📘 আকীদার মানদণ্ডে তাবীজ > 📄 তাবীজ ব্যবহার করা ছোট শিরক কি না বড় শিরক

📄 তাবীজ ব্যবহার করা ছোট শিরক কি না বড় শিরক


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
তাবীজ ব্যবহার করা কি বড় শিরক, না ছোট শিরক?
তাবীজ ব্যবহার করা কোন ধরনের শিরক, এ সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে তাবীযের হাক্কীকত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করাকে বেশি সংগত মনে করছি। অতএব, আল্লাহর নিকট তাওফীক চেয়ে বলছি:
আল্লাহর সাথে শিরক করার অর্থ হল: বান্দা কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে, তার নিকট প্রার্থনা করা, কোন কিছু আশা করা, তাকে ভয় করা, তার উপর ভরসা করা, কিংবা তার নিকট এমন বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করা যায় সমাধান আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারে না, অথবা তার নিকট মীমাংসা চাওয়া, অথবা আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার আনুগত্য করা, অথবা তার কাছ থেকে শরীয়তের বিধান গ্রহণ করা কিংবা তার জন্য (বা তার নামে) যবাই করা, অথবা তার নামে মানত করা, অথবা তাকে এতটুকু ভালোবাসা যতটুকু আল্লাহকে ভালোবাসা উচিত। সুতরাং, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সকল কথা, কাজ ও বিশ্বাসকে ওয়াজিব বা মোস্তাহাব রূপে নির্ধারণ করেছেন, সেগুলির সব কিংবা কোন একটি গায়রূল্লাহ্ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্য করাই হল শিরক। এ সম্পর্কে শায়খ ইবনে কাইয়ূম র. যা বলেছেন, তার সারমর্ম নিম্নরূপ:
আল্লাহপাক তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন এবং আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানব জাতি তাঁর পরিচয় লাভ করতে পারে, তাঁর ইবাদত করে এবং তাঁর একত্ববাদের স্বীকৃতি দিতে থাকে এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁর বিধানই যেন বাস্তবায়িত হয়ে যায়। সকল আনুগত্য তাঁর জন্যই নির্ধারিত হয়ে যায় এবং সমস্ত প্রার্থনা যেন তাঁর উদ্দেশ্যই হয়।
জেনে রাখা প্রয়োজন যে, শিরক দুই প্রকার। প্রথমত: যা আল্লাহর জাত (সত্তা), নাম ও গুণাবলির সাথে সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয়ত: যা তাঁর ইবাদত মুয়ামালাতের সাথে সম্পৃক্ত, যদিও শিরকে লিপ্ত বান্দা মনে মনে এই ধারণা পোষণ করে যে, আল্লাহর জাত, গুণাবলি ও কাজে কোন শরীক বা অংশীদার নেই। প্রথমোক্ত শিরক আবার দুই প্রকার যেমন:
১। শিক্রুত ত্বাতীল
এটাই হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য শিরক। ফিরআউনের শিরক এই প্রকারের একটি দৃষ্টান্ত। উহা আবার তিন প্রকার। প্রথমত: সৃষ্টিকে তার স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর নাম, গুণাবলি ও কার্যাবলীকে অস্বীকার করে মহান স্রষ্টাকে তাঁর পরিপূর্ণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তৃতীয়ত: আল্লাহর সাথে মুয়ামালাত বা কার্যাবলীর মাধ্যমে অস্বীকার করা, যেগুলি আল্লাহর একত্ববাদে বান্দার উপর স্বীকৃতি দেয়া ওয়াজিব।
২। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ইলাহ বা মা'বুদ সাব্যস্ত করা
মূলত: শিরক হচ্ছে সৃষ্টি ও স্রষ্টা হওয়ার জন্য যেসব গুণাবলি দরকার, সেগুলির ক্ষেত্রে কোন লোক সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা বা সাদৃশ্যপূর্ণ করলে, সে মুশরিক হয়ে যাবে। ক্ষতি করা, উপকার করা, দান করা ও দান না করার একক অধিকারী হওয়া ইলাহীর বৈশিষ্ট্য, তথা আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত। আর এ সব গুণাবলির একক অধিকারী হওয়ার কারণে প্রার্থনা করা ভয় করা, কোন কিছুর আশা করা এবং ভরসা করা কেবলমাত্র তাঁর সাথেই সম্পৃক্ত হতে পারে। সুতরাং, যদি কোন ব্যক্তি এসব গুণকে কোন মাখলুক বা সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত করে, তা হলে সে যেন সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে শরীক করল। আর দুর্বল, নিঃস্ব কোন কিছুকে ক্ষমতাবান, স্বাবলম্বী, স্বয়ং সম্পূর্ণ সত্তার সাথে তুলনা করা খুবই নিকৃষ্ট মানের তুলনা। যে আল্লাহর সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব জাহির করে এবং তার প্রশংসা করার জন্য, তাকে সম্মান জন্য তার কাছে অবনত হওয়া ও আশা করার জন্য মানুষকে আহ্বান করে, তাহলে ঐ ভয় করা, আশা করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, সাহায্য চাওয়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে মানুষের অন্তরকে তার সাথে সম্পৃক্ত করার কারণে নিশ্চয়ই সে আল্লাহর একত্ববাদ ও প্রভুত্বের ক্ষেত্রে সংঘর্ষে লিপ্ত হল। শিরক হর আল্লাহর প্রতি অতি নিকৃষ্ট একটি ধারণা। সুতরাং, আল্লাহ এবং তাঁর সৃষ্টির মধ্যে কোন প্রকার মাধ্যম দাঁড় করানো, তাঁর প্রভুত্ব, রবুবিয়ত ও একত্ববাদের প্রতি চরম আঘাত এবং তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করার শামিল। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এরূপ ধারণা করাকে কিছুতেই অনুমোদন করেন না। আর স্বাভাবিক জ্ঞান ও নিষ্কলুষ প্রকৃতিও উহাকে পরিত্যাগ করে এবং সুস্থ প্রকৃতি ও উন্নত স্বভাবের নিকট এটা সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় বলে বিবেচিত। শায়খ মোবারক ইবনে মাইলী বলেছেন- আল্লাহ ওয়া জাল্লা জালালুহু সর্ব প্রকার শিরক এক সাথে উল্লেখ করে বলেন: قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنْ ظَهِيرٍ ﴿۲۲﴾ وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ (سباء ۲۲-۲۳) অর্থাৎ বল: তোমরা আহ্বান কর তাদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্য মনে করতে। তারা আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও মালিক নয় এবং এত-দু-ভয়ে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের কেউ তাঁর সহায়কও নয়। যাকে অনুমতি দেয়া হয়, সে ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। (সুরা সাবা ২২ও ২৩ আয়াত) এ থেকে বুঝা গেল যে, উপরোক্ত আয়াতে শিরককে চার ভাগে শ্রেণি বিভাগ করত: প্রত্যেক শিরককে বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখন আমরা প্রত্যেক প্রকারের জন্য এমন নাম নির্ধারণ করব, যাতে একটি অপটি হতে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে যায়। شرك الاحتياز (শিরকুল ইহতিয়াজ) অর্থাৎ মালিকানার শিরক। আসমান ও জমিনের মধ্যে অনু পরিমাণ বস্তুর উপরও অন্য কারো মালিকানাকে আল্লাহ বারী তাআলা অস্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত: شرك الشياع (শিরকুশ শি'য়া) অর্থাৎ অংশীদারিত্বের শিরক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্বীয় রাজত্ব ও মর্যাদার ক্ষেত্রে অপরের সব ধরনের অংশীদারিত্বকে অস্বীকার করেছেন। তৃতীয়ত: شرك الاعانة (শিরকুল ইয়ানা) অর্থাৎ সাহায্য সহযোগিতার শিরক। আল্লাহ তাআলা তাঁর কাজে অন্য কারো সাহায্যকারী হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। যেমন, কোন ব্যক্তি বোঝা উঠিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অন্যকে সাহায্য করে। চতুর্থত: شرك الشفاعة (শিরকুশ শাফাআত) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এমন কারো অস্তিত্বকেও অস্বীকার করেছেন, যে তার মর্যাদার বলে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সুপারিশ করে কাউকে মুক্ত করতে পারে। অর্থাৎ, আল্লাহ কোন প্রকার শিরকই পছন্দ করেন না, তা যত দুর্বল ও সূক্ষ্মই হোক না কেন। তবে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে বিনম্র ভাবে অনুমতি লাভ করে সুপারিশ করতো শিরক হবে না। উল্লেখিত আয়াতে সব ধরনের শিরকের কথাই বলা হয়েছে। কেননা, শিরক হবে হয় প্রভুত্বের ক্ষেত্রে, নতুবা কার্যকলাপের মাধ্যমে। আবার প্রথম প্রকারের শিরক হয় আল্লাহর অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে নিজ অধিকারভুক্ত করে নিবে, অথবা তার অংশ যৌথভাবে বহাল থাকবে। এমনিভাবে দ্বিতীয় প্রকারের শিরক প্রভুর জন্য সাহায্যকারী হবে, অথবা প্রভুর নিকট অন্য কারো জন্য সাহায্যকারী হবে। এই চার প্রকার শিরকের কথাই উক্ত আয়াতে ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। উক্ত আয়াতের অনুসরণে শিরকের প্রকার সমূহের এরূপ আলোচনা আল্লামা ইবনুল কাইউম র. ব্যতীত, আমার জানা মতে অন্য কেই করেননি। ইবনুল কাইউম রা. এই চারটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা ঐ সকল মাধ্যমকে, মুশরিকরা যেগুলি অবলম্বন করেছিল, সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন করে দিয়েছেন। বস্তুত: যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে অভিভাবক অথবা সুপারিশকারী হিসাবে গ্রহণ করেছে, তার দৃষ্টান্ত হল মাকড়সার ঘর বানানোর ন্যায়, আর মাকড়সার ঘর হচ্ছে সব চেয়ে দুর্বল ঘর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنْ ظَهِيرٍ ﴿۲۲﴾ وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ (سباء ۲۲-۲۳) অর্থাৎ বল: তোমরা আহ্বান কর তাদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্য মনে করতে। তারা আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর অনু পরিমাণও মালিক নয় এবং এত দু ভয়ে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের কেউ তাঁর সহায়কও নয়। যাকে অনুমতি দেয়া হয়, সে ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। (সুরা সাবা ২২ও ২৩ আয়াত) মুশরিকরা যখন কারো নিকট থেকে কোন প্রকার উপকার পাওয়ার আশা করে কেবল তখনই সে তাকে মা'বুদ বা উপাস্য রূপে গ্রহণ করে নেয়। আর বলা বাহুল্য যে, উপকার একমাত্র তার কাছ থেকেই পাওয়া যায়, যার মধ্যে এই চারটি গুণের একটি হলেও বিদ্যমান আছে। গুণগুলি হল: (১) উপাসনাকারী যে জিনিসের আশা করে তার মালিক হওয়া। (২) মালিক না হলে, মালিকের অংশীদার হওয়া। (৩) অংশীদারও না হলে, সে জিনিসের ব্যাপারে মালিকের সাহায্যকারী হওয়া এবং (৪) সাহায্যকারীও না হলে, অন্তত: পক্ষে মালিকের কাছে কারো সম্পর্কে সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখা। সুতরাং, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উক্ত আয়াতে শিরকের এই চারটি স্তরকে ধারাবাহিক ভাবে অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ, আল্লাহ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও রাজত্বে অন্য কারো মালিকানা, অংশীদারিত্ব, সাহায্য সহায়তা এবং তাঁর কাছে সুপারিশের ক্ষমতা বিন্দুমাত্রও নেই। তবে, আল্লাহ যে সুপারিশ সাব্যস্ত করেছেন, সেটা তাঁর অনুমতিক্রমে হয় বলে তাতে মুশরিকদের জন্য কোন অংশ বা সুবিধা নেই। শায়খ মাইলী র. সম্ভবত: আল্লামা ইবনুল কাইয়ূমের রা. এই উক্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তদুপরি তার উক্তি উবনুল কাইয়ূমের উক্তির প্রায় কাছাকাছি। এতে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের অভিন্ন মতের পাওয়া যায়। আবার আবুল বাকা যুফী র. তার কুল্লিয়াত নামক কিতাবে শিরককে ছয় ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা:
১। شرك الاستقلال (শিরকুল ইসতিকলাল) দুজন ভিন্ন ভিন্ন শরীক সাব্যস্ত করাকে শিরকুল ইসতিকলাল বলা হয়। যেমন, মূর্তি পূজা করা করে থাকে।
২। شرك التبعيض (শিরকুত তাবঈদ) একাধিক মা'বুদের সমন্বয়ে এক মা'বুদ হওয়ার বিশ্বাসকে শিরকুত তাবঈদ বলা হয়। যেমন, নাছারাদের শিরক।
৩। شرك التقرير (শিরকুত তাকরীর) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা'বুদের ইবাদত করা যাতে তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে তাকে সহায়তা করে। যেমন, প্রাচীনকালের লোকদের শিরক অর্থাৎ জাহেলী যুগের শিরক।
৪। شرك التقليد (শিরকুত তাকলীদ) অন্যদের অনুসরণ করে গাইরুল্লাহর ইবাদত করাকে শিরকুত তাকলীদ বলা হয়। যেমন, জাহেলী মধ্য যুগের শিরক।
৫। شرك الاسباب (শিরকুল আসবাব্‌) ক্রিয়ার প্রভাবকে সাধারণ মাধ্যম সমূহের সাথে সার্বিক ভাবে সম্পৃক্ত করাকে শিরকুল আসবাব্ বলা হয়। যেমন, দার্শনিক, জড়বাদী এবং তাদের অনুসারীদের শিরক।
৬। شرك الاغراض (শিরকুল আগরাদ) গাইরুল্লাহর জন্য কোন কাজ করাকেই শিরকুল আগরাদ বলা হয়। লেখক বলেন, আমার মতে এখানে অনেক ধরনের শিরক আছে যেগুলি আল্লামা কাফাবী র. স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেননি। তবে, সেগুলি তাঁর নির্দেশিত মৌলনীতির আওতায় এসে যায়। যথা: শিরকুত তা'আও অর্থাৎ ইবাদতের শিরক। এটা শিরকের ক্ষেত্রে মৌলনীতি। এই মৌলনীতির আওতায় অনেক প্রকার শিরক এসে যায়। যেমন: ইয়াহুদী এবং নাছারাদের শিরক। তারা আল্লাহর তোয়াক্কা না করে হালাল-হারামের উৎস মনে করে তাদের ধর্ম যাজকদেরকে। এরূপ হারামকে হালাল মনে করার শিরক, আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার শিরক, আল্লাহর বিধান অস্বীকার করার শিরক, মুনাফিকীর শিরক এবং গাইরুল্লাহকে ভালবাসার শিরক। এ সকল শিরক, মনোবৃত্তি, মনোবাসনা, কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানের ইবাদত করায় যে শিরক হয়, তার আওতায় এসে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ الجاثية ٢٣ অর্থাৎ তুমি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছ, যে তার খেয়াল-খুশিতে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে-শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। তার কান ও অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তা ভাবনা করো না। (সুরা জাসিয়া, ২৩ আয়াত) অন্যত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ يس ٦٠ অর্থাৎ হে আদম, সন্তান! আমি কি তোমাদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সূরা য়াসীন ৬০ আয়াত শিরক দুই প্রকার। যথা: আকবর অর্থাৎ বড় শিরক এবং আছগর অর্থাৎ শেরক দুই প্রকার। যথা: আকবর অর্থাৎ বড় শিরক এবং আছগর অর্থাৎ ছোট শিরক। দুনিয়া এবং আখেরাতের দিক দিয়ে এই দুই প্রকার শিরকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন- বড় শিরকে যে ব্যক্তি লিপ্ত হবে তাকে দুনিয়াতে ধর্ম বিচ্যুতির দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে এবং তার যাবতীয় আদান প্রদান ও লেন-দেনের ব্যাপারে মূরতাদের (ধর্ম বিচ্যুত লোক) বিধি বিধান প্রযোজ্য হবে। ফিকাহ শাস্ত্রের কিতাবসমূহে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন: وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا ﴿الفرقان ۲۳﴾ অর্থাৎ আর আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনা রূপ করে দেব। (সূরা ফুরকান, ২৩ আয়াত।)
আর আখিরাতে তার শাস্তি হচ্ছে, সে চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। কারণ, শিরকের অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করেন না। আল্লাহ ওয়া জাল্লা শানুহু কুর'আনে এরশাদ করেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴿٤٨ النساء অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, ইহা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সূরা নিসা ৪৮ আয়াত।)
তবে শিরকে আছগর তথা ছোট শিরক জঘন্য হলেও, তার হুকুম বড় শিরক থেকে ভিন্নতর। ছাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে বর্ণিত আছে, ছোট শিরক হচ্ছে কবিরা গুনাহ সমূহের মধ্যে সর্বাধিক জঘন্য। তবে হ্যাঁ, এটা জঘন্য হলেও বড় শিরকের সমকক্ষ নয়। তার চেয়ে অনেক নিম্নে। এখন কথা হচ্ছে, আমরা কীভাবে উভয় শিরকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করব এবং সহজেই এই ফয়সালা করতে পারব যে, তাবীজ ব্যবহার কোন ধরনের শিরক? উল্লেখ্য যে, ছোট শিরক ও বড় শিরকের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য অনেক নীতিমালা রয়েছে। যেমন:
১। বাক্যের শব্দাবলিতে শিরকী অর্থ বিদ্যমান, কিন্তু উক্তিকারী বাক্য দ্বারা গাইরুল্লাহর জন্য কোন প্রকার ইবাদত সম্পাদনের উদ্দেশ্যে করেনি। এমতাবস্থায়, এ ধরনের বাক্য উচ্চারণ তথা ব্যবহার করা হবে ছোট শিরক। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. এমন এক ব্যক্তিকে লক্ষ করে এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রাসূলকে সা. বলেছেন: لمن قال له ماشاءالله وشئت قال أجعلتني الله ندا بل ماشاءالله وحده (أحمد) অর্থাৎ (আল্লাহ এবং আপনি যা ইচ্ছা করেছেন) রাসূল সা. বলেছেন: তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বলে ফেললে? এ ভাবে না বলে তোমার উচিত শুধু আল্লাহ যা চেয়েছেন বলা। (আহমদ) অন্য একটি হাদীসে এসেছে- لا تقولوا ما شاء الله وشاء فلان ولكن قولوا ما شاء الله ثم شاء فلان (أحمد) অর্থাৎ রাসূল সা. এরশাদ করেছেন: তোমরা এ রকম কথা বলো না, আল্লাহ এবং অমুক লোক যা ইচ্ছা করেছেন, বরং বলবে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন, অতঃপর অমুক যা ইচ্ছা করেছেন'। (মুসনাদে আহমদ) ছাহাবায়ে কেরামগণ রা. বলেছেন: শব্দ বা বাক্যের শিরক হচ্ছে অপ্রকাশ্য শিরক এবং ওটা ছোট শিরক। فَلَا تَجْعَلُوا للَّهَ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿البقرة ٢٢﴾ অর্থাৎ জেনে শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করো না। (সুরা বাকারাহ, ২২ আয়াত) এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: আন্দাদ অর্থ হচ্ছে এমন শিরক, যা রাতের অন্ধকারে মসৃণ কালো পাথরের উপর পিঁপড়ার চলাচলের চেয়েও অধিক গোপন। এই শিরকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেমন তুমি কাউকে বলে বসলে যে, হে অমুক! আল্লাহ এবং তোমার জীবনের শপথ, অথবা বলল: এই কুকুর না হলে আমাদের ঘরে চোর প্রবেশ করত, এই হাঁস বাড়িতে না থাকলে ঘরে চোর আসত, কিংবা একজন আর একজনকে বলল, আল্লাহ এবং আপনার ইচ্ছায়'। এভাবে কেউ বলল, আল্লাহ এবং অমুক না হলে সে কিছুই করতে পারত না' এ ধরনের সব কথাই হচ্ছে শিরক। অনুরূপভাবে উক্ত আয়াতের তাফসীরে আকরামা রা. বলেছেন, তার উদাহরণ হল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর নাম নিয়ে শপথ করা। রাসূল সা. বলেছেন: من حلف بغير الله فقد كفر أو أشرك (أحمد) অর্থাৎ যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর শপথ করল, সে কাফির হয়ে গেল অথবা মুশরিক হয়ে গেল। (আহমদ) এই হাদীসে শিরক বা কুফর দ্বারা ছোট শিরক বুঝানোই উদ্দেশ্য, যেমন ইবনে আব্বাসের রা. হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যা আগে উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে কাউকে গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাস বানানো, যথা: আব্দুল হাসান (হাসানের গোলাম), আব্দুল হোসাইন (হোসাইনের গোলাম), গোলাম রাসূল (রাসূলের গোলাম) ইত্যাদি। এ ধরনের নাম রেখে গাইরুল্লাহর সাথে দাসত্বের সম্পর্ক করাও শিরক।
২। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শিরক বিদ্যমান থাকা (অর্থাৎ ব্যক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরুপে শিরকী ভাবধারায় প্রভাবিত হওয়া) যেমন, এমন কোন লোক ভাল ও পুণ্য কাজ করল, যার অন্তরে ঈমান নেই অথবা শুধু পার্থিব স্বার্থ এবং ইহকালীন জীবনের লক্ষেই কেউ তার কর্ম তৎপরতা পরিচালিত করে। এরূপ অবস্থায় এটা হবে বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহপাক পবিত্র কালামে এরশাদ করেন: مَنْ كَانَ يُرِيدُ الحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالُهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ ﴿١٥﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿هود ١٦﴾ অর্থাৎ যদি কেউ পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করে, তাহলে দুনিয়ায় আমি তাদের কর্মের ফল দান করি এবং সেথায় তাদের কম দেয়া হবে না, তাদের জন্য পরকালে অগ্নি ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে, আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক। (সূরা হুদ ১৫ ও ১৬ আয়াত) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছোট শিরকও বিদ্যমান থাকতে পারে। যথা: কোন মুসল্লী তার ছালাতকে এ জন্যই ঠিক মত এবং সুন্দর ভাবে আদায় করছে যে, তাকে কোন লোক লক্ষ্য করে দেখছে। রাসূল সা. বলেছেন: এরূপ করা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। হাদীছ শরীফে এসেছে: জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূল সা. বের হলেন, অতঃপর বললেন: أيها الناس إياكم و شرك السرائر قالوا يا رسول الله ما شرك السرائر قال يقوم الرجل فيصلي فيزين صلاته جاهدا لما يري من نظر الناس إليه فذاك شرك السرائر (البيهقي ابن خزيمة) অর্থাৎ হে লোক সকল! তোমরা গোপন শিরক থেকে দুরে থেকো। ছাহাবাগণ রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা. গোপন শিরক কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো আমল। (আহমদ) দ্বিতীয়ত: কোন কাজকে শিরক বা কুফর আখ্যায়িত করে শরীয়তে তার জন্য মুরতাদের শাস্তি অপেক্ষা নিম্নতর শাস্তির বিধান করা, যার দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ কাজটি ধর্ম বিচ্যুতির ন্যায় কুফর। বরং উহা ছোট শিরক এবং কুফরের মিলিত অপরাধ। যেমন, কোন মুসলিমকে হত্যা করা। মুসলিম হত্যাকে রাসূল সা. কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর শরীয়তে মুসলিম হত্যাকারীর শাস্তি হল কিছাছ। কিন্তু নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা হত্যাকারীকে ক্ষমাও করে দিতে পারে, অথবা ইচ্ছা করলে দিয়ত বা রক্তপণও নিতে পারে। পক্ষান্তরে, যে মুরতাদ পুনরায় ইসলামে ফিরে না আসে, তার শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) কোন অবস্থাতেই ক্ষমা করা যায় না। এক মুসলিম অপর মুসলিমকে হত্যা করা কুফরী হলেও আল্লাহ তাদেরকে পরস্পর ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু একজন মুরতাদকে মুসলিমের ঈমানী ভাই বলে আখ্যায়িত করা নাজায়েয। এ সম্বন্ধে আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা জালালুহু বলেন: إِنَّمَا المُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ١٠ الحجرات ١٠ অর্থাৎ নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। সুতরাং, তোমরা তোমাদের ভাইদের মাঝে (সম্পর্ক) সংশোধন করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। সম্ভবত' তোমাদের প্রতি রহম করা হবে। (সূরা হুজুরাত ১০ আয়াত) তৃতীয়ত: ছাহাবী কর্তৃক কোন কাজকে শিরক বলে আখ্যায়িত করা অথবা কুরআন ও হাদীসের আলোকে বুঝা যে, ঐ কাজটি ছোট শিরক। যেহেতু রাসূল সা. ছাহাবাদের রা. কাছে আকীদাহ্ সম্পর্কে এমন বিস্তারিত আলোচনা করে গেছেন যে, তাদের নিকট অন্য কিছুর সাথে শিরকের সংমিশ্রণ হত না। অতএব, এ বিষয়ে যে কোন ছাহাবীর রা. কথাকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যায়। তা,বিজ ব্যবহার করা ছোট শিরক, না বড় শিরক?
তাবীজ ব্যবহার করা শিরকুল আসবাব-এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের শিরক শিরককারীর মনের অবস্থা ও তার ধ্যান ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে কখনো বড় শিরক, আবার কখনো ছোট শিরক হয়ে যায়। সুতরাং, তাবীজ ব্যবহার করাকে সাধারণভাবে বড় শিরক বা ছোট শিরক বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। বরং তাবীজ ও তাবীজ ব্যবহারকারীর প্রতি লক্ষ্য করতে হবে। তাবীজ যদি কোন মূর্তির ছবি হয়, অথবা এমন শিরকী মন্ত্র তাবীজে লেখা থাকে, যেগুলির মাধ্যমে গাইরুল্লাহর কাছে শিফার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে, তা হলে নিঃসন্দেহে উহা বড় শিরক। এভাবে যদি কেউ কড়ি বা সুতা ইত্যাদি গলায় ধারণ করে এবং এ ধারণা পোষণ করে যে, ঐ গুলি বালা-মুসিবত দূর করার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ক্ষমতা রাখে, তাহলে উহাও বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি এ ধরনের ধ্যান-ধারণা না হয়, তাহলে ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। আমরা এখন এ সম্পর্কে কয়েকজন ইসলামী ব্যক্তিত্বের কিছু উক্তি বর্ণনা করছি। শায়খ আব্দুর রহমান বিন সাদী, শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব রচিত “কিতাবুত তাওহীদ” এর উদ্ধৃতি দিয়ে লুবাব নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, বালা-মুসিবত দুর করার জন্য কিংবা বালা-মুসিবত থেকে হিফাযতে থাকার জন্য চুড়ি, তাগা ইত্যাদি পরিধান করা শিরক। এ বিষয়টি পুরাপুরিভাবে বুঝতে হলে আসবাব বা মাধ্যমের হুকুম সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ হল এই যে, বান্দার আসবাব বা মাধ্যম সম্পর্কে তিনটি ধারণা থাকতেই হবে।
১। কোন জিনিসকে সবব বা মাধ্যম মনে না করা, যতক্ষণ পর্যন্ত উহার পক্ষে শরয়ী প্রমাণ না পাওয়া যায়।
২। কোন বান্দা মাধ্যমের উপর ভরসা করবে না, বরং যিনি মাধ্যম হিসাবে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উপরই ভরসা করবে এবং শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ওটা ব্যবহার করবে ও আল্লাহ চাইলে উপকৃত হওয়ার আশা রাখবে।
৩। এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, মাধ্যম যত বড় ও শক্তিশালীই হোক না কেন, উহা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নির্দেশের আজ্ঞাবহ এবং তাঁর ফয়সালা ও তাকদীরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এখান থেকে বের হওয়ার কোন ক্ষমতাই তার নেই। আরো বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবেই উহার মধ্যে তাছাররুফ করেন। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর হিকমত অনুসারে উহার সবব হওয়ার গুণকে বহাল রাখেন, যাতে বান্দা উহা ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারে এবং তাতে নিহিত আল্লাহর হিকমতকে পুরোপুরিভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, তিনি মাধ্যমকে ইহার ক্রিয়া ও প্রভাবের সাথে কি সুন্দরভাবে সম্পৃক্ত করেছেন। আবার তিনি ইচ্ছা করলে মাধ্যম হওয়ার গুণকে পরিবর্তন করে দিতে পারেন যাতে বান্দা উহার উপর সম্পূর্ণরূপে ভরসা না করতে পারে, আল্লাহর কুদরতের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে অবগত হতে পারে এবং জানতে পারে যে, সার্বভৌম ক্ষমতা ও চূড়ান্ত ফয়সালার মালিক একমাত্র আল্লাহই। সব ধরনের আসবাব তথা মাধ্যম সম্পর্কে চিন্তা ও ব্যবহারে বান্দার উপরোক্ত ধারণা থাকা আবশ্যক তথা ফরয। একথা জানার পর ইহা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, যদি কেই মুছীবত আসার পরে উহা দুর করার জন্য অথবা মুসিবত আসার পূর্বে উহা প্রতিহত করার জন্য তাবীজাবলী বা সুতা ইত্যাদি ব্যবহার করে, তাহলে তা শিরক হবে। কেননা, সে যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, উহাই মুসিবত দুর করে বা প্রতিহত করে, তাহলে উহা হবে বড় শিরক। যেহেতু, সে সৃষ্টি এবং পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করেছে, তাই এটা হবে আল্লাহর একত্ববাদের সাথে শরীক করা। আর, যেহেতু সে উহাকে উপকারের মালিক মনে করে তার কাছে আশ্রয় চেয়েছে এবং এ আশায় অন্তরকে তার সাথে সম্পৃক্ত করেছে, তখন ইহা হবে ইবাদতের মাধ্যমে শরীক করা। অন্যদিকে, যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, মুসিবত দুর করার ও প্রতিহত করার মালিক একমাত্র আল্লাহই কিন্তু তাবীজাবলী বা সুতা ইত্যাদিকে সে এমন সবব মনে করে, যার দ্বারা মুসিবত দূর করা যায়, তাহলে প্রকৃত পক্ষে সে এমন বস্তুকে সবব ধারণা করল যা শরীয়তের দৃষ্টিতে এবং প্রাকৃতিকভাবে সবব নয়। তাই এটা শরীয়ত ও প্রকৃতির উপর একটি মিথ্যা অপবাদ। কেননা, শরীয়ত এ থেকে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছে, আর যে বিষয়ে নিষেধ আছে সেটা কোন উপকারী সবব বা মাধ্যম হতে পারে না এবং প্রাকৃতিকভাবে এটা এমন কোন নিশ্চিত বা অনিশ্চিত মাধ্যম নয় যার দ্বারা উদ্দেশ্য সাধন করা যায়। অনুরূপভাবে এটা কোন বৈধ উপকারী ঔষধও নয়। অধিকন্তু উহা শিরকের মাধ্যম সমূহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, ব্যবহারকারী অবশ্যই তার অন্তরকে উহার সাথে সম্পৃক্ত করে। আর ইহা এক ধরনের শিরক বা শিরকের মাধ্যম। তাবীজ ঐ সমস্ত জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলির সাথে ব্যবহারকারীদের অন্তর ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তাই ঐ নিয়তে কোন কিছু গলায় ঝোলানো তাবীযেরও একই হুকুম। এভাবে উহার কোনটি বড় শিরক আবার কোনটি ছোট শিরক। বড় শিরক যেমন: ঐ সমস্ত তাবীজ, যার মধ্যে শয়তান অথবা অন্য কোন সৃষ্ট জীবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। আর যে সকল বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সাহায্য করতে পারে না, সেগুলির ব্যাপারে গাইরুল্লহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা শিরক। ইনশাআল্লাহ্ এ বিষয়ে একটু পরেই আলোচনা আসছে। আর ছোট শিরক ও হারাম হওয়ার দৃষ্টান্ত হল ঐ সকল তাবীজ, যেগুলিতে এমন সব নাম থাকে, যেগুলোর অর্থ বুঝা যায় না এবং যেগুলি শিরকের দিকে নিয়ে যায়। শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ্ বিন শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব র. এরূপই বলেছেন যে, এখানে উদ্দেশ্য হল মুসিবত দূর করা বা প্রতিহত করার জন্য তামা, লোহা বা অনুরূপ কোন ধাতব বস্তু ব্যবহার করা। এর হুকুমে বর্ণনা করা হয়েছে যে, উহা শিরকে তা'তীলের অন্তর্ভুক্ত। মহান ও পবিত্র আল্লাহর একমাত্র ইলাহ বলতে ঐ সত্তাকে বুঝায়, যার প্রতি হৃদয় আসক্ত হয় এবং যার নিকট এমন বিষয়ের আশা রাখে ও আশ্রয় প্রার্থনা করে যা শুধু সর্ব শক্তিমান আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত এবং সকল আনুগত্য, সকল ইবাদত আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট। ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদত হচ্ছে-আল্লাহর কাছে দ'আ করা, তাঁর কাছে আশা করা, তাঁর উপর তাওয়াক্কুল রাখা এবং বিশ্বাস করা যে, ভাল-মন্দ একমাত্র তাঁরই হাতে। শুধু তিনিই ভাল-মন্দ আনয়নকারী ও প্রতিহতকারী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ (یونس ১০৭) অর্থাৎ আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোন কষ্ট আরোপ করেন তাহলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা খণ্ডানোর মত। পক্ষান্তরে, যদি তিনি কিছু কল্যাণ দান করেন, তাহলে তার মেহেরবাণীকে রহিত করার মতও কেউ নেই। (সুরা য়ুনুস ১০৭ আয়াত) সুতরাং, যদি কেউ বিশ্বাস রাখে যে, গিড়া, তাগা পরিধান করলে এবং হাঁড় ও তাবীজ ধারণ করলে বালা-মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট দূর হয়ে যায়, তবে সে এ ধরনের বিশ্বাসের কারণে শিরক করল এবং আল্লাহর কাজকে বাতিল করে দিল, যেটা নির্দিষ্ট রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে একমাত্র স্রষ্টার জন্য। এভাবে সে ঐ কাজকে تميمة এর জন্য সাব্যস্ত করে, যেটাকে যথাস্থানে মর্যাদা দেয়ার পরিবর্তে অন্যকে মর্যাদা দিল। এজন্যই নবী করীম সা. বাহুতে তামার চুড়ি ব্যবহারকারী ব্যক্তিকে বলেছেন উহা খুলে ফেলতে। কারণ, উহা কেবল দুর্বলতাই বাড়িয়ে দেবে। উহা সাথে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে কখনও সফল হতে পারবে না। ইমাম আহমদ র. ইমরান বিন হোসাইনের সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, বর্ণিত হাদীসের এই অংশ। ما أفلحت أبد "তুমি কখনও সফল হতে পারবে না” দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ইহা বড় শিরক, যা ক্ষমার অযোগ্য, এমনকি ইহার কারণে চিরকাল জাহান্নামে থাকতে হবে। শায়খ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ شرح كتاب الترحيد এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ তায়সীরুল আজিজুল হামিদ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, বালা-মুসিবত দূর করার উদ্দেশ্যে গিড়া, তাগা পরিধান করা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এখানে মনে রাখা দরকার যে, উক্ত কথা দ্বারা শায়খের উদ্দেশ্য হলো এই যে, ঐ সমস্ত তাবীজকে শুধু মাধ্যম মনে করে ব্যবহার করলে তা ছোট শিরক হবে। আর যদি ওগুলির উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে, সেগুলির নিকট থেকে উপকারের আশা করে এবং সেগুলির সাথে এমন ব্যবহার করে, যেমন ব্যবহার আল্লাহর সাথে করা উচিত, অথবা তাবীজ যদি শিরকী হয়, যেমন তাতে সৃষ্টির কাছে এমন ব্যাপারে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, যে সাহায্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ করতে পারে না, তা হলে ওটা নিঃসন্দেহে বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। তায়সীরুল তাওযীহ আন তাওহীদুল খালাইক ৪৭৯
শায়খের আলোচনার সমষ্টি থেকে স্পষ্টভাবে উক্ত কথাই প্রতীয়মান হয়। অনুরূপ কথা শায়খ আব্দুল আযীয বিন বাজও বলেছেন। তিনি বলেছেন- শয়তানের নাম, হাড়, পূতি, পেরেক অথবা তিলিস্মা (অর্থাৎ অর্থবিহীন বিদঘুটে শব্দ বা অক্ষর) প্রভৃতি বস্তু দিয়ে তাবীজ বানানো হলে সেটা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। অনেক সময় উল্লেখিত বস্তু সমূহের তাবীজ ব্যবহারকারী বিশ্বাস করল যে, এই তাবীজ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়াই তাকে হিফাযত করবে বা তার রোগ-ব্যাধি দূর করে দেবে অথবা তার দুঃখ-কষ্ট অপসারিত করবে। ফাতহুল মাজিদ গ্রন্থের উপর খামিদ আল ফিকী কর্তৃক লিখিত হাশিয়া-এর টীকা লিখতে গিয়ে শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায বলেছেন: তাবীজ ব্যবহার করায় দ্বীনের সাথে বিদ্রূপ করা হয় না, বরঞ্চ সেটা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত এবং জাহেলিয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার অনেক সময় তাবীজ ব্যবহারকারীর ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বড় শিরকের অন্তর্ভুক্তও হয়ে যায়। যথা: এরূপ ধারণা পোষণ করা যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়াই উহা উপকার ও ক্ষতি করে। কিন্তু যদি এরূপ ধারণা পোষণ করা হয় যে, উহা বদ নজর অথবা জিন ইত্যাদি থেকে হিফাযতে থাকার একটি মাধ্যম, তবে ইহা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, আল্লাহ তাবীজকে মাধ্যম হিসাবে সৃষ্টি করেন নি। বরঞ্চ উহা থেকে নিষেধ করেছেন, উহার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং সেটাকে রাসূলের সা. ভাষায় শিরক বলে ঘোষণা করেছেন। কারণ, ব্যবহারকারীর অন্তর আল্লাহ থেকে বিমুখ হয়ে তাবীযের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং উহার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, এভাবে শিরকের দরজা খুলে যায়। শায়খ হাফেজ হাকামী বলেন: وإن تكن مما سوي الوحيين فانها شرك بغير مين بل إنها قسيمة الأزلام في البعد عن سيما أو لى الاسلام অর্থাৎ দুই ওহি তথা আল কুরআন ও আল হাদীছ ব্যতীত, ইয়াহুদীদের তিলিসমাতি, মূর্তি পূজারি, নক্ষত্র পূজারি, মালাইকা পূজারি এবং জিনের খিদমত গ্রহণকারী ইত্যাদি বাতিল পন্থীদের তাবীজ ব্যবহার; অনুরূপভাবে পূতি, ধনুকের ছিলা, তাগা এবং লোহার ধাতব চুড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। কারণ, এগুলি সমস্যা সমাধানের জন্য বৈধ মাধ্যম কিংবা শরীয়ত সম্মত ঔষধ নয়। বরং তাবীজ ভক্তরা এসব জিনিসে নিজেদের খেয়াল খুশিতে একথা বিশ্বাস করে নিয়েছে যে, ওগুলি অমুক অমুক রোগ ব্যাধি থেকে রক্ষা করে। মূর্তি পূজারিরা যেমন তাদের বানানো মূর্তি সম্পর্কে কতকগুলি মূর্তির হাতে কল্যাণের এবং আর কতকের হাতে অকল্যাণের ক্ষমতা রয়েছে ইত্যাদি। তাবীজ সম্পর্কে তাবীজ ভক্তদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। মূলত: সেব তাবীজ জাহেলী যুগের أزلام “আযলাম” এর সাদৃশ্যপূর্ণ। “আযলাম” অর্থ হচ্ছে কাঠের অংশ বা টুকরা। জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের সাথে তিনটি কাঠ রাখত। কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে ঐ কাঠগুলি দ্বারা তারা লটারি করত। এগুলোর একটাতে লেখা ছিল إفعل অর্থ “কর” দ্বিতীয়টিতে লেখা ছিল لا تفعل অর্থ “করো না” এবং তৃতীয়টিতে লেখা ছিল غفل অর্থ “অজ্ঞাত”। লটারিতে “কর” লিখিত কাঠ আসলে কাজের উদ্দেশ্য যাত্রা করত। “করো না” লিখিত কাঠ আসলে, যাত্রা স্থগিত রাখত এবং “অজ্ঞাত” লিখিত কাঠ আসলে পুনরায় লটারি দেয়া হত। আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহ আমাদেরকে এই ভ্রষ্টতার পরিবর্তে একটি উত্তম পদ্ধতি দান করেছেন। আর সেটা হচ্ছে ইস্তেখারার ছালাত ও দু'আ। পরিশেষে বলা যায় যে, কুরআন হাদীসের বাহিরের তাবীজ সমূহ ভ্রান্ত এবং শরীয়ত বিরোধী, আযলামের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং মুসলিমদের 'আমল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। প্রকৃত তাওহীদবাদীরা এ থেকে অনেক দুরে অবস্থান করে। তাদের অন্তরে আছে প্রবল ঈমানী শক্তি। তাঁরা আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস রাখে। এ জন্যই তাদের তাওয়াক্কুল শুধু আল্লাহর উপর। অন্য কিছুর উপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করা থেকে তারা অনেক দুরে থাকে। পূর্বে উল্লেখিত দলিলসমূহ এবং শরীয়ত বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত বক্তব্য দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, তাবীজ ব্যবহারকারীর মানসিক অবস্থা, তাবীযের স্বরূপ এবং তার মধ্যে লিখিত জিনিসগুলির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে তাবীজকে শুধুমাত্র একটি হুকুমে আবদ্ধ করা সমীচীন নয়। অনুরূপভাবে, এটাও লক্ষণীয় যে, ছোট শিরক সাধারণ ব্যাপার নয়। তাকে ছোট বলার অর্থ হল- যে বড় শিরকের কারণে অনন্তকাল জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে, তার তুলনায় ছোট। অন্যথায় ছোট শিরক কবীরা গুনাহ সমূহের মধ্যে সর্বাধিক জঘন্য। তার দলীল ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত উক্তি। তিনি বলেছেন: قول ابن مسعود رضی الله عنه لأن أحلف بالله كاذبا أحب إلى من أن أحلف بغیره صادقا (মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক) অর্থাৎ আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা আমার কাছে অনেক উত্তম, গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য ব্যক্তি বা বস্তু) নামে সত্য শপথ করার চেয়ে। (মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক) শায়খ সোলায়মান বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব, ইবনে মাসউদের রা. এই উক্তির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন- মিথ্যা হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর নামে শপথ করাকে গাইরুল্লাহর নামের শপথে জড়িত আছে সত্যবাদিতা এবং শিরক। আর আল্লাহর নামের শপথে যদিও মিথ্যাবাদিতা বিদ্যমান, তবুও তাতে আছে তাওহীদ। তাই ইবনে মাসউদের রা. উল্লেখিত উক্তির তাৎপর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, ছোট শিরক অন্যান্য কবিরা গুনাহের তুলনায় সর্বাধিক গুরুতর। শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব উল্লেখ করেছেন- বালা-মুসিবত দূর করার জন্য অথবা বিপদ আপদ থেকে হিফাযতে থাকার জন্য গিড়া এবং তাগা ইত্যাদি ব্যবহার করা ছোট শিরক। ছাহাবায়ে কিরামের কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, ছোট শিরক কবীরা গুনাহ সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জঘন্য। কুরআন ও হাদীসে যে সকল দলীলে ছোট শিরকের প্রসঙ্গ এসেছে, সেগুলোতে ছোট বড় শিরকই শামিল। এ জন্যই ছালফে ছালেহীন (ছাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবেঈ তাবেয়ীন) ছোট শিরকের ক্ষেত্রে ঐ সমস্ত দলীল পেশ করেছেন যেগুলো মূলত: বড় শিরক প্রসঙ্গে এসেছে। ইবনে আব্বাস রা. এবং হুযায়ফা রা. থেকেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا ﴿النساء ٤٨ ﴾ অর্থাৎ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে যেন বড় ধরনের অপবাদ আরোপ করল। (সুরা নিসা ৪৮ আয়াত।)
অন্যত্র আল্লাহ ওয়া জাল্লা শানুহু বলেন: إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴿لقمان ১৩) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়। (সুরা লুকমান ১৩ আয়াত।)
উক্ত আয়াত-দ্বয়ে يشرك এবং الشرك দ্বারা ছোট বড় সকল শিরকই বুঝানো হয়েছে। রাসূলের সা. কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? রাসূল সা. উত্তরে বলেছেন- যে আল্লাহ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সাথে শিরক করা সবচেয়ে বড় গুনাহ। বুখারী শরীফের কিতাবুত তাফসীর অধ্যায়ে সূরা বাকারাহ এই আয়াত فَلَا تَجْعَلُوا اللَّهَ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ এর তাফসীরে ইবনে আব্বাস হতে বলেছেন- আন্দাদ অর্থ হচ্ছে ছোট শিরক। কিয়ামাহ দিবসে ছোট শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিদের বিচার কার্য সর্ব প্রথম সম্পন্ন করা হবে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ছোট শিরক কত ভয়াবহ। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি: إن أول الناس يقضى يوم القيامة عليه رجل استشهد فاتی به فعرفه نعمه فعرفها قال فما عملت فيها قال قاتلت فيك حتى استشهدت قال كذبت ولكنك قاتلت لأن يقال جرىء فقد قيل ثم أمر به فسحب علي وجهه حتي ألقي في النار ورجل تعلم العلم وعلمه وقرأ القرآن فأتي به فعرفه نعمه فعرفها قال فما فعلت فيها قال تعلمت العلم وعلمته وقرأت فيك القرآن قال كذبت ولكنك تعلمت العلم ليقال عالم وقرأت القرآن ليقال هو قارىء فقد قيل ثم أمر به فسحب علي وجهه حتى ألقي في النار ورجل وسع الله عليه وأعطاه من أصناف المال كله فأتى به فعرفه نعمه فعرفها قال فما عملت فيها قال ما تركت من سبيل تحب أن ينفق فيها إلا أنفقت فيها لك قال كذبت ولكنك فعلت ليقال هو جواد فقد قيل ثم أمر به فسحب علي وجهه ثم ألقي في النار. (মুসলিম)
অর্থাৎ কিয়ামাহ দিবসে সর্ব প্রথম তিন ব্যক্তির বিচার কার্য সম্পন্ন করা হবে। তাদের একজন হচ্ছে শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে এবং তার কাছে আল্লাহ প্রদত্ত নি'আমত সমূহ পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে এবং সে সেগুলো চিনবে (স্বীকার করে নিবে)। আল্লাহ তাকে প্রশ্ন করবেন- তুমি এই নি'আমতগুলির বিনিময়ে কি 'আমল করেছ? সে বলবে, আমি তোমার রাস্তায় যুদ্ধ করেছ যে, তোমাকে বীর বলা হবে। আর তাতো বলা হয়েছে। তখন আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তাদের আর একজন হচ্ছে আলেম, যে নিজে জ্ঞান শিক্ষা লাভ করেছে, অন্যকেও তা শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তাকে প্রদত্ত নি'আমত সমূহের পরিচয় করিয়ে দেবেন। সে ঐ নি'আমতগুলি চিনতে পারবে। প্রশ্ন করা হবে ঐ সমস্ত নি'আমতের বিনিময়ে তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে- আমি নিজে জ্ঞান শিখেছি এবং অপরকে তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমিতো এজন্যই ইলম শিখে ছিলে যে, তামাকো আলেম বলা হবে এবং এ উদ্দেশ্যই কুরআন পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে কারী বলা হবে। আর তাতো বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ নির্দেশ করবেন। সে অনুযায়ী তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তাদের অপরজন হচ্ছে বিত্তশালী, যাকে আল্লাহ অঢেল ধন সম্পদ দান করেছেন। তাকে তাঁর দরবারে হাযির করা হবে। এবং তাকে প্রদত্ত নি'আমতসমূহ আল্লাহ পরিচয় করিয়ে দেবেন, আর সেগুলো সে চিনবে (অর্থাৎ স্বীকার করে নিবে)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলবেন- এই নি'আমতের বিনিময়ে তুমি কি 'আমল করেছ? সে বলবে, আপনি যে সকল খাতে দান করা পছন্দ করেন, সেগুলির প্রত্যেকটিতে আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য দান করেছি, কোন খাতই আমার দান থেকে বাদ পড়েনি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যা কথা বললে। তুমিতো সেটা করেছ এ উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে দানশীল বলা হবে। আর তাতো বলা হয়েছে। অতঃপর তিনি আদেশ দেবেন, তখন তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম ইমাম নবভীর ব্যাখ্যা সহকারে) যে ভাল কাজে ছোট শিরক মিশ্রিত থাকবে সে 'আমল বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তার কোন মূল্যই নেই। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, রাসূল সা. বলেছেন যে. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন: أنا أغنى الشركاء عن الشرك من عمل عملا أشرك معى فيه غيري تركته و شركه (মুসলিম) অর্থাৎ আমি শরীকের শিরক থেকে অনেক পবিত্র। যে ব্যক্তি কোন কাজ করবে এবং তাতে আমার সাথে অন্যকেও অংশীদার বানাবে, আমি তাকে তার শিরক সহকারে পরিত্যাগ করব। (সহীহ মুসলিম, নবভীর র. ব্যাখ্যা সহকারে) আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। এক লোক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ইচ্ছা করেছে এবং সে (জিহাদের মাধ্যমে) দুনিয়ার সম্পদ (গণিমতের মাল) পেতে চায়। তখন রাসূল সা. বললেন: لأأجرله فأعاد عليه ثلاثا والنبى صلى الله عليه وسلم يقول: لا أجر له. (হাকেম ও আহমদ) অর্থাৎ সে কোন ছওয়াবই পাবে না। ঐ লোক রাসূলের সা. কাছে কথাটি তিনবার পূনারাবৃত্তি করল, কিন্তু প্রত্যেকবারই রাসূল সা. বললেন- (সে কোন ছওয়াব পাবে না) (হাকেম ও মুসনাদে আহমদ) আবু উমামা আল বাহেলী রা. থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি রাসূলের সা. নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! এক লোক আল্লাহর কাছে ছওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার কি প্রাপ্য? রাসূল সা. বললেন- সে কিছুই পাবে না। ঐ ব্যক্তি রাসূলের কাছে প্রশ্নটির একাধারে তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন, আর রাসূলে কারীম সা. বলে গেলেন- “সে কিছুই পাবে না”। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ গাফুরুর রাহীম কেবল সেই 'আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য করা হয় এবং উহার মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে। (নাসাঈ)

টিকাঃ
১. আল্লাহ গাফুরুর রাহীমের তরফ হতে সম্বভত অর্থ হচ্ছে অবশ্যই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00