইমান আনয়নে) প্রথম সারির অগ্রণী, আর যেসব লোক উত্তমরূপে তাদের অনুসরণকারী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যেমনভাবে তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়, সেখানে তারা চিরদিন অবস্থান করবে। এটাই হচ্ছে মহাসাফল্য।”²⁶
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ * وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحْبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.
“নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর) নবি এবং মুহাজির ও আনসারদের তওবা কবুল করলেন, যারা নবির অনুগামী হয়েছিল এমন সংকটময় মুহূর্তে, যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর (হক থেকে) বিচ্যুত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করলেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি স্নেহশীল, করুণাময়। আর ঐ তিন ব্যক্তির তওবাও তিনি কবুল করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।²⁷ এমনকি ভূপৃষ্ঠ নিজের প্রশস্ততা সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের নিজেদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল; আর তারা বুঝতে পেরেছিল, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন, যাতে তারা (নিজেদের) তওবায় অটল থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবা-কবুলকারী, অসীম দয়ালু।”²⁸
এ জাতীয় আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, সাহাবিগণকে ভালোবাসা ওয়াজিব; যাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থেকে উত্তমরূপে বালা-মুসিবত সহ্য করেছেন। আর এটাই ছিল তাঁদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। কেননা তাঁরা হকের ক্ষেত্রে তাঁদের নবির পৃষ্ঠপোষকতায় অটল ছিলেন। অনুরূপভাবে সকল সাহাবিকে ভালোবাসা এবং কোনো একজন সাহাবিদের ব্যাপারেও খারাপ মন্তব্য না করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব।²⁹ কেননা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
فَهَلْ أَنْتُمْ تَارِكُوا لِي صَاحِبِي.
“তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাহাবিকে (কষ্ট থেকে) অব্যাহতি দিবে?”³⁰
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهُ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ.
“তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি এক উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা দান করে, তবুও তা তাদের কারও এক মুদ (মধ্যম মাপের দু হাতের এক অঞ্জলি পরিমাণ) বা তার অর্ধেক পরিমাণ দানের সমপর্যায়ে পৌঁছবে না।”³¹
এরপর শাইখুল ইসলাম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
وَمَوَدَّةُ القُرْبَى بِهَا أَتَوَسِّلُ.
“আর নবিপরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করি।”
অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারকে ভালোবাসার অসিলায় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এবং আল্লাহর কাছে আশা করি, যেন তিনি আমার পাপ মোচন করে দেন এবং কেয়ামতের দিন আমাকে এমন সাহাবিবর্গ ও নবিপরিবারের প্রবেশস্থলে প্রবিষ্ট করেন, যাঁদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন।³²
মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى.
“(হে নবি,) আপনি বলে দিন, আমি এর বিনিময়ে (হেদায়েতের বাণী প্রচারের বিনিময়ে) তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদান চাই না; কেবল আত্মীয়ের প্রতি সৌহার্দ্য ব্যতীত।”³³
অর্থাৎ তোমাদের কাছ থেকে শুধু এটাই চাই যে, তোমরা আমার আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসবে এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে; আমার সাথে তাদের নিকটবর্তিতা ও সাহচর্য থাকার কারণে।
হাদিসে এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أنا خيار من خيار من خيار إن الله اختار العرب من بني آدم واختار كنانة من العربي واختار كريش من كنانة واختار بني هاشم من كريش واخترني من بني هاشم فأنا خيار من خيار من خيار.
“আমি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। নিশ্চয় আল্লাহ বনু আদমের মধ্য থেকে আরব জাতিকে চয়ন করেছেন। আরবদের মধ্য থেকে কিনানাকে চয়ন করেছেন, কিনান থেকে কুরাইশদেরকে চয়ন করেছেন, কুরাইশদের থেকে বনু হাশিমদেরকে চয়ন করেছেন, আর আমাকে চয়ন করেছেন বনু হাশিম গোত্র থেকে। সুতরাং আমি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”³⁴
মূলপাঠ :
وَلِكُلِّهِمْ قَدْرٌ عَلا وَفَضَائل ... لَكِنَّمَا الصِّدِّيقُ مِنْهُمْ أَفْضَلُ
আর তাঁদের (সাহাবিবর্গের) প্রত্যেকেরই সুউন্নত সম্মান ও মর্যাদা আছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন আস-সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
ব্যাখ্যা : এই কথার মাধ্যমে শাইখুল ইসলাম সাহাবিগণের মধ্যকার মর্যাদাগত তারতম্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন; যদিও তাঁদের সবাইকে ভালোবাসতে হবে। কারণ দলিলপ্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয়, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্য সাহাবিদের চেয়ে উত্তম, এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্য সাহাবিদের চেয়ে উত্তম। এরপরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তম, তারপরে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তম।³⁵
তারপরে উত্তম হলেন (একই সময়ে) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবিদের বাকি ছয়জন। তাঁরা হলেন- জুবাইর বিন আওয়্যাম, তালহা বিন উবাইদুল্লাহ, সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস, আব্দুর রহমান বিন আওফ, সায়িদ বিন জাইদ এবং আবু উবাইদা ইবনুল জারাহ।³⁶
এরপরে ইসলামের প্রতি অগ্রগামিতার দিক থেকে সকল সাহাবির মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য হয়েছে। এজন্য দুবার হিজরতকারী সাহাবিগণ অন্যান্য মুহাজির সাহাবির চেয়ে উত্তম।³⁷
অপরদিকে আকাবায় বায়াতকারী সাহাবিগণ অন্যান্য আনসার সাহাবির চেয়ে উত্তম। এরপর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিগণ উত্তম,³⁸ তারপর বাইআতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিগণ উত্তম।³⁹ তারপর যাঁরা হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে ইমান এনেছেন এবং হিজরত করেছেন। এরপর যাঁরা হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে ইমান এনেছেন এবং ইসলামের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন।⁴⁰ এরপর হলেন ছোটো সাহাবিগণ। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে সাহাবিগণের ক্রমধারা এমনই।
এই আলোচনায় শিয়া ও নাসিবি সম্প্রদায় থেকে অব্যাহতির ঘোষণা আছে। কেননা শিয়া সম্প্রদায় সাহাবিগণকে কাফির বলার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় করে না (সবাইকে কাফির বলে দেয়); কেবল আলি বিন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং সামান্য কয়েকজন সাহাবি ব্যতীত, যাঁদের সংখ্যা চোদ্দো বা পনেরো অতিক্রম করবে না (অর্থাৎ চোদ্দো বা পনেরোজন ছাড়া সকল সাহাবিকে কাফির ফতোয়া দেয় তারা)। পক্ষান্তরে নাসিবি সম্প্রদায় (শিয়াদের বিপরীত করতে গিয়ে) সাহাবিবর্গের সাথে মিত্রতা বজায় রাখে এবং নবিপরিবারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। উভয় ফের্কাই পথভ্রষ্টতার ওপরে রয়েছে। এক্ষেত্রে হক কথা হলো- আমরা তাঁদের সবার সাথে মিত্রতা বজায় রাখি, তাঁদেরকে ভালোবাসি এবং আল্লাহ তাঁদের জন্য যেই মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন, আমরা তাঁদেরকে সেই মর্যাদা প্রদান করি।

টিকাঃ
২২ যারা নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন তাঁদেরকে মুহাজির বলা হয়। আর মদিনার স্থানীয় মুসলিমদের বলা হয় আনসার, যাঁরা হিজরত করে আসা মুহাজির সাহাবিদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন সর্বতোভাবে। – অনুবাদক।
২৩ সুরা হাশর : ১০।
২৪ সুরা ফাতহ : ২৯।
২৫ সুরা ফাতহ : ১৮।
২৬ সুরা তাওবা : ১০০।
২৭ অনুবাদকের টীকা: যাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, তাঁরা তিনজন সাহাবি ছিলেন; কাব বিন মালিক, মুরারা বিন রাবি ও হিলাল বিন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাঁরা তিনজনই ছিলেন মুখলিস সাহাবি। তাবুক যুদ্ধে অবহেলাবশত তাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শরিক হননি। পরে তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন ও ভাবেন, জিহাদে শরিক না হয়ে পিছিয়ে থাকার একটি অপরাধ করেছি, কিন্তু পুনরায় মুনাফিকদের মতো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আরেকটি অপরাধ আমরা করব না। ফলে তাঁরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন এবং অপরাধের শাস্তির জন্য নিজেদেরকে পেশ করেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বিষয় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দেন, যেন আল্লাহ তাঁদের বিষয়ে কোনো ফয়সালা করেন। এরপরেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিগণকে উক্ত তিন সাহাবির সাথে কোনো সামাজিক সম্পর্ক রাখতে, এমনকি কথাবার্তা বলতেও নিষেধ করে দেন এবং চল্লিশ দিন পর তাঁদেরকে নিজ নিজ স্ত্রী থেকেও পৃথক থাকার আদেশ দেন। সুতরাং তাই করা হয়। আরও দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, মোট পঞ্চাশ দিন পর তাঁদের তওবা কবুল করা হয় এবং আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়। বিস্তারিত ঘটনা জানতে দেখুন : সহিহুল বুখারি, হা. ৪৪১৮। টীকা সমাপ্ত।
২৮ সুরা তাওবা : ১১৭-১১৮।
২৯ অনুবাদকের টীকা : সালাফদের যুগের বিশিষ্ট ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৪১ হি.) বলেছেন, ومن انتقص أحدا من أَصْحَابِ رَسُول الله ﷺ أَو بغضه بِحَدَث مِنْهُ أو ذكر مساويه كَانَ مبتدعا حَتَّى يترحم عَلَيْهِم جَمِيعًا ويكون قلبه لهم سليما. “যে ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো একজন সাহাবিরও মর্যাদাহানি করে, কিংবা সাহাবি কর্তৃক সংঘটিত কোনো ঘটনার কারণে তাঁকে অপছন্দ করে, অথবা তাঁর দোষত্রুটি আলোচনা করে, সে ব্যক্তি বিদাতি হয়ে যায়; যতক্ষণ না সে সকল সাহাবির জন্য রহমতের দোয়া করছে এবং তাঁদের সবার ব্যাপারে তার অন্তর প্রশান্ত হচ্ছে (ততক্ষণ পর্যন্ত সে বিদাতি হিসেবে বিবেচিত হবে)।” দ্রষ্টব্য : আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানি, উসুলুস সুন্নাহ (আল-খার্জ : দারুল মানার, ১ম প্রকাশ, ১৪১১ হি.), পৃ. ৫৪। টীকা সমাপ্ত।
৩০ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৬১।
৩১ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, হা. ২৫৪০।
৩২ অনুবাদকের টীকা: কোনো কিছুকে অসিলা বা মাধ্যম সাব্যস্ত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা নিঃশর্তভাবে বৈধ নয়। বরং কিছু বিষয়কে অসিলা গণ্য করা বৈধ, আবার কিছু বিষয়কে অসিলা গণ্য করা অবৈধ। প্রধানত তিনটি বিষয়কে অসিলা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা শরিয়তসম্মত। যথা: ১. মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলির অসিলায় দোয়া করা। দলিল : সুরা আরাফ : ১৮০; সুরা নামল : ১৯। ২. নিজে কোনো ভালো আমল করলে, সেই ভালো আমলের অসিলায় দোয়া করা। দলিল : সুরা আলে ইমরান : ১৬, ৫৩, ১৯৩-১৯৪; সহিহুল বুখারি, হা. ২২৭২; সহিহ মুসলিম, হা. ২৭৪৩। ৩. সৎব্যক্তির দোয়ার অসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করা। দলিল : সহিহুল বুখারি, হা. ১০১০। এই তিনটি বিষয়ের অসিলায় দোয়া করতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এগুলো ব্যতীত অন্যকিছুকে অসিলা করা-হয় শির্ক কিংবা বিদাত, আর নয়তো সেগুলো মতভেদপূর্ণ, যেসবের সিদ্ধতা নিয়ে সুন্নাহপন্থি উলামাগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, আত-তাওয়াসসুল আনওয়াউহু ওয়া আহকামুহ, তাহকিক : মুহাম্মাদ ইদ আল-আব্বাসি (রিয়াদ : দারুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.), পৃ. ২৯-৪২। শাইখুল ইসলাম 'লামিয়্যা' কবিতায় জানিয়েছেন, নবিপরিবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে অসিলা করে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এটা ভালো আমলকে অসিলা করে দোয়া করার অন্তর্ভুক্ত; যা বিলকুল শরিয়তসম্মত। টীকা সমাপ্ত।
৩৩ সুরা শুরা : ২৩।
৩৪ অনুবাদকের টীকা : কাছাকাছি শব্দে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আত-তাবারানি, আল-উকাইলি, ইবনু আদি, আবু নুআইম, হাকিম-সহ আরও অনেকে। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফা ওয়াল মাওদুআ ওয়া আসারুহাস সাইয়্যিউ ফিল উম্মাহ (রিয়াদ : দারুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৪১২ হি./১৯৯২ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫১২, হা. ৩৩৮। হাদিসটির বর্ণনাগত মান প্রসঙ্গে ইমাম আলবানি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৪২০ হি.) বলেছেন, “এ হাদিসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল।... জ্ঞাতব্য যে, হাদিসের শেষাংশে আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে; যা বিশুদ্ধ হাদিসগুলোতে সুসাব্যস্ত হয়েছে।” দ্রষ্টব্য : আল-আলবানি, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দয়িফা, খ. ১, পৃ. ৫১২-৫১৩। যেমন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ. “নিশ্চয় আল্লাহ ইসমাইলের বংশধর থেকে কিনানাকে চয়ন করেছেন, কিনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করেছেন, আর কুরাইশ থেকে বনু হাশিমকে বাছাই করেছেন এবং বনু হাশিম থেকে আমাকে চয়ন করেছেন।” দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিম, হা. ২২৭৬, মর্যাদা অধ্যায়, অধ্যায় নং : ৪৪, পরিচ্ছেদ : ১। টীকা সমাপ্ত।
৩৫ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৬৫৫, ৩৬৭১।
৩৬ তিরমিজি, হা. ৩৭৪৭, বর্ণনার মান : সহিহ; সদরুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আলাউদ্দিন ইবনু আবিল ইজ, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, তাহকিক : শুয়াইব আল-আরনাউত ও আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালা, ১০ম প্রকাশ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৭৩৩।
৩৭ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৭৭৯।
৩৮ সহিহুল বুখারি, হা. ৩৯৯২।
৩৯ আবু দাউদ, হা. ৪৬৫৩, বর্ণনার মান : সহিহ।
৪০ সুরা হাদিদ : ১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00