📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 উদাসীনতা

📄 উদাসীনতা


বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রতিটি প্রাণীর জন্যই আল্লাহ তাআলা মৃত্যুকে অবধারিত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলার সত্তা ছাড়া কিছুই বেঁচে থাকবে না। মানুষের সংবিধান হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদের সুশৃঙ্খল জীবনের জন্য প্রেরণ করেছেন রাসুলের আদর্শ। মানুষ সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলে উদাসীনতা তাকে আচ্ছন্ন করে নেয়। আর এই অবস্থায়ই এক সময় তার মৃত্যু এসে যায়। কিন্তু তার এই মৃত্যু হয় সবচেয়ে মন্দ অবস্থায়। যে ব্যক্তি মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন থেকে চলে, তাকে আল্লাহ তাআলা উত্তম অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। আর যে মৃত্যুর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় জিনিসের দিকে ছুটে যায়, তার মৃত্যু হয় সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থায়। আল্লাহর কাছে এ ধরনের মৃত্যু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন ও উদাসীন—এ দুই ব্যক্তির মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

দুনিয়ার ব্যাপারে মানুষের প্রবঞ্চনা
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।'১
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيبًا
'হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।'২
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً - يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল।'৩
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'
প্রিয় ভাই ও বোন, আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
আল্লাহ তাআলা আপনাদের নেক হায়াত দান করুন এবং সত্যের পথে আপনাদের ও আমার পদক্ষেপগুলো অবিচল রাখুন। আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে এবং আপনাদের তাঁর সম্মানিত গৃহে ভাই ভাই হিসেবে মুখোমুখি হয়ে পালঙ্কে বসার তাওফিক দান করেন। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ঐক্যকে সুসংহত করেন এবং আমাদের কাতারগুলোকে একতাবদ্ধ করে দেন। আমাদের দায়িত্বশীলদের সংশোধন করে দেন। আর আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন।
ওহে আল্লাহর বান্দা, আর কতদিন এভাবে উদাসীন থাকবে? অথচ মৃত্যু মানুষের ডান-বাম থেকে ছোঁ মারছে। প্রতিদিনই তো হাসপাতালগুলো কত নর-নারীকে বিদায় জানাচ্ছে। কত শিশু-বৃদ্ধকে বিদায় জানাচ্ছে। কবর তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।
বর্ণনায় আছে, ‘ঈসা-এর নিকট দুনিয়া একজন সুন্দরী বৃদ্ধার আকৃতি ধারণ করে উপস্থিত হয়েছিল। সে সব ধরনের সাজসজ্জা গ্রহণ করে এসেছিল। ঈসা তাকে বললেন, “তুমি বিয়ে করেছ কয়টি?” সে বলল, “অনেক।” ঈসা বললেন, “তারা সবাই কি তোমাকে ছেড়ে মৃত্যুবরণ করেছে না তুমি তাদের ছেড়ে দিয়েছ?” সে বলল, “বরং আমি তাদের সবাইকে হত্যা করে দিয়েছি।” তখন ঈসা বললেন, “ধ্বংস তোমার অবশিষ্ট স্বামীদের জন্য! তাদের কী হলো যে, তোমার অতীত স্বামীদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে না!” হে আমলে উদাসীন ও দীর্ঘ আশায় প্রবঞ্চিত! মৃত্যু হঠাৎ চলে আসবে, আর কবর হলো আমলের ঘর।

উদাসীনতা ভয়ংকর একটি আত্মিক রোগ
আদম-সন্তান যে রোগে আক্রান্ত হয়, তা দুই ধরনের। এক. শারীরিক রোগ, যা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করি। দুই. আত্মিক রোগ, যা হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে নেয়। এটি শারীরিক রোগের চেয়ে বেশি ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক। কারণ, এটি শুধু মৃত্যুর সময়ই প্রকাশিত হয়। আর আত্মিক রোগের ফলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় এবং এর ফলে নিজের দ্বীনদারিও বিনষ্ট হয়। প্রকৃতপক্ষে যার হৃদয় মরে যায়, তার তো দেহও মরে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
'আপনি যখন তাদের দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনাকে মুগ্ধ করে আর তারা যদি কথা বলে, আপনি তাদের কথা শুনেন। ৪
কিন্তু তাদের হৃদয়গুলো শূন্য। বর্তমানে অনেক মানুষই তাদের হৃদয়ের কাঠিন্যের ব্যাপারে অভিযোগ করে। আরে এই কাঠিন্য তো উদাসীনতা, যা অনেকের জীবনকে আচ্ছন্ন করে আছে। এটি ভয়ংকর এক রোগ। এটি হিদায়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়। মানুষ এভাবেই তার উদাসীনতায় বিলাসিতাপূর্ণ জীবনযাপন করতে থাকে। আর এক সময় হঠাৎ তার সামনে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়। যখন তার সামনে ঊর্ধ্ব গগনের বিকট আওয়াজ এসে যায়, তখন সে বলে : رَبِّ ارْجِعُونِ 'হে আমার রব, আমাকে (দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান।"৫ এখন সে নিজের হৃদয়ের চিকিৎসা করতে চায়। এখন সে ডাক্তারের কাছে গমন করতে চায়। সে এখন রোগাক্রান্ত এই হৃদয়ের চিকিৎসা অন্বেষণ করে।
প্রিয় ভাই ও বোন,
আমার কথা শোনো! জনৈক নেককার লোক এক বদকার লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাকে বললেন, 'হে অমুক, তুমি যে অবস্থায় আছ, তুমি কি সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করো?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার এই অবস্থাকে এমন কোনো অবস্থাতে রূপান্তর করার ইচ্ছা রাখো, যে অবস্থায় তুমি মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করো?' সে বলল, 'এ ছাড়া আমার হৃদয়ে আর কী আকাঙ্ক্ষাই বা আছে!' নেককার লোকটি বললেন, 'এই দুনিয়ার পর কি আমল করার মতো কোনো জায়গা আছে?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তুমি আমাকে এই গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, তোমার এই অবস্থায় মৃত্যু আসবে না?' সে বলল, 'না।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি কোনো বুদ্ধিমানকে এই অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট হতে দেখেনি! তুমি নিজেকে প্রশ্ন করো, তুমি যে অবস্থায় আছ, সে অবস্থায় কি তুমি মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করো?' সময় শেষ হয়ে গেছে এবং জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বিদায়ের সময় সন্নিকটে। তুমি কি এ জীবন ত্যাগ করতে এবং অন্য জগতে যেতে প্রস্তুত?
উদাসীনতা হলো এক ভয়ংকর ব্যাধি। কুরআন আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
'হে ইমানদারগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। যারা এ কারণে উদাসীন হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।'৬
মানুষের উদাসীনতার মূল কারণ হলো, দুনিয়া ও দুনিয়ার বিলাসিতায় মত্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:
اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ
'মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন; অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।'৭
مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنْ رَبِّهِمْ مُحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ
'তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে নতুন যে উপদেশই আসে, তারা তা শ্রবণ করে খেলার ছলে।'৮
لاهِيَةً قُلُوبُهُمْ وَأَسَرُّوا النَّجْوَى الَّذِينَ ظَلَمُوا هَلْ هَذَا إِلَّا بَشَرُ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ
'তাদের অন্তর থাকে খেলায় মত্ত; জালিমরা গোপনে পরামর্শ করে, সে তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ; এমতাবস্থায় দেখে শুনে তোমরা তার জাদুর কবলে কেন পড়ো?'৯
উদাসীনতা অনেক জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। উদাসীনতার কারণ হলো দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হওয়া এবং মৃত্যুর কথা ভুলে যাওয়া। আমরা মৃত্যু ও তার যন্ত্রণার কথা ভুলে গেছি। কবর ও তার অন্ধকারের কথা ভুলে গেছি। ভুলে গেছি মাটি ও তার চাপের কথা—ভুলে গেছি কবরের প্রশ্ন ও তার কঠোরতার কথা। আমরা হাশরের ময়দান ও তার পেরেশানির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে গেছি। আমরা উদাসীন হয়ে গেছি এ সত্যের ব্যাপারেও যে, শেষ পরিণাম হয়তো জান্নাত নয়তো জাহান্নাম।
وَالْمَوْتُ فَاذْكُرْهُ وَمَا وَرَاءَهُ *** فَمَا لِأَحَدٍ عَنْهُ بَرَاءَةُ وإنه للفيصل الَّذِي بِهِ *** يُعْرَفُ مَا لِلْعَبْدِ عِنْدَ رَبِّهِ والقَبْرُ رَوْضَةٌ مِنَ الجِنَانِ *** أَوْ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرِ النَّيْرَانِ إِنْ يَكُ خَيْراً فَالَّذِي مِنْ بَعْدِهِ *** خَيْرٌ عِنْدَ رَبِّنَا لِعَبْدِهِ وإِنْ يَكُ شَراً فَمَا بَعْدُ أَشَدُّ *** وَيْلٌ لِعَبْدٍ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ صَدَّ
'মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী জিন্দেগির কথা স্মরণ করো। কারও নিষ্কৃতি নেই তার হাত থেকে। মৃত্যুই সেই সীমারেখা, যেখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যাবে বান্দার জন্য আল্লাহ কী রেখেছেন। কবর হলো জান্নাতের উদ্যান, কিংবা জাহান্নামের গর্ত। যদি কবরের জীবন উত্তম হয়, তবে পরবর্তী সবকিছু বান্দার জন্য কল্যাণকর। আর যদি অপ্রীতিকর হয়, তবে পরবর্তী জীবন হবে আরও দুঃসহ। ধ্বংস সেই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথ থেকে বিমুখ হয়েছে।'
একদা আলি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে বলেছিলেন, 'হে কবরবাসী, হয়তো তোমরা আমাদেরকে তোমাদের খবর দেবে, না হয় আমরা তোমাদেরকে আমাদের খবর দেবো। আর আমাদের খবর হলো, বাড়িগুলো নীরব হয়ে গেছে, নারীদের বিয়ে হয়ে গেছে এবং সম্পদগুলো বণ্টিত হয়ে গেছে।' এরপর তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, যদি কবরবাসী কথা বলত, তাহলে তারা বলত, তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো, কেননা সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।' আমরা আদিষ্ট হয়েছি জীবন গঠন ও আনুগত্যে সময় কাজে লাগানোর জন্য। কারণ, আমাদের পার্থিব এই জীবন শুধু একটিই জীবন। চলে গেলে আর ফিরে আসবে না। সুতরাং এই জীবনকে মূল্যায়ন করো। রাসুল বলেন:
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ : شَبَابَكَ قَبْلَ هِرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ، وَغِنَاءَكَ قَبْلَ فَقْرِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ
'পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে মূল্যায়ন করো: যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে, সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে, ধনাঢ্যতাকে দারিদ্র্যের পূর্বে, অবসরতাকে ব্যস্ততার পূর্বে এবং জীবনকে মৃত্যুর পূর্বে।'১০
হে ভাই, বর্তমান মানুষের অবস্থা নিয়ে সামান্য চিন্তা করো। তাহলেই তুমি বর্তমান মানুষের উদাসীনতার পরিমাণ বুঝতে পারবে। তবে আল্লাহ তাআলা যার প্রতি রহম করেছেন, তার কথা ভিন্ন।

উদাসীনরা সালাত পরিত্যাগ করে
উদাসীনদের অবস্থা হলো সালাতের ব্যাপারে তারা গাফিল। তারা সালাত আদায় করে না। তারা দিনের পর দিন সালাতের ব্যাপারে অমনোযোগী থাকে। কয়েক মাস আগে সত্তরের অধিক বয়সী একজন বৃদ্ধ মারা গেল। আমার কাছে একজন এসে জিজ্ঞেস করল, 'শাইখ, যে সালাত আদায় করেনি, তার জানাজার সালাত আদায়ের হুকুম কী?' আমি বললাম, 'ঘটনা কী?' সে বলল, 'আমাদের এখানে সত্তরের অধিক বয়সী একজন বৃদ্ধ মারা গেছে, যাকে আমরা কখনো মসজিদে যেতে দেখিনি। আমরা কোনো দিন তাকে সালাত আদায় করতে এবং আল্লাহর জন্য মাথা ঝুঁকাতে দেখিনি। যখন তার পরিবারকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তারা বলল, “আমরা কোনো দিন তাকে সালাত আদায় করতে দেখিনি।” এটা কোন ধরনের উদাসীনতা?! আমাদের দিন যায়, রাত যায়। আমি, তুমি-আমরা সবাই চলছি শেষ প্রান্তের দিকে। শেষ বিদায়ের দিকে, যার থেকে ফিরে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু শেষ বিদায়ের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কোথায়? জনৈক নেককার লোক শেষ রাতে নিজ এলাকার সবচেয়ে উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে জোর আওয়াজে মানুষকে ডেকে ডেকে বলতেন, 'বিদায়ের সময় হয়েছে! বিদায়ের সময় হয়েছে! বিদায়ের সময় হয়েছে!' এভাবে তিনি মানুষকে আখিরাতের পথে যাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। হঠাৎ একদিন এই আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। এলাকার দায়িত্বশীল আমির তার ব্যাপারে লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করলে তাকে জানানো হলো, তিনি মারা গেছেন। আমির বললেন, 'তিনি সব সময় মানুষকে বিদায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। আর আজ তিনি নিজেই বিদায় নিয়ে চলে গেলেন!' তিনি বিদায়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত ছিলেন। সব সময় তিনি মৃত্যুর কথা স্মরণ করতেন। ফলে উট যখন তার ঘরের সামনে এসে বসল, তখন তাকে প্রস্তুতি নিয়ে জাগ্রত অবস্থায় পেল। পার্থিব বিভিন্ন আশা-ভরসা তাকে উদাসীন করে রাখেনি। আল্লাহর শপথ, মানুষের আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাধা শুধু দীর্ঘ আশা। যার আশা দীর্ঘ হয়, তার আমল মন্দ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
‘আপনি ছেড়ে দিন তাদের, তারা খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক এবং আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে।'১১
এ ধরনের লোকদের তুমি কখনো সালাতে দেখবে না। তারা কখনো রুকু- সিজদায় নিজের মাথা নত করে না। কোনো এক সড়কে আমার সাথে কিছু যুবকের সাক্ষাৎ হলো। তারা আমার সাথে গাড়িতে উঠল। এরপর আমার সাথে তাদের এই কথোপকথন হলো: আমি বললাম, 'তোমরা কোথায় যেতে চাও?' তারা বলল, 'অমুক স্থানে।' আমি বললাম, 'তোমাদের সেখানে যাওয়ার কী উদ্দেশ্য?' তারা বলল, 'আমরা চাকরি ও কাজ চাই।' আমি তাদের যোগ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন করলাম। উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো যোগ্যতা তাদের ছিল না। তাদের পড়াশোনা বা কাজের ব্যাপারে বিশেষ কোনো সার্টিফিকেটও ছিল না। আমি তাদের প্রশ্ন করলাম, 'তোমরা সালাতের ব্যাপারে কতটা যত্নশীল? আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সালাত হলো সকল বরকতের চাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
"আপনি আপনার পরিবারের লোকদের সালাতের ব্যাপারে আদেশ করুন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিজিক চাই না। আমি আপনাকে রিজিক দিই। আর আল্লাহভীরুতার পরিণাম শুভ।"১২
তখন প্রথমজন বলল, 'আপনি কি আমাদের কাছ থেকে সত্য কথা শুনতে চান, না আমরা মিথ্যা বলব?' আমি বললাম, 'যদি মিথ্যা বলো, তাহলে এর পরিণাম তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। আমার কোনো ক্ষতি হবে না।' সে বলল, 'হে শাইখ, আমি সালাত আদায় করি না।' জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কি কাফির?' সে বলল, 'না।' আমি বললাম, 'সালাত হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধান। রাসুল বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো সালাত। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল।'১৩
দ্বিতীয়জন বলল, 'আমার অবস্থা তার চেয়ে ভালো।' আমি বললাম, 'কীভাবে?' সে বলল, 'আমি দিনে দুই ওয়াক্ত সালাত আদায় করি।' বললাম, 'এটি তো আশ্চর্যজনক বিষয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে বলেছেন। আর তুমি দুই ওয়াক্ত সালাত আদায় করছ! এটি কোন ধরনের উদাসীনতা? পাঁচটি বিষয়ের ওপর কি ইসলামের ভিত্তি নয়? একজন মুসলিমের জন্য কি এটা সম্ভব যে, সে এই ভিত্তিগুলোর ব্যাপারে উদাসীন থাকবে অথবা এই বাস্তবতার ব্যাপারে অজ্ঞ থাকবে? বরং সে তো হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ে আদিষ্ট বান্দা।' আর তৃতীয়জনের বিষয়টি ছিল আরও আশ্চর্যজনক। সে বলল, 'আমিও প্রথমজনের তুলনায় ভালো আছি। আমি প্রতি জুমআর সালাত আদায় করি। আমি বললাম, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' অথচ প্রতিটি গ্রামেই তো আজানের আওয়াজ উচ্চকিত হচ্ছে। কিন্তু বিলালের আজানের ধ্বনি কোথায় গেল! প্রতিদিন প্রভাতে তোমাদের মিনারগুলো থেকে আওয়াজ উঁচু হচ্ছে, কিন্তু তোমাদের মসজিদগুলো ইবাদত থেকে শূন্য হয়ে পড়ছে। আল্লাহর শপথ, কারও অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক হবে না, যতক্ষণ না সালাতে তার অবস্থা ঠিক হবে। মানুষের বর্তমান অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক হবে না, যতক্ষণ না সে সালাতের ব্যাপারে যত্নশীল হবে।
রাসুল ﷺ বলেন : اكْلَفُوا مِنَ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ 'তোমরা ততটুকু আমল করো, যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে করা সম্ভব।১৪ (অপর এক হাদিসে তিনি বলেন ( وَاعْلَمُوا أَنَّ خَيْرَ أَعْمَالِكُمُ الصَّلَاةَ 'আর জেনে রেখো, তোমাদের সবচেয়ে উত্তম আমল হলো সালাত।১৫ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সালাতে যত্নশীল হওয়ার চেয়ে উত্তম কোনো মাধ্যম নেই। প্রকৃতপক্ষে উদাসীনরা সালাত আদায় করে না। বর্তমানে পুরো সমাজের উদাসীনতার প্রতি লক্ষ করো। যখন মুয়াজ্জিন ডাক দিয়ে বলেন, 'ঘুম হতে সালাত উত্তম', তখন রাস্তায় বের হলে তুমি দেখবে যে, মসজিদে যাওয়ার মতো একজন মানুষ বা একটি গাড়িও দৃষ্টিগোচর হবে না। বরং দেখবে, তোমার বাবা বা বৃদ্ধ কিছু ব্যক্তি অথবা হিদায়াতপ্রাপ্ত কিছু যুবকই কেবল মসজিদে যাচ্ছে। এ ছাড়া সবাই উদাসীনতার ঘুমে আচ্ছন্ন। এদের সংখ্যা আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ 'আর আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য অনেক জ্বিন ও মানুষ।...'১৬
ফজরের আজানের এক ঘণ্টা পর রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমাদের উদাসীনতার অবস্থা দেখো। দুনিয়ার দিকে আহ্বানকারী যখন আহ্বান করে বলে, 'এসো চাকরির দিকে, এসো কাজের দিকে!' তখন লোকজনে রাস্তাঘাট পূর্ণ হয়ে যায়। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই রাস্তায় নেমে পড়ে। বাড়িগুলো গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে ওঠে—সবাই দুনিয়া অর্জনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। উম্মতের অবস্থা কীভাবে পরিবর্তন হবে, যখন তারা আল্লাহর আদেশের চেয়ে নিজেদের দুনিয়াকে বড় করে দেখছে? আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'যখন তোমাদের ওপর একটি মুসিবত এসে পৌঁছাল, অথচ তোমরা তার পূর্বেই দ্বিগুণ কষ্টে পৌঁছে গিয়েছ, তখন কি তোমরা বলবে, “এটা কোথা থেকে এল?" তাহলে বলে দিন, "এ কষ্ট তোমাদের ওপর পৌঁছেছে তোমাদেরই পক্ষ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর ক্ষমতাশীল।"'১৭
বর্তমানের অনেক মুসলিমকেই তুমি দেখবে, তারা সালাত আদায় করে না। সালাতের ব্যাপারে তারা অবহেলা করে। এদের দেখবে, শুধু ডান-বামে তাকাচ্ছে। হালাল-হারাম বিচার করছে না। তারা কুরআনকে পরিত্যাগ করে। আর দিবানিশি গানবাদ্য নিয়ে পড়ে থাকে। তাদের নিকট রাত-দিন সমান।

উদাসীনতার ব্যাপারে সালাফের সতর্কীকরণ
সালাফের নিকট রাত ও দিনের অর্থ ভিন্ন। উমর বিন আব্দুল আজিজ বলতেন, 'রাত-দিন তোমার পেছনে কাজ করে যাচ্ছে। সুতরাং তুমিও তাতে কাজ করে নাও।'
আবু বকর সিদ্দিক উমর-কে এই বলে উপদেশ দিতেন যে, 'রাতের বেলায় আল্লাহর কিছু হক রয়েছে, যা তিনি দিনের বেলায় গ্রহণ করেন না। আর দিনের বেলায় আল্লাহর কিছু হক আছে, যা তিনি রাতের বেলায় গ্রহণ করেন না।'
আমরা আল্লাহর এসব হক ছেড়ে কোন পথে হাঁটছি? বর্তমানে উম্মাহর এই করুণ অবস্থায় পৌঁছার একটিই কারণ। আর তা হলো, যুবক ও বৃদ্ধ সকলের উদাসীনতা। আবু জার দীর্ঘ দিন পর মক্কায় ফিরে এসে দেখলেন, সেখানকার অধিবাসীরা নিজেদের বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণে ব্যস্ত। তারা নিজেদের পানাহারে বিলাসিতা শুরু করে দিয়েছে। তিনি তাদের মাঝে আশ্চর্যজনক পরিবর্তন লক্ষ করলেন। কাবার পাশে তাওয়াফ করতে করতে তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, 'হে লোক-সকল, আমি তোমাদের কল্যাণকামী, বিশ্বস্ত ও তোমাদের প্রতি দয়াশীল।' এ কথা শুনে লোকজন তাঁর কাছে এগিয়ে আসলো। 'এমন ব্যক্তির ব্যাপারে তোমাদের মতামত কী, যে সফরের ইচ্ছা করেছে, সে কি তার সফরের পাথেয় গ্রহণ করবে না?' তারা বলল, 'অবশ্যই।' তিনি বললেন, 'তোমাদের সে কাঙ্ক্ষিত সফরের চেয়ে দীর্ঘ সফর হলো আখিরাতের সফর। সুতরাং তোমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পাথেয় সংগ্রহ করো।' তারা বলল, 'আমাদের প্রয়োজন কী?' তিনি বললেন, 'রাতের অন্ধকারকে কবরের অন্ধকারের সাথে সম্পৃক্ত করো। বড় বড় অপরাধগুলোর ব্যাপারে অজুহাত তৈরি করে নাও। দুনিয়াকে দুটি মজলিশে ভাগ করে নাও—একটি আখিরাত অর্জনের জন্য এবং অপরটি দুনিয়া অর্জনের জন্য। এ ছাড়া ভিন্ন কিছু ইচ্ছা করবে না। কেননা, তা তোমাদের ক্ষতি সাধন করবে। টাকাকে দুভাগে ভাগ করে নাও—একভাগ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে এবং অপরভাগ নিজের জন্য ও নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করবে। এ ছাড়া অন্য কিছু ইচ্ছা করবে না। কারণ, তা তোমাদের ক্ষতি সাধন করবে। আমার কী হলো যে, আমি দেখছি, তোমরা সেসব ইমারত তৈরি করছ, যেখানে তোমরা বসবাস করতে পারবে না এবং সেসব খাদ্য প্রস্তুত করছ, যা তোমরা ভক্ষণ করতে পারবে না। তোমরা দীর্ঘ আশা করে বসে আছ। দুনিয়ার লোভ তোমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে, অথচ তোমরা তা পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারবে না।'
প্রিয় ভাই ও বোন,
যদি আবু জার আমাদের বর্তমান অবস্থা দেখতেন, তাহলে তিনি আমাদের ব্যাপারে কী বলতেন? আল্লাহর কাছেই সকল অভিযোগ পেশ করছি। যদি তিনি এসে এত বিশাল বিশাল ভবন দেখতেন, যেখানে দুজন বা তিনজন বসবাস করছে, তাহলে কী বলতেন তিনি? যদি আবু জার এসে সুদি ব্যাংকে আমাদের সম্পদের পরিমাণ দেখতেন, তাহলে তিনি কী বলতেন? যদি তিনি আমাদের নারী ও শিশুদের বাদ্যযন্ত্র ও গানের প্রতি আকর্ষণ দেখতেন, তাহলে কী বলতেন? যদি আবু জার এসে দেখতেন যে, আমাদের রাত কাটে ইন্টারনেটের বিভিন্ন চ্যানেলে? যদি তিনি এসে দেখতেন যে, স্টেডিয়ামগুলো যুবক-যুবতিদের দ্বারা পরিপূর্ণ, তাহলে তিনি কী বলতেন? যদি তিনি এসে দেখতেন যে, গরুপূজারিরা আমাদের মসজিদগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে, যদি তিনি এসে দেখতেন যে, ক্রুশের পূজারিরা আমাদের সম্মান ও ইজ্জত ভুলণ্ঠিত করছে। যদি তিনি এসে দেখতেন যে, বানর ও শূকরের নাতিরা আমাদের নিয়ে তামাশা করছে, তাহলে তিনি কী বলতেন? ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা নিজেদের উদাসীনতার ফলেই আজ এই অবস্থায় চলে এসেছি। আমাদের ওপর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যা কিছু আপতিত হচ্ছে, তা আমাদের উদাসীনতা ও দুর্বলতারই ফল। এখন আমাদের সময় হয়েছে উপদেশ শুনে তা গ্রহণ করার। এখনই উপদেশ শ্রবণ করে নিজেদের পরিবর্তন করার সময়। আমাদের কি মৃত্যুর কথা স্মরণ করার সময় হয়নি—যা ছোট বা বড়, শীতকাল বা গ্রীষ্মকাল, দিন বা রাত কিছুই চিনে না? আমাদের প্রত্যেকের জন্য কি এখনো সেই ভয়াবহ অবস্থার জন্য প্রতীক্ষা শুরু করার সময় হয়নি? কবরে রয়েছে মাটি চাপা এবং প্রশ্নপর্ব। তিনটি প্রশ্ন—আমাদের প্রত্যেকেই সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? আর তোমাদের মাঝে যে লোকটিকে প্রেরণ করা হয়েছে, তিনি কে? প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান তুমি সহজ মনে করো না। কারণ, উদাসীনরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে না। সুস্থ হৃদয়ের অধিকারী লোকজনই কেবল এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। কারণ, তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিচলতা দান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মজবুত বাক্য দ্বারা মজবুত করেন। পার্থিব জীবনে এবং পরকালে। এবং আল্লাহ জালিমদের পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা তা করেন।'১৮

উদাসীনতা সত্যের পথে বাধার দেয়াল
উদাসীনতা সত্য পথে বাধা প্রদান করে। বাধা প্রদান করে উপদেশ গ্রহণ করতে এবং মনোযোগ দিয়ে কারও উপদেশ শ্রবণ করতে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ
'আমি আমার নিদর্শনসমূহ হতে তাদের ফিরিয়ে রাখি, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে গর্ব করে। যদি তারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে ফেলে, তবুও তা বিশ্বাস করবে না। আর যদি হিদায়াতের পথ দেখে, তবে সে পথ গ্রহণ করে না। অথচ গোমরাহির পথ দেখলে, তা-ই গ্রহণ করে নেয়। এর কারণ, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে মনে করেছে এবং তা থেকে উদাসীন হয়ে রয়েছে।'১৯
মৃত্যু ও তার যন্ত্রণার জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? কবর ও তার অন্ধকারের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? সেদিনের জন্য তোমার কী প্রস্তুতি রয়েছে, যেদিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান? সেদিনের প্রশ্নোত্তরের জন্য তোমার কী কী প্রস্তুতি রয়েছে? অচিরেই তুমি নিজের সালাত, নিজের দৃষ্টি, নিজের প্রতিটি কথা এবং নিজের ছোট-বড় প্রতিটি কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একদা হাসান বসরি একদল যুবকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের মাঝে একজন যুবক খুব উচ্চস্বরে হাসছিল। হাসান তাকে বললেন, 'তুমি কি পুলসিরাত পার হয়ে গেছ?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো যে, তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে না জাহান্নামে?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তাহলে কীসের জন্য তোমার এই হাসি?'
প্রিয় ভাই ও বোন,
আর কতদিন আমাদের এই উদাসীনতা থাকবে? অথচ আমরা নিজেদের মৃতদের দাফন করি, কিন্তু উপদেশ গ্রহণ করি না! কতদিন এমন চলবে? অথচ আমরা আমাদের ছোট ও বড়দের বিদায় জানাচ্ছি, কিন্তু নিজেরা নাফরমানি থেকে বিরত হচ্ছি না! আমরা কত কত বার কবরস্থানে প্রবেশ করেছি, কিন্তু আমাদের হৃদয়কে উদাসীনতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সালাফগণ বলতেন, 'আমরা যখনই জানাজায় যেতাম, তখন মুখোশধারী ক্রন্দনকারীদের দেখতে পেতাম।' আর আমাদের বর্তমান বাস্তবতা দেখো। আজ যদি আমরা জানাজায় যাই, তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হয়? তারা বলতেন, 'অধিক ক্রন্দনকারীর কারণে আমরা বুঝতে পারতাম না যে, কাকে সান্ত্বনা দেবো।' আর বর্তমানে আমরা হাসি-ঠাট্টার কারণে বুঝতে পারি না, কাকে সান্ত্বনা দেবো। কবরস্থানে মৃতদের বিদায় জানানোর মতো কঠিন সময়েও তুমি মানুষকে প্রভাবিত হতে দেখবে না। কবরস্থান আর মৃতদের অবস্থা যখন আমাদের পরিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি, তখন আর কোন জিনিস আমাদের মাঝে পরিবর্তন আনবে? নিশ্চয় উদাসীনদের পথচলা হলো, অন্ধকারে পথচলা— যাদের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। গুনাহ ও নাফরমানি প্রতি মুহূর্তে তাদের ধোঁকা দিচ্ছে। অন্যদের তুলনায় তারাই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিচলতা পাওয়ার প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী।

উদাসীন ও নেককার ব্যক্তিদের অন্তিম মুহূর্তের কিছু বাস্তব কাহিনি গান গাইতে গাইতে যুবকদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া
একজন ট্রাফিক পুলিশ বললেন, আমাদের চোখের সামনে একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটল। হাইস্পিডের দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। আমরা দ্রুত সেখানে গেলাম। প্রথম গাড়ির কাছে এসে দেখলাম, ভেতরের লোকটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। তখন আমরা দ্বিতীয় গাড়ির কাছে ছুটে গেলাম। তাতে তিনজন যুবক ছিল। দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, তারা শেষ বিদায়ের সময়ে উপনীত হয়েছে। আমরা তাদেরকে গাড়ি থেকে বের করে রাস্তার এক সাইডে নিয়ে গেলাম। আমার সাথি তাদের কালিমার তালকিন দিচ্ছেন যে, 'তোমরা لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলো', 'তোমরা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলো।' হঠাৎ তাদের গানের আওয়াজ বেড়ে গেল। কিন্তু আমার সাথি তাদের আবার তালকিন দিতে লাগলেন যে, 'বলো, لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ।' কিন্তু তারা শয়তানের সুরে গান গাইতে থাকল। আর এভাবেই তারা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল। আল্লাহ তাআলার কাছে এ ধরনের মৃত্যু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাদের শেষ পরিণাম ছিল আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা। গান গেয়ে তাদের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। অবাধ্যতা তাদের প্রতারিত করেছে। শয়তান তাদের প্রবঞ্চিত করেছে। তারা নিজেদেরকে আনুগত্যে অভ্যস্ত করেনি। তারা কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করেনি। সুতরাং এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, যখন তাদের বলা হয়েছে যে, 'তোমরা لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলো', তখন তারা শয়তানের কালাম বলেছে। মৃত্যুর সময় অবাধ্যতা তাদের ধোঁকা দিয়েছে। এবং মৃত্যুর পরও তারা প্রতারিত হবে। আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

বেনামাজি যুবকের মৃত্যুর পর তার দেহের চামড়া কালো হয়ে যাওয়া
মৃতদের গোসলের কাজ করত, এমন একজন আমাকে জানাল, আমাদের কাছে যৌবনে পদার্পণ করেছে—এমন একজন যুবককে নিয়ে আসা হলো। যুবকটি খুব শুভ্র ছিল। যখন আমরা তাকে গোসল দিতে শুরু করলাম, তখন তার সাদা চামড়া কালো হতে শুরু করল। আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই বাণীতে সত্য কথাই বলেছেন:
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ
'আর যদি আপনি দেখতেন, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের জান কবজ করে; প্রহার করে তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাদদেশে আর বলে, "জ্বলন্ত আজাবের স্বাদ গ্রহণ করো।”২০
ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ 'এই হলো সেসবের বিনিময়, যা তোমরা তোমাদের পূর্বে পাঠিয়েছ নিজ হাতে। বস্তুত আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।'২১
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ 'আর আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।'২২
গোসলদাতা লোকটি জানাল যে, তার চেহারার রং সাদা থেকে একদম কালোতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এই দৃশ্য দেখে আমরা ভয় পেয়ে গোসলখানা থেকে বের হয়ে গেলাম। বাইরে এসে দেখলাম, এক লোক ধোঁয়া দিচ্ছেন। আমরা বললাম, 'মৃত লোকটি আপনাদের কেউ?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমি তার পিতা।' আজ কত পরিবারই এমন উদাসীনতায় জীবন কাটাচ্ছে, যা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানেন না। আমি বললাম, 'আপনাদের এই মৃত লোকটি কেমন ছিল?' তিনি বললেন, 'আমাদের এই মৃত লোকটি সালাত আদায় করত না!' আমি বললাম, 'আপনারা আপনাদের এই মৃত লোকটিকে নিয়ে যান এবং নিজেরাই তার গোসল ও কাফন দিন।' আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল -এর বিধান কি এই নয় যে, এমন লোককে গোসল ও কাফন দেওয়া হবে না? এমন লোককে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা হবে না। তাকে কাঁধে ওঠানো হবে না। তার জন্য দুআ করা হবে না এবং ক্ষমাও প্রার্থনা করা হবে না। বরং মরুভূমিতে তার জন্য একটি গর্ত খনন করা হবে এবং তাকে সেখানে উপুড় করে ফেলে রাখা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।'২৩
এই হলো উদাসীনতা। উদাসীনতা উদাসী লোকদের সাথে কী আচরণ করল! আমরা কি এ ধরনের লোকদের বিদায় জানাই না? এ রকম অনেক লোক আমাদের মাঝ থেকে বিদায় গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقَّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
'যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মতো যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।'২৪
اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
'জেনে রাখো, আল্লাহই জমিনকে তার মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।'২৫

এখনো কি আমাদের সময় হয়নি অতীত লোকদের থেকে উপদেশ গ্রহণ করার?
ছোট শিশু অচিরেই মরে যাবে, বয়স্ক লোকটিও মারা যাবে। পুরুষ মারা যাবে, মারা যাবে নারীও। উদাসীন মারা যারে, মারা যাবে নেককার লোকটিও। আল্লাহ তাআলা কারও প্রতি জুলুম করবেন না। উদাসীনতা তাদের গ্রাস করে নেবে এবং মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তেও তা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে। আর যারা নেককার, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর আগ মুহূর্তে অবিচলতা দান করেন।

কুরআন পাঠকালীন এক যুবকের মৃত্যু
যে লোকটি গান গাইতে গাইতে কিছু যুবকদের মৃত্যুবরণ করতে দেখেছেন, তিনি বলেছেন যে, কিছু দিন পর তিনি আরেকটি মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছেন। উঠতি বয়সের এক যুবকের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। সে কোনো একটি গলিপথে নিজের গাড়ি থামিয়ে নিল এবং গাড়ি ঠিক করার জন্য গাড়ি থেকে নেমে আসলো। হঠাৎ পেছন থেকে একটি গাড়ি এসে তার সাথে ধাক্কা খেল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার শরীরের হাড্ডিগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আমরা দ্রুত এক্সিডেন্টের জায়গায় ছুটে গেলাম। আমরা এসে দেখলাম, সে এমন এক অবস্থায়, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ তা জানে না। আমরা তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলাম। তার জরুরি অবস্থা আমরা বুঝতে পারছিলাম। হঠাৎ তার ক্ষীণ আওয়াজে আমরা পেরেশান হয়ে গেলাম। আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাই গাড়ির পেছনের সিটে তাকে বসিয়ে দিলাম। যখন আমরা তাকে ছেড়ে দিলাম, তখন তার সে আওয়াজ বুঝতে পারলাম। সে খুব মিষ্টি সুরে কুরআন পাঠ করছিল। এর চেয়ে সুন্দর আওয়াজ আমি কখনো শুনিনি। সে কুরআন পাঠ করছে আর আমরা ক্রন্দন করছি। আমি মনে মনে বললাম, সুবহানাল্লাহ! মনে হচ্ছে তার শরীরের হাড্ডিগুলো ভেঙে যায়নি। আমি ভাবলাম, তাকে কালিমায়ে শাহাদাতের তালকিন করব। অতীতে আমি এমন বহু পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। লোকটি বলেন, হঠাৎ তার আওয়াজ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে লাগল। আমি পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে নিজের শাহাদাত আঙুল উঁচিয়ে রেখে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করছে। এরপর তার হাতটি বুকের ওপর পড়ে গেল এবং সে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করল। এই লোকের জন্য প্রয়োজন নেই, তাকে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ)-এর তালকিন করানো। কারণ, সে নিজের জিন্দেগি পরিচালিত করেছে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ)-এর ওপর। সে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ)-এর অর্থ বুঝেছে। নিজের জীবন ব্যয় করেছে (لَا إِلَهَ إِلَّا الله)-এর ওপর। ফলে মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে অবিচলতা দান করেছেন। সে কখনো সালাত পরিত্যাগ করেনি এবং কুরআন তিলাওয়াতও বন্ধ করে দেয়নি। তার তাসবিহ বা জিকিরও ছুটে যায়নি কখনো। এগুলো সে সময় তার সাথে ছিল। তার সাথে ছিল স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই, সে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ পাঠ করতে করতে এই জীবনকে বিদায় জানিয়েছে।

এক যুবকের গোসল ও দাফনের সময় তার মাঝে দেখা গেল সফলতার নিদর্শন।
আমাদের জনৈক দায়ি ভাই বলেন, 'আমার কাছে একজন নেককার যুবকের লাশ নিয়ে আসা হলো। সে ছিল সৎ কাজের আদেশকারী এবং অসৎ কাজে বাধাদানকারী। সে মানুষের কল্যাণের ব্যাপারে উদগ্রীব ছিল। আমি তাকে এমনই ধারণা করি। আর আল্লাহ তাআলাই তার হিসাব গ্রহণকারী। তাকে গোসল দেওয়ার জন্য আমার কাছে নিয়ে আসা হলো। যখন আমরা তাকে গোসল দিয়ে মিশক ও কাফুর দিতে শুরু করলাম, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই—সেই আল্লাহর শপথ, আমরা তার গায়ে মিশক দেওয়ার আগেই তার দেহ থেকে মিশকের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। পুরো কামরাটি মিশকের ঘ্রাণে ভরে গেল। আমরা ইতিপূর্বে কখনো এ ধরনের মিশকের ঘ্রাণ পাইনি।' লোকটি বলেন, 'আমি আমার সাথিকে বললাম, “তুমি কি কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছ?” সে বলল, “অবশ্যই, আল্লাহর শপথ।” আমরা তার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চেহারা সাদা কাগজের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে গেছে। আমরা তাকে গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে নিলাম। তাকে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম। যারা কবরে নেমেছিল, তাদেরই একজন ছিলাম আমি। লোকেরা যখন তাকে আমাদের কাছে দিল হঠাৎ তাকে আমাদের হাত থেকে নিয়ে নেওয়া হলো। আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে বহন করতে পারলাম না। আমি আমার সাথিকে বললাম, "তুমি কি কিছু উপলব্ধি করতে পারছ?" সে বলল, "অবশ্যই, আল্লাহর শপথ।" তাকে মাটিতে ঢাকা হলো; আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে মাটি দিইনি। তাকে কিবলামুখী করা হলো; আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে কিবলামুখী করিনি। তার চেহারা থেকে কাপড় সরানো হলো। হঠাৎ দেখি, সে হাসছে। আমি ভয় পেয়ে মনে করেছিলাম সে জীবিত। যদি আমি নিজেই তাকে গোসল ও কাফন না দিতাম, তাহলে ধরে নিতাম সে জীবিত। এই নেককার যুবকের ইবাদত তার সাথে খিয়ানত করেনি। এমনকি কবরেও তার সাথে খিয়ানত করেনি। মানুষ মারা গেলে তার আমল তার অনুসরণ করে। আর উদাসীনদের পেছনে থাকে তাদের উদাসীনতা। আর নেককারদের অনুসরণ করে তাদের নেক আমল। নেক আমল তাদের কবরকে আলোকিত করে দেয়।
ওহে, তুমি আর কতদিন এভাবে চলবে, অথচ মানুষ একের পর এক বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু তোমার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না?
আমাদের অবশ্যই আত্মিক রোগের চিকিৎসা করতে হবে। আর আত্মার চিকিৎসা করতে হবে কুরআনের উপদেশ গ্রহণ করার মাধ্যমে। ইবনুল কাইয়িম বলেন, আত্মার চিকিৎসা পাঁচটি জিনিসের মাঝে রয়েছে: ফিকিরের সাথে কুরআন তিলাওয়াত, রাতের সালাত... কিন্তু বর্তমানে মানুষ ইন্টারনেটের পেছনে রাতের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে, দায়িত্ব ও ইবাদত বিনষ্ট করছে। আমাদের এ জাতি আজ প্রতিটি স্থানে দুঃখ-বেদনায় জর্জরিত। এই তো মসজিদে আকসা নিজের ক্ষত চাটছে। অথচ মুসলিমদের দলগুলো এখন ভিন্ন ভিন্ন। হায়, আমাদের যুবকদের কী হলো! আমাদের জন্য কি একজন সাদ বা মিকদাদ নেই?
জেনে রেখো, আত্মার চিকিৎসা হলো শেষ রজনির কান্না এবং আল্লাহর সামনে লুটিয়ে পড়া। চিকিৎসা হবে স্বল্প আহার ও পানাহারের মাধ্যমে। আত্মা তখনই বিনষ্ট হয়, যখন পেট পানাহার, বিনোদন ও উদাসীনতায় পূর্ণ হয়ে যায়। এসবের পর আত্মার চিকিৎসা হবে শ্রেষ্ঠ মানুষদের সংশ্রবের মাধ্যমে।

হৃদয়বান লোকদের কিছু ঘটনা
এমন একটি ঘটনা হলো, সালমান ফারসি -এর ঘটনা। সালমান ফারসি বলতেন, 'তিনটি বিষয় আমাকে আশ্চর্যান্বিত করে; এমনকি আমার হাসিও এসে যায়। (তা হলো) এক. দীর্ঘ আশাবাদী, মৃত্যু যাকে খুঁজছে। দুই. এমন উদাসীন, যার ব্যাপারে উদাসীনতা করা হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“সে যে কথাই উচ্চারণ করে, (তা গ্রহণ করার জন্য) তার কাছে একজন সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”২৬
তিন. মুখ ভরে হাস্যরত এমন ব্যক্তি, যে জানে না যে, তার রব তার প্রতি সন্তুষ্ট নাকি অসন্তুষ্ট।'
অন্য একজন বলেন, 'আমি যে রাতেই ঘুমাই ধারণা করি যে, এরপর আর জাগ্রত হতে পারব না।'
জনৈক সালাফ যখনই মসজিদ থেকে বের হতেন, তখন অনেক ক্রন্দন করতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমি আশঙ্কা করছি যে, দ্বিতীয়বার আর এখানে ফিরে আসতে পারব না।'
হাবিব ফারসি সকালবেলা তার স্ত্রীকে বলতেন, 'যদি আজ আমি মারা যাই, তাহলে গোসলের জন্য অমুকের কাছে প্রেরণ করবে, অমুকের কাছে কাফনের জন্য প্রেরণ করবে এবং এই এই কাজ করবে।' তার স্ত্রীকে বলা হলো, হয়তো সে কোনো স্বপ্ন দেখেছে। তখন তার স্ত্রী বলল, 'না, বরং প্রতিদিনই তিনি এ ধরনের কথা বলতেন।' এই হলো জাগ্রত হৃদয়।
আমির বিন আব্দুল্লাহ মাগরিবের আজান শুনলেন। তিনি সেদিন কঠিন অসুস্থ ছিলেন। বরং মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলেন। তিনি নিজ সন্তানদের বললেন, 'আমাকে ধরে মসজিদে নিয়ে যাও।' তারা বলল, 'আপনি সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা অবকাশ দিয়েছেন। অসুস্থ লোকের জন্য (মসজিদে উপস্থিত না হওয়াতে) কোনো অসুবিধা নেই।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আজানের ডাক শুনে সে ডাকে সাড়া প্রদান না করাকে আমি লজ্জাজনক মনে করি।'
আফসোস! বর্তমানে মানুষ মসজিদের পাশ দিয়ে চলে যায়; কেমন যেন বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তারা 'হাইয়া আলাস সালাহ' এবং 'হাইয়া আলাল ফালাহ' শুনেও তার ডাকে সাড়া প্রদান করে না। খুব কম সংখ্যক লোকই এ ডাকে সাড়া দেয়।
আমির বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আজানের ডাক শুনে সে ডাকে সাড়া প্রদান না করাকে আমি লজ্জাজনক মনে করি।' তখন তিনি গোসল করলেন, পবিত্র হয়ে আতর মাখলেন। এরপর মাগরিবের সালাত আদায় করার জন্য মসজিদে গেলেন। তিনি প্রথম সিজদা করে আর মাথা তুললেন না। তাঁর শেষ পরিণাম কতই না উত্তম হয়েছিল! তাঁর শেষ পরিণতি কতই না চমৎকার হয়েছিল! পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُمْ مِنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
'হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য করো এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তিনি তোমাদের গুনাহ মার্জনা করবেন আর তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন।'২৭
وَمَنْ لَا يُجِبْ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزِ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءُ أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
'আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মানবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তার কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। এ ধরনের লোকই প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।'২৮
এগুলো হলো হৃদয়বান লোকদের সংবাদ। যদি তুমি তাদের মতো হতে না পারো, তাহলে তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করো। নেককার লোকদের সাথে সাদৃশ্য রাখাও নেক। সুযোগ খোঁজা বা সুবিধা খোঁজার পেছনে পড়ো না। তখন আর তোমার ডাকে সাড়া দেওয়া হবে না। সুস্থতা চাইলে চিকিৎসা গ্রহণ করো।
আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন, 'যখন জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামিরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখন মৃত্যুকে শিংবিশিষ্ট সাদা-কালো একটি দুম্বার আকৃতিতে নিয়ে আসা হবে। এরপর জান্নাতিদের ডাক দিয়ে বলা হবে, “হে জান্নাতিগণ, তোমরা কি এটিকে চিনতে পারছ?” তখন তারা ঘাড় উঁচু করে দেখতে থাকবে। তারপর বলবে, “হ্যাঁ, আমরা চিনতে পারছি। এটি হলো মৃত্যু।” এরপর জাহান্নামিদের ডাক দিয়ে বলা হবে, “হে জাহান্নামিরা, তোমরা কি এটিকে চিনতে পারছ?” তখন তারা ঘাড় উঁচু করে বলবে, “হ্যাঁ, আমরা চিনতে পারছি, এটি হলো মৃত্যু।” এরপর মৃত্যুকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে নিয়ে আসার আদেশ করা হবে এবং তাকে জবাই করে দেওয়া হবে। এরপর জান্নাতিদের ডাক দিয়ে বলা হবে, “হে জান্নাতিরা, তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে, তোমাদের কখনো মৃত্যু হবে না।” এরপর জাহান্নামিদের ডেকে বলা হবে, "হে জাহান্নামিরা, তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে, তোমাদের কখনো মৃত্যু হবে না।” তখন হৃদয়বান মানুষদের বলা হবে, "তোমরা কখনো এখানে ক্ষুধার্ত হবে না। তোমরা এখানে সব সময় সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা এখানে সব সময় জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা এখানে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে, কখনো প্রস্থান করবে না। তোমরা এখানে চির যৌবনে থাকবে, কখনোই বৃদ্ধ হবে না।” আর উদাসীন ও জাহান্নামিদের বলা হবে, "তোমরা এখানে চিরকাল থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না।”
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ
"যদি আপনি দেখতেন, যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, "হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দেখলাম এবং শ্রবণ করলাম। এখন আমাদের পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে গেছি।”২৯
তখন তারা ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে। কিন্তু তাদের এই আশা কতই না দূরবর্তী হবে! এরপর রাসুল তিলাওয়াত করলেন :
وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ 'আপনি তাদের পরিতাপ দিবস সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিন, যখন সব ব্যাপারের মীমাংসা হয়ে যাবে; অথচ তারা রয়েছে উদাসীনতায় বিভোর এবং তারা ইমান আনছে না।'৩০
إِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا وَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ “আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী হব পৃথিবীর এবং তার ওপর যারা আছে তাদের এবং আমারই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।”৩১
হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহকে ভয় করো। উদাসীনতার ধূলি ঝেড়ে ফেলে দাও। বিদায়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। কারণ, হয়তো তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছ, কিন্তু আর সকালে উপনীত হতে পারবে না। অথবা তুমি সকালে উপনীত হয়েছ, কিন্তু আর সন্ধ্যায় উপনীত হতে পারবে না। যুবক তার যৌবনের মাধ্যমে প্রতারিত হয়। তুমি খেয়াল করে দেখো যে, যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মাঝে অনেক যুবকও আছে। বৃদ্ধ লোক প্রতারিত হয় তার সুস্থতার মাধ্যমে। অথচ অসুস্থতা সহসা চলে আসে। অসুস্থতা যার কাছে এসেছে, মৃত্যু তার নিকটবর্তী হয়েছে। মানুষের জন্য আশ্চর্য লাগে যে, যদি তারা ফিকির করত এবং নিজেদের হিসাব গ্রহণ করত, তাহলে দুনিয়াকে তারা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত এবং ভিন্নরূপে তারা তা অতিক্রম করত। দুনিয়া হলো তাদের জন্য অতিক্রমের জায়গা; গর্বের জায়গা নয়। গর্ব শুধু মুত্তাকিদের জন্য। আগামীকাল যখন হাশরের ময়দানে সকলে উপস্থিত হবে, তখন মানুষ জানতে পারবে যে, তাদের সঞ্চয়কৃত সবকিছুর মাঝে তাকওয়া ও নেক আমলই সর্বোত্তম। হে আল্লাহ, আমাদের সামনে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখান এবং আমাদের তা অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখান এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ, আমাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং আমাদের হৃদয়ে তা সজ্জিত করে দিন। কুফর, ফিসক এবং অবাধ্যতাকে আমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে দিন। হে আমাদের রব, আমাদেরকে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ, আমাদের কাতারগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে দিন এবং আমাদের ঐক্যকে সুসংহত করে দিন। হে বিশ্ব প্রতিপালক, আমাদেরকে উত্তম অবস্থায় আপনার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যান। হে আল্লাহ, ফিলিস্তিন, শিশান, কাশ্মীর, ফিলিপাইন, ইরাক এবং আফগানিস্তানসহ সব জায়গার দুর্বলদের সাহায্য করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদের জন্য সহযোগী, সমর্থনকারী, পৃষ্ঠপোষকতাকারী হয়ে যান। হে আল্লাহ, যারা তাদের সাহায্য করেছে, আপনি তাদের সাহায্য করুন। যারা তাদের লাঞ্ছিত করেছে, আপনি তাদের লাঞ্ছিত করুন। হে আল্লাহ, আমাদের কাছে থাকা মন্দের কারণে আপনার কাছে থাকা কল্যাণ থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার এবং সমস্ত সাহাবির ওপর।

টিকাঃ
১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
২. সুরা আন-নিসা, ৪: ১।
৩. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৪. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৪।
৫. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৯৯।
৬. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৯।
৭. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:১।
৮. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ২।
৯. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ৩।
১০. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৮৪৬।
১১. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৩।
১২. সুরা তহা, ২০: ১৩২।
১৩. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
১৪. সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৮, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৪০।
১৫. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৭৭।
১৬. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৭৯।
১৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৬৫।
১৮. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ২৭।
১৯. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৪৬।
২০. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৫০।
২১. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৫১।
২২. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৬১।
২৩. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
২৪. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৬।
২৫. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৭।
২৬. সুরা কফ, ৫০:১৮।
২৭. সুরা আল-আহকাফ, ৪৬: ৩১।
২৮. সুরা আল-আহকাফ, ৪৬: ৩২।
২৯. সুরা আস-সাজদা, ৩২: ১২।
৩০. সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৩৯।
৩১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৪০।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত লোকদের কাহিনি

📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত লোকদের কাহিনি


بسم الله الرحمن الرحيم

প্রিয় সুধী,
আমাদের আজকের আলোচনা তাদের নিয়ে নয়, যারা পানিতে ডুবে মারা যায়। তারা তো আল্লাহর ইচ্ছায় শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে, যদি নেককার হয়। আজকের এই আলোচনা তাদের নিয়ে, যারা ডুবে আছে প্রবৃত্তি ও কামনার সাগরে। যারা খাহিশাতের কাঁটাতারে আটকা পড়েছে আর তাতেই সুখবোধ করে। তাদের অবস্থা এমন যে, যেন তারা এই দুনিয়ায় চিরকাল থাকবে। তারা ভুলে গেছে যে, দুনিয়া হচ্ছে একটি যাতায়াত স্থান ও পরীক্ষাকেন্দ্র। যার পরে রয়েছে হিসাব-নিকাশ ও ফলাফল। অথচ দুনিয়া উপার্জন করতে করতে জওয়ান মানুষ বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে ভুলে যায় বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক ও আসমান-জমিনের মালিক পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার কথা।
আজকের এই আলোচনা সেসব পথহারা পথিকের প্রতি, যাদের কপালে দুঃখ- দুর্দশা ও ধ্বংস-বিনাশের ছাপ দৃশ্যমান। কারণ তারা পাপের সাগরে ডুবে আছে। যার ফলে তাদের হৃদয়গুলো অন্ধ হয়ে গেছে, বিবেক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাদের নিকট থেকে সুখ ও পরিতৃপ্তি বিদায় নিয়েছে আর তাদেরকে মাঝ পথে এনে ছেড়ে দিয়েছে।
সাঈদ বিন মুসাইয়িব বলেন, 'কতক মানুষ আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নিজেদের অনেক সম্মানিত করে নেন এবং আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে নিজেদের তারা অপমানিত করেন না।' এই পয়গাম তাদের প্রতি, যাদের জীবনে প্রবৃত্তি ও কামনাবাসনা পূরণ করা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। এভাবেই তারা জীবনভর অবাধ্যতা ও লাঞ্ছনার মাঝে ডুবে থাকে। আপনারা তাদের দেখবেন, তারা প্রকাশ্যে নাফরমানি করে বেড়ায় এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়। তাদের অনুভূতি থেকে হারিয়ে গেছে রাসুল -এর এই বাণীটি। তিনি বলেন, (كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا المُجَاهِرِينَ) ‘প্রত্যেক উম্মতকে ক্ষমা করা হবে তবে প্রকাশকারী ব্যতীত।৩২
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
'আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য অনেক জিন ও মানুষ। তাদের হৃদয় আছে, যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে, যা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, যা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত; তারাই হলো উদাসীন।'৩৩
তারা পাপের মাঝে ডুবে থাকে, কিন্তু বুঝতেও পারে না যে কী করছে তারা। এমন পথে তারা হাঁটে, যার শুরু হলো দোষ-ত্রুটি ও লাঞ্ছনা দিয়ে আর শেষ হয় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে। এদের আলোচনা শুরু করার আগে আমি তাদের প্রতি কিছু কথা বলতে চাই, যারা মুক্তির তরিতে আরোহণরত। আসুন, পাপাচারে ডুবে থাকা এই মানুষগুলোকে উদ্ধারের জন্য আমরা একে অপরের সহযোগী হই। তারা একটি দয়ার্দ্র দিলের অভাব অনুভব করছে। আর যারা দয়া করে, দয়াময় আল্লাহও তাদের দয়া করেন। তারা একটু সুন্দর আচরণের মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। আর উত্তম কথা তো সদাকা সমতুল্য। তারা একটি প্রস্ফুটিত মুচকি হাসির অভাব অনুভব করছে। আর আপনার ভাইয়ের জন্য আপনার একটি মুচকি হাসিও তো সদাকা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفْضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكَّلِينَ
‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে অবশ্যই তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন, তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। আর যখন কোনো কাজের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। আল্লাহ (তাঁর ওপর) ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।'৩৪
তাদের কিছু অবস্থা বর্ণনা করছি, তাদের দিন-রাত সবই সমান। সারাক্ষণ পাপের সাগরে ডুবন্ত তারা। তারা ভাবে, মনের খায়েশ পূরণ করার মাঝেই সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে। পার্থিব ভোগবিলাস আর সাজসজ্জার মাঝেই প্রকৃত শান্তি খোঁজে তারা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ
'শয়তান তাদের বশীভূত করে নিয়েছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে।'৩৫
এ ধরনের মানুষগুলো ভ্রমণের নির্ধারিত সময় ঠিক রাখার জন্য, সঠিক সময়ে ফ্লাইট ধরার জন্য এবং ভ্রমণে বের হওয়ার জন্য ভোরবেলায় ঘুম থেকে জাগতে পারে। কিন্তু জাগতে পারে না ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। অথচ ফজরের নামাজে গাফিলতি করা মুনাফিকের আলামত। এদের দেখবেন, খেলার মাঠে বলের পেছনে দীর্ঘক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু নামাজের সময়ের প্রতি কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। মসজিদ তাদের অদূরে হওয়া সত্ত্বেও তাদের আপনি মুসল্লিদের মাঝে দেখবেন না। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর সাথিদের উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন:
محَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعاً سُجَّداً يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانَا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল; আর তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রত্যাশায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদারত দেখবেন। ৩৬
রাসুল বলেন : اكْلَفُوا مِنَ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ 'তোমরা ততটুকু আমল করো, যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে করা সম্ভব।'৩৭ (অপর এক হাদিসে তিনি বলেন( وَاعْلَمُوا أَنَّ خَيْرَ أَعْمَالِكُمُ الصَّلَاةَ ‘আর জেনে রেখো, তোমাদের সবচেয়ে উত্তম আমল হলো নামাজ।'৩৮
আপনি কখনোই নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া ছাড়া আল্লাহ তাআলার অধিক নৈকট্যশীল হতে পারবেন না। বস্তুত নামাজের মাঝেই রয়েছে আত্মার প্রশান্তি। রাসুল নামাজের সময় হলে বিলাল -কে উদ্দেশ্য করে বলতেন: أَرِحْنَا بِهَا يَا بِلَالُ 'নামাজের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও হে বিলাল!’৩৯
মনে রাখবেন, صَلَاةَ -কে এ জন্যই صَلَاةَ বলা হয়, সালাত স্বয়ং সালাত আদায়কারীকে এবং এর প্রতি যত্নবান ব্যক্তিকে নিয়ে জান্নাতে চলে যায়। আর যে সালাত ত্যাগ করে এবং সালাতকে অবহেলা করে, তাকে তা জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। তাহলে আপনি কোনটিকে পছন্দ করবেন?
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তাঁর আত্মাকে প্রশান্ত করে দিন) বলেন, 'কতক আলিম আমাকে বলেছেন যে, পারস্যের কয়েকজন শাসক এক শাইখকে (আমি তাকে দেখেছি) বললেন, মানুষ এক জায়গায় নাচ-গান করার জন্য একত্রিত হয়েছে। হে শাইখ, যদি এটাই হয় জান্নাতের পথ, তবে জাহান্নামের পথ আর কোনটি?!'
পাপীদের আরও কিছু অবস্থা হলো, তাদের সময়গুলো হেলাখেলা, গানবাজনা ও আনন্দ-উল্লাসে কাটে। তারা ভালো কিছু করতে পারে না। কোনো খারাপ কাজকে তারা খারাপ মনে করে না। এরা অনেক গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা ও চরিত্রহীন লোকদের নাম মুখস্থ বলে দিতে পারে। অনেকের অবস্থা তো এমন যে, তারা এই নায়ক-গায়কদের রুচিবোধ, আগ্রহ-অনাগ্রহ ও স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা রাখে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেকেই এদের স্ত্রী, সন্তানদের নাম পর্যন্ত জানে। কিন্তু আফসোস, বড়ই আফসোস তাদের জন্য! তারা রাসুল ﷺ, সাহাবায়ে কিরাম এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনদের সিরাত সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। তারা প্রতিদিন হরেক রকমের পেপার-পত্রিকা পাঠ করে—এগুলোর পেছনে বহু অর্থ ব্যয় করে। অথচ এক মুহূর্তের জন্যেও কুরআন তিলাওয়াত করে না। যখন রাস্তায় সিগন্যালের সময় গাড়িগুলো অপেক্ষমাণ থাকে, তখন দেখবেন, তারা গান ছেড়ে গানের তালে তালে দুলতে থাকে। গানের উন্মাদনায় তাদের দেহ-মন উদ্বেলিত হতে থাকে। অথচ পবিত্র কুরআন শ্রবণের সময় তাদের হৃদয় একটুখানি প্রকম্পিত হয় না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكُهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُوراً
“তুই সত্যচ্যুত কর তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস স্বীয় আওয়াজ দ্বারা, স্বীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ কর, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে অংশীদার হয়ে যা এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দে।” শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়। '৪০
রাসুল ﷺ বলেন:
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ، يَسْتَحِلُّونَ الحَرَ وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ وَالمَعَازِفَ...
'আমার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।...'৪১
(ভেবে দেখুন তো, আজ এমন লোক আছে কি না!)
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'যারা গানবাজনা-প্রিয়, তাদেরকে একজন উত্তম উপদেশদাতার মতো উপদেশ দিন। যাতে তারা আপনার উপদেশ শুনে।...'
আমার ভাইয়েরা,
আজ সর্বত্র মুসলিম উম্মাহর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, শিশান-সহ এমন আরও বহু রাষ্ট্রের মুসলিমদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। তারা সকাল-সন্ধ্যায় জপতে থাকে-
هَا هُوَ الْأَقْصَى يَلُوْكُ جِرَاحَهُ *** وَالْمُسْلِمُوْنَ جُمُوْعُهُمْ أَحَادٌ دَمْعُ الْيَتَامَى فِيْهِ شَاهِدٌ ذُلَّةٌ *** وَسَوَادُ أَعْيُنُهُنَّ فِيهَا حَدَادُ يَا وَيْلَنَا مَاذَا أَصَابَ رِجَالَنَا *** أَوَ مَا لَنَا سَعْدُ وَلَا مِقْدَادُ
'দেখো, আকসার দেহ থেকে রক্ত ঝরছে! অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ শতধা বিভক্ত। এতিমের চোখের পানিতে দেখো ফুটে আছে আমাদের লাঞ্ছনার ইতিহাস, চোখের তারায় দেখো শোকের দুঃখগাথা। হায়, আমাদের যুবকদের আজ কী হয়ে গেল? আমাদের মাঝে কি একজন সাদ বা মিকদাদ নেই?'
যেখানে মুজাহিদদের রাত-দিন কাটে ভারী অস্ত্র, ট্যাংক ও কামানের আওয়াজে। সেখানে এদের রাত-দিন কাটে গানবাজনার মাঝে উন্মাদ হয়ে। তারা গানের সাগরে ডুবে যায়, বুঝতেও পারে না নিজের অবস্থা। তাদের দেখবেন বাজারে, কমপ্লেক্সে সব জায়গাতেই বাহ্যিক দিকটাকেই গুরুত্ব দেয়। নিজ ব্যক্তিসত্তার প্রতি খুবই যত্নবান তারা। অথচ তাদের অন্তরগুলো রয়ে যায় গুরুত্বহীন। বেশির ভাগ যুবক-যুবতিরই আজ এই অবস্থা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
إِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
"আপনি যখন তাদের দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনাকে মুগ্ধ করে আর তারা যদি কথা বলে, আপনি তাদের কথা শুনেন।"৪২
মুসলমানদের সম্মান রক্ষা তো দূরের কথা, এরা মুসলমানদের সম্মানহানি আর তাদের সরল মনগুলো নিয়ে খেলা করতে চায়। তারা কেমন যেন ভুলেই যায় যে, তাদেরও মা, বোন ও আত্মীয়-স্বজন আছে। আসলে তারা পাপের মাঝে এমনভাবে মত্ত হয়ে যায় যে, নিজেরাও অনুধাবন করতে পারে না নিজের কৃতকর্মের ব্যাপারে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। এক যুবক নবিজি -এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে জিনার অনুমতি দিন।' সাথে সাথে মজলিশের সকলেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। তিনি স্নেহশীল হৃদয় এবং দয়ার্দ্র অন্তর নিয়ে বললেন, তার ওপর রহমত নাজিল হোক। অতঃপর যুবকটি কাছে আসলে রাসুল তাকে বললেন, “তোমার মায়ের জন্য কি তুমি এই কাজটি পছন্দ করবে?” সে বলল, "আপনার জন্য আমার বাবা-মা উৎসর্গ হোক। আমি তা কখনোই পছন্দ করব না।" রাসুল বললেন, “সকল মানুষের অবস্থা এমনই। কেউ কারও মায়ের জন্য এমন কাজ পছন্দ করে না।" তিনি বললেন, "তুমি কি তোমার বোনের জন্য এই কাজটি পছন্দ করবে?” সে উত্তরে বলল, "আপনার জন্য আমার বাবা-মা উৎসর্গ হোক, তা আমি কখনোই পছন্দ করব না।” সে এটা বলতেই থাকল। রাসুল তাকে আবার বললেন, "তুমি কি তোমার ফুফুর জন্য..., তোমার খালার জন্য..., তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ করবে?" যুবকটি বলল, "না, কখনোই না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন।" অতঃপর নবিজি তাঁর পবিত্র হাত মুবারক যুবকটির গায়ে রেখে বললেন, “হে আল্লাহ, আপনি তার পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তার অন্তর পবিত্র করে দিন এবং তার লজ্জাস্থানের সুরক্ষা দান করুন।" অতঃপর যুবকটি মজলিশ থেকে উঠে গেল। তখন তার মনের মধ্যে জিনার চেয়ে অপ্রিয় ও নিন্দনীয় আর কিছুই ছিল না।৪৩
এই যুবক রাসুলের মজলিশ থেকে ওঠার সময় তার মানসিকতা এতটাই উচ্চ ও চাঙা হয়ে গেছে। আর তুমি! তুমি এখনো জিনার নেশায় বুঁদ হয়ে আছ। এর জন্য পরিকল্পনা করছ। এই খারাপ কাজটি চরিতার্থ করার জন্য এখানে সেখানে সফর করছ। আচ্ছা, তোমাকে বলছি। তুমি কি এই কাজটি তোমার পরিবারের কারও সাথে সংঘটিত হওয়াকে মেনে নেবে? এমনটি পছন্দ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর তোমার বিবেকের কাছে ছেড়ে দিলাম।
আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে বড় নাফরমানি হলো, কারও সাথে অবৈধ মেলামেশা করা। তিনি বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
'আর তোমরা জিনার নিকটবর্তীও হোয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পন্থা। '৪৪
হাসান বসরি বলেন, 'উমর বিন খাত্তাব-এর সময়ে এক যুবক ছিল। সে সর্বদা মসজিদে ইবাদতে ব্যস্ত থাকত। তার এই স্বভাব দেখে একজন মহিলা তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। অতঃপর মহিলা তার সাথে একান্তে কথা বলার জন্য আসে।' ভালো করে শুনুন। ছেলেটি কিন্তু তার কাছে যায়নি। মহিলাটি এসেছে। 'অতঃপর সে তার সাথে কথা বলল। এরপর সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল এবং তার কাছে সব অন্ধকার হয়ে আসলো। তারপর তার এক চাচা এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে গেল। পরে তার জ্ঞান ফিরে পেলে সে বলল, "চাচা, আমাকে উমর-এর কাছে নিয়ে যান। তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, যে তার প্রভুকে ভয় করে, তার প্রতিদান কী?” অতঃপর তার চাচা উমর-এর কাছে আসলেন। যখন উমর তাকে দেখলেন, তখন সে কান্না করে দিল এবং মারা গেল। তারপর উমর তার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন:
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ فَبِأَيِّ آلَاء رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
“আর যে তার পালনকর্তার সামনে পেশ হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?"৪৫
আল্লাহ তাআলাই তার পরিণতি সম্পর্কে ভালো জানেন। তবে আমি মনে করি, সে আরশের নিচে ছায়াপ্রাপ্ত সাত শ্রেণির একপ্রকারের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হবে। যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না। সেদিন সাত শ্রেণির লোককে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। তন্মধ্যে এক শ্রেণির ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুল বলেন:
وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةً ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ، فَقَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ،
'এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো মর্যাদাবান রূপসী নারী (মন্দ কাজের প্রতি) আহ্বান করল, কিন্তু সে বলল, “নিশ্চয় আমি আল্লাহকে ভয় করি।”৪৬
সুতরাং তোমাকে বলছি, যে সব সময় গুনাহ আর অবাধ্যতায় লিপ্ত! হে দাম্ভিক ও কঠিন সীমালঙ্ঘনকারী, তুমি তো ক্ষতির মধ্যেই রয়ে গেলে। অথচ যারা আল্লাহকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত। তোমার কপালে তা জুটবে কী করে!
পাপ কাজ করা, গুনাহে লিপ্ত থাকা পাপীদের জন্য এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাদের পাপের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
ظُلُمَاتٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ إِذَا أَخْرَجَ يَدَهُ لَمْ يَكَدْ يَرَاهَا وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُوراً فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ
'একের ওপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোনো জ্যোতিই নেই। '৪৭
তাদের জীবনের নেই কোনো নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা, শান্তি ও স্থিরতা। বরং বলা যায়, তারা প্রাণহীন এক জীবনই অতিবাহিত করে। কারণ ইমান ছাড়া জীবনের কোনো মূল্যই নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
'যারা ইমান এনেছে এবং তাদের ইমানকে জুলুমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা আর তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। '৪৮
তাদের অন্তরগুলো পাপের নির্যাতনে ক্রন্দন করছে আর অভিযোগ করছে। পাপ তাদের অন্তরে ইমানের আলোকে নিভিয়ে দিয়েছে। আক্ষেপ আর দুঃখে তাদের কলিজা ছিঁড়ে গেছে। দুশ্চিন্তা তাদের বিনিদ্র রাখে। পাপ করতে করতে পাপের অতল সমুদ্রে ডুবে যায় তারা। একের পর এক বিপদের মধ্যে হারিয়ে যায়। দুশ্চিন্তার পর দুশ্চিন্তা তাদের গ্রাস করে। তবুও তারা আল্লাহকে স্মরণ করে না-তাঁর কাছে তাওবা করে না।
আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى - قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيراً
'আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো (আগে) চক্ষুষ্মান ছিলাম।”'৪৯
সে তার ভ্রষ্টতা, অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য সত্ত্বেও আল্লাহর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। তিনি ইরশাদ করেন:
قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيراً - قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى - وَكَذَلِكَ نَجْزِي مَنْ أَسْرَفَ وَلَمْ يُؤْمِن بِآيَاتِ رَبِّهِ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبْقَى
‘সে বলবে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো (আগে) চক্ষুষ্মান ছিলাম।” তিনি বলবেন, “এমনিভাবে তোমার কাছে আমার নিদর্শনসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে (তার প্রতি কোনো গুরুত্ব দাওনি)। আজ তাই তেমনিভাবে তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে। আর এভাবেই আমি সেই ব্যক্তির প্রতিফল দিয়ে থাকি, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার প্রভুর নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করে। আর পরকালের শাস্তি তো অবশ্যই কঠিনতর ও অধিকতর স্থায়ী (হবে)।"৫০
এরা পাপের মাঝে ডুবে থাকে। আল্লাহর কাছে তাওবা করার জন্য একটু চিন্তাও তাদের মাঝে আসে না। সামান্য লজ্জাবোধও জাগ্রত হয় না তাদের দিলে। তাদের মনের মধ্যে সব সময় কুমন্ত্রণা ঘুরপাক খেতে থাকে। তাদেরকে তাওবাকারীদের দলে আহ্বান করা হয়; অথচ তারা ফিরেও তাকায় না। তারা নসিহত শুনে, কিন্তু তা গ্রহণ করে না। মৃতদের দাফন করে, কিন্তু তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। তারা সত্যকে দেখে, কিন্তু সত্য পথে চলে না। তাদের সত্যের দিকে ডাকা হয়, কিন্তু তারা সাড়া দেয় না।
তাদের আমরা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবো-
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ وَمَن لَّا يُجِبْ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزٍ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء أُوْلَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
'হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর (নবির) ডাকে সাড়া দাও এবং তার কথায় বিশ্বাস করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে তোমাদের রক্ষা করবেন। আর যারা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেবে না, তারা পৃথিবীতে (আল্লাহকে) অক্ষম করতে (অর্থাৎ আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পেতে) পারবে না এবং তিনি ছাড়া তাদের সাহায্যকারীও থাকবে না। তারা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।'৫১
এসব তো পাপীদের সার্বিক অবস্থার বর্ণনা করলাম। আসুন, এবার তাদের কিছু ঘটনা শোনা যাক:
যখন তাদের মধ্য থেকে কেউ তাওবা করে মুক্তির তরিতে আরোহণ করে, তখন তার অন্য সঙ্গীরা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে। সবাই সমালোচনায় মিডিয়া-ওয়ার শুরু করে দেয়। সমালোচনার তির ছুঁড়ে তার দিকে এবং তার পূর্বের ভুলগুলো বারবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। কেউ বলে, 'সে এই অবস্থায় বেশি থাকবে না। আবার আগের পথেই ফিরে আসবে।' কেউ বলে, 'মাত্র কয়েকটা দিন বা সপ্তাহ পেরুলেই তাকে আবার পূর্বের অবস্থাতেই দেখা যাবে।'
আর একটি শ্রেণি আছে এমন, যারা তাকে বর্তমান অবস্থার ব্যাপারে ভালো উপদেশ দেয়। নসিহত করে। সান্ত্বনা দেয়। তাকে বলে, 'এই পথে থাকতে তোমার কীসের অসুবিধা! তুমি তো কল্যাণের ওপরই আছ।' সুবহানাল্লাহ! এই শ্রেণির মানুষগুলো যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, আল্লাহর বিধানাবলি পালন করে না, সারাক্ষণ পাপের সাগরে ডুবে থাকে—এমন লোকদের দ্বীনের পথে ফিরে আসতে সাহস জোগায়, উৎসাহ দেয়। দ্বীনের পথে ফিরে আসা ব্যক্তিকে বলে, 'তুমি তো ভালো পথেই রয়েছ।'
পক্ষান্তরে অসৎ মানুষগুলো মন্দের দিকেই আহ্বান করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضُ لَهُ شَيْطَانَا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ - حَتَّى إِذَا جَاءنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ - وَلَن يَنفَعَكُمُ الْيَوْمَ إِذْ ظَلَمْتُمْ أَنَّكُمْ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ - أَفَأَنتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ أَوْ تَهْدِي الْعُمْيَ وَمَن كَانَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ فَإِمَّا نَذْهَبَنَّ بِكَ فَإِنَّا مِنْهُم مُنتَقِمُونَ - أَوْ نُرِيَنَّكَ الَّذِي وَعَدْنَاهُمْ فَإِنَّا عَلَيْهِم مُّقْتَدِرُونَ فَاسْتَمْسِكُ بِالَّذِي أُوحِيَ إِلَيْكَ إِنَّكَ عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ وَإِنَّهُ لَذِكْرُ لَّكَ وَلِقَوْمِكَ وَسَوْفَ تُسْأَلُونَ
'করুণাময় আল্লাহর স্মরণ থেকে যে বিরত থাকে, তার জন্য আমি এক শয়তানকে নিয়োজিত করি। অতঃপর সে-ই হয় তার সহচর।
তারাই তাদের (শয়তানেরা মানুষদের) সৎপথ তেকে বিরত রাখে; আর মানুষেরা মনে করে যে, তারা সৎপথে আছে। অবশেষে সে যখন আমার কাছে আসবে, তখন সে (তার সহচর শয়তানকে) বলবে, “হায়, আমার ও তোমার মধ্যে যদি দুই পূর্বের (অথবা পূর্ব ও পশ্চিমের) দূরত্ব থাকত! কত খারাপ সহচর সে!” যেহেতু তোমরা জুলুম করেছ, তাই শাস্তিতে তোমরা (তোমরা ও তোমাদের সহচর শয়তানেরা) শরিক হলেও আজ তোমাদের কোনো লাভ হবে না।
আপনি কি বধিরদের শোনাতে পারবেন? কিংবা অন্ধদের এবং যে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে আছে, তাকে পথ দেখাতে পারবেন? আমি যদি আপনাকে নিয়েও যাই, তবু তাদের শাস্তি দেবোই। অথবা তাদেরকে যে শাস্তির ওয়াদা দিয়েছি, তা যদি আপনাকে দেখাই, তবু তাদের ওপর আমার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। অতএব, আপনার কাছে যে ওহি পাঠানো হয়, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন। নিশ্চয় আপনি সঠিক পথে আছেন। আর এ কুরআন তো আপনার জন্য ও আপনার সম্প্রদায়ের জন্য একটি উপদেশ এবং শীঘ্রই আপনারা (এ ব্যাপারে) জিজ্ঞাসিত হবেন। '৫২
পাপিষ্ঠদের অবস্থা এমনই। তারা একা পাপী হতে চায় না। বরং নিজেদের মতো অন্যদেরকেও পাপের সাগরে ডুবিয়ে মারে। আর যদি আপনি তাদের উদ্ধার করতেও চান, তারা আপনাকেও তাদের সাথে শামিল করতে চাইবে। যে মহিলা জিনা করে, সে চায় জগতের সব নারী যদি ব্যভিচারী হয়ে যেত, তাহলে তারা সবাই সমান হয়ে যেত।
আশ্চর্য ব্যাপার! তাদের একজন সাথির হিদায়াতে তারা খুশি না হয়ে বরং পরিকল্পনা করে যে, তাকে কীভাবে হিদায়াতের পথ থেকে সরিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়।
আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, এক যুবক আল্লাহর দ্বীনের পথে ফিরে এসে তার ওপর অবিচল থাকার নিয়ত করল। তাই সে পরিপূর্ণরূপে মুক্তির পথে পা বাড়াল। সেই লক্ষ্যে সে নামাজের প্রতি যত্নবান হচ্ছিল এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছিল। সে তার আগের কিছু খারাপ বন্ধুর কথা মনে করে করে বলত, 'হায়, যদি তারাও আমার মতো হিদায়াতের পথে চলে আসত!' সে সর্বদা এটাই কামনা করত যে, 'তারা যদি আমার মতো মুক্তির তরিতে আরোহণ করত! তারাও যদি সত্যের পথে ফিরে আসা কাফেলায় শামিল হতো! সে তাদের দেখতে গেল। (এই ঘটনাটি সকল নতুন করে দ্বীনের পথে আসা ভাইদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আপনি আপনার পুরাতন বন্ধুদের দেখার জন্য একাকী যাবেন না। বরং সাথে এমন কাউকে নিয়ে যাবেন, যিনি তাদের দাওয়াত দিতে পারবেন। কেননা, সংখ্যাধিক্য বীরদেরকেও পরাজিত করতে পারে।)
এই ভাইটি তাদের সাথে একাকী দেখা করতে গেল। অতঃপর তার ওপর ধ্বংসলীলা নামতে থাকল একের পর এক। সবাই তাকে বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করল। অতীতের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে লাগল। সবাই মিলে একত্রে হাসাহাসি শুরু করে দিল। তারা যখন অতীতের স্মৃতিগুলো নতুন করে বলছিল, তখন সে তাদের কাছ থেকে উঠে গেল। তারা বিভিন্ন কথা বলে তার অন্তর নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করল। নতুন করে শুরু হলো তার সাথে যুদ্ধ। এর কয়েকদিন পর সবাই মিলে তার কাছে আসলো এবং তাকে কাছেই এক জায়গায় গাড়ি ক্রয় করার জন্য তাদের সাথে যেতে অনুরোধ করল। তাকে বলল যে, 'আমরা এমন একজন মানুষের কাছে যাব, যিনি আমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের নামাজের ইমামতি করেন। এ ছাড়াও তিনি আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেন।' এসব শুনে তার • মন যেতে প্রস্তুত হয়ে গেল এবং সবার সাথে রওয়ানা করল সে। (হায়, যদি সে তাদের সাথে না যেত!) তারা সেখানে একটি সজ্জিত এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে তাকে সেখানে একা রেখে দিল। এরপর তারা সকলে সেখান থেকে সরে গিয়ে পরিকল্পনা আঁটতে লাগল যে, তাকে কীভাবে আবার অবাধ্যতা আর নাফরমানির পথে ফিরিয়ে আনা যায়। তারা সকলে পাশের এক জায়গায় গানবাজনায় মত্ত হয়ে রাত কাটিয়ে দিল। এদিকে সে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। তারা এক পতিতার সাথে চুক্তি করে নিল এই মর্মে যে, তারা পতিতাকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দেবে, যদি সে তাদের ওই বন্ধুকে খারাপ কাজে লিপ্ত করাতে পারে। হায়, আল্লাহ! এরা আল্লাহর রাস্তা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করছে! অতঃপর তারা এই নারীকে তার কক্ষে প্রবেশ করিয়ে দিল। তার সাথে ছিল মদ আর গানের উপকরণ। যেন রাতের শয্যাটা রঙিন করা যায়। মদ মানুষের বিবেককে লোপ করে দেয়। গানের দ্বারা জিনার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। অতঃপর দুজন একাকী হয়ে গেল। (আর যখনই দুজন নারী-পুরুষ একাকী হয়, তখন শয়তান তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয়ে আসে।) সেই নারী তার সাথে চেষ্টা ও জোরাজুরি করেই যাচ্ছিল। অবশেষে সে তাকে এক গ্লাস মদ পান করিয়ে দিল সুযোগ বুঝে। এভাবে কয়েক গ্লাস পান করিয়ে দিল। অবশেষে চূড়ান্ত ও জঘন্য কাজটি ঘটে গেল। কয়েক মুহূর্তেই সে হারিয়ে গেল অধঃপতনের অতল গহ্বরে। অতঃপর সে ক্লান্ত শরীরে বস্ত্রহীন অবস্থায় মাতাল হয়ে তার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল। নাউজুবিল্লাহ। সকাল হলে মানুষরূপী শয়তানগুলো এসে অট্টহাসি দিতে দিতে দরজায় করাঘাত করতে লাগল। কামরার ভেতরে থাকা অসৎ নারীটি তখন দরজা খুলে দিল। তারা উৎসুক হয়ে সেই নারীকে জিজ্ঞেস করল, 'কোনো সুসংবাদ আছে?' পতিতা নারীটি বলল, 'হ্যাঁ, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। সে সবকিছুই করেছে আমার সাথে। মদ পান করেছে, জিনা করেছে, তারপর সে খালি গায়েই বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছে।' (ধ্বংস এমন মানুষগুলোর জন্য) তারা নিজেরা পাপ করে এবং অন্যকে পাপের পথে এনে খুশি হয়! তাদের যেই সাথি এত দিন নামাজ পড়ত, কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগী ছিল, তারা তাকে নাফরমানিতে বাধ্য করতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করছে! অতঃপর সকলে হাসতে হাসতে তার কক্ষে প্রবেশ করল। তখন সে বিছানায় শুয়ে ছিল। তারা তাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করল। ডাকতে থাকল তার নাম ধরে। কিন্তু তখনো সে সাড়া দিল না। সাড়া না দেওয়ায় তারা বারবার ডাকতে থাকল। তবুও সাড়া মিলল না তার। তারা তার বিছানায় নাড়া দিল, তবুও সে জাগ্রত হলো না। আহ, শুনুন তার অধঃপতনের কথা! তাদের সাথি মদ পান করল, জিনা করল, অতঃপর রাতে ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করল! সে তার বিছানায় এভাবেই মন্দ অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। দুনিয়া থেকে বিদায় নিল! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হে আল্লাহ, তাদের এই সাথি তো নামাজ পড়ত, রোজা রাখত, কুরআন তিলাওয়াত করত। কী হয়ে গেল তার! সে তো তাদের সাথে জীবিত অবস্থায়ই এসেছে। কিন্তু এখন কী অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে গেল!
সে তো তাদের জন্য হিদায়াত কামনা করেছে। অথচ তারা তাকে পথভ্রষ্ট করতেই চেয়েছে। এমনকি পথভ্রষ্ট করার জন্য নিজেদের অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে। তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল যে, তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখা। তারা তো তাদের উদ্দেশ্যে সফল হয়েছে। আল্লাহর অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে এনেছে তাকে। এবার কি তারা তাকে আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করতে পারবে? আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلاً - يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانَا خَلِيلاً - لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جاءني وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولاً
'আর (স্মরণ করুন) যেদিন জালিম নিজের দুই হাত কামড়াবে আর বলবে, “হায়, আমি যদি রাসুলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম! হায়, আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ (কুরআন) আসার পর সে-ই তো আমাকে তা থেকে বিপথে নিয়েছিল। আর শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।”৫৩
কবি বলেন:
فلا تَصْحَب أخا الفِسْقِ وإِيَّاكَ وإيَّاهُ فَكَمْ مِنْ فَاسِقٍ أَرْدَى مُطِيْعاً حِيْنَ آخَاهُ
'ফাসিককে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। দূরে থেকো তার থেকে, তাকেও সরিয়ে দাও দূরে। কত ফাসিক ধ্বংস করেছে কত নেককারকে, যখন তাদের মাঝে বন্ধুত্ব হয়েছে।'
এটাই হলো এসব পাপিষ্ঠদের হালত। আপনি তাদের রক্ষা করতে চাইবেন আর তারা আপনাকে অসৎ পথে নিয়ে আসতে চাইবে। কারণ তারা তো পাপের মধ্যেই ডুবে আছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَذَرْهُمْ فِي غَمْرَتِهِمْ حَتَّى حِينٍ أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِ مِن مَّالٍ وَبَنِينَ - نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لَّا يَشْعُرُونَ
'অতএব তাদের কিছু কালের জন্য তাদের অজ্ঞানতায় নিমজ্জিত থাকতে দিন। তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে যাচ্ছি। তাতে তাদেরকে দ্রুত কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না। '৫৪
তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:
أَفَرَأَيْتَ إِن مَّتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ - ثُمَّ جَاءَهُم مَّا كَانُوا يُوعَدُونَ - مَا أَغْنَى عَنْهُم مَّا كَانُوا يُمَتَّعُونَ
'আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদের বছরের পর বছর ভোগবিলাস করতে দিই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদের ওয়াদা দেওয়া হতো, তা তাদের কাছে এসে পড়ে। তখন তাদের ভোগবিলাস তাদের কি কোনো উপকারে আসবে?'৫৫
রাসুল বলেন:
إِنَّ مِنَ النَّاسِ مَفَاتِيحَ لِلْخَيْرِ، مَغَالِيقَ لِلشَّرِّ، وَإِنَّ مِنَ النَّاسِ مَفَاتِيحَ لِلشَّرِّ مَغَالِيقَ لِلْخَيْرِ، فَطُوبَى لِمَنْ جَعَلَ اللَّهُ مَفَاتِيحَ الْخَيْرِ عَلَى يَدَيْهِ، وَوَيْلٌ لِمَنْ جَعَلَ اللَّهُ مَفَاتِيحَ الشَّرِّ عَلَى يَدَيْهِ
'মানুষের মধ্যে কতক লোক আছে, যারা কল্যাণের চাবিকাঠি আর অকল্যাণের দ্বার রুদ্ধকারী। পক্ষান্তরে মানুষের মধ্যে কতক লোক আছে, যারা অকল্যাণের দ্বার উন্মোচনকারী এবং কল্যাণের দ্বার রুদ্ধকারী। সুতরাং সুসংবাদ তার জন্য, যার দুহাতে আল্লাহ কল্যাণের চাবি রেখেছেন। আর ধ্বংস তার জন্য, যার দুহাতে আল্লাহ অকল্যাণের চাবি রেখেছেন। '৫৬
তাদের পাপগুলো তাদের কোন অবস্থায় নিয়ে গেল! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ كَانُوا مِن قَبْلِهِمْ كَانُوا هُمْ أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَآثَاراً فِي الْأَرْضِ فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ وَمَا كَانَ لَهُم مِّنَ اللَّهِ مِن وَاقٍ، ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانَت تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَكَفَرُوا فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ إِنَّهُ قَوِيٌّ شَدِيدُ الْعِقَابِ
'তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না, যাতে দেখত তাদের পূর্বসূরিদের কী পরিণাম হয়েছে? তাদের শক্তি ও কীর্তি পৃথিবীতে এদের অপেক্ষা অধিকতর ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে তাদের গুনাহের কারণে ধৃত করেছিলেন এবং আল্লাহ থেকে তাদের রক্ষাকারী কেউ হয়নি। এর কারণ এই যে, তাদের কাছে তাদের রাসুলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি নিয়ে আগমন করত, অতঃপর তারা কাফির হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাদের ধৃত করেন। নিশ্চয় তিনি শক্তিধর, কঠোর শাস্তিদাতা। '৫৭
পাপ আর আল্লাহর অবাধ্যতা কত ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও জাতিকে যে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে গেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। দুনিয়া ও আখিরাতে যত অকল্যাণ সাধিত হয়, তার পেছনে একমাত্র কারণ পাপ আর আল্লাহর অবাধ্যতাই নয়কি? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
‘যখন তোমাদের ওপর একটি মুসিবত এসে পৌঁছাল, অথচ তোমরা তার পূর্বেই দ্বিগুণ কষ্টে পৌঁছে গেছ, তখন তোমরা বললে, “এটা কোথা থেকে এল?” (তাদের) বলুন, "এটা তোমাদের ওপর পৌঁছেছে তোমাদেরই পক্ষ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর ক্ষমতাশীল।'৫৮
কোন জিনিস ইবলিসকে ফেরেশতাদের রাজত্ব থেকে বের করে দিয়েছে, তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, লানত দিয়েছে, তার ভেতর-বাইর বিকৃত করে দিয়েছে, তার চেহারাকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও বিকৃত করে দিয়েছে? তার ভেতরটা বাইরের অংশ থেকেও অনেক নিকৃষ্ট ও বিকৃত। তার নৈকট্যকে দূরত্ব দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। রহমতের পরিবর্তে তাকে লানত দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্যকে অসুন্দর দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তার জান্নাতকে জাহান্নামে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ইমানের পরিবর্তে কুফরি গ্রহণ করেছে সে। তাই আল্লাহ তাআলা তাকে চূড়ান্তভাবে অপমান করেছেন এবং তাঁর করুণার দৃষ্টি থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তার ওপর মহান আল্লাহ তাআলার ক্রোধ আপতিত হয়েছে। তাই তিনি তাকে নিচে ফেলে দিয়েছেন এবং সবার কাছে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এমনই চেয়েছেন। তাই সে সকল পাপিষ্ঠ ও অনিষ্টকারীদের সরদারি করছে। সে ফেরেশতাদের সরদারি এবং আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে নিজের জন্য দুনিয়ার পাপিষ্ঠদের সরদারিতেই সন্তুষ্ট আর এটাই তার পছন্দনীয়। আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে এই বিতাড়িত শয়তান থেকে এবং তাঁর নির্দেশের অবাধ্যতা করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْؤُوماً مَّدْحُوراً لَّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ
'আল্লাহ বললেন, "বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। তাদের যে কেউ তোর পথে চলবে, নিশ্চয় আমি তোদের সবার দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করে দেবো।”৫৯
আল্লাহ তাআলা শয়তানের চক্রান্ত থেকে আমাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন:
يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْءَاتِهِمَا إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاء لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
'হে আদম-সন্তান, শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে, যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি, যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখো না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।'৬০
কোন জিনিস তাকে ওই অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে? নিশ্চয় তার পাপ এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে ঔদ্ধত্যই তাকে এই পরিণতি বরণ করতে বাধ্য করেছে। কী কারণে দুনিয়াবাসী পানিতে ডুবে গিয়েছিল? এমনকি পাহাড়ের উঁচুতেও পানি উঠেছিল। কীসের কারণে কওমে আদের ওপর তীব্র বাতাস প্রবাহিত হয়েছে? সেই বাতাস এতটাই তীব্র ছিল যে, তাদের সবাইকে মৃত করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِيَةٍ “তারা অসার খেজুর গাছের কাণ্ডের ন্যায় ভূপাতিত হয়ে রয়েছে।”৬১
কীসের কারণে কওমে সামুদের ওপর বিকট আওয়াজের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল? যার প্রভাবে তাদের অস্ত্রগুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। অবশেষে তারা মারাই গিয়েছে। কীসের কারণে ফিরআওন ও তার সম্প্রদায়কে পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে? অতঃপর তাদের আত্মাগুলোকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দেহগুলোকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে আর আত্মগুলোকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। নিশ্চয় এসবের একমাত্র কারণ হলো পাপ, গুনাহ এবং আল্লাহর অবাধ্যতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
كَذَّبَتْ ثَمُودُ وَعَادُ بِالْقَارِعَةِ - فَأَمَّا ثَمُودُ فَأُهْلِكُوا بِالطَّاغِيَةِ - وَأَمَّا عَادُ فَأُهْلِكُوا بِرِيحٍ صَرْصَرٍ عَاتِيَةٍ - سَخَّرَهَا عَلَيْهِمْ سَبْعَ لَيَالٍ وَثَمَانِيَةَ أَيَّامٍ حُسوماً فَتَرَى الْقَوْمَ فِيهَا صَرْعَى كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِيَةٍ فَهَلْ تَرَى لَهُم مِّن بَاقِيَةٍ وَجَاء فِرْعَوْنُ وَمَن قَبْلَهُ وَالْمُؤْتَفِكَاتُ بِالْخَاطِئَةِ - فَعَصَوْا رَسُولَ رَبِّهِمْ فَأَخَذَهُمْ أَخْذَةٌ رَّابِيَةً إِنَّا لَمَّا طَغَى الْمَاءِ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ لِنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذْكِرَةٌ وَتَعِيَهَا أُذُنٌ وَاعِيَةٌ
'আদ ও সামুদ গোত্র মহাপ্রলয়কে মিথ্যা বলেছিল। অতঃপর সামুদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা। এবং আদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা। যা তিনি প্রবাহিত করেছিলেন তাদের ওপর সাত রাত্রি ও আট দিবস পর্যন্ত অবিরাম। আপনি তাদের দেখতেন যে, তারা অসার খেজুর গাছের কাণ্ডের ন্যায় ভূপাতিত হয়ে রয়েছে। আপনি তাদের কোনো অস্তিত্ব দেখতে পান কি? ফিরআওন, তার পূর্ববর্তীরা এবং উল্টে যাওয়া বস্তিবাসীরা গুরুতর পাপ করেছিল। তারা তাদের পালনকর্তার রাসুলকে অমান্য করেছিল। ফলে তিনি তাদের কঠোর হস্তে পাকড়াও করলেন। যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম। যাতে এ ঘটনা তোমাদের জন্য স্মৃতির বিষয় এবং কান এটাকে উপদেশ গ্রহণের উপযোগীরূপে গ্রহণ করে।'৬২
কীসের কারণে তাদের আজ এমন অবস্থা? নিশ্চয় এটা কেবলই তাদের পাপের কারণে। কী কারণে কাওমে লুতকে আকাশে তুলে উপুড় করে ভূপাতিত করা হয়েছিল? অবশেষে তাদের মৃতদেহগুলোর ওপর কুকুরের আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। তারপর তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এভাবে তাদের সবাইকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা এতটাই কঠিন শাস্তি দিয়েছেন যে, এমন শাস্তি আর কাউকে দেননি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا جَاء أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِّيلٍ مَّنضُودٍ - مُسَوَّمَةٌ عِندَ رَبِّكَ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدٍ
'অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছাল, তখন আমি উক্ত জনপদের ওপরকে নিচে করে দিলাম এবং তার ওপর স্তরে স্তরে কাঁকর পাথর বর্ষণ করলাম। যার প্রতিটি তোমার পালনকর্তার নিকট চিহ্নিত ছিল। আর সেই পাপিষ্ঠদের থেকে খুব দূরেও নয়। '৬৩
তাদের ধ্বংসের কী কারণ ছিল?! তা হলো, তাদের অধঃপতিত মানসিকতা। মহিলাদের পরিবর্তে পুরুষদের কাছে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করত তারা। নিশ্চয় এটা জঘন্য অন্যায়। শুআইব-এর সম্প্রদায়ের ওপর কেন মেঘের আকৃতিতে আজাব দেওয়া হয়েছিল? অতঃপর যখন সেই মেঘ তাদের মাথার ওপর চলে আসলো, তখন তাদের ওপর অগ্নিবৃষ্টি বর্ষিত হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمْ عَذَابُ يَوْمِ الظُّلَّةِ إِنَّهُ كَانَ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ ۖ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُم مُّؤْمِنِينَ
'অতঃপর তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে দিল। ফলে তাদের মেঘাচ্ছন্ন দিবসের আজাব পাকড়াও করল। নিশ্চয় সেটা ছিল এক মহাদিবসের আজাব। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না। '৬৪
কীসের কারণে কারুনকে এবং তার ঘরবাড়ি, পরিবার ও সহায়-সম্পত্তি সহকারে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল? পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :
إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ
'যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলল, "দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালোবাসেন না।”৬৫
কী কারণে সাহিবু ইয়াসিনের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছে? অতঃপর তাদের শেষজনও চিরতরে নিশ্চুপ হয়ে গেল। তাদের সতর্ক করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :
يَا قَوْمِ اتَّبِعُوا الْمُرْسَلِينَ
“হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা রাসুলগণের অনুসরণ করো।”৬৬
তারা ধ্বংস হয়েছিল অবশ্যই তাদের পাপের কারণে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيراً
'যখন আমি কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার অবস্থাপন্ন লোকদের উদ্বুদ্ধ করি, অতঃপর তারা পাপাচারে মেতে ওঠে। তখন সে জনগোষ্ঠীর ওপর আদেশ অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমি তাকে উঠিয়ে আছাড় দিই। '৬৭
ইমাম আহমাদ বলেন, 'আমাদের কাছে ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেছেন, তিনি সাফওয়ান বিন আমর থেকে, সাফওয়ান বিন আমর আব্দুর রহমান বিন জুবাইর থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন,
“যখন সাইপ্রাস দ্বীপ বিজিত হলো, তখন সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে বিভক্তি করে দেওয়া হলো। অতঃপর তারা একে অপরের কাছে গিয়ে ক্রন্দন করত।” তিনি বলেন, 'আমি আবু দারদা -কে দেখেছি যে, তিনি বসে বসে একা একা কাঁদছেন। আমি বললাম, “হে আবু দারদা, এমন একটি পবিত্র দিনে তুমি কেন কান্না করছ? যেই দিনে আল্লাহ তাআলা এখানে ইসলাম ও এখানকার মুসলিমদের সম্মানিত করেছেন।” তিনি উত্তরে বললেন, “তোমার জন্য আফসোস হে জুবাইর! ওরা আল্লাহর কতই না লাঞ্ছনাকর সৃষ্টি, যখন তারা আল্লাহ তাআলার বিধানকে নষ্ট করে। অথচ তারা একটি বিজয়ী জাতি এবং তাদের ক্ষমতাও আছে।"
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَائِمٌ وَحَصِيدٌ وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَكِنْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبِيبٍ - وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ - إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَةٌ لِمَنْ خَافَ عَذَابَ الْآخِرَةِ ذَلِكَ يَوْمٌ تَجْمُوعُ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ - يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدُ
'এ হচ্ছে কয়েকটি জনপদের সামান্য ইতিবৃত্ত, যা আমি আপনাকে শোনাচ্ছি। তন্মধ্যে কোনো কোনোটি এখনও বর্তমান আছে, আর কোনো কোনোটির শিকড় কেটে দেওয়া হয়েছে। আমি কিন্তু তাদের প্রতি জুলুম করিনি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর অবিচার করেছে। ফলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব মাবুদকে ডাকত, আপনার পালনকর্তার হুকুম যখন এসে পড়ল, তখন কেউ কোনো কাজে আসলো না। তারা শুধু বিপর্যয়ই বৃদ্ধি করল। আর আপনার পালনকর্তা যখন কোনো পাপপূর্ণ জনপদকে ধরেন, তখন এমনিভাবেই ধরে থাকেন। নিশ্চয় তাঁর পাকড়াও খুবই মারাত্মক, বড়ই কঠোর।
নিশ্চয় ইহার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন প্রতিটি মানুষের জন্য, যে আখিরাতের আজাবকে ভয় করে। উহা এমন একদিন, যেদিন সব মানুষকেই সমবেত করা হবে, সেদিনটি যে হাজিরের দিন। আর আমি যে উহা বিলম্বিত করি, তা শুধু একটি ওয়াদার কারণে, যা নির্ধারিত রয়েছে। যেদিন তা আসবে, সেদিন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। অতঃপর কিছু লোক হবে হতভাগ্য আর কিছু লোক সৌভাগ্যবান। '৬৮
অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে আসা আরও একজন ভাইয়ের গল্প বলছি। ২৯ রমাজানের রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমরা নামাজ পড়ছিলাম। সেটি ছিল রমাজানের শেষ রাত। আমরা সুরা সাদ ও সুরা দুখান দিয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করছিলাম। এই দুটি সুরার মধ্যে আমরা অনেক নসিহতমূলক আয়াত তিলাওয়াত করেছি। যখন هَذَا ذِكْرٌ وَإِنَّ لِلْمُتَّقِينَ لَحَسْنَ مَآبٍ “এ এক মহৎ আলোচনা। আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে উত্তম ঠিকানা।"৬৯ এই আয়াতটি তিলাওয়াত করা হলো, তখন বিশ বছরের এক যুবক কান্না করতে শুরু করল। এর পরের আয়াতগুলো তার অস্তিত্বে ঝাঁকুনি দিল এবং তার অন্তরাত্মা নড়ে উঠল। তার কান্নায় অন্যান্য মুসল্লির অন্তরেও অনুভূতির সৃষ্টি হলো। দ্বিতীয় রাকআতে সুরা দুখানের আয়াতগুলো শুরু হয়। এই আয়াতগুলোও সবার অন্তরাত্মাকে নাড়া দিতে থাকল। শুনুন এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ فَتَنَّا قَبْلَهُمْ قَوْمَ فِرْعَوْنَ وَجَاءَهُمْ رَسُولُ كَرِيمٌ أَنْ أَدُّوا إِلَيَّ عِبَادَ اللهِ إِنِّي لَكُمْ رَسُولُ أَمِينٌ - وَأَنْ لَّا تَعْلُوا عَلَى اللَّهِ إِنِّي آتِيكُم بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ - وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَن تَرْجُمُونِ وَإِنْ لَّمْ تُؤْمِنُوا لِي فَاعْتَزِلُونِ فَدَعَا رَبَّهُ أَنَّ هَؤُلَاءِ قَوْمٌ تُجْرِمُونَ - فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلاً إِنَّكُم مُّتَّبَعُونَ وَاتْرُكُ الْبَحْرَ رَهْواً إِنَّهُمْ جُندٌ مُّغْرَقُونَ كَمْ تَرَكُوا مِن جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ وَزُرُوعٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَاكِهِينَ - كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا قَوْماً آخَرِينَ - فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءِ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنظَرِينَ
'তাদের পূর্বে আমি ফিরআওনের সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের কাছে আগমন করেছেন একজন সম্মানিত রাসুল। এই মর্মে যে, আল্লাহর বান্দাদের আমার কাছে অর্পণ করো। আমি তোমাদের জন্য প্রেরিত বিশ্বস্ত রাসুল। আর তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করো না। আমি তোমাদের কাছে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করছি। তোমরা যাতে আমাকে প্রস্তরবর্ষণে হত্যা না করো, তজ্জন্যে আমি আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তার শরণাপন্ন হয়েছি। তোমরা যদি আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করো, তবে আমার কাছ থেকে দূরে থাকো। অতঃপর সে তার পালনকর্তার কাছে দুআ করল যে, এরা অপরাধী সম্প্রদায়। তাহলে তুমি আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিবেলায় বের হয়ে পড়ো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাদ্ধবন করা হবে। এবং সমুদ্রকে অচল থাকতে দাও। নিশ্চয় ওরা নিমজ্জিত বাহিনী। তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান ও প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য স্থান। কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত। এমনিই হয়েছিল এবং আমি ওগুলোর মালিক করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি। '৭০
তারা আল্লাহর বিধান মানেনি। এই আয়াতগুলো শুনে যুবক নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে কান্না করে দিয়েছে। কারণ পবিত্র এই আয়াতগুলোর মর্ম ছিল খুবই কঠিন। এই কুরআন কতই না মহান! এর প্রতিটি আয়াত কতই না সুন্দর! যা আমাদের অন্তরে রেখাপাত করে। তাই বেশি বেশি কুরআন পড়তে হবে এবং এর তিলাওয়াত শ্রবণ করতে হবে। সুরা দুখানে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একটি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যা আমাদের কখনোই ভোলা উচিত নয়। পৃথিবীর সূচনা থেকে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা একত্রিত করবেন। পাপের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া মানুষগুলোকেও সেদিন সমবেত করা হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَهُمْ يَحْمِلُونَ أَوْزَارَهُمْ عَلَى ظُهُورِهِمْ أَلَّا سَاءَ مَا يَزِرُونَ
'তারা স্বীয় বোঝা স্বীয় পৃষ্ঠে বহন করবে। শুনে রাখো, তারা যে বোঝা বহন করবে, তা নিকৃষ্টতর বোঝা।' ৭১
আবার সৎকর্মশীল বান্দারাও সেদিন উপস্থিত হবে। তাদের চলার পথগুলো তাদের নেক কাজের আলোতে আলোকিত থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيقَاتُهُمْ أَجْمَعِينَ - يَوْمَ لَا يُغْنِي مَوْلًى عَن مَّوْلًى شَيْئاً وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ إِلَّا مَن رَّحِمَ اللَّهُ إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
'নিশ্চয় ফয়সালার দিন তাদের সবারই নির্ধারিত সময়। যেদিন কোনো বন্ধুই কোনো বন্ধুর উপকারে আসবে না এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। তবে আল্লাহ যার প্রতি দয়া করেন, তার কথা ভিন্ন। নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী দয়াময়।' ৭২
আল্লাহ তাআলা ওদের জন্য কতই না কঠিন আজাব প্রস্তুত করে রেখেছেন। আর এদের জন্য কতই না সুখকর নাজ-নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ شَجَرَةَ الزَّقُومِ طَعَامُ الْأَثِيمِ كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ كَغَلْي الْحَمِيمِ خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ ثُمَّ صُبُّوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ ذُقْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ إِنَّ هَذَا مَا كُنتُم بِهِ تَمْتَرُونَ
'নিশ্চয় জাক্কুম বৃক্ষ, পাপীর খাদ্য হবে; গলিত তাম্রের মতো পেটে ফুটতে থাকবে। যেমন ফুটে পানি। (বলা হবে) একে ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে। অতঃপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আজাব ঢেলে দাও। (বলা হবে) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমি তো সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত। এ সম্পর্কে তোমরা সন্দেহে পতিত ছিলে।'৭৩
এগুলো হলো সেসব আজাবের বর্ণনা, যেগুলো আল্লাহ তাআলা পাপিষ্ঠদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। তাহলে সেই আয়াতগুলোও শোনা দরকার, যেগুলোতে আল্লাহ তাআলা তাওবাকারী মুত্তাকিদের বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ - فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ يَلْبَسُونَ مِن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ - كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ آمِنِينَ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَى وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ فَضْلاً مِّن رَّبِّكَ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ فَإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ - فَارْتَقِبْ إِنَّهُم مُّرْتَقِبُونَ
'নিশ্চয় আল্লাহভীরুরা নিরাপদ স্থানে থাকবে। উদ্যানরাজি ও নির্ঝরিণীসমূহে। তারা পরিধান করবে চিকন ও পুরু রেশমিবস্ত্র, মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই হবে এবং আমি তাদের আনতলোচনা স্ত্রী দেবো। তারা সেখানে শান্ত মনে বিভিন্ন ফলমূল আনতে বলবে। তারা সেখানে মৃত্যু আস্বাদন করবে না, প্রথম মৃত্যু ব্যতীত এবং আপনার পালনকর্তা জাহান্নামের আজাব থেকে তাদের রক্ষা করবেন। আপনার পালনকর্তার কৃপায় এটাই মহাসাফল্য। আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ রাখে। অতএব, আপনি অপেক্ষা করুন, তারাও অপেক্ষা করছে।'৭৪
এই আয়াতগুলো সেই যুবকের মাঝে খুব আশ্চর্য ধরনের প্রভাব ফেলে। এমনকি তার খুব বেশি কান্না করার দরুন মুসল্লিরাও তার প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে যায়। অবশেষে যখন নামাজ শেষ হয়েছে, তখন সবাই তার চারপাশে জড়ো হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল, আল্লাহর রহমতের কথা শুনাচ্ছিল তাকে। আমিও তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে তখনো কেঁদেই যাচ্ছিল আর বলছিল, 'আল্লাহর কসম, আমি তাঁর কাছে লজ্জিত। বহু বছর ধরে আমি তাঁর অবাধ্যতা করে আসছি। অথচ এখনো তিনি আমাকে লালনপালন করছেন। তিনি যে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং আমার সব খবর রাখছেন, এ কথা জেনেও আমার একটু লজ্জা হয় না! বহু বছর ধরে আমি তো নামাজও পড়িনি, রোজাও রাখিনি! আমার জীবনের প্রথম রমাজান এটা। যেই রমাজানে আমি নামাজও পড়ছি, রোজাও রাখছি। আমি তো পাপ-পঙ্কিলতার কর্দমায় ডুবে ছিলাম।
আমার এমন কোনো ছোট বা বড় গুনাহ বাদ পড়েনি, যা আমি করিনি। বরং বারবার বহুবার করেছি। নেশা, অশ্লীলতা, মাদক সেবন ইত্যাদি কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। আমি গান শুনতে শুনতে রাতে ঘুমাতাম। এ আমার কেমন জীবন! রমাজানের দুরাত আগের কথা বলছি। আমি আমার এই স্বাভাবিক হালতেই ছিলাম। আমার কাছে আমার বন্ধুরা আসে। আমি তাদের মদ এবং নেশাকর দ্রব্য পরিবেশন করি। আমি সাথে করে বীণা নিয়ে আসলাম। তাদের সামনে গান গাওয়ার জন্য। আমরা ছিলাম চারজন। দুজন বলল, “এসব করতে করতে তো আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি। সময় হয়েছে এবার। জীবনের বাস্তবতা অনুধাবন করার। আমাদের জীবন থেকে বড় একটি অংশ শেষ হয়ে গেছে।"
সেই রাতে আমরা মসজিদে ইশার নামাজ আদায় করি। আমাদের ইচ্ছা ছিল এই রাতটি হবে আমাদের পুণ্যের ও ইসতিকামাতের জিন্দেগির সূচনা এবং পাপ-পঙ্কিলতার জীবনের সমাপ্তি। এই রাতটিই হবে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি আর আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা। অতঃপর আমি ও আমার এক বন্ধু মদ আর নেশার আসর ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ি। আর তারা তাদের পথে চলে যায়।
তখনই দেখি, আমাদের সামনে আমাদের এক বেখেয়ালি বন্ধু তার গাড়ি নিয়ে ডানে বামে মোড় নিয়ে নিয়ে ড্রাইভ করছে। সে পাগলের মতো দ্রুত গতিতে গাড়িটি চালাচ্ছিল। হঠাৎ তার গাড়িটি লেন বিচ্যুত হয়ে এক্সিডেন্ট করে বসে। তার অবস্থা খুবই ভয়ানক আকার ধারণ করে। এই সবই ঘটেছিল আমাদের চোখের সামনে। তার আওয়াজও আমাদের কানে আসছে। ঘটনা দেখে আমরা খুব দ্রুত গাড়ির কাছে আসি। এসে দেখি, তার দেহে অনেক বেশি জখম হয়েছে। যেগুলো থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তার হাড়গুলো ভেঙে গেছে। অতঃপর সে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَجِيدُ “মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। এ থেকেই তুমি টালবাহানা করতে।”৭৫
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ "বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য, দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম, যা তোমরা করতে।'৭৬
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ 'প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলতা পাবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ নয়। '৭৭
সুবহানাল্লাহ! কিছুক্ষণ আগেও তো তারা আমাদের সাথেই ছিল। তারাই তো আমাদের বলেছিল যে, 'আমরা জীবনের অনেকখানি নষ্ট করে ফেলেছি।' এমন উপদেশ তো তারাই আমাদের শুনাল। অভিনন্দন তাদের। তারা সত্যই বলেছে। তারা কিছুক্ষণ আগেই তো জামাআতে ইশার সালাত আদায় করে মসজিদ থেকে বের হয়েছে। রাসুল বলেন, "যে ব্যক্তি জামাআতের সাথে ইশার নামাজ আদায় করে, সে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর জিম্মায় থাকে।”৭৮
তারা তো রাত্রি অতিবাহিত করছিল। কিন্তু সকালের শুভ্র আলোর কিরণ আর দেখেনি। যুবকটি বলছিল, "আমি আমার সাথে থাকা বন্ধুটিকে কান্না করতে করতে বললাম, যদি আমরাও তাদের সাথে গাড়িতে থাকতাম, তাহলে কী অবস্থা হতো আমাদের?! আমরা কোন চেহারায়, কী অবস্থায় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হতাম?! তাঁর সাথে আমরা মাতাল অবস্থায় সাক্ষাৎ করতাম। তাঁর সাথে আমরা নেশা নিয়ে দেখা করতাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর কতই না দয়াবান! কত রাত কাটিয়ে দিয়েছি অশ্লীলতার সাগরে! তিনি তখনো আমাদের দেখছিলেন।” এভাবে যুবকটি তার ও তার বন্ধুদের ঘটনা বলে যাচ্ছিল। আর তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। তখন আমি মনে মনে বলছিলাম, অভিনন্দন তোমাকে হে যুবক! যারা মুক্তির তরিতে আরোহণ করতে চায়, তাদের অবস্থা এমনই হয়। সে বলতে লাগল, "আমার প্রতিপালকের সামনে আমার খুবই লজ্জা হচ্ছে। সত্যের পথ কেমন, আমার জানা নেই। তিনি কি আমার তাওবা কবুল করবেন এতকিছু করার পরেও?” আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। তার কষ্টের উপশম করার চেষ্টা করলাম আর তাকে কতগুলো সুসংবাদ শুনালাম। আমি তাকে বলেছি যে, “যেই ব্যক্তি তাওবা করে এবং আল্লাহর ওপর ইমান আনে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন।" তাকে আরও বললাম যে, “তাওবা করার পর পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি তাওবা করে, সে ওই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহই নেই।” তাকে আরও বললাম, “আল্লাহ তাআলা খারাপগুলোকে ভালো দ্বারা রূপান্তরিত করে দেন। আল্লাহর কাছে তাওবার চেয়ে খুশির খবর আর কিছুই নেই।” তাকে এই সুসংবাদও দিলাম যে, “আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।"
সে উমরা থেকে এসেছে মাত্র দুদিন হলো। গত ২৭ রমাজানের রাতে সে হারাম শরিফেই ছিল। এই প্রথমবার সে বাইতুল্লাহ দেখেছে। কিছুটা শান্ত হওয়ার পর আমি তাকে বললাম, “যাও! এখন থেকে নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেবে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। কেননা তিনি তোমার হায়াতে বরকত দিয়েছেন।” সে বলল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাকে সুযোগ দিয়েছেন এবং আমাকে সাথে সাথেই পাকড়াও করেননি।" আমি তাকে বললাম, “অসৎ সঙ্গ ছেড়ে দিয়ো, রাতের আড্ডাগুলো থেকে বেরিয়ে এসো, খারাপ কাজে সময় দিও না।" নষ্ট কোরো না। আর ভালো মানুষদের সাথে থাকবে, তাদের সাথে চলবে এবং তাদের সাথে মুক্তির তরিতে আরোহণ করবে। আর আমি কিছুদিন পর তোমার সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকব। ইদের পর তোমার সাথে দেখা করব। শুধু আমি আর তুমি কথা বলব। ইদের কয়েকদিন পরেই আমরা সাক্ষাৎ করব।” সে বলল, “আমি আগামীকাল আপনার সাথে ফজরের নামাজ পড়ব ইনশাআল্লাহ।” সঠিক সময়ে সে চলে আসলো। তার চেহারার দিকে আমি লক্ষ করলাম। দেখলাম, তার চেহারায় ইমানের আলো চমকাচ্ছে, সৎসঙ্গের গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছে। আমি তাকে আল্লাহ তাআলার সেই আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
أَوَ مَن كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُوراً يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِّنْهَا كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْكَافِرِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'আর যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ওই ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে, সেখান থেকে বের হতে পারছে না? এমনিভাবে কাফিরদের দৃষ্টিতে তাদের কাজকর্মকে সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। '৭৯
সে যখন কথা বলছিল, তার কথায় একটা প্রশান্তি ও ইতমিনান ভাব দেখা যাচ্ছিল। তখন সে প্রথম যেই কথাটি বলেছে, সেটি হলো, "ফজরের সালাত কতই না সুন্দর! কুরআন কতই না প্রশান্তিদায়ক!” তখন আমি মনে মনে বললাম, "সুবহানাল্লাহ! গতকাল ছিল গানের আসর মাতানো এক যুবক। আর আজ নামাজ ও কুরআনের প্রতি আগ্রহী এক যুবক।” সে বলল, “আমি আমার পুরোনো জিন্দেগির দুজন সাথিকে নিয়ে এসেছি। তারাও মুক্তির তরিতে আরোহণ করতে চায়। তারাও পাপের জীবন ছেড়ে দিয়েছে।” আমি তাকে বললাম, “কীভাবে এবং কখন পাপের জগতে পথচলা শুরু হলো?” সে বলল, “আমি মাঝারি বয়সের ছিলাম। তখনই এ পথে পা বাড়ালাম। প্রথমে সিগারেট, তারপর নেশার বড়ি, তারপর রাতের আড্ডা, এরপর নামাজ থেকে দূরে সরা, তারপর খড়, মদ, অশ্লীলতা এবং আরও যত খারাপ কাজ আছে, সবই শুরু হয়ে গেল। এরপর ধীরে ধীরে পাপের সাগরে এক স্তরের পর আরেক স্তরে পদার্পণ। এভাবে সাতটি বছর অতিবাহিত করলাম।
وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ
“আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম।”৮০
আল্লাহ তাআলা আমার ওপর কতই না দয়াবান! কত রাত আমি নষ্ট করেছি অশ্লীলতার আসরে। আমার রবের সামনে দাঁড়াতে আমার লজ্জাবোধ হয়। আমি বললাম, "আলহামদুলিল্লাহ। এই পথে অটল থাকো।" হে যুবক, তুমি তো পাপের অতল গহ্বরে ডুবেই যাচ্ছিলে। এখন তো তোমার তাওবা করার সুযোগ এসেছে। অনুশোচনার এবং পাপকে ছুড়ে ফেলার সময় এসেছে। এবার তুমিই নিজেকে চ্যালেঞ্জ করো। আমরা তোমাকে নামাজের প্রথম কাতারে দেখব, নাকি আগের মতো পেছনেই পড়ে থাকবে? অতঃপর এভাবেই তোমার মৃত্যু এসে যাবে। অথচ এই অবস্থায় মৃত্যু হওয়াকে তুমিও পছন্দ করো না। এখনো কি সময় হয়নি তোমার পাপের দরজা প্রত্যাখ্যান করার!? তুমি আল্লাহর কাছে হাত তুলে বলো:
وقفتُ ببابك يا خالقي *** أقل الذنوب على عاتقي أجر الخطايا وأشقى بها *** لهيباً من الحُزنِ فِي خَافقي يَسُوقُ العِبَادَ إليك الهدى *** وذَنْبي إلي بابكم سَائِقي أتيتُ ومالي سوى بابكم *** طَرِيحاً أَنَاجِيكَ يَا خَالِقِي إلهي أتيت بِصِدْقِ الحنين *** يُناجِيكَ بالتوب قلبُ حَزِينٌ إلهي أتيتُك في أضْلعي *** إِلَى سَاحَةِ العَفْوِ شَوْقُ دَفِينٌ
إلهي أَتَيْت لَكُم تَائِبا *** فألحق طَرِيحك في التائبين أعِنْه عَلى نَفْسِه والهوى *** فإن لم تُعِنْه فَمَن ذَا يُعِين أبُوحُ إِلَيْكَ بِما قَدْ مَضَى *** وأطرح قلبي بَين يَدَيْكَ بَقَايَا الخَطَايَا ودَرْبَ الهَوَى *** وما كان تَخْفَى دُرُوبِي عَلَيْكَ
'হে স্রষ্টা, আপনার দুয়ারে দাঁড়িয়েছি আমি, নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে সব পাপের দায়। গুনাহের বোঝা টানি আর ভাগ্যহত হই, দুঃখে আমার হৃদয় জ্বলে অগ্নিশিখার মতো। মানুষ আপনার দরবারে আসে হিদায়াতের সুবাস নিয়ে, আর আমাকে নিয়ে আসে আমারই পাপের বাহন। এসেছি আমি, আর কোনো দুয়ার খোলা নেই আপনারটি ছাড়া। আপনাকেই ব্যক্ত করি আমার মর্মবেদনা। প্রভু, নির্ভেজাল কান্না নিয়ে এসেছি, দুঃখী হৃদয় তাওবার কথা বলছে আপনাকে চুপিসারে। প্রভু, আপনার কাছে এসেছি ক্ষমার প্রান্তরে, আমার অন্তরের গভীরে সুপ্ত আছে মিলনের সুতীব্র আগ্রহ। প্রভু, আপনার কাছে তাওবা করতে এসেছি। আপনার বিতাড়িত বান্দাকে স্থান দিন তাওবাকারীদের দলে। তাকে সাহায্য করুন তার মন ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। আপনি যদি সাহায্য না করেন, তবে কে করবে? বিগত দিনের সবকিছু আপনার কাছে স্বীকার করি, নিজেকে পেশ করি আপনারই সামনে। অন্যান্য গুনাহ আর প্রবৃত্তির পথ, সব স্বীকার করি অকপটে! আমার পথ কখনোই আপনার অজানা ছিল না।'
এভাবে তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি আমার এই প্রশ্নের উত্তরে তুমি “না” বলবে না। তুমি কি মুক্তি পেতে চাও? যদি চাও, তাহলে মুক্তির পথে চলো। আল্লাহকে চেনো। সর্বদা ভাববে যে, আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। আল্লাহভীতির প্রতি সর্বদা আগ্রহী হও। যদি তুমি তোমার পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ এবং তোমার নিজেকে রক্ষা করতে চাও, তাহলে তুমি আল্লাহর হক রক্ষা করো।
রাসুল ﷺ বলেছেন, “তুমি আল্লাহকে হিফাজত করো, আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করবেন। আল্লাহকে হিফাজত করো, তাহলে তাঁকে তোমার পাশেই পাবে। তুমি স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তিনি তোমার কঠিন মুহূর্তে তোমাকে স্মরণ করবেন।”৮১ তুমি কি সেই ব্যক্তির কথা শুনোনি? যাদের সংবাদ রাসুল আমাদের দিয়েছেন। তারা পাহাড়ের গুহায় রাতের বেলায় আশ্রয় নিয়েছিল। অতঃপর পাহাড়ের ওপর থেকে একটি পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে তারা কঠিন আঁধারের মধ্যে পড়ে যায়। আল্লাহ ছাড়া তাদের অবস্থান কেউই জানত না। যদি আল্লাহ তাদের প্রতি তখন দয়া না করতেন, তাহলে নিশ্চিত এটি ছিল তাদের জন্য মৃত্যুপুরী। এমন কঠিন বিপদমুহূর্তে তারা পরস্পর বলেছিল, “তোমাদের প্রত্যেকের নেক আমল দ্বারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আজ এখান থেকে তোমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।" তাদের প্রথমজন তার মা-বাবার সাথে সদাচরণের কথা বলে দুআ করেছে। সে তাদের ওপর তার সম্পদ ও সন্তানকে প্রাধান্য দিত না। দ্বিতীয়জন প্রার্থনা করল, তার জিনা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জিনা থেকে দূরে থাকার কথা বলে। তৃতীয়জন প্রার্থনা করল এই বলে যে, সে শ্রমিককে তার পাওনা দিয়ে দিয়েছে। তারা তাদের দুআর মধ্যে বলেছে যে, “হে আল্লাহ, যদি আপনি মেনে নেন যে, আমরা যেই আমলগুলো করেছি, সেগুলো কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্যই করেছি, তাহলে আপনি আমাদের থেকে পাথরটি সরিয়ে দিন। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাদের সততা ও একনিষ্ঠতাকে কবুল করলেন, তখন তিনি তাদের থেকে একটু একটু করে পাথর সরিয়ে দিলেন। এরপর তারা বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। তারা সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করেছে, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের বিপদের সময় তাদের স্মরণ রেখেছেন। অর্থাৎ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাই আপনারা সকলেই আপনাদের নেক কাজগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন। প্রিয় ভাইয়েরা, আমি, আপনি বা আমরা সবাই যদি তাদের মতো পাহাড়ের গুহায় পড়ি, তাহলে আমরা কীসের অসিলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করব? আছে কি আমাদের এমন কোনো আমল?!
ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'যদি মানুষ মানুষের দ্বারাই সন্তুষ্ট থাকে, তবে তুমি আল্লাহকে পাওয়ার মাধ্যমে সন্তুষ্ট হও। যদি মানুষ দুনিয়া পেয়ে খুশি থাকে, তবে তুমি আল্লাহকে পেয়ে খুশি হও। যদি মানুষ তাদের প্রিয়জনদের পেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়, তবে তুমি আল্লাহকে পেয়ে ঘনিষ্ঠ হও। যখন তারা তাদের নেতা এবং বড়দের কাছে পরিচিত হবে এবং তাদের কাছে ইজ্জত সম্মান পাওয়ার জন্য নৈকট্য অর্জন করতে চাইবে, তখন তুমি আল্লাহর কাছে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করো এবং তাঁর সাথে ভালোবাসা গড়ে তোলো। তাঁর সামনে হাজির হও। এভাবেই তুমি চূড়ান্ত সম্মান অর্জন করে নাও। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعاً
'যে কেউ সম্মান লাভ করতে চায়, (সে জেনে রাখুক) সকল সম্মান তো আল্লাহরই (হাতে)। "৮২
তিনি আরও বলেন:
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
“সম্মান তো আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।"৮৩
সর্বশেষ এই কথাটি মনে রাখবে যে (রাসুল বলেছেন):
إِنَّ لِلتَّوْبَةِ بَابًا عَرْضُ مَا بَيْنَ مِصْرَاعَيْهِ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ
“তাওবার একটি দরজা আছে। এর দুই পাল্লার বিস্তৃতি হলো পূর্ব ও পশ্চিমের বিস্তৃতির সমান।”৮৪
অপর এক বর্ণনায় আছে যে, “এর বিস্তৃতি হলো সত্তর বছরের দূরত্বের সমান। যা কখনো বন্ধ করা হবে না, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।"৮৫ আল্লাহর কাছে তাওবার দরজা খোলা আছে। এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তুমি এখনো সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করোনি!? (হাদিসে কুদসিতে এসেছে) আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ডাক দিয়ে বলেন:
يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا، فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ
“হে আমার বান্দারা, তোমরা রাতে দিনে ভুল করে থাকো। আর আমি সব ভুল ক্ষমা করে দিই। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি ক্ষমা করে দেবো।"৮৬
এবার তো আপনি আল্লাহর আহ্বান শুনেছেন, তাহলে কখন সেই ডাকে সাড়া দেবেন? মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা রাতের বেলা তাঁর হাত প্রসারিত করে দেন, যাতে দিনের পাপীরা তাওবা করতে পারে। আবার দিনের বেলায় তাঁর হাতকে প্রসারিত করেন, যাতে রাতের খারাপ আমলকারীরা তাওবা করতে পারে। আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দা ওজর পেশ করতে তিনি পছন্দ করেন, তাহলে তুমি কখন তাঁর কাছে ওজর পেশ করবে? বারবার আল্লাহর কাছে দুআ করবে এবং বলবে, "হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং অন্তর্ভুক্ত করুন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের মাঝে। যাদের কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখও নেই।"
আজকের আলোচনা শেষ করার আগে আমি একটি পত্র শুনাতে চাই আপনাদের। যা এখানে উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজনের মাধ্যমে আমার কাছে এসেছে। তা হলো:
শাইখ খালিদের প্রতি, আমি একজন মুসলিম-সন্তান। কিন্তু আমি নামাজ পড়ি না, রোজা রাখি না। আমি তো একটা কাফির। ইসলামের কিছুই জানি না আমি। হ্যাঁ, আজ আমি আল্লাহকে সাক্ষ্য রেখে, অতঃপর আপনাকে তারপর উপস্থিত মুসল্লিদের সাক্ষ্য রেখে আমার তাওবার ঘোষণা দিচ্ছি। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমি চাই তা সবার সামনে পাঠ করা হোক। আমি বারবার ঘোষণা দিচ্ছি : أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।)
হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তাওবাকারীদের দলে শামিল করুন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের কাতারে ঠাঁই দিন। আমি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দৃঢ়তা কামনা করছি। হে আল্লাহ, আপনি সেসব হৃদয়কে জীবিত করে দিন, যেগুলোকে বান্দা নিজেই মৃত করে ফেলেছে। আমাদেরকে আপনার কঠিন আজাবের মুখোমুখি করবেন না। হে সম্মানিত সত্তা, যিনি দান দ্বারা সকলকে পরিপূর্ণ করে দেন, যিনি করুণা দ্বারা সকলকে সৌভাগ্যবান করে দেন। হে আল্লাহ, আপনি দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা আমাদেরকে আমাদের উদাসীনতা থেকে জাগিয়ে তুলুন এবং আমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পুণ্যবান সাদিকিনের পথ চাই। আপনি আমাদের আপনার নির্বাচিত উত্তম বান্দাদের মাঝে শামিল করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের প্রভূত কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে হিফাজত করুন। হে প্রভু, আপনি তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন, উদাসীনদের পথ দেখিয়ে দিন, পথভ্রষ্টদের পথ প্রদর্শন করুন। যারা এখানে আছে আর যারা নেই, সকলকে ক্ষমা করে দিন। জীবিত-মৃত সবাইকে মাফ করে দিন।
হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে আমাদের ভূখণ্ডে নিরাপদ করে দিন। আমাদের নেতাদের এবং যাদের কাছে আমাদের যাবতীয় বিষয়াদি, তাদের পরিশুদ্ধ করে দিন। আমাদের এই ভূখণ্ডকে এবং পৃথিবীর সকল মুসলিম ভূখণ্ডকে নিয়ামত ও সমৃদ্ধিতে ভরে দিন। হে আল্লাহ, আমাদের ইসলামের ওপর অটল রাখার মাধ্যমে হিফাজত করুন। মৃত্যুর পূর্বে আমাদের একনিষ্ঠভাবে তাওবা করার সুযোগ দিন এবং মৃত্যুর সময় কালিমা পাঠ করার তাওফিক দিন। আর মৃত্যুর পর আপনার রহমতের চাদরে আবৃত হওয়ার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ, আমরা আপনার রহমত চাই। সুতরাং সামান্য সময়ের জন্য হলেও আপনি আমাদের দায়িত্ব আমাদের কাছে ন্যস্ত করবেন না। হে আল্লাহ, আপনি যেমন মহান, সম্মানিত, আমাদের সাথেও আপনার সেই শান অনুযায়ী আচরণ করুন। আমাদের সাথে আমাদের মতো গুনাহগারদের বিবেচনায় কোনো আচরণ করবেন না। নিশ্চয় আপনিই একমাত্র সত্তা, যাকে মানুষ ভয় করবে এবং আপনিই একমাত্র ক্ষমাশীল।
হে আল্লাহ, আপনি (এ উম্মতের) পূর্ববর্তীদের মধ্যে এবং পরবর্তীদের মধ্যে মুহাম্মাদ -এর ওপর দুরুদ জারি রাখুন। আর ফেরেশতাদের মধ্যেও কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাঁর ওপর দুরুদ জারি রাখুন।
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ، وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

টিকাঃ
৩২. সহিহুল বুখারি: ৬০৬৯, সহিহু মুসলিম: ২৯৯০।
৩৩. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৭৯।
৩৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৫৯।
৩৫. সুরা আল-মুজাদালা, ৫৮: ১৯।
৩৬. সুরা আল-ফাতহ, ৪৮ : ২৯।
৩৭. সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৮, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৪০।
৩৮. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৭৭।
৩৯. তাবারানি এ কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৬২১৫।
৪০. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৬৪।
৪১. সহিহুল বুখারি: ৫৫৯০।
৪২. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৪।
৪৩. শাইখ এখানে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মূল বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। দেখুন, মুসনাদু আহমাদ: ২২২১১, তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৬৭৯, শুআবুল ইমান: ৫০৩২।
৪৪. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
৪৫. সুরা আর-রহমান, ৫৫ ৪৬-৪৭।
৪৬. সহিহুল বুখারি: ৬৬০, সহিহু মুসলিম: ১০৩১।
৪৭. সুরা আন-নূর, ২৪: ৪০।
৪৮. সুরা আল-আনআম, ৬: ৮২।
৪৯. সুরা তহা, ২০: ১২৪-১২৫।
৫০. সুরা তহা, ২০: ১২৫-১২৭।
৫১. সুরা আল-আহকাফ, ৪৬: ৩১-৩২।
৫২. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩: ৩৬-৪৪।
৫৩. সুরা আল-ফুরকান, ২৫ : ২৭-২৯।
৫৪. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫৪-৫৬।
৫৫. সুরা আশ-শুরা, ২৬: ২০৫-২০৭।
৫৬. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৩৭। আলবানি হাদিসটিকে সঠিক বলেছেন।
৫৭. সুরা গাফির, ৪০: ২১-২২।
৫৮. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৬৫।
৫৯. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৮।
৬০. সুরা আল-আরাফ, ৭: ২৭।
৬১. সুরা আল-হাক্কা, ৬৯: ৭।
৬২. সুরা আল-হাক্কা, ৬৯: ৪-১২।
৬৩. সুরা হুদ, ১১: ৮২-৮৩।
৬৪. সুরা আশ-শুআরা, ২৬ : ১৮৯-১৯০।
৬৫. সুরা আল-কাসাস, ২৮: ৭৬।
৬৬. সুরা ইয়াসিন, ৩৬: ২০।
৬৭. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ১৬।
৬৮. সুরা হুদ, ১১: ১০০-১০৫।
৬৯. সুরা সদ, ৩৮: ৪৯।
৭০. সুরা আদ-দুখান, ৪৪ : ১৭-২৯।
৭১. সুরা আল-আনআম, ৬: ৩১।
৭২. সুরা আদ-দুখান, ৪৪: ৪০-৪২।
৭৩. সুরা আদ-দুখান, ৪৪:৪৩-৫০।
৭৪. সুরা আদ-দুখান, ৪৪:৫১-৫৯।
৭৫. সুরা কফ, ৫০: ১৯।
৭৬. সুরা আল-জুমুআ, ৬২: ৮।
৭৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৮৫।
৭৮. হাদিসটি এভাবে আমি খুঁজে পাইনি; বরং হাদিসে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করে, সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে।' দেখুন, সহিহু মুসলিম: ৬৫৭। (অনুবাদক)
৭৯. সুরা আল-আনআম, ৬: ১২২।
৮০. সুরা আস-সাফফাত, ৩৭: ৫৭।
৮১. মুসনাদু আহমাদ : ২৮০৩, মুসতাদরাকুল হাকিম : ৬৩০৩, আল-জামি' আস-সহিহ লিস সুনান ওয়াল মাসানিদ: ৩/৩৪১।
৮২. সুরা ফাতির, ৩৫: ১০।
৮৩. সুরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩: ৮।
৮৪. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭৩৮৩।
৮৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৩৬।
৮৬. সহিহু মুসলিম: ২৫৭৭।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের কাহিনি

📄 পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের কাহিনি


বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। তাঁর কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অন্তরের মন্দ ভাব ও খারাপ কর্ম থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে তিনি হিদায়াত দেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার মতো আর কেউ নেই। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ার মতো আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ ৮৭
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقُكُم مِن نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَق مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُم رَقِيباً
‘হে মানব-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, অতঃপর সেই দুজন থেকে বিস্তার করেছেন বহু নর-নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট (অধিকার) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’ ৮৮
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيداً- يُصْلِحْ لَكُم أَعْمَالَكُم وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًاً
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহাসাফল্য অর্জন করল। '৮৯
'নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য কথা হলো আল্লাহর কথা। সর্বোত্তম হিদায়াত হলো মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত। নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ। আর সকল নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত। আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা এবং সকল ভ্রষ্টতার শেষ পরিণাম জাহান্নাম।'

আজকের আলোচনায় উপস্থিত আমার প্রিয় বোনেরা,
আস-সালামু আলাইকুম!
হকের পথে আল্লাহ তাআলা আমাদের ও আপনাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আজ আমরা একটি বরকতময় রজনিতে, বরকতময় স্থানে, বরকতময় মজলিশে আছি। আজকের আলোচনা হলো, পাপের সাগরে নিমজ্জিত নারীদের অবস্থা নিয়ে।
হে বোন, আজ আমি মুসলিম তরুণীদের উদ্দেশে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা বলতে চাই। যেগুলো আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দেবে। যারা হিদায়াতের পথ থেকে সরে গেছে এবং ভুলে গেছে যে, তারা খাদিজা, আয়িশা ও সুমাইয়া -এর উত্তরসূরি-আশা করা যায়, তারা সঠিক পথে ফিরে আসবে। সত্যপথের পথিকদের উদ্দেশেও কিছু কথা বলব, যাতে দ্বীনের পথে তাদের দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
হে বোন, যে কোনো কিছু চায়, সে তা অন্বেষণ করে। অর্জন করার চেষ্টা করে। আর আমাদের প্রত্যেকেই সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। এই দুটি জিনিস নিশ্চিত থাকলে অন্তরে প্রশান্তি থাকে। এমনই একজন প্রশান্তি অন্বেষণকারী বোন বলছেন, 'আমি সর্বত্র সবকিছুতে প্রশান্তি খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি। সবচেয়ে সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক পরিধান করেছি। আমার পরিবারের সাথে সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। এক দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে আরেক দেশের সৈকত চষে বেড়িয়েছি। এসব করেও প্রশান্তি পাইনি। বরং আমার চিন্তা ও সংকীর্ণতা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছি হয়তো গান শুনলে শান্তি মিলবে। তাই আরবের ও পাশ্চাত্যের সবচেয়ে দামি এলবাম ক্রয় করেছি। এগুলো শুনে শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। সুরের তালে তালে নৃত্য করেছি। কোনো প্রশান্তি তো মিলেইনি; বরং দূরত্বই বেড়েছে। সময়গুলো নষ্টই হয়েছে। ভেবেছি সিরিয়াল দেখা আর ফিল্ম দেখার মাঝে সুখ খুঁজে পাব। তাই বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলে ঘোরাঘুরি করতাম। এই আশায় যে, হয়তো একটি হাসি খুঁজে পাব। হ্যাঁ, আমি হেসেছি। কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। মনে হতো যে, দেহের রক্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।
হৃদয়ের গভীরে ব্যথা অনুভব করতাম। কীসের যেন অভাব থেকে যেত। সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে লেগে থাকা ক্ষতগুলো আরও বেড়ে যেত এবং নানা দুশ্চিন্তা ঘিরে রাখত আমাকে। তাই আমার বান্ধবীদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাকে বলল, “আরে সুখ তো সুদর্শন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের মাঝে। সে তোমাকে ভালোবাসা দেবে। প্রচণ্ড ভালোলাগার উষ্ণতায় তোমাকে ভাসিয়ে দেবে। তোমার সৌন্দর্য বর্ণনা করে টেলিফোনে প্রেমের কবিতা রচনা করবে।” ফলে তারা আমাকে টেলিফোন নাম্বারের ব্যবস্থা করে দিলে আমি সেই পথে পা বাড়াই। এভাবে একের পর এক যুবকের সাথে সম্পর্ক পরিবর্তন করতে থাকি। প্রকৃত সুখের খোঁজে...। কিন্তু তা তো পেলামই না; বরং তার উল্টোটাই ঘটল। আমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেললাম। আমার সম্মান, সম্ভ্রম, লজ্জা, তার আগে আমার দ্বীন-এ সবই আমি হারিয়ে ফেলি প্রকৃত সুখের খোঁজ করতে গিয়ে।
এক জাহান্নাম থেকে আরও কঠিন ও ভয়ানক অন্য জাহান্নামের পথ ধরেছিলাম আমি। আমি আশা করি যে, তোমরা আমাকে বুঝবে। আমার মতো এমন আরও অনেক পাপী তরুণীর সম্পর্কে জানবে। আমরা নিজেদের পাপের সাগরে কুরবান করে দিয়েছি। আমরা শুধু পাপীই নই; বরং আমরা পথহারা, দিশেহারা। নিজেদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা বলছি না। বরং আমি এ জন্য বলছি যে, যখন তোমরা এমন কাউকে দেখবে, তখন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, সদয় আচরণ করবে, তাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করবে। কেননা, তারা পাপের সাগরে নিমজ্জিত।'
হে বোন, আজকের আলোচনায় আমি তোমার কাছে এমন কিছু সংবাদ, কষ্টের ঘটনা ও সুসংবাদ শুনাব, যেগুলো আমি ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব। আমি পাঁচটি পর্বে সেগুলো উল্লেখ করব। প্রত্যেক দুই পর্বের মাঝে (ভিন্ন আলোচনার জন্য) সামান্য বিরতি থাকবে।
প্রথম পর্ব : 'লজ্জা ও অপমান।' অতঃপর দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনার জন্য বিরতি থাকবে।
দ্বিতীয় পর্ব: 'নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির।' অতঃপর 'একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প' শিরোনামে একটি বিরতি থাকবে।
তৃতীয় পর্ব: 'হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে।' এরপর 'প্রতিদান ও জান্নাত' শিরোনামে একটি আলোচনা করা হবে।
চতুর্থ পর্ব: 'যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু। বরং বলো যে, নেকড়ে বাঘ।' তারপর একটি আলোচনা করব, যার শিরোনাম হলো 'তোমার কাছে একটি পত্র।'
পঞ্চম পর্ব: কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে। তারপর 'আল্লাহর দরবারে আশাবাদী' এই শিরোনামে আলোচনা করব।
সবশেষে আরও কিছু কথা বলা হবে। যার শিরোনাম হলো, 'এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট রয়েছে।'
তাই আসুন, আমরা সেসব দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক কিছু ঘটনার আলোচনা করি। সেই সত্তার শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এই ঘটনাগুলো সম্পূর্ণটা সত্য ঘটনা। এখানে মিথ্যার ছিটেফোঁটাও নেই।

প্রথম পর্ব: লজ্জা ও অপমান
এক মেয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, আরেক পাপী যুবকের সাথে তার পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। তারা গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করে, তখন একটি ঘটনা ঘটে যায়। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ এসে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কিন্তু সেই যুবক তার অন্য এক বন্ধুকে মোবাইলে যোগাযোগ করে বলে যে, সে যেন এসে মেয়েটিকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাটে রেখে আসে। যাতে তারা উভয়েই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। ফলে সেও বেঁচে যাবে এবং মেয়েটিকেও মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না। সেই যুবক আসলো (হায়, যদি সে তখন না আসত, তাহলে কী যে হয়ে যেত!)। মেয়েটি তার সাথে গাড়িতে আরোহণ করল। যখনই সে ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে, দেখলো সে তো তার ভাই। দুজনকেই লজ্জা আর অপমানের সম্মুখীন হতে হলো। আশ্চর্যের কী আছে? সেই মেয়ে তো একটা পাপী। আর ছেলেটাও আরেকটা পাপী। এবার আপনারা ভেবে নিন। সে অন্যদের ইজ্জত-সম্মানের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর এটাও সত্য যে, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহর কসম, এই ঘটনা সত্য ঘটনা। যাতে মিথ্যার কিছুই নেই।
বিরতি: যেসব ভাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কাজ করছে, তাদের কাছে আমি আবেদন করেছি যে, তারা যেন আমাকে কিছু অবস্থা ও ঘটনা লিখে দেয়। যাদের সাথে মেয়েদের এমন ঘটনা ঘটেছে। তখন তাদের অনেকেই মুসলিম মেয়েদের এমন অবস্থা ভেবে কষ্টে, দুঃখে কান্না করে দিয়েছে। তারা চরিত্রহীনতার কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে? বরং তারা তো দ্বীন ও মুসলমানদের ওপর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এরা নিজেদের ইজ্জত-সম্মানের হিফাজত করতে চায় না। এমনই একজন আমাকে লিখেছে, 'আমরা মহিলা কলেজের অফিসে কাজ করছিলাম। আমরা কলেজের বিপরীত দিকে লক্ষ রাখতাম। যেদিক দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে মেয়েরা আসে। কারণ, যেই মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে বের হয়, তারা এসে এখানে অবতরণ করে, এরপর হেঁটে হেঁটে কলেজে প্রবেশ করে।
এমনই একদিন, আমার সহকর্মীকে দেখলাম, সে এক ছাত্রীর সাথে কথা বলছে আর তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কোথা থেকে এসেছ?” সে শপথ করে বলছিল যে, সে কলেজ থেকে এসেছে। তাদের পাড়া থেকে আসেনি। আমি আমার সহকর্মীকে বললাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে, এই মেয়েটি পাড়া থেকে এসেছে?” সে আমাকে বলল, “তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, এটা যেমন সত্য, তেমনই আমার ধারণা সত্য যে, সে পাড়া থেকে এসেছে।” আমি তাকে বললাম, “তাহলে তার প্রতি দৃষ্টি রাখো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করো। আর অফিসে বিষয়টি জানাও।” কিন্তু সে আমাকে বলল, "মেয়েটি তো আমাকে আল্লাহর শপথ করেই বলেছে। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তার এবং আমাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিই। আর যে মিথ্যা বলবে, তার পরিণাম তার ওপরেই বর্তাবে। আর প্রকৃতপক্ষে হিংস্র জানোয়ারগুলো থেকে তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে কিছু চাইও না।" মেয়েটি চলে গিয়ে কলেজের বিপরীত দিকে দোকানের সামনে বসে থাকা অন্য মেয়েদের সাথে বসেছে এবং তাদের বলেছে যে, “সে আমাদের উপস্থিত একটা উত্তর দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে এবং আমরা নাকি তার ওপর অন্যায় অপবাদ দিয়েছি।” সে অন্যান্য ছাত্রীকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করে, আমাদের বিরুদ্ধে যেন তারা চুপ না থাকে এবং আমাদের ভয় না করে। আমরা যখন পরবর্তী ফুটপাতে গিয়ে পৌছুলাম, হঠাৎ পেছন থেকে গাড়ির ব্রেকের আওয়াজ শুনলাম। সাথে সাথে পেছনে তাকিয়েই দেখি, সেই ছাত্রী মাটিতে লুটিয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িটি তাকে ধাক্কা দেয়। আমি বলব না, সে মারা গেছে। তবে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلاً عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
'জালিমরা যা করেছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না।' ৯০

দ্বিতীয় পর্ব : নামে মুসলিম কিন্তু আসলে তারা কাফির
আমাকে আমার একজন আত্মীয় বলেছেন। যিনি কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। 'একদিন আমি শিক্ষিকা-মিলনায়তন থেকে বের হই। তখন দেখি, একটি কক্ষের পাশেই দুজন ছাত্রী কথা বলছে। সময়টি ছিল জোহরের সময়। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে লক্ষ করে বলে, “তুমি আমাদের সাথে বিদ্যালয়ের মসজিদে কেন নামাজ পড়ো না?” দ্বিতীয় মেয়েটি বলে, "আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না। আমি তোমাকে আরেকটি বিষয় অবহিত করছি। আমার পরিবারের অন্যরাও এমনই। নামাজ পড়ে না।” হায়, আফসোস! মেয়েটি উচ্চ আওয়াজে, ঔদ্ধত্য সহকারে এবং নির্লজ্জ হয়ে বলল যে, 'আমি বাড়িতেও নামাজ পড়ি না।' হে মেয়ে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমার ও কাফিরের মাঝে তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?! আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন:
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيَّاً
'অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামাজ (নামাজের চেতনা) বরবাদ করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। সুতরাং শীঘ্রই তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পাবে। '৯১
ইবনে আব্বাস বলেন: 'আয়াতে উল্লেখিত أَضَاعُوا الصَّلَاةَ-এর অর্থ হলো, তারা পরিপূর্ণরূপে নামাজকে ছেড়ে দেয়নি। বরং তারা নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে পড়ত।' হ্যাঁ, আসলে তো ব্যাপারটা এমনই। সে অলসতা করে, অবহেলা দেখায়। ফলে আসরের সময় চলে আসলেও জোহরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। মাগরিবের সময় চলে আসলেও আসরের নামাজ আর আদায় করা হয় না। ইশার সময় হয়ে গেলেও মাগরিব আর আদায় করে না। ফজরের সময় চলে আসে, কিন্তু ইশার নামাজ তার আদায় হয় না। সূর্য উঠে যায়, তবুও তার ফজর পড়া হয় না! পাপী নারীদের অবস্থা এমনই। সুতরাং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন। নিক্ষেপ করেন জাহান্নামের নিচে অনেক দূরে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। তোমরা কি পারবে এমন শাস্তির যন্ত্রণা সহ্য করতে? রাসুল -এর সে কথা কি শুনোনি? তিনি বলেন:
العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল। '৯২
হায়, এমন কত পরিমাণ যে কাফির আছে, আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। যাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, আমার নাম, খাদিজা, আয়িশা ইত্যাদি। তারা তো মিথ্যা বলেছে তাহলে। কারণ তারা পাপী। নামাজ পড়ে না তাই।
ইমাম জাহাবি তার 'আল-কাবায়ির' গ্রন্থে জনৈক সালাফ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার এক বোনকে মৃত্যুর পর দাফন করেছেন। তখন কবরের ভেতরে তার একটি টাকার থলে পড়ে যায়। বিষয়টি তখন তিনি খেয়াল করেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার মনে পড়ে। ফলে তিনি ব্যাগের সন্ধানে কবরে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেন। তিনি কবর খুঁড়ে দেখলেন যে, সেখানে আগুন জ্বলছে। সাথে সাথে তিনি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দেন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে ফিরে আসেন। এসে মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমাকে বলুন তো, আমার বোন কী কাজ করত?' মা বললেন, 'কেন এমন প্রশ্ন করলে?' তিনি বললেন, 'আমি তার কবরে আগুন জ্বলতে দেখেছি।' এ কথা শুনে তার মা-ও কান্না করতে করতে বললেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার বোন নামাজের প্রতি অবহেলা করত। নির্দিষ্ট সময়ের পর তা আদায় করত।
হে আল্লাহর বান্দিরা, সেই মেয়ের গল্প তো তোমরা শুনেছ, যে নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে পিছিয়ে পড়ত। তাহলে তার কী অবস্থা হবে, যে নামাজই পড়ে না? কী হবে তার কবরের অবস্থা? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ يُكْشَفُ عَن سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ - فَذَرْنِي وَمَن يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ- وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
'যেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত হবে এবং লোকদেরকে সিজদা করতে বলা হবে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে এবং লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করবে। তারা যখন সুস্থ অবস্থায় ছিল, তখনও তাদেরকে সিজদা করতে বলা হতো। অতএব, যারা এই বাণীকে মিথ্যা বলে, তাদেরকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাদের ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না। তাদের আমি অবকাশ দেবো। আমার কৌশল খুব মজবুত। '৯৩
আল্লাহর শপথ, ইমানের পর নামাজ ছাড়া তুমি কিছুতেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। সুতরাং বেশি বেশি নামাজ পড়ো। তোমার ওপর নামাজ পড়ার আগে আগেই। আল্লাহ তোমাকে হিফাজত করুন। আর যে নামাজ পড়ে না, তার জানাজাও পড়া হবে না, তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন দেওয়া যাবে না, খাটিয়াতে বহন করা হবে না। বরং তাকে চেহারার ওপর টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, মরুভূমিতে তার জন্য গর্ত খোঁড়া হবে। সেখানে তাকে উপুড় করে রাখা হবে। তার জন্য দুআ করা যাবে না। ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
'আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে। '৯৪
সুতরাং তোমরা কি এমন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট? উত্তর তোমাদের কাছেই রেখে দিও। আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।'৯৫
বিরতি : একজন পাপী নারীর নাজাতের গল্প। পাপের সাগরে নিমজ্জিত একজন নারী বলছিলেন, 'আমি পড়ে যাওয়া চুলকে জমা করে রাখতাম এবং যত্ন সহকারে সেগুলো সংরক্ষণ করতাম। বান্ধবীদের সাথেও এগুলো নিয়ে আলাপ- আলোচনা করতাম। ভাবতাম, এতে সফলতা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমার কপালে হিদায়াত লিখে রেখেছেন। প্রবৃত্তির সাগর থেকে আমাকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। একদিন আমি কলেজের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমার পাশে দ্বীনের ওপর অটল একজন নেককার বোন ছিলেন। তখন আমাদের অনুষ্ঠানস্থলের মূলকক্ষে একটি দুআ লেখা ছিল। দুআটি হলো : "হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"৯৬
তখন ভাবলাম, আমরা তো পড়ে যাওয়া চুলকে সংরক্ষণ করে রাখি এই ভেবে যে, এতে সফলতা আছে। অথচ এই তরুণীরা এমন অসাধারণ ও মূল্যবান বাণী সংরক্ষণ করে। সেই দুআটি আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড আকারে প্রভাবিত হয়েছি আমি। এরপর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমি কী আমল করেছি?! এগুলো ভেবে কাঁদছিলাম। তখন পাশে বসে থাকা দ্বীনদার বোনটি আমার কান্নার অবস্থা অনুভব করেছেন। অতঃপর বোনটি আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমি তাকে বলেছি যে, "আমাদের আজকের সভাকক্ষে যেই দুআটি লেখা আছে, সেই দুআটিই আমার কান্নার কারণ। আমার মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে সেটি।” তিনি আমাকে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কল্যাণ চেয়েছেন। (দুআটি সম্পর্কে যেহেতু জানতে পেরেছ) তো আমল করতে শুরু করো। (আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন)। যাতে তুমি জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা পাও।”
ছোট্ট একটি বাক্য। যার মর্ম খুবই গভীর ও মহান। এই ছোট্ট দুআটিই তাকে উদাসীনতা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। আর তুমি! হে সেসব বোন, যারা প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে পাপের সাগরে ডুবেই যাচ্ছ, কী অবস্থা হবে তোমাদের? যারা সারাক্ষণ টিভির সামনে, বিভিন্ন চ্যানেলে, ইন্টারনেটে সময় অতিবাহিত করছ, পরকালে কী হবে তোমাদের? একটি পাপের লেজ ধরে আরেকটি পাপের দিকে পা বাড়াচ্ছ, নামাজের প্রতি অবহেলা করছ! এখনো কি সময় হয়নি তোমাদের তাওবা করার!? পাপগুলো মুছে ফেলার!? পাপের সাগর থেকে উত্তোলন হবার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজের সাথে হিসাব করার!? এখনো কি সময় হয়নি নিজেকে এ কথা বলার!?-হে নফস, যেদিন তাওবার সুযোগ থাকবে না, সেদিন আসার আগেই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, ক্ষমা প্রার্থনা করো তোমার পাপের জন্য ক্ষমাশীল দয়াময় রবের দরবারে। কারণ, মৃত্যু তোমার দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসছে। তাওবা না করলে আল্লাহর আজাব থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং অবাধ্যতা করে তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করো না। সেই ময়দানে মাহশারের কথা ভাবো, যেখানে সমস্ত মানুষ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকবে দুঃখভারাক্রান্ত ভগ্ন হৃদয় নিয়ে। সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহ! কেমন হবে যে সেদিনের অবস্থা! (হে বোন) কেমন হবে সেদিন তোমার অবস্থা? যেদিন—
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا - وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
'কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। আর যখন তোমার প্রতিপালক আসবেন আর ফেরেশতারা আসবে সারিবদ্ধ হয়ে।'৯৭
وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى
'আর সেদিন জাহান্নামকেও নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, তবে এই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে?'৯৮
আর পাপীদের অবস্থা হবে এমন, আল্লাহ তাআলা বলেন : يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُعَذِّبُ عَذَابَهُ أَحَدٌ - وَلَا يُوثِقُ وَثَاقَهُ أَحَدٌ
'সে বলবে, “হায়, আমি যদি আমার জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠাতাম!” বস্তুত সেদিন তিনি যে শাস্তি দেবেন, তেমন শাস্তি কেউ দিতে পারবে না।' এবং তাঁর বাঁধার মতো বাঁধবারও কেউ থাকবে না।'৯৯
আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুক্তি দেবেন, তাদের এভাবে ডাকা হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
'হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ১০০
রাসুল ইরশাদ করেন: وَرَأَيْتُ النَّارَ، فَلَمْ أَرَ كَاليَوْمِ مَنْظَرًا قَطُّ، وَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ
'আমি জাহান্নাম দেখেছি। আমি এর আগে কখনো এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। এবং আমি আরও দেখেছি যে, এর অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। ১০১
হে আল্লাহর বান্দি, অতএব আল্লাহকে ভয় করো। হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার বান্দাদের কবর থেকে ওঠাবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করবেন।

তৃতীয় পর্ব: হায় আফসোস! তার সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে
কলেজের একজন ছাত্রী যখন পড়ালেখা শেষ করে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়, তখন স্বাভাবিকত সে হবে তার পরিবার ও সন্তানসন্ততির জন্য একজন শিক্ষিকা, তার বীর সন্তানদের লালনপালনকারী। আফসোস, এসব মহৎ কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সে তার রবের অবাধ্যতা করছে, দ্বীনের বিপরীতে চলছে, ইজ্জত-সম্মান বিকিয়ে দিচ্ছে, পরিবারের সাথে খিয়ানত করছে এবং নিজের সম্মানবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে! যদি সে তার নিজের জন্যই বিশ্বস্ত হতে না পারে, তাহলে তার থেকে আর কীই বা আশা করা যায়!
বুধবারের দিন। কলেজ লাইফের শেষ দিন মেয়েটির। যেই বান্ধবীর সাথে সে সব কথা শেয়ার করে এবং কলেজে একত্রে যায়, তাকে এই মর্মে খবর দিল যে, শনিবার সে কলেজে যাবে না। রবিবারে আসবে। এ সময় সে পরিকল্পনা করে যে, শনিবারে এক যুবকের সাথে ঘুরতে বেরুবে। তাই সে তার বান্ধবীর মোবাইলটি তার কাছ থেকে নিয়ে রেখেছে যুবকটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য। সে যুবকের সাথে বেরিয়ে গেল। আর ভাবছিল, কেউ তাকে দেখছে না। সে ভুলে গেছে যে, আসমান-জমিনের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন তাকে দেখছেন। শনিবার সকালে। সব মেয়েরা যখন কলেজে প্রবেশ করছিল, তখন তার পরিবারের কেউ একজন তাকে প্রতিদিনের মতোই কলেজের সামনে রেখে যায়। সবাই তার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিল। তারা এই ভেবে তাকে একা ছেড়ে চলে যায় যে, সে তো কলেজ-ক্যাম্পাসেই আছে। (সেখানে সে অধ্যয়ন করবে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা লাভ করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, সে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত উম্মাহর উপকারে তার জ্ঞান ব্যয় করবে। যেই উম্মাহ আদর্শ মায়েদের প্রয়োজন অনুভব করছে।) কিন্তু সে কলেজের ফটকের দিকে না গিয়ে তার জন্য অপেক্ষমাণ যুবকের গাড়ির দিকে চলে যায়। এটি কলেজ-রেঞ্জারের দৃষ্টিতে পড়েছে। সাথে সাথে সে গাড়িটিকে এবং ভেতরের যুবক-যুবতিকে শনাক্ত করে ফেলে এবং কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়। তারা তাকে বলল, 'দুপুরে কলেজ ছুটির সময় তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবে।' (আহ! মেয়েদের কী দুঃসাহস! তারা যুবকদের সাথে একসাথে গাড়িতে চড়ে! কোনোরূপ দ্বিধাবোধ ও লজ্জা ছাড়াই)। ঠিক দুপুরে। তারা ফিরে আসে এবং কলেজের এক পাশে গাছের নিচে অবস্থান নেয়। তখন কলেজের প্রহরী গাড়িটির কাছে চলে যায়। যখন মেয়েটি গাড়ি থেকে নামল, তখন প্রহরী তার কাছে আসে এবং গাড়ির চালককে থামতে বলে। কিন্তু সেই কাপুরুষ পালিয়ে যায়। কিন্তু তার যাওয়ার আগেই প্রহরী গাড়ির নাম্বার লিখে ফেলে এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, 'কোথা থেকে এসেছ?' সে বলল, 'আমি কলেজ থেকেই বের হয়েছি।' প্রহরী বলল, 'তাহলে কলেজেই ফিরে যাও।' কিন্তু সে কলেজে ফিরে যেতে অস্বীকার করছিল। তাই প্রহরী তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে নেয়। তবুও সে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্রহরী কলেজ-প্রশাসনকে অবহিত করে এবং ব্যাগটি তাদের হাতে সোপর্দ করে। এরপর এক যুবক এসে মেয়েটির ব্যাগ চায়। প্রহরী তাকে কলেজের অফিসে নিয়ে (দ্বীন ও ইজ্জতের কর্ণধার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকে। (আল্লাহ যেন তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হিফাজত করেন)। তাদের আগমনের পূর্বক্ষণে যুবকটি গাড়ি থেকে তার মোবাইল আনার অজুহাতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। কিন্তু পুলিশ গাড়ির নাম্বার অনুসরণ করে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
মেয়েটি তার যেই বান্ধবীর কাছে বলেছিল যে, আমি শনিবারে আসব না, সেদিন সন্ধ্যায় সে তার সাথে যোগাযোগ করে এ কথা বলার জন্য যে, 'তোমার হেল্প চাই আমি। আমার বিষয়টি কারও কাছে প্রকাশ করবে না। যেহেতু আমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক যুবকের সাথে ছিলাম।' 'হ্যাঁ, আমি তোমার বিষয়টি গোপন রাখব। কেননা, যে কোনো মুসলমানের তথ্য গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে দুনিয়া-আখিরাতে গোপন রাখবেন।' বান্ধবি আরও বলল, 'তার কারণে আমি মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি। বরং কুরআন শরিফ ধরে মিথ্যা শপথ করেছি।' (আশ্চর্য ব্যাপার! তারা অপরাধকে গোপন করে রাখছে এবং পাপের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করছে!)
তার আরেক বান্ধবী তার পক্ষে মিথ্যা ও বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, সে শনিবারে মেয়েটিকে কলেজে দেখেছে। অথচ সে তাকে দেখেইনি। (আহ! তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কাজগুলো সম্পর্কে বেখেয়াল?) অপরদিকে মেয়েটি নিজে দাবি করছিল যে, তার ব্যাগ চুরি হয়েছে। সে তার আরও অনেক সহপাঠীকে একত্রিত করেছে তার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এ সবই ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। সে তার মাকেও নিয়ে এসেছে এ কথা বলানোর জন্য যে, সে দুপুরে বাড়িতে ছিল। মেয়েটি কঠোর হয়ে বলছে যে, 'আল্লাহর কসম, কুরআনে কারিমকে সামনে রেখে বলছি, আমি শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত কলেজের ভেতরেই ছিলাম। এ সময় আমি কলেজ থেকে বের হইনি। আমি যা বলছি, আল্লাহ তাআলাই তার সাক্ষী।'
আহ! তার যাবতীয় কার্যক্রমগুলো যে আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এই বিষয়টি তার কাছে খুবই নগণ্য একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ কমিটি ও পুলিশ তাদের কাজ চালিয়ে গেল। তারা যুবকটিকে নিয়ে আসে। সে স্পষ্ট প্রমাণাদির সামনে সব সত্য খুলে বলেছে এবং তার সাথে মেয়েটির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও স্বীকার করেছে। সাথে সাথে মেয়েটির সহপাঠীরাও এবার সত্যটা স্বীকার করেছে। ফলে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল এবং মিথ্যা প্রকাশ পেয়ে গেল। অতঃপর এই অপরাধে তাকে ও তার বন্ধুদের সতর্ক করে কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এবার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন! এরা কি তাদের প্রজন্মের লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত? তাদের কোলে কি উম্মাহর বীর তৈরির কোনো সম্ভাবনা আছে?
সবচেয়ে বড় যেই বিষয়টি সেটি হলো, যখন মেয়েটির বাবাকে ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করতে কলেজে ডাকা হয়েছে, তখন তিনি মাথা নিচু করে অবনত হয়ে প্রবেশ করছিলেন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটি বলল, 'আমি আমার বাবার সাথে ফিরছিলাম। তখন আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট ও বিষাক্ত তিরের ব্যথার মতো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। দীর্ঘ পথে তিনি আমার সাথে একটি কথাও বলেননি। কিন্তু তার নীরব দৃষ্টিগুলো বারবারই আমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল।' মেয়েটি আরও বলল, 'আমি তো সবার অধিকার নষ্ট করে অপরাধ করে ফেলেছি, নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি এবং আমাদের সুনাম নষ্ট করে দিয়েছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' এমন আরও বহু যুবতি আছে। যাদের সংখ্যা অগণিত।

বিরতি : সবরের প্রতিদান জান্নাত। আমার বোন কতই না উত্তম! নিশ্চয় সবরের প্রতিদান অনেক মহান। সবরকারী নারী-পুরুষদের অগণিতভাবে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ পুরস্কার দিয়ে দেবেন। অতএব, যে মহিলা আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে, অশ্লীল-অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে এবং বিপদাপদ সহ্য করার মাধমে সবর এখতিয়ার করেছে, তার প্রতিদান কী হতে পারে! সততা, নিষ্কলুষতা, লজ্জা ও সবরের প্রতিদান কতই না বেশি!
হে বোন, আমার কথা শোনো এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো যে, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা?! হে রত্নতুল্য মুসলিমা, তোমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক তো হলো পবিত্রতা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও লজ্জা। সুতরাং যখন তুমি তা খুলে ফেলবে, তখন তোমার জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে ভেতরের অংশই হবে অধিক উত্তম। তোমাকে পবিত্র রমণীদের একটি গল্প শুনাই। লজ্জা, পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মহা পুরস্কারের গল্প শোনো।
আতা বিন আবি রবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবনে আব্বাস আমাকে বলেছেন, "আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি রমণী দেখাব না?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” তিনি বললেন, “এই কালো মহিলাটি, তিনি নবিজি -এর খিদমতে এসে বললেন, "আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” রাসুল বললেন, "তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে।"
(হে বোন, তুমি ভালো করে শোনো, চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য ধৈর্যের ফলাফল হলো জান্নাত।)
রাসুল বলেন, “তুমি চাইলে ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তুমি চাও, আমি (তোমার জন্য) আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, তিনি যেন তোমাকে আরোগ্য দান করেন।” মহিলাটি উত্তর দিলেন, “বরং আমি ধৈর্যধারণ করব। (কেননা, এর মূল্য ও প্রতিদান অনেক বেশি)। কিন্তু আমি তো অনাবৃত হওয়ার আশঙ্কা করছি। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি অনাবৃত না হই।” ফলে রাসুল (তার জন্য) দুআ করলেন।”১০২
এটিই হলো এমন নারীদের অবস্থা, যারা আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে এবং মুহাম্মাদ-কে নবি ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এবং মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁরা লজ্জাবোধ ও পর্দার বিধানকে ছেড়ে দেননি। বরং ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বলেছেন আমি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করব। পর্দা খুলে যাওয়া আমি মেনে নেব না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيراً مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْساً وَلَا زَمْهَرِيراً - وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلاً - وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرًا - قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيراً وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْساً كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلاً - عَيْناً فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلاً - وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُوراً - وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيماً وَمُلْكاً كَبِيراً - عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقُ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُوراً - إِنَّ هَذَا كَانَ لَكُمْ جَزَاءً وَكَانَ سَعْيُكُم مَّشْكُوراً
'আর জান্নাত ও রেশমি পোশাক দ্বারা তিনি তাদের ধৈর্যধারণের পুরস্কার দেবেন। তারা সেখানে সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা রৌদ্র কিংবা শৈত্য অনুভব করবে না। জান্নাতের (গাছের) ছায়া তাদের ওপর নুয়ে থাকবে এবং তার ফলমূল তাদের নাগালের মধ্যে নিচে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তাদের পরিবেশন করা হবে রুপোর পাত্রে ও কাঁচের পাত্রে। রুপোর তৈরি কাঁচের মতো (স্বচ্ছ) পাত্রে। পরিবেশনকারীরা সঠিকভাবে সেগুলোর পরিমাপ ঠিক করবে। সেখানে তাদের এমন পেয়ালা পান করতে দেওয়া হবে, যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানকার একটি ঝরনা, যার নাম সালসাবিল। তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরগণ। আপনি তাদের দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। আপনি যখন সেখানটা দেখবেন, তখন এক নিয়ামত ও বিরাট এক রাজ্য দেখতে পাবেন। তাদের গায়ে থাকবে সবুজ পাতলা রেশমি বস্ত্র ও নকশা-করা পুরু রেশমি কাপড়। অলংকার হিসেবে তাদের পরানো হবে রুপোর কঙ্কণ। আর তাদের প্রভু তাদের পান করাবেন পবিত্র পানীয়। (তাদের বলা হবে) এটা তোমাদের পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছে। ১০৩
এটাই হলো ধৈর্য ও ধৈর্যশীলদের প্রতিদান। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থা কী? যুবতি, তরুণীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?!
আল্লাহ তাআলা বলেন: فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
'...আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মন দিয়ে কথা শোনে এবং ভালো কথা মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।'১০৪

চতুর্থ পর্ব: যুবকদের হাতে তামাশার বস্তু...
এটি লিখেছে একজন গুনাহগার বান্দি। সে বলল, 'এগুলো আমি আমার নিজ হাতে লিখেছি। এর কালিগুলো আমার রক্ত, এর মূল্য আমার কাছে আমার ইজ্জত-সম্মানের মতোই দামি। আমি তার কাছে একটি খেলনার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছি। বরং বলা যায় একটি নেকড়ে বাঘের হাতে।' মেয়েটি বলল, 'এক অনুষ্ঠানে তার (এক যুবকের) সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর থেকে আমরা একটু আধটু কথা বলা শুরু করি। এরই ফাঁকে তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি বললাম, “তারপর তো শুরু হয় কিছুটা দুশ্চিন্তা, কিছুটা স্বপ্ন ও মজার মজার গল্প।” মেয়েটি বলল, 'তার সাথে আমার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সে কয়েকজন যুবকের সাথে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকত প্রায় সময়। তো আমি তার সাথে যোগাযোগ করার সময় তার পাশের যুবকরা বলত যে, “ও (আমি) তোমাকে চাচ্ছে।” এমনই একবার, আমি তার সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তখন সে ছিল না। তার এক বন্ধু আমার ফোনের প্রত্যুত্তর দিল। অতঃপর সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং আমাকে অনুরোধ করে যে, আমি যেন তার সাথে সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু আমি তখন অস্বীকার করেছি। ফলে সে আমাকে এই বলে ধমক দিল যে, সে আমার ভালোবাসার যুবককে বলবে, আমি নাকি তার সাথে গোপনে গোপনে সম্পর্ক গড়ি এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। অতঃপর আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তার আহ্বানে সাড়া দিলাম।' (প্রথম যুবককে লক্ষ্য করে মেয়েটি যে বলেছিল, 'আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি, সেও আমাকে ভালোবাসে।' তাহলে মেয়েটির এই কথার সত্যতা কোথায়?)
মেয়েটি তার চিঠিতে আরও লিখেছে, 'প্রথম ছেলেটির চেয়েও দ্বিতীয় ছেলেটি আরও বেশি রোমান্টিক ও কাব্যিক ছিল। তার সাথে সম্পর্ক ভালোই চলছিল। এমনকি সে আমাকে তার সাথে ঘোরার জন্য আমার বাড়ি থেকেও বের করতে সক্ষম হয়েছে। সব সময় আমার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওয়াদা দিত সে। এমনকি আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিও (সম্ভ্রম) হারিয়ে ফেলি তার কাছে। এভাবে চলছিল আমাদের দিনগুলো। হঠাৎ একদিন আমাদের মাঝে যেকোনো একটি বিষয়ে ঝগড়া বাধে। সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাই তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমি। একদিন তাকে কল করলে তার এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে। সে আমাকে বলে, “আমার জানামতে তুমি অমুকের সাথে ঝগড়া করেছ। তাই আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে সমাধান করার চেষ্টা করব।” তার এই কথাগুলো আমি বিশ্বাস করে ফেলি। ফলে আমরা বিকেলে দেখা করার জন্য কলেজের পাশেই একটি জায়গা নির্ধারণ করি। ছেলেটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে চলে আসে এবং আমিও তার সাথে গাড়িতে চড়ে বসি। সে আমার কাঙ্ক্ষিত যুবকের কাছে না নিয়ে আমাকে সি-বিচের দিকে নিয়ে চলল। সেখানে এমন একটি জায়গায় সে আমাকে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষজন কেউ নেই। সেখানে পৌছার পর ছেলেটি আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং বারবার ফুসলাতে থাকে। আমি তার এসব বাজে প্রস্তাব অস্বীকার করছিলাম। আমার অস্বীকৃতি দেখে আমাকে সে জোর করছিল। একপর্যায়ে সে আমাকে ধর্ষণ করে ফেলে এবং আমাকে ধমক দিয়ে বলে যেন কারও কাছে না বলি। অতঃপর যেভাবে মানুষ কুকুরকে নিক্ষেপ করে, সেভাবে ছেলেটি আমাকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে চলে যায়। আমি আমার সম্পর্কিত সেই যুবককে বিষয়টি অবহিত করি। সে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আমার মন শান্ত করার চেষ্টা করছিল এবং আমাকে এই বলে শপথ দিচ্ছিল যে, তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। অতঃপর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার সাথে ঘুরে আসি। তারপর আমি আরও আশ্চর্য হই, যখন আরেকজন আমাকে কল করে বলল যে, "আমার কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি আছে এবং কিছু কল রেকর্ড আছে। যদি আমার সাথে বের না হও, তাহলে আমি এগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে দেবো।" এ কথা বলার পর আমি তার সাথে বের হই এবং আমার সাথে যা করার, সে তা-ই করল। এভাবেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছিল আর কুকর্ম করছিল। অবশেষে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। হায়! প্রথমবার যখন তারা আমার সাথে খারাপ কাজ করছিল, তখন যদি পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করত! কিন্তু এখন তো সময় শেষ। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। আমি ওদের হাতে ছিলাম একটি খেলনা মাত্র। এ নেকড়েগুলো আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পরিবারের ইজ্জতে কলঙ্ক লেপে দিলাম। হায়, আমার জন্য লজ্জা আর অপমানই রইল! আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ “আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।”১০৫
হে মুসলিম বোন, এগুলো কি একেকটি ট্র্যাজেডি আর অসহায়ের আর্তচিৎকার নয়? এই ঘটনাগুলো কি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে না? চক্ষুকে অশ্রুসজল করে না? আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে, আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করে। আমি চিৎকার করে আহ্বান করছি বাবা, মা এবং দায়িত্বশীলদের। আপনারা আপনাদের যুবতিদের রক্ষা করুন। আপনারা মেয়েগুলোকে বাঁচান। তাদের হিফাজত করুন। হে বাবা, হে মা, আপনারা সকলেই তো দায়িত্বশীল।
পরিবারের অসতর্কতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির অবাধ ব্যবহার এবং যেকোনো কাজে বাচ্চাদের জবাবদিহি ও তদারকি না করা এসব ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই আমাদের মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মা-বোনেরা সকাল-সন্ধ্যায় ড্রাইভারদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। এতে কোনোরূপ তদারকি বা কৈফিয়ত নেই। মেয়ে বাবার সামনে বের হয় কোনো পর্দা ছাড়া। এমন কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ বোরকা গায়ে দিয়ে বের হয়, যেগুলো (পর্দা রক্ষার বদলে) ফিতনা সৃষ্টি করে। তারা এভাবে লোভনীয় হয়ে বের হয়, অতঃপর কোনো ট্র্যাজেডি ঘটলে দোষ হয় যুবকদের। আমি যুবতিদের বলব, তুমি নিজেই তোমার বেইজ্জতির জন্য দায়ী। কারণ, তুমি তোমার শিষ্টাচার মেনে চলো না, লজ্জাবোধ নেই তোমার মাঝে, অর্ধনগ্ন হয়ে ঘর থেকে বের হও তুমি। তুমি চাওটা কী? তুমি কি পুরুষদের আকর্ষণ করতে চাও? আচ্ছা! তুমি কি জানো না যে, তুমি সকল পুরুষের জন্য নও; বরং তুমি কেবল একজন পুরুষের জন্য? আর সে হলো তোমার স্বামী। আর যদি তোমার স্বামী না থাকে, তবে ভবিষ্যতে তো তা হবে।
এক পশ্চিমা লোক এক মুসলিমকে প্রশ্ন করল, 'মুসলিম নারীরা কেন পর্দা করে?' মুসলিম ব্যক্তি উত্তরে বলল, 'কারণ, আমাদের মহিলারা তাদের স্বামী ছাড়া সন্তান লাভ করতে চান না।' হে মুসলিম বোন, তুমি কি বুঝেছ সেই মুসলিমের উত্তরটি?
রাস্তায়, ময়লা-আবর্জনা ও মসজিদের সামনের বক্সে পড়ে থাকা জিনার সন্তানের পরিসংখ্যান বলে, গত ১৪২৩ হিজরি সনে পূর্ব অঞ্চলে কুড়িয়ে পাওয়া জিনার সন্তানের সংখ্যা ছিল ৩২টি। পুরো বছরের মোট পরিসংখ্যান এটি। আর চলতি ১৪২৪ হিজরি সনে মাত্র ছয় মাসে জিনার সন্তানের সংখ্যা হলো ৪৮টি। শুধু পূর্ব অঞ্চলে। আমি পুরো দেশের পরিসংখ্যানের কথা এখানে বলিনি।
হে মুসলিম বোনেরা, এগুলো কি আমাদের দুর্ঘটনা নয়? এগুলো কি আমাদের লজ্জার বিষয় নয়?
ضدان يا أختاه ما اجتمعا *** دين الهدى والفسق والصد والله ما أزرى بأمتنا *** إلا ازدواج ما لَهُ حد
'হে বোন, দুই বিপরীত চরিত্র কখনো একত্রিত হয় না। হিদায়াতপূর্ণ দ্বীন আর পাপাচারপূর্ণ পথ। আল্লাহর শপথ, আমাদের উম্মাহকে কেবল ধ্বংস করেছে : উভয়ের মাঝে বাধাহীন সহাবস্থান।'
বিরতি : দুর্ঘটনা ও হাহাকারের বার্তা। হ্যাঁ, এই বার্তা সেই যুবতির প্রতি, যে কারুকার্য করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে এবং বোরকা ও গাউনকে কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়। তারা যেন ভালো করে শুনে।
এক তরুণীর চিঠি...যার শিরোনাম হলো, 'তোমার প্রতি এক অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান।' সে চিঠিতে লিখেছে,
'হে মহারত্নতুল্য আমার মুসলিম বোন, একটি ছোট্ট উপদেশমূলক চিরকুট পেশ করছি তোমার কাছে। যা তুমি হয়তো জানো না। আর জানলেও তা সম্পর্কে উদাসীন। পড়ো এবং দিলের কান দিয়ে শ্রবণ করো। তারপর ভাবো, যা তুমি পড়েছ এবং শুনেছ। অতঃপর তোমার লক্ষ্য তুমিই ঠিক করো। তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন : إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِراً وَإِمَّا كَفُوراً “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে।”১০৬ তুমি হয়তো ইতিপূর্বে কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ করোনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে রাসুল -এর পর সবচেয়ে প্রাণের ও প্রিয় মানুষটির সাথে আমি তাতে প্রবেশ করেছি। তিনি ছিলেন মনঃপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসার মতো একজন দুর্দান্ত মা। এটা শুধু আমার কথা নয়। বরং যারাই তাকে দেখেছে বা চিনেছে অথবা তার সম্পর্কে কারও মুখে শুনেছে, তাদের কথা। আমার মায়ের বিষয়ে কথা বলার আগে তোমাদের ছোট্ট একটি ঘটনা শুনাব। একবার আমার মা মারাত্মক আকারে রোগে ভুগছিলেন। অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ডাক্তারদের তার রোগের কঠিন অবস্থার কথা জানাতাম। মায়ের ধৈর্য, সহ্যক্ষমতা ও অভিযোগ না করা দেখে তারাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে যেতেন। সব সময় বিরতিহীনভাবে তার জবানে আল্লাহর জিকির লেগেই থাকত। তার এত ধৈর্য-সহ্যের মূল রহস্য এটিই। আল্লাহ তাআলা বলেন : فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।”১০৭ যে বছর তিনি ইনতিকাল করেছেন, সে বছরের শাবান মাসে তার অসুস্থতা চরম আকার ধারণ করে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। তখনও তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন আর বলতেন, “হে আল্লাহ, যদি আমার ভাগ্যে আপনি মৃত্যু লিখে রাখেন, তাহলে আমাকে রমাজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। কেননা, আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি দুনিয়াকে কেবল রমাজান মাস আছে বলেই ভালোবাসি। হে মালিক, আপনি আমাকে রমাজানের পূর্বে উঠিয়ে নেবেন না।" তিনি সব সময় এই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করেছেন এবং তাকে রমাজান পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতঃপর আরাফার দিনের শেষ মুহূর্তে এবং ইদের রাতের প্রথম প্রহরে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার চেহারায় একটি মৃদু হাসি লেগে ছিল। কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করেই তিনি ইনতিকাল করেছেন।'
তরুণী আরও বলে, 'আমার কথাগুলো দীর্ঘ করে ফেলছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে এ কথা বোঝাতে চাচ্ছি যে, যে দুনিয়াতে আল্লাহর হকের হিফাজত করে, মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাজত করবেন। যদি কখনো মৃতদের গোসলখানায় প্রবেশ না করে থাকো, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রবেশ করে দেখা উচিত। তোমার কোনো প্রিয় মানুষকে গোসল দেওয়ার জন্য। আর কিছুদিন পর তো সেখানে তোমাকেও গোসল দেওয়া হবে। হে বোন, তুমি কি জানো যে, মহিলাদের গোসল করানোর পর এবং কাফন পরানোর পর তাকে তার পরিহিত জামা দ্বারা ঢেকে দেওয়া হয়। অবশেষে যখন তাকে কবরে নামানো হয়, তখন সেটি ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এটা আমি আমার মাকে গোসল দেওয়ার পর বিদায় জানানোর সময় জেনেছি। সুতরাং ওহে সেই নারীরা, যারা কারুকার্যপূর্ণ জামা পরিধান করো, কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করো, যারা বিভিন্ন অংশ ঝুলে থাকা পোশাক পরিধান করো এবং এমন সব পোশাক পরিধান করো, যেগুলো যুবকদের ফিতনায় নিপতিত করে, তোমরা কি চাও যে, এসব পোশাক কবরপথে তোমার সঙ্গী হোক?
হে আমার বোন, কখনো মৃত্যু থেকে গাফিল হয়ো না, আল্লাহর আনুগত্য করে জীবন অতিবাহিত করো, অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা এবং তাঁর দান। আর তাঁর অবাধ্যতা করা হলো, অপমান, লাঞ্ছনা এবং দূরে সরে যাওয়া।
এক ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে রাতে নামাজ পড়তে উঠলে তার মনিবকেও জাগ্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু সে উঠল না। দাসী তাকে বারবার জাগ্রত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠছেই না। ফলে সে গিয়ে ভালোভাবে অজু করে তার মনিবের জন্য মুনাজাত করল। এ সময় মনিব ঘুম থেকে উঠে দাসীকে খোঁজাখুঁজি করে দেখে যে, সে আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় দুআ করছে আর বলছে, 'হে প্রভু, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। তাহলে আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না?' সে মুনাজাত শেষ করার পর মনিব তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কীভাবে জানো যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?' দাসী উত্তরে বলল, 'যদি তিনি আমাকে ভালো না-ই বাসতেন, তাহলে তিনি আপনাকে ঘুমিয়ে রাখতেন না এবং আমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করতেন না।' হে বোন, শুনলে তো এই দাসী কী বলেছে? বুঝেছ তার কথা? আল্লাহর আনুগত্য করলে তিনি ভালোবাসেন এবং নেক কাজের তাওফিক দান করেন। আর অবাধ্যতা করলে অপদস্থ করেন এবং দূরে ঠেলে দেন। এই হাদিসটি কি জীবনে বারবার শুনোনি? এই হাদিসে বর্ণিত ধমকি থেকে বাঁচার জন্য কি কখনো আমল করোনি? হাদিসটি হলো, রাসুল ﷺ ইরশাদ করেছেন : صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا জাহান্নামের দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছে—তাদের আমি দেখিনি।'... তাদের দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে তিনি বলেন:
وَنِسَاء كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتُ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
'এমন মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা, কিন্তু উলঙ্গপ্রায়। মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতি উটের পিঠের কুঁজের ন্যায়। তারা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়। '১০৮
ভালো করে শুনুন। তারা জান্নাতে প্রবেশ তো দূরের কথা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ অনেক মাইল দূর থেকে জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, الْعَنُوهُنَّ، فَإِنَّهُنَّ مَلْعُونَاتُ ، 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' ১০৯ হে বোন, তুমি কি বুঝেছ, এই হাদিসের মর্ম? অনুভব করতে পেরেছ, এই হাদিসে কত বড় ধমকি দেওয়া হয়েছে? সেসব নারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তার ঘ্রাণও পাবে না। এটি এতটাই ভয়ানক এক ধমকি, যা তনু-মনকে কাঁপিয়ে তোলে। 'তোমরা তাদের লানত দাও। কেননা, তারা লানতপ্রাপ্ত।' রাসুল -এর এই কথাটি তো আরও অনেক বেশি ভীতিকর। যা অন্তরের পূর্বে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। সুতরাং যারা এই ধমকির মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের কী অবস্থা হবে?
যেসব নারী পোশাক পরেও বিবস্ত্র, তাদের আপনারা দেখেননি মার্কেটে, বাজারে, দোকানপাটে, অনুষ্ঠানে? তারা মডেলিং আর স্টাইলের চূড়ান্ত পর্যায় অতিক্রম করেছে। কাঁধের সাথে জামা-ওড়না ঝুলিয়ে হাঁটে। ফলে তাদের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যায়। দেহাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়। তাদের চেহারাটা কেমন যেন আল্লাহর কাছে তাদের থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করছে। তুমি কি জানো না হে বোন, পর্দা কোনো সৌন্দর্যের জন্য নয়? বরং পর্দা হলো সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখার জন্য। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি। তোমরা যেন পরিশুদ্ধ হয়ে যাও। এই ফ্যাশনগুলো কি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা এবং খাদিজা -এর উত্তরসূরিদের জন্য উপযোগী? যখন কাউকে এভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন সে বলে, আমি আমার নিরাপত্তা ও চরিত্রের ব্যাপারে আস্থাশীল।

পঞ্চম পর্ব : কোনো শিরোনাম ছাড়াই এই পর্বের আলোচনা করা হবে
এ পর্বের কোনো শিরোনাম দিচ্ছি না। কেননা, আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছি না কী বিষয়ে আলোচনা করব। আর কীভাবেই বা আমি শিরোনাম নির্ধারণ করব? তাই আলোচনা শেষে আপনারাই একটা শিরোনাম নির্ধারণ করে নেবেন। সেটা আপনাদের ইচ্ছাধীন। তবুও আমি এর আলোচনা অব্যাহত রাখছি।
এক মেয়ে আমাকে বলেছে, 'জনৈক যুবকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের ফলাফল হলো, তার সাথে আমি বহুবার হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু এ বছর হজ করার পর আমি তাওবা করেছি, অনুতপ্ত হয়েছি এবং পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে এসেছি। সুতরাং আপনি আমাকে যা ইচ্ছা উপদেশ দিন।' আমি মেয়েটিকে বললাম, 'তুমি পরিপূর্ণভাবে তাওবা করো এবং আল্লাহর কাছে তাওবার ওপর দৃঢ়তা ও অটলতা কামনা করো।' এ কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তখন সে বলেছে, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি আমার তাওবায় সত্যবাদী। গুনাহ আমার অন্তর পুড়ে ফেলেছে এবং দিনের পর দিন চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরিয়ছে।'
তাই আমি তাকে সান্ত্বনা দিই এবং বলি, 'তাহলে তুমি কল্যাণের সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহর রহমত অতি প্রশস্ত। কেননা, তিনি অতি ক্ষমাশীল তার জন্য, যে তাওবা করে এবং নেক আমল করে, অতঃপর তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করে।' মেয়েটি বলল, 'তবে একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।' আমি জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'কিন্তু ছেলেটি এখনো বিভিন্ন সময়ে আমাকে কল করে। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। এটা জানা সত্ত্বেও যে, সেও অনেকটা ভালো হয়ে গেছে এবং তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।' তখন আমি মেয়েটিকে বললাম, 'বর্তমানে তার যোগাযোগের কারণ কী? এটা তো শয়তানের একটি দরজা। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।)১১০ যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে এবং অতীতে যা হয়েছে, সেগুলোকে পরিশুদ্ধ করে নিতে চায়, তাহলে সে যেন গুনাহের দরজা বন্ধ করে দেয়।' মেয়েটি বলল, 'সে আপনার বয়ানগুলো শুনে এবং ভিডিওগুলো দেখে।' আমি বললাম, 'তাহলে তার নাম্বার দাও, আমি তার সাথে কথা বলব।' অতঃপর নাম্বার নিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে আমি নিজেই তাকে আমার পরিচয় দিই। সে আমার পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়। তো আমি তাকে বললাম, 'তুমি এক মেয়ের সাথে যোগাযোগ করছ, আর তোমার এই বিষয়টি মেয়েটিকে চিন্তিত করে ফেলে। আর সেও তোমার জন্য কল্যাণ চায়। সে আমাকে বলেছে, তোমরা দুজনেই হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকেই তাওবা করার তাওফিক দান করেছেন এবং হিদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমি এ জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করো, তাঁর প্রশংসা করো। কিন্তু সবশেষে একটি বিষয় এখনো রয়ে গেছে।' ছেলেটি বলল, 'কী সেটি?' আমি বললাম, 'এখনো তাকে তোমার ফোন করা এবং ম্যাসেজ দেওয়া। যদি তুমি সত্যিই অতীতের সব ভুল ও পাপ থেকে ফিরে আসতে চাও, তাহলে তোমাকে পাপের দরজাসমূহ বন্ধ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا (আর তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করো।)১১১ সুতরাং তুমি শয়তান আগমনের প্রধান দরজা বন্ধ করে দাও।' অবশেষে ছেলেটি আমাকে একটি ভালো ওয়াদা দিল। সে আমার কথা রাখার ওয়াদা করল। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে আমি একদিন ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে তার খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'আমি এখন ভালো আছি।' তারপর মেয়েটিকে সেই ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'সে আমার সাথে এখন পরিপূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। কল ম্যাসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু...!' এ কথা বলে মেয়েটি চুপ করে রইল। এভাবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে মেয়েটি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে? বলো।' সে বলল, 'এমন একটি বিষয় এখনো বাকি আছে, যেটা আপনাকে বলা হয়নি। সেটা বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি আপনার কাছে বলতে লজ্জাবোধ করছি, আল্লাহর ব্যাপারে আমি কীভাবে সামান্যতম লজ্জাবোধও করলাম না! তবুও বিষয়টি আপনাকে জানানো জরুরি। বিষয়টি হলো, আমি একজন বিবাহিতা নারী। আমার তিনটি সন্তান আছে।' এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম, আমার মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। আমি কথাই বলতে পারছিলাম না। আমার ভেতরে কোনো এক চিৎকারকারী চিৎকার করে উঠল আর বলে উঠল যে, হে আল্লাহ, আমাদের অবনতি আর অবক্ষয় এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে!? মুসলমানদের অবক্ষয়ের দুঃখে আমার অশ্রুগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? আমি জানি যে, আমার অপরাধ অনেক বড়। আর আমি তাওবাও করেছি। আর আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহর কসম, আমি আমার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং নিজেকে রাব্বুল আলামিনের কাঠগড়ায় হাজির করেছি।' আমি নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, 'তোমার যে সন্তানগুলো আছে তারা কার সন্তান?' অতঃপর মেয়েটি বলল, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের প্রকৃত বাবার সন্তান। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত আমি।' আমি বললাম, 'তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছ যে, জিনা কেন এত জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ অপরাধ? জিনার মাধ্যমে ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়, বংশপরিচয় ও নসবনামা মিশ্রিত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزَّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। '১১২
শুধু তাই নয়; বরং তিনি এর জন্য সবচেয়ে জঘন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। তা হলো (বিবাহিতদের জিনার শাস্তি) পাথর নিক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ড। (কুরআনে তিনি জিনাকারীদের যে শান্তি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তিনি) জিনাকারী পুরুষের আগে জিনাকারিণী নারীর কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মহিলা যদি সংবরণ করত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে এত বড় অপরাধ সংঘটিত হতো না।' এ কথাগুলো শুনে মেয়েটি এতটাই কান্না করছিল যে, তার কান্নায় আমার হৃদয়টা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমি অনুভব করতাম, যখন আমার স্বামীকে দেখতাম, তখন নিজেকে অনেক অপরাধী ভাবতাম, নিজের কাছে নিজেকে অনেক তুচ্ছ মনে হতো। আর সব সময় তাকে বলতাম, 'ওগো, আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও। কিন্তু সে তো জানত না, আমি কেন তাকে এসব বলছি। বহুবার ভেবেছি, তাকে বিষয়টা খুলে বলব।' আমি তাকে বললাম, 'নিজের বিষয়টি গোপন রাখো। কারণ, যে নিজেকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলাও তাকে গোপন রাখেন। তবে আল্লাহর সাথে সততা বজায় রেখো। তাওবার ওপর অটল থেকো।' এ কথা বলায় তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তখন আমার কাছে পুরোপুরি মনে হয়েছিল যে, সে তার তাওবায় আসলেই সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ। '১১৩
বিরতি: এত সব ট্র্যাজেডি আর হাহাকারের মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা আশাবাদী। লাখো যুবতির হকের পথে ফিরে আসার মাধ্যমে আমরা অবশ্যই আশাবাদী। যারা কুপথ ছেড়ে সুপথে ফিরে আসছে, শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরছে, নিজেদের পর্দাকে সম্মানের বস্তু মনে করছে, অন্যদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করছে-তাদের সম্মানবোধ ও ইমান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হে বোন, আজ মুসলিম উম্মাহ তোমার কাছ থেকে আশা করে, তুমি যেন তাদের দিগ্বিজয়ী কিছু বীর, দুনিয়াবিমুখ আবিদ এবং কিছু আল্লাহভীরু আলিম উপহার দাও। আর এমনটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তুমি তোমার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হবে। গাফিল কখনো এমন উপহার দিতে পারবে না। তোমাদের কয়েকটি ঘটনা শুনাব। তাহলে তোমাদের হিম্মত ও মনোবল আরও বেড়ে যাবে। আর তোমরা জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর পুরুষ, নারী ও শিশু সকলেই বীরের জাতি। তবে শোনো...।
কিছু মেয়ে স্বপ্ন এবং বিভ্রমে ডুবে রয়েছে। আর তোমাদের সত্যবাদী বোনেরা দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের চাপা কষ্ট সহ্য করছে। তাদের এই কষ্টগুলো পাপী নারীদের কষ্টের মতো নয়। তাদের এই হাহাকার হলো প্রেম- আসক্তি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার হাহাকার। এগুলো উদাসীনদের চিন্তার মতো নয়। এগুলো হলো কামনাবাসনার উৎকণ্ঠার। একজন আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, 'আমি আপনার ইমেইল এড্রেসটা চাই। আমাদের কাছে কিছু চিঠি আছে, সেগুলো আপনার কাছে পাঠাব।' চিঠিগুলো আমার কাছে পৌঁছে যায়। সাথে সাথে পড়তে শুরু করি। পড়ছিলাম আর নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমার লজ্জা লেগে উঠল। সাথে সাথে আমি আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হই এই ভেবে যে, আমাদের মাঝে এমন মেয়েও আছে? হয়তো তোমরাও সেই চিঠির কিছু অংশ শুনতে চাও। যা ওরা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা, ইজ্জত-সম্মান উজাড় করে দিয়ে লিখেছে। এই চিঠিগুলো এমন দুজন মেয়ের লেখা, যারা জীবনের প্রথম থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য কুরবানি দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তারা বলেছে, 'হে শাইখ, কোনোরূপ উপস্থাপনা ছাড়াই আমাদের সমস্যার কথা তুলে ধরছি। আমরা মেয়ে, কিন্তু আমরা অন্য মেয়েদের মতো নই। অন্য মেয়েদের চিন্তাচেতনা থেকে আমাদের চিন্তাচেতনা একটু ভিন্ন।
আমাদের চিন্তা হলো, তরবারির মাধ্যমে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ )-এর ঝান্ডা উচ্চকিত করা। যদি মরে যাই, তবে তা হবে আমাদের নব জীবনের সূচনা। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য রয়েছে জিহাদের পথ। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি হলো, মৃত্যু এবং শাহাদাত। কীভাবে আমরা স্থির থাকতে পারি? নিজেদের শান্ত রাখতে পারি? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি যে, মুসলিম শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে! মা-বোনদের বন্দী করা হচ্ছে! আমাদের বাবাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তাদের নানা রকমের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু আমরা তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি না। তবে বর্তমানে অনেক বীরপুরুষরা যা করছে, তা থেকে কিছুটা সান্ত্বনা পাই। (অন্য বোনদের বলছি) যদি তোমরা অনুভব করে থাকো যে, ঘুমের মাঝে অনেক আরাম আছে, তবে আমরা কখনো সেই স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। আমরা ঘুমাই কামান আর যুদ্ধ বিমানের শব্দে। আমরা তোমাদের সাথে থেকেও তোমাদের মাঝে নেই।
হে শাইখ, যখন আমরা আপনাকে এই চিঠি লিখছি, তখন এর দ্বারা আমরা আপনার কাছ থেকে উম্মাহর বিপর্যয়ের কথা ভেবে ফিরতি কোনো চিঠির অপেক্ষায় তা লিখিনি। আপনার কাছ থেকে কোনো প্রশংসাও চাই না আমরা। কারণ আমাদের সবারই নিজের সম্পর্কে জানা আছে। বরং আমাদের এই চিঠি লেখার কারণ হচ্ছে, আমরা জিহাদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। আর আমাদের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, মৃত্যু আর শাহাদাহ। আপনি আমাদের এ কথা বলবেন না যে, “তোমরা তো নারী।” তা তো আমরা ভালো করেই জানি যে, আমরা নারী। কিন্তু আমরা হলাম এমন নারী, যাদের কলিজাটা পুরুষের কলিজার মতো। যে পুরুষরা কখনো হীনতা, অপমান ও অপদস্থতাকে মেনে নেয় না। আমাদের বলবেন না যে, তোমাদের জন্য হজ আর উমরাই হলো জিহাদের সমতুল্য। কারণ, আমরা চাই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হতে। আল্লাহর রাস্তায় আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি ব্যয় করতে চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। কসম সেই সত্তার—যাঁর হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা জান্নাতের জন্য অপেক্ষায় আছি। আল্লাহর কাছে শহিদের কী মর্যাদা, তা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। আমরা চাই আপনিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাদের সাথি হয়ে যান।'
তারা 'উম্মে আব্দুল্লাহ, উম্মে আব্দুর রহমান' এই কথা বলে চিঠি সমাপ্ত করেছে। এগুলো হলো তাদের সেই চিঠির চুম্বকাংশ। যা আমাকে নিজের মনের সাথে হিসাব করতে বাধ্য করেছে। আশা করি আপনাদেরকেও তেমনই বাধ্য করেছে। যেই জাতির মাঝে এমন বীর ও বীরাঙ্গনা নারী আছে, ইনশাআল্লাহ কেউ তাদের ঠেকাতে পারবে না। আমরাই তো সেই জাতি, যাদের সমগ্র মানবতার জন্য বের করা হয়েছে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন?
হে সত্যবাদী বোন, কোনো প্রতিরোধ-প্রতিকূলতাকে ভয় পেয়ো না। তুমি তো আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান। শত্রুদের সাজ-সরঞ্জাম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের জয়ধ্বনি সর্বদা উচ্চকিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। যদিও সত্যের চারিপাশে মিথ্যার প্রতিরোধ সমুদ্রের জলরাশির ন্যায় ফেনা তোলে।

সর্বশেষ আলোচনার শিরোনাম হলো, এখনো কল্যাণ অবশিষ্ট আছে।
হে বোন, আমাদের মা-বোনদের অধঃপতিত অবস্থা সত্ত্বেও এই উম্মাহর মাঝে এখনো কল্যাণ এবং আশার আলো জ্বলছে। উম্মাহর মাঝে কিছু সত্যবাদী মা-বোনের অস্তিত্ব আছে এখনো।
যেকোনো এক টিভি চ্যানেল একবার একটি দৃশ্য সম্প্রচার করেছিল। যেই একটি দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে এমন হাজারো দৃশ্য আবিষ্কার করেছে। আমরা তো বহুবার মহিলা সাহাবিদের এবং তাঁদের অনুসারীদের ইমানদীপ্ত গল্প শুনেছি। এটি এমনই একটি দৃশ্য, যা দেখার জন্য এবং শোনার জন্য আমাদের হৃদয় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা হলো, একজন ফিলিস্তিনি মায়ের দৃশ্য। যিনি তার ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেটির বয়স হয়তো বিশ বছর হবে। সে ইসতিশহাদি হামলা পরিচালনা করার পূর্বে তার শেষ অসিয়ত পাঠ করছিল। (হে আমার বোন, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো তার কথাগুলো। সে কতই না বড় ও মহান এক কুরবানি পেশ করেছে উম্মাহর জন্য!) তিনি তার হৃদয়ের আনন্দ ব্যক্ত করছিলেন এবং ছেলেকে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের জন্য তৈরি করছিলেন। একমাত্র প্রকৃত নিষ্কলুষ হৃদয়ের অধিকারীগণই এমন কাজ করতে পারেন। কারণ, তাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসার সাথে ঝুলে থাকে সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'বলুন, "আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। "১১৪
হে আল্লাহ, এই মা যখন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, তখন তাঁর কাছে কেমন অনুভব হয়েছে! অথচ সেই মা জানে যে, একটু পরেই তার শরীরের এমন কোনো অংশ আর অবশিষ্ট থাকবে না, যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। হে প্রভু, তার কাছে না জানি কেমন লেগেছে, যখন মমতাময়ী মা তার ছেলেকে চুমু খাচ্ছিলেন! তিনি তো তখন জানতেন যে, এটিই ছেলের কপালে শেষ চুমু। সে সময় জানি কেমন অনুভব হয়েছে তার মায়ের কাছে, যখন সে মায়ের সামনে থেকে হামলা করার জন্য বিদায়স্থান ত্যাগ করছিল! অথচ তার মা তো জানতেন যে, ছেলের সাথে এরপর আর কোনো দিন সাক্ষাৎ হবে না। যখন তিনি ছেলের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েছেন, তখন জানি কেমন মনে হয়েছে সেই মায়ের কাছে! যখন তিনি বিষ্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কেমন লেগেছে! সে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে পাঠ করছিল:
نَحْنُ الَّذِينَ بَايَعُوا مُحَمَّداً *** عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِيْنَا أَبَداً
'আমরাই সেই দল, যারা মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে বাইআত করেছে আমৃত্যু জিহাদের।'
তার সেই বিষ্ফোরণ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌছে দিয়েছে যে, আমরা এমন এক জাতি, যাদের দমানো যাবে না। কেননা, আমাদের সাথে রয়েছেন পরাক্রমশালী মহা শক্তিধর আল্লাহ তাআলা।
হে শহিদের মা, আপনি লাঞ্ছনা আর অপমানের কাছে মাথা নত করেননি। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি যা বলেছেন, তা পূরণ করেছেন। হে মা, আপনি তো মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, অপমান-অপদস্থতার সময়ে এক আলোর ঝলক, বিজলির মতো দীপ্তিময়। আপনার মতো একজন মায়ের সাথেই এই জাতির সম্পর্ক। যতদিন এই সম্পর্কের ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিন তাদের কেউ দমাতে পারবে না। হে মা, আপনি আমাদের মাঝে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। আমার থেকে লাঞ্ছনা মুছে দিয়েছেন। যেদিন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সবাই থমকে দাঁড়াবে, সেদিনের জন্য আপনি যা কিছু অগ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাতে অবশ্যই আপনি আনন্দিত হবেন। আপনি আমাদের মাঝে সাহাবি ও তাবিয়ি নারীদের ইমানের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيراً وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً
'নিশ্চয় (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী—আল্লাহ এদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। ১১৫
হে আমার মুসলিম বোন, যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে নিজেকে এই গুণগুলো দ্বারা সুসজ্জিত করো। যদি তুমি সত্যিই সফলতা অনুসন্ধান করে থাকো, তাহলে আমি তোমাকে এই পথের দিশা দিচ্ছি। আমাদের সকলেই তো সফলতা কামনা করে। আল্লাহর কসম, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোথাও সফলতা খুঁজে পাবে না। আল্লাহর সাথে সততা বজায় না রাখলে, তাঁর সন্তুষ্টিমতো না চললে সফলতার দেখা পাবে না। সফলতা নিহিত রয়েছে তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অপরাধ থেকে ইসতিগফার করার মাঝে। তুমি সফলতা খুঁজে পাবে শেষ রাতের অশ্রুতে, নেককার পুণ্যবান নারীদের সংস্পর্শে, তাওবাকারীদের কান্নায়, আল্লাহর দরবারে পাপীদের ক্রন্দনে। নামাজের একাগ্রতা, রুকু, আল্লাহর জন্য অবনত হওয়া, তাঁর কাছে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এবং তাঁর ভয়ে কান্না করার মধ্যে সফলতা আছে। রোজা, কিয়ামুল লাইল এবং আল্লাহ তাআলার বিধান পালনের মাঝে সফলতা খুঁজে পাবে। সফলতা আছে কুরআন তিলাওয়াত করার মাঝে এবং টিভি না দেখার মাঝে। আর তোমার প্রভু তো দিন-রাত তোমার দিকে হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। যখন তিনি কোনো নারীকে তাওবা করতে দেখেন, তখন তিনি খুশি হয়ে যান। যে তাকে আহ্বান করে, তিনি তার খুব কাছে থাকেন। তিনি সহনশীল, সম্মানিত, পাপ মোচনকারী, দোষ ঢেকে রাখেন। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখো না তুমি। দেখবে তোমার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে, রাস্তা দেখানো হবে এবং সাথে সাথে তুমি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করতে পারবে। তুমি নিজেই ফলাফল অনুভব করতে পারবে।
হে আল্লাহ, আমাদের যুবতিদের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে হিফাজত করুন; যারা দিশেহারা তাদের পথ দেখিয়ে দিন। হে আল্লাহ, যেই বোনেরা পাপের সাগরে নিমজ্জিত, তাদের উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ, যে সঠিক পথ থেকে দূরে সরে আছে, তাকে আপনি উত্তমভাবে আবার ফিরিয়ে আনুন। হে প্রভু, আমাদের খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা করার সুযোগ দিন। হকের ওপর অটল ও অবিচল করে দিন। পাপীদের পাপগুলো ক্ষমা করে দিন। তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। চিন্তাগ্রস্থদের চিন্তা দূর করে দিন। বিপদগ্রস্থদের বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ, সত্যবাদী নারীদের আপনি দৃঢ়তা দান করুন, তাদের আপনার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন। মুত্তাকি, পরহেজগার, পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ এবং পর্দানশিন করে দিন। তাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং তাদের অন্তরে ইমানকে সাজিয়ে দিন। তাদের কাছে কুফরি-ফিসকি এবং অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিন। তাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
হে আল্লাহ, যে আমাদের মা-বোনদের অনিষ্ট করার ইচ্ছা করে, তাকে আপনি তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত করে দিন। তাকে সমূলে ধ্বংস করে দিন। আমাদের মেয়েদেরকে ইমান, চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জাবোধ এবং পর্দা করার মানসিকতা দান করুন। হে আল্লাহ, তাদের কাছে পর্দার বিধানকে প্রিয় করে দিন। বেপর্দায় বাইরে খোলামেলা চলাফেরা করাকে তাদের কাছে অপ্রিয় করে দিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের বুঝ দান করুন। হে মালিক, আমাদের এই জমায়েতকে আপনি কবুল করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন। অতঃপর এখান থেকে চলে যাওয়াকেও আপনি কবুল করে নিন। আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

টিকাঃ
৮৭. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১০২।
৮৮. সুরা আন-নিসা, ৪:১।
৮৯. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৯০. সুরা ইবরাহিম, ১৪: ৪২।
৯১. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৫৯।
৯২. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
৯৩. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪২-৪৫।
৯৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১৭।
৯৫. সুরা আল-হাজ, ২২: ৪৬।
৯৬. সুনানু আবি দাউদ: ৫০৪৫।
৯৭. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২১-২২।
৯৮. সুরা আল-ফাজর, ৮ ৯: ২৩।
৯৯. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৪-২৬।
১০০. সুরা আল-ফাজর, ৮৯: ২৭-৩০।
১০১. সহিহুল বুখারি : ৫১৯৭, সহিহু মুসলিম : ৯০৭। উল্লেখ্য, শাইখের বক্তব্যে সংক্ষিপ্তভাবে হাদিসটির মাফহুম বর্ণিত হয়েছে, আমরা এখানে হাদিসটির মূল ইবারত থেকে আলোচ্য অংশটুকু উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)
১০২. সহিহুল বুখারি: ৫৬৫২, সহিহু মুসলিম: ২৫৭৬।
১০৩. সুরা আল-ইনসান, ৭৬ : ১২-২২।
১০৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯ : ১৭-১৮।
১০৫. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১০৬. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩।
১০৭. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৫২।
১০৮. সহিহ মুসলিম: ২১২৮।
১০৯. মুসনাদু আহমাদ: ৭০৮৩, সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৭৫৩।
১১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২০৮।
১১১. সুরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
১১২. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৩২।
১১৩. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১১৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১৬২।
১১৫. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ৩৫।

📘 এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি > 📄 সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা

📄 সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা


بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ
'যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে অন্তর বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?'১১৬
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
আল্লাহ তোমাদের নেক জীবন বর্ধিত করুন। সত্যের পথে তোমাদের যাত্রা সঠিক রাখুন। তোমাদের পদচারণা সঠিকতার ওপর রাখুন। সম্মানিত আরশের মালিক মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ও তোমাদের সম্মানের নিবাসে একত্রিত করেন, ভাই ভাই হিসেবে জান্নাতের উচ্চাসনে সমাসীন করেন। হে আল্লাহ, আপনার কাছে প্রার্থনা করি, আপনি গুনাহগারদের গুনাহ মাফ করুন, তাওবাকারীদের প্রার্থনা কবুল করে নিন, অস্থিরতায় আক্রান্তদের সঠিক পথ দেখান, পথভ্রষ্টদের হিদায়াত দিন, জীবিত-মৃত সকলকে ক্ষমা করে দিন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওবার আদেশ দিয়ে বলেন:
وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعاً أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'১১৭
আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করার ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন :
وَهُوَ الَّذِيْ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ
'আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'১১৮
আল্লাহর রহমতের দরজা সর্বদা খোলা, তাঁর কাছে আশার দরজা সব সময় খোলা। তিনি বলেন: لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ 'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।'১১৯
হাদিস শরিফে এসেছে, ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুল-কে বলতে শুনেছেন: يَا أَيُّهَا النَّاسُ، تُوبُوا إِلَى رَبِّكُمْ، فَإِنِّي أَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ 'হে লোক-সকল, তোমরা তোমাদের রবের কাছে তাওবা করো। নিশ্চয় আমি প্রতিদিন ১০০ বার তাওবা করি।'১২০
আল্লাহ তাআলা দাউদ-এর কাছে ওহি করেন, 'হে দাউদ, যদি পেছনে ফিরে থাকা লোকেরা জানত যে, আমি তাদের জন্য কতটা অপেক্ষা করি, তাদের প্রতি আমার কতটা স্নেহ কাজ করে, তাদের গুনাহের কাজ ছাড়ার প্রতি আমার চাওয়া কতটা বেশি—তবে আগ্রহের কারণে তারা মরে যেত, আমার ভালোবাসায় তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। হে দাউদ, যারা আমার ইবাদত না করে মুখ ফিরিয়ে রাখে, তাদের জন্য আমার এমন ইচ্ছা। তাহলে যারা আমার দিকে মনোনিবেশ করে, তাদের জন্য আমার ইচ্ছা কতটা সুন্দর হতে পারে?'
আজ আমাদের আলোচনার শিরোনাম, সত্যের পথে ফিরে আসা লোকদের কাফেলা। আমরা আলোচনা করব, আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনকারীদের পরিচয় ও তাদের প্রত্যাবর্তনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কাহিনি সম্পর্কে। প্রত্যাবর্তনের আলোচনার শুরু ও শেষের মাঝে পাঁচটি কথা আছে—
প্রত্যাবর্তন : ১. لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةً لَّأُوْلِي الْأَلْبَابِ )তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়।) ১২১
প্রত্যাবর্তন: ২. আল্লাহ নতুন জীবন দিলেন।
প্রত্যাবর্তন: ৩. তুমি কি তার মতো হতে চাও?
প্রত্যাবর্তন: ৪. নেশাখোরদের পথ।
প্রত্যাবর্তন: ৫. আমার হিদায়াত তার হাতে।
এরপর শেষকথা।
তবে শুরু করা যাক প্রত্যাবর্তনকারীদের নিয়ে প্রথম কথা। সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন:
'আল্লাহর একদল ফেরেশতা আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত মানুষগুলোর খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। খুঁজতে খুঁজতে যখন তারা আল্লাহর জিকিরকারীদের পেয়ে যায়, তাদের ডেকে বলে, "তোমরা তোমাদের কাজে আসো।" এরপর ফেরেশতারা তাদের ডানা দিয়ে নিকটবর্তী আকাশ পর্যন্ত ঢেকে ফেলেন। তখন তাদের রব ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, যদিও তিনি অধিক জানেন তারা কী বলবে, তিনি জানতে চান, "আমার বান্দারা কী বলে?" ফেরেশতারা উত্তর দেয়, “তারা আপনার পবিত্রতা, আপনার বড়ত্ব, আপনার প্রশংসা ও মর্যাদা বর্ণনা করে।” আল্লাহ বলেন, "তারা কী আমাকে দেখেছে?” ফেরেশতারা বলে, “না, আল্লাহর শপথ, তারা আপনাকে দেখেনি।” আল্লাহ বলেন, “যদি তারা আমাকে দেখত, তবে কেমন হতো?” ফেরেশতারা বলে, “যদি তারা আপনাকে দেখত, তবে আরও বেশি ইবাদত করত, আরও বেশি আপনার মর্যাদা ও প্রশংসা বর্ণনা করত, আরও বেশি পবিত্রতা বর্ণনা করত।”
হে আল্লাহ আপনাকে দেখার সৌভাগ্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। ক্ষতিকর ক্ষতি ও গোমরাহকারী ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ দান করুন আমাদের। হে আল্লাহ, আমাদের ইমানের সাজে সজ্জিত করুন, আমাদের হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
'এরপর আল্লাহ বলেন, “তারা আমার কাছে কী চায়?” ফেরেশতারা উত্তর দেয়, “তারা আপনার কাছে জান্নাত চায়।” আল্লাহ বলেন, “তারা কী জান্নাত দেখেছে?” ফেরেশতারা জবাবে বলে, “না, আল্লাহর শপথ, হে রব, তারা জান্নাত দেখেনি।” আল্লাহ বলেন, “তাহলে তারা জান্নাত দেখলে কী হতো?” ফেরেশতারা বলে, “তারা জান্নাত দেখলে আরও বেশি আগ্রহী হতো, আরও বেশি পরিমাণ ইবাদত করে জান্নাত তালাশ করত, আরও বেশি আকৃষ্ট হতো।”
কোথায় জান্নাতের পথের অভিযাত্রীরা? কোথায় জান্নাত-প্রত্যাশীরা?
'এরপর আল্লাহ বলেন, "তারা কীসের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে?” ফেরেশতারা বলে, "তারা জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে।" আল্লাহ বলেন, “তারা কী জাহান্নাম দেখেছে?” ফেরেশতারা জবাব দেয়, "না, আল্লাহর শপথ, হে রব, তারা জাহান্নাম দেখেনি।” আল্লাহ তখন বলেন, "যদি তারা জাহান্নাম দেখত, তবে কী হতো?” ফেরেশতারা বলে, "যদি তারা তা দেখত, তবে আরও বেশি পরিমাণে জাহান্নাম থেকে পলায়ন করত (ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে), আরও বেশি ভয় করত।”—'হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, জাহান্নাম থেকে আমাদের মুক্তি দিন।'—'এরপর আল্লাহ বলেন, "আমি তোমাদের সাক্ষ্য রেখে বলছি, আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।"-যারা এমন মজলিশের একজন, তারা সুসংবাদ নাও, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। 'এরপর ফেরেশতাদের একজন বলেন, "তাদের মাঝে অমুক তাদের একজন নয়, সে কেবল নিজের প্রয়োজন মেটাতে এসেছে।” তখন আল্লাহ বলেন, “তারা এমন মানুষ, যাদের সাথে উপবেশনকারী (ক্ষমা থেকে) বঞ্চিত হয় না। "১২২ হ্যাঁ, তোমরা সুসংবাদ নাও, কারণ তোমাদের রব প্রশস্ত রহমতের অধিকারী।
শোনো, আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বানকারী তোমাকে ডাকছেন, 'আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য পুণ্যবানরা অধীর হয়ে আছে, তাদের অপেক্ষার প্রহর বেশ লম্বা হয়েছে। আমি তাদের চেয়ে বেশি অধীর হয়ে আছি। যে আমাকে তালাশ করবে, সে আমাকে পাবে। আর যে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে তালাশ করবে, সে আমাকে পাবে না। যে আমার প্রতি এগিয়ে আসবে, আমি তাকে কবুল করে নেব। যে আমার দরজায় করাঘাত করবে, আমি তার জন্য দরজা খুলব। যে আমার ওপর তাওয়াক্কুল করবে, আমি তার জন্য যথেষ্ট হব। যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব। আমি যাদের দান করি, তারা হচ্ছে আমার জিকিরকারী দল, আমার জন্য মজলিশকারী দল, আমার কৃতজ্ঞতা আদায়কারীগণ, আমার আনুগত্যকারীগণ, আমার সম্মানকারীগণ। আর পাপীরা, আমি তাদের নিজ রহমত থেকে নিরাশ করি না, যদি তারা তাওবা করে। যদি তারা তাওবা করে, তবে আমিই তাদের প্রেমাস্পদ। যদি তারা তাওবা না করে, তবে আমি তাদের ডাক্তার। আমি তাদের পরীক্ষা করি বিপদ দিয়ে। আমি তাদের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত করি, পবিত্র করি। যে আমার দিকে অগ্রসর হয়, আমি তাকে দূর থেকে গ্রহণ করি। আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তাকে কাছ থেকে আহ্বান করি। যে আমার জন্য কোনো কিছু কুরবানি করে, আমি তাকে তার চেয়ে বেশি প্রদান করি। যে আমার সন্তুষ্টি কামনা করে, আমি তাকে তা-ই দিই, যা সে চায়। যে আমার ওপর ভরসা করে, আমার নিকট আশ্রয় চেয়ে কিছু শুরু করে, আমি তার জন্য লোহাও নরম করে দিই। যে আমার প্রতি নিবেদিত হয়, আমিও তার প্রতি নিবেদিত হই। যে আমার কাছে আশ্রয় নেয়, আমি তাকে আশ্রয় দিই। যে তার কর্মকে আমার দিকে ন্যস্ত করে, আমি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। যে নিজেকে আমার কাছে বিক্রি করে দেয়, আমি তাকে ক্রয় করে নিই; তাকে মূল্য দিয়ে দিই। জান্নাত, আমার সন্তুষ্টি, আমার ওয়াদাকে সত্য করি, পূর্বেকৃত ওয়াদাকে পূর্ণতা দিই।' আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ
'আল্লাহর চেয়ে আর কে বেশি নিজ ওয়াদা পালনকারী?'১২৩
আসল আনন্দ তো তাওবাকারীদের জন্য। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া তাদের ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের। '১২৪
আল্লাহর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হও। আল্লাহর শোকর আদায় করো। বলো: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
'হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আর আমি আপনার গোলাম। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের সকল অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার প্রতি আপনার অবতারিত সকল নিয়ামত আমি স্বীকার করছি। আর আমি নিজের কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার মতো আর কেউ নেই। '১২৫
বলো, আমি সে মৃত, যাকে আপনি জীবন দান করেছেন। সকল প্রশংসা আপনার। আমি সে দুর্বল, যাকে আপনি শক্তি দিয়েছেন; তাই আপনার জন্যই সকল স্তুতি। আমি ছোট, আপনি আমাকে লালনপালন করলেন। আপনার জন্যই সকল গুণগান। আমি দরিদ্র, আপনিই আমাকে স্বাবলম্বী করেছেন; তাই সকল প্রশংসা আপনার। আমি গোমরাহ ছিলাম, আপনিই আমাকে হিদায়াত দিলেন। অতএব সকল প্রশংসার মালিক কেবল আপনিই। আমি ছিলাম মূর্খ, আপনিই আমাকে শেখালেন; তাই সকল প্রশংসার অধিকারী একমাত্র আপনি। আমি ছিলাম ক্ষুধার্ত, আপনি আমাকে আহার করিয়েছেন; তাই সকল প্রশংসা কেবলই আপনার জন্য। সকল প্রশংসা, সকল শোকর ও কৃতজ্ঞতা আপনারই। জন্য। আপনার হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তন করে সবকিছু। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
يارب حمداً ليس غيرك يحمد *** يا من له كل الخلائق تصمد أبواب غيرك ربنا قد أوصدت *** رأيت بابك واسعاً لا يوصد
'হে রব, প্রশংসা আপনারই। অন্য কেউ প্রশংসার যোগ্য নয়। আপনার দিকেই মুখাপেক্ষী সমগ্র সৃষ্টিজগৎ। হে আমাদের রব, অন্যদের সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল আপনার প্রশস্ত দুয়ারই চির উন্মুক্ত।'
মানসুর বিন আম্মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
'সকাল হয়ে গেছে ভেবে এক রাতে আমি বের হলাম ঘর থেকে। কিন্তু রাত এখনো বাকি আছে দেখে একটি ঘরের দোরগোড়ায় বসে পড়লাম। ভেতর থেকে একটি যুবকের কান্নার আওয়াজ পেলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুবকটি বলছিল, "আপনার সম্মান ও মাহাত্ম্যের কসম, আমি আপনার অবাধ্যতা ও বিরোধিতা করতে চাইনি। কিন্তু আমি গুনাহ করে আপনার অবাধ্য হয়েছি। আমি আপনার শাস্তির বিষয়ে অনবগতও নই। আপনার শাস্তি সহ্য করার মতো শক্তিও আমার নেই। আপনার দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নফস আমাকে গুনাহের প্রতি প্ররোচিত করেছে। আমার আগ্রহ আমাকে পরাজিত করেছে। আপনি গুনাহ গোপন রাখবেন, এ বলে নফস আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। তাই আমি গুনাহ করে ফেলেছি।... কিন্তু... এখন আমাকে আপনার আজাব থেকে কে বাঁচাবে?!... আপনি যদি আমাকে তাড়িয়ে দেন, তবে আমি কার কাছে যাব?! হায়, হায়! কতটা দিন আমি গুনাহে কাটিয়েছি! হায়, আমার ধ্বংস! কতবার আমি তাওবা করেছি, আবারও কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়েছি! এখনই সময় আমি আমার রবকে লজ্জা করব।”
মানসুর বলেন, 'আমি তার কথা শুনে বললাম :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের নিজেদের আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তা-ই করে তাদের যা করার আদেশ দেওয়া হয়।”১২৬
এরপর আমি একটা কম্পন-আওয়াজ শুনলাম। তখন আমি নিজের প্রয়োজনে চলে গেলাম। সকালবেলা ফিরে এলাম সেখান দিয়ে। দেখলাম, বাড়ির দরজায় একটি লাশ রাখা আছে। আর এক বৃদ্ধা তার কাছে আসা-যাওয়া করছে। আমি তাকে বললাম, "কে মারা গেছে?”
সে বলল, "আমার চিন্তা বৃদ্ধি করো না। এখান থেকে যাও।”
আমি বললাম, “আমি একজন মুসাফির।"
বৃদ্ধা বলল, "এ আমার ছেলে। গত রাতে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে এক লোক গিয়েছিল। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় না দিন। সে জাহান্নাম সম্পর্কে একটি আয়াত তিলাওয়াত করে যায়। তার তিলাওয়াত করার পর থেকে আমার ছেলে কেঁপে কেঁপে অস্থির হয়ে ওঠে আর কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়।”
আমি বললাম, )إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ( “আমরা সকলে আল্লাহর জন্য, আর আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।" আমি এবার নিজেকে বললাম, হে ইবনে আম্মার, এটাই হচ্ছে তাকওয়াবানদের বৈশিষ্ট্য।'
أَيَا مَن لَيسَ لِي مِنهُ مُجِيرُ *** بَعفُوكَ مِن عِقابِكَ أَسْتَجِيرُ فَإِن عَذَّبَتِنِي فَالذَنبُ مِنِّي *** وَإِن تَغفِر فَأَنتَ بِهِ جَدِيرُ
'হে মহান সত্তা, যাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কেউ নেই। আপনার ক্ষমার মাধ্যমেই আশ্রয় চাই আপনার শাস্তি থেকে। আমাকে যদি শাস্তি দেন, নিশ্চয় আমি অপরাধী; শাস্তির উপযুক্ত। আর যদি ক্ষমা করেন, ক্ষমাই আপনাকে বেশি মানায়।'
যুবক-বৃদ্ধ, চিন্তিত-উদ্বিগ্ন সবার সমস্যার সমাধান হচ্ছে, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়াই সকল সমস্যার সমাধান।
এসো, আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। অনেক দিনই তো কাটালে আল্লাহ থেকে দূরে থেকে। অনেক দিন দূরে থাকার পর, গুনাহের অন্ধকার সাগরে ডুবে থাকার পর এবার এসো প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায়।
আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তনকারীগণ, যাদের অনেক দিনই কেটে গেল দূরে দূরে। পাপ ও গুনাহ যাদের পুড়ে দিল। যারা নিজেদের জীবনকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর তাদের সামনে একটি আলো উদ্ভাসিত হলো। ফলে তারা পাপের লাঞ্ছনাকে ছেড়ে এসে আনুগত্যের সাজে নিজেদের সজ্জিত করেছে। তারা নিজেদের নফস, প্রবৃত্তি, শয়তান ও তার দলের ওপর বিজয়ী হলো। তারা জান্নাতকে প্রাধান্য দিল জাহান্নামের ওপর। তারা আল্লাহর প্রতি কৃত অবাধ্যতার জন্য লজ্জিত হলো।
রাসুল ﷺ বলেন : النَّدَمُ تَوْبَةُ 'অনুতাপই তাওবা'।১২৭
জনৈক সালাফ বলেন, 'মুমিন বান্দা গুনাহ করে লজ্জিত হতে থাকে, এভাবে (তাওবা করে) সে জান্নাতে প্রবেশ করে।' তখন ইবলিস বলে, 'হায়, আমি যদি তাকে গুনাহে পতিত না করতাম!'
তলাব বিন হাবিব বলেন, 'বান্দা কর্তৃক আল্লাহর হক আদায় করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। বান্দা যদি গুনাহ করে ফেলে সকাল-সন্ধ্যায় তাওবা করে, তবে তাতে দোষ নেই। তবে যদি কেউ গুনাহের ওপর অটল থাকে, সেটা হবে অপরাধ।' অপরাধ হবে তখন, যখন কেউ অবহেলার বশবর্তী হয়ে গুনাহ করতেই থাকে। ভুলে থাকে তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা। এবং আল্লাহ যে তাকে দেখছেন, সে ব্যাপারে বেখবর থাকে।
এক লোক ইবরাহিম বিন আদামের কাছে আসলো। তাকে বলল, 'পাপ ও গুনাহের মাধ্যমে আমি নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আমাকে একটি গভীর কথা বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'আমি তোমাকে পাঁচটি জিনিসের উপদেশ দিচ্ছি।' লোকটি বলল, 'প্রথমটি বলুন।' ইবনে আদাম বললেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতা করে তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে খাবে না।' লোকটি বলল, 'কীভাবে? তিনিই তো আমাকে খাওয়ান!' ইবনে আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি এবার বলল, 'দ্বিতীয়টি কী?' ইবনে আদাম আরজ করলেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতা করে আল্লাহর জমিনে বাস করবে না। অন্য কোথাও গিয়ে বাস করবে।' লোকটি বলল, 'ইবরাহিম, তা কী করে সম্ভব! পুরো দুনিয়াটাই তো তাঁর। সব আসমানই তো তাঁর।' ইবরাহিম বিন আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বসবাস করবে আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'তৃতীয়টি বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'গুনাহ করার জন্য এমন একটি জায়গায় যাও, যেখানে গেলে আল্লাহ তোমাকে দেখবেন না।' লোকটি বলল, 'ইবরাহিম এমন কোনো জায়গা নেই। আর আল্লাহ তো ঘুমান না। তাঁকে তন্দ্রা ছুঁতে পারে না।' ইবরাহিম বিন আদام বললেন, 'আশ্চর্য! তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গা দেখছেন তুমি আবার তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'চতুর্থটি?' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'যখন তোমার কাছে মালাকুল মাওত তোমার রুহ কবজ করতে আসবে, তখন তাকে বলবে, আমি এখন মরতে চাই না।' লোকটি বলল, 'এ রকমটা কেউই করতে পারে না। আল্লাহ তো বলেছেন:
إِذَا جَاء أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
"তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় চলে আসলে তারা এক মুহূর্তও আগ-পিছ করতে পারবে না।"১২৮
ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'আশ্চর্য, তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গায় দেখছেন, মৃত্যু আসলে মৃত্যুকেও ঠেকাতে সক্ষম নও তুমি, আবার তুমি তাঁর অবাধ্যও হবে!'
লোকটি বলল, 'পঞ্চমটি বলুন।' ইবরাহিম বিন আদাম বললেন, 'যখন তোমার কাছে—আজাবের ফেরেশতা-জাবানিয়া আসবে তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য, তখন তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে জান্নাতে চলে যেও।'
লোকটি বলল, 'ইবরাহিম, কেউই এ রকম করতে পারে না।' ইবনে আদাম বললেন, 'আশ্চর্য, তুমি তাঁর রিজিক থেকে খাবে, তাঁর মালিকানাধীন জমিনে বাস করবে আর তিনি তোমাকে সব জায়গায় দেখছেন, মৃত্যু আসলে মৃত্যুকেও ঠেকাতে সক্ষম নও তুমি, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে চলে যেতেও পারবে না তুমি, তুমি আবার তাঁর অবাধ্যতাও করবে!'
লোকটি বলল, 'শোনো ইবরাহিম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আর তাঁর কাছে তাওবা করছি।'
লোকটি তাওবা করল, আল্লাহর অভিমুখী হলো, পাপ ও গুনাহ থেকে আল্লাহর দিকে পালিয়ে আসলো। সে ঘোষণা দিল প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হওয়ার। আর তুমি! হ্যাঁ, আমি তোমাকেই বলছি। তুমি আল্লাহর দেওয়া রিজিক খাচ্ছ, তাঁর জমিনে বাস করছ, যে জায়গাতেই থাকো না কেন তিনি তোমাকে সব সময় দেখছেন, মৃত্যু আসলে তুমি ঠেকাতেও পারবে না, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে চলে যেতে পারবে না...তোমার জন্য কি এতটুকু উপদেশই যথেষ্ট নয়! তোমার কি এখনো তাওবা করার সময় আসেনি! এখনো কি ক্ষমা চাওয়ার সময় আসেনি! এখনো কি সময় আসেনি প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একজন হওয়ার!
أَمَا آنَ لِمَا أَنْتَ فِيْهِ مَتَابٌ *** وَهَلْ لَكَ مِنْ بَعْدِ الغِيَابِ إِيَابٌ تَقَضَّتْ بِكَ الْأَعْمَارُ فِي غَيْرِ طَاعَةٍ *** سِوَى عَمَلٍ تَرْجُوهُ وَهُو سَرَابٌ وَلَيْسَ لِلْمَرْءِ سَلَامَةُ دِينِهِ *** سِوَى عُزْلَةٍ فِيهَا الجَلِيسُ كِتَابٌ
كِتَابٌ حَوَى الْعُلُومَ بِكُلِّهَا *** وَكُلُّ مَا حَوَى مِنَ الْعُلُومِ صَوَابٌ فَفِيْهِ الدَّوَاءُ لِكُلِّ دَاءٍ فَاغْفَرْ بِهِ *** فَوَا اللَّهُ مَا عَنْهُ يَنُوبُ كِتَابٌ
‘এখনো কি ঘনিয়ে আসেনি তাওবা করার সময়? একবার প্রস্থানের পর কি আর পারবে ফিরে আসতে? জীবন পুরোই অবাধ্যতায় কাটিয়ে দিলে। খেয়াল-খুশিমতো চলে, মরীচিকার পেছনেই ছুটলে তুমি। কারও দ্বীন তখনই শুদ্ধ থাকে, যখন কুরআনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক হয়। কুরআন একটি গ্রন্থ, যাতে একত্র হয়েছে সব জ্ঞান। আর যা জ্ঞান তাতে আছে, তার সবই শুদ্ধ তার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। আঁকড়ে ধরো একে, এতেই আছে সকল রোগের ওষুধ। আল্লাহর শপথ, কোনো গ্রন্থ তার সমকক্ষ হতে পারে না।’
আসো, আমরা এ প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার অতীতের কিছু মানুষের আর এ সময়ের কিছু মানুষের ঘটনা শুনি। আসো, আমরা তাদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার একটুখানি ইতিহাস। যাদের গল্পগুলো সত্য গল্প। অনুতপ্ততায় ভরা গল্প। অশ্রু ও আফসোসের গল্প। শিক্ষায় পরিপূর্ণ কাহিনি। যারা প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার আগে অভিযোগ করত চিন্তা-উদ্বিগ্নতার। দুঃখভরা কণ্ঠে সমাধান চাইত। যাদের কণ্ঠে ফুটে উঠত না পাওয়ার বেদনা। যারা ডুবে ছিল পাপসমুদ্রে। মদ-নেশা, নগ্নতা-অশ্লীলতা ছিল যাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাদের মুক্তি ছিল কেবল আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাঝে। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার মাঝেই ছিল তাদের জন্য সমাধান।

প্রত্যাবর্তন: ১
তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়
আবু হিশাম আস-সুফি বলেন:
'বসরার উদ্দেশে যাত্রা করব বলে ঠিক করলাম। একটি নৌকোয় চড়ব বলে নৌকোর কাছে আসলাম। দেখলাম, নৌকোতে একজন লোক। সাথে একজন তরুণী। লোকটি আমাকে বলল, “এখানে জায়গা নেই।” আমি তরুণীকে বললাম, আমাকেও নিতে। সে সায় দিল।
আমরা সফর শুরু করলাম নৌকোযোগে। লোকটি সকালের নাশতা আনতে বলল। নাশতা প্রস্তুত হলো। তরুণী বলল, “ওই মিসকিন লোকটিকেও ডাকো আমাদের সাথে খাবে সে।” আমি তাদের সাথে খাওয়ার জন্য আসলাম, কারণ আমি আদতে একজন মিসকিনই ছিলাম।
খাওয়ার পর লোকটি বলল, "তরুণী, সুরা আনো।" লোকটি সুরা পান করল। আমাকেও পান করাতে আদেশ দিল তাকে। তরুণী বলল, "আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন, মেহমানের মন-মর্জির ব্যাপার আছে।” এভাবে মদপান থেকে রেহাই পেলাম। লোকটির পেটে একটু মদ পড়তেই সে বলল, "তরুণী, তোমার উদ-বীণা নিয়ে আসো। তোমার প্রতিভার স্ফুরণ দেখাও।” তরুণী উদ-বীণায় সুর তুলল, গান গাইল।...
এরপর লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার কেমন লেগেছে?” আমি বললাম, “আমার কাছে এর চেয়ে উত্তম কিছু আছে। আমার কাছে যেটা আছে, সেটা এর চেয়ে উত্তম।” লোকটি বলল, “শোনাও তবে।” আমি শুরু করলাম:
إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ ۖ وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ
“যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে। যখন নক্ষত্র মলিন হয়ে যাবে। যখন পর্বতমালা অপসারিত হবে। যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটগুলো উপেক্ষিত হবে। যখন বন্য পশুরা একত্রিত হয়ে যাবে। যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে। যখন দেহে আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে। আর যখন জীবন্ত পুঁতে-ফেলা কন্যা-শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”১২৯
কুরআনের শব্দমালার তিলাওয়াত লোকটির অন্তরে কাঁপন তুলল। আমি তিলাওয়াত করতে থাকলাম। অবশেষে وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ )আর যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে।) আয়াতে এসে থামলাম আমি।
লোকটি তার দাসীকে বলল, “ওহে! তুমি আল্লাহর জন্য স্বাধীন।” এরপর সে সবটা মদ ছুড়ে ফেলে দিল। উদ-বীণা ভেঙে ফেলল। আমাকে ডেকে মুআনাকা করল আর কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাই, আল্লাহ কি আমার তাওবা কবুল করবেন?!” আমি বললাম, “হ্যাঁ, কেন নয়। إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهَّرِينَ )নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।) ১৩০
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ )তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ মোচন করেন।) ১৩১”
এরপর সে তাওবা করল। তাওবার ওপর অটল থাকল। নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে নিল। তার মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার সাথেই ছিলাম। ৪০ বছর কেটেছিল একসঙ্গে। তার মৃত্যুর পরের এক রাতের কথা। আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম। তাকে বললাম, "তুমি কোথায় জায়গা পেলে?" সে বলল, "জান্নাতে।” আমি জানতে চাইলাম, “কীভাবে?” সে জানাল, “তোমার وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ (যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে) আয়াতের তিলাওয়াতের মাধ্যমে।” আহ! আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
আমার ও তোমার অবস্থা কেমন হবে, যখন-
وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ وَإِذَا السَّمَاءِ كُشِطَتْ وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعَرَتْ- وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ عَلِمَتْ نَفْسٌ مَّا أَحْضَرَتْ
'যখন আমলনামা উন্মোচিত হবে। যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হবে। যখন জাহান্নামের অগ্নি প্রজ্বলিত করা হবে। এবং যখন জান্নাত সন্নিকটবর্তী হবে। তখন প্রত্যেকেই জেনে নেবে সে কী উপস্থিত করেছে।' ১৩২
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنكُمْ خَافِيَةٌ
'সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না।' ১৩৩
সেদিন আমাদের অবস্থা কেমন হবে? আল্লাহ! যখন দুচোখ কথা বলা শুরু করবে। যখন দুচোখ বলবে, 'আমাকে হারাম কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।' হায়, যখন দু-কান সাক্ষ্য দেবে, আমাকে দিয়ে সে গান শুনেছে, হারাম গানের মজা নিয়েছে। হায়, যখন দুহাত কথা বলা শুরু করবে, বলবে, আমাকে সুদ ও হারাম কাজে ব্যবহার করেছে। হায়, যখন দু-পা বলা শুরু করবে, আমাকেও সে হারাম কাজে ব্যবহার করেছে। আমাকে দিয়ে সে হারামের দিকে হেঁটে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।' ১৩৪
وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِن ظَنَنتُمْ أَنَّ اللَّهَ لَا يَعْلَمُ كَثِيرًا مِّمَّا تَعْمَلُونَ - وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنتُم بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُم مِّنْ الْخَاسِرِينَ - فَإِن يَصْبِرُوا فَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ وَإِن يَسْتَعْتِبُوا فَمَا هُم مِّنَ الْمُعْتَبِينَ
'তোমাদের কান, তোমাদের চোখ এবং তোমাদের ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না ধারণার বশবর্তী হয়ে তোমরা তাদের কাছে গোপন করতে না। তবে তোমাদের ধারণা ছিল যে, তোমরা যা করো, তার অধিকাংশই আল্লাহ জানেন না। তোমাদের পালনকর্তা সম্বন্ধে তোমাদের এ ভুল ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছ। এখন যদি তারা ধৈর্যধারণ করে, তবুও জাহান্নামই হবে তাদের আবাস; আর যদি তারা ওজরখাহি করে, তবুও তাদের ওজর কবুল করা হবে না।'১৩৫
কিয়ামতের সেই ভয়ংকর দিনে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইলে, মুক্তি পেতে চাইলে, সফল হতে চাইলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক, প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হয়ে যাওয়াই নাজাত ও সফলতার একমাত্র পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعاً أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'১৩৬

প্রত্যাবর্তন: ২ আল্লাহ নতুন জীবন দিলেন
বর্ণনাকারী ঘটনাটি এভাবে শুনাল :
'আমার বন্ধুর অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। হ্যাঁ, পরিবর্তন হয়ে গেল। তার শান্ত- সমাহিত হাসি তোমার কানে ফজরের মৃদু বাতাসের মতো খেলে যাবে। কিন্তু ইতিপূর্বে তার উদ্ধত ও অবজ্ঞার হাসি কানে বিঁধত, মনে বিঁধত কাঁটার মতো। এখন তার চোখের লাজুক চাহনি থেকে পবিত্রতা-শুদ্ধিতা ঠিকরে পড়ছে যেন। কিন্তু এর আগে ওই চোখ গুনাহের দিকে ইশারা করত। এখন তার মুখ থেকে প্রতিটি কথা হিসেব করে বেরোয়। কিন্তু এর আগে তার কথাগুলো মন্দ ও অনর্থক বিষয়াদির নির্দেশ করত। কাউকে কিছু বলা, কারও অন্তরে আঘাত দেওয়া ছিল তার কাছে তুচ্ছ বিষয়। সে কাউকে পরোয়া করত না, গুরুত্বও দিত না। এখন তার চেহারা শান্ত সমাহিত, সুন্দর সুশ্রী দাড়িতে সুশোভিত। চেহারা থেকে যেন নুর ঠিকরে বেরুচ্ছে। আজ যে লোকটা দেখছি আমার সামনে, এর আগে এ লোকটাই ছিল বেপরোয়া, বিপরীতমুখী।
প্রথম দেখায় আমি এখন তার চেহারার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিলাম। আমার মনে কী চলছে, সে ঠিক ঠিক বুঝে নেয়। বলে, 'তুমি হয়তো জানতে চাচ্ছ, কোন কারণে আমার এ পরিবর্তন?' আমি বললাম, 'আলবত। এতদিন তোমার যে অবয়ব ও কর্মকাণ্ড আমার মনে প্রোথিত ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক ভিন্ন তুমি। শেষ কয় বছর আগে দেখা হয়েছিল তোমার সঙ্গে। তখনকার তুমি আর এখনকার তুমি বেশ আলাদা।'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুরু করল সে, 'আল্লাহই নতুন জীবন দিলেন আমাকে।' আমি বললাম, 'নিশ্চয় এ পরিবর্তনের পেছনে কোনো ঘটনা আছে?!' 'হ্যাঁ, আছে বইকী। আমি বলছি সবটা।' বলতে বলতে সে আমার দিকে ফিরল, 'সাহিলির পথে গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমি। পথে একটা পুল পড়ল। পুলের ওপর গাড়ি উঠিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ছোট্ট শিশু গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হতে দেখলাম। তাকে দেখামাত্র দুর্ঘটনা এড়িয়ে যেতে স্টিয়ারিং দ্রুত ঘুরালাম।
কিন্তু কোনো কিছু বোঝার আগে আমি নিজেকে গভীর পানিতে আবিষ্কার করলাম। শ্বাস নেওয়ার জন্য মাথা তুললাম। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িতে পানি ভরে যেতে থাকে। গাড়ির সবদিক থেকে পানি ঢুকতে থাকে। গাড়ির দরজা খোলার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু দরজা খুলতে পারলাম না। আমি নিশ্চিত হলাম এখানেই জীবনের ইতি ঘটবে। আর কিছু মুহূর্ত। এরপরই আমি শেষ।
আমার চোখের সামনে দিয়ে জীবনের কিছু চিত্র দ্রুত চলে গেল একের পর এক। আমার পুরো জীবনটা যেন একবার দেখতে পেলাম আমি। আমার সব দুষ্কর্ম সব পাগলামো আমার সামনে ছিল তখন। তখন আমার মনে হচ্ছিল এটা পানি নয়, এটা কোনো ভয়ংকর ভয়ের আবেশ। আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। অনুভব করলাম অন্ধকারের তলদেশে হারিয়ে যাচ্ছি। প্রচণ্ড ভয় আমাকে ঘিরে ধরল। অনেক জোরে চিৎকার দিলাম। কিন্তু এত জোরের চিৎকারের এতটুকু শব্দ আমার কান পর্যন্ত পৌঁছল না। চিৎকার করে বলে উঠলাম, 'হে রব, হে রব, আপনি তো তিনি, যিনি বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন।' (আপনিই তো বলেছেন :)
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ
'বলো তো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে ডাকে। ১৩৭
'আমি হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম ওপরের দিকে। এ কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে হাঁসফাঁস করছিলাম। কষ্টটা মৃত্যুর ভয়ে ছিল না। মৃত্যু তো আমার জন্য নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। নিজের গুনাহ ও পাপের কষ্ট থেকে মুক্তি চাচ্ছিলাম তখন আমি। সে কষ্ট যেন আমার কণ্ঠরোধ করে রেখেছে। মনে হচ্ছিল আমার গলায় প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরেছে সে কষ্ট।
প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আমি সে ভীতিকর পরিবেশ ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছিলাম। আমার প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করার আগেই তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। আমি অনুভব করছিলাম আমার আশপাশের সবটা পানি আমাকে চেপে ধরেছে। যেন লোহার দেয়াল আমাকে সবদিক থেকে চেপে ধরেছে। মনে মনে বললাম, নিঃসন্দেহে এখানেই আমার জীবনের অবসান।' আমি শাহাদাতাইন উচ্চারণ করলাম। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলাম। হাতদুটো নাড়ালাম। তখন গাড়ির সামনে কিছুটা ফাঁক সৃষ্টি হলো। হুম...গাড়ির বাইরে যাওয়ার একটু আশা দেখা গেল। তখন আমার মনে পড়ল, গাড়ির সামনের কাঁচটা তো ভাঙা। আল্লাহর ইচ্ছায় তিন দিন আগেই তো কাঁচটা ভাঙল।
কোনো কিছু চিন্তা না করেই পরক্ষণে আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। নিজেকে সে ফাঁক জায়গার দিকে ঠেলে দিলাম। পানির চাপ থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজেকে এবার কিছুটা আলোর মাঝে পেলাম। দেখলাম, আমি গাড়ির বাইরে আসতে পেরেছি। ওপরে উঠে এসে তাকালাম চারপাশে। দেখলাম, মানুষজন তীরে দাঁড়িয়ে। একে অন্যকে ডেকে ডেকে হইচই করছিল। তাদের কথা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না কিছুই। আমাকে দেখে তাদের দুজন নেমে এল। পানি থেকে বের করে তীরে নিয়ে এল আমায়। তীরে আসলেও আমার আশপাশের সবকিছু সম্পর্কে বেখবর আমি। বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, আমি মৃত্যু থেকে বেঁচে ফিরেছি—এখন আমি জীবিত।
আমি গাড়িতে ছিলাম। পানিতে ডুবে গেলাম। আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। মরে যাচ্ছিলাম। একরকম মরেই গেলাম। আমার দেহটা হয়তো এখানে কোথাও দাফনকৃত থাকত। কিন্তু আমি বেঁচে ফিরলাম। আর নতুন একটা জীবন পেলাম। আমি সে, যে অতীতে মরার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে।
যাই হোক, তখন আমি সে জায়গা থেকে দৌড়ে চলে আসার তাগাদা অনুভব করলাম। সে জায়গা থেকে শরীরের সবটা জোর দিয়ে পালিয়ে আসতে চাইছিলাম। সে জায়গাটাতে নিজের কদর্য অতীতকে দাফন করে এলাম। আমি বাড়িতে এলাম একটা নতুন মানুষ হয়ে। বাড়ি থেকে ঘণ্টাকয়েক আগে বেরিয়ে যাওয়া আর ফিরে আসা আমি একজন ছিলাম না।
বাড়িতে এলাম। এসে প্রথম যে জিনিসটার দিকে আমার চোখ পড়ল, তা ছিল দেয়ালে ঝুলানো অভিনেত্রী, নর্তকী, গায়িকাদের ছবি। ছবিগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে সবগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললাম। এরপর সেগুলো খাটের ওপর নিক্ষেপ করে কাঁদতে থাকলাম। প্রথমবারের মতো আমার অতীত জীবনটা তখন আমার ভেতরে বেশ তিক্ততা সৃষ্টি করল। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। অনুতপ্ত হলাম। আল্লাহর আদেশের প্রতি আমার শিথিলতার কারণে লজ্জিত হলাম। আমার চোখের ভেতর থেকে, না, আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে তাওবা অশ্রু হয়ে ঝরছিল আমার চোখ দিয়ে। শরীরটা কাঁপতে থাকল। হঠাৎ তখন সে আওয়াজটা শুনলাম, যে আওয়াজ অনেক দিনই আমি শুনেছি এবং অবজ্ঞা করে এসেছি—আজান, আজানের আওয়াজ এল আমার কানে। যে আজান জীবনে অগণিত বার শুনেছি, আজ সে আজান শুনে মনে হচ্ছে প্রথমবারের মতো শুনছি।'
مَنَائِرُكُمْ عَلَتْ فِي كُلِّ ساحِ *** وَمَسْجِدكُمْ مِنَ العُبَادِ خالي وَجَلْجَلَةُ الأَذَانِ بكلِّ حَةٍ *** وَلَكِنْ أَيْنَ صَوْتُ مِنْ بَلالِ
'প্রতিটি প্রান্তরে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তোমাদের সুউচ্চ মিনার। কিন্তু মসজিদগুলোতে দেখা নেই ইবাদতকারীর। আজানের সুরধ্বনি তোলে প্রতিটি মহল্লায়, কিন্তু বিলালের মতো দরদি মুয়াজ্জিন কোথাও নেই।'
'আমি কেঁপে কেঁপে উঠে পড়লাম। অজু করলাম। মসজিদে... মসজিদে চলে এলাম। নামাজের পর আমি তাওবার ঘোষণা করলাম। বসে কাঁদতে থাকলাম। আল্লাহর কাছে দুআ করলাম আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিতে। সে সময়টা থেকে আমি এমন হয়ে গেছি, যেমন তুমি এখন দেখছ।'
আমি তাকে বললাম, 'তোমাকে মুবারকবাদ। আমার চোখে তপ্ত অশ্রু ঝরছে তোমার এ আগমনে। প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় তোমার যোগদানকে মুবারকবাদ!'
আমার প্রিয় বন্ধুরা, আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةٌ نَّصُوحاً
'হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৩৮
রাসুল বলেন:
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءُ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُونَ
'প্রত্যেক আদম-সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তাওবাকারীগণ।' ১৩৯
উমর বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো, বান্দা গুনাহ করে তাওবা করবে এবং পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হবে না।'
হাসান বসরি বলেন, 'তাওবাতুন নাসুহা বা আন্তরিক তাওবা হলো, আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া, মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং সে গুনাহে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করা।'
ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন, 'সত্যিকার তাওবাকারীর আলামত হলো দীর্ঘ অশ্রুপ্রবাহ, নির্জনতা পছন্দ করা এবং নিজের প্রত্যেক বিষয়ে মুহাসাবা বা পর্যালোচনা করা।'
হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমাদেরকে পবিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। যাদের কোনো ভয় নেই, আর যারা চিন্তিতও হবে না।

প্রত্যাবর্তন: ৩
তুমি কি তার মতো হতে চাও?!
এক পুণ্যবান বলেন:
'আমার এক আত্মীয় ছিল, যে একই সাথে নিকটও ছিল, আবার পরও ছিল। নিকট ছিল আত্মীয়তায়। কিন্তু দ্বীন হিসেবে দূরবর্তী সম্পর্কের। তার জীবনের কয়েকটা মিনিট থেকে আমি জেনে গেলাম তার দিন কাটানোর বিস্তারিত বিবরণ। কয়েকটা মিনিটের ভেতরেই সে আমাকে নিশ্চিত করেছে সাধারণত সে নামাজ পড়ে না। এ রকম আরও কত মানুষই তো আছে আমাদের সমাজে।
আমি তাকে নসিহত করলাম বারবার। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, সে ত্বরাপ্রবণ। আমি আশা করছিলাম, সে সালাত আদায়কারীদের একজন তো হয়ে যাবে। কিন্তু কখনো সে অগ্রসর হতো, আবার কখনো পিছিয়ে যেত। তার ধারণা জীবনটা মস্ত বড়। জীবন স্থায়ী। (হায়, ধ্বংস হোক দীর্ঘসূত্রতাকারীরা!)
'অচিরেই আমি তাওবা করব' বলে গুনাহ করতে থাকাকে দীর্ঘসূত্রতা বলে। আমি তাকে বললাম, “কতদিন বাঁচবে তুমি? বিশ! ত্রিশ! আশি! এরপর কী হবে?! এ ধোঁকার দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতেই হবে। দিন যত লম্বা হোক, রাত যত ছোট হোক—তোমার জীবনের সমাপ্তি একদিন আসবেই।
এক রাতের কথা। আমি আশা করিনি সে এমনটা করবে। এক অন্ধকার রাতে শয়তান তাকে বশীভূত করে নেয়, তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। একে একে সে পা ফেলে ধাবিত হয় গুনাহ ও অপরাধের দিকে। দীর্ঘ আশা তাকে আবারও ধোঁকা দিল। জীবনের সৌন্দর্য, দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে ধোঁকায় নিপতিত করল। তার মতো তো এমন অনেকেই আছে—
اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ
'শয়তান তাদের বশীভূত করে নিয়েছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। ১৪০
একদিন হঠাৎ অসময়ে তার কাছে এক মেহমান এল। তার দরজার কড়া নাড়ল। এ মেহমান আসা অবশ্যম্ভাবী ছিল। একবারই আসে সে। সাধারণত মেহমান আসে আনন্দ নিয়ে। কিন্তু এ মেহমান এসেছিল কষ্ট ও কাঠিন্য নিয়ে। নিশ্চয় আমার সে আত্মীয় চেয়েছিল টাকা-পয়সা দিয়ে তাকে বিদায় করতে, কিন্তু পারেনি সে। হয়তো চেয়েছিল কোনো ডাক্তার-ওষুধের মাধ্যমে তাকে বিদায় করবে। কিন্তু তাও হওয়ার জো নেই। সকল প্রতিরোধীয় কার্য বিফল হলো।
حيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ 'তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল হয়ে গেছে। '১৪১
সব শেষ হয়ে গেল। সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাহাড়সম স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। তার কণ্ঠেও ধ্বনিত হলো মৃত্যুকালীন ঘড়ঘড় শব্দ। তার নিশ্বাস আটকে গেল। রুহ দেহ ছেড়ে চলে গেল। তার কাছে নিকটবর্তী হতে থাকল কঠিন কিছু প্রশ্ন, হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম।'
যুবকটা বলে চলল, 'আমাদের পরিবারে অল্প বয়সে মৃত্যুবরণকারী সে-ই প্রথম ছিল না। তার আগে আরও কয়েকজনকে যুবক বয়সেই হারিয়েছি আমরা। কিন্তু তার মৃত্যুটা ছিল ভয়ের। তার মৃত্যুটা ছিল শিক্ষণীয়।
তার মৃত্যু, গোসল, জানাজা ও দাফনের দিনটি ছিল একটি স্মরণীয় দিন। অনেকেই সেদিন অনুপস্থিত ছিল। আমি ছিলাম এমন মানুষদের অগ্রে। কীভাবে আমি এমন একজন লোকের জানাজা আদায় করব, যার জানাজা আদায় করতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল নিষেধ করেছেন! আমি তার জানাজায় ছিলাম না। কারণ এটাই হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহর ইবাদত। যেন আল্লাহর আনুগত্যের ষোলোকলা পূর্ণ হয় আমার।
এরপর একদিন আত্মীয়-স্বজনরা একটি মজলিশে একত্রিত হয়। অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। বলতে গেলে আত্মীয়দের অধিকাংশরাই ছিল সেদিন। যারা নিজেদের দুনিয়ার ব্যাপারে জ্ঞানবান আর দ্বীনের বিষয়ে মূর্খ। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন:
يَعْلَمُونَ ظَاهِراً مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
'তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে, আর তারা পরকালের খবর রাখে না। ১৪২
আত্মীয়দের একজন দাঁড়াল। নিজের তলোয়ার বের করে তিরটা তাক করল সে। আর রেগেমেগে উচ্চস্বরে ব্যঙ্গ করে সকলকে শুনিয়ে বলে উঠল, 'শোনো, বড় তো মুসলমানি ফলাও। এখন তোমার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, তোমার কর্তব্য পালন করা কোথায় গেল?! অমুক মরল, কিন্তু তোমাকে আশেপাশে কোথাও তো দেখা গেল না। তোমার কোনো যোগদানই তো দেখলাম না আমরা।' তার কথার পর উপস্থিত সবার চোখের তিরস্কার-বাণ আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। হাত নাড়িয়ে আমাকে দুষতে দুষতে বলছিল, 'জানাজা ও শোকের দায়িত্ব পালন না করে কোথায় পালিয়ে ছিলে?!' কেবল এতটুকুই নয়, তাদের একজন তো ব্যঙ্গ করে এও বলল, 'নামাজ পড়া, রোজা রাখা না ছাই, হুঁহ...আত্মীয়তার অধিকার, পরিবারের কর্তব্য পালন করে না আবার দ্বীনদারি দেখায়!'
মজলিশের মানুষজন যা বলার বলতে থাকল। আমি তাদের কথার প্রত্যুত্তর করলাম না। তারা তিরস্কারের তিরগুলো আমার দিকে নিক্ষেপ করে ক্ষান্ত হলে আমি বলতে শুরু করলাম। প্রথম যে কথা বলেছে, সে আত্মীয়ের উদ্দেশে বলা শুরু করলাম সবাইকে শুনিয়ে, 'আমি যদি মাগরিবের নামাজ চার রাকআত আদায় করি, সেটা কি জায়িজ হবে?' সে চুপ। জবাব দিচ্ছিল না। তার ঠোঁট নড়ছিল। হতবাক নেত্রে তাকিয়ে ছিল। হাতদুটো নড়ছিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। তার কাছে জবাবটা জানতে চাইলাম, যেন সবাই শুনে নেয়। উত্তর দিল সে। সবাই শুনল। তিনবার জিজ্ঞেস করার পর বলল, 'জায়িজ হবে না।' এবার আমি বললাম, 'ঠিক বলেছ। এটাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্ধারিত পদ্ধতি। আমরা আল্লাহর আনুগত্য করি। তাঁর রাসুলের অনুসরণ করি। কিতাব ও সুন্নাহতে তাদের সব আদেশ-নিষেধ উল্লেখ করা আছে। কিতাব-সুন্নাহর হুকুম হচ্ছে, যে ব্যক্তি ঠিকমতো নামাজ আদায় করে না, তার জানাজায় শরিক না হওয়া। কিতাব-সুন্নাহ তাকে কাফির নাম দিয়েছে।' আমি উচ্চ আওয়াজে বললাম। সত্য কথাকে উচ্চ আওয়াজে শুনিয়ে দিলাম। সত্য বিজয়ী হয়, পরাজিত নয়।
আমার তৃণীরের তির নিক্ষেপ করলাম। আমাকে তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ-নিষেধ শুনতে হবে। না, আমি তোমার কথা শুনব? তোমার কথা মানব? মজলিশের সবার উদ্দেশে জোর আওয়াজে বলতে থাকলাম, 'শরিয়তে আমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে নামাজ ত্যাগকারী মারা গেলে তাকে গোসল না দিতে, তাকে মুসলিমদের কবরে দাফন না করতে। তাই আমি তার জানাজায় আসিনি। এটা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যে নিজেকে অটল রাখতেই করেছি আমি।' পুরো মজলিশে পিনপতন নীরবতা। সবার কথার তলোয়ার নিচে নেমে গেছে। সবার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। সবাই বুঝে নিল বিষয়টা। আল্লাহ বলেন:
قُلْ جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقاً
বলুন, "সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।"১৪৩
যুবকটা এরপর বলতে লাগল, 'কয়েক মাস পরের কথা। আমাদের পরিবারের অনেক যুবকই সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। তাদের দেখলাম, সবাই নিজ নিজ মুহাসাবায় (আত্মসমালোচনা) ব্যস্ত। নিজেদের কাজগুলোকে দ্বীনের আলোকে সাজিয়ে তুলছে তারা। তারা সবাই এমন সতর্ক হলো যে, যেন কখনো নামাজ ছুটে না যায়। আমার সে আত্মীয়টির ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরবর্তীদের জন্য রহমতস্বরূপ হয়ে গেল, পরবর্তীদের জন্য তা শিক্ষণীয় হলো। এমনকি আমার সেদিনের বলা কথাগুলোর প্রভাবে এলাকাজুড়ে আল্লাহর বাণী গুঞ্জরিত হচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَداً وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ
“আর তাদের কেউ মারা গেলে আপনি তার জন্য কখনো (জানাজার) নামাজ পড়বেন না, আর তার কবরের পাশে দণ্ডায়মান হবেন না।” ১৪৪
গুঞ্জরিত হচ্ছিল রাসুল -এর বাণী। তিনি বলেন :
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
'আমাদের এবং তাদের (কাফিরদের) মাঝে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ পার্থক্যকারী আমল) রয়েছে, তা হলো নামাজ। সুতরাং যে তা পরিত্যাগ করল, সে কুফরি করল।' ১৪৫
আমার প্রিয় ভাইয়েরা,
আপনাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আমাকে আপনারা বলুন, যুবকদের অবস্থা কেমন এখন? আজকের যুবকদের নামাজের অবস্থা কেমন? হায়, তাদের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যাই! যুবকদের একটা অংশ না নামাজ পড়ে, না রুকু করে, না রাতে না দিনে কখনো নামাজের ধার ধারে। একদল যুবক আগপিছ হতে থাকে। নামাজের সময় ঘুমায়। অসময়ে নামাজ পড়ে। নিজের যখন ইচ্ছে হয় তখন পড়ে। তারা এমনটা কীভাবে করতে পারে?
أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
'তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? সেই মহা দিবসে। যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে।' ১৪৬
হায়, এখনো কি সময় আসেনি সালাতের কাতারে দণ্ডায়মান হওয়ার! এখনো কি সময় আসেনি প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার!
প্রাজ্ঞজন বলেন, 'তুমি জেনে নাও, মানুষের তাওবা চারটি বিষয়ের সমন্বয়ে হয়ে থাকে:
এক. নিজের জবানকে গুনাহর কথা তথা গিবত, চোগলখুরি ও মিথ্যা থেকে রক্ষা করা।
দুই. অন্তরে মুসলিমদের জন্য হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা না রাখা।
তিন. মন্দ সঙ্গীদের বর্জন করা, তাদের কারও সাথে ওঠাবসা না করা।
চার. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।'
এসো, আমরা গুনাহর জন্য লজ্জিত হই, অনুতপ্ত হই। আল্লাহর কাছে গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর ইবাদতে সাধনা করি।

প্রত্যাবর্তন: ৪
নেশাখোরদের পথ
নেশার কারণে অনেক যুবক-তরুণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ যাদের ওপর রহম করেছেন তারা ব্যতীত প্রায় যুবকই আজ নেশার কালো থাবার নিচে। এমনই এক যুবক দুঃখজনক ঘটনা শুনাল, 'মাধ্যমিক শেষ করার পর আমি একটা ব্যবসায়িক কোম্পানিতে চাকরি নিই। অনেক বেশি কাজ ফাঁকি দেওয়া ও শৃঙ্খলাহীনতার কারণে বরখাস্ত করা হয় আমাকে। এরপর আমি বিভিন্ন জায়গায় কাজ করি। কনস্ট্রাকশন সাইটে, ব্যবসাসহ অনেক কিছুই করি। এভাবে কিছু সময় পর নিজের একটা অবস্থা তৈরি করি। যথেষ্ট পরিমাণে টাকা-পয়সা জমা করে ফেলি।
একদিন এক যুবক আমাকে এশিয়ার একটি রাষ্ট্রে ভ্রমণের ব্যাপারে বলল। সে জায়গার রগরগে বর্ণনা দিতে লাগল। এ যুবকটা প্রকাশ্যে মানুষের সামনে গুনাহয় লিপ্ত হতো। নাউজুবillah। হারাম ভোগ-উপভোগের নানান রূপ বর্ণনা করত সে আমার সামনে। আমাকে সে দেশ ভ্রমণে প্ররোচিত করত। এমনকি একদিন আমি ভ্রমণের ইচ্ছাকে দৃঢ় করলাম যে, আমি যাব। শয়তানও আমার ওপর ভর করে বসল।
আমার সঙ্গী আমার এ মতিভ্রমে স্বাগত জানাল! সে-ই টিকিট কেনার দায়িত্বটা নিল। আর আমার দায়িত্ব ছিল ভ্রমণস্থলের বাকি খরচটা বহন করা। আমরা সেখানে গেলাম। সেখানে একদল যুবককে দেখলাম, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, হারাম মোজ-মাস্তি করা।' আজ মাসজিদুল আকসা ব্যথার অভিযোগ করছে। আর মুসলিম তরুণ-যুবরা গুনাহ ও পাপে ডুবে আছে!
هَا هُوَ الْأَقْصَى يَلُوْكُ جِرَاحَهُ *** والمُسْلِمُونَ جُمُوْعُهُمْ آحَادُ يَا وَيْلَنَا مَاذَا أَصَابَ رِجَالَنَا *** أَوَ مَا لَنَا سَعْدُ وَلَا مِقْدَادُ
'দেখো, আকসার দেহ থেকে রক্ত ঝরছে! অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ শতধা বিভক্ত। হায়, আমাদের বীরদের আজ কী হয়েছে? আমাদের মাঝে কি একজন সাদ ও মিকদাদ নেই?'
যুবক বলে চলল, 'একদল যুবককে দেখলাম, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মোজ-মাস্তি করা। আমি তাদের কাছ থেকে শিখে শিখে তাদের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। তাদের কাছ থেকে সিগারেট খাওয়া, মদ পান করা শিখলাম। এরপর জিনা করা শিখলাম। এরপর শিখলাম নেশা। পাপ-পঙ্কিলতায় ডুবে গেলাম আমরা। নোংরামির একেবারে নিম্নপর্যায়ে চলে গেলাম। এরপর আমরা সেখান থেকে ফিরে এলাম।
কিছু দিন কাজ করে আরও কিছু টাকা-পয়সা জমিয়ে নিলাম। এরপর আরেকটা দেশে গেলাম। যেটা আগেরটার চেয়ে আরও বেশি ফিতনা-ফাসাদে ভরা ছিল। সব রকম নোংরামির স্বাদ নিলাম আমরা।
এক রাতে আমার নির্দিষ্ট নেশার বিক্রয়কারী নেশাদ্রব্য দিতে রাজি হলো না। আমি হোটেল থেকে বেরিয়ে আসি। একদল অপরাধীর সাথে দেখা হয়। তাদের আস্তানায় যাওয়ার অফার করে। তাদের সাথে সাথে তাদের আড্ডায় চলে গেলাম। আমার সামনে বিভিন্ন রকমের নেশার উপকরণ পেশ করল তারা। যেগুলোর কয়েকটা সম্পর্কে এর আগে আমি জানতামই না, শরীরের ওপরে সেগুলোর প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম আমি।
নেশা গ্রহণের পর তারা আমাকে পাশের কক্ষের দিকে ডাক দিল। জিনা করার জন্য। এডভান্স মূল্য পরিশোধ করার পর আমাকে যেতে দিল। আমি তখন নেশায় মত্ত হয়ে আছি। কী করছি না করছি বুঝতে পারছিলাম না। আমি তাদের প্রস্তাবে সায় দিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি যে হাবিয়া দোজখের দিকে পা বাড়িয়ে দিচ্ছি।
এর কিছু দিন পরের কথা। আমরা সফর থেকে ফিরে এলাম। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকলাম। কিন্তু নেশার তলব ভূতের মতো প্রতিটা জায়গায় আমাকে তাড়া করে ফিরছিল। কিছু একনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বলল। আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম, আমি যাব। কিন্তু আমি চিকিৎসা নিতে যাইনি। বরং এরপর অনেকবার ভ্রমণ করে এলাম, নোংরামির মাঝেই যেন আমার সব আনন্দ। আমার অধঃপতিত জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটা। সীমা অতিক্রম করতে লাগলাম। এখান-ওখান থেকে চুরি করে পকেট পুরতে লাগলাম। আত্মসাৎ ও প্রতারণা করতে লাগলাম। এভাবে হারাম মোজ-মাস্তির জন্য টাকা-পয়সা জমাতাম।
একদিন হঠাৎ করে শারীরিক অসুস্থতায় পড়ে গেলাম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলাম চিকিৎসার জন্য। আমার রক্ত পরীক্ষা করল তারা। রিপোর্ট এল। জানানো হলো, আমি এইডসে আক্রান্ত।
পুরো দুনিয়া আমার কাছে সংকীর্ণ হয়ে এল। হায়, এত বড় বিপদ! এ ভীষণ ভয়াবহতার কথা শোনার পর পাপের জীবনে যত মোজ-মাস্তি করেছি, নিমিষেই যেন সবটা উবে গেল। অবশিষ্ট থাকল কেবল কষ্ট আর দুঃখ।'
হায়, আফসোস! এমন বন্ধুদের সাথে চলেছি, যারা কেবল আমার ক্ষতিই করে গেছে! হায়, এমন লোকদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা আমার কোনো উপকারে আসেনি! তারা না আমাকে ভালো কিছু বলেছিল, আর না জীবন সম্পর্কে কোনো উপলব্ধি দিয়েছিল! হায়, আফসোস! বিগত জীবনটা এমন কেন কেটে গেল! জীবনটা নেশার ঘোরে কেটে গেল, আর আমি কবরের জন্য কোনো প্রস্তুতিই নিলাম না! কত সময় চলে গেল, অথচ আমি জ্বলন্ত আগুনকে ভয় করিনি! হায়, আফসোস! সেই দিন নিকটবর্তী, যেদিন আমার আমলের খাতা খোলা হবে, আমার জবানের পাপগুলো, নোংরা কাজগুলো, কুৎসিত গুনাহগুলোর কথা তোলা হবে! হায়, আফসোস! সেই দিন নিকটবর্তী, যেদিন আমার আমলনামা দেওয়া হবে, সব ভুল-শুদ্ধ প্রচারিত হবে, যৌবনের সময়ের হিসেব নেওয়া হবে, কতগুলো নামাজ নষ্ট করেছি আমি, কতগুলো জাকাত দিইনি, কত দিন রোজা ভঙ্গ করেছি—সবটা তোলা হবে, সবটার জবাবদিহি করতে হবে! কতগুলো সময় নষ্ট করেছি, সবটা জানতে চাওয়া হবে! হায়, আফসোস! কত গুনাহই না করেছি আমি! কত অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়েছি! হায়, আফসোস! কখনো তো আমার জবান রবের জিকিরে সিক্ত হয়নি। আমার দেহ কখনো তার কৃতজ্ঞতা আদায়ে যোগ দেয়নি! হায়, আফসোস! সেদিন নেককারগণ বহুগুণ মর্যাদা পেয়ে সফল হয়ে যাবে আর পাপী-জালিমরা যাবে জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে!...
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ- إِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا وَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ
'আপনি তাদেরকে পরিতাপ দিবস সম্পর্কে সতর্ক করে দিন, যখন সব ব্যাপারের মীমাংসা হয়ে যাবে; অথচ তারা রয়েছে উদাসীনতায় বিভোর এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না। আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী হব পৃথিবীর এবং তার ওপর যারা আছে তাদের। আর আমারই নিকট তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।'১৪৭
যুবক বলে চলল, 'সংক্ষেপে এ ছিল আমার কাহিনি। আমি এখন যতটুকু জানি, তা হচ্ছে, আমি এইডসের রোগী। মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এখন যত দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই না কেন আমার কোনো চিন্তা নেই। আমার যত তন্দ্রা ছিল, সব টুটে গেছে। সব উদাসীনতা ভেঙে আমি জেগে উঠেছি। যত বুদ্ধিমান যুবক আছে সবাইকে আমি নসিহত করি, একনিষ্ঠ দ্বীনের শিক্ষা মেনে চলবে। আমরা অনেক কিছু শিখি, কিন্তু আমল করি না, মেনে চলি না। আমরা মেনে চলি নফস, প্রবৃত্তি ও শয়তানের কথা। কিন্তু যে নফসের অনুসরণ করে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। (ধ্বংস সে, যে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আর আল্লাহর কাছে প্রাপ্তির আশা রাখে।)
আমার যুবক ভাইদের বলে যেতে চাই, তোমরা সাবধান হও, সতর্ক হও। নেশা, অশ্লীলতা, যাবতীয় মন্দকর্ম ছেড়ে দাও। কারণ এসব ধ্বংসকারী কাজকারবার। তোমরা খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ থেকে সতর্ক হও। কারণ খারাপ বন্ধু অভিশপ্ত ইবলিসের সৈনিক।
আমি তোমাদের আল্লাহর আমানতে সোপর্দ করছি। তিনি আমানত রক্ষা করেন। তোমরা যখন আমার এ চিঠি পড়ছ, তখন হয়তো আমার রুহ নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে গেছে তার রবের কাছে আর আমি মাটির নিচে। তাই আমার জন্য আল্লাহর কাছে রহমতের দুআ করবে।'
হে আল্লাহ, আপনার রহমত প্রতিটি জিনিসকে পরিবেষ্টন করে আছে। আপনার দুর্বল নিঃস্ব বান্দার প্রতি দয়া করুন।
যদি তুমি তাওবাকারী দেখতে চাও, তবে দেখো, কার চোখের পাতা অশ্রুর কারণে আহত। দেখো, কে বিরান রাতে প্রার্থনারত। দেখো, কে রবের দরবারে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। কে শুনেছে রবের ওহি-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৪৮
তাওবাকারীর খাবার হয় কম। চিন্তা হয় অনেক। তার উদ্বিগ্নতা প্রবল। যেন সে কারও আহত বন্দী। বারবার তার মনের ভেতর গুঞ্জরিত হয়-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৪৯
তাওবাকারী। যার শরীর রোজায় শীর্ণ হয়ে গেছে। কিয়ামুল লাইলের কারণে যার পদযুগল ক্লান্ত হয়ে আছে। যে না ঘুমানোর দৃঢ় শপথ নিয়েছে। যে তার দেহ-প্রাণ সঁপে দিয়েছে। যার অবস্থার বর্ণনা-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً 'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো-আন্তরিক তাওবা।'১৫০
তাওবাকারী... লাঞ্ছনা যাকে উচ্চকিত করেছে। উদ্বিগ্নতা যাকে দুর্বল করে ফেলেছে। যার আত্মা প্রবৃত্তিকে তিরস্কার করছে। ফলে সে প্রশংসার পাত্র বনে গেছে। তার অবস্থার বিবেচনা এ আয়াতে-
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحاً
'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো—আন্তরিক তাওবা।'১৫১
তাওবাকারী...যৌবনের গুনাহর অপরাধে ক্রন্দনরত। গুনাহে গুনাহে কালো আমলনামার কারণে দুঃখে বিষণ্ণ সে। নিশ্চয় যে আল্লাহর দরজায় আসে, সে তা উন্মুক্ত পায়। তার অবস্থা বিবেচিত হয় এ আয়াতের মাধ্যমে—
تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً
'তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো—আন্তরিক তাওবা। ১৫২
হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে তাওবা করছি, তাওবার ওপর অটল থাকার তাওফিক কামনা করছি, আমরা আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমরা পাপ ও পাপের উপকরণ থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

প্রত্যাবর্তন : ৫ আমার হিদায়াত তার হাতে
এক যুবক বলছে :
'আমার বয়স তখন ত্রিশও অতিক্রম করেনি। আমার স্ত্রী গর্ভধারণ করল প্রথম সন্তান। সেদিনের ঘটনাটি আমার সব সময় স্মরণ হয়। আমি শেষ রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে একটি বিনোদনকেন্দ্রে ছিলাম। পুরো রাত কেটে যায় অনর্থক গল্পগুজব, গিবত ও হারাম কথাবার্তায়। বন্ধুদেরকে হাসানোর ক্ষেত্রে আমিই ছিলাম সবচেয়ে অগ্রগামী। সবচেয়ে বেশি দোষচর্চা করতাম আমি। আর অন্যরা তা শুনে হাসত।
এক রাতে আমি তাদের সাথে অনেক হাসি-কৌতুক করলাম। মানুষকে নকল করার এক অসাধারণ যোগ্যতা ছিল আমার। যে কারও কণ্ঠস্বর নকল করে তাকে নিয়ে উপহাস করতে পারতাম আমি। এ কারণেই আমি যাকে-তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতাম। কেউ আমার কাছ থেকে নিরাপদ থাকত না। এমনকি আমার সাথীরাও আমার কাছ থেকে নিরাপদ থাকত না। আমার উপহাস থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই আমাকে এড়িয়ে চলত।
সে রাতের কথা আমার আজও স্মরণ আছে। বাজারে এক অন্ধ ভিক্ষা করছিল। অন্ধকে নিয়ে আমি উপহাস করেছিলাম। সবচেয়ে মন্দ বিষয় ছিল, আমি তার সামনে আমার পা ছড়িয়ে দিলাম। ফলে আমার পায়ের সাথে আঘাত খেয়ে সে পড়ে গেল। চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছিল কে তাকে ল্যাং মেরেছে। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না। আমি চলে এলাম।
প্রতিদিনের মতো আজও আমি বাড়ি ফিরলাম দেরি করে। আমার স্ত্রী আমার অপেক্ষায় ছিল। সে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে ছিল তখন। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, "রাশিদ, কোথায় ছিলে?”
আমি ঠাট্টা করে বললাম, "মঙ্গলগ্রহে আমার বন্ধুদের কাছে ছিলাম।”
তার দুর্বলতা বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে বলল, “রাশিদ, আমি খুব ক্লান্ত।” বাস্তবতা হলো তার ডেলিভারির সময় অতি আসন্ন ছিল।
তার গাল বেয়ে অশ্রুফোঁটা পড়ছিল। আমি অনুভব করলাম স্ত্রীকে অনেক অবহেলা করেছি আমি। দায়িত্ব ছিল তার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া এবং আমার নৈশপার্টি কমিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে তার গর্ভধারণ যখন নয় মাস।
আমি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। দীর্ঘ সময় যাবৎ সে কষ্ট সহ্য করতে থাকল। আমি ধৈর্যহীন হয়ে তার ডেলিভারির অপেক্ষা করছিলাম। তার ডেলিভারি ছিল অনেক কঠিন। একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। ফলে বাসায় চলে এলাম। আর সুসংবাদ দেওয়ার জন্য নার্সদের কাছে আমার নাম্বার দিয়ে এলাম।
ঘণ্টাখানিক পরে, তারা আমার সাথে যোগাযোগ করল এবং সালিমের জন্মের সংবাদ দিল। আমি দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেলাম। প্রথমে আমার সাথে যার দেখা হলো, আমি তার কাছে রুমে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। কিন্তু নার্সরা আমাকে প্রথমে দায়িত্বশীল মহিলা ডাক্তারের সাথে দেখা করতে বলল। আমি চিৎকার করে বললাম, “কোন ডাক্তার?! আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমার ছেলে সালিমকে আগে দেখা।”
তারা বলল, 'তুমি প্রথমে ডাক্তারের সাথে দেখা করে এসো!'
ডাক্তারের রুমে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে কয়েকটি বিপদের কথা বললেন এবং তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দিলেন। এরপর বললেন, “বাচ্চার চোখের পরিস্থিতি অনেক খারাপ।” ডাক্তাররা মনে করছেন, সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে!
আমার মাথা অবনত হয়ে গেল। অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। স্মরণ করছিলাম গত রাতের সে ভিক্ষুকের কথা, যাকে আমি বাজারে ল্যাং মেরেছিলাম এবং তাকে মানুষের হাসির পাত্র বানিয়েছিলাম।
সুবহানাল্লাহ! যেমন কর্ম তেমন ফল! আমি কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। নিজ স্ত্রী ও সন্তানের কথা স্মরণ হলো। ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্ত্রীকে দেখার জন্য চলে এলাম।
আমার স্ত্রী চিন্তিত ছিল না। কারণ, সে ছিল আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী ও সন্তুষ্ট। মানুষকে নিয়ে উপহাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সে আমাকে অনেক উপদেশ দিয়েছিল। সে সব সময় আমাকে ভীতি প্রদর্শন করত এবং বলত, “মানুষের দোষচর্চা করো না।"
আমরা হাসপাতাল থেকে সালিমকে নিয়ে বের হয়ে এলাম। বাস্তবতা ছিল আমি তাকে কখনোই গুরুত্ব দিইনি। আমি ধরে নিতাম যে, ঘরে কেউ নেই। যখন তার কান্নার আওয়াজ বেড়ে যেত, তখন অন্য রুমে ঘুমানোর জন্য চলে যেতাম। আমার স্ত্রী তাকে সব সময় গুরুত্ব দিত এবং তাকে অনেক ভালোবাসত। আমি তাকে ঘৃণা করতাম না। কিন্তু তাকে ভালোবাসতেও সক্ষম ছিলাম না!
সালিম বড় হলো। বুকে ভর করে চলতে শিখল। তার এই চলার ধরনও ছিল আশ্চর্যজনক। তার বয়স এক বছরের কাছাকাছি। সে হাঁটার চেষ্টা করছে। আমাদের কাছে তখন ক্লিয়ার হলো যে, সে পঙ্গু। আমার কাছে তাকে আরও বোঝা মনে হলো। এরপর আমার স্ত্রীর কোলে এল খালিদ ও উমর।
কয়েক বছর চলে গেল। সালিম বড় হলো এবং তার দুই ভাইও বড় হলো। আমি বাড়িতে থাকা পছন্দ করতাম না। সব সময় নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। প্রকৃতঅর্থে আমি ছিলাম তাদের হাতের খেলনা।
স্ত্রী আমার সংশোধনের ব্যাপারে নিরাশ হলো না। সব সময় আমার হিদায়াতের জন্য দুআ করত। আমার উদ্দেশ্যহীন চলাফেরায় সে রাগান্বিত হতো না। কিন্তু যখন সে সালিমের ব্যাপারে আমার অবহেলা এবং বাকি দুজনের ব্যাপারে গুরুত্ব দেখত, তখন অনেক চিন্তিত হতো। সালিম বড় হলো এবং সাথে সাথে তার ব্যাপারে আমার অবহেলাও বৃদ্ধি পেল। যখন আমার স্ত্রী তাকে কোনো একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তির জন্য বলল, তখন আমি গুরুত্ব দিইনি। আমি তার বয়সের ব্যাপারে কোনো পরোয়া করিনি। আমার সব দিনই সমান কাটত। কাজ, ঘুম, খানা ও রাত জেগে আড্ডাই ছিল আমার নেশা।
জুমআর দিন। আমি বেলা এগারোটার সময় জেগে উঠলাম। এটিই আমার ভোরবেলা। সেদিন একটি বিয়ের প্রোগ্রামে দাওয়াত ছিল। পোশাক পরে সুগন্ধি মেখে বের হওয়ার ইচ্ছে করলাম। মাত্র বাড়ির আঙিনা পার হলাম। কিন্তু সালিমের একটি দৃশ্য আমাকে থামিয়ে দিল। সে খুব কাঁদছিল তখন।
এই প্রথম আমি তার ব্যাপারে সজাগ হলাম। তার শিশুকাল থেকে দশ বছর চলে গেছে; আমি কখনো তার দিকে তাকাইনি। এই প্রথম তার দিকে দৃষ্টি দিলাম। তার কাছে গেলাম। "সালিম, কেন কাঁদছ?!"
সে আমার আওয়াজ শুনে থেমে গেল। যখন আমার নৈকট্য উপলব্ধি করল, তখন সে নিজের ছোট ছোট হাতখানা দিয়ে নিজের পাশের জিনিস উপলব্ধি করার চেষ্টা করল। সে কী খুঁজছিল? আমি বুঝলাম যে, সে আমার কাছ থেকে দূরে সরতে চাচ্ছে! কেমন যেন সে বলছিল, "এতদিন পর তুমি আমাকে অনুভব করলে? এই দশ বছর তুমি কোথায় ছিলে?!" আমি তার অনুসরণ করলাম। সে নিজ কামরায় প্রবেশ করল। প্রথমে আমাকে সে নিজের কান্নার কারণ বলেনি। আমি তার সাথে কোমল আচরণ করার চেষ্টা করলাম। এবার সালিম নিজের কান্নার কারণ বর্ণনা করতে শুরু করল। আমি তা শুনে কেঁপে উঠলাম।
আপনি জানেন, তার কান্নার কারণ কী ছিল? তার ভাই উমর তার কাছে আসতে বিলম্ব করেছিল। যে সব সময় তাকে মসজিদে পৌছিয়ে দিত। আর সেদিন ছিল জুমআর দিন। সে আশঙ্কা করছিল যে, মসজিদের প্রথম কাতারে জায়গা পাবে না। সে উমরকে ডেকেছে, ডেকেছে তার মাকে। কিন্তু কেউ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। ফলে সে কান্না শুরু করে দিয়েছে।
আমি তার জন্মান্ধ দুচোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখলাম। তার বাকি কথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। তার মুখের ওপর হাত রেখে বললাম, "সালিম, তুমি এ কারণেই কেঁদেছিলে?”
সে বলল, “হ্যাঁ।”
নিজের বন্ধুদের কথা ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম অনুষ্ঠানের কথা। তাকে বললাম, “সালিম, চিন্তা করো না। তুমি জানো কি, আজ কে তোমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে?”
সে বলল, “আমার বিশ্বাস উমর নিয়ে যাবে। কিন্তু সে সব সময় দেরি করে।”
আমি বললাম, “না, বরং আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে যাব।”
সালিম অবাক হলো। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে মনে করল, আমি তাকে নিয়ে উপহাস করছি। তার অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি নিজ হাতে তার অশ্রু মুছে দিয়ে তার হাত ধরলাম। আমি চিন্তা করেছিলাম তাকে গাড়ি দিয়ে পৌঁছিয়ে দেবো। কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করল যে, “মসজিদ কাছে। আমি পায়ে হেঁটে মসজিদে যেতে চাই।” আল্লাহর শপথ, সে আমাকে এমনটিই বলেছিল।
আমার স্মরণ হচ্ছিল না সর্বশেষ কবে মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম! এই প্রথম অতীত জীবনের কর্মকাণ্ডে ভয় ও লজ্জা অনুভব করলাম। মুসল্লিভরা মসজিদ। কিন্তু দেখলাম, সালিমের জন্য প্রথম কাতারে একটি জায়গা খালি। পিতা-পুত্র উভয়ে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনলাম। সালিম আমার পাশেই সালাত আদায় করল। প্রকৃতঅর্থে আমিই তার পাশে সালাত আদায় করলাম।
সালাত আদায়ের পর সালিম আমার কাছে একখণ্ড কুরআন চাইল। আমি অবাক হলাম। অন্ধ হয়ে কীভাবে কুরআন পাঠ করবে সে! আমি তার কথা না বোঝার ভান করলাম। কিন্তু তার অনুভূতিতে আঘাত লাগার ভয়ে তার সাথে সৌজন্যতা রক্ষা করলাম। তাকে একখণ্ড কুরআন শরিফ এনে দিলাম। সালিম আমাকে সুরা কাহফের পৃষ্ঠা খুলে দিতে বলল। আমি সূচিপত্র দেখে সুরা কাহফ বের করলাম।
সে কুরআন শরিফ নিয়ে নিজের সামনে রাখল। এরপর সুরা পাঠ শুরু করল। অথচ তার চক্ষুদ্বয় বন্ধ। ইয়া আল্লাহ, সে পুরা সুরাটি মুখস্থ করে নিয়েছে!
আমি লজ্জিত হলাম। হাতে কুরআন নিলাম। আমার পুরো শরীর তখন কাঁপছিল। আমি কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলাম এবং তিলাওয়াত করতে থাকলাম। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন এবং আমাকে সঠিক পথ দেখান। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। শিশুর মতো কান্না জুড়ে দিলাম। তখনো কিছু মানুষ মসজিদে সুন্নাত আদায় করছিল। তাদের সামনে কাঁদতে লজ্জা হলো। তাই নিজের কান্নাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলাম। আমার কান্না তখন ফোঁপানি ও বুকের ভেতর ঘড়ঘড় শব্দে পরিণত হলো।
আমি শুধু এতটুকুই অনুভব করলাম যে, একটি ছোট হাত আমার চেহারা স্পর্শ করছে এবং আমার চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। সে ছিল সালিম! আমি তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আমি তার দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম, তুমি অন্ধ নও, বরং আমিই অন্ধ। কারণ আমি ফাসিকদের পেছনে ঘুরছি, যারা আমাকে জাহান্নামের দিকে ডাকছে।
আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। আমার স্ত্রী সালিমকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিল। কিন্তু যখন দেখল, আমি তার সাথে জুমআর সালাত আদায় করেছি, তখন এই দুশ্চিন্তা খুশির আনন্দে পরিণত হলো এবং তার গাল বেয়ে আনন্দঅশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন থেকে মসজিদে জামাআতের সাথে আমার আর কোনো সালাত ছুটেনি। আমি খারাপ বন্ধুদের ত্যাগ করলাম এবং মসজিদে নামাজ আদায়কারী নেককার বন্ধুদের গ্রহণ করলাম। তাদের সাথে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করলাম। আমি তাদের কাছে এমন কিছু জিনিস পেলাম, যা আমাকে দুনিয়াবিমুখ করে দিয়েছে। কোনো জিকিরের মজলিশ বা বিতরের সালাতও আমার ছুটত না। এক মাসে আমি কয়েকবার কুরআন খতম করেছি। জিকিরের মাধ্যমে আমার জবানকে তরুতাজা করেছি। এ আশায় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের নামে আমার গিবত ও ঠাট্টা ক্ষমা করে দেবেন। আমি অনুভব করলাম যে, আমি নিজের পরিবারের একেবারে নিকটে। আমার স্ত্রীর চেহারায় যে ভয় ও উৎকণ্ঠার ছাপ ছিল, তা কেটে গেছে। আমার ছেলে সালিমের চেহারা থেকে কখনো মুচকি হাসি বিচ্ছিন্ন হতো না। যে তাকে দেখত, সে মনে করত যে, সালিমই দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী। আমি অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে থাকলাম।
একদিনের ঘটনা। আমার নেককার বন্ধুরা একটি সীমান্ত এলাকায় দাওয়ার প্রোগ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন ছিলাম। আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়ে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করলাম। আমার বিশ্বাস ছিল যে, সে এটি প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু ঘটল বিপরীত কাহিনি।
আমি খুব খুশি হলাম। বরং সে আমাকে উৎসাহিত করল। সে আমাকে ইতিপূর্বে অনুমতি ছাড়াই পাপের কাজে সফর করতে দেখেছে।
সালিমের কাছে গিয়ে তাকে আমার সফরের সংবাদ দিলাম। বিদায়ের জন্য সে আমাকে তার ছোট দুখানা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। বাড়ি থেকে সাড়ে তিন মাসের জন্য হারিয়ে গেলাম। এ সময়ে যখনই আমার সুযোগ হতো, বাড়িতে যোগাযোগ করতাম এবং স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে কথা বলতাম। আমি তাদের সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলাম। আহ! আমি সালিমকে কতই না মিস করছিলাম! সব সময় তার আওয়াজ শোনার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। আমার সফরে আসার পর থেকে শুধু সে আমার সাথে কথা বলেনি। আমার যোগাযোগের সময় হয়তো সে মসজিদে ছিল না হয় মাদরাসায়।
যখনই আমার স্ত্রীর সাথে সালিমের ভালোবাসার কথা বলতাম, তখন সে হাসত এবং খুব খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করত। কিন্তু সর্বশেষ যখন তার সাথে মোবাইলে সালিমের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তার কাঙ্ক্ষিত হাসি শুনলাম না। তার আওয়াজ পরিবর্তন হয়ে গেল।
আমি বললাম, “সালিমকে আমার পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছিয়ে দিয়ো।” সে বলল, “ইনশাআল্লাহ।” তারপর চুপ হয়ে গেল সে।
সফর শেষে বাড়ি ফিরে এলাম। দরজায় করাঘাত করলাম। আশা করেছিলাম যে, সালিম এসে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলে খালিদ দরজা খুলে দিল, যার বয়স এখনো চার বছর হয়নি। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। আর সে চিৎকার করে বলল, “বাবা...বাবা...।"
বাড়িতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কেন যেন আমার বুক ধড়ফড় করছিল।
বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলাম।
আমার স্ত্রী এগিয়ে এল। তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। কেমন যেন সে কৃত্রিম হাসি গ্রহণ করেছে।
আমি খুব চিন্তা করে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার কী হয়েছে?”
সে বলল, "কিছুই না।”
হঠাৎ সালিমের কথা স্মরণ হলো। জিজ্ঞেস করলাম, "সালিম কোথায়?”
তখন তার মাথা নত হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিল না সে। উষ্ণ অশ্রুফোঁটা তার গাল বেয়ে পড়তে লাগল।
আমি চিৎকার করে বললাম, "সালিম, সালিম কোথায়?”
তখন বেটা খালিদের আওয়াজ শুনলাম। সে বলল, "বাবা, সালিম জান্নাতে চলে গেছে। আল্লাহর কাছে।"
আমার স্ত্রী নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি কামরা থেকে বের হয়ে গেলাম।
পরে আমি জানতে পারলাম, আমার ফিরে আসার দু'সপ্তাহ আগে সালিম জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। তার মা তাকে হাসপাতাল নিয়ে গেল। কিন্তু তার জ্বর বেড়েই চলল। এমনকি একপর্যায়ে তার দেহ থেকে রুহ চলে গেল।
আমি বুঝতে পারলাম কী ঘটেছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। হ্যাঁ, এটা পরীক্ষা। আমাকে বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করতে হবে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম, যাঁর প্রশংসা সর্বদা করতে হবে। আমি তখনও সালিমের হাতের ছোঁয়া, ছোট্ট হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দেওয়া, দুহাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরা অনুভব করছিলাম। আমি সালিমের অন্ধত্ব ও খোঁড়া হওয়া নিয়ে কত চিন্তিত ছিলাম! কিন্তু মূলত সে অন্ধ ছিল না। সে অন্ধ ছিল না, অন্ধ ছিলাম আমি। যখন খারাপ বন্ধুদের সাথে ঘুরঘুর করতাম, তখন আমি অন্ধ ছিলাম। সালিম খোঁড়া ছিল না, কারণ সবকিছু চাপিয়ে ইমানের পথে চলতে পারত সে। এখনো আমি তার কথামালা স্মরণ করতে পারছি অক্ষরে অক্ষরে। সে বলত, "আল্লাহ অশেষ রহমতের অধিকারী।"
সালিম। যাকে অনেক দিন ভালোবাসা দিইনি আমি। অবশেষে প্রকাশ পেল, আমি তার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকে ভালোবাসি। আমি অনেক কাঁদলাম। তখনও আমি চিন্তিত-উদ্বিগ্ন হয়ে থাকলাম। কেনই বা চিন্তা হবে না, তার হাত ধরেই তো আমার দ্বীনের পথে আসা। হে আল্লাহ, আপনি সালিমকে কবুল করে নিন। তাকে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার পথে মৃত্যু পর্যন্ত অটল থাকা প্রার্থনা করি।'
সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, সুসংবাদ নাও হে প্রত্যাবর্তনকারী, সুসংবাদ নাও কাফেলার নতুন সাথি। সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের।' ১৫৩
সুসংবাদ নাও হে তাওবাকারী, আল্লাহ তোমার জন্য রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন :
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
'বলুন, “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।" ১৫৪
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحاً فَأَوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيماً
'কিন্তু যারা তাওবা করে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ১৫৫
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ 'নিশ্চয় পুণ্যরাজি পাপরাশিকে দূর করে দেয়।' ১৫৬
দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ আরও বলেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحاً ثُمَّ اهْتَدَى 'আর যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।' ১৫৭
(হাদিসে কুদসিতে এসেছে, রাসুল ইরশাদ করেন,) আল্লাহ বলেন:
يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ، وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةٌ
'আদম-সন্তান, তুমি যতদিন আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে আশা করতে থাকবে, তোমার পাপ যা-ই হোক না কেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। এ ক্ষেত্রে আমি কাউকে পরোয়া করি না। আদম-সন্তান, যদি তোমার পাপরাশি উচ্চাকাশ পর্যন্তও পৌঁছে যায়, এরপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, (তোমার পাপ যত বেশিই হোক না কেন,) আমি কারও পরোয়া করি না। আদম-সন্তান, যদি তুমি আমার কাছে দুনিয়ার সমান পাপ নিয়ে আসো এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তবে আমি তোমার কাছে দুনিয়ার সমান ক্ষমা নিয়ে আসব। ১৫৮
হে তাওবাকারী, সুসংবাদ নাও। সুসংবাদ নাও হে প্রত্যাবর্তনকারী, সুসংবাদ তোমার জন্য হে প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলার সঙ্গী!
রাসুল ﷺ বলেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ، كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
'গুনাহ থেকে তাওবাকারী সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহই নেই। '১৫৯
হে তাওবাকারী, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো, আল্লাহ তাওবাকারীদের তাওবাতে খুশি হন। গুনাহকারীর অনুতপ্ততাভরা অশ্রু তাঁর কাছে তাসবিহ-আদায়কারীর তাসবিহ উচ্চারণ থেকেও উত্তম।
বর্ণিত আছে, এক লোক ইবনে মাসউদ -এর কাছে আসলেন। নিজের গুনাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, 'এর কোনো তাওবা আছে কি?' ইবনে মাসউদ মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর প্রশ্নকর্তার দিকে ফিরলে দেখা গেল তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তিনি বললেন, 'জান্নাতের আটটি দরজা আছে। প্রতিটি দরজা খোলা ও বন্ধ করা হয়। তবে তাওবার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তাওবার দরজায় একজন ফেরেশতা থাকেন, যিনি দরজাটা খোলা রাখেন। তাই আমল করো। হতাশ হয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।'
আব্দুর রহমান বিন আবু কাসিম বলেন, 'আব্দুর রহমানের সাথে আমরা কাফিরের তাওবা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আল্লাহ বলেছেন :
إِن يَنتَهُوا يُغْفَرْ لَهُم مَّا قَدْ سَلَفَ
“তারা (কাফিররা) যদি নিবৃত্ত হয়, তাহলে তারা পূর্বে যা করেছে, তা ক্ষমা করা হবে।”১৬০
তিনি বলেন, আমি আশা করি আল্লাহর কাছে মুসলিমের অবস্থা কাফিরের চেয়ে উত্তম। আমার কাছে এ কথা পৌঁছেছে যে, একজন মুসলিমের তাওবা হলো, একবার মুসলিম হওয়ার পর দ্বিতীয়বার মুসলিম হওয়া।
বর্ণিত আছে, বনি ইসরাইলে এক যুবক ছিল। ২০ বছর আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিল সে। এরপর ২০ বছর আল্লাহর অবাধ্যতায় কাটাল। এরপর তার চোখ পড়ল আয়নায়। সে নিজের দাড়ির দিকে তাকাল। তার কাছে জীবনের বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। সে বলল, “হে আল্লাহ, ২০ বছর আমি আপনার আনুগত্য করলাম। এরপর ২০ বছর আপনার অবাধ্য ছিলাম। এখন যদি আমি ফিরে আসি, আপনি কি আমাকে কবুল করে নেবেন?!" তখন দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আহ্বানকারী বলে উঠলেন, "তুমি আমাকে ভালোবেসেছ, তাই আমি তোমাকে ভালোবাসলাম। তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ, তাই আমিও তোমাকে ত্যাগ করলাম। তুমি আমার অবাধ্য হলে আমি তোমাকে অবকাশ দিলাম। যদি তুমি ফিরে আসো, তবে তোমাকে কবুল করে নেব আমি।”
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ
'তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন আর পাপসমূহ ক্ষমা করেন।'১৬১
শোনো, তাওবার পথে কিছু সহায়ক আছে আবার কিছু বাধাও আছে। তাওবার ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে দীর্ঘ আশা পোষণ করা। জীবন নিয়ে যার আশা দীর্ঘ হবে, তার আমলের খাতা আশানুরূপ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ 'আপনি ছেড়ে দিন তাদের। তারা খেয়ে নিক এবং ভোগ করে নিক। আর আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতি সত্বর তারা জেনে নেবে।'১৬২
আল্লাহ তাআলা বলেন: أَفَرَأَيْتَ إِن مَّتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ - ثُمَّ جَاءَهُم مَّا كَانُوا يُوعَدُونَ 'আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদের বছরের পর বছর ভোগবিলাস করতে দিই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদের ওয়াদা দেওয়া হতো, তা তাদের কাছে এসে পড়ে। ১৬৩
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِ مِن مَّالٍ وَبَنِينَ نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لَّا يَشْعُرُونَ 'তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের যে ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে যাচ্ছি। তাতে তাদেরকে দ্রুত কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না।'১৬৪
তাওবার পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে মৃত্যু ও মৃত্যুর সময়টাকে মনে রাখা, স্মরণ করা। হ্যাঁ... মৃত্যু অতি নিকটে আমাদের। জীবন যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তা ছোট হয়ে থাকে। দুনিয়ায় যত যা কিছু থাক না কেন, এ দুনিয়া তুচ্ছ-নিকৃষ্ট। তাই নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নাও, যেমনটা তুমি চাও। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তখন আমার ও তোমার কী অবস্থা হবে, যখন আমাদের বলা হবে, 'অমুকের ছেলে অমুক, তোমার শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। তোমার বিদায়ের কাল এসে গেছে।' তখন কেউ হয়তো চিৎকার করে ফরিয়াদ করবে, 'হে রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি আমল করে আসতে পারি।' আবার কেউ চিৎকার করে বলবে, 'বাহ! বাহ! প্রিয়জনদের সাথে দেখা হবে। মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের সাথে সাক্ষাৎ হবে।' এ দুটো অবস্থার যেকোনো একটিই হবে আমাদের জীবনের পরিণতি। দুটোর যেটা তোমার কাছে ভালো লাগে, সেটা বেছে নাও নিজের জন্য।
যখন হাসসান বিন আবু সিনানের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, তাকে বলা হলো, 'আপনি কী পাবেন?' তিনি বললেন, 'কল্যাণ, যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কী চান?' তিনি বললেন, 'আমি চাই একটা লম্বা রাত, যার পুরোটা নামাজে কাটিয়ে দেবো।'
মুজানি শাফিয়ি-এর কাছে এলেন তার মৃত্যুকালীন অসুস্থতার মাঝে। জিজ্ঞেস করলেন, 'আজ সকালটা কেমন হলো, হে আবু আব্দুল্লাহ?!' ইমাম শাফিয়ি জবাব দিলেন, 'দুনিয়াকে বিদায় দেওয়া, প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়া, নিজের মন্দ আমলের সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ও মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করা অবস্থায় আজ সকাল হলো। আমার বিষয়টা রবের কাছে সোপর্দ করছি। আমি জানি না, আমার রুহ কোথায় যাবে—জান্নাতে? তবে আমি তাকে স্বাগত জানাব, না জাহান্নামে? তা হলে তাকে আমি দুঃখের বার্তা জানাব।' এরপর ইমাম শাফিয়ি কবিতা আবৃত্তি করলেন:
وَلَمَّا قَسا قلبي وَضاقَت مَذاهبي *** جَعَلْتُ الرجا مِنِّي لِعَفْوِكَ سُلَّما تَعاظَمَنِي ذَنبِي فَلَمَّا قَرَنتُهُ *** بِعَفوِكَ رَبِّي كَانَ عَفْوُكَ أَعظَما فما زلت ذا عَفُو عَنِ الذَنبِ لَم تَزَل *** تَجُودُ وَتَعْفو مِنَّةً وَتَكَرُّما
'আমার হৃদয় পাষাণ হয়ে গেছে, সংকীর্ণ হয়ে গেছে মুক্তির সকল পথ। তবু আপনার দয়ার আশা সম্বল করে দরবারে হাজির হয়েছি হে রব। বুঝতে পারি, আমার পাপের বোঝা অনেক ভারী। আপনার দয়ার সাথে তুলনা করে দেখি, তা আরও সুমহান! আপনি সর্বদা গুনাহ মাফ করেন, আপনি মহানুভব, নিজ করুণা ও দয়ায় আপনি সর্বদা ক্ষমা করেন।'১৬৫
শোনো হে প্রিয়, সব আশা-আকাঙ্ক্ষার অবসান হবে। সব ধন-সম্পদ নিঃশেষ হবে। বহু যত্নে গড়ে তোলা শরীরটা মাটির নিচে দাফন হবে। শোনো হে প্রিয়, দিন-রাতের আবর্তন সব নতুন ও অভিনবকে পুরোনো ও জীর্ণ করে দেয়। দিন-রাত প্রতিটি দূরের জিনিসকে কাছে এনে দেয়। দিন-রাতের আবর্তন পুরস্কার ও শাস্তির ক্ষণকে নিয়ে আসে। তাই সাবধান হও। সতর্ক হও।
শোনো আল্লাহর বান্দা, সতর্ক হও, ঘুম থেকে জেগে ওঠো, আল্লাহর কাছে বিনয়-নম্র হয়ে দাঁড়াও। আর বলো, এখনই সময় প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করো। এগিয়ে আসো। সালাফগণ বলেন, যে চারটি বিষয়ের তাওফিক পেয়েছে, সে চারটি বিষয় থেকে বঞ্চিত হবে না। যে দুআর তাওফিক পায়, সে প্রতিফল থেকে বঞ্চিত হয় না, তার দুআয় সাড়া দেওয়া হয়। আর তোমাদের রব বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।”১৬৬
যে ক্ষমা প্রার্থনার তাওফিকপ্রাপ্ত হয়, সে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে না। আর তোমাদের রব বলেন:
إِنَّهُ كَانَ غَفَّاراً
'তিনি তো পরম ক্ষমাশীল। '১৬৭
যে কৃতজ্ঞতা আদায়ের তাওফিকপ্রাপ্ত হয়, সে আরও বেশি নিয়ামত পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নিয়ামত) বৃদ্ধি করে দেবো।'১৬৮
যে তাওবা করার তাওফিক পায়, সে তাওবা কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না। তোমাদের রব বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ 'তিনি তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন।'১৬৯
শোনো হে প্রিয়, আল্লাহ ছাড়া জীবনটা বিরান মরুভূমি। অন্তরের পরিশুদ্ধি কেবল আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আমি যখন মন থেকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে আসব, তখন সকল কল্যাণ একে অন্যের সাথে মিলে যাবে, জীবন প্রাণ ফিরে পাবে, স্বভাব নিষ্কলুষ হবে, অন্তর হবে পরিশুদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ 'হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?'১৭০
হে তাওবাহীন যুবক, কেন তুমি নিজের জন্য কাঁদছ না? কেন তুমি নিজের এ মন্দ অবস্থায় সতর্ক হচ্ছ না? সাবধান হচ্ছ না কেন কঠিন আজাব থেকে?!
জীবন নামের খাতায় একটা তাওবার ঘটনা লেখো। অনুতপ্ততা ও লজ্জার কলমে, চোখের অশ্রু ও মনের অনুতপ্ততা দিয়ে একটা তাওবার ঘটনা লেখো। তা পেশ করো বিনম্র পদে ভয় নিয়ে রবের দরজায়। তার সাথে যুক্ত করো তোমার প্রাণের ক্ষুধা ও পিপাসা। রহমত প্রার্থনা করো।
অনেক প্রার্থনা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মানুষ যখন ঘুমন্ত থাকে, তখন রাতের আঁধারে রবের দরবারে দাঁড়িয়ে বলো, হে করুণাময়, মুমিনের ভরসাস্থল, মুমিনের আশার জায়গা, গুনাহগারের আরজি তোমার কাছে, যদি তুমি তাড়িয়ে দাও, তবে কার কাছে যাব আমি! গুনাহগারের প্রতি আপনি দয়ালু, পথভোলাদের ক্ষেত্রে আপনি সহনশীল, হে রব, আপনার বৈশিষ্ট্য ক্ষমা করা। আমি মূর্খের মতো আপনার অবাধ্য হয়েছি, হে মহান রব, আমাকে আমার এ মন্দ অবস্থা থেকে মুক্তি দিন। হে মাওলা, গোলাম তার মাওলা ছাড়া আর কার কাছে আশ্রয় নেবে? সেসব লোকই তো সৌভাগ্যবান, যারা গুনাহের পথ ছেড়ে নিজেদের শুদ্ধ করেছে। তারা রবের আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাকওয়ার স্থলে হাজিরা দিয়েছে, তারা অগ্রসর হয়েছে, নিজেদের কৃত প্রতিটি গুনাহর ক্ষমা চেয়েছে, তাওবা করেছে। রবের দরজার দিকে অগ্রসর হয়ে তারা ফেরত যায়নি খালি হাতে।
হে আল্লাহ, আমাদের পরিচালিত করুন শ্রেষ্ঠ পথে। আমাদের তাওবার তাওফিক দিন। আপনার দিকে অগ্রসর হওয়ার সৌভাগ্য দিন। আমাদের ডাকে সাড়া দিন। হে প্রভু, আপনি তিনিই, যার কাছে বিপদগ্রস্ত দুআ করলে সাড়া দেওয়া হয়। হে আল্লাহ, আমাদের পরিশুদ্ধ তাওবা গ্রহণ করুন। আমরা আমাদের তাওবার ওয়াদা কখনো ভঙ্গ করব না। আমাদের রক্ষা করুন, যেন আমরা সৌভাগ্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
হে আল্লাহ, তাওবাকারীদের তাওবা কবুল করুন। গুনাহগারদের ক্ষমা করে দিন। যুবক-বৃদ্ধ সবাইকে কবুল করে নিন প্রত্যাবর্তনকারীদের কাফেলাতে। হে আল্লাহ, আমাদের তাওফিক দিন আপনার অধিকার যথার্থরূপে আদায় করার। আমাদের হালাল রিজিকে বরকত দিন। আমাদের অপমানিত করবেন না আপনার সৃষ্টির সামনে। হে রব, আপনি দুআর সর্বোত্তম স্থল, আপনি আশার সর্বোত্তম স্থল। হে প্রয়োজন পূরণকারী, হে মর্যাদা উন্নতকারী, হে দুআয় সাড়াদানকারী! হে জমিন, আরশ ও আসমানসমূহের রব, আমাদের প্রার্থিত জিনিসটি দান করুন। আমাদের আশার প্রতিফল দান করুন। হে প্রার্থনাকারীদের প্রার্থিত বস্তুর মালিক, আপনি চুপ থাকা ব্যক্তিদের মনের কথা জানেন, আমাদের দান করুন আপনার ক্ষমার শীতলতা, আপনার মার্জনার মিষ্টতা, হে আরহামুর রাহিমিন।
اللهم صلي على محمد وعلى آله وصحبه الأخيار...

টিকাঃ
১১৬. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৬।
১১৭. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
১১৮. সুরা আশ-শুরা, ৪২: ২৫।
১১৯. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
১২০. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৮৪৭।
১২১. সুরা ইউসুফ, ১২: ১১১।
১২২. সহিহুল বুখারি: ৬৪০৮, সহিহু মুসলিম: ২৬৮৯।
১২৩. সুরা আত-তাওবা, ৯: ১১১।
১২৪. সুরা আল-বাকারা, ২ : ২২২।
১২৫. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৬।
১২৬. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৬।
১২৭. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫২।
১২৮. সুরা ইউনুস, ১০: ৪৯।
১২৯. সুরা আত-তাকবির, ৮১: ৮।
১৩০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
১৩১. সুরা আশ-শুরা, ৪২: ২৫।
১৩২. সুরা আত-তাকবির, ৮১: ১০-১৪।
১৩৩. সুরা আল-হাক্কা, ৬৯: ১৮।
১৩৪. সুরা ইয়াসিন, ৩৬: ৬৫।
১৩৫. সুরা ফুসসিলাত, ৪১: ২২-২৪।
১৩৬. সুরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
১৩৭. সুরা আন-নামল, ২৭: ৬২।
১৩৮. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৩৯. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫১, সুনানুত তিরমিজি: ২৪৯৯।
১৪০. সুরা আল-মুজাদালা, ৫৮: ১৯।
১৪১. সুরা সাবা, ৩৪: ৫৪।
১৪২. সুরা আর-রুম, ৩০: ৭।
১৪৩. সুরা আল-ইসরা, ১৭: ৮১।
১৪৪. সুরা আত-তাওবা, ৯: ৮৪।
১৪৫. সুনানুত তিরমিজি: ২৬২১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
১৪৬. সুরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩: ৪-৬।
১৪৭. সুরা মারইয়াম, ১৯ : ৩৯-৪০।
১৪৮. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৪৯. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫০. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫১. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫২. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৮।
১৫৩. সুরা আল-বাকারা, ২: ২২২।
১৫৪. সুরা আজ-জুমার, ৩৯: ৫৩।
১৫৫. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭০।
১৫৬. সুরা হুদ, ১১: ১১৪।
১৫৭. সুরা তহা, ২০: ৮২।
১৫৮. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫৪০।
১৫৯. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৫০।।
১৬০. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ৩৮।
১৬১. সুরা আশ-শুরা, ৪২ : ২৫।
১৬২. সুরা আল-হিজর, ১৫: ৩।
১৬৩. সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ২০৫-২০৬।
১৬৪. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩: ৫৫।
১৬৫. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৩৫৮; খতিব তারিখু বাগদাদ : ৭/৪৪৭-তে এ কবিতাটিকে আবু নাওয়াসের মৃত্যুকালীন কবিতা বলে উল্লেখ করেছেন।
১৬৬. সুরা গাফির, ৪০: ৬০।
১৬৭. সুরা নুহ, ৭১: ১০।
১৬৮. সুরা ইবরাহিম, ১৪:৭।
১৬৯. সুরা আশ-শুরা, ৪২:২৫।
১৭০. সুরা আল-ইনফিতার, ৮২:৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00