📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 উত্তরের অপেক্ষায়

📄 উত্তরের অপেক্ষায়


এক.

দু'আ নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ ভুল ধারণা আছে।

আল্লাহ বলেছেন, আমাকে ডাকো, আমি বান্দার ডাকে সাড়া দেই, আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করি।

মানুষের কাছে চাইলে মানুষ বিরক্ত হয়, আল্লাহর কাছে না চাইলে তিনি রাগ করেন। তাহাজ্জুদের দু'আ এমন এক তীর যা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না...

কুরআনের আয়াত ও হাদীসের এমন বক্তব্যগুলো শুনে আমরা যা ভাবি তা হলো: আল্লাহর কাছে চাইবার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিয়ে দেবেন। কোনো দেরি হবে না। হোক সেটা হালাল চাওয়া বা হারাম চাওয়া।

আল্লাহ ওয়াদার খেলাফ করেন না। তবে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলার সাড়া দেবার ধরণ একটু অন্যরকম। কাঙ্ক্ষিত বস্তু না দেওয়াটাও তার দু'আ কবুল করা বা সাড়া দেবার অংশ। ধরো, তোমার ছোটভাইয়ের অসুখ হয়েছে। ডাক্তার বলেছে রোজ রাতে ঘুমানোর আগে দুই চামচ করে ওষুধ খেতে হবে এক মাস। প্রথম রাতে ওষুধ খাবার সময় তোমার ছোটভাই আবিষ্কার করলো, ওষুধ বেশ মিষ্টি। খুব টেস্ট! সে জেদ ধরলো, একমাসের ওষুধ সে তখনই ঢকঢক করে গিলে খাবে! তুমি কি তাকে এমনটা করতে দেবে? সে তোমার কাছে খুব কান্নাকাটি করছে। কাকুতি মিনতি করছে। তোমার মন গলাতে না পেরে শেষমেষ ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে—তোমার মনে কি কোনো দয়া-মায়া নাই? তুমি কি আসলেই আমার ভাই? আমাকে না দিয়ে নিজে খেতে চাও, তাই না?

এমন অবস্থায় তুমি কী করবে? এখানে ওষুধ না দেওয়াই ভালোবাসার প্রমাণ। তাই না?

ছ্যাঁকা খাবার পরে দেখি অনেকেই সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মানুষটাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য মনপ্রাণ ঢেলে আল্লাহর কাছে দু'আ করতে থাকে। দু'আ কবুল না হলে আবারো সেই একই কাহিনী—আল্লাহর প্রতি অভিমান, অনুযোগ, বিরূপ ধারণা করা।

একটু ভেবে দেখো। তুমি হারাম কাজের জন্য, একটা হারাম সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতির জন্য দু'আ করছো, আল্লাহ কি তোমার এই হারাম কাজের দু'আ কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?

দুই. দু'আ নিয়ে আল্লাহর উপর মন্দ ধারণা করার আরেকটা কমন বিষয় হলো বিয়ে। সাধারণত এক্ষেত্রে দুই ধরনের ঘটনা ঘটে। প্রথমত, যাকে বিয়ে করতে চায় মানুষ তার নাম ধরে দু'আ করে। 'হে আল্লাহ অমুকরে আমার বউ বানাইয়া দাও, অনুকরে আমার জামাই বানাইয়া দাও...।' দু'আ চলতেই থাকে। কিন্তু অমুকের যদি অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায় তাহলেই শুরু হয়ে যায় আল্লাহর প্রতি অভিযোগ। 'আল্লাহ, ক্যান আমার সাথে এমন করলেন'?

আচ্ছা তুমি যাকে চাচ্ছো, তার সাথে বিয়ে যে তোমার দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে, এটা কি তুমি নিশ্চিত জানো? হয়তো বিয়ের পর দেখা গেল সে পরকীয়া করছে, দু'হাতে টাকা অপচয় করছে, তোমার সাথে ঝগড়া করছে, তোমার বাবা-মাকে কষ্ট দিচ্ছে, অন্য মেয়েকে নিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, তোমার গায়ে হাত তুলছে। অথবা দেখা গেল বউয়ের কারণে তুমি ঘুষ খাচ্ছো, হারাম ইনকামের দিকে ঝুঁকছো। হতে পারে স্বামী তোমাকে পর্দা করতে দিচ্ছে না... এমন অনেক কিছুই তো হতে পারে, তাই না? তুমি যেটাকে শাস্তি মনে করে অভিযোগ করছো, হয়তো সেটা আসলে তোমার জন্য নিয়ামত। কিন্তু তুমি সেটা এখনো বুঝতে পারছো না। অধৈর্য হয়ে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছো! তাছাড়া এভাবে সরাসরি নাম ধরে বিয়ের জন্য দু'আ করা ঠিক না। সালাফরা আমভাবে কল্যাণের জন্য দু'আ করতেন। এভাবে দু'আ করতে পারো যে,

'হে আল্লাহ, যদি সে আমার দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য ভালো হয় তাহলে তার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন, আর যদি ভালো না হয় তাহলে তাকে ভুলে যাবার তাওফিক দিন, তার উপর থেকে আমার মন উঠিয়ে নিন।'

সবচেয়ে ভালো হয় আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে দু'আ করলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের চোখ শীতল করে। এবং আমাদেরকে মুত্তাকি লোকদের নেতা বানিয়ে দিন।[৪০১]

এর চেয়ে সুন্দর দু'আ তুমি করতে পারবে? এর চেয়ে সুন্দর দু'আ করা সম্ভব? তবে শুধু দু'আ করে গেলেই হবে না, বিয়ে করার জন্য দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে যেগুলো আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

বিয়ে নিয়ে দু'আ এবং দু'আ নিয়ে অভিযোগের দ্বিতীয় একটা ধরন আছে। যারা মোটামুটি দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করে এটা তাদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। ধরো, তুমি ইসলাম পালনের ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করতে চাও। রবের কাছে করুণ মিনতি জানাচ্ছো বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। স্বপ্নের সেই অদেখা মানুষটা স্বপ্নেই থেকে যাচ্ছে, ছুঁতে পারছো না। বাসায় রাজি হচ্ছে না বা পছন্দমতো পাত্র-পাত্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের পছন্দ হচ্ছে তারা আবার রিজেক্ট করে দিচ্ছে। অনবরত দু'আ করে যাচ্ছো তুমি। কিন্তু বিয়ের ফুল ডুমুরের ফুল হয়েই আছে। তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করছে আল্লাহ কবে আমার দু'আ কবুল করবেন? কবে আসবে আল্লাহর সাহায্য? আল্লাহ দু'আকারীর দু'আ কবুল করেন- কই, আমার দু'আ তো কবুল হচ্ছে না!

অসাধারণ একজন দাঈ তারেক মেহেন্না। তাঁর একটি লেখা পড়েছিলাম বেশ আগে। আলোচনার এই পর্যায়ে সেই লেখাটা নিয়ে আসা জরুরি। তিনি লিখেছেন,

...আমরা দু'আকে বিপদের সময়, কঠিন মূহুর্তে প্যানিক বাটনের মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করি। আপনি কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ বারবার কুরআনে বলেছেন দরকারের সময় যে তাঁকে ডাকবে তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দেবেন। সুতরাং, আপনি মনে করলেন যদি ঠিকঠাক মতো দু'আ করতে পারেন (রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, মনোযোগের সাথে ইত্যাদি), তাহলে ঠিক পরদিন সকালেই আপনি আপনার দু'আর 'জবাব' পেয়ে যাবেন। আর যদি না পান, তাহলেই আপনি ভেতরে ভেতরে আল্লাহর অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ করা শুরু করবেন!

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একটি হাদীসে এই বিষয়ে বলেছেন। যদিও বুখারী ও মুসলিম-দুই জায়গাতেই এই হাদীসটি আছে, তবে আমাদের আলোচনার জন্য মুসলিমের বর্ণনাটি অধিকতর উপযুক্ত। হাদীসে এসেছে:

'একজন ব্যক্তির দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকে-যদি সে অন্যায় অথবা হারাম কিছুর জন্য দু'আ না করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাড়াহুড়ো না করে এবং অধৈর্য না হয়।'

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীসের দ্বারা ব্যক্তি অধৈর্য হয়ে যাবে?' রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন, 'সে বলবে, আমি দু'আ করছি এবং করেই যাচ্ছি, কিন্তু আমি দেখছি আমার দু'আর কোনো জবাব দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে সে আশা হারিয়ে ফেলবে এবং আল্লাহকে স্মরণ করা ছেড়ে দেবে।'[৪০২]

গভীরভাবে হাদীসটি বোঝার চেষ্টা করলে, কীভাবে দু'আ কাজ করে এবং কীভাবে কাজ করে না-সে বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারবো। একটু খেয়াল করুন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কী ধরনের শব্দ এখানে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন- '...তাঁর দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকবে।'

এবার অধৈর্য ব্যক্তির অভিযোগের সাথে তুলনা করুন- 'আমি দেখছি আমার দু'আর কোনো জবাব দেওয়া হচ্ছে না।'

আপাতদৃষ্টিতে দু'টো পরস্পর সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। এটা কীভাবে সম্ভব যে একজন ব্যক্তির দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকছে কিন্তু তাঁর কাছে মনে হচ্ছে সে কোনো ফল পাচ্ছে না? দু'আর উত্তর কোথায়?

ব্যাপারটা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই দু'আর জবাব একসাথে না এসে, ধাপে ধাপে আমাদের কাছে আসে। এমন কিছু হয়তো ঘটবে যার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু আপনার কাছে মনে হচ্ছে আপনার দু'আর জবাব আসছে না।

মনে করুন আপনি একটা ঘরে বন্দী। মুক্তির একমাত্র উপায় জানালা ভেঙে বের হওয়া, কিন্তু আপনার সম্বল শুধুমাত্র ছোট কিছু পাথরের টুকরো। আপনি জানালায় একটা ছোট পাথর ছুড়লেন। তাতে জানালা ভাঙলো না, কিন্তু খুব সুক্ষ্ম একটা ফাটল ধরলো। আপনি আরেকটা পাথর ছুড়লেন। আরেকটা ছোট ফাটল। আপনি আবার একটা পাথর ছুড়ে দিলেন, তারপর আরেকটি। যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরো জানালা অসংখ্য সুক্ষ্ম ফাটলে ভরে গেছে। শেষবারের মতো আপনি একটা পাথর ছুড়ে দিলেন এবং জানালার কাঁচ ভেঙে গেল। বন্দীত্ব থেকে আপনি মুক্তি পেলেন। দু'আও এভাবেই কাজ করে। আপনি প্রতিটি দু'আর মাধ্যমে আংশিক জবাব পেতে থাকেন এবং ধৈর্য ও অবিচলতার সাথে একই দু'আ বারবার করার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে শেষ পর্যন্ত দু'আর পরিপূর্ণ জবাব পাবেন।

মনে রাখবেন প্রথম পাথরটি শুধু একটি ফাটলই ধরাবে। কিন্তু আপনি যদি পাথর ছুড়তে থাকেন তাহলে এক সময় জানালা ভেঙে যাবে এবং আপনি মুক্ত হবেন। এর জন্য সময়ের প্রয়োজন। এই জন্যই হাদীসটিতে আমাদের বলা হচ্ছে- '... যতক্ষণ পর্যন্ত সে অধৈর্য না হচ্ছে।'

আপনি যখন কোনো চারাগাছে পানি দেন, তখন নিশ্চয় একসাথে ত্রিশ গ্যালন পানি ঢেলে দিয়ে, কেন মাটি থেকে বিশাল মহীরুহ বের হচ্ছে না, সেটা নিয়ে চিন্তা করতে বসেন না। বরং আপনি ধৈর্য সহকারে প্রতিদিন একটু একটু করে পানি দিতে থাকেন এটা জেনে যে, যত সময়ই লাগুক না কেন, শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফুলটি আপনি পাবেনই। একইভাবে আপনি জানেন, আল্লাহ আপনার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করবেন এবং আপনার দু'আর জবাব দেবেন- এটা সত্য। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে অলৌকিকভাবে দু'আর উত্তর পাওয়া নিয়মের ব্যতিক্রম, নিয়ম না। নিয়ম হলো আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাওয়া এবং তাঁর কাছ থেকে এর উত্তর পাওয়ার প্রক্রিয়া সময় ও ধৈর্যের উপর নির্ভরশীল।

ইবনুল জাওযী (রহ.) তাঁর 'সাইদুল খাতির' বইটিতে বলেছেন: 'কষ্ট-দুঃখ-দুর্দশা শেষ হবার একটি নির্ধারিত সময় আছে যা শুধু আল্লাহ জানেন। তাই যে ব্যক্তি দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসার আগে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা কোনো কাজে লাগবে না। ধৈর্য আবশ্যক কিন্তু দু'আ ছাড়া ধৈর্য অর্থহীন। যেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু'আ করছে, তাঁর কাছে সাহায্য চাইছে, তার উচিত না অধৈর্য হওয়া। বরং তার উচিত ধৈর্য, সালাত এবং দু'আর মাধ্যমে সর্বজ্ঞানী আল্লাহর ইবাদাতে নিয়োজিত হওয়া। অধৈর্য ব্যক্তি তাঁর ধৈর্য হারানোর মাধ্যমে আল্লাহর পরিকল্পনা লঙ্ঘন করার চেষ্টা করছে। এটা আল্লাহর সামনে একজন গোলাম ও বান্দার উপযুক্ত আচরণ কিংবা অবস্থান নয়। আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ অবস্থান হলো, আল্লাহর কাছ থেকে আসা তাকদীরকে মেনে নেওয়া। এবং এজন্য প্রয়োজন ধৈর্য। এর সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো সালাতের মাধ্যমে ক্রমাগত আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাওয়া। আল্লাহর কাছ থেকে আসা তাকদীরের বিরোধিতা করা হারাম এবং এটা আল্লাহর পরিকল্পনা লঙ্ঘনের চেষ্টার মধ্যে পড়ে। তাই এই বিষয়গুলো অনুধাবন করো এবং তোমার জন্য তোমার দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা সহ্য করা অনেক সহজ হবে।' [৪০৩]

ভাইয়া, আপু! হয়তো তুমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নও, আল্লাহ তোমাকে প্রস্তুত হবার সময় দিচ্ছেন। হয়তো তুমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নও, হয়তো এখন বিয়ে হলে তুমি তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যেতে। অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিতে না, যা আদতে তোমার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতো। [৪০৪] রিজেকশনের কারণে তুমি কষ্ট পাচ্ছো, অথচ আল্লাহ হয়তো তোমার জন্য আরো উত্তম কোনো জীবনসঙ্গীর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। যার জন্য তুমি কষ্ট পাচ্ছো তার সাথে বিয়ে হলে হয়তো তুমি সুখী হতে না, সংসারে অনেক অশান্তি হতো। তুমি দু'আ করতে থাকো, চেষ্টা করতে থাকো আর আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখো। আল্লাহ একদম উপযুক্ত সময়ে তোমার জন্য পারফেক্ট মানুষটাকে তোমার কাছে পাঠাবেন।[৪০৫]

শেষ বিচারের দিন আল্লাহর এক বান্দার সামনে পুরষ্কারের বিশাল এক পাহাড় নিয়ে আসা হবে। বান্দা বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! এগুলো কার?' আল্লাহ বলবেন, 'এগুলো তোমার।'

বান্দা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না এতোগুলো পুরস্কার তার, কারণ সে জানে দুনিয়াতে থাকতে এগুলো পাওয়ার মতো আমল সে করেনি।

আল্লাহ বান্দাকে বলবেন, 'তোমার মনে আছে তুমি আমার কাছে অনেক দু'আ করতে দুনিয়াতে। সেই দু'আগুলোর কিছু জবাব আমি দিয়েছিলাম, কিছু দেইনি। জবাব না দেওয়া দু'আগুলোর বদলে আমি তোমাকে এই পুরস্কার দিচ্ছি।'

বান্দা আফসোস করে বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! কেন আপনি দুনিয়াতে আমার কিছু দু'আ কবুল করেছিলেন! আপনি যদি একটা দু'আও কবুল না করতেন তাহলে আমি আজ কতোগুলো পুরস্কার পেতাম!'[৪০৬]

মন খারাপ করো না, হতাশ হয়ো না, অস্থিরও হয়ো না। জীবনটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকো। ট্রেনে উঠে ট্রেন চালকের উপর ভরসা করে নিশ্চিন্তে ঘুম দেই আমরা... অ্যাক্সিডেন্টের ভয়ে জেগে থাকি না। অথচ আল্লাহ আমাদের রব! তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন-তাঁর উপরই আমরা ভরসা করতে পারি না! এটা তো লজ্জার কথা! কষ্টের কথা! দু'আ কবুলের একটি পূর্বশর্তই হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা, সুধারণা রাখা।

'আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে আমি তেমন।' [৪০৭]

শুধু মুখে মুখে চাওয়া কিন্তু দু'আ নয়। তোমার মনের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য আল্লাহ যা যা করতে বলেছেন তা করো। দু'আ কবুলের শর্তগুলো জানো। [৪০৮] সেগুলো মেনে চলো। এগুলোও দু'আরই অংশ। এরপর তাঁর উপর ভরসা করো। যথাসময়ে জবাব আসবেই।

'... তোমার মালিক তোমাকে এমন কিছু দেবেন যাতে তুমি খুশি হয়ে যাবে।'[৪০৯]

টিকাঃ
[৪০১] সূরা আল-ফুরক্বান, ২৫:৭৪
[৪০২] সহীহ মুসলিম ২৭৩৫ (ইফা, ৬৬৮৫)
[৪০৩] কখনও ঝরে যেও না, তারেক মেহান্না, সীরাত পাবলিকেশন
[৪০৪] পরিচিতদের মধ্যে অনেক আছে। বিয়ের পরে অনেক বদলে গেছে। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন ঠিক নেই। বউ এর সাথে জড়াজডি করা ছবি দেদারসে আপলোড করে অনলাইনে। দেখা অনেকে ইসলামের বেসিক কাজটা পর্যন্ত করে না। নামায-কালাম, রোযা, পর্দা কোনো কিছুর
[৪০৫] এক ভাইয়ের কথা জানি। ১০-১২ বছর আল্লাহর কাছে বিয়ের জন্য দু'আ করেছেন। ভাইয়ের জন্য পাত্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সবাই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ভাইও ধৈর্য ধরতে ধরতে প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবুও দু'আ করা বন্ধ করেননি। আল্লাহর প্রতি সুধারণা রেখে দু'আ করেছিলেন। এরপর অবিশ্বাস্যভাবে ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বেশ সুখেই আছেন এখন তিনি।
[৪০৬] আল আদাব আল মুফরাদ লিল ইমামিল বুখারী- ৭১০, মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ১১১৩৩। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ আত-তারগীব: ১৬৩৩)
[৪০৭] বুখারী: ৭৪০৫, মুসলিম: ২৬৭৫ (ইফা. ৬৫৬১)। আল্লাহর প্রতি সুধারণা বাড়ানোর জন্য পড়া যেতে পারে ড. ইয়াদ কুনাইবি হাফিযাহুল্লাহর জীবন বদলে দেওয়া বই- আল্লাহর প্রতি সুধারণা, প্রকাশনী: শব্দতরু। অবশ্যপাঠ্য একটি বই।
[৪০৮] দু'আ কবুল হওয়ার শর্তগুলো কী কী; যাতে দু'আটি আল্লাহর কাছে কবুল হয়, IslamQA - tinyurl.com/2p85phan
[৪০৯] সূরা আদ-দুহা, ৯৩: ৫

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 সবিনয়ে নিবেদন

📄 সবিনয়ে নিবেদন


সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থা যতই দাবি করুক প্রেম-যৌনতা নিছক মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার না। এর সাথে জড়িত পরিবার, সমাজ, জাতি ও সভ্যতার উত্থান পতনের সম্পর্ক। এটুকু নিশ্চয় এরই মাঝে বোঝা গেছে। তাই এই তথাকথিত প্রেম আর ফ্রি সেক্স কালচারকে সমাজ থেকে দূর করার জন্য ভূমিকা রাখতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অংশীদারকে।

'কিন্তু আমি তো অতি ক্ষুদ্র মানুষ, আমি কী করবো? আমার বন্ধু প্রেম করলে, যিনা করলে, আত্মহত্যা করতে চাইলে আমি কী করবো, কীভাবে করবো? আমার ছেলে/ মেয়ে প্রেম করলে কী করবো? আমি শিক্ষক, আমি মসজিদের ইমাম, আমি ছাপোষা মধ্যবিত্ত, আমি এলাকার কিংবা ক্যাম্পাসের বড় ভাই, আমি এলাকার নেতা, আমি কীভাবে সাহায্য করবো?'- এরকম প্রশ্ন অনেকের মনেই। সেই প্রশ্নের উত্তরগুলো দেবার জন্যেই আমাদের এই লেখা।

অভিভাবক ও বন্ধুর দায়িত্ব
ব্রেকআপের পর...
১। ব্রেকআপের পর আপনার সন্তান বেশ কষ্টকর একটা সময় পার করবে। কেউ কেউ এসময় মদ-গাঁজাতে আসক্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই আত্মহত্যা করে। এ সময় তাকে মারধর বা বকাঝকা করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে মোড় নিবে। তাকে কাছে টেনে নিন। ঠাণ্ডা মাথায় কাছে বসিয়ে আমরা এ বইতে যেমন আলোচনা করলাম সেভাবে প্রেমের প্রকৃত বাস্তবতা তাকে বুঝান। আল্লাহ তাকে কী জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, সেটা মনে করিয়ে দিন। তার কথাগুলো শুনুন। সে একদিনে ফিরে আসতে পারবে না। একটু সময় নেবে। পড়াশোনায় একটু ছেদ পড়বে। এ ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নিন।

নিজে সন্তানের সাথে এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে লজ্জাবোধ করলে মামা, চাচা, বড় ভাইবোন, খালা, ফুপি যাদের সাথে সে ক্লোজ তাদের দিয়ে বুঝান। চাইলে মসজিদের ইমাম সাহেব, ভালো একজন আলিম বা দ্বীনদার কোনো মনোবিদের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। মনোবিদ মানেই পাগলের ডাক্তার নয়। এটা নিয়ে লজ্জা পাবেন না। প্রয়োজন মনে করলে আমাদের এই বইটাও তার হাতে তুলে দিতে পারেন। বইয়ে দেওয়া টিপসগুলো সে যেন অনুসরণ করে সেটা নিশ্চিত করুন।

রাতে তাকে একা ঘুমোতে দেবেন না। সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলে একসাথে ফজরের নামায পড়েন। হাঁটতে বের হন। কোথাও ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারেন।

কোনো ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও আদানপ্রদান হয়েছে কি না, কৌশলে জেনে নিন। এগুলোর কারণে যে ব্ল্যাকমেইল, আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে তা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ছবি-ভিডিও আদানপ্রদান হয়ে থাকলে সে পক্ষের সাথে বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছে যাওয়া কাম্য। প্রয়োজন মনে করলে প্রশাসনের সাহায্য নিন। যিনা করে ফেললে এবং গর্ভবতী হয়ে পড়লে কী করবেন, তা জানার জন্য অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আলিমের সাথে পরামর্শ করুন। আগেই অ্যাবরশন করে ফেলবেন না। যা কিছু হয়ে গেছে সবকিছু ভুলে গিয়ে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করতে বলুন। আন্তরিকভাবে তাওবাহ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সম্ভব হলে, পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুমোদন দিলে ভালো পাত্র-পাত্রী দেখে বিয়ে দিয়ে দেবেন। তবে জোর করে মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া যাবে না। [৪১০]

২। ব্রেকআপের পর বা প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে আপনার সন্তান মাদকাসক্ত হতে পারে বা আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের মধ্যে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়-
ক) সোশ্যাল মিডিয়াতে মৃত্যু আর আত্মহত্যা নিয়ে ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা。
খ) আত্মহত্যা বা মৃত্যুবিষয়ক কবিতা, গান লিখতে, শুনতে বা পড়তে থাকা।
গ) নিজের ক্ষতি করা। প্রায়ই এরা নিজের হাত-পা কাটে, ঘুমের ওষুধ খায়।
ঘ) মনমরা হয়ে থাকা, সব কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, নিজেকে দোষী ভাবা—এগুলো বিষণ্ণতার লক্ষণ; যা থেকে আত্মহত্যা ঘটে।
ঙ) মাদকাসক্তি বা ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি।
চ) সারা রাত জেগে থাকা, সারা দিন ঘুমানো। খাওয়াদাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
ছ) নিজেকে গুটিয়ে রাখা।
জ) পড়ালেখা, খেলাধুলা, শখের বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
ঝ) বেঁচে থাকার কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছে না, কেন জন্মগ্রহণ করলাম—এমনটা জানানো।
ঞ) হতাশ, বিষণ্ণ থাকা, এমন সমস্যায় আটকা পড়েছে যা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই-এমন কথা বলা।
ট) নিজেকে অন্যের বোঝা মনে করে-এমনটা জানানো।
ঠ) নিজের মূল্যবান সামগ্রী অন্যদের দিয়ে দেওয়া, সে না থাকলে তার জিনিসপত্র কাকে কাকে দিতে হবে তা বলে দেওয়া।
ড) পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে এমনভাবে বিদায় নেওয়া, যেন এটা শেষ বিদায়।

যা করবেন:
ক) ঘুরেফিরে সেই একই কথা, আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী তা বোঝান। উপরের আলোচনায় যে টিপসগুলো দেওয়া হলো সেগুলো অনুসরণ করুন।
খ) তাকে সরাসরি প্রশ্ন করুন তুমি কি আত্মহত্যার কথা ভাবছো? বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এভাবে সরাসরি প্রশ্ন করলে আত্মহত্যা করার ঝুঁকি কমে আসে।[৪১১]
গ) একাকীত্বে ভুগতে দেবেন না। তাকে সময় দিন।
ঘ) মাদক এবং আত্মহত্যার সম্ভাব্য জিনিসপত্র তার কাছ থেকে সরিয়ে রাখবেন। তার হাতে টাকা না দিয়ে, যা কেনা দরকার কিনে দিন। কার সাথে মিশছে তা খেয়াল রাখুন।
ঙ) অবস্থা গুরুতর মনে হলে মনোবিদের কাছে নিয়ে যান।

বন্ধুর করণীয়: একজন প্রকৃত বন্ধু, তার বন্ধুকে প্রেম, যিনা-ব্যভিচার করতে সাহায্য করে না। বরং তাকে এই ধংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। বন্ধু প্রেম বা যিনা করলে তুমি এই বইয়ে আলোচনা করা বিষয়গুলো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করো। একদিনে হয়তো হবে না। সময় লাগবে। সময় নাও। তোমার মাধ্যমে সে যদি পাপের পথ থেকে ফিরে আসে তাহলে তুমি প্রচুর সওয়াব পাবে।

শত চেষ্টার পরেও সে বুঝতে চাচ্ছে না। যিনা করছে, মাদক, আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে বা ব্রেকআপের ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে-এমন অবস্থায় যা করবে-
১। সময় দেওয়া, মন ভালো করার চেষ্টা করা, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, খেলাধুলার ব্যবস্থা করা, তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা না করা।
২। একজন ভালো আলেম বা দ্বীনদার মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়া।
৩। সিনিয়র কারো সঙ্গে আলোচনা করে দরকার হলে তার বাবা-মা, অভিভাবককে জানানো। এতে করে হয়তো তার সাথে তোমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু হাশরের ময়দানে সে ঠিকই বুঝবে তোমার বন্ধুত্বের মর্যাদা! [৪১২] তার প্রকৃত বন্ধু হিসেবে তোমার এই অস্বস্তিকর কাজটা করতেই হবে।

আপনি যখন জানলেন আপনার সন্তান প্রেম করে...
এই জানার ব্যাপারটা দুইভাবে হতে পারে।
১। আপনি নিজে আবিষ্কার করলেন বা আপনাকে কেউ জানালো।
২। আপনার সন্তান নিজে এসেই বললো।

প্রতিক্রিয়াও হয় দুই ধরনের।
১। ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া-
ক) এই বয়সে এমন এক আধটু করতে পারেই। এসব কিছু না। বয়সের দোষ। পরে ঠিক হয়ে যাবে। আর একদিক থেকে ভালোই হলো, আমাদের আর পাত্র/পাত্রী খুঁজতে হবে না।
খ) মাইর একটাও মাটিতে পড়ে না, স্কুল কলেজ, হাতখরচ দেওয়া সব বন্ধ। অপমান, তিরস্কার। কথা বন্ধ।

২। যা করা উচিত-
ক) প্রেম হারাম কাজ। এটার কারণে আপনার সন্তান কঠিন গুনাহ করছে। এখন প্রেমের সম্পর্কগুলো খুব দ্রুত যিনা-ব্যভিচারে রূপ নেয়। তার এই পাপগুলোর জন্য আল্লাহ আপনাকেও ধরবেন। ব্যক্তি, পরিবার সমাজ ও সভ্যতার উপর এগুলোর ভয়াবহতা আমরা পুরো বই জুড়ে আলোচনা করলাম। কাজেই আপনি এগুলো সিরিয়াসভাবে নিন।
খ) হালকা শাসন করতে পারেন, তবে হুলুস্থুল কিছু না। এই লেখায় দেওয়া টিপসগুলো অনুসরণ করে তাকে প্রেমের ও জীবনের বাস্তবতা বুঝান। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এলাকা বদলে ফেলুন।

বাসা থেকে পালিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকলে...
ধরুন, আপনাদের সন্তানেরা একে অপরকে পছন্দ করে এবং তাদের বিয়ে না দিলে পালিয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। অপর পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড, সামাজিক অবস্থান, বংশ-সব আপনাদের কাছাকাছি। ছেলে/মেয়েও চলনসই-এমন ক্ষেত্রে সন্তান প্রেম করলো কেন কেবল এই জেদ ধরে তাদের বিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত না। আমরা হারাম রিলেশনের বিয়েতে উৎসাহ দেই না (আগের লেখাগুলোতে এ নিয়ে আলোচনা এসেছে), কিন্তু তারপরও আমাদের সাজেশন থাকবে-এরকম পরিস্থিতিতে এদের বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। না হলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বাসা থেকে পালিয়ে নিজেদের এবং আপনাদের সবার জীবনই নষ্ট করে ফেলতে পারে তারা। তবে সিদ্ধান্ত নেবার আগে ভালো একজন আলেমের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে ভুলবেন না।

আপনার সন্তান বাসা থেকে পালিয়ে গেলে....
এটা বেশ ভয়ংকর পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে আসলে মাথা ঠিক রাখা বেশ কঠিন।ওর সাথে পালালাম লেখায় আমরা যেমন আলোচনা করলাম বাসা থেকে পালিয়ে গেলে ছেলে মেয়ে দুজনেরই ভয়ঙ্কর রকমের বিপদ হয় আজকাল। তাই অভিমান করে না থেকে দ্রুত তাদের খুঁজে বের করুন। ফিরিয়ে আনুন বা খোঁজখবর রাখুন। সে অবুঝের মতো পালিয়ে গেলেও দিনশেষে সে আপনারই সন্তান। আপনারই শরীরের অংশ। তার কিছু হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন আপনিই। সম্পর্ক মেনে নেবেন কি নেবেন না, সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু আগে ফিরিয়ে আনুন। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহযোগিতা নিন।

দেখুন, এই যে এতো সমস্যা, প্রেম, ব্রেকআপ, হতাশা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, যিনা-ব্যভিচার, ছবি ভাইরাল, মানসম্মান নষ্ট, আদরের সন্তান, ছোট ভাইবোন, ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাতিজা-ভাতিজির এই করুণ পরিণতি... এগুলো আমার আপনার হাতের কামাই। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে, পশ্চিমা বিশ্বের কথা শুনে শুনে ব্রেইনওয়াশড হয়ে গিয়েছি। হারামকে, গুনাহকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছি। প্রেমকে সহজ করেছি, বিয়েকে কঠিন করেছি। বিয়ে করতে চাওয়াকে মহা অপরাধ বানিয়েছি। অশ্লীলতার ফেরিওয়ালাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করিনি, বাচ্চাদেরকে জীবনের উদ্দেশ্য শিখিয়েছি ডিগ্রি কামানো, সরকারি চাকরি কিংবা বিদেশে সেটেল হওয়াকে, লেখাপড়া করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়াকে। ওদেরকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিইনি, উল্টো দাড়ি রাখলে, ইসলামী বইপত্র পড়লে, ইসলাম পালন করলে, মাহরাম মেনে চলতে চাইলে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ফলাফল আমাদের চোখের সামনেই। প্রতিকার করার চাইতে প্রতিরোধ করা উত্তম। চলুন দেখা যাক প্রেম, যিনা, যৌন বিকৃতির এই মহামারি ঠেকাতে আমরা কি কি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারি।

পারিবারিক পর্যায়ে আমার সন্তান কখনোই প্রেম-যিনা ব্যভিচার করতে পারে না-এই মিথ্যা আত্মবিশ্বাস রাখবেন না। বইয়ের শুরুতেই আমরা পরিসংখ্যান এনে দেখিয়েছি প্রেম-যিনার কী মহামারি অবস্থা। আপনার সন্তান হয়তো এগুলো করবে না, কিন্তু সে করবে এটা ধরেই কর্মপন্থা ঠিক করুন-

১। ছোট থেকেই তাকে ইসলামী অনুশাসনে বড় করে তুলুন। তার অন্তরে ঈমানের পরিচর্যা করুন। ইসলাম পালনের পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধের শিক্ষা দিন। সাহাবীদের সাথে, সালাহউদ্দীন আইউবী, মুহাম্মাদ বিন কাসিম, তারিক বিন যিয়াদ, তিতুমীর, শরীয়াতুল্লাহদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যে আল্লাহর সন্তুষ্টি, সেটা বুঝান। দাড়ি, টুপি, পর্দা করার পরিবেশ তৈরি করে দিন। যদি এ ব্যাপারে নিজের মধ্যে ত্রুটি থাকে, তাহলে সেটাও সংশোধন করে নিন। মানুষ দেখে দেখেই শেখে। শুধু জন্ম দিলেই প্রকৃত অর্থে বাবা-মা হওয়া যায় না। আপনি যদি সন্তানের হাতে ঈমানের কম্পাস ধরিয়ে না দেন, তাহলে এই সমাজ ও সভ্যতা তাকে অবক্ষয় ও অধঃপতনের দিকে নিশ্চিতভাবেই নিয়ে যাবে।

২। প্রেমের প্রকৃত বাস্তবতা বুঝান। বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে নেবে এই আশায় ফেলে রাখবেন না। বন্ধুদের কাছ থেকে কী জানবে, আশা করি বুঝতে পারছেন। একদিন কোথাও ঘুরতে নিয়ে যান। গিয়ে সুন্দর করে তাকে এগুলোর বাস্তবতা বুঝান।

৩। তাঁর বন্ধু হবেন না। কিন্তু বন্ধুর মতো মিশুন। তাকে সময় দিন। সে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সাথে মিশছে, আসলেই এক্সট্রা ক্লাস বা প্রাইভেট আছে কি না, এগুলোর ব্যাপারে খোঁজখবর রাখুন। বিশেষ করে সে যদি পরিবার থেকে দূরে, অন্য কোনো শহরে থাকে। অনেকেই বাসায় এমনভাবে থাকে যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না, কিন্তু শহরে এসে আকাশে বাতাসে সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়ায়। শিক্ষকদের সাথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখুন। মিথ্যা বললে কড়া মারধর করবেন নাস, স্নেহের অভিমান করুন। দেখবেন কাজ হবে।

মাঝে মাঝে হালকা শাসন করতে পারেন। তবে এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করবেন না, যাতে সে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। সবসময় সব ব্যাপারে খবরদারি না করে তাকে কিছুটা স্বাধীনতা দিন। তবে স্বাধীনতার সাথে যে দায়িত্ব জড়িত-এই বিষয়টিও ভালোভাবে বুঝান। সে প্রেম-যিনা করলে আপনি কতোটা কষ্ট পাবেন তা বুঝান। দেখবেন সে প্রতিকূল পরিবেশেও যিনা-ব্যভিচার থেকে দূরে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৪। ভার্সিটিতে যাবার আগ পর্যন্ত তার হাতে স্মার্টফোন তুলে দেবেন না। একান্ত দরকার হলে প্রয়োজনের জন্য শুধু ফোন করা যায় এমন বাটন ফোন কিনে দিন। না হলে সে প্রেম করবে, পর্ন দেখবে, গেইম খেলবে, টিকটকে অশ্লীল, সহিংসতামূলক কিংবা বিকৃত কন্টেন্ট বানাবে।[৪১৩] সে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে আপনি তার সাথে যুক্ত থাকুন। সে একাধিক আইডি, ফেইক আইডি ব্যবহার করতে পারে। এ ব্যাপারে একটু নজর রাখুন। স্মার্টফোন যদি দিতেই হয় অশ্লীল সাইট বন্ধের ফিল্টার ব্যবহার করুন।[৪১৪] ফোন দেবার পরিবর্তে কম্পিউটার কিনে দিতে পারেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ফটো এডিটিং, ভিডিও এডিটিং ইত্যাদি তার ক্যারিয়ারের জন্য খুবই উপকারী। এগুলো শিখলে সে অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হতে পারবে। নির্জনে, একা রুমে নয়, বরং সকলের চোখে পড়ে এমন জায়গায় কম্পিউটার চালানোর ব্যবস্থা করুন।

৫। আইটেম সং, মিউযিক, সিনেমা থেকে তাকে দূরে রাখুন। আপনার সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এগুলোই তাকে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। এগুলো থেকে শুধু তাকে দূরে রাখলে হবে না, আপনার নিজেরও দূরে থাকতে হবে।

৬। ফ্রি-মিক্সিং এর পরিবেশ দেবেন না। হোক সে কাযিন বা অন্য কোনো আত্মীয়। ইসলাম যা বলেছে তা করবেন-আলাদা আলাদা রাখবেন। বয়েস অনলি, গার্লস অনলি প্রতিষ্ঠানে পড়াবেন।

৭। বিয়ে দিয়ে দিন। এখন দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে কালেমা পড়িয়ে বিয়ে করিয়ে রাখলেন। আকদ হয়ে গেল, অনুষ্ঠান পরে করলেন। ছেলে ছেলের বাসায় থাকলো, মেয়ে মেয়ের বাসায় থেকে পড়াশোনা করলো। মাঝে মাঝে বা ছুটির দিনগুলোতে এ ওর বাড়িতে বেড়াতে গেল।

এই পয়েন্ট পড়ার পর আমাদের ইমম্যাচিউর ভাবছেন বোধহয়। এতো ছোট ছেলে মেয়ে কীভাবে বিয়ে করবে? এরা তো নিজেরাই দায়িত্ব নিতে পারে না। বিয়ে করে খাওয়াবে কী? দেখুন, বিয়ে না দেওয়া হলে সে পাপ করবেই করবে। আমরা জাস্ট আপনাকে এবং আপনার সন্তানকে পাপ করা থেকে বাঁচাতে চাচ্ছি।

তাছাড়া আপনার ছেলেমেয়ে যে ম্যাচিউর হতে পারে না এর বেশিরভাগ দোষ আপনার। আপনিই তাকে ননীর পুতুল করে বড় করেছেন। যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছেন। তার জীবনে পড়াশোনা আর মোবাইল ছাড়া কিছুই রাখেননি। সে ম্যাচিউর হবে কীভাবে? সন্তানকে খেলাধুলার সুযোগ দিন, বাজার করতে দিন, সংসারের ছোটখাটো কাজ করতে দিন। ছোট থেকেই, টাকাপয়সা কীভাবে আসে, কীভাবে খরচ করতে হয় অর্থাৎ আর্থিক সাক্ষরতা শেখান। প্রকৃত পুরুষ ও নারীর বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে সাহায্য করুন। কলেজ লেভেল থেকেই টিউশনি, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদির মাধ্যমে টুকটাক উপার্জন করতে সাহায্য করুন। দেখবেন সে কেমন দায়িত্ববান হয়ে যায়। একবার দায়িত্ববান হলে দেখবেন মেয়ের বাবা আপনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছে না。

গবেষণা বলে, বিয়ের পর সাধারণত মানুষ দায়িত্ববান হয়, গোছানো হয়, জীবনের প্রতি মনোযোগী হয়, উপার্জন বাড়ে। আল্লাহ তা'আলা আগেই আমাদের এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে দিয়ে দিন। দেখবেন সে আজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। [৪১৫]

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ যুগে ক্যারিয়ারের বাস্তবতা বুঝুন। এখন শুধু বইয়ের পড়াশোনা, ডিগ্রি দিয়ে চাকরি হয় না। সামনে আরো হবে না। তাকে দায়িত্ববান করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে, পড়ার পাশাপাশি টুকটাক কাজ করতে শিখলে তার ক্যারিয়ারের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে ঘন। বরং চাকরি পাবার জন্য খুব জরুরি কিছু জিনিস যেমন, যোগাযোগের দক্ষতা, মানুষজনের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা তার মধ্যে তৈরি হবে।

সামাজিক দায়িত্ব:
১। প্রেম-যিনার বাস্তবতা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা। জুমু'আর খুতবাহতে আলোচনা করা। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করা। সভা, সেমিনার, ক্যাম্পেইন ইত্যাদি করা। রাস্তাঘাটে, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, শপিংমল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকা দেখলে কল্যাণকামী হয়ে (পাওয়ার না দেখিয়ে) আন্তরিকভাবে, দরকার হলে মাথায় হাত বুলিয়ে তাদেরকে নাসীহাহ করা। প্রয়োজনে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের জানানো।

২। বিয়ের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা। বিয়েকে সহজ করা। বেশি বয়সে বিয়ে, ব্যাপক খরচাপাতির নেতিবাচক প্রবণতাগুলো থেকে সরে আসা। ইসলামে সাবালক হলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া যায়। সাবালক হবার লক্ষণ হলো- ক) ছেলেদের স্বপ্নদোষ হওয়া, খ) মাসিক হওয়া, গ) প্রাইভেট এরিয়ায় চুল গজানো, ঘ) চন্দ্র বছর অনুসারে ১৫ বছর বয়স হওয়া। [৪১৬]

৩। যারা অশ্লীলতা ছড়ায় তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা। তাদের সাথে লেনদেন না করা। যেসব জায়গায় যিনা-ব্যভিচারের আসর বসে সেগুলোর ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। তবে রাগের বশে জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর করা যাবে না।

৪। ছবি-ভিডিও ভাইরাল হওয়া, আত্মহত্যা কিংবা বাসা থেকে পালানোর ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।

৫। তরুণদের দূরে ঠেলে না দিয়ে কাছে টেনে নেওয়া। খেলাধুলা, একসাথে খাওয়া দাওয়া করা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মসজিদকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা (যেমন, টানা ৪০ দিন জামা'আতে সালাত আদায়ের জন্য পুরস্কার দেওয়া), সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।

গাছ যদি পানির অভাবে মরে যেতে শুরু করে তাহলে গাছের কাণ্ডে, পাতায় পানি ঢেলে খুব একটা সুবিধা করা যায় না। পানি ঢালতে হয় গাছের গোড়ায় শিকড়ে। আমাদের সকল সমস্যার সমাধানের জন্য ফিরে যেতে হবে আমাদের শিকড়-ইসলামে।

ইসলামের মধ্যেই রয়েছে সকল সমস্যার সমাধান। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ইসলামী অনুশাসন মেনে চললে সকল সমস্যার সমাধান অটোম্যাটিক হয়ে যাবে। যার প্রমাণ আমরা পাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলের ইতিহাস থেকে। চলুন, মূলে ফিরে যাই।

টিকাঃ
[৪১০] Parents forcing their daughter into a marriage, IslamQA - tinyurl.com/2m454x7j
[৪১১] Suicide Prevention, National Institute of Mental Health, August 2022-tinyurl. com/2s46bd5z
[৪১২] অধিকাংশ সময় প্রেমের মোহ কেটে গেলেই সে বুঝতে পারবে। হাশরের ময়দান পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগবে না。
[৪১৩] বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন- ইলমহাউস পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইটি।
[৪১৪] ফিল্টার সম্পর্কে জানতে পড়ুন- বিষে বিষক্ষয়, Lostmodesty.com- tinyurl. com/2cmr9w8p
[৪১৫] 'তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন তাদের বিবাহ দাও এবং তোমাদের সৎকর্মশীল দাস-দাসীদেরও, তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন, আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।' [সূরা আন-নূর, ২৪: ৩২]
Married men earn more than everyone else (including married women and single men), Nov. 19, 2019- tinyurl.com/36nux
Marriage Tied to Longer Life Span, New Data Shows, webmd.com,Oct. 10, 2019 - tinyurl.com/5n6z7np9
[৪১৬] আল ইনায়া শারহুল হেদায়া ৮/২০১; আদ্দুররুল মুখতার ৬/১৫৩; তাফসিরে কুরতুবি ১২/১৫১ বিস্তারিত- ছেলে-মেয়ে বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) কখন হয়? শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী হাফিযাহুল্লাহ, quranerjyoti.com, ১ জুলাই, ২০১৭- tinyurl.com/yc47mc9m

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 অনুপম উত্থান

📄 অনুপম উত্থান


হলিউডের সিনেমার মতোই আমরা কোনো এক সুপারহিরোর জন্য অপেক্ষা করি। ভাবি, কোনো একদিন ব্যাটম্যান, সুপারম্যানের মতো কেউ আসবে আর তারপর সব বদলে যাবে। আবার আলো ফিরে আসবে মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। এখন যেভাবে চলছে চলুক, অবেলায় নিভে যাক অযুত কোটি তরুণ-তরুণী, আত্মহত্যা করুক বেকার বোকা যুবকের দল, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাক পরিযায়ী পাখি আর প্রজাপতিরা, তাতে আমার কী? আমি তো কিছুই বদলাতে পারবো না! এগুলোর জন্য তো আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করবেন না!

আসলেই কী তাই? নাকি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালে আমার শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট জীবনটা হয়তো একটু ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হবে, বাপের হোটেলে খাওয়া জীবনটা, মাসে একবার ট্যুর দেওয়ার জীবনটা, সেলফিবাজি, আড্ডাবাজি, রেস্টুরেন্ট আর সিনেপ্লেক্সের জীবনটা, বাইক-সিনেমা-ওয়েবসিরিযের জীবনটা, প্রেমিকার চোখে চোখ রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না, দায়িত্ব নিতে হবে, কাজ করতে হবে, আরামের জীবন ছেড়ে বের হয়ে আসতে হবে-এই ভেবে আমরা এই মিথ্যে কথাগুলো বলি নিজের সাথে?

আমাদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। এখন বয়স আমাদের দায়িত্ব নেবারই। এই তারুণ্যে, যদি জীবনের এই বসন্তে শুধু নারী আর প্রেম দিয়েই জীবনকে সাজাই তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম নিশ্চিতভাবে আমাদের চিহ্নিত করবে ভীরু কাপুরুষ হিসেবে। ওরা আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। ক্ষমা করা উচিতও না।

স্রোতের সাথে আর কত অন্ধ চলা? চলো নিজেকে বদলাই, সমাজকে বদলে দেই। দূর থেকে মনে হয় স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো অসম্ভব। যে একবার দাঁড়ায় কেবল সেই বুঝতে পারে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে তবে অসম্ভব কিছুই না। একবার আল্লাহর উপর ভরসা করে দাঁড়াতে পারলে আর কোনো চিন্তা থাকে না। এই পথের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আল্লাহর রহমত, সাহায্য, ভালোবাসা। আর অবশ্যই চিরসুখের এক জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। আলহামদুলিল্লাহ!

হতাশা আর অন্ধকারের এই ব-দ্বীপে আলোর মশাল হাতে ছুটে চলছেন কিছু সিংহহৃদয় ভাইয়েরা। পর্নোগ্রাফি, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক, মোবাইল আসক্তি, হতাশা, আত্মহত্যা, বিয়েকে কঠিন করে ফেলা, যিনা-ব্যভিচার-অশ্লীলতার বিরুদ্ধে নিজেদের উদ্যোগে সচেতনতামূলক নানা কাজকর্ম করে যাচ্ছেন একের পর এক। লিফলেট বিতরণ করছেন। সেমিনার করছেন। প্রজন্মকে, সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। এই জেনারেশনের দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রামের বাস্তবতাগুলো বোঝানোর চেষ্টা করছেন সমাজকে, অভিভাবকদের, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, ইমাম, আলেম ও শিক্ষকদের। আসক্তি, হতাশা, বিকৃতি আর আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ানো প্রজন্মের কাঁধে আপনজন হয়ে হাত রাখার চেষ্টা করছেন। এসো না, তুমিও চলে এসো তাদের দলে!

ক্যাম্পেইন আয়োজনের সকল মালমশলা পাবে এখানে- https://tinyurl.com/onupomutthan

সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা কিংবা কাউকে বোঝানো, সব ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। শুধু দুনিয়ার লাভক্ষতির হিসেব-নিকেশ করে মানুষ সত্যিকারার্থে আলোর পথে ফিরে আসতে পারে না। সাময়িকভাবে ফিরে আসলেও, একসময় সে কোনো না কোনো ভাবে আবার বস্তুবাদ আর ভোগবাদের চক্রে আটকেই যায়। যেকোনো অন্ধকার থেকে ফিরে আসার মূল লক্ষ্য হতে হয় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। তাহলেই পরিবর্তন হয় স্থায়ী।

প্রেম ও যিনার ক্ষতিকর দিক এবং এ থেকে বের হয়ে আসার উপায় নিয়ে কথা বলার সময় পুরো আলোচনাকে সাজাতে হবে ঈমান, তাওহীদ এবং মহান আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে। পরিবর্তনের ভিত্তি হতে হবে ইসলাম। যে বিকৃত আধুনিক লেন্সের ভেতরে দিয়ে মানুষ বাস্তবতাকে দেখছে, দেখতে শিখেছে-সেটা পাল্টে দিয়ে ইসলামের লেন্স দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে শেখাতে হবে তাদের। তাই আলোচনার সময়, ক্যাম্পেইন করার সময় আততায়ী ভালোবাসা, চশমা এবং শুভ্রতার ব্যাকরণ-এই তিন অংশের মূল পয়েন্টগুলো পরিস্কার করে তুলে ধরতে পারলে সেটা খুব ফলদায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

***

বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সমাজ আর বিশ্বব্যবস্থাকে তো অনেক তো গালমন্দ করলে। ফেইসবুকে অনেক ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটালে। কতোটুকু লাভ হলো? তেমন কোনো পরিবর্তন কি আসলো এই সমাজে? নাকি জাস্টফ্রেন্ড, অনলি ফ্রেন্ড, কাছে আসার গল্প, প্রেম, লিটনের ফ্ল্যাট, লঞ্চের কেবিন, গ্রুপ ট্যুর, বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, ছবি, ভিডিও ভাইরাল, ছ্যাঁকা, মদ-বাবা-গাঁজা, হতাশা, টিকটক বিড়ম্বনা, মোবাইল আসক্তি... অসুখের তালিকা কেবল লম্বাই হতে থাকলো? দিন দিন বাড়লো আগ্রাসী শূন্যতায় গ্রাস হয়ে যাওয়া মানবাত্মার সংখ্যা?

আমাদের সাথে যা হবার হয়ে গেছে, কিন্তু হৃদয়ঘটিত অসুখ আর মৃত্যুর এই উপনিবেশে আর যেন কোনো ছোট ভাই, কোনো ছোট বোনের জীবন নষ্ট না হয়, যেন আর কোনো মায়ের বুক বিধ্বস্ত না হয়-চলো এবার সেই চেষ্টা করবে। অনেক তো জীবন নষ্ট করলে, চলো এবার জীবন বদলানোর চেষ্টা করবে।

চলো, আবার আমরা উঠে দাঁড়াই। অস্বস্তিকর নীরবতার প্রাচীরে আঘাত হানি ভালোবাসা আর কল্যাণকামিতা দিয়ে। সমাজকে পথ দেখাই তাওহীদের মশাল জ্বেলে। কলুষিত এই সমাজটাকে শেখাই শুভ্রতার ব্যাকরণ।

চলো আমরা আবার উঠে দাঁড়াই। রচনা করি অনুপম উত্থানের এক মৌলিক কাহিনী। বিচারের দিন মহান রবের মুখোমুখি হবার সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে অন্তত এটুকু যেন বলার সুযোগ থাকে তোমার-আমার।

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 'দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম'

📄 'দুশো তিপ্পান্নতম প্রেম'


এক.
সবাই ফেরে না। ফিরতে যে হবে এই বোধটাই কাজ করে না অনেকের মনে। কেউ কেউ ফেরে। প্রত্যাবর্তনের পথে কিছু কিছু ব্যয়বহুল অতীত তো থেকেই যায়। সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে সযত্নে লুকিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাস, এক পৃথিবী হাহাকার, অশ্রু, ঘাম, রক্ত, বুকের ভেতরের প্রতিনিয়ত লাল নীল ক্ষরণ। প্রিয়তমার গভীর কালো চোখ, কালো চোখে মুক্তোর মতো জল, টুকরো টুকরো স্মৃতি, প্রিয় কিছু গান, কিছু কবিতা প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সব হারানোর ভয়, সমাজ, সংস্কৃতি অদৃশ্য এক শেকলে আটকে রাখে, ফিরতে দেয় না।

তারপরও কেউ কেউ ফিরে আসে জীবনে, ফিরে আসে মিল্লাতু ইবরাহীমে। জাহেলিয়াতকে লাথি মেরে, মিথ্যে উপাস্যদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, মূর্তবিমূর্ত মূর্তিগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে, সমাজ-সংস্কৃতির কারাগারের দেওয়াল ধসিয়ে দেয় ধূলোয়। সব হারানোর ভয় হারিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করে, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...' প্রত্যাবর্তনের পথে ফেরার ইচ্ছেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছে থাকলে আল্লাহ ফেরার পথে অবশ্যই পরিচালিত করবেন। এটাই আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাহ। দিন চলে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যায়, এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির পতন হয়, নদী তার গতিপথ বদলে ফেলে, কিন্তু আল্লাহর এই সুন্নাহর কোন পরিবর্তন হয় না। আসহাবুল কাহফের যুবক থেকে শুরু করে সালমান আল ফারিসি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত... কখনো হয়নি।

আমরা আজ এক যুবকের গল্প শুনবো।[৪১৭] জীবনের সবক'টি অন্ধকার গলিতে বিচরণ করে যে প্রত্যক্ষ করেছে সকালের সোনালী সূর্যোদয়। অন্ধকারে মাথা কুটে মরেছে বহুকাল, তাই তীব্রভাবে বুঝেছে আলোর মূল্য, আলোর দেখা পাওয়া মাত্রই গ্রহণ করে নিয়েছে দ্বিধাহীন চিত্তে।
জীবনের বিশাল ক্যানভাসে সুনিপুণভাবে এঁকেছে প্রত্যাবর্তনের গল্প...

...প্রথম কখন কোন মুহূর্তে আমি তোমাকে দেখেছিলাম ঠিক মনে নেই। বুকের হার্টবিট মিস হয়নি, বুকের বাম পাশটা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যেতেও চায়নি। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছেদ পড়লে কান গরম হয়ে যায়। বালিকা বিশ্বাস করো, সেই মুহূর্তে আমার কিছুই হয়নি। হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যে করেই হোক তোমাকে পেতেই হবে, যে করেই হোক! ষোলোতে পা দেওয়া আমি হঠাৎ করেই সেদিন যেন অনেক বড় হয়ে গেলাম। বুঝে ফেললাম এক নিমিষে, ক্যারিয়ারে মনোযোগী না হলে নিম্নমধ্যবিত্ত এই আমার তোমাকে পাওয়া হবে না কখনোই।

পড়াশোনায় সিরিয়াস হলাম। রাত জেগে জেগে পড়তাম। যখন ঘুমে দুচোখ ভারী হয়ে আসতো, তখন তোমার কথা ভাবতাম। ঘুম পালিয়ে যেতো। অদ্ভূত এক শক্তি অনুভব করতাম। ভাগ্যের সন্ধানে নড়বড়ে পালতোলা জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়া যুবকদের স্বপ্নের মতো শক্তি পেতাম। হাতমুঠো করে প্রতিজ্ঞা নবায়ন করতাম। তোমাকে পেতেই হবে!

এক বছরের জুনিয়র তুমি, জানলেও না আমার রেসাল্ট এরপর থেকে কত ভালো হতে শুরু করলো। অঙ্কের মোস্তাফিজ স্যারের হাতে বরাবরই অপমানিত হতাম, সেই মোস্তাফিজ স্যার পর্যন্ত আমাকে ক্লাসের সবার সামনে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিলেন! বিতর্কের ডায়াসে দাঁড়িয়ে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে একের পর এক আক্রমণ শানাতাম, করতালিতে ফেটে পড়তো হলরুম। এককোণায় চুপটি করে বসে থাকতে তুমি; স্নিগ্ধ, সৌম্য মূর্তি হয়ে, আমি আরো প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম প্রতিপক্ষের উপর!

টিফিনের ব্রেকে তুমি ফুচকা খেতে যেতে স্কুল গেটে। দূর থেকে তোমাকে দেখতাম আর মুগ্ধ হতাম ক্ষণে ক্ষণে। একটা মেয়ে গোগ্রাসে ফুচকা গিলছে একের পর এক, এই অদ্ভূত দৃশ্যও আমার কাছে অপূর্ব মনে হতো। প্রেমে পড়লে সত্যিই মানুষের মস্তিষ্ক ওলটপালট আচরণ করে।

প্রথম কখন আমাদের কথা হয়েছিল, মনে আছে তোমার?

ফিযিক্সের প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলে তুমি হারুন স্যারের বাসায়। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। বাসায় ফেরার মাঝপথে আটকা পড়লে আমাদের পাশের গলিতে, নাবিলদের বাসার নিচে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে, কাদামাখা ভূত হয়ে বাসায় ফিরছিলাম। ভর সন্ধ্যায় তোমাকে ঐখানে দেখে চমকে গেলাম। তুমি আমার দিকে একপলক চাইলে। ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় ছেয়ে গিয়েছে তোমার মুখ। যা বোঝার বুঝে গেলাম। এক দৌড়ে বাসায় গিয়ে ছাতা নিয়ে আসলাম। একটা রিকশা ডেকে দিলাম। একেবারে সিনেমার নায়কদের মতো।

পুরোটা সময় তুমি মুখ গোমড়া করে ছিলে, হাই পাওয়ারের চশমা পরা হাইস্কুলের হেড মাস্টারনীর মতো। ভাগ্যিস, তখন ফেইসবুক, মোবাইলের এতো সহজলভ্যতা ছিল না, তাহলে তুমি খুব সহজেই বাসায় যোগাযোগ করতে আর আমারও কপালে জুটতো না হিরোগিরি করা। রিকশায় ওঠার আগে হাফপ্যান্ট, ম্যাগি টিশার্ট পড়া আপাদমস্তক কাদামাখা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে। আস্তে করে বলেছিলে, থ্যাংকস। বুকে কাঁপন উঠেছিল আমার!

এরপর মাঝেমাঝেই তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে। কখনো টিফিনের ব্রেকে ম্যাথ বুঝতে আসতে, কখনো বা ফিজিক্স। আমি খুব নার্ভাস হয়ে যেতাম। তুমি কঠিন মুখে পড়া বুঝতে নাকি বোঝার ভান করতে, আর মনে মনে আমার দুরবস্থা দেখে হাসতে?

একবার পরীক্ষাতে তোমার সিট পড়লো একদম আমার পাশে। আমি পরীক্ষা আর কী দিবো! এতো নার্ভাস হয়ে গেলাম, হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে ধুক ধুক করছিল ভয় হচ্ছিল সবাই না জানি শুনে ফেলে!

আমি স্কুল শেষ করে বের হয়ে আসলাম। তুমি এক বছরের জুনিয়র, স্কুলেই থেকে গেলে। আমি চলে গেলাম অন্য শহরে। কলেজের ক্লাস টেস্ট, ল্যাবের ভয়াবহ অত্যাচার, নতুন পরিবেশ, তার উপর তোমার সাথে আর যোগাযোগ হয় না। আমার তখন কী যে ভাঙচুর অবস্থা! ছুটিতে বাড়ি এসে তোমার বাসার সামনের গলিতে হেঁটে বেড়াতাম, যদি একটিবার তোমার দেখা পাওয়া যায়, যদি একটিবার তুমি ব্যালকনিতে আসো। কী যে কষ্টের ছিল সেই দিনগুলো! ফেইসবুকে একাউন্ট খুলেছিলাম। তোমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছিলাম। অনেক বন্ধুবান্ধবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পাইনি। দুই বছর এভাবে চলে গেল। তোমার দেখা পেলাম না। তুমিও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করলে না। ভীষণ দুঃসময় চলছিল আমার তখন।

ভার্সিটিতে ওঠার পর ভাবলাম এবার তোমাকে বোধহয় মনের কথা বলা যায়। কত কাহিনী করে তোমার ফোন নম্বর ম্যানেজ করলাম! উইকএন্ড ছিল। পুরো হল ফাঁকা। সারাদিন মনের সাথে যুদ্ধ করলাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। আগুনঝরা চৈত্রের শেষ প্রহরে দুরু দুরু বুকে তোমাকে ফোন দিলাম। আড়াই বছর পরে তোমার কথা শুনলাম। নার্ভাস হয়ে সব ভজঘট পাকিয়ে ফেললাম। কথা জড়িয়ে আসছিল। একটু পর ধাতস্থ হয়ে কতো কথা বলে গিয়েছিলাম কিন্তু সেই কথাটি আর বলা হলো না। তুমি ঠিকই ধরে ফেলেছিলে। হেসেছিলে প্রাণভরে। কপট রাগের স্বরে বলেছিলে- সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা।'

আমি আর তোমাকে ফোন দেইনি। এর মাঝে একদিন তুমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি দিনে অন্তত দশবার তোমার ওয়ালে ঘুরে বেড়াতাম আর বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। নক করার সাহসও হয়নি। কেন যে এতো ভীরু হয়ে যেতাম তোমার কাছে! প্রেমের মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছিল সেই প্রথম দেখা থেকেই। যদিও বা তখন তা ছিল একপাক্ষিক হাওয়া। হৃদয় আকাশে যে অল্প অল্প করে ভালোবাসার মেঘ জমছিল সেটা তুমিও বুঝতে, আমিও বুঝতাম। শুধু বৃষ্টিটাই কেন জানি নামছিল না!

এইচএসসির পর আমার শহরে চলে আসলে মেডিকেলে চান্স পেয়ে। উঠলে তোমার ভাইয়ের বাসায়। ভাইয়াকে বলে দিয়েছিলে এডমিশনের সব কাজ একাই পারবে। ফোন করে ডেকে নিলে আমাকে।

তারপর এডমিশনের কাজে এ বিল্ডিং, ও বিল্ডিং-এ ছোটাছুটি, রাস্তা পার হতে গিয়ে ভয় পেয়ে তোমার আমার বামবাহু আঁকড়ে ধরা, রিকশায় ঘুরাঘুরি... কখন যে বিস্ময়কর রুদ্ধশ্বাস ভালোবাসার মেঘ গলে গেল, কখন অঝোরে বৃষ্টি নামলো, কখন 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে নেমে আসলাম আমরা দুজন, টের পাইনি একদম!

এরপরের কাহিনীটা পুরোনোই। পৃথিবীর বুকে এ কাহিনী অনেকবার অভিনীত হয়েছে। অবিমিশ্র ভালোবাসায় মাতাল হয়ে গেলাম আমরা দুজন। নিঃসঙ্গতায়, নির্জনতায় কেটেছে আমার সারাবেলা, কতো ভয়ঙ্কর দিন গেছে, কতো গভীর গোপন কথা লুকোনো আছে আমার হৃদয়ে... এখন আমার খুব কাছে সমস্ত উষ্ণতা, নিশ্চয়তা আর স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অবিশ্বাস্য সুন্দরী একটা মেয়ে! এ যেন এক রূপকথা! এক স্বপ্নের ভালোবাসা!

দুই.
রং বদলে ধূসর হয়ে গেল জীবন কয়েক মাসের মাথাতেই। আসলে প্রেমে পড়ার সময় থেকে প্রেম হয়ে যাবার পরের কিছুটা সময় স্বপ্নের মতো কাটে। তারপর স্বপ্নভঙ্গ হয়। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ!

তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে আমাদের ঝগড়া হতো... এইটা কেন করলাম, কেন ওইটা করলাম না, কেন ওর সঙ্গে কথা বললাম, কেন ফোন রিসিভ করলাম না, কেন মেসেজের রিপ্লাই দিলাম না। প্রত্যেক ঝগড়া শেষে আমাকেই সরি বলতে হতো। মালির চোখ এড়িয়ে হলের বাগান থেকে গোলাপ চুরি করে, মনের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে (বেশিরভাগ সমইয় জীবনানন্দ বা সুনীলের কবিতা কপি পেস্ট করতাম। তুমি বইটই পড়তে না। ধরতেই পারতে না আমার কারচুপি!) বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে তোমার মান-অভিমানের বরফ গলাতে হতো।

আমাকে কতো সন্দেহ করতে তুমি! কিছুক্ষণ পর পর ফোন করতে। ফোন একটু বিযি দেখলেই চিল্লাচিল্লি! মায়ের সঙ্গেও যে আমি ফোনে কথা বলতে পারি, এটা বুঝতে চাইতে না। ঝগড়া করতে। অথচ অন্য ছেলেদের সাথে তুমি খুব হেসে হেসে কথা বলতে, রিকশায় এখানে সেখানে যেতে। আমার গা জ্বলে যেতো ঈর্ষায়! তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে, হেসে উড়িয়ে দিতে। বলতে, ওরা তো আমার ক্লাসমেট বা জাস্ট ফ্রেন্ড! একবার এক ব্যাচেলর স্যারের স্কেচ এঁকে ফেইসবুকে আপলোড দিলে তুমি। এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই ক্ষেপে বোম হয়ে গেলে, আমার সাথে কথা বললে না ঝাড়া দু'সপ্তাহ!

একে তো ছিলে ডানাকাটা পরীর মতো রূপবতী, তার উপর খুব মিশুক। সহজেই ক্যাম্পাসে পপুলার হয়ে গেলে। ডিএসএলআর-ওয়ালা অনেক জাস্টফ্রেন্ড ছিল তোমার। তাদের দিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। আমার পছন্দ হতো না। নিষেধ করলে শুনতে না। ঘষামাজা করে প্রায় প্রত্যেকদিন ফেইসবুকে ছবি আপলোড করতে, ছেলেরা সমানে লাভ রিয়‍্যাক্ট দিতো, কমেন্টে তোমার রূপের প্রশংসা করতো। তুমি খুব খুশি হতে। আর এদিকে আমি ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।

অনেকবার তোমাকে বুঝিয়েছিলাম, ফেইসবুকে এভাবে ছবি দিও না। যে ছেলেগুলো তোমার রূপের প্রশংসা করছে, সেই ছেলেগুলোর অনেকেই তোমাকে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে, রসালো আলোচনা করে বন্ধুদের সাথে।

তুমি আমার কথা শুনে রেগে ফায়ার হয়ে যেতে। আমি খুব পসেসিভ, তুমি তোমার ব্যক্তিস্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছো, স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছো না, আমার মানসিকতা খুব নোংরা, আমার পাশে তুমি ইনসিকিউরড ফিল করো, গা ঘিন ঘিন করে- কত কিছু শুনিয়েছিলে তুমি।

রাত জেগে ফোনে কথা বলার কারণে সকালের ক্লাসগুলো মিস হতো। পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না। পড়ার টেবিলে বসলে শুধু 'তুমিই' মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে। তাছাড়া একটু পরপর মেসেজের রিপ্লাই দিতে হতো, কথা বলতে হতো। খুব খারাপ রেসাল্ট হয়েছিল সেই সেমিস্টারগুলোতে। ভালো ছাত্র, ভালো মানুষ রুমমেট অনেক বুঝিয়েছিল। পাত্তা দেইনি। বাবা মাঝে মাঝে পড়াশোনা কেমন চলছে জিজ্ঞাসা করতেন। আমি বাবার কাছে আজীবন সত্যি বলে এসেছি। আমাকে নিয়ে তিনি একদম নিশ্চিন্ত ছিলেন। মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে আমার বুক ভেঙে যেতো। খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু মিথ্যে বলতেই হতো। ঐদিনগুলোতে প্রবল এক পাপবোধ তাড়া করে বেড়াতো আমায়। শান্তি পেতাম না। রাতে ঘুমুতে পারতাম না।

পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। একবার টার্ম ব্রেকের সময় বাসাতেও যেতে পারলাম না টিউশনির কারণে। ডেটিং এর খরচ জোগাড়ের জন্য বাসায় মিথ্যে কথা বলে টাকা নিতাম। একই বই তিন চারবার করে কিনতাম। টিউশনিও করাতে হতো কয়েকটা। টায়ার্ড হয়ে রুমে ফিরতাম রাতে। পড়তে বসার মন মানসিকতা বা এনার্জি কোনোটাই থাকতো না। রেসাল্ট খারাপ হতো, আগেই বলেছি। আমার কি যে খারাপ লাগতো! আমার গাধা গাধা বন্ধুগুলোও আমার চেয়ে অনেক ভালো করতো।

তোমাকে স্বপ্ন ভেবে ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বড়ো সাধ ছিল আকাশে সাত লক্ষ সুখের ফানুস ওড়ানোর, অথচ আমার মৃত আকাশ জুড়ে উড়েছিল শুধুই যন্ত্রণার বেলুন। বিষম ভার হয়ে তুমি চেপে বসেছিলে আমার বুকের ভেতর। তবু তোমার হাসি, আড়চোখের চাহনি, পাগলামি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছেলেমানুষি কথাবার্তা, আলো-আঁধারি, রহস্যময়তা, উদাসীনতা, গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা সবকিছু মিলিয়ে তুমি আমার কাছে ছিলে এক মাদকের মতো। মিশে গিয়েছিলে আমার রক্তের প্রতিটি অণুচক্রিকায়। জানি তুমি আমাকে পোড়াবে, কিন্তু আমি পুড়তেই যে ভালোবাসতাম...

তিন.
....একবার তোমার এক আচরণে (এটা নিয়ে পরে বলবো)। আমি বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রথমবারের মতো তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে। চোখ ফুলিয়ে কেঁদেছিলে। আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্কের সুতো আলগা হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর তা আবার জোড়া লাগলো। সেই শুরুর দিনগুলোর মতো। প্রেম পেকে টসটসে হয়ে গেল, তুমি আমার হাতে হাত রেখে ১০৮ বারেরও বেশি জিজ্ঞেস করে ফেললে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো তো? আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে না তো? বেশ চলছিল এরপর। পাগলামি, কফিশপ, সিনেপ্লেক্স, কথায় কথায় রাতভোর হয়ে যাওয়া, স্বপ্ন, কল্পনা...

হঠাৎ একদিন কানাডা থেকে এলো এক দমকা হাওয়া। সেই দমকা হাওয়ায় অচিন দেশের রাজকুমার তোমাকে নিয়ে উড়াল দিলো। বিদায় নিতে তুমি এসেছিলে রবীন্দ্র সরোবরে। কেঁদে কেঁদে বলেছিলে, 'আমাকে ক্ষমা করে দিও'। আমি হেসেছিলাম। তোমার চোখের পানি মুছে দিয়ে দুগালে নিজের দুহাত রেখে বলেছিলাম, 'পাগলি মেয়ে একটা!'

তারপর কতো দিন, কতো রাত চলে গেছে! কত নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটেছে। কতো রাত আমি নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছি বিছানায় এপাশ ওপাশ করে করে। একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছি। গভীর রাতে সাউন্ড সিস্টেম অন করেছি। মান্না দে কেঁদে কেঁদে জানিয়েছে সে অনেকদিন দেখেনি তার প্রিয়াকে, তাহসান বলেছে চাঁদের আলো কখনো তার হবে না। মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে হলের সিঁড়িতে বসতাম। গাঁজায় দুটো দম দিয়ে গান ধরতাম 'গিভ মি সাম সানশাইন, গিভ মি সাম রেইন...'

খাওয়াদাওয়া করতাম না, ক্লাসে যেতাম না, ক্লাস টেস্টগুলোও মিস করতাম। বাসা থেকে ফোনের পর ফোন দিতো। ধরতাম না। পরে ফোন করে আম্মুকে ঝাড়ি দিতাম। রুমমেট, বন্ধুবান্ধব, স্যার, অনেকেই চেষ্টা করেছে বোঝানোর। বুঝিনি আমি। বন্ধুরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো যেটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো ১৮০ ডিগ্রী।

গাঁজা আর সিগারেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে গোলগাল, ভালোছেলে দুই রুমমেট অন্য রুমে পালিয়ে বাঁচলো। বেড দুইটা ফাঁকা পড়েছিল এক দিন। দরজা বন্ধ করে সারাদিন গাঁজা টেনেছিলাম। পরের দিন বেডদুটো আবার দখল হয়ে গেল। একজন আমার চাইতে দুই বছরের সিনিয়র। হুজুর। মুখে একগাল দাড়ি, চোখে চশমা। মুখে সব সময় স্মিত হাসি। প্রথম দেখাতেই মানুষটাকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। আমার বেহাল অবস্থায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন উনি।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমাকে বুঝিয়েছিলেন উনি। আমি তর্ক করেছি, মেজাজ হারিয়ে একদিন চিৎকার করে বলেছিলাম, 'আমাকে আমার মতোই থাকতে দেন না ভাই! আপনারা হুজুর মানুষ, ভালোবাসার কী বোঝেন? সব মেয়েরা মিথ্যেবাদী, প্রতারক।'

ভালোবাসার কী বুঝি! ভাই স্মিত হেসে আমাকে শুনিয়েছিলেন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। শুনিয়েছিলেন নবীজি (ﷺ) আর খাদীজা (রা.)-এর ভালোবাসার কথা, শত বাধা-বিপত্তির মুখেও দ্বীন প্রচারে নবীজি (ﷺ) -এর দৃঢ়তা আর খাদীজা (রা.)-এর পাশে থাকার কথা। শুনিয়েছেন স্ত্রী আইশাহ (রা.)-এর সাথে নবীজি (ﷺ) -এর দৌড় প্রতিযোগিতার গল্প, স্ত্রীর এঁটো পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করার গল্প, সওয়ারীর পিঠে উঠতে স্ত্রীকে সাহায্য করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার গল্প। কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, 'হে নবী, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় দেই।'[৪১৮]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সব স্ত্রীদের জানিয়ে নিলেন। তাঁদেরকে বেছে নেবার সুযোগ দিলেন হয় আমাকে পাবে অথবা এই দুনিয়ার ভোগবিলাস, চাকচিক্য। তাঁর সব স্ত্রীরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন, 'আমরা আপনাকেই চাই ইয়া রাসূলাল্লাহ।'

এমন এক সংসার তাঁরা বেছে নিলেন, যেখানে মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলে না, খেজুর খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়, নবীর স্ত্রী হয়েও মোটা কাপড় পরে থাকতে হয়, সংসারের কাজ করতে গিয়ে কালিঝুলি মাখতে হয়, জরাজীর্ণ কুটিরে খেজুরপাতার বিছানায় শুতে হয়।

আমি শুনেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। এমনটাও হয়! রূপকথার ভালোবাসাও যে হেরে যায় এর কাছে!

যদি আমাদের ঘরবাধা হতো, যদি আমাদের এরকম দরিদ্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তুমি কী এভাবেই আমাকে ভালোবাসতে? কক্ষণো নয়। এই অবস্থায় পড়লে প্রথম সুযোগেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতো। সিনেমা বা ডেটিং-এ না নিয়ে গেলে, তুমি যেরকম করতে আমার সাথে, মাসের পর মাস আধপেটে থাকা, জীর্ণ পোশাক পরা...উফ! সম্ভবই না।

ভাই আমাকে বুঝিয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে...

তুমি তো হেরেই গেলে। লুযার হয়েই রইলে আজীবন! বালিকা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এক পলক দেখেই তুমি যাকে ভালোবেসেছিলে, ক্যারিয়ার, পড়াশোনা, শাশ্বত নিয়মকানুন ভেঙেচুরে কাঙালের মতো ছুটে বেড়িয়েছিলে যার পিছু পিছু, সেই বালিকা তোমাকে ভুলে গিয়েছে। একসময় তোমার কবিতা শোনার জন্য যেই বালিকা একটু পর পর ফোন করে জ্বালাতো, তোমার নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখলেই নক করতো, সেই মেয়ে শব্দেরও অধিক দ্রুতগতিতে ভুলে গিয়েছে তোমাকে, তোমার সেই সব নিশাচরী কবিতাগুলোকে। ভুলে গিয়েছে বাদলা দিনের প্রথম কদমফুল আর বৃষ্টিতে ভেজার সব প্রহরগুলোকে। একপলকেই ভুলে গেছে সবকিছু, ঠিক যেমন এক পলক দেখেই তুমি প্রেমে পড়েছিলে।

বড়লোক, এস্টাব্লিশড স্বামীর সাথে রোজ রোজ ছবি দেয়; রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমা হলে। হানিমুনের ছবি, বিদেশ ঘোরার ছবি। দামি ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে হাসিতে ভরপুর সব ছবি। সুখ, ভালোবাসা উপচে পড়ছে যেন! তুমি এসব দেখে দেখে, অতীতের কথা ভেবে, পুরোনো স্মৃতি মনে করে নিজেকে পোড়াও। তামাক পাতার ধোঁয়ায়। পুড়ে যায় তোমার তরুণ ফুসফুস, তোমার হৃৎপিণ্ড। বেঈমানি করে বসে দুচোখ। নামে অশ্রুর অঝোর ধারা।

বালিকার ছলনা নারীজাতির ওপর থেকে তোমার সব বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তুমি হানা দাও নিষিদ্ধ সাইটগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীল উদ্দামতা চলতে থাকে পর্দায়। তুমিও সমানে হাত চালাও। প্রতিশোধ নিতে হবে, মস্ত বড় প্রতিশোধ, ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ!

এই প্রতিশোধের শেষ কোথায়? আর কতো রাত গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে পড়ে থাকলে, আর কতো ক্লাস ফাঁকি দিলে, আর কতো মেয়েকে ধরে খেয়ে ছেড়ে দিলে, আর কতো রাত পর্ন দেখলে, আর কতোবার হস্তমৈথুন করলে, আর কতোবার মায়ের চোখের জল দেখলে, বাবার আর কতোটা অপমান দেখলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হবে? তুমি ঐ মেয়েকে পরাজিত করতে পারবে? বলো, আর কতো কাল তোমার এই অদ্ভূত প্রতিশোধ চলবে? কবে তুমি বিজয়ী হবে? কবে বালিকা হেরে যাবে?

বোকা ছেলে, তুমি তো শুরুতেই হেরে গিয়েছো! প্রতিশোধ নেবার নামে গাঁজা খাচ্ছো, সিগারেট খাচ্ছো, খাওয়াদাওয়া, ঘুমের অনিয়ম করছো এতে কার ক্ষতিটা হচ্ছে শুনি? ঐ মেয়ের, না তোমার নিজের, নিজের শরীরের? পর্ন আর হস্তমৈথুনে তুমি তিলে তিলে শেষ করে ফেলছো পৌরুষের সব শক্তি, কার ক্ষতি হচ্ছে? কার মা কষ্ট পাচ্ছে? আত্মীয়, প্রতিবেশী, পাশের বাসার আংকেল-আন্টিদের কাছে কার মা, কার বাবা অপমানিত হচ্ছে? সে তো সুখেই আছে। তোমার কোনো দুঃখ, কষ্ট, প্রতিশোধের অভিমান, আগুন কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি, করবেও না; এরকম অবস্থায় সাধারণত করেও না।

আর তুমি?
নিজের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছো! নর্দমার শুয়োর আর রাস্তার কুকুরেরা যেভাবে জীবনযাপন করে, তুমি বেছে নিয়েছো ঠিক সেই জীবন। নিজের শরীর শেষ করছো, স্বপ্নগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে মারছো। বোকা ভাই আমার! এটা কোনো জীবন হলো?

ফিরে এসো ভাই। বাবার কাছে ক্ষমা চাও, মায়ের চোখের জল মুছে দাও। জায়নামাযে দাঁড়াও। চোখের জলে জ্বালিয়ে দাও অতীতের সব ভুল, সব পাপ। আবার শুরু থেকে সব শুরু করো। লম্বা একটা জীবন পড়ে আছে। ফিরে আসো ভাই! ফিরে আসো জীবনে। প্লিজ!

আস্তে আস্তে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসা শুরু হলো। ঝাঁকড়া চুলে তেল, চিরুনি পড়লো, সিগারেট খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিলাম, গাঁজা ছেড়ে দিলাম একেবারেই, শুক্রবার ছাড়াও মাঝে মাঝে মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। বালিকা, তোমার বিরহের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করলো। কী ঋতু চলছিল তখন? শরৎ না হেমন্ত? হেমন্ত বোধহয়। আহা কী ভীষণ দামি ছিল সেই হেমন্ত!

ইউটিউব ব্রাউজিং করতে করতে একদিন পেয়ে গেলাম 'পরকালের পথে যাত্রা' নামের এক লেকচার সিরিয। গমগমে কন্ঠস্বরের বক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন একটানা। আমি শুয়ে শুয়ে শুনে গেলাম কাঁথা মুড়ি দিয়ে। কী দরদ মাখা কণ্ঠ তাঁর, কী গভীরতা তাঁর কথায়!

সেই লেকচারে শুনলাম আশ্চর্য একদল তরুণীদের কথা, আয়তনয়না যাদের চোখ, কোনো মানুষ ও জ্বীন কখনো যাদের স্পর্শ করেনি। প্রবাল ও পদ্মরাগের মতো এই সব তরুণীদেরকে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা নাম দিয়েছেন হুর আল আঈন। আল্লাহ তা'আলা এদেরকে নাকি এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন যে এদের দিকে তাকিয়ে মানুষ বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে। তবু চোখ ফেরাতে পারবে না। সেই লেকচারে আরো শুনলাম আকাশের ওপারের লাল নীল হিরে আর মুক্তোর প্রাসাদের কথা, আদিগন্ত বিস্তৃত রেশমের গালিচা, সারি সারি আসন, সালসাবিল আর কাউসারের কথা, সিদরাতুল মুনতাহার কথা...।

বালিকা তোমার প্রতি যে ভালোবাসাটুকু অবশিষ্ট ছিল তার এক কানাকড়িও আর থাকলো না এই লেকচার শোনার পর। কঠোর প্রতিজ্ঞা করলাম, জান্নাতের সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই মিস করা যাবে না। বদলে গেলাম আমি। আমূল বদলে গেলাম।

চার.
...বৃষ্টি ভালোবাসতাম আমরা দুজন। কতদিন বৃষ্টিতে দুজনে হেঁটে বেড়িয়েছি ফাঁকা ফুটপাতে, কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়েছি বৃষ্টির স্রোতধারায়। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। সারা বিকেল আমরা ঘুরে বেড়ালাম রিকশায়। শেষ বিকেলে ঝুম বৃষ্টির পরের সেই ভীষণ প্রিয় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। রিকশার ভেতরের আঁধো অন্ধকারে তুমি আমার গা সেঁটে বসলে। একদম গা সেঁটে। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।

আমি হয়তো তখন শুক্রবারের নামাযও পড়তাম না, হয়তো চেইন স্মোকার ছিলাম, লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ন দেখতাম হঠাৎ হঠাৎ। তারপরেও তুমি যখন মাঝে মাঝে এতো কাছাকাছি আসতে, তখন আমার অস্বস্তি হতো। কেমন জানি হয়ে যেতে তুমি সেই সময়টুকুতে। চোখের ভাষায় কী জানি বলতে চাইতে!

সেদিন আমি ছোট্ট রিকশার একপাশে যতটুকু সরে বসা সম্ভব ততটুকু সরে বসেছিলাম। তুমি মুখে রহস্যময় হাসি হেসে আবার আমার গা সেঁটে বসছিলে বারবার। রিকশা থেকে নেমে যাবার আগমুহূর্তে আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললে, 'কাল বাসা খালি। ভাইয়া, ভাবী বেড়াতে যাবে। একা একা আমি বাসায় থাকতে পারি না। আমার ভীষণ ভয় লাগে...'।

কী ভুলের মধ্যেই না আমি ডুবে ছিলাম! আলেয়াকে আলো ভেবে নষ্ট করেছিলাম জীবনের সবচেয়ে সজীব সময়গুলো। এখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। বৃষ্টিতে ভিজি। খালি পায়ে একা হেঁটে বেড়াই সবুজ ঘাসের উপর। রাসূলুল্লাহর (*) সুন্নাহ।[৪১৯] দু'আ করি মন ভরে, বৃষ্টির সময় দু'আ কবুল হয়। হলের লেকের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি বৃষ্টির ফোঁটা পানিতে পড়ে বৃত্তাকার ঢেউ তৈরি করছে, দূরের শালবনের ভেতর কাকের দল বৃষ্টিতে জবুথবু হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির ঠাণ্ডা ফোঁটা ভিজিয়ে দেয় আমার সর্বাঙ্গ, আড়াল করে ফেলে চোখের তপ্ত অশ্রু। কত ভুল করে ফেলেছি এই ছোট্ট জীবনে! কত গুনাহ করে ফেলেছি। ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি ছাড়া তো আমার যাবার জায়গা নেই।

বালিকা, তোমার সম্মোহনী আমন্ত্রণে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। তড়িতাহতের মতো কেঁপে উঠেছিলাম নিদারুণ বেদনায়। ঘৃণায় সারা শরীর রি রি করে উঠেছিল। নিজেকে ধোঁয়া তুলসি পাতা প্রমাণ করতে চাইছি না। টগবগে তরুণ আমি। নারীদেহের ব্যাকুল শুশ্রুষা পাবার ইচ্ছে আমারও হতো। কিন্তু বালিকা বিশ্বাস করো, বিয়ের আগে এসব করবো এমনটা কখনো তোমাকে নিয়ে ভাবিনি। পাপ আর পঙ্কিলতা সযত্নে দূরে সরিয়ে, বুকের বেশ বড়সড় একটা জায়গা ফাঁকা করে, পবিত্রতা আর স্নিগ্ধ ভালোলাগায় মুড়ে রেখেছিলাম তোমাকে। সেই তুমি এমন একটা কথা বলতে পারলে!

তুমি বোধহয় পড়ে ফেলেছিলে আমার অনুভূতি। সেই রাতে লম্বা একটা মেসেজ পাঠিয়ে সরি বলেছিলে। দুইদিন পরে মাফ চাইতে আমার হলের নিচে এসেছিলে সশরীরে। তোমার চোখের পানি দেখে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম তখনই। কিন্তু তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গিয়েছিল অনেকখানি।

ক্লাস নাইনের এ সেকশনের বালিকা, তুমি ছিলে আমার কৈশোরের প্রথম ভালোলাগা, ভালোবাসা। হাইস্কুল সুইটহার্ট। কোনো কালিমা না ছুঁয়ে নিখাদ ভালোবাসা আর শুভ্রতায় কতোবার তোমাকে ছুঁয়েছি কল্পনায়, তোমার রেশমের মতো চুলে আনমনে বিনুনি কেটেছি, সে সবের তুমি কতটা জেনেছো?

পোকাদের হাতে তুলে দিয়েছো নিজেকে, পোকারা খুবলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করেছে দিবানিশি, কেউ একজন তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে পার করে দেবে দীর্ঘ সুখের প্রহর...এই সৌভাগ্য তোমার কখনো হবে?

এই পৃথিবীতে কতদিন তোমাকে পেতাম বলো? কতোটাই বা নিখুঁত তুমি? অপরূপা? পরিপূর্ণা? চুলে তেল না দিলে, চিরুনি না করলে তোমাকে পাগলি পাগলি লাগে। দাঁত না মাজলে দুর্গন্ধ বের হয়, বগল থেকে বিশ্রী গন্ধ আসে, চোখে পিচুটি জমে, সাবান না দিলে ময়লার আস্তরণ পড়ে। টয়লেটে যেতে হয়, নাকে সর্দি আসে। ৩০-৩৫ বছর বয়স হলেই মেদ জমে হিপোপটোম্যাস হয়ে যাবে, তারপর একদিন চুল পেকে যাবে, চামড়া ঝুলে যাবে, ফোকলা দাঁতের দাদী-নানী হয়ে যাবে।

তোমার মায়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে ভুলতে বসেছিলাম তুমি সসীম, তুমি নশ্বর। ভুলতে বসেছিলাম এই আকাশের ওপারেও আরেকটা আকাশ রয়েছে। তার উপর স্বর্ণ, মণিমুক্তো আর হীরার একটা প্রাসাদ রয়েছে আমার। সেখানে যাবার রাস্তা দুনিয়াতে নিজের বাড়ি যাবার পথের চাইতেও ভালোভাবে চিনবো। প্রাসাদের কাছাকাছি যাবার পরে অসাধারণ একটি দৃশ্য দেখে থমকে যাবো আমি। আমার হার্টবিট মিস হবে। পা ভারী হয়ে যাবে, নড়াচড়া করতে পারবো না!

কী সেই দৃশ্য?

আমার জান্নাতি স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে- অপরূপ এই দৃশ্যে আমি মুগ্ধ হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবো বছরের পর বছর! ৪০ বছর পলকহীন চোখে তাকিয়ে উপভোগ করবো আমার জান্নাতি সেই স্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য, এমন রূপ যা দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় বটে না। কোনো মানবহৃদয় তা কখনো কল্পনাও করতে পারে না।

আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলছেন, 'নিশ্চয় আমরা তাদেরকে সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে। আর তাদেরকে করেছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা'। [৪২০]

আয়তনয়না হুরদের সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলছেন,
'যেন তাঁরা সুরক্ষিত মুক্তো'।[৪২১]
'তাঁরা যেন প্রবাল ও পদ্মরাগ'।[৪২২]
'যেন তারা গৌরবর্ণ সুরক্ষিত ডিম'।[৪২৩]

জান্নাতি স্ত্রীগণ এ কারণেই সুন্দরী নয় যে তাঁরা কোনো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে। বরং স্বয়ং আল্লাহ তাঁদের সৌন্দর্যের সার্টিফিকেট দিয়েছেন!

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের স্ত্রীদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- একজন জান্নাতের হুর যদি পৃথিবীর প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে তবে মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত সমগ্র স্থান এমনভাবে আলোকিত, উদ্ভাসিত হয়ে যেতো যে তাতে চন্দ্র, সূর্যের আলো পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যেতো। সমগ্র পৃথিবী সুগন্ধিতে ভরে যেতো।[৪২৪]

জান্নাতের স্ত্রীদের তোমার মতো শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। তাদের টয়লেটে যেতে হয় না, গা দিয়ে গন্ধ বের হয় না, মুখে দুর্গন্ধ হয় না। তাঁদেরকে তো মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়নি! বরং আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তাঁদের তৈরি করেছেন বিশেষভাবে- কস্তুরী, কপূর এবং জাফরান দিয়ে। তাঁদের থুতুও মেশকের সুগন্ধ ছড়াবে। মাথার ওড়না দুনিয়া এবং এই পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে, সে সবকিছুর চেয়েও উত্তম!

তোমার মতো তাঁরা কখনো বুড়িয়ে যাবে না। কখনো তাঁদের সৌন্দর্য ম্লান হবে না। বরং দিন দিন তাঁরা আরো বেশি রূপবতী, মায়াবতী হয়ে উঠবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমু'আবারে জান্নাতি লোকেরা সেখানে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরের হাওয়ায় সেখানকার ধূলোবালি তাঁদের চেহারা ও কাপড়ের উপর পড়বে। তাতে তাঁদের সৌন্দর্য বেড়ে যাবে। স্ত্রীদের নিকট ফিরে যাবার পরে তাঁদের স্ত্রীরা বলবেন, আপনারা তো বেশি সুন্দর হয়ে গিয়েছেন'। জান্নাতি লোকেরাও স্ত্রীদের বলবেন, 'তোমরাও আগের চাইতে অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছো'।[৪২৫]

জীবন বাবু হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে মালয় সাগর, বিদর্ভ নগর ঘুরে শেষমেষ বনলতা সেনের কাছে যে শান্তি পেয়েছিল, আমি তোমার কাছে ঠিক সেই শান্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দিনরাত তুমি তুমি করেও অস্থিরতা, অশান্তি, নির্ঘুম রাতেই কপালে জুটেছে আমার বেশি। সবসময় সন্দেহ, ঝাড়ি, জেরা, পুলিশগিরি... এসবে কি শান্তি পাওয়া যায়?

জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই আমাকে তোমার মতো বকাবকি করবে না, ঝাড়ির উপর রাখবে না, এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দাও, রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাও, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাও ইত্যাদি আবদার করবে না। কখনোই কটু কথা বলবে আমাকে। সন্দেহ করবে না।

'তাঁদের সাথে থাকবে লজ্জাবতী, নম্র ও আয়তলোচনা তরুণীরা' [৪২৬]
'সেখানে তাঁরা কোনো অর্থহীন প্রলাপ শুনতে পাবে না। বরং বলা হবে শুধু শান্তি! নিরবচ্ছিন্ন শান্তি।'[৪২৭]

বালিকা, তুমি যেমন আমার মৌলিক ভালোবাসা ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছো, জান্নাতের স্ত্রীরা কখনোই এমন করবে না। ওরা কখনোই আমাকে ধোঁকা দেবে না। আমাকে কোনো টেনশন করতে হবে না- না জানি আমাকে ছেড়ে চলে যায় কি না। না জানি আমাকে ধোঁকা দেয় কি না, না জানি আমার সাথে প্রতারণা করে কি না। এসবের তো কোনো সম্ভাবনাই নেই, কারণ হুর আল আঈনকে তো কেবল আমার জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। না কোনো মানুষ বা জ্বীন এদের দেখেছে আর না কেউ তাঁদের স্পর্শ করেছে।

‘সেখানে থাকবে আয়তনয়না স্ত্রীগণ। এদের কোনো জ্বীন বা মানুষ স্পর্শ করেনি।’[৪২৮]

জান্নাতের স্ত্রী কখনোই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না। অন্য পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। মিষ্টি সুরে আমাকে বলবে, 'তোমার চাইতে হ্যান্ডসাম পুরুষ আর কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা তো সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার স্বামী আর আমাকে তোমার স্ত্রী বানিয়েছেন।' [৪২৯]

আহহ! আমার কোনো টেনশন নেই। কোনো ভাবনা নেই। জান্নাতের স্ত্রী অসীম সময় জুড়ে আমাকেই, শুধু আমাকেই ভালোবাসবে; প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে আগের চেয়েও বেশি কাছে চাইবে, আমার বুকে মুখ লুকোবে, আমাকে জড়িয়ে ধরেই সুখের গল্প লিখবে। জান্নাত তো হলো সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে দুঃখকষ্ট নেই, নেই গ্লানি, অবসাদ বা বিষণ্ণতা বলে কোনো কিছু। শুধু সুখ আর সুখ। অবিরাম বৃষ্টির মতো সুখ। যার শুরু আছে শেষ নেই। জান্নাতের নিয়ামতের কথা কল্পনা করারও ক্ষমতা নেই মাটির মানুষের। এমনই এক রাজ্য সেটি! রূপকথার মতো যেখানে- অতঃপর তাহারা চিরকাল সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো।'

'কেউই জানে না চোখ জুড়ানো কি কি নিয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়েছে জান্নাতে। [৪৩০]

পাঁচ.
মাঝে মাঝে উথালপাতাল জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় চারিদিক। চাঁদের আলো যেন হেসে হেসে গলে পড়ে। রাতজাগা বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে আসে বকুলমালার তীব্র গন্ধ। এমন রাতে ঘুমানো অপরাধ। এই অপরাধ আমি করি না। বাইরের বারান্দায়, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকি। শত সহস্র বছরের পুরোনো নক্ষত্ররা মিটিমিটি তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। আমিও কী তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি না? তোমায় ভেবে কল্পনায় আনমনে লিখতে থাকি না কোনো এক উপাখ্যান? এক অদ্ভূত, কাল্পনিক কিন্তু সত্য প্রেমের উপাখ্যান।

'তুমিও কি সহস্রবার আমার কথা ভেবেছো? নাকি তার চেয়েও বেশি; লক্ষকোটি বার? ধূলিমলিন মিথ্যে কথার এই পৃথিবীতে বসে আমি কতো অযুত কোটিবার তোমার কথা ভেবেছি! পুকুর ধারে জলের গন্ধে চোখ ভিজিয়েছি। আর মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি কোষ ব্যবহার করে করে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি এমন এক সুখের, যা কখনো কোনো মানুষ অনুভব করেনি...

তুমি এলে... পাশে বসলে আমার, সবুজ ঘাসের উপর। একটু দূরেই টলটলে স্বচ্ছ পানির বিশাল দীঘি। আকাশ থেকে একরাশ নীল ঝরে ঝরে পড়ে একটু নীলাভ দেখাচ্ছে দীঘিটাকে। তোমার কোলে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি। তুমি আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছো। দুটো প্রজাপতি সেই কখন থেকে উড়ছে। তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে খুশিতে হেসে দিলে। আমি দুশো একান্ন বারের মতো তোমার প্রেমে পড়লাম। আমার চোখ দেখেই তুমি বুঝে ফেললে সেটা, তাই না?

খামখেয়ালি বাতাস এসে এলোমেলো করে দিলো তোমার চুল। একগোছা চুল এসে পড়লো তোমার মুখের ডানপাশে। সরিয়ে দিলাম ফুঁ দিয়ে। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলে। দুশো বায়ান্ন বারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম!

তোমার দুষ্টুমি ভরা চোখের তারায় নীল আকাশ তিরতির করে কাঁপছিল। তুমি কি জানো, তোমার সেই সবুজাভ চোখ আমার ভেতরের কত কিছুর মৃত্যু ঘটালো আর কত কিছুর জীবন দিলো? আড়চোখে তোমার দিকে তাকাতেই ধরা পড়ে গেলাম আবার। তোমার চোখেমুখে সবজান্তার হাসি। আমার কী দোষ বলো? তোমাকে আল্লাহ যে বানিয়েছেন বানানোর মতো করেই!

বিকেলের এক নরম মুহূর্ত। আবদার ধরলে, কাউসার দেখতে যাবে। বেরিয়ে পড়লাম আমরা। নৌকায় দাঁড়িয়ে আগন্তুক বাতাসে তুমি মেলে দিলে দুই হাত। পাখির মতো। যেন এক্ষুণি গা ভাসাবে এই আগন্তুক বাতাসে। ঘোরলাগা এক আলো এসে পড়লো তোমার স্নিগ্ধ মুখটাতে। মুহূর্তেই তুমি যেন আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেলে। ছুঁতে ইচ্ছে করে না, কথা বলতে ইচ্ছে করে না, কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না। দূর থেকে শুধু একমনে দেখে যেতে ইচ্ছে করে!

বছরের পর বছর ধরে! হাজার হাজার বছর ধরে!

আর ঠিক তখনই দুশো তিপ্পান্নবারের মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম! জানি, তুমি আমার কল্পনার চাইতেও সুন্দর। আমার কল্পনা ধারে কাছেও যেতে পারে না তোমার অনুপম সৌন্দর্যের। তবু আমি তোমার কথা ভাবি। কল্পনায় তোমাকে ছুঁই হরদম।

হে হুর আল আঈন, হে আমার জান্নাতি স্ত্রী, তুমিও কি আমার কথা ভাবো অষ্টপ্রহর? তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছো আমার? জানি না, জানতে চাইও না। শুধু জেনে রাখো, অসীম গুণোত্তর ধারার মতো আমি তোমার প্রেমে পড়ে চলেছি, পড়েই যাচ্ছি, পড়েই যাচ্ছি, পড়েই যাচ্ছি ...

মাতাল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেয় গগন শিরীষ গাছটা। ওর ডালপালার ছায়া বারান্দার যমীনে আঁকে অদ্ভূত এক নকশা। জ্যোৎস্না দুলে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে পানকৌড়ির ডাক। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমার কল্পনার সুতো। ঠেস দিয়ে বসে থাকি আমি বারান্দায়। চোখের কোণে কী অশ্রুবিন্দু জমে? নাকি আমার মনের ভুল? কল্পনা? কী জানি!
অপেক্ষার প্রহরগুলো বড় কষ্টের!
তবে সবকিছুরই তো শেষ আছে—তিক্ততার, শান্তির, অস্থিরতার, জীবনোপন্যাসের।

দীর্ঘ অপেক্ষার তো বটেই।
তাই না?

টিকাঃ
[৪১৭] সত্য কাহিনী অবলম্বনে লস্টমডেস্টি টিম কর্তৃক অনুলিখিত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত। শেষের চার লাইনের কবিতাটি লিখেছেন- আবদুল্লাহ।
[৪১৮] সূরা আহযাব, ৩৩: ২৮
[৪১৯] ফাদালাহ বিন ওবাইদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (*) আমাদেরকে মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটতে আদেশ করেছেন। (আবু দাউদ: ৪১৬০। হাফেজ ইরাকী হাদিসটির সনদকে জায়্যিদ তথা শক্তিশালী বলেছেন। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। তাখরীজুল ইহইয়া ৪/২৮৯, সহীহাহ ২/২০)
[৪২০] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৩৫-৩৭
[৪২১] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ২৩
[৪২২] সূরা আর রহমান, ৫৫:৫৮
[৪২৩] সূরা আস সাফফাত, ৩৭:৪৯
[৪২৪] বুখারী: ২৭৯৬
[৪২৫] মুসলিম: ২৮৩৩
[৪২৬] সূরা আস সাফফাত, ৩৭:৪৮
[৪২৭] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬:২৫-২৬
[৪২৮] সূরা রহমান, ৫৫:৫৬
[৪২৯] ইবনুল জাওযী, কারা জান্নাতের কুমারীদের ভালোবাসে, আর রিহাব পাবলিকেশন, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩
[৪৩০] সূরা আস-সাজদা, ৩২:১৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px