📄 হারিয়ে পাওয়া
হয়তো তোমার একটা রাজপুত্র ছিল, অদ্ভূত আইনে প্রেম করতে তোমরা- রমাদানে হাত ধরা যাবে না, এক রিকশায় বসা যাবে না, এরকম আরো অদ্ভূত অনেক কিছু। নিউমার্কেটের বহু অলিগলি ঘুরে খুঁজে এনেছিল পায়েল, সযত্নে পরিয়ে দিয়েছিল তোমার পায়ে, রোজ রাতে নিটোল প্রেমের গান শোনাতো সে... তোমাকে আর ব্যালকনির ওপাশের রাত জাগা ক্লান্ত তারাটাকে। এখনও সে গান শোনায়। তবে সেটা তুমি না। ইনবক্সে চাহিদামাফিক ছবি দিতে পারোনি। এটাই ছিল তোমার অপরাধ।
অথবা তোমার কেউই ছিল না, বুকে ছিল শুধু হাহাকার, চরাচর ডুবে যাওয়া সিক্ত বিষণ্ণতা, অন্ধকারে নির্বাসিত। অথবা হয়তো কাউকে ভালো লেগেছিল তোমার, নির্নিমেষ দৃষ্টি ফেলে একদিন দেখেছিলে কৈশোর পেরোনো অশ্বত্থ গাছটার নিচে রিকশাতে উঠছে সে। কী জানি বলবে বলে এক দৌড়ে রাস্তা পেরুলে, ভীরু সমর্পিত চোখে রিকশা থামিয়ে নেমে গিয়েছিল সে-ও। কিন্তু কোনো এক অন্তর্নিহিত বাধায় বলতে পারোনি কিছু। নিষ্প্রাণ চোখে অসংখ্য ব্যথা আর প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে কিছুক্ষণ। অন্তহীন নৈরাশ্য বুকে ফিরে এসেছিলে তুমি।
অথবা হয়তো হঠাৎ করেই একজনের সাথে দেখা হয়ে গেল তোমার। বছর দশেক পরে। দেখা না হলেই মনে হয় ভালো হতো। শরীরের সমস্ত অণু-পরমাণু দিয়ে ভালোবেসেছিলে তাকে। আন্ত:পারমাণবিক ব্যবধান ভুলে রেখেছিলে হৃদয়ের একেবারে কাছে। একদিন সেই তোমার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে... লঞ্চের বদ্ধ কেবিনে বরিশাল যাওনি বলে।
হঠাৎ দেখা হওয়ায় বিস্মৃতির পথ ধরা স্মৃতিরা প্রত্যাবর্তন করছে। একে একে এসে ঝাপটা মারছে। ছাইচাপা আগুন ধিকিধিকি করে মাথাচাড়া দিচ্ছে আবার। আঁধারের মতো কষ্ট নামছে বুকে। হয়তো রাত জাগা তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে আরো কিছু রাত...
দুই.
সুশীল প্রগতিশীলদের ক্রমাগত প্রোপ্যাগান্ডার ফলে প্রেম করতে না পারলে, প্রেমে ছ্যাঁকা খেলে বা লিটনের ফ্ল্যাটে না যেতে পারলে তোমরা নিজেদের মনে করো জীবনে পরাজিত এক সৈনিক। ঘোর বর্ষা নামা চোখে, তামাক পাতার ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়ে ভাবো- আমার বন্ধুরা কতই না এনজয় করছে, আর আমি জীবনে কিছুই করতে পারলাম না। আমার জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে গেল!
বিয়ে বহির্ভূত এই রিলেশনগুলো যে হারাম, এগুলো করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন- এমন কিছু বলে সান্ত্বনা দিতে গেলে তোমরা মুখে হয়তো কিছু বলো না, কিন্তু মনের ভেতর ঠিকই একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করো- ধুর, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, সবই খালি হারাম! ইসলাম মানতে গেলে জীবনটা একেবারে তেজপাতা হয়ে যাবে। আনন্দ, মজা করার কোনো সুযোগই নেই।
আল্লাহ বলেছেন এই হারাম রিলেশন, এই যিনা-ব্যভিচার এসবের মধ্যে সুখ নেই।[২৪৭] অন্যদিকে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, মিডিয়াসাহা-রা বলছে- না! জীবনের চরম মজা লুকিয়ে আছে এর মধ্যেই!
তুমি কার কথা বিশ্বাস করবে? আল্লাহকে নাকি সুশীল প্রগতিশীলদের? আল্লাহকে নাকি বিনোদন যন্ত্র আর মিডিয়াসাহা-কে?
আমাদের সবচেয়ে ভালোবাসেন কে? -আল্লাহ
এখন বলো, আল্লাহ কি আমাদের খারাপ চান? আমাদের জীবন থেকে সকল আনন্দ কেড়ে নিতে চান? আল্লাহ কি আমাদের কষ্ট দিতে চান? আমাদের জীবনকে দুঃখের মহাসাগর বানাতে চান? প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে ভালোমতো ভাবো।
আল্লাহ বিয়ে বহির্ভূত প্রেমকে যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন তার মানে অবশ্যই এটার মধ্যে প্রকৃত সুখ বা শান্তি নেই। লিটনের ফ্ল্যাটে দশ-বারোটা মেয়ের কাপড় খুলতে পারার মধ্যে ক্ষণিকের মজা থাকলেও শান্তি নেই।[২৪৮] যারা এটা করতে পারে না তাদের নিজেকে লুযার মনে করার কিছু নেই বরং এর উল্টোটা সত্যি। যারা এই তথাকথিত প্রেম ভালোবাসা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে তারাই আসল পুরুষ। তারাই পরিপূর্ণ, আলোকিত, সাহসী নারী। যুগে যুগে কালে কালে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে সাহসী, সবচেয়ে ড্যাশিং স্মার্ট মানুষদের দলে তারা। তারাই এমন মানুষ, এপারের জীবনে যাদের নানান জাতের, নানার রঙের আদি ও আসল সুখ আর শান্তি অনুগত ভৃত্যের মতো অনুসরণ করে সবসময়, ঠিক তেমনি ওপারের অসীম জীবনটাতে এমন কিছু পুরষ্কার অপেক্ষা করে থাকে যা মানব মস্তিষ্কের কল্পনারও বাইরে!
তিন.
এলাকায় এলাকায় ঘোষণা দেওয়া হলো। 'খুনী মূসা' যেন পালাতে না পারে। যে করেই হোক ওকে গ্রেফতার করতে হবে- এমন কড়া নির্দেশ জারি করলো ফিরআউন। নগরের একপ্রান্ত থেকে ছুটে এলেন মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি সহানুভূতিশীল এক ব্যক্তি। ত্রস্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন- পালাও মূসা! তোমাকে খুন করার জন্য তন্ন তন্ন করে খুঁজছে ফিরআউনের লোকেরা!
মূসা আলাইহিস সালাম তৎক্ষণাৎ স্থান ত্যাগ করলেন। পাড়ি দিলেন এক দীর্ঘ বিরান পথ। পৌঁছালেন মাদায়েনে। ক্ষতবিক্ষত পায়ে বিশ্রাম নেবার জন্য বসলেন এক গাছের ছায়ায়। পেছনে গ্রেফতারি পরোয়ানা, সামনে ফেরারি অনিশ্চিত জীবন, অপরিচিত পরিবেশ... নিঃস্ব, রিক্ত।
গাছের অদূরেই ছিল এক কুয়া। রাখালেরা পশুদের পানি পান করাচ্ছে সেখানে। পশু আর রাখালের ভিড়, হাঁকডাকে জায়গাটা সরগরম হয়ে আছে। কে কার আগে পশুকে পানি খাওয়াতে পারে চলছে তার প্রতিযোগিতা। ভিড় থেকে একটু দূরে দুজন তরুণী তাঁদের পশু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ ধরে। পুরুষদের এই হট্টগোলের মাঝে তাঁদের পশুকে পানি খাওয়ানোর সুযোগ মিলছিল না। রাখালদের কারো কোনো খেয়াল নেই তাঁদের প্রতি।
ক্লান্ত মূসা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, আপনাদের ব্যাপারটা কী'?
তাঁরা উত্তর দিলেন- রাখালরা চলে গেলে তারপর আমরা আমাদের পশুদের পানি পান করাবো। আমাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ।
মূসার মনে দয়া হলো। সেই সাথে কিছুটা বিরক্তও হলেন রাখালদের উপর। এরা কেমন পুরুষ! নারীদের সম্মান করতে জানে না। শক্তিশালী মূসা রাখালদের ভিড় ঠেলে পশুকে পানি পান করালেন। তারপর কোনো কথা না বলে, কোনো বিনিময় না চেয়ে সোজা ফিরে গেলেন আগের জায়গায়, গাছের ছায়ায়। ফিরেও তাকালেন না আর তাঁদের প্রতি। নিঃসঙ্গ এক আগন্তুক তিনি। বাড়ি থেকে বহুদূরে, ফিরআউনের প্রাসাদে প্রাচুর্যের মাঝে বড় হয়েছেন। আজ হঠাৎ করেই তিনি নেমে এসেছেন অতি সাধারণের কাতারে। ঠিক এই সময়টাতে মূসা আলাইহিস সালাম করলেন তাঁর সেই বিখ্যাত দু'আটি -
'হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার উপর যেকোনো কল্যাণই অবতীর্ণ করবেন, আমি তার অত্যন্ত মুখাপেক্ষী। [২৪৯]
খানিক বাদেই দিগন্তে দেখা গেলো সেই দুই তরুণীর একজনকে। লাজ-নম্র কুণ্ঠিত পায়ে এগিয়ে আসছিলেন তিনি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাও পছন্দ করলেন তাঁর এভাবে হেঁটে আসা। কুরআনের আয়াত নাযিল করে সম্মানিত করলেন তাঁকে, 'অতঃপর বালিকাদ্বয়ের একজন লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে তাঁর কাছে আগমন করলো।' [২৫০]
মূসার কাছে এসে বললেন- 'আপনি কি একবার আমাদের বাড়িতে আসবেন? আমাদের পশুকে পানি পান করানোর জন্য বাবা আপনাকে কিছু পুরষ্কার দিতে চান'। 'আপনি পথ বলে দিন, আমি সামনে যাচ্ছি, আপনি পেছনে আসুন। যদি আমি ভুল পথে যাই তাহলে নুড়ি পাথর ছুঁড়ে আমাকে পথ বাতলে দিবেন'- মূসা উঠে দাঁড়ালেন। [২৫১] মূসা আলাইহিস সালাম এগোতে থাকলেন। তাঁর পিছু নিলেন সেই তরুণী।
সেই দুই তরুণীর বাবা ছিলেন একজন বৃদ্ধ ধার্মিক ব্যক্তি। [২৫২] পিতৃসুলভ স্নেহের সুরে মূসার কাছে জানতে চাইলেন- ব্যাটা বলো তো তোমার কাহিনী।
মূসা আলাইহিস সালাম একে একে সব বললেন। জানালেন কেন তাঁকে বেছে নিতে হয়েছে এই ফেরারি অনিশ্চিত জীবন। দুই তরুণীর একজন পিতাকে বললেন- আপনি দয়া করে তাঁকে কর্মচারী হিসেবে নিয়ে নিন। কর্মচারী হিসেবে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিই তো সবচেয়ে ভালো।
সেই বৃদ্ধ ব্যক্তি বললেন, আমার মেয়েদের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই, আর আমার সাথে আট বছর কাজ করতে হবে এবং তুমি চাইলে দশ বছরও করতে পারো। [২৫৩]
কিছুক্ষণ আগেও মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন নিঃস্ব, রিক্ত, একা। হঠাৎ করে মহান আল্লাহ তাঁর থাকার নিরাপদ আশ্রয়, উপার্জনের পথ, পরিবার, সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিলেন।
কী অপূর্ব এক গল্প! এই গল্প থেকে আমাদের জন্য রয়েছে অনুপ্রেরণা পাবার বেশ কিছু উপাদান। প্রথমে চলো মূসা আলাইহিস সালামের কাজের কিছু বিশ্লেষণ করা যাক-
ক) আমাদের খেলার মাঠের পাশ দিয়ে মাঝে মাঝেই প্রাইভেট-কোচিং ফেরত বালিকারা বাসায় যেতো। এমন কোনো বালিকা পাশ দিয়ে গেলেই খেয়াল করতাম পোলাপান খুব সিরিয়াস হয়ে খেলছে। যে ব্যাট ধরছে সে ছক্কা মেরে বালিকাদের সামনে হিরো সাজতে চাচ্ছে। যে বোলিং করছে সে চাইছে ব্যাটসম্যানের মিডল স্ট্যাম্প ভেঙে চিৎকার চেঁচামেচি করে বালিকাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। বাইক নিয়ে উরাধুরা টান মারা, সাইকেলের স্টান্ট করা বা ডিএসএলআর দিয়ে মাঞ্জা মেরে ছবি তুলে ভার্চুয়াল জগতে মেয়ে পটানোর ব্যাপারটা ছেলেপেলে খুব নিষ্ঠার সাথে করে। মেয়ে জুনিয়রের অ্যাসাইনমেন্ট করে দিয়ে ভাই-ই-য়া ডাক শুনতে চাওয়া বা ফার্স্ট ইয়ারের জুনিয়রকে নাম্বার দিয়ে ও সমস্যা হলে এই ভাইকে স্মরণ করো, ডায়ালগ ঝেড়ে হিরোগিরি করে ইম্প্রেস করতে চাওয়া পোলাপাইনেরও অভাব নেই।
মূসা আলাইহিস সালামের পরিস্থিতি এবার একটু মিলাও। একেবারেই নিঃস্ব, কপর্দকহীন তিনি। বাড়িঘর, আপনজন ছেড়ে বহুদূরে। কবে ফিরতে পারবেন, আদৌ পারবেন কি না সেটাও জানেন না। রাজার ঘরের মানুষ। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েননি। রাখালদের ভিড় ঠেলে দুই তরুণীর পশুকে তিনি পানি পান করালেন। উপকারের বিনিময়ে কিছু অর্থ বা খাবার তাদের কাছ থেকে চাইতে পারতেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনি কিছুই চাননি। তরুণীদের সামনে নিজেকে বীর হিসেবেও জাহির করেননি। তিনি একটা কথাও বলেননি। সোজা এসে বসেছেন গাছতলায়। পুরো ঘটনা যদি দেখো- মূসা আলাইহিস সালাম দুই তরুণীর সাথে প্রয়োজনের বাইরে একটা শব্দও বেশি বলেন নি। এমনই ছিল তাঁর শালীনতাবোধ, লজ্জাবোধ, পবিত্রতার প্রতি ভালোবাসা।
মূসা আলাইহিস সালামের মতো এমন বিপদে পড়লে আর এমন সুযোগ পেলে আমরা কী করতাম? মূসা আলাইহিস সালামের মতো কিছু করলে নিশ্চয় এ সমাজ আমাদের বোকা উপাধি দিতো, তাই না?
২) বৃদ্ধের বাড়ির পথ মূসা আলাইহিস সালাম চিনতেন না। তিনি বৃদ্ধের কন্যার পিছু পিছু যেতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি বললেন, আমি সামনে সামনে যাচ্ছি, আপনি পেছনে পেছনে আসুন। যদি আমি ভুল পথে যাই তাহলে নুড়ি পাথর ছুঁড়ে আমাকে পথ বাতলে দিবেন। দেখো, এখান থেকেও দুইটি বিষয় বের হয়ে আসে-
ক) কারো পেছনে পেছনে চললে তার দিকে তাকাতে হয়। মূসা আলাইহিস সালাম সেই নারীর দিকে প্রয়োজন ছাড়া তাকাতে চাচ্ছিলেন না। তাই অপরিচিত রাস্তাতেও সেই তরুণীর সামনে সামনে চলেছেন। এভাবে তিনি তার দৃষ্টির হিফাযত করলেন।
খ) পথ ভুল করলে পথ ঠিক করে দেবার জন্য যেন অতিরিক্ত কথা বলতে না হয়, তাই নুড়ি পাথর দিয়ে পথ চেনানোর কথা বললেন। এমনই ছিল মূসা আলাইহিস সালামের শালীনতাবোধ।
৩) মূসা আলাইহিস সালাম সব কিছু থেকে, সব সৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছেন এমন একজনের কাছে যিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আল্লাহকে ডেকেছেন। আবেদন জানিয়েছেন- ইয়া আল্লাহ, তুমি আমার কাছে যে কল্যাণই পাঠাবে আমি তার পথ চেয়ে আছি। মুসা আলাইহিস সালামের এই শালীনতাবোধ, লজ্জাশীলতা, আমানতদারিতা আর সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহর দিকে আসা- এই কয়েকটি কাজের প্রতিদান হিসেবে তৎক্ষণাৎ আল্লাহ উনাকে যা দিলেন-
- নিরাপদ আশ্রয়।
- চোখ শীতলকারী স্ত্রী।
- খাবার-দাবার, অর্থ।
অথচ কিছুক্ষণ আগেও তিনি ছিলেন এক ফেরারি যুবক, আশ্রয়, খাবারদাবার, টাকাপয়সা কিছুই ছিল না তাঁর। আলাইহিস সালাম।
***
নিজেদের উপর কর্তৃত্বশীল, অভিজাত নারীদের নিয়ে পুরুষের একটু বিশেষ ফ্যান্টাসি থাকে। বিশেষ করে সেই নারী যদি সুন্দরী হয়। ইউসুফ আলাইহিস সালামের মালিকের স্ত্রী ছিল অত্যন্ত সুন্দরী, অভিজাত, কর্তৃত্বশীল। আল্লাহর নবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম ফ্যান্টাসি থেকে মুক্ত ছিলেন। কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালামের সৌন্দর্য দেখে কুচক্রান্ত করতে শুরু করে মালিকের স্ত্রী জুলায়খা। ক্রমাগত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে প্ররোচিত করতে থাকে যিনার জন্য। কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম বরাবর প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন।
একদিন জুলায়খার স্বামী আযিয বাড়িতে ছিল না। কুটিল ষড়যন্ত্র করলো জুলায়খা। কৌশলে ইউসুফকে ডেকে নিলো নিজের ঘরে। বন্ধ করে দিলো ঘরের দরজা। ইউসুফের সামনে অপূর্ব সাজে সজ্জিত অভিজাত সুন্দরী নারী জুলায়খা। বদ্ধ ঘর, দুজনে একা। বারবার প্রলোভন দেখাচ্ছে জুলায়খা- চলে এসো, এতো অপরূপ সাজে সেজেছি আমি শুধু তোমার জন্য। এসো আমার কাছে...
অনড় থাকলেন ইউসুফ আলাইহিস সালাম। মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন। জুলায়খা জোর করে ইউসুফকে তার কাছে টানতে চেষ্টা করলো। পবিত্রতা রক্ষার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন ইউসুফ। জুলায়খাও গেল পিছু পিছু এবং দরজাতেই দুজনের সাথে দেখা হয়ে গেল জুলায়খার স্বামী আযিযের। সঙ্গে সঙ্গে পবিত্রতার মুখোশ পরে নিলো জুলায়খা। এক গুরুতর অভিযোগ করলো ইউসুফ আলাইহিস সালামের নামে- আযিযের অনুপস্থিতিতে জুলায়খার পবিত্রতা নষ্ট করার চেষ্টা করছিল ইউসুফ! ইউসুফ আলাইহিস সালাম তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানান- না, বরং সেই আমার পবিত্রতা নষ্ট করতে চাচ্ছিল।
ইউসুফের জামা পরীক্ষা করা হোক- ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক ভৃত্য বললো-যদি দেখা যায় ইউসুফের জামার সামনের অংশ ছেঁড়া তাহলে বোঝা যাবে যে ইউসুফ দোষী। আর যদি দেখা যায় যে ইউসুফের জামার পেছনের অংশ ছেঁড়া তাহলে ইউসুফ নিরপরাধ।
জামা পরীক্ষা করার পর সকলেই নিশ্চিত হয়ে গেলো - ইউসুফ আলাইহিস সালামই সত্য কথা বলছেন। দোষী প্রমাণিত হলো জুলায়খা। কিন্তু তারপরেও জুলায়খার কোনো শাস্তি হলো না।
এদিকে খবর ছড়িয়ে গেলো শহরে- আযিযের স্ত্রী জুলায়খা তার দাসের সাথে জোর করে যিনা করতে চেয়েছে। শহরের নারীরা ছি ছি করতে থাকলো। জুলায়খা একদিন দাওয়াত করলো ওদের। সবার সামনে একটা আপেল আর একটা ছুরি রাখলো। বললো তোমরা ছুরি দিয়ে আপেল কাটো। নারীরা আপেল কাটা শুরু করলে জুলায়খা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে তাদের সামনে দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেলো। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর রূপে নারীরা এতোটাই মজে গেলো যে তারা আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেললো, কিন্তু টেরও পেলো না। অবাক বিস্মিত নারীদের মুখ থেকে বের হয়ে আসলো- এ তো মানুষ নয়, মনে হচ্ছে কোনো ফেরেশতা!
জুলায়খা বললো- 'হ্যাঁ দেখো, এর জন্যেই তোমরা আমাকে কটু কথা বলেছো। আমি ওর সাথে যিনা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও রাজি হয়নি, পবিত্র থাকতে চেয়েছে। ওকে আমার প্রস্তাবে রাজি হতেই হবে। না হলে ওকে কারাগারে যেতে হবে।'
ইউসুফ আলাইহিস সালাম জুলায়খার কথা শুনে আল্লাহকে বললেন, 'হে আমার রব! এই নারীরা আমাকে যেদিকে ডাকছে, এর চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশি প্রিয়।' [২৫৪]
অবশেষে জুলায়খার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কারাগারেই ছুঁড়ে ফেলা হলো। অভিযোগ আনা হলো- সে তার মালিকের স্ত্রীর পবিত্রতা নষ্ট করতে চেয়েছে। পুরো শহর জানে ইউসুফ নির্দোষ, আযিযের স্ত্রী জানে, আযিয জানে, সবাই জানে ... তাও কারাগারের অন্ধকূপে ছুঁড়ে ফেলা হলো ইউসুফকে। [২৫৫] ভাইদের চক্রান্তে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে দাসের জীবনযাপন করা, তারপর বিনা দোষে কারাবরণ। [২৫৬]
***
এবার আমরা একটু বিরতি নেবো। নিজেকে একটু কল্পনা করবো ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর জায়গায়। একজন অভিজাত সুন্দরী নারীর সাথে একই বাড়িতে থাকো তুমি। দীর্ঘদিন ধরে দিনরাত অনবরত তোমাকে প্রলুব্ধ করে সে। একদিন ঘরে ডেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। তোমার সামনে অভিজাত, অপরূপা এক নারী, আশেপাশে আর কেউ নেই। বদ্ধ ঘরে সেই লাস্যময়ী উদ্ভিন্নযৌবনা নারী আহ্বান করছে তার সাথে এক হয়ে যাবার। এমন অবস্থায় তুমি কী করতে? এমন সুযোগ পেলে আমাদের অবস্থা কী হতো?
এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কথা আমাদের কলিজার বন্ধুরা জানতে পারলে আমাদের কি মান সম্মান কিছু অবশিষ্ট থাকতো? আমাদের পুরুষত্ব নিয়ে কথা উঠতো না? এমন মজা নেবার সুযোগ কি আসলেই কেউ হাতছাড়া করতো? লাস্যময়ীর সাথে বিছানায় না গেলে কারাগারে যেতে হবে এমন হুমকি পাবার পরেও আমরা কি রাজি না হয়ে থাকতাম? বা এই কারণে কারাগারে গেলে সমাজ আমাদের কি বোকা বলতো না?
ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর এই পবিত্রতাবোধের পুরষ্কার আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন বহুগুণে।[২৫৭] কয়েক বছর পর দেশের রাজাই সসম্মানে তাঁকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে আসলো। সবাই স্বীকার করে নিলো ইউসুফ আলাইহিস সালাম নির্দোষ ছিলেন। অর্থমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো তাঁকে। তাঁর যে ভাইয়েরা তাকে ষড়যন্ত্র করে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল তারা ভুল স্বীকার করে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলো। ইউসুফ আলাইহিস সালাম ফিরে পেলেন তাঁর হারানো পরিবার।
***
অনেক আগে ইহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে কিফ্ল নামের এক লোক ছিল।[২৫৮] এলাকায় নতুন কেউ আসলে স্থানীয়রা কিফলের পরিচয় দিতো এক শব্দে- প্লেবয়! একদিন একজন নারী আসে তার কাছে। কিফ্ল এই সেই বলে ষাট দিনারের বিনিময়ে তার সাথে যিনা করার সুযোগ পায়। অগ্রিম টাকাও দিয়ে দেয়। যিনার চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রবেশের আগে মহিলাটি হঠাৎ কেঁদে উঠে। প্রচণ্ড অবাক হয়ে যায় কিফ্ল। সেই সাথে কৌতূহল।
কী হলো? তোমাকে তো আমি টাকা দিয়েছিই। কোনো জোর জবরদস্তি করে কিছু করছি না। তুমিই তো রাজি হয়েছিলে! এভাবে কাঁদছো কেন? কৌতূহলী কিফ্ল প্রশ্ন করে।
না, তা না...আসলে এটা একটা পাপ কাজ। আমি আগে কখনোই করিনি। আজ নিরুপায় হয়ে এসেছি- কাঁদো কাঁদো গলায় জবাব দেয় মেয়েটি।
জবাব শুনে কী যেন হয়ে গেল কিফলের। ঐ মেয়ের কাছ থেকে সরে আসলো। কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে বললো, 'ঠিক আছে। তুমি চলে যাও। এই দিনারগুলোও নিয়ে যাও। তোমাকে দিয়ে দিলাম।' অবাক মহিলা, দিনার নিয়ে চলে গেল।
কিফ্ল আল্লাহর নামে শপথ করলো- আল্লাহর কসম! কিফ্ল আর কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করবে না।
সে রাতেই মারা গেল কিফ্ল। সকাল হতেই দেখা গেল তার দরজায় লেখা আছে- অবশ্যই আল্লাহ কিফ্লকে মাফ করে দিয়েছেন।
আচ্ছা, এবার তোমাকে কিছু প্রশ্ন করি।
***
আল্লাহর নবী মূসা আলাইহিস সালাম পশুকে পানি খেতে নিয়ে আসা তরুণীদের সাথে ফ্লার্ট করেননি। তিনি কি বোকামি করেছেন?
ইউসুফ আলাইহিস সালাম জুলায়খার মতো সুন্দরী অভিজাত নারীর শত প্রলোভন সত্ত্বেও তার সাথে পরকীয়া করেননি, সুবর্ণ সুযোগ পাবার পরও নিজেকে সংযত রেখেছেন। এমনকি জুলায়খার প্রস্তাবে সাড়া দেবার চাইতে কারাগারে যাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি কি বোকামি করেছেন?
কিফ্ল.... তিনিও কি বোকা ছিলেন? না হলে এভাবে সুযোগ পাবার পরেও কিছু না করে ফিরে আসে?
সেক্যুলার রোল মডেল, বুদ্ধিজীবী, সুশীল আর আজকের ইয়ুথ আইকনদের কথা অনুসারে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই হয় না- 'হ্যাঁ, তারা সবাই বোকা ছিল।' এমন চিন্তা থেকে আমরা মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
এই মানুষগুলোর কাজের প্রশংসা করেছেন আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা। যুগ যুগ ধরে মানুষদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে এই মানুষগুলোর গল্প তিনি মানুষের মধ্যে সংরক্ষিত রেখেছেন। যারা যিনা-ব্যভিচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখে, তাঁদের আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা অত্যন্ত ভালোবাসেন। তাঁদের দু হাত ভরে দান করেন। আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,
'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হবার ভয় রাখে তার জন্য রয়েছে দুইটি জান্নাত।' [২৫৯]
এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন,
'এই জান্নাত দুটি সেই ব্যক্তিকে প্রদান করা হবে যে গুনাহ করার সংকল্প করার পর আল্লাহর ভয়ে গুনাহ হতে বিরত থেকেছে।'[২৬০]
পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে বিচার চলবে হাশরের ময়দানে। সূর্য থাকবে মানুষের একদম কাছে। মাথার আড়াই হাত উপরে। সূর্য আজ আমাদের থেকে কতো কোটি কিলোমিটার দূরে, তারপরও তার তাপে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই। হাশরের সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা চিন্তা করো। সেদিন কী দুরবস্থায় পড়তে হবে মানুষদের! ঘামের সাগরে মানুষ হাবুডুবু খাবে, তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবে, ছায়া মিলবে না। আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না সেইদিন। সেই আরশের ছায়ায় আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা দয়া করে যাদের আশ্রয় দিবেন তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো সেই যুবকরা যাদের যৌবন কেটেছে আল্লাহর ইবাদাতে, আরেকটি শ্রেণি হলো সেই পুরুষ যে পরমাসুন্দরী অভিজাত মহিলার যিনার আহ্বান ফিরিয়ে দিয়ে বলে, 'আমি আল্লাহকে ভয় করি।'[২৬১]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো নারীর সাথে নিষিদ্ধ সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে তাকে ছেড়ে দেয় আল্লাহ তাকে মহা ভয়ঙ্কর দিনে নিরাপত্তা দান করবেন, তাঁকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন এবং তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন।' রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, 'হে কুরাইশ বংশের যুবকেরা, তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করো। ব্যভিচার করো না। যে তার প্রবৃত্তির তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ রাখবে, তার জন্য রয়েছে জান্নাত।'[২৬২]
আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করলে আল্লাহ এর চাইতেও শতগুণ বেশি পুরস্কার দান করেন। আল্লাহর জন্য স্যাক্রিফাইস করো। আখিরাতের সুবিশাল পুরস্কারের পাশাপাশি দেখবে তোমার দুনিয়ার এই জীবনটাতেও নেমে আসবে জান্নাতের প্রশান্তি। এমন এক শান্তির দেখা পাবে, যা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব। তোমার জীবনটা সহজ হয়ে যাবে। তুমি বুঝতে পারবে অলক্ষ্যে থেকে কেউ একজন তোমার জীবনপথে বিছানো কাঁটাগুলো তুলে সেখানে লাগিয়ে দিচ্ছে ফুলগাছ। গার্লফ্রেন্ড নেই, প্রেম করতে পারছো না?
মন খারাপ করো না, আল্লাহ তোমাকে পবিত্র রাখতে চাচ্ছেন।
ব্রেকআপ হয়েছে?
আল্লাহ তোমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে আসার সুযোগ করে দিচ্ছেন, সসীম এই জগতের একটা মরণ ফাঁদ থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহ তোমাকে অসীম জীবনের জান্নাত দিতে চাচ্ছেন। এমন এক জান্নাত দিতে চাচ্ছেন যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। এরপরও কি তুমি মন খারাপ করে থাকবে? আল্লাহর কথা তোমার বিশ্বাস হয় না?
'সেই মুমিনরাই সফল, যারা তাঁদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে।'[২৬৩]
'যাকে আগুন হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলকাম। বস্তুত পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।'[২৬৪]
'নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম, নিশ্চয় তারাই হলো সফলকাম।'[২৬৫]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তো তোমাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন। বলেছেন- 'যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহবা) এবং দু'পায়ের মধ্যখানের (লজ্জাস্থান) হিফাযতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জান্নাতের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেব।'[২৬৬]
যেই আল্লাহ মূসাকে দিলেন, ইউসুফকে দিলেন, কিফ্লকে দিলেন সেই আল্লাহ পবিত্র থাকার পুরস্কার আমাদের দেবেন না- এমন কী কোথাও লেখা আছে? আল্লাহ তো সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েই রেখেছেন, 'যে আল্লাহকে ভয় করে আর ধৈর্য ধরে, আল্লাহ এমন ভালো মানুষদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।'[২৬৭]
এরপরও কেন আমরা সন্দেহ করি? কেন আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পারি না? হারাম রিলেশন থেকে দূরে থাকলে আমাদের জীবনের সব রং, সব আনন্দ পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং এর মতো একযোগে নিভে যাবে- কেন এমন হাস্যকর বিশ্বাস আমরা আঁকড়ে ধরে বসে থাকি?
আল্লাহ কি ওয়াদার খেলাফকারী? আল্লাহ কি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন?
নিজেদের প্রশ্ন করো। প্রশ্নগুলো এড়ানোর চেষ্টা করো না। ছাড়াছাড়াভাবে তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিয়ে মনকে ভুলিয়ে রেখো না। সময় নিয়ে ভাবো। পর্দার লাল নীল জগতের স্বপ্ন বেচার চোরাকারবারি, বিজ্ঞানমনস্ক 'স্যার' আর কিউট কিউট ভাইয়ারা কথার মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে:
সময় তো তোমার এখনই, এ সময় প্রেমহীন কাটালে কলঙ্ক হয়ে যাবে মানবজন্মের নামে। অনেক কিছু হারাচ্ছো তুমি, জীবনের অনেক মজা থেকে বঞ্চিত হচ্ছো, উপভোগ করতে পারছো না, পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তারুণ্যের সব আবেগ... ব্যর্থতায় নষ্ট কষ্টে অবলীলায় কেন শেষ করছো এই স্বপ্নের জীবন এক অবেলায়?
সেক্যুলার ধর্মের পীরবাবাদের দ্বারা ব্রেইনওয়াশড হয়ে তোমরা হয়তো ভেবেছিলে বিয়োগান্তক কোনো উপন্যাসের নায়কের মতো পা টেনে টেনে হেঁটে বিদায় নেবে এই আলো ঝলমলে পৃথিবী থেকে। তোমাদের জীবনের কোনো লাভ লস নেই। পুরোটাই লস। সব সমর্পিত ব্যর্থতার কাছে, হতাশার কাছে।
তোমরা ভুল ভেবেছিলে। তোমরা ভুল ছিলে।
হয়তো তথাকথিত প্রগতিশীলদের চোখে তুমি বোকা, ধর্মান্ধ মোল্লায় পরিণত হয়েছো। হয়তো ওদের তৈরি সংজ্ঞায় হেরে গেছো তুমি সেই রূপসীর চোখে, ধোঁকা দিয়েছে তোমাকে সেই রাজপুত্র। কিন্তু তারা জানে না, হেরে গিয়েও জিতে গেছো তুমি!
'হেরে গিয়ে'ও জেতা যায়!
টিকাঃ
[২৪৭] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে তার জন্য থাকবে সংকীর্ণ জীবন।” সুরা ত্বহা ২০:১২৪।
[২৪৮] এগুলো নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি।
[২৪৯] সূরা ক্বাসাস, ২৮:২৪
[২৫০] সূরা ক্বাসাস, ২৮:২৫
[২৫১] ঘটনার এই অংশটুকু কুরআন বা হাদিসের বর্ণনা নয়। এটা ইসরাইলী বর্ণনা। এই ধরণের বর্ণনার সত্যতা জানা যায় না। তাই নিশ্চিত সত্য মনে না করে কেবল শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ বা পড়া যেতে পারে। শরয়ী সম্পাদক।
[২৫২] অনেকে বলেছেন এই বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন নবী শুআইব আলাইহিস সালাম।
[২৫৩] সূরা ক্বাসাস, ২৮:২৭-২৮
[২৫৪] সূরা ইউসুফ, ১২: ৩৩
[২৫৫] সূরা ইউসুফ, আয়াত ২৩ থেকে ৩৫ দ্রষ্টব্য।
[২৫৬] তাফসীর ইবনু কাসীর, সূরা ইউসুফ The Story of Prophet Yusuf and the Wife of al-Aziz, Dr. Mohsen Haredy, aboutislam.net, July 01, 2020- tinyurl.com/5vnjf44d
[২৫৭] অথচ আমাদের সমাজে খুবই জঘন্য একটা কথা প্রচলিত আছে। ইউসুফ (আ) ও প্রেম করেছেন (নাউযুবিল্লাহ), গানও আছে "প্রেম করেছে ইউসুফ নবী, তার প্রেমে জুলেখা বিবি গো...'- নিঃসন্দেহে এগুলো মিথ্যা।
[২৫৮] ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি এ হাদীস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছ থেকে সাতবারের বেশি শুনেছি। তিরমিযী: ২৪৯৬, মুসনাদ আহমাদ: ৪৭৪৭। তবে বর্ণনাটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতবিরোধ আছে। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম ইবনু কাসীর বলেছেন, 'অতি গারীব (বিরল) একটি হাদিস। এর সনদের ব্যাপারে আপত্তি আছে' (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১/২২৬)। আলবানী হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন (যয়ীফাহ: ৪০৮৩)।
[২৫৯] সূরা রহমান, ৫৫:৪৬
[২৬০] তাফসীর তাবারী- উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য। (২৩/৫৬)
[২৬১] বুখারী:৬৬০, ১৪২৩, ৬৪৭৯, ৬৮০৬, মুসলিম: ১০৩১ (ইফা. ২২৫২) Those whom Allaah will shade with His shade, Islamqa- tinyurl.com/3kx42xn2
[২৬২] মুসতাদরাক আল-হাকেম: ৮০৬২, শুআবুল ঈমান: ৪৯৮৪। বুসীরী, হাইসামী, আলবানী প্রমুখ হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন (মাজমাউয যাওয়াইদ: ৭৩১২, ইতহাফুল খিয়ারাহ: ৩০৬৬, ৪/৬, সহীহাহ: ২৬৯৬)
[২৬৩] সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩: ১ ও ৫
[২৬۴] সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৮৫
[২৬৫] সূরা আল-মু'মিনুন, ২৩:১১১
[২৬৬] বুখারী, ৬৪৭৪
[২৬৭] সূরা ইউসুফ, ১২:৯০
📄 চশমা
বিয়ে বহির্ভূত প্রেম ভালোবাসার ভয়ঙ্কর দিক জানার পর আশা করি এখন তোমরা এর থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করবে। প্রত্যাবর্তনের পথে তোমাদের স্বাগতম। এই পথে অনেক ধরনের সংশয়, অনেক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তোমাদের মাঝে কাজ করবে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সংশয়গুলো দূর করার পাশাপাশি প্রত্যাবর্তনের পথের প্রতিটি ফাঁদ এবং সেগুলো এড়ানোর উপায় নিয়ে আমরা আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। বইয়ের কলেবর ছোট রাখার জন্য খুব বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। সেগুলো আমাদের ওয়েবসাইট এবং পেইজে পাবে। তবে সে আলোচনায় যাবার আগে তোমাদের একটি বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে।
সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থা, মিডিয়া, সুশীল-প্রগতিশীল গোষ্ঠী আর লিবারেল মিশনারীদের মগজধোলাইয়ের শিকার হয়ে তোমরা বিশ্বকে, নিজের জীবনকে যে চশমার মধ্য দিয়ে দেখতে শিখেছো। সেই চশমা খুলে ফেলতে হবে। এর বদলে পরতে হবে ইসলামের চশমা। পৃথিবী এবং জীবনকে দেখতে হবে তাওহীদের চশমা দিয়ে।
দেখো, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদেরকে এই পৃথিবীতে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন আমাদের জন্য কোনটা উপকারী আর কোনটা ক্ষতিকর। তিনি আমাদেরকে সেই বিষয়গুলো করতে আদেশ দিয়েছেন যা আমাদের নিজেদের জন্য, পরিবার সমাজ ও সভ্যতার জন্য উপকারী। তিনি সেই বিষয়গুলোকেই নিষিদ্ধ করেছেন যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
নৈতিকতার ভিত্তি হলো আল্লাহ ও ইসলাম। শালীনতা, অশ্লীলতা, ঠিক-বেঠিক, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকার সবকিছুর একমাত্র নীতি নির্ধারক হলেন আল্লাহ। কোনো মানুষ, কোনো সংঘ, সভ্যতা, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নয়।
আল্লাহ বলেছেন, 'যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য জীবনব্যবস্থা অনুসন্ধান করবে, তার পক্ষ থেকে তা (অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা) কখনো গ্রহণ করা হবে সাংগঠনিকভাবে। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।’[২৬৮]
তুমি যখন ইসলামের এই চশমা চোখে দুনিয়াটা দেখা শুরু করবে তখন অনেকগুলো সন্দেহ আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব তোমার মধ্য থেকে চলে যাবে। নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ইসলামের চশমায় দেখার জন্য আমাদের কিছু জিনিস জানা ও মানা জরুরি:
১। যৌনতা কেবল বিয়ের মাঝেই হবে। বিয়ের বাইরে নারী পুরুষের যৌন সম্পর্ক জায়েজ নেই।[২৬৯] আল্লাহ বলেছেন,
'আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে রাখে সংরক্ষিত, নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ছাড়া, এতে তারা হবে না নিন্দিত। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারাই হবে সীমাঙ্ঘনকারী।'[২৭০]
২। মাহরাম ছাড়া অন্য নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে জায়েজ নেই। মাহরাম হলো সেই সমস্ত নারী-পুরুষ যাদের সাথে বিয়ে হারাম। মেয়েদের জন্য মাহরাম হলো- বাবা, দাদা, চাচা, মামা, নিজ ভাই, দুধ ভাই ইত্যাদি। ছেলেদের জন্য মাহরাম হলো মা, খালা, ফুপি, দাদি, নানি, নিজ বোন, দুধ বোন ইত্যাদি। মামাতো, চাচাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাইবোন, দেবর-ভাবী, দুলাভাই-শালী একে অপরের মাহরাম না।[২৭১] এদের সাথে শরীয়াহ অনুযায়ী পর্দা করতে হবে, অবাধ মেলামেশা করা যাবে না। শুধু যে নির্জনেই মেলামেশা বন্ধ করতে হবে এমন না। সামাজিক গ্যাদারিং যেমন ধরো অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানেও অবাধ মেলামেশা বন্ধ করতে হবে। শরীয়াহসম্মত কোনো কারণ ছাড়া অনর্থক কথা বলা যাবে না, খোশগল্প করা, চ্যাট করা হাই হ্যালো করা তো বহু দূরের কথা। আলকেমি লেখাতে আমরা দেখেছি নারী পুরুষ কাছাকাছি অবস্থান এবং কথাবার্তা কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে।
৩। নারী-পুরুষ উভয়কেই পর্দা করতে হবে। পোশাক পরতে হবে শরীয়াহর নির্দেশনা অনুযায়ী। শুধু শরীর ঢাকা যথেষ্ট না, শরীরের কাঠামো যেন বোঝা না যায়, তাও লক্ষ্য রাখতে হবে। এই কথা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। আলকেমির লেখাতে আমরা দেখেছি নারীর সৌন্দর্য, শরীরের গঠন ছেলেদের কীভাবে পাগল করে দেয়।
৪। চোখের হিফাযত করতে হবে- নারী-পুরুষ উভয়কেই। বিশেষ করে পুরুষের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। নারীর তুলনায় পুরুষেরা সৌন্দর্য আর চেহারা দেখে বেশি প্রভাবিত হয়।
৫। সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিকভাবে তাওহীদ বোঝা। নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও আমরা অনেকেই তাওহীদের অর্থ, এর দাবিগুলো বুঝি না। তাওহীদের একটা অর্থ হলো আল্লাহ আমার মালিক। আমি তাঁর দাস। তিনি আমাকে যা বলবেন সেটাই আমাকে করতে হবে। শুনলাম ও মানলাম, এই হবে মুসলিমের মনোভাব।
তাই যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে আমাদের দেখতে হবে কাজটা শরীয়াহতে হালাল না হারাম? এই কাজটা কি আল্লাহ পছন্দ করবেন নাকি অপছন্দ করবেন? তুমি যখন এই বিষয়টামেনে নেবে তখন ব্রেকআপ করলেও মনে কষ্ট পাবে- এমন সংশয় থাকবে না। ‘দ্বীনি' গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড নামের আত্মপ্রতারণার সুযোগ থাকবে না। ব্রেকআপের পর গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের ক্ষতি করা, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছবি ভাইরাল করে দেওয়া, মিথ্যা ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মামলা দেওয়া, আত্মহত্যা করা, মদ-গাঁজা, সিগারেট খেয়ে জীবন নষ্ট করার মতো কাজগুলো করার সুযোগ পাবে না। কারণ এগুলো সবই মহান আল্লাহর অবাধ্যতা।
প্রেম-ব্রেকআপের পরের এই চরমপন্থী প্রতিক্রিয়াগুলোর মূল কারণ হলো, ক্রমাগত ব্রেইনওয়াশিং-এর ফলে আমরা প্রেমকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সার্থকতা হিসেবে দেখি। পাশাপাশি আমাদের জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য কী, জীবনের সার্থকতা কোথায়, আমরা জানি না। বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে ইসলাম আমাদের শেখায় আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদাত করা। আল্লাহ এ জন্যেই আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
'আর আমি সৃষ্টি করেছি জ্বীন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে'।[২৭২]
এটা কিন্তু শুধু নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ করা ইত্যাদি আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। বরং মহান আল্লাহর নির্ধারিত শরীয়াহ অনুযায়ী ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্ব পর্যায়ের প্রতিটি বিষয়ে আমল করা, সে অনুসারে চলাও আল্লাহর ইবাদাত। এটাই দুনিয়াতে আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে দেখায়, এর মাধ্যমেই সৃষ্টির হক সংরক্ষিত হয়, দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা হয় ভারসাম্য।
কাজেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আচার-আচরণ, লেনদেন, সামাজিক কিংবা অন্য ইস্যুতে আল্লাহর কথা অনুযায়ী কাজ করা, তাঁকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজ করাও ইবাদাহ। এই জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য প্রেম করা না। বোহেমিয়ানের মতো জীবন কাটিয়ে দেওয়া, ভবঘুরের মতো দুয়ারে দুয়ারে সস্তা সুখের খোঁজ করা, মানুষের কাছে আকর্ষণীয় বা কাঙ্ক্ষিত হওয়া মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য না। মানুষ আল্লাহর দাস। আর হিসেবে আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর গোলামি করা। এতেই আমাদের জীবনের প্রকৃত সফলতা, সুখ ও শান্তি নিহিত।[২৭৩]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) যেমনটা বলেছেন- 'মানুষের অন্তর সৃষ্টিগতভাবেই দুইভাবে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। একটি হলো ইবাদাতের ক্ষেত্রে, যা মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর একটি হলো আল্লাহর সাহায্য ও তাঁর উপর ভরসা করার ব্যাপারে। আল্লাহর ইবাদাত ছাড়া, তাঁকে ভালোবাসা ছাড়া, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন ছাড়া অন্তর কখনোই বিশুদ্ধ হবে না, সফলতা লাভ করবে না। খুশি হবে না, সুখ পাবে না, প্রশান্তি পাবে না। এমনকি যদি সে উপভোগের সব কিছু পেয়েও যায়, তারপরও অন্তর প্রশান্ত হবে না।'[২৭৪]
এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে তোমাকে। এতোদিন নারী-পুরুষের সম্পর্ককে তুমি দেখেছো প্রেমের ফিল্টারের ভেতর দিয়ে। আসলে বলা ভালো, এভাবেই তোমাকে শেখানো হয়েছে। কিন্তু নারী-পুরুষের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিয়ে। আর প্রেম আর বিয়ের মধ্যে আছে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে নেই, সেটা অন্য কোনো দিনের জন্য তোলা থাক। তবে এখানে আমরা সংক্ষেপে কিছু বিষয় বলি-
ক। প্রেমের মূল বৈশিষ্ট্য হলো আকর্ষণ, নতুনত্ব, যৌনতা। অন্যদিকে যৌনতার পাশাপাশি বিয়ের বৈশিষ্ট্য হলো দায়িত্ব, সম্মান, মায়া, যত্ন, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, স্থায়িত্ব। বিয়েতে মজার সাথে সাথে আপাতভাবে কঠিন কঠিন অনেক বিষয় আছে। অন্যদিকে প্রেমে আপাতদৃষ্টিতে শুধুই মজা। কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো টেকসই বন্ধন নেই। নতুন নতুন প্রেম করে নতুন নতুন শরীরে ডুব দেওয়া কিংবা পছন্দের মানুষের সান্নিধ্য উপভোগ করাই এর সহজাত বৈশিষ্ট্য। এখানে কেবল সুখ আর সুখ। কিন্তু সাধারণত যেসব বিষয় শুধুই সুখের প্রতিশ্রুতি দেয় সেগুলো মরীচিকা হয়। প্রেমও মরীচিকা। যার বিস্তারিত আলোচনা আমরা করে এসেছি। নোঙর ছাড়া নৌকা মুক্ত ভাবে চলতে পারে। কিন্তু দিন শেষে সেই ছুটে চলার পরিণতি কী হয়? সেই নৌকা কি গন্তব্যে পৌঁছায়?
খ। এই পার্থক্যের কারণে বিয়ে এবং প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষের মাইন্ডসেট প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা থাকে। এজন্যই অনেকসময় বলতে দেখা যায়- অমুক প্রেম করার জন্য ভালো, কিন্তু বিয়ের মতো ম্যাটেরিয়াল না। মানুষ যাদের সাথে প্রেম করে তাদের অনেককেই বিয়ের উপযুক্ত মনে করে না। বিয়ে করতে গিয়ে একজন পুরুষ শুধু তার যৌনসঙ্গী খোঁজে না, সে তার সন্তানের মা-কে খোঁজে। নারী শুধু বিছানার সঙ্গী আর টাকার মেশিন খোঁজে না, তার সন্তানদের পিতাকেও খোঁজে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানুষ সুখ দুঃখের ভাগীদারকে খোঁজে, জীবনের অংশীদারকে খোঁজে, দুনিয়া ও আখিরাতের সাথীকে খোঁজে। বিয়ের মাধ্যমে দুটো পরিবারের সম্পর্ক হয়, দুটো বংশগতি এক সূত্রে এসে মেলে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে সহজাতভাবেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে স্থিতিশীল করে। উড়নচণ্ডী, বাউন্ডুলে ছেলেটাও বিয়ের পর সিরিয়াস হয়ে যায়। তাকে দায়িত্বশীল হতে হয়। সে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করে। সন্তানের দায়িত্ব নেয়। পরিবার ও সমাজে অবদান রাখে।
অন্যদিকে প্রেমের উদ্দেশ্য কী? প্রেমের উদ্দেশ্যই হলো ক্ষণিকের সুখ। স্রেফ আনন্দ, আর কিছু না- হয় শরীরের মাধ্যমে নয়তো সান্নিধ্যের মাধ্যমে। প্রেমের সময় মানুষ সেই মানুষটাকেই বেছে নেয় যাকে তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়। তৎক্ষণাৎ যার কারণে তার মস্তিকে ডোপামিন কিংবা সেক্স হরমোন রিলিয হবে। যৌনতা অথবা বিচ্ছেদ ছাড়া প্রেমের আর কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নেই। প্রেম সবসময়ই একটা সাময়িক অবস্থা। সাময়িক সুখ, সাময়িক সান্নিধ্য, সাময়িক মনোযোগ, সাময়িক আবেগ ও অবস্থান। কাজেই এ সম্পর্ক হয় ক্ষণস্থায়ী। হরমোনের নেশা কেটে গেলেই সম্পর্কও হারিয়ে যায়, অথবা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সম্পর্ক হিসেবে বিয়ে আর প্রেম যে একেবারেই আলাদা, অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী, এ বিষয়টা খুব ভালোভাবে বোঝা যায় উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময়কার একটি ঘটনা থেকে।
একদিন এক লোক আসলো খলীফাহ উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। বললো, 'ইয়া, আমিরুল মুমীনিন, আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই।'
'কেন? কেন তুমি তাকে তালাক দিতে চাও?'
'কারণ আমি তাকে ভালোবাসি না।'
উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সব ঘর কবে থেকে কেবল ভালোবাসার উপরে গড়ে উঠেছে? সেবা-যত্ন, তদারকি, অভিভাবকত্ব এগুলো কোথায়?'
উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যা বললেন তা হলো- ভালোবাসাই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। এমন অনেক পরিবার আছে যেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছুর উপর ভিত্তি করে। হতে পারে তারা আগে একে অপরকে ভালবাসতো। কিন্তু মানুষের মন বদলায়। অনেক কিছুই ভুল হতে পারে। কিন্তু তার মানে কি-স্ত্রীকে বা স্বামীকে আর ভালোবাসি না- এই কারণে পরিবার ভেঙে ফেলতে হবে?
আল্লাহ তা'আলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা এবং দয়া দিয়েছেন। যদি ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় তারপরেও সেখানে দয়া থাকে। যত্ন, অভিভাবকত্ব, দায়িত্ব, সমবেদনা আর সহানুভূতি থাকে। একজন স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর যত্ন নেওয়া যদিও সে তার স্ত্রীকে এখন আর ভালো না বাসে। ঠিক একই কথা প্রযোজ্য স্ত্রীদের ক্ষেত্রেও। একজন মুসলিম আখিরাতকে কেন্দ্র করে বাঁচে। তার কাছে পরিবার হলো এমন এক নিউক্লিয়াস যেখানে সে তার বাচ্চাদের লালনপালন করে।
উমার ইবনু খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে না। এরপরও স্ত্রীর সাথে নিজের উপর জোর খাটিয়ে ঘুমাই।'
উমার ইবনু খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কামনা অনূভব করা না সত্ত্বেও নিজের উপর জোর করে কেন স্ত্রীর সাথে ঘুমাতেন?
হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ এমন একজন বান্দা তৈরি করবেন যে আল্লাহর প্রশংসা করবে। যার মাধ্যমে দ্বীন প্রচার হবে, ইসলামের সুরক্ষার জন্য যে লড়াই করবে, যে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত করবে।
উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে বললেন, তাঁকে তালাক দিও না。
প্রেমই জীবনের সবকিছু না। প্রেম অনেকটাই মরীচিকার মতো। বিয়ের পর সময়ের স্রোতে বাস্তবতায় ধাক্কা খেয়ে শুরুর সেই অমোঘ আকর্ষণ কমে যায়। এসব নিয়ে অনেক আলোচনা আমরা করে আসলাম। কিন্তু প্রেম ফুরিয়ে যেতেই পারে, প্রেম ফুরালেও দয়া ফুরালে চলবে না, ভালো আচরণ থাকতেই হবে। [২৭৫]
আশা করি, বিয়ে, প্রেম এবং নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারে ইসলাম তোমার কাছ থেকে কী দাবি করে, তা বুঝতে পেরেছো। আসলে শুধু একটা জিনিস মাথায় রাখলেই সব কিছু অটোম্যাটিক ঠিক হয়ে যাবে। আর তা হলো- সবার আগে আসবেন আল্লাহ। কোনো একটা কাজে যদি দুনিয়ার সব মানুষ অসন্তুষ্ট হয় কিন্তু সেটা আল্লাহর আদেশ হয়, তাহলে দুনিয়ার সব মানুষকে অসন্তুষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই কাজটি করতে হবে। প্রেম থেকে দূরে সরে আসো, ব্রেকআপের সময়, ব্রেকআপের পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা- সব ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সবসময় মাথায় রাখবে।
'আল্লাহ ও রাসূল অধিক হকদার, সত্যিকারের মুসলমান হলে তারা যেন তাঁদেরকে সন্তুষ্ট করে।' [২৭৬]
আলোর পথের এই অভিযাত্রায় তোমাকে স্বাগতম!
টিকাঃ
[২৬৮] সূরা আলে-ইমরান, ৩:৮৫
[২৬৯] ক্রীতদাসীদের সাথে যৌনতা জায়েজ আছে। তবে সেই ক্রীতদাসী আমাদের সময়কার বাসাবাড়িতে কাজ করে এমন দাসী না। বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারো মাকতাবাতুল আযহার থেকে প্রকাশিত ইসলামে দাস-দাসী ব্যবস্থা বইটি। লেখক- শামসুল আরেফিন শক্তি।
[২৭০] সূর আল-মু'মিনুন, ২৩:৫-৭
[২৭১] সম্পূর্ণ মাহরাম লিস্ট পাবে এখানে- https://www.hadithbd.com/mahram/
[২৭২] সূরা আয যারিয়াত, ৫১:৫৬
[২৭৩] Al-'Ubudiyyah, Ibn Qayyim al-Jawziyyah Rahimahullah, sunnahonline. com- tinyurl.com/3s4rerez
[২৭৪] Al-'Ubudiyyah: Being a True Slave of Allah, Ibn Taymiyyah Rahimahullah, sunnahonline.com- tinyurl.com/4msrb8y7
[২৭৫] উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) জীবনী, শাইখ আনওয়ার বিন নাসির আল-ইয়ামানী
[২৭৬] সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৬২
📄 বিদায় বলে দাও...
বিদায় বলতে চাইলেই কি বিদায় বলা যায়? ভুলতে চাইলেই কি ভোলা যায়? কিছু খণ্ড খণ্ড আকাশ, ভোর হয়ে যাওয়া কিছু ভাঙাচোরা রাত, সরোবরের ধারে বসে ভাঙা গলায় শোনানো 'খুব জানতে ইচ্ছে করে' গানটা... কতো খুচরো স্মৃতি তার সাথে! জীবনের 'অ' থেকে 'চন্দ্রবিন্দু' জুড়ে শুধু সেই মানুষটাই। শরীরে বৃষ্টির মতো মোহ, মজ্জায় ও মগজের কোষে অনুক্ষণ অনুরণন। কিন্তু তারপরেও এই মানুষটার নাম একটানে লাল কালি দিয়ে কেটে দিতে হবে। আঁধারের মতো কষ্ট নামবে তোমার হৃদয়ের অলিন্দে। বুকের গহীনে ঝিরি ঝিরি কষ্ট ঝরবে...তবু তোমার বিদায় বলতে হবে।
কেন ব্রেকআপ করবে?
ব্রেকআপ করার আগে তোমাকে অবশ্যই মনের মধ্যে গেঁথে ফেলতে হবে তুমি কেন ব্রেকআপ করবে। চাইলে একটা লিস্ট করতে পারো, আমি এই এই কারণে ব্রেকআপ করবো। ব্রেকআপ করা আমার জন্য অনেক কঠিন। কিন্তু তারপরেও আমি ব্রেকআপ করবো কারণ-
১। ব্রেকআপ করার প্রথম ও প্রধান কারণ হলো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। বিয়ে বহির্ভূত তথাকথিত এই প্রেম একেবারেই হারাম।[২৭৭] এর কারণে আল্লাহ আমার উপর অসন্তুষ্ট হন। এর কারণে আমার অনেক পাপ হচ্ছে। যিনা-ব্যভিচারের গুনাহ হচ্ছে। নিজেকে এবং আমার তথাকথিত ভালোবাসার মানুষকে আমি জাহান্নামের জ্বালানি বানিয়ে ফেলছি। আমি আল্লাহর জন্য গুনাহ থেকে সরে আসতে চাই। তাই আমি ব্রেকআপ করছি।
২। আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে দূরে সরে আসার কারণে আল্লাহ আমাকে পুরস্কার দেবেন। দুনিয়াতে এবং আখিরাতে। তাঁর নির্দেশ মেনে চললে জান্নাতে স্থান করে দেবেন। আমার হৃদয়কে প্রশান্ত করবেন। চোখ শীতল হয়ে যায় এমন একজন ভালোবাসার মানুষ দেবেন দুনিয়ার এই জীবনটাতেও।
৩। প্রেমের কারণে আমি পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালন করতে পারছি না। ইবাদাত করতে পারছি না। অবাধ্যতা আর গুনাহর কারণে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছি মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে। ঈমান ও ইবাদতের স্বাদ, মিষ্টতা অনুভব করতে পারছি না।
৪। প্রেম করে ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রেই সুখী হওয়া যায় না। মিডিয়া, সুশীল প্রগতিশীলরা যতো যাই বলুক না কেন এ পথে ম্যাক্সিমাম মানুষ সুখ পায় না। কোনো না কোনো কারণে পস্তাতে হয়ই। এ পথ মরীচিকার। এপথে কষ্ট, টুকরো টুকরো মৃত্যু, অসীম দুর্নিবার বেদনা। এ পথ জাহান্নামের।
কিছু পিছুটান [২৭৮]...
১। সাময়িক সময়ের জন্য ব্রেকআপ করি, পরে সে দ্বীনে ফিরলে/প্রতিষ্ঠিত হলে একসময় বিয়ে করবো...
এমন চিন্তা করা যাবে না। সাময়িক ব্রেকআপ থেকে বিয়ে, মাঝখানের এ সময়টাতে পা হড়কানোর ভালো সুযোগ থেকে যায়। তোমার কথা বলতে ইচ্ছা করবে, চ্যাট করতে ইচ্ছা করবে, একটু দেখতে ইচ্ছা করবে, মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করবে। 'আমরা তো বিয়ে করবোই', এই চিন্তা থেকে দুর্বল মুহূর্তে শয়তানের লাড়াচাড়া খেয়ে বিছানায় চলে যেতে ইচ্ছা করবে।
হয়তো তুমি প্রেম করা হারাম বুঝতে পেরেছো, কিন্তু তোমার প্রেমিক-প্রেমিকা ভুল বুঝতে পেরেছে কি না, সে আসলেই আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানার কোনো উপায় তোমার হাতে নেই। আবেগ থেকে, তোমাকে হারানোর ভয়ে সে আন্তরিকভাবে তাওবাহ না করেই হয়তো বলবে, হ্যাঁ আমি তাওবাহ করেছি। গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফেরা, বান্দা এবং রবের মধ্যেকার একটা বিষয়। এই উপলব্ধি মানুষের অন্তর থেকে আসতে হয়। আরেকজনের জন্য গুনাহ ছাড়া যায় না। গুনাহ ছাড়তে হলে, সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে বদলাতে চাইলে, তা কেবল আল্লাহর জন্যই হতে হবে।
তাছাড়া আরো কিছু প্রশ্ন থেকে যায়- বাসায় বললেই তোমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে কি না? প্রতিষ্ঠিত হবার সংজ্ঞা কী? প্রতিষ্ঠিত হবার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হবে কি না? মেয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করলো, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছেলে যদি বেটার অপশান খোঁজা শুরু করে?
এরকম অনেক বিষয় আছে। সব দিক বিবেচনা করে আমাদের (লস্টমডেস্টি টিমের) মনে হয়েছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে না চলে বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় একেবারে ব্রেকআপ করে ফেলা আবশ্যক।
২। ওর কাছে তোমার কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি-ভিডিও আছে। ব্রেকআপ করলে সেটা সে নেটে ছড়িয়ে দেবে-
বিষয়টা লজ্জার এবং ভয়ের। তবে ভয় আর লজ্জার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। যিনা করা এবং ছবি-ভিডিও শেয়ার করা ছিল তোমার প্রথম ভুল। এখন ভিডিও ভাইরাল হবার ভয়ে ব্রেকআপ না করা হবে দ্বিতীয় ভুল। প্রথমত, সে তোমাকে ভালোবাসলে কখনোই তোমাকে দিয়ে এমন ছবি বা ভিডিও করাতো না। দ্বিতীয়ত, সেগুলো তার কাছে রাখতো না, ব্ল্যাকমেইল করার তো প্রশ্নই উঠে না। আর ভাইরাল করার হুমকির কারণে তুমি যদি তার সাথে প্রেম চালিয়ে যাও, তাহলে সে এই ছবি-ভিডিওর মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে তোমাকে দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের যিনা করিয়ে নিবে (এরই মধ্যে যদি না করে থাকে)। তারপর সেটাও ভিডিও করে রেখে সেই ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করিয়ে তোমাকে ভোগ করতেই থাকবে। তুমি একটু বেঁকে বসলেই বা তোমাকে ভোগ করতে করতে একঘেয়েমি চলে আসলে ছবি-ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেবে। [২৭৯] ব্ল্যাকমেইল করে তোমার কাছ থেকে টাকা আদায় করবে। [২৮০]
যা ভুল করার এর মধ্যেই করে ফেলেছো। আর ভুল করতে যেও না। ওর সাথে ব্রেকআপ করে এখনই বাস্তবতার মুখোমুখি হও। আল্লাহর কাছে দু'আ করো এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য। অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়া এবং মারধর খাবার সম্ভাবনা থাকলেও অবশ্যই অবশ্যই অভিভাবকদের জানাও। স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা করো। অবস্থা বেগতিক দেখলে আইনজীবির সঙ্গে কথা বলে প্রচলিত আইনের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।
৩। ব্রেকআপ করলে ও অনেক কষ্ট পাবে, ওর মন ভেঙে যাবে, আমার এতে পাপ হবে, মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা এক...
বিয়ে বহির্ভূত প্রেমের মাধ্যমে তুমি প্রতিনিয়ত আল্লাহর আইন অমান্য করে যাচ্ছো। এখন তুমি এই পাপ থেকে বাঁচতে চাচ্ছো আর আল্লাহ তোমাকে এ কারণেই শাস্তি দেবেন? পাকড়াও করবেন? অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসার কারণে আল্লাহ তোমাকে শাস্তি দেবেন? আর অবাধ্যতা করলে পুরস্কার পাবে? এমন কথা কোনো লজিকের মধ্যে পড়ে?
মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা সমান কথা- এটা কোনো হাদীস নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনোই এমন কথা বলেননি। এগুলো আমাদের সমাজের প্রচলিত কিছু ফালতু কথা ছাড়া আর কিছুই না।
৪। যে মানুষটা আমাকে এতোটা ভালোবাসে, আমিই তার জীবন মরণ সবকিছু তাকে এভাবে ছ্যাঁকা দেওয়াটা কি বিবেকবান কোনো মানুষের কাজ? তার জীবনটা কি আমি নষ্ট করে দিচ্ছি না?
ভুলেও এই চিন্তা করবে না। ওর সাথে প্রেম করে পাপ করা, যিনা-ব্যাভিচার করে ওকে এবং নিজেকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দেওয়া কি প্রকৃত মানবতা? না কি সাময়িক কিছু কষ্ট দিয়ে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো প্রকৃত মানবিকতা? সম্পর্ক টিকিয়ে রাখলে ওর ভালো হবে- এটা তোমার নিছক ধারণা। বাস্তবতা তো ভিন্ন। অধিকাংশ প্রেমের ক্ষেত্রেই কি ছ্যাড়াব্যাড়া লাগে তা তো আমরা দেখলাম। তুমি যদি সত্যিকার অর্থেই তার ভালো চাও, কল্যাণ চাও তাহলে তোমার ও তার দুনিয়া এবং আখিরাতের বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থেই কিছুটা কঠোর হও।
সে অভিশাপ দিচ্ছে, দিতে দাও, ভয় পেও না। এই অভিশাপে কিছুই হবে না। সে কান্নাকাটি করছে, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে রেখেছে, অগোছালো জীবনযাপন করছে- করতে দাও। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে। কিছুদিন যাবার পর মোহান্ধ মন মুক্তি পাবে। সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যায়।
৫। আমি তার সাথে যিনা করে ফেলেছি, তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এমন অবস্থায় ব্রেকআপ করলে তা তার সাথে ভয়ঙ্কর প্রতারণা হবে না? তাছাড়া, তাকে বিয়ে করলে তো আমার যিনার গুনাহ মাফ পেয়ে যেতো...
বাংলাদেশে সাধারণত এমন একটা বিশ্বাস প্রচলিত আছে - যার সাথে যিনা করা হয়েছে তার সাথে বিয়ে দিলেই আল্লাহ যিনার গুনাহ মাফ করে দিবেন। কিন্তু শরীয়াহর বাস্তবতা এটা নয়। অবিবাহিত কেউ যিনা করলে, তার জন্য শরীয়াহর নির্ধারিত শাস্তি হলো ১০০ বার বেত্রাঘাত ও ১ বছরের জন্য নির্বাসন। বিবাহিত কেউ যিনা করলে তার শাস্তি হল রজম- পাথর ছুড়ে হত্যা করা। যার সাথে যিনা করেছে তাকে বিয়ে করা না।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যিনা করার সময় মানুষ ঈমান হারিয়ে ফেলে। সে সময় তার মাথার উপর ঈমান ঝুলতে থাকে। যিনার শেষে আবার ফেরত আসে।[২৮১]
এজন্য যিনার গুনাহ মাফ করার জন্য আন্তরিকভাবে তাওবাহ করতেই হবে। তাওবাহ করার শর্ত ৩টি – ক) সেই গুনাহ এবং গুনাহের উপকরণগুলো ছেড়ে দেওয়া, খ) আন্তরিকভাবে লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা, মাফ চাওয়া এবং গ) ভবিষ্যতে এমন গুনাহ আর কখনোই করবো না- কঠোরভাবে এই সংকল্প করা।
এই তিনটি শর্ত পূর্ণ করতে পারলে তোমার তাওবাহ কবুল হবে। না হলে হবে না। তাওবাহ যেন কবুল হয় সে জন্য বেশি বেশি গোপনে দান ও ইবাদাত করা উচিত। এগুলো আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ মিটিয়ে দেয়। আন্তরিকভাবে তাওবাহ করলে আল্লাহ্ তোমাকে মাফ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। [২৮২] যার সাথে যিনা করেছো, গুনাহ মাফের জন্য তাকে তুমি বিয়ে করতে বাধ্য-এটা ভুল ধারণা।
এখন এসো প্রতারণার ব্যাপারটা দেখা যাক। যিনার গুনাহ অতি জঘন্য হওয়ার কারণে আল্লাহ তা'আলা যিনাকারী নারী-পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে ছাড়া বিয়ে করবে না এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মুমিনদের উপর এটা হারাম করা হয়েছে।' [২৮৩]
শাইখ সাদী (রহ.) তার তাফসীরে এই আয়াতের ব্যাপারে বলেছেন, 'যিনা অত্যন্ত ঘৃণ্য প্রকৃতির কাজ। মানুষের সম্মানকে যিনা এমনভাবে কলঙ্কিত করে, যা অন্য কোনো গুনাহ করে না। আয়াতে এই দিকটির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের বলছেন, ব্যভিচারী পুরুষকে শুধু ঐ নারীই স্বেচ্ছায় বিয়ে করতে পারে, যে নিজে ব্যভিচারিণী অথবা যে মুশরিক... একইভাবে, একজন ব্যভিচারী নারীকে মুশরিক অথবা ব্যভিচারী পুরুষ ছাড়া আর কেউ বিয়ে করতে পারে না।
.... আর মুমিনদের উপর এটা হারাম করা হয়েছে'-অর্থাৎ, যিনাকারীকে বিয়ে করা আল্লাহ মুমিনদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহর এ বিধানের কথা জানা সত্ত্বেও, বারবার যিনা করে এবং যিনা থেকে তাওবাহ করেনি, এমন কোনো নারী বা পুরুষকে যে জেনেশুনে বিয়ে করতে চায়— হয় সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যে বিধানসমূহ দিয়েছেন তা মানে না, যার অর্থ সে মুশরিক, অথবা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যে বিধানসমূহ দিয়েছেন তা সে মানে; তবুও জেনেশুনে একজন যিনাকারীকে সে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন ক্ষেত্রে এই বিয়ে যিনা, এবং যে বিয়ে করেছে সে যিনাকারী ও ফাসিক বলে গণ্য হবে। সে যদি সত্যকারভাবে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখতো, তাহলে এই কাজ করতো না। এ থেকে বোঝা যায়, তাওবাহ করেনি এমন যিনাকারীকে (নারী বা পুরুষ) বিয়ে করা হারাম।' [২৮৪]
এটা ব্যভিচারী পুরুষের ব্যাপারে যেমন খাটে, ব্যভিচারিণী নারীর ব্যাপারেও খাটে। তাই নিজে তাওবাহ করার সাথে সাথে, অপরজনও যদি তাওবাহ না করে, তবে বিয়ে বৈধ হবে না। তুমি আন্তরিকভাবে তাওবাহ করেছো, কিন্তু সে করেনি এমন অবস্থায় তুমি তাকে বিয়ে না করলে প্রতারণা হবে না। তবে সেও যদি আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে তাওবাহ করে তাহলে চাইলে বিয়ে হতে পারে।
৬। সে যদি বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা দেয়? মামলা খাবার ভয়ের চাইতে তুমি আল্লাহর অবাধ্য হচ্ছো, সাথে যিনা করেছো এবং এখন আবার রিলেশন চালিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছো—এই ব্যাপারটা নিয়ে তোমার বেশি দুশ্চিন্তা করা উচিত। তুমি মামলা খাবার ভয়ে তার সাথে প্রেম চালিয়ে গেলে এবং তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হলে, সেই বিয়ে তোমার জন্য জাহান্নাম হিসেবে হাজির হবে এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সুন্দর দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নেবার জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা শ্রদ্ধা, সম্মানের সম্পর্ক থাকা জরুরি। কিন্ত এক্ষেত্রে তো তা থাকছে না। কাজেই সারাজীবনের জন্য না পস্তিয়ে এখন পরিস্থিতির মুখোমুখি হও। আইনগত দিক দিয়ে 'বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ' মামলা তেমন একটা জোরদার মামলা না। [২৮৫] সবাই জানে আসলে কী হয়েছে। কাজেই মামলা করার ভয় দেখালেই হাটু কাঁপা-কাঁপি শুরু হবার দরকার নেই। আল্লাহর কাছে ক্রমাগত দু'আ করতে থাকো। তুমি একটা পাপের জীবন থেকে ফিরে আসতে চাচ্ছো। তোমার নিয়্যত যদি সঠিক থাকে, তাহলে আল্লাহ তোমার ফিরে আসার পথ সহজ করে দেবেন। ইনশাআল্লাহ।
৭। ব্রেকআপের কথা বলাতে সে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছে। তার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী- এই অপরাধবোধ আমাকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। তাছাড়া আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে মামলা করলেও আমি তো পুলিশি ঝামেলায় ফেঁসে যাব। এখন কী করবো?
এটাও বেশ কমন একটা সমস্যা। তুমি আমার সাথে রুম ডেইট করতে না গেলে আমি হাত কেটে ফেলবো। ছবি না দিলে ঘুমের ট্যাবলেট খাবো, ছাদ থেকে লাফ দেবো - এমন হুমকিও অহরহ শোনা যায়।
এগুলো হলো তোমার পার্টনারের নিপীড়ক (abusive) মানসিকতার প্রমাণ। খালি চোখে দেখলে মনে হবে, তোমার ভালোবাসার জন্য সে এমন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তার নিজের কামনাবাসনা পূরণ হচ্ছে না, তোমাকে দেখতে পাচ্ছে না, কথা বলতে পারছে না- এ জন্যেই সে এমন ধংসাত্মক কাজ করতে চাচ্ছে। তার কাছে তোমার প্রতি তাঁর ভালোবাসাটা গুরুত্বপূর্ণ না। সে যদি আসলেই তোমাকে ভালোবাসতো তাহলে তোমাকে এভাবে মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলতো না। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতো না।
এই আত্মহত্যার হুমকি বা বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কাজগুলোকে তার সাথে ব্রেকআপ করে ফেলার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। হুমকিগুলোর কারণে তুমি যদি সম্পর্ক চালিয়ে যাও, তাহলে সে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যাবে তুমি তার দাসে পরিণত হয়েছো। বাকী জীবনটা তার দাস হয়ে চরম মানসিক নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়ে কাটাতে হবে তোমার। যারা এভাবে হুমকি দেয় তারা সাধারণত আত্মহত্যা করে না। এসব হুমকি ধামকি পাত্তা দিও না। ব্রেকআপ করে ফেলো। সে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলেও, পাগলামি করলেও, তার বাবা-মা শত রিকোয়েস্ট করলেও তুমি তার সাথে কোনো যোগাযোগ করবে না। তাহলে আর এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। আর টানা কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকলে ওর শোকের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যাবে। তোমাকে ভুলে যাওয়া সহজ হবে। যদি তার উপকার করতে চাও তাহলে তার পরিবারকে একজন মনোবিদ খুঁজে দাও।[২৮৬] মনোবিদের কাছে কয়েকটা সেশন কাটালে সে ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।
তবে অনেকে আসলেই আত্মহত্যা করতে চায়। তোমার প্রেমিক বা প্রেমিকা এমন হলে সেক্ষেত্রেও ব্রেকআপ ছাড়া অন্য কিছু ভাববে না। বরং এমন হলে আরো গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্রেকআপ করতে হবে। কারণ-
ক) তার জন্য দরকার একজন মনোবিদের। তুমি তাকে সাহায্য করতে পারবে না। সে মানসিকভাবে অসুস্থ। আত্মহত্যা থেকে বাঁচানোর জন্য তুমি তার সাথে সম্পর্ক চালিয়ে গেলেও সে মানসিকভাবে সুস্থ হবে না। বরং এই আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে তোমাকে সারাজীবন নির্যাতন নিপীড়ন করে যাবে।
খ) জীবনে নানা ঝড়ঝঞ্ঝা আসেই। দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, ব্যর্থতা গিলে ফেলতে চায় অজগর সাপের মতো। এটাই জীবন। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিতে চাওয়া তার এই ভীরু দুর্বল কাপুরুষ মন জীবনের এই অন্ধকার দিনগুলোতে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে না। সে মাথা নিচু করে পরাজয় বরণ করে বারবার পালাতে চাইবে জীবন থেকে। তুমি কেন এমন একজন মানুষকে জীবন সঙ্গী বা সঙ্গীনী হিসেবে নেবে? সে তখন আত্মহত্যা করলে বা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলে তোমার বাচ্চাকাচ্চার, তোমার সংসারের কী হবে? তোমার নিজের কী হবে? ভেবেছো এসব?
আত্মহত্যা করা কবীরা গুনাহ। যে আল্লাহর নিষেধ লঙ্ঘন করে আত্মহত্যা করে, যে তার নিজের বাবা-মা'র কথা না ভেবে তাদের ভালোবাসাকে পায়ে দলে আত্মহত্যা করে, এমন মানুষের জন্য কেন তুমি নিজের জীবনকে নষ্ট করবে? কেন তোমার জীবন নিয়ে জুয়া খেলবে? কেন বাবা-মা, ভাইবোনকে কষ্ট দেবে? তুমি তো তাকে সুস্থ করেও তুলতে পারবে না। ভালোবাসা দিয়ে আমি তাকে ঠিক করে ফেলবো-এমন মিথ্যা বিশ্বাস কেবল সমস্যাকে আড়াল করে রাখবে।
প্রয়োজনে তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানিয়ে কাউন্সেলিং করার জন্য বলো। ঝগড়া করো না। কটু কথা বলো না, রাগারাগি করো না- তুই মর, আত্মহত্যা কর, যা খুশি তাই করো, জাহান্নামে যা, সুইসাইড করার সাহস থাকলে, করেই ফেলতি; এভাবে ন্যাকা কান্না কাঁদতি না- এ ধরনের কোনো কথা বলো না। মেসেজ দিও না। বিবেকের দিক থেকে এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের দিক থেকে তুমি তাহলে সেইফ সাইডে থাকবে। [২৮৭]
আত্মহত্যা করে ফেললেও তোমার নিজের অপরাধবোধে ভোগার কোনো কারণ নেই। তার মৃত্যুর জন্য কোনোভাবেই তুমি দায়ী নও। তার কাজের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে তার নিজের। তুমি তাকে আত্মহত্যা করতে বলোনি। তার বাবা-মা বা সমাজ যদি তোমাকে দোষারোপ করে তাহলে তা হবে পুরোপুরি অন্যায় ও সুস্পষ্ট যুলুম। বরং চাইলে তাদের দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলা যায় কিছুটা হলেও-কেন তারা তাদের সন্তানের মানসিক অবস্থার ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখেনি? আল্লাহ তোমাকে এজন্য পাকড়াও করবেন না। [২৮৮]
'প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী থাকবে। কেউ অন্যের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।' [২৮৯]
৮। আমরা পবিত্র প্রেম করি। আমরা হাতও ধরি না, এক রিকশায় পাশাপাশি বসলেও দূরত্ব বজায় রাখি, চোখে চোখ রাখলেও চোখ মারি না। তাছাড়া আমরা একে অপরকে দ্বীন পালনে উদ্বুদ্ধ করি। ফজরের নামাযে ডেকে দেই। আর আমরা বিয়ের নিয়্যাতে প্রেম করছি। একে অপরকে জানছি, চিনছি, বুঝছি। আমাদের ব্রেকআপ করার কী দরকার?
আলকেমি এবং চশমা লেখা দুটো আবার পড়ে এসো। এবার নিজেকে প্রশ্ন করো তুমি যে অজুহাতগুলো দিচ্ছো-এগুলো আল্লাহর সামনে হাশরের ময়দানে দিতে পারবে কি না। নিজেকে প্রশ্ন করো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনটা করতে বলেছেন কি না? সাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈগণ এমন করে বিয়ের উদ্দেশ্যে, দ্বীন শেখার নামে প্রেম করেছেন কি না? নিজেকে প্রশ্ন করো, ওকে নিয়ে তোমার মনে কখনো খারাপ চিন্তা এসেছে কি না? আমাদের উত্তর দেওয়া লাগবে নিজেকে উত্তর দাও।
হালাল মদ, হালাল পতিতালয় বলে যেমন কিছু নেই, তেমনি পবিত্র প্রেম বলে কিছু নেই। এভাবে 'পবিত্র প্রেম' করতে গিয়ে অহরহ যিনা হয়ে যায়। কমসেকম পর্ন মাস্টারবেশনে আসক্ত হয়ে যায়। এর প্রমাণ ভুরিভুরি, অতীতে ও বর্তমানে।
৯। এই নষ্ট হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে ভালো মেয়ে কি পাবো? প্রেম না করলে ফ্রেশ মেয়ে পাওয়া যা না... এরেঞ্জড ম্যারেজ করা মানে সেকেন্ডহ্যান্ড, অন্যের ইউজড জিনিস বিয়ে করা, প্রেম না করলে দ্রুত বিয়ে করতে পারবো না...
না, এ ধরনের চিন্তাভাবনা ভুলেও করবে না। আল্লাহর অবাধ্য হবার জন্য অজুহাত তৈরি করবে না। বিয়ে করার জন্য আল্লাহ প্রেম করার শর্ত দেননি। দ্রুত বিয়ে করার জন্য সাহাবীরা প্রেম করতেন না, বরং আর্থিক, মানসিক, শারীরিক যোগ্যতা অর্জন করতেন। তুমি এসব অর্জনের চেষ্টা না করে কেন প্রেম করছো? সকালে ঘরে খাবার নেই, দুপুরে খাবার পাওয়া যাবে-এই জন্য কি তুমি পাশের বাসায় গিয়ে শূকরের মাংস খাবে?
যারা ভালো মেয়ে, তারা তোমার আমার সাথে এসে ইনবক্সে গুতাগুতি করবে না, ঢলাঢলি করবে না। জাস্ট ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ড কালচার, রিকশায় ঘোরাঘুরি করা, প্রেম করা, ভালোবাসার প্রমাণ দেখানোর জন্য ভিডিও কলে কাপড় খোলা বা লিটনের ফ্ল্যাটে যাওয়া তো বহু দূরের কথা। এই এক শ্রেণীর মেয়েদের দেখেই পৃথিবীর তাবৎ মেয়ে সম্পর্কে এমন বাজে ধারণা করে ফেললাম আমরা?
'যে আল্লাহকে ভয় করে আর ধৈর্য ধরে, আল্লাহ এমন ভালো মানুষদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।' [২৯০]
ভাই দেখ, অনেক ভালো মেয়ে আছে। তুমি যেমন এই ঘোর কলুষতার বর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে রাখার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ করে যাচ্ছো, বিশ্বাস করো তেমনি এই একই আকাশের নিচে, একই পৃথিবীর বুকে অসংখ্য বোনেরাও দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যাচ্ছে, অপেক্ষা করে আছে কবে পবিত্রতার ঘোড়ায় চড়ে আসবে তার রাজপুত্র। কবে এই দমবন্ধ হয়ে আসা পৃথিবীতে তারা দুজনে মিলে দু'রুমের ভাড়া বাসায় একটুকরো জান্নাত রচনা করবে। এসবের কতোটুকুই বা তুমি জেনেছো? ভেবেছো?
চতুর্দিকে ভালোবাসার আকাল দেখে তুমি হতাশ হবে না। যদি তুমি পবিত্র থাকো, যদি তোমার ভালোবাসা, জীবনসঙ্গিনীর জন্য অপেক্ষা মৌলিক হয় তাহলে আল্লাহ তোমাকে নিশ্চিত ভালো একজন মেয়ের সাথে জুড়ি বেঁধে দিবেন। জীবনের ভালোবাসা হয়তো কোনো এক ভোরে চুপ করে কড়া নাড়বে তোমার দরজায়। তারপর শুরু হবে পৃথিবীর পথে নতুন এক পথচলা। যে পথের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে দুষ্টুমি, খুনসুটি, মান-অভিমান, মায়া, মমতা আর সত্যিকারের পবিত্র ভালোবাসা।
একটু কষ্ট সহ্য করো। অন্তরে গেঁথে নাও একটি কথা - জান্নাতের প্রথম মুহূর্তেই তুমি ভুলে যাবে দুনিয়ার সব দুঃখকষ্ট!
টিকাঃ
[২৭৭] The Difference Between a Haram Relationship and Love, IslamQA- tinyurl. com/4k3xjdxj
যে প্রেমের শেষ পরিণতি হচ্ছে বিয়ে: সেটা কি হারাম? tinyurl.com/2vzyt46w
Love and Correspondence Before Marriage, IslamQA- tinyurl.com/5c753cc6
[২৭৮] বইয়ের কলেবর ছোট রাখার জন্য আমরা এখানে কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য হলাম। এই পিছুটানগুলো ছাড়াও আরো অনেক পিছুটানের বিস্তারিত আলোচনা পাবে এই লিংকে- Lost Modesty ফেইসবুক পোস্ট, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২২- tinyurl. com/dsm82r8a অবশ্যই অবশ্যই পড়ে নাও।
[২৭৯] কু-প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিলো প্রেমিক, আরটিভি, জুলাই ২৬, ২০২২- tinyurl.com/5yerrzc2
নগ্ন ছবি পোস্ট করার ভয় দেখিয়ে ফেসবুক বান্ধবীকে ধর্ষণ, ঢাকাটাইমস, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮-tinyurl.com/mraj7vem
অনলাইনে প্রেম, বিয়ের আশ্বাসে নগ্ন ভিডিও ধারণ: অবশেষে ব্ল্যাকমেইল, voiceofasiabd.net, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১- tinyurl.com/3d3f6us5
অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ভাইরাল, স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা, ডিবিসি নিউজ, ফেব্রুয়ারি ২১,২০২১ tinyurl.com/dfy2t9wp
[২৮০] অশ্লীল ছবি ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা, মানবকণ্ঠ, জুলাই ০৫, ২০২১- tinyurl.com/bdfr4kcs
অনলাইনে প্রেম করে আপত্তিকর ভিডিও সংগ্রহঃ ফাঁদে ফেলে টাকা আদায়, crimediarybd. com, অক্টোবর ২২,২০২০- tinyurl.com/dkx8afcp
[২৮১] আবু দাউদ: ৪৬৯০। ইবনু হাজার হাদিসটিকে সহীহ সনদে বর্ণিত বলেছেন। (ফাতহুল বারী ১২/৬১ হা: ৬৭৭২ এর ব্যাখ্যায়।)
[২৮২] সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০
[২৮৩] সূরা আন-নূর, ২৪:৩
[২৮৪] তাফসীরে সাদী, সূরা আন-নূর, আয়াত ৩
[২৮৫] বিয়ের প্রলোভনে 'ধর্ষণের' অভিযোগ: আইনি ভিত্তি কতটুকু? যায়যায়দিন, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২২- tinyurl.com/2pjvnvmz
[২৮৬] তোমাকে যে খুঁজে দিতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
[২৮৭] সমাজের মুরুব্বী স্থানীয় কাউকে বিষয়গুলো জানিয়ে রাখা যেতে পারে। সেই সাথে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে অভিভাবক শ্রেণীর কাউকে সঙ্গে নিয়ে থানাতে জিডি করে রাখতে পারো। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করে, তাহলে যে ব্যক্তি আত্মহত্যায় সাহায্য করবে এবং প্ররোচনা দান করবে, সে ব্যক্তিকে ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হবে। তা ছাড়া সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ৩২ ধারায় বলা আছে, আত্মহত্যাকারীর মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া সুইসাইড নোট প্ররোচনা দানকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে শুধু একটি সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না। সুইসাইড নোটের সমর্থনে আরও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। এখন তুমি যদি ফোনে, মেসেজে বা অন্যকোনোভাবে তাকে আত্মহত্যার প্ররোচরনামূলক কোনো কথা না বলো তাহলে সুইসাইড নোটে সে যদি তোমার নাম লিখেও রাখে তাহলেও তোমার কিছুই হবে না ইন শা আল্লাহ। কারণ তুমি তাকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচনা দাওনি। আর তুমি আগেই যেহেতু তার বাবা মাকে বিষয়টি জানিয়েছ (প্রমাণস্বরূপ মেসেজের স্ক্রিনশট, কলরেকর্ড রেখেছো), প্রয়োজনে জিডি করে রেখেছ, বা সমাজের মুরুব্বী স্থানীয় কাউকে জানিয়ে রেখেছো কাজেই তোমার কোনো ভয় নেই। তোমার কিছুই হবে না ইন শা আল্লাহ।
[২৮৮] How to end a Haram relationship? assimalhakeem.net, Aug 17, 2021 - tinyurl.com/4ba6ttn3
[২৮৯] সূরা আল আন'আম, ৬:১৬৪
[২৯০] সূরা ইউসুফ, ১২:৯০
📄 মোহমুক্তি
ব্রেকআপ করার ক্ষেত্রে তোমার প্রথম কাজ হলো তাওবাহ করা। কেন ব্রেকআপ করছো, কার জন্য, কিসের জন্য করছো-খুব স্পষ্টভাবে এটা মাথায় থাকতে হবে। কোনো অস্পষ্টতা, মনকে বুঝ দেওয়া ভাসাভাসা ধারণা থাকলে চলবে না। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে, এটা যেমন সত্য, তোমার ব্রেকআপ করার মূল লক্ষ্য হলো-আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, এই বাক্যটাও তেমন সত্য হতে হবে। যেমনটা আমরা একটু আগেই আলোচনা করলাম।
খুব ভালো হয়, তাওবাহ করার নিয়তে রাতের শেষ ভাগে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলে। [২৯১] শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত গুনাহ হয়েছে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাও। আর কক্ষনো না করার নিয়তে ক্ষমা চাও। আর তুমি নিশ্চয়ই জানো যার তাওবাহ কবুল হয়, আল্লাহ তার সব গুনাহ মুছে দেন। শুধু তাই না, ওই গুনাহগুলোর বদলে সমপরিমাণ ভালো কাজ আমলনামায় লিখে দেন আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা।
এরপর একটা মেসেজ লিখতে হবে। এটাই হবে তোমার প্রেমিক/প্রেমিকাকে পাঠানো শেষ মেসেজ। মেসেজের ভাষা অনেকটা এমন হতে পারে...
আমরা যা করছি তা হারাম। আমি আল্লাহকে ভয় করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে সরে যাচ্ছি, তাওবাহ করে রিলেশন শেষ করে দিচ্ছি। আমার সাথে আর কখনোই যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। তোমার জন্যে এটা কষ্টের হতে পারে। আমার জন্যেও কাজটা কষ্টকর। তবে জাহান্নামের আগুনে পোড়ার কষ্টের তুলনায় এই কষ্ট কিছুই না। আমি জাহান্নামের আগুনে পুড়তে চাই না, আমার কারণে তুমি জাহান্নামের আগুনে পুড়ে যাও, এটাও চাই না। তুমিও তাওবাহ করে ফেলো, নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করো।
কোনো অপমানজনক কথা বলো না। তার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলো না। যেমন- তুই আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছিস, তুই আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবি, তোর সাথে আজকে থেকে ব্রেকআপ, তোকে নিয়ে আমি আর ভাববো না, তুই মরে যা জাহান্নামে যা, আমার কিছু যায় আসে না – এ ধরনের সব কথা অপ্রয়োজনীয়। বিশাল লম্বা মেসেজ লিখবে না। মেসেজে দুঃখবিলাসী কথাবার্তা থাকবে না। অযথা ভাষার কারিগরি এড়িয়ে যাবে। একেকটা শব্দ লিখবে আর নিজেকে প্রশ্ন করবে, এই শব্দটা লেখার দরকার আছে কি না। আমার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এই লাইনটা কি জরুরি? নাকি অন্য কোনো কারণে আমি এই কথাগুলো যুক্ত করছি?
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে:
১। মেসেজ পাঠাবে। ফোন করে বা দেখা করে বলবে না। অনেকেই বলে ব্রেকআপ মেসেজ পাঠিয়ে করা উচিত নয়। ফোনে কথা বলতে গেলে বা কোথাও দেখা করে ব্রেকআপ করতে গেলে তুমি আবেগ ধরে রাখতে নাও পারো। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এবং তুমি আবার প্রেমের মায়াজালে, শয়তানের ফাঁদে পড়ে যেতে পারো।
২। মেসেজ রাতে পাঠাবে না। রাতে মানুষ একা থাকে। ইমোশনাল সাপোর্ট পাবার সুযোগ কম থাকে। এ সময় তোমার মেসেজ পেয়ে সে আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
৩। আদর্শ ব্রেকআপ বলে কিছু নেই। ব্রেকআপ করার জন্য আদর্শ দিন বলেও কিছু নেই। আজ করবো, কাল করবো এভাবে ব্রেকআপ করার সময় পেছাবে না। ব্রেকআপে কষ্ট থাকবেই। এটা মেনে নিতেই হবে। তাকে কষ্ট না দিয়ে, নিজে কষ্ট না পেয়ে এমনভাবে ব্রেকআপ করবো যেন দুইজনেই জিতে যায়, কেউ হেরে না যায়-এমন আসলে হয় না। এমন প্ল্যান করতে করতে দেখা যাবে তুমি ব্রেকআপই করতে পারছো না।
৪। মেসেজ সিন হলে ফোন থেকে ওর নাম্বার ব্লক করে দাও। সবচেয়ে ভালো হয় সিম বদলে ফেললে। ফেসবুকসহ অন্য সব প্ল্যাটফর্মে তার আইডি ব্লক করে দাও, চ্যাট হিস্ট্রি মুছে দাও। নিজের পুরানো পোস্টগুলো ডিলিট দিয়ে দিও। দরকার হলে পুরনো আইডি ডিলিট দিয়ে, নতুন করে খুলো। মোবাইল-পিসি, ড্রাইভ থেকে সব ছবি, ভিডিও মুছে ফেলো। কোন উপহার যদি থাকে নষ্ট করে ফেলো বা দান করে দাও। ভুলেও তার সাথে আর কোনোভাবে যোগাযোগ করা যাবে না, তার ছবি দেখা যাবে না, স্মৃতি ঘাঁটা যাবে না। মনের গভীরে চিরুনী তল্লাশি চালিয়ে ওর সব স্মৃতিগুলোকে গ্রেফতার করে আমৃত্যু হাজতে ভরে দাও। তোমাদের রিলেশনের ব্যাপারে পরিচিত যতো জন জানতো, সবাইকে পারসোনালি বলে দাও তুমি আল্লাহর আজাবকে ভয় করে। তাওবাহ করে রিলেশন থেকে সরে এসেছো। তাই এই বিষয় নিয়ে কেউ যেন আর কোনো কথা ভুলেও না তুলে। লাইফ থেকে তাকে একেবারে শিফট ডিলিট মেরে দাও।
৫। ব্রেকআপ একাকী করবে। এর মাঝে ওর বা তোমার কোনো বন্ধু আত্মীয়স্বজন, কাযিনকে টানবে না। এতে অযথা ঝামেলা তৈরি হবার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া তাদের কথাতে প্রভাবিত হয়ে তুমি তখন ব্রেকআপ না-ও করতে পারো。
৬। সে আর একবার দেখা করতে চাইবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তোমার কথা সামনাসামনি শুনে 'বুঝতে' চাইবে, অথবা আরেকবার নিজেকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ চাইবে। বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনের মাধ্যমে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইবে। অন্য আইডি থেকে বা অন্য নাম্বার থেকে ফোনও করতে পারে। ভুলেও তার সাথে আর একটা শব্দও কথা বলা যাবে না। ওর কণ্ঠ শুনলে, মেসেজের রিপ্লাই দিলে তুমি আবার তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাবার ঘোরতর আশঙ্কা থাকে। অন্তত শেষবারের মতো দেখা করতে দাও-এই কান্নাজড়ানো আবদার রাখতে গিয়ে দেখা করতে গেছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের যিনা করে ফেলেছে, এমন বেশ কিছু ঘটনা শুনেছি।
৭। সে ইসলামের পথে ফিরে আসলো কি না, তা চেক করার জন্য যোগাযোগ করবে না। ওর টাইমলাইনে ঘোরাফেরা করবে না, বা পরিচিত কারো মাধ্যমে খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করবে না।
দেখো ভাইয়া, দেখো আপু! এই যে এই কথাগুলো লিখছি, আমার নিজেরও তোমার কথা ভেবে অনেক কষ্ট হচ্ছে! কিন্তু জাহান্নামের আগুনের কষ্ট তোমার ব্রেকআপের কষ্টের চেয়ে হাজার কোটি গুণ যন্ত্রণাদায়ক। জান্নাতের পথ দুঃখ কষ্ট দিয়ে ঘেরা।[২৯২] তাই বৃহত্তর কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই কষ্টটুকু সহ্য করে নাও।
'...তোমরা যা অপছন্দ করো হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা ভালোবাসো হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন তোমরা জানো না।[২৯৩]
ব্রেকআপ তো করে ফেললাম, কিন্তু আমি কি ওকে ভুলতে পারবো? ঠিক থাকতে পারবো? ওর সাথে আবার বোধহয় যোগাযোগ করে ফেলবো, ওর চোখের জল দেখে আমার শত প্রতিজ্ঞা হয়তো মোমের মতোই গলে যাবে... এসব ভেবে দুশ্চিন্তা করবে না। মনোবল হারাবে না। তুমি তোমার নিয়্যতকে পাক্কা করো, আল্লাহর উপর ভরসা করো, আল্লাহ তোমাকে ঠিকই ট্র্যাকে রাখবেন...
আর যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ করে দেবেন...[২৯৪] আর যে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।[২৯৫]
টিকাঃ
[২৯১] রাতের শেষভাগেই করতে হবে এমন না। যেকোনো সময় যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর কাছে তাওবাহ করা যায়।
[২৯২] নাসায়ী ৩৭৬৩, তিরমিজী: ২৫৬০ ও আবু দাউদ: ৪৭৪৪, সহীহ আত-তারগীব। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
[২৯৩] সূরা বাকারাহ, ২:২১৬
[২৯৪] সূরা তালাক, ৬৫:২
[২৯৫] সূরা তাগাবুন, ৬৪:১১