📄 পুড়ে যাবে তুমি
রূপকথার স্নো হোয়াইটের সেই আয়নার গল্প পড়েছো না? ঐ যে জাদুর এক আয়না ছিল এক রাণীর কাছে। আয়নাকে জিজ্ঞাসা করতো সে রোজ নিয়ম করে- বলো তো, পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী কে? আয়না উত্তর দিতো, আপনিই সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। আয়নার এই উত্তর শুনে আনন্দ আর পরিতৃপ্তির হাসি যেন উপচে পড়তো রাণীর চোখে। এভাবেই চলছিল দিন। কিন্তু একদিন দিন বদলে গেল। আয়না হঠাৎ বলে বসলো, না রাণী মা, আপনি না। সবচেয়ে রূপসী হলো স্নো হোয়াইট।
রাগে ফণা তোলা সাপের মতো ফুঁসে উঠলো রাণী। বিষাক্ত সাপের মতো হিস হিস কন্ঠে নির্দেশ দিলো জল্লাদকে- স্নো হোয়াইটকে নিয়ে যাবে গভীর বনে। হত্যা করে প্রমাণ স্বরূপ তার কলিজা নিয়ে আসবে আমার কাছে!
মেয়েরা আসলে এমনই! নিজের রূপের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। একজন মেয়ের সামনে অন্যের প্রশংসা করলে ঈর্ষাবোধ ঠেলেঠুলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রূপবতী কোনো মেয়ে সেজেগুজে আসলে অপর রূপবতী নিজের সাথে তুলনা করা শুরু করে...ওর নাকটা আমার চাইতে বোঁচা, ওর চুল দেখে তো মনে হচ্ছে ঘোড়ার লেজ, হাইটে আমার চাইতে কয়েক ইঞ্চি ছোট!
ত্বকের, চুলের এতো যত্ন, ড্রেসিং টেবিল ভর্তি এতো সাজগোজের পণ্য, এতো মেকআপ টিউটোরিয়াল দেখা, নিত্য নতুন পোশাক, ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রামে একটার পর একটা ছবি দেওয়া, ইউটিউব বা টিকটকে শর্ট ভিডিও...এসব কিছু অন্যের একটু মনোযোগ আকর্ষণ, মিষ্টি কিছু প্রশংসা, বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে যাওয়া কিছু মুখ দেখে সুখ পাওয়ার জন্যই তো, তাই না?
আপু, তুমি হয়তো শুধু এসব ভেবেই ছবি-ভিডিও দাও, রাস্তায় সাজগোজ করে বের হও। কিন্তু ছেলেরা শুধু এটুকুই ভাবে না। আলকেমি লেখাতে আমরা দেখেছি ছেলেরা সুন্দরী, সাজগোজ করা মেয়েদের দেখলে দৈহিক আকর্ষণবোধ করে। সোজা বাংলায় বললে, শুতে চায়। শোবার কথা চিন্তা করে। ছেলেরা সৃষ্টিগতভাবেই এমন। এটাই তাদের সহজাত প্রবৃত্তি। তোমাকে তো আর সরাসরি শোবার কথা বলতে পারে না। তাই কৌশলের আশ্রয় নেয় এবং সেই কৌশলও আবর্তিত হয় সেই প্রশংসাকে কেন্দ্র করে। অন্তহীন প্রশংসা করে তোমার। শ্রুতিমধুর নিখুঁত মিথ্যার বন্যা বইয়ে দেয়। এরই মাঝে তোমার জন্য ফাঁদ পাতে। প্রশংসা পেয়ে গলে যাওয়া তুমি টেরই পাও না কী আসতে যাচ্ছে সামনে। ধাপে ধাপে কৌশলগুলো দেখা যাক:
ধাপ ১: তুমি না অমুক সেলিব্রেটির মতো দেখতে![৩৬০] তুমি কি জানো তার চাইতেও অনেক সুন্দর তুমি... এমন ধরনের কথা বার্তা বলবে। বর্তমান সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থায় সেলিব্রেটিদের একরকম পূজাই করা হয়। কাজেই অন্যের মুখে সেলিব্রেটিদের সাথে নিজের রূপের তুলনা শুনে মেয়েরা আহ্লাদে একেবারে আটখানা হয়ে যায়।
ধাপ ২: তুমি না অনেক হট, একদম অমুক সেলিব্রেটির মতো, তোমার ফিগারটা সেই! দূর থেকে দেখলে তো বুঝাই যায় না যে তুমি হেঁটে যাচ্ছো, না অমুক সেলিব্রেটি হেঁটে যাচ্ছে-এরকম প্রশংসা দিয়ে শুরু হয় এই ধাপ। আগের ধাপের মতোই মেয়েরা এমন প্রশংসাতে অনেক খুশি হয়। আসলে এই ধাপ থেকেই প্রশংসা একটু একটু গ্রাফিক, একটু খোলামেলা হতে থাকে। মেয়ের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে সে ঠিক করে কতোটা খোলামেলা কথা সে বলবে। মেয়ে রেগে গেলে বা রেগে যাবার ভান করলে, সে সাবধানে খেলবে। সময় নেবে। আর যদি খুশিতে গদগদ হয়ে যায় প্রশংসা শুনে, তাহলে আরো বেশি খোলামেলা কথা বলবে। কিন্তু যেহেতু সেলিব্রেটি অ্যাঙ্গেলটা থাকছেই মানে বাজে অশ্লীল কথাগুলো সরাসরি সেগুলো না বলে সেলিব্রেটিদের সাথে তুলনা করে বলছে, কাজেই মেয়েরা তেমন একটা রাগ করে না। খুশি হয়।
ধাপ ৩: সেক্সের প্রস্তাব দেবার চূড়ান্ত ধাপ এটা। আগের দুই ধাপ সফলতার সাথে শেষ করে আসায় যথেষ্ট খোলামেলা কথাবার্তাও গা সওয়া হয়ে যায়। এবারে ছেলেরা বলা শুরু করে- জানো অমুক সেলিব্রেটির শরীরের কথা (হিপ, বুক) মনে হলে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না, তুমিও তো তার মতোই দেখতে... তুমি এতো হট কেন? তোমাকে দেখলে আমার নিজেকে কন্ট্রোল করতে অনেক কষ্ট হয়, আমাকে এভাবে কষ্ট দেবার জন্য তোমার অনেক পাপ হয়, তুমি কি জানো সেটা? গতরাতে অমুক নায়িকার একটা আইটেম সং দেখছিলাম, তোমার কথা মনে হচ্ছিল বারবার...।[৩৬১] এর চেয়েও আরো অনেক 'সাহসী' কথা বলে অনেকে। তবে সবসময় চেষ্টা করে সেলিব্রেটি অ্যাঙ্গেল আর প্রশংসা ধরে রাখতে। প্রশংসার মুগ্ধতার মায়াপাশে বন্দী হয়ে মেয়েটি কখন যে বিছানায় গিয়ে উঠে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টিই হারিয়ে ফেলে, তা বুঝতে পারে না।
আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। মেয়েদের কীভাবে পটাতে হয়, মেয়েদের সাথে কীভাবে ফ্লার্ট করতে হয়-এমন অসংখ্য অনলাইন কন্টেন্ট পাবে। সেখানে দেখবে সবাই একটা কথাই বলছে- মেয়েদের প্রশংসা করো।
আমরা খুব ভালো বন্ধু, ও আমাকে অনেক সাহায্য করে, ও তো আমার জাস্ট ফ্রেন্ড, ও আমার ভাইয়ের মতো, আমাদের মন তো পবিত্র-এসব ফালতু কথা। তোমার মনে হয়তো কিছু আসে না, কিন্তু ছেলেদের মনে অনেক কিছুই আসে, আপু। দু'জন নারী পুরুষ মিশবে, পাশাপাশি বসে ক্লাস করবে, একই রিকশায় বসবে, হাত ধরাধরি করবে, সংস্কৃতি চর্চার নামে রাতবিরাতে ক্যাম্পাসে ঘুরবে, ট্যুরে যাবে, রসালো মজার আলোচনা করবে আর মনে কিছু আসবে না-এমন দাবি কেউ করলে হয় সে মিথ্যা বলছে অথবা তার ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। তোমাকে ভেবে, তোমার ছবি দেখে সে মাস্টারবেট করে, পর্ন দেখে। ও তোমাকে সাহায্য করে কারণ এর মাধ্যমে সে তোমাকে পটিয়ে প্রেম করতে চায়। তোমার শরীরটা চায়। আর এমন মানুষদের হাতে ধর্ষণের অসংখ্য উদাহরণ তো আমরা পুরো বই জুড়েই দিয়ে আসলাম। [৩৬২] তুমি একটু যদি ভালোমতো খেয়াল করো-তার তাকানো, তার স্পর্শ, কথাবার্তা তাহলেই বুঝতে পারবে। তুমি যদি জানতে ছেলেরা তোমাকে নিয়ে কী ভাবে, তোমাকে কীভাবে দেখে, তাহলে তুমি হয়তো নিজেকে নিরেট লোহা দিয়ে ঢেকে রাখতে।
নারী এবং পুরুষ হলো বারুদ ও ম্যাচের মতো। একসাথে থাকলে আগুন লাগবেই। আল্লাহ এভাবেই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন আমাদের সম্পর্কে। তাই তিনি নারী-পুরুষের সহাবস্থান নির্জনে ও সামাজিক সেটআপে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। বলেছেন পর্দা করতে। দৃষ্টির হিফাযত করতে। নারীদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলছেন,
'আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের প্রদর্শনীর মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।' [৩৬৩]
'যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পরপুরুষদের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের মানুষ প্রলুব্ধ হয়।' [৩৬৪]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলছেন,
'আমি আমার পর জনগণের মাঝে পুরুষদের জন্য মেয়েদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা ছেড়ে যাচ্ছি না।'[৩৬৫]
'নারীদের (ফিতনা) থেকে বাঁচো। কারণ, বনী ইসরাঈলদের প্রথম ফিতনা নারীদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল।’[৩৬৬]
তিনি আরো বলছেন,
'কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না, তবে জেনে রাখবে এমতাবস্থায় তাদের সাথে তৃতীয়জন হলো শয়তান।[৩৬৭]
আল্লাহ তা'আলা পুরুষ সাহাবী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-দের উদ্দেশ্য করে বলছেন, 'তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র।[৩৬৮]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সম্মানিতা স্ত্রী, আমাদের আম্মাজান, যাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের ঈমানের দাবি, তাঁদের ব্যাপারেই পুরুষ সাহাবীদের জন্য এমন আয়াত নাযিল করেছেন আল্লাহ তা'আলা। নবী রাসূলদের পর সবচেয়ে ধার্মিক মানুষ হলেন সাহাবীরা! তাহলে তোমার আমার মতো সাধারণ নারী পুরুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
শাইখ ইবনু বায ও শাইখ ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুমাল্লাহ নারী-পুরুষের দেখাদেখি, নির্জনে অবস্থান ও সহাবস্থান সংক্রান্ত বিবিধ আলোচনায় বলেছেন,
নবী (ﷺ)-এর যুগে নারীগণ পুরুষদের সাথে সহাবস্থান করতেন না, মসজিদেও না, আর বাজারেও না। নবী (ﷺ)-এর মসজিদে নারীরা পুরুষদের পেছনে, পুরুষদের শেষ কাতারের পরের কাতারে সালাত আদায় করতেন এবং তিনি নারীদের প্রথম সারি বা কাতারের সাথে পুরুষদের শেষ কাতারের ফিতনার আশঙ্কা থেকে সতর্ক করার জন্য বলতেন:
'নারীদের সর্বোত্তম সারি বা কাতার হলো শেষ কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের প্রথম কাতার, আর পুরুষদের সর্বোত্তম কাতার হলো প্রথম কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের শেষ কাতার।[৩৬৯]
আর নবী (ﷺ)-এর যুগে পুরুষদেরকে (মসজিদ থেকে) প্রস্থানের সময় বিলম্ব করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো, যাতে নারীগণ প্রস্থান করতে পারে এবং মসজিদ থেকে তারা এমনভাবে বের হতে পারে যাতে মসজিদের দরজায় তাদের সাথে পুরুষগণ মিশতে না পারে। রাস্তায় পথ চলার সময় পরস্পরের মাঝে সংস্পর্শের দ্বারা ফিতনার আশঙ্কা থেকে সাবধান ও সতর্ক করার জন্য নারীদেরকে রাস্তাজুড়ে চলতে নিষেধ করা হতো, রাস্তার প্রান্তসীমায় চলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো অথচ তাঁরা পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সকলে ঈমান ও তাকওয়ার যে মানে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সে হিসেবে তাদের পরবর্তীগণের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?'[৩৭০]
ইবনুল জাওযী (রহ.) যেমনটা বলছেন,
'রোগ সারানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করাই সব থেকে উত্তম। প্রথম পর্যায়ে করণীয় হলো বিবাহ বহির্ভূত দুই নারী পুরুষের নির্জনে দেখা সাক্ষাৎ না করা ও কথাবার্তা না বলা।' [৩৭১]
কাজেই প্রেম-যিনা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের অবশ্যই প্রকাশ্য এবং গোপন ফ্রি-মিক্সিং থেকে বাঁচতে হবে। পর্দা করতে হবে, দৃষ্টির হিফাযত করতে হবে।
দুই.
যে স্যারের প্রাইভেটে বা কোচিং-এ মেয়েরা থাকে সেই স্যারের প্রাইভেট বা কোচিং জমজমাট হয়- এমনটা আমরা দেখে আসছি সেই ছোটবেলা থেকেই। অধিকাংশ প্রেমেরই সূচনা হয় এভাবে সহশিক্ষা (কো-এডুকেশন) থেকে। তাই স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, কোচিং- সবকিছু বয়েস অনলি বা গার্লস অনলি রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করো। কো-এডুকেশনের চাইতে ছেলে মেয়ে আলাদা আলাদা থাকলে পড়াশোনাও ভালো হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চোখের হিফাযত করা, ফ্রি-মিক্সিং এড়ানো আসলে তোমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তোমাদের জন্য কিছু টিপস:
১। ক্লাসে কখনোই বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে বসবে না; কেউ পাশে এসে বসলে, উঠে অন্য বেঞ্চে চলে যাবে।
২। বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা বলবে না, নাম জিজ্ঞেস করারও দরকার নেই। কেউ কথা বলতে আসলেও যেনো তোমার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারে, তুমি কথা বলতে আগ্রহী না। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখবে না। কেউ মেসেজ দিলেও সিন করবে না। গ্রুপ স্টাডি করবে না।
৩। পর্দা ছাড়া বা পর্দাসহ ছেলে মেয়ে ছবি তোলা পর্দার খেলাফ এবং শরীয়াহর সীমানা বহির্ভূত মেলামেশা। পর্দা করেও ছেলেমেয়ে একসাথে ছবি তোলা যাবে না। আপুরা, তোমরা বান্ধবীদের সাথেও গ্রুপ ছবি তুলবে না। কোনো বান্ধবী যদি তোমার সিঙ্গেল ছবিও তুলতে চায়, তুলতে দেবে না। কারণ, এসব ছবির গন্তব্য হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় অথবা তার ফোন থেকে তার ভাই, স্বামী বা অন্য কেউ তা দেখে ফেলতে পারে। অনলাইনে দেওয়া তোমাদের ছবি এডিট করে পর্নসাইট, চটি পেইজে দিয়ে দেওয়ার, ব্ল্যাকমেইল করার লোকের অভাব নেই। আর এটা না হলেও তোমাদের ছবি দেখে অনেকেই সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগে, মাস্টারবেট করে। এটা নির্মম বাস্তবতা。
৪। বার্থডে সেলিব্রেশন, র্যাগ ডে বা এরকম অন্য কোনো অনুষ্ঠানের নামে রং মাখামাখি, ছেলে মেয়ের একে অপরের টিশার্টে অশ্লীল মন্তব্য লেখা টাইপ কোনো ধরনের কোনো কাজে অংশগ্রহণ করবে না।
৫। ছেলেমেয়েদের আড্ডায় কখনো অংশ নেবে না, ট্যুর যদি ফ্রি-মিক্সিং এর হয়, তাহলে যাবে না। ব্যাচ ট্যুরগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেক্স ট্যুরে পরিণত হয়ে গেছে।
৬। বন্ধুত্ব করার আগে যাচাই করে নেবে। কারণ মানুষ তার বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং সচ্চরিত্রের মানুষদের সাথেই বন্ধুত্ব করবে। না হলে দেখবে তোমার বন্ধু বা বান্ধবীরাই তোমাকে গুনাহর দিকে ঠেলছে, ফুসলাচ্ছে। ওদের অশ্লীল আড্ডাবাজিতে তুমিও প্রভাবিত হয়ে যাবে। তবে ওদেরকে একদম এড়িয়ে চলবে না। তাদের সাথেও আন্তরিকভাবে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে হাসিমুখে কথা বলবে, বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে যাবে।
৭। ছেলেরা দাড়ি রাখবে, প্যান্ট টাখনুর উপরে রাখবে, পোশাক-আশাকে সুন্নাহ মেনে চলার চেষ্টা করবে। দেখবে ক্যাম্পাসের বা ক্যাম্পাসের বাইরের মেয়েরাও নিজেরাই তোমাকে এড়িয়ে চলছে। আপুরাও শরীয়াহ অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে পর্দা করবে। [৩৭২] সেক্যুলার সমাজ আর সাংস্কৃতিক জমিদাররা যতই দাবি করুক- যা খুশি পরবো, এতে সমাজের কী- তাদের এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়, বিজ্ঞান এবং যুক্তিসম্মতও নয়। আর ইসলামসম্মত তো নয়-ই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
'আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে।' [৩৭৩]
'হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[৩৭৪]
পর্দা করো। জিন্সের প্যান্ট আর ফুলহাতা শার্ট পরে শুধু মাথায় স্কার্ফ লাগানোকে পর্দা বলে না। শরীর আঁকড়ে ধরা টাইট গাউন পরে পর্দার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। আশা করি এ বাস্তবতাগুলো তুমি বুঝো। পর্দা করে সব করা যায়-এ ধরনের মুখরোচক স্লোগানের শুদ্ধতা প্রমাণের জন্য পর্দা করে নাচ, গান কিংবা টিকটক করলেও হবে না। পর্দা করার অর্থ শুধু শরীর ঢাকা না। নিজের আচরণ ও কথাকে নিয়ন্ত্রণ করাও পর্দার অংশ। আল্লাহর আইনের ফাঁকফোঁকর খোঁজার চেষ্টা করো না। ইসলামের শিক্ষা ও সীমারেখা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার চেষ্টা করো। ইনশাআল্লাহ ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে কোথাও ছেলেরা তোমার কাছে ঘেঁষবে না।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বেশ বিখ্যাত একটা হাদীস আছে। তিনি বলেছেন,
'দুই প্রকার জাহান্নামি মানুষ আসবে; যাদেরকে আমি আমার যুগে দেখতে পাচ্ছি না। এক প্রকার হলো, ঐ সব নারী যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকবে। তারা পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে। তাদের মাথার খোঁপা উটের কুঁজের মতো (উঁচু, যা) এদিক-ওদিক হেলানো থাকবে।
তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না; এমনকি তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ, জান্নাতের সুঘ্রাণ ৫০০ বছর রাস্তার দূরত্ব থেকেও অনুভব করা যাবে। [৩৭৫]
হাদীসটির অর্থ ভালোমতো বুঝে নাও। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম নাওয়াউয়ী এবং অন্যান্য বিখ্যাত আলেমগণ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
'কাপড় পরেও উলঙ্গ হলো সেই সমস্ত নারী, যারা এতো পাতলা কাপড় পরে যে, কাপড়ের মধ্য দিয়ে তাদের গায়ের চামড়া দেখা যায়, অথবা এমন টাইট পোশাক পরে, যার কারণে তাদের শরীরের আকৃতি বুঝা যায় অথবা তাদের শরীরের কিছু অংশ আবৃত থাকে আর কিছু অংশ উন্মুক্ত থাকে...'
'তারা পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে'-এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন,
'তারা এমনভাবে সাজসজ্জা করবে, হাঁটাচলা করবে, এমন আচার-আচরণ করবে, যাতে অপরিচিত আগন্তুক পুরুষদের আকৃষ্ট করা যায়। প্রলুব্ধ করা যায়।'[৩৭৬]
তোমার আচার-আচরণকে এই হাদীসের আঁতশ কাচের নিচে ফেলে পরীক্ষা করে দেখো। প্রয়োজনে নিজেকে বদলে ফেলো। আপু, কোনোমতেই এমন নারীদের লিস্টে তোমার নাম তুলো না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কাজগুলোর ব্যাপারে এমন সতর্ক করেছেন সেগুলোকে নারীবাদী, প্রগতিশীল-সুশীলরা, আজকের এই সেক্যুলার সমাজ জাতে ওঠার, স্মার্ট হবার, নারী স্বাধীনতার, উন্নয়ন আর প্রগতিশীলতার ফিচার বানিয়েছে। আপু, চিনে নাও তোমার শত্রুদের। সাবধান থাকো! এই হাদীসে যে বিষয়গুলোর কথা এসেছে সেগুলোকে কিন্তু কিয়ামতের আলামতের মধ্যে গণ্য করা হয়।
৮। ছেলেরা দ্বীনি ভাইদের সাথে পরিচিত হবে, যোগাযোগ রাখবে। মসজিদে সালাতের পর যে আমলগুলো হয়- যেমন হাদীস পড়া, কুরআন শিক্ষা করা- এসবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। আপুরাও, দ্বীনি বোনদের সাথে পরিচিত হয়ে একটা শক্ত কমিউনিটির মতো থাকবে। এতে ঈমান আমল টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা যেমন পাবে, তেমনি পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে।
৯। একান্ত বাধ্য হয়ে যদি কখনো বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা বলতেই হয় তাহলে যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই কথা বলবে, বেশি স্মার্ট হয়ে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করবে না। দৃষ্টির হিফাযত করবে। মেয়েরা কথা বলার সময় হাত নেড়ে নেড়ে কোমল সুরে তিন আলিফ টান দিয়ে ভাইয়া...য়া- বলবে না।[৩৭৭] কথা সংক্ষিপ্ত রাখবে। পাশ্চাত্যের ভদ্রতা হচ্ছে কথা বলার সময় চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) আমাদের ভদ্রতা শিখিয়েছেন এভাবে- কোনো প্রয়োজনে নারী পুরুষের কথা বার্তা হলে পারতপক্ষে চেহারার দিকে না তাকানো। তুমি কোনটা মানবে, সিদ্ধান্ত তোমার।
১০। বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে ল্যাব গ্রুপ, প্রজেক্ট গ্রুপ, অ্যাসাইনমেন্ট গ্রুপ করবে না। ভদ্র ভাষায় স্যারদের অনুরোধ করবে। অনেকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য কিংবা পড়াশোনা করতে হয় তাই করা- এমন চিন্তাভাবনা থেকে পড়ে। বাংলা, চারুকলা, দর্শন, হিসাববিজ্ঞান টাইপের বিষয়গুলোর ডিগ্রির জন্য পর্দার মতো ফরজ বিধান পালনে ব্যর্থ হবার ঝুঁকি নেবে কি না, সে ব্যাপারেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার মনে হয়।
১১। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে সরাসরি রুমে/বাসায় চলে আসবে। ক্যান্টিনে, গাছতলায়, মাঠে, লাইব্রেরিতে, বারান্দায়, করিডোরে বসে আড্ডা দেবে না।
১২। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে টিউশনি করাবে না। টিউশনি করাতে গিয়ে স্টুডেন্ট এর মা, বোন, ভাই, বাবা (মেয়েদের ক্ষেত্রে) এদের কাছ থেকেও চোখের হিফাযত করতে হবে। টিউশনি করাতে গিয়ে ছাত্রীর সাথে, ছাত্রীর বোন, মা ইত্যাদির সাথে প্রেম, পরকীয়া যিনা, ধর্ষণ এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা। টিউশনি করাতে গিয়ে স্টুডেন্টের বাবা-ভাইদের হাতে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। আপুরা খুব সাবধান। স্টুডেন্টকে তুমি ছোট ভাইয়ের মতো মনে করলেও, সে কিছু বোঝে না, তুমি এমন ভাবলেও- তারা আজকাল অনেক কিছুই বোঝে। [৩৭৮]
যতো টাকাই দিক না কেন আর তুমি যতোই সমস্যায় থাকো না কেন, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো। এই অফার ছাড়লে আল্লাহ তোমাকে এর বিনিময়ে আরো অনেক ভালো অফার দেবেন। আমাদের একজন বন্ধু বেশ মোটা টাকার একটা টিউশনির অফার পায়। তিন জন মেয়েকে পড়াতে হবে। বন্ধু রাজি হয়নি। আল্লাহ পরে তাকে জীবিকার খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যখন তুমি আল্লাহর জন্য কোনো জিনিস বিসর্জন দেবে আল্লাহ তা'আলা এর চাইতে উত্তম বিনিময় দান করবেন।[৩৭৯]
*** ক্যাম্পাসের বাইরেও যেসব জায়গায় চোখের হিফাযত করতে ফ্রি-মিক্সিং এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না সেসব জায়গা এড়িয়ে চলো। যেমন-
ক। বিয়েশাদীর ফ্রি-মিক্সিং অনুষ্ঠানে যাবে না। নতুন প্রেমের সূচনা হয় এই অনুষ্ঠানগুলোতে।
খ। ভ্যালেন্টাইন্স, পহেলা বৈশাখসহ এ ধরনের অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে প্রয়োজন না পড়লে বাসার বাইরে বের হবে না।
গ। মেয়েদের স্কুল কলেজ কোচিং যেসব এলাকায় থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলবে। কাপলদের আড্ডা বসে যে রাস্তায়, পার্কে, রেস্টুরেন্টে, কফিশপে- ভুলেও সেদিকের ছায়া মাড়াবে না। বিনোদনকেন্দ্র গুলোতে যদি কোনো কারণে যাওয়াই লাগে তাহলে এমন সময় বা দিনে যাবে যখন ভিড় কম থাকে।
ঘ। লোকাল বাসে দরকার হলে দাঁড়িয়ে থাকবে কিন্তু মেয়েদের পাশে বসবে না। দূরের ভ্রমণে মেয়ের পাশে সিট পড়লে সিট বদলে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সাথে বই রাখবে। পুরো রাস্তা বই পড়বে বা লেকচার শুনবে। ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে আরো ভালো!
ঙ। রাস্তাঘাটে চলার সময় মাথা নিচু করে হাঁটবে। মাটির দিকে তাকিয়ে। মেয়েরা পর্দা করলো কি না সে চিন্তা বাদ দিয়ে তুমি নিজের চোখের হিফাযত করার চেষ্টা করবে। আল্লাহকে স্মরণ করবে।
উচ্চারণ: 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্কি ওয়াল আ'মালি ওয়াল আহওয়ায়ি।'
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে খারাপ চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই।'[৩৮০]
এ ধরনের বেশ কিছু দু'আ আছে। মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে সঠিক উচ্চারণ শিখে মুখস্থ করে নেবে। বেশি বেশি দু'আ করবে।
চ। লিফটে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে একাকী উঠবে না। লিফটে মাঝে মাঝেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সময় দরজার দিকে সরাসরি মুখ করে থাকবে না। দরজা খুললেই কোনো রূপসীর দিকে তোমার চোখ পড়ে যেতে পারে। দরজার এক পাশে দাঁড়াবে।
ছ। ব্যাংক, দোকান, টিকেট কাউন্টার ইত্যাদি স্থানে যেখানে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ থাকবে, সুযোগ থাকলে সেখানে না গিয়ে অন্যটাতে যাবে।
জ। ভাবী, দেবর, দুলাভাই, কাযিন এদের সাথে আরো কঠোরভাবে পর্দা করবে। ভাবী, দুলাভাই, কাযিনদের সাথে পরকীয়া, প্রেম, যিনা-ব্যভিচার, খুন ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটে। [৩৮১]
এমন আরো অনেকগুলো বিষয় আছে, কিন্তু মূল পয়েন্ট এগুলোই। আশা করছি একটা ধারণা পেয়েছো।
তিন. শুধু অফলাইনে না, অনলাইনেও ফ্রি-মিক্সিংয়ের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটকসহ যা যা আছে বিপরীত লিঙ্গের সবাইকে আনফ্রেন্ড করে দেবে। কাযিন ইত্যাদি যারা আছে তাদেরকেও আনফ্রেন্ড করে দাও। যদি না-ই পারো তাহলে আনফলো করে দাও, তাহলে তাদের ছবি তোমার ওয়ালে আসবে না। তোমার যেসব বন্ধুরা মেয়েদের ছবি-ভিডিও শেয়ার দেয় তাদেরকেও এভাবে আনফলো করে রাখতে পারো। নাটক-সিনেমার ক্লিপ পোস্ট করা পেইজ, ফিমেইল সেলিব্রেটিদের পেইজ, প্রেমের লুতুপুতু মার্কা বিভিন্ন পেইজ, ক্রাশ এন্ড কনফেশন টাইপ গ্রুপ, চ্যানেল, আইডি সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। কোনোভাবেই বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যোগাযোগ করা যাবে না।
ফ্রেন্ডলিস্টে এমন কাউকে ফলো করবে না, যারা তাদের প্রেমিকা বা বউ এর সাথে ছবি আপলোড দেয়, চেক-ইন দেয়, খুনসুটির গল্প শেয়ার করে। এগুলো তোমার বুকের বাম পাশের চিনচিনে ব্যথার জন্ম দিতে পারে। হেল্প সিকিং বিভিন্ন গ্রুপে বিপরীত লিঙ্গের পোস্টে লাইক কমেন্ট করবে না। লাভ রিয়্যাক্ট দেবে না। [৩৮২] কেউ জরুরি কিছু জানতে চাইলেও তোমার কমেন্ট করার দরকার নেই। অন্য বোনেরা-ভাইয়েরা আছে, তারা জানাবে।
কখনোই বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ইনবক্স করবে না। হোক সে আলেম। আপু, তোমার কিছু জানার দরকার পড়লে নারী আলেমদের কাছে যাও বা তোমার মাহরাম পুরুষের মাধ্যমে কোনো আলেমের কাছ থেকে জেনে নাও। বিপরীত লিঙ্গের কেউ মেসেজ করলে রিপ্লাই দেওয়া দূরের কথা, সিনও করবে না। সে যতো বড় আলেম, লেখক বা ফেইসবুক সেলিব্রেটিই হোক না কেন।[৩৮৩] ইসলামের ব্যাপারে বিপরীত লিঙ্গের কেউ কিছু জানতে চাইলেও একই কথা প্রযোজ্য। [৩৮৪]
দ্বীনি কোনো বিষয়ের উপর অনলাইন কোর্সে ভর্তি হলে অবশ্যই দেখে নিবে সেখানে নারী পুরুষের আলাদা ক্লাস হয় কি না। উস্তাদ বিবাহিত কি না। উস্তাদের স্বীকৃতি আছে কি না, অন্যান্য আলেম উলামারা তাকে চেনেন কি না। যদি না হয়- তাহলে ভর্তি হবার দরকার নেই। এসব কোর্সে ক্লাস করতে গিয়ে 'হালাল প্রেম', শুরু করা মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম না।
বাস্তবজীবনে চোখের হিফাযত করো, অনলাইনে ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করো, আবার ইনবক্সে বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের সাথে দ্বীন চর্চা করো, কমেন্ট চালাচালি করো, পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দাও- এটা একধরনের ভণ্ডামি। আত্মমর্যাদাশীল কোনো মানুষের পক্ষে এমন কিছু করা সম্ভব না। আল্লাহর অবাধ্য হয়েই বিপরীত লিঙ্গের সাথে যোগাযোগ শুরু করতে হয়। আর আল্লাহ অবাধ্যতা করে কীসের দাওয়াহ? আল্লাহকে ভয় করো।
পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিলে, কমেন্ট করলে বা ইনবক্সে দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করলে, এমন আর কী হয়- এ ধরনের প্রশ্ন কেউ কেউ করে বসে। দেখো এগুলো ছোট ছোট আগুনের স্ফুলিঙ্গ। এগুলোই ধীরে ধীরে বিশাল এক আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বারসিসার ঘটনা জানো?
বারসিসা[৩৮৫] ছিল খুব ইবাদাতগুজার লোক। যুদ্ধে যাবার আগে তিন ভাই তাদের একমাত্র বোনকে বারসিসার যিম্মায় রেখে যেতে চাইলো। প্রথমে না করলেও, ভাইদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে বারসিসা রাজি হলো। ঠিক হলো বারসিসা থাকবে তার নিজের বাসায়। আর মেয়েটি থাকবে অন্য এক বাসায়। রোজ খাবার তৈরি করে মেয়েটির ঘরের দরজায় রেখে আসতো বারসিসা। কথা বলতো না। কিছুদিন কেটে গেল এভাবে। কিন্তু আস্তে আস্তে বারসিসা শয়তানের ফাঁদে পা দিলো।
শয়তান তাকে বোঝালো- এভাবে খাবার দিয়ে চলে আসা তো অভদ্রতা, তাকে ডেকে খাবার দিয়ে আসো। বারসিসা তাই করতে শুরু করলো। তারপর শয়তান বললো, তার সাথে দুই-একটা কথা বলো, কথা বললে আর কী হবে? বারসিসা তাই করলো। তারপর শয়তান বললো- ঘরের মধ্যে বসে একটু কথা বললে আর কী হবে- মেয়েটা সারাদিন একা একা থাকে। বারসিসা শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া দিলো। এভাবে একটু করলে কী হয়... থেকে শুরু করে এক পর্যায়ে বারসিসা সেই মেয়ের সাথে যিনা করলো। মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে সন্তান জন্ম দিলো।
ততদিনে ভাইদের ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে। বারসিসা প্রচণ্ড ভয় পেলো। শয়তান এবার বুদ্ধি দিলো- ভাইয়েরা যদি এসে এই অবস্থা দেখে, তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেবে। তুমি বরং ঝামেলা মিটিয়ে ফেলো! শয়তানের পরামর্শে বারসিসা সেই মেয়ে ও তার সন্তানকে খুন করে কবর দিলো। ভাইয়েরা ফিরলে কান্নাকাটি করে বললো- তোমাদের বোন অসুখে মারা গেছে। ঐখানে কবর দিয়েছি। ভাইয়েরা কান্নাকাটি করে চলে গেল। কিন্তু রাতে শয়তান গিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে তিন ভাইকে সত্যটা জানিয়ে দিলো। পরদিন তিন ভাই মিলে বারসিসার কাছে আসলো। মেয়েটির কবরে তার সন্তানের লাশও দেখতে পেলো। নিশ্চিত হলো, বারসিসাই তাদের বোনকে হত্যা করেছে। তারা বারসিসাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো। তারা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন শয়তান এসে বারসিসাকে বললো, তুমি যদি আমাকে সিজদাহ করো তাহলে আমি তোমাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করবো, বারসিসা তাই করলো। তারপর? তারপর শয়তান বারসিসাকে ত্যাগ করলো।
এভাবে, একটু কথা বললে কী হয়, একটু তাকালে কী হয়... এই একটু একটুর ফাঁদে পড়ে বারসিসা যিনা করলো, খুন করলো, শিরক করলো, তারপর তাকে সেই অবস্থায় মরতে হলো।[৩৮৬]
আমাদের সমাজেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে সদ্য দ্বীনে ফেরা বোনেরা দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা, আবেগের কারণে খুব সহজেই অনলাইনের ফাঁদে পড়ে যায়। ফেইসবুকে কেউ ইসলাম নিয়ে একটু ভালো লিখলেই, দাড়ি-টুপিওয়ালা কেউ সুন্দর করে দুটো কথা বললেই, নাশীদ গাইলেই, বই লিখলেই তাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি শুরু হয়ে যায়। দ্বীন শেখা কিংবা দাওয়াহর ফাঁদে পড়ে দিল দিয়ে বসে থাকে। গোপনে ব্ল্যাকমেইল করে। দ্বীনি মুখোশধারী ছেলেপেলে বিয়ে করে কয়দিন ভোগ করে ছেড়ে দেয়। মনে রেখো, শরীয়াহ দ্বীনি ভাই-দ্বীনি বোনদের জন্য আলাদা না। সেলিব্রেটিদের জন্য আলাদা না। আলিমদের জন্য আলাদা না। শরীয়াহর বিধান সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
অনলাইনের জগৎটা বাস্তব দুনিয়া থেকে পুরোই আলাদা। এখানে খুব সহজেই ভান ধরা যায়। অনলাইনে কাউকে ভালো ভাবার দরকার নাই। আবার খারাপ ভাবারও দরকার নেই। কিছুই মনে করার দরকার নেই। বাস্তবজীবনে ইন্টার্যাকশ্যান হয়নি, চেনো না এমন ভাই বা বোনদের খুব বেশি আপন ভাবার দরকার নেই। ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার দরকার নেই। ছবি শেয়ার বা ভিডিও কলে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। যাকে একেবারেই চেনো না, তার সাথে জরুরি কথা ছাড়া কোনো কথাই বলবে না। পার্সোনাল কোনো তথ্য জানাবে না。
বোনরা মনে রেখো, আজকাল অনেক ছেলেই মেয়ে সেজে আইডি চালায়। তাই অনলাইনে নতুন কোনো বোনের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হলে তার সম্পর্কে যতটুকু পারো খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করবে। ভয়েস মেসেজ ও ছবি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কোনো বোন যদি বারবার তোমার ভয়েস মেসেজ বা ছবি চায় তাহলে তাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। শুধু অনলাইনের সম্পর্কগুলো শক্তিশালী হয় না। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে থাকে এখানে। ছবি শেয়ারের প্রসঙ্গ যখন আসলো তখন অনেকবার বলে আসা কথাটা আর একবার মনে করিয়ে দেই। কখনোই তোমার খোলামেলা ছবি তুলবে না, ভিডিও করবে না। স্বামীর জন্যেও না। স্বামীকেও তুলতে দিবে না। এটা জায়েজ নেই।[৩৮৭] মেসেঞ্জারে, ওয়াটসঅ্যাপে ছবি আদানপ্রদান করবে না। ভিডিও কলে অশালীন পোশাক পরবে না। হতে পারে তার ফোন হারিয়ে গেল, হতে পারে আইডি হ্যাক হলো, হতে পারে তার সাথে তোমার ডিভোর্স হয়ে গেল।[৩৮৮] বারবার বলার পরও এই ভুলটা বারবার হচ্ছে এবং ভয়ংকর মাশুল গুনতে হচ্ছে।
মূল কথা হলো, রাসূল (ﷺ)-এর কথা মেনে বাস্তব দুনিয়ার তুমি যেমন বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে শরীয়াহসম্মত কারণ ছাড়া কথাবার্তা বলবে না, নির্জনে (মানে তোমরা ছাড়া আর কেউ নেই) কথাবার্তা বলবে না, আলাপ আলোচনা করবে না, তেমনি অনলাইনেও ইনবক্সের নির্জনতায় করবে না।[৩৮৯]
***
খলীফাহ উমার একবার আরেক সাহাবী উবাই ইবনু কা'বকে (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) প্রশ্ন করেছিলেন, তাকওয়া কী? জবাবে উবাই রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনি কখনো কাঁটা বিছানো পথে হেঁটেছেন? -হ্যাঁ। কীভাবে হেঁটেছেন? -খুব সাবধানে, কষ্ট সহ্য করে হেঁটেছি, যাতে আমার শরীরে কাঁটা বিঁধে না যায়। এটাই হলো তাকওয়া। [৩৯০]
কাঁটা বিছানো পথে মানুষ যেভাবে সতর্ক হয়ে চলে, ঠিক সেভাবে আখিরাতের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য হারাম থেকে বেঁচে থাকা আর পুরস্কারের জন্য আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেই আমল করার নাম তাকওয়া। তাকওয়ার এই কনসেপ্টটা যদি তুমি বুঝতে পারো, যদি বসিয়ে নিতে পারো নিজের মনে ও মস্তিষ্কে, তাহলে এতোক্ষণ যা কিছু বললাম তা বোঝা এবং মানার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারী মুত্তাকিনদের ভালোবাসেন।' [৩৯১] 'যে তাকওয়া অবলম্বন করলো, আল্লাহ তার জন্যে কাজগুলোকে সহজ করে দেবেন। [৩৯২]
টিকাঃ
[৩৬০] নায়িকা, গায়িকা, মডেল, অনলাইন সেলিব্রেটি
[৩৬১] মেয়ে একটু বেশী প্রশ্রয় দিলে বলে অমুক পর্নস্টারের পর্ন দেখছিলাম...
[৩৬২] পাবজি বন্ধুদের বিরুদ্ধে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, সময় নিউজ, অক্টোবর ১৬, ২০২০- tinyurl.com/4ckw2dbt জন্মদিনের অনুষ্ঠানে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ, যুগান্তর, জুন ১৯, ২০২২-tinyurl.com/ mpvt4w6m
প্রথমে ধর্ষণ করলো দুই বন্ধু, সাহায্য চেয়ে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীটি, প্রথম আলো, আগস্ট ০০৮, ২০২২- tinyurl.com/kep9j7nf
ভাইয়ের দুই বন্ধুর হাতে স্কুলছাত্রী ধর্ষিত, ইনকিলাব, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ tinyurl.com/muckff4k
[৩৬৩] সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩
[৩৬৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩২
[৩৬৫] বুখারী: ৫০৯৬, মুসলিম: ২৭৪০ (ইফা. ৬৬৯৪)
[৩৬৬] মুসলিম: ২৪৭২ (ইফা. ৬৬৯৭)
[৩৬৭] তিরমিযী: ২১৬৫। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
[৩৬৮] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৫৩
[৩৬৯] ইবন মাজাহ: ১০০০। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[৩৭০] নারী-পুরুষের দেখাদেখি, নির্জনে অবস্থান ও সহাবস্থান সংক্রান্ত বিবিধ ফতোয়া, islamhouse.com- tinyurl.com/ywwxb3n5
[৩৭১] ইসলামে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম পাবলিকেশন, পৃষ্ঠা -১১৭
[৩৭২] তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্দার কারণে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া, বিরূপ মন্তব্য করা, মারধর করা, জঙ্গি, উগ্রবাদী, জামাত-শিবির বানানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে। যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। হিজাব পরায় ছাত্রীকে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন শিক্ষক, জাগো নিউজ, এপ্রিল ২৭, ২০১৬-tinyurl.com/wfryvdn4 পর্দা করায় শিক্ষার্থীকে জঙ্গি আখ্যায়িত করে বের করে দিলেন শিক্ষক, eyenews.news, আগস্ট ২২, ২০২২- tinyurl.com/4yfufr7v ঢাবিতে পর্দাকারী ৩ জনের ১ জন নারী বৈষম্যের শিকার, ইনকিলাব, এপ্রিল ১, ২০২২-tinyurl. com/mrspztff ক্লাসে নেকাব না খোলায় ছাত্রীকে শাসালেন ইবি শিক্ষক, নয়া দিগন্ত, মার্চ ২৯, ২০২২-tinyurl.com/2p9rkded
হিজাব পরায় ১৮ ছাত্রীকে পেটালেন হিন্দু শিক্ষিকা, সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, ইনকিলাব, এপ্রিল ৯, ২০২২- tinyurl.com/2p8rvvys
বোরকা পরলে আবার ঢাবিতে পড়ার শখ কেন? bd-journal.com, মার্চ ৩১, ২০২২-tinyurl. com/mmuvbmtr
[৩৭৩] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩১
[৩৭৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৫৯
[৩৭৫] মুসলিম: ২১২৮ (ইফা. ৫৩৯৭)
[৩৭৬] মাজমু'উল ফাতাওয়াঃ ২২/১৪৬ Meaning of Hadith "Women will be Clothed yet Naked", daruliftaa.com- tinyurl. com/2p9bwb5a
[৩৭৭] যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পরপুরুষদের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের মানুষ প্রলুব্ধ হয়।" [সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৩২]
[৩৭৮] স্কুলছাত্রী অদিতাকে যেভাবে হত্যা করে গৃহশিক্ষক রনি, আরটিভি নিউজ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২- tinyurl.com/4d47whn3
টিউশনি করাতে গিয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ: শিক্ষক গ্রেফতার, সুরমা নিউজ ২৪ ডট নেট, মার্চ ০৪, ২০২০- tinyurl.com/ymm9rhwu
টিউশনি দেওয়ার কথা বলে প্রেমের ফাদে তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা, sonaymoritv.com, মে ৬,২০২২- tinyurl.com/mvkbsxva
টিউশনি করাতে গিয়ে গৃহকর্তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণী, অতঃপর.......probashirnews.com, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮-tinyurl.com/bp782s68
[৩৭৯] মুসনাদে আহমদ: ২৩০৭৪। হাইসামী হাদিসটির বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/২৯৯, সহীহাহ ২/৭৩৪)
[৩৮০] তিরমিযী: ৩৫৯১। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[৩৮১] দুলাভাইয়ের হাতে ধর্ষিতা কিশোরীর চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ, যুগান্তর, জুলাই ০১,২০১৮- tinyurl.com/29jc42pd
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী ৭ মাসের অন্ত:সত্ত্বা, ধর্ষক দুলাভাই গ্রেপ্তার, জনকণ্ঠ, আগস্ট ১৭, ২০২২-tinyurl.com/3tw3vhn2
আড়াইহাজারে বিয়ের প্রলোভনে চাচাতো বোনকে ধর্ষণ, যুগান্তর, এপ্রিল ১৮, ২০১৮- tinyurl. com/y3mp6ktu
হাজীগঞ্জে শালী-দুলাভাই পরকীয়ায় বোন ও স্বামীর হাতে গৃহবধূ খুন, চাঁদপুর টাইমস, অক্টোবর ১৮, ২০১৮-tinyurl.com/yz4r2392
নানিকে দেখতে গিয়ে খালাতো ভাইয়ের হাতে ধর্ষণের শিকার শিশু, দেশ রূপান্তর, আগস্ট ২৬, ২০১৯- tinyurl.com/bdh3ca2r
দেবরের হাতে ধর্ষিত গৃহবধূর বিষপানে আত্মহত্যা, প্রতিদিনের সংবাদ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৬- tinyurl.com/5dn2rtuw
নবী (ﷺ) বলেছেন, 'দেবর-ভাসুর মৃত্যু সমতুল্য ভয়ানক বিষয়।' অর্থাৎ মৃত্যু যেমন জীবনের জন্য ভয়ানক, অনুরূপভাবে চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোন ও দেবর-ভাবী ও শালিকা- দুলাভাইয়ের সাক্ষাৎ ঈমান আমলের জন্য তদ্রূপ ভয়ানক। [বুখারি: ৫২৩২, মুসলিম: ২১৭২]
[৩৮২] আপু, তুমি হয়তো কোনোকিছু না ভেবে এমনিতেই লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছো। কিন্তু তোমার লাভ রিয়্যাক্ট পেয়ে সেই দ্বীনি ভাইটির দিল মে লাড্ডু ফোটা শুরু হয়ে গিয়েছে। আরে সে আমার পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছে মানে আমাকে সে পছন্দ করে, ভালোবাসে।
[৩৮৩] কেউ তোমাকে হাই/হ্যালো করার জন্য নক দিলেই বুঝবে সে একটা ফাতরা ভণ্ড।
[৩৮৪] সম্মানিত আলেম উলামারা তাঁদের সম্মানিত স্ত্রীদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। অন্যথায় না দেওয়ায় উত্তম। (আমরা আপনাদের উপদেশ দেবার স্পর্ধা দেখাচ্ছি না। আল্লাহ এ থেকে আমাদের হিফাযত করুক)। সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে অবিবাহিত আলিমদের বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে অনলাইনে আলাপ আলোচনা, ইনবক্সে মেসেজ আদান প্রদান না করাই অধিক তাকওয়ার প্রমাণ বলেই মনে হয়। আল্লাহু আলম।
[৩৮৫] বারসিসার ঘটনাটি কুরআন বা হাদিসের ঘটনা নয়। এটি একটি ইসরাঈলী বর্ণনা, যা বিভিন্ন উলাম তাঁদেরা আলোচনায় এনেছেন। এটি কেবল শিক্ষণীয় ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, যার সত্যতা সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলা অবগত।
[৩৮৬] বিস্তারিত শোনো- বিষাক্ত তীর ২, Lost Modesty, Lost Modesty Youtube Channel, ফেব্রুয়ারি ২৩,২০১৯- tinyurl.com/4wtpm2yu
[৩৮৭] He wants to photograph his wife naked so that he can look at the pictures when he is away! Islamqa - tinyurl.com/ze7pre8n
[৩৮৮] ফেসবুকে স্ত্রীর নগ্ন ছবি পোস্ট, স্বামী গ্রেফতার, ডেইলি বাংলাদেশ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২ - tinyurl.com/mspf3983
[৩৮৯] তিরমিযী: ১১৭১
[৩৯০] তাফসীর ইবনু কাসীর, সূরা বাকারাহ, আয়াত ২
[৩৯১] সূরা আলে ইমরান: ৭৬
[৩৯২] সূরা তালাক: ৪
📄 ক্রীতদাস
প্রেমের একটি ভয়ঙ্কর ফাঁদ হলো ফ্রেন্ডযোন। একটা মানুষের আত্মসম্মান ধ্বংস করে তাকে অন্যের চাকর বানিয়ে ফেলে এটা। ছেলে, মেয়ে দুইদলের মধ্যেই এই সমস্যাটা দেখা দিলেও সাধারণত ছেলেরাই এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়।[৩৯৩]
ফ্রেন্ডযোন জিনিসটা আসলে কী?
ফ্রেন্ডযোন মানে ঠিক প্রেম করা না। এটা হচ্ছে প্রেমের প্রলোভনে চাকর বানানোর মতো। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মতো অনেকটা। ধরো, তুমি একজনকে পছন্দ করো। কিন্তু নানা কারণে তুমি তাকে প্রপোষ করতে পারো না; তাকে বলার মতো যথেষ্ট সাহস জোগাড় করতে পারো না; সে যদি প্রত্যাখ্যান করে, সে যদি রেগে যায়। তাই তুমি তাকে গিয়ে বললে, আমি তোমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাই। ও হয়তো এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছে তুমি তার জন্য প্রেমে দিওয়ানা। কিন্তু না বোঝার ভান করে সে তোমার সাথে বন্ধুত্ব চালিয়ে যায়। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে তুমি তাকে সরাসরি প্রপোষ করতেও ভয় পাও। তুমি আটকে গেলে ফ্রেন্ডযোনে। ফ্রেন্ডযোনে ফেঁসে গিয়ে প্রতিনিয়ত খুন হওয়া শুরু হলো তোমার।
আবার ধরো তুমি তাকে প্রপোজ করেছো। কিন্তু সে বললো, 'আরে, এসব তুমি কী বলছো! আমি তো তোমাকে খুবই ভালো একজন বন্ধু হিসেবে দেখি। আমি তো অন্য একজনের সাথে প্রেম করি।' তখন তুমি তার সাথে সম্পর্ক একেবারেই শেষ না করে বললে, 'আচ্ছা ঠিকাছে, আমাকে তোমার ভালোবাসতে হবে না, আমরা স্রেফ বন্ধু হয়েই থাকি।'
ঘরের খেয়ে বিনা পয়সায় অন্যের জন্য কামলা খাটার সংগ্রামী, মেহনতি এই জীবনে তোমাকে সুস্বাগতম! ফ্রেন্ডযোনে ফেঁসে গিয়ে তুমি যে অন্য একজনের চাকর হয়ে গেছো তার কিছু লক্ষণ:
১। অধীর আগ্রহে তুমি তার ফোন-মেসেজের জন্য অপেক্ষা করো। একটু পর পর চেক করো সে অনলাইনে আছে কি না। তোমার পাঁচটা মেসেজের বদলে সে একটা রিপ্লাই দিলে দ্বিগুণ উৎসাহে আরো দশটা মেসেজ দিয়ে দাও। তার সব ছবিতে তুমি লাভ রিয়্যাক্ট দাও, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করো তার রূপের।
২। সবসময় তোমার মাথাতে শুধু সে ঘোরাফেরা করে।
৩। তার সাথে ডেট করার স্বপ্ন দেখো তুমি। তার সাথে তোমার বিয়ে হবে, বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় করবে, হানিমুনে কোথায় যাবে, বাচ্চার নাম কী রাখবে-নানা হাবিজাবি জিনিস ভাবতে থাকো।
৪। সে ডাকলেই তুমি ছুটে আসো। তার জন্য সবসময় তুমি অ্যাভেইলেবল। রাত যতোই গভীর হোক, ঝড়, বন্যা, বৃষ্টি কিংবা অগ্ন্যুৎপাত হোক, কারফিউ জারি হোক, বিশ্বযুদ্ধ লাগুক-সে ডাকলেই তুমি ছুটে যাও।
৫। তুমি কখনো তাকে না বলতে পারো না। তোমার যতোই কষ্ট হোক না কেন, যতোই বাবা-মা'র অবাধ্য হওয়া লাগুক না কেন কিংবা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে যতো ছোট হতেই হোক না কেন, এমনকি কাজটা করতে তোমার মন তীব্রভাবে বাধা দিলেও সব কষ্ট, সব অনিচ্ছা জয় করে তুমি সেই কাজটা শুধু সে বলেছে বলে করে দাও।
৬। সে যা-ই বলুক বা করুক না কেন, তাতে তুমি প্রবলবেগে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাও। সারা দুনিয়ার মানুষ ভুল বললেও তুমি তা ঠিক বলো। তুমি তাকে অবিরাম সাপোর্ট দিয়ে যাও।
৭। সবসময় তুমি তার জন্য কিছু করার, তাকে ইম্প্রেস করার পরিকল্পনা করো। সে যে খাবার পছন্দ করে তুমি সেই খাবার রান্না করার চেষ্টা করো। ফুচকা খেতে পছন্দ করলে দু'দিন পরপরই তাকে ফুচকা খাওয়াতে নিয়ে যাও। তার পছন্দগুলো অনুকরণের চেষ্টা করো। সে যে সেলিব্রেটিকে পছন্দ করে তার মতো হেয়ারকাট, জামা কাপড় পরার চেষ্টা করো। সে বিটিএসের পাগলা ফ্যান হলে তুমিও বিটিএসের পাগলা ফ্যান হয়ে যাও।
৮। তুমি তার জীবনের সব সমস্যার সমাধানকারী, তুমি একাধারে তার পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট এবং বডিগার্ড। তুমি তার অ্যাসাইনমেন্ট করে দাও, তার ল্যাব রিপোর্ট লিখে দাও। কেউ তাকে টিয করলে, তার ছবিতে উল্টাপাল্টা কমেন্ট করলে তুমি তাকে মেরে আসো। তুমি তার ড্রাইভার, তুমি তার ক্যাশিয়ার, ফুচকার বিল সবসময় তুমিই দাও। তুমি তার ক্যারিয়ার কাউন্সেলর, তুমি তার ডাক্তার, তুমিই তার নার্স। তুমি তার মনোবিদ, তার মন ভালো করে দেবার দায়িত্ব তোমারই। বয়ফ্রেন্ডের সাথে তার ঝগড়া বা ব্রেকআপ হলেও ইমোশনাল সাপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব তোমার। [৩৯৪]
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন চলে আসে, একজন মানুষ কেন এসব করে? কেন স্বেচ্ছায় অন্য একজন মানুষের দাসে পরিণত হয়? প্রথম ও প্রধান কারণ, ঘুরেফিরে সেই একই-মোহ, হরমোনের খেলা, প্রেমকে জীবনের সবকিছু মনে করা, তাওহীদ না বোঝা, পৃথিবীতে আল্লাহ তাকে কেন পাঠিয়েছেন সেই কারণ সম্পর্কে বেখেয়াল থাকা।
পাশাপাশি প্রেমের অন্যান্য ব্যাপারগুলোর মতো এখানেও পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে নাটক, সিনেমা, গান, কবিতা, উপন্যাস। প্রগতিশীল মিডিয়ার ব্রেইনওয়াশের কারণে প্রেমাতাল মানুষেরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, এভাবে শত দুঃখ, বেদনা, অপমান সহ্য করে। আমি যদি কামলা খেটে যাই, তবে সহজেই সবকিছু উল্টে যাবে এবং ভালোবাসার স্বপ্ন পটে যাবেই। কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত খুন হয়ে, ব্যাপক সময় নষ্ট করে, প্রচুর শ্রম দিয়ে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে, বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে, ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে, টাকাপয়সা নষ্ট করে, নিজের সম্মানকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে আসলেই কি লাভ হয়?
আমার এক বন্ধু ছিল। ধরি তার নাম সবুজ। যে মেয়েটার হয়ে সে কামলা দিতো সেই মেয়েটার নাম ধরি চম্পা। [৩৯৫] ভার্সিটির চারটা বছর একনিষ্ঠভাবে কামলা খেটে গেছে সবুজ। এমনকি সকালে বুয়া নাস্তা বানাতে দেরি হলে সে খালি পেটে, এমনকি কখনো শুধু তেল দিয়ে ভাত মেখে খেয়ে ভার্সিটিতে দৌড় দিতো চম্পার খেদমতের উদ্দেশ্যে। চম্পা বুঝতো সবুজের মনের কথা। সবুজও মুখ ফুটে বলতে পারতো না। হঠাৎ একদিন সবুজের মেসেঞ্জারে একটা আংটির ছবি পাঠায় চম্পা। তারপর চম্পা আর অন্য এক ছেলের কাপল ছবি। এই ছেলের সাথেই অ্যাঙ্গেইজমেন্ট হয়েছে তার। ছেলে ইটালি থাকে। সবুজ বেকার। সবুজ আমার পাশেই বসে ছিল। আমি ল্যাপটপে লিখছি, আর সে একটু পর পর আমাকে পচাচ্ছে। [৩৯৬] মেসেজ আসার পর একেবারে চুপ হয়ে গেল সে। এই থম মেরে থাকাটা থেমে থেমে চালু থাকলো পরের কয়েকটা মাস। চরম ডিপ্রেশনে চলে গেল সে।
সবুজ পরে চম্পাকে মেসেজ দিয়েছিল, 'তুমি তো জানতে আমি তোমাকে ভালোবাসি... তারপরও কেন এমন করলে? আমাকে অন্তত একবার তো জানাতে পারতে!' সবুজের মেসেজ পেয়ে আকাশ থেকে যেন পড়েছিল চম্পা- 'ওমা! সেকি! আমরা তো কেবল খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। কখনোই তোমাকে নিয়ে আমি এমন কিছু ভাবিনি! কী বলছো তুমি এসব! ছি!'
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এভাবে কামলা খেটে, চাকর সেজে ফলাফল আসে না। এগুলো সিনেমার পর্দায় হয়। উপন্যাসের পাতায় হয়। বাস্তবে হয় না। সিনেমায় নায়ক থাকে একজন, কিন্তু তার বাস্তবতায় তো তুমি একাই নায়ক না, তার হাতে তো আরো অনেক অপশান আছে। কেন তোমার কাছেই সে থাকবে? একটা আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মসম্মানহীন, ব্যক্তিত্বহীন, নিজের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের ব্যাপারে উদাসীন ছেলের কাছে কেন সে থাকবে? না থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এভাবে কামলা খেটে আল্লাহর অসন্তুষ্টি, নিজের মর্যাদা নষ্ট করা আর একতরফা ব্রেকআপের ভয়ঙ্কর কষ্ট ছাড়া আর কী তুমি পেলে?
ভাই, তোমার একটা দাম আছে, সম্মান আছে। তুমি মানুষ, তুমি মুসলিম। তুমি সেই মানুষগুলোর একজন যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার। মানুষকে তন্ত্রমন্ত্রের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য পৃথিবীতে তোমার আগমন। সেই তুমিই এভাবে অন্য একজনের দাস হয়ে গেলে?
তুমি যখন মেয়েদের পেছন পেছন ঘুরো, ফ্লার্ট করার চেষ্টা করো, বেহায়ার মতো সব ছবিতে লাভ রিঅ্যাক্ট দাও... বিশ্বাস করো সেই মেয়ের চোখে তোমার দাম থাকে না, সম্মান থাকে না। তুমি ছোট হয়ে যাও তার কাছে। মেয়েরা সাধারণত আত্মসম্মানহীন, ব্যক্তিত্বহীন ছেলেকে পছন্দ করে না। সে ভেবে নেয় এই ছেলেটা আমার জন্য পাগল। একে দিয়ে আমি যা খুশি করিয়ে নিতে পারি। তোমার দুর্বলতা, দুর্বলতার গল্পের ডালপালা সাজিয়ে বন বানিয়ে সে তার ফ্রেন্ডদের সাথে হাসি তামাশা করে। দিনশেষে তুমি তার কাছে টিস্যু হয়েই থাকো। যে টিস্যু দিয়ে নাক ঝেড়ে উপেক্ষার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায় যখন তখন। তোমাকে সে আসলে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে চায় না। পছন্দ করে না। কিন্তু সে চায় তুমি তার সাথে থাকো। যেন তোমাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায়। মাঝে মাঝে তোমার সাথে এমন আচরণ করে যাতে মনে হয় সে তোমাকে ভালোবাসে। বোঝাতে চায়-তুমি তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সবই আসলে অভিনয়। ক্ষণিকের লোক দেখানো আবেগ।
মেয়েদের গালি দিও না। সে কি তোমার কাছে ওয়াদা করেছে বা তোমাকে লিখিত দিয়েছে যে এভাবে জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে দিলে সে তোমার হয়ে যাবে? তোমার জীবনের সব সমস্যার কি সমাধান হয়ে গেছে যে তুমি অন্যের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে ব্যস্ত হয়ে যাও? সেবাই মানুষের ধর্ম, মানুষকে সাহায্য করা মহান কাজ, আল্লাহ এতে খুশি হন-এইসব আবোলতাবোল ভূগোল বোঝানোর চেষ্টা করো না প্লিজ!
বাবাকে বাজার করতে সাহায্য করো? মাকে বাসার কাজে সাহায্য করো? তোমার ক্লাসের বন্ধুদের সাহায্য করো, তাকে যেভাবে সাহায্য করো সেভাবে? ছেলে বন্ধু কোনো একটা ল্যাব রিপোর্ট লিখে দিলে কিংবা বা অ্যাসাইনমেন্টের ছবি এঁকে দিলে ক্যান্টিনে গিয়ে সিঙ্গাড়া-সামুচা, কোল্ড ড্রিংকস আদায় করে নাও। আর ওর অ্যাসাইনমেন্ট বা ল্যাব রিপোর্টও তুমি নিজে থেকেই লিখে দাও! এটাই তোমার মানুষকে সাহায্য করার নমুনা?
বলতে কষ্ট লাগছে ভাই, তবু বলতে হচ্ছে, তুমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বোকা। কেউ সমস্যার সমাধান করে দিলেই মেয়েরা তার প্রেমে পড়ে যায় না। তাই যদি হতো তাহলে রিকশাওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, মুচি-সবার প্রেমেই তো পড়ে যেতো মেয়েরা। ভাই, নিজেকে আর কতো ছোট করবে? তোমার কি কোনো সম্মান নেই? সে তো পৃথিবীতে একমাত্র মানুষ না। দুনিয়াতে অসংখ্য মানুষ আছে। তুমি কেন তার পেছনে এভাবে নির্লজ্জের মতো ঘুরো, ভাই?
ভালোবাসা হতে হলে দুইপাশে একটা সম্মানের সম্পর্ক থাকতে হয়। একপাশে চাকর আর একপাশে মনিব-এভাবে ভালোবাসা হয় না। খেদমত বা বিশ্বস্ততার জন্য মনিবের মনে দয়া, ভালোবাসা থাকতে পারে...তবে সেটা এক মানবের জন্য এক মানবীর মনে যে ভালোবাসা জন্মায় সেই ভালোবাসা না। তোমাকে এমন কাজ করতে দেখলে খুব কষ্ট হয় ভাইয়া। খারাপ লাগে। এভাবে নিজেকে ছোট করো না, মনুষ্যত্বের অপমান করো না। চাকর হয়ো না, প্রকৃত অর্থে পুরুষ হও।
টিকাঃ
[৩৯৩] এটা আসলে মেয়েদের ইগোর গোড়ায় পানি ঢালে। তার পেছনে একটা ছেলে পাগলের মতো ঘুরছে, তাকে সে যেভাবে খুশি সেভাবে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে পারে, ইচ্ছেমতো তার সব কাজ করিয়ে নিতে পারে- এই বিষয়গুলো ভেবে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করে।
[৩৯৪] তোমার মনে তখন চলতে থাকে আমি এভাবে ইমশোনাল সাপোর্ট করলে সে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে। ভুলে যাবে তার বয়ফ্রেন্ডকে। ব্রেকআপ করে আমার কাছে চলে আসবে। আল্লাহর কাছে ধুমসে দু'আও শুরু করে দাও। আর তার বয়ফ্রেন্ড কতো খারাপ আর তুমি কতো কেয়ারিং- এসব প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকো। দেখো ভাই, এভাবে যে মেয়ে অন্য একজনের সাথে বিচ্ছেদ করে তোমার কাছে আসবে, নিশ্চিত থাকো তোমার সাথে বিচ্ছেদ করে সে অন্য একজনের কাছে চলে যাবে। তোমার মতোই অন্য একজন তার ব্রেইনওয়াশ করবে একদিন।
[৩৯৫] বর্তমানে সবাই বিবাহিত। পরিচয় প্রকাশিত হলে সংসারে অশান্তি হতে পারে তাই ছদ্মনামের আশ্রয় নেওয়া।
[৩৯৬] যতদূর মনে পড়ে মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের কাজ চলছিল তখন।
📄 আসল পুরুষ! আসল নারী!
কনডমের বিলবোর্ডটা এমন একটা জায়গায়, আগে থেকে সতর্ক না থাকলে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। বিশাল বিলবোর্ড। একজন পুরুষ ও একজন নারী। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। মহিলা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে ধরা একটা মেডেল। বিলবোর্ডের ডান কোণায় লেখা... 'আসল পুরুষ'।
কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, ভ্রু-প্লাক করা, টাইট জিন্স আর টি-শার্ট পরা, একে অপরের গায়ের উপর হেলান দিয়ে বসে থাকা কিছু ছেলের ছবি। সবচেয়ে সুন্দর ছেলেকে বাছাই করার জন্যে কোনো এক টিভি চ্যানেলের সুন্দরী প্রতিযোগিতার 'পুরুষ' সংস্করণ। একেবারে ফ্রন্ট পেইজ অ্যাডভারটাইজমেন্ট। এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার স্লোগান হলো, 'প্রমাণ করো তুমিই হিরো'।
এই হলো আমাদের কাছে পুরুষত্বের সংজ্ঞা। আজ পুরুষের সফলতার মাপকাঠি হলো তার শয্যাসঙ্গীর সংখ্যা অথবা নারীর মতো যত্নে নিজেকে 'গ্রুম' করতে পারা। আর কোন নারীকে কতোজন পুরুষ শয্যাসঙ্গী হিসেবে পেতে চায় তা হলো নারীত্বের সফলতার মাপকাঠি। নারী আর পুরুষ পরিচয়ের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্যও এখন আর নেই। সেই একই শরীরী হিসেব-নিকেশের পাল্লায় তুলে বিচার করা হয় দুজনকেই। কেউ দাতা, কেউ গ্রহীতা, কেউ ক্রেতা, কেউ বিক্রেতা, কেউ ব্যবহারকারী, কেউ ব্যবহৃতা, কেউ কামুক, কেউ কামের লক্ষ্য-পার্থক্য এইটুকুই। আমরা পুরুষ ও নারীর জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সার্থকতাকে আজ এই গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ করেছি।
খেলোয়াড়, অভিনেতা, গায়ক। আমাদের কাছে পুরুষত্বের রোলমডেল হলো ড্রাগ অ্যাডিক্ট, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উড়নচণ্ডী, বহুগামী, নানা ধরনের, নানা আঙ্গিকের এসব মনোরঞ্জনকারীরা। আমাদের কাছে নারীত্বের রোল মডেল হলো শরীর দেখিয়ে টাকা কামানো চামড়া ব্যবসায়ী, নর্তকী আর বাইজিরা। নিজ সন্তানের জন্মদাত্রীকে স্বীকৃতি না দেওয়া মেসি-রোনালদো, ব্যভিচারী টাইগার উডস, কিশোরসুলভ অঙ্গভঙ্গি আর আচরণের পঞ্চাশোর্ধ ব্র্যাড পিট- সালমান খান, মাঠে বল হাতে কিংবা পায়ে ছোটাছুটি করা কিছু লোক, সমকামিতার সমর্থক বিটিএস অথবা লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে নেংটি পরে মারামারি করা WWE কিংবা MMA অ্যাথলেটরা আমাদের কাছে পুরুষত্বের রোল মডেল! আসল পুরুষ! আসল নারী!
শারীরিক ভাবে পুরুষ হওয়া আর সত্যিকার অর্থে, চিন্তা-চেতনায়, আচরণে একজন পুরুষ হবার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। নিছক Male হওয়া মানেই Man হওয়া নয়। নিজের ছোট ভাইয়ের টি-শার্ট গায়ে দিয়ে, উচ্চস্বরে হাঁকডাক করে, উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি কিংবা নাচানাচি করে টিকটক বানিয়ে, মঞ্চে ক্যাটওয়াক করে, ভ্রু-প্লাক করে পত্রিকার ফটোশুট করে, আমাদের সমাজ-সভ্যতার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী 'হিরো' কিংবা 'আসল পুরুষ' হওয়া গেলেও সত্যিকার অর্থে পুরুষত্ব অর্জন করা যায় না, Man হওয়া যায় না। ঠিক একইভাবে শরীরের ভাঁজ ও খাঁজ দেখিয়ে, টিকটক-ইন্সটাতে লাখ লাখ ফ্যান ফলোয়ার কামানো, প্রথা ভাঙা, সাহসিকতা, স্বাধীনতার নামে শাশ্বত নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে কাপড় খোলা, নারীর কমনীয় সকল বৈশিষ্ট্য ঝেড়ে ফেলে, নারীত্বের অপমান করে প্রতিনিয়ত পুরুষের মতো হতে চাওয়া প্রকৃত নারীর, সাহসী নারীর বৈশিষ্ট্য না।
তাহলে আসল পুরুষ কারা? সাহসী নারীই বা কারা? কী তাদের বৈশিষ্ট্য? কোথায় পাওয়া যাবে তাদের?
এ সমাজ-সভ্যতার তৈরি করা রোলমডেলদের মাঝে সত্যিকারের পুরুষ আর নারীদের খুঁজলে শুধু ব্যর্থই হতে হবে। যদি আসল বীরত্ব, আসল পুরুষত্বের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে আমরা জানতে চাই তাহলে আমাদের তাকাতে হবে মুস'আব, উমার, আবু দুজানা, ইক্করামা, খালিদ, সা'দদের জীবনীর দিকে। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন। সত্যিকারের পুরুষত্বের উদাহরণ খুঁজতে তাকাতে হবে মুহাম্মাদ বিন কাসিম, সালাহউদ্দীন, তারিক বিন যিয়াদ, উমার মুখতার, আল-খাত্তাবি, ইমাম শামিল, তিতুমীর, শরীয়াতুল্লাহ আর তৃতীয় উমারের দিকে, রাহিমাহুমুল্লাহ। নারীত্বের প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য আমাদের তাকাতে হবে খাদিজা, ফাতিমা, আসিয়া, মারইয়াম, আইশা, উম্মে আইমান, সুমাইয়্যা, সাফিয়্যাহ, খাওলা-দের দিকে। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আজমাইন।
দুই.
আমাদের এই বয়সেই বাপদাদারা দু-তিনটা করে বিয়ে করেছেন, সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, ছোট ভাইবোনদের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন, ভাতিজা, ভাগ্নে এমন আত্মীয়দেরও লালন পালন করেছেন। আমাদের নানীদাদীরা ছয়-সাতটা করে কিংবা আরো বেশি বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করেছেন। ভালোভাবেই করেছেন। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই মানবসমাজ চলেছে। কিন্তু আজ আমরা ছেলেরা ত্রিশ বছর বয়সে এসেও নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারি না। অন্য একটা মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে করা তো দূরে থাক। বাবা-মার কাছ থেকে হাত খরচ নিতে হয়, সংসারের খরচ চালানোর কথা তো আষাঢ়ে গল্পের মতো। অনেকের তো চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছেও বালকত্ব কাটে না। মেয়েরা স্বামীর সংসার করতে, রান্না-বান্না করতে, বাচ্চাকাচ্চা নিতে ভয় পায়। রান্নাবান্না করতে পারি না, কীভাবে 'বাসা'কে 'বাড়ি' বানাতে হয় জানি না, গৃহস্থালির টুকিটাকি কাজ করতে পারি না। জানি না কীভাবে বাচ্চাকাচ্চাদের মানুষ করতে হয়।
আমরা দায়িত্ব নিতে ভয় পাই। সংসারের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা, বাজার পর্যন্ত করতে পারি না ঠিকঠাক। তরমুজওয়ালা, মাছওয়ালাদের সাথে দামাদামি করে কেনার মতো মানসিক শক্তি, ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত আমাদের নেই। আমরা অফলাইনে মানুষজনের সাথে মিশতে পারি না। বন্ধুত্ব করতে পারি না। আমরা হতাশ প্রজন্ম। ভীতু প্রজন্ম। চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের মাঝে ভয় কাজ করে। পান থেকে চুন খসলেই আমরা আত্মহত্যা করে ফেলি। আমরা স্বার্থপর প্রজন্ম। অহংকারী প্রজন্ম। আমাদের নিজেদের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কেন আমাদের এই ভয়াবহ অবস্থা? কেন নিদারুণ দুঃসময়ে আমাদের এই যৌবন?
কারণ আমরা সত্যিকার অর্থে সাবালক হবার অর্থ বুঝিনি। একজন পরিপক্ক মানুষের যে দায়িত্ব নিতে হয় তার উপযুক্ত আমরা হয়ে উঠতে পারিনি। প্রকৃত অর্থে পুরুষত্ব আর নারীত্বের সংজ্ঞাই আমরা চিনিনি। কুরআন, হাদীস ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে প্রকৃত আসল পুরুষ ও তথাকথিত আসল পুরুষদের মধ্যে পার্থক্য হলো [৩৯৭]_
প্রকৃত আসল পুরুষ
তথাকথিত আসল পুরুষ
আত্মমর্যাদাশীল, নিজে কাউকে অপমান করে না, অন্য কাউকে অপমান করতে দেয় না। বাবা-মা ভাইবোন, পরিবার-পরিজনকে দরকার হলে জীবন দিয়েও আগলে রাখে।
আত্মমর্যাদা নেই।
দায়িত্বশীল, কর্তব্যবোধ সম্পন্ন, নীতিবান। নিজ কাজের দায়িত্ব নেয়। সে বুঝে সমাজ ও পরিবারে তার ভূমিকা নেতৃত্ব দেওয়ার। নিজে স্বাবলম্বী হবার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের প্রয়োজনে সাধ্যমতো এগিয়ে আসে।
দায়িত্ব আর কর্তব্যবোধ বলে কিছু নেই। প্রেম করে লিটনের ফ্ল্যাটে নিতে চায়, কিন্তু বিয়ে করতে চায় না। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা, সাহস, সক্ষমতা কোনোটাই নেই। বাবা-মা'র টাকা নষ্ট করে। বাপের, শ্বশুরের টাকায় বউয়ের খরচ চালাতে চায়। অর্থ উপার্জনের, স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করে না।
পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল, কষ্টসহিষ্ণু। হালাল জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করে। কিছু অর্জন করতে হলে কষ্ট করতে হয়, এ বাস্তবতা জানে।
অলস, জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করে না, কলম পিষে বড়লোক হওয়া কিংবা সহজে সব কিছু পাবার স্বপ্নে মশগুল। সবকিছুই হাতের কাছে রেডিমেইড চায়।
সমস্যার মুখোমুখি হলে সমাধানের চেষ্টা করে। নিজেকে প্রশ্ন করে, এখন আমার করণীয় কী?
সমস্যার মুখোমুখি হলে হা-হুতাশ আর হাহাকার করে। ঝিম মেরে বসে থাকে। নিজেকে প্রশ্ন করে, আমার এখন কেমন লাগছে?
নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। নিজের শরীরকে বাধ্য করে ইচ্ছেশক্তির আনুগত্য করতে।
নফসের গোলাম। সব সময় আরাম খোঁজে। ডোপামিন অ্যাডিক্ট।
আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। গভীরভাবে অনুভব করলেও আবেগ দ্বারা চালিত হয় না।
আবেগ, আবেগ প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে কিশোরীর সাথে মিল বেশি।
মেয়ে দেখলে চোখ নামিয়ে ফেলে, যথাযথ সম্মান করে।
চোখ দিয়ে গিলে খাবার চেষ্টা করে, পিছ নেয়, আজেবাজে মন্তব্য করে, অথবা বাসায় গিয়ে ফ্যান্টাসাইয করে।
ভবিষ্যৎ স্ত্রীর জন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করে।
প্রেম করা ছাড়া থাকতে পারে না। যার তার সাথে শুতে চায়, একেই নিজের অর্জন মনে করে। শোয়ার কাউকে না পেলে পতিতার খোঁজ করে।
নিজ স্ত্রীকে সম্মান করে। তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায়ের চেষ্টা করে। স্ত্রীসহ নিজের পরিবারের নারীদের সম্মান ও মর্যাদা কঠোরভাবে রক্ষা করে।
বুঝে না বুঝে স্ত্রীকে মানুষের সামনে দর্শনীয় বস্তুর মতো উপস্থাপন করে। আরেকজনকে সম্মান দূরের কথা, নিজের সম্মানই রক্ষা করতে পারে না।
পর্ন, মাস্টারবেশনে আসক্ত নয়, দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীকে সুখী রাখতে পারে।
পর্ন মাস্টারবেশনে যন্ত্রপাতি নষ্ট করে ফেলে।
সাহসী, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।
ভীতুর ডিম, প্রতিবাদ দূরে থাক, ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যায়কারীর পা চাটে।
সহানুভূতিশীল, দয়ালু, নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করে।
স্বার্থপর, সবসময় নিজের চিন্তা করে।
আল্লাহকে ভালোমতো চেনে, মানে। দ্বীন ইসলাম ও রাসূল (ﷺ)-এর সম্মানের সাথে আপস করে না。
আল্লাহকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। সস্তা সুখ আর নানা তুচ্ছ জিনিস নিয়ে ব্যস্ত। স্রোতের সাথে চলে। মিডিয়া আর সমাজ যা গেলায়, তাই গিলে।
ভদ্র, উত্তম আখলাকের অধিকারী, শো অফ করে না, মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না, তবে আচরণে মিনমিনে মেয়েলি ভাব থাকে না।
সেলিব্রেটি রোলমডেল এবং মিডিয়ার ট্রেন্ডের অনুকরণে উদ্ধত, অহংকারী- নিজেকে জাহির করায় ব্যস্ত। অথবা মিনমিনে মেয়েলি।
নবী (ﷺ) -এর সুন্নাহ পালন করে। শরীরের যত্ন নেয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। সুগন্ধি ব্যবহার করে।
ফরজ গোসলও ঠিকমতো করে না। নোংরা, অগোছালো। গায়ের দুর্গন্ধে টেকা যায় না, আউলা ঝাউলা ভাব ধরে। অথবা, মিডিয়ার ট্রেন্ডের অনুসরণ আর সেলিব্রেটিদের মতো পোশাক-আশাক পরাকে আর হেয়ারস্টাইল মেইনটেইন করাকেই স্মার্টনেস ভাবে।
ব্যক্তিত্ববান, সৎ, বিশ্বস্ত। কথা দিয়ে কথা রাখে।
অলস, অকর্মণ্য, মেয়েদের পেছনে ঘুরে, কথা দিয়ে কথা রাখে না, বিশ্বাস করা যায় না।
জানে, জীবনের অর্থ শুধু ভোগ না। নিজের বিশ্বাস ও আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন। প্রয়োজনে আত্মত্যাগে প্রস্তুত।
কোনো বিশ্বাস কিংবা আদর্শ নেই। ভোগে আসক্ত হবার কারণে আপসহীন হবার অর্থই হয়তো বোঝে না। আত্মত্যাগের প্রশ্নই আসে না। তার সব মনোযোগ তার নফসকে নিয়ে।
ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে সামনে আগায়, বিপদে ভেঙে পড়ে না, দৃঢ় অবিচল থাকে, আত্মহত্যা করে না, দুনিয়ার সকল মানুষের কাছে অভিযোগ অনুযোগ না করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কান্না করে।
ব্যর্থতাকে ভয় পায়, পান থেকে চুন খসলেই শিশুর মতো কান্নাকাটি শুরু করে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, আত্মহত্যা করে মানুষের কাছে অভিযোগ ফেলে।
পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য রহমতস্বরূপ।
স্রেফ বোঝা।
চুপিচুপি একটা কথা বলি। মেয়েরা এই আসল পুরুষদেরই পছন্দ করে।[৩৯৮] এভাবেই তাদের বানিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা। পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতির কারণে তাদের অনেকেই আসল পুরুষ চিনতে পারে না, বোহেমিয়ান পুরুষদের সাথে দু'দিন প্রেম করতে পারে, ভুল করে ঘর বাঁধতে পারে কিন্তু মনেপ্রাণে তারা এই আসল পুরুষদেরই খুঁজে বেড়ায়।
এবারে চলো দেখা যাক কুরআন, হাদীস এবং এক্সপার্টদের মতামত অনুসারে আবহমান প্রকৃত নারী ও তথাকথিত আধুনিক নারীর মধ্যে পার্থক্য কী কী।[৩৯৯]
আবহমান প্রকৃত নারী
তথাকথিত আধুনিক নারী
লাজুক, নারীসুলভ কমনীয়, নম্র, ভদ্র, বাসার বাইরে হৈচৈ করে না, নিজের নারীত্ব নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে না।
নারীর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে। মনেপ্রাণে পুরুষের মতো হতে চায়। পুরুষ যা করে তা করতে পারাকেই নারীর ক্ষমতায়ন মনে করে।
পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর কথা মেনে চলে।
সমাজ, মিডিয়া, সংস্কৃতি, পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করে শরীর দেখানো, আর নিজেকে উন্মুক্ত করাকে সাহসিকতা মনে করে, জাতে ওঠার মাধ্যম মনে করে।
ছেলেদের সাথে মেশে না, ছেলেরাও তার ব্যক্তিত্বের কারণে তার সাথে মেশার সাহস করে না, প্রেম করে না।
জাস্টফ্রেন্ড, অনলি ফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ডের অভাব হয় না, ছেলেদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ায়, প্রেম না করে থাকতে পারে না, ছেলেদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানো, নাচানোকে স্মার্টনেস মনে করে।
ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর জন্য নিজেকে হিফাযত করে, বিশ্বস্ত থাকে।
যার তার সাথে শুয়ে পড়ে, লিটনের ফ্ল্যাট, লং ট্যুর, লঞ্চের কেবিন, এক সাথে কয়েকটা প্রেম, পরকীয়া, গর্ভপাত সবখানেই বিচরণ থাকে, এগুলোকে স্মার্টনেসের অংশ ভাবে।
ছবি আপলোড করে না, স্বামী চাইলেও ব্যক্তিগত ছবি তুলতে দেয় না।
সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের ছবি আর ভিডিও আপলোড করে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মনোযোগ উপভোগ করে। ফ্যান-ফলোয়ারস, মনোযোগ, প্রশংসা চায়। জাস্টফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড যে-ই চাক, ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে দেয়।
রান্নাবান্না, শিশু লালনপালন, ঘরের কাজকে জীবনের অপচয় মনে করে না। সমাজ ও পরিবারে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন।
ঘরের কাজ করাকে জীবনের অপচয় মনে করে, দাসত্ব মনে করে। বিশ্বব্যবস্থা, মিডিয়া আর সমাজের তৈরি সাফল্যের সংজ্ঞা মেনে নিয়ে তার পেছনে অন্ধের মতো ছোটে।
পুরুষদের প্রতিযোগী মনে করে না, সহযোগী মনে করে।
প্রতিযোগী মনে করে, ক্ষেত্র বিশেষে পুরুষবিদ্বেষী হয়।
সন্তান লালনপালন করাকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দেয়।
ক্যারিয়ারকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দেয়। সন্তানকে বুয়ার হাতে ছেড়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না।
স্বামীর সাথে সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সম্পর্ক থাকে। সব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে না, দাম্পত্য হক আদায়ের উপর তেমন গুরুত্ব দেয় না। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে, স্বামীর হক আদায়ের যথাসাধ্য চেষ্টা করে।
স্বামীকে অসম্মান করে, ছোট করে, প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, দৌড়ের উপর রাখে। ঝাড়ি মারে, জাহাজের একজন ক্যাপ্টেন থাকে, স্বামীর পরিবারে স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নেয়। সব সময় দৌড়ের উপর রাখে।
স্বামীর টাকাকে নিজের টাকা মনে করে, লজ্জা করে না, হীনম্মন্যতায় ভোগে না।
নিজে কামাই করতে না পারলে জীবন ব্যর্থ জাতীয় কিছু একটা মনে করে।
শুধুমাত্র স্বামীর জন্য সুন্দর করে সাজে, নিজের সকল সৌন্দর্য অন্য সবার কাছ থেকে রক্ষা করে স্বামীর জন্য রেখে দেয়।
বাইরের সকল পুরুষের জন্য সাজগোজ করলেও ঘরে স্বামীর সামনে এলোমেলো অবিন্যস্ত থাকতে পছন্দ করে।
এই তথাকথিত আধুনিক নারীদের পেছনে ছেলেরা লাইন দিলেও এদেরকে শেষ পর্যন্ত তারা বিয়ে করতে চায় না, যার প্রমাণ আমরা আগেই দিয়েছি। এদের সাথে বিছানায় রাত কাটানো যায়, কিন্তু বাচ্চার মা বানানো যায় না, সারাদিন পর ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে খেতে বসে যে মানুষটা একরাশ মমতা নিয়ে ভাত বেড়ে দেবে, সেই মানুষের জায়গায় এদের কল্পনা করা যায় না। যতো চরিত্রহীন ছেলেই হোক না কেন, বিয়ের জন্য আবহমান প্রকৃত নারীই থাকে তাদের প্রথম পছন্দ।
এই আসল পুরুষেরাই, প্রকৃত নারীরাই যুগে যুগে, দেশে দেশে পৃথিবীর গতিপথ চেইঞ্জ করে দেয়। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসে পরিণত করে। সমস্ত বিশ্বকে সত্য, সুন্দর, কল্যাণ ইনসাফের পথে পরিচালিত করে। এটাই আল্লাহ'র সুন্নাহ। শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়, এক সভ্যতার পতন ঘটে গিয়ে অন্য সভ্যতার উত্থান ঘটে, নদী তার গতিপথ বদলে ফেলে, তবু আল্লাহর এই সুন্নাহর কোনো পরিবর্তন হয় না।
***
তরুণ প্রজন্ম হলো জাতির প্রাণ। জাতির মেরুদণ্ড। সেই তরুণরাই যদি এভাবে মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়ে তাহলে এই জাতি, সমাজ আর বিশ্বের কী হবে? মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে কে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসবে? আমাদের এই দুরবস্থার জন্য শুধু আমরাই দায়ী নই। বাবা-মা, সমাজব্যবস্থা, বিশ্ব কাঠামো সবকিছু দায়ী। কিন্তু শুধু তাদের দিকে আঙুল তুলে, ফেইসবুকে তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলেই সব হয়ে যাবে না। সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা সমস্যা সমাধানের পূর্বশর্ত। তবে সেখানেই থেমে থাকলে সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হয়। বদলে ফেলতে হয় নিজেদের।
১। এসো আমরা নিজেরা দায়িত্ব নিতে শিখি। ছোট থেকেই বাসার কাজে সাহায্য সহযোগিতা করি। মেয়েরা রান্নাবান্না করা, ঘরের কাজ শেখা, সংসার গুছিয়ে রাখা শিখে নেই। ছেলেরা কাঁচাবাজারে যাওয়া শুরু করি। শুধু আঁতেলের মতো মাথাগুঁজে পড়াশোনা না করে, পড়াশোনা ঠিক রেখে বাইরের দুনিয়াটাকে দেখার চেষ্টা করি। সংসার কীভাবে চলে, সংসারের খরচ কীভাবে আসে এগুলো বাবা-মা'র কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করি। নিজের কাজগুলো নিজেই করি। ক্লাস ৮-৯ এ ওঠার পর থেকেই নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করা উচিত। টিউশনি, অনলাইনে ছোটখাটো ব্যবসা, বড় ভাই বা পরিচিতদের ব্যবসায়, কাজে পার্টটাইম কাজ করা, ফ্রিল্যান্সিংসহ অনেক অপশান খোলা আছে।
এই বয়সে অর্থ উপার্জনকে আমাদের সমাজে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। আবার এই সমাজই অর্থ ছাড়া দামও দেয় না। সমাজ ভণ্ডামি করে যাবেই। সমাজের কথায় কান দেবে না। অর্থ উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাও। দেখবে দ্রুত বিয়ে করে সংসার চালানোর মতো টাকা তুমি ম্যানেজ করে ফেলেছো বা অন্য একজন মানুষের দায়িত্ব নেবার জন্য যে ব্যক্তিত্ব দরকার, যে ম্যাচুরিটি দরকার তা তোমার মাঝে চলে এসেছে। আর কিছু যদি না-ও হয় এই অভিজ্ঞতা তোমার কাজে লাগবে। মেয়ের বাপ বা তোমার বাপ তোমাকে বিয়ে করাতে ভয় করবে না। পাশাপাশি ঘরের কাজ শিখে ফেলা, গোছালো হবার ফলে আপু তোমাকে নিয়েও তোমার বাবা-মা চিন্তা করবে না যে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কী করবে।
বিয়ে করার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার আসলে এই দায়িত্ব নিতে শেখা আর ম্যাচুরিটি আসার ব্যাপারটা। টাকাপয়সার চাইতেও এ দুটো জিনিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তোমরা এই বিষয় নিয়ে একদমই মাথা ঘামাও না। শুধু মেয়ের কিংবা নিজের বাপ-মাকে কষে গালি দাও। একটা ইমম্যাচিউর, দায়িত্ব কর্তব্যবোধহীন ছেলের হাতে কেন কোনো অভিভাবক তাদের মেয়েকে তুলে দেবেন? নিজের স্ত্রীর হাতখরচ, শ্যাম্পু-সাবানের টাকা পর্যন্ত বাবা-শ্বশুরের কাছ থেকে নিয়ে বিয়ে করবো-এমন চিন্তা করতে তোমার লজ্জা লাগা উচিত। সাহাবীদের উদাহরণ টানবে না। সাহাবীরা গরীব ছিলেন, অভাবী ছিলেন, কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিলেন না, কল্পনাবিলাসী ছিলেন না। তাদের একেকজন একেকটা জনপদের দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত পুরুষ ছিলেন। তাঁরা ফ্যান্টাসির জগতে বসবাস করতেন না। তারা গ্রহ, নক্ষত্রের হিসেবে মিলিয়ে, বউয়ের মধ্যে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার লম্বা লিস্ট নিয়ে, ঈদের জামা কেনার মতো করে পাত্রী চয় করতেন না। তারা অনেক ক্ষেত্রেই বিধবা, বয়স্ক, দেখতে সাদামাটা নারীদেরও বিয়ে করেছেন। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।
২। বাচ্চাদের মতো আচরণ করা থেকে বিরত থাকো। সব সময় হাসিঠাট্টা, মজা করা, প্র্যাংক করা, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘোরা, বাবা বা শ্বশুরের দেওয়া লাখ লাখ টাকার বাইক দাবড়ানো, মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকা, হিজড়াদের মতো নাচগান করা একজন দায়িত্বশীল পুরুষ বা নারীর বৈশিষ্ট্য না। এগুলো ব্যক্তিত্বহীন মানুষের কাজ। পুরুষসুলভ ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য, নিজের মধ্যে আনতে শেখো। নারীসুলভ চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের চেষ্টা করো। মোবাইলটা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রেখে বাস্তব দুনিয়ার বাস্তব মানুষের সাথে মেলামেশা করো। রাতে ঘুমাও, শরীরচর্চা করো, গোছালো জীবনযাপন করো।
৩। বিসিএস আর সরকারি চাকরি ছাড়াও যে টাকা উপার্জন করা যায়, সম্মান পাওয়া যায়, বিয়ে করা যায়- এই বিষয়টা বিশ্বাস করো। সমাজের মানুষের কথায় কান না দিয়ে থাকা খুবই কষ্টের। কিন্তু তারপরও এই কষ্টটুকু করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা ভালো না, এই বলে শিক্ষাব্যবস্থাকে গালি দিয়ে বসে থাকবে না। নিজে স্কিল অর্জনের চেষ্টা করো। ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে, অনলাইনে অনেক কোর্স আছে, একাডেমি আছে-সেগুলোর সাহায্য নাও। পরিবারের বোঝা হয়ে থেকো না, রাতের পর রাত গেইম খেলে, প্রেম করে সিনেমা-সিরিয়াল-সিরিয দেখে কাটিও না। দরকার হলে রাস্তায় ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করবো তবুও আরেকজনের ওপর নির্ভরশীল থাকবো না-এমন দৃঢ় হতে হবে পুরুষের সংকল্প।
৪। ভোগবাদী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসো। পরিশ্রম করো। কষ্ট করো। চ্যালেঞ্জ নাও। অলসতাকে ইসলামের লেবাস পরিয়ো না। আমি যুহুদ অবলম্বন করছি, তাওয়াক্কুল করছি-এসব মিথ্যা বলো না। ইসলামে অলসতা, কাপুরুষতার কোনো স্থান নেই। পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য স্যাক্রিফাইস করতে শেখো। সমাজের মানুষদের নিয়ে ভাবো। প্রেম-ভালোবাসা, মাদক, পর্ন, মাস্টারবেশন, সিনেমা, মিউযিক, ওয়েবসিরিয, টিকটক, বিটিএস বা অশ্লীলতার মধ্যে যতো ডুবে থাকবে ততো তুমি দাসত্বের জীবনে বন্দী হয়ে যাবে। তত বেশি নষ্ট হবে তোমার প্রাণশক্তি, আত্মবিশ্বাস।
৫। মিডিয়া, সমাজ, এই বিশ্বব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে শেখো। অন্ধভাবে বিশ্বাস করে নিও না। কেন তারা যা বলে সেটাই পরম সত্য হবে? তারা যদি সঠিক হয়, তাহলে তাদের বাতলে দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে পাশ্চাত্যের সমাজের কেন এতো ভয়াবহ অবস্থা? কেন তাদের এতো হতাশা? আত্মহত্যা? কেন আজ পৃথিবীর এ অবস্থা? বইপত্র পড়ো। জ্ঞান চর্চা করো। ভেড়া হয়ে থেকো না। কাউকে তোমার ব্রেইনওয়াশ করতে দিও না। স্রোতের বিপরীতে যেতে শেখো।
৬। ইসলামে ফিরে এসো। ইসলামই মানবতার একমাত্র মুক্তির পথ।
'আর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান আনতো ও তাকওয়া অবলম্বন করতো তাহলে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।'[৪০০]
বিয়ে করতে না পারার, হতাশার, সমস্যাগুলোর কারণ চিহ্নিত করে দেওয়া হলো। সমস্যার সমাধানও তোমার সামনেই আছে। এখন তুমি কি পরিবর্তনের পথে হাঁটবে নাকি হতাশায় ডুবে থাকবে? ফেইসবুকে কিংবা বন্ধুদের সাথে কথোপকথনে বাবা-মা আর সমাজকে গালিগালাজ করবে নাকি বাস্তবতাকে বদলানোর চেষ্টা করবে? নাকি মাথা কুটে মরবে অনিঃশেষ অভিযোগের আঙুল তোলার গোলকধাঁধায়?
কিছু মানুষ সারা জীবন হা-হুতাশ করে যায়। অভিযোগ আর অনুযোগেই তাদের জীবন কাটে। আর কিছু মানুষ পরিবর্তন আনে। তুমি কোন ধরনের মানুষ হবে?
সিদ্ধান্ত তোমার!
টিকাঃ
[৩৯৭] True Men, Manhood, And Masculinity in Islam, siasat.com, July 8, 2019-tinyurl.com/54n9h8jn
10 Qualities That Define A Man & 7 That Don't, mensxp.com, Jul 24, 2015 -tinyurl.com/2aawvy4e
10 Qualities of a Gentleman, leadership-matters.biz, Jul 4, 2013 -tinyurl.com/ mr3hj4u6
Top 10 Qualities of Highly Successful People, inc.com- tinyurl.com/489yfmwn Top 10 Traits of a Real Man (Muslim Style), muslimmatters.org, August 28, 2012-tinyurl.com/mpr9v7bt
True men, manhood, and masculinity in Islam, abuaminaelias.com, March 28, 2018- tinyurl.com/5fcsffdw
[৩৯৮] 9 Qualities Every Woman Looks For In A Husband, lifehack.org- tinyurl. com/5n8ctnvv The qualities that women look for in a man, thegentlemansjournal.com- tinyurl. com/bdxe2hyb
5 Secrets to a Successful Long-Term Relationship or Marriage, Medically reviewed by John M. Grohol, Psy.D, psychcentral.com, May 17, 2016-tinyurl.com/ yd25um97
[৩৯৯] 15 Qualities of A Good Wife, Medically reviewed by Dr. Lourdes Mantecón- Garza, MD, September 14, 2022- tinyurl.com/ywry52bk Ideal character of Muslim women, arabnews.com, January 01, 2016- tinyurl. com/52vc2du7 10 Qualities of a Lady, leadership-matters.biz, Jun 14, 2013- tinyurl.com/yext3dvu
[৪০০] সূরা আল-আ'রাফ, ৭: ৯৬
📄 উত্তরের অপেক্ষায়
এক.
দু'আ নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ ভুল ধারণা আছে।
আল্লাহ বলেছেন, আমাকে ডাকো, আমি বান্দার ডাকে সাড়া দেই, আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করি।
মানুষের কাছে চাইলে মানুষ বিরক্ত হয়, আল্লাহর কাছে না চাইলে তিনি রাগ করেন। তাহাজ্জুদের দু'আ এমন এক তীর যা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না...
কুরআনের আয়াত ও হাদীসের এমন বক্তব্যগুলো শুনে আমরা যা ভাবি তা হলো: আল্লাহর কাছে চাইবার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিয়ে দেবেন। কোনো দেরি হবে না। হোক সেটা হালাল চাওয়া বা হারাম চাওয়া।
আল্লাহ ওয়াদার খেলাফ করেন না। তবে আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলার সাড়া দেবার ধরণ একটু অন্যরকম। কাঙ্ক্ষিত বস্তু না দেওয়াটাও তার দু'আ কবুল করা বা সাড়া দেবার অংশ। ধরো, তোমার ছোটভাইয়ের অসুখ হয়েছে। ডাক্তার বলেছে রোজ রাতে ঘুমানোর আগে দুই চামচ করে ওষুধ খেতে হবে এক মাস। প্রথম রাতে ওষুধ খাবার সময় তোমার ছোটভাই আবিষ্কার করলো, ওষুধ বেশ মিষ্টি। খুব টেস্ট! সে জেদ ধরলো, একমাসের ওষুধ সে তখনই ঢকঢক করে গিলে খাবে! তুমি কি তাকে এমনটা করতে দেবে? সে তোমার কাছে খুব কান্নাকাটি করছে। কাকুতি মিনতি করছে। তোমার মন গলাতে না পেরে শেষমেষ ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে—তোমার মনে কি কোনো দয়া-মায়া নাই? তুমি কি আসলেই আমার ভাই? আমাকে না দিয়ে নিজে খেতে চাও, তাই না?
এমন অবস্থায় তুমি কী করবে? এখানে ওষুধ না দেওয়াই ভালোবাসার প্রমাণ। তাই না?
ছ্যাঁকা খাবার পরে দেখি অনেকেই সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মানুষটাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য মনপ্রাণ ঢেলে আল্লাহর কাছে দু'আ করতে থাকে। দু'আ কবুল না হলে আবারো সেই একই কাহিনী—আল্লাহর প্রতি অভিমান, অনুযোগ, বিরূপ ধারণা করা।
একটু ভেবে দেখো। তুমি হারাম কাজের জন্য, একটা হারাম সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতির জন্য দু'আ করছো, আল্লাহ কি তোমার এই হারাম কাজের দু'আ কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?
দুই. দু'আ নিয়ে আল্লাহর উপর মন্দ ধারণা করার আরেকটা কমন বিষয় হলো বিয়ে। সাধারণত এক্ষেত্রে দুই ধরনের ঘটনা ঘটে। প্রথমত, যাকে বিয়ে করতে চায় মানুষ তার নাম ধরে দু'আ করে। 'হে আল্লাহ অমুকরে আমার বউ বানাইয়া দাও, অনুকরে আমার জামাই বানাইয়া দাও...।' দু'আ চলতেই থাকে। কিন্তু অমুকের যদি অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায় তাহলেই শুরু হয়ে যায় আল্লাহর প্রতি অভিযোগ। 'আল্লাহ, ক্যান আমার সাথে এমন করলেন'?
আচ্ছা তুমি যাকে চাচ্ছো, তার সাথে বিয়ে যে তোমার দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হবে, এটা কি তুমি নিশ্চিত জানো? হয়তো বিয়ের পর দেখা গেল সে পরকীয়া করছে, দু'হাতে টাকা অপচয় করছে, তোমার সাথে ঝগড়া করছে, তোমার বাবা-মাকে কষ্ট দিচ্ছে, অন্য মেয়েকে নিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, তোমার গায়ে হাত তুলছে। অথবা দেখা গেল বউয়ের কারণে তুমি ঘুষ খাচ্ছো, হারাম ইনকামের দিকে ঝুঁকছো। হতে পারে স্বামী তোমাকে পর্দা করতে দিচ্ছে না... এমন অনেক কিছুই তো হতে পারে, তাই না? তুমি যেটাকে শাস্তি মনে করে অভিযোগ করছো, হয়তো সেটা আসলে তোমার জন্য নিয়ামত। কিন্তু তুমি সেটা এখনো বুঝতে পারছো না। অধৈর্য হয়ে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছো! তাছাড়া এভাবে সরাসরি নাম ধরে বিয়ের জন্য দু'আ করা ঠিক না। সালাফরা আমভাবে কল্যাণের জন্য দু'আ করতেন। এভাবে দু'আ করতে পারো যে,
'হে আল্লাহ, যদি সে আমার দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য ভালো হয় তাহলে তার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন, আর যদি ভালো না হয় তাহলে তাকে ভুলে যাবার তাওফিক দিন, তার উপর থেকে আমার মন উঠিয়ে নিন।'
সবচেয়ে ভালো হয় আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে দু'আ করলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের চোখ শীতল করে। এবং আমাদেরকে মুত্তাকি লোকদের নেতা বানিয়ে দিন।[৪০১]
এর চেয়ে সুন্দর দু'আ তুমি করতে পারবে? এর চেয়ে সুন্দর দু'আ করা সম্ভব? তবে শুধু দু'আ করে গেলেই হবে না, বিয়ে করার জন্য দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে যেগুলো আমরা আগেই আলোচনা করেছি।
বিয়ে নিয়ে দু'আ এবং দু'আ নিয়ে অভিযোগের দ্বিতীয় একটা ধরন আছে। যারা মোটামুটি দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করে এটা তাদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। ধরো, তুমি ইসলাম পালনের ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করতে চাও। রবের কাছে করুণ মিনতি জানাচ্ছো বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। স্বপ্নের সেই অদেখা মানুষটা স্বপ্নেই থেকে যাচ্ছে, ছুঁতে পারছো না। বাসায় রাজি হচ্ছে না বা পছন্দমতো পাত্র-পাত্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের পছন্দ হচ্ছে তারা আবার রিজেক্ট করে দিচ্ছে। অনবরত দু'আ করে যাচ্ছো তুমি। কিন্তু বিয়ের ফুল ডুমুরের ফুল হয়েই আছে। তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করছে আল্লাহ কবে আমার দু'আ কবুল করবেন? কবে আসবে আল্লাহর সাহায্য? আল্লাহ দু'আকারীর দু'আ কবুল করেন- কই, আমার দু'আ তো কবুল হচ্ছে না!
অসাধারণ একজন দাঈ তারেক মেহেন্না। তাঁর একটি লেখা পড়েছিলাম বেশ আগে। আলোচনার এই পর্যায়ে সেই লেখাটা নিয়ে আসা জরুরি। তিনি লিখেছেন,
...আমরা দু'আকে বিপদের সময়, কঠিন মূহুর্তে প্যানিক বাটনের মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করি। আপনি কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ বারবার কুরআনে বলেছেন দরকারের সময় যে তাঁকে ডাকবে তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দেবেন। সুতরাং, আপনি মনে করলেন যদি ঠিকঠাক মতো দু'আ করতে পারেন (রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, মনোযোগের সাথে ইত্যাদি), তাহলে ঠিক পরদিন সকালেই আপনি আপনার দু'আর 'জবাব' পেয়ে যাবেন। আর যদি না পান, তাহলেই আপনি ভেতরে ভেতরে আল্লাহর অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ করা শুরু করবেন!
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একটি হাদীসে এই বিষয়ে বলেছেন। যদিও বুখারী ও মুসলিম-দুই জায়গাতেই এই হাদীসটি আছে, তবে আমাদের আলোচনার জন্য মুসলিমের বর্ণনাটি অধিকতর উপযুক্ত। হাদীসে এসেছে:
'একজন ব্যক্তির দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকে-যদি সে অন্যায় অথবা হারাম কিছুর জন্য দু'আ না করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাড়াহুড়ো না করে এবং অধৈর্য না হয়।'
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীসের দ্বারা ব্যক্তি অধৈর্য হয়ে যাবে?' রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জবাব দিলেন, 'সে বলবে, আমি দু'আ করছি এবং করেই যাচ্ছি, কিন্তু আমি দেখছি আমার দু'আর কোনো জবাব দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে সে আশা হারিয়ে ফেলবে এবং আল্লাহকে স্মরণ করা ছেড়ে দেবে।'[৪০২]
গভীরভাবে হাদীসটি বোঝার চেষ্টা করলে, কীভাবে দু'আ কাজ করে এবং কীভাবে কাজ করে না-সে বিষয়ে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারবো। একটু খেয়াল করুন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কী ধরনের শব্দ এখানে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন- '...তাঁর দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকবে।'
এবার অধৈর্য ব্যক্তির অভিযোগের সাথে তুলনা করুন- 'আমি দেখছি আমার দু'আর কোনো জবাব দেওয়া হচ্ছে না।'
আপাতদৃষ্টিতে দু'টো পরস্পর সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। এটা কীভাবে সম্ভব যে একজন ব্যক্তির দু'আর জবাব দেওয়া হতে থাকছে কিন্তু তাঁর কাছে মনে হচ্ছে সে কোনো ফল পাচ্ছে না? দু'আর উত্তর কোথায়?
ব্যাপারটা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই দু'আর জবাব একসাথে না এসে, ধাপে ধাপে আমাদের কাছে আসে। এমন কিছু হয়তো ঘটবে যার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু আপনার কাছে মনে হচ্ছে আপনার দু'আর জবাব আসছে না।
মনে করুন আপনি একটা ঘরে বন্দী। মুক্তির একমাত্র উপায় জানালা ভেঙে বের হওয়া, কিন্তু আপনার সম্বল শুধুমাত্র ছোট কিছু পাথরের টুকরো। আপনি জানালায় একটা ছোট পাথর ছুড়লেন। তাতে জানালা ভাঙলো না, কিন্তু খুব সুক্ষ্ম একটা ফাটল ধরলো। আপনি আরেকটা পাথর ছুড়লেন। আরেকটা ছোট ফাটল। আপনি আবার একটা পাথর ছুড়ে দিলেন, তারপর আরেকটি। যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরো জানালা অসংখ্য সুক্ষ্ম ফাটলে ভরে গেছে। শেষবারের মতো আপনি একটা পাথর ছুড়ে দিলেন এবং জানালার কাঁচ ভেঙে গেল। বন্দীত্ব থেকে আপনি মুক্তি পেলেন। দু'আও এভাবেই কাজ করে। আপনি প্রতিটি দু'আর মাধ্যমে আংশিক জবাব পেতে থাকেন এবং ধৈর্য ও অবিচলতার সাথে একই দু'আ বারবার করার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে শেষ পর্যন্ত দু'আর পরিপূর্ণ জবাব পাবেন।
মনে রাখবেন প্রথম পাথরটি শুধু একটি ফাটলই ধরাবে। কিন্তু আপনি যদি পাথর ছুড়তে থাকেন তাহলে এক সময় জানালা ভেঙে যাবে এবং আপনি মুক্ত হবেন। এর জন্য সময়ের প্রয়োজন। এই জন্যই হাদীসটিতে আমাদের বলা হচ্ছে- '... যতক্ষণ পর্যন্ত সে অধৈর্য না হচ্ছে।'
আপনি যখন কোনো চারাগাছে পানি দেন, তখন নিশ্চয় একসাথে ত্রিশ গ্যালন পানি ঢেলে দিয়ে, কেন মাটি থেকে বিশাল মহীরুহ বের হচ্ছে না, সেটা নিয়ে চিন্তা করতে বসেন না। বরং আপনি ধৈর্য সহকারে প্রতিদিন একটু একটু করে পানি দিতে থাকেন এটা জেনে যে, যত সময়ই লাগুক না কেন, শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফুলটি আপনি পাবেনই। একইভাবে আপনি জানেন, আল্লাহ আপনার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করবেন এবং আপনার দু'আর জবাব দেবেন- এটা সত্য। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে অলৌকিকভাবে দু'আর উত্তর পাওয়া নিয়মের ব্যতিক্রম, নিয়ম না। নিয়ম হলো আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাওয়া এবং তাঁর কাছ থেকে এর উত্তর পাওয়ার প্রক্রিয়া সময় ও ধৈর্যের উপর নির্ভরশীল।
ইবনুল জাওযী (রহ.) তাঁর 'সাইদুল খাতির' বইটিতে বলেছেন: 'কষ্ট-দুঃখ-দুর্দশা শেষ হবার একটি নির্ধারিত সময় আছে যা শুধু আল্লাহ জানেন। তাই যে ব্যক্তি দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসার আগে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা কোনো কাজে লাগবে না। ধৈর্য আবশ্যক কিন্তু দু'আ ছাড়া ধৈর্য অর্থহীন। যেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু'আ করছে, তাঁর কাছে সাহায্য চাইছে, তার উচিত না অধৈর্য হওয়া। বরং তার উচিত ধৈর্য, সালাত এবং দু'আর মাধ্যমে সর্বজ্ঞানী আল্লাহর ইবাদাতে নিয়োজিত হওয়া। অধৈর্য ব্যক্তি তাঁর ধৈর্য হারানোর মাধ্যমে আল্লাহর পরিকল্পনা লঙ্ঘন করার চেষ্টা করছে। এটা আল্লাহর সামনে একজন গোলাম ও বান্দার উপযুক্ত আচরণ কিংবা অবস্থান নয়। আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ অবস্থান হলো, আল্লাহর কাছ থেকে আসা তাকদীরকে মেনে নেওয়া। এবং এজন্য প্রয়োজন ধৈর্য। এর সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো সালাতের মাধ্যমে ক্রমাগত আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাওয়া। আল্লাহর কাছ থেকে আসা তাকদীরের বিরোধিতা করা হারাম এবং এটা আল্লাহর পরিকল্পনা লঙ্ঘনের চেষ্টার মধ্যে পড়ে। তাই এই বিষয়গুলো অনুধাবন করো এবং তোমার জন্য তোমার দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা সহ্য করা অনেক সহজ হবে।' [৪০৩]
ভাইয়া, আপু! হয়তো তুমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নও, আল্লাহ তোমাকে প্রস্তুত হবার সময় দিচ্ছেন। হয়তো তুমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নও, হয়তো এখন বিয়ে হলে তুমি তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যেতে। অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিতে না, যা আদতে তোমার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতো। [৪০৪] রিজেকশনের কারণে তুমি কষ্ট পাচ্ছো, অথচ আল্লাহ হয়তো তোমার জন্য আরো উত্তম কোনো জীবনসঙ্গীর ব্যবস্থা করে রেখেছেন। যার জন্য তুমি কষ্ট পাচ্ছো তার সাথে বিয়ে হলে হয়তো তুমি সুখী হতে না, সংসারে অনেক অশান্তি হতো। তুমি দু'আ করতে থাকো, চেষ্টা করতে থাকো আর আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখো। আল্লাহ একদম উপযুক্ত সময়ে তোমার জন্য পারফেক্ট মানুষটাকে তোমার কাছে পাঠাবেন।[৪০৫]
শেষ বিচারের দিন আল্লাহর এক বান্দার সামনে পুরষ্কারের বিশাল এক পাহাড় নিয়ে আসা হবে। বান্দা বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! এগুলো কার?' আল্লাহ বলবেন, 'এগুলো তোমার।'
বান্দা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না এতোগুলো পুরস্কার তার, কারণ সে জানে দুনিয়াতে থাকতে এগুলো পাওয়ার মতো আমল সে করেনি।
আল্লাহ বান্দাকে বলবেন, 'তোমার মনে আছে তুমি আমার কাছে অনেক দু'আ করতে দুনিয়াতে। সেই দু'আগুলোর কিছু জবাব আমি দিয়েছিলাম, কিছু দেইনি। জবাব না দেওয়া দু'আগুলোর বদলে আমি তোমাকে এই পুরস্কার দিচ্ছি।'
বান্দা আফসোস করে বলবে, 'ইয়া আল্লাহ! কেন আপনি দুনিয়াতে আমার কিছু দু'আ কবুল করেছিলেন! আপনি যদি একটা দু'আও কবুল না করতেন তাহলে আমি আজ কতোগুলো পুরস্কার পেতাম!'[৪০৬]
মন খারাপ করো না, হতাশ হয়ো না, অস্থিরও হয়ো না। জীবনটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকো। ট্রেনে উঠে ট্রেন চালকের উপর ভরসা করে নিশ্চিন্তে ঘুম দেই আমরা... অ্যাক্সিডেন্টের ভয়ে জেগে থাকি না। অথচ আল্লাহ আমাদের রব! তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন-তাঁর উপরই আমরা ভরসা করতে পারি না! এটা তো লজ্জার কথা! কষ্টের কথা! দু'আ কবুলের একটি পূর্বশর্তই হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা, সুধারণা রাখা।
'আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে আমি তেমন।' [৪০৭]
শুধু মুখে মুখে চাওয়া কিন্তু দু'আ নয়। তোমার মনের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য আল্লাহ যা যা করতে বলেছেন তা করো। দু'আ কবুলের শর্তগুলো জানো। [৪০৮] সেগুলো মেনে চলো। এগুলোও দু'আরই অংশ। এরপর তাঁর উপর ভরসা করো। যথাসময়ে জবাব আসবেই।
'... তোমার মালিক তোমাকে এমন কিছু দেবেন যাতে তুমি খুশি হয়ে যাবে।'[৪০৯]
টিকাঃ
[৪০১] সূরা আল-ফুরক্বান, ২৫:৭৪
[৪০২] সহীহ মুসলিম ২৭৩৫ (ইফা, ৬৬৮৫)
[৪০৩] কখনও ঝরে যেও না, তারেক মেহান্না, সীরাত পাবলিকেশন
[৪০৪] পরিচিতদের মধ্যে অনেক আছে। বিয়ের পরে অনেক বদলে গেছে। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন ঠিক নেই। বউ এর সাথে জড়াজডি করা ছবি দেদারসে আপলোড করে অনলাইনে। দেখা অনেকে ইসলামের বেসিক কাজটা পর্যন্ত করে না। নামায-কালাম, রোযা, পর্দা কোনো কিছুর
[৪০৫] এক ভাইয়ের কথা জানি। ১০-১২ বছর আল্লাহর কাছে বিয়ের জন্য দু'আ করেছেন। ভাইয়ের জন্য পাত্রী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সবাই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ভাইও ধৈর্য ধরতে ধরতে প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবুও দু'আ করা বন্ধ করেননি। আল্লাহর প্রতি সুধারণা রেখে দু'আ করেছিলেন। এরপর অবিশ্বাস্যভাবে ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বেশ সুখেই আছেন এখন তিনি।
[৪০৬] আল আদাব আল মুফরাদ লিল ইমামিল বুখারী- ৭১০, মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ১১১৩৩। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ আত-তারগীব: ১৬৩৩)
[৪০৭] বুখারী: ৭৪০৫, মুসলিম: ২৬৭৫ (ইফা. ৬৫৬১)। আল্লাহর প্রতি সুধারণা বাড়ানোর জন্য পড়া যেতে পারে ড. ইয়াদ কুনাইবি হাফিযাহুল্লাহর জীবন বদলে দেওয়া বই- আল্লাহর প্রতি সুধারণা, প্রকাশনী: শব্দতরু। অবশ্যপাঠ্য একটি বই।
[৪০৮] দু'আ কবুল হওয়ার শর্তগুলো কী কী; যাতে দু'আটি আল্লাহর কাছে কবুল হয়, IslamQA - tinyurl.com/2p85phan
[৪০৯] সূরা আদ-দুহা, ৯৩: ৫