📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 সত্য তাওবা

📄 সত্য তাওবা


بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ يٰعِبَادِيَ الَّذِيْنَ اَسْرَفُوْا عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا ؕ اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
বলুন, “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”২৩২
وَ اِنِّىْ لَغَفَّارٌ لِّمَنْ تَابَ وَ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدٰى
'আর যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।' ২৩৩
প্রিয় ভাইয়েরা,
আমরা একটি বরকতময় স্থানে বসে আছি। একটা মুবারক সময়ে মুবারক লোকদের সাথে আছি। আজকের রাতে আলোচ্য বিষয়ের শিরোনাম হলো 'সত্য তাওবা'।
জীবনের উন্নতি ও অবনতি ঘটে তাওবাকে আবর্তন করে। হিদায়াতের পথে তাওবা করে শুরু হয় নতুন জীবন। আর তাওবা না করে গোমরাহির পথে চলতে থাকা জীবনের চরম অবনতি। তাওবা-আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে তাওবা করার তাওফিক দান করেন। তিনি তাওয়াবুর রাহিম-তাওবা কবুলকারী অসীম দয়ালু। তাওবা তাওবাকারীদের জন্য একটি পরীক্ষা, যাতে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীদের পার্থক্য করা যায়। তাওবা নতুন এক জন্ম। তাওবা নতুন এক দিগন্তে পা রাখার নাম। তাওবা নব জীবন। এ জীবন আল্লাহর ছায়ায় আল্লাহর সঙ্গ লাভের অনুভূতিসম্পন্ন। তাওবার ক্ষেত্রে প্রার্থিত হচ্ছে, তাওবা হতে হবে আন্তরিকভাবে। তাওবার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি সৎ থাকতে হবে। তাই আজকের আলোচনার শিরোনাম: সত্য তাওবা।
প্রিয় ভাই, অনেকেই তাওবা করে। কিন্তু তাদের মাঝে কম সংখ্যক মানুষই সত্য তাওবা করে এবং তাওবার ওপর অটল থাকে।
কয়েক দিন থেকে দিন-রাত এ আলোচনা লেখার কাজ করে চলেছি। একটার পর একটা কিতাব উল্টিয়ে গেছি। অনেকের তাওবার ঘটনা পড়ে অতীত ও বর্তমানের কিছু ঘটনা নির্বাচন করেছি। কুরআন, হাদিস ও আসারের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলেছি এ আলোচনাকে। কিছু কবিতা ও নেককারদের বাণী তুলে এনেছি। পুরো আলোচনার মাধ্যমে চেয়েছি তাওবাকারীদের দৃঢ় করতে ও গাফিলদের রিমাইন্ডার দিতে। সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছি যে, প্রত্যেক গুনাহই কিছু না কিছু বিপদ নিয়ে আসে। আর তা দূরীভূত হয় কেবল তাওবার মাধ্যমে। কথাগুলো পুরুষ-নারী সকলের জন্য নিবেদিত।
আমাদের সবাইকে তাওবা করতে হবে। তাই আসো তাওবা করি। আসো, আমরা ইসতিগফারকারীদের কাতারে শামিল হই। তাওবাকারীদের একজন হয়ে যাই। আমরা প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হয়ে যাই। মৃত্যু আসার আগেই আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাই। আমরা তো জানি না, আগামীকাল কোথায় থাকব আমরা। জানি না, আগামীকাল পর্যন্ত কি আমরা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে থাকব, না জাহান্নামের গর্তসমূহের একটিতে হবে আমাদের অবস্থান! যার শুরু ভালো, তার শেষও ভালো। যে আল্লাহর সাথে থাকে, আল্লাহও তার সাথে থাকেন। যে তাওবায় আল্লাহর সাথে সততা বজায় রাখে, আল্লাহও তার সাথে তার সততার প্রতিফল অনুযায়ী আচরণ করেন, তাকে উত্তম অন্তিম পরিণতি দান করেন।
আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু এ রকম:
১. মিথ্যা তাওবা।
২. পেছনে থেকে যাওয়া তিন সাথি।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো কিছু ত্যাগ করে।
৪. ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা।
৫. হে চক্ষুষ্মান, শিক্ষা গ্রহণ করো।

মিথ্যা তাওবা
মানসুর বিন আম্মার বলেন, 'আমার এক বন্ধু ছিল। গুনাহগার ছিল সে। এরপর তাওবা করল। আমি তার বিষয়ে খুব খেয়াল করতাম। তাকে দেখতাম, সে অনেক ইবাদত করছে, কিয়ামুল লাইল ও সিয়াম পালন করছে। তাকে দেখলাম, অনেক ইবাদত ও তাহাজ্জুদে নিজের আমলনামা সাজাচ্ছে। কিন্তু এরপর কয়েকদিন তাকে আর দেখলাম না। তার ব্যাপারে আমার আগ্রহ- ঔৎসুক্য দেখে আমাকে বলা হলো, “সে অসুস্থ।” আমি তার ঘরে এলে ঘর থেকে তার ছোট মেয়ে বেরিয়ে এল। বলল, “কাকে চান?” আমি বললাম, “তোমার বাবাকে বলো, অমুক এসেছেন।” মেয়েটি আমার জন্য অনুমতি নিল। আমি ভেতরে ঢুকে দেখলাম, সে ঘরের মাঝখানে বিছানায় শুয়ে আছে। তার চেহারা কালো হয়ে গেছে, তার দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে, তার ঠোঁটদুটো মোটা হয়ে গেছে।
আমি তার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে বললাম, “হে আমার ভাই, বেশি বেশি ( لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ) পড়ো।” সে চোখ খুলে ঝাঁজালো দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। এরপর অজ্ঞান হয়ে গেল। আমি দ্বিতীয়বার বললাম, “হে আমার ভাই, বেশি বেশি ( لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ) পড়ো।” এরপর তৃতীয়বারও এমনই বললাম। অতঃপর সে চোখ খুলে বলল, "ভাই মানসুর, কালিমা ও আমার মাঝে কিছু একটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কালিমা ও আমার মাঝে কিছু একটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” আমি বলে উঠলাম, ( لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ ) এরপর তাকে বললাম, "ভাই, তাহলে সেসব সালাত, সিয়াম, তাহাজ্জুদ ও কিয়াম?!"
সে বলল, “সেগুলো অন্যকে দেখানোর জন্য। আমার তাওবা মিথ্যা ছিল। আমি বেশি বেশি ইবাদত করতাম, যাতে মানুষ আমার সুনাম করে, আমি সুখ্যাতি পাই। আমি মানুষকে দেখানোর জন্য এসব করতাম। একাকী সময়ে দরজা বন্ধ করে পর্দা টানিয়ে দিয়ে মদ পান করতাম আর রবের অবাধ্যতায় লিপ্ত হতাম। এভাবে বেশ সময় কেটে গেলে আমাকে রোগে পাকড়াও করে আর আমি মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে যাই। আমি তখন আমার এ মেয়েকে বলি, আমাকে একটি কুরআন এনে দাও। কুরআন নিয়ে আমি বললাম, হে আল্লাহ, এ পবিত্র কুরআনে প্রদত্ত আপনার বাণীর কসম করে বলছি, আমাকে সুস্থ করে দিন, আমার বিপদ দূর করে দিন, আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো কোনো গুনাহ করব না। এরপর আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন। আমাকে রোগমুক্ত করলেন। রোগমুক্তির পর আমি আবার আগের মতো কামনাবাসনা চরিতার্থ করতে এবং গুনাহ করতে শুরু করি। শয়তান আমাকে রবের সাথে কৃত ওয়াদার কথা ভুলিয়ে দেয়।
আমি লম্বা একটা সময় ধরে গুনাহের ওপর থাকি। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ি, মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাই। স্ত্রীকে তখন আগের মতো বলি, আমাকে ঘরের মাঝখানে নিয়ে যাও। এরপর কুরআন আনতে বলি। কুরআন থেকে কিছুটা পড়ে কুরআন তুলে ধরে বলি, হে আল্লাহ, এ কুরআনে আপনার যে কথাগুলো আছে, তার পবিত্রতার দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে সুস্থ করে দিন, আমার বিপদ দূর করুন। আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন। আমার অসুস্থতা দূর করলেন। এরপর আবারও আমি আগের মতোই হয়ে যাই। গুনাহ ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। যেন আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের ওয়াদা একেবারে বিস্মৃত হয়ে যাই। এরপর আমি এ রোগে আক্রান্ত হই, যেমনটা তুমি এখন দেখছ। রোগে আক্রান্ত হলে স্ত্রীকে বলি, আমাকে ঘরের মাঝখানে নিয়ে রাখো। যেমন তুমি এখন দেখছ। এরপর আমি কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য মুসহাফ আনতে বলি। কিন্তু কুরআনের সবকটা হরফই আমার জন্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। একটা হরফও পড়তে পারি না। এ থেকে আমি বুঝলাম, আল্লাহ আমার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন। আমি এবার আকাশের দিকে মাথা তুলে দুআ করলাম, হে আল্লাহ, হে আকাশ-জমিনের একচ্ছত্র অধিপতি, হে আল্লাহ, আমাকে রোগমুক্ত করুন। তখন গায়িবি আওয়াজ শুনলাম:
تَتُوْبُ عَنِ الذُّنوبِ إِذَا مَرِضْتَ *** وَتَرْجِعُ لِلذُّنوبِ إِذَا بَرَأْتَ فَكَمْ مِنْ كُرْبَةٍ نَجَاكَ مِنْهَا *** وَكَمْ كَشَفَ البَلَاءَ إِذَا بُلِيْتَ أمَا تَخْشَى بِأَنْ تَأْتِي المَنَايَا *** وَأَنْتَ عَلَى الخَطَايَا قَد لَهَوْتَ “রুগ্ন হলে তুমি তাওবা করো, সুস্থ হলে আবার ফিরে যাও পাপাচারে। কতবার তিনি তোমার দুঃখ দূর করলেন, কত বিপদে তিনি তোমায় রক্ষা করলেন। তুমি কি ভয় করো না? মৃত্যু এসে যাবে, আর তুমি লিপ্ত থাকবে খেল-তামাশায়!'
মানসুর বিন আম্মার বলেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছ থেকে বের হচ্ছি আর আমার দুচোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে। দরজার কাছাকাছি না পৌঁছতেই আমাকে জানানো হলো, সে মৃত্যুবরণ করেছে। তার ও তার কামনাবাসনার মাঝে জীবন-অবসান বাধা হয়ে গেছে।'
হ্যাঁ, হে প্রিয়, তাওবা কেবল মুখের কথা নয়। তাওবা হচ্ছে অন্তরের অনুশোচনা, গুনাহর জীবনে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প। তাওবার শর্ত হচ্ছে, আখিরাতের জীবনের কোনো কিছু সম্মুখীন হওয়ার আগেই তাওবা করতে হবে। যে আখিরাতের আজাব দেখে বা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তাওবা করে, তার তাওবা গ্রহণীয় নয়। তার তাওবার সময় চলে গেছে।
আল্লাহর শপথ, কেউ সত্য তাওবা করলে তাকে রবের দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। কেউ ইখলাসের সাথে তাওবা করলে, একনিষ্ঠভাবে রবের অভিমুখী হলে জমিন ও আসমানের রবের দরজায় তাকে স্বাগত জানানো হয়।
সত্য তাওবাতেই আসল মর্যাদা। তাই তো আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ 'হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'২৩৪
কোথায় আজকের যুবকেরা, যারা সত্য তাওবা করবে? কোথায় তোমরা, যারা তাওবা করে রবের পথে অটল থাকবে।
আজ উম্মাহর এ ক্রান্তিলগ্নে তোমাদের প্রয়োজন। আজ যুবকদের প্রয়োজন, যারা দ্বীনের মাধ্যমে শক্তিশালী হবে, নিজেদের আকিদাকে যারা আঁকড়ে ধরবে, নিজেদের সোনালি অতীত নিয়ে যারা গৌরব করবে। আল্লাহর শপথ—যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, যতদিন যুবক সম্প্রদায় কল্যাণের ওপর থাকবে, ততদিন উম্মাহ কল্যাণের ওপর থাকবে। এমনকি শিশুদের মাঝেও কল্যাণ আসবে। আসো, অগ্রসর হও, ভেঙে দাও সব পাপের বলয়।
এক ইবাদতকারিণী রোজাদার তাহাজ্জুদগুজার তরুণী। বয়সে নবীন। অতীতের নয়, এ প্রজন্মের যুবতি ছিল সে। এক যুবক পাণিপ্রার্থী হলো তার। কিন্তু যুবতি তার প্রস্তাবে রাজি হচ্ছিল না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কেন এ অসম্মতি?' যুবতি জানাল, 'আমি সাওম ও কিয়াম ভালোবাসি।' বলা হলো, 'স্বামীর খিদমতও ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার মাধ্যম। তুমি তো স্বামীর কাছে থাকলে কল্যাণ ও ইবাদতের মাঝেই থাকবে।' যুবতি তখন ইসতিখারা করল। তার ইতস্ততা কেটে গেল। বিয়েতে রাজি হলো সে। তবে বলল, 'কিন্তু একটা শর্ত আছে?' শর্তটা কী? শর্তটা কী ছিল? যুবতি বলল, 'স্বামী আমাকে প্রতি সপ্তাহে তিন দিনের নফল রোজা রাখার অনুমতি দেবে।' যুবতি জানত নফল রোজার জন্য স্বামীর অনুমতি আবশ্যক। হবু স্বামীকে বলা হলো, সেও সন্তুষ্টচিত্তে রাজি হলো। স্বামীর রাজি হওয়ায় যুবতিও খুশি হলো। অতঃপর বিয়ে সম্পন্ন হলো। তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর একটি ঘর প্রতিষ্ঠিত হলো।
আল্লাহু আকবার! আমরা তো এমনই ঘর নির্মাণ করতে চাই। আমরা তো চাই এ রকম ঘর নির্মিত হোক, যে ঘরে দিনের বেলা রোজা ও রাতের বেলা তাহাজ্জুদ হবে সকলের প্রার্থিত। এমন ঘর থেকেই দ্বীনদার বের হয়, বের হয় দ্বীনের বীর। জেনে নাও, ইসলামের প্রতিটি বীর মাদরাসাতুল লাইল থেকেই বের হয়। অন্ধকারের ইবাদতের মাঝেই প্রকৃত মুখলিস ও অগ্রসরদের চেনা যায়।
জেনে রাখো, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত দিনের প্রহরে বীর ও সচতুর যোদ্ধা হতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি রাতের প্রহরে বীরত্ব ও বৈরাগ্য শিখবে। এক যুবক সম্পর্কে শুনলাম। চিকন শরীর তার। লজ্জা অনেক। কথা খুব কম বলে। তার একমাত্র আরাধ্য ইসলাম ও দ্বীনের কাজ। বয়স এখনো ২৭ পেরোইনি। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত ও সঠিক কথার যোগ্যতা রয়েছে ঢের। আল্লাহর কাছ থেকে তাওফিকপ্রাপ্ত সে। আর আল্লাহই তো তাওফিকদাতা। এক যুবক বলে, 'দাওয়াতি সফরে অনেকবারই আমি তার সফরের সাথি হয়েছি। আমরা সফরে বেশ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়তাম। সফর বেশ কষ্টের হতো আমাদের জন্য। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও তার মাঝে আশ্চর্য রকম শক্তি লক্ষ করতাম আমরা। রাতের বেলার কিয়ামে অভ্যস্ত ছিল সে। সাধারণ মানুষের কিয়ামুল লাইল নয়। বেশ দীর্ঘ সময়ের কিয়ামুল লাইল। যার কারণে যে কারও পা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ত।'
প্রিয় সুধী, অনেকেই কিয়ামুল লাইল আদায় করে। কিন্তু কারও কিয়ামুল লাইল মিনিটের সমান। আর কারও ঘণ্টার সমান।
তো সে বলতে থাকল, সে চিকন শরীরের যুবক এক রাতেই পাঁচ পারা কুরআন পড়ত তাহাজ্জুদের নামাজে। অবস্থা যা-ই হোক না কেন, পরিস্থিতি যেমন কষ্টকরই হোক না কেন, সে যুবক সর্বদা এ আমল করতে থাকত। প্রতিদিন কিয়ামুল লাইলে পাঁচ পারা কুরআন। আমি তখন তাকে বললাম, 'আস-সাদিকুন এমনই হয়ে থাকেন।'
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ 'তারা রাতের সামান্য অংশই অতিবাহিত করত নিদ্রায়। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।'২৩৫
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ - فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। কেউই জানে না, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী কী প্রতিদান লুক্কায়িত রয়েছে।'২৩৬
যে উম্মাহ এমন বৈশিষ্ট্য ও গুণের অধিকারী হবে, সে উম্মাহ বিইজনিল্লাহ কখনো পরাজিত-পদানত হবে না। এমন গুণের অধিকারী উম্মাহ পরীক্ষিত হতে পারে। পরীক্ষিত হবে যতদিন না তাদের কাছে আল্লাহর আদেশ ও আনন্দের মূহূর্তটা আসে এবং জালিমরা জেনে নেয় যে, তার কোন মহাসংকটের জায়গায় যাচ্ছে।

পেছনে থেকে যাওয়া তিন সাথি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবার কথা উল্লেখ করেছেন, যেন আমরাও তাদের মতো তাওবা করে সে সকল সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'আর তিনি অনুগ্রহ করলেন ওই তিনজনের প্রতিও যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল২৩৭ তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধীভূত হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই, আশ্রয় কেবল তাঁরই কাছে। এরপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তাঁর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ অতিশয় তাওবা কবুলকারী, বড়ই দয়ালু। ২৩৮
এ আয়াতের পর এ আহ্বানটি শোনো-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'২৩৯
সহিহ বুখারিতে তাদের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। আমি এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করব।
নবিজি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন সাহাবিদের। ঘটনাটি তাবুক যুদ্ধের। তখন ছিল বেশ গরম। যেতেও হবে বহু দূরে। শত্রুও অনেক এবং বেশ হঠকারীও তারা।
কাব পেছনে থেকে যাওয়া তিনজনের একজন। তিনিই এ হাদিসের বর্ণনাকারী। তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, দৃঢ় ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে আমি সে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকিনি। বরং গড়িমসি করার কারণে এমনটা হয়েছিল। রাসুল তাঁর সাথিদের নিয়ে যখন মদিনা ছেড়ে গেলেন, তখনও আমি মনে মনে বললাম, “আগামীকাল রওয়ানা হয়ে তাদের সাথে গিয়ে মিলিত হব।” কিন্তু আমি পারলাম না তা করতে। আমি ইচ্ছা করছিলাম সফর শুরু করেই তাদের সঙ্গ নিয়ে নেব। কিন্তু হায়, আমি আর তা পারলাম না! ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো।
রাসুল তাবুক থাকাকালীন অন্যদের কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তখন এক লোক বলল, "আল্লাহর রাসুল, তাকে তার ধন-সম্পদ ও আত্মঅহংকার আসতে দেয়নি।” তখন মুআজ বিন জাবাল বলেছিলেন, “তুমি ঠিক বলোনি। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে ভালোই জানি।”
আজ মুসলিমদের মাঝে নিজ ভাইদের মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য চেষ্টা কোথায়?
কাব বলেন, 'আমি যখন জানতে পেলাম, রাসুল তাবুক থেকে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা করেছেন। তখন চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরল। আমি বলার মতো মিথ্যা অজুহাত খুঁজতে শুরু করলাম। আগামীকাল এমন কথা বলব, যাতে রাসুলের রাগ ঠান্ডা হয়ে যায়।
কিন্তু যখন জানতে পারলাম, রাসুল মদিনায় চলে এসেছেন, তখন আমার মন থেকে এ ভ্রান্ত চিন্তা দূর হয়ে গেল। আমি মনে মনে স্থির করলাম, যে কথায় মিথ্যার এতটুকু লেশ আছে, তা দিয়ে আমি কখনো রাসুলের রাগ প্রশমিত করব না। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম সত্য বলার।
জিহাদ থেকে পেছনে থাকা লোকগুলো আসতে থাকল। তারা এটা সেটা বলে ওজর পেশ করতে থাকল, শপথ করতে থাকল। সংখ্যায় তারা ছিল ৮০ জনের অধিক। রাসুল তাদের থেকে তাদের প্রকাশ্য অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। আর তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলেন।”
শোনো, আমার প্রিয় ভাই ও বোন, আল্লাহ প্রকাশ্য অবস্থার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। বরং তিনি মানুষের ভেতরের অবস্থা অনুযায়ী তাদের পরিমাপ করেন।
কাব বলেন, 'সবশেষে আমি আসলাম। সালাম দিলে তিনি মুচকি হাসলেন। কিন্তু সে হাসিতে সন্তুষ্টি ছিল না। এগিয়ে গিয়ে আমি তার সামনে বসলাম। তিনি আমাকে বললেন, "কেন তুমি পেছনে থেকে গেলে? তুমি কি বাহন ক্রয় করোনি?"
আমি বললাম, “আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি যদি দুনিয়ার অন্য কারও সামনে বসতাম এখন। তাহলে কোনো না কোনো আপত্তি পেশ করে তার ক্রোধ থেকে বের হয়ে আসতাম। আর আমি তর্কে বেশ পটুও। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি জানি, আজ যদি আপনার সামনে মিথ্যা বলে আপনাকে সন্তুষ্টও করি। এমন একদিন অচিরেই আসবে, যেদিন আল্লাহ আপনাকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
যদি সত্যটা বলি, তবে অবশ্যই তা আপনাকে অসন্তুষ্ট করবে, কিন্তু আশা করি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন...."
প্রিয় সুধী,
অমুক-তমুকের কাছে মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, মিথ্যা হাসি হেসে তার থেকে নিজের কাজ সারতে পারবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে মিথ্যা বলে কিছুই নিতে পারবে না। তাঁর কাছ থেকে কিছু নিতে হলে, মুক্তি পেতে হলে তোমাকে আল্লাহর সাথে অবশ্যই সততা বজায় রাখতে হবে।
কাব বললেন, "আল্লাহর শপথ, আমার কোনো ওজর ছিল না। আমার পিছিয়ে থাকার সময়টাতে আমি যতটা সচ্ছল ও শক্তিশালী ছিলাম, এর আগে এতটা সচ্ছল ও শক্তিশালী কখনোই ছিলাম না।”
রাসুল বললেন, “সত্য বললে। এখন চলে যাও, যত দিন না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেন।"
আমি উঠে আসলাম। কিছু লোক আমাকে তিরস্কার করল। বলল, “তুমি অন্যদের মতো ওজর দেখাতে পারতে। তোমার জন্য নবিজি-এর ক্ষমাপ্রার্থনাই যথেষ্ট ছিল।"
আমি তাদের বললাম, "আমার মতো কি অন্য কেউ এমনটা করেছে?"
তারা জবাব দিল, “হ্যাঁ। তোমার মতো আরও দুজন এমন বলেছে। মুরারা বিন রবিআ আমিরি আর হিলাল বিন উমাইয়া।"
তাদের কথা শুনে আমি অটল রইলাম আগের মতো। এদিকে রাসুল মুসলিমদের নিষেধ করে দিয়েছেন, যে তিনজন তাবুকে অংশগ্রহণ করেনি, তাদের সাথে যেন কেউ কথা না বলে।
মানুষজন আমাদের পরিত্যাগ করল। আমাদের সাথে তাদের আচরণ পাল্টে গেল। এমনকি মনে হচ্ছিল, এ যেন চেনা-পরিচিত সে পৃথিবী নয়। এতদিনের পরিচিত পৃথিবী অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমাদের ৫০ দিন কেটেছিল।
আমার মতো অন্য দুজন ভেঙে পড়েছিল। ঘরে বসে তারা কাঁদতে থাকল। আমি তাদের চাইতে অধিক যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম। আমি ঘর থেকে বের হয়ে নামাজের জামাআতে শরিক হতাম, বাজারে ঘুরাফেরা করতাম, কেউ আমার সাথে কথা বলত না। নামাজ শেষে রাসুল-কে তাঁর বসার স্থানে এসে সালাম দিতাম। নিজেকে নিজে বলতাম, "আমার সালামের উত্তরে কি রাসুল ঠোঁট নাড়িয়েছেন না নাড়াননি?” আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম। গোপনে আড়চোখে তাকাতাম তাঁর দিকে।
আমার প্রতি অন্যদের এ কঠোরতা অনেক দিন চলল। এমনকি একদিন আমি আমার প্রিয় চাচাতো ভাই আবু কাতাদার বাগানপ্রাচীর টপকে ভেতরে গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু সে আমার সালামের উত্তর দিল না।
আমি তাকে বললাম, “আবু কাতাদা, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি?”
সে চুপ করে থাকল। আমি আবারও একই কথা বললাম আল্লাহর কসম দিয়ে। কিন্তু সে কিছুই বলল না। এরপর আবারও আল্লাহর কসম দিয়ে একই কথা বললাম। তৃতীয়বার সে এতটুকু বলল যে, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।” তখন আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বাগানপ্রাচীর টপকে সেখান থেকে চলে এলাম আমি।
আরেক দিনের কথা। আমি বাজারে হাঁটছিলাম। তখন শুনলাম, সিরিয়া থেকে আগত খাবারবিক্রেতা এক বেনিয়া আমার সম্পর্কে জানতে চেয়ে লোকদের বলছে, “কেউ কি আমাকে কাব বিন মালিকের সন্ধান দেবে?”
লোকেরা তখন ইশারা করল আমার দিকে। লোকটা আমার কাছে এসে হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। চিঠিটা গাসসানের রাজার। তাতে লেখা, 'আমার কাছে খবর এসেছে যে, আপনার সঙ্গী আপনার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে এমন লাঞ্ছনা ও অপমানের মাঝে থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনার পাশে আছি।'
চিঠি পড়ে আমি বললাম, “এটা আরেকটা পরীক্ষা।” উনুন খুঁজতে থাকলাম তখন আমি। চিঠিটা উনুনে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হলাম।'
বান্দাকে তার ইমানের পরিমাণ অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি কারও ইমান কঠিন হয়, তবে তার ওপর কঠিন বিপদ আপতিত হয়, কঠিন পরীক্ষায় পরীক্ষিত হয় সে। যদি তার ইমান স্বল্প হয়, তবে তাকে সহজ বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
কাব বলেন,
'আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা আসার অপেক্ষায় এ শান্তি অবস্থায় ৪০ দিন অতিবাহিত করার পর রাসুলের পক্ষ থেকে একজন দূত আসলো। সে আমাকে জানাল, "স্ত্রী থেকে পৃথক হওয়ার জন্য রাসুল আপনাকে আদেশ দিয়েছেন।"
আমি তাকে বললাম, “আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, না অন্য কী করব?”
সে বলল, “না, পৃথক থাকুন। তার নিকটে যাবেন না।”
আমার মতো অন্য দুজনকেও একই আদেশ দেওয়া হলো। আমি স্ত্রীকে ডেকে বললাম, “তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত সেখানে থাকো।"
অন্যদিকে হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী নবিজি-এর কাছে গিয়ে বলল, "আল্লাহর রাসুল, হিলাল বিন উমাইয়া বয়োবৃদ্ধ মানুষ। তার কোনো সেবক নেই। আমি যদি তার সেবা করি, আপনি কি অপছন্দ করবেন তা?” রাসুল জবাব দিলেন, “না, তবে সে যেন তোমার (বিছানায়) নিকটবর্তী না হয়।” হিলালের স্ত্রী বলল, “আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। এ সম্পর্কে তার কোনো অনুভূতি নেই। শুরু থেকে আজও তিনি কেঁদেই যাচ্ছেন।”
এমনই হয় পুণ্যবানদের অবস্থা। তাদের চোখের পানি সর্বদা রাত-দিন ঝরতে থাকে। কাব বলেন,
'আরও দশ রাত পরের কথা। সেদিন ৫০ রাত পূর্ণ হলো আমার শান্তির। সেদিন সকালে ফজরের নামাজ আদায় করে আমাদের একটি ঘরের ছাদে বসে আছি আমি। যে অবস্থার কথা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। যে পৃথিবীটা প্রশস্ত ছিল অনেক, তা আমার জন্য তখন ছিল সংকীর্ণ। কিন্তু সেদিন সাল' পর্বতের ওপর থেকে একটা উচ্চ আওয়াজ আমার কানে আসে-
"ওহে কাব বিন মালিক, সুসংবাদ গ্রহণ করো!"
সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেলাম আমি। আমার মুক্তিসংবাদ এসে গেছে। আজ আমি মুক্ত হয়েছি। আমাদের তাওবা আল্লাহ গ্রহণ করেছেন বলে রাসুল এই ফজরের নামাজের পর মানুষের সামনে ঘোষণা দিলেন।... মানুষজন আমাকে ও আমার দুই সাথি হিলাল ও মুরারাকে সুসংবাদ জানাতে আসতে লাগল।... আমার কাছে সুসংবাদদাতা যখন এল, তখন আমি নিজের কাপড় খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম, সেগুলো ছাড়া অন্য কিছু আমার মালিকানায় ছিল না তখন। এরপর দুটো কাপড় ধার করে নিয়ে পরে নিলাম আমি।
এরপর আমি রাসুল -এর কাছে আসতে লাগলাম। মানুষজন আমার সাথে দলে দলে সাক্ষাৎ করতে লাগল। তারা আমাকে তাওবা কবুলের অভিনন্দন জানিয়ে বলতে লাগল, “আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করেছেন, তাই তোমাকে সাধুবাদ।” এরপর আমি এসে মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ উঠে এল আমার দিকে। তিনি দ্রুত উঠে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং সাধুবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তালহার সে আচরণ আমি কখনো ভুলব না....
আমি রাসুল -কে সালাম দিলাম। দেখলাম, তাঁর চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। তিনি যখন আনন্দিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা এত সুন্দর হতো যে, মনে হতো এক টুকরো চাঁদ। তিনি আমাকে বললেন, “সুসংবাদ গ্রহণ করো উত্তম এক দিনের, যেদিনটি তোমার জন্মের পর থেকে অতিবাহিত দিনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উত্তম।"
আমি তখন বললাম, “এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে না আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে?"
তিনি বললেন, “বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে।” যখন আমি তাঁর সামনে বসলাম, বললাম, “আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ আমাকে আমার সত্য বলার কারণে মুক্তি দিয়েছেন। আর আমার তাওবার সত্যতা দাবি রাখে যে, যত দিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন মিথ্যা বলব না কখনো।" আল্লাহর কসম, সত্য বলার পরও কোনো মুসলিমকে এতটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি, যতটা যেতে হয়েছে আমাকে।'
হে মুমিন-মুমিনা যারা তাওবা করেছ, তারা চিন্তা করো রাসুলের এ বাণী নিয়ে أَنْتُمْ خَيْرُ يَوْمٍ مَرَّ عَلَيْكَ مُنْذُ وُلِدَتْكَ أُمُّكَ : দিনের, যেদিনটি তোমার জন্মের পর থেকে অতিবাহিত দিনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উত্তম।"২৪০ আল্লাহ! কত সুন্দর তাওবা! কত সুন্দর প্রত্যাবর্তন! তাওবা একটা পরীক্ষা। যার মাধ্যমে যে ধ্বংস হওয়ার সে সুস্পষ্টরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, আর যে বেঁচে যাওয়ার সে সুস্পষ্টরূপে বেঁচে যায়।
প্রিয় সুধী,
যারা তাদের তাওবাতে সত্যবাদী, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেছেন, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাদের মুক্ত করেছেন গুনাহ থেকে। শোনো, তোমাদের তাওবার কিছু প্রভাব দেখাই। যারা সত্য তাওবা করে ছিল, তাদের কেউ কেউ কৃত গুনাহের কারণে মৃত্যু পর্যন্ত অনুশোচনা করতে থাকত। মৃত্যুবরণ করলেই তবে তাদের অনুশোচনা তাদের সাথে দাফন হতো। কেউ কেউ মানুষকে ত্যাগ করে একাকী হয়ে বাড়ির ভেতরে কান্নায় ভেঙে পড়ত, চিৎকার করে করে কাঁদতে থাকত। কেউ কেউ আকাঙ্ক্ষা করতেন, যদি তিনি মাটি হতেন, তবে তার গুনাহের কারণে আল্লাহর হিসেবের সম্মুখীন হতে হতো না। কেউ কেউ তার গালে মাটি মাখিয়ে দিতেন, যাতে তিনি লাঞ্ছনা অনুভব করেন এবং আল্লাহ তাআলা তার এ রকম অবস্থা দেখে তার ওপর রহম করেন। কেউ কেউ ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নিজেকে কাবার গিলাফে জড়িয়ে নিতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। তাদের কেউ কেউ মরুভূমিতে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকতেন এ কথার ওপর যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল না করলে তিনি বাড়ি ফিরবেন না, অতঃপর আল্লাহ তার তাওবা কবুল করতেন। তাদের কেউ কেউ আল্লাহর কোনো ঘরে ইতিকাফ করতে থাকতেন, আল্লাহর জিকির করতেন, কুরআন তিলাওয়াত করতেন, রুকু-সিজদায় কান্নায় ভেঙে পড়তেন, তার দুচোখে বেয়ে পড়ত লজ্জার অশ্রু। তাদের কেউ কেউ লজ্জায় কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে থাকতেন আর এ অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যেতেন। আবার কেউ কেউ আল্লাহর ভয়ে এক বিকট চিৎকারে মৃত্যুবরণ করতেন। কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদতে এতটা বিলীন হয়ে যেতেন যে, দগ্ধ কাঠের মতো মরে পড়ে থাকতেন।
প্রিয় সুধী,
আমি এতক্ষণ যা উল্লেখ করলাম, এগুলোতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পাপ কাজের কারণে আল্লাহর ভয় মুমিনদের অন্তরকে এতটা আন্দোলিত করত, যেন ভয়ের কারণে তাদের হৃদয় সেখান থেকে খুলে পড়ে যেত। আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে ভয়ের বজ্রপাত কতটা জোরে তাদের অন্তরে আঘাত হানত! তাদের অন্তরে ভয়ের বজ্রপাতে তা থেকে গাফিলতির মেঘ হটে যেত। তাদের অন্তর-আকাশ থেকে ভয়ের বৃষ্টিপাত হতো আর এভাবে তা পরিষ্কার হয়ে যেত। তাদের অন্তর-আকাশে আলো ফুটে উঠত, ফলে তা আলোকিত হতো। কত সুন্দর বলেছেন সে মহান সত্তা-
يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ
'তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।' ২৪১

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো কিছু ত্যাগ করে
পাপাচারে লিপ্ত ছিল সে। আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে পাপাচারকে বর্জন করল। আল্লাহও তাকে এর বিনিময় দিলেন।...সে ছিল গানবাজনায় লিপ্ত, সংগীতের বিশ্রী দুনিয়ায় মত্ত। এ গুনাহের প্রতি তার মোহ যে জিনিসটা বাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত তার সুন্দর ও মিষ্টি কণ্ঠ। যে কণ্ঠে গান গেয়ে মানুষের অনুভূতিতে কম্পন তুলত সে। সে কিন্তু গান হারাম হওয়া ও তার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করত না। তার একমাত্র চিন্তা ছিল কীভাবে খ্যাতি লাভ করা যায়, কীভাবে মানুষের দৃষ্টি কাড়া যায়।
ভ্রান্তিময় খ্যাতির পেছনে ছুটে চলল সে। গানের একটা এলবামও বের করল। এলবামের সিডি পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিলাতে থাকল। একদিন তার এক আত্মীয় এল তার সাক্ষাতে। বহু দূরের একটি শহর থেকে। তার সাথে ছিল একজন নেককার যুবক। দুজনই তার কাছে রাত কাটাল। যুবকটা যখন তার গান ও সুন্দর কণ্ঠের ব্যাপারে জানল, সে বলল,
'হায়, যদি এ সুন্দর সুর শয়তানের বাঁশির পেছনে ব্যয়িত না হয়ে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য উৎসর্গিত হতো! তুমি কি আল্লাহর বাণী শোনোনি—
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا - قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا - قَالَ اذْهَبْ فَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ فَإِنَّ جَهَنَّمَ جَزَاؤُكُمْ جَزَاءً مَوْفُورًا - وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتَكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا - إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا
'স্মরণ করুন, যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, “আদমকে সিজদা করো”, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই তাকে সিজদা করল। সে বলেছিল, "আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে আপনি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন?” সে বলল, “আপনি কি ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন যে, আপনি এ ব্যক্তিকে আমার ওপর সম্মান দিচ্ছেন! আপনি যদি আমাকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তাহলে আমি অল্প কিছু বাদে তার বংশধরদের অবশ্য অবশ্যই আমার কর্তৃত্বাধীনে এনে ফেলব।” তিনি (আল্লাহ) বললেন, “চলে যা, অতঃপর তাদের মধ্যে থেকে যে তোর অনুগামী হবে, জাহান্নামই হবে তাদের সবার প্রতিফল, পূর্ণ প্রতিফল। তুই সত্যচ্যুত কর তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, স্বীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের আক্রমণ কর, তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে শরিক হয়ে যা এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দে। ছলনা ছাড়া শয়তান তাদের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। আমার বান্দাদের ব্যাপার হলো, তাদের ওপর তোর কোনো আধিপত্য চলবে না।" কর্ম সম্পাদনে আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট।'২৪২
এ কথা ও আয়াতগুলো তার অন্তরে দাগ কাটল। তার অন্তর সায় দিল। রাত যখন গভীর হলো, সবাই শুয়ে পড়ল। কিন্তু সময়টা তো তাওবাকারীদের জাগরণের সময়। সাক্ষাৎ করতে আসা সে আত্মীয় বলে, 'রাত ঘনিয়ে এলে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম। পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে গেল। তখন হঠাৎ করে কারও কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙল। পাশে তাকিয়ে দেখি, সে গায়ক আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে আছে! নামাজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! আল্লাহর অবাধ্যতায় যে গুনাহ হয়ে গেছে, সে জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছে! আমি এ দৃশ্য দেখে আনন্দিত হলাম। তার লজ্জা ও ক্রন্দনে আনন্দিত হলাম। সে তার অতীত ছেড়ে আল্লাহর কাছে ভবিষ্যতের আশায় অগ্রসর হয়েছে। আল্লাহ তাকে বিনিময় দিলেন। তার ছেড়ে আসা জিনিসটির তুলনায় উত্তম কিছু দান করলেন। সে কুরআনকে ভালোবাসতে শুরু করল। সকাল-সন্ধ্যা কেবল কুরআনের সাথে। রাত-দিন কুরআন তিলাওয়াতে। কুরআনের ইলম ও বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিখতে শুরু করল সে। এমনকি এ বিষয়ে ইমাম ও কারি হয়ে উঠল। শ্রুতিমধুর তিলাওয়াত ও নামাজের খুশুর মাধ্যমে সবার মধ্যমণি হয়ে উঠল সে।'
মহান সে সত্তা, যিনি অবস্থার পরিবর্তন করেন। এ মানুষটা সত্য তাওবা করলেন, আল্লাহও তার সাথে সততা বজায় রাখলেন। সে আল্লাহর জন্য তার প্রিয় জিনিসটি ছেড়ে এল। বিনিময়ে আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করলেন তাকে। কুরআনের চেয়ে উত্তম আর কোনো বিনিময় হতে পারে? কুরআনের চেয়ে সুন্দর আর কোনো বিনিময় হতে পারে?
আল্লাহ! কত সুন্দর তাওবা! কত সুন্দর প্রত্যাবর্তন!
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُبْصِرُونَ
'যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে।' ২৪৩
প্রিয় ভাই ও বোন,
শোনো, ছোট ছোট গুনাহ কয়েকটা কারণে বড় আকার ধারণ করে। ছোট গুনাহ বড় আকার ধারণ করে গুনাহ করে যাওয়া ও গুনাহের ওপর অটল থাকার কারণে। তাই বলা হয়, ‘ছোট গুনাহ অব্যাহতভাবে করতে থাকলে, সেটা আর ছোট থাকে না। আর ইসতিগফার করলে বড় গুনাহও মিটে যায় সহজে।’
মুহাম্মাদ বিন সিরিন বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি কৃত গুনাহের কারণে কাঁদি না। বরং আমি সে গুনাহর কারণে কাঁদি, যেটাকে আমি ছোট মনে করেছিলাম, কিন্তু আল্লাহর কাছে তা (অপরাধ হিসেবে) অনেক বড়!’ কোনো গুনাহকে ছোট মনে করলে সেটা আর ছোট থাকে না। বান্দা যখন কোনো গুনাহকে গুরুতর মনে করে, তখন সে গুনাহ আল্লাহর কাছে ক্ষুদ্র-নগণ্য হয়ে যায়। আর যখন বান্দা কোনো গুনাহকে ক্ষুদ্র মনে করে, আল্লাহর কাছে সে গুনাহ গুরুতর হয়ে যায়।
হাদিসে এসেছে। রাসুল বলেন: إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدُ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ
‘মুমিন তার গুনাহগুলোকে এত বিরাট মনে করে যে, যেন সে একটা পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর সে আশঙ্কা করে যে, পাহাড়টা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মনে করে নাকের ওপর উড়ে আসা একটা মাছি।’২৪৪
আল্লাহ তাআলা তাঁর এক নবিকে বলেন, ‘গুনাহের ক্ষুদ্রত্বের দিকে তাকিয়ো না; বরং আমার বড়ত্বের প্রতি তাকাও। তখন আমার অবাধ্যতা গুরুতর মনে হবে।’
যে গুনাহগার গুনাহে লিপ্ত হয়ে আনন্দিত হয়, গুনাহ নিয়ে বা গুনাহের আলোচনা করে গর্ববোধ করে—তার সে গুনাহ বড় আকার ধারণ করে। তারা মনে করে গুনাহ করতে পারা নিয়ামত। কিন্তু তারা জানে না, গুনাহে লিপ্ত হওয়া গাফিলতি ও দুর্ভাগ্য।
হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমরা। আমাদের অবস্থা সংশোধন করে দিন। আমাদেরকে নিজেদের ওপর সোপর্দ করবেন না এক মুহূর্তের জন্যও।
যখন গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক গুনাহ গোপন রাখা, তাঁর সহনশীলতা, তাঁর অবকাশকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তখন গুনাহ আর ছোট থাকে না, সে গুনাহ বড় গুরুতর হয়ে যায়। হায়, তারা তো বুঝতে পারে না আল্লাহ কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিয়েছেন, একেবারে ছেড়ে দেননি!
أَفَأَمِنُوا مكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
'তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউই নির্ভয় হতে পারে না।'২৪৫
গুনাহ তখনও গুরুতর হয়ে যায়, যখন গুনাহগার প্রকাশ্যে গুনাহ করতে থাকে। কারণ সে নিজের গুনাহের ওপর আল্লাহর দিয়ে রাখা পর্দাকে লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে গুনাহ করে এবং মানুষকে মন্দের প্রতি উসকে দেয়।
এরচেয়েও বড় কারণ হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি লজ্জা কমে যাওয়া। রাসুল বলেন:
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا المُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ، فَيَقُولَ: يَا فُلَانُ، عَمِلْتُ البَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
“গুনাহের কথা প্রকাশকারীরা ব্যতীত আমার উম্মতের সকলকেই ক্ষমা করা হবে। আর মুজাহারাহ বা গুনাহের কথা প্রকাশ করার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি রাতের বেলায় গুনাহ করার পর আল্লাহ তাআলা তা গোপন রাখেন। অতঃপর যখন সকাল হয়, তখন সে বলে, “হে অমুক, গতরাতে আমি এই এই কাজ করেছি।” অথচ সে গুনাহের কথা প্রকাশ করার পূর্ব পর্যন্ত রাতের বেলায় আল্লাহ তাআলা তা গোপন রেখেছিলেন। আর সকালবেলা আল্লাহর গোপন রাখা বিষয়টি সে নিজেই প্রকাশ করে দিয়েছে।”২৪৬
জনৈক সালাফ বলেন, 'কখনো গুনাহ করবে না। যদি গুনাহ করেও ফেলো, তবুও কাউকে গুনাহর প্রতি উৎসাহ দেবে না। যদি এমনটা করো, তবে তুমি মুনাফিকদের মতো হয়ে যাবে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ
'মুনাফিক পুরুষ আর মুনাফিক নারী সবারই গতিবিধি একরকম, তারা অন্যায় কাজের নির্দেশ দেয় আর সৎ কাজ করতে নিষেধ করে।'২৪৭
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সেসব থেকে মুক্ত রেখেছেন, যেগুলোতে অনেক মানুষ পরীক্ষিত হয়ে আছে। যিনি আমাদেরকে অনেকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন।

ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা
তোমাদের সামনে একটি ঘটনা বর্ণনা করব, যার শিরোনাম হচ্ছে, 'ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা।' ঘটনাটি ছোট করে বলব। এ ঘটনায় আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে।
তার নাম ফাতিনা (প্রলুব্ধকারী)। সে তার নামের মতোই। দ্বীন ছাড়া অন্য সবে শিক্ষিত সে। তার কাছে দ্বীন হচ্ছে একটা সুন্দর মনের অধিকারী হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তুমি ভালো মনের অধিকারী—এবার তুমি যার সাথে ইচ্ছা মিলিত হও। যা ইচ্ছা পরতে পারো। যা ইচ্ছা করতে পারো।
এক রাতে কলেজে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে একত্রিত হলো সে ও তার বান্ধবীরা। যেটা এমন এক অনুষ্ঠান, যার পক্ষে আল্লাহ কিছু নাজিল করেননি অর্থাৎ শরিয়তে এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের কোনো ভিত্তি নেই। যেটা আমরা কাফিরদের থেকে নিয়েছি তাদের সাথে মিল রেখে, তাদের অনুগত হয়ে। অথচ ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে...।’২৪৮ বাকিটা তোমরা জানো।
সুন্দর করে সেজেগুজে সবচেয়ে সুদর্শনা হয়ে আসলো সে।... পুরো জায়গাটা জুড়ে ঘুরতে লাগল। এখান-ওখান থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছিল। সে সবাইকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কি জানো, আমাদের অনুষ্ঠানের মাঝে কমতি কোন জায়গায়?' সবাই নিজের মতো করে উত্তর দিল আর সে 'না।...না...।' বলতে থাকল। একই প্রশ্ন এভাবে জিজ্ঞেস করতেই থাকল। এরপর হেসে নিজেই উত্তর দিল, 'আমাদের এ অনুষ্ঠানের কমতি হচ্ছে সে মহাপুণ্যবতী।' তার কথায় হাসির রোল উঠল। তখন তাদের একজন প্রতিবাদ করে বলল, 'কেন তোমরা এভাবে হাসছ? কেন এ হাসি-ঠাট্টা একজন পুণ্যবতীকে নিয়ে? সে কি আমাদের সহপাঠী নয়? সে কি আমাদের কলেজে আমাদের বন্ধু নয়! কিছু কাল আগেও সে কি আমাদের একজন ছিল না, আমাদের নাইটপার্টির একজন ছিল না? যদিও এখন সে নামাজ ও কুরআন নিয়ে তার ইবাদতগাহে আছে। আখিরাতের তালাশে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। তোমরা কেন তাকে নিয়ে এমন করছ?'
সবাই তখন ফাতিনার প্রশ্নটা ভুলে এ কথায় লেগে গেল। আরেকজন বলে উঠল, 'আমরা তার কাছে গিয়েছিলাম। তাকে ইনভাইট করেছিলাম বার্থডে পার্টির। কিন্তু সে না করে দিল! উল্টো দীর্ঘ একটা লেকচার দিল চরিত্র, দ্বীন, অভ্যাস ও সমাজের ওপর!'
ফাতিনা বলে উঠল, 'পুণ্যবতী উলিয়া, না ছাই! আস্ত একটা গাধি!...আগে যেমন ছিল সেটাই ভালো ছিল। বুদ্ধিমতী ছিল, স্বাধীন ছিল ধর্মের পাগলামি ধরার আগে। এখন আর সে আমাদের মাঝে নেই।'
সুবহানাল্লাহ, দ্বীন কি না পাগলামি হয়ে গেছে!
ফাতিনা তার কথা চালিয়ে গেল, 'হ্যাঁ, সে আস্ত একটা গাধি! দ্রুত গতিতে সে পরিবর্তন হয়ে গেল। চিন্তা বদলে গেল। হুলিয়া পাল্টে গেল। কাপড় বড় হয়ে গেল। এখন তো তাকে বুড়ির মতো লাগছে। যেন সে জানেই না, যত কম কাপড়, তত ভালো। তার চাইতে আশ্চর্য হচ্ছি তার চুল দেখে। চুল নাকি ঢেকে রাখতে হবে একটা কালো বিচ্ছিরি কাপড়ের নিচে! নির্বোধ একটা! জানে না যে, আল্লাহ কেবল মানুষের মন দেখেন। এ ছাড়া যত যা আছে, সবই ঢং।'
আল্লাহু আকবার, পর্দা করা, দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা নাকি ঢং! আল্লাহ তাআলা এসব টিভি-চ্যানেল ধ্বংস করুন। যেগুলোর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে এ প্রজন্মের ওপর।
ফাতিনা বলতে থাকল, 'সে আমাদের ভয় দেখায় জাহান্নামের। বলে, আল্লাহ দেহের উলঙ্গ অংশ জাহান্নামে পোড়াবেন। আমাদের ভয় দেখায় মৃত্যুর নামে ও আরেকটা আছে না হিসাব বলে! তোরা শুনে নে, মূলত সে পুরুষদের কুটচালে আটকা পড়েছে। নারীর স্বাধীনতা ভুলে গেছে। দ্বীনদারি এসব তার ঢং।'
তখন উপস্থিত একজন বলে উঠল, 'সংশয়ের খপ্পরে পড়ে তার এ অবস্থা। সে ভুলে গেছে, পুরুষ-নারী দুজন দুজনার জন্য। কোথায় তার স্বপ্ন হবে তার প্রেমিককে নিয়ে। সে কিনা এসব ভুলভাল করছে। হতভাগী! মুর্খ! এমন ভরা যৌবনে মতিভ্রম ঘটেছে তার। তাকে বাঁচানোর জন্য আমাদের কিছু করা উচিত।'
হায়, এসব হতভাগী বুঝতে পারছে না, তারাই তো হতভাগী! তাদেরই তো বাঁচানো প্রয়োজন আরেকজন এসে।
এরপর বিভিন্নজনের স্বর উঁচু হতে লাগল, অবশ্যই তাকে এ ভুল থেকে বাঁচাতে হবে। ইবাদত করে করে, বেশি বেশি নামাজ পড়ে, অধিক কুরআন তিলাওয়াত করে শেষ করে দিচ্ছে নিজের যৌবনকে। না বাজারে যায়, না কোনো অনুষ্ঠানে যায়, ঘর থেকে পর্যন্ত বেরোয় না....
আহা! দ্বীন নিয়ে এ কেমন বোধ-উপলব্ধি তাদের! দ্বীন তাদের কাছে ফূর্তি ও উদ্ভট স্বাধীনতার নাম। তারা বলছে মৃত্যু কত দেরি। কিন্তু মৃত্যু তো তাদের খুব কাছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে, 'এখন তো ভরা যৌবন! এখন মরব নাকি! মৃত্যু তো বুড়িয়ে গেলে তবেই...।' হায়, এত বড় অজ্ঞতা! এত দীর্ঘ দুরাশা! যার আশা দীর্ঘ হয়, তার আমল মন্দ হয়। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন:
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'আপনি ছেড়ে দিন তাদের। তারা খেয়ে নিক আর ভোগ করে নিক। আর আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে।'২৪৯
অনুষ্ঠান শেষ হলো। কয়েকটা বছর কেটে গেল। ফাতিনা পাস করে বের হলো। সে পুণ্যবতীও পাস করে বের হলো এবং দ্বীনের পথে অটল থাকল।
এরপর ফাতিনার কী হলো? সে পুণ্যবতীরই বা কী হলো? আসো, মনোযোগ দাও, আমরা অন্য জায়গা থেকে গল্পটা শুনতে থাকি।
কোনো এক হাসপাতাল। ৪র্থ তলায়। একটা কক্ষ থেকে ভেসে আসছে রোগিনীর কান্নার আওয়াজ। পুরো কক্ষটা কান্নার আওয়াজে গমগম করছে। এ রোগিনী কয়েকটা মাস ধরেই এখানে আছে। ডাক্তাররা তার অবস্থা দেখে হতাশ এখন। আর তার কান্নার আওয়াজও হাসপাতালের অন্যদের কাছে গা সওয়া হয়ে গেছে। কেউই তার জন্য কোনো কিছু করতে সক্ষম নয়। তার কান্নার আওয়াজ নার্সরাও মানিয়ে নিয়েছে। এদিকে নতুন ডিউটি মহিলা ডাক্তারের কানে এ কান্নার আওয়াজ যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভুলতে পারছে না সে। কিছুতেই মাথা থেকে সরিয়ে দিতে পারছে না সে কান্নার ব্যাপারটা। তার অন্তর দয়া-অনুগ্রহে ভরা। এমনটাই তো হয়ে থাকে ইমানে ভরা অন্তর।
সে কিছু ওষুধ আর ঘুমের বড়ি হাতে নিল। সে ওই রোগিনীর কক্ষে প্রবেশ করল। দরজার চৌকাঠ থেকেই বেডের ওপর শোয়া রোগিনীকে দেখা গেল।
অনেক দিন পরে দেখা হলো। এগিয়ে এসে রোগিনীর নার্ভ চ্যাক করল। দুর্বল, প্রায় বন্ধ। শ্বাসক্রিয়া দেখে নিল একবার। খুব অস্পষ্টভাবে শ্বাস নিচ্ছে। তার পাশে এসে বসল সে। শরীরে যেন ভালো অনুভূতি আসে, এ জন্য কিছু খাইয়ে দিল। একটুপর রোগিনীর জ্ঞান ফিরল। সোজা হয়ে খাটে বসল সে। পুরো ঘর ঘুরে এল তার দৃষ্টি। সবশেষে দৃষ্টি এসে ঠেকল ডাক্তারের চেহারায়। রোগিনী তার দুর্বল দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তার উত্তেজনা বাড়তে লাগল। ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল, 'আমি আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কে? তুমি কে?' ডাক্তার বলল, 'জি মা, আমি ডাক্তার।' রোগিনী বলল, 'আমি তোমার পেশা জানতে চাইনি। তোমার নাম জানতে চাচ্ছি। আল্লাহর দোহাই, তুমি কি উলিয়া নও?' ডাক্তার বিস্ময় নেত্রে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আমি উলিয়া।' এ কথা শুনে হঠাৎ করে রোগিনী তার হাতদুটো বাড়িয়ে উলিয়াকে জড়িয়ে ধরল, তাকে চুমু খেল, কান্নায় ভেঙে পড়ল। এদিকে উলিয়ার বিস্ময় বাড়তেই লাগল। বিস্ময়ে তার চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল। কে এ মহিলা? সে পাগল নাকি? কীভাবে সে আমাকে চিনল? এর আগে কখনো তার সাথে আমার দেখা হয়নি। তার চিকিৎসায় আসিওনি আমি। প্রথমবারের মতো আসলাম তার কাছে। আজই তো প্রথম রাত এ হাসপাতালে আমার। আজই তো এখানে জয়েন হলাম আমি ডিউটি ডাক্তার হিসেবে।
উলিয়া তার মাথা তুলে পেছনে নিয়ে গেল। হতবাক হয়ে রোগিনীর দিকে তাকিয়ে থাকল। সে বুঝতে পারছে না এ মহিলা করছে কী! উলিয়া মুখ খুলল এবার। জানতে চাইল 'আপনি কে খালা? আপনি কীভাবে আমার নাম জানেন? আমরা কি পূর্বপরিচিত?' কান্নায় রুদ্ধস্বরে মহিলাটি জবাব দিল, 'হ্যাঁ, উলিয়া, আমরা এর আগে বহু বহুবার মিলিত হয়েছি। তোমার নাম ও তোমার এ অবয়ব আমার মনের মাঝে অঙ্কিত হয়ে আছে। বিশেষ করে তিন বছর আগ থেকে, যখন আমি এ রোগে আক্রান্ত হই, তখন থেকে তোমার নাম-অবয়ব আমার মনে বিশেষভাবে চেপে আসে। আহ! উলিয়া! আহ! আমি সেই নারী যে তোমার গিবত করত, তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত। আমি ফাতিনা!'
কথাগুলো শুনে উলিয়া রীতিমতো ধাক্কা খেল। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। তার মুখে রা সরল না। একটা কথাও সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বলে উঠল, 'আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ফাতিনা?!'
এ তো অসম্ভব। কারণ ফাতিনা তার নামের মতোই কমবয়স্ক, সুন্দর ও সুশ্রী ছিল। ফাতিনা দুর্বল কণ্ঠে বলল, 'হ্যাঁ, আমিই সে, যাকে একসময় ফাতিনা বলে ডাকা হতো।' এবার উলিয়া ফাতিনাকে টেনে বুকের সাথে লাগিয়ে আলিঙ্গনরত হলো। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। কান্না শিথিল হয়ে আসলে ফাতিনা তাদের বিচ্ছেদের সময় থেকে গত সাত বছরের সব গল্প বলতে শুরু করল।
বলল সে, 'স্নাতক করার পর পড়ালেখা শেষ করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। বিলাসী আর উদ্ধত হয়ে পড়ি প্রতিটা বিষয়ে। আমি কখনো আল্লাহর বিষয়ে সন্দেহ করিনি। বরং আমি এ বিশ্বাস রাখতাম যে, আমাকে ভালো মনের হতে হবে, এটাই যথেষ্ট। অনেক যুবক-যুবতির সাথে পরিচিত হলাম। এরপর চাকরিসূত্রে পরিচিত এক লোকের সাথে পরিচিত হলাম। সে আমাকে ভালোবাসত, আমিও তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আমাদের জীবনটা ছিল আল্লাহ থেকে দূরে, উদাসীনতায় ভরা। আমাদের বিয়ের কিছু বছর পর আমাদের কোলে এল সুন্দর একটি মেয়ে। আমি তার নাম রাখলাম, সুজান। আমার বান্ধবীর নামে। তুমি তো তাকে চিনতে। এরপর একসময় আমার পেটে ব্যথা অনুভব হতে থাকে। ডাক্তার জানাল এটা আলসার। চিকিৎসা শুরু হলো। কিন্তু ফল হলো না কিছুই। আমার ব্যথা দিনদিন বাড়তেই লাগল। সাথে সাথে বাড়তে লাগল চিন্তা। এ কঠিন সময়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে আমি আরও বেশি বিলাসিতা-বিনোদনে ডুবে গেলাম। আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে আমি তাঁর থেকে পালাতে থাকলাম। আরও বেশি গাফিলতিতে ডুবে গেলাম। আমার অসুস্থতা বাড়তে লাগল। নতুন ডায়াগনসিসে দেখা গেল, পেটের ভেতর টিউমার। এ টিউমার একটা সময় পর ক্যানসারে রূপ নিল। ক্যানসারের প্রকোপ তীব্র হতে শুরু করল। শেষটায় ক্যানসারের তীব্রতায় এ হাসপাতালের বেডে শুয়ে আমি। এখানে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি আর মৃত্যুর অপেক্ষা করছি। গত চার মাসে আমার মেয়েকে দেখিনি একবারও। তার বয়স এখন চার বছর। স্বামী দুই সপ্তাহ ধরে আমাকে দেখতে আসছে না। আমার কাছে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে করতে সে ক্লান্ত। সম্ভবত সে বিরক্ত হয়ে গেছে বা আমাকে অপছন্দ করছে।'
উলিয়া তার ঘটনা শুনে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। এরপর নিজেকে সংযত করে উঠে গেল ফাতিনার দিকে, তাকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। বলতে লাগল, 'চিন্তা করো না ফাতিনা, চিন্তা করো না। আমি জানি তুমি বেশ শক্ত। তুমি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিজেকে হতাশায় সঁপে দিও না। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করবেন। এমনটা কখনো কখনো পরীক্ষা করার জন্যেও হয়ে থাকে। তুমি নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো। সবর করো। ধৈর্যধারণই শ্রেয়।' ফাতিনা শান্ত হলো। নিজের চেহারা ঢেকে নিল দুহাতে। বলতে লাগল, 'আল্লাহ আমায় ক্ষমা করো। হে আল্লাহ, আমার জন্য কেবল তুমিই আছ। তুমি কি আমায় কবুল করে নেবে না? আল্লাহ, আমাকে তোমার রহমতে ঢেকে নাও। আল্লাহ, এ পরীক্ষা থেকে আমায় মুক্তি দাও। এটা তো স্রেফ পরীক্ষা নয়। এটা প্রতিশোধ সেসবের জন্য, যতবার আমি সেসব আয়াত ভুলে গেছি, যা আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছিল। যতবার আমি আমার নেককার প্রেমময় মায়ের কথাকে অবজ্ঞা করেছি। এটা প্রতিশোধ সেসব লোকের পক্ষে, যাদের আমি গোমরাহ করেছি, ফিতনায় ফেলেছি। হে আল্লাহ, কত যুবককেই না আমি গোমরাহ করেছি, বিশৃঙ্খল করেছি!' এরপর ফাতিনা বলতে শুরু করল, 'আমার মৃত্যু আমাকে নিয়ে নাও। আমার ভুল ধারণা আমাকে কত দীর্ঘকাল থেকেই তো ধোঁকা দিয়ে আসছে। আমি ধারণা করতাম মৃত্যু কেবল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরই হয় আর যুবক-যুবতিরা বেঁচে থাকে। আমাকে আমার দীর্ঘ আশা ধোঁকা দিয়েছে।'
يَا غَافِلاً عَنِ العَمَلْ *** وَغَرَّهُ طُولُ الأَمَل المَوْتُ يَأْتِي بَغْتَةً *** وَالقَبْرُ صُنْدُوْقُ العَمَلُ
'হে আমলের ব্যাপারে উদাসীন, যাকে প্রতারিত করছে দীর্ঘ জীবনের আশা। হঠাৎ শিয়রে উপস্থিত হয় মৃত্যু। কবর হচ্ছে আমলের গুদামঘর।'
এরপর ফাতিনা উলিয়াকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, 'উলিয়া, সত্যি কি কবর অন্ধকারময় জায়গা?!' জিজ্ঞেস করে নিজেই আবার উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, সত্যিই তো। আমি কবরে কেবল আমার নিজের ঠান্ডা পচা শরীরটাই নিয়ে যেতে পারব। সেখানে আমার সাথে আমার পরিবারের কেউ বা কোনো প্রিয়জন থাকবে না। আমার সাথে আমার সম্পদ বা কাপড়চোপড় কিছুই থাকবে না। আমার স্বামীও থাকবে না। বন্ধুবান্ধবরাও থাকবে না। হে আল্লাহ, আমি আমার ছোট্ট সুজানকে ছেড়ে যাব! আমি এখনো কম বয়সের! এখনো জীবনটা সেভাবে উপভোগও করিনি!' এরপর সে নিজের চোখদুটো স্পর্শ করে বলল, 'তোমাদের দুজনকে দিয়ে আমি আলো দেখি। কত যুবককে অধঃপতিত করেছি এ দুটো দিয়ে! সত্যিই কি এ দুটোকে পোকামাকড় খেয়ে ফেলবে আর এগুলো মাটি হয়ে যাবে!'
উলিয়া তাকে দুহাতের ঘেরায় নিয়ে নিল। বুকে জড়িয়ে ধরল। এরপর কুরআন তিলাওয়াত করল এবং তার জন্য দুআ করল। তাকে বলল, 'ব্যস, ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে ফাতিনা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর আরোগ্য দান থেকে নিরাশ হয়ো না।' ফাতিনা বলল, 'আমি তোমার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জানতে চাইছি উলিয়া, আমি যা করেছি, যত অপরাধ করেছি, এরপরও কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?' উলিয়া দৃঢ়কণ্ঠে বলল, 'কেন নয়, আল্লাহর ক্ষমা প্রশস্ত। আল্লাহ তাওয়াবুর রাহিম, তিনি তাওবা কবুলকারী দয়াময়। তুমি শোনোনি, তিনি অপরাধীদের আহ্বান করে বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'বলুন, "হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”২৫০
ফাতিনা বলল, 'তোমার রবের কসম উলিয়া, এরপর থেকে তুমি আমাকে ফাতিনা বলবে না। আমাকে জালিমা বলে ডাকবে। হ্যাঁ, জালিমা বলবে। আমি কত সময় ধরে আমার নফসের ওপর কতটা মারাত্মকভাবে জুলম করে আসছি! আমি নিজের নফসের ওপর অনেক অত্যাচার করেছি।'
এরপর আশ্চর্য এক ক্ষমতায় সোজা হয়ে বসল ফাতিনা। দুহাত আকাশের দিকে তুলে বিনম্রচিত্তে কেঁপে কেঁপে দুআ করতে লাগল, 'হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন আমি প্রত্যাবর্তন করেছি, আপনার অভিমুখী হয়েছি। এখন আমি আপনার দরজায় আসা এক নগণ্য মানুষ। হে আল্লাহ, যদি আমার তাকদিরে সুস্থতা লেখা থাকে, তবে তা-ই দান করুন। এটা তো আপনার কাছে কঠিন কিছু নয়। ডাক্তার-হাকিমরা অসম্ভব বললেও আপনার কাছে তো সবই সম্ভব। হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি সুস্থ হলে আর কখনো আপনার অবাধ্য হব না। হে আল্লাহ, আর যদি আপনি আমার তাকদিরে তাড়াতাড়ি মৃত্যু লিখে থাকেন, তবে হে দয়াময় সাক্ষী থাকুন আমি আপনার রহমত থেকে নিরাশ হইনি। যতদিন আমার শরীরে প্রাণ থাকবে, ততদিন আমি আপনার ক্ষমা থেকেও নিরাশ হব না। হে দুনিয়া-আখিরাতের দয়াময় আল্লাহ! হে আল্লাহ, আমি আমার নফসের ওপর অনেক জুলুম করেছি, আর গুনাহ কেবল আপনিই ক্ষমা করেন, আপনি তো ক্ষমাশীল দয়াময়।'
জনৈক সালাফ বলেন, 'মালাকুল মাওত যখন কারও কাছে আসে, তখন তাকে জানিয়ে দেয় যে, তোমার কাছে আর কিছু সময় আছে, আর তোমার মৃত্যু এ সময় থেকে বিলম্বিত হবে না। তুমি এরচেয়ে এতটুকু বেশি সময়ও পাবে না। তখন সে ব্যক্তির মাঝে আফসোস প্রকাশ পায়। আল্লাহ তার সবই জানেন। সে তখন প্রার্থনা করে, যদি তাকে এ সময়ের সাথে মিলিয়ে আরও কিছু সময় দেওয়া হয়, তবে সে তার কমতি ও ত্রুটিগুলোকে সংশোধন করবে। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী এমন সুযোগ কখনোই পায় না।'
এ ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা বলেন: وَحِيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ
'তাদের এবং তাদের বাসনার মাঝে অন্তরাল হয়ে গেছে। '২৫১
এদিকে ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন: مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِينَ
'(আর আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো তোমাদের কারও) মৃত্যু আসার আগেই। অন্যথায় সে বলবে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদাকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। ২৫২
বলা হয়, কিছুকাল বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, মৃত্যুপথযাত্রী মালাকুল মাওতকে বলে, 'আমাকে একদিন অবকাশ দাও। আমি রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। তাঁর কাছে তাওবা করব এবং নেক আমল করব।' তখন তাকে বলা হয়, 'দিন ফুরিয়ে গেছে। দিন ফুরিয়ে গেছে।' তখন সে বলে, 'আমাকে এক ঘণ্টা সময় দাও।' বলা হয়, 'সময় শেষ হয়ে গেছে।' তার জন্য তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
হায়, কত আফসোসের সে সময়টা! কত লজ্জার! এমন মৃত্যু কতই না আফসোসের!
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ 'আর আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।'২৫৩
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ ۚ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا 'আর এমন লোকদের তাওবা নিষ্ফল, যারা গুনাহ করতেই থাকে, অতঃপর মৃত্যুর মুখোমুখি হলে বলে, "আমি এখন তাওবা করছি" এবং (তাওবা) তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।' ২৫৪
তাহলে তাওবা কাদের জন্য? কাদের তাওবা কবুল হয়?
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'নিশ্চয় যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে বসে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে, এরাই তারা, যাদের তাওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। '২৫৫
হে আল্লাহ, আমাদের জীবনের শেষাংশ প্রথমাংশের চেয়ে উত্তম বানিয়ে দিন, আমাদের শেষ আমল উত্তম করে দিন, আপনার সাথে মিলিত হওয়ার দিনকে উত্তমতর দিন বানিয়ে দিন।

হে চক্ষুষ্মান, শিক্ষা গ্রহণ করো
এক তাওবাকারী আমার কাছে লিখে পাঠিয়েছে তার তাওবা ও প্রত্যাবর্তনের ঘটনা সম্পর্কে। চিঠিতে সে বলেছে, 'আমি জানি না, কীভাবে শুরু করব। জানি না, কীভাবে আমার ফিরে আসার গল্পটা বর্ণনা করব। আমি একজন যুবক। এখন আমার বয়স ২৬ বৎসর। ভাইদের মধ্যে আমিই বড়। আমার পরিবার খুবই দরিদ্র। আমার বন্ধুবান্ধবরা নামাজ-রোজার ধার ধারে না। আমাদের পুরো জীবনটা ছিল স্রেফ রাতজাগা, মদ খাওয়া ও নেশা করার মাঝে। সাত বছর চলল এভাবে। একসময় আমরা পুরোনো কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে আরেকটা শুরু করি।
উদাসীনতার নতুন দিগন্তে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমাদের একজন বলল, 'চলো, কাফিরদের দেশে বেড়িয়ে আসি। সেখানে মজ-মাস্তি হবে, ফুর্তি হবে।' আমরা তাই করলাম। হায়, যদি আমরা এমনটা না করতাম!
সেখানে গিয়ে আমরা জিনা, অশ্লীলতা, প্রতারণা-জোচ্চুরি শিখলাম। আমরা সফরে কয়েক মাস ধরে থাকতাম। যখনই টাকা-পয়সা শেষ হয়ে আসত, বাড়িতে যোগাযোগ করে চেয়ে নিতাম। আমরা তখন প্রচণ্ড নেশায় ডুবে ছিলাম। বাড়ির লোকদের জানাতাম, আমরা টাকার অভাবে ফিরে আসতে পারছি না। যখন টাকা-পয়সা পৌঁছত, ভ্রমণের বাকি সময়টায় সেটা দিয়ে চলতাম আমরা। এভাবে প্রতিবার আমাদের কোনো একজন তার বাড়িতে যোগাযোগ করে প্রতারণা করে টাকা আনত।
একবার আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। একটা ক্লাবে গেলাম। সেখানে পশুর মতো মদ, মিউজিক ও নাচানাচি চলত। বরং বলা ভালো, এমন জীবনের চাইতে পশুর জীবনই শ্রেয়। একের পর এক আসতে থাকল মদের গ্লাস। আমরা কথা বলতে থাকলাম। মদ খেতে থাকলাম। আমাদের একজন “আসছি বলে” নিকটে এক জায়গায় গেল। নেশায় বুঁদ ছিল সে। একটু আসছি বলে গেলেও কয়েকটা ঘণ্টা কেটে গেল সে আর এল না। তাই আমরা তার খোঁজে বের হলাম।
খোঁজাখুঁজির পর পেলাম তাকে। তার গাড়ি একটা উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে গেছে। আর সে গাড়ির ভেতরে মরে আছে বেশ শোচনীয় অবস্থায়। আমরা কাঁদলাম। তার মৃত্যুতে বেশ চিন্তা ও উদ্বিগ্নতায় পড়ে গেলাম। এমন অবস্থাতেই বাড়িতে ফিরে এলাম।
এ ঘটনার পর দুমাসও অতিবাহিত হয়নি আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলাম। হে আল্লাহ, কত কঠোরই না ছিল আমাদের অন্তর! আমার কাছে না সম্পদ ছিল, আর না ছিল মাসিক বেতন। আমি প্রতারণা-জোচ্চুরি করে চলতাম। আর এর ভার বহন করতে হতো আমার পরিবারকে। আমার এমন কর্মের ফলে পরিবারের ওপর অনেক ঋণের বোঝা এসে পড়ে। এমনকি আমি ঋণ করে আমার অন্য বন্ধুদের ভ্রমণ-খরচ বহন করতাম, যদিও তারা আমার চেয়ে বেশি টাকা-পয়সার মালিক ছিল, আমার চেয়ে ভালো অবস্থা ছিল তাদের। আমার ধারণা ছিল এটা বন্ধুবান্ধবের ওপর মহানুভবতা।
আমার ওপর ঋণের বড় একটা বোঝা স্তূপ হয়ে যায়। দিনকে দিন আমার অবস্থা বেগতিক হতে থাকে। আমার বন্ধুরা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তারা নিজেরাই ভ্রমণ করতে থাকে আমাকে না জানিয়েই। আর আমি কি না তাদের কারণেই এ ঋণের নিচে দেবে আছি। তখন আমি বুঝলাম, এসব স্রেফ দুধের মাছি। আমি নিজেকে বললাম, "অবশেষে তোমাদের চিনেছি।"
এরপর আমি অন্যদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলি। কিন্তু তাদের অবস্থা আগের বন্ধুদের চাইতে ভালো ছিল না। আমি টাকা-পয়সা একত্র করলাম আর আমার চাচাতো ভাই ও তাদের নিয়ে একটা গ্রুপ করে এশিয়ার সে কুখ্যাত শহরে গেলাম, যে শহর অশ্লীলতা, পাপাচারিতা ও অনৈতিকতার জন্য কুখ্যাত।
সেখানে পৌছার দুদিন পর আমার চাচাতো ভাই বলল, সে তাড়াতাড়ি ফিরে যাবে। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল, "আমি স্বপ্নে দেখেছি এ শহরের লোকেরা আগুনে পুড়ছে। আগুন তাদের ঝলসে দিচ্ছিল আর এদিকে অত্যন্ত ফরসা একজন আমার কাছে এসে বলল, "তাদের মতো পুড়ে যাওয়ার আগেই ফিরে যাও।”
চাচাতো ভাই ও আমি ফিরে এলাম। বাড়িতে বসে থাকলাম টাকা-পয়সা ছাড়া, বন্ধুবান্ধব ছাড়া। চিন্তা-উদ্বিগ্নতা-সংকীর্ণতায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। একদিন ফেরার সময় এল।
একদিন মা আমার কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে কিছু কথা বললেন। বললেন, "কেন তুই নামাজ পড়িস না! কেন তুই আল্লাহর কাছে ফিরে আসিস না!" এ বলে তিনি একটা ক্যাসেট দিলেন। আমি কসম করলাম তার কাছে যে, ক্যাসেটটা আমি শুনব। এরপর তিনি চলে গেলেন। আমিও ক্যাসেটটা প্লেয়ারে লাগিয়ে শুনতে লাগলাম।
ক্যাসেট বেজে উঠল। মনে হচ্ছিল বক্তা আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে। পাপ ও গুনাহে নিমজ্জিতদের সম্পর্কে বলা হচ্ছিল ক্যাসেটে। বন্ধুত্বের প্রভাব, দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও নষ্টের পথে যাওয়ার বিষয়ে বন্ধুদের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা হলো। আমি কাঁদতে থাকলাম। কাঁদতেই থাকলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম তাওবা করব। ফিরে আসব রবের কাছে।'
চিঠির লেখক বলল, 'হে শাইখ, আপনি কি জানেন ক্যাসেটের সে বক্তা কে ছিল? হ্যাঁ, সে বক্তা ছিলেন আপনি। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি। ক্যাসেটের নাম ছিল : احوال الغارقين "পাপের সাগরে নিমজ্জিত লোকদের কাহিনি।"
এরপর মা আমাকে আরেকটি ক্যাসেট দিল। নাম : قوافل العائدين "সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা।"
আমি তখন দুআ করলাম, 'হে আল্লাহ, আমাকে তেমনই বানিয়ে দিন, যেমন উত্তম তারা বলে তার চেয়ে বেশি। আমাকে তাদের ধারণা থেকে সুন্দর বানিয়ে দিন। তারা যা জানে না, সেসব গুনাহের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন।'
সে বলল, 'শাইখ, এখন আমি আপনাকে চিঠি লিখছি আর খুব করে কাঁদছি। আমার মা পাশে বসে আছেন। তিনিও আমার সাথে কাঁদছেন আর আমার অটলতার জন্য দুআ করছেন। আপনার জন্য দুআ করছেন, যেন মৃত্যু পর্যন্ত আপনি দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারেন। আমার তাওবার কারণে তিনি বেশ আনন্দিত। শাইখ, আমার গল্পটা এর চাইতে অনেক বড়। কিন্তু সংক্ষেপে বললাম।
আমার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে আপনাকে বলি। নতুন জীবনের শুরু থেকে আমি উত্তম থেকে উত্তমের দিকে যাত্রা করছি। আলো থেকে আলোর দিকে ছুটছি। আমি একটা চাকরি করছি এখন। এর আগে তো বেশ অলস বসে থাকতাম। এমনকি এর আগে অন্যদের মতো আমার কোনো সার্টিফিকেটও ছিল না। কিন্তু আল্লাহর রহমত, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। আমি আপনাকে আরেকটা খবর জানাতে চাই। খবরটা শুনে আপনি আনন্দিত হবেন অবশ্যই। চাকরির পাশাপাশি আমি আল্লাহর ঘরের মুয়াজ্জিনও এখন। আমি এখন আল্লাহর ঘরগুলোর একটিতে আজান দিয়ে থাকি। প্রতিদিন আমি আজান দিই। প্রতিদিন অনেকবার “আল্লাহু আকবার” বলি। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলি। আপনি আমার অটলতার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার পূর্বের বন্ধুদেরকে হিদায়াত ও পরিশুদ্ধির পথে আহ্বান জানাব। আমি আশা করি আমার ঘটনা থেকে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ শিক্ষা গ্রহণ করবেন।'
প্রিয় ভাই ও বোন,
গুনাহ ও পাপের দরজায় আমরা প্রত্যেকেই প্রবেশ করেছি। এটা সে সাগর, যেটাতে আমরা সবাই কিছু সময়ের জন্য হলেও সাঁতার কেটেছি। গুনাহ থেকে কেবল নিষ্পাপগণই মুক্তি পেয়েছিলেন, আল্লাহ যাঁদের নির্বাচন করেছেন, আল্লাহ যাঁদের নবি ও রাসুল করে পাঠিয়েছেন। আমি ও আপনারা সবাই রাসুল -এর এ বাণীর অন্তর্গত, তিনি বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। ২৫৬
রাসুল আরও বলেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ، وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ، فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
'সেই সত্তার শপথ-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি তোমরা পাপই না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উঠিয়ে নিতেন এবং এমন এক জাতি নিয়ে আসতেন, যারা গুনাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।'২৫৭
ধ্বংস ও মন্দ তাদের জন্য, যারা গুনাহের ওপর অটল থাকে। তাদের দুর্বল ইমানের নফস ও খবিস শয়তানগুলো তাদের কাছে গুনাহকে সুশোভিত করে তোলে। উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেন, 'হে মানুষসকল, যে কোনো গুনাহ করে, সে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নেয়। এরপর আবার গুনাহ করলে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এরপরও যদি গুনাহ করে, তবে সে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কারণ গুনাহ মানুষকে ঘিরে থাকে। ধ্বংস হলো গুনাহের ওপর অটল থাকার মাঝে।'
প্রিয় ভাই ও বোন,
গুনাহের কারণে লজ্জিত হও, কাঁদতে থাকো। গুনাহকে ছুঁড়ে ফেলে দাও। ফিরে আসো সত্যের পথে। সৎ পথে ফিরে আসা মন্দের ওপর চলা থেকে উত্তম। রবের পথে ফিরে আসলেই তবে জীবন সুন্দর হয়। দ্বীনকে আঁকড়ে ধরলেই তবে জীবন সুন্দর হয়।
অনেকে ইতস্তত বোধ করেন। অনেকে বলেন, আমাদের গুনাহ অনেক। আমাদের গুনাহের খাদ খুবই গভীর। আল্লাহ কি আমাদের মাফ করবেন? আমি তাদের বলি, হ্যাঁ। আরও জোরে বলব, হ্যাঁ, তোমরা তাওবা করো, লজ্জিত হও, ফিরে আসো আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন। বরং আল্লাহ তোমাদের তাওবা ও প্রত্যাবর্তনে আনন্দিত হবেন। আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন। আমার সাথে এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা করে দেখো-
رَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
'আর আমার করুণা ও দয়া প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। '২৫৮
আল্লাহর রহমত প্রশস্ত। আমরা তাঁর সামনে কিছুই নই। তিনি হলেন আরহামুর রাহিমিন। চিন্তা করে দেখো, ভেবে দেখো, আল্লাহ বলছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।'২৫৯
হ্যাঁ, আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ, করুণা, মহানুভবতায় সকল গুনাহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। সাইদ বিন মুসাইয়িব আল্লাহর বাণী : فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا )...তবে তিনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল। ২৬০)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'এ আয়াতে সেসব লোকের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা গুনাহ করে তাওবা করে, আবার গুনাহ করে তাওবা করে।' তাওবার দরজা খোলা। আল্লাহর দুহাত সারা দিন-রাত প্রসারিত থাকে, যাতে তিনি দিন ও রাতের গুনাহগারকে ক্ষমা করেন।
ফুজাইল বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন, গুনাহগারদের সুসংবাদ দিন, গুনাহগারদের সুসংবাদ দিন, তারা তাওবা করলে আমি ক্ষমা করে দেবো। আর পুণ্যবানদের সতর্ক করে দিন, আমার ন্যায়দণ্ড তাদের ওপর প্রয়োগ করলে তাদের কেউই শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে না।'
সহিহ সনদে হাদিসে কুদসিতে এসেছে, 'আল্লাহ বলেন : مَنْ عَلِمَ أَنِّي ذُو قُدْرَةٍ عَلَى مَغْفِرَةِ الذُّنُوبِ، غَفَرْتُ لَهُ وَلَا أُبَالِي، مَا لَمْ يُشْرِكْ بِي شَيْئًا 'যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আমি গুনাহ ক্ষমা করতে সক্ষম, পরোয়াহীনভাবে আমি তাকে ক্ষমা করে দিই, যতক্ষণ না সে আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করে।'২৬১
প্রিয় ভাই ও বোন, শোনো, আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন, হিদায়াত ও রহমতের নবি বলেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ 'গুনাহ থেকে তাওবাকারী সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহই নেই। '২৬২
আমাদের সবার মাঝে আল্লাহ বরকত দান করুন। আমরা তাওবা, লজ্জা ও প্রত্যাবর্তনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হব। তোমরা আল্লাহর দিকে দ্রুত অগ্রসর হও সে পরিস্থিতি আসার আগেই, যখন তোমরা বলবে: رَبِّ ارْجِعُونِ "হে আমার রব, আমাকে (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান।”২৬৩ কিন্তু সে অনুরোধে, সে দয়া ভিক্ষায় সাড়া দেওয়া হবে না তখন। এখন তো তাওবার দরজা, রহমানের রহমতের দরজা খোলা। আল্লাহর রহমত প্রশস্ত। এখনই সুযোগ। বরং হে তাওবাকারী, হে তাওবাকারিণী শুনে নাও এসব আয়াত, যেখানে ফেরেশতাগণ তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন আল্লাহর কাছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ - رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ - وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'যারা আরশ বহন করে আছে, আর যারা আছে তার চারপাশে, তারা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে আর তাঁর প্রতি ইমান পোষণ করে আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আপনার রহমত ও জ্ঞান দিয়ে সবকিছুকে বেষ্টন করে রেখেছেন, কাজেই যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে, তাদের ক্ষমা করুন, আর জাহান্নামের আজাব থেকে তাদের রক্ষা করুন। হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি তাদের আর তাদের পিতৃপুরুষ, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে, তাদেরও চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান যার ওয়াদা আপনি তাদের দিয়েছেন; আপনি মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সমস্ত অনিষ্টতা থেকে তাদের রক্ষা করুন। সেদিন আপনি যাকে সমস্ত অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন, তার ওপর তো দয়াই করবেন। ওটাই হলো বিরাট সাফল্য।”২৬৪
আসো, অগ্রসর হও, দ্রুত এগিয়ে আসো। প্রাণের সতেজতা উন্নত হওয়ার মাঝে। আর তার মুক্তি উচ্চতায়।
আল্লাহর কাছে ফিরে আসো, তাঁর অভিমুখী হও। আল্লাহকে ভয় করো। মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকার জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো। সত্য তাওবা ও তাওবার পরে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
জেনে রাখো, আল্লাহর পথে ইসতিকামাতের চাবিকাঠি হচ্ছে মিহরাব। মসজিদে গমনাগমনই কল্যাণের চাবিকাঠি। রবের পথে চলার জন্য মসজিদে প্রাপ্ত পাথেয়ই উত্তম পাথেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ - رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ
'আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়িম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।' ২৬৫
তাদের ভয়ের প্রতিদান কী?
لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
'যাতে আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করেন তাদের উত্তম কার্যাবলি অনুসারে আর নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন, কারণ আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে করেন, অপরিমিত রিজিক দান করেন।' ২৬৬
মসজিদ আবাদ করা ইমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।'২৬৭
রাসুল বলেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ وَرَاحَ، أَعَدَّ اللَّهُ لَهُ نُزُلَهُ مِنَ الْجَنَّةِ كُلَّمَا غَدًا أَوْ رَاحَ
'যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় যতবার মসজিদে গমন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে ততবার মেহমানদারির ব্যবস্থা করে রাখেন।'২৬৮
অপর হাদিসে এসেছে, 'আর আল্লাহর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা হচ্ছে মসজিদ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে বাজার।'২৬৯
হাসান বিন আলি বলেন, 'যে নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত করে, সে সাতটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করে: ১. মুহকাম আয়াতের জ্ঞান। ২. উপকারী ভাই। ৩. সুন্দর ইলম। ৪. প্রত্যাশিত রহমত। ৫. হিদায়াতি কথা। ৬. অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকা। ৭. লজ্জায় গুনাহ ত্যাগ করা। ৮. অথবা ভয়ে গুনাহ ত্যাগ করা।
হে আল্লাহ, আপনার দীর্ঘ অবকাশে যারা ধোঁকায় পড়ে আছে, আপনি সেসব বান্দার প্রতি রহম করুন। তাদের আপনি নিজ অনুগ্রহের স্থায়িত্ব দান করুন। আপনার উত্তম দান গ্রহণের প্রতি তাদের হাতকে প্রসারিত করুন। তাদের বিশ্বাস দান করুন যে, তারা সবাই আপনার প্রতি মুখাপেক্ষী সর্বদা। প্রিয় ভাই ও বোন,
তোমরা সবাই আমার সাথে বলো, হে আল্লাহ, যদি লজ্জা আমাদের তাওবার প্রতি ধাবিত করে, তবে আমাদের লজ্জা দান করুন। যদি গুনাহ ত্যাগ করা আমাদের আপনার নিকটবর্তী করে, তবে আমাদের গুনাহ ত্যাগ করার তাওফিক দান করুন। হে আল্লাহ, আপনার তো কত নৈকট্যশীল আছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন আমাদের। আমাদের পাপগুলো মোচন করুন। আমাদের প্রতিষ্ঠিত করুন। আমাদের অন্তরকে হিদায়াত দান করুন। আমাদের মনের হিংসা-বিদ্বেষ ধুয়ে মুছে দিন। আমাদের আপনার রহমত থেকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনি তো তাওবা-কবুলকারী, দয়াময়, মহানুভব, মহা দানশীল, আপনি গুনাহ ক্ষমাকারী, হে তাওবা-কবুলকারী, হে আরহামুর রাহিমিন।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, আপনি যদি আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
أستغفر الله العظيم وصلى الله على محمد وعلى آله وصحبه أجمعين

টিকাঃ
২৩২. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ৫৩।
২৩৩. সুরা ত্বহা, ২০: ৮২।
২৩৪. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১১৯।
২৩৫. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ১৭-১৮।
২৩৬. সুরা আস-সাজদা, ৩২: ১৬-১৭।
২৩৭. তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে। তারা হলেন কাব বিন মালিক, মুরারা বিন রাবিআ ও হিলাল বিন উমাইয়া।
২৩৮. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১১৮।
২৩৯. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১১৮।
২৪০. সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯।
২৪১. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩৭।
২৪২. সুরা আল-ইসরা, ১৭ : ৬১-৬৫।
২৪৩. সুরা আল-আরাফ, ৭: ২০১।
২৪৪. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৮।
২৪৫. সুরা আল-আরাফ, ৭: ৯৯।
২৪৬. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯, সহিহু মুসলিম: ২৯৯০।
২৪৭. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ৬৭।
২৪৮. পুরো হাদিসটি হলো, রাসুল বলেছেন : مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ 'যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' - সুনানু আবি দাউদ: ৪০৩১।
২৪৯. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৩।
২৫০. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
২৫১. সুরা সাবা, ৩৪ : ৫৪।
২৫২. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ১০।
২৫৩. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৩৩।
২৫৪. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৮।
২৫৫. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৭।
২৫৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
২৫৭. সহিহু মুসলিম: ২৭৪৯।
২৫৮. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৫৬।
২৫৯. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
২৬০. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ২৫।
২৬১. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির : ১১৬১৫, আল-জামি' আস-সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১/১৩১।
২৬২. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫০।
২৬৩. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৯৯।
২৬৪. সুরা গাফির, ৪০:৭।
২৬৫. সুরা আন-নূর, ২৪ : ৩৬-৩৭।
২৬৬. সুরা আন-নূর, ২৪ : ৩৮।
২৬৭. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১৮।
২৬৮. সহিহুল বুখারি: ৬৬২, সহিহু মুসলিম: ৬৬৯।
২৬৯. দেখুন, সহিহু মুসলিম: ৬৭১।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 আল্লাহর ভয়ে সদা ক্রন্দন করে যারা

📄 আল্লাহর ভয়ে সদা ক্রন্দন করে যারা


بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اَلَمْ يَاْنِ لِلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا اَنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِ اللّٰهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَّكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْاَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوْبُهُمْ وَكَثِيْرٌ مِّنْهُمْ فٰسِقُوْنَ
'যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং (তাঁর কাছ থেকে) যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।'২৭০
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِهٖ وَلَا تَمُوْتُنَّ اِلَّا وَاَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।'২৭১
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
'হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।' ২৭২
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল।' ২৭৩
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ ﷺ-এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'
আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের গুণ বর্ণনা করে বলেন: إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّداً وَبُكِياً 'এদের সামনে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হতো, তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত এবং ক্রন্দন করত।'২৭৪
وَيَخِرُّونَ لِلأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعاً 'আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।' ২৭৫
রাসুল বলেছেন:
لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ تَعَالَى حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ، وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ نَارِ جَهَنَّمَ 'আল্লাহর ভয়ে কান্না করেছে এমন ব্যক্তির জাহান্নামে প্রবেশ করা এমনই অসম্ভব, যেমন (দোহনকৃত) দুধ ওলানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। এবং আল্লাহর রাস্তার ধুলোবালি ও জাহান্নামের আগুন কখনো একত্রিত হবে না।'২৭৬
আবুল জিলদ জাইলান বিন ফাওরাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি দাউদ -এর মাসআলার মধ্যে পড়েছি যে, তিনি বলেছেন, “হে আমার প্রতিপালক, আপনার ভয়ে যে ব্যক্তির চোখের অশ্রু তার গণ্ডদেশে গড়িয়ে পড়েছে, তার প্রতিদান কী?" তিনি বলেন, "তার প্রতিদান হলো, তার চেহারাকে আগুনের ওপর হারাম করে দেবো এবং মহা আতঙ্কের দিন তাকে নিরাপদ রাখব।"'
সুতরাং বোঝা গেলো, আল্লাহর দরবারে কান্নার যেমন শরয়ি মূল্যায়ন আছে, তেমনই এটি একটি ইবাদতও বটে। আর আল্লাহর ভয়ে কান্না করা তাঁর রহমতের চাবিতুল্য।
আলোচনা শুরু করার পূর্বে আমি আপনাদের এ কথা বলছি না যে, আপনারা ক্রন্দন করবেন না। না, বরং অবশ্যই অবশ্যই ক্রন্দন করবেন। তবে প্রশ্ন হলো কীজন্য ক্রন্দন করবেন? হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর দরবারে আমাদের বিপদাপদ ও কষ্টের কারণে কান্না করব। কেউ কান্না করে বাবা-মা'র জন্য, কেউ ভাই-বোনের জন্য, আবার কেউ সঙ্গী, সাথি, নিকটস্থ প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধবের জন্য, কেউ ক্ষতিতে পতিত হওয়ার কারণে কান্না করে; বরং সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো অনেকে তো এমনও আছে, যারা টেলিভিশনে বা ডিশে কোনো নাটক-সিরিয়াল ও মুভি দেখেও কান্না করে থাকে। আবার অনেকে টুর্নামেন্ট বা খেলা দেখেও কান্না করে। হায়, এরা যে কত ক্ষতিগ্রস্ত! আল্লাহর কসম, তাদের ও আমাদের অশ্রুর মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। রাসুল -এর ইনতিকালের পর একদিন উম্মে আইমান -এর কাছে আবু বকর ও উমর উপস্থিত হলেন। তাঁরা তার খোঁজখবর নিতে এসেছেন। তখন তিনি কাঁদছিলেন। তাই তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে উম্মে আইমান, আপনি কেন কাঁদছেন? আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা তাঁর রাসুলের জন্য উত্তম?” তিনি উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, আমি জানি, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা তাঁর রাসুলের জন্য অনেক উত্তম। কিন্তু আমি কাঁদছি ওহি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে।"
রাসুল ইনতিকাল করায় তিনি উম্মতের জন্য ভয়, দুঃখ ও কষ্টের কারণে কান্না করেছেন। তাহলে তাঁদের ব্যাপারে আমি আর কীই বা বলব! তাঁদের মাঝে এমনও অনেকে ছিলেন, যাঁদের অশ্রুতে জমিন সিক্ত হয়েছে। তাঁদের কারও সামনে জাহান্নামের আলোচনা করা হলে প্রায় অচেতন হয়ে মাথা নত করে ফেলতেন। আজানের আওয়াজ কানে আসলে ভয়ে প্রকম্পিত হতেন। যখন তাঁদের কেউ নামাজের জন্য অজু করতেন, তখন তাঁর চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করত এবং চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত।
প্রিয় ভাই ও বোন,
আপনার কানে জানাজার আজানের আওয়াজ আসার পূর্বে অন্তরের কান দিয়ে শ্রবণ করুন। এক মহিলা ইমাম আওজায়ি -এর স্ত্রীর কাছে গেলেন। অতঃপর সেই মহিলা ইমাম আওজায়িরের নামাজের স্থানটি পরিদর্শনকালে দেখলেন যে, সেখানে পানি লেগে আছে। তাই মহিলাটি ইমাম আওজায়িরের স্ত্রীকে এসে বললেন, 'তোমার মা সন্তানহারা হোক! তুমি বাচ্চাদের ব্যাপারে উদাসীন হওয়ার কারণে তারা আওজায়িরের নামাজের জায়গায় প্রশ্রাব করে দিয়েছে।' এ কথা শুনে ইমাম আওজায়িরের স্ত্রী বললেন, 'না, এগুলো প্রশ্রাব নয়; বরং এগুলো হলো আওজায়িরের চোখের পানি।'
কতই না মূল্যবান সেই অশ্রুগুলো! এগুলোর দাম কতই না বেশি! সালিহিনের ঘটনা শুনলে অন্তর জীবিত থাকে। তাদের পথ অনুসরণের মাধ্যমে সৌভাগ্য অর্জিত হয়।
আল্লাহর বান্দারা, এই ধারণা থেকে আপনাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে যে, কেবল দুর্বল ব্যক্তিদের সাথেই কান্নার সম্পর্ক রয়েছে। বীরদের জন্য কান্না করা সাজে না। হ্যাঁ, শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার সময়ে কান্না করাটা বীরদের জন্য সাজে না। ঘোড়ার হেষাধ্বনি, অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনলে এবং দেহের অঙ্গগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে কান্না করা শোভা পায় না। বরং তখন কান্না করা ভীতু লোকদের কাজ। আর আমরা যেই কান্নার কথা বলছি, তা হলো, আল্লাহর ভয়, শাস্তির আতঙ্ক, অবনত অবস্থায়, নিচু হয়ে এবং তাঁর ইবাদতের উদ্দেশ্যে কান্না করা। নিশ্চয় এই কান্না হলো মহা প্রতাপশালী ও পরাক্রমশালী আল্লাহর জন্য নত হয়ে কান্না করা। সেই মহান সত্তার ভয়ে কান্না করা, যিনি চিরঞ্জীব—কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।
আব্দুল্লাহ বিন শিখখির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهُوَ يُصَلَّى وَلِجَوْفِهِ أَزيزُ كَأزيز الْمِرْجَلِ يَعْنِي: يَبْكِي
'আমি নবিজি -এর নিকট এসেছি। তখন তিনি নামাজ পড়ছিলেন। আর তাঁর হৃদয় থেকে উত্তপ্ত পাতিলের ন্যায় টগটগ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল অর্থাৎ তিনি কাঁদছিলেন।'২৭৭
যিনি বীরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীর এবং সবচেয়ে বীরত্বপূর্ণ ঘোড়সওয়ার, তিনিই কান্না করছেন।
রাসুল -এর অসুস্থতার সময় যখন তিনি আবু বকর -কে নামাজের ইমামতির জন্য খবর পাঠিয়েছেন, তখন আয়িশা বলেন, 'নিশ্চয় আবু বকর একজন নরম (কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও দ্রুত ক্রন্দনকারী) দিলের পুরুষ। যদি তিনি আপনার স্থানে দণ্ডায়মান হন, তাহলে তিনি কান্নাই করবেন— তিলাওয়াত করতে পারবেন না।' অন্য বর্ণনায় আছে, 'আবু বকর যখন আপনার স্থলাভিষিক্ত হবেন, মানুষ কান্নার কারণে কিছুই শুনতে পারবে না।'২৭৮
কিন্তু আপনারা লক্ষ করুন আবু বকর -এর বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা, শক্তিমত্তা ও রিদ্দার যুদ্ধের সময় তাঁর দৃঢ়তার প্রতি। যেদিন তিনি মুরতাদদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এমন মহান ব্যক্তির আজ বড়ই প্রয়োজন। তখন আবু বকর প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। আর আল্লাহ তাআলাও তাঁর মাধ্যমে বিরুদ্ধবাদীদের আধিক্য সত্ত্বেও দ্বীনের অনেক খিদমত আনজাম দিয়েছেন।
আর উমর ফারুক তো কঠিন স্বভাবের হিসেবেই পরিচিত সকলের কাছে। তাঁর মাঝে এত কঠোরতা, রাগ-ক্রোধ থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করে কাঁদতেন এবং অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন তিনি।
ইমাম বুখারি আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ -এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি শেষ কাতারে ছিলাম। তখন আমি উমরকে ঘড় ঘড় শব্দে কাঁদিতে অবস্থায় (أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ) "আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।" (-সুরা ইউসুফ: ৮৬) এই আয়াত পড়তে শুনেছি।'২৭৯
হে ভাই, সত্য করে বলুন তো, কুরআনের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে কখনো কি আপনার অশ্রু ঝরেছে? যেই আয়াতগুলো প্রতিনিয়ত আপনাকে জান্নাতের বিভিন্ন নিয়ামতরাজি ও জাহান্নামের বিভিন্ন খবরাখবর দিয়ে যাচ্ছে! আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব ও সালিহিনের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَاباً مُّتَشَابِها مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَن يُضْلِلْ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
'আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী তথা কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যার অংশসমূহ পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ এবং যা বারবার পঠিত হয়। যারা তাদের প্রভুকে ভয় করে, এ বাণীতে তাদের চামড়া কেঁপে ওঠে। তারপর তাদের শরীর ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটা আল্লাহর পথনির্দেশ। এর দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা পথ নির্দেশ করেন। আর আল্লাহ যাকে বিপথে নেন, তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক নেই। '২৮০
ইবনে মাসউদ বলেন, 'আমি রাসুল-এর নিকট ছিলাম। তখন তিনি আমাকে বলেন, "আমার সামনে কুরআন তিলাওয়াত করো।” আমি বললাম, "আমি আপনার সামনে কুরআন তিলাওয়াত করব?! অথচ আপনার ওপর কুরআন নাজিল করা হয়েছে।” রাসুল বললেন, "আমার কাছে অন্যের মুখ থেকে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করতে ভালো লাগে।" ইবনে মাসউদ বলেন, 'অতঃপর আমি সুরা নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করলাম। যখন আমি (فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاء شَهِيداً) তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে উপস্থিত করব তাদের ওপর সাক্ষীরূপে।”২৮১ এই আয়াত পাঠ করলাম (এই আয়াত দ্বারা রাসুল-এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।), তখন তিনি বললেন, “আপাতত যথেষ্ট হয়েছে।” তারপর আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। '২৮২
মহান রবের ভয় এবং উম্মতের জন্য দরদ ও মায়া-মমতার কারণেই তাঁর এই অবস্থা হলো। আমি আপনাদের সামনে সেই আয়াতে কারিমা তিলাওয়াত করছি, যাতে সেই মহান দিবসের কঠিন অবস্থা আপনারা বুঝতে পারেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاء شَهِيداً - يَوْمَئِذٍ يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَعَصَوُا الرَّسُولَ لَوْ تُسَوَّى بِهِمُ الْأَرْضُ وَلَا يَكْتُمُونَ اللَّهَ حَدِيثاً
'সুতরাং তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে উপস্থিত করব তাদের ওপর সাক্ষীরূপে। যারা কুফরি করেছে এবং রাসুলের অবাধ্য হয়েছে, তারা সেদিন কামনা করবে, যদি তাদেরসহ মাটি সমান করে দেওয়া হতো (মাটির সাথে তাদের মিশিয়ে দেওয়া হতো)! তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথাই গোপন করতে পারবে না।'২৮৩
হে আল্লাহ, আমি আপনার প্রতি আগ্রহের কারণে কান্না করেছি। আমাকে জান্নাতে আপনার কাছে আশ্রয় দিন। আমি জাহান্নামের ভয়ে কান্না করেছি। আপনার দর্শন যদি না মিলে! সেই আশঙ্কায় কান্না করেছি। আল্লাহ তাআলা জাহান্নামিদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ - كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوبُونَ - ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُوا الْجَحِيمِ - ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تُكَذِّبُونَ
কখনো না (তাদের কথা ঠিক নয়); বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। কখনো না; সেদিন তারা তাদের প্রভু থেকে অবশ্যই আড়ালে থাকবে। অতঃপর অবশ্যই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তারপর বলা হবে, এটা তো তা-ই, যা তোমরা অবিশ্বাস করতে।২৮৪
আল্লাহর কসম, জান্নাতের মধ্যে দয়াময় আল্লাহ তাআলাকে দেখার চেয়ে আর কোনো নিয়ামতই এত সুখের ও মজার নয়। আর আল্লাহ তাআলাকে দেখতে না পারার কষ্টের চেয়ে জাহান্নামের কোনো আজাবই এত কষ্টদায়ক নয়।
ইবনে উসাইমিন বলেন, 'আল্লাহর কসম, যদি অন্তরগুলো আহত হতো, তাহলে ব্যথায় খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত এবং দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে যেত। আর সে বলত : وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُم مُّلَاقُوهُ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ “আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো যে, তোমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে। আর মুমিনদের সুসংবাদ দিন।”২৮৫ আল্লাহ তাআলাকে দেখার সুসংবাদের চেয়ে আর কোন সুসংবাদ বড় হতে পারে!? প্রত্যেক আশিক তার মাশুককে দেখার আগ্রহে থাকে।
সালিহ আল-মুররি বলেন, 'কাব আল-আহবার থেকে আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি গুনাহের ভয়ে কান্না করে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, আর যে আল্লাহর প্রতি আসক্ত হয়ে কান্না করে, তার জন্য আল্লাহকে দেখা বৈধ হয়ে যায়। সে যখন ইচ্ছা, তখনই আল্লাহকে দেখতে পাবে।"
ঈসা মুআল্লিম জাদান আবু উমর থেকে বর্ণনা করে বলেন, 'আমাদের কাছে এই খবর এসেছে যে, "যে ব্যক্তি জাহান্নামের ভয়ে কান্না করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। আর যে ব্যক্তি জান্নাতের আশায় কান্না করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”
হে আল্লাহ, আপনার অনুগ্রহ থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না।
হাদিস শরিফে এসেছে। রাসুল বলেন:
وَاللَّهِ لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا، وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا، وَمَا تَلَذَّذْتُمْ بِالنِّسَاءِ عَلَى الْفُرُشَاتِ، وَلَخَرَجْتُمْ إِلَى الصُّعُدَاتِ، تَجْأَرُونَ إِلَى الله
'আল্লাহর কসম, আমি যা জানি, যদি তোমরা তা জানতে, তাহলে তোমরা অল্পই হাসতে আর বেশি ক্রন্দন করতে, বিছানায় স্ত্রী সম্ভোগ করতে না এবং চিৎকার করে আল্লাহর কাছে দুআ করতে করতে পথে-প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে।'২৮৬
আবু জার যখন এই হাদিসটি শুনেছেন, তখন বলেছেন, 'আমার ইচ্ছে হয় যদি আমি এমন কোনো গাছ হতাম, যা উপকারে আসে!'
আল্লাহর কসম, যদি আমাদের হৃদয়গুলো আহত হতো, তাহলে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার ব্যথায় খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত। কিন্তু আমাদের হৃদয়গুলো দুনিয়ার ভালোবাসায় মাতাল হয়ে আছে। কিছু কাল পরেই তার জ্ঞান ফিরে আসবে।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু ছেড়ে এসেছে, পরিতাপ ও ভয়ের সাথে যদি সেগুলোর জন্য তার অন্তর ব্যথিত না হয়, তাহলে সে আখিরাতে যখন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে, তখন সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যাবে।' সুতরাং অবশ্যই অন্তর ব্যথিত হবে। হয়তো সেটা দুনিয়াতে অথবা আখিরাতে। তাই আপনাদের ইচ্ছা এবার। দুনিয়ায় ব্যথিত হবেন নাকি আখিরাতে গিয়ে ব্যথিত হবেন। আমাদের ও তাদের মাঝে পার্থক্য হলো, স্বল্প বিস্তৃত কথাগুলো তাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এবং কাঁদায়। আর আমরা বারবার বাধা-প্রতিবন্ধকতার কথা শুনি। কিন্তু আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তনই হয় না।
একবার উমর বিন আব্দুল আজিজ তার এক গোলামকে একটি ভুলের কারণে প্রহার করতে উদ্যত হলেন। তখন গোলাম তাকে বলল, 'হে উমর, আল্লাহকে ভয় করো। হে উমর, আল্লাহকে ভয় করো। আর সেই রাতের কথা স্মরণ করো, যে রাত পেরুলেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে।' অতঃপর উমর বিন আব্দুল আজিজ কাঁদতে লাগলেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কান্না বন্ধ করেননি, যতক্ষণ না শুনেছেন যে, কেউ তাকে ডাকছে। তার মৃত্যুর সময় যখন উপস্থিত হয়েছে, তখন তার কাছে এই আয়াত তিলাওয়াত করা হচ্ছিল, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
'এই পরকালের আবাস আমি তাদের জন্যই নির্ধারিত করি, যারা পৃথিবীতে ঔদ্বত্য দেখাতে কিংবা ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণام আল্লাহভীরুদের জন্য। '২৮৭
হে ভাই ও বোন, আপনাদের আমি জিজ্ঞেস করছি, আপনাদের পাপগুলো কি আপনাদের কাঁদায় কখনো? অদৃশ্যের খবর সম্পর্কে জ্ঞাত আল্লাহ তাআলার ওপর দুঃসাহসের কারণে কি কান্না আসে না?
হে পাপীরা, তোমরা ভালো করে শোনো (আমরা প্রত্যেকেই তো পাপী), উকবা বিন আমির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, মুক্তি কীসে?” তিনি বললেন : أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ “তোমার জবানকে নিয়ন্ত্রণ করো, তোমার ঘর যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় এবং তোমার ভুলগুলোর জন্য কান্না করো।”২৮৮
হ্যাঁ, কান্না করুন সকলে। আপনাদের জানাজার নামাজ পড়ানোর আগেই আল্লাহর দরবারে কান্না করুন। সেই মহা সমাবেশস্থলে দণ্ডায়মান হওয়ার আগেই কান্না করুন। কেননা, সেখানে ফেরেশতারা আপনাদের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দেবে। ওহে আল্লাহর বান্দা, আপনার পাপের কারণে আপনাকে স্থির করে দেবে ফেরেশতারা এবং বলবে, 'তোমার কি অমুক গুনাহের কথা স্মরণ পড়ে? সেই পাপের কথা কি তোমার মনে আছে?' তখন ফেরেশতাদের প্রশ্ন থেকে পালানোর কোনো জায়গা থাকবে না আপনার। অতএব, আপনার প্রভুর কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার আগেই কাঁদুন। তিনি প্রশ্ন করবেন, যখন তুমি পাপ করতে, তখন কি ধারণা করতে না যে, আমি তোমাকে দেখছি? যখন মানুষের চোখ থেকে লুকিয়ে পাপকর্মে লিপ্ত হতে, তখন আমার কথা ভেবে একটুও লজ্জাবোধ করোনি? হে মানুষ, আল্লাহর দরবারে কান্না করুন। কেননা, গোলাম যখন তার মনিবের সামনে ক্রন্দন করে, তখন তার মনিব তাকে দয়া করে। শিশু যখন কান্না করে, তখন বাবা-মা তার চাহিদা পূরণ করে; তাই ছোট হয়ে, নীচু হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্না করুন। আর আমাদের প্রভু তো বাবা-মা'র চেয়েও আমাদের প্রতি বেশি দয়াবান। এমনকি আমাদের নিজেদের চেয়েও তিনি আমাদের প্রতি অতি দয়ালু। তাই তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি ফিরিয়ে দেবেন না।
একদিন মালিক বিন দিনার নসিহত করছিলেন। তখন হাওসাব কেঁদে দিলেন। তিনি সকলের কাছেই একজন আবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দুনিয়াবিমুখ আল্লাহর অলি। মালিক বিন দিনার তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'হে আবু বিশর, (এটি তার উপাধি) কাঁদো। হে আবু বিশর, কাঁদো। কেননা, আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, বান্দা যখন কাঁদতেই থাকে, তখন তার মনিব তাকে দয়া করেন, এমনকি জাহান্নাম থেকেও মুক্তি দিয়ে দেন। আর এ কথা মনে রেখো যে, হৃদয়ের ব্যথার কম-বেশির ভিত্তিতেই কান্নার কম-বেশি হয়। পরকালের ব্যাপারে যথোপযুক্ত সামান্য আলোচনাই জীবিত অন্তরে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে। আর অন্তরের জীবন হলো গুনাহ ছেড়ে দেওয়া।
মাকহুল আস-সামি বলেন, 'যেই অন্তরের গুনাহ কম, সেই অন্তর বেশি জীবিত। যারা গুনাহমুক্ত ও জাগ্রত হৃদয়ের অধিকারী, কেবল একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেও তাদের অন্তর আলোকিত হয়ে যায়। প্রতাপশালী আল্লাহ তাআলার আলোচনা করলে তাদের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু প্রবাহিত হয়। আখিরাতের আলোচনা করলে তাদের দেহগুলো প্রকম্পিত ও অস্থির হয়ে যায়।'
হে ভাই, একটু চিন্তা করুন আখিরাতের বিষয়গুলো। সহিহ বুখারিতে আবু সাইদ থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন, “হে আদম!” আদম বলবেন, “লাব্বাইক হে প্রভু!” অতঃপর তাকে উচ্চস্বরে ডেকে বলা হবে, "নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাকে তোমার সন্তানদের থেকে জাহান্নামের অধিবাসীদের বের করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।" তিনি বলবেন, "হে প্রভু, জাহান্নামি কারা?" তিনি বলবেন, "প্রত্যেক এক হাজার থেকে—বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি বলবেন—নয়শ নিরানব্বইজন (জাহান্নামে যাবে)।” রাসুল বলেন, 'তখনই শিশু বার্ধক্যে উপনীত হবে, প্রত্যেক গর্ভধারিণী গর্ভপাত করবে, মানুষকে তুমি দেখবে মাতালের মতো—আসলে তারা মাতাল নয়; বরং আল্লাহর শাস্তি খুবই ভয়াবহ হবে।'২৮৯
হে মুসলিম ভাই ও বোন, আল্লাহর কাছে কাঁদুন। যেদিন কান্না কোনো কাজে আসবে না, সেদিন আসার আগেই নিজের পাপের কথা চিন্তা করে আল্লাহর দরবারে অশ্রু ঢালুন। কান্না হলো তাওবার চাবিকাঠি। কাঁদলে অন্তর নরম ও অনুতপ্ত হয়।
রাসুল বলেন: عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنُ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَعَيْنُ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ اللهِ 'দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। এক. ওই চোখ, যা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। দুই. ওই চোখ, যা আল্লাহর রাস্তায় প্রহরার কাজে রাত জেগেছে।'২৯০
যদি আপনারা অশ্রুর মূল্য ও প্রভাব বুঝতে চান, তাহলে তাওবাকারীদের জিজ্ঞেস করুন। যখন তারা ভগ্ন হৃদয় নিয়ে, ভীত-সন্ত্রস্ত ও হীন হয়ে আল্লাহর দিকে অভিমুখী হয়, তখন অনুতাপ ও তাওবার প্রমাণ হিসেবে তপ্ত অশ্রুগুলো তাদের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে। সুসংবাদ তাদের জন্য। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।'২৯১
হামজা আল-আ'মা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার মা হাসানের নিকট গিয়েছিলেন, অতঃপর বলেছেন, “হে আবু সাইদ, আমি চাই যে, আমার এই ছেলে তোমার সাথে থাকবে। হয়তো বা আল্লাহ তাআলা তোমার মাধ্যমে তার কোনো উপকার করবে।" আমি তার সাথে একমত ছিলাম না। একদিন তিনি আমাকে বলেন, “হে বৎস, তুমি সর্বদা আখিরাতের ব্যাপারে চিন্তা করবে। তাহলে হয়তো এই চিন্তা তোমাকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেবে। আর একাকিত্বের সময় বেশি বেশি কান্না করবে, তাহলে তোমার প্রভু এই অবস্থা দেখে হয়তো তোমার প্রতি দয়া করবেন। আর তখন তুমি হয়ে যাবে সফল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত।” তিনি বলেন, 'আমি তার ঘরে প্রবেশ করেই দেখতাম, তিনি কান্না করছেন এবং তার কাছে মানুষেরা আসলেও দেখতাম, তিনি কান্না করছেন। আবার কখনো দেখতাম, তিনি নামাজ পড়ছেন। তখনও তার ক্রন্দন ও বিলাপ শোনা যেত। তাই একদিন তাকে বললাম, “হে আবু সাইদ, আপনি তো অনেক বেশি কান্না করেন।" এ কথা বলার পর তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন, “হে বৎস, মুমিন যদি কান্নাই না করে, তাহলে করবে কী?"
হে বৎস, কান্না রহমত ডেকে আনে। যদি তুমি জীবনকে এমনভাবে গড়তে পারো যে, তুমি সর্বদা কান্না করো, তাহলে তা-ই করো। কেননা, হয়তো বা আল্লাহ তাআলা তোমাকে কান্নারত অবস্থায় দেখে তোমার প্রতি দয়া করবেন। আর যদি তিনি তোমার প্রতি রহম করেন, তাহলে তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে গেলে এবং জান্নাত পেয়ে সফল হলে। বাচ্চা যখন কান্না করে, তার মা কি তখন তার ওপর দয়া করে না? অবশ্যই করে। তুমি কি মনে করো যে, একজন মা তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে? উত্তর তোমার কাছেই থাক।
আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ابْكُوا، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا؛ فَإِنَّ أَهْلَ النَّارِ يَبْكُونَ حَتَّى تَسِيلَ دُمُوعُهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ كَأَنَّهَا جَدَاوِلُ حَتَّى تَنْقَطِعَ الدُّمُوعُ فَتَسِيلَ الدِّمَاءُ، فَتَقْرَحَ الْعُيُونَ، فَلَوْ أَنَّ سُفُنًا أُجْرِيَتْ فِيهِ لَجَرَتْ
'হে মানুষ, তোমরা কান্না করো। যদি কান্না করতে না পারো, তাহলে কান্নার ভান করো। কেননা, জাহান্নামের অধিবাসীদের এত অশ্রু প্রবাহিত হবে যে, যেন তা পানির নহর। এমনকি একসময় তাদের চোখের অশ্রু শেষ হয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে। এবং চক্ষুদ্বয় রক্তকূপে পরিণত হবে। যদি তাতে জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা চলতে পারবে। ২৯২
আহ, আহ, আফসোস! কঠিন হৃদয়গুলোর জন্য।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুল -এর কাছে এসে অন্তরের কাঠিন্যের অভিযোগ করল। তখন রাসুল বললেন:
إِنْ أَحْبَبْتَ أَنْ يَلِينَ قَلْبُكَ فَامْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيمِ، وَأَطْعِمِ الْمِسْكِينَ "যদি চাও যে তোমার অন্তর নরম হোক, তাহলে ইয়াতিমের মাথা মুছে দাও এবং মিসকিনকে খানা খাওয়াও। ২৯৩
আল্লাহর বান্দারা, আর কত দিন আমাদের হৃদয়গুলো শক্ত হয়ে থাকবে? আত্মাগুলো উদাসীন হয়ে রবে?! আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় কি এখনো হয়নি? তিনি তো ঘোষণা দিয়েছেন:
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ 'যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং (তাঁর কাছ থেকে) যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?'২৯৪
ইবনে মাসউদ বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমাদের ইসলাম গ্রহণ ও এই আয়াতগুলো অবতীর্ণের সময়ের মাঝে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান ছিল। অথচ এই কয়েক বছরেই আল্লাহ তাআলা আমাদের ভর্ৎসনা করেছেন। জীবন্ত হৃদয়ের মানুষ যখন এই আয়াত শ্রবণ করত, তখন তারা কান্না করে দিত আর বলত, “হে প্রভু অবশ্যই সময় হয়েছে।"
النَّاسُ فِي غَفْلَةٍ والمَوْتُ يُوْقِظُهمْ *** وَمَا يُفِيقُوْنَ حَتَّى يَنْفَدَ العُمُرُ يُشَيِّعُوْنَ أَهَالِيْهِمْ بِجَمْعِهِمْ *** وَيَنْظُرُونَ إِلَى مَا فِيْهِ قَدْ قُبِرُوا وَيَرْجِعُوْنَ إِلَى أَحْلَامِ غَفْلَتِهِمْ *** كَأَنَّهُم مَا رَأَوْا شَيْئاً وَلَا نَظَرُوا
'মানুষেরা উদাসীন, তাদের জাগিয়ে তুলে মৃত্যু। জীবন ফুরিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের হুঁশ ফেরে না। সবাই মিলে বিদায় জানায় পরিবারের সদস্যদেরকে। তাদের গোরস্তানের দিকে সবাই স্বচক্ষে তাকিয়ে দেখে। কিন্তু ফিরে এসে তারা আবার ডুবে যায় উদাসীনতায়। যেন তারা কিছুই দেখেনি, কিছুই তাদের চোখে পড়েনি।'
এটা অধিকাংশ মানুষের অবস্থা। অধিকাংশ মানুষ এমনই। তাই আমরা আল্লাহর কাছে অন্তরের কাঠিন্য থেকে আশ্রয় চাই। কেননা, এটি অনেক নিকৃষ্ট অবস্থা।
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'কিয়ামতের দিন মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রহার করা হবে অন্তরের কাঠিন্য, আল্লাহর থেকে দূরে থাকার কারণে। কঠিন হৃদয়গুলোকে নরম করার জন্যই মূলত আগুনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর কঠিন হৃদয়গুলোই আল্লাহর থেকে বেশি দূরে থাকে। আর অন্তর কঠিন হয়ে গেলে চক্ষুও অশ্রুহীন হয়ে যায়।'
ইয়াজিদ আর-রাক্কাশি বলেন, 'যদি তুমি তোমার পাপের জন্য কান্না না করো, তাহলে তুমি ছাড়া আর কে আছে যে তোমার পাপের জন্য আল্লাহর কাছে কান্না করবে?'
আল্লাহ তাআলা আমাকে ও আপনাদের কুরআনে কারিমের আয়াত ও উপদেশগুলোর মাধ্যমে উপকৃত করুন। আপনারা যা শুনছেন, আমি তা-ই বলেছি। আমি আল্লাহর কাছে সকল গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আমার ও আপনাদের জন্য। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়।

দ্বিতীয় খুতবা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য তাঁর অনুগ্রহের কারণে এবং কৃতজ্ঞতা তাঁরই জন্য তাঁর তাওফিকদান ও কৃপার কারণে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি সুমহান, এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসুল, যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে আহ্বানকারী। হে আল্লাহ, আপনি রহমত, শান্তি ও বরকত নাজিল করুন মুহাম্মাদ -এর ওপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কিরাম ও তাঁর অনুসারীদের ওপর।
উপস্থিত প্রিয় ভাই ও বোন,
আমি আপনাদের এবং আমার নিজেকে তাকওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহকেই ভয় করুন। তিনি বলেন:
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ
'আর তোমরা সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমাদের আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।' ২৯৫
বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে যে, জনৈক তাবিয়ি রাসুল -এর ভালোবাসায়, তাঁর প্রতি আসক্তির কারণে দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ কান্না করেছেন। অবশেষে তিনি স্বপ্নে রাসুল -কে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন।
কিন্তু আমার আর আপনাদের অবস্থা কী? বাস্তবিকভাবে আমরা কি কখনো তাঁকে হারানোর বেদনায় কোনো দিন কেঁদেছি? রাসুল-কে হারানোর বেদনা তো এমনই এক জ্বালা, যা চোখ দিয়ে অশ্রুর ঝরনা প্রবাহিত করে, মস্তিষ্ককে বিবেকহীন করে দেয়। কখনো রাসুল -কে স্বপ্নে দেখার আশা করেছেন? তাঁকে দেখার আশায় ক্রন্দন করেছেন? আপনার মন কি কখনো তাঁর হাতে হাওজে কাওসারের পানি পান করার আশা পোষণ করেছে?
একজন আশিকে রাসুলের ভাষায়:
تَسَلَّى النَّاسُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّا *** لَعُمْرُ اللَّهُ بَعْدَكَ مَا سَلِيْنَا إِنْ كَانَ عَرْ فِي الدُّنْيَا اللقاء فَفِي * مَوَاقِفِ الحَشْرِ نَلْقَاكُمْ وَيَكْفِيْنَا
'লোকেরা দুনিয়া পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ, আপনার পরে আমরা আর প্রশান্ত হইনি। পৃথিবীতে যদি সাক্ষাৎ কষ্টকর হয়, হাশরের ময়দানে আমরা আপনার দেখা পাব, এটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।'
এই অবস্থাটি আপনার কাছেও আমি পেশ করলাম। যা সত্যিকারের নবিপ্রেমিকদের অন্তরকে নাড়া দিয়ে যায়। তা তো এমনই এক ভয়ানক অবস্থা, যাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
যখন হুনাইনের যুদ্ধ থেকে মুসলিমরা বিজয়ী হয়ে গনিমত নিয়ে ফিরে আসেন, নবিজি মুসলিমদের মাঝে গনিমত বণ্টন করে দেন। বিশেষ করে তখন তিনি নব মুসলিমদের হৃদয়কে ইসলামের ওপর আরও মজবুত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। মুমিন সাহাবিদেরকেও ইমান ও ইসলামের প্রতি অনেক গুরুত্বারোপ করেন। তখন আনসাররা জিজ্ঞেস করলেন যে, 'রাসুল কেন আমাদেরকে গনিমত ও ফাইয়ের অংশ দেননি?' তারা এ বিষয়ে পরস্পর ফিসফিস করতে লাগল। সাদ বিন উবাদা আনসারদের এই বিষয়টি শুনে ফেলেন। সাথে সাথেই তিনি নবিজি-এর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হন এবং তাঁকে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আনসারদের এই গোত্র আপনার ফাই বণ্টন নিয়ে আপনার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা পোষণ করছে। আপনি আপনার সম্প্রদায়ের মাঝে তা বণ্টন করেছেন এবং আরব গোত্রগুলোর মাঝে অনেক কিছু দিয়েছেন। আর আনসারদের এই গোত্রের ভাগ্যে কিছুই মিলেনি।' অতঃপর নবিজি তাকে বললেন, “তোমার এবং তাদের মাঝে আর পার্থক্য রইলো কোথায় হে সাদ?' তখন সাদ স্পষ্ট ভাষায় বললেন, 'আমার গোত্রের মধ্যে আমি তো একজন মাত্র।' অতঃপর নবিজি তাকে বললেন, 'তাহলে তোমার সম্প্রদায়কে এখনই একত্রিত করো।' এরপর সাদ আনসারি কবিলাকে একত্রিত করলেন এবং রাসুল নির্দেশ দিলেন যে, তাদের কাছে যেন অন্য কেউ না যায়। তখন রাসুল তাদের নিকট আসলেন—তাঁর ওপর আমার মা-বাবা উৎসর্গিত হোক—অতঃপর তিনি সবার চেহারার দিকে তাকিয়ে একটি উজ্জ্বল মৃদু হাসি দিলেন। তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তিনি অবগত যে সেটাই বুঝিয়েছেন।
অতঃপর বললেন, 'হে আনসারিরা, তোমাদের ব্যাপারে আমার কাছে একটি সংবাদ এসেছে। তোমরা আমার ব্যাপারে একটি ধারণা লালন করেছ। আমি কি তোমাদের কাছে তোমাদের ভ্রষ্টতার সময়ে আসিনি? অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের আমার মাধ্যমে হিদায়াত দিয়েছেন। তোমরা ছিলে দরিদ্র, অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদের ধনাঢ্যতা দিয়েছেন। তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন, অতঃপর আমার মাধ্যমে তিনি তোমাদের মাঝে সুসম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছেন।' তাঁরা বলল, 'অবশ্যই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই অধিক শ্রেষ্ঠ এবং দয়াকারী।'
তারপর রাসুল বললেন, 'হে আনসার গোষ্ঠী, তোমরা কি আমার ডাকে সাড়া দেবে না?।' তাঁরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কীভাবে আপনার ডাকে সাড়া দেবো? আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্যই সকল অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব।' তখন রাসুল বললেন, 'যদি তোমরা চাইতে তাহলে বলতে এবং যদি তোমরা সত্যায়ন করতে, তাহলে তোমাদেরকেও সত্যায়ন করা হতো: আপনি আমাদের মাঝে এসেছেন এমন অবস্থায় যখন আপনাকে অন্যরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, আমরা আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আপনি এসেছেন সাহায্যহীন অবস্থায়, আমরা আপনাকে সাহায্য করেছি। আপনি এসেছেন নিঃস্ব অবস্থায়, আমরা আপনার ওপর সহানুভূতিশীল হয়েছি। আপনি এসেছেন বিতাড়িত অবস্থায়, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি।
হে আনসারগণ! দুনিয়ার সামান্য বিষয়ের জন্য তোমরা অসন্তুষ্ট হয়ে আছ, যার বিনিময়ে আমি কিছু লোকের মন রক্ষা করেছি, যেন তারা ইসলামের প্রতি ধাবিত হয়। আর তোমাদের ইসলামের প্রতি ন্যস্ত করেছি। হে আনসারগণ, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নয় যে, যখন মানুষ বকরি ও উট নিয়ে যাবে, তখন তোমাদের ভাগে আল্লাহর রাসুল-কে নিয়ে যাবে? কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন, যদি হিজরত না থাকত, তাহলে আমিও একজন আনসার হতাম। যদি মানুষ কোনো একটি জাতিকে গ্রহণ করত, তাহলে আমি আনসারদের গ্রহণ করতাম। হে আল্লাহ, আপনি আনসারদের প্রতি দয়ার্দ্র হোন, তাদের সন্তানদের ও সন্তানের সন্তানদের দয়া করুন।' অতঃপর আনসারিরা ক্রন্দন করলেন। এমনকি তাঁদের দাড়ি ভিজে গেল। তাঁদের প্রেমাস্পদের আর তাঁদের অশ্রু একাকার হয়ে গেল। সকলেই চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তাঁদের সাথে সাদ ও ছিলেন। তাঁরা বলছিল, 'আমরা আমাদের ভাগে রাসুল-কে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। ২৯৬
কতই না সুন্দর ছিল সেই দৃশ্য! কতই না চমৎকার ছিল সেই দৃশ্য, যখন সত্যবাদীরা তাদের প্রেমাস্পদের প্রতি ভালোবাসা ও আসক্তি চোখের অশ্রুর মাধ্যমে প্রকাশ করেছে!
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ جَاءكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ
'তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছে। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু।'২৯৭
আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, আপনারা কি কখনো তাঁকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছেন? কখনো কি তাঁর বিচ্ছেদের শোকে কেঁদেছেন? যদি আপনি সত্যিই তাঁকে ভালোবেসে থাকেন, তবে এটাই তাঁকে ভালোবাসার নিয়ম। এটি আপনার জন্য একটি হাদিয়াস্বরূপ। সুতরাং শক্ত করে তা আঁকড়ে ধরুন। তবে অমনোযোগীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। এটা ভাববেন না যে, সবার অশ্রুই সত্য। বরং কিছু মিথ্যা অশ্রুও আছে। যেমন: ইউসুফ-এর ভাইয়েরা তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করার পর রাতের বেলায় তাদের বাবার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসেছে। আর দোষ দিল বাঘের। অথচ এখানে বাঘের কোনো সম্পর্কই ছিল না। হে মুসলিম ভাই, আজ আপনাদের মাঝে এমনও অনেক মানুষ আছে, যারা কখনো ফজরের নামাজ মুসল্লিদের সাথে জামাআতে পড়েনি। বরং ঘুমিয়েই বেলা পার করে দেয়। আর যখনই আপনি ঘুম থেকে উঠেছেন, তখনও কি ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে পড়তে পেরেছেন? না; বরং আপনার জামাআত ছুটেই গেল। কিন্তু এ নিয়ে আপনি একটুও অস্থির হননি!
আপনি কি কান্না করেছেন? আপনি কি অনুতপ্ত হয়েছেন? পরিবর্তনের জন্য কি প্রতিজ্ঞা করেছেন? আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তীদের মাঝে পার্থক্য হলো তাদের অশ্রুগুলো ছিল তপ্ত আর আমাদের অশ্রুগুলো ঠান্ডা। তপ্ত অশ্রুর প্রভাব রাতে এবং দিনে উভয় সময়েই থাকে। তা জীবনের গতি পাল্টে দেয়। আল্লাহর কোনো বিধান ছুটে গেলে তারা কান্না করতেন। আর ঠান্ডা অশ্রু হলো, যা বের হওয়ার খানিক পরেই তার প্রভাব চলে যায়। তাই পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই মহান সত্তার—যিনি তপ্ত অশ্রু প্রবাহিতকারীদের পবিত্র করেছেন এবং তাদের সততা বর্ণনা করেছেন।
আওফি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, 'নবিজি মানুষকে তাঁর সাথে যুদ্ধের জন্য বের হতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তাঁর কাছে সাহাবিদের একটি জামাআত আসলো। তাদের যুদ্ধের কোনো বাহন ছিল না। তারা বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, আমাদেরকে আপনার সাথে নিয়ে যান।" রাসুল বলেন, "আল্লাহর কসম, আমার কাছে এমন কিছু নেই, যাতে আমি তোমাদের আরোহণ করাব।”২৯৮ তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেল। আবার জিহাদ না করে বসে থাকাও তাদের জন্য কষ্টসাধ্য মনে হচ্ছিল। অথচ তাদের না আছে কোনো খরচাদি না আছে বাহন! আল্লাহ তাআলা তাদের মনের মাঝে তাঁর প্রতি ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসা দেখে তাদের এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ওহি নাজিল করেন এবং তাদের অন্তরের সত্যতা প্রমাণ করে দেন। তিনি ইরশাদ করেন:
لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ مَا عَلَى الْمُحْسِنِينَ مِن سَبِيلٍ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوْكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَّا يَجِدُوا مَا يُنفِقُونَ - إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ وَهُمْ أَغْنِيَاء رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
'(জিহাদে অংশগ্রহণ না করায়) দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোনো অভিযোগ নেই, যখন তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি আন্তরিক থাকে। সৎকর্মশীলদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কারণ নেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। তাদের বিরুদ্ধে (কোনো অভিযোগ) নেই, যারা আপনার কাছে বাহনের জন্য এলে আপনি বলেছিলেন, "আমার কাছে তো তোমাদের দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই।” যখন তারা ব্যয় করার মতো কিছু না পাওয়ার কষ্টে অশ্রুপূর্ণ নয়নে ফিরে গিয়েছিল। আসলে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে, যারা ধনী হওয়া সত্ত্বেও আপনার কাছে অনুমতি চায়। তারা পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের (মহিলাদের) সাথে থাকতে পছন্দ করেছে। আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন। তাই তারা জানে না। '২৯৯
তারা জিহাদে যাওয়ার সক্ষমতা না থাকায় কেঁদেছেন। শাহাদাতের পথে অগ্রসর হওয়ার বাহন না থাকায় তারা ক্রন্দনরত ছিলেন। আর আমি ও আপনারা কীসের জন্য কাঁদি? ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, হিন্দুস্থান, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মুসলিমদের দুর্দশা কি আপনাদের কাঁদায় কখনো?
আল্লাহ তাআলা কি বলেননি? وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً “আর তোমাদের এই যে জাতি, এটা তো একই জাতি। "৩০০
রাসুল কি ইরশাদ করেননি?
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ، وَتَرَاحُمِهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌّ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
"পরস্পর ভালোবাসা, দয়া ও অনুগ্রহে মুমিনদের দৃষ্টান্ত হলো একই দেহের মতো। যখন তার কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন তার বাকি সব অঙ্গ বিনিদ্রা ও জ্বরের শিকার হয়।"৩০১
হে ভাই, বিধবা নারীদের আর্তচিৎকার কি তোমাকে কাঁদায় না? এতিম শিশু আর বৃদ্ধদের করুণ আওয়াজ কি তোমার কর্ণকুহরে আঘাত করে না? তুমি কি ইরাকের বোন ফাতিমার সেই হৃদয়বিদারক আহ্বান শুনোনি? ক্রুসের পূজারিরা যার ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে! যদি তাদের আহ্বানে তুমি সাড়া না দাও, তবে কে আর সাড়া দেবে?! কে তাদের আর্তচিৎকার শুনবে?! ফিলিস্তিন, শিশান, আফগানিস্তানের ফাতিমাদের আহ্বানে আর কে সাড়া দেবে? সারা পৃথিবীর মুসলিম নারীদের ডাক শুনবে কে?
আল্লাহর কসম, যদি তুমি অনুভব করতে যে, তোমার চারপাশে কী ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত? তাহলে তোমার ক্রন্দনের জন্য বেশি কিছুর প্রয়োজন হতো না। নিজের অজান্তেই অল্পতে কেঁদে ফেলতে তুমি। কেননা, কালের স্তূপীকৃত দুঃখের চাপে পড়ে, অবৈধ দখলদারদের প্রভাবে এবং মুনাফিক ও দুশমনের বিদ্বেষের কারণে হৃদয়গুলো জমাট বেঁধে গেছে। আর যখন অনুভব করবে যে, তুমি আসলে কিছু করতে চাও, কিন্তু বাধা-প্রতিবন্ধকতার কারণে পারছ না, তাহলে অবশ্যই তোমার মন থেকে কান্না আসবে। তখন কান্না ও আল্লাহর জিকির ছাড়া কোনো কিছুতেই হৃদয়ের আগুন নিভবে না এবং কষ্ট হালকা হবে না। তখন সার্বক্ষণিক অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে এবং মুসলিমদের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব আর কাফিরদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে। দ্বীনদারদের কাফেলার সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ সর্বদা তাড়া করবে তোমাকে।
হে আমাদের দায়িত্বশীলগণ, যেভাবে আপনারা আমাদের দুনিয়ার সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার জন্য সন্তোষজনকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সেভাবে আমাদের দ্বীন ও আখিরাতের বিষয়গুলোর প্রতিও একটু গুরুত্ব দিন। যাতে দুনিয়ার সুখের সাথে আখিরাতের সুখও নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমাদের আনন্দে পূর্ণতা আসে, যেন আমরা পরিপূর্ণরূপে খুশি হতে পারি। আমরা আপনাদের প্রতি আশাবাদী। আর দ্বীনের সাহায্যের মাধ্যমেই দুনিয়াতে সম্মান পাওয়া যায় এবং আখিরাতের সুখ নিশ্চিত হয়। দ্বীনের সাহায্যের মাধ্যমেই আল্লাহর সাহায্য আসে এবং জমিনে কর্তৃত্ব অর্জিত হয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
'তারা এমন লোক যে, আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই, তাহলে তারা নামাজ কায়িম করবে, জাকাত দেবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজ করতে নিষেধ করবে। আল্লাহর হাতেই সবকিছুর পরিণতি।'৩০২
আল্লাহর কসম, আমাদের হৃদয় ততক্ষণ পর্যন্ত খুশি হবে না, যতক্ষণ না আমাদের প্রথম কিবলা মুক্ত হবে, মুসলিম বন্দীরা মুক্তি পাবে এবং যতক্ষণ না ইরাকসহ বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশ থেকে কুকুরগুলো বেরিয়ে যাবে।
হে আল্লাহ, আপনি আপনার দ্বীন ও কিতাবকে এবং আপনার প্রিয় হাবিবের সুন্নাহ ও একত্ববাদে বিশ্বাসীদের সাহায্য করুন। যারা দ্বীনকে সাহায্য করে, তাদের আপনি সাহায্য করুন। যারা তাওহিদবাদীদের অপদস্থ করে, তাদের আপনি অপদস্থ করুন। হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আপনার ভালোবাসা, যারা আপনাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা এবং এমন আমলের ভালোবাসা চাই, যা আমাদের আপনার ভালোবাসা অর্জনে সহায়তা করবে। হে প্রভু, আমরা আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি এমন হৃদয় থেকে, যা আপনার ভয়ে ভীত হয় না; এমন চক্ষু থেকে, যা আপনার দরবারে কাঁদে না; এমন কান থেকে, যা আপনার কথা শুনে না; এমন নফস থেকে, যা তৃপ্ত হয় না; এমন ইলম থেকে, যা উপকারে আসে না; এমন দুআ থেকে, যা কবুল হয় না। হে আল্লাহ, আমাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং অন্তরে তা সুসজ্জিত করে দিন। আর কুফুরি, ফুসুকি ও অবাধ্যতাকে আমাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। আমাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
আমাদেরকে আমাদের নিজ ভূখণ্ডে নিরাপদ করে দিন, আমাদের নেতাদের সংশোধন করে দিন। আমাদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এমন কারও হাতে রাখুন, যে আপনাকে ভয় করে এবং আপনার সন্তুষ্টি মেনে চলে। হে আল্লাহ, আপনি পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করে নিন। বিপদগ্রস্তদের বিপদ দূর করে দিন। দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা লাঘব করে দিন। ঋণীদের ঋণ পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দিন। পথহারাকে পথ দেখান। পথভ্রষ্টকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। জীবিত-মৃত সকলকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহর বান্দারা,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الفَحْشَاءِ وَالمُنْكَرِ وَالبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعْلَكُمْ تَذَكَّرُونَ
'নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।'৩০৩
অতএব, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনিও তোমাদের স্মরণ করবেন। তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো। তাহলে তিনি নিয়ামত বাড়িয়ে দেবেন। আর আল্লাহর জিকিরই সর্বোত্তম। তিনি সবার কৃতকর্ম সম্পর্কে জানেন।

টিকাঃ
২৭০. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭ : ১৬।
২৭১. সুরা আলি ইমরান, ৩ : ১০২।
২৭২. সুরা আন-নিসা, ৪: ১।
২৭৩. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ : ৭০-৭১।
২৭৪. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৮। উল্লেখ্য, এটি সিজদার আয়াত। সুতরাং এটি তিলাওয়াত করলে বা শুনলে সিজদা করা ওয়াজিব হবে।
২৭৫. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ১০৯। উল্লেখ্য, এটি সিজদার আয়াত। সুতরাং এটি তিলাওয়াত করলে বা শুনলে সিজদা করা ওয়াজিব হবে।
২৭৬. সুনানুন নাসায়ি: ৩১০৮, সুনানুত তিরমিজি: ১৬৩৩।
২৭৭. সুনানুন নাসায়ি: ১২১৪।
২৭৮. দেখুন, সহিহুল বুখারি: ৬৬৪, সহিহু মুসলিম: ৪১৮।
২৭৯. সহিহুল বুখারি: ১/১৪৪।
২৮০. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ২৩।
২৮১. সুরা আন-নিসা, ৪:৪১।
২৮২. সহিহুল বুখারি: ৫০৫০, সহিহু মুসলিম: ৮০০।
২৮৩. সুরা আন-নিসা, ৪: ৪১-৪২।
২৮৪. সুরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩: ১৪-১৭।
২৮৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২৩।
২৮৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৯০।
২৮৭. সুরা আল-কাসাস, ২৮ : ৮৩।
২৮৮. শুআবুল ইমান : ৭৮৪, তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির : ৭৪১।
২৮৯. সহিহুল বুখারি: ৪৭৪১।
২৯০. সুনানুত তিরমিজি: ১৬৩৯।
২৯১. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
২৯২. আজ-জুহদ ওয়ার রাকায়িক লি ইবনিল মুবারক : ২/৮৫।
২৯৩. আর-রিক্কাতু ওয়াল বুকায়ু লি ইবনি আবিদ দুনইয়া: ৪৭।
২৯৪. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৬।
২৯৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৮১।
২৯৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৮/২৫৩।
২৯৭. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১২৮।
২৯৮. সহিহুল বুখারি: ৬৭২১।
২৯৯. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৯১-৯৩।
৩০০. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫২।
৩০১. সহিহুল বুখারি : ৬০১১, সহিহু মুসলিম: ২৫৮৬। উল্লেখ্য, শাইখের লেকচারে হাদিসটির আংশিক বর্ণিত হয়েছে। এখানে আমরা পুরো হাদিসটি উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
৩০২. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪১।
৩০৩. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৯০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00