📘 আকীদার মানদণ্ডে তাবীজ > 📄 তাবীজের সংজ্ঞা

📄 তাবীজের সংজ্ঞা


লেসান নামক অভিধানে বলা হয়েছে- তামীম অর্থ হচ্ছে তাবীজ (রক্ষা কবজ) শব্দটির একবচন তামীমা। আবু মনসুর বলেছেন, তামীম দ্বারা তাবীজ বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এমনিভাবে বলা যায় যে, বিষধর সাপ ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য যে পূতি জাতীয় তাবীজ সূতায় গেঁথে গলায় বেঁধে দেয়া হয়, তাকেই তামায়েম কিংবা তামীমা অর্থাৎ তাবীজ বলা হয়।
ইবনে জোনাই রহ. থেকে বর্ণিত অনেকের মতে তাবীজ হচ্ছে ঐ জিনিস, যা তাগায় বেঁধে লটকানো হয়। সা'আলব রহ. থেকে বর্ণিত আছে- আরবরা বলে تممت المولود এর অর্থ হল- আমি শিশুর গলায় তাবীজ ঝুলিয়ে দিয়েছি। এক কথায় বলা যায় যে, মানুষের গলায় বা অন্যান্য অঙ্গে বিপদাপদ থেকে বাঁচার জন্য যেসব তাবীজ ধারণ করা হয়, সেগুলিকেই তামীমা বলা হয়।
ইবনে বরী বলেন- কবি সালমা বিন খরশবের নিম্ন বর্ণিত কবিতায় “তামীমা” এর অর্থই গৃহীত হয়েছে। কবি বলেন:
تعوذ بالرقي من غير خبل
وتعقد في قلائدها التميم
অর্থাৎ ঝাড়-ফুঁক এবং তাবীজ তুমারের মাধ্যমে নিশ্চিন্তে বিপদে থেকে আশ্রয় গ্রহণ করবে। আর তার গলায় তাবীজ বেঁধে দেবে। আবু মনসুর বলেছেন, التمائم একবচন হচ্ছে تميمة আর তমীমা হল, দানা জাতীয় তাবীজ। বেদুঈনরা বদ নজর থেকে হিফাজতে থাকার জন্য এ ধরনের তাবীজ তাদের শিশুদের এবং তাদের সন্তানদের গলায় লটকিয়ে দিত। ইসলাম তাদের এরকম কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা বাতিল করে দেয়।
হাজলী তার নিম্ন-বর্ণিত কবিতা থেকে এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন:
وإذا المنية أنشبت أظفارها أنفيت كل تميمة لا تنفع
অর্থাৎ- সে মৃত্যুবরণ করলে, মৃত্যুর পর মুজায়্যেনা (একটি গোত্রের নাম) তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর ব্যাপারে সফল হবে না। সুতরাং, হে মুজায়্যেন! তার উপর তাবীজ ঝুলিয়ে দাও। আল্লামা ইবনে হাজার বলেন, التمائم হল تميمة এর বহুবচন। আর তা হচ্ছে তাবীজ বা হাড় যা মাথায় লটকানো হয়। জাহেলী যুগে মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, তাবীজ দ্বারা বিপদ আপদ দুর হয়ে যায়।
ইবনুল আসীর বলেছেন التمائم শব্দটি বহুবচন, এর এক বচন হল تميمة অর্থ- তাবীজ। আরবরা শিশুদের গলায় তাবীজ লটকাত, যাতে বদ নজর না লাগে। ওটাই তাদের আকীদাহ্। অতঃপর ইসলাম তাদের এই আকীদাকে ভ্রান্ত বলে ঘোষণা করেছে। ইবনে উমরের রহ. হাদীসে এসেছে- তুমি যে 'আমল করেছে, আমি তার কোন পরোয়াই করি না (অর্থাৎ তার কোন মূল্যই নেই) যদি তুমি তাবীজ লটকাও। অন্য এক হাদীসে এসেছে, যে তাবীজ ব্যবহার করে, আল্লাহ তার কোন কিছুই পূর্ণ করবেন না। (কারণ সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাবীযের উপর ভরসা করেছে) বস্তুত: আইয়ামে জাহেলিয়া তথা জাহেলী যুগে মানুষের ধারণা ছিল, তাবীজ হচ্ছে রোগমুক্তি ও চিকিৎসার পরিপূর্ণতা। তাবীজ ব্যবহার করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবার কারণ হচ্ছে এই যে, এতে লিখিত তাক্বদীরকে উপেক্ষা করার ইচ্ছা থাকে। এবং আল্লাহ একমাত্র তাক্বদীরের নিয়ন্ত্রণকারী, অথচ তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের মাধ্যমে ক্ষতি ও দুঃখ কষ্ট দুর করার চেষ্টা করা হয়। এর উপরোল্লিখিত আভিধানিক সংজ্ঞাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে এই যে, এতে লিখিত তাক্বদীরকে উপেক্ষা করার ইচ্ছা থাকে। এবং আল্লাহ একমাত্র তাক্বদীরের নিয়ন্ত্রণকারী, অথচ তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের মাধ্যমে ক্ষতি ও দুঃখ কষ্ট দুর করার চেষ্টা করা হয়। এর উপরোল্লিখিত আভিধানিক সংজ্ঞাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তাবীজ দুই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। প্রথমত: ঐ সমস্ত রোগ-ব্যাধি এবং বদ নজর থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে, যা এখনও সংঘটিত হয়নি। শিশুর গলায়, ঘোড়ার ঘাড়ে এবং ঘর-বাড়িতে যে সকল তাবীজ ঝোলানো হয়, সেগুলিতে উক্ত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। দ্বিতীয়ত: যে বিপদ এসে গেছে, তা থেকে উদ্ধার পাবার জন্য রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা যে তাবীজ ব্যবহার করে, তার উদ্দেশও স্পষ্ট। ইনশাআল্লাহ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে।
উল্লেখ্য যে, “বিষধর সাপ থেকে বাঁচার জন্য যে তাবীজ নেয়া হয়, তাকে তামীমা বলে।” এ ধরনের সংজ্ঞা দ্বারা নির্দিষ্ট অর্থ বুঝা গেলেও মূলত: তামিমা শুধু ওতেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, আরবরা خرز (দানা জাতীয় তাবীজ) ব্যতীত অন্যান্য তাবীজও ব্যবহার করত। যেমন, তারা খরগোশের হাড় তাবীজ হিসাবে ব্যবহার করত, আর এর দ্বারা তারা মনে করত, বদ নজর ও যাদু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুতরাং, তাদেরকে এটা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে- ঘোড়ার ঘাড়ে লটকানো ধনুকের ছিলাসমূহ ছিঁড়ে ফেলার জন্য রাসূল সা. আদেশ করেছেন। মোদ্দা কথা, উপরোল্লিখিত উদ্দেশ্য দ্বয়ের জন্য যা কিছুই ব্যবহার করা হোক না কেন, সেটাই হচ্ছে তামিমা তথা তাবীজ। সেটা حرز হোক বা কাঠ জাতীয় বস্তু হোক। সেটা ঘাস বা পাতা হোক, অথবা খনিজ জাতীয় পদার্থ হোক, অর্থাৎ তাবীজ বস্তুটি যাই হোক না কেন, তা মন্দ থেকে হিফাযতে থাকার জন্য অথবা মন্দকে দুর করার জন্য ব্যবহার করা হলে تميمة এর অন্তর্ভুক্ত হবে, অর্থাৎ সেটা শিরক হবে। কারণ, বস্তুর সত্তা এবং উদ্দেশ্যটাই বিবেচ্য হয়, তার নাম যাই দেয়া হোক না কেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মদের মূল কাজ হচ্ছে মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি আচ্ছন্ন করা। অতএব, যে সকল বস্তু পান বা ভক্ষণ করলে বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে যায়, সেগুলিই মদ। মদ হবার জন্য আঙ্গুর থেকে তৈরি হতে হবে, এমন কোন শর্ত নেই। আর তাবীযের ব্যাপারটিও তাই। এখানে কোন নির্দিষ্টতা নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00