📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 হাতের মুঠোয় মরীচিকা

📄 হাতের মুঠোয় মরীচিকা


এক.
প্রেম বলতে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও সমাজে যে ব্যাপারটাকে বোঝানো হয়, সেটার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এতো এতো তথ্য আর আলোচনার পরও কেউ একটা আপত্তি হয়তো তুলতে পারে। কেউ হয়তো বলতে পারে –
আমি তো এমন অনেককে দেখেছি যারা চুটিয়ে প্রেম করেছে। শরীরের আনন্দ ভাগাভাগি করেছে দেদারসে। কিন্তু তাদের তো তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। কেউ আত্মহত্যা করেনি, মাদকাসক্ত হয়নি, পরীক্ষায় ফেল করেনি, ডিপ্রেশনে ভোগেনি। বরং এদের সফল ক্যারিয়ার আছে, অনেকের রিলেশনশিপ বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেই বিয়ে দিব্যি ঠিকঠাক চলছে। অনেকে বিয়েই করেনি, এখনো দিব্যি এইসব করে বেড়াচ্ছে। মজায় আছে। প্রেম-ভালোবাসার যে ছবিটা আপনি আঁকলেন, তার সাথে এই বাস্তবতা তো মেলে না। এ ধরনের উদাহরণগুলো আপনার কথাকে নাকচ করে দেয়।
হ্যাঁ, প্রেমের সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মাত্রায় ভোগান্তি নিয়ে আসলেও, 'সফল' প্রেমের গল্পও পাওয়া যায়। কিন্তু এ থেকে আসলে আমাদের বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয় ভগ্ন।
আবারো মনে করিয়ে দেই, আমাদের মূল বক্তব্য আসলে কী। আমরা বলছি, প্রেমের সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসে। সেই নেতিবাচক পরিণতির মাঝে আছে প্রতারণা, প্রেমিক-প্রেমিকাকে ব্যবহার করা, ব্ল্যাকমেইলিং, ডিপ্রেশন, পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারে প্রভাব, মাদকাসক্তি, অবাধ যৌনাচার, ধর্ষণ, পরিবারের ভাঙন, অপরাধ ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেলে সেটা অধিকাংশ ফলাফলকে নাকচ করে না।
ধরো, সাত তলা থেকে লাফ দিলে সবাই মারা যায় না। শতকরা ১০% মানুষ হয়তো এর পরও বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু তার মানে কিন্তু এই না যে, যেহেতু ১০০% মানুষ মারা যাচ্ছে না, যেহেতু সাত তলা থেকে 'সফল লাফানো'র উদাহরণ আছে, তাই সবাই সাত তলা থেকে এখন লাফানো শুরু করবে। অথবা সবাইকে সাত তলা থেকে লাফাতে উৎসাহিত করা হবে। কাজটাকে খুব চমৎকার, সুখের কিছু একটা হিসেবে তুলে ধরা হবে!
একইসাথে এটাও মনে রাখা দরকার যে প্রেম, যিনা এবং যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এর আছে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও সভ্যতাগত নেতিবাচক প্রভাব। আমরা এরই মধ্যে আলোচনা করেছি, কীভাবে এ বিষয়গুলো ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার ও সভ্যতাকে ধ্বংস করছে তিলে তিলে। কাজেই, অনেকে 'মজায় আছে', এই উদাহরণ ব্যক্তিপর্যায়ে টানা গেলেও, সামষ্টিক যে নেতিবাচক প্রভাব সমাজ ও সভ্যতার ওপর পড়েছে, সেই বাস্তবতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রেম নেতিবাচক ফলাফল আনে, অতএব প্রেম থেকে দূরে থাকো-এটি আমাদের দাবি না। প্রেমের ব্যাপারে আমাদের মৌলিক আপত্তি হলো, প্রেম মহান আল্লাহর অবাধ্যতা, যা মানুষকে বিভিন্ন গুনাহর দিকে নিয়ে যায়। প্রেম সম্পর্কে আমরা যেভাবে ভাবতে অভ্যস্ত তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, এ কথা স্পষ্ট। বিয়ের বাইরে মহান আল্লাহ যৌনতার স্বাধীনতা দেননি। এটি কবীরা গুনাহ। আর কোনো রিলেশনশিপে যদি যৌনতা না-ও থাকে, তবুও সেখানে গাইর-মাহরামের সাথে কথা বলা, দেখা করা, একাকী সময় কাটানো, 'সম্পর্ক গড়ে তোলা'-র মতো অনেক বিষয় থাকে যা পরিষ্কার হারাম। মহান আল্লাহর অসংখ্য বিধানের স্পষ্ট অবাধ্যতা। দুনিয়াতে যদি কেউ এই গুনাহগুলোর ফলাফলের মুখোমুখি হওয়া থেকে বেঁচেও যায়, আখিরাতে তাকে অবশ্যই মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। কাজেই কেউ যদি দুনিয়াতে বস্তুবাদী অর্থে প্রেম করে 'সফল'ও হয়, তবু বিচারের দিনে তাকে এক মহাবিপর্যের সম্মুখীন হতে হবে। প্রেম এমন এক পথ যা মানুষকে ক্রমেই আরো বড় বিচ্যুতির দিকে নিয়ে যায়। হয়তো শুরুটা হয় চোখের দেখা থেকে। কিন্তু ধীরে ধীরে এক গুনাহ অসংখ্য গুনাহর পথ খুলে দেয়।
আর ব্যাপারটা শুধু জেনেশুনে আল্লাহর অবাধ্যতা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেই অবাধ্যতাকে মানুষ উদযাপন করছে, এ নিয়ে গর্ব করছে, সবার সামনে নিজের গুনাহ প্রকাশ করছে এবং এই অবাধ্যতাগুলোকে সমাজে একরকম নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো চরম বিপর্যয়। আর সেই বিপর্যগুলোর কিছু কিছু আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের পুরো আলোচনা গড়ে উঠেছে এই অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে।
দুই.
বস্তুবাদী, সেক্যুলার চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে যাবার কারণে গুনাহর ব্যাপারে আমাদের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। ভালোমন্দ বা হারাম-হালালের ব্যাপারে মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত জানাটাই যে যথেষ্ট, এখানে যে আর বাড়তি তথ্যউপাত্ত, যুক্তিতর্কের দরকার নেই, এই উপলব্ধি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের অন্তরগুলো মরে গেছে। তাই আমরা শুধু অজুহাতের খোঁজ করি অথবা নানা যুক্তিতর্ক হাতড়ে বেড়াই। সহজ বিষয়গুলো তখন আর সহজে বোঝা যায় না。
একটা তথাকথিত সফল প্রেমের ক্ষেত্রে কী ক্ষতিগুলো হয়, এসো সংক্ষেপে একটু দেখা যাক। প্রেম হলো মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা মেটানোর অবৈধ পথ। এই অবৈধ পথের অনেক ক্ষতি আছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো, এই পথ বান্দাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের মাঝে দেওয়াল তুলে দেয়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এর একটা বই আছে, 'ইথাসাহ আল-লাহফান মিন মাসায়িদিশ-শাইত্বান'। বইটাতে তিনি সুন্দর একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আমাদের কোনো একজন সালাফকে (নেককার পূর্বসুরী) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ভালোবাসার ব্যাপারে। উত্তরে তিনি খুব সুন্দর একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেন,
'ভালোবাসা দিলের একটি রোগ। যেসব মানুষের দিল (বা মন) আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ কোনো মাখলুকের গোলাম বা বান্দা বানিয়ে দেন।'
ইবনুল জাওযী (রহ.)-ও এমনটা বলেছেন,
'প্রেমিকদের মন-মগজ প্রথম পর্যায়েই স্রষ্টার চিন্তা থেকে উদাসীন হয়ে যায়। আল্লাহর পরিচয়, আল্লাহর ভয় তথা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চিন্তা তার অন্তরে থাকে না। এরপর যতো হারাম কাজ করে, ততো বেশি আখিরাতের ক্ষতিতে জড়িয়ে পড়ে। আপন সৃষ্টিকর্তার কঠোর শাস্তির হকদার সাব্যস্ত হয়। এভাবে সে যতোই তার কামনা ও প্রেমাসক্তির নিকটবর্তী হয়, ততোই তার প্রতিপালকের থেকে দূরবর্তী হয়ে যায়।' [২১৮]
তিনি আরো বলেন,
'নারী আসক্তি ও গুনাহের কারণে অন্তর মরে যায়, ফলে সে আল্লাহর কাছে মুনাজাতের স্বাদ পায় না, পবিত্র কুরআন তার অন্তরে অবস্থান করে না। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাসহ অন্যান্য ইবাদত তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। আরো অনেক অবক্ষয় রয়েছে, যা তাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে নেয়, যা সে অনুধাবনও করতে পারে না। তার অন্তরের দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত হয় গুনাহের অন্ধকার, নষ্ট হয়ে যায় তার অন্তর দৃষ্টি'।[২১৯]
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন,
'জেনে রাখো, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ব্যতিত কোন কিছুকে ভালোবাসবে, অবশ্যই তার ভালোবাসার বস্তুটি তার ক্ষতি করবো।...
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ব্যতিত যে ব্যক্তি কোন কিছুকে ভালোবাসবে, পাওয়া যাক বা না পাওয়া যাক, তার কারণে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে সে না পাওয়ার শাস্তি ও কষ্ট ভোগ করবে। আর যদি পাওয়া যায় তাহলে সে তা যতটুকু উপভোগ করতে পারবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাবে।' [২২০]
ব্যাপারটা একবার চিন্তা করো, তুমি নিজের হাতে মহান আল্লাহর সাথে তোমার সম্পর্কের মাঝে দেওয়াল তুলে দিচ্ছো। যে আল্লাহ তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, শত নাফরমানি সত্ত্বেও যে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত, যে আর-রাহমান প্রতিনিয়ত তোমাকে রিযক দিয়ে যাচ্ছেন, যাঁর দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা, তুমি নিজে তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছো! কেন? একটা তুচ্ছ মানুষের জন্য? কিছু সস্তা সুখের জন্য? শরীরের আরামের জন্যে? এ কেমন অভিশপ্ত লেনদেন?
প্রেম অনেক সময় হারামের গণ্ডি পেরিয়ে আরো ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ ব্যাপারে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন,
'প্রেম কখনো এমনও হয় যে তা কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে যায়... ওই ব্যক্তির মত যে তার প্রেমাস্পদকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে, আল্লাহকে যেভাবে ভালোবাসে, তাকে সেভাবেই ভালোবাসে।'
অতিরঞ্জন মনে হচ্ছে? মুঝে তুঝমে রাব দিখতা হ্যায়...বান গ্যায়ে হো তুম মেরে খুদা...এ ধরনের গান কিন্তু একেবারে কম না!
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ ধরনের প্রেমের কিছু লক্ষণ বলে দিয়েছেন। সেগুলো দেখলে বিষয় টা আরো পরিষ্কার হবে। তার মতে, এ ধরনের প্রেমের লক্ষণ হলো:
'প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দেবে। যদি কখনো আল্লাহর হক আর প্রেমাস্পদের হকের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন আল্লাহর হকের ওপর প্রেমাস্পদের হককে প্রাধান্য দেবে।' [২২১]
একটু ভালো করে ভেবে বলো তো, প্রেমের সম্পর্কে এমন ব্যাপার ঘটে কি না? উত্তরটা কাউকে বলতে হবে না, শুধু নিজের কাছে স্বীকার করলেই হবে। তোমাদের মনে করিয়ে দেই, ইসলামের খুব বেসিক একটা কনসেপ্ট হলো- আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে ভালোবাসতে হবে দুনিয়ার সবার চাইতে, সবকিছুর চাইতে বেশি। তাঁরা হবেন আমাদের জীবনের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তাঁরা আসবেন সবার প্রথমে। স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) প্রকৃত বিশ্বাসী হবার এই শর্ত আমাদের জানিয়েছেন।
আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা বলছেন, 'কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহকে অন্য যে কোনো কিছুর চাইতে বেশি ভালোবাসে'। [২২২]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তানাদি ও দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হবো।।[২২৩]
কাজেই যেটাকে তুমি সফল প্রেম মনে করছো, সেটা আসলে চরম ব্যর্থতা। ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। একজন মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেকে মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। হৃদয়ে ঈমানের স্বাদকে নষ্ট করে ফেলছে নিজের হাতেই। একের পর এক গুনাহে জড়াচ্ছে, পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে অবাধ্য গভীর থেকে আরো গভীরে। কেন? একজন মানুষের জন্য। একজন নশ্বর মানুষের জন্য। যার জন্ম হয়েছিল এক ফোঁটা বীর্য থেকে আর মৃত্যুর পর যার ঠাঁই হবে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। একজন মানুষ, যে তার শরীরের ভেতরে আবর্জনা বয়ে বেড়ায়। দিন দিন যার বয়স বাড়ে, যার চোখের আলো স্তিমিত হয়ে আসে, চামড়া ঝুলে পড়ে, সৌন্দর্য মলিন হয়ে যায়। একজন মানুষ, মৃত্যুর পর যার শরীর পচে যায়। মাটির সাথে মিশে যায়।
এর জন্য জান্নাতকে পায়ে ঠেলা? আল্লাহর অবাধ্য হওয়া? জাহান্নামের দিকে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়া?
আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয়টা কি জানো? মহান আল্লাহ তোমাকে একা থাকতে বলছেন না। তিনি তোমাকে বলছেন না, সব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, শুধু কষ্টে কষ্টে জীবনটা পার করে দিতে। তুমি পৃথিবীতে ভালোবাসতে পারবে, আনন্দিত হতে পারবে, সুখী হতে পারবে, যৌনতার স্বাদ নিতে পারবে। কোনো কিছুতেই আল্লাহ তোমাকে বাধা দিচ্ছেন না। তোমাকে শুধু কাজগুলো করতে হবে মহান আল্লাহর ঠিক করে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী, ব্যস! আর তাহলে তুমি আখিরাতের শাস্তি থেকে বাঁচবে, দুনিয়ার জীবনে বারাকাহ পাবে এবং সমাজ, পরিবার ও সভ্যতা সমৃদ্ধ হবে।
তারপরও মানুষ অবাধ্য হচ্ছে। অসীমকে উপেক্ষা করে সীমিতর পেছনে এ কেমন ছুটে চলা? একে উন্মাদনা ছাড়া আর কিছু কি বলা যায়?

টিকাঃ
[২১৮] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ, দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮
[২১৯] যাম্মুল হাওয়া, ইবনুল জাওযী (র.), পৃষ্ঠা ২১৯
[২২০] মাজমু'উল ফাতাওয়া ১/২৮-২৯
[২২১] আদ-দা' ওয়াদ-দাওয়া', ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.), দারু ইবন হাযম প্রকাশনী, ২০১৯ ঈ. পৃ: ৪৮৮
[২২২] সূরা বাকারাহ, ২:১৬৫
[২২৩] বুখারি: ১৫, মুসলিম: ১৬ (ইফা.)

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 এ কেমন বোকামি?

📄 এ কেমন বোকামি?


মানুষ একা বাঁচতে পারে না। মানুষের সঙ্গীর দরকার। কিন্তু ফ্যান্টাসি দরকার না। সত্যি কথা বলতে তুমি আসলে কষ্ট করতে চাচ্ছো না, বিয়ের মাধ্যমে সঙ্গী পাবার জন্য যে কষ্ট করতে হয়, যে সংগ্রাম করতে হয়, যে যোগ্যতাগুলো অর্জন করার চেষ্টা করতে হয়, তুমি সেটা করার কথা ভাবছো না। এই জিনিসটাকে এড়িয়ে তুমি প্রেমের শর্টকাট খুঁজছো। বাস্তবতার মুখোমুখি হবার সাহস তোমার নেই। তুমি পালিয়ে বেড়াতে চাচ্ছো।
তুমি ফল চাচ্ছো, কিন্তু সে ফল পাবার জন্য যে কষ্ট করতে হয়, তা করতে চাচ্ছো না। সেগুলোকে তোমার কাছে বোরিং মনে হয়, ফালতু মনে হয়। তুমি সঙ্গী চাচ্ছো, কিন্তু একটা সম্পর্কে জড়ালে তোমার দায়িত্ব কর্তব্য কী হবে, সেগুলো তুমি জানো না, জানার কোনো আগ্রহও নেই। তাহলে কীভাবে হবে বলো?
দিনশেষে বারবার তুমি এটাই প্রমাণ করছো যে তুমি ইমম্যাচিউর। একূলও হারাচ্ছো, ওকূলও হারাচ্ছো। তুমি একটার পর একটা রিলেশনে জড়িয়ে এখন যেমন দুঃস্থ সময় পার করছো। তেমনি ভবিষ্যৎ জীবনটাকেও বিষিয়ে দিচ্ছো। সবচেয়ে ভয়ংকর এবং গুরুতর ব্যাপার হলো তুমি ক্রমাগত মহান আল্লাহর অবাধ্য হচ্ছো। গুনাহ করছো। নিজের আখিরাত নষ্ট করছো নিজ হাতে। এসব করার কোনো মানে হয়?
দেখো, এই বয়সে জীবন তোমার জন্য যতো উপহারের পসরা সাজিয়ে বসেছে, বয়স যখন ২৫/২৬ হয়ে যাবে বা ৩০ পার করবে, তখন তা থাকবে না। জীবন কৃপণ হয়ে যাবে। সুযোগের কথা বাদ দাও, ত্রিশ বছর বয়সে তোমার কাঁধে এমন অনেক দায়িত্ব কর্তব্য চলে আসবে যা এখন নেই। বিগত বছরগুলোতে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আসা ক্লান্ত বাবা তোমার ঘাড়ে দায়িত্ব তুলে দিয়ে অবসরে যেতে চাইবেন। তুমি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারবে না। দুনিয়া সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। এখন তোমার হাতে অনেক সময়, অনেক অবসর, জীবন তোমার প্রতি উদার। গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের পেছনে না ছুটে, সেক্সের জন্য ভাদ্র মাসের কুকুরের মতো সব জায়গায় কড়া না নেড়ে বরং সুযোগগুলোকে কাজে লাগাও। বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। একটু ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের ফল মিষ্টি। সিঙ্গেল থাকলে মানুষ মারা যায় না।
এখন তোমার হাতে অফুরন্ত সময় আছে। এ সময় নষ্ট করো না। অন্য কোনো মানুষের দাসে পরিণত হয়ো না। ডিম পাড়া রাজ হাঁসকে অতি লোভে নষ্ট করে দিও না। ধৈর্য ধরে তার সেবা যত্ন করতে থাকো। সোনার ডিম পেতেই থাকবে তুমি। ইন শা আল্লাহ্ একসময় তোমারও সঙ্গী হবে। তোমারও সন্তান হবে। এখন যে জিনিসগুলো নিয়ে তুমি আফসোস করছো, তখন এগুলোর কথা মনে হলে তোমার হাসি পাবে!
প্রিয় ভাইয়া, প্রিয় আপু! তথাকথিত এই প্রেমের পাশেই শুয়ে আছে দুরারোগ্য অসুখ। প্রেমের অসুখে ভুগে আর কতো কোটি ঠোকর খাবে? বিষে বিষে নীল হবে? আর কতো ভুল করবে? সিদ্ধান্ত নেবার সময় কি এখনো আসেনি?
তাওহীদের আলোতে বিদায় করে দাও সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থার চাপিয়ে দেওয়া পুরোনো সব অন্ধকার বিশ্বাস। রঙিন চশমাটা খুলে ফেলো চোখ থেকে। তাওবাহর ঝুম বৃষ্টিতে ধুয়ে ফেলো তোমার ক্লান্ত, বিধ্বস্ত কিন্তু স্নিগ্ধ মুখটা।

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 জানিলাম এ জীবন স্বপ্ন নয়

📄 জানিলাম এ জীবন স্বপ্ন নয়


এক.
ঢেউখেলানো এক মাথা চুল ছিল আমার বাবার। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। সুঠাম। ঋজু ভঙ্গিতে হাঁটতেন। সুদর্শন। পুরোনো ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায় একসময় আমার পাড়াতো অনেক 'ফুপিদের' মনে ঝড় তুলতেন বাবা। ব্যডমিন্টনের তুখোড় খেলোয়াড়। ভলিবল টিমের ক্যাপ্টেন। মাটিতে শুয়ে পড়ে বল ক্লিয়ার করার দুর্দান্ত দৃশ্য আমি বহু দেখেছি আমার প্রথম তারুণ্যেও। এখন বাবা কুঁজো হয়ে হাঁটেন। সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। কোঁকড়া কালো চুল এক ইতিহাস!
আমার মা-ও কম ছিলেন না। দুধে আলতা গায়ের রং, কাটা কাটা কালো চোখ। অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে ছোটাছুটি করতেন সারা ঘরময়। মা এখন বামহাত নাড়াতে পারেন না ঠিকমতো। চোখে কম দেখেন। মুখে বলিরেখা পড়ে গিয়েছে।
এইতো সেদিনের কথা। কতো উদ্যম, কতো প্রাণশক্তি নিয়ে তাঁরা ছুটে বেড়াতেন, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে যেতেন! আজ সেই দিনগুলো অতীত।
বাবা-মাকে বুড়ো হতে দেখা, তাদের বর্তমান অসহায়ত্ব দেখার চাইতে কষ্টকর কিছু কি আছে? একসময় যে বাবার আঙুল ধরে তুমি ব্যস্ত রাস্তা পার হতে, সেই বাবা আজ খুব ধীরে ধীরে কষ্ট করে হাঁটেন, এটা কীভাবে সহ্য করা যায়? অসুস্থ হলে যেই মা সারারাত তোমার সেবা করে কাটিয়ে দিতেন, সেই মা বিছানায় শুয়ে আছেন অসুস্থ হয়ে, তুমি তাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছো—এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কি হতে পারে?
যেই বাবার ঘাড়ে চড়ে তুমি স্কুলে যেতে, মেলায় যেতে সেই বাবার লাশের খাটিয়া তোমার ঘাড়ে, এর চেয়ে কষ্টের কিছু কি আছে এই দুনিয়ায়? জীবন বড় অদ্ভূত! বড় নিষ্ঠুর!
আমাদের শৈশব কৈশোরকে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন যেসব মানুষেরা, শিশু মনে, জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিখাদ বিস্ময় আর নির্ভেজাল মুগ্ধতা, তারাই আজ ইতিহাস!
বুড়ি হয়ে গেছেন এলাকার জাতীয় ক্রাশ সুমি আপা। মাথায় টাক পড়ে গেছে এলাকার টিনা-মিনা-পিংকিদের হার্টথ্রব সজীব ভাইয়েরা। সেদিন অনেকদিন পর সামিউল ভাইয়ের সাথে দেখা। সাঁতার কাটা শিখেছিলাম উনার হাত ধরে। ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ভাইয়া আমাকে ধরে ধরে ক্রিকেট শিখিয়েছিলেন। ফিল্ডিং মিস করার অপরাধে কতোবার মাথায় গাট্টি মেরেছেন! সেই চঞ্চল সামিউল ভাই কতো বদলে গেছেন। খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। মাথার চুলও পেকে গেছে। ধীর, স্থির, শান্ত এখন। ঘাড়ে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কেমন চলছে তোর দিনকাল? ভালো আছিস তো'?
জীবন বড় অদ্ভূত। বড় নিষ্ঠুর। বড় প্রতারক!
মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম সবাই আজ কবরে। আমাকে কী আদরটাই না করতেন উনারা! মসজিদের উঠোনে আম গাছ ছিল অনেক। সবার জন্য নিষিদ্ধ হলেও আমার জন্য ছিল উন্মুক্ত। আর ছিল ফ্রি বৈকালিক নাস্তা-চায়ের কাপে ডুবিয়ে পাউরুটি খাওয়া。
কবরে শুয়ে আছেন লজেন্স খাবার পয়সা দেওয়া তালুকদার বড়াব্বু, পঙ্গু হয়ে গেছেন মজার মজার গল্প বলা কবির চাচা। একটা দ্রুতগতির বাস পিষে দিয়েছে ফারুক কাকুকে-আমার ছোটবড় সব আবদার যিনি মেটাতেন। পিচঢালা রাজপথের এখানে সেখানে লেপ্টে ছিল ফারুক কাকুর মগজ। বড় বীভৎস সেই দৃশ্য!
জীবন বড় অদ্ভূত। বড় নিষ্ঠুর!
কয়দিন আগের কথা! এইতো সেদিন! সেদিন বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলে গেলাম। গতকালের কথা মনে হয়। কিন্তু ঠিকঠাক হিসেব কষলে দেখা যায় বিশ বছরও পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। বিশ বছর! চোখের পলকে বিশ বছর পার হয়ে গেল! একদম টের পেলাম না!
জীবন কতো অভিনয় জানে! কতো মুখোশ পরে থাকে এই জীবন! চোখের পলকেই এভাবে পার হয়ে যায় মাটির পৃথিবীর এই এক জীবন। কতো মায়া, কতো স্মৃতি, কত স্বপ্ন, কতো ভালোবাসা, কতো পিছুটান সব একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। মালাকুল মাউতের সাথে সাক্ষাৎ হবার প্রথম মুহূর্তেই মানুষ বুঝে ফেলে এ জগৎ ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই না। জেনে যায় আখিরাতের সেই অনন্ত জীবনের কথা কোনো স্বপ্ন নয়, কল্পনা নয়, অবাস্তব কিছু নয়। অনাবিল সুখ আর নির্মম শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া সেই আল-কুরআন মিথ্যে নয়। মিথ্যা বলেন না আল্লাহর রাসূল (ﷺ), মিথ্যে বলেননি আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা।
সবাই বোঝে, আমিও বুঝবো, তুমিও বুঝবে। কষ্টের দিন আসুক আর সুখের দিন আসুক, দিন একসময় চলে যাবেই। পৃথিবীর যতো সুখ আর ভালোবাসা আছে সব তুমি বেসে ফেললে, ধরো প্রতি দিন গার্লফ্রেন্ড বদলালে, ধরো দুনিয়ার সবচেয়ে রূপবতীরা তোমার গার্লফ্রেন্ড, ধরো তুমি প্রত্যেকদিন একজন একজন করে পৃথিবীর সবচেয়ে হট, লাস্যময়ী নারীদের সাথে বিছানায় গেলে, ধরো এই পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হলে। তুমি এভাবেই জীবন কাটিয়ে দিলে। কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে?
সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে যাবে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একদিন বয়স ঘড়িটা জানান দিবে-তোমার সময় শেষ। তুমি টেরও পাবে না।
একদিন মরতে হবে তোমাকে। হ্যাঁ, তোমাকেই মরতে হবে। একা একা অন্ধকার কবরে যেতে হবে। কেউ থাকবে না সেখানে। তোমার গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড, জাস্ট ফ্রেন্ড, অনলি ফ্রেন্ড, তোমার গ্যাং, তোমার বাডিস, তোমার বাবা-মা-কেউই না। এমন এক জীবন শুরু করতে হবে যার শুরু আছে কিন্তু কোনো শেষ নেই। সেখানে তুমি কখনোই মৃত্যুবরণ করবে না। ১০০ বছর? ৫০০ বছর? ১০ লাখ বছর? ১০ কোটি বছর? ১০০০,০০,০০,০০০ কোটি বছর?
কখনোই না। সেই জীবনের শুরু আছে। কিন্তু শেষ নেই।
দুই.
তোমাকে ছোট্ট একটা পরীক্ষা করতে বলি। মোমবাতি জ্বালাও বা আগুনের শিখার উপর কিছুক্ষণ আঙুল ধরে রাখো। কেমন লাগছে? এই সামান্য আগুনের শিখার উত্তাপ তুমি সহ্য করতে পারছো? হাতে কখনো পিন ঢুকেছে তোমার, বা সূঁচ?
দীর্ঘ একটা স্বপ্ন বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। আর নবীদের স্বপ্ন সত্য। নবীদের স্বপ্ন ওয়াহীর অংশ। স্বপ্নের ব্যাপারে তিনি (ﷺ) বলেন, 'একপর্যায়ে আমরা (বড়) একটা চুল্লির মত বস্তুর কাছে এসে পৌঁছলাম। সে চুল্লির উপরিভাগ সংকীর্ণ ও নিম্নভাগ প্রশস্ত। ভেতরে বিরাট চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আমরা চুল্লিটার ভেতরে দেখতে পেলাম উলঙ্গ নারী ও পুরুষদেরকে। তাদের নিচ থেকে কিছুক্ষণ পর পর এক একটা আগুনের হলকা আসছিল, আর তার সাথে সাথে আগুনের তীব্র দহনে তারা প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করছিল। আমি বললাম, 'হে জিবরীল, এরা কারা?' তিনি বলেন, এরা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ।'[২২৪] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ওই নারীকে স্পর্শ করা থেকে অনেক ভালো, যে নারী তার জন্য হালাল নয়।'[২২৫]
পৃথিবীর এই ছোট ছোট ব্যথা তুমি সহ্য করতে পারছো না। তাহলে মৃত্যুর ওপারের ভয়ংকর ব্যথা কীভাবে সহ্য করবে তুমি? যেখানে জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা হবে দুনিয়ার আগুনের ৭০ গুণ বেশি?
নাকি তুমি মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যা মনে করো? নবীজি (ﷺ)-কে অস্বীকার করো? নাকি তুমি মনে করো পরকাল বলে কিছু নেই, আর এসব কোনো কিছুর কোনো শাস্তি হবে না?
নিজেকে প্রশ্ন করো, কেন তুমি এমন করছো?
তুমি নিজেকে বিশ্বাসী বলে দাবি করো। একবার ভেবে দেখো তো আসলেই তুমি বিশ্বাস করো কি না আল্লাহর বাণীকে? তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর কথাকে? কোথাও ঠাণ্ডা হয়ে বসে নিজের মনের ভেতর একটু ঘুরে এসো তো। তুমি কি আসলেই পরকাল বিশ্বাস করো? নাকি ওগুলো তোমার কাছে একটা রহস্যময় অবাস্তবতা মনে হয়? মনে হয় বহু আলোক বর্ষ দূরের কিছু। হয়তো ঘটবে, হয়তো ঘটবে না! এসব পরে ভেবে দেখা যাবে। এই যৌবন প্রেমহীন গেলে মানবজন্মের নামে কলংক হবে। তাই চুটিয়ে প্রেম করি...
আমি অনেককেই বলতে দেখি, সে তার প্রেমিকা-প্রেমিককে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কেউ কি ভালোবাসার মানুষকে ধাক্কা মেরে আগুনে ফেলে দিতে পারে? আচ্ছা, এটা কেমন ভালোবাসা যেই ভালোবাসা প্রিয় মানুষকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়? যাকে তুমি এতটাই ভালোবাসো কি করে তাকে দিয়ে দিনের পর দিন গুনাহ করিয়ে নিচ্ছো? এটা কেমন ভালোবাসা! নিজেকে প্রশ্ন করো, এই ভালোবাসার পরিণাম কী হবে? প্লিজ উত্তরটা তুমি দিয়ে যেও..
নাকি ভাবছো, এখন মজা লুটে নেই, পরে তাওবাহ করে নেবো! বোকা ভাই আমার, বোকা বোন আমার, তোমার বয়সী এমন অসংখ্য মানুষ আজ কবরে শুয়ে আছে যারা তোমার মতোই ভেবেছিল পরে তাওবাহ করে নেবো। কিন্তু তাওবাহ করার সুযোগ পায়নি। হয়তো যিনারত অবস্থাতেই তাদের সামনে খুলে গিয়েছে মৃত্যুর পর্দা। আর তুমি কি মনে করো তুমি এভাবে প্ল্যান করে পাপ করে তারপর তাওবাহ করার বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহকে ধোঁকা দিতে পারবে? সেই আল্লাহকে যিনি সবকিছু জানেন? যাঁর জ্ঞান পরিপূর্ণ? তোমার মনের ঘরের সবচেয়ে গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখা কথাও যাঁর অজানা নেই? যাঁর ইলমের বাইরে কোনো কিছুই নেই? আসলেই কি তুমি মনে করো, আসমান ও যমীনের মালিককে তুমি এভাবে ধোঁকা দিতে পারবে? নাকি এসব বলে নিজেকেই ধোঁকা দিচ্ছো তুমি?
তোমাকে যদি প্রশ্ন করি, নিজের রব আল্লাহকে ভালোবাসো? যদি বলি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ভালোবাসো? চোখ বন্ধ করেই তুমি 'হ্যাঁ' বলে দেবে, কোনো কিছু চিন্তা করার আগেই... অথচ তুমি রবের হুকুম আর হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করেই হারাম রিলেশন করে যাচ্ছো! আল্লাহ বলেছেন, 'যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।[২২৬] তিনি বলেছেন দৃষ্টির হিফাযত করতে।[২২৭]
রাসূলুল্লাহ (*) বলেছেন, 'দুই চোখের যিনা হচ্ছে- দেখা, দুই কানের যিনা হচ্ছে- শোনা, জিহ্বার যিনা হচ্ছে- কথা, হাতের যিনা হচ্ছে- ধরা, পায়ের যিনা হচ্ছে- হাঁটা, অন্তর কামনাবাসনা করে; আর লজ্জাস্থান সেটাকে বাস্তবায়ন করে অথবা করে না।' [২২৮]
তাহলে তুমি কীভাবে হারাম রিলেশন করে যাচ্ছো? দিনের পর দিন রবের নাফরমানি করে যাচ্ছো... দিনশেষে আবার বলছো, আমি আল্লাহ তা'আলাকে ভালোবাসি, আমি নবিজী (ﷺ)-কে ভালোবাসি! একটুও কি অনুশোচনা হয় না? ফেইসবুক আর ইন্সটাতে কাপল পিক দিতে তোমার একটুও লজ্জা লাগে না? দুঃখ হয় না, নিজের গুনাহর জন্য?
যেই বাবা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কতো কষ্ট করে টাকা দেন, সেই টাকা গার্লফ্রেন্ডের পেছনে ঢালতে তোমার খারাপ লাগে না? যেই মা তোমাকে দশ মাস দশদিন গর্ভে ধারণ করেছেন, নিজে না খেয়ে তোমার মুখে খাবার তুলে দিয়ছেন, বয়ফ্রেন্ডের সাথে লিটনের ফ্ল্যাটে যাবার জন্য সেই মায়ের চোখে তাকিয়ে-এক্সট্রা ক্লাস আছে, আজকে আসতে দেরি হবে-এতো বড় মিথ্যা কথা বলতে তোমার কি একবারও বুক কাঁপে না? বাবা-মা'র প্রতি তোমার এ কেমন ভালোবাসা?
ভাই জেনে রাখো, নিশ্চিত জেনে রাখো, তোমার এই যৌবন, তোমার এই লঞ্চের কেবিনে যাওয়ার সাময়িক সুখ, ট্যুর আর রিকশায় হাতাহাতি করার মজা সব শেষ হয়ে যাবে। খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পাপের বোঝা থেকে যাবে। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত তুমি করবে বছরের পর বছর আগুনে পুড়ে। অনেকে ভাবে... থাকলাম না হয় জাহান্নামে কিছুদিন। সমস্যা কি! একটু কষ্ট সহ্য করলাম। এরপর তো জান্নাতে যাবোই একদিন। আমি তো মুসলিম... একদিন না একদিন জান্নাতে যাবোই!
শোনো, জাহান্নামে কবরের প্রথম রাতেই তুমি ভুলে যাবে প্রিয়তমার সব উষ্ণ আলিঙ্গন! তোমার মৃত্যুর পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই এই জীবনের সব সুখকে তুমি চিনতে পারবে তুচ্ছ কিছু অভিজ্ঞতা হিসেবে। বিচারের দিন বিচার শুরুর অপেক্ষা করতে করতে পুরো দুনিয়ার জীবনকে তোমার কাছে মনে হবে অর্থহীন, স্রেফ অর্থহীন! আর জাহান্নাম?
জাহান্নামের প্রথম স্পর্শ ঝলসে দেবে পৃথিবীর সকল সুখের প্রহর! [২২৯] জাহান্নাম, জাহান্নামের আগুন এতোটাই ভয়াবহ হবে যে, জাহান্নাম দেখা মাত্রই মানুষ আল্লাহর কাছে ভিক্ষা করতে শুরু করবে- ইয়া আল্লাহ! তুমি আমার ভাই/বোন, স্বামী/স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি সবাইকে জাহান্নামের মধ্যে ফেলে দাও, কিন্তু আমাকে ফেলো না[২৩০]। জাহান্নামের নিঃশ্বাস পাওয়া মাত্র মানুষ আর এক সেকেন্ডের জন্যেও জাহান্নামে যেতে রাজি হবে না। এটা জাহান্নাম-কোনো ছেলেখেলা নয়。
কোন মুখে তুমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে? একটু চিন্তা করো। তোমার যিনা করার দৃশ্য যদি কেউ ভিডিও করে ভাইরাল করে দেয়, তুমি মুখ দেখাতে পারবে? তোমার মা-বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারবে? হাশরের ময়দানে পৃথিবীর আদি থেকে শুরু করে অন্ত পর্যন্ত সব মানুষ থাকবে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ), থাকবেন সকল নবী রাসূল। আলাইহিমুস সালাম। থাকবেন আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা স্বয়ং। সেখানে সকলের সামনে যদি তোমার লীলাখেলা দেখানো হয় তখন তুমি কি লজ্জায় মিশে যেতে চাইবে না?
এটা কি পাগলামি না? এমন কাজ করা যার জন্য সেই জীবনে চিরকাল আগুনে পুড়তে হয়, বিষাক্ত সাপের দংশনে দংশিত হতে হয়, ফেরেশতার মুগুরের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে হয়। বছরের পর বছর ধরে! হাজার হাজার বছর ধরে যেখানে তুমি প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে ডাকবে। কিন্তু কখনোই তোমার মৃত্যু হবে না!
এসব শাস্তির কথা, ভয়ের কথা বলতে ইচ্ছা করছে না ভাইয়া, আপু। জানি তোমার মন খারাপ হচ্ছে। হয়তো আমার উপর অনেক রাগ হচ্ছে। তুমি এখন বড় হয়েছো, বুঝতে শিখেছো। নিজের মতোই চলতে পারো। ভাবছো, আমি তোমাকে খুব জ্ঞান দিচ্ছি, মোল্লাগিরি করছি। অপমান করছি। দেখো, আমার এরকম কোনো কিছু করার ইচ্ছা নেই। আসলে তোমাকে জাহান্নামীদের মতো কাজ করতে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। বিশ্বাস করো! ঐ পথে সুখ নেই, শান্তি নেই, প্রেম নেই, প্রীতি নেই। নেই মহৎ কোনো সত্য। আছে শুধু যন্ত্রণা। চরাচরে ভেসে যাওয়া যন্ত্রণা। তোমার এই বয়সে হয়তো তুমি বুঝতে পারছো না। তোমার চোখে এখন রঙিন চশমা। কিন্তু একটা বয়স পর তুমিও বুঝে যাবে। কিন্তু তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি ভালোবাসা মানুষের স্বভাবজাত। তোমাকে তো একেবারে এটা অবদমন করে রাখতে বলা হচ্ছে না। এটা একেবারে দমিয়ে রাখা বাস্তবসম্মত কোনো কথা নয়। কিন্তু ভালোবাসার ফানুস ভুল আকাশে উড়ানো যাবে না। আল্লাহ আমাদের জন্য বিয়ের ব্যবস্থা দিয়েছেন। বিয়ের চেষ্টা করতে হবে। আর সবর করতে হবে। মহান আল্লাহর উপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধরতে হবে। তুমি এই ভেবে ভয় পাবে না বা এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবে না যে-আমি সবর করতে পারবো না। তুমি যদি একটু সাহস করে সবরের চেষ্টা করো, তাহলে আল্লাহ তোমার জন্য সহজ করে দেবেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এমন ওয়াদাই করেছেন।
‘আর যে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি তাঁর অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।’[২৩১]
‘যে ব্যক্তি ধৈর্য অবলম্বনের চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীলতা দান করবেন।’[২৩২]
একটু কষ্ট করো ভাইয়া, আপু। সময় খুব দ্রুত যায়। একাকীত্ব, হাহাকার আর কিছু ক্ষোভ বুকে নিয়েই হোক, একটু অপেক্ষা করো। যারা আল্লাহর উপর ভরসা করেন, তাদেরকে তিনি ঠকান না। ইনশাআল্লাহ, এই মাটির পৃথিবীতেই অবাক চাঁদের আলোয় একদিন ধরা দেবে তোমার চোখের দুঃখগুলো শান্ত করার মতো একজন মানুষ। তারপর শুরু হবে পৃথিবীর পথে নতুন এক পথচলা। যে পথের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে দুষ্টুমি, খুনসুটি, মান-অভিমান, মায়া, মমতা আর সত্যিকারের পবিত্র ভালোবাসা।
একটু কষ্ট সহ্য করো। অন্তরে গেঁথে নাও একটি কথা - জান্নাতের প্রথম মুহূর্তেই তুমি ভুলে যাবে দুনিয়ার সব দুঃখকষ্ট!

টিকাঃ
[২২৪] সহীহ বুখারী: ৭০৪৭, ১৩৮৬
[২২৫] আল-মু'জামুল কাবীর লিত-ত্বাবারানী: ৪৮৭, মাজমাউয যাওয়াইদ: ৭৭১৮, সহীহাহ: ২২৬। ইমাম হাইসামী বলেছেন, হাদিসটির বর্ণণাকারীগণ সহীহ (মুসলিম) গ্রন্থের বর্ণনাকারী (অর্থাৎ, নির্ভরযোগ্য)। আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[২২৬] সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭ : ৩২
[২২৭] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩০
[২২৮] সহীহ বুখারী : ৬২৪৩ ও সহীহ মুসলিম : ২৬৫৭ (ইফা. ৬৫১২, ৬৫১৩)
[২২৯] আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য থেকে দুনিয়ায় সর্বাধিক সুখের অধিকারী ব্যক্তিকে আনা হবে। তারপর তাকে (জাহান্নামের) আগুনে একবার ডুবিয়ে বলা হবে, 'হে আদম সন্তান, তুমি কোনদিন ভালো কিছু দেখেছ? কোনদিন তুমি সুখে ছিলে কি? সে বলবে, 'আল্লাহর কসম, হে আমার প্রতিপালক, না'। সহীহ মুসলিম: ২৮০৭ (ইফা. ৬৮২৯)
[২৩০] আল মা'আরিজ ৭০:১১-১৪
[২৩১] আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
[২৩২] বুখারি: ১৪৬৯, মুসলিম: ১০৫৩ (ইফা. ২২৯৫)

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 আয় কান্না ঝেঁপে...

📄 আয় কান্না ঝেঁপে...


সব বাতি নিভে গেছে দশ তালা বিল্ডিংয়ের। চিলেকোঠার ঘরে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে কেবল। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া তরুণের হাতের জ্বলন্ত সিগারেট পুড়ছে ধীরে ধীরে। সিগারেটের সাথে তাল মিলিয়ে পুড়ছে তরুণও। এতো বছরের সম্পর্কটা ভেঙে গেল গত পরশু। তরুণের গাল বেয়ে নামছে সরু একটা কান্নার স্রোত। সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে পিউর ছ্যাঁকা খাওয়া একটা গান।
সেই একই রাত। পাশের বিল্ডিং। ষোড়শী এক বালিকার চোখে নেমেছে কান্নার বৃষ্টি। উহু, তরুণের প্রেমিকা নয় সে। তার দুঃখ অন্য একজনের জন্য। কোরিয়ান এক সিরিজ দেখে শেষ করলো সে এই রাতদুপুরে। নায়কের কষ্টে কাঁদছে সে। হাপুস নয়নে!
কবিদের মতো দুঃখবিলাসী অনেক মানুষ দেখা যায় আশেপাশে। দুঃখ নিয়ে বিলাস করে। দুঃখ পেতে, কষ্ট পেতে ভালোবাসে। ভালোবাসে কাঁদতে। হুমায়ূন বা বিশ্বযুদ্ধের কোনো উপন্যাস পড়ে এরা কাঁদে, খেলায় প্রিয় দল হেরে গেলে কাঁদে, গান শুনে কাঁদে, কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ করে। খুঁজে খুঁজে, খুঁড়ে খুঁড়ে, কষ্ট বের করে করে কাঁদে।
অথচ এই চোখের পানি, এই দুঃখবিলাস-মহাকালের কাছে আদৌ কি এর কোনো মূল্য আছে? চোখের পানি কি এতোটাই সস্তা? আমরা আসলে জানি না চোখের পানির মূল্য কতোটুকু। এ কারণেই অকারণে অপাত্রে চোখের জল ফেলি।
জাহান্নামের আগুন পৃথিবীর আগুনের সত্তর গুণেরও বেশি তীব্র। পুড়তে পুড়তে জাহান্নামের আগুন কুচকুচে কালো হয়ে গেছে! দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটা যদি এক মুহূর্ত জাহান্নামের আগুনে কাটায়, তাহলে সে ভুলে যাবে জীবনে কখনো সুখের স্পর্শ পেয়েছিল কি না। এই ভীষণ, ভয়ঙ্কর আগুনও নিভে যেতে পারে [২০০] মাত্র এক ফোঁটা চোখের জলে![২০৪]
আল্লাহর ভয়ে মুসলিমের চোখ থেকে নির্গত অশ্রু নিভিয়ে দিতে পারে জাহান্নামের এই ভয়ঙ্কর আগুনও। তুমি হয়তো অনেক পাপ করেছো, অনেক বার যিনা করেছো, আরো অনেক জঘন্য জঘন্য পাপ করেছো কিন্তু আল্লাহর রহমতের কাছে এসব কিছুই না। তুমি পাপ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও আল্লাহ বারবার ক্ষমা করতে করতে ক্লান্ত হন না। তিনিই জঘন্য জঘন্য সব পাপীকে, তাওবাহ করলে ক্ষমা করে দেন।[২৩৫] আল্লাহর জন্য তোমার চোখ থেকে নির্গত অশ্রুর এক ফোঁটা ধুয়ে মুছে পবিত্র করে ফেলতে পারে সকল পাপের পঙ্কিলতাকে।
এক মায়ের ছেলে হারিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুজির পরও ছেলেকে পাওয়া গেল না। মায়ের পাগল হতে বাকি। এমন সময় হারানো ছেলেকে পাওয়া গেল। মা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। ভালোবাসার অশ্রু নামছে তার দু'গাল বেয়ে, অঝোরে। এই মায়ের পক্ষে কি এই অবস্থায় সাত রাজার ধন এই ছেলেকে আগুনে ফেলে দেওয়া সম্ভব হবে? আল্লাহ আমাদেরকে এই মায়ের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি ভালোবাসেন। ভালোবাসার ১০০ ভাগের মধ্যে ৯৯ ভাগ আল্লাহ নিজের কাজে রেখে দিয়েছেন। বাকি ১ ভাগ সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন।[২৩৬]
বাবা-মা'র অবাধ্য হলে, তাদের কথা না শুনলে, তাদের মনে কষ্ট দিলে সন্তানদের প্রতি তাদের ভালোবাসায় ভাটা পড়ে যায় কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসায় কখনো ভাটা পড়ে না। তুমি যখন আল্লাহকে স্মরণ করো, আল্লাহও তোমাকে স্মরণ করেন।[২৩৭] যখন তাঁকে ভুলে যাও, তাঁর অবাধ্যতা করো তখনো তিনি তোমার জন্য ক্ষুধার খাদ্য পাঠিয়ে দেন, তৃষ্ণার পানি পাঠিয়ে দেন, বুক ভরে শ্বাস নিতে দেন মুক্ত বাতাসে। গুনাহর পর একবার 'ইয়া রব' বলে ডাক দিলেই তিনি সাড়া দেন- 'ইয়া আবদী! হে আমার বান্দা বলো, বলো তোমার কি চাই?' [২৩৮] বিশ্বাস করো, আল্লাহর মতো আর কেউ তোমাকে ভালোবাসে না।
তুমি যখন আল্লাহর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাও আল্লাহ তোমার দিকে দশ ধাপ এগিয়ে আসেন, তুমি আল্লাহর দিকে হেঁটে গেলে তিনি দৌড়ে আসেন।[২৩৯] আল্লাহ সুযোগ খোঁজেন তোমাকে ক্ষমা করে দেবার। অজুর পানির মাধ্যমে তিনি তোমার পাপগুলো ঝরিয়ে দেন, দুই সালাতের মাধ্যমে মাঝের সময়গুলোতে করা পাপগুলো ক্ষমা করে দেন। তিনি রাতে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন দিনের পাপীদের জন্য আর দিনে ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন রাতের পাপীদের জন্য।[২৪০]
তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন কেউ যদি আকাশ সমান উঁচু পাপ নিয়েও তার সঙ্গে দেখা করে, কিন্তু শিরক না করে, তাহলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন।[২৪১] তারপর তিনি প্রবেশ করাবেন এমন এক জান্নাতে যা কোনো চোখ দেখেনি, কোন অন্তর চিন্তাও করেনি। এতোটা ভালোবাসেন তোমাকে যে আল্লাহ, বলো তো সেই আল্লাহর জন্য শেষ কবে কেঁদেছো?
আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন নবী আলাইহিমুস সালাম-গণের পর এই যমীনের বুকে হেঁটে বেড়ানো সবচেয়ে পুণ্যবান মানুষ। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বেশ কয়েকবার জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন তিনি। তারপরও সালাতে আল্লাহর ভয়ে তিনি কাঁদতেন। উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মতো জাঁদরেল মানুষও সালাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতেন। উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে কাঁদতে নিজের দাড়ি ভিজিয়ে ফেলতেন। অথচ তাঁরা দুনিয়াতে থাকতেই পেয়েছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ। আমরা কিন্তু তাদের মতো এমন সুসংবাদ পেয়ে যাইনি। তারপরও তোমার আমার চোখগুলো শুকনো। আমাদের মনগুলো পাথর। অভিশপ্ত আমাদের দু'চোখ। অভিশপ্ত আমাদের হৃদয়।
তোমার কোনকিছুরই প্রয়োজন নেই তাঁর। তিনি আল-জাব্বার, আল-কাহহার, আল-মুতাকাব্বির, রাব্বুল আরশীল আযীম। রাজাদের রাজা তিনি, বাদশাহদের বাদশাহ। তাঁর বড়ত্ব এমন যা কল্পনা করা, অনুধাবন করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তারপরও আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, তোমার জন্য জান্নাতে এতো এতো নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন। আর কতোকাল এই আল্লাহকে ভুলে থাকবে? আর কতোকাল নিজের নফসের কাছে পরাজিত হবে? আল্লাহর স্মরণে অন্তর বিগলিত হবার সময় কি এখনো আসেনি?
উঠো, ওযু করে আসো। দাঁড়াও তোমার রবের সামনে নতমুখে। সব জানেন তিনি, সব। গোপনে রাতের আঁধারে একা একা তুমি যা করেছিলে সব জানেন তিনি। তোমার সব ব্যথা, সব কষ্ট, যে কথাগুলো তুমি নিজের কাছেও স্বীকার করো না, সব তিনি জানেন। তুমি অনেকবার তাওবাহ করেছো, আবার পাপ করেছো, আবার তাওবাহ করেছো, আবার পাপ করেছো... তাওবাহ আর পাপ করতে করতে তুমি নিজের ব্যাপারে সন্দেহে পড়ে গেছো, আল্লাহ কি আমাকে আর মাফ করবেন? নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে গিয়েছো, লজ্জিত হয়েছো... কিন্তু তারপরও তিনি অপেক্ষা করে আছেন তোমার জন্য। হ্যাঁ, আর-রাহমান ক্ষমা করবেন, আল-গাফফার তোমাকে মাফ করে দেবেন। তোমাকে ক্ষমা করে তিনি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।[২৪২] তিনি বলেছেন, 'প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক হলো যারা তাওবাহ করে।' [২৪৩]
'হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবাহ করো! যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো।' [২৪৪]
উঠে দাঁড়াও। দুই রাকাত সালাত আদায় করো। আরো একবার তোমার রবকে কথা দাও-তুমি ভালো হয়ে যাবে। শিশুর মতো অঝোরে কাঁদো, এই চোখের পানি তোমার রবের কাছে সব চাইতে প্রিয়।
“হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়। [২৪৫]
'যারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করে তখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কে পাপ ক্ষমা করতে পারে? এবং তারা যা (অপরাধ) করে ফেলে, তাতে জেনেশুনে অটল থাকে না। সেসব লোকের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা এবং জান্নাত; যার নিচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং (সৎ) কর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম।[২৪৬]

টিকাঃ
[২০০] এখানে আগুন নিভে যাওয়া বলতে জাহান্নামের আগুনের স্পর্শ থেকে বেঁচে যাওয়া বোঝানো হয়েছে।
[২০৪] তিরমিযী: ১৬৩৯, আত-তারগিব: ১৯১৮, মিশকাত: ৩৮২৯, সহীহ আল-জামে': ৪১১১। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। বিস্তারিত পড়ো- আল্লাহভীতি, hadithbd.com - tinyurl.com/8kz6vz9s
[২৩৫] ১০০ খুন করা পাপীকেও আল্লাহ ক্ষমা করেছেন! (বুখারি: ৩৪৭০, মুসলিম: ২৭৬৬ (ই.ফা ৬৭৫২)) পুরো হাদীস পড়তে পারো hadithbd.com এর এই লিংক থেকে-tinyurl.com/ bd9pn2mz
[২৩৬] বুখারী: ৬০০০, মুসলিম: ২৭৫২-২৭৫৪ (ইফা, ৬৭১৯-৬৭২৫)
[২৩৭] বুখারী : ৭৪০৫, মুসলিম: ২৬৭৫ (ইফা. ৬৫৬১)
[২৩৮] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “যে (আমাকে) ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দেই যখনই সে আমাকে ডাকে” আল-বাকারাহ ২:১৮৬
[২৩৯] বুখারী : ৭৪০৫, মুসলিম : ২৬৭৫ (ইফা. ৬৫৬১)
[২৪০] মুসলিম: ৯৮৬ (ইফা. ৬৭৩৪)
[২৪১] তিরমিযী: ৩৫৪০। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[২৪২] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো বান্দা কোনোরূপ গুনাহ করার পর উত্তমরূপে ওযু করে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামায পড়ে এবং আল্লাহর কাছে গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। (তিরমিযী: ৪০৬, আবু দাউদ: ১৫২১, ইবনু মাজাহ: ১৩৯৫, মুসনাদ আহমাদ: ০২, ইবনু হিব্বান: ৬৩২, ইবনু খুজাইমাহ, বায়হাকী) ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ আল-জামে': ৫৭৩৮)
[২৪৩] তিরমিযী: ২৪৯৯, সহীহ আল-জামে': ৪৫১৫। ইবনু হাজার হাদিসটির সনদকে শক্তিশালী বলেছেন (বুলুগুল মারাম: ১৪৯১) এবং আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
[২৪৪] সূরা আন-নূর, ২৪:৩১
[২৪৫] সূরা আয-যুমার, ৩৯: ৫৩
[২৪৬] সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৩৫-১৩৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px