📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের কাহিনি

📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের কাহিনি


বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা

📄 সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা


بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ
'যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে অন্তর বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?'১১৬
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
আল্লাহ তোমাদের নেক জীবন বর্ধিত করুন। সত্যের পথে তোমাদের যাত্রা সঠিক রাখুন। তোমাদের পদচারণা সঠিকতার ওপর রাখুন। সম্মানিত আরশের মালিক মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ও তোমাদের সম্মানের নিবাসে একত্রিত করেন, ভাই ভাই হিসেবে জান্নাতের উচ্চাসনে সমাসীন করেন। হে আল্লাহ, আপনার কাছে প্রার্থনা করি, আপনি গুনাহগারদের গুনাহ মাফ করুন, তাওবাকারীদের প্রার্থনা কবুল করে নিন, অস্থিরতায় আক্রান্তদের সঠিক পথ দেখান, পথভ্রষ্টদের হিদায়াত দিন, জীবিত-মৃত সকলকে ক্ষমা করে দিন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওবার আদেশ দিয়ে বলেন:
وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعاً أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'১১৭
আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করার ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন :
وَهُوَ الَّذِيْ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ
'আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'১১৮
আল্লাহর রহমতের দরজা সর্বদা খোলা, তাঁর কাছে আশার দরজা সব সময় খোলা। তিনি বলেন: لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ 'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।'১১৯
হাদিস শরিফে এসেছে, ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুল-কে বলতে শুনেছেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ، تُوبُوا إِلَى رَبِّكُمْ، فَإِنِّي أَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ 'হে লোক-সকল, তোমরা তোমাদের রবের কাছে তাওবা করো। নিশ্চয় আমি প্রতিদিন ১০০ বার তাওবা করি।'১২০
আল্লাহ তাআলা দাউদ-এর কাছে ওহি করেন, 'হে দাউদ, যদি পেছনে ফিরে থাকা লোকেরা জানত যে, আমি তাদের জন্য কতটা অপেক্ষা করি, তাদের প্রতি আমার কতটা স্নেহ কাজ করে, তাদের গুনাহের কাজ ছাড়ার প্রতি আমার চাওয়া কতটা বেশি—তবে আগ্রহের কারণে তারা মরে যেত, আমার ভালোবাসায় তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। হে দাউদ, যারা আমার ইবাদত না করে মুখ ফিরিয়ে রাখে, তাদের জন্য আমার এমন ইচ্ছা। তাহলে যারা আমার দিকে মনোনিবেশ করে, তাদের জন্য আমার ইচ্ছা কতটা সুন্দর হতে পারে?'
আজ আমাদের আলোচনার শিরোনাম, সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা। আমরা আলোচনা করব, আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনকারীদের পরিচয় ও তাদের প্রত্যাবর্তনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কাহিনি সম্পর্কে। প্রত্যাবর্তনের আলোচনার শুরু ও শেষের মাঝে পাঁচটি কথা আছে—
প্রত্যাবর্তন : ১. لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةً لَّأُوْلِي الْأَلْبَابِ )তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়।) ১২১
প্রত্যাবর্তন: ২. আল্লাহ নতুন জীবন দিলেন।
প্রত্যাবর্তন: ৩. তুমি কি তার মতো হতে চাও?
প্রত্যাবর্তন: ৪. নেশাখোরদের পথ।
প্রত্যাবর্তন: ৫. আমার হিদায়াত তার হাতে।
এরপর শেষকথা।
তবে শুরু করা যাক প্রত্যাবর্তনকারীদের নিয়ে প্রথম কথা। সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন:
'আল্লাহর একদল ফেরেশতা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত মানুষগুলোর খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। খুঁজতে খুঁজতে যখন তারা আল্লাহর জিকিরকারীদের পেয়ে যায়, তাদের ডেকে বলে, "তোমরা তোমাদের কাজে আসো।" এরপর ফেরেশতারা তাদের ডানা দিয়ে নিকটবর্তী আকাশ পর্যন্ত ঢেকে ফেলেন। তখন তাদের রব ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, যদিও তিনি অধিক জানেন তারা কী বলবে, তিনি জানতে চান, "আমার বান্দারা কী বলে?" ফেরেশতারা উত্তর দেয়, “তারা আপনার পবিত্রতা, আপনার বড়ত্ব, আপনার প্রশংসা ও মর্যাদা বর্ণনা করে।” আল্লাহ বলেন, "তারা কী আমাকে দেখেছে?” ফেরেশতারা বলে, “না, আল্লাহর শপথ, তারা আপনাকে দেখেনি।” আল্লাহ বলেন, “যদি তারা আমাকে দেখত, তবে কেমন হতো?” ফেরেশতারা বলে, “যদি তারা আপনাকে দেখত, তবে আরও বেশি ইবাদত করত, আরও বেশি আপনার মর্যাদা ও প্রশংসা বর্ণনা করত, আরও বেশি পবিত্রতা বর্ণনা করত।”
হে আল্লাহ আপনাকে দেখার সৌভাগ্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। ক্ষতিকর ক্ষতি ও গোমরাহকারী ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ দান করুন আমাদের। হে আল্লাহ, আমাদের ইমানের সাজে সজ্জিত করুন, আমাদের হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
'এরপর আল্লাহ বলেন, “তারা আমার কাছে কী চায়?” ফেরেশতারা উত্তর দেয়, “তারা আপনার কাছে জান্নাত চায়।” আল্লাহ বলেন, “তারা কী জান্নাত দেখেছে?” ফেরেশতারা জবাবে বলে, “না, আল্লাহর শপথ, হে রব, তারা জান্নাত দেখেনি।” আল্লাহ বলেন, “তাহলে তারা জান্নাত দেখলে কী হতো?” ফেরেশতারা বলে, “তারা জান্নাত দেখলে আরও বেশি আগ্রহী হতো, আরও বেশি পরিমাণ ইবাদত করে জান্নাত তালাশ করত, আরও বেশি আকৃষ্ট হতো।”
কোথায় জান্নাতের পথের অভিযাত্রীরা? কোথায় জান্নাত-প্রত্যাশীরা?
'এরপর আল্লাহ বলেন, "তারা কীসের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে?” ফেরেশতারা বলে, "তারা জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে।" আল্লাহ বলেন, “তারা কী জাহান্নাম দেখেছে?” ফেরেশতারা জবাব দেয়, "না, আল্লাহর শপথ, হে রব, তারা জাহান্নাম দেখেনি।” আল্লাহ তখন বলেন, "যদি তারা জাহান্নাম দেখত, তবে কী হতো?” ফেরেশতারা বলে, "যদি তারা তা দেখত, তবে আরও বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে পলায়ন করত (ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে), আরও বেশি ভয় করত।”—'হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন।'—'এরপর আল্লাহ বলেন, "আমি তোমাদের সাক্ষ্য রেখে বলছি, আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।"-যারা এমন মজলিশের একজন, তারা সুসংবাদ নাও, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। 'এরপর ফেরেশতাদের একজন বলেন, "তাদের মাঝে অমুক তাদের একজন নয়, সে কেবল নিজের প্রয়োজন মেটাতে এসেছে।” তখন আল্লাহ বলেন, “তারা এমন মানুষ, যাদের সাথে উপবেশনকারী (ক্ষমা থেকে) বঞ্চিত হয় না। "১২২ হ্যাঁ, তোমরা সুসংবাদ নাও, কারণ তোমাদের রব প্রশস্ত রহমতের অধিকারী।
শোনো, আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বানকারী তোমাকে ডাকছেন, 'আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য পুণ্যবানরা অধীর হয়ে আছে, তাদের অপেক্ষার প্রহর বেশ লম্বা হয়েছে। আমি তাদের চেয়ে বেশি অধীর হয়ে আছি। যে আমাকে তালাশ করবে, সে আমাকে পাবে। আর যে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে তালাশ করবে, সে আমাকে পাবে না। যে আমার প্রতি এগিয়ে আসবে, আমি তাকে কবুল করে নেব। যে আমার দরজায় করাঘাত করবে, আমি তার জন্য দরজা খুলব। যে আমার ওপর তাওয়াক্কুল করবে, আমি তার জন্য যথেষ্ট হব। যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব। আমি যাদের দান করি, তারা হচ্ছে আমার জিকিরকারী দল, আমার জন্য মজলিশকারী দল, আমার কৃতজ্ঞতা আদায়কারীগণ, আমার আনুগত্যকারীগণ, আমার সম্মানকারীগণ। আর পাপীরা, আমি তাদের নিজ রহমত থেকে নিরাশ করি না, যদি তারা তাওবা করে। যদি তারা তাওবা করে, তবে আমিই তাদের প্রেমাস্পদ। যদি তারা তাওবা না করে, তবে আমি তাদের ডাক্তার। আমি তাদের পরীক্ষা করি বিপদ দিয়ে। আমি তাদের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত করি, পবিত্র করি। যে আমার দিকে অগ্রসর হয়, আমি তাকে দূর থেকে গ্রহণ করি। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তাকে কাছ থেকে আহ্বান করি। যে আমার জন্য কোনো কিছু কুরবানি করে, আমি তাকে তার চেয়ে বেশি প্রদান করি। যে আমার সন্তুষ্টি কামনা করে, আমি তাকে তা-ই দিই, যা সে চায়। যে আমার ওপর ভরসা করে, আমার নিকট আশ্রয় চেয়ে কিছু শুরু করে, আমি তার জন্য লোহাও নরম করে দিই। যে আমার প্রতি নিবেদিত হয়, আমিও তার প্রতি নিবেদিত হই। যে আমার কাছে আশ্রয় নেয়, আমি তাকে আশ্রয় দিই। যে তার কর্মকে আমার দিকে ন্যস্ত করে, আমি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। যে নিজেকে আমার কাছে বিক্রি করে দেয়, আমি তাকে ক্রয় করে নিই; তাকে মূল্য দিয়ে দিই। জান্নাত, আমার সন্তুষ্টি, আমার ওয়াদাকে সত্য করি, পূর্বেকৃত ওয়াদাকে পূর্ণতা দিই।' আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ
'আল্লাহর চেয়ে আর কে বেশি নিজ ওয়াদা পালনকারী?'১২৩
আসল আনন্দ তো তাওবাকারীদের জন্য। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া তাদের ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের। '১২৪
আল্লাহর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হও। আল্লাহর শোকর আদায় করো। বলো: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
'হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আর আমি আপনার গোলাম। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের সকল অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার প্রতি আপনার অবতারিত সকল নিয়ামত আমি স্বীকার করছি। আর আমি নিজের কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার মতো আর কেউ নেই। '১২৫
বলো, আমি সে মৃত, যাকে আপনি জীবন দান করেছেন। সকল প্রশংসা আপনার। আমি সে দুর্বল, যাকে আপনি শক্তি দিয়েছেন; তাই আপনার জন্যই সকল স্তুতি। আমি ছোট, আপনি আমাকে লালনপালন করলেন। আপনার জন্যই সকল গুণগান। আমি দরিদ্র, আপনিই আমাকে স্বাবলম্বী করেছেন; তাই সকল প্রশংসা আপনার। আমি গোমরাহ ছিলাম, আপনিই আমাকে হিদায়াত দিলেন। অতএব সকল প্রশংসার মালিক কেবল আপনিই। আমি ছিলাম মূর্খ, আপনিই আমাকে শেখালেন; তাই সকল প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আপনি। আমি ছিলাম ক্ষুধার্ত, আপনি আমাকে আহার করিয়েছেন; তাই সকল প্রশংসা কেবলই আপনার জন্য। সকল প্রশংসা, সকল শোকর ও কৃতজ্ঞতা আপনারই। জন্য। আপনার হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তন করে সবকিছু। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
يارب حمداً ليس غيرك يحمد *** يا من له كل الخلائق تصمد أبواب غيرك ربنا قد أوصدت *** رأيت بابك واسعاً لا يوصد
'হে রব, প্রশংসা আপনারই। অন্য কেউ প্রশংসার যোগ্য নয়। আপনার দিকেই মুখাপেক্ষী সমগ্র সৃষ্টিজগৎ। হে আমাদের রব, অন্যদের সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল আপনার প্রশস্ত দুয়ারই চির উন্মুক্ত।'
মানসুর বিন আম্মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'সকাল হয়ে গেছে ভেবে এক রাতে আমি বের হলাম ঘর থেকে। কিন্তু রাত এখনো বাকি আছে দেখে একটি ঘরের দোরগোড়ায় বসে পড়লাম। ভেতর থেকে একটি যুবকের কান্নার আওয়াজ পেলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুবকটি বলছিল, "আপনার সম্মান ও মাহাত্ম্যের কসম, আমি আপনার অবাধ্যতা ও বিরোধিতা করতে চাইনি। কিন্তু আমি গুনাহ করে আপনার অবাধ্য হয়েছি। আমি আপনার শাস্তির বিষয়ে অনবগতও নই। আপনার শাস্তি সহ্য করার মতো শক্তিও আমার নেই। আপনার দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নফস আমাকে গুনাহের প্রতি প্ররোচিত করেছে। আমার আগ্রহ আমাকে পরাজিত করেছে। আপনি গুনাহ গোপন রাখবেন, এ বলে নফস আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। তাই আমি গুনাহ করে ফেলেছি।... কিন্তু... এখন আমাকে আপনার আজাব থেকে কে বাঁচাবে?!... আপনি যদি আমাকে তাড়িয়ে দেন, তবে আমি কার কাছে যাব?! হায়, হায়! কতটা দিন আমি গুনাহে কাটিয়েছি! হায়, আমার ধ্বংস! কতবার আমি তাওবা করেছি, আবারও কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়েছি! এখনই সময় আমি আমার রবকে লজ্জা করব।”
মানসুর বলেন, 'আমি তার কথা শুনে বললাম :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের নিজেদের আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তা-ই করে তাদের যা করার আদেশ দেওয়া হয়।”১২৬
এরপর আমি একটা কম্পন-আওয়াজ শুনলাম। তখন আমি নিজের প্রয়োজনে চলে গেলাম। সকালবেলা ফিরে এলাম সেখান দিয়ে। দেখলাম, বাড়ির দরজায় একটি লাশ রাখা আছে। আর এক বৃদ্ধা তার কাছে আসা-যাওয়া করছে। আমি তাকে বললাম, "কে মারা গেছে?”
সে বলল, "আমার চিন্তা বৃদ্ধি করো না। এখান থেকে যাও।”
আমি বললাম, “আমি একজন মুসাফির।"
বৃদ্ধা বলল, "এ আমার ছেলে। গত রাতে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে এক লোক গিয়েছিল। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় না দিন। সে জাহান্নাম সম্পর্কে একটি আয়াত তিলাওয়াত করে যায়। তার তিলাওয়াত করার পর থেকে আমার ছেলে কেঁপে কেঁপে অস্থির হয়ে ওঠে আর কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়।”
আমি বললাম, )إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ( “আমরা সকলে আল্লাহর জন্য, আর আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।" আমি এবার নিজেকে বললাম, হে ইবনে আম্মার, এটাই হচ্ছে তাকওয়াবানদের বৈশিষ্ট্য।'
أَيَا مَن لَيسَ لِي مِنهُ مُجِيرُ *** بَعفُوكَ مِن عِقابِكَ أَسْتَجِيرُ فَإِن عَذَّبَتِنِي فَالذَنبُ مِنِّي *** وَإِن تَغفِر فَأَنتَ بِهِ جَدِيرُ
'হে মহান সত্তা, যাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কেউ নেই। আপনার ক্ষমার মাধ্যমেই আশ্রয় চাই আপনার শাস্তি থেকে। আমাকে যদি শাস্তি দেন, নিশ্চয় আমি অপরাধী; শাস্তির উপযুক্ত। আর যদি ক্ষমা করেন, ক্ষমাই আপনাকে বেশি মানায়।'
যুবক-বৃদ্ধ, চিন্তিত-উদ্বিগ্ন সবার সমস্যার সমাধান হচ্ছে, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়াই সকল সমস্যার সমাধান।
এসো, আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। অনেক দিনই তো কাটালে আল্লাহ থেকে দূরে থেকে। অনেক দিন দূরে থাকার পর, গুনাহের অন্ধকার সাগরে ডুবে থাকার পর এবার এসো প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায়।
আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনকারীগণ, যাদের অনেক দিনই কেটে গেল দূরে দূরে। পাপ ও গুনাহ যাদের পুড়ে দিল। যারা নিজেদের জীবনকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর তাদের সামনে একটি আলো উদ্ভাসিত হলো। ফলে তারা পাপের লাঞ্ছনাকে ছেড়ে এসে আনুগত্যের সাজে নিজেদের সজ্জিত করেছে। তারা নিজেদের নফস, প্রবৃত্তি, শয়তান ও তার দলের ওপর বিজয়ী হলো। তারা জান্নাতকে প্রাধান্য দিল জাহান্নামের ওপর। তারা আল্লাহর প্রতি কৃত অবাধ্যতার জন্য লজ্জিত হলো।
রাসুল ﷺ বলেন : النَّدَمُ تَوْبَةُ 'অনুতাপই তাওবা'।১২৭
জনৈক সালাফ বলেন, 'মুমিন বান্দা গুনাহ করে লজ্জিত হতে থাকে, এভাবে (তাওবা করে) সে জান্নাতে প্রবেশ করে।' তখন ইবলিস বলে, 'হায়, আমি যদি তাকে গুনাহে পতিত না করতাম!'
তলাব বিন হাবিব বলেন, 'বান্দা কর্তৃক আল্লাহর হক আদায় করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। বান্দা যদি গুনাহ করে ফেলে সকাল-সন্ধ্যায় তাওবা করে, তবে তাতে দোষ নেই। তবে যদি কেউ গুনাহের ওপর অটল থাকে, সেটা হবে অপরাধ।' অপরাধ হবে তখন, যখন কেউ অবহেলার বশবর্তী হয়ে গুনাহ করতেই থাকে। ভুলে থাকে তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা। এবং আল্লাহ যে তাকে দেখছেন, সে ব্যাপারে বেখবর থাকে।
এক লোক ইবরাহিম বিন আদামের কাছে আসলো। তাকে বলল, 'পাপ ও গুনাহের মাধ্যমে আমি নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আমাকে একটি গভীর কথা বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'আমি তোমাকে পাঁচটি জিনিসের উপদেশ দিচ্ছি।' লোকটি বলল, 'প্রথমটি বলুন।' ইবনে আদাম বললেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতা করে তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে খাবে না।' লোকটি বলল, 'কীভাবে? তিনিই তো আমাকে খাওয়ান!' ইবনে আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি এবার বলল, 'দ্বিতীয়টি কী?' ইবনে আদাম আরজ করলেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতা করে আল্লাহর জমিনে বাস করবে না। অন্য কোথাও গিয়ে বাস করবে।' লোকটি বলল, 'ইবরাহিম, তা কী করে সম্ভব! পুরো দুনিয়াটাই তো তাঁর। সব আসমানই তো তাঁর।' ইবরাহিম বিন আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বসবাস করবে আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'তৃতীয়টি বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'গুনাহ করার জন্য এমন একটি জায়গায় যাও, যেখানে গেলে আল্লাহ তোমাকে দেখবেন না।' লোকটি বলল, 'ইবরাহিম এমন কোনো জায়গা নেই। আর আল্লাহ তো ঘুমান না। তাঁকে তন্দ্রা ছুঁতে পারে না।' ইবরাহিম বিন আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গা দেখছেন তুমি আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'চতুর্থটি?' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'যখন তোমার কাছে মালাকুল মাওত তোমার রুহ কবজ করতে আসবে, তখন তাকে বলবে, আমি এখন মরতে চাই না।' লোকটি বলল, 'এ রকমটা কেউই করতে পারে না। আল্লাহ তো বলেছেন:
إِذَا جَاء أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
"তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় চলে আসলে তারা এক মুহূর্তও আগ-পিছ করতে পারবে না।"১২৮
ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'আশ্চর্য, তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গায় দেখছেন, মৃত্যু আসলে মৃত্যুকেও ঠেকাতে সক্ষম নও তুমি, আবার তুমি তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'পঞ্চমটি বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'যখন তোমার কাছে—আজাবের ফেরেশতা-জাবানিয়া আসবে তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য, তখন তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে জান্নাতে চলে যেও।'
লোকটি বলল, 'ইবরাহিম, কেউই এ রকম করতে পারে না।' ইবনে আদাম বললেন, 'আশ্চর্য, তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গায় দেখছেন, মৃত্যু আসলে মৃত্যুকেও ঠেকাতে সক্ষম নও তুমি, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে চলে যেতেও পারবে না তুমি, তুমি আবার তাঁর অবাধ্যতাও করবে!'
লোকটি বলল, 'শোনো ইবরাহিম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আর তাঁর কাছে তাওবা করছি।'
লোকটি তাওবা করল, আল্লাহর অভিমুখী হলো, পাপ ও গুনাহ থেকে আল্লাহর দিকে পালিয়ে আসলো। সে ঘোষণা দিল প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হওয়ার। আর তুমি! হ্যাঁ, আমি তোমাকেই বলছি। তুমি আল্লাহর দেওয়া রিজিক খাচ্ছ, তাঁর জমিনে বাস করছ, যে জায়গাতেই থাকো না কেন তিনি তোমাকে সব সময় দেখছেন, মৃত্যু আসলে তুমি ঠেকাতেও পারবে না, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে চলে যেতে পারবে না...তোমার জন্য কি এতটুকু উপদেশই যথেষ্ট নয়! তোমার কি এখনো তাওবা করার সময় আসেনি! এখনো কি ক্ষমা চাওয়ার সময় আসেনি! এখনো কি সময় আসেনি প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হওয়ার!
أَمَا آنَ لِمَا أَنْتَ فِيْهِ مَتَابٌ *** وَهَلْ لَكَ مِنْ بَعْدِ الغِيَابِ إِيَابٌ تَقَضَّتْ بِكَ الْأَعْمَارُ فِي غَيْرِ طَاعَةٍ *** سِوَى عَمَلٍ تَرْجُوهُ وَهُو سَرَابٌ وَلَيْسَ لِلْمَرْءِ سَلَامَةُ دِينِهِ *** سِوَى عُزْلَةٍ فِيهَا الجَلِيسُ كِتَابٌ
كِتَابٌ حَوَى الْعُلُومَ بِكُلِّهَا *** وَكُلُّ مَا حَوَى مِنَ الْعُلُومِ صَوَابٌ فَفِيْهِ الدَّوَاءُ لِكُلِّ دَاءٍ فَاغْفَرْ بِهِ *** فَوَا اللَّهُ مَا عَنْهُ يَنُوبُ كِتَابٌ
‘এখনো কি ঘনিয়ে আসেনি তাওবা করার সময়? একবার প্রস্থানের পর কি আর পারবে ফিরে আসতে? জীবন পুরোই অবাধ্যতায় কাটিয়ে দিলে। খেয়াল-খুশিমতো চলে, মরীচিকার পেছনেই ছুটলে তুমি। কারও দ্বীন তখনই শুদ্ধ থাকে, যখন কুরআনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক হয়। কুরআন একটি গ্রন্থ, যাতে একত্র হয়েছে সব জ্ঞান। আর যা জ্ঞান তাতে আছে, তার সবই শুদ্ধ তার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। আঁকড়ে ধরো একে, এতেই আছে সকল রোগের ওষুধ। আল্লাহর শপথ, কোনো গ্রন্থ তার সমকক্ষ হতে পারে না।’
আসো, আমরা এ প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার অতীতের কিছু মানুষের আর এ সময়ের কিছু মানুষের ঘটনা শুনি। আসো, আমরা তাদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একটুখানি ইতিহাস। যাদের গল্পগুলো সত্য গল্প। অনুতপ্ততায় ভরা গল্প। অশ্রু ও আফসোসের গল্প। শিক্ষায় পরিপূর্ণ কাহিনি। যারা প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার আগে অভিযোগ করত চিন্তা-উদ্বিগ্নতার। দুঃখভরা কণ্ঠে সমাধান চাইত। যাদের কণ্ঠে ফুটে উঠত না পাওয়ার বেদনা। যারা ডুবে ছিল পাপসমুদ্রে। মদ-নেশা, নগ্নতা-অশ্লীলতা ছিল যাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাদের মুক্তি ছিল কেবল আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাঝে। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার মাঝেই ছিল তাদের জন্য সমাধান।

প্রত্যাবর্তন: ১
তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়
আবু হিশাম আস-সুফি বলেন:
'বসরার উদ্দেশে যাত্রা করব বলে ঠিক করলাম। একটি নৌকোয় চড়ব বলে নৌকোর কাছে আসলাম। দেখলাম, নৌকোতে একজন লোক। সাথে একজন তরুণী। লোকটি আমাকে বলল, “এখানে জায়গা নেই।” আমি তরুণীকে বললাম, আমাকেও নিতে। সে সায় দিল।
আমরা সফর শুরু করলাম নৌকোযোগে। লোকটি সকালের নাশতা আনতে বলল। নাশতা প্রস্তুত হলো। তরুণী বলল, “ওই মিসকিন লোকটিকেও ডাকো আমাদের সাথে খাবে সে।” আমি তাদের সাথে খাওয়ার জন্য আসলাম, কারণ আমি আদতে একজন মিসকিনই ছিলাম।
খাওয়ার পর লোকটি বলল, "তরুণী, সুরা আনো।" লোকটি সুরা পান করল। আমাকেও পান করাতে আদেশ দিল তাকে। তরুণী বলল, "আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন, মেহমানের মন-মর্জির ব্যাপার আছে।” এভাবে মদপান থেকে রেহাই পেলাম। লোকটির পেটে একটু মদ পড়তেই সে বলল, "তরুণী, তোমার উদ-বীণা নিয়ে আসো। তোমার প্রতিভার স্ফুরণ দেখাও।” তরুণী উদ-বীণায় সুর তুলল, গান গাইল।...
এরপর লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার কেমন লেগেছে?” আমি বললাম, “আমার কাছে এর চেয়ে উত্তম কিছু আছে। আমার কাছে যেটা আছে, সেটা এর চেয়ে উত্তম।” লোকটি বলল, “শোনাও তবে।” আমি শুরু করলাম:
إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ ۖ وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ
“যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে। যখন নক্ষত্র মলিন হয়ে যাবে। যখন পর্বতমালা অপসারিত হবে। যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটগুলো উপেক্ষিত হবে। যখন বন্য পশুরা একত্রিত হয়ে যাবে। যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে। যখন দেহে আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে। আর যখন জীবন্ত পুঁতে-ফেলা কন্যা-শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”১২৯
কুরআনের শব্দমালার তিলাওয়াত লোকটির অন্তরে কাঁপন তুলল। আমি তিলাওয়াত করতে থাকলাম। অবশেষে وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ )আর যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে।) আয়াতে এসে থামলাম আমি।
লোকটি তার দাসীকে বলল, “ওহে! তুমি আল্লাহর জন্য স্বাধীন।” এরপর সে সবটা মদ ছুড়ে ফেলে দিল। উদ-বীণা ভেঙে ফেলল। আমাকে ডেকে মুআনাকা করল আর কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাই, আল্লাহ কি আমার তাওবা কবুল করবেন?!” আমি বললাম, “হ্যাঁ, কেন নয়। إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهَّرِينَ )নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।) ১৩০
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ )তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ মোচন করেন।) ১৩১”
এরপর সে তাওবা করল। তাওবার ওপর অটল থাকল। নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে নিল। তার মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার সাথেই ছিলাম। ৪০ বছর কেটেছিল একসঙ্গে। তার মৃত্যুর পরের এক রাতের কথা। আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম। তাকে বললাম, "তুমি কোথায় জায়গা পেলে?" সে বলল, "জান্নাতে।” আমি জানতে চাইলাম, “কীভাবে?” সে জানাল, “তোমার وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ (যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে) আয়াতের তিলাওয়াতের মাধ্যমে।” আহ! আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
আমার ও তোমার অবস্থা কেমন হবে, যখন-
وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ وَإِذَا السَّمَاءِ كُشِطَتْ وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعَرَتْ- وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ عَلِمَتْ نَفْسٌ مَّا أَحْضَرَتْ
'যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে। যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হবে। যখন জাহান্নামের অগ্নি প্রজ্বলিত করা হবে। এবং যখন জান্নাত সন্নিকটবর্তী হবে। তখন প্রত্যেকেই জেনে নেবে সে কী উপস্থিত করেছে।' ১৩২
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنكُمْ خَافِيَةٌ
'সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না।' ১৩৩
সেদিন আমাদের অবস্থা কেমন হবে? আল্লাহ! যখন দুচোখ কথা বলা শুরু করবে। যখন দুচোখ বলবে, 'আমাকে হারাম কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।' হায়, যখন দু-কান সাক্ষ্য দেবে, আমাকে দিয়ে সে গান শুনেছে, হারাম গানের মজা নিয়েছে। হায়, যখন দুহাত কথা বলা শুরু করবে, বলবে, আমাকে সুদ ও হারাম কাজে ব্যবহার করেছে। হায়, যখন দু-পা বলা শুরু করবে, আমাকেও সে হারাম কাজে ব্যবহার করেছে। আমাকে দিয়ে সে হারামের দিকে হেঁটে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।' ১৩৪
وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِن ظَنَنتُمْ أَنَّ اللَّهَ لَا يَعْلَمُ كَثِيرًا مِّمَّا تَعْمَلُونَ - وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنتُم بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُم مِّنْ الْخَاسِرِينَ - فَإِن يَصْبِرُوا فَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ وَإِن يَسْتَعْتِبُوا فَمَا هُم مِّنَ الْمُعْتَبِينَ
'তোমাদের কান, তোমাদের চোখ এবং তোমাদের ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না ধারণার বশবর্তী হয়ে তোমরা তাদের কাছে গোপন করতে না। তবে তোমাদের ধারণা ছিল যে, তোমরা যা করো, তার অধিকাংশই আল্লাহ জানেন না। তোমাদের পালনকর্তা সম্বন্ধে তোমাদের এ ভুল ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছ। এখন যদি তারা ধৈর্যধারণ করে, তবুও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস; আর যদি তারা ওজরখাহি করে, তবুও তাদের ওজর কবুল করা হবে না।'১৩৫
কিয়ামতের সেই ভয়ংকর দিনে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইলে, মুক্তি পেতে চাইলে, সফল হতে চাইলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক, প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হয়ে যাওয়াই নাজাত ও সফলতার একমাত্র পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعاً أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'১৩৬

প্রত্যাবর্তন: ২ আল্লাহ নতুন জীবন দিলেন
বর্ণনাকারী ঘটনাটি এভাবে শুনাল :
'আমার বন্ধুর অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। হ্যাঁ, পরিবর্তন হয়ে গেল। তার শান্ত- সমাহিত হাসি তোমার কানে ফজরের মৃদু বাতাসের মতো খেলে যাবে। কিন্তু ইতিপূর্বে তার উদ্ধত ও অবজ্ঞার হাসি কানে বিঁধত, মনে বিঁধত কাঁটার মতো। এখন তার চোখের লাজুক চাহনি থেকে পবিত্রতা-শুদ্ধিতা ঠিকরে পড়ছে যেন। কিন্তু এর আগে ওই চোখ গুনাহের দিকে ইশারা করত। এখন তার মুখ থেকে প্রতিটি কথা হিসেব করে বেরোয়। কিন্তু এর আগে তার কথাগুলো মন্দ ও অনর্থক বিষয়াদির নির্দেশ করত। কাউকে কিছু বলা, কারও অন্তরে আঘাত দেওয়া ছিল তার কাছে তুচ্ছ বিষয়। সে কাউকে পরোয়া করত না, গুরুত্বও দিত না। এখন তার চেহারা শান্ত সমাহিত, সুন্দর সুশ্রী দাড়িতে সুশোভিত। চেহারা থেকে যেন নুর ঠিকরে বেরুচ্ছে। আজ যে লোকটা দেখছি আমার সামনে, এর আগে এ লোকটাই ছিল বেপরোয়া, বিপরীতমুখী।
প্রথম দেখায় আমি এখন তার চেহারার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিলাম। আমার মনে কী চলছে, সে ঠিক ঠিক বুঝে নেয়। বলে, 'তুমি হয়তো জানতে চাচ্ছ, কোন কারণে আমার এ পরিবর্তন?' আমি বললাম, 'আলবত। এতদিন তোমার যে অবয়ব ও কর্মকাণ্ড আমার মনে প্রোথিত ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক ভিন্ন তুমি। শেষ কয় বছর আগে দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে। তখনকার তুমি আর এখনকার তুমি বেশ আলাদা।'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুরু করল সে, 'আল্লাহই নতুন জীবন দিলেন আমাকে।' আমি বললাম, 'নিশ্চয় এ পরিবর্তনের পেছনে কোনো ঘটনা আছে?!' 'হ্যাঁ, আছে বইকী। আমি বলছি সবটা।' বলতে বলতে সে আমার দিকে ফিরল, 'সাহিলির পথে গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমি। পথে একটা পুল পড়ল। পুলের ওপর গাড়ি উঠিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ছোট্ট শিশু গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হতে দেখলাম। তাকে দেখামাত্র দুর্ঘটনা এড়িয়ে যেতে স্টিয়ারিং দ্রুত ঘুরালাম।
কিন্তু কোনো কিছু বোঝার আগে আমি নিজেকে গভীর পানিতে আবিষ্কার করলাম। শ্বাস নেওয়ার জন্য মাথা তুললাম। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িতে পানি ভরে যেতে থাকে। গাড়ির সবদিক থেকে পানি ঢুকতে থাকে। গাড়ির দরজা খোলার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু দরজা খুলতে পারলাম না। আমি নিশ্চিত হলাম এখানেই জীবনের ইতি ঘটবে। আর কিছু মুহূর্ত। এরপরই আমি শেষ।
আমার চোখের সামনে দিয়ে জীবনের কিছু চিত্র দ্রুত চলে গেল একের পর এক। আমার পুরো জীবনটা যেন একবার দেখতে পেলাম আমি। আমার সব দুষ্কর্ম সব পাগলামো আমার সামনে ছিল তখন। তখন আমার মনে হচ্ছিল এটা পানি নয়, এটা কোনো ভয়ংকর ভয়ের আবেশ। আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। অনুভব করলাম অন্ধকারের তলদেশে হারিয়ে যাচ্ছি। প্রচণ্ড ভয় আমাকে ঘিরে ধরল। অনেক জোরে চিৎকার দিলাম। কিন্তু এত জোরের চিৎকারের এতটুকু শব্দ আমার কান পর্যন্ত পৌঁছল না। চিৎকার করে বলে উঠলাম, 'হে রব, হে রব, আপনি তো তিনি, যিনি বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন।' (আপনিই তো বলেছেন :)
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ
'বলো তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে ডাকে। ১৩৭
'আমি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম ওপরের দিকে। এ কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে হাঁসফাঁস করছিলাম। কষ্টটা মৃত্যুর ভয়ে ছিল না। মৃত্যু তো আমার জন্য নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। নিজের গুনাহ ও পাপের কষ্ট থেকে মুক্তি চাচ্ছিলাম তখন আমি। সে কষ্ট যেন আমার কণ্ঠরোধ করে রেখেছে। মনে হচ্ছিল আমার গলায় প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরেছে সে কষ্ট।
প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আমি সে ভীতিকর পরিবেশ ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছিলাম। আমার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করার আগেই তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। আমি অনুভব করছিলাম আমার আশপাশের সবটা পানি আমাকে চেপে ধরেছে। যেন লোহার দেয়াল আমাকে সবদিক থেকে চেপে ধরেছে। মনে মনে বললাম, নিঃসন্দেহে এখানেই আমার জীবনের অবসান।' আমি শাহাদাতাইন উচ্চারণ করলাম। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলাম। হাতদুটো নাড়ালাম। তখন গাড়ির সামনে কিছুটা ফাঁক সৃষ্টি হলো। হুম...গাড়ির বাইরে যাওয়ার একটু আশা দেখা গেল। তখন আমার মনে পড়ল, গাড়ির সামনের কাঁচটা তো ভাঙা। আল্লাহর ইচ্ছায় তিন দিন আগেই তো কাঁচটা ভাঙল।
কোনো কিছু চিন্তা না করেই পরক্ষণে আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। নিজেকে সে ফাঁক জায়গার দিকে ঠেলে দিলাম। পানির চাপ থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজেকে এবার কিছুটা আলোর মাঝে পেলাম। দেখলাম, আমি গাড়ির বাইরে আসতে পেরেছি। ওপরে উঠে এসে তাকালাম চারপাশে। দেখলাম, মানুষজন তীরে দাঁড়িয়ে। একে অন্যকে ডেকে ডেকে হইচই করছিল। তাদের কথা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না কিছুই। আমাকে দেখে তাদের দুজন নেমে এল। পানি থেকে বের করে তীরে নিয়ে এল আমায়। তীরে আসলেও আমার আশপাশের সবকিছু সম্পর্কে বেখবর আমি। বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, আমি মৃত্যু থেকে বেঁচে ফিরেছি—এখন আমি জীবিত।
আমি গাড়িতে ছিলাম। পানিতে ডুবে গেলাম। আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। মরে যাচ্ছিলাম। একরকম মরেই গেলাম। আমার দেহটা হয়তো এখানে কোথাও দাফনকৃত থাকত। কিন্তু আমি বেঁচে ফিরলাম। আর নতুন একটা জীবন পেলাম। আমি সে, যে অতীতে মরার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে।
যাই হোক, তখন আমি সে জায়গা থেকে দৌড়ে চলে আসার তাগাদা অনুভব করলাম। সে জায়গা থেকে শরীরের সবটা জোর দিয়ে পালিয়ে আসতে চাইছিলাম। সে জায়গাটাতে নিজের কদর্য অতীতকে দাফন করে এলাম। আমি বাড়িতে এলাম একটা নতুন মানুষ হয়ে। বাড়ি থেকে ঘণ্টাকয়েক আগে বেরিয়ে যাওয়া আর ফিরে আসা আমি একজন ছিলাম না।
বাড়িতে এলাম। এসে প্রথম যে জিনিসটার দিকে আমার চোখ পড়ল, তা ছিল দেয়ালে ঝুলানো অভিনেত্রী, নর্তকী, গায়িকাদের ছবি। ছবিগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে সবগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললাম। এরপর সেগুলো খাটের ওপর নিক্ষেপ করে কাঁদতে থাকলাম। প্রথমবারের মতো আমার অতীত জীবনটা তখন আমার ভেতরে বেশ তিক্ততা সৃষ্টি করল। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। অনুতপ্ত হলাম। আল্লাহর আদেশের প্রতি আমার শিথিলতার কারণে লজ্জিত হলাম। আমার চোখের ভেতর থেকে, না, আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাওবা অশ্রু হয়ে ঝরছিল আমার চোখ দিয়ে। শরীরটা কাঁপতে থাকল। হঠাৎ তখন সে আওয়াজটা শুনলাম, যে আওয়াজ অনেক দিনই আমি শুনেছি এবং অবজ্ঞা করে এসেছি—আজান, আজানের আওয়াজ এল আমার কানে। যে আজান জীবনে অগণিত বার শুনেছি, আজ সে আজান শুনে মনে হচ্ছে প্রথমবারের মতো শুনছি।'
مَنَائِرُكُمْ عَلَتْ فِي كُلِّ ساحِ *** وَمَسْجِدكُمْ مِنَ العُبَادِ خالي وَجَلْجَلَةُ الأَذَانِ بكلِّ حَةٍ *** وَلَكِنْ أَيْنَ صَوْتُ مِنْ بَلالِ
'প্রতিটি প্রান্তরে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তোমাদের সুউচ্চ মিনার। কিন্তু মসজিদগুলোতে দেখা নেই ইবাদতকারীর। আজানের সুরধ্বনি তোলে প্রতিটি মহল্লায়, কিন্তু বিলালের মতো দরদি মুয়াজ্জিন কোথাও নেই।'
'আমি কেঁপে কেঁপে উঠে পড়লাম। অজু করলাম। মসজিদে... মসজিদে চলে এলাম। নামাজের পর আমি তাওবার ঘোষণা করলাম। বসে কাঁদতে থাকলাম। আল্লাহর কাছে দুআ করলাম আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিতে। সে সময়টা থেকে আমি এমন হয়ে গেছি, যেমন তুমি এখন দেখছ।'
আমি তাকে বললাম, 'তোমাকে মুবারকবাদ। আমার চোখে তপ্ত অশ্রু ঝরছে তোমার এ আগমনে। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় তোমার যোগদানকে মুবারকবাদ!'
আমার প্রিয় বন্ধুরা, আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةٌ نَّصُوحاً
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৩৮
রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ।' ১৩৯
উমর বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো, বান্দা গুনাহ করে তাওবা করবে এবং পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হবে না।'
হাসান বসরি বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো, আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া, মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং সে গুনাহে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করা।'
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'সত্যিকার তাওবাকারীর আলামত হলো দীর্ঘ অশ্রুপ্রবাহ, নির্জনতা পছন্দ করা এবং নিজের প্রত্যেক বিষয়ে মুহাসাবা বা পর্যালোচনা করা।'
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমাদেরকে পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। যাদের কোনো ভয় নেই, আর যারা চিন্তিতও হবে না।

প্রত্যাবর্তন: ৩
তুমি কি তার মতো হতে চাও?!
এক পুণ্যবান বলেন:
'আমার এক আত্মীয় ছিল, যে একই সাথে নিকটও ছিল, আবার পরও ছিল। নিকট ছিল আত্মীয়তায়। কিন্তু দ্বীন হিসেবে দূরবর্তী সম্পর্কের। তার জীবনের কয়েকটা মিনিট থেকে আমি জেনে গেলাম তার দিন কাটানোর বিস্তারিত বিবরণ। কয়েকটা মিনিটের ভেতরেই সে আমাকে নিশ্চিত করেছে সাধারণত সে নামাজ পড়ে না। এ রকম আরও কত মানুষই তো আছে আমাদের সমাজে।
আমি তাকে নসিহত করলাম বারবার। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, সে ত্বরাপ্রবণ। আমি আশা করছিলাম, সে সালাত আদায়কারীদের একজন তো হয়ে যাবে। কিন্তু কখনো সে অগ্রসর হতো, আবার কখনো পিছিয়ে যেত। তার ধারণা জীবনটা মস্ত বড়। জীবন স্থায়ী। (হায়, ধ্বংস হোক দীর্ঘসূত্রতাকারীরা!)
'অচিরেই আমি তাওবা করব' বলে গুনাহ করতে থাকাকে দীর্ঘসূত্রতা বলে। আমি তাকে বললাম, “কতদিন বাঁচবে তুমি? বিশ! ত্রিশ! আশি! এরপর কী হবে?! এ ধোঁকার দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতেই হবে। দিন যত লম্বা হোক, রাত যত ছোট হোক—তোমার জীবনের সমাপ্তি একদিন আসবেই।
এক রাতের কথা। আমি আশা করিনি সে এমনটা করবে। এক অন্ধকার রাতে শয়তান তাকে বশীভূত করে নেয়, তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। একে একে সে পা ফেলে ধাবিত হয় গুনাহ ও অপরাধের দিকে। দীর্ঘ আশা তাকে আবারও ধোঁকা দিল। জীবনের সৌন্দর্য, দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে ধোঁকায় নিপতিত করল। তার মতো তো এমন অনেকেই আছে—
اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ
'শয়তান তাদের বশীভূত করে নিয়েছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। ১৪০
একদিন হঠাৎ অসময়ে তার কাছে এক মেহমান এল। তার দরজার কড়া নাড়ল। এ মেহমান আসা অবশ্যম্ভাবী ছিল। একবারই আসে সে। সাধারণত মেহমান আসে আনন্দ নিয়ে। কিন্তু এ মেহমান এসেছিল কষ্ট ও কাঠিন্য নিয়ে। নিশ্চয় আমার সে আত্মীয় চেয়েছিল টাকা-পয়সা দিয়ে তাকে বিদায় করতে, কিন্তু পারেনি সে। হয়তো চেয়েছিল কোনো ডাক্তার-ওষুধের মাধ্যমে তাকে বিদায় করবে। কিন্তু তাও হওয়ার জো নেই। সকল প্রতিরোধীয় কার্য বিফল হলো।
حيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ 'তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল হয়ে গেছে। '১৪১
সব শেষ হয়ে গেল। সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাহাড়সম স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। তার কণ্ঠেও ধ্বনিত হলো মৃত্যুকালীন ঘড়ঘড় শব্দ। তার নিশ্বাস আটকে গেল। রুহ দেহ ছেড়ে চলে গেল। তার কাছে নিকটবর্তী হতে থাকল কঠিন কিছু প্রশ্ন, হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম।'
যুবকটা বলে চলল, 'আমাদের পরিবারে অল্প বয়সে মৃত্যুবরণকারী সে-ই প্রথম ছিল না। তার আগে আরও কয়েকজনকে যুবক বয়সেই হারিয়েছি আমরা। কিন্তু তার মৃত্যুটা ছিল ভয়ের। তার মৃত্যুটা ছিল শিক্ষণীয়।
তার মৃত্যু, গোসল, জানাজা ও দাফনের দিনটি ছিল একটি স্মরণীয় দিন। অনেকেই সেদিন অনুপস্থিত ছিল। আমি ছিলাম এমন মানুষদের অগ্রে। কীভাবে আমি এমন একজন লোকের জানাজা আদায় করব, যার জানাজা আদায় করতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল নিষেধ করেছেন! আমি তার জানাজায় ছিলাম না। কারণ এটাই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহর ইবাদত। যেন আল্লাহর আনুগত্যের ষোলোকলা পূর্ণ হয় আমার।
এরপর একদিন আত্মীয়-স্বজনরা একটি মজলিশে একত্রিত হয়। অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। বলতে গেলে আত্মীয়দের অধিকাংশরাই ছিল সেদিন। যারা নিজেদের দুনিয়ার ব্যাপারে জ্ঞানবান আর দ্বীনের বিষয়ে মূর্খ। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন:
يَعْلَمُونَ ظَاهِراً مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
'তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে, আর তারা পরকালের খবর রাখে না। ১৪২
আত্মীয়দের একজন দাঁড়াল। নিজের তলোয়ার বের করে তিরটা তাক করল সে। আর রেগেমেগে উচ্চস্বরে ব্যঙ্গ করে সকলকে শুনিয়ে বলে উঠল, 'শোনো, বড় তো মুসলমানি ফলাও। এখন তোমার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, তোমার কর্তব্য পালন করা কোথায় গেল?! অমুক মরল, কিন্তু তোমাকে আশেপাশে কোথাও তো দেখা গেল না। তোমার কোনো যোগদানই তো দেখলাম না আমরা।' তার কথার পর উপস্থিত সবার চোখের তিরস্কার-বাণ আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। হাত নাড়িয়ে আমাকে দুষতে দুষতে বলছিল, 'জানাজা ও শোকের দায়িত্ব পালন না করে কোথায় পালিয়ে ছিলে?!' কেবল এতটুকুই নয়, তাদের একজন তো ব্যঙ্গ করে এও বলল, 'নামাজ পড়া, রোজা রাখা না ছাই, হুঁহ...আত্মীয়তার অধিকার, পরিবারের কর্তব্য পালন করে না আবার দ্বীনদারি দেখায়!'
মজলিশের মানুষজন যা বলার বলতে থাকল। আমি তাদের কথার প্রত্যুত্তর করলাম না। তারা তিরস্কারের তিরগুলো আমার দিকে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হলে আমি বলতে শুরু করলাম। প্রথম যে কথা বলেছে, সে আত্মীয়ের উদ্দেশে বলা শুরু করলাম সবাইকে শুনিয়ে, 'আমি যদি মাগরিবের নামাজ চার রাকআত আদায় করি, সেটা কি জায়িজ হবে?' সে চুপ। জবাব দিচ্ছিল না। তার ঠোঁট নড়ছিল। হতবাক নেত্রে তাকিয়ে ছিল। হাতদুটো নড়ছিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। তার কাছে জবাবটা জানতে চাইলাম, যেন সবাই শুনে নেয়। উত্তর দিল সে। সবাই শুনল। তিনবার জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'জায়িজ হবে না।' এবার আমি বললাম, 'ঠিক বলেছ। এটাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্ধারিত পদ্ধতি। আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি। তাঁর রাসুলের অনুসরণ করি। কিতাব ও সুন্নাহতে তাদের সব আদেশ-নিষেধ উল্লেখ করা আছে। কিতাব-সুন্নাহর হুকুম হচ্ছে, যে ব্যক্তি ঠিকমতো নামাজ আদায় করে না, তার জানাজায় শরিক না হওয়া। কিতাব-সুন্নাহ তাকে কাফির নাম দিয়েছে।' আমি উচ্চ আওয়াজে বললাম। সত্য কথাকে উচ্চ আওয়াজে শুনিয়ে দিলাম। সত্য বিজয়ী হয়, পরাজিত নয়।
আমার তৃণীরের তির নিক্ষেপ করলাম। আমাকে তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ-নিষেধ শুনতে হবে। না, আমি তোমার কথা শুনব? তোমার কথা মানব? মজলিশের সবার উদ্দেশে জোর আওয়াজে বলতে থাকলাম, 'শরিয়তে আমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে নামাজ ত্যাগকারী মারা গেলে তাকে গোসল না দিতে, তাকে মুসলিমদের কবরে দাফন না করতে। তাই আমি তার জানাজায় আসিনি। এটা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যে নিজেকে অটল রাখতেই করেছি আমি।' পুরো মজলিশে পিনপতন নীরবতা। সবার কথার তলোয়ার নিচে নেমে গেছে। সবার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। সবাই বুঝে নিল বিষয়টা। আল্লাহ বলেন:
قُلْ جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقاً
বলুন, "সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।"১৪৩
যুবকটা এরপর বলতে লাগল, 'কয়েক মাস পরের কথা। আমাদের পরিবারের অনেক যুবকই সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। তাদের দেখলাম, সবাই নিজ নিজ মুহাসাবায় (আত্মসমালোচনা) ব্যস্ত। নিজেদের কাজগুলোকে দ্বীনের আলোকে সাজিয়ে তুলছে তারা। তারা সবাই এমন সতর্ক হলো যে, যেন কখনো নামাজ ছুটে না যায়। আমার সে আত্মীয়টির ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরবর্তীদের জন্য রহমতস্বরূপ হয়ে গেল, পরবর্তীদের জন্য তা শিক্ষণীয় হলো। এমনকি আমার সেদিনের বলা কথাগুলোর প্রভাবে এলাকাজুড়ে আল্লাহর বাণী গুঞ্জরিত হচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَداً وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ
“আর তাদের কেউ মারা গেলে আপনি তার জন্য কখনো (জানাজার) নামাজ পড়বেন না, আর তার কবরের পাশে দণ্ডায়মান হবেন না।” ১৪৪
গুঞ্জরিত হচ্ছিল রাসুল -এর বাণী। তিনি বলেন :
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল।' ১৪৫
আমার প্রিয় ভাইয়েরা,
আপনাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আমাকে আপনারা বলুন, যুবকদের অবস্থা কেমন এখন? আজকের যুবকদের নামাজের অবস্থা কেমন? হায়, তাদের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যাই! যুবকদের একটা অংশ না নামাজ পড়ে, না রুকু করে, না রাতে না দিনে কখনো নামাজের ধার ধারে। একদল যুবক আগপিছ হতে থাকে। নামাজের সময় ঘুমায়। অসময়ে নামাজ পড়ে। নিজের যখন ইচ্ছে হয় তখন পড়ে। তারা এমনটা কীভাবে করতে পারে?
أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
'তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? সেই মহা দিবসে। যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে।' ১৪৬
হায়, এখনো কি সময় আসেনি সালাতের কাতারে দণ্ডায়মান হওয়ার! এখনো কি সময় আসেনি প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার!
প্রাজ্ঞজন বলেন, 'তুমি জেনে নাও, মানুষের তাওবা চারটি বিষয়ের সমন্বয়ে হয়ে থাকে:
এক. নিজের জবানকে গুনাহর কথা তথা গিবত, চোগলখুরি ও মিথ্যা থেকে রক্ষা করা।
দুই. অন্তরে মুসলিমদের জন্য হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা না রাখা।
তিন. মন্দ সঙ্গীদের বর্জন করা, তাদের কারও সাথে ওঠাবসা না করা।
চার. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।'
এসো, আমরা গুনাহর জন্য লজ্জিত হই, অনুতপ্ত হই। আল্লাহর কাছে গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর ইবাদতে সাধনা করি।

প্রত্যাবর্তন: ৪
নেশাখোরদের পথ
নেশার কারণে অনেক যুবক-তরুণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ যাদের ওপর রহম করেছেন তারা ব্যতীত প্রায় যুবকই আজ নেশার কালো থাবার নিচে। এমনই এক যুবক দুঃখজনক ঘটনা শুনাল, 'মাধ্যমিক শেষ করার পর আমি একটা ব্যবসায়িক কোম্পানিতে চাকরি নিই। অনেক বেশি কাজ ফাঁকি দেওয়া ও শৃঙ্খলাহীনতার কারণে বরখাস্ত করা হয় আমাকে। এরপর আমি বিভিন্ন জায়গায় কাজ করি। কনস্ট্রাকশন সাইটে, ব্যবসাসহ অনেক কিছুই করি। এভাবে কিছু সময় পর নিজের একটা অবস্থা তৈরি করি। যথেষ্ট পরিমাণে টাকা-পয়সা জমা করে ফেলি।
একদিন এক যুবক আমাকে এশিয়ার একটি রাষ্ট্রে ভ্রমণের ব্যাপারে বলল। সে জায়গার রগরগে বর্ণনা দিতে লাগল। এ যুবকটা প্রকাশ্যে মানুষের সামনে গুনাহয় লিপ্ত হতো। নাউজুবillah। হারাম ভোগ-উপভোগের নানান রূপ বর্ণনা করত সে আমার সামনে। আমাকে সে দেশ ভ্রমণে প্ররোচিত করত। এমনকি একদিন আমি ভ্রমণের ইচ্ছাকে দৃঢ় করলাম যে, আমি যাব। শয়তানও আমার ওপর ভর করে বসল।
আমার সঙ্গী আমার এ মতিভ্রমে স্বাগত জানাল! সে-ই টিকিট কেনার দায়িত্বটা নিল। আর আমার দায়িত্ব ছিল ভ্রমণস্থলের বাকি খরচটা বহন করা। আমরা সেখানে গেলাম। সেখানে একদল যুবককে দেখলাম, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, হারাম মোজ-মাস্তি করা।' আজ মাসজিদুল আকসা ব্যথার অভিযোগ করছে। আর মুসলিম তরুণ-যুবরা গুনাহ ও পাপে ডুবে আছে!
هَا هُوَ الْأَقْصَى يَلُوْكُ جِرَاحَهُ *** والمُسْلِمُونَ جُمُوْعُهُمْ آحَادُ يَا وَيْلَنَا مَاذَا أَصَابَ رِجَالَنَا *** أَوَ مَا لَنَا سَعْدُ وَلَا مِقْدَادُ
'দেখো, আকসার দেহ থেকে রক্ত ঝরছে! অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ শতধা বিভক্ত। হায়, আমাদের বীরদের আজ কী হয়েছে? আমাদের মাঝে কি একজন সাদ ও মিকদাদ নেই?'
যুবক বলে চলল, 'একদল যুবককে দেখলাম, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মোজ-মাস্তি করা। আমি তাদের কাছ থেকে শিখে শিখে তাদের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। তাদের কাছ থেকে সিগারেট খাওয়া, মদ পান করা শিখলাম। এরপর জিনা করা শিখলাম। এরপর শিখলাম নেশা। পাপ-পঙ্কিলতায় ডুবে গেলাম আমরা। নোংরামির একেবারে নিম্নপর্যায়ে চলে গেলাম। এরপর আমরা সেখান থেকে ফিরে এলাম।
কিছু দিন কাজ করে আরও কিছু টাকা-পয়সা জমিয়ে নিলাম। এরপর আরেকটা দেশে গেলাম। যেটা আগেরটার চেয়ে আরও বেশি ফিতনা-ফাসাদে ভরা ছিল। সব রকম নোংরামির স্বাদ নিলাম আমরা।
এক রাতে আমার নির্দিষ্ট নেশার বিক্রয়কারী নেশাদ্রব্য দিতে রাজি হলো না। আমি হোটেল থেকে বেরিয়ে আসি। একদল অপরাধীর সাথে দেখা হয়। তাদের আস্তানায় যাওয়ার অফার করে। তাদের সাথে সাথে তাদের আড্ডায় চলে গেলাম। আমার সামনে বিভিন্ন রকমের নেশার উপকরণ পেশ করল তারা। যেগুলোর কয়েকটা সম্পর্কে এর আগে আমি জানতামই না, শরীরের ওপরে সেগুলোর প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম আমি।
নেশা গ্রহণের পর তারা আমাকে পাশের কক্ষের দিকে ডাক দিল। জিনা করার জন্য। এডভান্স মূল্য পরিশোধ করার পর আমাকে যেতে দিল। আমি তখন নেশায় মত্ত হয়ে আছি। কী করছি না করছি বুঝতে পারছিলাম না। আমি তাদের প্রস্তাবে সায় দিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি যে হাবিয়া দোজখের দিকে পা বাড়িয়ে দিচ্ছি।
এর কিছু দিন পরের কথা। আমরা সফর থেকে ফিরে এলাম। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকলাম। কিন্তু নেশার তলব ভূতের মতো প্রতিটা জায়গায় আমাকে তাড়া করে ফিরছিল। কিছু একনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বলল। আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম, আমি যাব। কিন্তু আমি চিকিৎসা নিতে যাইনি। বরং এরপর অনেকবার ভ্রমণ করে এলাম, নোংরামির মাঝেই যেন আমার সব আনন্দ। আমার অধঃপতিত জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটা। সীমা অতিক্রম করতে লাগলাম। এখান-ওখান থেকে চুরি করে পকেট পুরতে লাগলাম। আত্মসাৎ ও প্রতারণা করতে লাগলাম। এভাবে হারাম মোজ-মাস্তির জন্য টাকা-পয়সা জমাতাম।
একদিন হঠাৎ করে শারীরিক অসুস্থতায় পড়ে গেলাম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলাম চিকিৎসার জন্য। আমার রক্ত পরীক্ষা করল তারা। রিপোর্ট এল। জানানো হলো, আমি এইডসে আক্রান্ত।
পুরো দুনিয়া আমার কাছে সংকীর্ণ হয়ে এল। হায়, এত বড় বিপদ! এ ভীষণ ভয়াবহতার কথা শোনার পর পাপের জীবনে যত মোজ-মাস্তি করেছি, নিমিষেই যেন সবটা উবে গেল। অবশিষ্ট থাকল কেবল কষ্ট আর দুঃখ।'
হায়, আফসোস! এমন বন্ধুদের সাথে চলেছি, যারা কেবল আমার ক্ষতিই করে গেছে! হায়, এমন লোকদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা আমার কোনো উপকারে আসেনি! তারা না আমাকে ভালো কিছু বলেছিল, আর না জীবন সম্পর্কে কোনো উপলব্ধি দিয়েছিল! হায়, আফসোস! বিগত জীবনটা এমন কেন কেটে গেল! জীবনটা নেশার ঘোরে কেটে গেল, আর আমি কবরের জন্য কোনো প্রস্তুতিই নিলাম না! কত সময় চলে গেল, অথচ আমি জ্বলন্ত আগুনকে ভয় করিনি! হায়, আফসোস! সেই দিন নিকটবর্তী, যেদিন আমার আমলের খাতা খোলা হবে, আমার জবানের পাপগুলো, নোংরা কাজগুলো, কুৎসিত গুনাহগুলোর কথা তোলা হবে! হায়, আফসোস! সেই দিন নিকটবর্তী, যেদিন আমার আমলনামা দেওয়া হবে, সব ভুল-শুদ্ধ প্রচারিত হবে, যৌবনের সময়ের হিসেব নেওয়া হবে, কতগুলো নামাজ নষ্ট করেছি আমি, কতগুলো জাকাত দিইনি, কত দিন রোজা ভঙ্গ করেছি—সবটা তোলা হবে, সবটার জবাবদিহি করতে হবে! কতগুলো সময় নষ্ট করেছি, সবটা জানতে চাওয়া হবে! হায়, আফসোস! কত গুনাহই না করেছি আমি! কত অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়েছি! হায়, আফসোস! কখনো তো আমার জবান রবের জিকিরে সিক্ত হয়নি। আমার দেহ কখনো তার কৃতজ্ঞতা আদায়ে যোগ দেয়নি! হায়, আফসোস! সেদিন নেককারগণ বহুগুণ মর্যাদা পেয়ে সফল হয়ে যাবে আর পাপী-জালিমরা যাবে জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে!...
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ- إِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا وَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ
'আপনি তাদেরকে পরিতাপ দিবস সম্পর্কে সতর্ক করে দিন, যখন সব ব্যাপারের মীমাংসা হয়ে যাবে; অথচ তারা রয়েছে উদাসীনতায় বিভোর এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না। আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী হব পৃথিবীর এবং তার ওপর যারা আছে তাদের। আর আমারই নিকট তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।'১৪৭
যুবক বলে চলল, 'সংক্ষেপে এ ছিল আমার কাহিনি। আমি এখন যতটুকু জানি, তা হচ্ছে, আমি এইডসের রোগী। মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এখন যত দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই না কেন আমার কোনো চিন্তা নেই। আমার যত তন্দ্রা ছিল, সব টুটে গেছে। সব উদাসীনতা ভেঙে আমি জেগে উঠেছি। যত বুদ্ধিমান যুবক আছে সবাইকে আমি নসিহত করি, একনিষ্ঠ দ্বীনের শিক্ষা মেনে চলবে। আমরা অনেক কিছু শিখি, কিন্তু আমল করি না, মেনে চলি না। আমরা মেনে চলি নফস, প্রবৃত্তি ও শয়তানের কথা। কিন্তু যে নফসের অনুসরণ করে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। (ধ্বংস সে, যে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আর আল্লাহর কাছে প্রাপ্তির আশা রাখে।)
আমার যুবক ভাইদের বলে যেতে চাই, তোমরা সাবধান হও, সতর্ক হও। নেশা, অশ্লীলতা, যাবতীয় মন্দকর্ম ছেড়ে দাও। কারণ এসব ধ্বংসকারী কাজকারবার। তোমরা খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ থেকে সতর্ক হও। কারণ খারাপ বন্ধু অভিশপ্ত ইবলিসের সৈনিক।
আমি তোমাদের আল্লাহর আমানতে সোপর্দ করছি। তিনি আমানত রক্ষা করেন। তোমরা যখন আমার এ চিঠি পড়ছ, তখন হয়তো আমার রুহ নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে গেছে তার রবের কাছে আর আমি মাটির নিচে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে রহমতের দুআ করবে।'
হে আল্লাহ, আপনার রহমত প্রতিটি জিনিসকে পরিবেষ্টন করে আছে। আপনার দুর্বল নিঃস্ব বান্দার প্রতি দয়া করুন।
যদি তুমি তাওবাকারী দেখতে চাও, তবে দেখো, কার চোখের পাতা অশ্রুর কারণে আহত। দেখো, কে বিরান রাতে প্রার্থনারত। দেখো, কে রবের দরবারে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। কে শুনেছে রবের ওহি-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৪৮
তাওবাকারীর খাবার হয় কম। চিন্তা হয় অনেক। তার উদ্বিগ্নতা প্রবল। যেন সে কারও আহত বন্দী। বারবার তার মনের ভেতর গুঞ্জরিত হয়-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৪৯
তাওবাকারী। যার শরীর রোজায় শীর্ণ হয়ে গেছে। কিয়ামুল লাইলের কারণে যার পদযুগল ক্লান্ত হয়ে আছে। যে না ঘুমানোর দৃঢ় শপথ নিয়েছে। যে তার দেহ-প্রাণ সঁপে দিয়েছে। যার অবস্থার বর্ণনা-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৫০
তাওবাকারী... লাঞ্ছনা যাকে উচ্চকিত করেছে। উদ্বিগ্নতা যাকে দুর্বল করে ফেলেছে। যার আত্মা প্রবৃত্তিকে তিরস্কার করছে। ফলে সে প্রশংসার পাত্র বনে গেছে। তার অবস্থার বিবেচনা এ আয়াতে-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحاً
'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো—আন্তরিক তাওবা।'১৫১
তাওবাকারী...যৌবনের গুনাহর অপরাধে ক্রন্দনরত। গুনাহে গুনাহে কালো আমলনামার কারণে দুঃখে বিষণ্ণ সে। নিশ্চয় যে আল্লাহর দরজায় আসে, সে তা উন্মুক্ত পায়। তার অবস্থা বিবেচিত হয় এ আয়াতের মাধ্যমে—
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً
'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো—আন্তরিক তাওবা। ১৫২
হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে তাওবা করছি, তাওবার ওপর অটল থাকার তাওফিক কামনা করছি, আমরা আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমরা পাপ ও পাপের উপকরণ থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

প্রত্যাবর্তন : ৫ আমার হিদায়াত তার হাতে
এক যুবক বলছে :
'আমার বয়স তখন ত্রিশও অতিক্রম করেনি। আমার স্ত্রী গর্ভধারণ করল প্রথম সন্তান। সেদিনের ঘটনাটি আমার সব সময় স্মরণ হয়। আমি শেষ রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে একটি বিনোদনকেন্দ্রে ছিলাম। পুরো রাত কেটে যায় অনর্থক গল্পগুজব, গিবত ও হারাম কথাবার্তায়। বন্ধুদেরকে হাসানোর ক্ষেত্রে আমিই ছিলাম সবচেয়ে অগ্রগামী। সবচেয়ে বেশি দোষচর্চা করতাম আমি। আর অন্যরা তা শুনে হাসত।
এক রাতে আমি তাদের সাথে অনেক হাসি-কৌতুক করলাম। মানুষকে নকল করার এক অসাধারণ যোগ্যতা ছিল আমার। যে কারও কণ্ঠস্বর নকল করে তাকে নিয়ে উপহাস করতে পারতাম আমি। এ কারণেই আমি যাকে-তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতাম। কেউ আমার কাছ থেকে নিরাপদ থাকত না। এমনকি আমার সাথীরাও আমার কাছ থেকে নিরাপদ থাকত না। আমার উপহাস থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই আমাকে এড়িয়ে চলত।
সে রাতের কথা আমার আজও স্মরণ আছে। বাজারে এক অন্ধ ভিক্ষা করছিল। অন্ধকে নিয়ে আমি উপহাস করেছিলাম। সবচেয়ে মন্দ বিষয় ছিল, আমি তার সামনে আমার পা ছড়িয়ে দিলাম। ফলে আমার পায়ের সাথে আঘাত খেয়ে সে পড়ে গেল। চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছিল কে তাকে ল্যাং মেরেছে। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না। আমি চলে এলাম।
প্রতিদিনের মতো আজও আমি বাড়ি ফিরলাম দেরি করে। আমার স্ত্রী আমার অপেক্ষায় ছিল। সে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে ছিল তখন। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, "রাশিদ, কোথায় ছিলে?”
আমি ঠাট্টা করে বললাম, "মঙ্গলগ্রহে আমার বন্ধুদের কাছে ছিলাম।”
তার দুর্বলতা বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে বলল, “রাশিদ, আমি খুব ক্লান্ত।” বাস্তবতা হলো তার ডেলিভারির সময় অতি আসন্ন ছিল।
তার গাল বেয়ে অশ্রুফোঁটা পড়ছিল। আমি অনুভব করলাম স্ত্রীকে অনেক অবহেলা করেছি আমি। দায়িত্ব ছিল তার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া এবং আমার নৈশপার্টি কমিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে তার গর্ভধারণ যখন নয় মাস।
আমি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। দীর্ঘ সময় যাবৎ সে কষ্ট সহ্য করতে থাকল। আমি ধৈর্যহীন হয়ে তার ডেলিভারির অপেক্ষা করছিলাম। তার ডেলিভারি ছিল অনেক কঠিন। একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। ফলে বাসায় চলে এলাম। আর সুসংবাদ দেওয়ার জন্য নার্সদের কাছে আমার নাম্বার দিয়ে এলাম।
ঘণ্টাখানিক পরে, তারা আমার সাথে যোগাযোগ করল এবং সালিমের জন্মের সংবাদ দিল। আমি দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেলাম। প্রথমে আমার সাথে যার দেখা হলো, আমি তার কাছে রুমে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। কিন্তু নার্সরা আমাকে প্রথমে দায়িত্বশীল মহিলা ডাক্তারের সাথে দেখা করতে বলল। আমি চিৎকার করে বললাম, “কোন ডাক্তার?! আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমার ছেলে সালিমকে আগে দেখা।”
তারা বলল, 'তুমি প্রথমে ডাক্তারের সাথে দেখা করে এসো!'
ডাক্তারের রুমে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে কয়েকটি বিপদের কথা বললেন এবং তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দিলেন। এরপর বললেন, “বাচ্চার চোখের পরিস্থিতি অনেক খারাপ।” ডাক্তাররা মনে করছেন, সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে!
আমার মাথা অবনত হয়ে গেল। অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। স্মরণ করছিলাম গত রাতের সে ভিক্ষুকের কথা, যাকে আমি বাজারে ল্যাং মেরেছিলাম এবং তাকে মানুষের হাসির পাত্র বানিয়েছিলাম।
সুবহানাল্লাহ! যেমন কর্ম তেমন ফল! আমি কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। নিজ স্ত্রী ও সন্তানের কথা স্মরণ হলো। ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্ত্রীকে দেখার জন্য চলে এলাম।
আমার স্ত্রী চিন্তিত ছিল না। কারণ, সে ছিল আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী ও সন্তুষ্ট। মানুষকে নিয়ে উপহাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সে আমাকে অনেক উপদেশ দিয়েছিল। সে সব সময় আমাকে ভীতি প্রদর্শন করত এবং বলত, “মানুষের দোষচর্চা করো না।"
আমরা হাসপাতাল থেকে সালিমকে নিয়ে বের হয়ে এলাম। বাস্তবতা ছিল আমি তাকে কখনোই গুরুত্ব দিইনি। আমি ধরে নিতাম যে, ঘরে কেউ নেই। যখন তার কান্নার আওয়াজ বেড়ে যেত, তখন অন্য রুমে ঘুমানোর জন্য চলে যেতাম। আমার স্ত্রী তাকে সব সময় গুরুত্ব দিত এবং তাকে অনেক ভালোবাসত। আমি তাকে ঘৃণা করতাম না। কিন্তু তাকে ভালোবাসতেও সক্ষম ছিলাম না!
সালিম বড় হলো। বুকে ভর করে চলতে শিখল। তার এই চলার ধরনও ছিল আশ্চর্যজনক। তার বয়স এক বছরের কাছাকাছি। সে হাঁটার চেষ্টা করছে। আমাদের কাছে তখন ক্লিয়ার হলো যে, সে পঙ্গু। আমার কাছে তাকে আরও বোঝা মনে হলো। এরপর আমার স্ত্রীর কোলে এল খালিদ ও উমর।
কয়েক বছর চলে গেল। সালিম বড় হলো এবং তার দুই ভাইও বড় হলো। আমি বাড়িতে থাকা পছন্দ করতাম না। সব সময় নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। প্রকৃতঅর্থে আমি ছিলাম তাদের হাতের খেলনা।
স্ত্রী আমার সংশোধনের ব্যাপারে নিরাশ হলো না। সব সময় আমার হিদায়াতের জন্য দুআ করত। আমার উদ্দেশ্যহীন চলাফেরায় সে রাগান্বিত হতো না। কিন্তু যখন সে সালিমের ব্যাপারে আমার অবহেলা এবং বাকি দুজনের ব্যাপারে গুরুত্ব দেখত, তখন অনেক চিন্তিত হতো। সালিম বড় হলো এবং সাথে সাথে তার ব্যাপারে আমার অবহেলাও বৃদ্ধি পেল। যখন আমার স্ত্রী তাকে কোনো একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তির জন্য বলল, তখন আমি গুরুত্ব দিইনি। আমি তার বয়সের ব্যাপারে কোনো পরোয়া করিনি। আমার সব দিনই সমান কাটত। কাজ, ঘুম, খানা ও রাত জেগে আড্ডাই ছিল আমার নেশা।
জুমআর দিন। আমি বেলা এগারোটার সময় জেগে উঠলাম। এটিই আমার ভোরবেলা। সেদিন একটি বিয়ের প্রোগ্রামে দাওয়াত ছিল। পোশাক পরে সুগন্ধি মেখে বের হওয়ার ইচ্ছে করলাম। মাত্র বাড়ির আঙিনা পার হলাম। কিন্তু সালিমের একটি দৃশ্য আমাকে থামিয়ে দিল। সে খুব কাঁদছিল তখন।
এই প্রথম আমি তার ব্যাপারে সজাগ হলাম। তার শিশুকাল থেকে দশ বছর চলে গেছে; আমি কখনো তার দিকে তাকাইনি। এই প্রথম তার দিকে দৃষ্টি দিলাম। তার কাছে গেলাম। "সালিম, কেন কাঁদছ?!"
সে আমার আওয়াজ শুনে থেমে গেল। যখন আমার নৈকট্য উপলব্ধি করল, তখন সে নিজের ছোট ছোট হাতখানা দিয়ে নিজের পাশের জিনিস উপলব্ধি করার চেষ্টা করল। সে কী খুঁজছিল? আমি বুঝলাম যে, সে আমার কাছ থেকে দূরে সরতে চাচ্ছে! কেমন যেন সে বলছিল, "এতদিন পর তুমি আমাকে অনুভব করলে? এই দশ বছর তুমি কোথায় ছিলে?!" আমি তার অনুসরণ করলাম। সে নিজ কামরায় প্রবেশ করল। প্রথমে আমাকে সে নিজের কান্নার কারণ বলেনি। আমি তার সাথে কোমল আচরণ করার চেষ্টা করলাম। এবার সালিম নিজের কান্নার কারণ বর্ণনা করতে শুরু করল। আমি তা শুনে কেঁপে উঠলাম।
আপনি জানেন, তার কান্নার কারণ কী ছিল? তার ভাই উমর তার কাছে আসতে বিলম্ব করেছিল। যে সব সময় তাকে মসজিদে পৌছিয়ে দিত। আর সেদিন ছিল জুমআর দিন। সে আশঙ্কা করছিল যে, মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না। সে উমরকে ডেকেছে, ডেকেছে তার মাকে। কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। ফলে সে কান্না শুরু করে দিয়েছে।
আমি তার জন্মান্ধ দুচোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখলাম। তার বাকি কথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। তার মুখের ওপর হাত রেখে বললাম, "সালিম, তুমি এ কারণেই কেঁদেছিলে?”
সে বলল, “হ্যাঁ।”
নিজের বন্ধুদের কথা ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম অনুষ্ঠানের কথা। তাকে বললাম, “সালিম, চিন্তা করো না। তুমি জানো কি, আজ কে তোমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে?”
সে বলল, “আমার বিশ্বাস উমর নিয়ে যাবে। কিন্তু সে সব সময় দেরি করে।”
আমি বললাম, “না, বরং আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে যাব।”
সালিম অবাক হলো। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে মনে করল, আমি তাকে নিয়ে উপহাস করছি। তার অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি নিজ হাতে তার অশ্রু মুছে দিয়ে তার হাত ধরলাম। আমি চিন্তা করেছিলাম তাকে গাড়ি দিয়ে পৌঁছিয়ে দেবো। কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করল যে, “মসজিদ কাছে। আমি পায়ে হেঁটে মসজিদে যেতে চাই।” আল্লাহর শপথ, সে আমাকে এমনটিই বলেছিল।
আমার স্মরণ হচ্ছিল না সর্বশেষ কবে মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম! এই প্রথম অতীত জীবনের কর্মকাণ্ডে ভয় ও লজ্জা অনুভব করলাম। মুসল্লিভরা মসজিদ। কিন্তু দেখলাম, সালিমের জন্য প্রথম কাতারে একটি জায়গা খালি। পিতা-পুত্র উভয়ে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনলাম। সালিম আমার পাশেই সালাত আদায় করল। প্রকৃতঅর্থে আমিই তার পাশে সালাত আদায় করলাম।
সালাত আদায়ের পর সালিম আমার কাছে একখণ্ড কুরআন চাইল। আমি অবাক হলাম। অন্ধ হয়ে কীভাবে কুরআন পাঠ করবে সে! আমি তার কথা না বোঝার ভান করলাম। কিন্তু তার অনুভূতিতে আঘাত লাগার ভয়ে তার সাথে সৌজন্যতা রক্ষা করলাম। তাকে একখণ্ড কুরআন শরিফ এনে দিলাম। সালিম আমাকে সুরা কাহফের পৃষ্ঠা খুলে দিতে বলল। আমি সূচিপত্র দেখে সুরা কাহফ বের করলাম।
সে কুরআন শরিফ নিয়ে নিজের সামনে রাখল। এরপর সুরা পাঠ শুরু করল। অথচ তার চক্ষুদ্বয় বন্ধ। ইয়া আল্লাহ, সে পুরা সুরাটি মুখস্থ করে নিয়েছে!
আমি লজ্জিত হলাম। হাতে কুরআন নিলাম। আমার পুরো শরীর তখন কাঁপছিল। আমি কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলাম এবং তিলাওয়াত করতে থাকলাম। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন এবং আমাকে সঠিক পথ দেখান। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। শিশুর মতো কান্না জুড়ে দিলাম। তখনো কিছু মানুষ মসজিদে সুন্নাত আদায় করছিল। তাদের সামনে কাঁদতে লজ্জা হলো। তাই নিজের কান্নাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলাম। আমার কান্না তখন ফোঁপানি ও বুকের ভেতর ঘড়ঘড় শব্দে পরিণত হলো।
আমি শুধু এতটুকুই অনুভব করলাম যে, একটি ছোট হাত আমার চেহারা স্পর্শ করছে এবং আমার চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। সে ছিল সালিম! আমি তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আমি তার দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম, তুমি অন্ধ নও, বরং আমিই অন্ধ। কারণ আমি ফাসিকদের পেছনে ঘুরছি, যারা আমাকে জাহান্নামের দিকে ডাকছে।
আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। আমার স্ত্রী সালিমকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিল। কিন্তু যখন দেখল, আমি তার সাথে জুমআর সালাত আদায় করেছি, তখন এই দুশ্চিন্তা খুশির আনন্দে পরিণত হলো এবং তার গাল বেয়ে আনন্দঅশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন থেকে মসজিদে জামাআতের সাথে আমার আর কোনো সালাত ছুটেনি। আমি খারাপ বন্ধুদের ত্যাগ করলাম এবং মসজিদে নামাজ আদায়কারী নেককার বন্ধুদের গ্রহণ করলাম। তাদের সাথে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করলাম। আমি তাদের কাছে এমন কিছু জিনিস পেলাম, যা আমাকে দুনিয়াবিমুখ করে দিয়েছে। কোনো জিকিরের মজলিশ বা বিতরের সালাতও আমার ছুটত না। এক মাসে আমি কয়েকবার কুরআন খতম করেছি। জিকিরের মাধ্যমে আমার জবানকে তরুতাজা করেছি। এ আশায় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের নামে আমার গিবত ও ঠাট্টা ক্ষমা করে দেবেন। আমি অনুভব করলাম যে, আমি নিজের পরিবারের একেবারে নিকটে। আমার স্ত্রীর চেহারায় যে ভয় ও উৎকণ্ঠার ছাপ ছিল, তা কেটে গেছে। আমার ছেলে সালিমের চেহারা থেকে কখনো মুচকি হাসি বিচ্ছিন্ন হতো না। যে তাকে দেখত, সে মনে করত যে, সালিমই দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী। আমি অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে থাকলাম।
একদিনের ঘটনা। আমার নেককার বন্ধুরা একটি সীমান্ত এলাকায় দাওয়ার প্রোগ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন ছিলাম। আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়ে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করলাম। আমার বিশ্বাস ছিল যে, সে এটি প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু ঘটল বিপরীত কাহিনি।
আমি খুব খুশি হলাম। বরং সে আমাকে উৎসাহিত করল। সে আমাকে ইতিপূর্বে অনুমতি ছাড়াই পাপের কাজে সফর করতে দেখেছে।
সালিমের কাছে গিয়ে তাকে আমার সফরের সংবাদ দিলাম। বিদায়ের জন্য সে আমাকে তার ছোট দুখানা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। বাড়ি থেকে সাড়ে তিন মাসের জন্য হারিয়ে গেলাম। এ সময়ে যখনই আমার সুযোগ হতো, বাড়িতে যোগাযোগ করতাম এবং স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে কথা বলতাম। আমি তাদের সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলাম। আহ! আমি সালিমকে কতই না মিস করছিলাম! সব সময় তার আওয়াজ শোনার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। আমার সফরে আসার পর থেকে শুধু সে আমার সাথে কথা বলেনি। আমার যোগাযোগের সময় হয়তো সে মসজিদে ছিল না হয় মাদরাসায়।
যখনই আমার স্ত্রীর সাথে সালিমের ভালোবাসার কথা বলতাম, তখন সে হাসত এবং খুব খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করত। কিন্তু সর্বশেষ যখন তার সাথে মোবাইলে সালিমের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তার কাঙ্ক্ষিত হাসি শুনলাম না। তার আওয়াজ পরিবর্তন হয়ে গেল।
আমি বললাম, “সালিমকে আমার পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছিয়ে দিয়ো।” সে বলল, “ইনশাআল্লাহ।” তারপর চুপ হয়ে গেল সে।
সফর শেষে বাড়ি ফিরে এলাম। দরজায় করাঘাত করলাম। আশা করেছিলাম যে, সালিম এসে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলে খালিদ দরজা খুলে দিল, যার বয়স এখনো চার বছর হয়নি। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। আর সে চিৎকার করে বলল, “বাবা...বাবা...।"
বাড়িতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কেন যেন আমার বুক ধড়ফড় করছিল।
বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলাম।
আমার স্ত্রী এগিয়ে এল। তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। কেমন যেন সে কৃত্রিম হাসি গ্রহণ করেছে।
আমি খুব চিন্তা করে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার কী হয়েছে?”
সে বলল, "কিছুই না।”
হঠাৎ সালিমের কথা স্মরণ হলো। জিজ্ঞেস করলাম, "সালিম কোথায়?”
তখন তার মাথা নত হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিল না সে। উষ্ণ অশ্রুফোঁটা তার গাল বেয়ে পড়তে লাগল।
আমি চিৎকার করে বললাম, "সালিম, সালিম কোথায়?”
তখন বেটা খালিদের আওয়াজ শুনলাম। সে বলল, "বাবা, সালিম জান্নাতে চলে গেছে। আল্লাহর কাছে।"
আমার স্ত্রী নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি কামরা থেকে বের হয়ে গেলাম।
পরে আমি জানতে পারলাম, আমার ফিরে আসার দু'সপ্তাহ আগে সালিম জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। তার মা তাকে হাসপাতাল নিয়ে গেল। কিন্তু তার জ্বর বেড়েই চলল। এমনকি একপর্যায়ে তার দেহ থেকে রুহ চলে গেল।
আমি বুঝতে পারলাম কী ঘটেছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। হ্যাঁ, এটা পরীক্ষা। আমাকে বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করতে হবে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম, যাঁর প্রশংসা সর্বদা করতে হবে। আমি তখনও সালিমের হাতের ছোঁয়া, ছোট্ট হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দেওয়া, দুহাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরা অনুভব করছিলাম। আমি সালিমের অন্ধত্ব ও খোঁড়া হওয়া নিয়ে কত চিন্তিত ছিলাম! কিন্তু মূলত সে অন্ধ ছিল না। সে অন্ধ ছিল না, অন্ধ ছিলাম আমি। যখন খারাপ বন্ধুদের সাথে ঘুরঘুর করতাম, তখন আমি অন্ধ ছিলাম। সালিম খোঁড়া ছিল না, কারণ সবকিছু চাপিয়ে ইমানের পথে চলতে পারত সে। এখনো আমি তার কথামালা স্মরণ করতে পারছি অক্ষরে অক্ষরে। সে বলত, "আল্লাহ অশেষ রহমতের অধিকারী।"
সালিম। যাকে অনেক দিন ভালোবাসা দিইনি আমি। অবশেষে প্রকাশ পেল, আমি তার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকে ভালোবাসি। আমি অনেক কাঁদলাম। তখনও আমি চিন্তিত-উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলাম। কেনই বা চিন্তা হবে না, তার হাত ধরেই তো আমার দ্বীনের পথে আসা। হে আল্লাহ, আপনি সালিমকে কবুল করে নিন। তাকে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার পথে মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকা প্রার্থনা করি।'
সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, সুসংবাদ নাও হে প্রত্যাবর্তনকারী, সুসংবাদ নাও কাফেলার নতুন সাথি। সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।' ১৫৩
সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, আল্লাহ তোমার জন্য রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন :
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
'বলুন, “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।" ১৫৪
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحاً فَأَوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيماً
'কিন্তু যারা তাওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ১৫৫
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ 'নিশ্চয় পুণ্যরাজি পাপরাশিকে দূর করে দেয়।' ১৫৬
দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ আরও বলেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحاً ثُمَّ اهْتَدَى 'আর যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।' ১৫৭
(হাদিসে কুদসিতে এসেছে, রাসুল ইরশাদ করেন,) আল্লাহ বলেন:
يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ، وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةٌ
'আদম-সন্তান, তুমি যতদিন আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে আশা করতে থাকবে, তোমার পাপ যা-ই হোক না কেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। এ ক্ষেত্রে আমি কাউকে পরোয়া করি না। আদম-সন্তান, যদি তোমার পাপরাশি উচ্চাকাশ পর্যন্তও পৌঁছে যায়, এরপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, (তোমার পাপ যত বেশিই হোক না কেন,) আমি কারও পরোয়া করি না। আদম-সন্তান, যদি তুমি আমার কাছে দুনিয়ার সমান পাপ নিয়ে আসো এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তবে আমি তোমার কাছে দুনিয়ার সমান ক্ষমা নিয়ে আসব। ১৫৮
হে তাওবাকারী, সুসংবাদ নাও। সুসংবাদ নাও হে প্রত্যাবর্তনকারী, সুসংবাদ তোমার জন্য হে প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার সঙ্গী!
রাসুল ﷺ বলেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
'গুনাহ থেকে তাওবাকারী সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহই নেই। '১৫৯
হে তাওবাকারী, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো, আল্লাহ তাওবাকারীদের তাওবাতে খুশি হন। গুনাহকারীর অনুতপ্ততাভরা অশ্রু তাঁর কাছে তাসবিহ-আদায়কারীর তাসবিহ উচ্চারণ থেকেও উত্তম।
বর্ণিত আছে, এক লোক ইবনে মাসউদ -এর কাছে আসলেন। নিজের গুনাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, 'এর কোনো তাওবা আছে কি?' ইবনে মাসউদ মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর প্রশ্নকর্তার দিকে ফিরলে দেখা গেল তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তিনি বললেন, 'জান্নাতের আটটি দরজা আছে। প্রতিটি দরজা খোলা ও বন্ধ করা হয়। তবে তাওবার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তাওবার দরজায় একজন ফেরেশতা থাকেন, যিনি দরজাটা খোলা রাখেন। তাই আমল করো। হতাশ হয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।'
আব্দুর রহমান বিন আবু কাসিম বলেন, 'আব্দুর রহমানের সাথে আমরা কাফিরের তাওবা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আল্লাহ বলেছেন :
إِن يَنتَهُوا يُغْفَرْ لَهُم مَّا قَدْ سَلَفَ
“তারা (কাফিররা) যদি নিবৃত্ত হয়, তাহলে তারা পূর্বে যা করেছে, তা ক্ষমা করা হবে।”১৬০
তিনি বলেন, আমি আশা করি আল্লাহর কাছে মুসলিমের অবস্থা কাফিরের চেয়ে উত্তম। আমার কাছে এ কথা পৌঁছেছে যে, একজন মুসলিমের তাওবা হলো, একবার মুসলিম হওয়ার পর দ্বিতীয়বার মুসলিম হওয়া।
বর্ণিত আছে, বনি ইসরাইলে এক যুবক ছিল। ২০ বছর আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিল সে। এরপর ২০ বছর আল্লাহর অবাধ্যতায় কাটাল। এরপর তার চোখ পড়ল আয়নায়। সে নিজের দাড়ির দিকে তাকাল। তার কাছে জীবনের বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। সে বলল, “হে আল্লাহ, ২০ বছর আমি আপনার আনুগত্য করলাম। এরপর ২০ বছর আপনার অবাধ্য ছিলাম। এখন যদি আমি ফিরে আসি, আপনি কি আমাকে কবুল করে নেবেন?!" তখন দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আহ্বানকারী বলে উঠলেন, "তুমি আমাকে ভালোবেসেছ, তাই আমি তোমাকে ভালোবাসলাম। তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ, তাই আমিও তোমাকে ত্যাগ করলাম। তুমি আমার অবাধ্য হলে আমি তোমাকে অবকাশ দিলাম। যদি তুমি ফিরে আসো, তবে তোমাকে কবুল করে নেব আমি।”
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ
'তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন আর পাপসমূহ ক্ষমা করেন।'১৬১
শোনো, তাওবার পথে কিছু সহায়ক আছে আবার কিছু বাধাও আছে। তাওবার ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে দীর্ঘ আশা পোষণ করা। জীবন নিয়ে যার আশা দীর্ঘ হবে, তার আমলের খাতা আশানুরূপ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ 'আপনি ছেড়ে দিন তাদের। তারা খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক। আর আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে।'১৬২
আল্লাহ তাআলা বলেন: أَفَرَأَيْتَ إِن مَّتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ - ثُمَّ جَاءَهُم مَّا كَانُوا يُوعَدُونَ 'আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদের বছরের পর বছর ভোগবিলাস করতে দিই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদের ওয়াদা দেওয়া হতো, তা তাদের কাছে এসে পড়ে। ১৬৩
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِ مِن مَّالٍ وَبَنِينَ نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لَّا يَشْعُرُونَ 'তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের যে ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে যাচ্ছি। তাতে তাদেরকে দ্রুত কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না।'১৬৪
তাওবার পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে মৃত্যু ও মৃত্যুর সময়টাকে মনে রাখা, স্মরণ করা। হ্যাঁ... মৃত্যু অতি নিকটে আমাদের। জীবন যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা ছোট হয়ে থাকে। দুনিয়ায় যত যা কিছু থাক না কেন, এ দুনিয়া তুচ্ছ-নিকৃষ্ট। তাই নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নাও, যেমনটা তুমি চাও। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তখন আমার ও তোমার কী অবস্থা হবে, যখন আমাদের বলা হবে, 'অমুকের ছেলে অমুক, তোমার শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। তোমার বিদায়ের কাল এসে গেছে।' তখন কেউ হয়তো চিৎকার করে ফরিয়াদ করবে, 'হে রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি আমল করে আসতে পারি।' আবার কেউ চিৎকার করে বলবে, 'বাহ! বাহ! প্রিয়জনদের সাথে দেখা হবে। মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে সাক্ষাৎ হবে।' এ দুটো অবস্থার যেকোনো একটিই হবে আমাদের জীবনের পরিণতি। দুটোর যেটা তোমার কাছে ভালো লাগে, সেটা বেছে নাও নিজের জন্য।
যখন হাসসান বিন আবু সিনানের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, তাকে বলা হলো, 'আপনি কী পাবেন?' তিনি বললেন, 'কল্যাণ, যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কী চান?' তিনি বললেন, 'আমি চাই একটা লম্বা রাত, যার পুরোটা নামাজে কাটিয়ে দেবো।'
মুজানি শাফিয়ি-এর কাছে এলেন তার মৃত্যুকালীন অসুস্থতার মাঝে। জিজ্ঞেস করলেন, 'আজ সকালটা কেমন হলো, হে আবু আব্দুল্লাহ?!' ইমাম শাফিয়ি জবাব দিলেন, 'দুনিয়াকে বিদায় দেওয়া, প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়া, নিজের মন্দ আমলের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ও মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করা অবস্থায় আজ সকাল হলো। আমার বিষয়টা রবের কাছে সোপর্দ করছি। আমি জানি না, আমার রুহ কোথায় যাবে—জান্নাতে? তবে আমি তাকে স্বাগত জানাব, না জাহান্নামে? তা হলে তাকে আমি দুঃখের বার্তা জানাব।' এরপর ইমাম শাফিয়ি কবিতা আবৃত্তি করলেন:
وَلَمَّا قَسا قلبي وَضاقَت مَذاهبي *** جَعَلْتُ الرجا مِنِّي لِعَفْوِكَ سُلَّما تَعاظَمَنِي ذَنبِي فَلَمَّا قَرَنتُهُ *** بِعَفوِكَ رَبِّي كَانَ عَفْوُكَ أَعظَما فما زلت ذا عَفُو عَنِ الذَنبِ لَم تَزَل *** تَجُودُ وَتَعْفو مِنَّةً وَتَكَرُّما
'আমার হৃদয় পাষাণ হয়ে গেছে, সংকীর্ণ হয়ে গেছে মুক্তির সকল পথ। তবু আপনার দয়ার আশা সম্বল করে দরবারে হাজির হয়েছি হে রব। বুঝতে পারি, আমার পাপের বোঝা অনেক ভারী। আপনার দয়ার সাথে তুলনা করে দেখি, তা আরও সুমহান! আপনি সর্বদা গুনাহ মাফ করেন, আপনি মহানুভব, নিজ করুণা ও দয়ায় আপনি সর্বদা ক্ষমা করেন।'১৬৫
শোনো হে প্রিয়, সব আশা-আকাঙ্ক্ষার অবসান হবে। সব ধন-সম্পদ নিঃশেষ হবে। বহু যত্নে গড়ে তোলা শরীরটা মাটির নিচে দাফন হবে। শোনো হে প্রিয়, দিন-রাতের আবর্তন সব নতুন ও অভিনবকে পুরোনো ও জীর্ণ করে দেয়। দিন-রাত প্রতিটি দূরের জিনিসকে কাছে এনে দেয়। দিন-রাতের আবর্তন পুরস্কার ও শাস্তির ক্ষণকে নিয়ে আসে। তাই সাবধান হও। সতর্ক হও।
শোনো আল্লাহর বান্দা, সতর্ক হও, ঘুম থেকে জেগে ওঠো, আল্লাহর কাছে বিনয়-নম্র হয়ে দাঁড়াও। আর বলো, এখনই সময় প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করো। এগিয়ে আসো। সালাফগণ বলেন, যে চারটি বিষয়ের তাওফিক পেয়েছে, সে চারটি বিষয় থেকে বঞ্চিত হবে না। যে দুআর তাওফিক পায়, সে প্রতিফল থেকে বঞ্চিত হয় না, তার দুআয় সাড়া দেওয়া হয়। আর তোমাদের রব বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।”১৬৬
যে ক্ষমা প্রার্থনার তাওফিকপ্রাপ্ত হয়, সে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে না। আর তোমাদের রব বলেন:
إِنَّهُ كَانَ غَفَّاراً
'তিনি তো পরম ক্ষমাশীল। '১৬৭
যে কৃতজ্ঞতা আদায়ের তাওফিকপ্রাপ্ত হয়, সে আরও বেশি নিয়ামত পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নিয়ামত) বৃদ্ধি করে দেবো।'১৬৮
যে তাওবা করার তাওফিক পায়, সে তাওবা কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না। তোমাদের রব বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ 'তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'১৬৯
শোনো হে প্রিয়, আল্লাহ ছাড়া জীবনটা বিরান মরুভূমি। অন্তরের পরিশুদ্ধি কেবল আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আমি যখন মন থেকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে আসব, তখন সকল কল্যাণ একে অন্যের সাথে মিলে যাবে, জীবন প্রাণ ফিরে পাবে, স্বভাব নিষ্কলুষ হবে, অন্তর হবে পরিশুদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ 'হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?'১৭০
হে তাওবাহীন যুবক, কেন তুমি নিজের জন্য কাঁদছ না? কেন তুমি নিজের এ মন্দ অবস্থায় সতর্ক হচ্ছ না? সাবধান হচ্ছ না কেন কঠিন আজাব থেকে?!
জীবন নামের খাতায় একটা তাওবার ঘটনা লেখো। অনুতপ্ততা ও লজ্জার কলমে, চোখের অশ্রু ও মনের অনুতপ্ততা দিয়ে একটা তাওবার ঘটনা লেখো। তা পেশ করো বিনম্র পদে ভয় নিয়ে রবের দরজায়। তার সাথে যুক্ত করো তোমার প্রাণের ক্ষুধা ও পিপাসা। রহমত প্রার্থনা করো।
অনেক প্রার্থনা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মানুষ যখন ঘুমন্ত থাকে, তখন রাতের আঁধারে রবের দরবারে দাঁড়িয়ে বলো, হে করুণাময়, মুমিনের ভরসাস্থল, মুমিনের আশার জায়গা, গুনাহগারের আরজি তোমার কাছে, যদি তুমি তাড়িয়ে দাও, তবে কার কাছে যাব আমি! গুনাহগারের প্রতি আপনি দয়ালু, পথভোলাদের ক্ষেত্রে আপনি সহনশীল, হে রব, আপনার বৈশিষ্ট্য ক্ষমা করা। আমি মূর্খের মতো আপনার অবাধ্য হয়েছি, হে মহান রব, আমাকে আমার এ মন্দ অবস্থা থেকে মুক্তি দিন। হে মাওলা, গোলাম তার মাওলা ছাড়া আর কার কাছে আশ্রয় নেবে? সেসব লোকই তো সৌভাগ্যবান, যারা গুনাহের পথ ছেড়ে নিজেদের শুদ্ধ করেছে। তারা রবের আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাকওয়ার স্থলে হাজিরা দিয়েছে, তারা অগ্রসর হয়েছে, নিজেদের কৃত প্রতিটি গুনাহর ক্ষমা চেয়েছে, তাওবা করেছে। রবের দরজার দিকে অগ্রসর হয়ে তারা ফেরত যায়নি খালি হাতে।
হে আল্লাহ, আমাদের পরিচালিত করুন শ্রেষ্ঠ পথে। আমাদের তাওবার তাওফিক দিন। আপনার দিকে অগ্রসর হওয়ার সৌভাগ্য দিন। আমাদের ডাকে সাড়া দিন। হে প্রভু, আপনি তিনিই, যার কাছে বিপদগ্রস্ত দুআ করলে সাড়া দেওয়া হয়। হে আল্লাহ, আমাদের পরিশুদ্ধ তাওবা গ্রহণ করুন। আমরা আমাদের তাওবার ওয়াদা কখনো ভঙ্গ করব না। আমাদের রক্ষা করুন, যেন আমরা সৌভাগ্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
হে আল্লাহ, তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। গুনাহগারদের ক্ষমা করে দিন। যুবক-বৃদ্ধ সবাইকে কবুল করে নিন প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলাতে। হে আল্লাহ, আমাদের তাওফিক দিন আপনার অধিকার যথার্থরূপে আদায় করার। আমাদের হালাল রিজিকে বরকত দিন। আমাদের অপমানিত করবেন না আপনার সৃষ্টির সামনে। হে রব, আপনি দুআর সর্বোত্তম স্থল, আপনি আশার সর্বোত্তম স্থল। হে প্রয়োজন পূরণকারী, হে মর্যাদা উন্নতকারী, হে দুআয় সাড়াদানকারী! হে জমিন, আরশ ও আসমানসমূহের রব, আমাদের প্রার্থিত জিনিসটি দান করুন। আমাদের আশার প্রতিফল দান করুন। হে প্রার্থনাকারীদের প্রার্থিত বস্তুর মালিক, আপনি চুপ থাকা ব্যক্তিদের মনের কথা জানেন, আমাদের দান করুন আপনার ক্ষমার শীতলতা, আপনার মার্জনার মিষ্টতা, হে আরহামুর রাহিমিন।
اللهم صلي على محمد وعلى آله وصحبه الأخيار...

টিকাঃ
১১৬. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৬।
১১৭. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
১১৮. সুরা আশ-শুরা, ৪২: ২৫।
১১৯. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
১২০. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৮৪৭।
১২১. সুরা ইউসুফ, ১২: ১১১।
১২২. সহিহুল বুখারি: ৬৪০৮, সহিহু মুসলিম: ২৬৮৯।
১২৩. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১১১।
১২৪. সুরা আল-বাকারা, ২ : ২২২।
১২৫. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৬।
১২৬. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৬।
১২৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫২।
১২৮. সুরা ইউনুস, ১০: ৪৯।
১২৯. সুরা আত-তাকবির, ৮১: ৮।
১৩০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
১৩১. সুরা আশ-শুরা, ৪২: ২৫।
১৩২. সুরা আত-তাকবির, ৮১: ১০-১৪।
১৩৩. সুরা আল-হাক্কা, ৬৯: ১৮।
১৩৪. সুরা ইয়াসিন, ৩৬: ৬৫।
১৩৫. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ২২-২৪।
১৩৬. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
১৩৭. সুরা আন-নামল, ২৭: ৬২।
১৩৮. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৩৯. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১৪০. সুরা আল-মুজাদালা, ৫৮: ১৯।
১৪১. সুরা সাবা, ৩৪: ৫৪।
১৪২. সুরা আর-রুম, ৩০: ৭।
১৪৩. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৮১।
১৪৪. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৮৪।
১৪৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
১৪৬. সুরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩: ৪-৬।
১৪৭. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৩৯-৪০।
১৪৮. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৪৯. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫০. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫১. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫২. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫৩. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
১৫৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
১৫৫. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭০।
১৫৬. সুরা হুদ, ১১: ১১৪।
১৫৭. সুরা তহা, ২০: ৮২।
১৫৮. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৪০।
১৫৯. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫০।।
১৬০. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ৩৮।
১৬১. সুরা আশ-শুরা, ৪২ : ২৫।
১৬২. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৩।
১৬৩. সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ২০৫-২০৬।
১৬৪. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫৫।
১৬৫. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৩৫৮; খতিব তারিখু বাগদাদ : ৭/৪৪৭-তে এ কবিতাটিকে আবু নাওয়াসের মৃত্যুকালীন কবিতা বলে উল্লেখ করেছেন।
১৬৬. সুরা গাফির, ৪০: ৬০।
১৬৭. সুরা নুহ, ৭১: ১০।
১৬৮. সুরা ইবরাহিম, ১৪:৭।
১৬৯. সুরা আশ-শুরা, ৪২:২৫।
১৭০. সুরা আল-ইনফিতার, ৮২:৬।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 সত্যের পথে ফিরে আসা নারীদের কাফেলা

📄 সত্যের পথে ফিরে আসা নারীদের কাফেলা


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। ১৭১
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
'হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন। '১৭২
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল।'১৭৩
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'
প্রিয় মুসলিম বোন আমার, আল্লাহ তাআলা তোমাকে নেক হায়াত দান করুন এবং সত্যের পথে তোমার পদক্ষেপগুলো অবিচল রাখুন। আমি মহান আরশের মালিক আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকে নিরাপত্তা দান করেন। তোমাকে আল্লাহভীরু, পূত-পবিত্রা ও পরহেজগার বানিয়ে দেন।
হে বোন, আল্লাহর বান্দা-বান্দিরা আলোকিতও হয় এবং অস্তমিতও হয়। বস্তুত দুনিয়ার স্বাদ ও প্রবৃত্তি তাদের গাফিল করে রেখেছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বান্দা ও বান্দির প্রশান্তি লাভ, সফলতা ও পবিত্রতা লাভের জন্য অদৃশ্যের ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত মহান সত্তার দিকে ফিরে আসা এবং তাঁর সামনে নত হওয়ার বিকল্প নেই। কেননা, দুনিয়া যতই মানুষের কাছে আসুক, যতই তার জন্য সজ্জিত ও অলংকৃত হোক, তাতে সে সফলতার কোনো মুখ দেখে না। সফলতা পরিপূর্ণভাবে নিহত আছে আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসা এবং তাঁর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণের মধ্যে। সফলতা রয়েছে আল্লাহ তাআলার নিষেধাবলি থেকে বিরত থাকার মধ্যে। সফলতার অন্বেষণকারী অনেক। প্রশান্তি ও প্রশস্ততার প্রার্থীও অনেক। কিন্তু হে প্রিয় বোন!
সফলতা সেটি কোথায়?! সফলতার উৎস কী?! অনেক বোনই ধারণা করে যে, সফলতা তো রয়েছে সম্পদের মাঝে। ফলে তারা তাতেই তা খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু সেখানে তারা তা খুঁজে পায় না। অনেকে ভাবে যে, সফলতা রয়েছে সুখ্যাতির মাঝে। ফলে তারা সুখ্যাতি অর্জনে বিভোর থাকে, কিন্তু সেখানেও তারা তা খুঁজে পায় না। হাদিস শরিফে আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসুল বলেন:
لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادٍ مِنْ ذَهَبٍ، أَحَبَّ أَنَّ لَهُ وَادِيًا آخَرَ، وَلَنْ يَمْلَأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ، وَاللَّهُ يَتُوبُ عَلَى مَنْ تَابَ
'যদি আদম-সন্তান একটি স্বর্ণের উপত্যকার মালিক হয়, তাহলে সে আরেকটি উপত্যকা কামনা করবে। তার মুখ শুধু মাটিই পূর্ণ করতে পারবে। আর যে তাওবা করে, তার প্রতি আল্লাহ তাআলা সদয় হন। '১৭৪
হে বোন, অনেক নারীর ধারণা, সফলতা রয়েছে প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো এবং দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতায়। সুতরাং তারা এর পেছনেই সফলতা খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তারা সেখানেও তা পায় না। তাহলে সফলতা জিনিসটি কোথায়?! কীভাবে সেটি অর্জন করতে হয়?! তার স্থান কোথায়?! হে বোন, আমার কথায় কান দাও এবং চোখ খোলার আগে হৃদয়ের দরজা খুলে দাও। এসো, আমরা এই ঘটনাটি শুনি। এই মেয়েটি সেসব যুবতির একজন, যারা সফলতা অন্বেষণ করেছেন। এসো, আমরা এমন এক নারীর কথা শুনি, যে তাওবাকারী নারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমরা এখন যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব, তার শিরোনাম হলো, 'আল্লাহর পথে ফিরে আসা নারীদের কাফেলা।'
চলো, আমরা সে নারীর ঘটনা দিয়ে আলোচনা শুরু করি, যে ফিরে আসা নারী কাফেলায় যুক্ত হয়েছে এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এই যুবতি বোন বলেন:
আমার বোনের চেহারাটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আসছে ক্রমশ। ধীরে ধীরে যেন নেতিয়ে পড়ছে শরীরটাও। কিন্তু এই নিয়ে তার কোনো ভাবান্তর নেই। সে তার চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করে প্রতিদিন।
যখনই তার খোঁজ করো দেখবে, সে বসে আছে জায়নামাজ পেতে—কখনো ঝুঁকছে রুকুতে, কখনো লুটিয়ে পড়ছে সিজদায়, কখনো বা হাতদুটি মেলে ধরেছে রবের দরবারে। সুবহে সাদিকের ম্লান আলোতে, সন্ধ্যার ঘনায়মান আঁধারে কিংবা গভীর রজনীর সুষুপ্ত প্রহরে—সব সময় তোমার চোখে পড়বে এই দৃশ্য। ক্লান্তি বা বিরক্তির কোনো চিহ্নই তুমি দেখবে না তার অবয়বে। অফুরন্ত উদ্যমের এক অপার্থিব আলো যেন সারাক্ষণ ঘিরে রাখে তাকে।
অপরদিকে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের এক মেয়ে। বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন পড়তে আমি ভালোবাসি। গল্প ও উপন্যাসের স্তুপ জমে ওঠে আমার টেবিলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিই ইউটিউবে ভিডিও দেখে। বাড়ির কাজগুলো আদায় করা হয় না ঠিকমতো। এমনকি নিয়মিত সালাত আদায় করাও আমার হয়ে ওঠে না কোনো দিন।
হে প্রিয় বোন, এই বোনের মতো অনেকেই আছে। (শাইখের কথা)
বিভিন্ন ধরনের ফিল্ম ও মুভির প্রতি আমি চরম আসক্ত। টানা তিন ঘণ্টা ঠায় বসে থেকে একেকটি মুভি দেখি। ওদিকে মসজিদের মিনার হতে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি—এতে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না আমার অন্তরে। আমি ব্যস্ত থাকি আমার কাজে।
দীর্ঘক্ষণ ইন্টারনেটে কাটিয়ে সেদিন যখন বিছানায় যাই, রাত প্রায় শেষ হয়ে আসে। জায়নামাজে বসে অনুচ্চ স্বরে সে আমাকে ডাকে—
- হেনা, এ্যাই হেনা!
- কী বলতে চাও বলো, নাওরা। আমার কণ্ঠে বিরক্তির আভাস।
- দেখো, ফজরের সালাত না পড়ে ঘুমোবে না কিন্তু। তার গলার স্বর বেশ উঁচু ও ধারালো মনে হলো আমার।
- উফ! কী যে বলো। এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি। এটি তো তাহাজ্জুদের আজান।
- আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিই। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে তলিয়ে যাই গভীর ঘুমে। আমার চোখ খোলে যথারীতি ভোরের আলোতে।
দিন যায়, সপ্তাহ ফুরোয়, মাস আসে। কোনো পরিবর্তন নেই আমাদের জীবনে। স্বাতন্ত্র্যের কোনো চূড়া জেগে ওঠে না চলমান সময়ের নিস্তরঙ্গ সমতলে।
তার শরীরে বাসা বাঁধা মারাত্মক ব্যাধিটি ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে। একসময় শয্যাশয়ী হয়ে পড়ে সে। একদিন আমাকে ডাকে—
- হেনা, একটু এদিকে আসবি? আমার পাশে খানিকক্ষণ বসবি? (তার মধুর স্বরে অদ্ভুত এক আকর্ষণ, যা উপেক্ষা করার শক্তি আমার কোনো কালেই হয়নি। সদা সত্যভাষী আর নির্মল চরিত্রের অধিকারী হওয়ার কারণেই হয়তো তার কথায় ফুটে ওঠে অদম্য এক ব্যক্তিত্ব, যার প্রভাব এড়ানো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।)
- কিছু বলবে?
- বসো। কিছুক্ষণ আমার পাশে বসো।
- বসলাম। এবার বলো, কী বলতে চাও? (আমার চোখে-মুখে কৌতূহলের ঝিলিক।)
সে মিষ্ট ভাষায় তিলাওয়াত করল :
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
'প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলতা পাবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ নয়।' ১৭৫
তার সুমিষ্ট মোলায়েম সুরের তিলাওয়াতে আমি অভিভূত হই। আয়াতটি পড়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চেহারায় তার প্রশান্তির দীপ্তি। তারপর ধীর কণ্ঠে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে:
- তুমি কি মৃত্যুতে বিশ্বাস করো না?
- অবশ্যই বিশ্বাস করি। (আমার কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা।)
- ছোট-বড় সকল কথা ও কর্মের হিসাব দিতে হবে, তা কি বিশ্বাস করো না?
- অবশ্যই! কিন্তু...কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো অসীম দয়ালু পরম ক্ষমাশীল। আর পুরো জীবনটাই তো পড়ে আছে সামনে।
- তুমি কি জানো না, মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে কড়া নাড়তে পারে তোমার দরোজায়? হিন্দ কি তোমার চেয়ে ছোট ছিল না। অথচ সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল। মারা গেল অমুক অমুক এবং অমুক। আজ কোথায় ওরা? মৃত্যু বয়স চেনে না—মানে না কোনো সমীকরণ। জ্ঞানীগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, মৃত্যুর নির্ধারিত কোনো কারণ নেই এবং নির্ধারিত কোনো সময়ও নেই।
- তুমি জানো, আমি অন্ধকারে ভয় পাই। এভাবে মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছ কেন আমাকে? এখন আমি রাতে ঘুমাব কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম, এবার তুমি আমাদের সঙ্গে ভ্রমণে যেতে রাজি হয়েছ আর তা-ই বলার জন্য আমায় ডেকেছ। (ভীত কম্পিত শোনায় আমার গলা।)
সহসা তাঁর কণ্ঠে যেন ঝরে পড়ে একরাশ বিষণ্ণতা। সম্মুখে প্রসারিত তার স্থির দৃষ্টি। স্বগতোক্তির মতো করে সে বলে:
খুব সম্ভব এই বছর আমি খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি—অন্য একটা জায়গায়। জীবনের ওপারের দৃশ্যটা আমার চোখে ভাসছে বারবার। হায়াত তো আল্লাহরই হাতে।
বলতে বলতে অশ্রুসজল হয়ে ওঠে তার মায়াবী চোখদুটি। সৌম্য মুখাবয়বে তার জেগে ওঠে দূর আকাশের স্বপ্ন। মনে হয় সে আমার পাশে নেই, উড়ে বেড়াচ্ছে দূরের কোনো দিগন্তে—যেখানে আসমান চারদিক থেকে গোল হয়ে নেমে মাটি ছুঁয়েছে।
সহসা মনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে তার দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। ডাক্তাররা আব্বুকে একান্তে ডেকে বলেছেন, ‘এই রোগ মানুষকে বেশি দিন বাঁচতে দেয় না।’ কিন্তু ওকে তো কেউ এই খবর জানতে দেয়নি। তাহলে...? আমার মনে হয়, এভাবে হারিয়ে যাওয়াই তার জীবনস্বপ্ন। হঠাৎ তার দৃঢ় কণ্ঠে আমি ফিরে আসি ভাবনার জগৎ থেকে...
কী হলো তোমার? এভাবে কী চিন্তা করছ? তুমি কি তাহলে ভাবছ, আমি অসুস্থ বলেই এমন কথা বলছি?
কক্ষনো না! বরং দেখা যায়, বহু সুস্থ মানুষ চলে যায় অসুস্থেরও অনেক আগে। অনেক সুস্থ মানুষ কোনো কারণ ছাড়া মারা যায়। আবার অনেক অসুস্থ মানুষ দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকে।
তোমার বয়স এখন বিশ বছর। তুমি আর কয় বছর বাঁচবে? ধরো আরও ২০ বছর অথবা মনে করো ৪০ বছর। তারপর কী হবে?
কোনো পার্থক্য নেই আমাদের মাঝে—সবাই চলে যাব আমরা মায়াভরা এই জগৎ ছেড়ে। হয়তো জান্নাত, নয়তো জাহান্নামই হবে আমাদের ঠিকানা। তুমি আল্লাহর সেই বাণীটি শোনোনি?
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ
‘তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলতা পাবে।’ ১৭৬
আবারও কিছুক্ষণ মৌন হয়ে থাকে সে। কী যেন গুছিয়ে নেয় মনে মনে। ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে তার বুদ্ধিদীপ্ত মায়াবী চোখদুটি। আবার সচল হয়ে ওঠে তার নিশ্চল ঠোঁট। আমার ডান হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে : সকালে নতুন খবর শুনবি।
আচ্ছা। আমার একটু তাড়া আছে। তোমার সঙ্গে পরে আরও কথা হবে। (এই বলে আমি উঠে পড়ি তার শিয়র থেকে।)
যেতে যেতে আমার কানে গুঞ্জন তুলে তার শেষ কথাগুলো, ‘বোন আমার, আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত দিন। সালাতের কথা ভুলে যেয়ো না।’
ঠক ঠক ঠক। দরোজায় মৃদু করাঘাতের শব্দে হঠাৎ আমার ঘুম ছুটে যায়। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে। কী হলো আজ! এখনো তো মোটে আটটা! আমার জাগার সময় তো হয়নি! সহসা কানে ভেসে আসে অনেকগুলো মেয়েলি কান্নার আওয়াজ। সেই সঙ্গে বহু মানুষের শোরগোল। বুকটা ধক করে ওঠে। ইয়া আল্লাহ! কী হচ্ছে এসব...। দরোজায় আর শব্দ হচ্ছে না।
আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠি। দরোজার দিকে যেতে যেতে মনে পড়ে যায় নাওরার কথা। তাকে নিয়ে আব্বু হাসপাতালে গিয়েছিলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...
বাসার সবাই বিষণ্ণ। আম্মু ও ফুফুরা অনুচ্চ স্বরে কাঁদছেন। ছোট ভাইটা ব্যালকনির রেলিং ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একরাশ বেদনায় কেমন যেন হু হু করে ওঠে মনটা।
এই বছর বোধ হয় আর কোনো ভ্রমণ হবে না। পুরো সময়টা ঘরেই কাটাতে হবে। আহ! কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছি...
জোহর একটার সময় হাসপাতাল থেকে আব্বুর ফোন আসে। তিনি বলেন, 'এখন নাওরার সঙ্গে দেখা করা যাবে। তাড়াতাড়ি এসো...।' ফোন রেখে আম্মু কাঁদতে কাঁদতে জানান :
'তোর আব্বুর কথা শুনে মনে হচ্ছে, নাওরার অবস্থা বড় ভালো না। তার কণ্ঠ কেমন ভেজা ভেজা আড়ষ্ট মনে হয়েছে।'
অল্প সময়ের মধ্যেই প্রস্তুত হয় সবাই। ড্রাইভারকে ডাকতে ডাকতে গাড়ি রাখার বারান্দায় চলে আসি। দ্রুত গাড়ি বের করে সে। একের পর এক মোড় ঘুরে গাড়ি ছুটে চলে হাসপাতাল অভিমুখে। পরিচিত রাস্তাঘাট আর লোকজনের ভিড়ের মতো স্বাভাবিক দৃশ্যগুলোও চোখে ঝাপসা হয়ে ভাসে। প্রতিদিনের চলার পথটিকেও কেমন যেন বিদঘুটে মনে হয়। পাশে আম্মু অনুচ্চ স্বরে দুআ করছেন নাওরার জন্য। মাঝে মাঝে বলছেন, 'আহ! আমার কলিজার টুকরো নাওরা! কত ভালো মেয়ে! কত ভালোবাসত আমায়! কোনোদিন সময় নষ্ট করতে তাকে দেখিনি।...'
পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি রেখে বিশাল গেইট পেরিয়ে ধীর পায়ে প্রবেশ করি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। বিকট শব্দে সাইরেন বাজিয়ে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে আমাদের থেকে একটু দূরে। কর্তব্যরত কর্মচারীরা ছুটে আসে গাড়ির চারপাশে। একটি রোগী ওহ ওহ করে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আরেকজনের শরীর রক্তাক্ত—ভয়ার্ত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে। তৃতীয়জনের চোখদুটি নষ্ট হয়ে গেছে—কে জানে বেচারা বেঁচে আছে কি না। লোকেরা বলাবলি করছে, কোথাও নাকি গাড়ি উল্টে খাদে পড়েছে।
মানুষের ভিড় ঠেলে করিডোর ধরে সামনে খানিকটা গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দুতলায় চলে আসি আমরা। চারদিকে অদ্ভুত সব দৃশ্য, যা আগে কখনো দেখা হয়নি। হঠাৎ আব্বুকে আসতে দেখি। আমাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেন তিনি। তাড়া দিয়ে বলেন, 'চলো। আমার সাথে এসো। ও এখন ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে।' আব্বুকে অনুসরণ করে আমরা আইসিইউ-এর মূল দরোজার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। পরিচিত এক নার্স এসে আম্মুকে বলে, 'আপনার মেয়ে অনেক ভালো আছে।' তার কথা শুনে আনন্দে উজ্জল হয়ে ওঠে আম্মুর মুখ।
ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে একসঙ্গে একজনের বেশি প্রবেশ করার অনুমতি নেই। প্রথমে যান আম্মু। একটু পরেই তিনি বেরিয়ে আসেন—দুচোখে তাঁর অশ্রুর বন্যা। মেয়ের সামনে কান্না লুকোতেই বোধ হয় চলে এসেছেন দ্রুত। এবার আমার পালা। ধীর পায়ে দরোজা ঠেলে ভেতরে যাই। রোগী দেখার ব্যবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ছোট্ট একটি ঘুলঘুলি দিয়ে দূর থেকে দেখতে হয়, কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাদা পোশাকের ডাক্তারদের ভিড়ের মাঝে নাওরা নির্নিমেষ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পর আব্বুর প্রচেষ্টায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে যাই। দায়িত্বশীলরা আমাকে বলে দেয়, 'দুই মিনিটের বেশি থাকা যাবে না।'
ত্রস্তপদে আমি তার দিকে এগিয়ে যাই। কাছে গিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বলি :
- কেমন আছ নাওরা? গত সন্ধ্যায়ও তো তুমি ভালো ছিলে। হঠাৎ কী হলো তোমার? (বলতে বলতে আমি তার পাশে গিয়ে বসি।)
- আলহামদুলিল্লাহ! আমি এখন ভালো আছি। (আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলে।) কিন্তু তোমার হাত দেখছি ভীষণ ঠান্ডা!
খাটিয়ার এক প্রান্তে বসে আমি দুহাতে তার পা স্পর্শ করি। সে খুব দ্রুত পা গুটিয়ে বলে :
- ইস! দেখ তো কারবার! আমি তোমাকে ভালোভাবে বসতেও দিইনি।
- আরে নাহ! আমি বসতে পেরেছি।
আমি ঠায় চেয়ে থাকি তার অপূর্ব মুখশ্রীর দিকে। ইস! কত সুন্দর আমার বোনটা! দেখে যেন আশ মেটে না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার মুখ খুলে সে :
- জানিস, আমি এই আয়াতটি নিয়ে ভাবছি:
وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ
'আর গোছা গোছার সাথে জড়িত হয়ে যাবে।' ১৭৭
إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ
'সেদিন আপনার পালনকর্তার নিকট সবকিছু নীত হবে।'১৭৮
হেনা, আমার জন্য তুমি অবশ্যই দুআ করবে। খুব দ্রুত আমি আখিরাতের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানাতে চলেছি।
কবি বলেন: سَفْرِي بَعِيدُ وَزادي لَنْ يُبَلِّغَنِي *** وَقُوَتِي ضَعُفَتْ والموتُ يَطلُبُني وَلِي بقايا ذُنوبٍ لَسْتُ أَعْلَمُها *** الله يَعْلَمُها في السِّرِ والعَلَنِ
'আমার সফর দীর্ঘ, কিন্তু পাথেয় আমার যথেষ্ট নয়। অথচ আমার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে, মৃত্যু হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমায়। কত গুনাহ করেছি আমি, যা আমিই জানি না। আল্লাহ তাআলা আমার গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন।'
তার এমন হৃদয়-বিদারক কথা শুনে বুকটা ধক করে ওঠে। অশ্রুরা এসে ভিড় করে দুচোখের কোণায়। সহসা আমার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় এক শীতল স্রোত। সেই সঙ্গে থরথর করে কেঁপে ওঠে পুরো শরীর। উচ্ছ্বাসিত ভাবাবেগ রোধ করতে দুই হাতে মুখ ঢেকে আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি ইউনিট থেকে। আমার অবস্থা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যান আব্বু। বাড়িতে কেউ আমাকে এভাবে কাঁদতে কিংবা ভেঙে পড়তে দেখেনি কোনোদিন।
ধীরে ধীরে অস্তমিত হয় বিষণ্ণ সেই দিনটির রক্তিম সূর্য। সাঁঝের ঘনায়মান আঁধারের সাথে সাথে অদ্ভুত এক মৌনতা এসে গ্রাস করে আমাদের প্রকাণ্ড বাড়িটা। সময় যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায়। অপরিচিত লাগে চারপাশের সবকিছু।
ঘোর কাটতেই বুঝতে পারি, জনসমাগমে পুরো বাড়িটা গমগম করছে। আমার চাচাতো বোনরা এসেছে। খালাতো বোনদেরও দেখতে পাই। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রই। এত মানুষ কেন আজ? আমার বুঝতে বাকি থাকে না নাওরা আর নেই। চলে গেছে সে.....বহু দূরে ... না ফেরার দেশে...
জানি না, এরপর কী ঘটে আমাদের বাড়িতে। কারা এসেছে? কে কী বলছে?— সবকিছু কেমন ধোঁয়াশা হয়ে ওঠে আমার চোখে। হে আল্লাহ, কোথায় আমি— কী হচ্ছে এসব! পাথরের মতো জমে ওঠে আমার বুক। কান্নার শক্তিও আমি হারিয়ে ফেলি সেদিন।
পরে ওরা আমাকে বলে, আব্বু নাকি আমার হাত ধরে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন নাওরাকে। আর শেষ মুহূর্তে আমি চুমু খেয়েছি নাওরার হাতে।
সহসা আমার মনে আবছা ঝিলিক দিয়ে ওঠে একটি দৃশ্য—আইসিইউ-তে নাওরা মোলায়েম কণ্ঠে তিলাওয়াত করেছিল :
وَالْتَفَّتِ السَّاقُ بِالسَّاقِ
‘আর গোছা গোছার সাথে জড়িত হয়ে যাবে।’ ১৭৯
إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمَسَاقُ
‘সেদিন আপনার পালনকর্তার নিকট সবকিছু নীত হবে।’ ১৮০
সেদিন রাতেই আমি গিয়ে বসি নাওরার সেই জায়নামাজে। মনটা হুহু করে কেঁদে ওঠে অজানা এক আবেগে। নাওরা আমার বোন। একসঙ্গে ভাগাভাগি করে ছিলাম একই মায়ের উদরে। একসাথে বেড়ে উঠেছি আমরা। আমরা জমজ বোন। নাওরা আমার জীবনসাথি—আমার সুখ-দুঃখের অকৃত্রিম সঙ্গী।
ফেলে আসা দিনগুলোর কত কথাই না আজ মনে পড়ছে। কী সুন্দর দিন ছিল আমাদের! নাওরা আমাকে খুব ভালোবাসত—তার প্রাণের চেয়েও বেশি। আমার হিদায়াতের জন্য নিরন্তর দুআ করে যেত। গভীর রাতে রবের দরবারে হাত তুলে অশ্রু ঝরাত। আমাকে স্মরণ করিয়ে দিত মৃত্যুর কথা, আখিরাতের কথা, হাশরের কথা।
আজ কবরে নাওরার প্রথম রাত। হে আল্লাহ, তুমি তার ওপর রহম করো। তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও, উদ্ভাসিত করো তোমার করুণার আলোয়।
জায়নামাজে বসে আমি চারদিকে তাকাই। ওই তো নাওরার কুরআন শরিফ— সযত্নে রাখা আছে শেল্পে। আর ওই যে তার জামাকাপড়—দেয়ালে ঝুলছে। ওখানে কাঁচের শোকেজে ভাঁজ করা তার গোলাপি কামিজটিও দেখা যাচ্ছে। সে বলত, 'এটি বিয়ের জন্য তুলে রেখেছি।'
দেখতে দেখতে হৃদয়ে জেগে ওঠে বিরহের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। চোখের শুকিয়ে যাওয়া ধারাগুলো সজীব হয়ে ওঠে আবার। সহসা মনে হয়, বাড়িটা কেমন শূন্য হয়ে গেছে। একটা থমথমে ভাব নেমে এসেছে ঘরের অলিন্দে, বাড়ির ছাদে-পশ্চিমের ব্যালকনিতে।
মনের অজান্তেই আমি ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি হৃদয়ে বড় করুণ হয়ে বাজতে থাকে। নাওরা...! নাওরা...! বোন আমার! কোথায় তুমি? কেন এভাবে একা ফেলে চলে গেলি? অশ্রুভেজা হাতদুটো আসমানের দিকে মেলে ধরে বলি, 'আল্লাহ, মালিক আমার! অনেক নাফরমানি করেছি। আমি তাওবা করছি। আমায় ফিরিয়ে দিও না। প্রভু আমার, আমার বোনকে কবরে শান্তিতে রাখো।
আচমকা মনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে অদ্ভুত এক ভাবনা—আজ যদি নাওরার জায়গায় আমি হতাম। কী হতো আমার পরিণতি?! আমি আর ভাবতে পারি না। অজানা এক আতঙ্কে কেঁপে ওঠে আমার অন্তরাত্মা।
আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!
মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর সুর—অদ্ভুত এক ঝংকার তোলে হৃদয়তন্ত্রীতে। সম্মোহিতের মতো আমিও বলতে থাকি মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে—'হাইয়া আলাল ফালাহ! হাইয়া আলাল ফালাহ! অন্তরের কোথাও যেন দোলা দিয়ে যায় অনাবিল প্রশান্তির হিমেল হাওয়া। শাদা ওড়নাটি গায়ে জড়িয়ে আমি জায়নামাজে দাঁড়াই। মনে হয় জীবনের শেষ সালাত আদায় করছি, যেমনটি করেছিল নাওরা। ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
তারপর...? তারপর সময়ের স্রোত বয়ে চলে—কখনো ধীরে কখনো জোরে। কখনো মিষ্টি মধুর ছন্দে। আমি আর সেই আগের হেনা নেই, আগের মতো আর বলি না, 'পুরো জীবনটাই তো সামনে পড়ে আছে।'
ভোরে উঠে আমি আর বিকেলের আশা করি না।
সন্ধ্যায় ঘনায়মান আঁধার দেখে প্রতীক্ষা করি না নতুন সূর্যোদয়ের।১৮১
প্রিয় বোন, আমি ধারণা করি না যে, তুমি কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবে এবং আগুনের লেলিহান শিখায় পরিতুষ্ট হবে। তোমার কী হলো? তুমি নিজেকে জাহান্নামের প্রতি সন্তুষ্টির শিক্ষা দিচ্ছ। আমি দেখছি যে, তুমি আসমান ও জমিনের অধিপতির অবাধ্যতা করছ। অথচ তিনি যদি চান, তাহলে তোমার আনন্দকে দুঃখে পরিণত করতে পারেন। তোমার সুস্থতাকে অসুস্থতায় এবং সফলতাকে ব্যর্থতায় পরিণত করতে পারেন। তুমি কি এগুলো সহ্য করতে পারবে? না তুমি যেকোনো বিষয়ের কর্তৃত্ব করতে পারো?!
প্রিয় বোন আমার, কিয়ামতের দিন তোমার সাথে তোমার পিতা-মাতা, সাথি-সঙ্গী বা কোনো নিকটাত্মীয় তোমার পাশে দাঁড়াবে না। অচিরেই তুমি অপদস্থতার সাথে একাকী দণ্ডায়মান হবে।
তুমি ডান দিকে তাকিয়ে জান্নাত ও তার সুঘ্রাণ দেখবে এবং বাম দিকে তাকিয়ে দেখবে, জাহান্নামের লেলিহান শিখা এবং তার ধোঁয়া। দেখবে, জাহান্নামের বিচ্ছু ও প্রাণীদের...। সুতরাং তুমি নিজের পথ বেছে নাও, তুমি নিজের পথ বেছে নাও। হয়তো আল্লাহর পথে ফিরে আসা কাফেলার সাথে যুক্ত হও। আর তখন তোমার জন্য সুসংবাদ রয়েছে। জান্নাত ও তার সুঘ্রাণের সুসংবাদ। এমন রবের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যিনি ক্রোধান্বিত না হয়ে সন্তুষ্ট হবেন। দুনিয়ার সম্মান এবং আখিরাতের সফলতার সুসংবাদ গ্রহণ করো। নয়তো সুউচ্চ কণ্ঠে নিজের পরিণামের ঘোষণা শোনো:
يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولًا 'যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমণ্ডল ওলটপালট করা হবে; সেদিন তারা বলবে, “হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসুলের আনুগত্য করতাম!””১৮২
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا 'জালিম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, “হায়, আফসোস! আমি যদি রাসুলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম!”১৮৩
يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا 'হায়, আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! '১৮৪
لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا 'আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়। ১৮৫
তারা আরও চিৎকার করে বলতে থাকবে:
قَالُوا رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شِقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالِينَ 'তারা বলবে, “হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দুর্ভাগ্যের হাতে পরাভূত ছিলাম এবং আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত জাতি।”১৮৬
رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ
'হে আমাদের পালনকর্তা, এ থেকে আমাদের উদ্ধার করো; আমরা যদি পুনরায় তা করি, তবে আমরা গুনাহগার হব। ১৮৭
তখন তাদের কোনো উত্তরদাতা থাকবে না: كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ حَسَرَاتٍ عَلَيْهِمْ وَمَا هُم بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ
'এভাবেই আল্লাহ তাদেরকে দেখাবেন তাদের কৃতকর্ম তাদেরকে অনুতপ্ত করার জন্য। অথচ তারা কস্মিনকালেও আগুন থেকে বের হতে পারবে না। ১৮৮
তুমি কি রোগ বুঝো?! আর ওষুধ কী, তা জানো?! জানো কি মুক্তি কীসে?! রবি বিন খুসাইম তার সাথিদের বলেন, 'রোগ হলো গুনাহ। ওষুধ হলো ইসতিগফার এবং শিফা হলো তাওবা করা এবং পুনরায় গুনাহ না করা।'
( أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ ) বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দকর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ নবি এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদের অপদস্থ করবেন না। তাদের নুর তাদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। তারা বলবে, "হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের নুরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। ১৮৯
হে বোন, তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা বলতে কী বোঝায়?
উমর বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো বান্দা গুনাহ করে তাওবা করবে এবং পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হবে না।'
হাসান বসরি তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবার ব্যাপারে বলেন, 'বান্দা নিজের পেছনের কর্মে লজ্জিত হওয়া। সাথে সাথে ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা।'
তিনি আরও বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো, আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া, মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং সে গুনাহে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করা।'
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'মানুষকে তাওবা থেকে বাধা দেয় দীর্ঘ আশা। আর সত্যিকার তাওবাকারীর আলামত হলো দীর্ঘ অশ্রুপ্রবাহ, নির্জনতা পছন্দ করা এবং নিজের প্রত্যেক বিষয়ে মুহাসাবা বা পর্যালোচনা করা।'
মুহাম্মাদ আল-ওয়াররাক বলেন, 'মৃত্যুর আগে এবং জবান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে নিজের জন্য আশাপ্রদ তাওবা করো। দ্রুত তাওবা করো। কারণ, অনুগত নেককার বান্দার জন্য এটি হলো সঞ্চিত ভান্ডার ও গনিমত।'
প্রত্যেক আদম-সন্তান গুনাহকারী। হে প্রিয় বোন, হ্যাঁ, প্রত্যেক আদম-সন্তানই গুনাহকারী। আমাদের মাঝে কে আছে কখনো গুনাহ করেনি? আর কার শুধু নেকই আছে? যদি আপনি নেককার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার মন্দও আছে।
বোন, গুনাহ করাটা আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা, রাসুল বলেছেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১৯০
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বা দোষের ওপর দোষ হলো, সব সময় গুনাহে লিপ্ত থাকা। এই মহান আহ্বান সম্পর্কে চিন্তা করুন, যা পরম করুণাময় দয়ালু সত্তার পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি আপনাকে ডাকছেন এবং সবাইকে ডাকছেন। তাঁর রহমত ও জান্নাতের দিকে সবাইকে আহ্বান করছেন:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা তৈরি করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য। ১৯১
الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রর্দশন করে। বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '১৯২
কিন্তু এরা কি গুনাহ থেকে মুক্ত ছিলেন? না, না; কেউ নিষ্পাপ নন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
‘তারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোনো মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের ওপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তা-ই করতে থাকে না। ১৯৩
হ্যাঁ, বোন, গুনাহে অটল থাকা হলো নিজের জন্য ধ্বংস। এটি ব্যর্থতা এবং অবসন্নতার কারণ। কিন্তু প্রকৃত বান্দা-বান্দি ভুল করলে নিজেদের ভুলের ওপর অটল থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أُولَئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتُ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ
'তাদেরই জন্য প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবণ, যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!'১৯৪
قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
'তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কী হয়েছে।'১৯৫
هُذَا بَيَانُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ
'এই হলো মানুষের জন্য বর্ণনা। আর যারা ভয় করে তাদের জন্য উপদেশবাণী। '১৯৬
প্রিয় বোন, হ্যাঁ, আমাদের ভুল নফস আমাদের গুনাহে নিমজ্জিত করে। কিন্তু আমাদের মাঝে রয়েছে নফসে লাওয়ামা, যা গুনাহে লিপ্ত হলে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে। সুতরাং গুনাহে বারবার লিপ্ত হওয়াও একটি গুনাহ। একের পর এক গুনাহের মজলিশে বসাও একটি গুনাহ। গুনাহে বারবার গমন করা, তাতে সন্তুষ্ট হওয়া এবং গুনাহে প্রশান্তি লাভ করা ধ্বংসের আলামত। আর এর মাঝে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো গুনাহের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ বা প্রচার করতে থাকা। এই বিশ্বাস থাকার পরও যে, আরশের ওপর থেকে মহান আল্লাহ তাআলা দেখছেন।
রাসুল ﷺ বলেন : )كُلُّ أُمَّتِي مُعَافِّي إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ( 'গুনাহের কথা প্রকাশকারীরা ব্যতীত আমার উম্মতের সকলকেই ক্ষমা করা হবে।...'১৯৭
প্রিয় বোন, তাওবাকারিণী কে? কে তাওবাকারিণী! সে হলো ভগ্ন হৃদয়ের অধিকারিণী, অনবরত অশ্রু প্রবাহকারিণী, যার রয়েছে জাগ্রত অনুভূতি, অস্থির চিত্তের অধিকারিণী, সত্যবাদিনী। তাওবাকারিনী হলো, বড়াই থেকে মুক্ত, নিজ রবের প্রতি মুখাপেক্ষী। তাওবাকারী নারী হলো সে, যে থাকে ভয় ও আশার মাঝে, মুক্তি ও ধ্বংসের মাঝে। তাওবাকারী নারীর মাঝে সব সময় জ্বলন থাকে, তার হৃদয়ে থাকে ব্যথা, চেহারায় থাকে আফসোস, অশ্রুতে থাকে রহস্য। তাওবাকারী নারীর প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। তাওবাকারী নারী আনুগত্যে স্বাদ পায়, ইবাদতে প্রশান্তি লাভ করে, ইমানে পায় মিষ্টতা এবং এগিয়ে আসার মাঝে স্বাদ পায়। তাওবাকারী নারী এমন মায়ের মতো, যে নিজ সন্তানকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং সে এমন ব্যক্তির মতো, যে সমুদ্রে ডুবে গেছে এবং পরে গভীর সমুদ্র থেকে নিরাপত্তার সৈকতে মুক্তি পেয়েছে। তাওবাকারী নারী হলো সে, যে নিজের গর্দানকে নফসের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেছে এবং নিজের হৃদয়কে গুনাহের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করেছে। আর যে তার আত্মাকে মুক্ত করেছে নোংরা চরিত্র থেকে এবং নিজের নফসকে বের করে এনেছে অপরাধের সমুদ্র থেকে।
التَّوْبَةُ হলো تَابَ يَتُوْبُ -এর মাসদার বা উৎসমূল। এর অর্থ হলো ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। তাওবা হলো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে গুনাহ পরিত্যাগ করা। এটি ওজরখাহির সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি। প্রিয় বোন, ওজরখাহি তিন প্রকার : হয়তো ওজরখাহিকারী বলবে, 'আমি করিনি।' বা বলবে, 'আমি এই কারণে করেছি।' অথবা বলবে, 'আমি করেছি এবং অপরাধ করেছি। আমি পূর্ণরূপে ছেড়ে দিয়েছি, ফিরে এসেছি এবং প্রত্যাবর্তন করেছি।' এ ছাড়া আর চতুর্থ কোনো পথ নেই। আর তাওবা হলো সর্বশেষ প্রকারটি।
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ 'হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। '১৯৮
মানুষের দুটি প্রকার: আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ 'যারা এহেন কাজে থেকে তাওবা না করে, তারাই জালিম। '১৯৯
প্রিয় বোন, আল্লাহ তাআলা নিজ বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও জালিম এই দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোনো প্রকারের কথা উল্লেখ করেননি। যারা তাওবা করেনি, তাদের জন্য জালিম শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আর তার চেয়ে বড় জালিম কেউ নেই। কেননা, সে নিজের রব সম্পর্কে জানে না এবং রবের ব্যাপারে তার করণীয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। সে অবগত নয় নিজের দোষ ও নিজের কর্মের বিপদ সম্পর্কে।
সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুল ﷺ বলেন: وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي اليَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
'আল্লাহর শপথ, আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে ৭০ বারের অধিক ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবা করি।'২০০
যাঁর অতীত ও ভবিষ্যতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, তিনি দৈনিক ৭০ বার তাওবা করতেন।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি প্রতিদিন ১০০ বার আল্লাহর কাছে তাওবা করতেন।২০১ আর তাঁর সাহাবিগণ গুনতেন যে, তিনি একই বৈঠকে দাঁড়ানোর পূর্বে ১০০ বার এই দুআ পড়তেন: رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ، إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ 'হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী দয়ালু। '২০২ )إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ( 'যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়।'২০৩ এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুল এমন কোনো সালাত আদায় করেননি, যাতে এই দুআ পাঠ করেননি: سُبْحَانَكَ اللهُمَّ رَبَّنَا، وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي 'আমাদের রব, হে আল্লাহ, আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা করছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।'
হে বোন, তাওবা হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত লোকদের পথ ছেড়ে দেওয়া। গুনাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের পরেই কেবল তাওবা কবুল হবে। গুনাহ সম্পর্কে জানতে হবে এবং তা স্বীকার করতে হবে। সাথে সাথে দুনিয়া ও আখিরাতের মন্দ পরিণাম থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে মুক্তি প্রার্থনা করতে হবে।
চলো, আমরা সাইয়িদুল ইসতিগফারে বলা রাসুল -এর বাণী শুনি : اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
'হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আর আমি আপনার গোলাম। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের সকল অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার প্রতি আপনার অবতারিত সকল নিয়ামত আমি স্বীকার করছি। আর আমি নিজের কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার মতো আর কেউ নেই।'২০৪
তাওবা যখন উল্লেখিত তিনটি জিনিসের ওপর নির্ভর করে, তখন এই তিনটিকে তাওবার জন্য শর্ত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর অনুশোচনা: এটি ছাড়া তাওবা হয় না। যে নিজের মন্দের ব্যাপারে অনুতপ্ত হয় না, সে মূলত নিজের গুনাহের ব্যাপারে সন্তুষ্ট এবং বারবার গুনাহ করতে অভ্যস্ত।
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল বলেছেন : النَّدَمُ تَوْبَةُ অনুতাপই তাওবা।'২০৫ আর পরিত্যাগ করা বা ছেড়ে দেওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গুনাহ পরিত্যাগ ছাড়া কোনো তাওবা নেই।
প্রিয় বোন, আর সংকল্প হলো তাওবার সত্যতার দলিল। আর তাওবার পূর্ণতা হলো নিজের ওজর পেশ করা। প্রিয় বোন, তাওবার পূর্ণতা হলো ওজর পেশ করা। নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং ভগ্নতা পেশ করার মাধ্যমে ওজরখাহি করা।
আমার হৃদয়ের গহিন থেকে বলছি, আমার হৃদয়ের গহিন থেকে বলছি :
(হে রব) আপনার ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে আমি আপনার নাফরমানি করিনি এবং আপনার শানে অবজ্ঞাবশতও করিনি।
না আমি আপনার আনুগত্য অস্বীকার করে করেছি, আর না আপনার প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে নাফরমানি করেছি।
কিন্তু শয়তান, নফস ও প্রবৃত্তির প্ররোচনায় আমি আপনার নাফরমানি করছি।
আপনার অনুগ্রহ, ক্ষমা এবং প্রশস্ত সহনশীলতার স্বাদ আমাদের আস্বাদন করান।
জবানের ভাষায়:
হে আমার ইলাহ, আমাকে শাস্তি দেবেন না। কারণ, আপনার আশা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।
যখন আমি অনুতপ্ত হয়ে সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করি, তখন তার মাঝে নিজের কত পদস্খলন দেখি।
মানুষ আমার ব্যাপারে ভালো ধারণা করে, কিন্তু আমি দুনিয়ার সৌন্দর্যে মত্ত হয়ে আছি।
অথচ আমার সামনে রয়েছে কঠিন হিসাব, যা আমার সবকিছু স্বীকার করে দেবে।
যদি আপনি ক্ষমা করেন, তাহলে আপনার ক্ষমা এবং আমার সুধারণা সম্বল। আর আপনি তো আমার ওপর অনুগ্রহ ও নিয়ামতদানকারী।

খাঁটি তাওবার আলামত:
প্রিয় বোন, হ্যাঁ, খাঁটি তাওবার কিছু নিদর্শন রয়েছে, যার মাধ্যমে তা চেনা যায়।
প্রথমত, তাওবাকারী তার তাওবার পর আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকবে।
দ্বিতীয়ত, সব সময় ভয় তার সঙ্গী হবে।
চোখের পলক পরিমাণ সময়ের জন্যও নিজেকে সে নিরাপদ মনে করবে না। তার মাঝে সব সময় ভয় থাকবে, যতক্ষণ না সে মৃত্যুর সময় ফেরেশতার এই বাণী শ্রবণ করবে:
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ 'তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোনো।'২০৬
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسَكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ 'ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে, যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে তোমরা যা দাবি করো। '২০৭
نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ 'এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। '২০৮
এই সময় তার ভয় ও উৎকণ্ঠা দূর হয়ে যাবে।
মকবুল ও সহিহ তাওবার আরেকটি আলামত হলো, নিজের অপরাধ ও গুনাহের পরিমাণ অনুযায়ী হৃদয় লজ্জা, ভয় ও অনুশোচনায় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
যার হৃদয় দুনিয়াতে নিজের কর্মের ভয় ও অনুশোচনায় টুকরো টুকরো না হবে, তার হৃদয় আখিরাতে টুকরো টুকরো হবে। যখন সব সত্য উদ্ভাসিত হয়ে যাবে, সে আনুগত্যকারীদের প্রতিদান ও অবাধ্যদের শাস্তি দেখবে, তখন তার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। আর এটি হয়তো দুনিয়াতে হবে, নয়তো আখিরাতে হবে।
উমর বিন জার বলেন, 'সব চিন্তাই দূর হয়ে যায়, কিন্তু গুনাহ থেকে তাওবাকারীর চিন্তা দূর হয় না। আর খাঁটি তাওবার একটি আলামত হলো হৃদয়ের বিশেষ ভগ্নতা, যা অন্য কোনো জিনিসের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে না। তার ভগ্নতা হৃদয়কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নেবে এবং তাকে নিজ রবের সামনে হীন, তুচ্ছ ও বিনয়ী হিসেবে পেশ করবে।
আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দার এই বিনয়, তুচ্ছতা, নতি স্বীকার করা ও হৃদয়ের ভগ্নতা খুবই পছন্দনীয়। আল্লাহর সামনে বান্দা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং নিজেকে তাঁর সামনে সঁপে দেওয়ার চেয়ে তাঁর কাছে প্রিয় কোনো জিনিস নেই। এই অবস্থায় বান্দার এই কথা আল্লাহর কাছে কতই না প্রিয়: আপনার সম্মান ও আমার অসম্মান, আপনার শক্তি ও আমার দুর্বলতার মাধ্যমে প্রার্থনা করছি। আপনার অমুখাপেক্ষিতা ও আমার মুখাপেক্ষিতার মাধ্যমে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। এই আমার মিথ্যা ও ভুলত্রুটি আপনার সামনে। আমি ছাড়া আপনার অনেক বান্দা-বান্দি আছে। আর আপনি ছাড়া আমার কোনো রব নেই। আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। আমি আপনার কাছে মিসকিনের মতো চাচ্ছি। আপনার নিকট দুআ করছি ভীত-সন্ত্রস্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মতো।
আমি এমন ব্যক্তির মতো প্রার্থনা করছি, যার গর্দান আপনার জন্য নত হয়েছে, যার নাক আপনার তরে লুটিয়ে পড়েছে, যার চক্ষু আপনার জন্য অশ্রু বর্ষণ করছে এবং যার হৃদয় আপনার জন্য বিগলিত হয়েছে।
সুতরাং এগুলো হলো মকবুল তাওবার নিদর্শন। যে নিজ হৃদয়ে এমন ভাব না দেখবে, সে যেন নিজের তাওবার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় এবং নিজের হিসাব পর্যবেক্ষণ করে। মুখের তাওবা অতি সহজ। মুখের তাওবা অনেক সহজ। সত্যবাদীগণ সবচেয়ে কঠিন মনে করেন খালিস নিয়তে তাওবাকে। সত্যবাদীগণ সবচেয়ে কঠিন মনে করেন খালিস নিয়তে তাওবাকে।
শাকিক বলখি বলেন: তাওবার আলামত হলো, অতীতের ব্যাপারে ক্রন্দন করা, গুনাহে নিমজ্জিত হওয়ার ভয় করা, অসৎ বন্ধুদের ছেড়ে দেওয়া এবং সৎ লোকদের সংশ্রব গ্রহণ করা।
হে আল্লাহ আমাদেরকে তাওবাকারী ও পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করুন। যাদের কোনো ভয় নেই এবং নেই কোনো দুশ্চিন্তা।
গুনাহ মোচনকারী, তাওবা কবুলকারী সত্তার আহ্বান শোনো এবং এ ব্যাপারে ফিকির করো:
(أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ) বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ 'বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।'২০৯
لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'২১০
وَأَنِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ
'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আজাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।'২১১
وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
'তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ উত্তম বিষয়ের অনুসরণ করো তোমাদের কাছে অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আজাব আসার পূর্বে।'২১২
أَن تَقُولَ نَفْسُ يَا حَسْرَنَا عَلَى مَا فَرَّطتُ فِي جَنبِ اللَّهِ وَإِن كُنتُ لَمِنَ السَّاخِرِينَ
'যাতে কেউ না বলে, "হায়, হায়! আল্লাহ সকাশে আমি কর্তব্যে অবহেলা করেছি এবং আমি ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”২১৩
أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ اللَّهَ هَدَانِي لَكُنتُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
'অথবা না বলে, “আল্লাহ যদি আমাকে পথপ্রদর্শন করতেন, তবে অবশ্যই আমি পরহেজগারদের একজন হতাম।”২১৪
أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى الْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِي كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ
'অথবা আজাব প্রত্যক্ষ করার সময় না বলে, "যদি কোনোরূপ একবার ফিরে যেতে পারি, তবে আমি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে যাব।”২১৫
بَلَى قَدْ جَاءَتْكَ آيَاتِي فَكَذَّبْتَ بِهَا وَاسْتَكْبَرْتَ وَكُنتَ مِنَ الْكَافِرِينَ
'হ্যাঁ, তোমার কাছে আমার নির্দেশ এসেছিল; অতঃপর তুমি তাকে মিথ্যা বলেছিলে, অহংকার করেছিলে এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলে।'২১৬
وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ تَرَى الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ وُجُوهُهُم مُّسْوَدَّةٌ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِرِينَ
যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখ কালো দেখবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নামে নয় কি?'২১৭
وَيُنَجِّي اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
'আর আল্লাহ মুত্তাকিদের তাদের সাফল্যসহ নাজাত দেবেন। তাদেরকে অনিষ্ট স্পর্শ করবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।'২১৮
তুমি কি এই বাণী শুনেছ, বুঝেছ? কে তোমাকে আহ্বান করছেন?
সবচেয়ে প্রিয় ও কোমল নামের অধিকারী সত্তা ডাক দিচ্ছেন তাদের, যারা তাকে ভুলে গেছে, যারা তাঁর ব্যাপারে হঠকারিতা করেছে। তিনি তাদের জন্য নিজ রহমতের দরজা খুলে দিচ্ছেন। তিনি তাদের জন্য নিজ রহমতের দরজা খুলে দিচ্ছেন। তিনি তাদের নিজ রহমত থেকে নিরাশ করেননি।
ওহে আল্লাহর বান্দি, যার ওপর ধারাবাহিকভাবে আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করছেন এবং প্রতিটি নিশ্বাসে রয়েছে তাঁরই অনুগ্রহ। যিনি তোমার অসুস্থতা দূর করেছেন। তোমাকে পাথেয় দিয়ে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছেন। তোমার নিকট দলিল পাঠিয়েছেন, সফরের খরচ দিয়েছেন। তোমাকে সম্বল দিয়েছেন, দিয়েছেন পথের ডাকাতদের দমন করার হাতিয়ার। তোমাকে তিনি দান করেছেন কর্ণ, চক্ষু, হৃদয়। তোমাকে চিনিয়ে দিয়েছেন ভালো ও মন্দ, ক্ষতিকর ও উপকারী বিষয়। তোমার কাছে রাসুল পাঠিয়েছেন, উপদেশ গ্রহণের জন্য দিয়েছেন কিতাব। তিনি দান করেছেন বোধশক্তি ও কর্মশক্তি।
এ ছাড়াও তিনি নিজের সম্মানিত বাহিনী দ্বারা তোমাকে সাহায্য করেছেন, যারা তোমাকে অটল রাখে, পাহারা দেয়, তোমার শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করে এবং তোমার থেকে তাদের সরিয়ে রাখে। তারা চায় যে, তুমি তাদের প্রতি ঝুঁকে না যাও এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব না করো। অর্থাৎ তারা আল্লাহর শত্রু বিতাড়িত শয়তান থেকে তোমাকে দূরে রাখে। তোমাকে শয়তানের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অথচ তুমি তাদের ওপর শয়তানের বিজয় হওয়াটাই কামনা করো।
أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا
'অতএব তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। এটা জালিমদের জন্য খুবই নিকৃষ্ট বদল।'২১৯
ওহে আল্লাহর বান্দি, আল্লাহ তোমাকে তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তোমার কাছে তাঁর কোনো প্রয়োজন আছে এ কারণে নয়। বরং এর মাধ্যমে যাতে তুমি তাঁর আরও অনুগ্রহ লাভ করতে পারো, সে জন্য তিনি তোমাকে আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু তুমি তাঁর নিয়ামতের অকৃজ্ঞতা করেছ এবং তাঁর নিয়ামতের মাধ্যমে তাঁর অসন্তুষ্টিতে সাহায্য গ্রহণ করেছ। তিনি তোমাকে তাঁর স্মরণের ব্যাপারে আদেশ করেছেন। যাতে তিনি তোমাকে তাঁর কৃত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তুমি তাঁকে ভুলে গেছ, তাঁর আদেশাবলিকে ভুলে গেছ। তোমার প্রতি যিনি রহম করেন, তাঁর ব্যাপারে এমন ব্যক্তির প্রতি অভিযোগ করছ, যে তোমার প্রতি দয়া করে না। যে সত্তা তোমার প্রতি জুলুম করছে, তাকে তুমি জালিম ভাবছ না। আর যে তোমার প্রতি শত্রুতা করছে এবং তোমার প্রতি জুলুম করছে, তুমি তাকে ডাকছ। অথচ আল্লাহ তাআলাই তোমাকে সুস্থতা, মুক্তি, সম্পদ ও সম্মান দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। কিন্তু তুমি তাঁর নিয়ামত দিয়ে তাঁর অবাধ্যতায় সহায় গ্রহণ করো।
আল্লাহর বান্দি, দয়াময় আল্লাহ তোমাকে তাঁর দরোজায় ডাকছেন, আর তুমি না তাঁর দরোজায় দণ্ডায়মান হও আর না তাঁর দরোজায় করাঘাত করো।
তিনি তোমার জন্য তাঁর সব দরোজা খুলে দিয়েছেন, কিন্তু তুমি তাতে প্রবেশ করোনি। তিনি তোমার কাছে রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তোমাকে মর্যাদার গৃহের প্রতি আহ্বান করেছেন, কিন্তু তুমি রাসুলের অবাধ্যতা করেছ। তুমি বলেছ, আমি শোনা কোনো বিষয়ের কারণে নিজের দেখা জিনিস পরিত্যাগ করব না। কিন্তু এরপরেও তিনি তোমাকে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ করেননি।
তিনি বলেন, তুমি যখনই আসবে, আমি তোমাকে কবুল করে নেব। যদি তুমি রাতে আসো, আমি তোমাকে গ্রহণ করব। তুমি যদি দিনে আসো, তাহলেও আমি তোমাকে গ্রহণ করব। যদি তুমি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী হও, তাহলে আমি তোমার দিকে এক হাত এগিয়ে যাব। তুমি যদি আমার দিকে এক হাত পরিমাণ এগিয়ে যাও, তাহলে আমি তোমার দিকে এক গজ এগিয়ে যাব। যদি আমার দিকে হেঁটে আসো, তাহলে আমি তোমার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাব। যদি তুমি আমার কাছে পৃথিবীভরা গুনাহ নিয়ে আসো, এরপর আমার সাথে কোনো শিরক করা ছাড়া সাক্ষাৎ করো, তাহলে আমিও তোমার কাছে সমপরিমাণ ক্ষমা নিয়ে আসব। আর এ ক্ষেত্রে আমি কোনো পরোয়া করব না। যদি তোমার গুনাহ আসমানের উচ্চতায় পৌঁছে যায়, এরপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলে তোমার সবকিছু আমি ক্ষমা করে দেবো। এবং এ ক্ষেত্রে কোনো পরোয়া করব না। আমার চেয়ে বেশি দানশীল ও করুণাকারী আর কে আছে? অপরাধের মাধ্যমে বান্দারা আমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আর আমি তাদেরকে তাদের বিছানায় নিরাপদে রাখি।
জিন ও ইনসানকে আমি সৃষ্টি করেছি, কিন্তু ইবাদত করা হয় অন্যের। আমিই রিজিক দান করি, কিন্তু তারা শোকর আদায় করে অন্যের। বান্দাদের দিকে অবতীর্ণ হয় আমার কল্যাণ আর আমার দিকে উত্থিত হয় তাদের অকল্যাণ। আমি তাদের কাছে নিয়ামতের মাধ্যমে প্রিয় হতে চাই, অথচ আমি তাদের থেকে অমুখাপেক্ষী। কিন্তু তারা আমার উপাসনা করে গুনাহের মাধ্যমে। অথচ তারা সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী আমার দিকে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে রক্ষা করুন। তুমি ডাক শোনো, তুমি আল্লাহর ডাক শোনো। তিনি বলেছেন, যে আমার দিকে এগিয়ে আসে, আমি তার সাথে দূর থেকেই সাক্ষাৎ করি। আর যে আমার থেকে বিমুখ, আমি তাকে কাছ থেকে ডাকি। যে আমার জন্য কোনো জিনিস ত্যাগ করে, আমি তাকে তার চেয়ে বেশি দান করি। যে আমার সন্তুষ্টির ইচ্ছা করে, আমি তার ইচ্ছা পূরণ করি। যে আমার শক্তি ও ক্ষমতার ওপর ভরসা করে কাজ করে, আমি তার জন্য লোহাকে বিগলিত করি।
আমার স্মরণকারী, আমার মজলিশে উপবেশনকারী, আমার শোকরকারী, আমার আনুগত্যকারী, আমার অবাধ্যতাকারীকে আমি কখনো নিজ রহমত থেকে নিরাশ করি না। অবাধ্যতাকারীকে আমি কখনো নিজের রহমত থেকে নিরাশ করি না। যদি তারা আমার দিকে ফিরে আসে, তাহলে আমি তাদের প্রিয় সত্তা। যদি তারা আমার দিকে ফিরে আসে, তাহলে আমি তাদের বন্ধু। আমি তাওবাকারীদের ভালোবাসি। পবিত্রদের ভালোবাসি। যদি তারা আমার কাছে তাওবা না করে, তাহলে আমি তাদের ডাক্তার। আমি তাদের বিপদে ফেলে দিই; যাতে তাদের দোষ থেকে মুক্ত করতে পারি। যে আমাকে সকলের ওপর প্রাধান্য দেয়, আমি তাকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দিই। একটি নেক আমার কাছে দশগুণ বৃদ্ধি পায়। এমনকি সাতশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও আরও বহু বহু গুণে তা বৃদ্ধি পায়। আর একটি মন্দ আমার কাছে একটি মন্দ হিসেবেই থাকে। যদি এতে সে লজ্জিত হয় এবং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তার সব পাপই ক্ষমা করে দিই। আর এ ক্ষেত্রে আমি কোনো পরোয়া করি না। আমি সামান্য আমলেরও প্রতিদান দিই এবং বিশাল অপরাধও ক্ষমা করে দিই।
আমার দয়া ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পায়, সহনশীলতা পাকড়াওয়ের ওপর এবং ক্ষমা শাস্তির ওপর প্রাধান্য পায়। আমি নিজ বান্দাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি দয়াশীল। আমি বান্দাদের প্রতি সন্তানের প্রতি মায়ের দয়ার চেয়ে বেশি দয়াশীল। তাওবাকারীদের তাওবা এবং ফিরে আসা লোকদের ফিরে আসায় আনন্দিত হই আমি।...এটি হলো ইহসান, দয়া ও করুণার আনন্দ। বান্দার তাওবার প্রতি আল্লাহর মুখাপেক্ষিতার আনন্দ নয়। (কেননা, আমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আর তিনি কোনো ব্যাপারেই কারও মুখাপেক্ষী নন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন :)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
'হে মানুষ, তোমরাই আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ; তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।'২২০
إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ
'তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের বিলুপ্ত করে এক নতুন সৃষ্টির উদ্ভব করবেন।'২২১
وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزٍ
'এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।'২২২
(আল্লাহ বলেন) হে আমার বান্দারা, তোমরা আমার উপকার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে, আমার উপকার করবে এবং আমার অনিষ্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে, আমার অনিষ্ট করবে। হে আমার বান্দারা, তোমরা দিবা-নিশি ভুল করো। কিন্তু আমি তোমাদের সকল ভুল মাফ করে দিই। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমি ক্ষমা করে দেবো।
হে বোন, এই বিশাল আহ্বানের পর ফিরে আসা লোকদের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাও। নিজের উদাসীনতা থেকে জেগে ওঠো এবং পদস্খলনের মাটি ঝেড়ে ফেলে দাও। তোমার হিম্মতের রশি মজবুত করে নাও। এবং কুরআনের এই আহ্বানে সাড়া দাও:
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ
'হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য করো।'
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
'হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য করো এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তিনি তোমাদের গুনাহ মার্জনা করবেন আর তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন। '২২৩
আরেকজন তাওবাকারী বোনের কাহিনি: এসো, আমরা আরও কতিপয় তাওবাকারী বোনের কাহিনি শুনি।
তাদের একজন বলেন, 'আমার জীবনে দ্বীন ছিল নামমাত্র। যদিও আমি মনে করতাম ইসলাম হলো মহান এক ধর্ম। কিন্তু আমি হলাম তুচ্ছ এক বান্দি। শুধু ফজরের সালাত আদায় করতাম, আর বাকি সময়গুলো নিজের নিয়মতান্ত্রিক কর্মে ব্যস্ত থাকতাম। আমি নিজের কর্মস্থলে সংকীর্ণতা ও বিরক্তি অনুভব করতাম। যদিও এ ক্ষেত্রে আমি ছিলাম শীর্ষ স্থানে। আমি সালাতে এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করলাম। এমনকি একপর্যায়ে একটি রাত আসলো। আমি নববর্ষের সে রাতটি উদযাপন করতে আমার এক বন্ধুর বাসায় গেলাম।'-হে বোন, তার ভ্রষ্টতা নিয়ে চিন্তা করো।
সে বলে, 'আমি জনৈক বন্ধুর বাড়িতে নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়েছিলাম। হইচই ও মিউজিকের বিকট আওয়াজ। আমি একটি আওয়াজ শুনলাম, যা আমার ভেতর কম্পন সৃষ্টি করল এবং আমাকে আন্দোলিত করে তুলল। আমি ফজরের আজান শুনলাম। আল্লাহর ঘোষক আমাকে আহ্বান করছে। সেদিন থেকেই আমি এ ধরনের মেলামেশা থেকে দূরে সরতে লাগলাম এবং এ ধরনের প্রোগ্রাম থেকে হটে এলাম। আমি আল্লাহর কিতাবের দিকে ধাবিত হলাম এবং তা পাঠ করতে শুরু করলাম। আমি তাফসিরের কিতাবগুলোও অধ্যয়ন করতে লাগলাম।
আমি নিজের কক্ষের জানালার কাছে বসে আসমানের দিকে তাকাতাম। এতে আমি সীমাহীন স্বাদ অনুভব করতাম।
নিজের জীবনে আমি একটি জিনিসের অনুপস্থিতি অনুভব করতাম। পরে আমি ইমান পেলাম এবং ইমানে এক ধরনের স্বাদও পেলাম। পেরেশানি যতই হোক ইমানের স্বাদ ভিন্ন।
এবার আমি নিজ অভিজ্ঞতার কথা বলছি :
যখন হৃদয়ের সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার সাথে হয়ে যায়, তখন হৃদয় থেকে উৎকণ্ঠা, সংকীর্ণতা ও পেরেশানি দূর হয়ে যায়। এবং তার স্থানে প্রশান্তি, আরাম, স্থিরতা ও সুখ মিলে।
আমি কর্মক্ষেত্রে ছিলাম সদা অস্থির। আমার মনে হচ্ছিল আমি পাগলের ন্যায় ছুটে চলছি। আমরা চারপাশ মিথ্যা আর নোংরামিতে ভরে গিয়েছিল। পরে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করেছেন।
আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে এনেছেন।' সে বলল, 'বর্তমানে আমি নিজের জীবনে সবচেয়ে প্রিয় অনুভব করি আল্লাহ তাআলাকে। আমি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসি। তাঁর সাথে গোপনে কথা বলি। তাঁকে ডাকি এবং তাঁর কাছেই আমার চাওয়া-পাওয়ার সবকিছু বলি। তারা যে ভালোবাসার কথা বলে, আমি তার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। এবং সে সাগরে ডুবও দিয়েছি। আমি দেখেছি যে, আল্লাহর ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা।'
হ্যাঁ, বোন, হ্যাঁ! যে আল্লাহ তাআলাকে পেয়েছে, সে সবকিছুই পেয়েছে। আর যে আল্লাহকে পায়নি, সে সবকিছুই হারিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ ۚ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
'এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ কুরআন সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়?'২২৪
অন্য এক বোন বলেন, 'আমি নির্লজ্জের মতো নিজের সৌন্দর্যকে পশুদের চোখের সামনে তুলে ধরতাম।
প্রগতি ও স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়েই আমার এই অবস্থা হয়েছিল। আমি ইসলাম থেকে দূরে ছিলাম। কুরআনের অক্ষরগুলো এবং ইসলামের নাম ছাড়া আমি কিছুই জানতাম না। সম্পদ ও মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও আমার ভেতরে সব সময় এক ধরনের শঙ্কা কাজ করত। আমি গ্যাস ও বিদ্যুতের জিনিসগুলোকে ভয় করতাম। আমি ভয় করতাম যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে অবাধ্যতার প্রতিদানে জ্বালিয়ে দেবেন।
আমি মনে মনে বলতাম, আমি আগামীকাল কীভাবে আল্লাহ তাআলার আজাব থেকে রক্ষা পাব?!
কীভাবে আগামীকাল আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা পাব! বোনটি বলেন, 'বিয়ের পর আমি নিজের স্বামীর সাথে ফ্রান্সে গেলাম। হানিমুন করার জন্য।
মুসলিম ছেলে-মেয়েদের অধঃপতনের কথা শোনো!
সে বলছে, 'আমরা একটি গির্জায় গেলাম। যখন গির্জায় প্রবেশের ইচ্ছা করলাম, তখন তারা তাদের স্থানের মর্যাদা রক্ষায় আমার শরীর ঢাকতে বাধ্য করল। আমি মনে মনে বললাম, সুবহানাল্লাহ! তাদের বিকৃত দ্বীনকে তারা এভাবে সম্মান করে! তাহলে আমাদের কী হলো যে, আমরা আমাদের দ্বীনকে সম্মান করি না?! আমি আমার স্বামীকে বললাম, "আমি আল্লাহর নিয়ামতের শোকর আদায়ের উদ্দেশে দুই রাকআত সালাত আদায় করব।” ফলে আমার জন্য বড় একটি পোশাক আনা হলো। আমি সেটি পরিধান করে নিলাম এবং মাথা ঢেকে নিলাম। প্যারিসের বড় একটি মসজিদে প্রবেশ করে আমি সালাত আদায় করলাম। মসজিদ থেকে বের হয়ে যখন আমি গেইটে আমার হিজাব এবং বড় জামাটিও খুলে ফেললাম হঠাৎ ফ্রান্সের এক যুবতি মেয়ে আমার কাছে আসলো। আমি কখনো তাকে ভুলতে পারব না। সে আমাকে হিজাবটি পরিয়ে দিল এবং কোমলতার সাথে আমার হাতটি ধরে রাখল। আমার কাঁধে হাত রেখে নরম সুরে বলল, "কেন হিজাব খুলে ফেলছ? তুমি কি জানো না, আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আদেশ করেছেন?!" আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার কথা শুনছিলাম। আমি তার কাছ থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তারা আমাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিল এবং তার সঙ্গিনীসহ আমাকে শুনতে বাধ্য করল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” সে বলল, “তুমি কি এর অর্থ বুঝো? তুমি কি এর অর্থ বুঝো?” সে আমাকে বলল, “বোন, এগুলো কেবল কিছু বাক্য নয় যে, তা শুধু মুখে উচ্চারণ করা হবে। এগুলো কেবল কিছু বাক্য নয় যে, তা শুধু মুখে উচ্চারণ করা হবে। বরং (এ কালিমা মুখে উচ্চারণের সাথে সাথে তা) সত্যায়ন করা এবং অনুসরণ করাও আবশ্যক। কর্মের মাধ্যমেও এগুলো সত্যায়ন করা আবশ্যক।” এই মেয়েটি আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। তার কথায় আমার হৃদয় আন্দোলিত হয়ে উঠেছে। সে ফিরে যেতে যেতে বলেছিল, "বোন, এই দ্বীনকে সাহায্য করো, এই দ্বীনকে সাহায্য করো। আর বোন, এই দ্বীনের সাহায্য হবে শুধু আদেশাবলির অনুসরণ এবং নিষেধাবলি থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে।"
এই বোন বলে, 'আমি মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি ছিলাম চিন্তামগ্ন। রাতে আমার স্বামী আমাকে এমন পার্টিতে নিয়ে গেলেন, যেখানে নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে পশুর মতো আচরণ করছিল। তারা ছিল প্রায় বিবস্ত্র। পশুরাও তাদের আচরণ থেকে মুক্ত। অন্ধকারে নিমজ্জিত আমার হৃদয় এদিকে আকৃষ্ট হচ্ছিল। তাই আমি বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। আমি দ্রুত আমার দেশ ও বাড়িতে ফিরে আসার ইচ্ছা করলাম। আর এখান থেকেই আমার প্রত্যাবর্তনকারীদের সাথে পথযাত্রা শুরু হয়।'
সে বলে, 'আমি ইতিপূর্বে প্রশান্তি কী জিনিস বুঝতাম না। কিন্তু যখন সালাত ও তিলাওয়াত শুরু করি এবং জাহিলিয়াতকে পরিত্যাগ করি, তখন থেকে প্রশান্তি অনুভব করতে পারি। যদিও এর ফলে আমার স্বামী ও পার্শ্ববর্তীদের হারাতে হয়েছে। তারা সবাই আমাকে অন্ধকারে ধরে রাখতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমি অন্ধকারে ফিরে যেতে রাজি ছিলাম না। আমি চাচ্ছিলাম না যে, আমি অন্ধকারে ফিরে যাব। আমি নিজের জীবনকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে নিলাম। আমার দুআ ও কান্নাকাটির ফলে আল্লাহ তাআলা আমার স্বামীকে হিদায়াত দান করলেন। আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি নিজ নিয়ামতের মাধ্যমে নেককারদের পূর্ণতা দান করেন।
তৃতীয় এক বোনের কথা : 'আমার সঙ্গী আধুনিকতার অধঃপতনে আমাকে ছাড়িয়ে গেল। আমি ছিলাম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। আমি আল্লাহর কালাম হাতে নিয়ে পাতা খুললাম। তখন আমার সামনে এই আয়াতটি ভেসে উঠল :
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
“তোমরা আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসুলের অনুগত হও।”২২৫
আমি তা বন্ধ করলাম। এরপর দ্বিতীয়বার আবার খুললে আমার চোখ পড়ল এই আয়াতের ওপর-
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي
“সে (মুসা) বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন।”২২৬
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
"এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।"২২৭
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
“এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন।”২২৮
يَفْقَهُوا قَوْلِي
"যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।"২২৯
এরপর আমি তা দ্বিতীয়বার বন্ধ করলাম। তারপর তৃতীয়বার আবার খুললাম। এবার আমার দৃষ্টি পড়ল এই আয়াতের ওপর, যা আমাকে চিৎকার করে ডাক দিয়ে বলল:
وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةً لَّا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَن فِي الْقُبُورِ
“আর এ কারণে যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে সন্দেহ নেই এবং এ কারণে যে, কবরে যারা আছে, আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন।”২৩০
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এরপর একটি সাদা জামা নিয়ে তা পরিধান করলাম। অতঃপর আয়নার দিকে তাকালাম। তখন আমি নিজের চেহারাকে নুরের দ্বারা বেষ্টিত দেখলাম। আমি অনুভব করলাম যে, আমি আল্লাহর সঙ্গে আছি। আমি অনুভব করলাম আমি আল্লাহর সঙ্গে আছি। আর আল্লাহ তাআলা আমার খুব নিকটে। আর আমি আল্লাহর খুব কাছে। আমি মোবাইল উঠিয়ে আমার সঙ্গীর সাথে যোগাযোগ করলাম এবং তাকে সুসংবাদ দিলাম। আমি বললাম, "আমার জন্য দৃঢ়তার দুআ করো। আমার জন্য দৃঢ়তার দুআ করো। আমি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের সাথে যুক্ত হলাম।” সে বলল, 'আমি অনুভব করলাম যে, আমি আল্লাহর নিকটে আছি।' হ্যাঁ, আল্লাহ কি বলেননি—
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبُ
'আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে। বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে।'২৩১
নিকটে... আমি শুনি এবং উত্তর দিই। কাছের দূরের অর্থাৎ নৈকট্যশীল ও নৈকট্যহারা সকলকে আমি দান করি। রিজিক দিই শত্রু ও প্রিয় সবাইকে।
হাঁপিয়ে ওঠা লোককে তিনি সাহায্য করেন, তৃষ্ণার্ত লোকের তৃষ্ণা নিবারণ করেন এবং একের পর এক অনুগ্রহ করতে থাকেন। তিনি অতি সন্নিকটে; তাঁর দান সর্বদা অবধারিত। তাঁর দরোজা সব সময়ের জন্য খোলা। তিনি সহনশীল, দয়াময় এবং পাপ মোচনকারী। তাঁকে ডাকে সমুদ্রে নিমজ্জিত ব্যক্তি, পথহারা ব্যক্তি। বন্দী তাঁকে ডাকে চার দেয়ালের ভেতর থেকে, যেমন ডাকে বান্দা গুহার ভেতর থেকে। তিনি বান্দার সন্নিকটে।
বোন আমার, মোবাইল ও তাতে কথোপকথনের ভয়াবহতা সম্পর্কে কি তুমি শুনেছ? হ্যাঁ, বোন! এটা অপদস্থতা ও লাঞ্ছনার দ্বার খুলে দেয়।
এক অসহায় বোন বলেন, 'এক যুবক আমার বাড়িতে এসে আমার সাথে যোগাযোগ করল। সে কোমল ভাষায় আমাকে সম্বোধন করল। ফলে আমি তার প্রতি কোমল হয়ে গেলাম। শুরুর দিকে আমি শুধু তার সাথে কথা বলতাম। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনা শুরু হয়ে গেল। ফলে আমি তার কলের অপেক্ষা করতাম। আমাদের মাঝে কথা চলতে থাকল। এরপর এটি ভালোবাসায় রূপান্তরিত হলো। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর কাল্পনিক স্বপ্নে পরিণত হলো। এক রাতে সে আমাকে তার সাথে বের হতে বলল। কারণ, আমরা অচিরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছি এবং বিয়ের ব্যাপারে আমরা একমতও হয়েছি। সে আমাকে বলল, "আমরা মুখোমুখি হয়ে একে অপরকে দেখে নিই। যাতে আমরা প্রস্তাব পাঠানোর পূর্বে নিজেদের দেখে নিতে পারি। যদি আমরা একে অপরের প্রতি মুগ্ধ হই, তাহলে বিয়ে হবে, অন্যথায় কিছু না হওয়ার মতোই।' আমি এটিকে কঠিনভাবে পরিত্যাগ করলাম। কিন্তু সে এতে পীড়াপীড়ি করতে থাকল। সে বলল, 'এটি এমন একটি বিষয়, যা বিয়ের ব্যাপারে আমাদের একমত করে তুলবে।' আমি পেরেশানি ও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম যে, সে কি আমার লজ্জার পোশাক খুলে ফেলতে চায়?! আমার রীতিগুলোকে নষ্ট করে দিতে চায়?! যখনই সে মোবাইল করত, আমাকে দেখার কথা বলত এবং সরাসরি সাক্ষাতের কথা বলত। আর আমি ওজরখাহি করতাম। আমি পেরেশানি ও উৎকণ্ঠায় চলতে থাকলাম। ভয় করছিলাম যে, আমার বাবা বা ভাই বিষয়টি জেনে ফেলবে। আমি সমাজের মানুষের চোখের ভয় করছিলাম। আর এসব কিছুর পূর্বে হলো আল্লাহ তাআলার ভয়। আমি সকালে আমার স্কুলের এক শিক্ষিকার কাছে গেলাম। নিজের পুরো ঘটনা খুলে বললাম তাকে। আমি কাঁদছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, "তুমি কখনো এমন করবে না, তুমি কখনো এমন করবে না। তুমি নিজের মনকে প্রস্তুত করো।" তিনি আমাকে বললেন, "বিষয়টি তোমার হাতে। তুমি এ ধরনের বিষয় থেকে সতর্ক থাকো। এ ধরনের ঘটনা অনেক। সে যেন তোমার ইজ্জত ও মর্যাদা লুটে না নেয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকো। সে তোমাকে কেবল লাঞ্ছনা আর অপদস্থতাই দিয়ে যাবে। তুমি নিজের জান্নাতকে জাহান্নাম দিয়ে পরিবর্তন করার ব্যাপারে সতর্ক থাকো। তুমি চিন্তা করো তো, যদি তুমি তার সাথে একবার, দুবার বা এরপর কয়েকবার ঘোরাফেরা করো, তাহলে ফলাফল কী হবে?!
তুমি ওই খবিস ও নিকৃষ্টদের দ্বারা প্রবঞ্চিত হয়ো না। কারণ, তারা যদিও নিজেদের কোমলতার চাদরে আবৃত করেছে, কিন্তু তাদের হৃদয়গুলো হলো নেকড়ের হৃদয়। তাদের হৃদয়গুলো দ্বীনের ব্যাপারে শূন্য এবং এগুলো চলে নিজেদের প্রবৃত্তি ও শয়তানের পথে। একটি মেয়ের যখন সম্মান ও মর্যাদা চলে যায়, তখন তার আর কী দাম থাকে? আমি তোমাকে আল্লাহর নামে জিজ্ঞেস করছি, আমি তোমাকে আল্লাহর নামে জিজ্ঞেস করছি, যদি তোমার পরিবারের লোকেরা তোমার এই বিষয়টি জানে, তাহলে পরিণতি কী হবে?
কত বাবা তার মেয়েকে হত্যা করে দিয়েছে! কত ভাই তার বোনকে হত্যা করে দিয়েছে! কত মেয়ের বুদ্ধি লোপ পেয়েছে! ফলে সে পাগল হয়ে গেছে। কত মেয়ে নিজেই আত্মহত্যা করেছে! কী কারণ?! মোবাইলে কথোপকথন।' এই বোন বলল, 'আমি কাঁদতে থাকলাম এবং আমার শিক্ষিকাকে বললাম, "আপনি আমাকে গভীর ঘোর থেকে উদ্ধার করলেন এবং বিশাল উদাসীনতা থেকে জাগ্রত করলেন।”' মেয়েটি নিজের হাত আকাশের দিকে তুলে প্রার্থনা করল, 'প্রভু হে, তোমার ক্ষমা, তোমার সহনশীলতা এবং তোমার দয়া প্রার্থনা করছি, হে আরহামুর রাহিমিন। প্রভু হে, আমার তাওবা কবুল করো। এবং আমার ভগ্নতায় জোড়া লাগিয়ে দাও। আমার দুআ কবুল করো।'
হে আল্লাহ, তাকে কবুল করুন। হে আল্লাহ, তাকে আপনার পথের পথযাত্রীদের সাথে কবুল করে নিন। হে বোন, তুমি সরল হয়ো না এবং বোকাও হয়ো না। এই যুবকের কাহিনি শোনো! এই যুবকের কাহিনি শোনো! যে যুবতিদের প্ররোচিত করত। যার রিলেশন ছিল অনেক অনেক। তার যখন বিয়ের সময় হলো, তখন সে তার বন্ধুকে বলল, 'আমার জন্য এমন পরিবারের মেয়ে খুঁজো, যাদের মেয়েরা পবিত্র।' তার বন্ধু তাকে বলল, 'তুমি যাদের চিনতে, তারা কোথায়?!' সে বলল, 'এরা অপবিত্র। এরা নষ্টা। এরা বিয়ের উপযুক্ত নয়। যদি তারা আমার সাথে বের হতে পারে, তাহলে অচিরেই অন্য কারও সাথেও বের হতে পারবে।' সুতরাং তোমরা তাদের প্রতারণার শিকার হয়ো না।
প্রিয় বোন, তোমরা তাদের প্রতারণার শিকার হয়ো না। তোমাদের সমাধান হলো, আল্লাহর পথে ফিরে আসা নারীদের কাফেলায় যুক্ত হয়ে যাওয়া। সবশেষে আমি কিছু বিষয় তোমাদের সামনে তুলে ধরছি, যা তোমাদের তাওবা করার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে এবং তোমাদের তাওবার ওপর অটল থাকতে সহায়তা করবে।
বর্ণিত আছে, সত্যবাদী হলো সে, যে নিজের তাওবার ওপর অটল থাকতে পারে। প্রথমেই নিজের নিয়তকে খাঁটি করো। এরপর নেক আমলে চেষ্টা ও সাধনা অব্যাহত রাখো। গুনাহের নোংরামি ও নষ্টামি উপলব্ধি করো। গুনাহের স্থান থেকে দূরে থাকো এবং গুনাহের উপকরণসমূহ যেমন: অশ্লীল ম্যাগাজিন... ইত্যাদি ধ্বংস করে দাও। সৎ সঙ্গী খুঁজে বের করো এবং সব সময় কুরআন তিলাওয়াত করো। বিশেষ করে ভীতিকর ও হৃদয় বিগলিতকারী আয়াতগুলো তিলাওয়াত করো। আর স্মরণ করো যে, শাস্তি অনেক সময় দেরি করে আসে। সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি তৈরি হয়। সব সময় আল্লাহর জিকির করতে থাকো, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি তৈরি হয়।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাওবাকারী ও পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করুন। যাদের কোনো ভয় নেই এবং যারা চিন্তিতও হবে না। হে আল্লাহ, আমাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। হে আল্লাহ, আমাদের মুত্তাকি ও আপনার একনিষ্ঠ বান্দা বানিয়ে দিন এবং আপনি যা হিফাজত করতে বলেছেন তার হিফাজতকারী বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যে আমাদের এবং তাদের ব্যাপারে মন্দ চিন্তা করছে, তাদেরকে নিজেদের ব্যাপারে ব্যস্ত করে দিন; তাদের মন্দ চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের বোনদের সে সকল নারীর অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সৎপথে চলে। হে আল্লাহ, তাদের সামনে থেকে হিফাজত করুন এবং তাদের পেছন থেকেও হিফাজত করুন। হে আল্লাহ, তাদেরকে তাদের দ্বীনের ব্যাপারে হিফাজত করুন এবং দুনিয়ার ব্যাপারেও হিফাজত করুন।
হে বিশ্ব প্রতিপালক, আমাদের প্রভু, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি আপনি ক্ষমা ও দয়া না করেন, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। হে আল্লাহ, আমাদের সাথে সেরূপ আচরণ করুন, যেরূপ আপনার শান। আমাদের সাথে আমাদের কর্মের উপযোগী আচরণ করবেন না। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
أستغفر الله العظيم وصلى الله عليه وعلى آله وصحبه أجمعين. وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

টিকাঃ
১৭১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
১৭২. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
১৭৩. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
১৭৪. সহিহু মুসলিম: ১০৪৮।
১৭৫. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৮৫।
১৭৬. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৮৫।
১৭৭. সুরা আল-কিয়ামা, ৭৫: ২৯।
১৭৮. সুরা আল-কিয়ামা, ৭৫: ৩০।
১৭৯. সুরা আল-কিয়ামা, ৭৫: ২৯।
১৮০. সুরা আল-কিয়ামা, ৭৫: ৩০।
১৮১. উল্লেখিত ঘটনাটি রুহামা থেকে প্রকাশিত 'স্বাগত তোমায় আলোর ভুবনে' বইতেও এসেছে। তাই নতুনভাবে আর এটি অনুবাদ না করে আমীমুল ইহসান ভাইয়ের অনুবাদটুকুই এখানে যুক্ত করেছি। (অনুবাদক)
১৮২. সুরা আল-আহজাব, ৩৩:৬৬।
১৮৩. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ২৭।
১৮৪. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ২৮।
১৮৫. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ২৯।
১৮৬. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ১০৬।
১৮৭. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ১০৭।
১৮৮. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৬৭।
১৮৯. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬ : ৮।
১৯০. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১৯১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৩।
১৯২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৪।
১৯৩. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৫।
১৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৬।
১৯৫. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৭।
১৯৬. সুরা আলি ইমরান, ৩ : ১৩৮।
১৯৭. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯, সহিহু মুসলিম: ২৯৯০।
১৯৮. সুরা আন-নূর, ২৪ : ৩১।
১৯৯. সুরা আল-হুজুরাত, ৪৯ : ১১।
২০০. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৭।
২০১. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৮৪৭।
২০২. সুনানু আবি দাউদ: ১৫১৬।
২০৩. সুরা আন-নাসর, ১১০: ১।
২০৪. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৬।
২০৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫২।
২০৬. সুরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০।
২০৭. সুরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৩১।
২০৮. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ৩২।
২০৯. সুরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৩।
২১০. সুরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৩।
২১১. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৪।
২১২. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৫।
২১৩. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৬।
২১৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৭।
২১৫. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৮।
২১৬. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ৫৯।
২১৭. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৬০।
২১৮. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৬১।
২১৯. সুরা আল-কাহফ, ১৮: ৫০।
২২০. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৫।
২২১. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৬।
২২২. সুরা ফাতির, ৩৫: ১৭।
২২৩. সুরা আল-আহকাফ, ৪৬: ৩১।
২২৪. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ৫৩।
২২৫. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ৯২।
২২৬. সুরা তহা, ২০: ২৫।
২২৭. সুরা তহা, ২০: ২৬।
২২৮. সুরা তহা, ২০: ২৭।
২২৯. সুরা তহা, ২০ : ২৮।
২৩০. সুরা আল-হাজ, ২২:৭।
২৩১. সুরা আল-বাকারা, ২; ১৮৬।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 সত্য তাওবা

📄 সত্য তাওবা


بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ يٰعِبَادِيَ الَّذِيْنَ اَسْرَفُوْا عَلٰۤى اَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا ؕ اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
বলুন, “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”২৩২
وَ اِنِّىْ لَغَفَّارٌ لِّمَنْ تَابَ وَ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدٰى
'আর যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।' ২৩৩
প্রিয় ভাইয়েরা,
আমরা একটি বরকতময় স্থানে বসে আছি। একটা মুবারক সময়ে মুবারক লোকদের সাথে আছি। আজকের রাতে আলোচ্য বিষয়ের শিরোনাম হলো 'সত্য তাওবা'।
জীবনের উন্নতি ও অবনতি ঘটে তাওবাকে আবর্তন করে। হিদায়াতের পথে তাওবা করে শুরু হয় নতুন জীবন। আর তাওবা না করে গোমরাহির পথে চলতে থাকা জীবনের চরম অবনতি। তাওবা-আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে তাওবা করার তাওফিক দান করেন। তিনি তাওয়াবুর রাহিম-তাওবা কবুলকারী অসীম দয়ালু। তাওবা তাওবাকারীদের জন্য একটি পরীক্ষা, যাতে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীদের পার্থক্য করা যায়। তাওবা নতুন এক জন্ম। তাওবা নতুন এক দিগন্তে পা রাখার নাম। তাওবা নব জীবন। এ জীবন আল্লাহর ছায়ায় আল্লাহর সঙ্গ লাভের অনুভূতিসম্পন্ন। তাওবার ক্ষেত্রে প্রার্থিত হচ্ছে, তাওবা হতে হবে আন্তরিকভাবে। তাওবার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি সৎ থাকতে হবে। তাই আজকের আলোচনার শিরোনাম: সত্য তাওবা।
প্রিয় ভাই, অনেকেই তাওবা করে। কিন্তু তাদের মাঝে কম সংখ্যক মানুষই সত্য তাওবা করে এবং তাওবার ওপর অটল থাকে।
কয়েক দিন থেকে দিন-রাত এ আলোচনা লেখার কাজ করে চলেছি। একটার পর একটা কিতাব উল্টিয়ে গেছি। অনেকের তাওবার ঘটনা পড়ে অতীত ও বর্তমানের কিছু ঘটনা নির্বাচন করেছি। কুরআন, হাদিস ও আসারের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলেছি এ আলোচনাকে। কিছু কবিতা ও নেককারদের বাণী তুলে এনেছি। পুরো আলোচনার মাধ্যমে চেয়েছি তাওবাকারীদের দৃঢ় করতে ও গাফিলদের রিমাইন্ডার দিতে। সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছি যে, প্রত্যেক গুনাহই কিছু না কিছু বিপদ নিয়ে আসে। আর তা দূরীভূত হয় কেবল তাওবার মাধ্যমে। কথাগুলো পুরুষ-নারী সকলের জন্য নিবেদিত।
আমাদের সবাইকে তাওবা করতে হবে। তাই আসো তাওবা করি। আসো, আমরা ইসতিগফারকারীদের কাতারে শামিল হই। তাওবাকারীদের একজন হয়ে যাই। আমরা প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হয়ে যাই। মৃত্যু আসার আগেই আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাই। আমরা তো জানি না, আগামীকাল কোথায় থাকব আমরা। জানি না, আগামীকাল পর্যন্ত কি আমরা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে থাকব, না জাহান্নামের গর্তসমূহের একটিতে হবে আমাদের অবস্থান! যার শুরু ভালো, তার শেষও ভালো। যে আল্লাহর সাথে থাকে, আল্লাহও তার সাথে থাকেন। যে তাওবায় আল্লাহর সাথে সততা বজায় রাখে, আল্লাহও তার সাথে তার সততার প্রতিফল অনুযায়ী আচরণ করেন, তাকে উত্তম অন্তিম পরিণতি দান করেন।
আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু এ রকম:
১. মিথ্যা তাওবা।
২. পেছনে থেকে যাওয়া তিন সাথি।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো কিছু ত্যাগ করে।
৪. ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা।
৫. হে চক্ষুষ্মান, শিক্ষা গ্রহণ করো।

মিথ্যা তাওবা
মানসুর বিন আম্মার বলেন, 'আমার এক বন্ধু ছিল। গুনাহগার ছিল সে। এরপর তাওবা করল। আমি তার বিষয়ে খুব খেয়াল করতাম। তাকে দেখতাম, সে অনেক ইবাদত করছে, কিয়ামুল লাইল ও সিয়াম পালন করছে। তাকে দেখলাম, অনেক ইবাদত ও তাহাজ্জুদে নিজের আমলনামা সাজাচ্ছে। কিন্তু এরপর কয়েকদিন তাকে আর দেখলাম না। তার ব্যাপারে আমার আগ্রহ- ঔৎসুক্য দেখে আমাকে বলা হলো, “সে অসুস্থ।” আমি তার ঘরে এলে ঘর থেকে তার ছোট মেয়ে বেরিয়ে এল। বলল, “কাকে চান?” আমি বললাম, “তোমার বাবাকে বলো, অমুক এসেছেন।” মেয়েটি আমার জন্য অনুমতি নিল। আমি ভেতরে ঢুকে দেখলাম, সে ঘরের মাঝখানে বিছানায় শুয়ে আছে। তার চেহারা কালো হয়ে গেছে, তার দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে, তার ঠোঁটদুটো মোটা হয়ে গেছে।
আমি তার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে বললাম, “হে আমার ভাই, বেশি বেশি ( لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ) পড়ো।” সে চোখ খুলে ঝাঁজালো দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। এরপর অজ্ঞান হয়ে গেল। আমি দ্বিতীয়বার বললাম, “হে আমার ভাই, বেশি বেশি ( لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ) পড়ো।” এরপর তৃতীয়বারও এমনই বললাম। অতঃপর সে চোখ খুলে বলল, "ভাই মানসুর, কালিমা ও আমার মাঝে কিছু একটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কালিমা ও আমার মাঝে কিছু একটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” আমি বলে উঠলাম, ( لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ ) এরপর তাকে বললাম, "ভাই, তাহলে সেসব সালাত, সিয়াম, তাহাজ্জুদ ও কিয়াম?!"
সে বলল, “সেগুলো অন্যকে দেখানোর জন্য। আমার তাওবা মিথ্যা ছিল। আমি বেশি বেশি ইবাদত করতাম, যাতে মানুষ আমার সুনাম করে, আমি সুখ্যাতি পাই। আমি মানুষকে দেখানোর জন্য এসব করতাম। একাকী সময়ে দরজা বন্ধ করে পর্দা টানিয়ে দিয়ে মদ পান করতাম আর রবের অবাধ্যতায় লিপ্ত হতাম। এভাবে বেশ সময় কেটে গেলে আমাকে রোগে পাকড়াও করে আর আমি মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে যাই। আমি তখন আমার এ মেয়েকে বলি, আমাকে একটি কুরআন এনে দাও। কুরআন নিয়ে আমি বললাম, হে আল্লাহ, এ পবিত্র কুরআনে প্রদত্ত আপনার বাণীর কসম করে বলছি, আমাকে সুস্থ করে দিন, আমার বিপদ দূর করে দিন, আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো কোনো গুনাহ করব না। এরপর আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন। আমাকে রোগমুক্ত করলেন। রোগমুক্তির পর আমি আবার আগের মতো কামনাবাসনা চরিতার্থ করতে এবং গুনাহ করতে শুরু করি। শয়তান আমাকে রবের সাথে কৃত ওয়াদার কথা ভুলিয়ে দেয়।
আমি লম্বা একটা সময় ধরে গুনাহের ওপর থাকি। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ি, মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাই। স্ত্রীকে তখন আগের মতো বলি, আমাকে ঘরের মাঝখানে নিয়ে যাও। এরপর কুরআন আনতে বলি। কুরআন থেকে কিছুটা পড়ে কুরআন তুলে ধরে বলি, হে আল্লাহ, এ কুরআনে আপনার যে কথাগুলো আছে, তার পবিত্রতার দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে সুস্থ করে দিন, আমার বিপদ দূর করুন। আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন। আমার অসুস্থতা দূর করলেন। এরপর আবারও আমি আগের মতোই হয়ে যাই। গুনাহ ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। যেন আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের ওয়াদা একেবারে বিস্মৃত হয়ে যাই। এরপর আমি এ রোগে আক্রান্ত হই, যেমনটা তুমি এখন দেখছ। রোগে আক্রান্ত হলে স্ত্রীকে বলি, আমাকে ঘরের মাঝখানে নিয়ে রাখো। যেমন তুমি এখন দেখছ। এরপর আমি কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য মুসহাফ আনতে বলি। কিন্তু কুরআনের সবকটা হরফই আমার জন্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। একটা হরফও পড়তে পারি না। এ থেকে আমি বুঝলাম, আল্লাহ আমার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন। আমি এবার আকাশের দিকে মাথা তুলে দুআ করলাম, হে আল্লাহ, হে আকাশ-জমিনের একচ্ছত্র অধিপতি, হে আল্লাহ, আমাকে রোগমুক্ত করুন। তখন গায়িবি আওয়াজ শুনলাম:
تَتُوْبُ عَنِ الذُّنوبِ إِذَا مَرِضْتَ *** وَتَرْجِعُ لِلذُّنوبِ إِذَا بَرَأْتَ فَكَمْ مِنْ كُرْبَةٍ نَجَاكَ مِنْهَا *** وَكَمْ كَشَفَ البَلَاءَ إِذَا بُلِيْتَ أمَا تَخْشَى بِأَنْ تَأْتِي المَنَايَا *** وَأَنْتَ عَلَى الخَطَايَا قَد لَهَوْتَ “রুগ্ন হলে তুমি তাওবা করো, সুস্থ হলে আবার ফিরে যাও পাপাচারে। কতবার তিনি তোমার দুঃখ দূর করলেন, কত বিপদে তিনি তোমায় রক্ষা করলেন। তুমি কি ভয় করো না? মৃত্যু এসে যাবে, আর তুমি লিপ্ত থাকবে খেল-তামাশায়!'
মানসুর বিন আম্মার বলেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছ থেকে বের হচ্ছি আর আমার দুচোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে। দরজার কাছাকাছি না পৌঁছতেই আমাকে জানানো হলো, সে মৃত্যুবরণ করেছে। তার ও তার কামনাবাসনার মাঝে জীবন-অবসান বাধা হয়ে গেছে।'
হ্যাঁ, হে প্রিয়, তাওবা কেবল মুখের কথা নয়। তাওবা হচ্ছে অন্তরের অনুশোচনা, গুনাহর জীবনে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প। তাওবার শর্ত হচ্ছে, আখিরাতের জীবনের কোনো কিছু সম্মুখীন হওয়ার আগেই তাওবা করতে হবে। যে আখিরাতের আজাব দেখে বা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তাওবা করে, তার তাওবা গ্রহণীয় নয়। তার তাওবার সময় চলে গেছে।
আল্লাহর শপথ, কেউ সত্য তাওবা করলে তাকে রবের দরজা থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। কেউ ইখলাসের সাথে তাওবা করলে, একনিষ্ঠভাবে রবের অভিমুখী হলে জমিন ও আসমানের রবের দরজায় তাকে স্বাগত জানানো হয়।
সত্য তাওবাতেই আসল মর্যাদা। তাই তো আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ 'হে ইমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'২৩৪
কোথায় আজকের যুবকেরা, যারা সত্য তাওবা করবে? কোথায় তোমরা, যারা তাওবা করে রবের পথে অটল থাকবে।
আজ উম্মাহর এ ক্রান্তিলগ্নে তোমাদের প্রয়োজন। আজ যুবকদের প্রয়োজন, যারা দ্বীনের মাধ্যমে শক্তিশালী হবে, নিজেদের আকিদাকে যারা আঁকড়ে ধরবে, নিজেদের সোনালি অতীত নিয়ে যারা গৌরব করবে। আল্লাহর শপথ—যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, যতদিন যুবক সম্প্রদায় কল্যাণের ওপর থাকবে, ততদিন উম্মাহ কল্যাণের ওপর থাকবে। এমনকি শিশুদের মাঝেও কল্যাণ আসবে। আসো, অগ্রসর হও, ভেঙে দাও সব পাপের বলয়।
এক ইবাদতকারিণী রোজাদার তাহাজ্জুদগুজার তরুণী। বয়সে নবীন। অতীতের নয়, এ প্রজন্মের যুবতি ছিল সে। এক যুবক পাণিপ্রার্থী হলো তার। কিন্তু যুবতি তার প্রস্তাবে রাজি হচ্ছিল না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কেন এ অসম্মতি?' যুবতি জানাল, 'আমি সাওম ও কিয়াম ভালোবাসি।' বলা হলো, 'স্বামীর খিদমতও ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার মাধ্যম। তুমি তো স্বামীর কাছে থাকলে কল্যাণ ও ইবাদতের মাঝেই থাকবে।' যুবতি তখন ইসতিখারা করল। তার ইতস্ততা কেটে গেল। বিয়েতে রাজি হলো সে। তবে বলল, 'কিন্তু একটা শর্ত আছে?' শর্তটা কী? শর্তটা কী ছিল? যুবতি বলল, 'স্বামী আমাকে প্রতি সপ্তাহে তিন দিনের নফল রোজা রাখার অনুমতি দেবে।' যুবতি জানত নফল রোজার জন্য স্বামীর অনুমতি আবশ্যক। হবু স্বামীকে বলা হলো, সেও সন্তুষ্টচিত্তে রাজি হলো। স্বামীর রাজি হওয়ায় যুবতিও খুশি হলো। অতঃপর বিয়ে সম্পন্ন হলো। তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর একটি ঘর প্রতিষ্ঠিত হলো।
আল্লাহু আকবার! আমরা তো এমনই ঘর নির্মাণ করতে চাই। আমরা তো চাই এ রকম ঘর নির্মিত হোক, যে ঘরে দিনের বেলা রোজা ও রাতের বেলা তাহাজ্জুদ হবে সকলের প্রার্থিত। এমন ঘর থেকেই দ্বীনদার বের হয়, বের হয় দ্বীনের বীর। জেনে নাও, ইসলামের প্রতিটি বীর মাদরাসাতুল লাইল থেকেই বের হয়। অন্ধকারের ইবাদতের মাঝেই প্রকৃত মুখলিস ও অগ্রসরদের চেনা যায়।
জেনে রাখো, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত দিনের প্রহরে বীর ও সচতুর যোদ্ধা হতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি রাতের প্রহরে বীরত্ব ও বৈরাগ্য শিখবে। এক যুবক সম্পর্কে শুনলাম। চিকন শরীর তার। লজ্জা অনেক। কথা খুব কম বলে। তার একমাত্র আরাধ্য ইসলাম ও দ্বীনের কাজ। বয়স এখনো ২৭ পেরোইনি। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত ও সঠিক কথার যোগ্যতা রয়েছে ঢের। আল্লাহর কাছ থেকে তাওফিকপ্রাপ্ত সে। আর আল্লাহই তো তাওফিকদাতা। এক যুবক বলে, 'দাওয়াতি সফরে অনেকবারই আমি তার সফরের সাথি হয়েছি। আমরা সফরে বেশ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়তাম। সফর বেশ কষ্টের হতো আমাদের জন্য। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও তার মাঝে আশ্চর্য রকম শক্তি লক্ষ করতাম আমরা। রাতের বেলার কিয়ামে অভ্যস্ত ছিল সে। সাধারণ মানুষের কিয়ামুল লাইল নয়। বেশ দীর্ঘ সময়ের কিয়ামুল লাইল। যার কারণে যে কারও পা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ত।'
প্রিয় সুধী, অনেকেই কিয়ামুল লাইল আদায় করে। কিন্তু কারও কিয়ামুল লাইল মিনিটের সমান। আর কারও ঘণ্টার সমান।
তো সে বলতে থাকল, সে চিকন শরীরের যুবক এক রাতেই পাঁচ পারা কুরআন পড়ত তাহাজ্জুদের নামাজে। অবস্থা যা-ই হোক না কেন, পরিস্থিতি যেমন কষ্টকরই হোক না কেন, সে যুবক সর্বদা এ আমল করতে থাকত। প্রতিদিন কিয়ামুল লাইলে পাঁচ পারা কুরআন। আমি তখন তাকে বললাম, 'আস-সাদিকুন এমনই হয়ে থাকেন।'
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ 'তারা রাতের সামান্য অংশই অতিবাহিত করত নিদ্রায়। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।'২৩৫
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ - فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ 'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। কেউই জানে না, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী কী প্রতিদান লুক্কায়িত রয়েছে।'২৩৬
যে উম্মাহ এমন বৈশিষ্ট্য ও গুণের অধিকারী হবে, সে উম্মাহ বিইজনিল্লাহ কখনো পরাজিত-পদানত হবে না। এমন গুণের অধিকারী উম্মাহ পরীক্ষিত হতে পারে। পরীক্ষিত হবে যতদিন না তাদের কাছে আল্লাহর আদেশ ও আনন্দের মূহূর্তটা আসে এবং জালিমরা জেনে নেয় যে, তার কোন মহাসংকটের জায়গায় যাচ্ছে।

পেছনে থেকে যাওয়া তিন সাথি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবার কথা উল্লেখ করেছেন, যেন আমরাও তাদের মতো তাওবা করে সে সকল সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'আর তিনি অনুগ্রহ করলেন ওই তিনজনের প্রতিও যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল২৩৭ তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধীভূত হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই, আশ্রয় কেবল তাঁরই কাছে। এরপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তাঁর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ অতিশয় তাওবা কবুলকারী, বড়ই দয়ালু। ২৩৮
এ আয়াতের পর এ আহ্বানটি শোনো-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।'২৩৯
সহিহ বুখারিতে তাদের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। আমি এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করব।
নবিজি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন সাহাবিদের। ঘটনাটি তাবুক যুদ্ধের। তখন ছিল বেশ গরম। যেতেও হবে বহু দূরে। শত্রুও অনেক এবং বেশ হঠকারীও তারা।
কাব পেছনে থেকে যাওয়া তিনজনের একজন। তিনিই এ হাদিসের বর্ণনাকারী। তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, দৃঢ় ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে আমি সে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকিনি। বরং গড়িমসি করার কারণে এমনটা হয়েছিল। রাসুল তাঁর সাথিদের নিয়ে যখন মদিনা ছেড়ে গেলেন, তখনও আমি মনে মনে বললাম, “আগামীকাল রওয়ানা হয়ে তাদের সাথে গিয়ে মিলিত হব।” কিন্তু আমি পারলাম না তা করতে। আমি ইচ্ছা করছিলাম সফর শুরু করেই তাদের সঙ্গ নিয়ে নেব। কিন্তু হায়, আমি আর তা পারলাম না! ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো।
রাসুল তাবুক থাকাকালীন অন্যদের কাছে আমার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তখন এক লোক বলল, "আল্লাহর রাসুল, তাকে তার ধন-সম্পদ ও আত্মঅহংকার আসতে দেয়নি।” তখন মুআজ বিন জাবাল বলেছিলেন, “তুমি ঠিক বলোনি। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে ভালোই জানি।”
আজ মুসলিমদের মাঝে নিজ ভাইদের মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য চেষ্টা কোথায়?
কাব বলেন, 'আমি যখন জানতে পেলাম, রাসুল তাবুক থেকে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা করেছেন। তখন চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরল। আমি বলার মতো মিথ্যা অজুহাত খুঁজতে শুরু করলাম। আগামীকাল এমন কথা বলব, যাতে রাসুলের রাগ ঠান্ডা হয়ে যায়।
কিন্তু যখন জানতে পারলাম, রাসুল মদিনায় চলে এসেছেন, তখন আমার মন থেকে এ ভ্রান্ত চিন্তা দূর হয়ে গেল। আমি মনে মনে স্থির করলাম, যে কথায় মিথ্যার এতটুকু লেশ আছে, তা দিয়ে আমি কখনো রাসুলের রাগ প্রশমিত করব না। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম সত্য বলার।
জিহাদ থেকে পেছনে থাকা লোকগুলো আসতে থাকল। তারা এটা সেটা বলে ওজর পেশ করতে থাকল, শপথ করতে থাকল। সংখ্যায় তারা ছিল ৮০ জনের অধিক। রাসুল তাদের থেকে তাদের প্রকাশ্য অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। আর তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলেন।”
শোনো, আমার প্রিয় ভাই ও বোন, আল্লাহ প্রকাশ্য অবস্থার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন না। বরং তিনি মানুষের ভেতরের অবস্থা অনুযায়ী তাদের পরিমাপ করেন।
কাব বলেন, 'সবশেষে আমি আসলাম। সালাম দিলে তিনি মুচকি হাসলেন। কিন্তু সে হাসিতে সন্তুষ্টি ছিল না। এগিয়ে গিয়ে আমি তার সামনে বসলাম। তিনি আমাকে বললেন, "কেন তুমি পেছনে থেকে গেলে? তুমি কি বাহন ক্রয় করোনি?"
আমি বললাম, “আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ, আমি যদি দুনিয়ার অন্য কারও সামনে বসতাম এখন। তাহলে কোনো না কোনো আপত্তি পেশ করে তার ক্রোধ থেকে বের হয়ে আসতাম। আর আমি তর্কে বেশ পটুও। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি জানি, আজ যদি আপনার সামনে মিথ্যা বলে আপনাকে সন্তুষ্টও করি। এমন একদিন অচিরেই আসবে, যেদিন আল্লাহ আপনাকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
যদি সত্যটা বলি, তবে অবশ্যই তা আপনাকে অসন্তুষ্ট করবে, কিন্তু আশা করি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন...."
প্রিয় সুধী,
অমুক-তমুকের কাছে মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, মিথ্যা হাসি হেসে তার থেকে নিজের কাজ সারতে পারবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে মিথ্যা বলে কিছুই নিতে পারবে না। তাঁর কাছ থেকে কিছু নিতে হলে, মুক্তি পেতে হলে তোমাকে আল্লাহর সাথে অবশ্যই সততা বজায় রাখতে হবে।
কাব বললেন, "আল্লাহর শপথ, আমার কোনো ওজর ছিল না। আমার পিছিয়ে থাকার সময়টাতে আমি যতটা সচ্ছল ও শক্তিশালী ছিলাম, এর আগে এতটা সচ্ছল ও শক্তিশালী কখনোই ছিলাম না।”
রাসুল বললেন, “সত্য বললে। এখন চলে যাও, যত দিন না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেন।"
আমি উঠে আসলাম। কিছু লোক আমাকে তিরস্কার করল। বলল, “তুমি অন্যদের মতো ওজর দেখাতে পারতে। তোমার জন্য নবিজি-এর ক্ষমাপ্রার্থনাই যথেষ্ট ছিল।"
আমি তাদের বললাম, "আমার মতো কি অন্য কেউ এমনটা করেছে?"
তারা জবাব দিল, “হ্যাঁ। তোমার মতো আরও দুজন এমন বলেছে। মুরারা বিন রবিআ আমিরি আর হিলাল বিন উমাইয়া।"
তাদের কথা শুনে আমি অটল রইলাম আগের মতো। এদিকে রাসুল মুসলিমদের নিষেধ করে দিয়েছেন, যে তিনজন তাবুকে অংশগ্রহণ করেনি, তাদের সাথে যেন কেউ কথা না বলে।
মানুষজন আমাদের পরিত্যাগ করল। আমাদের সাথে তাদের আচরণ পাল্টে গেল। এমনকি মনে হচ্ছিল, এ যেন চেনা-পরিচিত সে পৃথিবী নয়। এতদিনের পরিচিত পৃথিবী অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমাদের ৫০ দিন কেটেছিল।
আমার মতো অন্য দুজন ভেঙে পড়েছিল। ঘরে বসে তারা কাঁদতে থাকল। আমি তাদের চাইতে অধিক যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম। আমি ঘর থেকে বের হয়ে নামাজের জামাআতে শরিক হতাম, বাজারে ঘুরাফেরা করতাম, কেউ আমার সাথে কথা বলত না। নামাজ শেষে রাসুল-কে তাঁর বসার স্থানে এসে সালাম দিতাম। নিজেকে নিজে বলতাম, "আমার সালামের উত্তরে কি রাসুল ঠোঁট নাড়িয়েছেন না নাড়াননি?” আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম। গোপনে আড়চোখে তাকাতাম তাঁর দিকে।
আমার প্রতি অন্যদের এ কঠোরতা অনেক দিন চলল। এমনকি একদিন আমি আমার প্রিয় চাচাতো ভাই আবু কাতাদার বাগানপ্রাচীর টপকে ভেতরে গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু সে আমার সালামের উত্তর দিল না।
আমি তাকে বললাম, “আবু কাতাদা, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি জানো না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি?”
সে চুপ করে থাকল। আমি আবারও একই কথা বললাম আল্লাহর কসম দিয়ে। কিন্তু সে কিছুই বলল না। এরপর আবারও আল্লাহর কসম দিয়ে একই কথা বললাম। তৃতীয়বার সে এতটুকু বলল যে, “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।” তখন আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বাগানপ্রাচীর টপকে সেখান থেকে চলে এলাম আমি।
আরেক দিনের কথা। আমি বাজারে হাঁটছিলাম। তখন শুনলাম, সিরিয়া থেকে আগত খাবারবিক্রেতা এক বেনিয়া আমার সম্পর্কে জানতে চেয়ে লোকদের বলছে, “কেউ কি আমাকে কাব বিন মালিকের সন্ধান দেবে?”
লোকেরা তখন ইশারা করল আমার দিকে। লোকটা আমার কাছে এসে হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল। চিঠিটা গাসসানের রাজার। তাতে লেখা, 'আমার কাছে খবর এসেছে যে, আপনার সঙ্গী আপনার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে এমন লাঞ্ছনা ও অপমানের মাঝে থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা আপনার পাশে আছি।'
চিঠি পড়ে আমি বললাম, “এটা আরেকটা পরীক্ষা।” উনুন খুঁজতে থাকলাম তখন আমি। চিঠিটা উনুনে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হলাম।'
বান্দাকে তার ইমানের পরিমাণ অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি কারও ইমান কঠিন হয়, তবে তার ওপর কঠিন বিপদ আপতিত হয়, কঠিন পরীক্ষায় পরীক্ষিত হয় সে। যদি তার ইমান স্বল্প হয়, তবে তাকে সহজ বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
কাব বলেন,
'আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা আসার অপেক্ষায় এ শান্তি অবস্থায় ৪০ দিন অতিবাহিত করার পর রাসুলের পক্ষ থেকে একজন দূত আসলো। সে আমাকে জানাল, "স্ত্রী থেকে পৃথক হওয়ার জন্য রাসুল আপনাকে আদেশ দিয়েছেন।"
আমি তাকে বললাম, “আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, না অন্য কী করব?”
সে বলল, “না, পৃথক থাকুন। তার নিকটে যাবেন না।”
আমার মতো অন্য দুজনকেও একই আদেশ দেওয়া হলো। আমি স্ত্রীকে ডেকে বললাম, “তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত সেখানে থাকো।"
অন্যদিকে হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী নবিজি-এর কাছে গিয়ে বলল, "আল্লাহর রাসুল, হিলাল বিন উমাইয়া বয়োবৃদ্ধ মানুষ। তার কোনো সেবক নেই। আমি যদি তার সেবা করি, আপনি কি অপছন্দ করবেন তা?” রাসুল জবাব দিলেন, “না, তবে সে যেন তোমার (বিছানায়) নিকটবর্তী না হয়।” হিলালের স্ত্রী বলল, “আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। এ সম্পর্কে তার কোনো অনুভূতি নেই। শুরু থেকে আজও তিনি কেঁদেই যাচ্ছেন।”
এমনই হয় পুণ্যবানদের অবস্থা। তাদের চোখের পানি সর্বদা রাত-দিন ঝরতে থাকে। কাব বলেন,
'আরও দশ রাত পরের কথা। সেদিন ৫০ রাত পূর্ণ হলো আমার শান্তির। সেদিন সকালে ফজরের নামাজ আদায় করে আমাদের একটি ঘরের ছাদে বসে আছি আমি। যে অবস্থার কথা আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। যে পৃথিবীটা প্রশস্ত ছিল অনেক, তা আমার জন্য তখন ছিল সংকীর্ণ। কিন্তু সেদিন সাল' পর্বতের ওপর থেকে একটা উচ্চ আওয়াজ আমার কানে আসে-
"ওহে কাব বিন মালিক, সুসংবাদ গ্রহণ করো!"
সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেলাম আমি। আমার মুক্তিসংবাদ এসে গেছে। আজ আমি মুক্ত হয়েছি। আমাদের তাওবা আল্লাহ গ্রহণ করেছেন বলে রাসুল এই ফজরের নামাজের পর মানুষের সামনে ঘোষণা দিলেন।... মানুষজন আমাকে ও আমার দুই সাথি হিলাল ও মুরারাকে সুসংবাদ জানাতে আসতে লাগল।... আমার কাছে সুসংবাদদাতা যখন এল, তখন আমি নিজের কাপড় খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম, সেগুলো ছাড়া অন্য কিছু আমার মালিকানায় ছিল না তখন। এরপর দুটো কাপড় ধার করে নিয়ে পরে নিলাম আমি।
এরপর আমি রাসুল -এর কাছে আসতে লাগলাম। মানুষজন আমার সাথে দলে দলে সাক্ষাৎ করতে লাগল। তারা আমাকে তাওবা কবুলের অভিনন্দন জানিয়ে বলতে লাগল, “আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করেছেন, তাই তোমাকে সাধুবাদ।” এরপর আমি এসে মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ উঠে এল আমার দিকে। তিনি দ্রুত উঠে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং সাধুবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তালহার সে আচরণ আমি কখনো ভুলব না....
আমি রাসুল -কে সালাম দিলাম। দেখলাম, তাঁর চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। তিনি যখন আনন্দিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা এত সুন্দর হতো যে, মনে হতো এক টুকরো চাঁদ। তিনি আমাকে বললেন, “সুসংবাদ গ্রহণ করো উত্তম এক দিনের, যেদিনটি তোমার জন্মের পর থেকে অতিবাহিত দিনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উত্তম।"
আমি তখন বললাম, “এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে না আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে?"
তিনি বললেন, “বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে।” যখন আমি তাঁর সামনে বসলাম, বললাম, “আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ আমাকে আমার সত্য বলার কারণে মুক্তি দিয়েছেন। আর আমার তাওবার সত্যতা দাবি রাখে যে, যত দিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন মিথ্যা বলব না কখনো।" আল্লাহর কসম, সত্য বলার পরও কোনো মুসলিমকে এতটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি, যতটা যেতে হয়েছে আমাকে।'
হে মুমিন-মুমিনা যারা তাওবা করেছ, তারা চিন্তা করো রাসুলের এ বাণী নিয়ে أَنْتُمْ خَيْرُ يَوْمٍ مَرَّ عَلَيْكَ مُنْذُ وُلِدَتْكَ أُمُّكَ : দিনের, যেদিনটি তোমার জন্মের পর থেকে অতিবাহিত দিনগুলোর মাঝে সবচেয়ে উত্তম।"২৪০ আল্লাহ! কত সুন্দর তাওবা! কত সুন্দর প্রত্যাবর্তন! তাওবা একটা পরীক্ষা। যার মাধ্যমে যে ধ্বংস হওয়ার সে সুস্পষ্টরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, আর যে বেঁচে যাওয়ার সে সুস্পষ্টরূপে বেঁচে যায়।
প্রিয় সুধী,
যারা তাদের তাওবাতে সত্যবাদী, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেছেন, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাদের মুক্ত করেছেন গুনাহ থেকে। শোনো, তোমাদের তাওবার কিছু প্রভাব দেখাই। যারা সত্য তাওবা করে ছিল, তাদের কেউ কেউ কৃত গুনাহের কারণে মৃত্যু পর্যন্ত অনুশোচনা করতে থাকত। মৃত্যুবরণ করলেই তবে তাদের অনুশোচনা তাদের সাথে দাফন হতো। কেউ কেউ মানুষকে ত্যাগ করে একাকী হয়ে বাড়ির ভেতরে কান্নায় ভেঙে পড়ত, চিৎকার করে করে কাঁদতে থাকত। কেউ কেউ আকাঙ্ক্ষা করতেন, যদি তিনি মাটি হতেন, তবে তার গুনাহের কারণে আল্লাহর হিসেবের সম্মুখীন হতে হতো না। কেউ কেউ তার গালে মাটি মাখিয়ে দিতেন, যাতে তিনি লাঞ্ছনা অনুভব করেন এবং আল্লাহ তাআলা তার এ রকম অবস্থা দেখে তার ওপর রহম করেন। কেউ কেউ ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নিজেকে কাবার গিলাফে জড়িয়ে নিতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। তাদের কেউ কেউ মরুভূমিতে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকতেন এ কথার ওপর যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল না করলে তিনি বাড়ি ফিরবেন না, অতঃপর আল্লাহ তার তাওবা কবুল করতেন। তাদের কেউ কেউ আল্লাহর কোনো ঘরে ইতিকাফ করতে থাকতেন, আল্লাহর জিকির করতেন, কুরআন তিলাওয়াত করতেন, রুকু-সিজদায় কান্নায় ভেঙে পড়তেন, তার দুচোখে বেয়ে পড়ত লজ্জার অশ্রু। তাদের কেউ কেউ লজ্জায় কষ্টে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে থাকতেন আর এ অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যেতেন। আবার কেউ কেউ আল্লাহর ভয়ে এক বিকট চিৎকারে মৃত্যুবরণ করতেন। কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদতে এতটা বিলীন হয়ে যেতেন যে, দগ্ধ কাঠের মতো মরে পড়ে থাকতেন।
প্রিয় সুধী,
আমি এতক্ষণ যা উল্লেখ করলাম, এগুলোতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পাপ কাজের কারণে আল্লাহর ভয় মুমিনদের অন্তরকে এতটা আন্দোলিত করত, যেন ভয়ের কারণে তাদের হৃদয় সেখান থেকে খুলে পড়ে যেত। আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে ভয়ের বজ্রপাত কতটা জোরে তাদের অন্তরে আঘাত হানত! তাদের অন্তরে ভয়ের বজ্রপাতে তা থেকে গাফিলতির মেঘ হটে যেত। তাদের অন্তর-আকাশ থেকে ভয়ের বৃষ্টিপাত হতো আর এভাবে তা পরিষ্কার হয়ে যেত। তাদের অন্তর-আকাশে আলো ফুটে উঠত, ফলে তা আলোকিত হতো। কত সুন্দর বলেছেন সে মহান সত্তা-
يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ
'তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।' ২৪১

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো কিছু ত্যাগ করে
পাপাচারে লিপ্ত ছিল সে। আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে পাপাচারকে বর্জন করল। আল্লাহও তাকে এর বিনিময় দিলেন।...সে ছিল গানবাজনায় লিপ্ত, সংগীতের বিশ্রী দুনিয়ায় মত্ত। এ গুনাহের প্রতি তার মোহ যে জিনিসটা বাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত তার সুন্দর ও মিষ্টি কণ্ঠ। যে কণ্ঠে গান গেয়ে মানুষের অনুভূতিতে কম্পন তুলত সে। সে কিন্তু গান হারাম হওয়া ও তার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করত না। তার একমাত্র চিন্তা ছিল কীভাবে খ্যাতি লাভ করা যায়, কীভাবে মানুষের দৃষ্টি কাড়া যায়।
ভ্রান্তিময় খ্যাতির পেছনে ছুটে চলল সে। গানের একটা এলবামও বের করল। এলবামের সিডি পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিলাতে থাকল। একদিন তার এক আত্মীয় এল তার সাক্ষাতে। বহু দূরের একটি শহর থেকে। তার সাথে ছিল একজন নেককার যুবক। দুজনই তার কাছে রাত কাটাল। যুবকটা যখন তার গান ও সুন্দর কণ্ঠের ব্যাপারে জানল, সে বলল,
'হায়, যদি এ সুন্দর সুর শয়তানের বাঁশির পেছনে ব্যয়িত না হয়ে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য উৎসর্গিত হতো! তুমি কি আল্লাহর বাণী শোনোনি—
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا - قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا - قَالَ اذْهَبْ فَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ فَإِنَّ جَهَنَّمَ جَزَاؤُكُمْ جَزَاءً مَوْفُورًا - وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتَكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا - إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا
'স্মরণ করুন, যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, “আদমকে সিজদা করো”, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই তাকে সিজদা করল। সে বলেছিল, "আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে আপনি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন?” সে বলল, “আপনি কি ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন যে, আপনি এ ব্যক্তিকে আমার ওপর সম্মান দিচ্ছেন! আপনি যদি আমাকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তাহলে আমি অল্প কিছু বাদে তার বংশধরদের অবশ্য অবশ্যই আমার কর্তৃত্বাধীনে এনে ফেলব।” তিনি (আল্লাহ) বললেন, “চলে যা, অতঃপর তাদের মধ্যে থেকে যে তোর অনুগামী হবে, জাহান্নামই হবে তাদের সবার প্রতিফল, পূর্ণ প্রতিফল। তুই সত্যচ্যুত কর তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, স্বীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের আক্রমণ কর, তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে শরিক হয়ে যা এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দে। ছলনা ছাড়া শয়তান তাদের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। আমার বান্দাদের ব্যাপার হলো, তাদের ওপর তোর কোনো আধিপত্য চলবে না।" কর্ম সম্পাদনে আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট।'২৪২
এ কথা ও আয়াতগুলো তার অন্তরে দাগ কাটল। তার অন্তর সায় দিল। রাত যখন গভীর হলো, সবাই শুয়ে পড়ল। কিন্তু সময়টা তো তাওবাকারীদের জাগরণের সময়। সাক্ষাৎ করতে আসা সে আত্মীয় বলে, 'রাত ঘনিয়ে এলে আমরা ঘুমিয়ে গেলাম। পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে গেল। তখন হঠাৎ করে কারও কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙল। পাশে তাকিয়ে দেখি, সে গায়ক আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে আছে! নামাজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! আল্লাহর অবাধ্যতায় যে গুনাহ হয়ে গেছে, সে জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছে! আমি এ দৃশ্য দেখে আনন্দিত হলাম। তার লজ্জা ও ক্রন্দনে আনন্দিত হলাম। সে তার অতীত ছেড়ে আল্লাহর কাছে ভবিষ্যতের আশায় অগ্রসর হয়েছে। আল্লাহ তাকে বিনিময় দিলেন। তার ছেড়ে আসা জিনিসটির তুলনায় উত্তম কিছু দান করলেন। সে কুরআনকে ভালোবাসতে শুরু করল। সকাল-সন্ধ্যা কেবল কুরআনের সাথে। রাত-দিন কুরআন তিলাওয়াতে। কুরআনের ইলম ও বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিখতে শুরু করল সে। এমনকি এ বিষয়ে ইমাম ও কারি হয়ে উঠল। শ্রুতিমধুর তিলাওয়াত ও নামাজের খুশুর মাধ্যমে সবার মধ্যমণি হয়ে উঠল সে।'
মহান সে সত্তা, যিনি অবস্থার পরিবর্তন করেন। এ মানুষটা সত্য তাওবা করলেন, আল্লাহও তার সাথে সততা বজায় রাখলেন। সে আল্লাহর জন্য তার প্রিয় জিনিসটি ছেড়ে এল। বিনিময়ে আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করলেন তাকে। কুরআনের চেয়ে উত্তম আর কোনো বিনিময় হতে পারে? কুরআনের চেয়ে সুন্দর আর কোনো বিনিময় হতে পারে?
আল্লাহ! কত সুন্দর তাওবা! কত সুন্দর প্রত্যাবর্তন!
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُبْصِرُونَ
'যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে।' ২৪৩
প্রিয় ভাই ও বোন,
শোনো, ছোট ছোট গুনাহ কয়েকটা কারণে বড় আকার ধারণ করে। ছোট গুনাহ বড় আকার ধারণ করে গুনাহ করে যাওয়া ও গুনাহের ওপর অটল থাকার কারণে। তাই বলা হয়, ‘ছোট গুনাহ অব্যাহতভাবে করতে থাকলে, সেটা আর ছোট থাকে না। আর ইসতিগফার করলে বড় গুনাহও মিটে যায় সহজে।’
মুহাম্মাদ বিন সিরিন বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি কৃত গুনাহের কারণে কাঁদি না। বরং আমি সে গুনাহর কারণে কাঁদি, যেটাকে আমি ছোট মনে করেছিলাম, কিন্তু আল্লাহর কাছে তা (অপরাধ হিসেবে) অনেক বড়!’ কোনো গুনাহকে ছোট মনে করলে সেটা আর ছোট থাকে না। বান্দা যখন কোনো গুনাহকে গুরুতর মনে করে, তখন সে গুনাহ আল্লাহর কাছে ক্ষুদ্র-নগণ্য হয়ে যায়। আর যখন বান্দা কোনো গুনাহকে ক্ষুদ্র মনে করে, আল্লাহর কাছে সে গুনাহ গুরুতর হয়ে যায়।
হাদিসে এসেছে। রাসুল বলেন: إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدُ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ
‘মুমিন তার গুনাহগুলোকে এত বিরাট মনে করে যে, যেন সে একটা পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর সে আশঙ্কা করে যে, পাহাড়টা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মনে করে নাকের ওপর উড়ে আসা একটা মাছি।’২৪৪
আল্লাহ তাআলা তাঁর এক নবিকে বলেন, ‘গুনাহের ক্ষুদ্রত্বের দিকে তাকিয়ো না; বরং আমার বড়ত্বের প্রতি তাকাও। তখন আমার অবাধ্যতা গুরুতর মনে হবে।’
যে গুনাহগার গুনাহে লিপ্ত হয়ে আনন্দিত হয়, গুনাহ নিয়ে বা গুনাহের আলোচনা করে গর্ববোধ করে—তার সে গুনাহ বড় আকার ধারণ করে। তারা মনে করে গুনাহ করতে পারা নিয়ামত। কিন্তু তারা জানে না, গুনাহে লিপ্ত হওয়া গাফিলতি ও দুর্ভাগ্য।
হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, আপনার রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমরা। আমাদের অবস্থা সংশোধন করে দিন। আমাদেরকে নিজেদের ওপর সোপর্দ করবেন না এক মুহূর্তের জন্যও।
যখন গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক গুনাহ গোপন রাখা, তাঁর সহনশীলতা, তাঁর অবকাশকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তখন গুনাহ আর ছোট থাকে না, সে গুনাহ বড় গুরুতর হয়ে যায়। হায়, তারা তো বুঝতে পারে না আল্লাহ কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিয়েছেন, একেবারে ছেড়ে দেননি!
أَفَأَمِنُوا مكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
'তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউই নির্ভয় হতে পারে না।'২৪৫
গুনাহ তখনও গুরুতর হয়ে যায়, যখন গুনাহগার প্রকাশ্যে গুনাহ করতে থাকে। কারণ সে নিজের গুনাহের ওপর আল্লাহর দিয়ে রাখা পর্দাকে লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে গুনাহ করে এবং মানুষকে মন্দের প্রতি উসকে দেয়।
এরচেয়েও বড় কারণ হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি লজ্জা কমে যাওয়া। রাসুল বলেন:
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا المُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ، فَيَقُولَ: يَا فُلَانُ، عَمِلْتُ البَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
“গুনাহের কথা প্রকাশকারীরা ব্যতীত আমার উম্মতের সকলকেই ক্ষমা করা হবে। আর মুজাহারাহ বা গুনাহের কথা প্রকাশ করার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি রাতের বেলায় গুনাহ করার পর আল্লাহ তাআলা তা গোপন রাখেন। অতঃপর যখন সকাল হয়, তখন সে বলে, “হে অমুক, গতরাতে আমি এই এই কাজ করেছি।” অথচ সে গুনাহের কথা প্রকাশ করার পূর্ব পর্যন্ত রাতের বেলায় আল্লাহ তাআলা তা গোপন রেখেছিলেন। আর সকালবেলা আল্লাহর গোপন রাখা বিষয়টি সে নিজেই প্রকাশ করে দিয়েছে।”২৪৬
জনৈক সালাফ বলেন, 'কখনো গুনাহ করবে না। যদি গুনাহ করেও ফেলো, তবুও কাউকে গুনাহর প্রতি উৎসাহ দেবে না। যদি এমনটা করো, তবে তুমি মুনাফিকদের মতো হয়ে যাবে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ
'মুনাফিক পুরুষ আর মুনাফিক নারী সবারই গতিবিধি একরকম, তারা অন্যায় কাজের নির্দেশ দেয় আর সৎ কাজ করতে নিষেধ করে।'২৪৭
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সেসব থেকে মুক্ত রেখেছেন, যেগুলোতে অনেক মানুষ পরীক্ষিত হয়ে আছে। যিনি আমাদেরকে অনেকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন।

ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা
তোমাদের সামনে একটি ঘটনা বর্ণনা করব, যার শিরোনাম হচ্ছে, 'ফাতিনা নই; বরং আমি জালিমা।' ঘটনাটি ছোট করে বলব। এ ঘটনায় আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে।
তার নাম ফাতিনা (প্রলুব্ধকারী)। সে তার নামের মতোই। দ্বীন ছাড়া অন্য সবে শিক্ষিত সে। তার কাছে দ্বীন হচ্ছে একটা সুন্দর মনের অধিকারী হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তুমি ভালো মনের অধিকারী—এবার তুমি যার সাথে ইচ্ছা মিলিত হও। যা ইচ্ছা পরতে পারো। যা ইচ্ছা করতে পারো।
এক রাতে কলেজে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে একত্রিত হলো সে ও তার বান্ধবীরা। যেটা এমন এক অনুষ্ঠান, যার পক্ষে আল্লাহ কিছু নাজিল করেননি অর্থাৎ শরিয়তে এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের কোনো ভিত্তি নেই। যেটা আমরা কাফিরদের থেকে নিয়েছি তাদের সাথে মিল রেখে, তাদের অনুগত হয়ে। অথচ ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে...।’২৪৮ বাকিটা তোমরা জানো।
সুন্দর করে সেজেগুজে সবচেয়ে সুদর্শনা হয়ে আসলো সে।... পুরো জায়গাটা জুড়ে ঘুরতে লাগল। এখান-ওখান থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছিল। সে সবাইকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কি জানো, আমাদের অনুষ্ঠানের মাঝে কমতি কোন জায়গায়?' সবাই নিজের মতো করে উত্তর দিল আর সে 'না।...না...।' বলতে থাকল। একই প্রশ্ন এভাবে জিজ্ঞেস করতেই থাকল। এরপর হেসে নিজেই উত্তর দিল, 'আমাদের এ অনুষ্ঠানের কমতি হচ্ছে সে মহাপুণ্যবতী।' তার কথায় হাসির রোল উঠল। তখন তাদের একজন প্রতিবাদ করে বলল, 'কেন তোমরা এভাবে হাসছ? কেন এ হাসি-ঠাট্টা একজন পুণ্যবতীকে নিয়ে? সে কি আমাদের সহপাঠী নয়? সে কি আমাদের কলেজে আমাদের বন্ধু নয়! কিছু কাল আগেও সে কি আমাদের একজন ছিল না, আমাদের নাইটপার্টির একজন ছিল না? যদিও এখন সে নামাজ ও কুরআন নিয়ে তার ইবাদতগাহে আছে। আখিরাতের তালাশে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। তোমরা কেন তাকে নিয়ে এমন করছ?'
সবাই তখন ফাতিনার প্রশ্নটা ভুলে এ কথায় লেগে গেল। আরেকজন বলে উঠল, 'আমরা তার কাছে গিয়েছিলাম। তাকে ইনভাইট করেছিলাম বার্থডে পার্টির। কিন্তু সে না করে দিল! উল্টো দীর্ঘ একটা লেকচার দিল চরিত্র, দ্বীন, অভ্যাস ও সমাজের ওপর!'
ফাতিনা বলে উঠল, 'পুণ্যবতী উলিয়া, না ছাই! আস্ত একটা গাধি!...আগে যেমন ছিল সেটাই ভালো ছিল। বুদ্ধিমতী ছিল, স্বাধীন ছিল ধর্মের পাগলামি ধরার আগে। এখন আর সে আমাদের মাঝে নেই।'
সুবহানাল্লাহ, দ্বীন কি না পাগলামি হয়ে গেছে!
ফাতিনা তার কথা চালিয়ে গেল, 'হ্যাঁ, সে আস্ত একটা গাধি! দ্রুত গতিতে সে পরিবর্তন হয়ে গেল। চিন্তা বদলে গেল। হুলিয়া পাল্টে গেল। কাপড় বড় হয়ে গেল। এখন তো তাকে বুড়ির মতো লাগছে। যেন সে জানেই না, যত কম কাপড়, তত ভালো। তার চাইতে আশ্চর্য হচ্ছি তার চুল দেখে। চুল নাকি ঢেকে রাখতে হবে একটা কালো বিচ্ছিরি কাপড়ের নিচে! নির্বোধ একটা! জানে না যে, আল্লাহ কেবল মানুষের মন দেখেন। এ ছাড়া যত যা আছে, সবই ঢং।'
আল্লাহু আকবার, পর্দা করা, দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা নাকি ঢং! আল্লাহ তাআলা এসব টিভি-চ্যানেল ধ্বংস করুন। যেগুলোর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে এ প্রজন্মের ওপর।
ফাতিনা বলতে থাকল, 'সে আমাদের ভয় দেখায় জাহান্নামের। বলে, আল্লাহ দেহের উলঙ্গ অংশ জাহান্নামে পোড়াবেন। আমাদের ভয় দেখায় মৃত্যুর নামে ও আরেকটা আছে না হিসাব বলে! তোরা শুনে নে, মূলত সে পুরুষদের কুটচালে আটকা পড়েছে। নারীর স্বাধীনতা ভুলে গেছে। দ্বীনদারি এসব তার ঢং।'
তখন উপস্থিত একজন বলে উঠল, 'সংশয়ের খপ্পরে পড়ে তার এ অবস্থা। সে ভুলে গেছে, পুরুষ-নারী দুজন দুজনার জন্য। কোথায় তার স্বপ্ন হবে তার প্রেমিককে নিয়ে। সে কিনা এসব ভুলভাল করছে। হতভাগী! মুর্খ! এমন ভরা যৌবনে মতিভ্রম ঘটেছে তার। তাকে বাঁচানোর জন্য আমাদের কিছু করা উচিত।'
হায়, এসব হতভাগী বুঝতে পারছে না, তারাই তো হতভাগী! তাদেরই তো বাঁচানো প্রয়োজন আরেকজন এসে।
এরপর বিভিন্নজনের স্বর উঁচু হতে লাগল, অবশ্যই তাকে এ ভুল থেকে বাঁচাতে হবে। ইবাদত করে করে, বেশি বেশি নামাজ পড়ে, অধিক কুরআন তিলাওয়াত করে শেষ করে দিচ্ছে নিজের যৌবনকে। না বাজারে যায়, না কোনো অনুষ্ঠানে যায়, ঘর থেকে পর্যন্ত বেরোয় না....
আহা! দ্বীন নিয়ে এ কেমন বোধ-উপলব্ধি তাদের! দ্বীন তাদের কাছে ফূর্তি ও উদ্ভট স্বাধীনতার নাম। তারা বলছে মৃত্যু কত দেরি। কিন্তু মৃত্যু তো তাদের খুব কাছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে, 'এখন তো ভরা যৌবন! এখন মরব নাকি! মৃত্যু তো বুড়িয়ে গেলে তবেই...।' হায়, এত বড় অজ্ঞতা! এত দীর্ঘ দুরাশা! যার আশা দীর্ঘ হয়, তার আমল মন্দ হয়। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন:
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'আপনি ছেড়ে দিন তাদের। তারা খেয়ে নিক আর ভোগ করে নিক। আর আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে।'২৪৯
অনুষ্ঠান শেষ হলো। কয়েকটা বছর কেটে গেল। ফাতিনা পাস করে বের হলো। সে পুণ্যবতীও পাস করে বের হলো এবং দ্বীনের পথে অটল থাকল।
এরপর ফাতিনার কী হলো? সে পুণ্যবতীরই বা কী হলো? আসো, মনোযোগ দাও, আমরা অন্য জায়গা থেকে গল্পটা শুনতে থাকি।
কোনো এক হাসপাতাল। ৪র্থ তলায়। একটা কক্ষ থেকে ভেসে আসছে রোগিনীর কান্নার আওয়াজ। পুরো কক্ষটা কান্নার আওয়াজে গমগম করছে। এ রোগিনী কয়েকটা মাস ধরেই এখানে আছে। ডাক্তাররা তার অবস্থা দেখে হতাশ এখন। আর তার কান্নার আওয়াজও হাসপাতালের অন্যদের কাছে গা সওয়া হয়ে গেছে। কেউই তার জন্য কোনো কিছু করতে সক্ষম নয়। তার কান্নার আওয়াজ নার্সরাও মানিয়ে নিয়েছে। এদিকে নতুন ডিউটি মহিলা ডাক্তারের কানে এ কান্নার আওয়াজ যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভুলতে পারছে না সে। কিছুতেই মাথা থেকে সরিয়ে দিতে পারছে না সে কান্নার ব্যাপারটা। তার অন্তর দয়া-অনুগ্রহে ভরা। এমনটাই তো হয়ে থাকে ইমানে ভরা অন্তর।
সে কিছু ওষুধ আর ঘুমের বড়ি হাতে নিল। সে ওই রোগিনীর কক্ষে প্রবেশ করল। দরজার চৌকাঠ থেকেই বেডের ওপর শোয়া রোগিনীকে দেখা গেল।
অনেক দিন পরে দেখা হলো। এগিয়ে এসে রোগিনীর নার্ভ চ্যাক করল। দুর্বল, প্রায় বন্ধ। শ্বাসক্রিয়া দেখে নিল একবার। খুব অস্পষ্টভাবে শ্বাস নিচ্ছে। তার পাশে এসে বসল সে। শরীরে যেন ভালো অনুভূতি আসে, এ জন্য কিছু খাইয়ে দিল। একটুপর রোগিনীর জ্ঞান ফিরল। সোজা হয়ে খাটে বসল সে। পুরো ঘর ঘুরে এল তার দৃষ্টি। সবশেষে দৃষ্টি এসে ঠেকল ডাক্তারের চেহারায়। রোগিনী তার দুর্বল দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তার উত্তেজনা বাড়তে লাগল। ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল, 'আমি আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কে? তুমি কে?' ডাক্তার বলল, 'জি মা, আমি ডাক্তার।' রোগিনী বলল, 'আমি তোমার পেশা জানতে চাইনি। তোমার নাম জানতে চাচ্ছি। আল্লাহর দোহাই, তুমি কি উলিয়া নও?' ডাক্তার বিস্ময় নেত্রে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আমি উলিয়া।' এ কথা শুনে হঠাৎ করে রোগিনী তার হাতদুটো বাড়িয়ে উলিয়াকে জড়িয়ে ধরল, তাকে চুমু খেল, কান্নায় ভেঙে পড়ল। এদিকে উলিয়ার বিস্ময় বাড়তেই লাগল। বিস্ময়ে তার চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল। কে এ মহিলা? সে পাগল নাকি? কীভাবে সে আমাকে চিনল? এর আগে কখনো তার সাথে আমার দেখা হয়নি। তার চিকিৎসায় আসিওনি আমি। প্রথমবারের মতো আসলাম তার কাছে। আজই তো প্রথম রাত এ হাসপাতালে আমার। আজই তো এখানে জয়েন হলাম আমি ডিউটি ডাক্তার হিসেবে।
উলিয়া তার মাথা তুলে পেছনে নিয়ে গেল। হতবাক হয়ে রোগিনীর দিকে তাকিয়ে থাকল। সে বুঝতে পারছে না এ মহিলা করছে কী! উলিয়া মুখ খুলল এবার। জানতে চাইল 'আপনি কে খালা? আপনি কীভাবে আমার নাম জানেন? আমরা কি পূর্বপরিচিত?' কান্নায় রুদ্ধস্বরে মহিলাটি জবাব দিল, 'হ্যাঁ, উলিয়া, আমরা এর আগে বহু বহুবার মিলিত হয়েছি। তোমার নাম ও তোমার এ অবয়ব আমার মনের মাঝে অঙ্কিত হয়ে আছে। বিশেষ করে তিন বছর আগ থেকে, যখন আমি এ রোগে আক্রান্ত হই, তখন থেকে তোমার নাম-অবয়ব আমার মনে বিশেষভাবে চেপে আসে। আহ! উলিয়া! আহ! আমি সেই নারী যে তোমার গিবত করত, তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত। আমি ফাতিনা!'
কথাগুলো শুনে উলিয়া রীতিমতো ধাক্কা খেল। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। তার মুখে রা সরল না। একটা কথাও সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বলে উঠল, 'আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ফাতিনা?!'
এ তো অসম্ভব। কারণ ফাতিনা তার নামের মতোই কমবয়স্ক, সুন্দর ও সুশ্রী ছিল। ফাতিনা দুর্বল কণ্ঠে বলল, 'হ্যাঁ, আমিই সে, যাকে একসময় ফাতিনা বলে ডাকা হতো।' এবার উলিয়া ফাতিনাকে টেনে বুকের সাথে লাগিয়ে আলিঙ্গনরত হলো। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। কান্না শিথিল হয়ে আসলে ফাতিনা তাদের বিচ্ছেদের সময় থেকে গত সাত বছরের সব গল্প বলতে শুরু করল।
বলল সে, 'স্নাতক করার পর পড়ালেখা শেষ করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। বিলাসী আর উদ্ধত হয়ে পড়ি প্রতিটা বিষয়ে। আমি কখনো আল্লাহর বিষয়ে সন্দেহ করিনি। বরং আমি এ বিশ্বাস রাখতাম যে, আমাকে ভালো মনের হতে হবে, এটাই যথেষ্ট। অনেক যুবক-যুবতির সাথে পরিচিত হলাম। এরপর চাকরিসূত্রে পরিচিত এক লোকের সাথে পরিচিত হলাম। সে আমাকে ভালোবাসত, আমিও তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। আমাদের জীবনটা ছিল আল্লাহ থেকে দূরে, উদাসীনতায় ভরা। আমাদের বিয়ের কিছু বছর পর আমাদের কোলে এল সুন্দর একটি মেয়ে। আমি তার নাম রাখলাম, সুজান। আমার বান্ধবীর নামে। তুমি তো তাকে চিনতে। এরপর একসময় আমার পেটে ব্যথা অনুভব হতে থাকে। ডাক্তার জানাল এটা আলসার। চিকিৎসা শুরু হলো। কিন্তু ফল হলো না কিছুই। আমার ব্যথা দিনদিন বাড়তেই লাগল। সাথে সাথে বাড়তে লাগল চিন্তা। এ কঠিন সময়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে আমি আরও বেশি বিলাসিতা-বিনোদনে ডুবে গেলাম। আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে আমি তাঁর থেকে পালাতে থাকলাম। আরও বেশি গাফিলতিতে ডুবে গেলাম। আমার অসুস্থতা বাড়তে লাগল। নতুন ডায়াগনসিসে দেখা গেল, পেটের ভেতর টিউমার। এ টিউমার একটা সময় পর ক্যানসারে রূপ নিল। ক্যানসারের প্রকোপ তীব্র হতে শুরু করল। শেষটায় ক্যানসারের তীব্রতায় এ হাসপাতালের বেডে শুয়ে আমি। এখানে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি আর মৃত্যুর অপেক্ষা করছি। গত চার মাসে আমার মেয়েকে দেখিনি একবারও। তার বয়স এখন চার বছর। স্বামী দুই সপ্তাহ ধরে আমাকে দেখতে আসছে না। আমার কাছে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে করতে সে ক্লান্ত। সম্ভবত সে বিরক্ত হয়ে গেছে বা আমাকে অপছন্দ করছে।'
উলিয়া তার ঘটনা শুনে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। এরপর নিজেকে সংযত করে উঠে গেল ফাতিনার দিকে, তাকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। বলতে লাগল, 'চিন্তা করো না ফাতিনা, চিন্তা করো না। আমি জানি তুমি বেশ শক্ত। তুমি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিজেকে হতাশায় সঁপে দিও না। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করবেন। এমনটা কখনো কখনো পরীক্ষা করার জন্যেও হয়ে থাকে। তুমি নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো। সবর করো। ধৈর্যধারণই শ্রেয়।' ফাতিনা শান্ত হলো। নিজের চেহারা ঢেকে নিল দুহাতে। বলতে লাগল, 'আল্লাহ আমায় ক্ষমা করো। হে আল্লাহ, আমার জন্য কেবল তুমিই আছ। তুমি কি আমায় কবুল করে নেবে না? আল্লাহ, আমাকে তোমার রহমতে ঢেকে নাও। আল্লাহ, এ পরীক্ষা থেকে আমায় মুক্তি দাও। এটা তো স্রেফ পরীক্ষা নয়। এটা প্রতিশোধ সেসবের জন্য, যতবার আমি সেসব আয়াত ভুলে গেছি, যা আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছিল। যতবার আমি আমার নেককার প্রেমময় মায়ের কথাকে অবজ্ঞা করেছি। এটা প্রতিশোধ সেসব লোকের পক্ষে, যাদের আমি গোমরাহ করেছি, ফিতনায় ফেলেছি। হে আল্লাহ, কত যুবককেই না আমি গোমরাহ করেছি, বিশৃঙ্খল করেছি!' এরপর ফাতিনা বলতে শুরু করল, 'আমার মৃত্যু আমাকে নিয়ে নাও। আমার ভুল ধারণা আমাকে কত দীর্ঘকাল থেকেই তো ধোঁকা দিয়ে আসছে। আমি ধারণা করতাম মৃত্যু কেবল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরই হয় আর যুবক-যুবতিরা বেঁচে থাকে। আমাকে আমার দীর্ঘ আশা ধোঁকা দিয়েছে।'
يَا غَافِلاً عَنِ العَمَلْ *** وَغَرَّهُ طُولُ الأَمَل المَوْتُ يَأْتِي بَغْتَةً *** وَالقَبْرُ صُنْدُوْقُ العَمَلُ
'হে আমলের ব্যাপারে উদাসীন, যাকে প্রতারিত করছে দীর্ঘ জীবনের আশা। হঠাৎ শিয়রে উপস্থিত হয় মৃত্যু। কবর হচ্ছে আমলের গুদামঘর।'
এরপর ফাতিনা উলিয়াকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, 'উলিয়া, সত্যি কি কবর অন্ধকারময় জায়গা?!' জিজ্ঞেস করে নিজেই আবার উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, সত্যিই তো। আমি কবরে কেবল আমার নিজের ঠান্ডা পচা শরীরটাই নিয়ে যেতে পারব। সেখানে আমার সাথে আমার পরিবারের কেউ বা কোনো প্রিয়জন থাকবে না। আমার সাথে আমার সম্পদ বা কাপড়চোপড় কিছুই থাকবে না। আমার স্বামীও থাকবে না। বন্ধুবান্ধবরাও থাকবে না। হে আল্লাহ, আমি আমার ছোট্ট সুজানকে ছেড়ে যাব! আমি এখনো কম বয়সের! এখনো জীবনটা সেভাবে উপভোগও করিনি!' এরপর সে নিজের চোখদুটো স্পর্শ করে বলল, 'তোমাদের দুজনকে দিয়ে আমি আলো দেখি। কত যুবককে অধঃপতিত করেছি এ দুটো দিয়ে! সত্যিই কি এ দুটোকে পোকামাকড় খেয়ে ফেলবে আর এগুলো মাটি হয়ে যাবে!'
উলিয়া তাকে দুহাতের ঘেরায় নিয়ে নিল। বুকে জড়িয়ে ধরল। এরপর কুরআন তিলাওয়াত করল এবং তার জন্য দুআ করল। তাকে বলল, 'ব্যস, ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে ফাতিনা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর আরোগ্য দান থেকে নিরাশ হয়ো না।' ফাতিনা বলল, 'আমি তোমার কাছে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জানতে চাইছি উলিয়া, আমি যা করেছি, যত অপরাধ করেছি, এরপরও কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?' উলিয়া দৃঢ়কণ্ঠে বলল, 'কেন নয়, আল্লাহর ক্ষমা প্রশস্ত। আল্লাহ তাওয়াবুর রাহিম, তিনি তাওবা কবুলকারী দয়াময়। তুমি শোনোনি, তিনি অপরাধীদের আহ্বান করে বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
'বলুন, "হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”২৫০
ফাতিনা বলল, 'তোমার রবের কসম উলিয়া, এরপর থেকে তুমি আমাকে ফাতিনা বলবে না। আমাকে জালিমা বলে ডাকবে। হ্যাঁ, জালিমা বলবে। আমি কত সময় ধরে আমার নফসের ওপর কতটা মারাত্মকভাবে জুলম করে আসছি! আমি নিজের নফসের ওপর অনেক অত্যাচার করেছি।'
এরপর আশ্চর্য এক ক্ষমতায় সোজা হয়ে বসল ফাতিনা। দুহাত আকাশের দিকে তুলে বিনম্রচিত্তে কেঁপে কেঁপে দুআ করতে লাগল, 'হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন আমি প্রত্যাবর্তন করেছি, আপনার অভিমুখী হয়েছি। এখন আমি আপনার দরজায় আসা এক নগণ্য মানুষ। হে আল্লাহ, যদি আমার তাকদিরে সুস্থতা লেখা থাকে, তবে তা-ই দান করুন। এটা তো আপনার কাছে কঠিন কিছু নয়। ডাক্তার-হাকিমরা অসম্ভব বললেও আপনার কাছে তো সবই সম্ভব। হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি সুস্থ হলে আর কখনো আপনার অবাধ্য হব না। হে আল্লাহ, আর যদি আপনি আমার তাকদিরে তাড়াতাড়ি মৃত্যু লিখে থাকেন, তবে হে দয়াময় সাক্ষী থাকুন আমি আপনার রহমত থেকে নিরাশ হইনি। যতদিন আমার শরীরে প্রাণ থাকবে, ততদিন আমি আপনার ক্ষমা থেকেও নিরাশ হব না। হে দুনিয়া-আখিরাতের দয়াময় আল্লাহ! হে আল্লাহ, আমি আমার নফসের ওপর অনেক জুলুম করেছি, আর গুনাহ কেবল আপনিই ক্ষমা করেন, আপনি তো ক্ষমাশীল দয়াময়।'
জনৈক সালাফ বলেন, 'মালাকুল মাওত যখন কারও কাছে আসে, তখন তাকে জানিয়ে দেয় যে, তোমার কাছে আর কিছু সময় আছে, আর তোমার মৃত্যু এ সময় থেকে বিলম্বিত হবে না। তুমি এরচেয়ে এতটুকু বেশি সময়ও পাবে না। তখন সে ব্যক্তির মাঝে আফসোস প্রকাশ পায়। আল্লাহ তার সবই জানেন। সে তখন প্রার্থনা করে, যদি তাকে এ সময়ের সাথে মিলিয়ে আরও কিছু সময় দেওয়া হয়, তবে সে তার কমতি ও ত্রুটিগুলোকে সংশোধন করবে। কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী এমন সুযোগ কখনোই পায় না।'
এ ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা বলেন: وَحِيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ
'তাদের এবং তাদের বাসনার মাঝে অন্তরাল হয়ে গেছে। '২৫১
এদিকে ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন: مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِينَ
'(আর আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো তোমাদের কারও) মৃত্যু আসার আগেই। অন্যথায় সে বলবে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদাকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। ২৫২
বলা হয়, কিছুকাল বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে, মৃত্যুপথযাত্রী মালাকুল মাওতকে বলে, 'আমাকে একদিন অবকাশ দাও। আমি রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। তাঁর কাছে তাওবা করব এবং নেক আমল করব।' তখন তাকে বলা হয়, 'দিন ফুরিয়ে গেছে। দিন ফুরিয়ে গেছে।' তখন সে বলে, 'আমাকে এক ঘণ্টা সময় দাও।' বলা হয়, 'সময় শেষ হয়ে গেছে।' তার জন্য তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
হায়, কত আফসোসের সে সময়টা! কত লজ্জার! এমন মৃত্যু কতই না আফসোসের!
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ 'আর আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।'২৫৩
وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ ۚ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا 'আর এমন লোকদের তাওবা নিষ্ফল, যারা গুনাহ করতেই থাকে, অতঃপর মৃত্যুর মুখোমুখি হলে বলে, "আমি এখন তাওবা করছি" এবং (তাওবা) তাদের জন্যও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।' ২৫৪
তাহলে তাওবা কাদের জন্য? কাদের তাওবা কবুল হয়?
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
'নিশ্চয় যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে বসে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে, এরাই তারা, যাদের তাওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, রহস্যবিদ। '২৫৫
হে আল্লাহ, আমাদের জীবনের শেষাংশ প্রথমাংশের চেয়ে উত্তম বানিয়ে দিন, আমাদের শেষ আমল উত্তম করে দিন, আপনার সাথে মিলিত হওয়ার দিনকে উত্তমতর দিন বানিয়ে দিন।

হে চক্ষুষ্মান, শিক্ষা গ্রহণ করো
এক তাওবাকারী আমার কাছে লিখে পাঠিয়েছে তার তাওবা ও প্রত্যাবর্তনের ঘটনা সম্পর্কে। চিঠিতে সে বলেছে, 'আমি জানি না, কীভাবে শুরু করব। জানি না, কীভাবে আমার ফিরে আসার গল্পটা বর্ণনা করব। আমি একজন যুবক। এখন আমার বয়স ২৬ বৎসর। ভাইদের মধ্যে আমিই বড়। আমার পরিবার খুবই দরিদ্র। আমার বন্ধুবান্ধবরা নামাজ-রোজার ধার ধারে না। আমাদের পুরো জীবনটা ছিল স্রেফ রাতজাগা, মদ খাওয়া ও নেশা করার মাঝে। সাত বছর চলল এভাবে। একসময় আমরা পুরোনো কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে আরেকটা শুরু করি।
উদাসীনতার নতুন দিগন্তে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমাদের একজন বলল, 'চলো, কাফিরদের দেশে বেড়িয়ে আসি। সেখানে মজ-মাস্তি হবে, ফুর্তি হবে।' আমরা তাই করলাম। হায়, যদি আমরা এমনটা না করতাম!
সেখানে গিয়ে আমরা জিনা, অশ্লীলতা, প্রতারণা-জোচ্চুরি শিখলাম। আমরা সফরে কয়েক মাস ধরে থাকতাম। যখনই টাকা-পয়সা শেষ হয়ে আসত, বাড়িতে যোগাযোগ করে চেয়ে নিতাম। আমরা তখন প্রচণ্ড নেশায় ডুবে ছিলাম। বাড়ির লোকদের জানাতাম, আমরা টাকার অভাবে ফিরে আসতে পারছি না। যখন টাকা-পয়সা পৌঁছত, ভ্রমণের বাকি সময়টায় সেটা দিয়ে চলতাম আমরা। এভাবে প্রতিবার আমাদের কোনো একজন তার বাড়িতে যোগাযোগ করে প্রতারণা করে টাকা আনত।
একবার আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। একটা ক্লাবে গেলাম। সেখানে পশুর মতো মদ, মিউজিক ও নাচানাচি চলত। বরং বলা ভালো, এমন জীবনের চাইতে পশুর জীবনই শ্রেয়। একের পর এক আসতে থাকল মদের গ্লাস। আমরা কথা বলতে থাকলাম। মদ খেতে থাকলাম। আমাদের একজন “আসছি বলে” নিকটে এক জায়গায় গেল। নেশায় বুঁদ ছিল সে। একটু আসছি বলে গেলেও কয়েকটা ঘণ্টা কেটে গেল সে আর এল না। তাই আমরা তার খোঁজে বের হলাম।
খোঁজাখুঁজির পর পেলাম তাকে। তার গাড়ি একটা উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে গেছে। আর সে গাড়ির ভেতরে মরে আছে বেশ শোচনীয় অবস্থায়। আমরা কাঁদলাম। তার মৃত্যুতে বেশ চিন্তা ও উদ্বিগ্নতায় পড়ে গেলাম। এমন অবস্থাতেই বাড়িতে ফিরে এলাম।
এ ঘটনার পর দুমাসও অতিবাহিত হয়নি আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলাম। হে আল্লাহ, কত কঠোরই না ছিল আমাদের অন্তর! আমার কাছে না সম্পদ ছিল, আর না ছিল মাসিক বেতন। আমি প্রতারণা-জোচ্চুরি করে চলতাম। আর এর ভার বহন করতে হতো আমার পরিবারকে। আমার এমন কর্মের ফলে পরিবারের ওপর অনেক ঋণের বোঝা এসে পড়ে। এমনকি আমি ঋণ করে আমার অন্য বন্ধুদের ভ্রমণ-খরচ বহন করতাম, যদিও তারা আমার চেয়ে বেশি টাকা-পয়সার মালিক ছিল, আমার চেয়ে ভালো অবস্থা ছিল তাদের। আমার ধারণা ছিল এটা বন্ধুবান্ধবের ওপর মহানুভবতা।
আমার ওপর ঋণের বড় একটা বোঝা স্তূপ হয়ে যায়। দিনকে দিন আমার অবস্থা বেগতিক হতে থাকে। আমার বন্ধুরা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তারা নিজেরাই ভ্রমণ করতে থাকে আমাকে না জানিয়েই। আর আমি কি না তাদের কারণেই এ ঋণের নিচে দেবে আছি। তখন আমি বুঝলাম, এসব স্রেফ দুধের মাছি। আমি নিজেকে বললাম, "অবশেষে তোমাদের চিনেছি।"
এরপর আমি অন্যদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলি। কিন্তু তাদের অবস্থা আগের বন্ধুদের চাইতে ভালো ছিল না। আমি টাকা-পয়সা একত্র করলাম আর আমার চাচাতো ভাই ও তাদের নিয়ে একটা গ্রুপ করে এশিয়ার সে কুখ্যাত শহরে গেলাম, যে শহর অশ্লীলতা, পাপাচারিতা ও অনৈতিকতার জন্য কুখ্যাত।
সেখানে পৌছার দুদিন পর আমার চাচাতো ভাই বলল, সে তাড়াতাড়ি ফিরে যাবে। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল, "আমি স্বপ্নে দেখেছি এ শহরের লোকেরা আগুনে পুড়ছে। আগুন তাদের ঝলসে দিচ্ছিল আর এদিকে অত্যন্ত ফরসা একজন আমার কাছে এসে বলল, "তাদের মতো পুড়ে যাওয়ার আগেই ফিরে যাও।”
চাচাতো ভাই ও আমি ফিরে এলাম। বাড়িতে বসে থাকলাম টাকা-পয়সা ছাড়া, বন্ধুবান্ধব ছাড়া। চিন্তা-উদ্বিগ্নতা-সংকীর্ণতায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। যে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। একদিন ফেরার সময় এল।
একদিন মা আমার কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে কিছু কথা বললেন। বললেন, "কেন তুই নামাজ পড়িস না! কেন তুই আল্লাহর কাছে ফিরে আসিস না!" এ বলে তিনি একটা ক্যাসেট দিলেন। আমি কসম করলাম তার কাছে যে, ক্যাসেটটা আমি শুনব। এরপর তিনি চলে গেলেন। আমিও ক্যাসেটটা প্লেয়ারে লাগিয়ে শুনতে লাগলাম।
ক্যাসেট বেজে উঠল। মনে হচ্ছিল বক্তা আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে। পাপ ও গুনাহে নিমজ্জিতদের সম্পর্কে বলা হচ্ছিল ক্যাসেটে। বন্ধুত্বের প্রভাব, দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও নষ্টের পথে যাওয়ার বিষয়ে বন্ধুদের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা হলো। আমি কাঁদতে থাকলাম। কাঁদতেই থাকলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম তাওবা করব। ফিরে আসব রবের কাছে।'
চিঠির লেখক বলল, 'হে শাইখ, আপনি কি জানেন ক্যাসেটের সে বক্তা কে ছিল? হ্যাঁ, সে বক্তা ছিলেন আপনি। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি। ক্যাসেটের নাম ছিল : احوال الغارقين "পাপের সাগরে নিমজ্জিত লোকদের কাহিনি।"
এরপর মা আমাকে আরেকটি ক্যাসেট দিল। নাম : قوافل العائدين "সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা।"
আমি তখন দুআ করলাম, 'হে আল্লাহ, আমাকে তেমনই বানিয়ে দিন, যেমন উত্তম তারা বলে তার চেয়ে বেশি। আমাকে তাদের ধারণা থেকে সুন্দর বানিয়ে দিন। তারা যা জানে না, সেসব গুনাহের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন।'
সে বলল, 'শাইখ, এখন আমি আপনাকে চিঠি লিখছি আর খুব করে কাঁদছি। আমার মা পাশে বসে আছেন। তিনিও আমার সাথে কাঁদছেন আর আমার অটলতার জন্য দুআ করছেন। আপনার জন্য দুআ করছেন, যেন মৃত্যু পর্যন্ত আপনি দ্বীনের পথে অটল থাকতে পারেন। আমার তাওবার কারণে তিনি বেশ আনন্দিত। শাইখ, আমার গল্পটা এর চাইতে অনেক বড়। কিন্তু সংক্ষেপে বললাম।
আমার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে আপনাকে বলি। নতুন জীবনের শুরু থেকে আমি উত্তম থেকে উত্তমের দিকে যাত্রা করছি। আলো থেকে আলোর দিকে ছুটছি। আমি একটা চাকরি করছি এখন। এর আগে তো বেশ অলস বসে থাকতাম। এমনকি এর আগে অন্যদের মতো আমার কোনো সার্টিফিকেটও ছিল না। কিন্তু আল্লাহর রহমত, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। আমি আপনাকে আরেকটা খবর জানাতে চাই। খবরটা শুনে আপনি আনন্দিত হবেন অবশ্যই। চাকরির পাশাপাশি আমি আল্লাহর ঘরের মুয়াজ্জিনও এখন। আমি এখন আল্লাহর ঘরগুলোর একটিতে আজান দিয়ে থাকি। প্রতিদিন আমি আজান দিই। প্রতিদিন অনেকবার “আল্লাহু আকবার” বলি। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলি। আপনি আমার অটলতার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার পূর্বের বন্ধুদেরকে হিদায়াত ও পরিশুদ্ধির পথে আহ্বান জানাব। আমি আশা করি আমার ঘটনা থেকে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ শিক্ষা গ্রহণ করবেন।'
প্রিয় ভাই ও বোন,
গুনাহ ও পাপের দরজায় আমরা প্রত্যেকেই প্রবেশ করেছি। এটা সে সাগর, যেটাতে আমরা সবাই কিছু সময়ের জন্য হলেও সাঁতার কেটেছি। গুনাহ থেকে কেবল নিষ্পাপগণই মুক্তি পেয়েছিলেন, আল্লাহ যাঁদের নির্বাচন করেছেন, আল্লাহ যাঁদের নবি ও রাসুল করে পাঠিয়েছেন। আমি ও আপনারা সবাই রাসুল -এর এ বাণীর অন্তর্গত, তিনি বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। ২৫৬
রাসুল আরও বলেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ، وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ، فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ
'সেই সত্তার শপথ-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি তোমরা পাপই না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উঠিয়ে নিতেন এবং এমন এক জাতি নিয়ে আসতেন, যারা গুনাহ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।'২৫৭
ধ্বংস ও মন্দ তাদের জন্য, যারা গুনাহের ওপর অটল থাকে। তাদের দুর্বল ইমানের নফস ও খবিস শয়তানগুলো তাদের কাছে গুনাহকে সুশোভিত করে তোলে। উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেন, 'হে মানুষসকল, যে কোনো গুনাহ করে, সে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নেয়। এরপর আবার গুনাহ করলে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এরপরও যদি গুনাহ করে, তবে সে যেন তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কারণ গুনাহ মানুষকে ঘিরে থাকে। ধ্বংস হলো গুনাহের ওপর অটল থাকার মাঝে।'
প্রিয় ভাই ও বোন,
গুনাহের কারণে লজ্জিত হও, কাঁদতে থাকো। গুনাহকে ছুঁড়ে ফেলে দাও। ফিরে আসো সত্যের পথে। সৎ পথে ফিরে আসা মন্দের ওপর চলা থেকে উত্তম। রবের পথে ফিরে আসলেই তবে জীবন সুন্দর হয়। দ্বীনকে আঁকড়ে ধরলেই তবে জীবন সুন্দর হয়।
অনেকে ইতস্তত বোধ করেন। অনেকে বলেন, আমাদের গুনাহ অনেক। আমাদের গুনাহের খাদ খুবই গভীর। আল্লাহ কি আমাদের মাফ করবেন? আমি তাদের বলি, হ্যাঁ। আরও জোরে বলব, হ্যাঁ, তোমরা তাওবা করো, লজ্জিত হও, ফিরে আসো আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন। বরং আল্লাহ তোমাদের তাওবা ও প্রত্যাবর্তনে আনন্দিত হবেন। আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন। আমার সাথে এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা করে দেখো-
رَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
'আর আমার করুণা ও দয়া প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। '২৫৮
আল্লাহর রহমত প্রশস্ত। আমরা তাঁর সামনে কিছুই নই। তিনি হলেন আরহামুর রাহিমিন। চিন্তা করে দেখো, ভেবে দেখো, আল্লাহ বলছেন:
إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।'২৫৯
হ্যাঁ, আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ, করুণা, মহানুভবতায় সকল গুনাহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। সাইদ বিন মুসাইয়িব আল্লাহর বাণী : فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا )...তবে তিনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল। ২৬০)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'এ আয়াতে সেসব লোকের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা গুনাহ করে তাওবা করে, আবার গুনাহ করে তাওবা করে।' তাওবার দরজা খোলা। আল্লাহর দুহাত সারা দিন-রাত প্রসারিত থাকে, যাতে তিনি দিন ও রাতের গুনাহগারকে ক্ষমা করেন।
ফুজাইল বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন, গুনাহগারদের সুসংবাদ দিন, গুনাহগারদের সুসংবাদ দিন, তারা তাওবা করলে আমি ক্ষমা করে দেবো। আর পুণ্যবানদের সতর্ক করে দিন, আমার ন্যায়দণ্ড তাদের ওপর প্রয়োগ করলে তাদের কেউই শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে না।'
সহিহ সনদে হাদিসে কুদসিতে এসেছে, 'আল্লাহ বলেন : مَنْ عَلِمَ أَنِّي ذُو قُدْرَةٍ عَلَى مَغْفِرَةِ الذُّنُوبِ، غَفَرْتُ لَهُ وَلَا أُبَالِي، مَا لَمْ يُشْرِكْ بِي شَيْئًا 'যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আমি গুনাহ ক্ষমা করতে সক্ষম, পরোয়াহীনভাবে আমি তাকে ক্ষমা করে দিই, যতক্ষণ না সে আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করে।'২৬১
প্রিয় ভাই ও বোন, শোনো, আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন, হিদায়াত ও রহমতের নবি বলেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ 'গুনাহ থেকে তাওবাকারী সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহই নেই। '২৬২
আমাদের সবার মাঝে আল্লাহ বরকত দান করুন। আমরা তাওবা, লজ্জা ও প্রত্যাবর্তনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হব। তোমরা আল্লাহর দিকে দ্রুত অগ্রসর হও সে পরিস্থিতি আসার আগেই, যখন তোমরা বলবে: رَبِّ ارْجِعُونِ "হে আমার রব, আমাকে (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান।”২৬৩ কিন্তু সে অনুরোধে, সে দয়া ভিক্ষায় সাড়া দেওয়া হবে না তখন। এখন তো তাওবার দরজা, রহমানের রহমতের দরজা খোলা। আল্লাহর রহমত প্রশস্ত। এখনই সুযোগ। বরং হে তাওবাকারী, হে তাওবাকারিণী শুনে নাও এসব আয়াত, যেখানে ফেরেশতাগণ তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন আল্লাহর কাছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ - رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ - وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'যারা আরশ বহন করে আছে, আর যারা আছে তার চারপাশে, তারা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করে আর তাঁর প্রতি ইমান পোষণ করে আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আপনার রহমত ও জ্ঞান দিয়ে সবকিছুকে বেষ্টন করে রেখেছেন, কাজেই যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে, তাদের ক্ষমা করুন, আর জাহান্নামের আজাব থেকে তাদের রক্ষা করুন। হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি তাদের আর তাদের পিতৃপুরুষ, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে, তাদেরও চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান যার ওয়াদা আপনি তাদের দিয়েছেন; আপনি মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সমস্ত অনিষ্টতা থেকে তাদের রক্ষা করুন। সেদিন আপনি যাকে সমস্ত অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন, তার ওপর তো দয়াই করবেন। ওটাই হলো বিরাট সাফল্য।”২৬৪
আসো, অগ্রসর হও, দ্রুত এগিয়ে আসো। প্রাণের সতেজতা উন্নত হওয়ার মাঝে। আর তার মুক্তি উচ্চতায়।
আল্লাহর কাছে ফিরে আসো, তাঁর অভিমুখী হও। আল্লাহকে ভয় করো। মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকার জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো। সত্য তাওবা ও তাওবার পরে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
জেনে রাখো, আল্লাহর পথে ইসতিকামাতের চাবিকাঠি হচ্ছে মিহরাব। মসজিদে গমনাগমনই কল্যাণের চাবিকাঠি। রবের পথে চলার জন্য মসজিদে প্রাপ্ত পাথেয়ই উত্তম পাথেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ - رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ
'আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়িম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।' ২৬৫
তাদের ভয়ের প্রতিদান কী?
لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَيَزِيدَهُم مِّن فَضْلِهِ وَاللَّهُ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
'যাতে আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করেন তাদের উত্তম কার্যাবলি অনুসারে আর নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন, কারণ আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে করেন, অপরিমিত রিজিক দান করেন।' ২৬৬
মসজিদ আবাদ করা ইমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।'২৬৭
রাসুল বলেন:
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ وَرَاحَ، أَعَدَّ اللَّهُ لَهُ نُزُلَهُ مِنَ الْجَنَّةِ كُلَّمَا غَدًا أَوْ رَاحَ
'যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় যতবার মসজিদে গমন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে ততবার মেহমানদারির ব্যবস্থা করে রাখেন।'২৬৮
অপর হাদিসে এসেছে, 'আর আল্লাহর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা হচ্ছে মসজিদ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে বাজার।'২৬৯
হাসান বিন আলি বলেন, 'যে নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত করে, সে সাতটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করে: ১. মুহকাম আয়াতের জ্ঞান। ২. উপকারী ভাই। ৩. সুন্দর ইলম। ৪. প্রত্যাশিত রহমত। ৫. হিদায়াতি কথা। ৬. অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকা। ৭. লজ্জায় গুনাহ ত্যাগ করা। ৮. অথবা ভয়ে গুনাহ ত্যাগ করা।
হে আল্লাহ, আপনার দীর্ঘ অবকাশে যারা ধোঁকায় পড়ে আছে, আপনি সেসব বান্দার প্রতি রহম করুন। তাদের আপনি নিজ অনুগ্রহের স্থায়িত্ব দান করুন। আপনার উত্তম দান গ্রহণের প্রতি তাদের হাতকে প্রসারিত করুন। তাদের বিশ্বাস দান করুন যে, তারা সবাই আপনার প্রতি মুখাপেক্ষী সর্বদা। প্রিয় ভাই ও বোন,
তোমরা সবাই আমার সাথে বলো, হে আল্লাহ, যদি লজ্জা আমাদের তাওবার প্রতি ধাবিত করে, তবে আমাদের লজ্জা দান করুন। যদি গুনাহ ত্যাগ করা আমাদের আপনার নিকটবর্তী করে, তবে আমাদের গুনাহ ত্যাগ করার তাওফিক দান করুন। হে আল্লাহ, আপনার তো কত নৈকট্যশীল আছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন আমাদের। আমাদের পাপগুলো মোচন করুন। আমাদের প্রতিষ্ঠিত করুন। আমাদের অন্তরকে হিদায়াত দান করুন। আমাদের মনের হিংসা-বিদ্বেষ ধুয়ে মুছে দিন। আমাদের আপনার রহমত থেকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দেবেন না। আপনি তো তাওবা-কবুলকারী, দয়াময়, মহানুভব, মহা দানশীল, আপনি গুনাহ ক্ষমাকারী, হে তাওবা-কবুলকারী, হে আরহামুর রাহিমিন।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, আপনি যদি আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
أستغفر الله العظيم وصلى الله على محمد وعلى آله وصحبه أجمعين

টিকাঃ
২৩২. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ৫৩।
২৩৩. সুরা ত্বহা, ২০: ৮২।
২৩৪. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১১৯।
২৩৫. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ১৭-১৮।
২৩৬. সুরা আস-সাজদা, ৩২: ১৬-১৭।
২৩৭. তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে। তারা হলেন কাব বিন মালিক, মুরারা বিন রাবিআ ও হিলাল বিন উমাইয়া।
২৩৮. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১১৮।
২৩৯. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১১৮।
২৪০. সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮, সহিহু মুসলিম: ২৭৬৯।
২৪১. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩৭।
২৪২. সুরা আল-ইসরা, ১৭ : ৬১-৬৫।
২৪৩. সুরা আল-আরাফ, ৭: ২০১।
২৪৪. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৮।
২৪৫. সুরা আল-আরাফ, ৭: ৯৯।
২৪৬. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯, সহিহু মুসলিম: ২৯৯০।
২৪৭. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ৬৭।
২৪৮. পুরো হাদিসটি হলো, রাসুল বলেছেন : مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ 'যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' - সুনানু আবি দাউদ: ৪০৩১।
২৪৯. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৩।
২৫০. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
২৫১. সুরা সাবা, ৩৪ : ৫৪।
২৫২. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ১০।
২৫৩. সুরা আন-নাহল, ১৬: ৩৩।
২৫৪. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৮।
২৫৫. সুরা আন-নিসা, ৪: ১৭।
২৫৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
২৫৭. সহিহু মুসলিম: ২৭৪৯।
২৫৮. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৫৬।
২৫৯. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
২৬০. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ২৫।
২৬১. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির : ১১৬১৫, আল-জামি' আস-সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ১/১৩১।
২৬২. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫০।
২৬৩. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৯৯।
২৬৪. সুরা গাফির, ৪০:৭।
২৬৫. সুরা আন-নূর, ২৪ : ৩৬-৩৭।
২৬৬. সুরা আন-নূর, ২৪ : ৩৮।
২৬৭. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১৮।
২৬৮. সহিহুল বুখারি: ৬৬২, সহিহু মুসলিম: ৬৬৯।
২৬৯. দেখুন, সহিহু মুসলিম: ৬৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00