📄 মরিবার হলো তার সাধ...
আমাদের ছোট ভাইবোনদের জেনারেশনকে কী এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে- কিছু হলেই অত্যন্ত ঠুনকো কারণে এরা আত্মঘাতী হয়ে পড়ছে। কিন্তু কেন অবেলায় অভিমানী মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে এতো? কেন এতো তুচ্ছ কারণেই নিভে যাচ্ছে সব শুকতারাদের দল? [৩৩১]
বলিউড, নাটক, সিরিয়াল, গান, সাহিত্য, কবিতা তথা প্রচলিত সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি উপাদান ছ্যাঁকা খাওয়া পরবর্তী আত্মঘাতী কাজগুলোকে খুব রোমান্টিক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। তারা পর্দায় দেখাচ্ছে- ব্রেকআপের পর প্রেমিক-প্রেমিকারা ছন্নছাড়া জীবন কাটায়, বাবা-মা ক্যারিয়ার সব ভুলে মদ-গাঁজায় ডুবে থাকে। হাত কেটে ফেলে। শত লাথি খেয়েও বারবার প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে ছুটে যায়, অপমানিত হয়, মারধরের শিকার হয়, তবুও লজ্জা হয় না। জীবন ধ্বংস করার এই চরম অবমাননাকর প্রক্রিয়াটাকে মিডিয়া অত্যন্ত মহান ভাবে উপস্থাপন করে। এভাবে নিজেকে তিলে তিলে কষ্ট দেওয়াটাই নাকি 'ট্রু লাভ'। এভাবে একদিন হয়তো তোমার ভালোবাসা তার ভুল বুঝতে পারবে। ফিরে আসবে তোমার বুকে!
রূপালি পর্দায় এভাবে প্রেমিক বা প্রেমিকা ফিরে আসলেও বাস্তব জীবনে তা হয় না। গল্প কিংবা সিনেমায় নায়ক একজন, নায়িকাও একজন। কিন্তু বাস্তবজীবনের নায়ক নায়িকা তো আর একজন দুইজন না, অসংখ্য। তোমার কাছেই ফিরে আসতে হবে, এছাড়া তার আর কোনো অপশান নেই-ব্যাপারটা এমন না। শুধু শুধু তুমি জীবন নষ্ট করে চলছো। এভাবে শোক ভোলা যায় না। আর যদি সে তোমার এই দেবদাস সুলভ আচরণের কারণে ফিরেও আসে তাহলেও সম্পর্ক আর আগের মতো থাকবে না। অন্তর্বর্তী শূন্যতায় সম্পর্কের সুতো কেটে যায়। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সে যা বলবে, যা যা শর্ত দেবে তা তোমাকে নিঃশর্তে মেনে নিতে হবে। তোমার সাথে তার সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার থাকবে না। বরং সেই সম্পর্ক হবে মনিব আর দাসের। অনেক কিছুর মাশুল গুনে তারপর হয়তো মুক্তি মিলবে সেই দাসত্ব থেকে। কে জানে, হয়তো সারাজীবনেও মুক্তি মিলবে না।
ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার পেছনেও অন্যতম প্রধান কালপ্রিট হলো আত্মহত্যাকে মিডিয়াতে রোমান্টিসিযমের মোড়কে উপস্থাপন। সেট ডিজাইন, লাইট আর ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউযিক, ডায়ালগ, গল্পের স্ক্রিন প্লে, Quit টাইপের সুইসাইড নোট-সবকিছু মিলিয়ে এমন আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করা হয় যা দর্শকদের মনে তীব্রভাবে গেঁথে যায় ঠিক এভাবে- আহা! আত্মহত্যা করা কতো নাটকীয়, কী ভয়ঙ্কর রোমান্টিক একটা বিষয়! কোনো এক চাঁদনী পসর রাতে বা ঘোর বর্ষণভরা শ্রাবণ সন্ধ্যায় আমি ঝুলে পড়বো সিলিংয়ে বা পাখির মতো ডানা মেলে লাফ দিবো বিশ তলা উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে... আমার টেবিলে বইয়ের নিচে কিংবা লাশের পাশে চাপা পড়ে থাকবে সুইসাইড নোট। আমার মৃত্যুর পর সে বুঝতে পারবে আমি তাকে কতো ভালোবাসি! আমার জন্য কাঁদবে সে, কিন্তু আমাকে আর পাবে না; আমাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে আসতে সে। সারাজীবন অপরাধবোধে দগ্ধ হতে থাকবে। আমাকে করা তার প্রতিটি অবহেলার প্রতিশোধ এভাবেই নেবো আমি। আমার বন্ধুরা আমার ফেইসবুক টাইমলাইনে, আমার প্রোফাইল পিকচার কিংবা পোস্টের কমেন্টে RIP লেখবে, 'লাশটা আজও তার খুনিকে ভালোবাসে'-টাইপ পোস্ট দেবে, আমার কবরের পাশে ফুল দেবে, আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে প্রকৃত একজন প্রেমিক হিসেবে- 'যে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসেনি। ভালোবাসার জন্য জীবন দিয়েছে'। আমার কবরের উপর সবুজ ঘাস জন্মাবে। ফাগুন হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপবে সাদা সাদা ঘাসফুল...
অনেকেই ভাবে আত্মহত্যা করা খুব গভীর অনুভূতি সম্পন্ন কোনো কাজ। মৃত্যুর এই পদ্ধতি হয়তো তাদের মৃত্যুকে অর্থবহ করবে। মানুষ তাকে নিয়ে ভাবতে, কথা বলতে... তার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তোমার এই আত্মহত্যার কানাকড়ি কোনো মূল্য নেই। তেতো সত্যিটা হলো তুমি এভাবে আত্মহত্যা করার ফলে পৃথিবীর কারো কিছুই যায় আসবে না। পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। তারপরও পৃথিবী চলে। আত্মহত্যা তোমাকে স্পেশাল বানাবে না। বাস্তব জীবনের কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউযিক নেই। নেই লাইট আর ক্যামেরার মুন্সিয়ানা, আলো-আঁধারির খেলা। কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে নেমে এসো।
এভাবে তুমি শুধু নিজেকে ধ্বংস করছো। তোমার বাবা-মাকে কষ্ট দিচ্ছো। হয়তো তোমার বন্ধুবান্ধব, পরিচিত মানুষেরা তোমার টাইমলাইনে মৃত্যুর পর RIP লেখবে, এক-দুই দিন, বড়জোর এক-দুই সপ্তাহ তোমার কথা মনে করবে। তারপর ভুলে যাবে। এমনভাবে ভুলে যাবে যেন পৃথিবীতে তোমার অস্তিত্বই ছিল না। হয়তো হুটহাট মনে পড়বে তোমার কথা। তবে তোমাকে তারা মনে করবে একটা কাপুরুষ, অবুঝ, বোকা, ভীতু হিসেবে। পরাজিত হয়ে বা ড্রামাবাজি করতে করতে যে জীবন থেকে পালিয়েছে। অন্যদের উপদেশ দেবে-ঐ ভীতুটার মতো কখনো ভুল কাজ করো না!
কোনো কিছুই থেমে থাকবে না তোমার জন্য। পৃথিবী আগের মতোই চলবে। আকাশের রং আগের মতোই নীল থাকবে, বাবলা বনে চৈতালী হাওয়ার নিস্তব্ধতা খান খান করে অবিশ্রান্ত আর্তনাদের মতো ডেকে যাবে নিঃসঙ্গ কোনো ঘুঘু। তারাভরা আকাশে বুনো হাঁস ডানা মেলবে। তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে বৃষ্টিবিলাস করবে, জ্যোৎস্না রাতে ফাগুন হাওয়ায় ফিসফিস করে আউড়ে যাবে ভালোবাসার চিরন্তন বাক্যগুলো। তোমার জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হওয়া, তোমার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে আজীবন দুঃখ বয়ে বেড়ানোর অবকাশ বা ইচ্ছে, কোনোটাই মিলবে না তার। কষ্ট পাবে শুধু তোমার বাবা-মা। এই পৃথিবীতে তোমার প্রকৃত আপনজন। আর কষ্ট পাবে তুমি। কবরে, বিচারের দিনে, জাহান্নামে। কেন? এতো কিছু কীসের জন্য?
ধরো, তুমি যেমন প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলে ঠিক তাই হলো। কিন্তু তুমি কি এসব দেখতে পাবে? প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে মিলন হবে? না, কিছুই হবে না। সে তার জীবনসঙ্গীকে নিয়ে জীবন কাটাবে। এদিকে উল্টো তুমি কবরের আযাব ভোগ করবে। কোনো মানে হয়?
'যে যেভাবে আত্মহত্যা করবে, তার শাস্তি অনন্তকাল সেভাবেই চলতে থাকবে। [১] বাসা থেকে বিয়ে না দেওয়ায় অনেক কাপল একসাথে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা করলে দুইজনের মিলন হবে না। বরং দু'জনকেই আত্মহত্যার গুনাহর কারণে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাহলে এভাবে মরে লাভ কী হলো? প্রকৃত আবেগ থেকেও অনেকে আত্মহত্যা করে। ভাবে, আত্মহত্যা করে ফেলি; তাহলে আমার সব কষ্ট একসাথে শেষ হয়ে যাবে। দেখো ভাইয়া, দেখো আপু, আত্মহত্যা করলে কোনো কষ্টই শেষ হয়ে যায় না। দুনিয়ার এই জীবনটা শেষ না। বরং এ জীবনটা খুব ছোট। মৃত্যুর পর মানুষের আসল জীবন শুরু হয়। আত্মহত্যা করলে তোমার কষ্ট তো কমবেই না বরং কবরে আরো ভয়ঙ্কর কষ্টের শুরু হবে। এই মেয়ে বা ছেলেকে হারালে তুমি আর জীবনে বিয়েই করতে পারবে না, পৃথিবীর এরাই একমাত্র ছেলে/মেয়ে এমনও তো না। তাহলে কেন এই বোকামি?
তবে আত্মহত্যা করার পেছনের মূল কারণ হলো দুইটি- ১। প্রেমকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সার্থকতা হিসেবে দেখা। ২। জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা সম্পর্কে বেখেয়াল হওয়া।
এ নিয়ে আগের লেখাগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে। সেগুলো আবার পড়ে নাও। ভালোমতো মনে ও মস্তিষ্কে গেঁথে নাও। আল্লাহ তোমাকে তাঁর ইবাদাতের জন্য পাঠিয়েছেন, পুরো মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার দায়িত্ব তিনি আমাদের দিয়েছেন। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য প্রেম করা না! যে মহান দায়িত্ব আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন সেটা ভুলে সামান্য প্রেমের জন্য এভাবে তুমি জীবন দিয়ে দিচ্ছো?
উপরে বলা দুটি বিষয়ের বাস্তবতা বুঝলে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করলে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করা সম্ভব না তোমার পক্ষে।
'তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।’[৩৩৩]
আল্লাহ কি ইবরাহীমের জন্য আগুনকে শীতল করে দেননি? তিনি কি ইসমাঈলকে ছুরির নিচে রক্ষা করেন নি? ইউনুসকে রক্ষা করেননি মাছের পেট থেকে? তিনি মূসার জন্য সমুদ্রের মাঝে রাস্তা বানাননি? ইউসুফকে জুলায়খার চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেননি? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেননি? আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। তাহলে কেন তিনি তোমার জীবনের সমস্যার সমাধান করে দেবেন না? তাঁকে একটু ডাকার মতো করে ডেকে তো দেখো! ভরসা করো তাঁর উপর। ফিরে আসো ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। ইনশাআল্লাহ, তিনি তোমার সকল দুঃখকষ্ট লাঘব করে দেবেন।
মুসলিমদের ঘরে জন্মগ্রহণ করে স্কুলের ইসলাম শিক্ষা বই পড়েই আমরা ভেবে বসি ইসলাম সম্পর্কে, আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে আমরা একেবারে সবজান্তা হয়ে গেছি। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো ইসলাম সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আমরা আল্লাহকে চিনি না, আমাদের নবী (ﷺ)-কে চিনি না। পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি না। আর চলি না বলেই আমরা অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি।
সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-দের উত্তপ্ত মরুর বুকে শুইয়ে কয়লার আগুনের তাপ দেওয়া হতো। কোমরের চর্বি, মাংস গলে কয়লার আগুন নিভে যেতো। চোখের সামনেই মা-বাবাকে অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলা হতো। ধন সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন সব কিছু ত্যাগ করে বেছে নিতে হতো নির্বাসনের জীবন, কারাগারের জীবন। [৩৩৪] মক্কার সুদর্শন, স্টাইলিশ যুবক মুসআব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে রাজকীয় লাইফস্টাইল ছেড়ে বরণ করে নিতে হয়েছিল রাস্তার ধূলিমলিন জীবন। কিন্তু তারপরও তাঁরা প্রকৃত সুখী জীবনযাপন করতেন। সবসময় হাসিমুখে থাকতেন। আত্মহত্যার কথা তো কল্পনাতেও ছিল না! কীভাবে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার পরেও তাঁরা হাসিমুখে থেকেছেন? বীরের মতো মাথা উঁচু করে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিপদের মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন? কারণ তাঁরা আল্লাহকে চিনতেন। তাঁরা ইসলামের শক্তিতে একেকজন হয়ে গিয়েছিলেন সত্যিকারের সুপারহিরো। আমরা আল্লাহকে চিনি না, তাঁকে মানি না বলেই আমাদের জীবনের এতো হতাশা, এতো দুঃখ-কষ্ট, মানসিকভাবে আমরা এতো দুর্বল।
কাজ (রিয়্যাক্টিভ)
নেশা করা, ঘুমের ওষুধ খাওয়া, হাত কাটা, কোনো কাজকর্ম না করে দুঃখ বিলাস করা, বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া, খাওয়া দাওয়া না করা।
না পাওয়ার দুঃখে, অভিমান, ঝগড়া করে আত্মহত্যা করা।
পরিণতি
তোমার সাবেক প্রেমিক/ প্রেমিকার উপর এগুলোর কোনো প্রভাব নেই। এসবে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সে দিব্যি তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে শুধু তোমার। তুমি তোমার স্বাস্থ্য, সময়, টাকাপয়সা এবং জীবন নষ্ট করছো। পরিবারা কে কষ্ট দিচ্ছো। নিষিদ্ধ কাজগুলো করার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাচ্ছো। প্রেমিক-প্রেমিকা ফিরে আসলেও তার দাসত্ব মেনে নিচ্ছো।
১। কবরের শাস্তি।
২। জাহান্নামের শাস্তি।
৩। বাবা-মা'র কষ্ট।
৪। নিজেকে ভীরু, বোকা, কাপুরুষ, লুযার প্রমাণ করা।
৫। আল্লাহর দেওয়া সুন্দর এই জীবনের অসংখ্য নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়া।
কাজ (প্রোঅ্যাক্টিভ)
১ নং কলামের কাজগুলোর বদলে তুমি ধৈর্য ধরলে। নেশার পেছনে টাকা না উড়িয়ে সেই টাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে। দু'আ করলে গুনাহ মাফের জন্য, চোখ শীতল করা জীবনসঙ্গীনীর জন্য। নিজের স্কিল বাড়ানোর চেষ্টা করলে।
বিচ্ছেদকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেওয়া, বিচ্ছেদের ধাক্কাকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।
পরিণতি
আল্লাহ তোমাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করবেন। তোমার জীবন করে দেবেন প্রশান্তিময়। তোমার স্কিল দিয়ে পরিবার, সমাজের, মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবে। সবশেষে আল্লাহ তোমাকে চিরসুখের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, ইনশাআল্লাহ।
১। গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বাঁচানো।
২। শাস্তি থেকে বাঁচা।
৩। প্রশান্তিময় বরকতময় জীবন।
৪। চোখ শীতলকারী জীবন সঙ্গী/ সঙ্গিনী।
৫। জান্নাত।
যদি মন কাঁদে লেখাতে একাকীত্ব অবসর কাটানোর যে টিপসগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো অনুসরণ করো। হাসপাতালে যাও সুযোগ পেলে। আমার পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের বন্ধু ছ্যাঁকা খেয়ে মারাত্মক আত্মঘাতী জীবনযাপন করছিল। হাসপাতালে এক পাক ঘুরে এসে, রোগীদের দুঃখ কষ্ট, বেঁচে থাকার আকুতি দেখে সে একদম সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত এসেছে।
তোমার মাথায় আত্মহত্যার কথা উঁকি দিয়েছে এটা বাবা-মা বা আপনজনদের জানিয়ে দাও। যদি সম্ভব হয় একজন মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। দড়ি, ছুরি, কাঁচি, ব্লেড, ঘুমের ওষুধ (যদি থাকে) হাতের নাগাল থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। যতটা পারা যায় একাকী থাকাকে এড়ানোর চেষ্টা করো। বিশেষ করে রাতে। রাত জাগবে না এবং রাতে একা ঘুমাবে না। আত্মহত্যার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে রাতে। সেই সঙ্গে ওযু করে ঘুমানোর দু'আ পড়ে ঘুমাও।
তবু যদি মাথায় আত্মহত্যার কথা ঘুরতেই থাকে....
১। যখনই এমন হবে সঙ্গে সঙ্গে 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই) পড়বে। শয়তান তোমাকে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে।
২। রুমে একা থাকলে রুম থেকে বের হয়ে যাবে। পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলবে। [৩৩৫] বাসায় কেউ না থাকলে রাস্তায় বের হয়ে যাবে। হাঁটাহাঁটি করবে। মসজিদে চলে যেতে পারো। মসজিদে গিয়ে দু'রাকাত নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। সুযোগ থাকলে কোনো আলিমের কাছে চলে যাবে। পারলে রাস্তার কোনো অসহায় গরীব দুঃখী মানুষকে খাবার কিনে দেবে। ৫-১০ টাকা যা পারো দান করবে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।
***
একটু ধৈর্য ধরে থাকো। সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। যেই মানুষটা তোমার চিন্তাভাবনায় মিশে গিয়েছিল, যাকে ছাড়া ভেবেছিলে তুমি বাঁচবে না, তাকে ছাড়াই দিব্যি তুমি হেসেখেলে বেঁচে থাকবে। মাসের পর মাস চলে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে, তার কথা তোমার ক্ষণিকের জন্যেও মনে হবে না। তার চেহারা মন থেকে মুছে যাবে, হয়তো ভুলে যাবে তার নামও। পাগলামির কথা ভেবে তখন তুমি আফসোস করবে, কী অবুঝ ছিলে তুমি, পাগলামির কী বিশাল ভাবসম্প্রসারণ করে যাচ্ছিলে...
প্রকৃত ভালোবাসা তো মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। বাবা আদম ও মা হাওয়ার ভালোবাসার মাধ্যমে বহতা মানবসভ্যতার সূচনা হয়েছে। আল্লাহ তাঁদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। যে ভালোবাসা জীবন ধ্বংস করে দেয়, ধ্বংস করে পরিবার ও সমাজকে সেই ভালোবাসা কেমন ভালোবাসা? ফিরে আসো এমন ধ্বংসাত্মক ভালোবাসা থেকে। আল্লাহ বিচ্ছেদের এই কষ্টের মাধ্যমে তোমাকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন। তোমাকে সুযোগ করে দিচ্ছেন পরম সফলতার পথে চলার। এই সুযোগ হেলায় নষ্ট করো না।
টিকাঃ
[৩৩১] এই লেখার বিস্তারিত ভার্সন পাবে এই লিংকে- Lost Modesty ফেইসবুক পোেস্ট, অক্টোবর ০২,২০২২- tinyurl.com/2p9yv6nh
[১] বুখারী: ৫৭৭৮, মুসলিম: ১০৯ (ইফা. ২০১)
[৩৩৩] সূরা আন-নিসা, ৪:২৯
[৩৩৪] তুমি চাইলে আমাদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারো। আমাদের লোকবল অত্যন্ত সীমিত। এরপরেও আমাদের চেষ্টা থাকবে মেন্টাল সাপোর্ট দেবার। অন্তত তোমার কথাগুলো আমরা শুনবো ইনশাআল্লাহ।
[৩৩৫] ফোন করার মতো কাউকেই না পেলে জাতীয় জরুরি সাহায্য নাম্বার- ৯৯৯ এ ফোন করবে।
📄 তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ
এক.
মানুষ কি নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্তে প্রেমে পড়ে? অনেকেই একদম দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে বলে- আমি ঐ দিন, অমুক তারিখের, ঐ সময় ওর প্রেমে পড়েছিলাম। আকাশের রং কেমন ছিল, বাতাস হচ্ছিল কি না, সূর্য তার দায়িত্ব কতোটুকু পালন করছিল, এমন খুঁটিনাটিও মনে থাকে নাকি অনেকের। জিসান এসব ঠিক বিশ্বাস করতো না। এরকম দিনক্ষণ গুণে কেউ প্রেমে পড়ে নাকি! যতসব চাপাবাজি!
তারপর জিসান তার দেখা পেলো...
সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার প্রশ্ন দেবার ঠিক আগমুহূর্ত। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো জিসান। হঠাৎ চোখ পড়লো তার উপর। একটা কালো ব্যান্ড দিয়ে চুলগুলো পেছনে নিয়ে বাঁধছিল সে। সব ভুলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জিসান। মানুষের সিক্সথ সেন্স বলে কিছু আছে বোধহয়। কেউ কারো দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সে টের পায়। সেও টের পেলো। চোখাচোখি হলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন লাফাতে শুরু করলো জিসানের। পেটের ভেতরেও যেন হাজারটা প্রজাপতি একসাথে ডানা ঝাপটাচ্ছে। জিসানের চোখের ভাষা মেয়েটা বুঝে ফেললো নিমিষেই। ক্ষীণ একটা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটেই মিলিয়ে গেল তার দু'ঠোঁটে। সেই মুহূর্তে, সেই ১৭ আগস্ট, মঙ্গলবার সকাল ৯ টা ৫৭ মিনিটে ৫৮ সেকেন্ডে জিসান তার প্রেমে পড়ে গেল!
...শুরুটা হয় খুব সাধারণ, নির্দোষ এক বিষয় দিয়ে- 'এক পলক তাকানো'। সাধারণের চাইতে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকা হয়তো। তারপর? ভালোলাগা, ক্রাশ খাওয়া যাকে বলা হয়। এরপর? মেসেঞ্জারে টুংটাং, রাতজাগা, কথায় কথায় রাত ভোর হয়ে যাওয়া। প্রপোজ করা। ফাস্টফুড বা কফিশপে প্রথম দেখা, ফাগুনের অগোছালো ফুটপাতে পাশাপাশি হাঁটা, খুনসুটি, রিকশাবিলাস। তারপর ফ্যান্টাসি কিংডম, ওয়াটার কিংডমের পর্ব শেষ করে লিটনের ফ্ল্যাট কিংবা ট্যুর। শরীরের উত্তাপে ভালোবাসা পরিমাপ করা।
তারপর? প্রাইভেট ক্লিনিক। গর্ভপাত। ডাস্টবিনে নতুন কোনো নবজাতকের, কাক আর কুকুরে খুবলে খুবলে খাওয়া লাশ। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, ভিডিও-ছবি ভাইরাল। মোহ, স্বপ্ন, কল্পনা, মৃত্যু।
অথবা ব্রেকআপ। সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়ে প্রাক্তনকে ভুলবার চেষ্টা। হতাশা, দলাপাকানো কান্না আর কষ্টের দীর্ঘ রাত। গাঁজা, নেশা, পর্ন, হস্তমৈথুন... লাইভে এসে আত্মহত্যার রোমান্টিসিযম। মোহ, স্বপ্ন, কল্পনা, মৃত্যু।
অথবা টেক্সটবুক লাভস্টোরির মতো জীবন পার করে দেওয়া, কিন্তু আল্লাহর আইনের অবাধ্য হয়ে জাহান্নামের জ্বালানি হওয়া...
অথচ শুরুটা ছিল সাধারণ এক বিষয় থেকে- এক পলক তাকানো। যুগে যুগে কতো আবিদ, আল্লাহওয়ালা লোকদের পদস্খলন হলো, কতো বুকে দাউ দাউ আগুন জ্বললো, কতো ঘর তছনছ হয়ে গেল, ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি বসালো, কতো রাজা সিংহাসন হারিয়ে ফেললো, ছারখার হয়ে গেল কতো নগর, বন্দর, শহর, গ্রাম, সভ্যতা!
রবিঠাকুর বুঝেছিল এই আপাত নিরীহ এক পলক তাকানো, চকিত চাহনির ভয়াবহতা। নিজে মানতে না পারলেও লিখে গিয়েছে বহু বছর আগে-
প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা সেদিন চৈত্রমাস
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
চোখের অবাধ্য দৃষ্টি। আদম সন্তানের সাথে শয়তানের চিরন্তন যুদ্ধের মারাত্মক কার্যকরী এক অস্ত্র। বিষাক্ত অব্যর্থ তীর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'দৃষ্টি ইবলিসের তীরগুলো থেকে বিষ মেশানো একটি তীর।' [৩৩৬]
চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির ধ্বংসাত্মক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আমরা আলকেমি লেখাতে বহু আলোচনা করে এসেছি। তোমার রব তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। শয়তান যেন তোমাকে তার খেলার পুতুল না বানাতে পারে, তার জন্য কুরআনে আল্লাহ বেশ কিছু বিষয় তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। ঈমানদার মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করে... '[৩৩৭]
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে মানুষের নিজের চেয়েও ভালোমতো চেনেন। তিনি জানেন মানুষ চোখের হিফাযত করতে, পর্দা করতে ভুলে যাবে। তাই তিনি বিষয়টি কুরআনে বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর শত নিষেধ সত্ত্বেও আমরা এ বিষয়টাকে একদমই পাত্তা দেই না। 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, একি মোর অপরাধ'- এই হলো অবাধ্য দৃষ্টির ব্যাপারে আমাদের মনোভাব। ফলাফল কী আমরা হাতেনাতে পাইনি? চারিদিকে আজ ভাঙনের সুর। পতনের আওয়াজ পাওয়া যায় অষ্টপ্রহর। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, 'যৌন কেলেঙ্কারির শুরু হয় দেখা থেকে, যেমন আগুনের শুরুটা একটিমাত্র স্ফুলিংগ থেকে। এজন্য লজ্জাস্থানের সংরক্ষণের জন্য দৃষ্টির সংরক্ষণ জরুরি।[৩০৮] তিনি আরো বলেন, 'দৃষ্টি অবনত রাখার মাধ্যমে মানুষ প্রেমের নেশা থেকে নিরাপদ থাকে।[৩৩৯]
ইবনুল জাওযী (রহ.) যেমন বলেছেন, '...প্রেম এক গাছের মতো, আর দৃষ্টি হলো সেই পানির মতো যা ঐ গাছের দিকে গড়িয়ে যায়। সুতরাং, গাছে পানি সেচ দেওয়া হলে গাছ প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে ওঠে। আর এ সমস্ত দুর্যোগের মূলে থাকে অবাধ দৃষ্টিপাত, যা শরীয়াহতে নিষিদ্ধ। এই অবাধ তথা অবৈধ দৃষ্টির কারণে কু-কামনা অন্তরে প্রবল হয়, বিপর্যয়ের বন্যা ব্যক্তিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং অনেকের রোগ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে তখন আর না কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাদের কানে বাজে, আর না কারো মারপিট গায়ে লাগে।' [৩৪০]
সেই রঙিন কৈশোর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কতবার তুমি মায়াবতীদের প্রেমে পড়েছো! আর কতবার তোমার হৃদয় ভেঙেছে! চিন্তা করে দেখো একবার, এর কিছুই হতো না যদি তুমি চোখের হিফাযত করতো। চোখের হিফাযত করতে পারলে তোমার জীবনের গল্পটাই অন্যরকম হতো!
প্রেমে পড়া, পরকীয়া, আত্মহত্যা, যিনা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, গর্ভপাত, খুনোখুনি, পর্ন, হস্তমৈথুন, আসক্তিসহ আমাদের অনেক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো, জীবন অনেক সুন্দর আনন্দময় হয়ে যেতো যদি আমরা চোখের হিফাযত করতে পারতাম। যদি সতর্ক হতাম অবাধ্য দৃষ্টির ব্যাপারে। যদি শয়তানের ফাঁদগুলো চিনতাম। যদি শয়তানের তীরগুলোর বিরুদ্ধে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশিত পথে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতাম। কিন্তু আমরা বড়ই উদাসীন!
দুই.
কী যেন নাম ছিল বালিকার... নামটাও ভুলে গেছো, অথচ একসময় এই বিস্মৃতপ্রায় বালিকাকে দূর থেকে ঠোঁট টিপে হাসতে দেখে কতোবার অঙ্কে ভুল করেছো, বালিকার ঈষৎ ভ্রুকুটিতে কতোবার নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেক্ট্রন বিন্যাস ওলটপালট হয়ে গিয়েছে, ভুলিয়ে দিয়েছে থিওরি অফ রিলেটিভিটির প্রশ্নগুলোর চিন্তা- খেয়াল আছে?
জ্ঞানার্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো চোখের হিফাযত করা। চোখের হিফাযত করলে বিচক্ষণতা বাড়ে, বুদ্ধি দিন দিন ধারালো হয়। শাইখ সুজাউল কারমানী (রহ.) বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি তার বাহ্যিক অবস্থাকে সুন্নাহর পাবন্দ বানায়, অন্তরকে আল্লাহর চিন্তায় ও স্মরণে ব্যস্ত রাখে, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকে, নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে নজর হিফাযত করে এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, সে ব্যক্তির উপলব্ধি এবং দূরদৃষ্টি কখনো ভুল হয় না।’[৩৪১]
পড়ার টেবিলে মন বসে না? মন অস্থির হয়ে থাকে? সময়ে বরকত পাও না? মনে হয় দিন ২৪ ঘণ্টা না হয়ে আরো কয়েক ঘণ্টা বেশি হলে ভালো হতো? কাজে শুধু ঘাপলা লাগে? চোখের হিফাযত করো। জীবন পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। তুমি কিছুদিন চেষ্টা করে দেখো, যদি উপকৃত না হও তাহলে বাদ দিও। শাইখ জুলফিকার আলী যেমনটা বলছেন,
‘চোখের গুনাহ’র অন্যতম খারাপ প্রভাব হলো, এর কারণে রিযিক ও সময়ের বরকত শেষ হয়ে যায়। ছোট ছোট কাজে বড় বড় সমস্যা ছুটে আসে। জীবনে অনেক কষ্ট ও চেষ্টার পরও সফলতার মুখ দেখা হয় না। আপাতদৃষ্টিতে কাজ সম্পন্ন মনে হলেও যথাসময়ে কাজ অসম্পন্ন দেখা যায়। অহেতুক চিন্তা ও পেরেশানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ মনে করে, কেউ কিছু একটা করেছে। অথচ সে নিজের অন্তরের গুনাহের কারণে বিপদের মধ্যে পড়ে থাকে। নিজেই স্বীকার করে যে, একটা সময় ছিল যখন সে মাটিতে হাত রাখলেও সোনা হয়ে যেতো। আর এখন সোনায় হাত রাখলেও মাটিতে পরিণত হয়। এসবই চোখের গুনাহের কারণে হয়।’[৩৪২]
কিন্তু...কিন্তু আল্লাহর দেওয়া সৌন্দর্য দেখবো না? আমার কতো ভালো লাগে দেখতে! দেখো, যেই আল্লাহ সৌন্দর্য দিয়েছেন, সেই আল্লাহই তো তোমাকে চোখের হিফাযত করতে বলেছেন। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার অজুহাত দেওয়ার সময় আল্লাহর কথা মনে পড়ে, কিন্তু আল্লাহর আদেশ মানার কথা মনে পড়ে না? এধরনের ফাজলামো অজুহাতে তুমি নিজেও কি আসলে কনভিন্সড? সত্যি করে বলো তো?
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন,
‘দৃষ্টি অবনতকরণ দ্বারা মানুষের অন্তর দুঃখ ও হতাশা থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা, যে ব্যক্তি নিজ দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণহীন রাখে, দুঃখ ব্যতীত আর কিছু অর্জিত হয় না। সে এমন কিছু দেখে যা সে অর্জন করতে পারে না আর না তা থেকে ধৈর্যধারণ করতে পারে।'[৩৪৩]
তিনি আরো বলেছেন, 'দৃষ্টির তীর নিক্ষেপ করলে নিক্ষেপকারীই প্রথমে বিদ্ধ হয়। দৃষ্টিনিক্ষেপকারী ভাবে আরেকবার দেখলে তার অন্তরে যে ক্ষত হয়েছে তা নিরাময় হবে। অথচ আরেকটি দৃষ্টি ক্ষতকে আরো গভীর করে।'[৩৪৪]
নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখো- ক্যাম্পাসে, রাস্তাঘাটে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দু'চোখে গোগ্রাসে মেয়ে গিলে তোমার বুক অস্থিরতার আগুনে পুড়ে যায় না? দু'চোখ দিয়ে স্ক্যান করা জাস্টফ্রেন্ডের শরীর মনে করে তুমি গভীর রাতে বাথরুমে নিজেকে ঠাণ্ডা করো না? পাগল হয়ে যাও না শরীরের নেশায়? কিন্তু চোখের হিফাযত করতে পারলে জীবনের, ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে মুসলমান প্রথমবার কোনো মহিলার সৌন্দর্য দেখে চোখ নামিয়ে নেয়, আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তার জন্য ইবাদাতে স্বাদ ও মিষ্টতা সৃষ্টি করে দেন।'[৩৪৫] 'কুদৃষ্টি শয়তানের বিষমিশ্রিত তীর সমূহের একটি। যে ব্যক্তি আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলার ভয়ে তাকে ছেড়ে দেবে, আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তার অন্তরে ঈমানের স্বাদ সৃষ্টি করে দেবেন।'[৩৪৬] এই ঈমানের স্বাদ যে কতো মিষ্টি হতে পারে তা নিজে অনুভব না করলে কল্পনাও করতে পারবে না!
চোখের হিফাযত করতে না পারলে দাম্পত্য জীবনেও মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। দুনিয়ার তাবৎ মেয়েদের সৌন্দর্য যেহেতু তুমি আকণ্ঠ পানে মগ্ন থাকো- তাই বউকে দেখা মাত্রই সুন্দরী অপ্সরীদের সাথে তুমি তার তুলনা শুরু করবে। আরে ঐ মেয়েটার চুল কত সিল্কি ছিল, আমার বউয়ের চুল ভালো না। ঐ মেয়ের ফিগারটা সেই ছিল, আমার বউয়ের ফিগার ভালো না... এরকম শত কথা মনে হবে। ভালোবাসা বিলীন হয়ে যাবে। অথচ যদি চোখের হিফাযত করতে তাহলে বউকে মনে হতো বিশ্বসুন্দরী। নিজের সব কামনাবাসনা, ভালোবাসা সবকিছু বউয়ের জন্য হিফাযত করে বাসায় ফিরতে। এরপর তুমুল প্রেমের বন্যা বইয়ে যেতো। জীবন হতো সুন্দর।[৩৪৭]
চোখের হিফাযত করতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। নিজের চোখ এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, তুমি বুঝবে তুমি আর প্রবৃত্তির অনুগত দাস না। গভীর আত্মবিশ্বাস তখন জন্ম নেবে তোমার মনে। তোমার জীবনকে তুমি নিজে নিয়ন্ত্রণ করবে। নফস আর সস্তা প্রেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। চোখের হিফাযত তোমাকে উপহার দেবে ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব। পাঁচ-দশটা গার্লফ্রেন্ড চালায় এমন ছেলে আসল পুরুষ নয়, আসল পুরুষ তো তারাই যারা রূপবতীদের রূপের আকর্ষণ উপেক্ষা করে চোখের হিফাযত করে। মেয়েদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা মানে নিজেকেই অপমান করা- এটা কেন আমরা বুঝি না? যে মেয়েটার দিকে তুমি লোলুপ চোখে তাকিয়ে আছো, তার কাছে তুমি কতটুকু ছোট হয়ে গেছো, সেটা একবার ভেবে দেখো তো! মেয়েটা ধরেই নেবে যে তুমি একটা ক্যাবলাকান্ত, তোমাকে চাইলেই ইচ্ছেমতো ঘুরানো যায়।
তিন.
আশা করি বুঝতে পেরেছো প্রেমের ফাঁদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য চোখের হিফাযত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু চোখের হিফাযত কীভাবে করবো? অশ্লীলতার বিষাক্ত বাতাসে এই সমাজ বিষিয়ে গিয়েছে। বিদ্যমান বিশ্ব কাঠামোকে পরিবর্তন করা না গেলে ১০০ ভাগ চোখের হিফাযত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে তার মানে এই না যে, ১০০% সম্ভব না তাই আমরা সেই চেষ্টাই ছেড়ে দেবো। আর কোনো খাবার না থাকলে, জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনে শূকরও খাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তার মানে কি তুমি প্রতিদিন মজা করে চার প্লেট করে শূকরের মাংসের বিরিয়ানি আর কয়েক হালি হ্যামবার্গার খাবে? নিশ্চয় না। তো চলো দেখা যাক, এই বিরুদ্ধ পরিবেশে কীভাবে চোখের হিফাযত করা যায়-
১। রোলমডেল ঠিক করো। যেসব মানুষ চোখের হিফাযতের মহাকাব্য রচনা করেছেন তাদের কথা বেশি বেশি জানো। অনুপ্রেরণা পাবে। রোলমডেলদের মধ্যে প্রথমেই আসবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং নবীগণ। বিশেষ করে মূসা এবং ইউসুফ আলাইহিমাস সালাম এর ব্যাপারে এরই মধ্যে আমরা আলোচনা করেছি। অনুসরণীয়দের লিস্টে তারপর আসবে সাহাবীগণের নাম। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। তারপর আসবেন নেককার পূর্বসুরী বা আস-সালাফুস সালিহীন।
যেমন ধরো, হাসান বিন আবী সিনান ছিলেন হাসান আল-বাসরী'র ছাত্রদের একজন। তিনি চোখের হিফাযতের ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন। একবার ঈদের সালাত শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। কেউ একজন তাকে বললো, 'আজ ঈদের নামাজে অনেক মহিলা শরীক হয়েছিল।' প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'ফিরে আসা পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনো মহিলার দেখা হয়নি।'
ঈদের দিন তাঁর স্ত্রী কথায় কথায় তাঁকে বলেছিলেন, 'আজ তো অনেক সুন্দরীদের দেখলে!' তিনি উত্তর দিলেন, 'ঘর থেকে বের হয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কোনো মহিলা আমার চোখে পড়েনি।'[৩৪৮]
তো এরকম ঘটনা অনেক রয়েছে। শুধু অতীতে না, বর্তমান যুগেও আছে।[৩৪৯] এসব ঘটনা বেশি বেশি সামনে রাখার চেষ্টা করো।[৩৫০] নিজের ওপর চ্যালেঞ্জ নাও- তারা যদি পারে তো আমি কেন পারবো না?
২। ৩-৫-৭ দিনের একটা ছোট এক্সপেরিমেন্ট করো। সম্পূর্ণভাবে চোখের হিফাযত করো। এই সময়কার অনুভূতিগুলো বিস্তারিত লিখে রাখো। তুমি কতোটা শান্তি পাচ্ছো, তোমার অন্তর কতোটা স্থির হয়ে আছে ...ইত্যাদি। এরপর মাঝে মাঝেই এই ডায়েরি খুলে এই সময়কার অনুভূতিগুলো পড়বে। চোখের হিফাযত করার অনুপ্রেরণা পাবে।
৩। বিয়ে ও রোযা চোখের হিফাযতের জন্য কার্যকরী ওষুধ। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই টিপস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্য রাখে তাদের উচিত বিয়ে করে ফেলা। কেননা বিয়ে দৃষ্টি অবনতকারী ও লজ্জাস্থানকে হিফাযতকারী। আর যার সামর্থ্য নেই তার উচিত রোযা রাখা। কেননা রোযা যৌন উত্তেজনা প্রশমনকারী।[৩৫১]
তবে বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভুগবে না। এখন বিয়ে করতে পারছি না, তার মানে চোখের হিফাযতও করতে পারবো না- এটা ভুল ধারণা। বিয়ে করার জন্য যোগ্যতা অর্জন করো, রোযা রাখো। সামনে বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইন শা আল্লাহ।
৪। কো এডুকেশন এড়িয়ে চলা। সর্বোচ্চ চেষ্টা করো নারী পুরুষের ফ্রি-মিক্সিং হয় এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলতে।
৫। সোশ্যাল সাইটের ব্যাপারে সাবধান থাকো। বিপরীত লিঙ্গের কেউই যেন তোমার সাথে এড না থাকে। তোমার নিউযফিডে যেন এমন কিছু না আসে।
৬। যেসব জায়গায় চোখের হিফাযত করতে পারবে বলে মনে হয় না, সেসব জায়গা এড়িয়ে চলো। [৩৫২]
৭। আল্লাহর পথে ফিরে এসো। প্রেম থেকে নিজেকে রক্ষা করা, চোখের হিফাযত করার পূর্বশর্ত হলো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) যেমনটা বলেছেন,
'হৃদয় যদি একমাত্র আল্লাহকে ভালোবাসে, দ্বীনকে একমাত্র তার জন্য একনিষ্ঠ করে, তাহলে অন্য কারো ভালোবাসার মুসিবত তাকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রেমের উন্মাদনা তো পরের কথা। প্রেম ভালোবাসায় লিপ্ত হওয়ার কারণ হৃদয়ে আল্লাহর মহব্বতের অপূর্ণতা। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে মহব্বত করতেন, তিনি এই মানবীয় ইশক মহব্বত থেকে বেঁচে গেছেন। [৩৫৩]
৮। নিজের সাথে যুদ্ধ করো। হঠাৎ, অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো উপর চোখ পড়ে যেতেই পারে। এতে কোনো পাপ নেই। তবে প্রথমবার চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
'হে আলী! একবার দৃষ্টিপাত হয়ে গেলে, দ্বিতীয়বার আর দৃষ্টি দিও না। কারণ প্রথমবার দৃষ্টি মাফ হয়ে যায়, কিন্তু দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দিলে গুনাহ হয়'। [৩৫৪]
আসলে কারো উপর চোখ পড়লো, দেখে ভালো লাগলো, দেখতে থাকতেই ইচ্ছা করলো বা চোখ নামিয়ে নেবার পর আবার দেখতে ইচ্ছা করলো- এই মুহূর্তটাতেই তোমার আসল লড়াই শুরু হয়। এ সময়টাতেই মনের সকল জোর এক করে শয়তানকে আর নফসকে হারাতে হবে। নিজের সাথে নিজেকেই যুদ্ধ করতে হবে।
আমি চাইলে আবার তাকাতে পারি সেই রূপসীর দিকে। কিন্তু কেন তাকাবো? তাকে দেখে কি আমার তৃপ্তি মেটবে নাকি অন্তরে অতৃপ্ত তৃষ্ণা জাগবে? আমি কি প্রেম, যিনা-ব্যভিচারের ফাঁদে পড়তে চাই? জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে চাই? চোখের হিফাযত করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।[৩৫৫] আমি কি জান্নাত চাই না? আল্লাহকে দেখতে চাই না? জান্নাতের অনিন্দ্যসুন্দর স্ত্রীদের সাথে প্রেম করতে চাই না? আমি কেন ক্ষণিকের সুখের জন্য এতোকিছু হারাবো? কেন রক্ত, ময়লা, ঘাম মেশানো পৃথিবীর অপূর্ণ মানবীকে আরেকবার দেখার জন্য জান্নাত হারানোর ঝুঁকি নেবো?
আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, 'যে নিজের কামনা-বাসনার অনুসরণ করে তার উদাহরণ তো কুকুরের মতো।'[৩৫৬] আমি কি তাহলে কুকুর? আমি কি একটা পশু?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কামনা- বাসনা আমার আনীত বিধানের অধীন হবে। [৩৫৭] আমি কি মুমিন হতে চাই না?
নিজের মা, বোনের কথা চিন্তা করো। অন্য কোনো পুরুষ যদি তাদের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতো, শরীর স্ক্যান করতো- তাহলে তোমার কেমন লাগতো? সেই রূপসীও তো কারো না কারো বোন, মা!
এভাবে নিজের সাথে লড়াই করতে থাকো। ইনশাআল্লাহ তোমার আর দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছা করবে না। পাশাপাশি সেই মেয়ের জন্য দু'আ করতে পারো- আল্লাহ, তাকে তুমি পরিপূর্ণ পর্দা করার তাওফিক দাও। আল্লাহ এর বিনিময়ে তোমাকেও চোখের হিফাযত করার তাওফিক দেবেন ইনশাআল্লাহ।
৯। মেয়েদের পেছনে কখনো হাঁটবে না। মেয়েদের হিপ মারাত্মক ফিতনাহ তৈরি করে। [৩৫৮] দ্রুত হেঁটে মেয়েদের সামনে চলে যাবে বা রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে যাবে।
১০। রাস্তায় বসে আড্ডা দেবার সময় সতর্ক থাকবে। রাস্তায় বসে আড্ডা দিলে আসলে চোখের হিফাযত করা মুশকিল হয়ে যায়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, 'তোমরা রাস্তার পাশে বসে থেকো না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমাদের তো এর প্রয়োজন হয়। পরস্পরে প্রয়োজনীয় কথা বলতে হয়। রাসূল (ﷺ) বললেন, বসতেই যদি হয় তবে রাস্তার হক আদায় করে বসো। সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কী?
রাসূল (ﷺ) বললেন, রাস্তার হক হলো- দৃষ্টিকে অবনত রাখা। কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখা। [৩৫৯]
১১। নিজেকে শাস্তি দাও। এটা চোখের হিফাযতের খুবই কার্যকরী একটা পদ্ধতি। অনেক উলামা নিজের জন্য এমন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। নিজের জন্য অস্বস্তিকর শাস্তির ব্যবস্থা করবে। যেমন ধরো, তোমার টাকাপয়সার সমস্যা। তুমি ঠিক করবে, চোখের হিফাযত করতে না পারলে আমি দিনে ৫০-১০০-৫০০ টাকা মাসজিদে দান করবো। তোমার যদি সালাত আদায় করতে আলসেমি লাগে, তাহলে ঠিক করবে, চোখের হিফাযত করতে না পারলে আমি প্রতিদিন ৪, ৬, ১০ রাকাত নফল সালাত আদায় করবো। আইডিয়াটা ধরতে পেরেছো নিশ্চয়? এতে নিজের উপর যেমন প্রেশার থাকবে, তেমনি আরো সওয়াবের কাজ করে ফেললে শয়তান বাবাজি হতাশ হয়ে তোমার থেকে দূরে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
***
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, দৃষ্টি শয়তানের তীর। এই দৃষ্টি থেকেই শুরু কতো অসংখ্য আঁধারের পথচলা। এসো, মহান আল্লাহর নির্দেশ মেনে দৃষ্টি অবনত রাখি, নিজেদের সুন্নাহর বর্মে ঢেকে ব্যর্থ করে দিই শয়তানের এই তীর।
টিকাঃ
[৩৩৬] মুসতাদারাকে হাকিম: ৭৮৭৫
[৩৩৭] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩০-৩১
[৩০৮] আল-জাওয়াবুল কাফি, ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ, পৃষ্ঠা-২০৪
[৩৩৯] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৯
[৩৪০] যাম্মুল হাওয়া ১/১২৭
[৩৪১] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৮
[৩৪২] যৌবনের মৌবনে, মাওলানা জুলফিকার আহমেদ নকশবন্দি, মাহফিল প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৫৫
[৩৪৩] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৬
[৩৪৪] আল জাওয়াবুল কাফি, ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ, পৃষ্ঠা- ৪১৭
[৩৪৫] মুসনাদ আহমাদ: ৮৭২২২, আল-মু'জামুল কাবীর লিত-ত্বাবারানী: ৭৮৪২, শু'আবুল ঈমান লিল-বাইহাকী: ৫০৪৮। ইবনু আদী হাদিসটিকে দুর্বল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আলবানী বলেছেন অত্যন্ত দুর্বল। (আল-কামেল ৬/২৬০, হিজাবুল মারআহ পৃ. ৪৯)
[৩৪৬] মুসতাদরাক আল-হাকিম হুযাইফা রা. হতে: ৭৮৭৫, আল-মু'জামুল কাবীর লিত-ত্বাবারানী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. হতে: ১০৩৬২। হুযাইফা রা. হতে বর্ণনাকে ইমাম যাহাবী ও সাফারীনী হাম্বলী দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের বর্ণনাকে হাইসামী ও মুনযিরী দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। (মীযানুল ই'তিদাল ১/১৯৪, শারহু কিতাবিশ শিহাব: ৪৩৪, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/৬৬, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ৩/৮৬।)
[৩৪৭] অবশ্যই পড়ে ফেলো- হুজুরদের প্রেম যে কারণে এতো তীব্র হয়, lostmodesty.com, আগস্ট ৩০, ২০১৮ – tinyurl.com/5rtny24n
[৩৪৮] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৬১
[৩৪৯] আমাদেরই পরিচিত এমন একজন ভাই ছিলেন।
[৩৫০] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা বইটা পড়ে ফেলো।
[৩৫১] বুখারী: ৫০৬৬ ও মুসলিম : ১৪০০ (ইফা. ৩২৭০)
[৩৫২] এই লিস্টের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর পয়েন্টের আরো বিস্তারিত আলোচনা পাবে পুড়ে যাবে তুমি লেখায়।
[৩৫৩] মাজমু'উল ফাতাওয়া: ১০/১৩৫
[৩৫৪] মুসনাদ আহমাদ ২২৯৯১, তিরমিযী ২৭৭৭, আবু দাউদ ২১৪৯, মিশকাত: ০১১৩, সহীহ আল-জামে': ৭৯৫৩। আলবানী ও শুআইব আরনাউত্ব হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[৩৫৫] আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ৮০১৮। ইবনু হাজার ও আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। (আল-আশারাতুল উশারিয়্যাহ হা: ১০, সহীহ আল-জামে': ১২২৫)
[৩৫৬] সূরা আল-আ'রাফ, ৭:১৭৬
[৩৫৭] কিতাবুস সুন্নাহ লি- ইবনি আবী আসিম: ১৫। ইমাম নাবাবী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবনু হাজার বলেছেন, এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। (আল-আরবাঈন: ৪১, ফাতহুল বারী ১৩/২৮৯ হা: ৭৩০৮ এর ব্যাখ্যায়)
[৩৫৮] Waists, Hips and the Sexy Hourglass Shape, Robert D. Martin Ph.D., psychologytoday.com, July 20, 2015-tinyurl.com/yh5t432n Dixson BJ, Grimshaw GM, Linklater WL, Dixson AF. Eye-tracking of men's preferences for waist-to-hip ratio and breast size of women. Arch Sex Behav. 2011 Feb;40(1):43-50. doi: 10.1007/s10508-009-9523-5. Epub 2009 Aug 18. PMID: 19688590.
[৩৫৯] বুখারী: ৬২২৯
📄 পুড়ে যাবে তুমি
রূপকথার স্নো হোয়াইটের সেই আয়নার গল্প পড়েছো না? ঐ যে জাদুর এক আয়না ছিল এক রাণীর কাছে। আয়নাকে জিজ্ঞাসা করতো সে রোজ নিয়ম করে- বলো তো, পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী কে? আয়না উত্তর দিতো, আপনিই সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। আয়নার এই উত্তর শুনে আনন্দ আর পরিতৃপ্তির হাসি যেন উপচে পড়তো রাণীর চোখে। এভাবেই চলছিল দিন। কিন্তু একদিন দিন বদলে গেল। আয়না হঠাৎ বলে বসলো, না রাণী মা, আপনি না। সবচেয়ে রূপসী হলো স্নো হোয়াইট।
রাগে ফণা তোলা সাপের মতো ফুঁসে উঠলো রাণী। বিষাক্ত সাপের মতো হিস হিস কন্ঠে নির্দেশ দিলো জল্লাদকে- স্নো হোয়াইটকে নিয়ে যাবে গভীর বনে। হত্যা করে প্রমাণ স্বরূপ তার কলিজা নিয়ে আসবে আমার কাছে!
মেয়েরা আসলে এমনই! নিজের রূপের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। একজন মেয়ের সামনে অন্যের প্রশংসা করলে ঈর্ষাবোধ ঠেলেঠুলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রূপবতী কোনো মেয়ে সেজেগুজে আসলে অপর রূপবতী নিজের সাথে তুলনা করা শুরু করে...ওর নাকটা আমার চাইতে বোঁচা, ওর চুল দেখে তো মনে হচ্ছে ঘোড়ার লেজ, হাইটে আমার চাইতে কয়েক ইঞ্চি ছোট!
ত্বকের, চুলের এতো যত্ন, ড্রেসিং টেবিল ভর্তি এতো সাজগোজের পণ্য, এতো মেকআপ টিউটোরিয়াল দেখা, নিত্য নতুন পোশাক, ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রামে একটার পর একটা ছবি দেওয়া, ইউটিউব বা টিকটকে শর্ট ভিডিও...এসব কিছু অন্যের একটু মনোযোগ আকর্ষণ, মিষ্টি কিছু প্রশংসা, বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে যাওয়া কিছু মুখ দেখে সুখ পাওয়ার জন্যই তো, তাই না?
আপু, তুমি হয়তো শুধু এসব ভেবেই ছবি-ভিডিও দাও, রাস্তায় সাজগোজ করে বের হও। কিন্তু ছেলেরা শুধু এটুকুই ভাবে না। আলকেমি লেখাতে আমরা দেখেছি ছেলেরা সুন্দরী, সাজগোজ করা মেয়েদের দেখলে দৈহিক আকর্ষণবোধ করে। সোজা বাংলায় বললে, শুতে চায়। শোবার কথা চিন্তা করে। ছেলেরা সৃষ্টিগতভাবেই এমন। এটাই তাদের সহজাত প্রবৃত্তি। তোমাকে তো আর সরাসরি শোবার কথা বলতে পারে না। তাই কৌশলের আশ্রয় নেয় এবং সেই কৌশলও আবর্তিত হয় সেই প্রশংসাকে কেন্দ্র করে। অন্তহীন প্রশংসা করে তোমার। শ্রুতিমধুর নিখুঁত মিথ্যার বন্যা বইয়ে দেয়। এরই মাঝে তোমার জন্য ফাঁদ পাতে। প্রশংসা পেয়ে গলে যাওয়া তুমি টেরই পাও না কী আসতে যাচ্ছে সামনে। ধাপে ধাপে কৌশলগুলো দেখা যাক:
ধাপ ১: তুমি না অমুক সেলিব্রেটির মতো দেখতে![৩৬০] তুমি কি জানো তার চাইতেও অনেক সুন্দর তুমি... এমন ধরনের কথা বার্তা বলবে। বর্তমান সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থায় সেলিব্রেটিদের একরকম পূজাই করা হয়। কাজেই অন্যের মুখে সেলিব্রেটিদের সাথে নিজের রূপের তুলনা শুনে মেয়েরা আহ্লাদে একেবারে আটখানা হয়ে যায়।
ধাপ ২: তুমি না অনেক হট, একদম অমুক সেলিব্রেটির মতো, তোমার ফিগারটা সেই! দূর থেকে দেখলে তো বুঝাই যায় না যে তুমি হেঁটে যাচ্ছো, না অমুক সেলিব্রেটি হেঁটে যাচ্ছে-এরকম প্রশংসা দিয়ে শুরু হয় এই ধাপ। আগের ধাপের মতোই মেয়েরা এমন প্রশংসাতে অনেক খুশি হয়। আসলে এই ধাপ থেকেই প্রশংসা একটু একটু গ্রাফিক, একটু খোলামেলা হতে থাকে। মেয়ের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে সে ঠিক করে কতোটা খোলামেলা কথা সে বলবে। মেয়ে রেগে গেলে বা রেগে যাবার ভান করলে, সে সাবধানে খেলবে। সময় নেবে। আর যদি খুশিতে গদগদ হয়ে যায় প্রশংসা শুনে, তাহলে আরো বেশি খোলামেলা কথা বলবে। কিন্তু যেহেতু সেলিব্রেটি অ্যাঙ্গেলটা থাকছেই মানে বাজে অশ্লীল কথাগুলো সরাসরি সেগুলো না বলে সেলিব্রেটিদের সাথে তুলনা করে বলছে, কাজেই মেয়েরা তেমন একটা রাগ করে না। খুশি হয়।
ধাপ ৩: সেক্সের প্রস্তাব দেবার চূড়ান্ত ধাপ এটা। আগের দুই ধাপ সফলতার সাথে শেষ করে আসায় যথেষ্ট খোলামেলা কথাবার্তাও গা সওয়া হয়ে যায়। এবারে ছেলেরা বলা শুরু করে- জানো অমুক সেলিব্রেটির শরীরের কথা (হিপ, বুক) মনে হলে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না, তুমিও তো তার মতোই দেখতে... তুমি এতো হট কেন? তোমাকে দেখলে আমার নিজেকে কন্ট্রোল করতে অনেক কষ্ট হয়, আমাকে এভাবে কষ্ট দেবার জন্য তোমার অনেক পাপ হয়, তুমি কি জানো সেটা? গতরাতে অমুক নায়িকার একটা আইটেম সং দেখছিলাম, তোমার কথা মনে হচ্ছিল বারবার...।[৩৬১] এর চেয়েও আরো অনেক 'সাহসী' কথা বলে অনেকে। তবে সবসময় চেষ্টা করে সেলিব্রেটি অ্যাঙ্গেল আর প্রশংসা ধরে রাখতে। প্রশংসার মুগ্ধতার মায়াপাশে বন্দী হয়ে মেয়েটি কখন যে বিছানায় গিয়ে উঠে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টিই হারিয়ে ফেলে, তা বুঝতে পারে না।
আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। মেয়েদের কীভাবে পটাতে হয়, মেয়েদের সাথে কীভাবে ফ্লার্ট করতে হয়-এমন অসংখ্য অনলাইন কন্টেন্ট পাবে। সেখানে দেখবে সবাই একটা কথাই বলছে- মেয়েদের প্রশংসা করো।
আমরা খুব ভালো বন্ধু, ও আমাকে অনেক সাহায্য করে, ও তো আমার জাস্ট ফ্রেন্ড, ও আমার ভাইয়ের মতো, আমাদের মন তো পবিত্র-এসব ফালতু কথা। তোমার মনে হয়তো কিছু আসে না, কিন্তু ছেলেদের মনে অনেক কিছুই আসে, আপু। দু'জন নারী পুরুষ মিশবে, পাশাপাশি বসে ক্লাস করবে, একই রিকশায় বসবে, হাত ধরাধরি করবে, সংস্কৃতি চর্চার নামে রাতবিরাতে ক্যাম্পাসে ঘুরবে, ট্যুরে যাবে, রসালো মজার আলোচনা করবে আর মনে কিছু আসবে না-এমন দাবি কেউ করলে হয় সে মিথ্যা বলছে অথবা তার ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। তোমাকে ভেবে, তোমার ছবি দেখে সে মাস্টারবেট করে, পর্ন দেখে। ও তোমাকে সাহায্য করে কারণ এর মাধ্যমে সে তোমাকে পটিয়ে প্রেম করতে চায়। তোমার শরীরটা চায়। আর এমন মানুষদের হাতে ধর্ষণের অসংখ্য উদাহরণ তো আমরা পুরো বই জুড়েই দিয়ে আসলাম। [৩৬২] তুমি একটু যদি ভালোমতো খেয়াল করো-তার তাকানো, তার স্পর্শ, কথাবার্তা তাহলেই বুঝতে পারবে। তুমি যদি জানতে ছেলেরা তোমাকে নিয়ে কী ভাবে, তোমাকে কীভাবে দেখে, তাহলে তুমি হয়তো নিজেকে নিরেট লোহা দিয়ে ঢেকে রাখতে।
নারী এবং পুরুষ হলো বারুদ ও ম্যাচের মতো। একসাথে থাকলে আগুন লাগবেই। আল্লাহ এভাবেই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন আমাদের সম্পর্কে। তাই তিনি নারী-পুরুষের সহাবস্থান নির্জনে ও সামাজিক সেটআপে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। বলেছেন পর্দা করতে। দৃষ্টির হিফাযত করতে। নারীদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলছেন,
'আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের প্রদর্শনীর মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।' [৩৬৩]
'যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পরপুরুষদের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের মানুষ প্রলুব্ধ হয়।' [৩৬৪]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলছেন,
'আমি আমার পর জনগণের মাঝে পুরুষদের জন্য মেয়েদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা ছেড়ে যাচ্ছি না।'[৩৬৫]
'নারীদের (ফিতনা) থেকে বাঁচো। কারণ, বনী ইসরাঈলদের প্রথম ফিতনা নারীদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল।’[৩৬৬]
তিনি আরো বলছেন,
'কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না, তবে জেনে রাখবে এমতাবস্থায় তাদের সাথে তৃতীয়জন হলো শয়তান।[৩৬৭]
আল্লাহ তা'আলা পুরুষ সাহাবী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-দের উদ্দেশ্য করে বলছেন, 'তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র।[৩৬৮]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সম্মানিতা স্ত্রী, আমাদের আম্মাজান, যাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের ঈমানের দাবি, তাঁদের ব্যাপারেই পুরুষ সাহাবীদের জন্য এমন আয়াত নাযিল করেছেন আল্লাহ তা'আলা। নবী রাসূলদের পর সবচেয়ে ধার্মিক মানুষ হলেন সাহাবীরা! তাহলে তোমার আমার মতো সাধারণ নারী পুরুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
শাইখ ইবনু বায ও শাইখ ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুমাল্লাহ নারী-পুরুষের দেখাদেখি, নির্জনে অবস্থান ও সহাবস্থান সংক্রান্ত বিবিধ আলোচনায় বলেছেন,
নবী (ﷺ)-এর যুগে নারীগণ পুরুষদের সাথে সহাবস্থান করতেন না, মসজিদেও না, আর বাজারেও না। নবী (ﷺ)-এর মসজিদে নারীরা পুরুষদের পেছনে, পুরুষদের শেষ কাতারের পরের কাতারে সালাত আদায় করতেন এবং তিনি নারীদের প্রথম সারি বা কাতারের সাথে পুরুষদের শেষ কাতারের ফিতনার আশঙ্কা থেকে সতর্ক করার জন্য বলতেন:
'নারীদের সর্বোত্তম সারি বা কাতার হলো শেষ কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের প্রথম কাতার, আর পুরুষদের সর্বোত্তম কাতার হলো প্রথম কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের শেষ কাতার।[৩৬৯]
আর নবী (ﷺ)-এর যুগে পুরুষদেরকে (মসজিদ থেকে) প্রস্থানের সময় বিলম্ব করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো, যাতে নারীগণ প্রস্থান করতে পারে এবং মসজিদ থেকে তারা এমনভাবে বের হতে পারে যাতে মসজিদের দরজায় তাদের সাথে পুরুষগণ মিশতে না পারে। রাস্তায় পথ চলার সময় পরস্পরের মাঝে সংস্পর্শের দ্বারা ফিতনার আশঙ্কা থেকে সাবধান ও সতর্ক করার জন্য নারীদেরকে রাস্তাজুড়ে চলতে নিষেধ করা হতো, রাস্তার প্রান্তসীমায় চলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো অথচ তাঁরা পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সকলে ঈমান ও তাকওয়ার যে মানে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সে হিসেবে তাদের পরবর্তীগণের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত?'[৩৭০]
ইবনুল জাওযী (রহ.) যেমনটা বলছেন,
'রোগ সারানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করাই সব থেকে উত্তম। প্রথম পর্যায়ে করণীয় হলো বিবাহ বহির্ভূত দুই নারী পুরুষের নির্জনে দেখা সাক্ষাৎ না করা ও কথাবার্তা না বলা।' [৩৭১]
কাজেই প্রেম-যিনা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের অবশ্যই প্রকাশ্য এবং গোপন ফ্রি-মিক্সিং থেকে বাঁচতে হবে। পর্দা করতে হবে, দৃষ্টির হিফাযত করতে হবে।
দুই.
যে স্যারের প্রাইভেটে বা কোচিং-এ মেয়েরা থাকে সেই স্যারের প্রাইভেট বা কোচিং জমজমাট হয়- এমনটা আমরা দেখে আসছি সেই ছোটবেলা থেকেই। অধিকাংশ প্রেমেরই সূচনা হয় এভাবে সহশিক্ষা (কো-এডুকেশন) থেকে। তাই স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, কোচিং- সবকিছু বয়েস অনলি বা গার্লস অনলি রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করো। কো-এডুকেশনের চাইতে ছেলে মেয়ে আলাদা আলাদা থাকলে পড়াশোনাও ভালো হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চোখের হিফাযত করা, ফ্রি-মিক্সিং এড়ানো আসলে তোমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তোমাদের জন্য কিছু টিপস:
১। ক্লাসে কখনোই বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে বসবে না; কেউ পাশে এসে বসলে, উঠে অন্য বেঞ্চে চলে যাবে।
২। বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা বলবে না, নাম জিজ্ঞেস করারও দরকার নেই। কেউ কথা বলতে আসলেও যেনো তোমার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারে, তুমি কথা বলতে আগ্রহী না। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখবে না। কেউ মেসেজ দিলেও সিন করবে না। গ্রুপ স্টাডি করবে না।
৩। পর্দা ছাড়া বা পর্দাসহ ছেলে মেয়ে ছবি তোলা পর্দার খেলাফ এবং শরীয়াহর সীমানা বহির্ভূত মেলামেশা। পর্দা করেও ছেলেমেয়ে একসাথে ছবি তোলা যাবে না। আপুরা, তোমরা বান্ধবীদের সাথেও গ্রুপ ছবি তুলবে না। কোনো বান্ধবী যদি তোমার সিঙ্গেল ছবিও তুলতে চায়, তুলতে দেবে না। কারণ, এসব ছবির গন্তব্য হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় অথবা তার ফোন থেকে তার ভাই, স্বামী বা অন্য কেউ তা দেখে ফেলতে পারে। অনলাইনে দেওয়া তোমাদের ছবি এডিট করে পর্নসাইট, চটি পেইজে দিয়ে দেওয়ার, ব্ল্যাকমেইল করার লোকের অভাব নেই। আর এটা না হলেও তোমাদের ছবি দেখে অনেকেই সেক্স ফ্যান্টাসিতে ভোগে, মাস্টারবেট করে। এটা নির্মম বাস্তবতা。
৪। বার্থডে সেলিব্রেশন, র্যাগ ডে বা এরকম অন্য কোনো অনুষ্ঠানের নামে রং মাখামাখি, ছেলে মেয়ের একে অপরের টিশার্টে অশ্লীল মন্তব্য লেখা টাইপ কোনো ধরনের কোনো কাজে অংশগ্রহণ করবে না।
৫। ছেলেমেয়েদের আড্ডায় কখনো অংশ নেবে না, ট্যুর যদি ফ্রি-মিক্সিং এর হয়, তাহলে যাবে না। ব্যাচ ট্যুরগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেক্স ট্যুরে পরিণত হয়ে গেছে।
৬। বন্ধুত্ব করার আগে যাচাই করে নেবে। কারণ মানুষ তার বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং সচ্চরিত্রের মানুষদের সাথেই বন্ধুত্ব করবে। না হলে দেখবে তোমার বন্ধু বা বান্ধবীরাই তোমাকে গুনাহর দিকে ঠেলছে, ফুসলাচ্ছে। ওদের অশ্লীল আড্ডাবাজিতে তুমিও প্রভাবিত হয়ে যাবে। তবে ওদেরকে একদম এড়িয়ে চলবে না। তাদের সাথেও আন্তরিকভাবে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে হাসিমুখে কথা বলবে, বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে যাবে।
৭। ছেলেরা দাড়ি রাখবে, প্যান্ট টাখনুর উপরে রাখবে, পোশাক-আশাকে সুন্নাহ মেনে চলার চেষ্টা করবে। দেখবে ক্যাম্পাসের বা ক্যাম্পাসের বাইরের মেয়েরাও নিজেরাই তোমাকে এড়িয়ে চলছে। আপুরাও শরীয়াহ অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে পর্দা করবে। [৩৭২] সেক্যুলার সমাজ আর সাংস্কৃতিক জমিদাররা যতই দাবি করুক- যা খুশি পরবো, এতে সমাজের কী- তাদের এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়, বিজ্ঞান এবং যুক্তিসম্মতও নয়। আর ইসলামসম্মত তো নয়-ই। মহান আল্লাহ বলেছেন,
'আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে।' [৩৭৩]
'হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[৩৭৪]
পর্দা করো। জিন্সের প্যান্ট আর ফুলহাতা শার্ট পরে শুধু মাথায় স্কার্ফ লাগানোকে পর্দা বলে না। শরীর আঁকড়ে ধরা টাইট গাউন পরে পর্দার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। আশা করি এ বাস্তবতাগুলো তুমি বুঝো। পর্দা করে সব করা যায়-এ ধরনের মুখরোচক স্লোগানের শুদ্ধতা প্রমাণের জন্য পর্দা করে নাচ, গান কিংবা টিকটক করলেও হবে না। পর্দা করার অর্থ শুধু শরীর ঢাকা না। নিজের আচরণ ও কথাকে নিয়ন্ত্রণ করাও পর্দার অংশ। আল্লাহর আইনের ফাঁকফোঁকর খোঁজার চেষ্টা করো না। ইসলামের শিক্ষা ও সীমারেখা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার চেষ্টা করো। ইনশাআল্লাহ ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে কোথাও ছেলেরা তোমার কাছে ঘেঁষবে না।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বেশ বিখ্যাত একটা হাদীস আছে। তিনি বলেছেন,
'দুই প্রকার জাহান্নামি মানুষ আসবে; যাদেরকে আমি আমার যুগে দেখতে পাচ্ছি না। এক প্রকার হলো, ঐ সব নারী যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকবে। তারা পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে। তাদের মাথার খোঁপা উটের কুঁজের মতো (উঁচু, যা) এদিক-ওদিক হেলানো থাকবে।
তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না; এমনকি তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ, জান্নাতের সুঘ্রাণ ৫০০ বছর রাস্তার দূরত্ব থেকেও অনুভব করা যাবে। [৩৭৫]
হাদীসটির অর্থ ভালোমতো বুঝে নাও। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম নাওয়াউয়ী এবং অন্যান্য বিখ্যাত আলেমগণ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন,
'কাপড় পরেও উলঙ্গ হলো সেই সমস্ত নারী, যারা এতো পাতলা কাপড় পরে যে, কাপড়ের মধ্য দিয়ে তাদের গায়ের চামড়া দেখা যায়, অথবা এমন টাইট পোশাক পরে, যার কারণে তাদের শরীরের আকৃতি বুঝা যায় অথবা তাদের শরীরের কিছু অংশ আবৃত থাকে আর কিছু অংশ উন্মুক্ত থাকে...'
'তারা পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে'-এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন,
'তারা এমনভাবে সাজসজ্জা করবে, হাঁটাচলা করবে, এমন আচার-আচরণ করবে, যাতে অপরিচিত আগন্তুক পুরুষদের আকৃষ্ট করা যায়। প্রলুব্ধ করা যায়।'[৩৭৬]
তোমার আচার-আচরণকে এই হাদীসের আঁতশ কাচের নিচে ফেলে পরীক্ষা করে দেখো। প্রয়োজনে নিজেকে বদলে ফেলো। আপু, কোনোমতেই এমন নারীদের লিস্টে তোমার নাম তুলো না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কাজগুলোর ব্যাপারে এমন সতর্ক করেছেন সেগুলোকে নারীবাদী, প্রগতিশীল-সুশীলরা, আজকের এই সেক্যুলার সমাজ জাতে ওঠার, স্মার্ট হবার, নারী স্বাধীনতার, উন্নয়ন আর প্রগতিশীলতার ফিচার বানিয়েছে। আপু, চিনে নাও তোমার শত্রুদের। সাবধান থাকো! এই হাদীসে যে বিষয়গুলোর কথা এসেছে সেগুলোকে কিন্তু কিয়ামতের আলামতের মধ্যে গণ্য করা হয়।
৮। ছেলেরা দ্বীনি ভাইদের সাথে পরিচিত হবে, যোগাযোগ রাখবে। মসজিদে সালাতের পর যে আমলগুলো হয়- যেমন হাদীস পড়া, কুরআন শিক্ষা করা- এসবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। আপুরাও, দ্বীনি বোনদের সাথে পরিচিত হয়ে একটা শক্ত কমিউনিটির মতো থাকবে। এতে ঈমান আমল টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা যেমন পাবে, তেমনি পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে।
৯। একান্ত বাধ্য হয়ে যদি কখনো বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা বলতেই হয় তাহলে যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই কথা বলবে, বেশি স্মার্ট হয়ে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করবে না। দৃষ্টির হিফাযত করবে। মেয়েরা কথা বলার সময় হাত নেড়ে নেড়ে কোমল সুরে তিন আলিফ টান দিয়ে ভাইয়া...য়া- বলবে না।[৩৭৭] কথা সংক্ষিপ্ত রাখবে। পাশ্চাত্যের ভদ্রতা হচ্ছে কথা বলার সময় চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) আমাদের ভদ্রতা শিখিয়েছেন এভাবে- কোনো প্রয়োজনে নারী পুরুষের কথা বার্তা হলে পারতপক্ষে চেহারার দিকে না তাকানো। তুমি কোনটা মানবে, সিদ্ধান্ত তোমার।
১০। বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে ল্যাব গ্রুপ, প্রজেক্ট গ্রুপ, অ্যাসাইনমেন্ট গ্রুপ করবে না। ভদ্র ভাষায় স্যারদের অনুরোধ করবে। অনেকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য কিংবা পড়াশোনা করতে হয় তাই করা- এমন চিন্তাভাবনা থেকে পড়ে। বাংলা, চারুকলা, দর্শন, হিসাববিজ্ঞান টাইপের বিষয়গুলোর ডিগ্রির জন্য পর্দার মতো ফরজ বিধান পালনে ব্যর্থ হবার ঝুঁকি নেবে কি না, সে ব্যাপারেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার মনে হয়।
১১। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে সরাসরি রুমে/বাসায় চলে আসবে। ক্যান্টিনে, গাছতলায়, মাঠে, লাইব্রেরিতে, বারান্দায়, করিডোরে বসে আড্ডা দেবে না।
১২। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে টিউশনি করাবে না। টিউশনি করাতে গিয়ে স্টুডেন্ট এর মা, বোন, ভাই, বাবা (মেয়েদের ক্ষেত্রে) এদের কাছ থেকেও চোখের হিফাযত করতে হবে। টিউশনি করাতে গিয়ে ছাত্রীর সাথে, ছাত্রীর বোন, মা ইত্যাদির সাথে প্রেম, পরকীয়া যিনা, ধর্ষণ এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা। টিউশনি করাতে গিয়ে স্টুডেন্টের বাবা-ভাইদের হাতে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। আপুরা খুব সাবধান। স্টুডেন্টকে তুমি ছোট ভাইয়ের মতো মনে করলেও, সে কিছু বোঝে না, তুমি এমন ভাবলেও- তারা আজকাল অনেক কিছুই বোঝে। [৩৭৮]
যতো টাকাই দিক না কেন আর তুমি যতোই সমস্যায় থাকো না কেন, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো। এই অফার ছাড়লে আল্লাহ তোমাকে এর বিনিময়ে আরো অনেক ভালো অফার দেবেন। আমাদের একজন বন্ধু বেশ মোটা টাকার একটা টিউশনির অফার পায়। তিন জন মেয়েকে পড়াতে হবে। বন্ধু রাজি হয়নি। আল্লাহ পরে তাকে জীবিকার খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যখন তুমি আল্লাহর জন্য কোনো জিনিস বিসর্জন দেবে আল্লাহ তা'আলা এর চাইতে উত্তম বিনিময় দান করবেন।[৩৭৯]
*** ক্যাম্পাসের বাইরেও যেসব জায়গায় চোখের হিফাযত করতে ফ্রি-মিক্সিং এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না সেসব জায়গা এড়িয়ে চলো। যেমন-
ক। বিয়েশাদীর ফ্রি-মিক্সিং অনুষ্ঠানে যাবে না। নতুন প্রেমের সূচনা হয় এই অনুষ্ঠানগুলোতে।
খ। ভ্যালেন্টাইন্স, পহেলা বৈশাখসহ এ ধরনের অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে প্রয়োজন না পড়লে বাসার বাইরে বের হবে না।
গ। মেয়েদের স্কুল কলেজ কোচিং যেসব এলাকায় থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলবে। কাপলদের আড্ডা বসে যে রাস্তায়, পার্কে, রেস্টুরেন্টে, কফিশপে- ভুলেও সেদিকের ছায়া মাড়াবে না। বিনোদনকেন্দ্র গুলোতে যদি কোনো কারণে যাওয়াই লাগে তাহলে এমন সময় বা দিনে যাবে যখন ভিড় কম থাকে।
ঘ। লোকাল বাসে দরকার হলে দাঁড়িয়ে থাকবে কিন্তু মেয়েদের পাশে বসবে না। দূরের ভ্রমণে মেয়ের পাশে সিট পড়লে সিট বদলে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সাথে বই রাখবে। পুরো রাস্তা বই পড়বে বা লেকচার শুনবে। ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে আরো ভালো!
ঙ। রাস্তাঘাটে চলার সময় মাথা নিচু করে হাঁটবে। মাটির দিকে তাকিয়ে। মেয়েরা পর্দা করলো কি না সে চিন্তা বাদ দিয়ে তুমি নিজের চোখের হিফাযত করার চেষ্টা করবে। আল্লাহকে স্মরণ করবে।
উচ্চারণ: 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্কি ওয়াল আ'মালি ওয়াল আহওয়ায়ি।'
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে খারাপ চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই।'[৩৮০]
এ ধরনের বেশ কিছু দু'আ আছে। মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে সঠিক উচ্চারণ শিখে মুখস্থ করে নেবে। বেশি বেশি দু'আ করবে।
চ। লিফটে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে একাকী উঠবে না। লিফটে মাঝে মাঝেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সময় দরজার দিকে সরাসরি মুখ করে থাকবে না। দরজা খুললেই কোনো রূপসীর দিকে তোমার চোখ পড়ে যেতে পারে। দরজার এক পাশে দাঁড়াবে।
ছ। ব্যাংক, দোকান, টিকেট কাউন্টার ইত্যাদি স্থানে যেখানে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ থাকবে, সুযোগ থাকলে সেখানে না গিয়ে অন্যটাতে যাবে।
জ। ভাবী, দেবর, দুলাভাই, কাযিন এদের সাথে আরো কঠোরভাবে পর্দা করবে। ভাবী, দুলাভাই, কাযিনদের সাথে পরকীয়া, প্রেম, যিনা-ব্যভিচার, খুন ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটে। [৩৮১]
এমন আরো অনেকগুলো বিষয় আছে, কিন্তু মূল পয়েন্ট এগুলোই। আশা করছি একটা ধারণা পেয়েছো।
তিন. শুধু অফলাইনে না, অনলাইনেও ফ্রি-মিক্সিংয়ের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিকটকসহ যা যা আছে বিপরীত লিঙ্গের সবাইকে আনফ্রেন্ড করে দেবে। কাযিন ইত্যাদি যারা আছে তাদেরকেও আনফ্রেন্ড করে দাও। যদি না-ই পারো তাহলে আনফলো করে দাও, তাহলে তাদের ছবি তোমার ওয়ালে আসবে না। তোমার যেসব বন্ধুরা মেয়েদের ছবি-ভিডিও শেয়ার দেয় তাদেরকেও এভাবে আনফলো করে রাখতে পারো। নাটক-সিনেমার ক্লিপ পোস্ট করা পেইজ, ফিমেইল সেলিব্রেটিদের পেইজ, প্রেমের লুতুপুতু মার্কা বিভিন্ন পেইজ, ক্রাশ এন্ড কনফেশন টাইপ গ্রুপ, চ্যানেল, আইডি সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। কোনোভাবেই বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে যোগাযোগ করা যাবে না।
ফ্রেন্ডলিস্টে এমন কাউকে ফলো করবে না, যারা তাদের প্রেমিকা বা বউ এর সাথে ছবি আপলোড দেয়, চেক-ইন দেয়, খুনসুটির গল্প শেয়ার করে। এগুলো তোমার বুকের বাম পাশের চিনচিনে ব্যথার জন্ম দিতে পারে। হেল্প সিকিং বিভিন্ন গ্রুপে বিপরীত লিঙ্গের পোস্টে লাইক কমেন্ট করবে না। লাভ রিয়্যাক্ট দেবে না। [৩৮২] কেউ জরুরি কিছু জানতে চাইলেও তোমার কমেন্ট করার দরকার নেই। অন্য বোনেরা-ভাইয়েরা আছে, তারা জানাবে।
কখনোই বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ইনবক্স করবে না। হোক সে আলেম। আপু, তোমার কিছু জানার দরকার পড়লে নারী আলেমদের কাছে যাও বা তোমার মাহরাম পুরুষের মাধ্যমে কোনো আলেমের কাছ থেকে জেনে নাও। বিপরীত লিঙ্গের কেউ মেসেজ করলে রিপ্লাই দেওয়া দূরের কথা, সিনও করবে না। সে যতো বড় আলেম, লেখক বা ফেইসবুক সেলিব্রেটিই হোক না কেন।[৩৮৩] ইসলামের ব্যাপারে বিপরীত লিঙ্গের কেউ কিছু জানতে চাইলেও একই কথা প্রযোজ্য। [৩৮৪]
দ্বীনি কোনো বিষয়ের উপর অনলাইন কোর্সে ভর্তি হলে অবশ্যই দেখে নিবে সেখানে নারী পুরুষের আলাদা ক্লাস হয় কি না। উস্তাদ বিবাহিত কি না। উস্তাদের স্বীকৃতি আছে কি না, অন্যান্য আলেম উলামারা তাকে চেনেন কি না। যদি না হয়- তাহলে ভর্তি হবার দরকার নেই। এসব কোর্সে ক্লাস করতে গিয়ে 'হালাল প্রেম', শুরু করা মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম না।
বাস্তবজীবনে চোখের হিফাযত করো, অনলাইনে ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করো, আবার ইনবক্সে বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের সাথে দ্বীন চর্চা করো, কমেন্ট চালাচালি করো, পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দাও- এটা একধরনের ভণ্ডামি। আত্মমর্যাদাশীল কোনো মানুষের পক্ষে এমন কিছু করা সম্ভব না। আল্লাহর অবাধ্য হয়েই বিপরীত লিঙ্গের সাথে যোগাযোগ শুরু করতে হয়। আর আল্লাহ অবাধ্যতা করে কীসের দাওয়াহ? আল্লাহকে ভয় করো।
পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিলে, কমেন্ট করলে বা ইনবক্সে দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করলে, এমন আর কী হয়- এ ধরনের প্রশ্ন কেউ কেউ করে বসে। দেখো এগুলো ছোট ছোট আগুনের স্ফুলিঙ্গ। এগুলোই ধীরে ধীরে বিশাল এক আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বারসিসার ঘটনা জানো?
বারসিসা[৩৮৫] ছিল খুব ইবাদাতগুজার লোক। যুদ্ধে যাবার আগে তিন ভাই তাদের একমাত্র বোনকে বারসিসার যিম্মায় রেখে যেতে চাইলো। প্রথমে না করলেও, ভাইদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে বারসিসা রাজি হলো। ঠিক হলো বারসিসা থাকবে তার নিজের বাসায়। আর মেয়েটি থাকবে অন্য এক বাসায়। রোজ খাবার তৈরি করে মেয়েটির ঘরের দরজায় রেখে আসতো বারসিসা। কথা বলতো না। কিছুদিন কেটে গেল এভাবে। কিন্তু আস্তে আস্তে বারসিসা শয়তানের ফাঁদে পা দিলো।
শয়তান তাকে বোঝালো- এভাবে খাবার দিয়ে চলে আসা তো অভদ্রতা, তাকে ডেকে খাবার দিয়ে আসো। বারসিসা তাই করতে শুরু করলো। তারপর শয়তান বললো, তার সাথে দুই-একটা কথা বলো, কথা বললে আর কী হবে? বারসিসা তাই করলো। তারপর শয়তান বললো- ঘরের মধ্যে বসে একটু কথা বললে আর কী হবে- মেয়েটা সারাদিন একা একা থাকে। বারসিসা শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া দিলো। এভাবে একটু করলে কী হয়... থেকে শুরু করে এক পর্যায়ে বারসিসা সেই মেয়ের সাথে যিনা করলো। মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে সন্তান জন্ম দিলো।
ততদিনে ভাইদের ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে। বারসিসা প্রচণ্ড ভয় পেলো। শয়তান এবার বুদ্ধি দিলো- ভাইয়েরা যদি এসে এই অবস্থা দেখে, তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দেবে। তুমি বরং ঝামেলা মিটিয়ে ফেলো! শয়তানের পরামর্শে বারসিসা সেই মেয়ে ও তার সন্তানকে খুন করে কবর দিলো। ভাইয়েরা ফিরলে কান্নাকাটি করে বললো- তোমাদের বোন অসুখে মারা গেছে। ঐখানে কবর দিয়েছি। ভাইয়েরা কান্নাকাটি করে চলে গেল। কিন্তু রাতে শয়তান গিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে তিন ভাইকে সত্যটা জানিয়ে দিলো। পরদিন তিন ভাই মিলে বারসিসার কাছে আসলো। মেয়েটির কবরে তার সন্তানের লাশও দেখতে পেলো। নিশ্চিত হলো, বারসিসাই তাদের বোনকে হত্যা করেছে। তারা বারসিসাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো। তারা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন শয়তান এসে বারসিসাকে বললো, তুমি যদি আমাকে সিজদাহ করো তাহলে আমি তোমাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করবো, বারসিসা তাই করলো। তারপর? তারপর শয়তান বারসিসাকে ত্যাগ করলো।
এভাবে, একটু কথা বললে কী হয়, একটু তাকালে কী হয়... এই একটু একটুর ফাঁদে পড়ে বারসিসা যিনা করলো, খুন করলো, শিরক করলো, তারপর তাকে সেই অবস্থায় মরতে হলো।[৩৮৬]
আমাদের সমাজেও এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে সদ্য দ্বীনে ফেরা বোনেরা দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা, আবেগের কারণে খুব সহজেই অনলাইনের ফাঁদে পড়ে যায়। ফেইসবুকে কেউ ইসলাম নিয়ে একটু ভালো লিখলেই, দাড়ি-টুপিওয়ালা কেউ সুন্দর করে দুটো কথা বললেই, নাশীদ গাইলেই, বই লিখলেই তাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি শুরু হয়ে যায়। দ্বীন শেখা কিংবা দাওয়াহর ফাঁদে পড়ে দিল দিয়ে বসে থাকে। গোপনে ব্ল্যাকমেইল করে। দ্বীনি মুখোশধারী ছেলেপেলে বিয়ে করে কয়দিন ভোগ করে ছেড়ে দেয়। মনে রেখো, শরীয়াহ দ্বীনি ভাই-দ্বীনি বোনদের জন্য আলাদা না। সেলিব্রেটিদের জন্য আলাদা না। আলিমদের জন্য আলাদা না। শরীয়াহর বিধান সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
অনলাইনের জগৎটা বাস্তব দুনিয়া থেকে পুরোই আলাদা। এখানে খুব সহজেই ভান ধরা যায়। অনলাইনে কাউকে ভালো ভাবার দরকার নাই। আবার খারাপ ভাবারও দরকার নেই। কিছুই মনে করার দরকার নেই। বাস্তবজীবনে ইন্টার্যাকশ্যান হয়নি, চেনো না এমন ভাই বা বোনদের খুব বেশি আপন ভাবার দরকার নেই। ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার দরকার নেই। ছবি শেয়ার বা ভিডিও কলে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। যাকে একেবারেই চেনো না, তার সাথে জরুরি কথা ছাড়া কোনো কথাই বলবে না। পার্সোনাল কোনো তথ্য জানাবে না。
বোনরা মনে রেখো, আজকাল অনেক ছেলেই মেয়ে সেজে আইডি চালায়। তাই অনলাইনে নতুন কোনো বোনের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হলে তার সম্পর্কে যতটুকু পারো খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করবে। ভয়েস মেসেজ ও ছবি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কোনো বোন যদি বারবার তোমার ভয়েস মেসেজ বা ছবি চায় তাহলে তাকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। শুধু অনলাইনের সম্পর্কগুলো শক্তিশালী হয় না। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে থাকে এখানে। ছবি শেয়ারের প্রসঙ্গ যখন আসলো তখন অনেকবার বলে আসা কথাটা আর একবার মনে করিয়ে দেই। কখনোই তোমার খোলামেলা ছবি তুলবে না, ভিডিও করবে না। স্বামীর জন্যেও না। স্বামীকেও তুলতে দিবে না। এটা জায়েজ নেই।[৩৮৭] মেসেঞ্জারে, ওয়াটসঅ্যাপে ছবি আদানপ্রদান করবে না। ভিডিও কলে অশালীন পোশাক পরবে না। হতে পারে তার ফোন হারিয়ে গেল, হতে পারে আইডি হ্যাক হলো, হতে পারে তার সাথে তোমার ডিভোর্স হয়ে গেল।[৩৮৮] বারবার বলার পরও এই ভুলটা বারবার হচ্ছে এবং ভয়ংকর মাশুল গুনতে হচ্ছে।
মূল কথা হলো, রাসূল (ﷺ)-এর কথা মেনে বাস্তব দুনিয়ার তুমি যেমন বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে শরীয়াহসম্মত কারণ ছাড়া কথাবার্তা বলবে না, নির্জনে (মানে তোমরা ছাড়া আর কেউ নেই) কথাবার্তা বলবে না, আলাপ আলোচনা করবে না, তেমনি অনলাইনেও ইনবক্সের নির্জনতায় করবে না।[৩৮৯]
***
খলীফাহ উমার একবার আরেক সাহাবী উবাই ইবনু কা'বকে (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) প্রশ্ন করেছিলেন, তাকওয়া কী? জবাবে উবাই রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনি কখনো কাঁটা বিছানো পথে হেঁটেছেন? -হ্যাঁ। কীভাবে হেঁটেছেন? -খুব সাবধানে, কষ্ট সহ্য করে হেঁটেছি, যাতে আমার শরীরে কাঁটা বিঁধে না যায়। এটাই হলো তাকওয়া। [৩৯০]
কাঁটা বিছানো পথে মানুষ যেভাবে সতর্ক হয়ে চলে, ঠিক সেভাবে আখিরাতের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য হারাম থেকে বেঁচে থাকা আর পুরস্কারের জন্য আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেই আমল করার নাম তাকওয়া। তাকওয়ার এই কনসেপ্টটা যদি তুমি বুঝতে পারো, যদি বসিয়ে নিতে পারো নিজের মনে ও মস্তিষ্কে, তাহলে এতোক্ষণ যা কিছু বললাম তা বোঝা এবং মানার ব্যাপারটা সহজ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারী মুত্তাকিনদের ভালোবাসেন।' [৩৯১] 'যে তাকওয়া অবলম্বন করলো, আল্লাহ তার জন্যে কাজগুলোকে সহজ করে দেবেন। [৩৯২]
টিকাঃ
[৩৬০] নায়িকা, গায়িকা, মডেল, অনলাইন সেলিব্রেটি
[৩৬১] মেয়ে একটু বেশী প্রশ্রয় দিলে বলে অমুক পর্নস্টারের পর্ন দেখছিলাম...
[৩৬২] পাবজি বন্ধুদের বিরুদ্ধে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, সময় নিউজ, অক্টোবর ১৬, ২০২০- tinyurl.com/4ckw2dbt জন্মদিনের অনুষ্ঠানে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ, যুগান্তর, জুন ১৯, ২০২২-tinyurl.com/ mpvt4w6m
প্রথমে ধর্ষণ করলো দুই বন্ধু, সাহায্য চেয়ে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীটি, প্রথম আলো, আগস্ট ০০৮, ২০২২- tinyurl.com/kep9j7nf
ভাইয়ের দুই বন্ধুর হাতে স্কুলছাত্রী ধর্ষিত, ইনকিলাব, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ tinyurl.com/muckff4k
[৩৬৩] সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩
[৩৬৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩২
[৩৬৫] বুখারী: ৫০৯৬, মুসলিম: ২৭৪০ (ইফা. ৬৬৯৪)
[৩৬৬] মুসলিম: ২৪৭২ (ইফা. ৬৬৯৭)
[৩৬৭] তিরমিযী: ২১৬৫। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
[৩৬৮] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৫৩
[৩৬৯] ইবন মাজাহ: ১০০০। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[৩৭০] নারী-পুরুষের দেখাদেখি, নির্জনে অবস্থান ও সহাবস্থান সংক্রান্ত বিবিধ ফতোয়া, islamhouse.com- tinyurl.com/ywwxb3n5
[৩৭১] ইসলামে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম পাবলিকেশন, পৃষ্ঠা -১১৭
[৩৭২] তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্দার কারণে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া, বিরূপ মন্তব্য করা, মারধর করা, জঙ্গি, উগ্রবাদী, জামাত-শিবির বানানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে। যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। হিজাব পরায় ছাত্রীকে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন শিক্ষক, জাগো নিউজ, এপ্রিল ২৭, ২০১৬-tinyurl.com/wfryvdn4 পর্দা করায় শিক্ষার্থীকে জঙ্গি আখ্যায়িত করে বের করে দিলেন শিক্ষক, eyenews.news, আগস্ট ২২, ২০২২- tinyurl.com/4yfufr7v ঢাবিতে পর্দাকারী ৩ জনের ১ জন নারী বৈষম্যের শিকার, ইনকিলাব, এপ্রিল ১, ২০২২-tinyurl. com/mrspztff ক্লাসে নেকাব না খোলায় ছাত্রীকে শাসালেন ইবি শিক্ষক, নয়া দিগন্ত, মার্চ ২৯, ২০২২-tinyurl.com/2p9rkded
হিজাব পরায় ১৮ ছাত্রীকে পেটালেন হিন্দু শিক্ষিকা, সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, ইনকিলাব, এপ্রিল ৯, ২০২২- tinyurl.com/2p8rvvys
বোরকা পরলে আবার ঢাবিতে পড়ার শখ কেন? bd-journal.com, মার্চ ৩১, ২০২২-tinyurl. com/mmuvbmtr
[৩৭৩] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩১
[৩৭৪] সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৫৯
[৩৭৫] মুসলিম: ২১২৮ (ইফা. ৫৩৯৭)
[৩৭৬] মাজমু'উল ফাতাওয়াঃ ২২/১৪৬ Meaning of Hadith "Women will be Clothed yet Naked", daruliftaa.com- tinyurl. com/2p9bwb5a
[৩৭৭] যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পরপুরুষদের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরের মানুষ প্রলুব্ধ হয়।" [সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৩২]
[৩৭৮] স্কুলছাত্রী অদিতাকে যেভাবে হত্যা করে গৃহশিক্ষক রনি, আরটিভি নিউজ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২- tinyurl.com/4d47whn3
টিউশনি করাতে গিয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ: শিক্ষক গ্রেফতার, সুরমা নিউজ ২৪ ডট নেট, মার্চ ০৪, ২০২০- tinyurl.com/ymm9rhwu
টিউশনি দেওয়ার কথা বলে প্রেমের ফাদে তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা, sonaymoritv.com, মে ৬,২০২২- tinyurl.com/mvkbsxva
টিউশনি করাতে গিয়ে গৃহকর্তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণী, অতঃপর.......probashirnews.com, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮-tinyurl.com/bp782s68
[৩৭৯] মুসনাদে আহমদ: ২৩০৭৪। হাইসামী হাদিসটির বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/২৯৯, সহীহাহ ২/৭৩৪)
[৩৮০] তিরমিযী: ৩৫৯১। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[৩৮১] দুলাভাইয়ের হাতে ধর্ষিতা কিশোরীর চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ, যুগান্তর, জুলাই ০১,২০১৮- tinyurl.com/29jc42pd
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী ৭ মাসের অন্ত:সত্ত্বা, ধর্ষক দুলাভাই গ্রেপ্তার, জনকণ্ঠ, আগস্ট ১৭, ২০২২-tinyurl.com/3tw3vhn2
আড়াইহাজারে বিয়ের প্রলোভনে চাচাতো বোনকে ধর্ষণ, যুগান্তর, এপ্রিল ১৮, ২০১৮- tinyurl. com/y3mp6ktu
হাজীগঞ্জে শালী-দুলাভাই পরকীয়ায় বোন ও স্বামীর হাতে গৃহবধূ খুন, চাঁদপুর টাইমস, অক্টোবর ১৮, ২০১৮-tinyurl.com/yz4r2392
নানিকে দেখতে গিয়ে খালাতো ভাইয়ের হাতে ধর্ষণের শিকার শিশু, দেশ রূপান্তর, আগস্ট ২৬, ২০১৯- tinyurl.com/bdh3ca2r
দেবরের হাতে ধর্ষিত গৃহবধূর বিষপানে আত্মহত্যা, প্রতিদিনের সংবাদ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৬- tinyurl.com/5dn2rtuw
নবী (ﷺ) বলেছেন, 'দেবর-ভাসুর মৃত্যু সমতুল্য ভয়ানক বিষয়।' অর্থাৎ মৃত্যু যেমন জীবনের জন্য ভয়ানক, অনুরূপভাবে চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোন ও দেবর-ভাবী ও শালিকা- দুলাভাইয়ের সাক্ষাৎ ঈমান আমলের জন্য তদ্রূপ ভয়ানক। [বুখারি: ৫২৩২, মুসলিম: ২১৭২]
[৩৮২] আপু, তুমি হয়তো কোনোকিছু না ভেবে এমনিতেই লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছো। কিন্তু তোমার লাভ রিয়্যাক্ট পেয়ে সেই দ্বীনি ভাইটির দিল মে লাড্ডু ফোটা শুরু হয়ে গিয়েছে। আরে সে আমার পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছে মানে আমাকে সে পছন্দ করে, ভালোবাসে।
[৩৮৩] কেউ তোমাকে হাই/হ্যালো করার জন্য নক দিলেই বুঝবে সে একটা ফাতরা ভণ্ড।
[৩৮৪] সম্মানিত আলেম উলামারা তাঁদের সম্মানিত স্ত্রীদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। অন্যথায় না দেওয়ায় উত্তম। (আমরা আপনাদের উপদেশ দেবার স্পর্ধা দেখাচ্ছি না। আল্লাহ এ থেকে আমাদের হিফাযত করুক)। সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে অবিবাহিত আলিমদের বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে অনলাইনে আলাপ আলোচনা, ইনবক্সে মেসেজ আদান প্রদান না করাই অধিক তাকওয়ার প্রমাণ বলেই মনে হয়। আল্লাহু আলম।
[৩৮৫] বারসিসার ঘটনাটি কুরআন বা হাদিসের ঘটনা নয়। এটি একটি ইসরাঈলী বর্ণনা, যা বিভিন্ন উলাম তাঁদেরা আলোচনায় এনেছেন। এটি কেবল শিক্ষণীয় ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, যার সত্যতা সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলা অবগত।
[৩৮৬] বিস্তারিত শোনো- বিষাক্ত তীর ২, Lost Modesty, Lost Modesty Youtube Channel, ফেব্রুয়ারি ২৩,২০১৯- tinyurl.com/4wtpm2yu
[৩৮৭] He wants to photograph his wife naked so that he can look at the pictures when he is away! Islamqa - tinyurl.com/ze7pre8n
[৩৮৮] ফেসবুকে স্ত্রীর নগ্ন ছবি পোস্ট, স্বামী গ্রেফতার, ডেইলি বাংলাদেশ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২২ - tinyurl.com/mspf3983
[৩৮৯] তিরমিযী: ১১৭১
[৩৯০] তাফসীর ইবনু কাসীর, সূরা বাকারাহ, আয়াত ২
[৩৯১] সূরা আলে ইমরান: ৭৬
[৩৯২] সূরা তালাক: ৪
📄 ক্রীতদাস
প্রেমের একটি ভয়ঙ্কর ফাঁদ হলো ফ্রেন্ডযোন। একটা মানুষের আত্মসম্মান ধ্বংস করে তাকে অন্যের চাকর বানিয়ে ফেলে এটা। ছেলে, মেয়ে দুইদলের মধ্যেই এই সমস্যাটা দেখা দিলেও সাধারণত ছেলেরাই এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়।[৩৯৩]
ফ্রেন্ডযোন জিনিসটা আসলে কী?
ফ্রেন্ডযোন মানে ঠিক প্রেম করা না। এটা হচ্ছে প্রেমের প্রলোভনে চাকর বানানোর মতো। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মতো অনেকটা। ধরো, তুমি একজনকে পছন্দ করো। কিন্তু নানা কারণে তুমি তাকে প্রপোষ করতে পারো না; তাকে বলার মতো যথেষ্ট সাহস জোগাড় করতে পারো না; সে যদি প্রত্যাখ্যান করে, সে যদি রেগে যায়। তাই তুমি তাকে গিয়ে বললে, আমি তোমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাই। ও হয়তো এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছে তুমি তার জন্য প্রেমে দিওয়ানা। কিন্তু না বোঝার ভান করে সে তোমার সাথে বন্ধুত্ব চালিয়ে যায়। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে তুমি তাকে সরাসরি প্রপোষ করতেও ভয় পাও। তুমি আটকে গেলে ফ্রেন্ডযোনে। ফ্রেন্ডযোনে ফেঁসে গিয়ে প্রতিনিয়ত খুন হওয়া শুরু হলো তোমার।
আবার ধরো তুমি তাকে প্রপোজ করেছো। কিন্তু সে বললো, 'আরে, এসব তুমি কী বলছো! আমি তো তোমাকে খুবই ভালো একজন বন্ধু হিসেবে দেখি। আমি তো অন্য একজনের সাথে প্রেম করি।' তখন তুমি তার সাথে সম্পর্ক একেবারেই শেষ না করে বললে, 'আচ্ছা ঠিকাছে, আমাকে তোমার ভালোবাসতে হবে না, আমরা স্রেফ বন্ধু হয়েই থাকি।'
ঘরের খেয়ে বিনা পয়সায় অন্যের জন্য কামলা খাটার সংগ্রামী, মেহনতি এই জীবনে তোমাকে সুস্বাগতম! ফ্রেন্ডযোনে ফেঁসে গিয়ে তুমি যে অন্য একজনের চাকর হয়ে গেছো তার কিছু লক্ষণ:
১। অধীর আগ্রহে তুমি তার ফোন-মেসেজের জন্য অপেক্ষা করো। একটু পর পর চেক করো সে অনলাইনে আছে কি না। তোমার পাঁচটা মেসেজের বদলে সে একটা রিপ্লাই দিলে দ্বিগুণ উৎসাহে আরো দশটা মেসেজ দিয়ে দাও। তার সব ছবিতে তুমি লাভ রিয়্যাক্ট দাও, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করো তার রূপের।
২। সবসময় তোমার মাথাতে শুধু সে ঘোরাফেরা করে।
৩। তার সাথে ডেট করার স্বপ্ন দেখো তুমি। তার সাথে তোমার বিয়ে হবে, বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় করবে, হানিমুনে কোথায় যাবে, বাচ্চার নাম কী রাখবে-নানা হাবিজাবি জিনিস ভাবতে থাকো।
৪। সে ডাকলেই তুমি ছুটে আসো। তার জন্য সবসময় তুমি অ্যাভেইলেবল। রাত যতোই গভীর হোক, ঝড়, বন্যা, বৃষ্টি কিংবা অগ্ন্যুৎপাত হোক, কারফিউ জারি হোক, বিশ্বযুদ্ধ লাগুক-সে ডাকলেই তুমি ছুটে যাও।
৫। তুমি কখনো তাকে না বলতে পারো না। তোমার যতোই কষ্ট হোক না কেন, যতোই বাবা-মা'র অবাধ্য হওয়া লাগুক না কেন কিংবা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে যতো ছোট হতেই হোক না কেন, এমনকি কাজটা করতে তোমার মন তীব্রভাবে বাধা দিলেও সব কষ্ট, সব অনিচ্ছা জয় করে তুমি সেই কাজটা শুধু সে বলেছে বলে করে দাও।
৬। সে যা-ই বলুক বা করুক না কেন, তাতে তুমি প্রবলবেগে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাও। সারা দুনিয়ার মানুষ ভুল বললেও তুমি তা ঠিক বলো। তুমি তাকে অবিরাম সাপোর্ট দিয়ে যাও।
৭। সবসময় তুমি তার জন্য কিছু করার, তাকে ইম্প্রেস করার পরিকল্পনা করো। সে যে খাবার পছন্দ করে তুমি সেই খাবার রান্না করার চেষ্টা করো। ফুচকা খেতে পছন্দ করলে দু'দিন পরপরই তাকে ফুচকা খাওয়াতে নিয়ে যাও। তার পছন্দগুলো অনুকরণের চেষ্টা করো। সে যে সেলিব্রেটিকে পছন্দ করে তার মতো হেয়ারকাট, জামা কাপড় পরার চেষ্টা করো। সে বিটিএসের পাগলা ফ্যান হলে তুমিও বিটিএসের পাগলা ফ্যান হয়ে যাও।
৮। তুমি তার জীবনের সব সমস্যার সমাধানকারী, তুমি একাধারে তার পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট এবং বডিগার্ড। তুমি তার অ্যাসাইনমেন্ট করে দাও, তার ল্যাব রিপোর্ট লিখে দাও। কেউ তাকে টিয করলে, তার ছবিতে উল্টাপাল্টা কমেন্ট করলে তুমি তাকে মেরে আসো। তুমি তার ড্রাইভার, তুমি তার ক্যাশিয়ার, ফুচকার বিল সবসময় তুমিই দাও। তুমি তার ক্যারিয়ার কাউন্সেলর, তুমি তার ডাক্তার, তুমিই তার নার্স। তুমি তার মনোবিদ, তার মন ভালো করে দেবার দায়িত্ব তোমারই। বয়ফ্রেন্ডের সাথে তার ঝগড়া বা ব্রেকআপ হলেও ইমোশনাল সাপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব তোমার। [৩৯৪]
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন চলে আসে, একজন মানুষ কেন এসব করে? কেন স্বেচ্ছায় অন্য একজন মানুষের দাসে পরিণত হয়? প্রথম ও প্রধান কারণ, ঘুরেফিরে সেই একই-মোহ, হরমোনের খেলা, প্রেমকে জীবনের সবকিছু মনে করা, তাওহীদ না বোঝা, পৃথিবীতে আল্লাহ তাকে কেন পাঠিয়েছেন সেই কারণ সম্পর্কে বেখেয়াল থাকা।
পাশাপাশি প্রেমের অন্যান্য ব্যাপারগুলোর মতো এখানেও পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে নাটক, সিনেমা, গান, কবিতা, উপন্যাস। প্রগতিশীল মিডিয়ার ব্রেইনওয়াশের কারণে প্রেমাতাল মানুষেরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, এভাবে শত দুঃখ, বেদনা, অপমান সহ্য করে। আমি যদি কামলা খেটে যাই, তবে সহজেই সবকিছু উল্টে যাবে এবং ভালোবাসার স্বপ্ন পটে যাবেই। কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত খুন হয়ে, ব্যাপক সময় নষ্ট করে, প্রচুর শ্রম দিয়ে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে, বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে, ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে, টাকাপয়সা নষ্ট করে, নিজের সম্মানকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে আসলেই কি লাভ হয়?
আমার এক বন্ধু ছিল। ধরি তার নাম সবুজ। যে মেয়েটার হয়ে সে কামলা দিতো সেই মেয়েটার নাম ধরি চম্পা। [৩৯৫] ভার্সিটির চারটা বছর একনিষ্ঠভাবে কামলা খেটে গেছে সবুজ। এমনকি সকালে বুয়া নাস্তা বানাতে দেরি হলে সে খালি পেটে, এমনকি কখনো শুধু তেল দিয়ে ভাত মেখে খেয়ে ভার্সিটিতে দৌড় দিতো চম্পার খেদমতের উদ্দেশ্যে। চম্পা বুঝতো সবুজের মনের কথা। সবুজও মুখ ফুটে বলতে পারতো না। হঠাৎ একদিন সবুজের মেসেঞ্জারে একটা আংটির ছবি পাঠায় চম্পা। তারপর চম্পা আর অন্য এক ছেলের কাপল ছবি। এই ছেলের সাথেই অ্যাঙ্গেইজমেন্ট হয়েছে তার। ছেলে ইটালি থাকে। সবুজ বেকার। সবুজ আমার পাশেই বসে ছিল। আমি ল্যাপটপে লিখছি, আর সে একটু পর পর আমাকে পচাচ্ছে। [৩৯৬] মেসেজ আসার পর একেবারে চুপ হয়ে গেল সে। এই থম মেরে থাকাটা থেমে থেমে চালু থাকলো পরের কয়েকটা মাস। চরম ডিপ্রেশনে চলে গেল সে।
সবুজ পরে চম্পাকে মেসেজ দিয়েছিল, 'তুমি তো জানতে আমি তোমাকে ভালোবাসি... তারপরও কেন এমন করলে? আমাকে অন্তত একবার তো জানাতে পারতে!' সবুজের মেসেজ পেয়ে আকাশ থেকে যেন পড়েছিল চম্পা- 'ওমা! সেকি! আমরা তো কেবল খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। কখনোই তোমাকে নিয়ে আমি এমন কিছু ভাবিনি! কী বলছো তুমি এসব! ছি!'
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এভাবে কামলা খেটে, চাকর সেজে ফলাফল আসে না। এগুলো সিনেমার পর্দায় হয়। উপন্যাসের পাতায় হয়। বাস্তবে হয় না। সিনেমায় নায়ক থাকে একজন, কিন্তু তার বাস্তবতায় তো তুমি একাই নায়ক না, তার হাতে তো আরো অনেক অপশান আছে। কেন তোমার কাছেই সে থাকবে? একটা আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মসম্মানহীন, ব্যক্তিত্বহীন, নিজের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের ব্যাপারে উদাসীন ছেলের কাছে কেন সে থাকবে? না থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এভাবে কামলা খেটে আল্লাহর অসন্তুষ্টি, নিজের মর্যাদা নষ্ট করা আর একতরফা ব্রেকআপের ভয়ঙ্কর কষ্ট ছাড়া আর কী তুমি পেলে?
ভাই, তোমার একটা দাম আছে, সম্মান আছে। তুমি মানুষ, তুমি মুসলিম। তুমি সেই মানুষগুলোর একজন যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার। মানুষকে তন্ত্রমন্ত্রের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য পৃথিবীতে তোমার আগমন। সেই তুমিই এভাবে অন্য একজনের দাস হয়ে গেলে?
তুমি যখন মেয়েদের পেছন পেছন ঘুরো, ফ্লার্ট করার চেষ্টা করো, বেহায়ার মতো সব ছবিতে লাভ রিঅ্যাক্ট দাও... বিশ্বাস করো সেই মেয়ের চোখে তোমার দাম থাকে না, সম্মান থাকে না। তুমি ছোট হয়ে যাও তার কাছে। মেয়েরা সাধারণত আত্মসম্মানহীন, ব্যক্তিত্বহীন ছেলেকে পছন্দ করে না। সে ভেবে নেয় এই ছেলেটা আমার জন্য পাগল। একে দিয়ে আমি যা খুশি করিয়ে নিতে পারি। তোমার দুর্বলতা, দুর্বলতার গল্পের ডালপালা সাজিয়ে বন বানিয়ে সে তার ফ্রেন্ডদের সাথে হাসি তামাশা করে। দিনশেষে তুমি তার কাছে টিস্যু হয়েই থাকো। যে টিস্যু দিয়ে নাক ঝেড়ে উপেক্ষার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায় যখন তখন। তোমাকে সে আসলে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে চায় না। পছন্দ করে না। কিন্তু সে চায় তুমি তার সাথে থাকো। যেন তোমাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায়। মাঝে মাঝে তোমার সাথে এমন আচরণ করে যাতে মনে হয় সে তোমাকে ভালোবাসে। বোঝাতে চায়-তুমি তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সবই আসলে অভিনয়। ক্ষণিকের লোক দেখানো আবেগ।
মেয়েদের গালি দিও না। সে কি তোমার কাছে ওয়াদা করেছে বা তোমাকে লিখিত দিয়েছে যে এভাবে জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে দিলে সে তোমার হয়ে যাবে? তোমার জীবনের সব সমস্যার কি সমাধান হয়ে গেছে যে তুমি অন্যের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে ব্যস্ত হয়ে যাও? সেবাই মানুষের ধর্ম, মানুষকে সাহায্য করা মহান কাজ, আল্লাহ এতে খুশি হন-এইসব আবোলতাবোল ভূগোল বোঝানোর চেষ্টা করো না প্লিজ!
বাবাকে বাজার করতে সাহায্য করো? মাকে বাসার কাজে সাহায্য করো? তোমার ক্লাসের বন্ধুদের সাহায্য করো, তাকে যেভাবে সাহায্য করো সেভাবে? ছেলে বন্ধু কোনো একটা ল্যাব রিপোর্ট লিখে দিলে কিংবা বা অ্যাসাইনমেন্টের ছবি এঁকে দিলে ক্যান্টিনে গিয়ে সিঙ্গাড়া-সামুচা, কোল্ড ড্রিংকস আদায় করে নাও। আর ওর অ্যাসাইনমেন্ট বা ল্যাব রিপোর্টও তুমি নিজে থেকেই লিখে দাও! এটাই তোমার মানুষকে সাহায্য করার নমুনা?
বলতে কষ্ট লাগছে ভাই, তবু বলতে হচ্ছে, তুমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বোকা। কেউ সমস্যার সমাধান করে দিলেই মেয়েরা তার প্রেমে পড়ে যায় না। তাই যদি হতো তাহলে রিকশাওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, মুচি-সবার প্রেমেই তো পড়ে যেতো মেয়েরা। ভাই, নিজেকে আর কতো ছোট করবে? তোমার কি কোনো সম্মান নেই? সে তো পৃথিবীতে একমাত্র মানুষ না। দুনিয়াতে অসংখ্য মানুষ আছে। তুমি কেন তার পেছনে এভাবে নির্লজ্জের মতো ঘুরো, ভাই?
ভালোবাসা হতে হলে দুইপাশে একটা সম্মানের সম্পর্ক থাকতে হয়। একপাশে চাকর আর একপাশে মনিব-এভাবে ভালোবাসা হয় না। খেদমত বা বিশ্বস্ততার জন্য মনিবের মনে দয়া, ভালোবাসা থাকতে পারে...তবে সেটা এক মানবের জন্য এক মানবীর মনে যে ভালোবাসা জন্মায় সেই ভালোবাসা না। তোমাকে এমন কাজ করতে দেখলে খুব কষ্ট হয় ভাইয়া। খারাপ লাগে। এভাবে নিজেকে ছোট করো না, মনুষ্যত্বের অপমান করো না। চাকর হয়ো না, প্রকৃত অর্থে পুরুষ হও।
টিকাঃ
[৩৯৩] এটা আসলে মেয়েদের ইগোর গোড়ায় পানি ঢালে। তার পেছনে একটা ছেলে পাগলের মতো ঘুরছে, তাকে সে যেভাবে খুশি সেভাবে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে পারে, ইচ্ছেমতো তার সব কাজ করিয়ে নিতে পারে- এই বিষয়গুলো ভেবে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করে।
[৩৯৪] তোমার মনে তখন চলতে থাকে আমি এভাবে ইমশোনাল সাপোর্ট করলে সে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে। ভুলে যাবে তার বয়ফ্রেন্ডকে। ব্রেকআপ করে আমার কাছে চলে আসবে। আল্লাহর কাছে ধুমসে দু'আও শুরু করে দাও। আর তার বয়ফ্রেন্ড কতো খারাপ আর তুমি কতো কেয়ারিং- এসব প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকো। দেখো ভাই, এভাবে যে মেয়ে অন্য একজনের সাথে বিচ্ছেদ করে তোমার কাছে আসবে, নিশ্চিত থাকো তোমার সাথে বিচ্ছেদ করে সে অন্য একজনের কাছে চলে যাবে। তোমার মতোই অন্য একজন তার ব্রেইনওয়াশ করবে একদিন।
[৩৯৫] বর্তমানে সবাই বিবাহিত। পরিচয় প্রকাশিত হলে সংসারে অশান্তি হতে পারে তাই ছদ্মনামের আশ্রয় নেওয়া।
[৩৯৬] যতদূর মনে পড়ে মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ের কাজ চলছিল তখন।