📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 মোহমুক্তি

📄 মোহমুক্তি


ব্রেকআপ করার ক্ষেত্রে তোমার প্রথম কাজ হলো তাওবাহ করা। কেন ব্রেকআপ করছো, কার জন্য, কিসের জন্য করছো-খুব স্পষ্টভাবে এটা মাথায় থাকতে হবে। কোনো অস্পষ্টতা, মনকে বুঝ দেওয়া ভাসাভাসা ধারণা থাকলে চলবে না। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে, এটা যেমন সত্য, তোমার ব্রেকআপ করার মূল লক্ষ্য হলো-আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, এই বাক্যটাও তেমন সত্য হতে হবে। যেমনটা আমরা একটু আগেই আলোচনা করলাম।

খুব ভালো হয়, তাওবাহ করার নিয়তে রাতের শেষ ভাগে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলে। [২৯১] শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত গুনাহ হয়েছে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাও। আর কক্ষনো না করার নিয়তে ক্ষমা চাও। আর তুমি নিশ্চয়ই জানো যার তাওবাহ কবুল হয়, আল্লাহ তার সব গুনাহ মুছে দেন। শুধু তাই না, ওই গুনাহগুলোর বদলে সমপরিমাণ ভালো কাজ আমলনামায় লিখে দেন আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা।

এরপর একটা মেসেজ লিখতে হবে। এটাই হবে তোমার প্রেমিক/প্রেমিকাকে পাঠানো শেষ মেসেজ। মেসেজের ভাষা অনেকটা এমন হতে পারে...

আমরা যা করছি তা হারাম। আমি আল্লাহকে ভয় করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে সরে যাচ্ছি, তাওবাহ করে রিলেশন শেষ করে দিচ্ছি। আমার সাথে আর কখনোই যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। তোমার জন্যে এটা কষ্টের হতে পারে। আমার জন্যেও কাজটা কষ্টকর। তবে জাহান্নামের আগুনে পোড়ার কষ্টের তুলনায় এই কষ্ট কিছুই না। আমি জাহান্নামের আগুনে পুড়তে চাই না, আমার কারণে তুমি জাহান্নামের আগুনে পুড়ে যাও, এটাও চাই না। তুমিও তাওবাহ করে ফেলো, নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করো।

কোনো অপমানজনক কথা বলো না। তার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলো না। যেমন- তুই আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছিস, তুই আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবি, তোর সাথে আজকে থেকে ব্রেকআপ, তোকে নিয়ে আমি আর ভাববো না, তুই মরে যা জাহান্নামে যা, আমার কিছু যায় আসে না – এ ধরনের সব কথা অপ্রয়োজনীয়। বিশাল লম্বা মেসেজ লিখবে না। মেসেজে দুঃখবিলাসী কথাবার্তা থাকবে না। অযথা ভাষার কারিগরি এড়িয়ে যাবে। একেকটা শব্দ লিখবে আর নিজেকে প্রশ্ন করবে, এই শব্দটা লেখার দরকার আছে কি না। আমার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এই লাইনটা কি জরুরি? নাকি অন্য কোনো কারণে আমি এই কথাগুলো যুক্ত করছি?

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে:
১। মেসেজ পাঠাবে। ফোন করে বা দেখা করে বলবে না। অনেকেই বলে ব্রেকআপ মেসেজ পাঠিয়ে করা উচিত নয়। ফোনে কথা বলতে গেলে বা কোথাও দেখা করে ব্রেকআপ করতে গেলে তুমি আবেগ ধরে রাখতে নাও পারো। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এবং তুমি আবার প্রেমের মায়াজালে, শয়তানের ফাঁদে পড়ে যেতে পারো।

২। মেসেজ রাতে পাঠাবে না। রাতে মানুষ একা থাকে। ইমোশনাল সাপোর্ট পাবার সুযোগ কম থাকে। এ সময় তোমার মেসেজ পেয়ে সে আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

৩। আদর্শ ব্রেকআপ বলে কিছু নেই। ব্রেকআপ করার জন্য আদর্শ দিন বলেও কিছু নেই। আজ করবো, কাল করবো এভাবে ব্রেকআপ করার সময় পেছাবে না। ব্রেকআপে কষ্ট থাকবেই। এটা মেনে নিতেই হবে। তাকে কষ্ট না দিয়ে, নিজে কষ্ট না পেয়ে এমনভাবে ব্রেকআপ করবো যেন দুইজনেই জিতে যায়, কেউ হেরে না যায়-এমন আসলে হয় না। এমন প্ল্যান করতে করতে দেখা যাবে তুমি ব্রেকআপই করতে পারছো না।

৪। মেসেজ সিন হলে ফোন থেকে ওর নাম্বার ব্লক করে দাও। সবচেয়ে ভালো হয় সিম বদলে ফেললে। ফেসবুকসহ অন্য সব প্ল্যাটফর্মে তার আইডি ব্লক করে দাও, চ্যাট হিস্ট্রি মুছে দাও। নিজের পুরানো পোস্টগুলো ডিলিট দিয়ে দিও। দরকার হলে পুরনো আইডি ডিলিট দিয়ে, নতুন করে খুলো। মোবাইল-পিসি, ড্রাইভ থেকে সব ছবি, ভিডিও মুছে ফেলো। কোন উপহার যদি থাকে নষ্ট করে ফেলো বা দান করে দাও। ভুলেও তার সাথে আর কোনোভাবে যোগাযোগ করা যাবে না, তার ছবি দেখা যাবে না, স্মৃতি ঘাঁটা যাবে না। মনের গভীরে চিরুনী তল্লাশি চালিয়ে ওর সব স্মৃতিগুলোকে গ্রেফতার করে আমৃত্যু হাজতে ভরে দাও। তোমাদের রিলেশনের ব্যাপারে পরিচিত যতো জন জানতো, সবাইকে পারসোনালি বলে দাও তুমি আল্লাহর আজাবকে ভয় করে। তাওবাহ করে রিলেশন থেকে সরে এসেছো। তাই এই বিষয় নিয়ে কেউ যেন আর কোনো কথা ভুলেও না তুলে। লাইফ থেকে তাকে একেবারে শিফট ডিলিট মেরে দাও।

৫। ব্রেকআপ একাকী করবে। এর মাঝে ওর বা তোমার কোনো বন্ধু আত্মীয়স্বজন, কাযিনকে টানবে না। এতে অযথা ঝামেলা তৈরি হবার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া তাদের কথাতে প্রভাবিত হয়ে তুমি তখন ব্রেকআপ না-ও করতে পারো。

৬। সে আর একবার দেখা করতে চাইবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তোমার কথা সামনাসামনি শুনে 'বুঝতে' চাইবে, অথবা আরেকবার নিজেকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ চাইবে। বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনের মাধ্যমে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইবে। অন্য আইডি থেকে বা অন্য নাম্বার থেকে ফোনও করতে পারে। ভুলেও তার সাথে আর একটা শব্দও কথা বলা যাবে না। ওর কণ্ঠ শুনলে, মেসেজের রিপ্লাই দিলে তুমি আবার তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাবার ঘোরতর আশঙ্কা থাকে। অন্তত শেষবারের মতো দেখা করতে দাও-এই কান্নাজড়ানো আবদার রাখতে গিয়ে দেখা করতে গেছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের যিনা করে ফেলেছে, এমন বেশ কিছু ঘটনা শুনেছি।

৭। সে ইসলামের পথে ফিরে আসলো কি না, তা চেক করার জন্য যোগাযোগ করবে না। ওর টাইমলাইনে ঘোরাফেরা করবে না, বা পরিচিত কারো মাধ্যমে খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করবে না।

দেখো ভাইয়া, দেখো আপু! এই যে এই কথাগুলো লিখছি, আমার নিজেরও তোমার কথা ভেবে অনেক কষ্ট হচ্ছে! কিন্তু জাহান্নামের আগুনের কষ্ট তোমার ব্রেকআপের কষ্টের চেয়ে হাজার কোটি গুণ যন্ত্রণাদায়ক। জান্নাতের পথ দুঃখ কষ্ট দিয়ে ঘেরা।[২৯২] তাই বৃহত্তর কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই কষ্টটুকু সহ্য করে নাও।

'...তোমরা যা অপছন্দ করো হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা ভালোবাসো হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন তোমরা জানো না।[২৯৩]

ব্রেকআপ তো করে ফেললাম, কিন্তু আমি কি ওকে ভুলতে পারবো? ঠিক থাকতে পারবো? ওর সাথে আবার বোধহয় যোগাযোগ করে ফেলবো, ওর চোখের জল দেখে আমার শত প্রতিজ্ঞা হয়তো মোমের মতোই গলে যাবে... এসব ভেবে দুশ্চিন্তা করবে না। মনোবল হারাবে না। তুমি তোমার নিয়্যতকে পাক্কা করো, আল্লাহর উপর ভরসা করো, আল্লাহ তোমাকে ঠিকই ট্র্যাকে রাখবেন...

আর যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ করে দেবেন...[২৯৪] আর যে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।[২৯৫]

টিকাঃ
[২৯১] রাতের শেষভাগেই করতে হবে এমন না। যেকোনো সময় যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর কাছে তাওবাহ করা যায়।
[২৯২] নাসায়ী ৩৭৬৩, তিরমিজী: ২৫৬০ ও আবু দাউদ: ৪৭৪৪, সহীহ আত-তারগীব। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
[২৯৩] সূরা বাকারাহ, ২:২১৬
[২৯৪] সূরা তালাক, ৬৫:২
[২৯৫] সূরা তাগাবুন, ৬৪:১১

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 যদি মন কাঁদে

📄 যদি মন কাঁদে


তোমার একটা মায়াবতী ছিল। সেই মায়াবতীকে হারানোর একটা গল্পও তোমার আছে। নিপুণ নিষ্ঠায় তাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করছো। কিন্তু দুষ্কৃতিকারী স্মৃতিগুলো পিছু ছাড়ছে না। মাঝে মাঝেই ওরা হানা দেয়। রাত যতো বাড়তে থাকে ততো বাড়তে থাকে স্মৃতির অত্যাচার। রোমন্থনের কপাট যতোই বন্ধ করতে চাও না কেন দরজায় কড়া নাড়ে তারা। এলোমেলো হয়ে গেছো তুমি। তীক্ষ্ম একটা ব্যথা বুকের ভেতরটায় ছুরির মতো গেঁথে আছে। আকাশে রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়ায় ঘোলাটে চাঁদ। নিস্তব্ধতা দর্শক হয়ে জানালায় বসে থাকে নির্বাক।

ঐ মানুষটাকে কেন ভুলতে পারছো না, সেই কারণগুলো খুঁজে বের করা তাকে ভুলে যাবার প্রক্রিয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে সবার আগে যে বিষয়টি আসবে তা হলো একটা লিস্ট করা। ওর যা যা তোমার ভালো লাগে না সবকিছুর একটা লিস্ট করো। যেমন ধরো-

১। সে মাঝে মাঝে সবার সামনে নাকের ভেতর হাত দিয়ে চুলকায়।
২। তার গা থেকে দুর্গন্ধ আসে।
৩। সবার সামনে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে সর্দি ঝাড়ে টিস্যু বা রুমালে।
৪। অতিরিক্ত কথা বলে ...

এরকম ছোটখাটো ব্যাপার থেকে শুরু করে তোমাকে প্যারা দিতো, তোমার সাথে ঝগড়া করতো, তোমাকে অশান্তির মধ্যে রাখতো, তোমার সব ব্যাপারে খবরদারি করতো- যা যা তোমার মনে হয় সব কিছু লিস্ট করে রাখো। পাশাপাশি প্রেম যে তোমার জীবনে একটা ক্যান্সারের মতো ছিল, এই প্রেমের পরিণতি কী, আখিরাতে কতোটা শাস্তি পেতে হবে, আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, প্রেম না করে পবিত্র থাকলে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে কতোটা পুরস্কার দেবেন, প্রেমের কারণে তুমি জীবনে কী কী হারিয়েছো, তোমার জীবনে আরো কী কী অর্জন করার কথা ছিল, কতো কী করার ছিলো কিন্তু পারোনি- এসবও লিস্ট করে রাখো।

যখনই তার কথা মনে হবে, কষ্ট পাবে তখনই এই লিস্টটা বের করে পড়বে, হাতের কাছে লিস্ট না থাকলে মনে করার চেষ্টা করবে। দেখবে, কষ্টের তীব্রতা অনেক কমে গেছে। এটা একেবারে গ্যারান্টিড একটা পদ্ধতি। যে কোনো আসক্তি কাটানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি 'স্বপ্নে পাওয়া আশ্চর্য' ওষুধের মতো কাজ করে! ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালাব্যামার ড. কিম মেয়ার্ট্য সহ অসংখ্য বিশেষজ্ঞ এমন লিস্ট করতে বলেছে।[২৯৬] ইবনুল জাওযী (রহ.) তার বিখ্যাত বই যাম্মুল হাওয়াতে উল্লেখ করেছেন, 'মানুষের শরীর, তার ভেতরে থাকা ময়লা এবং পোশাকের আড়ালে ঢেকে রাখা দোষত্রুটিগুলোর কথা ভাবলে প্রেমের আকর্ষণ অনেকটা কমে যায়। এ কারণেই বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কারো যখন কোনো মহিলাকে ভালো লাগবে, তখন সে যেন তার দোষত্রুটির কথা চিন্তা করে।' [২৯৭]

আমেরিকার ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন গবেষকের করা রিসার্চসহ আরো অনেক গবেষণা থেকে উঠে এসেছে- ব্রেকআপের কষ্ট ভোলার আরেকটি কার্যকরী উপায় হলো ডায়েরি লেখা। [২৯৮] যে লিস্টের কথা বলা হলো সেটা ডায়েরিতে লিখে ফেলো। পাশাপাশি তোমার অনুভূতি, চিন্তাভাবনা, রিলেশন চলার সময় পাওয়া বিভিন্ন কষ্ট, নিয়মিত একটু একটু করে ডায়েরিতে লিখবে। বুকের ভেতর দলাপাকানো কষ্টগুলো কলমের কালি হয়ে বের হয়ে যাবে। মন হালকা হয়ে যাবে। দিনে ১৫-২০ মিনিট করে ডায়েরি লেখাই যথেষ্ট ইনশাআল্লাহ।

কেন তাকে ভুলতে পারছো না
শত চেষ্টার পরেও তুমি প্রাক্তনকে ভুলতে পারছো না। এমন অবস্থায় সাধারণ কয়েকটি ব্যাপার কাজ করে।

১। মস্তিষ্কে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া: আলকেমি লেখায় আমরা বলেছিলাম প্রেমে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কে খুশির হরমোন যেমন ডোপামিন, সেরোটোনিন ইত্যাদি রিলিয হয়ে মাদকের মতো একটা আসক্তি তৈরি করে। ব্রেকআপের ফলে এই হরমোন রিলিয বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি স্ট্রেস হরমোন তৈরি হয়ে আমাদের কষ্ট দেয়। তাই মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই প্রাক্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেন খুশির হরমোনগুলো রিলিয হয়।

কিন্তু প্রাক্তনকে যেহেতু বর্তমান বানানো যাবে না, তাই আমাদের খুঁজতে হবে এমন কিছু কাজ যা মস্তিষ্কে এই খুশির হরমোনগুলো রিলিয করবে। তোমার ভালো লাগবে। সুখকর অনুভূতি হবে। ব্রেকআপের কষ্ট ভুলে যাবে। সেই সাথে প্যারা সৃষ্টিকারী হরমোন করোটিসোলকেই প্যারা দিয়ে বিদায় করে দেবে।

ক) ব্যায়াম করা: খুশির হরমোন রিলিযের কার্যকরী একটা পদ্ধতি হলো ব্যায়াম করা।[২৯৯] তোমাকে জিমে গিয়ে ব্যায়াম করতে হবে এমন না। সকালে দৌড়ানো, বাইরে হাঁটাহাঁটি, পাঁচ-দশটা পুশআপ, একটু জগিং করা, ক্রিকেট ফুটবল খেলা, এগুলোও তোমার মস্তিষ্কে ডোপামিন বাড়াতে কাজে লাগবে। যখনই মন খারাপ লাগবে সঙ্গে সঙ্গে ৫-১০ টা পুশআপ দাও। দেখবে জীবন সুন্দর![৩০০] তাছাড়া শারীরিকভাবে ফিট থাকা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সুন্নাহ। আল্লাহ দুর্বল মুমিনের তুলনায় সবল মুমিনকে বেশি ভালোবাসেন। এমনিতেই ব্যায়াম করা উচিত।

খ) সূর্যের আলোতে যাওয়া: ব্রেকআপের কষ্টে দরজা জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে ব্রয়লার মুরগির মতো বসে বসে ঝিমালে কষ্ট কমবে না। আরো বাড়বে। সেই সাথে বাড়বে অন্যান্য সমস্যা। Seasonal affective disorder (SAD) নামে একটা অসুখই আছে- শীতকালে সূর্যের দেখা না পেলে মানুষজন মনমরা হয়ে থাকে, কিছু ভালো লাগে না কিছু, হতাশায় ভোগে। সূর্যের আলোর অভাবে দিলখুশ করে দেওয়া হরমোনগুলো রিলিয হতে চায় না। তাই সূর্যের আলোতে প্রতিদিন কিছুটা সময় (অন্তত ২০-৩০ মিনিট) কাটালেও ডোপামিনের প্রবাহ বাড়বে। ভালো লাগবে।[৩০১]

গ) পর্যাপ্ত ঘুম এবং রাত না জাগা: রাতে ভালোমতো না ঘুমালে ডোপামিনের সংবেদনশীলতা কমে যাবে। ডোপামিন সংবেদনশীলতা বলতে বোঝানো হচ্ছে- ধরো আগে ১ প্লেট বিরিয়ানি খেলেই তোমার পেট ভরে যেতো, এখন দু’প্লেটেও হয় না। তো, এমনিতেই তোমার ডোপামিন রিলিয কম হয়, তারপর যেটা হয় সেটাও যদি ঠিকমতো কাজ করতে না পারে তাহলে তো মুশকিল। তাই রাতে ৭-৮ ঘণ্টার একটা ঘুম লাগাও। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠো। সকালে ডোপামিন বেশি মাত্রায় রিলিয হয়। ডোপামিন ফর্মে ফিরে আনন্দের চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে দেবে। [৩০২] ডোপামিনের সাথে সম্পর্ক যদি না-ও থাকতো, তোমার একেবারেই রাত জাগা উচিত না। সারাদিন কষ্টেমষ্টে পার করে দিলেও প্রাক্তনের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে রাতে। রাতের নির্জনতায়, নিঃসঙ্গতায় মন পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আত্মহত্যা, মদ বিড়ি গাঁজা খাওয়া অধিকাংশই হয় এই রাতের বেলা। তাই একেবারেই রাত জাগা যাবে না।

ঘ) খাবার: বিভিন্ন খাবার আছে যেগুলোর মাধ্যমে খুশির হরমোনগুলো রিলিজ করা যায়। যেমন- মিষ্টিকুমড়া, সয়াবিন, শিম, মটরশুটি, শাকসবজি, কলা, আপেল, তরমুজ, স্ট্রবেরি, পেপে, দুধ, দই, পনিরসহ দুগ্ধজাত সকল খাবার, মুরগি, ডিম, গ্রিন টি, কফি, মাছ, মাংস, কাঠবাদাম, কাজু বাদাম, বাদাম, চকলেট। বিড়ি, সিগারেট, গাঁজা না খেয়ে তোমার সামর্থ্য অনুসারে এগুলো খেতে পারো। [৩০৩]

ঙ) হাসি: ব্রেকআপের হতাশা, কষ্ট ভুলতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে হাসি। ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেছেন, 'হাস্যরসের আলোচনা করলে বিচ্ছেদের কষ্ট কমে আসে'। [৩০৪] 'দি হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি'র 'ডিপার্টমেন্ট অফ রিহ্যাবিলিটেশন সায়েন্স'- এর করা এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, হাসি মস্তিষ্কের খুশির হরমোন ডোপামিন ও সেরোটনিনের মাত্রা বাড়ায়। হাসার ফলে হতাশা ও উদ্বেগ কমে। [৩০৫] বন্ধু বান্ধব, কাযিন [৩০৬], বাচ্চা কাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো, পশু পাখি বা বাচ্চাকাচ্চাদের ফানি ভিডিও ক্লিপস দেখা ইত্যাদি নানাভাবে হাসি ঠাট্টা করা যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখবে যেন চোখের হেফাযতে সমস্যা না হয়, আর সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং এর নেশা যেন পেয়ে না বসে।

খুশির হরমোন বাড়ানোর জন্য যোগ ব্যায়াম, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মেডিটেইশন, ইত্যাদির কথা অনেকে বলতে পারে। এগুলো করবে না। এগুলোর ভেতর অনেক জিনিস আছে যা হারাম, অনেক ক্ষেত্রে যা শিরকের পর্যায়ে পৌছে যায়। বিস্তারিত জেনে নাও রেফারেন্সে দেওয়া আর্টিকেলগুলো পড়ে।[৩০৭]

ব্রেকআপের কষ্ট ভোলা এবং হ্যাপি হরমোন রিলিয়ের আরো একটি ভালো পদ্ধতি আছে। সেটা আসছে পরের পয়েন্টেই।

২। সেক্স: হয়তো প্রাক্তনের সাথে তুমি বিছানা শেয়ার করতে। তার সাথে সেক্স চ্যাট করতে। হস্তমৈথুন করতে। এককথায় তোমার শরীরের চাহিদা মেটানোর একটা মাধ্যম ছিল সে। ব্রেকআপ হবার পর যখন তোমার শরীরের চাহিদা জেগে উঠছে তখন তাকে কাছে পাচ্ছো না। কিন্তু তার শরীরের ছবি বা তাকে নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিগুলো তোমার মাথায় গেঁথে আছে। তাই শরীরের চাহিদা জেগে উঠলেই তোমার মাথায় অটোমেটিক্যালি সে চলে আসে। পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে।

ব্রেকআপের পরের হতাশা থেকে, নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখার জন্য অনেকে খুব ঘন ঘন পর্ন দেখে, মাস্টারবেট করে। আবার সেই একই লুপে পড়ে যায়। পর্ন দেখার সময় বা মাস্টারবেট করার সময় তার কথা মনে হয়। আরো হতাশা, বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে। এই চক্র চলতেই থাকে। চক্র ভাঙার জন্য তোমার মাথায় সেক্স ফ্যান্টাসি আসলে সঙ্গে সঙ্গেই তা দূর করে দিতে হবে। একজন মুসলিম হিসেবে এমনিতেই এটা তোমার কর্তব্য। এক মুহূর্তের জন্যেও চিন্তা করা যাবে না তাকে নিয়ে। পর্ন, মাস্টারবেশনের অভ্যাস বাদ দিতে হবে। মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইটা ভালোমতো পড়লে ইনশাআল্লাহ উপকৃত হতে পারবে। আল্লাহর রহমতে অসংখ্য মানুষ এই বই পড়ে উপকৃত হয়েছে।[৩০৮] ব্যায়াম করা, সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া, রোযা রাখা ইত্যাদির পাশাপাশি বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। বিয়ে তোমাকে শরীরের চাহিদা মেটার হালাল উপায় দেবে।

আধুনিক কালের গবেষকেরা বলছে- শারীরিক অন্তরঙ্গতা হতাশা উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। কারণ যৌনতার ফলে মন ভালো করে দেওয়া হরমোনগুলো যেমন- ডোপামিন, অক্সিটোসিন ইত্যাদি রিলিয হয়। তাদেরও শত শত বছর পূর্বে এমনটাই বলেছেন ইবনুল জাওযী (রহ.),
'প্রেম রোগের চিকিৎসার মধ্যে একটি হলো অধিক যৌনসঙ্গম। কেননা, অধিক যৌন সঙ্গম শরীরের তাপ কমিয়ে দেয়, আর এই তাপের দ্বারাই প্রেম ঊর্ধ্বগামী হয়। সুতরাং স্বাভাবিক তাপ নিস্তেজ হলে শরীর শান্ত থাকবে, মন ঠাণ্ডা হবে। এবং প্রেমের আগুন ঝিমিয়ে আসবে। [৩০৯]

৩। একাকীত্ব: একটা সময় তোমার দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, আক্ষেপগুলো হয়তো তুমি তার সাথে শেয়ার করতে। এখন বিষয়গুলো কার সাথে শেয়ার করবে, তুমি বুঝতে পারো না। ঘরে ফেরার পর নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ, ক্লান্ত দুপুরে বা গভীর বিষণ্ণ রাতের একাকীত্বে, আক্ষেপের ভারে বারবার তোমার শুধু তার কথা মনে হয়। পুরোনো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠে। এমন অবস্থায় করণীয়:

ক) সেই লিস্টটা আবার বের করে পড়বে, প্রেম কন্টিনিউ করলে তোমার আখিরাত ও ইহকাল কেমন দুর্বিষহ হয়ে যেতো সেগুলো ভাববে।
খ) ধীরস্থিরভাবে অর্থ বুঝে বুঝে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে। কুরআনকে নিজের সঙ্গী বানাবে। কুরআন থেকে দুরে থাকার কারণে তুমি আমি শূন্যতা ও হতাশায় ডুবন্ত। মহান আল্লাহ বলেন, যারা ঈমানদার তাদের জন্য এটি (আল-কুরআন) একটি পথ নির্দেশিকা এবং আরোগ্যদানকারী (নিরাময়)। [৩১০] 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলগণের সঙ্গে আছেন।' [৩১১]
গ) রেগুলার যিকির করবে। দেখবে অন্যরকম শান্তি পাচ্ছো। আল্লাহ বলেছেন, '...আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।' [৩১২] সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার-এর মতো সহজ বাক্যগুলোর মাধ্যমে যিকির করো। [৩১৩] স্রেফ মুখস্থ পড়ার বদলে যিকিরের শব্দ ও বাক্যগুলোর অর্থ জেনে নাও। তারপর ধীরে ধীরে অন্তর থেকে সেগুলো উচ্চারণ করো। অর্থ নিয়ে চিন্তা করো। সকাল সন্ধ্যায় নিরাপত্তার জন্য যে ২৩ আযকার রয়েছে সেগুলো কখনো বাদ দিও না। [৩১৪] অর্থ জেনে জেনে বিষয়ভিত্তিক সুন্নাহসম্মত যিকিরের জন্য ভালো একটা সোর্স হিসনুল মুসলিম বই ও অ্যাপ। লিংক রেফারেন্সে দিয়ে দেওয়া আছে।[৩১৫]
ঘ) ভালো একজন বন্ধু খুঁজে বের করো। সালাত আদায় করে, সুন্নাহ মানার চেষ্টা করে- এমন হলে ভালো হয়। তার সাথে শেয়ার করো তোমার দুঃখকষ্ট আর আক্ষেপের কথা।
ঙ) বাবা-মার সঙ্গে সময় কাটালে ব্রেইনে ডোপামিন রিলিস হয়।[৩১৬] বাবা-মা, ভাইবোনদের সাথে বেশি বেশি করে সময় কাটাও। দেখো কতো ভালোবাসা নিয়ে বসে আছেন তাঁরা তোমার জন্য। বাসা থেকে দূরে থাকলে ফোনে কথা বলো। গার্লফ্রেন্ড- বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে তো অনেক বাইরে ঘুরাঘুরি করেছো, অনেক ফুচকা খেয়েছো, এবার মাকে নিয়ে একটু ঘুরো। মোড়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ফুচকা খাও, বাবাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে ঘুরো, ফ্যামিলির সাথে ট্যুর দাও... তারা যে কী পরিমাণ খুশি হবে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য অনেক কিছু করেও তুমি তার মন পাওনি, অথচ তুমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করবে বাবা-মা, ভাইবোনের জন্য তোমার করা ছোট ছোট কাজেই তারা কতোটা খুশি হবেন!
চ) আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখো। তাঁর উপর ভরসা রাখো। এই একাকীত্ব, শূন্যতা দূর হয়ে যাবে। আল্লাহ দেখছেন তোমার কষ্ট। আল্লাহ সহজ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ। এই বন্দীত্ব থেকে, অদৃশ্য এই কারাগার থেকে খুব শীঘ্রই তুমি মুক্তি পাবে। এইতো সামনেই পাখিরা আবার আকাশে উড়বে। পড়তে পারো শাইখ ইয়াদ কুনাইবির আল্লাহর প্রতি সুধারণা বইটি, এছাড়া আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল, নবীজির পদাঙ্ক অনুসরণ বইগুলোও পড়া যেতে পারে। পাশাপাশি এই বইয়ের হারিয়ে পাওয়া লেখাটা আবার পড়ো ইন শা আল্লাহ।
ছ) আত্মমর্যাদাশীল, হকপন্থী আলিম- যারা আধুনিকতার নামে সাহাবী এবং ক্ল্যাসিকাল স্কলারদের মতামত উপেক্ষা করে নিজেদের মনমতো ইসলামের ব্যাখ্যা করেন না, দ্বীনের ব্যাপারে যারা আপসকামিতায় ভোগেন না- তাদের লেকচার শোনো। নবী- রাসূল, সাহাবীদের জীবনী, পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম, দুনিয়ার ধোঁকা এই বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য দাও।
রাতের সালাত আদায় করো।[৩১৭] রাতের গহীনে যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে তখন ঘুম থেকে ওঠো। ঘরের সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে একান্তে আল্লাহর সামনে দাঁড়াও। তোমার মন খারাপ, দুঃখ কষ্ট সব পালিয়ে যাবে। 'নিশ্চয়ই ইবাদাতের জন্য রাতে উঠা প্রবৃত্তি দমনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণে অনুকূল।'[৩১৮]
জ) অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে জানো, তাদের সাহায্য করো। দুঃখ দূর করার চেষ্টা করো। আল্লাহও তোমার দুঃখ দূর করে দেবেন। রাসূল (ﷺ) বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন, যে তার বান্দাদের প্রতি দয়া করে।'[৩১৯] 'আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।'[৩২০]
অন্যকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তোমার মূল উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দয়া লাভ। পাশাপাশি এই বিষয়টাও জেনে রাখো- যখন তুমি অন্য মানুষকে সাহায্য করবে তখন তোমার মস্তিষ্কে খুশির হরমোনগুলো রিলিজ হবে এবং স্ট্রেস হরমোন করটিসোলের প্রবাহ কমে যাবে।[৩২১]

৪। মজার স্মৃতি: অতীতে তার সাথে তোমার বেশ কিছু স্মৃতি রয়েছে। বিশেষ করে রিলেশনের প্রথম সময়গুলোর মজার সুখের আনন্দের স্মৃতি। ব্রেকআপের পরে কোনো কারণে জীবনে জটিলতা নেমে আসলে অবধারিতভাবে অতীতের সুখের স্মৃতি বেশি বেশি মনে পড়ে। মনে হয় সে ছিল তাই জীবনটা রঙিন ছিল। সে নেই তাই জীবনটা রং হারিয়ে ফেলেছে। তাকে আবার ফিরে পেলে অভিমান ভেঙে ফিরে আসবে জীবনের সব রং। এমন ক্ষেত্রে করণীয়:

ক) কেন তুমি ব্রেকআপ করেছো মনে করে দেখো। তুমি আল্লাহকে খুশি করার জন্যে, তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচতে গুনাহ থেকে ফিরে এসেছো। কেন তুমি আবার গুনাহে ফিরে যাবে?
খ) সেই লিস্টটার উপর আবারো চোখ বুলাও। কাজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
গ) সে ফিরে আসলে তোমার সাদাকালো হয়ে যাওয়া জীবনে আবার রং ফিরে আসবে-এই কথার ভিত্তি কী? কীভাবে তুমি নিশ্চিত হলে? তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে? বরং সে ফিরে আসলে তোমার জীবন আরো তেজপাতা হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে।
ঘ) রিলেশনের প্রথম সময়গুলো মোহের কারণে মজার হয়। কিন্তু কিছুটা সময় গেলেই জীবন বিষিয়ে যায়। বইয়ের শুরুতে বিস্তারিত আলোচনা আছে। আবার পড়ে নাও।
ঙ) জান্নাতের কথা চিন্তা করো। জান্নাতে তুমি কীভাবে মজা করবে, কী কী করবে, এ নিয়ে প্ল্যান করো। যেমন ধরো আমার ইচ্ছা হলো জান্নাতে ঢুকে রেশমের বালিশে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসবো। একপাশে থরে থরে থাকবে মাল্টা, অন্যপাশে ঝুলবে থোকা থোকা আঙুর। আহ!
দুনিয়ার এই মজা একেবারেই ক্ষণিকের। জান্নাতের জীবনের কোনো শেষ নেই, বারবার এ সত্যটা নিজেকে মনে করিয়ে দেবে। জান্নাত নিয়ে প্রতিদিন যদি ১০-১৫ মিনিট করেও ভাবো, তাহলে প্রাক্তনের কষ্ট একেবারে রকেটের গতিতে ভুলে যাবে।

৫। সিনেমা, সিরিজ, নাটক, মিউযিক, প্রেমের উপন্যাস: এগুলো সম্ভবত প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার টপ থ্রি কারণের মধ্যে একটা। এসব দেখলে, শুনলে, পড়লে, ক্ষণিকের ভালোলাগা কাজ করবে। কিন্তু তারপর তুমি তাকে মিস করতে শুরু করবে, তোমার প্রেমকাহিনীর সাথে মেলানোর চেষ্টা করবে এবং ভুলতে পারবে না ওকে। [৩২২] এগুলোকে একেবারেই জীবন থেকে বিদায় করে দাও। কুরআন তিলাওয়াত শুনো, তিলাওয়াত করো, ইসলামি নাশীদ শুনো, লেকচার শুনো, উপকারী বিভিন্ন ডকুমেন্টারি দেখো, বইপত্র পড়ো।

৬। ওর কথা মনে পড়ে এমন জিনিস বিদায় করো নি: বিদায় বলে দাও লেখাতে বলা হয়েছিল, ওর কথা মনে করে দেয় এমন সবকিছু তোমার জীবন থেকে সরাতে হবে। ওর দেওয়া গিফট, ওর ফেইসবুক আইডি, চিঠি, মেসেজ সব তোমার জীবন থেকে বিদায় করতে হবে। এটা না হলে এগুলো তোমাকে তার কথা মনে করিয়ে দেবে। এগুলো সব থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলো। অন্য আইডি থেকেও তার টাইমলাইনে ঘুরাঘুরি করা যাবে না। সামাজিক মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক ড. টারা মার্শাল গবেষণা করে বলছেন, 'ফেইসবুকে প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে গেলে বা তার খোঁজখবর রাখলে ব্রেকআপের কষ্ট সামলানো, প্রাক্তনকে ভোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। [৩২৩] যতটুকু সম্ভব প্রেম করার ঐ গলি, রাস্তা, ফুটপাত, গাছতলা, নদীর ধার, পুকুর পাড়, পার্কের বেঞ্চি, ফাস্ট ফুড বা কফিশপের দোকানগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। একান্তই এড়াতে না পারলে আল্লাহর কাছে নিজের মন ও চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার সাহায্য চাও। ভুলেও ভ্যালেন্টাইন্স ডে, নববর্ষ, নিউ ইয়ার বা এমন যতো দিন আছে এসব দিনে কাজ না থাকলে বাইরে বের হবে না, কাপলদের আড্ডাখানায় যাবে না, ক্লাস শেষেই চলে আসবে।

৭। ফ্রেন্ড সার্কেল: ওরা ঠিকই কথায় কথায় তোমার প্রেমিক-প্রেমিকার কথা তুলবে। কথা শুনবে আর ভেতরে ভেতরে তুমি কষ্টে দগ্ধ হবে। তাকে ভুলতে পারবে না। এই রিলেশনের ব্যাপারে যারা জানতো তাদের সবাইকে জানিয়ে দাও তোমার পরিবর্তনের কথা। যাতে আর কেউ কখনো দেখা হলে বা কথা প্রসঙ্গে অতীতের জাহিলিয়াতের কথা মনে করিয়ে না দেয়। দরকার হলে ফ্রেন্ড সার্কেলের পরিধি ছোট করে নিয়ে আসো।

ব্রেকআপের পর বন্ধুদের কাছ থেকে মানসিক সাপোর্ট নেবার ব্যাপারেও একটু সতর্ক থাকতে হবে। দেখা যাবে যে- অনেকেই তোমাকে গান, সিনেমা, নাটক, মদ- বিড়ি-গাঁজা-বাবা ধরিয়ে দেবে। প্রাক্তনের উপর প্রতিশোধ নেবার বুদ্ধি দেবে বা এই ব্রেকআপের কষ্ট ভুলার জন্য আবার অন্য একটা প্রেম করার পরামর্শ দেবে। মানুষের উপর তার বন্ধুর প্রভাব পড়ে। তোমার বন্ধু যদি হারামে ডুবে থাকে, তাহলে সে তোমাকেও হারামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে দু'আ করো যেন তিনি এমন বন্ধু বা সাথী জুটিয়ে দেন যে তোমাকে আল্লাহর আনুগত্যে সাহায্য করবে, হারাম থেকে তোমাকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবে।

৮। শূন্যতা ও অবসর: একাকী অবসরের মুহূর্তগুলো ফ্ল্যাশব্যাক করাবে অতীতের দিনগুলোর কথা। শয়তানের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই একাকী কাটানো বেকার সময়গুলো। সাবধান! ফাঁদে পা দিও না। সিনেমা, নাটক, সিরিয়াল না দেখে, ইউটিউবে একটার পর একটা ভিডিও না দেখে নিজেকে কোনো না কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যস্ত রাখো। আখিরাত নিয়ে ভাবো, যে টিপসগুলো দেওয়া হচ্ছে সেগুলো অনুসরণের চেষ্টা করো। অবসরই রাখবে না। ইসলামী বই পড়ো, নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলো। টিউশনি করো, টাকা কামানোর চেষ্টা করো, স্কিল বাড়াও, ব্যায়াম করো, রান্নাবান্না শেখো, ঘরের কাজ শেখো, নতুন কোন ভাষা শেখো, ড্রাইভিং শেখো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবনী, সাহাবীদের জীবনী পড়ো, কুরআনের অনুবাদ পড়ে ফেলো। মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়েরতবু হেমন্ত এলে অবসর পাওয়া যাবে এই আর্টিকেল পড়ো।[৩২৪] অবসর সময়কে কীভাবে কাজে লাগানো দরকার তা নিয়ে বেশ ভালো ধারণা হবে, ইন শা আল্লাহ।

নিজেকে মানুষজনের কাছ থেকে গুটিয়ে নেবে না। একাকী থাকবে না। শরীর ও মনকে চাঙ্গা রাখতে হবে, ফুরফুরে রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন বিষণ্ণতা পেয়ে না বসে। মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলে মন ফ্রেশ হয়ে যাবে। মাঠে গিয়ে খেলাধুলা, সমাজসেবামূলক কাজে সাহায্য করা, বাগান করা, বিড়াল, পাখি, খরগোশ পোষা মানে অন্য কোনো হবিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। সপ্তাহে একদিন কোথাও থেকে ঘুরে এসো। যেন ওইসব ছাইপাঁশ প্রেমের সস্মৃতি তোমার আশেপাশেও ভিড়তে না পারে।

ইবনুল জাওযী (রহ.)র প্রেমের কষ্ট ভোলানোর জন্য যে পদ্ধতিগুলো বাতলে দিয়েছেন তাদের মধ্যে কিছু হলো- ঘুরে বেড়ানো, ঘুমানো, জীবিকার জন্য ব্যস্ত হওয়া, শরীর ঠাণ্ডা রাখা, গোসল করা, রোগীদের দেখতে যাওয়া, মৃতদের জানাজা ও কাফন দাফনে অংশ নেওয়া, কবরস্থান দেখতে যাওয়া, মৃতদের দেখা, মৃত্যু ও তার পরের অবস্থাগুলোর কথা চিন্তা করা প্রভৃতি। তাঁর মতে, এসব কাজ কামনাবাসনার আগুন নিভিয়ে দেয়। অন্যদিকে গান বাজনা তা বাড়িয়ে দেয়। এমনইভাবে আল্লাহর যিকিরের মজলিস, দুনিয়াবিমুখ মানুষদের সাহচর্য, পুণ্যবান মানুষদের জীবনী ও ওয়াজ নসিহতের দ্বারাও প্রেমের প্রতিকার পাওয়া যায়। [৩২৫] অবসর সময়ে এগুলো করে ফেলতে পারো।

১। প্রতিশোধ: প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার অন্যতম একটি কারণ হলো ব্রেকআপের পর অনেককে প্রতিশোধের নেশায় পেয়ে বসে। প্রতিশোধ নেবার চিন্তা দিনরাত প্রতিটি ক্ষণে তোমার মস্তিষ্কে তার চিন্তাকে জাগিয়ে রাখবে।

প্রতিশোধ নেবার চিন্তা মাথা থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলতে হবে। এভাবে অন্য একজন মানুষের এবং তার পরিবারের ক্ষতি করা গুনাহ। এটা আল্লাহর অবাধ্য হওয়া। জেনে বুঝে এমন অবাধ্যতা করার সুযোগ নেই। এর পক্ষে কোনো অজুহাত দেওয়ারও সুযোগ নেই। প্রতিশোধ নেওয়ার অংশ হিসেবে যে কাজগুলো করতে হবে নিশ্চিতভাবেই তার অনেক কিছু হারাম। তুমি কেন হারাম কাজ করবে? আরেকজনের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজের আখিরাত বরবাদ করবে? দুটো ভুল দিয়ে একটা শুদ্ধ হয় না। মাইনাসে মাইনাসে প্লাস শুধু অঙ্কের জগতে হয়, বাস্তবে হয় না।

যে উপায়গুলোর মাধ্যমে তাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছো তা কি শুধু তাকেই কষ্ট দিচ্ছে? নাকি তার বাবা মা, তার ভাই বোন, স্বামী-স্ত্রী, পরিবার বা আত্মীয়স্বজনেরও ক্ষতির কারণ হচ্ছে? তাদের কী দোষ? তাছাড়া তুমি তোমার নিজের জন্যেও কবর খুঁড়ছো। নিজের জীবন, নিজের পরিবারকে শেষ করে দিচ্ছো। সামাজিক ও পুলিশি ঝামেলায় পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, মানসম্মানের বারোটা বাজাচ্ছো। ছাড়ো এই প্রতিশোধ। প্রতিশোধ খেলা। এই খেলার সবটুকু লেভেল কমপ্লিট করলেও তুমি কখনো শান্তি পাবে না। তৃপ্তি পাবে না।

যা হবার হয়ে গেছে। মেনে নাও। নিজের এবং অন্যের জীবন নষ্ট না করে জীবন গড়ো। হাইলি কোয়ালিফাইড, স্কিল্ড একজন মানুষ হও। ভীরুতা কাপুরুষতাকে গুলি মেরে আল্লাহর প্রকৃত দাস হয়ে যাও। সাহসী, চরিত্রবান, সৎ, পরোপকারী, সমাজ এবং জাতির প্রতি দায়িত্বশীল একজন মানুষ হবার চেষ্টা করো।

উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও- ওর পেছনে লেগে থাকলে ও আবার আমার কাছে ফিরে আসবে, ব্রেকআপ মেনে নিলাম কিন্তু আমরা স্রেফ বন্ধু হয়ে থাকি-এসব চিন্তাভাবনাও প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার পেছনের কারণ হিসেবে বেশ ভূমিকা রাখে।

এতক্ষণ যা যা আলোচনা করা হলো, সেগুলো প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার পেছনের মূখ্য কারণ। এই কারণগুলোর সাথে সরাসরি তুমি জড়িত। কিন্তু এর বাইরেও প্রেমের ফাঁদ থেকে বের না হবার পরোক্ষ কিছু কারণ আছে যেগুলোতে তুমি সরাসরিভাবে জড়িত না। যেমন:

১। ব্রেকআপের পরে আবার নতুন করে প্রেমে পড়ার ফাঁদ: প্রথমবার প্রেমে পড়ে রিলেশন করাটা অনেকের জন্য কষ্টকর হলেও বা সময় লাগলেও, পরের প্রেমগুলোর ক্ষেত্রে খুব একটা সময় বা পরিশ্রম লাগে না। একেবারে সিরিয আকারে প্রেমলীলা চলতে থাকে। বিশেষ করে ব্রেকআপের পর। এর কারণ কী? অনেকগুলো কারণ আছে-
* ব্রেকআপের পর একাকীত্ব সহ্য করতে না পারা, গাঞ্জুট্টি, হিরোইঞ্চির মতো প্রেমের নেশায় পড়ে যাওয়া। প্রেম ছাড়া নিজেকে পঙ্গু মনে হওয়া।
* ব্রেকআপ হবার বা ঠিক এর পরের সময়টাতে 'তুমিহীনতায়' যে শূন্যতা কাজ করে সেই শূন্যতা পূরণের জন্য বিপরীত লিঙ্গের কাছ থেকে মেন্টাল সাপোর্ট নেওয়া।
* প্রাক্তনের উপর প্রতিশোধ নেওয়া বা প্রাক্তনের মনে ঈর্ষা জাগানোর জন্য একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া।
* শরীরের চাহিদা পূরণ (সেক্স)।

দেখো, তুমি তো আল্লাহর জন্য, আল্লাহকে ভালোবেসে, তাঁর অসন্তুষ্টির ভয়ে, প্রেম থেকে দূরে সরে এসেছো। আবার কেন অন্ধকারের জীবনটাতে ফেরত যেতে চাচ্ছো? জাহান্নামের পথ ধরছো? আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে, জান্নাতের চাইতে তোমার কাছে ক্ষণিকের এই ডোপামিনের নেশা বেশি হয়ে গেল? প্রেমের কারণে এতোটা কষ্ট পেলে তুমি, এতোটা অশ্রু ঝরলো তোমার চোখে... তারপরও কেন আবার সেই প্রেমের ফাঁদেই পা দেওয়া? বিয়ে করার চেষ্টা করা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা, যিকির করা, বাবা-মা'র সাথে সময় কাটানো ইত্যাদি নানা পদ্ধতি বাতলে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পড়ে নাও।

মেন্টাল সাপোর্ট এর জন্য কখনোই বিপরীত লিঙ্গের কাছে যাবে না। ওরা তোমাকে হেল্প তো করতে পারবেই না, উল্টো আবার মরণফাঁদে পড়ে যাবে। খুব ভালো হয় একজন দ্বীনদার মনোবিদের কাছে যেতে পারলে। না পারলে তোমার বন্ধু (মেয়েদের ক্ষেত্রে বান্ধবী), বড় ভাই, কাযিন, নিকটাত্মীয় এবং এলাকার মধ্যে মুরুব্বীস্থানীয় কেউ (যাদের সাথে তুমি ফ্রি, যারা সৎ, যারা তোমার ভালো চায়), তোমার ফেভারিট স্যার (মেয়েদের জন্য ম্যাডাম), আলেম-উলামার কাছে যেতে পারো। চাইলে আমাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারো। [৩২৬]

২। মাঝে মাঝে তার সাথে দেখা: প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার পেছনে বেশ ভূমিকা রাখে। সারাদিন চোখের সামনে থাকে। পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এমন অবস্থায় যে ভুল কাজ তোমরা করো-
ছ্যাঁকা বিশেষজ্ঞ বাপ্পারাজের মতো বিরহে ভুগো, কান্নাকাটি করো, হা-হুতাশ করো, আফসোস করো, কষ্ট পাও, নষ্ট হও, একটা চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাও...

এমন ক্ষেত্রে যা করতে হবে:
ক। যা হবার হয়ে গেছে, তাকে নিয়ে আর নতুন কোনো স্বপ্ন দেখবে না। এগুলো স্রেফ সময় নষ্ট, জীবন নষ্ট- কথাগুলো বারবার নিজেকে মনে করিয়ে দেবে。
খ। সে যদি আবার ফিরেও আসে, তাহলে তোমার জীবনকে সে নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার প্রেম করলে তুমি আবার গুনাহতে জড়াবে, জাহান্নামের জ্বালানি হবে- যখনই তার কথা মনে হবে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাববে। তার দোষগুলার কথা মনে করবে, বিভিন্ন সময় তার দেওয়া প্যারাগুলোর কথা চিন্তা করবে। সে স্পেশাল কেউ ছিল না, সমাজের আর দশটা মানুষের মতোই সাধারণ মানুষ সে।
গ। চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল। কঠোরভাবে দৃষ্টির হিফাযত করো। যদি সুযোগ থাকে (এবং খুব বেশি সমস্যা না হয়) তাহলে অন্য জায়গায় মুভ করো।
ঘ। একটু মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। তবে এই মন খারাপকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। নিজেকে আরো ম্যাচিউরড, আরো স্কিল্ড করে তুলবে, প্রকৃত একজন মানুষ হবে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করবে-আল্লাহ তোমাকে একজন ছ্যাঁচড়া মানুষ থেকে, পাপ করা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

৩। স্বপ্ন: অনেকের ক্ষেত্রেই প্রাক্তনকে ভুলতে না পারার পেছনে স্বপ্নের ভূমিকা থাকে।

হঠাৎ করেই প্রাক্তন স্বপ্নে চলে আসে। পুরোনো প্রেম জাগিয়ে দেয়। এরকম অবস্থায় নিজেকে সামলানো খুব কঠিন হয়ে যায়। সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যায়। বেশিরভাগ প্রেমিক-প্রেমিকাই এমন অবস্থায় নিজের আত্মসম্মান নষ্ট করে, একটা গ্রেট লুযারের মতো আবার যোগাযোগ করে বসে প্রাক্তনের সঙ্গে। এতোদিনে ব্রেইনের যে হরমোনের ভারসাম্য ফিরে এসেছিল তা নিমিষেই নষ্ট করে ফেলে। নতুন করে কষ্ট পেয়ে নষ্ট হবার গল্প লেখা শুরু করে।

করণীয়:
ক। কোনোভাবেই তার সাথে যোগাযোগ করবে না। একটা মেসেজও দেবে না কখনো।
খ। নিজের সাথে বারবার যুদ্ধ করবে। নিজেকে প্রশ্ন করবে- আমি কেন আল্লাহর অবাধ্য হবো? যে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত জাহান্নামের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি আমি, সেই পথে আবার কেন ফিরে যাবো? কেন করবো এই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড?
গ। স্বপ্ন দেখার সঙ্গে সঙ্গে তুমি সেই লিস্টটা খুলে বসো, ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে থাকো, বইয়ে যে ক্ষতিগুলোর কথা আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো মনে করো। আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে সাহায্য চাও।

৪। হতাশা: ব্রেকআপ করার সময় অনেক সময় হতাশা জেঁকে বসতে পারে। ইচ্ছে হতে পারে হাল ছেড়ে দেওয়ার। তোমার হতাশাকে ব্যবহার করে শয়তান তোমাকে আবার আগের পথে ফেরত নেওয়ার চেষ্টা চালাবে। মনে রাখবে, তুমি সত্যিকারভাবে না চাইলে, কেউ তোমার জীবন গুছিয়ে দিতে পারবে না। তোমার সমস্যার সমাধান অন্য কেউ এসে করে দিতে পারবে না। দুনিয়ার ইতিহাসে কোটি কোটি মানুষ একা একাই নিজের জীবনকে মেরামত করে ফেলেছে। তুমি মহাজাগতিক এলিয়েন না। তুমি মাটির মানুষ। তুমি পারবে। চাইলেই পারবে।

হাজার চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না- এটা স্রেফ একটা অজুহাত। কোনো অমোঘ, অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা না। এটা লুযারদের কথা। রিয়্যাক্টিভ আচরণ। তুমি তাকে ভুলতে চাচ্ছো না অথবা তাকে ভোলার জন্য যে কষ্টটুকু করতে হবে তা সহ্য করতে চাচ্ছো না- এটাই হলো বাস্তবতা।

তার সাথে যোগাযোগ না করলে কী হবে? -অনেক কষ্ট হবে। অনেক খারাপ লাগবে।
ওকে, তারপর কী হবে? -কী আর হবে, অনেক কষ্ট হবে।

তো এই কষ্টগুলো মেনে নিয়ে, ধৈর্য ধরে কিছুদিন পার করে দাও। সময়ের সাথে সাথেই সব ঠিক হয়ে যায়। খুব দ্রুতই কেটে যাবে এই মোহ যেটাকে তুমি ভালোবাসা মনে করছো। ব্রেকআপ করে ফেলার পর অপর পক্ষ (যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়) কয়েকটা স্টেইজের মধ্য দিয়ে যায়:

১) কেন ব্রেকআপ হলো পাগলের মতো এটার উত্তর খুঁজে বেড়ানো।
২) উত্তর পাবার পর সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা। ব্রেকআপ যে হয়েছে এটাই অস্বীকার করা।
৩) বুঝতে পারা যে আসলেই ব্রেকআপ হয়েছে। তাই গভীর কষ্ট, দুঃখ পাওয়া।
৪) প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা।
৫) প্রাক্তন ফিরে না আসায় তার প্রতি গভীর ক্রোধ জন্ম নেওয়া, প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করা।
৬) সব কিছু মেনে নেওয়া, স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা।[৩২৭]

১ থেকে ৬ এ যাওয়া, মানে ব্রেকআপের শুরু থেকে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে যাবার মধ্যে সময় লাগে গড়ে তিন মাসের মতো। অধিকাংশ ছ্যাঁকা খাওয়া মানুষের এর মধ্যেই ৬ নম্বর স্টেইজে চলে আসে। তিনটা মাস একটু কষ্ট করতে পারবে না?[৩২৮] এতোটাই দুর্বল মানুষ তুমি? তুমি তাকে ভুলতে পারছো না- ব্যাপারটা এমন না। তুমি আসলে তাকে ভুলতে চাচ্ছো না। এটা সম্পূর্ণ তোমার নিজের সিদ্ধান্ত।

'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না।'[৩২৯]

মানুষ ধরেই নেয়, জীবনের অন্য সব বিষয়ে সে ভুল করতে পারে কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে তার কোনো ভুল নেই। সে একটা ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিল বা ভুল কাজ করেছে, এটা মানতেই চায় না। মেনে নাও- তুমি ভুল করেছিলে।

তাকে ঘিরে তোমার যে রুটিন তৈরি হয়েছিল সেটা বদলে ফেলো। প্রোডাক্টিভ হও। ম্যাচিউর হও। এভাবে চিন্তা করো যে, সে তোমার জীবনে একজন মানুষ হিসেবে ছিল। প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে না, স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে না। জাস্ট একজন মানুষ হিসেবে ছিল। জীবনে অনেক মানুষ আসে। অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়, আবার তারা জীবন থেকে চলেও যায়। এমন একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে নাও তাকে। তুমি তাকে কিনে নাওনি, সে তোমার দাস নয়। সে চলে যেতেই পারে।

তাকে হয়তো ১০০% ভুলতে পারবে না। থমকে যাওয়া কোনো গ্রীষ্মের বিকেলে কিংবা গভীর হাওয়ার রাতে হঠাৎ মনে পড়তে পারে তার কথা- স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নাও। একসময় সে তোমার জীবনে ছিল, ছোট্টবেলার হারিয়ে যাওয়া সময়টার মতো এখন আর সেও নেই-এ কথাটা সহজভাবে নাও। সে এখন অতীত। তোমার ভুলগুলোর কথা ভাবো- তুমি কতো ছেলেমানুষ ছিলে, কতো পাগলামি করেছো। মানুষ তার পিতামাতা, এমনকি সন্তানের মৃত্যুর স্মৃতিও বুকে নিয়ে বেঁচে থাকে। আর তুমি প্রাক্তনের স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করতে পারবে না? এটা কোনো কথা? সে চলে গেছে মানে তোমার জীবন শেষ হয়ে যায়নি। জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়েছে মাত্র। জীবন এর পরেও সুন্দর, সম্ভাবনাময়। জীবনে পরতে পরতে রোমাঞ্চ ছড়িয়ে রেখে তোমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

কখনো ধৈর্যহারা হবে না, কখনো ভাববে না 'আমি পারবো না'। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাও, দেখবে আল্লাহ সাহায্য করবেন। দুনিয়া তো আমাদের জন্য কারাগার। এখানে পদে পদে পরীক্ষা থাকবে, কষ্ট থাকবে, না পাওয়ার বেদনা থাকবে। আল্লাহর জন্য, তাঁকে ভালোবেসে, তাঁর সন্তুষ্টির আশায় এগুলো মেনে নাও। আল্লাহর সন্তুষ্টি মানেই তো জান্নাত। সব না-পাওয়ার আবদার না হয় জান্নাতে গিয়েই করলে।

জাহান্নাম থেকে একেবারে শেষে যে মুসলিম ব্যক্তি বের হবেন, সাজাভোগ শেষে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর সময় আল্লাহ বলবেন, 'চাও।' সে চাইতে থাকবে। কিছু চাইতে ভুলে গেলে স্বয়ং আল্লাহ তাকে বিভিন্ন জিনিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন! আর বলবেন, 'এটা চাও, ওটা চাও।' এভাবে আল্লাহ তাকে স্মরণ করাতে থাকবেন, আর লোকটি চাইতে থাকবে। অবশেষে চাওয়ার আর কিছুই থাকবে না। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন,

'তোমার সব ইচ্ছা পূর্ণ করা হলো। তার সাথে আরো দশগুণ (তোমাকে দেওয়া হলো)। [৩৩০]
অপূর্ণতায়, নষ্ট কষ্টে কয়েকটা দিন না হয় যাক, জান্নাতের প্রথম পদক্ষেপই তো বৈশাখী ঝড়ো হাওয়ার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সকল দুঃখ, ভুলিয়ে দেবে সকল অপ্রাপ্তির বেদনা। তাই না?

টিকাঃ
[২৯৬] Surviving A Relationship Break-Up-Top 20 Strategies, Dr. Kim Maertz, Mental Health Centre, University of Alberta- tinyurl.com/cwctzh8b
[২৯৭] যাম্মুল হাওয়া ১/৬৫৩
[২৯৮] Slotter, E. B., & Ward, D. E. (2015). Finding the silver lining: The relative roles of redemptive narratives and cognitive reappraisal in individuals' emotional distress after the end of a romantic relationship. Journal of Social and Personal Relationships, 32(6), 737-756. https://doi.org/10.1177/0265407514546978
The First Thing You Should Do After a Breakup For Your Heart's Sake,popsugar. com, July 20, 2017-tinyurl.com/2veh26hr
Lewandowski Jr, Gary. (2009). Promoting positive emotions following relationship dissolution through writing. The Journal of Positive Psychology. 4. 21-31. 10.1080/17439760802068480.
[২৯৯] 54 Factors that May Increase Dopamine, Biljana Novkovic, PhD, selfhacked. com, August 24, 2022- tinyurl.com/yj9hjeuv
[৩০০] কী কী ব্যায়াম করবে, কিভাবে করবে, এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাবে ষোলো ম্যাগাজিনের এই লেখায়, ষোলো ফেইসবুক পোস্ট, মার্চ ২৫, ২০২২- tinyurl.com/sholobeyam
[৩০১] Seasonal Depressive Disorder, National Library of Medicine National Center for Biotechnology Information- tinyurl.com/mr24j3rc
[৩০২] 10 Best Ways to Increase Dopamine Levels Naturally, healthline.com- tinyurl.com/nbh96wp5
[৩০৩] Dopamine: The pathway to pleasure, Harvard Health Publishing Harvard Medical School, July 20, 2021- tinyurl.com/3zaj6whr
54 Factors that May Increase Dopamine, Biljana Novkovic, PhD,selfhacked. com, August 24, 2022- tinyurl.com/yj9hjeuv How to increase dopamine levels and feel like your best self,insider.com, Oct 23, 2020- tinyurl.com/yjhf9cut
দেহের ভেতরেই রয়েছে খুশী থাকার পন্থা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, জুন ১৪,২০২১- tinyurl.com/3ubxbr82
[৩০৪] ইসলামে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৫৫
[৩০৫] দেহের ভেতরেই রয়েছে খুশী থাকার পন্থা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, জুন ১৪,২০২১- tinyurl.com/3ubxbr82
[৩০৬] ছেলেদের জন্য ছেলে কাযিন, মেয়েদের জন্য মেয়ে কাযিন
[৩০৭] What Is the Ruling on Yoga?IslamQA- tinyurl.com/39e9rewh কোয়ান্টাম মেথড: মেডিটেশন: যোগ ব্যায়াম: ইসলাম কী বলে? শাঈখ মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী, জানুয়ারী ২২, ২০২২- tinyurl.com/2p85z82v কোয়ান্টাম মেথড: আমাদেরকে কোন পথে ডাকছে- ১, quraneralo.net, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০- tinyurl.com/2ecxpehm
[৩০৮] বইয়ের লিংক- tinyurl.com/mry9n44t
[৩০৯] ইসলামে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৫৭
[৩১০] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪৪
[৩১১] সূরা বাকারাহ ২:১৫৩
[৩১২] সূরা রাদ, ১৩:২৮
[৩১৩] ষোলো ফেইসবুক পোস্ট, মার্চ ২৮,২০২২- tinyurl.com/5cp89sun এখানে সহজ ১০ টি যিকিরের লিস্ট দেওয়া আছে।
[৩১৪] এগুলো তোমাকে নানা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে। সকাল সন্ধ্যার এই যিকিরগুলো ইনশা আল্লাহ তোমাকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে নিরাপত্তা প্রদান করবে।
[৩১৫] হিসনুল মুসলিম বই বা এপে এই যিকিরগুলো পেয়ে যাবে- tinyurl.com/hisnul
[৩১৬] How love blossoms between you and your child, babycenter.ca- tinyurl.com/ mrxyy8dc
[৩১৭] তাহাজ্জুদে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার জন্য একটা বই সাজেস্ট করছি, আমার খুবই প্রিয় একটা বই। শাইখ আহমাদ মুসা জিবরীল-এর 'কিয়ামুল লাইল'। ৩০ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই, কিন্তু তাহাজ্জুদের ব্যাপারে অনুপ্রেরণামূলক আলোচনায় একদম ঠাসা!
[৩১৮] সূরা মুযযাম্মিল, ৭৩:৬
[৩১৯] বুখারী: ১২৮৪
[৩২০] মুসলিম: ২৬৯৯ (ইফা. ৬৬০৮)
[৩২১] The Helper's High: The Neurobiology of Helping Others, tjajal.medium. com, Jun 17, 2018- tinyurl.com/mrx5yvuf
[৩২২] বাদ্যযন্ত্র সহ গান শোনা হারাম। গানের আরও ব্যাপক ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে। বিস্তারিত জানতে দেখতে পারেন এটি-tinyurl.com/zpbzr৭wh
[৩২৩] Tara C. Marshall.Facebook Surveillance of Former Romantic Partners: Associations with PostBreakup Recovery and Personal Growth.Cyberpsychology, Behavior, and Social Networking. Oct 2012.521-526.http://doi.org/10.1089/ cyber.2012.0125
[৩২৪] অ্যাপ- tinyurl.com/mry9n44t, পিডিএফ- tinyurl.com/3z8fpw65
[৩২৫] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-২৫৫, ২৫৭,২৫৮
[৩২৬] ইমেইল - lostmodesty@gmail.com ফেইসবুক-www.facebook.com/lostmodesty
[৩২৭] 7 Stages After A Break Up, Psych2Go, ইউটিউব ভিডিও, ডিসেম্বর ৫, ২০১৮- tinyurl.com/yeynt9n8
[৩২৮] কারও কারও ক্ষেত্রে আর একট বেশি সময় লাগতে পারে। এই ধরো গড়ে ৬ মাস। How Long Does It Take to Get over a Breakup? Experts Weigh In, blog.zencare.co- tinyurl.com/a6frxjt6
[৩২৯] সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৮৬
[৩৩০] বুখারী: ৮০৬, আযান অধ্যায়, ১/৭৬৯; ইসলামিক ফাউণ্ডেশন

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 মরিবার হলো তার সাধ...

📄 মরিবার হলো তার সাধ...


আমাদের ছোট ভাইবোনদের জেনারেশনকে কী এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে- কিছু হলেই অত্যন্ত ঠুনকো কারণে এরা আত্মঘাতী হয়ে পড়ছে। কিন্তু কেন অবেলায় অভিমানী মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে এতো? কেন এতো তুচ্ছ কারণেই নিভে যাচ্ছে সব শুকতারাদের দল? [৩৩১]

বলিউড, নাটক, সিরিয়াল, গান, সাহিত্য, কবিতা তথা প্রচলিত সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি উপাদান ছ্যাঁকা খাওয়া পরবর্তী আত্মঘাতী কাজগুলোকে খুব রোমান্টিক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। তারা পর্দায় দেখাচ্ছে- ব্রেকআপের পর প্রেমিক-প্রেমিকারা ছন্নছাড়া জীবন কাটায়, বাবা-মা ক্যারিয়ার সব ভুলে মদ-গাঁজায় ডুবে থাকে। হাত কেটে ফেলে। শত লাথি খেয়েও বারবার প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে ছুটে যায়, অপমানিত হয়, মারধরের শিকার হয়, তবুও লজ্জা হয় না। জীবন ধ্বংস করার এই চরম অবমাননাকর প্রক্রিয়াটাকে মিডিয়া অত্যন্ত মহান ভাবে উপস্থাপন করে। এভাবে নিজেকে তিলে তিলে কষ্ট দেওয়াটাই নাকি 'ট্রু লাভ'। এভাবে একদিন হয়তো তোমার ভালোবাসা তার ভুল বুঝতে পারবে। ফিরে আসবে তোমার বুকে!

রূপালি পর্দায় এভাবে প্রেমিক বা প্রেমিকা ফিরে আসলেও বাস্তব জীবনে তা হয় না। গল্প কিংবা সিনেমায় নায়ক একজন, নায়িকাও একজন। কিন্তু বাস্তবজীবনের নায়ক নায়িকা তো আর একজন দুইজন না, অসংখ্য। তোমার কাছেই ফিরে আসতে হবে, এছাড়া তার আর কোনো অপশান নেই-ব্যাপারটা এমন না। শুধু শুধু তুমি জীবন নষ্ট করে চলছো। এভাবে শোক ভোলা যায় না। আর যদি সে তোমার এই দেবদাস সুলভ আচরণের কারণে ফিরেও আসে তাহলেও সম্পর্ক আর আগের মতো থাকবে না। অন্তর্বর্তী শূন্যতায় সম্পর্কের সুতো কেটে যায়। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সে যা বলবে, যা যা শর্ত দেবে তা তোমাকে নিঃশর্তে মেনে নিতে হবে। তোমার সাথে তার সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার থাকবে না। বরং সেই সম্পর্ক হবে মনিব আর দাসের। অনেক কিছুর মাশুল গুনে তারপর হয়তো মুক্তি মিলবে সেই দাসত্ব থেকে। কে জানে, হয়তো সারাজীবনেও মুক্তি মিলবে না।

ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার পেছনেও অন্যতম প্রধান কালপ্রিট হলো আত্মহত্যাকে মিডিয়াতে রোমান্টিসিযমের মোড়কে উপস্থাপন। সেট ডিজাইন, লাইট আর ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউযিক, ডায়ালগ, গল্পের স্ক্রিন প্লে, Quit টাইপের সুইসাইড নোট-সবকিছু মিলিয়ে এমন আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করা হয় যা দর্শকদের মনে তীব্রভাবে গেঁথে যায় ঠিক এভাবে- আহা! আত্মহত্যা করা কতো নাটকীয়, কী ভয়ঙ্কর রোমান্টিক একটা বিষয়! কোনো এক চাঁদনী পসর রাতে বা ঘোর বর্ষণভরা শ্রাবণ সন্ধ্যায় আমি ঝুলে পড়বো সিলিংয়ে বা পাখির মতো ডানা মেলে লাফ দিবো বিশ তলা উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে... আমার টেবিলে বইয়ের নিচে কিংবা লাশের পাশে চাপা পড়ে থাকবে সুইসাইড নোট। আমার মৃত্যুর পর সে বুঝতে পারবে আমি তাকে কতো ভালোবাসি! আমার জন্য কাঁদবে সে, কিন্তু আমাকে আর পাবে না; আমাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে আসতে সে। সারাজীবন অপরাধবোধে দগ্ধ হতে থাকবে। আমাকে করা তার প্রতিটি অবহেলার প্রতিশোধ এভাবেই নেবো আমি। আমার বন্ধুরা আমার ফেইসবুক টাইমলাইনে, আমার প্রোফাইল পিকচার কিংবা পোস্টের কমেন্টে RIP লেখবে, 'লাশটা আজও তার খুনিকে ভালোবাসে'-টাইপ পোস্ট দেবে, আমার কবরের পাশে ফুল দেবে, আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে প্রকৃত একজন প্রেমিক হিসেবে- 'যে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসেনি। ভালোবাসার জন্য জীবন দিয়েছে'। আমার কবরের উপর সবুজ ঘাস জন্মাবে। ফাগুন হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপবে সাদা সাদা ঘাসফুল...

অনেকেই ভাবে আত্মহত্যা করা খুব গভীর অনুভূতি সম্পন্ন কোনো কাজ। মৃত্যুর এই পদ্ধতি হয়তো তাদের মৃত্যুকে অর্থবহ করবে। মানুষ তাকে নিয়ে ভাবতে, কথা বলতে... তার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তোমার এই আত্মহত্যার কানাকড়ি কোনো মূল্য নেই। তেতো সত্যিটা হলো তুমি এভাবে আত্মহত্যা করার ফলে পৃথিবীর কারো কিছুই যায় আসবে না। পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। তারপরও পৃথিবী চলে। আত্মহত্যা তোমাকে স্পেশাল বানাবে না। বাস্তব জীবনের কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউযিক নেই। নেই লাইট আর ক্যামেরার মুন্সিয়ানা, আলো-আঁধারির খেলা। কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে নেমে এসো।

এভাবে তুমি শুধু নিজেকে ধ্বংস করছো। তোমার বাবা-মাকে কষ্ট দিচ্ছো। হয়তো তোমার বন্ধুবান্ধব, পরিচিত মানুষেরা তোমার টাইমলাইনে মৃত্যুর পর RIP লেখবে, এক-দুই দিন, বড়জোর এক-দুই সপ্তাহ তোমার কথা মনে করবে। তারপর ভুলে যাবে। এমনভাবে ভুলে যাবে যেন পৃথিবীতে তোমার অস্তিত্বই ছিল না। হয়তো হুটহাট মনে পড়বে তোমার কথা। তবে তোমাকে তারা মনে করবে একটা কাপুরুষ, অবুঝ, বোকা, ভীতু হিসেবে। পরাজিত হয়ে বা ড্রামাবাজি করতে করতে যে জীবন থেকে পালিয়েছে। অন্যদের উপদেশ দেবে-ঐ ভীতুটার মতো কখনো ভুল কাজ করো না!

কোনো কিছুই থেমে থাকবে না তোমার জন্য। পৃথিবী আগের মতোই চলবে। আকাশের রং আগের মতোই নীল থাকবে, বাবলা বনে চৈতালী হাওয়ার নিস্তব্ধতা খান খান করে অবিশ্রান্ত আর্তনাদের মতো ডেকে যাবে নিঃসঙ্গ কোনো ঘুঘু। তারাভরা আকাশে বুনো হাঁস ডানা মেলবে। তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে বৃষ্টিবিলাস করবে, জ্যোৎস্না রাতে ফাগুন হাওয়ায় ফিসফিস করে আউড়ে যাবে ভালোবাসার চিরন্তন বাক্যগুলো। তোমার জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হওয়া, তোমার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে আজীবন দুঃখ বয়ে বেড়ানোর অবকাশ বা ইচ্ছে, কোনোটাই মিলবে না তার। কষ্ট পাবে শুধু তোমার বাবা-মা। এই পৃথিবীতে তোমার প্রকৃত আপনজন। আর কষ্ট পাবে তুমি। কবরে, বিচারের দিনে, জাহান্নামে। কেন? এতো কিছু কীসের জন্য?

ধরো, তুমি যেমন প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলে ঠিক তাই হলো। কিন্তু তুমি কি এসব দেখতে পাবে? প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে মিলন হবে? না, কিছুই হবে না। সে তার জীবনসঙ্গীকে নিয়ে জীবন কাটাবে। এদিকে উল্টো তুমি কবরের আযাব ভোগ করবে। কোনো মানে হয়?

'যে যেভাবে আত্মহত্যা করবে, তার শাস্তি অনন্তকাল সেভাবেই চলতে থাকবে। [১] বাসা থেকে বিয়ে না দেওয়ায় অনেক কাপল একসাথে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা করলে দুইজনের মিলন হবে না। বরং দু'জনকেই আত্মহত্যার গুনাহর কারণে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাহলে এভাবে মরে লাভ কী হলো? প্রকৃত আবেগ থেকেও অনেকে আত্মহত্যা করে। ভাবে, আত্মহত্যা করে ফেলি; তাহলে আমার সব কষ্ট একসাথে শেষ হয়ে যাবে। দেখো ভাইয়া, দেখো আপু, আত্মহত্যা করলে কোনো কষ্টই শেষ হয়ে যায় না। দুনিয়ার এই জীবনটা শেষ না। বরং এ জীবনটা খুব ছোট। মৃত্যুর পর মানুষের আসল জীবন শুরু হয়। আত্মহত্যা করলে তোমার কষ্ট তো কমবেই না বরং কবরে আরো ভয়ঙ্কর কষ্টের শুরু হবে। এই মেয়ে বা ছেলেকে হারালে তুমি আর জীবনে বিয়েই করতে পারবে না, পৃথিবীর এরাই একমাত্র ছেলে/মেয়ে এমনও তো না। তাহলে কেন এই বোকামি?

তবে আত্মহত্যা করার পেছনের মূল কারণ হলো দুইটি- ১। প্রেমকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সার্থকতা হিসেবে দেখা। ২। জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা সম্পর্কে বেখেয়াল হওয়া।

এ নিয়ে আগের লেখাগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে। সেগুলো আবার পড়ে নাও। ভালোমতো মনে ও মস্তিষ্কে গেঁথে নাও। আল্লাহ তোমাকে তাঁর ইবাদাতের জন্য পাঠিয়েছেন, পুরো মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার দায়িত্ব তিনি আমাদের দিয়েছেন। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য প্রেম করা না! যে মহান দায়িত্ব আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন সেটা ভুলে সামান্য প্রেমের জন্য এভাবে তুমি জীবন দিয়ে দিচ্ছো?

উপরে বলা দুটি বিষয়ের বাস্তবতা বুঝলে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করলে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করা সম্ভব না তোমার পক্ষে।

'তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।’[৩৩৩]

আল্লাহ কি ইবরাহীমের জন্য আগুনকে শীতল করে দেননি? তিনি কি ইসমাঈলকে ছুরির নিচে রক্ষা করেন নি? ইউনুসকে রক্ষা করেননি মাছের পেট থেকে? তিনি মূসার জন্য সমুদ্রের মাঝে রাস্তা বানাননি? ইউসুফকে জুলায়খার চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেননি? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেননি? আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। তাহলে কেন তিনি তোমার জীবনের সমস্যার সমাধান করে দেবেন না? তাঁকে একটু ডাকার মতো করে ডেকে তো দেখো! ভরসা করো তাঁর উপর। ফিরে আসো ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। ইনশাআল্লাহ, তিনি তোমার সকল দুঃখকষ্ট লাঘব করে দেবেন।

মুসলিমদের ঘরে জন্মগ্রহণ করে স্কুলের ইসলাম শিক্ষা বই পড়েই আমরা ভেবে বসি ইসলাম সম্পর্কে, আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে আমরা একেবারে সবজান্তা হয়ে গেছি। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো ইসলাম সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আমরা আল্লাহকে চিনি না, আমাদের নবী (ﷺ)-কে চিনি না। পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি না। আর চলি না বলেই আমরা অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি।

সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-দের উত্তপ্ত মরুর বুকে শুইয়ে কয়লার আগুনের তাপ দেওয়া হতো। কোমরের চর্বি, মাংস গলে কয়লার আগুন নিভে যেতো। চোখের সামনেই মা-বাবাকে অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলা হতো। ধন সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন সব কিছু ত্যাগ করে বেছে নিতে হতো নির্বাসনের জীবন, কারাগারের জীবন। [৩৩৪] মক্কার সুদর্শন, স্টাইলিশ যুবক মুসআব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে রাজকীয় লাইফস্টাইল ছেড়ে বরণ করে নিতে হয়েছিল রাস্তার ধূলিমলিন জীবন। কিন্তু তারপরও তাঁরা প্রকৃত সুখী জীবনযাপন করতেন। সবসময় হাসিমুখে থাকতেন। আত্মহত্যার কথা তো কল্পনাতেও ছিল না! কীভাবে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার পরেও তাঁরা হাসিমুখে থেকেছেন? বীরের মতো মাথা উঁচু করে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিপদের মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন? কারণ তাঁরা আল্লাহকে চিনতেন। তাঁরা ইসলামের শক্তিতে একেকজন হয়ে গিয়েছিলেন সত্যিকারের সুপারহিরো। আমরা আল্লাহকে চিনি না, তাঁকে মানি না বলেই আমাদের জীবনের এতো হতাশা, এতো দুঃখ-কষ্ট, মানসিকভাবে আমরা এতো দুর্বল।

কাজ (রিয়‍্যাক্টিভ)
নেশা করা, ঘুমের ওষুধ খাওয়া, হাত কাটা, কোনো কাজকর্ম না করে দুঃখ বিলাস করা, বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া, খাওয়া দাওয়া না করা।
না পাওয়ার দুঃখে, অভিমান, ঝগড়া করে আত্মহত্যা করা।

পরিণতি
তোমার সাবেক প্রেমিক/ প্রেমিকার উপর এগুলোর কোনো প্রভাব নেই। এসবে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সে দিব্যি তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে শুধু তোমার। তুমি তোমার স্বাস্থ্য, সময়, টাকাপয়সা এবং জীবন নষ্ট করছো। পরিবারা কে কষ্ট দিচ্ছো। নিষিদ্ধ কাজগুলো করার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাচ্ছো। প্রেমিক-প্রেমিকা ফিরে আসলেও তার দাসত্ব মেনে নিচ্ছো।
১। কবরের শাস্তি।
২। জাহান্নামের শাস্তি।
৩। বাবা-মা'র কষ্ট।
৪। নিজেকে ভীরু, বোকা, কাপুরুষ, লুযার প্রমাণ করা।
৫। আল্লাহর দেওয়া সুন্দর এই জীবনের অসংখ্য নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়া।

কাজ (প্রোঅ্যাক্টিভ)
১ নং কলামের কাজগুলোর বদলে তুমি ধৈর্য ধরলে। নেশার পেছনে টাকা না উড়িয়ে সেই টাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে। দু'আ করলে গুনাহ মাফের জন্য, চোখ শীতল করা জীবনসঙ্গীনীর জন্য। নিজের স্কিল বাড়ানোর চেষ্টা করলে।
বিচ্ছেদকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেওয়া, বিচ্ছেদের ধাক্কাকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।

পরিণতি
আল্লাহ তোমাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করবেন। তোমার জীবন করে দেবেন প্রশান্তিময়। তোমার স্কিল দিয়ে পরিবার, সমাজের, মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবে। সবশেষে আল্লাহ তোমাকে চিরসুখের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, ইনশাআল্লাহ।
১। গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বাঁচানো।
২। শাস্তি থেকে বাঁচা।
৩। প্রশান্তিময় বরকতময় জীবন।
৪। চোখ শীতলকারী জীবন সঙ্গী/ সঙ্গিনী।
৫। জান্নাত।

যদি মন কাঁদে লেখাতে একাকীত্ব অবসর কাটানোর যে টিপসগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো অনুসরণ করো। হাসপাতালে যাও সুযোগ পেলে। আমার পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের বন্ধু ছ্যাঁকা খেয়ে মারাত্মক আত্মঘাতী জীবনযাপন করছিল। হাসপাতালে এক পাক ঘুরে এসে, রোগীদের দুঃখ কষ্ট, বেঁচে থাকার আকুতি দেখে সে একদম সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত এসেছে।

তোমার মাথায় আত্মহত্যার কথা উঁকি দিয়েছে এটা বাবা-মা বা আপনজনদের জানিয়ে দাও। যদি সম্ভব হয় একজন মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। দড়ি, ছুরি, কাঁচি, ব্লেড, ঘুমের ওষুধ (যদি থাকে) হাতের নাগাল থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। যতটা পারা যায় একাকী থাকাকে এড়ানোর চেষ্টা করো। বিশেষ করে রাতে। রাত জাগবে না এবং রাতে একা ঘুমাবে না। আত্মহত্যার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে রাতে। সেই সঙ্গে ওযু করে ঘুমানোর দু'আ পড়ে ঘুমাও।

তবু যদি মাথায় আত্মহত্যার কথা ঘুরতেই থাকে....

১। যখনই এমন হবে সঙ্গে সঙ্গে 'আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই) পড়বে। শয়তান তোমাকে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে।
২। রুমে একা থাকলে রুম থেকে বের হয়ে যাবে। পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলবে। [৩৩৫] বাসায় কেউ না থাকলে রাস্তায় বের হয়ে যাবে। হাঁটাহাঁটি করবে। মসজিদে চলে যেতে পারো। মসজিদে গিয়ে দু'রাকাত নামায আদায় করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। সুযোগ থাকলে কোনো আলিমের কাছে চলে যাবে। পারলে রাস্তার কোনো অসহায় গরীব দুঃখী মানুষকে খাবার কিনে দেবে। ৫-১০ টাকা যা পারো দান করবে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।

***

একটু ধৈর্য ধরে থাকো। সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। যেই মানুষটা তোমার চিন্তাভাবনায় মিশে গিয়েছিল, যাকে ছাড়া ভেবেছিলে তুমি বাঁচবে না, তাকে ছাড়াই দিব্যি তুমি হেসেখেলে বেঁচে থাকবে। মাসের পর মাস চলে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতায় ধুলো জমবে, তার কথা তোমার ক্ষণিকের জন্যেও মনে হবে না। তার চেহারা মন থেকে মুছে যাবে, হয়তো ভুলে যাবে তার নামও। পাগলামির কথা ভেবে তখন তুমি আফসোস করবে, কী অবুঝ ছিলে তুমি, পাগলামির কী বিশাল ভাবসম্প্রসারণ করে যাচ্ছিলে...

প্রকৃত ভালোবাসা তো মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। বাবা আদম ও মা হাওয়ার ভালোবাসার মাধ্যমে বহতা মানবসভ্যতার সূচনা হয়েছে। আল্লাহ তাঁদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। যে ভালোবাসা জীবন ধ্বংস করে দেয়, ধ্বংস করে পরিবার ও সমাজকে সেই ভালোবাসা কেমন ভালোবাসা? ফিরে আসো এমন ধ্বংসাত্মক ভালোবাসা থেকে। আল্লাহ বিচ্ছেদের এই কষ্টের মাধ্যমে তোমাকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন। তোমাকে সুযোগ করে দিচ্ছেন পরম সফলতার পথে চলার। এই সুযোগ হেলায় নষ্ট করো না।

টিকাঃ
[৩৩১] এই লেখার বিস্তারিত ভার্সন পাবে এই লিংকে- Lost Modesty ফেইসবুক পোেস্ট, অক্টোবর ০২,২০২২- tinyurl.com/2p9yv6nh
[১] বুখারী: ৫৭৭৮, মুসলিম: ১০৯ (ইফা. ২০১)
[৩৩৩] সূরা আন-নিসা, ৪:২৯
[৩৩৪] তুমি চাইলে আমাদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারো। আমাদের লোকবল অত্যন্ত সীমিত। এরপরেও আমাদের চেষ্টা থাকবে মেন্টাল সাপোর্ট দেবার। অন্তত তোমার কথাগুলো আমরা শুনবো ইনশাআল্লাহ।
[৩৩৫] ফোন করার মতো কাউকেই না পেলে জাতীয় জরুরি সাহায্য নাম্বার- ৯৯৯ এ ফোন করবে।

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ

📄 তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ


এক.
মানুষ কি নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্তে প্রেমে পড়ে? অনেকেই একদম দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে বলে- আমি ঐ দিন, অমুক তারিখের, ঐ সময় ওর প্রেমে পড়েছিলাম। আকাশের রং কেমন ছিল, বাতাস হচ্ছিল কি না, সূর্য তার দায়িত্ব কতোটুকু পালন করছিল, এমন খুঁটিনাটিও মনে থাকে নাকি অনেকের। জিসান এসব ঠিক বিশ্বাস করতো না। এরকম দিনক্ষণ গুণে কেউ প্রেমে পড়ে নাকি! যতসব চাপাবাজি!

তারপর জিসান তার দেখা পেলো...

সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার প্রশ্ন দেবার ঠিক আগমুহূর্ত। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো জিসান। হঠাৎ চোখ পড়লো তার উপর। একটা কালো ব্যান্ড দিয়ে চুলগুলো পেছনে নিয়ে বাঁধছিল সে। সব ভুলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জিসান। মানুষের সিক্সথ সেন্স বলে কিছু আছে বোধহয়। কেউ কারো দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সে টের পায়। সেও টের পেলো। চোখাচোখি হলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন লাফাতে শুরু করলো জিসানের। পেটের ভেতরেও যেন হাজারটা প্রজাপতি একসাথে ডানা ঝাপটাচ্ছে। জিসানের চোখের ভাষা মেয়েটা বুঝে ফেললো নিমিষেই। ক্ষীণ একটা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটেই মিলিয়ে গেল তার দু'ঠোঁটে। সেই মুহূর্তে, সেই ১৭ আগস্ট, মঙ্গলবার সকাল ৯ টা ৫৭ মিনিটে ৫৮ সেকেন্ডে জিসান তার প্রেমে পড়ে গেল!

...শুরুটা হয় খুব সাধারণ, নির্দোষ এক বিষয় দিয়ে- 'এক পলক তাকানো'। সাধারণের চাইতে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকা হয়তো। তারপর? ভালোলাগা, ক্রাশ খাওয়া যাকে বলা হয়। এরপর? মেসেঞ্জারে টুংটাং, রাতজাগা, কথায় কথায় রাত ভোর হয়ে যাওয়া। প্রপোজ করা। ফাস্টফুড বা কফিশপে প্রথম দেখা, ফাগুনের অগোছালো ফুটপাতে পাশাপাশি হাঁটা, খুনসুটি, রিকশাবিলাস। তারপর ফ্যান্টাসি কিংডম, ওয়াটার কিংডমের পর্ব শেষ করে লিটনের ফ্ল্যাট কিংবা ট্যুর। শরীরের উত্তাপে ভালোবাসা পরিমাপ করা।

তারপর? প্রাইভেট ক্লিনিক। গর্ভপাত। ডাস্টবিনে নতুন কোনো নবজাতকের, কাক আর কুকুরে খুবলে খুবলে খাওয়া লাশ। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ, ভিডিও-ছবি ভাইরাল। মোহ, স্বপ্ন, কল্পনা, মৃত্যু।

অথবা ব্রেকআপ। সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়ে প্রাক্তনকে ভুলবার চেষ্টা। হতাশা, দলাপাকানো কান্না আর কষ্টের দীর্ঘ রাত। গাঁজা, নেশা, পর্ন, হস্তমৈথুন... লাইভে এসে আত্মহত্যার রোমান্টিসিযম। মোহ, স্বপ্ন, কল্পনা, মৃত্যু।

অথবা টেক্সটবুক লাভস্টোরির মতো জীবন পার করে দেওয়া, কিন্তু আল্লাহর আইনের অবাধ্য হয়ে জাহান্নামের জ্বালানি হওয়া...

অথচ শুরুটা ছিল সাধারণ এক বিষয় থেকে- এক পলক তাকানো। যুগে যুগে কতো আবিদ, আল্লাহওয়ালা লোকদের পদস্খলন হলো, কতো বুকে দাউ দাউ আগুন জ্বললো, কতো ঘর তছনছ হয়ে গেল, ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি বসালো, কতো রাজা সিংহাসন হারিয়ে ফেললো, ছারখার হয়ে গেল কতো নগর, বন্দর, শহর, গ্রাম, সভ্যতা!

রবিঠাকুর বুঝেছিল এই আপাত নিরীহ এক পলক তাকানো, চকিত চাহনির ভয়াবহতা। নিজে মানতে না পারলেও লিখে গিয়েছে বহু বছর আগে-
প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা সেদিন চৈত্রমাস
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।

চোখের অবাধ্য দৃষ্টি। আদম সন্তানের সাথে শয়তানের চিরন্তন যুদ্ধের মারাত্মক কার্যকরী এক অস্ত্র। বিষাক্ত অব্যর্থ তীর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'দৃষ্টি ইবলিসের তীরগুলো থেকে বিষ মেশানো একটি তীর।' [৩৩৬]

চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির ধ্বংসাত্মক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আমরা আলকেমি লেখাতে বহু আলোচনা করে এসেছি। তোমার রব তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। শয়তান যেন তোমাকে তার খেলার পুতুল না বানাতে পারে, তার জন্য কুরআনে আল্লাহ বেশ কিছু বিষয় তোমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। ঈমানদার মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করে... '[৩৩৭]

আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে মানুষের নিজের চেয়েও ভালোমতো চেনেন। তিনি জানেন মানুষ চোখের হিফাযত করতে, পর্দা করতে ভুলে যাবে। তাই তিনি বিষয়টি কুরআনে বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর শত নিষেধ সত্ত্বেও আমরা এ বিষয়টাকে একদমই পাত্তা দেই না। 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, একি মোর অপরাধ'- এই হলো অবাধ্য দৃষ্টির ব্যাপারে আমাদের মনোভাব। ফলাফল কী আমরা হাতেনাতে পাইনি? চারিদিকে আজ ভাঙনের সুর। পতনের আওয়াজ পাওয়া যায় অষ্টপ্রহর। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, 'যৌন কেলেঙ্কারির শুরু হয় দেখা থেকে, যেমন আগুনের শুরুটা একটিমাত্র স্ফুলিংগ থেকে। এজন্য লজ্জাস্থানের সংরক্ষণের জন্য দৃষ্টির সংরক্ষণ জরুরি।[৩০৮] তিনি আরো বলেন, 'দৃষ্টি অবনত রাখার মাধ্যমে মানুষ প্রেমের নেশা থেকে নিরাপদ থাকে।[৩৩৯]

ইবনুল জাওযী (রহ.) যেমন বলেছেন, '...প্রেম এক গাছের মতো, আর দৃষ্টি হলো সেই পানির মতো যা ঐ গাছের দিকে গড়িয়ে যায়। সুতরাং, গাছে পানি সেচ দেওয়া হলে গাছ প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে ওঠে। আর এ সমস্ত দুর্যোগের মূলে থাকে অবাধ দৃষ্টিপাত, যা শরীয়াহতে নিষিদ্ধ। এই অবাধ তথা অবৈধ দৃষ্টির কারণে কু-কামনা অন্তরে প্রবল হয়, বিপর্যয়ের বন্যা ব্যক্তিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং অনেকের রোগ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে তখন আর না কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাদের কানে বাজে, আর না কারো মারপিট গায়ে লাগে।' [৩৪০]

সেই রঙিন কৈশোর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কতবার তুমি মায়াবতীদের প্রেমে পড়েছো! আর কতবার তোমার হৃদয় ভেঙেছে! চিন্তা করে দেখো একবার, এর কিছুই হতো না যদি তুমি চোখের হিফাযত করতো। চোখের হিফাযত করতে পারলে তোমার জীবনের গল্পটাই অন্যরকম হতো!

প্রেমে পড়া, পরকীয়া, আত্মহত্যা, যিনা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, গর্ভপাত, খুনোখুনি, পর্ন, হস্তমৈথুন, আসক্তিসহ আমাদের অনেক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো, জীবন অনেক সুন্দর আনন্দময় হয়ে যেতো যদি আমরা চোখের হিফাযত করতে পারতাম। যদি সতর্ক হতাম অবাধ্য দৃষ্টির ব্যাপারে। যদি শয়তানের ফাঁদগুলো চিনতাম। যদি শয়তানের তীরগুলোর বিরুদ্ধে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশিত পথে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতাম। কিন্তু আমরা বড়ই উদাসীন!

দুই.

কী যেন নাম ছিল বালিকার... নামটাও ভুলে গেছো, অথচ একসময় এই বিস্মৃতপ্রায় বালিকাকে দূর থেকে ঠোঁট টিপে হাসতে দেখে কতোবার অঙ্কে ভুল করেছো, বালিকার ঈষৎ ভ্রুকুটিতে কতোবার নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ইলেক্ট্রন বিন্যাস ওলটপালট হয়ে গিয়েছে, ভুলিয়ে দিয়েছে থিওরি অফ রিলেটিভিটির প্রশ্নগুলোর চিন্তা- খেয়াল আছে?

জ্ঞানার্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো চোখের হিফাযত করা। চোখের হিফাযত করলে বিচক্ষণতা বাড়ে, বুদ্ধি দিন দিন ধারালো হয়। শাইখ সুজাউল কারমানী (রহ.) বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি তার বাহ্যিক অবস্থাকে সুন্নাহর পাবন্দ বানায়, অন্তরকে আল্লাহর চিন্তায় ও স্মরণে ব্যস্ত রাখে, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে দূরে থাকে, নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে নজর হিফাযত করে এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করে, সে ব্যক্তির উপলব্ধি এবং দূরদৃষ্টি কখনো ভুল হয় না।’[৩৪১]

পড়ার টেবিলে মন বসে না? মন অস্থির হয়ে থাকে? সময়ে বরকত পাও না? মনে হয় দিন ২৪ ঘণ্টা না হয়ে আরো কয়েক ঘণ্টা বেশি হলে ভালো হতো? কাজে শুধু ঘাপলা লাগে? চোখের হিফাযত করো। জীবন পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। তুমি কিছুদিন চেষ্টা করে দেখো, যদি উপকৃত না হও তাহলে বাদ দিও। শাইখ জুলফিকার আলী যেমনটা বলছেন,
‘চোখের গুনাহ’র অন্যতম খারাপ প্রভাব হলো, এর কারণে রিযিক ও সময়ের বরকত শেষ হয়ে যায়। ছোট ছোট কাজে বড় বড় সমস্যা ছুটে আসে। জীবনে অনেক কষ্ট ও চেষ্টার পরও সফলতার মুখ দেখা হয় না। আপাতদৃষ্টিতে কাজ সম্পন্ন মনে হলেও যথাসময়ে কাজ অসম্পন্ন দেখা যায়। অহেতুক চিন্তা ও পেরেশানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ মনে করে, কেউ কিছু একটা করেছে। অথচ সে নিজের অন্তরের গুনাহের কারণে বিপদের মধ্যে পড়ে থাকে। নিজেই স্বীকার করে যে, একটা সময় ছিল যখন সে মাটিতে হাত রাখলেও সোনা হয়ে যেতো। আর এখন সোনায় হাত রাখলেও মাটিতে পরিণত হয়। এসবই চোখের গুনাহের কারণে হয়।’[৩৪২]

কিন্তু...কিন্তু আল্লাহর দেওয়া সৌন্দর্য দেখবো না? আমার কতো ভালো লাগে দেখতে! দেখো, যেই আল্লাহ সৌন্দর্য দিয়েছেন, সেই আল্লাহই তো তোমাকে চোখের হিফাযত করতে বলেছেন। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার অজুহাত দেওয়ার সময় আল্লাহর কথা মনে পড়ে, কিন্তু আল্লাহর আদেশ মানার কথা মনে পড়ে না? এধরনের ফাজলামো অজুহাতে তুমি নিজেও কি আসলে কনভিন্সড? সত্যি করে বলো তো?

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন,
‘দৃষ্টি অবনতকরণ দ্বারা মানুষের অন্তর দুঃখ ও হতাশা থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা, যে ব্যক্তি নিজ দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণহীন রাখে, দুঃখ ব্যতীত আর কিছু অর্জিত হয় না। সে এমন কিছু দেখে যা সে অর্জন করতে পারে না আর না তা থেকে ধৈর্যধারণ করতে পারে।'[৩৪৩]

তিনি আরো বলেছেন, 'দৃষ্টির তীর নিক্ষেপ করলে নিক্ষেপকারীই প্রথমে বিদ্ধ হয়। দৃষ্টিনিক্ষেপকারী ভাবে আরেকবার দেখলে তার অন্তরে যে ক্ষত হয়েছে তা নিরাময় হবে। অথচ আরেকটি দৃষ্টি ক্ষতকে আরো গভীর করে।'[৩৪৪]

নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখো- ক্যাম্পাসে, রাস্তাঘাটে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দু'চোখে গোগ্রাসে মেয়ে গিলে তোমার বুক অস্থিরতার আগুনে পুড়ে যায় না? দু'চোখ দিয়ে স্ক্যান করা জাস্টফ্রেন্ডের শরীর মনে করে তুমি গভীর রাতে বাথরুমে নিজেকে ঠাণ্ডা করো না? পাগল হয়ে যাও না শরীরের নেশায়? কিন্তু চোখের হিফাযত করতে পারলে জীবনের, ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে মুসলমান প্রথমবার কোনো মহিলার সৌন্দর্য দেখে চোখ নামিয়ে নেয়, আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তার জন্য ইবাদাতে স্বাদ ও মিষ্টতা সৃষ্টি করে দেন।'[৩৪৫] 'কুদৃষ্টি শয়তানের বিষমিশ্রিত তীর সমূহের একটি। যে ব্যক্তি আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলার ভয়ে তাকে ছেড়ে দেবে, আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা তার অন্তরে ঈমানের স্বাদ সৃষ্টি করে দেবেন।'[৩৪৬] এই ঈমানের স্বাদ যে কতো মিষ্টি হতে পারে তা নিজে অনুভব না করলে কল্পনাও করতে পারবে না!

চোখের হিফাযত করতে না পারলে দাম্পত্য জীবনেও মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। দুনিয়ার তাবৎ মেয়েদের সৌন্দর্য যেহেতু তুমি আকণ্ঠ পানে মগ্ন থাকো- তাই বউকে দেখা মাত্রই সুন্দরী অপ্সরীদের সাথে তুমি তার তুলনা শুরু করবে। আরে ঐ মেয়েটার চুল কত সিল্কি ছিল, আমার বউয়ের চুল ভালো না। ঐ মেয়ের ফিগারটা সেই ছিল, আমার বউয়ের ফিগার ভালো না... এরকম শত কথা মনে হবে। ভালোবাসা বিলীন হয়ে যাবে। অথচ যদি চোখের হিফাযত করতে তাহলে বউকে মনে হতো বিশ্বসুন্দরী। নিজের সব কামনাবাসনা, ভালোবাসা সবকিছু বউয়ের জন্য হিফাযত করে বাসায় ফিরতে। এরপর তুমুল প্রেমের বন্যা বইয়ে যেতো। জীবন হতো সুন্দর।[৩৪৭]

চোখের হিফাযত করতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। নিজের চোখ এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, তুমি বুঝবে তুমি আর প্রবৃত্তির অনুগত দাস না। গভীর আত্মবিশ্বাস তখন জন্ম নেবে তোমার মনে। তোমার জীবনকে তুমি নিজে নিয়ন্ত্রণ করবে। নফস আর সস্তা প্রেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। চোখের হিফাযত তোমাকে উপহার দেবে ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব। পাঁচ-দশটা গার্লফ্রেন্ড চালায় এমন ছেলে আসল পুরুষ নয়, আসল পুরুষ তো তারাই যারা রূপবতীদের রূপের আকর্ষণ উপেক্ষা করে চোখের হিফাযত করে। মেয়েদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা মানে নিজেকেই অপমান করা- এটা কেন আমরা বুঝি না? যে মেয়েটার দিকে তুমি লোলুপ চোখে তাকিয়ে আছো, তার কাছে তুমি কতটুকু ছোট হয়ে গেছো, সেটা একবার ভেবে দেখো তো! মেয়েটা ধরেই নেবে যে তুমি একটা ক্যাবলাকান্ত, তোমাকে চাইলেই ইচ্ছেমতো ঘুরানো যায়।

তিন.

আশা করি বুঝতে পেরেছো প্রেমের ফাঁদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য চোখের হিফাযত করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু চোখের হিফাযত কীভাবে করবো? অশ্লীলতার বিষাক্ত বাতাসে এই সমাজ বিষিয়ে গিয়েছে। বিদ্যমান বিশ্ব কাঠামোকে পরিবর্তন করা না গেলে ১০০ ভাগ চোখের হিফাযত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে তার মানে এই না যে, ১০০% সম্ভব না তাই আমরা সেই চেষ্টাই ছেড়ে দেবো। আর কোনো খাবার না থাকলে, জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনে শূকরও খাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তার মানে কি তুমি প্রতিদিন মজা করে চার প্লেট করে শূকরের মাংসের বিরিয়ানি আর কয়েক হালি হ্যামবার্গার খাবে? নিশ্চয় না। তো চলো দেখা যাক, এই বিরুদ্ধ পরিবেশে কীভাবে চোখের হিফাযত করা যায়-

১। রোলমডেল ঠিক করো। যেসব মানুষ চোখের হিফাযতের মহাকাব্য রচনা করেছেন তাদের কথা বেশি বেশি জানো। অনুপ্রেরণা পাবে। রোলমডেলদের মধ্যে প্রথমেই আসবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং নবীগণ। বিশেষ করে মূসা এবং ইউসুফ আলাইহিমাস সালাম এর ব্যাপারে এরই মধ্যে আমরা আলোচনা করেছি। অনুসরণীয়দের লিস্টে তারপর আসবে সাহাবীগণের নাম। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। তারপর আসবেন নেককার পূর্বসুরী বা আস-সালাফুস সালিহীন।

যেমন ধরো, হাসান বিন আবী সিনান ছিলেন হাসান আল-বাসরী'র ছাত্রদের একজন। তিনি চোখের হিফাযতের ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন। একবার ঈদের সালাত শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। কেউ একজন তাকে বললো, 'আজ ঈদের নামাজে অনেক মহিলা শরীক হয়েছিল।' প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'ফিরে আসা পর্যন্ত আমার সঙ্গে কোনো মহিলার দেখা হয়নি।'
ঈদের দিন তাঁর স্ত্রী কথায় কথায় তাঁকে বলেছিলেন, 'আজ তো অনেক সুন্দরীদের দেখলে!' তিনি উত্তর দিলেন, 'ঘর থেকে বের হয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কোনো মহিলা আমার চোখে পড়েনি।'[৩৪৮]

তো এরকম ঘটনা অনেক রয়েছে। শুধু অতীতে না, বর্তমান যুগেও আছে।[৩৪৯] এসব ঘটনা বেশি বেশি সামনে রাখার চেষ্টা করো।[৩৫০] নিজের ওপর চ্যালেঞ্জ নাও- তারা যদি পারে তো আমি কেন পারবো না?

২। ৩-৫-৭ দিনের একটা ছোট এক্সপেরিমেন্ট করো। সম্পূর্ণভাবে চোখের হিফাযত করো। এই সময়কার অনুভূতিগুলো বিস্তারিত লিখে রাখো। তুমি কতোটা শান্তি পাচ্ছো, তোমার অন্তর কতোটা স্থির হয়ে আছে ...ইত্যাদি। এরপর মাঝে মাঝেই এই ডায়েরি খুলে এই সময়কার অনুভূতিগুলো পড়বে। চোখের হিফাযত করার অনুপ্রেরণা পাবে।

৩। বিয়ে ও রোযা চোখের হিফাযতের জন্য কার্যকরী ওষুধ। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই টিপস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্য রাখে তাদের উচিত বিয়ে করে ফেলা। কেননা বিয়ে দৃষ্টি অবনতকারী ও লজ্জাস্থানকে হিফাযতকারী। আর যার সামর্থ্য নেই তার উচিত রোযা রাখা। কেননা রোযা যৌন উত্তেজনা প্রশমনকারী।[৩৫১]

তবে বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভুগবে না। এখন বিয়ে করতে পারছি না, তার মানে চোখের হিফাযতও করতে পারবো না- এটা ভুল ধারণা। বিয়ে করার জন্য যোগ্যতা অর্জন করো, রোযা রাখো। সামনে বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইন শা আল্লাহ।

৪। কো এডুকেশন এড়িয়ে চলা। সর্বোচ্চ চেষ্টা করো নারী পুরুষের ফ্রি-মিক্সিং হয় এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলতে।

৫। সোশ্যাল সাইটের ব্যাপারে সাবধান থাকো। বিপরীত লিঙ্গের কেউই যেন তোমার সাথে এড না থাকে। তোমার নিউযফিডে যেন এমন কিছু না আসে।

৬। যেসব জায়গায় চোখের হিফাযত করতে পারবে বলে মনে হয় না, সেসব জায়গা এড়িয়ে চলো। [৩৫২]

৭। আল্লাহর পথে ফিরে এসো। প্রেম থেকে নিজেকে রক্ষা করা, চোখের হিফাযত করার পূর্বশর্ত হলো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) যেমনটা বলেছেন,
'হৃদয় যদি একমাত্র আল্লাহকে ভালোবাসে, দ্বীনকে একমাত্র তার জন্য একনিষ্ঠ করে, তাহলে অন্য কারো ভালোবাসার মুসিবত তাকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রেমের উন্মাদনা তো পরের কথা। প্রেম ভালোবাসায় লিপ্ত হওয়ার কারণ হৃদয়ে আল্লাহর মহব্বতের অপূর্ণতা। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যিনি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে মহব্বত করতেন, তিনি এই মানবীয় ইশক মহব্বত থেকে বেঁচে গেছেন। [৩৫৩]

৮। নিজের সাথে যুদ্ধ করো। হঠাৎ, অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো উপর চোখ পড়ে যেতেই পারে। এতে কোনো পাপ নেই। তবে প্রথমবার চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
'হে আলী! একবার দৃষ্টিপাত হয়ে গেলে, দ্বিতীয়বার আর দৃষ্টি দিও না। কারণ প্রথমবার দৃষ্টি মাফ হয়ে যায়, কিন্তু দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দিলে গুনাহ হয়'। [৩৫৪]

আসলে কারো উপর চোখ পড়লো, দেখে ভালো লাগলো, দেখতে থাকতেই ইচ্ছা করলো বা চোখ নামিয়ে নেবার পর আবার দেখতে ইচ্ছা করলো- এই মুহূর্তটাতেই তোমার আসল লড়াই শুরু হয়। এ সময়টাতেই মনের সকল জোর এক করে শয়তানকে আর নফসকে হারাতে হবে। নিজের সাথে নিজেকেই যুদ্ধ করতে হবে।

আমি চাইলে আবার তাকাতে পারি সেই রূপসীর দিকে। কিন্তু কেন তাকাবো? তাকে দেখে কি আমার তৃপ্তি মেটবে নাকি অন্তরে অতৃপ্ত তৃষ্ণা জাগবে? আমি কি প্রেম, যিনা-ব্যভিচারের ফাঁদে পড়তে চাই? জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে চাই? চোখের হিফাযত করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।[৩৫৫] আমি কি জান্নাত চাই না? আল্লাহকে দেখতে চাই না? জান্নাতের অনিন্দ্যসুন্দর স্ত্রীদের সাথে প্রেম করতে চাই না? আমি কেন ক্ষণিকের সুখের জন্য এতোকিছু হারাবো? কেন রক্ত, ময়লা, ঘাম মেশানো পৃথিবীর অপূর্ণ মানবীকে আরেকবার দেখার জন্য জান্নাত হারানোর ঝুঁকি নেবো?

আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, 'যে নিজের কামনা-বাসনার অনুসরণ করে তার উদাহরণ তো কুকুরের মতো।'[৩৫৬] আমি কি তাহলে কুকুর? আমি কি একটা পশু?

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কামনা- বাসনা আমার আনীত বিধানের অধীন হবে। [৩৫৭] আমি কি মুমিন হতে চাই না?

নিজের মা, বোনের কথা চিন্তা করো। অন্য কোনো পুরুষ যদি তাদের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতো, শরীর স্ক্যান করতো- তাহলে তোমার কেমন লাগতো? সেই রূপসীও তো কারো না কারো বোন, মা!

এভাবে নিজের সাথে লড়াই করতে থাকো। ইনশাআল্লাহ তোমার আর দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছা করবে না। পাশাপাশি সেই মেয়ের জন্য দু'আ করতে পারো- আল্লাহ, তাকে তুমি পরিপূর্ণ পর্দা করার তাওফিক দাও। আল্লাহ এর বিনিময়ে তোমাকেও চোখের হিফাযত করার তাওফিক দেবেন ইনশাআল্লাহ।

৯। মেয়েদের পেছনে কখনো হাঁটবে না। মেয়েদের হিপ মারাত্মক ফিতনাহ তৈরি করে। [৩৫৮] দ্রুত হেঁটে মেয়েদের সামনে চলে যাবে বা রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে যাবে।

১০। রাস্তায় বসে আড্ডা দেবার সময় সতর্ক থাকবে। রাস্তায় বসে আড্ডা দিলে আসলে চোখের হিফাযত করা মুশকিল হয়ে যায়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, 'তোমরা রাস্তার পাশে বসে থেকো না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমাদের তো এর প্রয়োজন হয়। পরস্পরে প্রয়োজনীয় কথা বলতে হয়। রাসূল (ﷺ) বললেন, বসতেই যদি হয় তবে রাস্তার হক আদায় করে বসো। সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কী?
রাসূল (ﷺ) বললেন, রাস্তার হক হলো- দৃষ্টিকে অবনত রাখা। কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখা। [৩৫৯]

১১। নিজেকে শাস্তি দাও। এটা চোখের হিফাযতের খুবই কার্যকরী একটা পদ্ধতি। অনেক উলামা নিজের জন্য এমন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। নিজের জন্য অস্বস্তিকর শাস্তির ব্যবস্থা করবে। যেমন ধরো, তোমার টাকাপয়সার সমস্যা। তুমি ঠিক করবে, চোখের হিফাযত করতে না পারলে আমি দিনে ৫০-১০০-৫০০ টাকা মাসজিদে দান করবো। তোমার যদি সালাত আদায় করতে আলসেমি লাগে, তাহলে ঠিক করবে, চোখের হিফাযত করতে না পারলে আমি প্রতিদিন ৪, ৬, ১০ রাকাত নফল সালাত আদায় করবো। আইডিয়াটা ধরতে পেরেছো নিশ্চয়? এতে নিজের উপর যেমন প্রেশার থাকবে, তেমনি আরো সওয়াবের কাজ করে ফেললে শয়তান বাবাজি হতাশ হয়ে তোমার থেকে দূরে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

***

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, দৃষ্টি শয়তানের তীর। এই দৃষ্টি থেকেই শুরু কতো অসংখ্য আঁধারের পথচলা। এসো, মহান আল্লাহর নির্দেশ মেনে দৃষ্টি অবনত রাখি, নিজেদের সুন্নাহর বর্মে ঢেকে ব্যর্থ করে দিই শয়তানের এই তীর।

টিকাঃ
[৩৩৬] মুসতাদারাকে হাকিম: ৭৮৭৫
[৩৩৭] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩০-৩১
[৩০৮] আল-জাওয়াবুল কাফি, ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ, পৃষ্ঠা-২০৪
[৩৩৯] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৯
[৩৪০] যাম্মুল হাওয়া ১/১২৭
[৩৪১] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৮
[৩৪২] যৌবনের মৌবনে, মাওলানা জুলফিকার আহমেদ নকশবন্দি, মাহফিল প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৫৫
[৩৪৩] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৪৬
[৩৪৪] আল জাওয়াবুল কাফি, ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ, পৃষ্ঠা- ৪১৭
[৩৪৫] মুসনাদ আহমাদ: ৮৭২২২, আল-মু'জামুল কাবীর লিত-ত্বাবারানী: ৭৮৪২, শু'আবুল ঈমান লিল-বাইহাকী: ৫০৪৮। ইবনু আদী হাদিসটিকে দুর্বল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আলবানী বলেছেন অত্যন্ত দুর্বল। (আল-কামেল ৬/২৬০, হিজাবুল মারআহ পৃ. ৪৯)
[৩৪৬] মুসতাদরাক আল-হাকিম হুযাইফা রা. হতে: ৭৮৭৫, আল-মু'জামুল কাবীর লিত-ত্বাবারানী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. হতে: ১০৩৬২। হুযাইফা রা. হতে বর্ণনাকে ইমাম যাহাবী ও সাফারীনী হাম্বলী দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের বর্ণনাকে হাইসামী ও মুনযিরী দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। (মীযানুল ই'তিদাল ১/১৯৪, শারহু কিতাবিশ শিহাব: ৪৩৪, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/৬৬, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ৩/৮৬।)
[৩৪৭] অবশ্যই পড়ে ফেলো- হুজুরদের প্রেম যে কারণে এতো তীব্র হয়, lostmodesty.com, আগস্ট ৩০, ২০১৮ – tinyurl.com/5rtny24n
[৩৪৮] চোখের আপদ ও তার প্রতিকার, মাওলানা ইরশাদুল হক আছরী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা-৬১
[৩৪৯] আমাদেরই পরিচিত এমন একজন ভাই ছিলেন।
[৩৫০] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা বইটা পড়ে ফেলো।
[৩৫১] বুখারী: ৫০৬৬ ও মুসলিম : ১৪০০ (ইফা. ৩২৭০)
[৩৫২] এই লিস্টের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর পয়েন্টের আরো বিস্তারিত আলোচনা পাবে পুড়ে যাবে তুমি লেখায়।
[৩৫৩] মাজমু'উল ফাতাওয়া: ১০/১৩৫
[৩৫৪] মুসনাদ আহমাদ ২২৯৯১, তিরমিযী ২৭৭৭, আবু দাউদ ২১৪৯, মিশকাত: ০১১৩, সহীহ আল-জামে': ৭৯৫৩। আলবানী ও শুআইব আরনাউত্ব হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[৩৫৫] আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ৮০১৮। ইবনু হাজার ও আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। (আল-আশারাতুল উশারিয়‍্যাহ হা: ১০, সহীহ আল-জামে': ১২২৫)
[৩৫৬] সূরা আল-আ'রাফ, ৭:১৭৬
[৩৫৭] কিতাবুস সুন্নাহ লি- ইবনি আবী আসিম: ১৫। ইমাম নাবাবী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। ইবনু হাজার বলেছেন, এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। (আল-আরবাঈন: ৪১, ফাতহুল বারী ১৩/২৮৯ হা: ৭৩০৮ এর ব্যাখ্যায়)
[৩৫৮] Waists, Hips and the Sexy Hourglass Shape, Robert D. Martin Ph.D., psychologytoday.com, July 20, 2015-tinyurl.com/yh5t432n Dixson BJ, Grimshaw GM, Linklater WL, Dixson AF. Eye-tracking of men's preferences for waist-to-hip ratio and breast size of women. Arch Sex Behav. 2011 Feb;40(1):43-50. doi: 10.1007/s10508-009-9523-5. Epub 2009 Aug 18. PMID: 19688590.
[৩৫৯] বুখারী: ৬২২৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px