📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 অনুপম উত্থান

📄 অনুপম উত্থান


হলিউডের সিনেমার মতোই আমরা কোনো এক সুপারহিরোর জন্য অপেক্ষা করি। ভাবি, কোনো একদিন ব্যাটম্যান, সুপারম্যানের মতো কেউ আসবে আর তারপর সব বদলে যাবে। আবার আলো ফিরে আসবে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। এখন যেভাবে চলছে চলুক, অবেলায় নিভে যাক অযুত কোটি তরুণ-তরুণী, আত্মহত্যা করুক বেকার বোকা যুবকের দল, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাক পরিযায়ী পাখি আর প্রজাপতিরা, তাতে আমার কী? আমি তো কিছুই বদলাতে পারবো না! এগুলোর জন্য তো আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করবেন না!

আসলেই কী তাই? নাকি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালে আমার শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট জীবনটা হয়তো একটু ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হবে, বাপের হোটেলে খাওয়া জীবনটা, মাসে একবার ট্যুর দেওয়ার জীবনটা, সেলফিবাজি, আড্ডাবাজি, রেস্টুরেন্ট আর সিনেপ্লেক্সের জীবনটা, বাইক-সিনেমা-ওয়েবসিরিযের জীবনটা, প্রেমিকার চোখে চোখ রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না, দায়িত্ব নিতে হবে, কাজ করতে হবে, আরামের জীবন ছেড়ে বের হয়ে আসতে হবে-এই ভেবে আমরা এই মিথ্যে কথাগুলো বলি নিজের সাথে?

আমাদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। এখন বয়স আমাদের দায়িত্ব নেবারই। এই তারুণ্যে, যদি জীবনের এই বসন্তে শুধু নারী আর প্রেম দিয়েই জীবনকে সাজাই তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম নিশ্চিতভাবে আমাদের চিহ্নিত করবে ভীরু কাপুরুষ হিসেবে। ওরা আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। ক্ষমা করা উচিতও না।

স্রোতের সাথে আর কত অন্ধ চলা? চলো নিজেকে বদলাই, সমাজকে বদলে দেই। দূর থেকে মনে হয় স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো অসম্ভব। যে একবার দাঁড়ায় কেবল সেই বুঝতে পারে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে তবে অসম্ভব কিছুই না। একবার আল্লাহর উপর ভরসা করে দাঁড়াতে পারলে আর কোনো চিন্তা থাকে না। এই পথের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আল্লাহর রহমত, সাহায্য, ভালোবাসা। আর অবশ্যই চিরসুখের এক জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। আলহামদুলিল্লাহ!

হতাশা আর অন্ধকারের এই ব-দ্বীপে আলোর মশাল হাতে ছুটে চলছেন কিছু সিংহহৃদয় ভাইয়েরা। পর্নোগ্রাফি, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক, মোবাইল আসক্তি, হতাশা, আত্মহত্যা, বিয়েকে কঠিন করে ফেলা, যিনা-ব্যভিচার-অশ্লীলতার বিরুদ্ধে নিজেদের উদ্যোগে সচেতনতামূলক নানা কাজকর্ম করে যাচ্ছেন একের পর এক। লিফলেট বিতরণ করছেন। সেমিনার করছেন। প্রজন্মকে, সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। এই জেনারেশনের দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রামের বাস্তবতাগুলো বোঝানোর চেষ্টা করছেন সমাজকে, অভিভাবকদের, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, ইমাম, আলেম ও শিক্ষকদের। আসক্তি, হতাশা, বিকৃতি আর আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ানো প্রজন্মের কাঁধে আপনজন হয়ে হাত রাখার চেষ্টা করছেন। এসো না, তুমিও চলে এসো তাদের দলে!

ক্যাম্পেইন আয়োজনের সকল মালমশলা পাবে এখানে- https://tinyurl.com/onupomutthan

সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা কিংবা কাউকে বোঝানো, সব ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। শুধু দুনিয়ার লাভক্ষতির হিসেব-নিকেশ করে মানুষ সত্যিকারার্থে আলোর পথে ফিরে আসতে পারে না। সাময়িকভাবে ফিরে আসলেও, একসময় সে কোনো না কোনো ভাবে আবার বস্তুবাদ আর ভোগবাদের চক্রে আটকেই যায়। যেকোনো অন্ধকার থেকে ফিরে আসার মূল লক্ষ্য হতে হয় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। তাহলেই পরিবর্তন হয় স্থায়ী।

প্রেম ও যিনার ক্ষতিকর দিক এবং এ থেকে বের হয়ে আসার উপায় নিয়ে কথা বলার সময় পুরো আলোচনাকে সাজাতে হবে ঈমান, তাওহীদ এবং মহান আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে। পরিবর্তনের ভিত্তি হতে হবে ইসলাম। যে বিকৃত আধুনিক লেন্সের ভেতরে দিয়ে মানুষ বাস্তবতাকে দেখছে, দেখতে শিখেছে-সেটা পাল্টে দিয়ে ইসলামের লেন্স দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে শেখাতে হবে তাদের। তাই আলোচনার সময়, ক্যাম্পেইন করার সময় আততায়ী ভালোবাসা, চশমা এবং শুভ্রতার ব্যাকরণ-এই তিন অংশের মূল পয়েন্টগুলো পরিস্কার করে তুলে ধরতে পারলে সেটা খুব ফলদায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

***

বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সমাজ আর বিশ্বব্যবস্থাকে তো অনেক তো গালমন্দ করলে। ফেইসবুকে অনেক ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটালে। কতোটুকু লাভ হলো? তেমন কোনো পরিবর্তন কি আসলো এই সমাজে? নাকি জাস্টফ্রেন্ড, অনলি ফ্রেন্ড, কাছে আসার গল্প, প্রেম, লিটনের ফ্ল্যাট, লঞ্চের কেবিন, গ্রুপ ট্যুর, বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, ছবি, ভিডিও ভাইরাল, ছ্যাঁকা, মদ-বাবা-গাঁজা, হতাশা, টিকটক বিড়ম্বনা, মোবাইল আসক্তি... অসুখের তালিকা কেবল লম্বাই হতে থাকলো? দিন দিন বাড়লো আগ্রাসী শূন্যতায় গ্রাস হয়ে যাওয়া মানবাত্মার সংখ্যা?

আমাদের সাথে যা হবার হয়ে গেছে, কিন্তু হৃদয়ঘটিত অসুখ আর মৃত্যুর এই উপনিবেশে আর যেন কোনো ছোট ভাই, কোনো ছোট বোনের জীবন নষ্ট না হয়, যেন আর কোনো মায়ের বুক বিধ্বস্ত না হয়-চলো এবার সেই চেষ্টা করবে। অনেক তো জীবন নষ্ট করলে, চলো এবার জীবন বদলানোর চেষ্টা করবে।

চলো, আবার আমরা উঠে দাঁড়াই। অস্বস্তিকর নীরবতার প্রাচীরে আঘাত হানি ভালোবাসা আর কল্যাণকামিতা দিয়ে। সমাজকে পথ দেখাই তাওহীদের মশাল জ্বেলে। কলুষিত এই সমাজটাকে শেখাই শুভ্রতার ব্যাকরণ।

চলো আমরা আবার উঠে দাঁড়াই। রচনা করি অনুপম উত্থানের এক মৌলিক কাহিনী। বিচারের দিন মহান রবের মুখোমুখি হবার সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে অন্তত এটুকু যেন বলার সুযোগ থাকে তোমার-আমার।

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 'দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম'

📄 'দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম'


এক.
সবাই ফেরে না। ফিরতে যে হবে এই বোধটাই কাজ করে না অনেকের মনে। কেউ কেউ ফেরে। প্রত্যাবর্তনের পথে কিছু কিছু ব্যয়বহুল অতীত তো থেকেই যায়। সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে সযত্নে লুকিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাস, এক পৃথিবী হাহাকার, অশ্রু, ঘাম, রক্ত, বুকের ভেতরের প্রতিনিয়ত লাল নীল ক্ষরণ। প্রিয়তমার গভীর কালো চোখ, কালো চোখে মুক্তোর মতো জল, টুকরো টুকরো স্মৃতি, প্রিয় কিছু গান, কিছু কবিতা প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সব হারানোর ভয়, সমাজ, সংস্কৃতি অদৃশ্য এক শেকলে আটকে রাখে, ফিরতে দেয় না।

তারপরও কেউ কেউ ফিরে আসে জীবনে, ফিরে আসে মিল্লাতু ইবরাহীমে। জাহেলিয়াতকে লাথি মেরে, মিথ্যে উপাস্যদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, মূর্তবিমূর্ত মূর্তিগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে, সমাজ-সংস্কৃতির কারাগারের দেওয়াল ধসিয়ে দেয় ধূলোয়। সব হারানোর ভয় হারিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করে, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...' প্রত্যাবর্তনের পথে ফেরার ইচ্ছেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছে থাকলে আল্লাহ ফেরার পথে অবশ্যই পরিচালিত করবেন। এটাই আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাহ। দিন চলে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যায়, এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির পতন হয়, নদী তার গতিপথ বদলে ফেলে, কিন্তু আল্লাহর এই সুন্নাহর কোন পরিবর্তন হয় না। আসহাবুল কাহফের যুবক থেকে শুরু করে সালমান আল ফারিসি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত... কখনো হয়নি।

আমরা আজ এক যুবকের গল্প শুনবো।[৪১৭] জীবনের সবক'টি অন্ধকার গলিতে বিচরণ করে যে প্রত্যক্ষ করেছে সকালের সোনালী সূর্যোদয়। অন্ধকারে মাথা কুটে মরেছে বহুকাল, তাই তীব্রভাবে বুঝেছে আলোর মূল্য, আলোর দেখা পাওয়া মাত্রই গ্রহণ করে নিয়েছে দ্বিধাহীন চিত্তে।
জীবনের বিশাল ক্যানভাসে সুনিপুণভাবে এঁকেছে প্রত্যাবর্তনের গল্প...

...প্রথম কখন কোন মুহূর্তে আমি তোমাকে দেখেছিলাম ঠিক মনে নেই। বুকের হার্টবিট মিস হয়নি, বুকের বাম পাশটা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যেতেও চায়নি। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছেদ পড়লে কান গরম হয়ে যায়। বালিকা বিশ্বাস করো, সেই মুহূর্তে আমার কিছুই হয়নি। হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যে করেই হোক তোমাকে পেতেই হবে, যে করেই হোক! ষোলোতে পা দেওয়া আমি হঠাৎ করেই সেদিন যেন অনেক বড় হয়ে গেলাম। বুঝে ফেললাম এক নিমিষে, ক্যারিয়ারে মনোযোগী না হলে নিম্নমধ্যবিত্ত এই আমার তোমাকে পাওয়া হবে না কখনোই।

পড়াশোনায় সিরিয়াস হলাম। রাত জেগে জেগে পড়তাম। যখন ঘুমে দুচোখ ভারী হয়ে আসতো, তখন তোমার কথা ভাবতাম। ঘুম পালিয়ে যেতো। অদ্ভূত এক শক্তি অনুভব করতাম। ভাগ্যের সন্ধানে নড়বড়ে পালতোলা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়া যুবকদের স্বপ্নের মতো শক্তি পেতাম। হাতমুঠো করে প্রতিজ্ঞা নবায়ন করতাম। তোমাকে পেতেই হবে!

এক বছরের জুনিয়র তুমি, জানলেও না আমার রেসাল্ট এরপর থেকে কত ভালো হতে শুরু করলো। অঙ্কের মোস্তাফিজ স্যারের হাতে বরাবরই অপমানিত হতাম, সেই মোস্তাফিজ স্যার পর্যন্ত আমাকে ক্লাসের সবার সামনে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিলেন! বিতর্কের ডায়াসে দাঁড়িয়ে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতাম, করতালিতে ফেটে পড়তো হলরুম। এককোণায় চুপটি করে বসে থাকতে তুমি; স্নিগ্ধ, সৌম্য মূর্তি হয়ে, আমি আরো প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম প্রতিপক্ষের উপর!

টিফিনের ব্রেকে তুমি ফুচকা খেতে যেতে স্কুল গেটে। দূর থেকে তোমাকে দেখতাম আর মুগ্ধ হতাম ক্ষণে ক্ষণে। একটা মেয়ে গোগ্রাসে ফুচকা গিলছে একের পর এক, এই অদ্ভূত দৃশ্যও আমার কাছে অপূর্ব মনে হতো। প্রেমে পড়লে সত্যিই মানুষের মস্তিষ্ক ওলটপালট আচরণ করে।

প্রথম কখন আমাদের কথা হয়েছিল, মনে আছে তোমার?

ফিযিক্সের প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলে তুমি হারুন স্যারের বাসায়। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। বাসায় ফেরার মাঝপথে আটকা পড়লে আমাদের পাশের গলিতে, নাবিলদের বাসার নিচে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে, কাদামাখা ভূত হয়ে বাসায় ফিরছিলাম। ভর সন্ধ্যায় তোমাকে ঐখানে দেখে চমকে গেলাম। তুমি আমার দিকে একপলক চাইলে। ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গিয়েছে তোমার মুখ। যা বোঝার বুঝে গেলাম। এক দৌড়ে বাসায় গিয়ে ছাতা নিয়ে আসলাম। একটা রিকশা ডেকে দিলাম। একেবারে সিনেমার নায়কদের মতো।

পুরোটা সময় তুমি মুখ গোমড়া করে ছিলে, হাই পাওয়ারের চশমা পরা হাইস্কুলের হেড মাস্টারনীর মতো। ভাগ্যিস, তখন ফেইসবুক, মোবাইলের এতো সহজলভ্যতা ছিল না, তাহলে তুমি খুব সহজেই বাসায় যোগাযোগ করতে আর আমারও কপালে জুটতো না হিরোগিরি করা। রিকশায় ওঠার আগে হাফপ্যান্ট, ম্যাগি টিশার্ট পড়া আপাদমস্তক কাদামাখা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে। আস্তে করে বলেছিলে, থ্যাংকস। বুকে কাঁপন উঠেছিল আমার!

এরপর মাঝেমাঝেই তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে। কখনো টিফিনের ব্রেকে ম্যাথ বুঝতে আসতে, কখনো বা ফিজিক্স। আমি খুব নার্ভাস হয়ে যেতাম। তুমি কঠিন মুখে পড়া বুঝতে নাকি বোঝার ভান করতে, আর মনে মনে আমার দুরবস্থা দেখে হাসতে?

একবার পরীক্ষাতে তোমার সিট পড়লো একদম আমার পাশে। আমি পরীক্ষা আর কী দিবো! এতো নার্ভাস হয়ে গেলাম, হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে ধুক ধুক করছিল ভয় হচ্ছিল সবাই না জানি শুনে ফেলে!

আমি স্কুল শেষ করে বের হয়ে আসলাম। তুমি এক বছরের জুনিয়র, স্কুলেই থেকে গেলে। আমি চলে গেলাম অন্য শহরে। কলেজের ক্লাস টেস্ট, ল্যাবের ভয়াবহ অত্যাচার, নতুন পরিবেশ, তার উপর তোমার সাথে আর যোগাযোগ হয় না। আমার তখন কী যে ভাঙচুর অবস্থা! ছুটিতে বাড়ি এসে তোমার বাসার সামনের গলিতে হেঁটে বেড়াতাম, যদি একটিবার তোমার দেখা পাওয়া যায়, যদি একটিবার তুমি ব্যালকনিতে আসো। কী যে কষ্টের ছিল সেই দিনগুলো! ফেইসবুকে একাউন্ট খুলেছিলাম। তোমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছিলাম। অনেক বন্ধুবান্ধবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পাইনি। দুই বছর এভাবে চলে গেল। তোমার দেখা পেলাম না। তুমিও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করলে না। ভীষণ দুঃসময় চলছিল আমার তখন।

ভার্সিটিতে ওঠার পর ভাবলাম এবার তোমাকে বোধহয় মনের কথা বলা যায়। কত কাহিনী করে তোমার ফোন নম্বর ম্যানেজ করলাম! উইকএন্ড ছিল। পুরো হল ফাঁকা। সারাদিন মনের সাথে যুদ্ধ করলাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। আগুনঝরা চৈত্রের শেষ প্রহরে দুরু দুরু বুকে তোমাকে ফোন দিলাম। আড়াই বছর পরে তোমার কথা শুনলাম। নার্ভাস হয়ে সব ভজঘট পাকিয়ে ফেললাম। কথা জড়িয়ে আসছিল। একটু পর ধাতস্থ হয়ে কতো কথা বলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথাটি আর বলা হলো না। তুমি ঠিকই ধরে ফেলেছিলে। হেসেছিলে প্রাণভরে। কপট রাগের স্বরে বলেছিলে- সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা।'

আমি আর তোমাকে ফোন দেইনি। এর মাঝে একদিন তুমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি দিনে অন্তত দশবার তোমার ওয়ালে ঘুরে বেড়াতাম আর বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। নক করার সাহসও হয়নি। কেন যে এতো ভীরু হয়ে যেতাম তোমার কাছে! প্রেমের মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছিল সেই প্রথম দেখা থেকেই। যদিও বা তখন তা ছিল একপাক্ষিক হাওয়া। হৃদয় আকাশে যে অল্প অল্প করে ভালোবাসার মেঘ জমছিল সেটা তুমিও বুঝতে, আমিও বুঝতাম। শুধু বৃষ্টিটাই কেন জানি নামছিল না!

এইচএসসির পর আমার শহরে চলে আসলে মেডিকেলে চান্স পেয়ে। উঠলে তোমার ভাইয়ের বাসায়। ভাইয়াকে বলে দিয়েছিলে এডমিশনের সব কাজ একাই পারবে। ফোন করে ডেকে নিলে আমাকে।

তারপর এডমিশনের কাজে এ বিল্ডিং, ও বিল্ডিং-এ ছোটাছুটি, রাস্তা পার হতে গিয়ে ভয় পেয়ে তোমার আমার বামবাহু আঁকড়ে ধরা, রিকশায় ঘুরাঘুরি... কখন যে বিস্ময়কর রুদ্ধশ্বাস ভালোবাসার মেঘ গলে গেল, কখন অঝোরে বৃষ্টি নামলো, কখন 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে নেমে আসলাম আমরা দুজন, টের পাইনি একদম!

এরপরের কাহিনীটা পুরোনোই। পৃথিবীর বুকে এ কাহিনী অনেকবার অভিনীত হয়েছে। অবিমিশ্র ভালোবাসায় মাতাল হয়ে গেলাম আমরা দুজন। নিঃসঙ্গতায়, নির্জনতায় কেটেছে আমার সারাবেলা, কতো ভয়ঙ্কর দিন গেছে, কতো গভীর গোপন কথা লুকোনো আছে আমার হৃদয়ে... এখন আমার খুব কাছে সমস্ত উষ্ণতা, নিশ্চয়তা আর স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিশ্বাস্য সুন্দরী একটা মেয়ে! এ যেন এক রূপকথা! এক স্বপ্নের ভালোবাসা!

দুই.
রং বদলে ধূসর হয়ে গেল জীবন কয়েক মাসের মাথাতেই। আসলে প্রেমে পড়ার সময় থেকে প্রেম হয়ে যাবার পরের কিছুটা সময় স্বপ্নের মতো কাটে। তারপর স্বপ্নভঙ্গ হয়। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ!

তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে আমাদের ঝগড়া হতো... এইটা কেন করলাম, কেন ওইটা করলাম না, কেন ওর সঙ্গে কথা বললাম, কেন ফোন রিসিভ করলাম না, কেন মেসেজের রিপ্লাই দিলাম না। প্রত্যেক ঝগড়া শেষে আমাকেই সরি বলতে হতো। মালির চোখ এড়িয়ে হলের বাগান থেকে গোলাপ চুরি করে, মনের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে (বেশিরভাগ সমইয় জীবনানন্দ বা সুনীলের কবিতা কপি পেস্ট করতাম। তুমি বইটই পড়তে না। ধরতেই পারতে না আমার কারচুপি!) বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে তোমার মান-অভিমানের বরফ গলাতে হতো।

আমাকে কতো সন্দেহ করতে তুমি! কিছুক্ষণ পর পর ফোন করতে। ফোন একটু বিযি দেখলেই চিল্লাচিল্লি! মায়ের সঙ্গেও যে আমি ফোনে কথা বলতে পারি, এটা বুঝতে চাইতে না। ঝগড়া করতে। অথচ অন্য ছেলেদের সাথে তুমি খুব হেসে হেসে কথা বলতে, রিকশায় এখানে সেখানে যেতে। আমার গা জ্বলে যেতো ঈর্ষায়! তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে, হেসে উড়িয়ে দিতে। বলতে, ওরা তো আমার ক্লাসমেট বা জাস্ট ফ্রেন্ড! একবার এক ব্যাচেলর স্যারের স্কেচ এঁকে ফেইসবুকে আপলোড দিলে তুমি। এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই ক্ষেপে বোম হয়ে গেলে, আমার সাথে কথা বললে না ঝাড়া দু'সপ্তাহ!

একে তো ছিলে ডানাকাটা পরীর মতো রূপবতী, তার উপর খুব মিশুক। সহজেই ক্যাম্পাসে পপুলার হয়ে গেলে। ডিএসএলআর-ওয়ালা অনেক জাস্টফ্রেন্ড ছিল তোমার। তাদের দিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। আমার পছন্দ হতো না। নিষেধ করলে শুনতে না। ঘষামাজা করে প্রায় প্রত্যেকদিন ফেইসবুকে ছবি আপলোড করতে, ছেলেরা সমানে লাভ রিয়‍্যাক্ট দিতো, কমেন্টে তোমার রূপের প্রশংসা করতো। তুমি খুব খুশি হতে। আর এদিকে আমি ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।

অনেকবার তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, ফেইসবুকে এভাবে ছবি দিও না। যে ছেলেগুলো তোমার রূপের প্রশংসা করছে, সেই ছেলেগুলোর অনেকেই তোমাকে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে, রসালো আলোচনা করে বন্ধুদের সাথে।

তুমি আমার কথা শুনে রেগে ফায়ার হয়ে যেতে। আমি খুব পসেসিভ, তুমি তোমার ব্যক্তিস্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছো, স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছো না, আমার মানসিকতা খুব নোংরা, আমার পাশে তুমি ইনসিকিউরড ফিল করো, গা ঘিন ঘিন করে- কত কিছু শুনিয়েছিলে তুমি।

রাত জেগে ফোনে কথা বলার কারণে সকালের ক্লাসগুলো মিস হতো। পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না। পড়ার টেবিলে বসলে শুধু 'তুমিই' মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে। তাছাড়া একটু পরপর মেসেজের রিপ্লাই দিতে হতো, কথা বলতে হতো। খুব খারাপ রেসাল্ট হয়েছিল সেই সেমিস্টারগুলোতে। ভালো ছাত্র, ভালো মানুষ রুমমেট অনেক বুঝিয়েছিল। পাত্তা দেইনি। বাবা মাঝে মাঝে পড়াশোনা কেমন চলছে জিজ্ঞাসা করতেন। আমি বাবার কাছে আজীবন সত্যি বলে এসেছি। আমাকে নিয়ে তিনি একদম নিশ্চিন্ত ছিলেন। মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে আমার বুক ভেঙে যেতো। খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু মিথ্যে বলতেই হতো। ঐদিনগুলোতে প্রবল এক পাপবোধ তাড়া করে বেড়াতো আমায়। শান্তি পেতাম না। রাতে ঘুমুতে পারতাম না।

পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। একবার টার্ম ব্রেকের সময় বাসাতেও যেতে পারলাম না টিউশনির কারণে। ডেটিং এর খরচ জোগাড়ের জন্য বাসায় মিথ্যে কথা বলে টাকা নিতাম। একই বই তিন চারবার করে কিনতাম। টিউশনিও করাতে হতো কয়েকটা। টায়ার্ড হয়ে রুমে ফিরতাম রাতে। পড়তে বসার মন মানসিকতা বা এনার্জি কোনোটাই থাকতো না। রেসাল্ট খারাপ হতো, আগেই বলেছি। আমার কি যে খারাপ লাগতো! আমার গাধা গাধা বন্ধুগুলোও আমার চেয়ে অনেক ভালো করতো।

তোমাকে স্বপ্ন ভেবে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বড়ো সাধ ছিল আকাশে সাত লক্ষ সুখের ফানুস ওড়ানোর, অথচ আমার মৃত আকাশ জুড়ে উড়েছিল শুধুই যন্ত্রণার বেলুন। বিষম ভার হয়ে তুমি চেপে বসেছিলে আমার বুকের ভেতর। তবু তোমার হাসি, আড়চোখের চাহনি, পাগলামি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছেলেমানুষি কথাবার্তা, আলো-আঁধারি, রহস্যময়তা, উদাসীনতা, গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা সবকিছু মিলিয়ে তুমি আমার কাছে ছিলে এক মাদকের মতো। মিশে গিয়েছিলে আমার রক্তের প্রতিটি অণুচক্রিকায়। জানি তুমি আমাকে পোড়াবে, কিন্তু আমি পুড়তেই যে ভালোবাসতাম...

তিন.
....একবার তোমার এক আচরণে (এটা নিয়ে পরে বলবো)। আমি বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রথমবারের মতো তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে। চোখ ফুলিয়ে কেঁদেছিলে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্কের সুতো আলগা হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর তা আবার জোড়া লাগলো। সেই শুরুর দিনগুলোর মতো। প্রেম পেকে টসটসে হয়ে গেল, তুমি আমার হাতে হাত রেখে ১০৮ বারেরও বেশি জিজ্ঞেস করে ফেললে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো? আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে না তো? বেশ চলছিল এরপর। পাগলামি, কফিশপ, সিনেপ্লেক্স, কথায় কথায় রাতভোর হয়ে যাওয়া, স্বপ্ন, কল্পনা...

হঠাৎ একদিন কানাডা থেকে এলো এক দমকা হাওয়া। সেই দমকা হাওয়ায় অচিন দেশের রাজকুমার তোমাকে নিয়ে উড়াল দিলো। বিদায় নিতে তুমি এসেছিলে রবীন্দ্র সরোবরে। কেঁদে কেঁদে বলেছিলে, 'আমাকে ক্ষমা করে দিও'। আমি হেসেছিলাম। তোমার চোখের পানি মুছে দিয়ে দুগালে নিজের দুহাত রেখে বলেছিলাম, 'পাগলি মেয়ে একটা!'

তারপর কতো দিন, কতো রাত চলে গেছে! কত নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটেছে। কতো রাত আমি নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি বিছানায় এপাশ ওপাশ করে করে। একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছি। গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম অন করেছি। মান্না দে কেঁদে কেঁদে জানিয়েছে সে অনেকদিন দেখেনি তার প্রিয়াকে, তাহসান বলেছে চাঁদের আলো কখনো তার হবে না। মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে হলের সিঁড়িতে বসতাম। গাঁজায় দুটো দম দিয়ে গান ধরতাম 'গিভ মি সাম সানশাইন, গিভ মি সাম রেইন...'

খাওয়াদাওয়া করতাম না, ক্লাসে যেতাম না, ক্লাস টেস্টগুলোও মিস করতাম। বাসা থেকে ফোনের পর ফোন দিতো। ধরতাম না। পরে ফোন করে আম্মুকে ঝাড়ি দিতাম। রুমমেট, বন্ধুবান্ধব, স্যার, অনেকেই চেষ্টা করেছে বোঝানোর। বুঝিনি আমি। বন্ধুরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো যেটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো ১৮০ ডিগ্রী।

গাঁজা আর সিগারেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে গোলগাল, ভালোছেলে দুই রুমমেট অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচলো। বেড দুইটা ফাঁকা পড়েছিল এক দিন। দরজা বন্ধ করে সারাদিন গাঁজা টেনেছিলাম। পরের দিন বেডদুটো আবার দখল হয়ে গেল। একজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র। হুজুর। মুখে একগাল দাড়ি, চোখে চশমা। মুখে সব সময় স্মিত হাসি। প্রথম দেখাতেই মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। আমার বেহাল অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন উনি।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমাকে বুঝিয়েছিলেন উনি। আমি তর্ক করেছি, মেজাজ হারিয়ে একদিন চিৎকার করে বলেছিলাম, 'আমাকে আমার মতোই থাকতে দেন না ভাই! আপনারা হুজুর মানুষ, ভালোবাসার কী বোঝেন? সব মেয়েরা মিথ্যেবাদী, প্রতারক।'

ভালোবাসার কী বুঝি! ভাই স্মিত হেসে আমাকে শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। শুনিয়েছিলেন নবীজি (ﷺ) আর খাদীজা (রা.)-এর ভালোবাসার কথা, শত বাধা-বিপত্তির মুখেও দ্বীন প্রচারে নবীজি (ﷺ) -এর দৃঢ়তা আর খাদীজা (রা.)-এর পাশে থাকার কথা। শুনিয়েছেন স্ত্রী আইশাহ (রা.)-এর সাথে নবীজি (ﷺ) -এর দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প, স্ত্রীর এঁটো পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করার গল্প, সওয়ারীর পিঠে উঠতে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার গল্প। কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, 'হে নবী, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় দেই।'[৪১৮]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সব স্ত্রীদের জানিয়ে নিলেন। তাঁদেরকে বেছে নেবার সুযোগ দিলেন হয় আমাকে পাবে অথবা এই দুনিয়ার ভোগবিলাস, চাকচিক্য। তাঁর সব স্ত্রীরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন, 'আমরা আপনাকেই চাই ইয়া রাসূলাল্লাহ।'

এমন এক সংসার তাঁরা বেছে নিলেন, যেখানে মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলে না, খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, নবীর স্ত্রী হয়েও মোটা কাপড় পরে থাকতে হয়, সংসারের কাজ করতে গিয়ে কালিঝুলি মাখতে হয়, জরাজীর্ণ কুটিরে খেজুরপাতার বিছানায় শুতে হয়।

আমি শুনেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। এমনটাও হয়! রূপকথার ভালোবাসাও যে হেরে যায় এর কাছে!

যদি আমাদের ঘরবাধা হতো, যদি আমাদের এরকম দরিদ্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তুমি কী এভাবেই আমাকে ভালোবাসতে? কক্ষণো নয়। এই অবস্থায় পড়লে প্রথম সুযোগেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতো। সিনেমা বা ডেটিং-এ না নিয়ে গেলে, তুমি যেরকম করতে আমার সাথে, মাসের পর মাস আধপেটে থাকা, জীর্ণ পোশাক পরা...উফ! সম্ভবই না।

ভাই আমাকে বুঝিয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে...

তুমি তো হেরেই গেলে। লুযার হয়েই রইলে আজীবন! বালিকা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এক পলক দেখেই তুমি যাকে ভালোবেসেছিলে, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, শাশ্বত নিয়মকানুন ভেঙেচুরে কাঙালের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলে যার পিছু পিছু, সেই বালিকা তোমাকে ভুলে গিয়েছে। একসময় তোমার কবিতা শোনার জন্য যেই বালিকা একটু পর পর ফোন করে জ্বালাতো, তোমার নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখলেই নক করতো, সেই মেয়ে শব্দেরও অধিক দ্রুতগতিতে ভুলে গিয়েছে তোমাকে, তোমার সেই সব নিশাচরী কবিতাগুলোকে। ভুলে গিয়েছে বাদলা দিনের প্রথম কদমফুল আর বৃষ্টিতে ভেজার সব প্রহরগুলোকে। একপলকেই ভুলে গেছে সবকিছু, ঠিক যেমন এক পলক দেখেই তুমি প্রেমে পড়েছিলে।

বড়লোক, এস্টাব্লিশড স্বামীর সাথে রোজ রোজ ছবি দেয়; রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমা হলে। হানিমুনের ছবি, বিদেশ ঘোরার ছবি। দামি ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে হাসিতে ভরপুর সব ছবি। সুখ, ভালোবাসা উপচে পড়ছে যেন! তুমি এসব দেখে দেখে, অতীতের কথা ভেবে, পুরোনো স্মৃতি মনে করে নিজেকে পোড়াও। তামাক পাতার ধোঁয়ায়। পুড়ে যায় তোমার তরুণ ফুসফুস, তোমার হৃৎপিণ্ড। বেঈমানি করে বসে দুচোখ। নামে অশ্রুর অঝোর ধারা।

বালিকার ছলনা নারীজাতির ওপর থেকে তোমার সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি হানা দাও নিষিদ্ধ সাইটগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীল উদ্দামতা চলতে থাকে পর্দায়। তুমিও সমানে হাত চালাও। প্রতিশোধ নিতে হবে, মস্ত বড় প্রতিশোধ, ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ!

এই প্রতিশোধের শেষ কোথায়? আর কতো রাত গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকলে, আর কতো ক্লাস ফাঁকি দিলে, আর কতো মেয়েকে ধরে খেয়ে ছেড়ে দিলে, আর কতো রাত পর্ন দেখলে, আর কতোবার হস্তমৈথুন করলে, আর কতোবার মায়ের চোখের জল দেখলে, বাবার আর কতোটা অপমান দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হবে? তুমি ঐ মেয়েকে পরাজিত করতে পারবে? বলো, আর কতো কাল তোমার এই অদ্ভূত প্রতিশোধ চলবে? কবে তুমি বিজয়ী হবে? কবে বালিকা হেরে যাবে?

বোকা ছেলে, তুমি তো শুরুতেই হেরে গিয়েছো! প্রতিশোধ নেবার নামে গাঁজা খাচ্ছো, সিগারেট খাচ্ছো, খাওয়াদাওয়া, ঘুমের অনিয়ম করছো এতে কার ক্ষতিটা হচ্ছে শুনি? ঐ মেয়ের, না তোমার নিজের, নিজের শরীরের? পর্ন আর হস্তমৈথুনে তুমি তিলে তিলে শেষ করে ফেলছো পৌরুষের সব শক্তি, কার ক্ষতি হচ্ছে? কার মা কষ্ট পাচ্ছে? আত্মীয়, প্রতিবেশী, পাশের বাসার আংকেল-আন্টিদের কাছে কার মা, কার বাবা অপমানিত হচ্ছে? সে তো সুখেই আছে। তোমার কোনো দুঃখ, কষ্ট, প্রতিশোধের অভিমান, আগুন কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি, করবেও না; এরকম অবস্থায় সাধারণত করেও না।

আর তুমি?
নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছো! নর্দমার শুয়োর আর রাস্তার কুকুরেরা যেভাবে জীবনযাপন করে, তুমি বেছে নিয়েছো ঠিক সেই জীবন। নিজের শরীর শেষ করছো, স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে মারছো। বোকা ভাই আমার! এটা কোনো জীবন হলো?

ফিরে এসো ভাই। বাবার কাছে ক্ষমা চাও, মায়ের চোখের জল মুছে দাও। জায়নামাযে দাঁড়াও। চোখের জলে জ্বালিয়ে দাও অতীতের সব ভুল, সব পাপ। আবার শুরু থেকে সব শুরু করো। লম্বা একটা জীবন পড়ে আছে। ফিরে আসো ভাই! ফিরে আসো জীবনে। প্লিজ!

আস্তে আস্তে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসা শুরু হলো। ঝাঁকড়া চুলে তেল, চিরুনি পড়লো, সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম, গাঁজা ছেড়ে দিলাম একেবারেই, শুক্রবার ছাড়াও মাঝে মাঝে মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। বালিকা, তোমার বিরহের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করলো। কী ঋতু চলছিল তখন? শরৎ না হেমন্ত? হেমন্ত বোধহয়। আহা কী ভীষণ দামি ছিল সেই হেমন্ত!

ইউটিউব ব্রাউজিং করতে করতে একদিন পেয়ে গেলাম 'পরকালের পথে যাত্রা' নামের এক লেকচার সিরিয। গমগমে কন্ঠস্বরের বক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন একটানা। আমি শুয়ে শুয়ে শুনে গেলাম কাঁথা মুড়ি দিয়ে। কী দরদ মাখা কণ্ঠ তাঁর, কী গভীরতা তাঁর কথায়!

সেই লেকচারে শুনলাম আশ্চর্য একদল তরুণীদের কথা, আয়তনয়না যাদের চোখ, কোনো মানুষ ও জ্বীন কখনো যাদের স্পর্শ করেনি। প্রবাল ও পদ্মরাগের মতো এই সব তরুণীদেরকে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা নাম দিয়েছেন হুর আল আঈন। আল্লাহ তা'আলা এদেরকে নাকি এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন যে এদের দিকে তাকিয়ে মানুষ বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে। তবু চোখ ফেরাতে পারবে না। সেই লেকচারে আরো শুনলাম আকাশের ওপারের লাল নীল হিরে আর মুক্তোর প্রাসাদের কথা, আদিগন্ত বিস্তৃত রেশমের গালিচা, সারি সারি আসন, সালসাবিল আর কাউসারের কথা, সিদরাতুল মুনতাহার কথা...।

বালিকা তোমার প্রতি যে ভালোবাসাটুকু অবশিষ্ট ছিল তার এক কানাকড়িও আর থাকলো না এই লেকচার শোনার পর। কঠোর প্রতিজ্ঞা করলাম, জান্নাতের সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই মিস করা যাবে না। বদলে গেলাম আমি। আমূল বদলে গেলাম।

চার.
...বৃষ্টি ভালোবাসতাম আমরা দুজন। কতদিন বৃষ্টিতে দুজনে হেঁটে বেড়িয়েছি ফাঁকা ফুটপাতে, কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়েছি বৃষ্টির স্রোতধারায়। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। সারা বিকেল আমরা ঘুরে বেড়ালাম রিকশায়। শেষ বিকেলে ঝুম বৃষ্টির পরের সেই ভীষণ প্রিয় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। রিকশার ভেতরের আঁধো অন্ধকারে তুমি আমার গা সেঁটে বসলে। একদম গা সেঁটে। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমি হয়তো তখন শুক্রবারের নামাযও পড়তাম না, হয়তো চেইন স্মোকার ছিলাম, লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ন দেখতাম হঠাৎ হঠাৎ। তারপরেও তুমি যখন মাঝে মাঝে এতো কাছাকাছি আসতে, তখন আমার অস্বস্তি হতো। কেমন জানি হয়ে যেতে তুমি সেই সময়টুকুতে। চোখের ভাষায় কী জানি বলতে চাইতে!

সেদিন আমি ছোট্ট রিকশার একপাশে যতটুকু সরে বসা সম্ভব ততটুকু সরে বসেছিলাম। তুমি মুখে রহস্যময় হাসি হেসে আবার আমার গা সেঁটে বসছিলে বারবার। রিকশা থেকে নেমে যাবার আগমুহূর্তে আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললে, 'কাল বাসা খালি। ভাইয়া, ভাবী বেড়াতে যাবে। একা একা আমি বাসায় থাকতে পারি না। আমার ভীষণ ভয় লাগে...'।

কী ভুলের মধ্যেই না আমি ডুবে ছিলাম! আলেয়াকে আলো ভেবে নষ্ট করেছিলাম জীবনের সবচেয়ে সজীব সময়গুলো। এখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। বৃষ্টিতে ভিজি। খালি পায়ে একা হেঁটে বেড়াই সবুজ ঘাসের উপর। রাসূলুল্লাহর (*) সুন্নাহ।[৪১৯] দু'আ করি মন ভরে, বৃষ্টির সময় দু'আ কবুল হয়। হলের লেকের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি বৃষ্টির ফোঁটা পানিতে পড়ে বৃত্তাকার ঢেউ তৈরি করছে, দূরের শালবনের ভেতর কাকের দল বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা ফোঁটা ভিজিয়ে দেয় আমার সর্বাঙ্গ, আড়াল করে ফেলে চোখের তপ্ত অশ্রু। কত ভুল করে ফেলেছি এই ছোট্ট জীবনে! কত গুনাহ করে ফেলেছি। ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি ছাড়া তো আমার যাবার জায়গা নেই।

বালিকা, তোমার সম্মোহনী আমন্ত্রণে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। তড়িতাহতের মতো কেঁপে উঠেছিলাম নিদারুণ বেদনায়। ঘৃণায় সারা শরীর রি রি করে উঠেছিল। নিজেকে ধোঁয়া তুলসি পাতা প্রমাণ করতে চাইছি না। টগবগে তরুণ আমি। নারীদেহের ব্যাকুল শুশ্রুষা পাবার ইচ্ছে আমারও হতো। কিন্তু বালিকা বিশ্বাস করো, বিয়ের আগে এসব করবো এমনটা কখনো তোমাকে নিয়ে ভাবিনি। পাপ আর পঙ্কিলতা সযত্নে দূরে সরিয়ে, বুকের বেশ বড়সড় একটা জায়গা ফাঁকা করে, পবিত্রতা আর স্নিগ্ধ ভালোলাগায় মুড়ে রেখেছিলাম তোমাকে। সেই তুমি এমন একটা কথা বলতে পারলে!

তুমি বোধহয় পড়ে ফেলেছিলে আমার অনুভূতি। সেই রাতে লম্বা একটা মেসেজ পাঠিয়ে সরি বলেছিলে। দুইদিন পরে মাফ চাইতে আমার হলের নিচে এসেছিলে সশরীরে। তোমার চোখের পানি দেখে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম তখনই। কিন্তু তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গিয়েছিল অনেকখানি।

ক্লাস নাইনের এ সেকশনের বালিকা, তুমি ছিলে আমার কৈশোরের প্রথম ভালোলাগা, ভালোবাসা। হাইস্কুল সুইটহার্ট। কোনো কালিমা না ছুঁয়ে নিখাদ ভালোবাসা আর শুভ্রতায় কতোবার তোমাকে ছুঁয়েছি কল্পনায়, তোমার রেশমের মতো চুলে আনমনে বিনুনি কেটেছি, সে সবের তুমি কতটা জেনেছো?

পোকাদের হাতে তুলে দিয়েছো নিজেকে, পোকারা খুবলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করেছে দিবানিশি, কেউ একজন তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পার করে দেবে দীর্ঘ সুখের প্রহর...এই সৌভাগ্য তোমার কখনো হবে?

এই পৃথিবীতে কতদিন তোমাকে পেতাম বলো? কতোটাই বা নিখুঁত তুমি? অপরূপা? পরিপূর্ণা? চুলে তেল না দিলে, চিরুনি না করলে তোমাকে পাগলি পাগলি লাগে। দাঁত না মাজলে দুর্গন্ধ বের হয়, বগল থেকে বিশ্রী গন্ধ আসে, চোখে পিচুটি জমে, সাবান না দিলে ময়লার আস্তরণ পড়ে। টয়লেটে যেতে হয়, নাকে সর্দি আসে। ৩০-৩৫ বছর বয়স হলেই মেদ জমে হিপোপটোম্যাস হয়ে যাবে, তারপর একদিন চুল পেকে যাবে, চামড়া ঝুলে যাবে, ফোকলা দাঁতের দাদী-নানী হয়ে যাবে।

তোমার মায়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে ভুলতে বসেছিলাম তুমি সসীম, তুমি নশ্বর। ভুলতে বসেছিলাম এই আকাশের ওপারেও আরেকটা আকাশ রয়েছে। তার উপর স্বর্ণ, মণিমুক্তো আর হীরার একটা প্রাসাদ রয়েছে আমার। সেখানে যাবার রাস্তা দুনিয়াতে নিজের বাড়ি যাবার পথের চাইতেও ভালোভাবে চিনবো। প্রাসাদের কাছাকাছি যাবার পরে অসাধারণ একটি দৃশ্য দেখে থমকে যাবো আমি। আমার হার্টবিট মিস হবে। পা ভারী হয়ে যাবে, নড়াচড়া করতে পারবো না!

কী সেই দৃশ্য?

আমার জান্নাতি স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে- অপরূপ এই দৃশ্যে আমি মুগ্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবো বছরের পর বছর! ৪০ বছর পলকহীন চোখে তাকিয়ে উপভোগ করবো আমার জান্নাতি সেই স্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য, এমন রূপ যা দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় বটে না। কোনো মানবহৃদয় তা কখনো কল্পনাও করতে পারে না।

আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলছেন, 'নিশ্চয় আমরা তাদেরকে সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে। আর তাদেরকে করেছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা'। [৪২০]

আয়তনয়না হুরদের সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলছেন,
'যেন তাঁরা সুরক্ষিত মুক্তো'।[৪২১]
'তাঁরা যেন প্রবাল ও পদ্মরাগ'।[৪২২]
'যেন তারা গৌরবর্ণ সুরক্ষিত ডিম'।[৪২৩]

জান্নাতি স্ত্রীগণ এ কারণেই সুন্দরী নয় যে তাঁরা কোনো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে। বরং স্বয়ং আল্লাহ তাঁদের সৌন্দর্যের সার্টিফিকেট দিয়েছেন!

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের স্ত্রীদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- একজন জান্নাতের হুর যদি পৃথিবীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে তবে মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সমগ্র স্থান এমনভাবে আলোকিত, উদ্ভাসিত হয়ে যেতো যে তাতে চন্দ্র, সূর্যের আলো পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যেতো। সমগ্র পৃথিবী সুগন্ধিতে ভরে যেতো।[৪২৪]

জান্নাতের স্ত্রীদের তোমার মতো শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। তাদের টয়লেটে যেতে হয় না, গা দিয়ে গন্ধ বের হয় না, মুখে দুর্গন্ধ হয় না। তাঁদেরকে তো মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়নি! বরং আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তাঁদের তৈরি করেছেন বিশেষভাবে- কস্তুরী, কপূর এবং জাফরান দিয়ে। তাঁদের থুতুও মেশকের সুগন্ধ ছড়াবে। মাথার ওড়না দুনিয়া এবং এই পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে, সে সবকিছুর চেয়েও উত্তম!

তোমার মতো তাঁরা কখনো বুড়িয়ে যাবে না। কখনো তাঁদের সৌন্দর্য ম্লান হবে না। বরং দিন দিন তাঁরা আরো বেশি রূপবতী, মায়াবতী হয়ে উঠবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমু'আবারে জান্নাতি লোকেরা সেখানে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরের হাওয়ায় সেখানকার ধূলোবালি তাঁদের চেহারা ও কাপড়ের উপর পড়বে। তাতে তাঁদের সৌন্দর্য বেড়ে যাবে। স্ত্রীদের নিকট ফিরে যাবার পরে তাঁদের স্ত্রীরা বলবেন, আপনারা তো বেশি সুন্দর হয়ে গিয়েছেন'। জান্নাতি লোকেরাও স্ত্রীদের বলবেন, 'তোমরাও আগের চাইতে অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছো'।[৪২৫]

জীবন বাবু হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে মালয় সাগর, বিদর্ভ নগর ঘুরে শেষমেষ বনলতা সেনের কাছে যে শান্তি পেয়েছিল, আমি তোমার কাছে ঠিক সেই শান্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দিনরাত তুমি তুমি করেও অস্থিরতা, অশান্তি, নির্ঘুম রাতেই কপালে জুটেছে আমার বেশি। সবসময় সন্দেহ, ঝাড়ি, জেরা, পুলিশগিরি... এসবে কি শান্তি পাওয়া যায়?

জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই আমাকে তোমার মতো বকাবকি করবে না, ঝাড়ির উপর রাখবে না, এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দাও, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাও, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাও ইত্যাদি আবদার করবে না। কখনোই কটু কথা বলবে আমাকে। সন্দেহ করবে না।

'তাঁদের সাথে থাকবে লজ্জাবতী, নম্র ও আয়তলোচনা তরুণীরা' [৪২৬]
'সেখানে তাঁরা কোনো অর্থহীন প্রলাপ শুনতে পাবে না। বরং বলা হবে শুধু শান্তি! নিরবচ্ছিন্ন শান্তি।'[৪২৭]

বালিকা, তুমি যেমন আমার মৌলিক ভালোবাসা ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছো, জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই এমন করবে না। ওরা কখনোই আমাকে ধোঁকা দেবে না। আমাকে কোনো টেনশন করতে হবে না- না জানি আমাকে ছেড়ে চলে যায় কি না। না জানি আমাকে ধোঁকা দেয় কি না, না জানি আমার সাথে প্রতারণা করে কি না। এসবের তো কোনো সম্ভাবনাই নেই, কারণ হুর আল আঈনকে তো কেবল আমার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। না কোনো মানুষ বা জ্বীন এদের দেখেছে আর না কেউ তাঁদের স্পর্শ করেছে।

‘সেখানে থাকবে আয়তনয়না স্ত্রীগণ। এদের কোনো জ্বীন বা মানুষ স্পর্শ করেনি।’[৪২৮]

জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না। অন্য পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। মিষ্টি সুরে আমাকে বলবে, 'তোমার চাইতে হ্যান্ডসাম পুরুষ আর কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা তো সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার স্বামী আর আমাকে তোমার স্ত্রী বানিয়েছেন।' [৪২৯]

আহহ! আমার কোনো টেনশন নেই। কোনো ভাবনা নেই। জান্নাতের স্ত্রী অসীম সময় জুড়ে আমাকেই, শুধু আমাকেই ভালোবাসবে; প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে আগের চেয়েও বেশি কাছে চাইবে, আমার বুকে মুখ লুকোবে, আমাকে জড়িয়ে ধরেই সুখের গল্প লিখবে। জান্নাত তো হলো সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে দুঃখকষ্ট নেই, নেই গ্লানি, অবসাদ বা বিষণ্ণতা বলে কোনো কিছু। শুধু সুখ আর সুখ। অবিরাম বৃষ্টির মতো সুখ। যার শুরু আছে শেষ নেই। জান্নাতের নিয়ামতের কথা কল্পনা করারও ক্ষমতা নেই মাটির মানুষের। এমনই এক রাজ্য সেটি! রূপকথার মতো যেখানে- অতঃপর তাহারা চিরকাল সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো।'

'কেউই জানে না চোখ জুড়ানো কি কি নিয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়েছে জান্নাতে। [৪৩০]

পাঁচ.
মাঝে মাঝে উথালপাতাল জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় চারিদিক। চাঁদের আলো যেন হেসে হেসে গলে পড়ে। রাতজাগা বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে আসে বকুলমালার তীব্র গন্ধ। এমন রাতে ঘুমানো অপরাধ। এই অপরাধ আমি করি না। বাইরের বারান্দায়, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকি। শত সহস্র বছরের পুরোনো নক্ষত্ররা মিটিমিটি তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমিও কী তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি না? তোমায় ভেবে কল্পনায় আনমনে লিখতে থাকি না কোনো এক উপাখ্যান? এক অদ্ভূত, কাল্পনিক কিন্তু সত্য প্রেমের উপাখ্যান।

'তুমিও কি সহস্রবার আমার কথা ভেবেছো? নাকি তার চেয়েও বেশি; লক্ষকোটি বার? ধূলিমলিন মিথ্যে কথার এই পৃথিবীতে বসে আমি কতো অযুত কোটিবার তোমার কথা ভেবেছি! পুকুর ধারে জলের গন্ধে চোখ ভিজিয়েছি। আর মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি কোষ ব্যবহার করে করে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি এমন এক সুখের, যা কখনো কোনো মানুষ অনুভব করেনি...

তুমি এলে... পাশে বসলে আমার, সবুজ ঘাসের উপর। একটু দূরেই টলটলে স্বচ্ছ পানির বিশাল দীঘি। আকাশ থেকে একরাশ নীল ঝরে ঝরে পড়ে একটু নীলাভ দেখাচ্ছে দীঘিটাকে। তোমার কোলে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি। তুমি আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছো। দুটো প্রজাপতি সেই কখন থেকে উড়ছে। তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে খুশিতে হেসে দিলে। আমি দুশো একান্ন বারের মতো তোমার প্রেমে পড়লাম। আমার চোখ দেখেই তুমি বুঝে ফেললে সেটা, তাই না?

খামখেয়ালি বাতাস এসে এলোমেলো করে দিলো তোমার চুল। একগোছা চুল এসে পড়লো তোমার মুখের ডানপাশে। সরিয়ে দিলাম ফুঁ দিয়ে। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলে। দুশো বায়ান্ন বারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম!

তোমার দুষ্টুমি ভরা চোখের তারায় নীল আকাশ তিরতির করে কাঁপছিল। তুমি কি জানো, তোমার সেই সবুজাভ চোখ আমার ভেতরের কত কিছুর মৃত্যু ঘটালো আর কত কিছুর জীবন দিলো? আড়চোখে তোমার দিকে তাকাতেই ধরা পড়ে গেলাম আবার। তোমার চোখেমুখে সবজান্তার হাসি। আমার কী দোষ বলো? তোমাকে আল্লাহ যে বানিয়েছেন বানানোর মতো করেই!

বিকেলের এক নরম মুহূর্ত। আবদার ধরলে, কাউসার দেখতে যাবে। বেরিয়ে পড়লাম আমরা। নৌকায় দাঁড়িয়ে আগন্তুক বাতাসে তুমি মেলে দিলে দুই হাত। পাখির মতো। যেন এক্ষুণি গা ভাসাবে এই আগন্তুক বাতাসে। ঘোরলাগা এক আলো এসে পড়লো তোমার স্নিগ্ধ মুখটাতে। মুহূর্তেই তুমি যেন আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেলে। ছুঁতে ইচ্ছে করে না, কথা বলতে ইচ্ছে করে না, কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না। দূর থেকে শুধু একমনে দেখে যেতে ইচ্ছে করে!

বছরের পর বছর ধরে! হাজার হাজার বছর ধরে!

আর ঠিক তখনই দুশো তিপ্পান্নবারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম! জানি, তুমি আমার কল্পনার চাইতেও সুন্দর। আমার কল্পনা ধারে কাছেও যেতে পারে না তোমার অনুপম সৌন্দর্যের। তবু আমি তোমার কথা ভাবি। কল্পনায় তোমাকে ছুঁই হরদম।

হে হুর আল আঈন, হে আমার জান্নাতি স্ত্রী, তুমিও কি আমার কথা ভাবো অষ্টপ্রহর? তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছো আমার? জানি না, জানতে চাইও না। শুধু জেনে রাখো, অসীম গুণোত্তর ধারার মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে চলেছি, পড়েই যাচ্ছি, পড়েই যাচ্ছি, পড়েই যাচ্ছি ...

মাতাল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেয় গগন শিরীষ গাছটা। ওর ডালপালার ছায়া বারান্দার যমীনে আঁকে অদ্ভূত এক নকশা। জ্যোৎস্না দুলে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পানকৌড়ির ডাক। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমার কল্পনার সুতো। ঠেস দিয়ে বসে থাকি আমি বারান্দায়। চোখের কোণে কী অশ্রুবিন্দু জমে? নাকি আমার মনের ভুল? কল্পনা? কী জানি!
অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় কষ্টের!
তবে সবকিছুরই তো শেষ আছে—তিক্ততার, শান্তির, অস্থিরতার, জীবনোপন্যাসের।

দীর্ঘ অপেক্ষার তো বটেই।
তাই না?

টিকাঃ
[৪১৭] সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত। শেষের চার লাইনের কবিতাটি লিখেছেন- আবদুল্লাহ।
[৪১৮] সূরা আহযাব, ৩৩: ২৮
[৪১৯] ফাদালাহ বিন ওবাইদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (*) আমাদেরকে মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটতে আদেশ করেছেন। (আবু দাউদ: ৪১৬০। হাফেজ ইরাকী হাদিসটির সনদকে জায়্যিদ তথা শক্তিশালী বলেছেন। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। তাখরীজুল ইহইয়া ৪/২৮৯, সহীহাহ ২/২০)
[৪২০] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৩৫-৩৭
[৪২১] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ২৩
[৪২২] সূরা আর রহমান, ৫৫:৫৮
[৪২৩] সূরা আস সাফফাত, ৩৭:৪৯
[৪২৪] বুখারী: ২৭৯৬
[৪২৫] মুসলিম: ২৮৩৩
[৪২৬] সূরা আস সাফফাত, ৩৭:৪৮
[৪২৭] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬:২৫-২৬
[৪২৮] সূরা রহমান, ৫৫:৫৬
[৪২৯] ইবনুল জাওযী, কারা জান্নাতের কুমারীদের ভালোবাসে, আর রিহাব পাবলিকেশন, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩
[৪৩০] সূরা আস-সাজদা, ৩২:১৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px