📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো...?

📄 অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো...?


এক।

লাভ ম্যারেজকে ডিযনি কার্টুন, নাটক, সিনেমা, সিরিজ, সাহিত্য কবিতা-সব জায়গাতেই প্রেমের সফল এক সমাপ্তি হিসেবে দেখানো হয়। লাভস্টোরিগুলো শেষ হয় এভাবে... অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকিলো। অন্যদিকে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজকে অচেনা, অজানা একজন মানুষের সাথে শুয়ে পড়া, দাসত্বের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়।

অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ নিয়ে সেক্যুলারদের ব্যাপক আপত্তি। আবার এরাই কিন্তু হুকআপ কালচারকে প্রমোট করে। বিয়ের মতো একটা পবিত্র ও শক্তিশালী বন্ধন যেখানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করে অন্তরঙ্গ হওয়া যায়, প্রতারণা বা খারাপ কিছু ঘটার ঝুঁকি অনেক কম থাকে-তা সেক্যুলারদের কাছে হারাম। কিন্তু হুকআপ কালচারাল মাধ্যমে পার্টি, নাইট ক্লাব, বার ইত্যাদিতে গিয়ে সম্পূর্ণ আগন্তুকের সাথে কয়েক ঘণ্টার পরিচয়ে প্রতারণা, ধর্ষণ বা যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড করা খুব আরাম!

ওর সাথে আমার মনের মিল হচ্ছে কি না, ওকে আমার পছন্দ হবে কি না, ওর সাথে আমি একই ছাদের নিচে সারাজীবন কাটাতে পারবো কি না, আমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হবে কি না এটা জানার পূর্বশর্তগুলো কী? কী কী কাজ করলে সেই মানুষটাকে চেনা যাবে? বিদ্যমান বিশ্বকাঠামো এই সমস্যার যে যে সমাধানগুলো দিয়েছে সেগুলো হলো -
১. তার সাথে ডেট করতে হবে মানে প্রেম করতে হবে, রেস্টুরেন্টে যেতে হবে, ডিনারে যেতে হবে।
২. দূরে বা কাছে ট্যুরে যেতে হবে।
৩. মাঝে মাঝে রুমডেট বা বিছানায় যেতে হবে।
৪. লিভ টুগেদার করে বিয়ের আগে একটা ট্রায়াল দিয়ে নিতে পারলে তো সোনায় সোহাগা!

বিয়ের আগে মানুষ চেনার এই শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে অ্যামেরিকানরা মেনে চলেছে। পরিণতিতে কী হয়েছে? বিচ্ছেদের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, পারিবারিক অশান্তি, ঝগড়া, তীব্র হতাশা, সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, খুন, মামলা-মোকদ্দমা, জেল, জরিমানা। এমনকি আজ তারাই বলছে যেসব অ্যামেরিকান বিয়ের আগে লিভ টুগেদার করে, দাম্পত্য জীবনে তারা সুখী হচ্ছে না; কোর্টে বিচ্ছেদের আবেদন করছে। অ্যামেরিকার হাজার হাজার নারীর উপর চালানো গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যারা বিয়ের আগে লিভ টুগেদার করছে, তাদের বিচ্ছেদের সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ বেশি। ইউনিভার্সিটি অফ ডেনভারের মনোবিজ্ঞানী গ্যালেনা রৌডস বলছে, 'আমরা সাধারণত মনে করি বেশি অভিজ্ঞতা থাকা ভালো কিন্তু বাস্তবতা পুরো বিপরীত। বেশি অভিজ্ঞতা দাম্পত্য জীবনের সুখ কেড়ে নেয়।' [১৪৩]

অ্যামেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টারসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে লিভ টুগেদার করা যুগলদের তুলনায় বিবাহিত অ্যামেরিকানরা অনেক সুখী জীবনযাপন করে। তাদের সম্পর্কে বিশ্বস্ততা, দায়বদ্ধতা, স্থিতিশীলতা, কল্যাণকামিতা থাকে। তারা বেশি ইনকাম করে। বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপারে বেশি যত্নবান হয়। মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। [১৪৪] লিভ টুগেদার করা কাপলদের মধ্যে বিচ্ছেদের হার থাকে অনেক অনেক বেশি। [১৪৫]

মিডিয়া, নারীবাদী ও সুশীল-প্রগতিশীলদের অনবরত প্রোপাগান্ডার ফলে আমাদের সমাজে উপরের লিস্টের ১, ২ ও ৩ নম্বর কাজগুলো মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবার পথে। লিভ টুগেদারের সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে। তরুণ প্রজন্ম তো বটেই, অভিভাবকেরা পর্যন্ত ভাবছেন-বিয়ের আগে প্রেম করে ঘোরাঘুরি করে একটা নিজেরা জানাশোনা করে নিলে ক্ষতি কী? এতে বন্ধন শক্তপোক্ত হবে-এমন মানসিকতা সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশকে যিনায় সয়লাব করে দেবার হুমকিতে ফেলে দিয়েছে।

দাম্পত্য জীবনে যৌনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একে অপরকে তৃপ্তি দিতে না পারলে এটার কারণেই সংসারে মারাত্মক অশান্তি, পরকীয়া এমনকি ডিভোর্স পর্যন্ত হয়। তাহলে তুমি কেন বিয়ের আগে প্রেম করে মানুষটা কেমন, তার মন মানসিকতা কেমন, শুধু এগুলো বোঝার চেষ্টা করবা? কেন বিছানায় গিয়ে সেই মানুষটা কেমন পারফর্ম করতে পারে, সেটা যাচাই করবা না? বিয়ের পরে দেখা গেল সে তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না-তখন?

বুঝতে পারছো এই চিন্তা কাঠামোর চূড়ান্ত পরিণতি কোন দিকে যাচ্ছে? কয় বছর, কয়জনের সঙ্গে প্রেম করলে তুমি বুঝতে পারবে তুমি আসল মানুষ খুঁজে পেয়েছো? কয়জনের বিছানায় কয়বার করে গেলে বুঝতে পারবে তোমার জন্য এই ছেলেটা বা এই মেয়েটা পারফেক্ট? পারফেক্ট ম্যাচ খোঁজার জন্য তুমি তোমার বোনকে কয়টা ছেলের বিছানায় পাঠাবে?
- প্রশ্নগুলো আছে, কিন্তু নেই কোনো কংক্রিট উত্তর।

এই অবাধ যৌনতার ফসল হিসেবে পাওয়া ডিপ্রেশন, গর্ভপাত, যৌনবাহিত রোগ, মানসিক ট্রমা, ভাইরাল ভিডিও, আত্মহত্যা, মানসম্মানের ক্ষতি, ধর্ষণ- এগুলোর দায়ভার কে নেবে?
এরও নেই কোনো উত্তর।

অ্যামেরিকায় বেশিরভাগ বিয়েই হয় প্রেমের কারণে। এবং সেখানকার ডিভোর্সের শতকরা হার ৪০-৫০ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ৪০-৫০ শতাংশ বিচ্ছেদের মধ্যে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে বিচ্ছেদের হার মাত্র ৪ শতাংশ। [১৪৬]

অধ্যাপক, বিখ্যাত সংস্থা সাইকোলজি টুডে-র সাবেক প্রধান সম্পাদক, অ্যামেরিকার সায়েন্টিফিক ম্যাগাজিন MIND এর সম্পাদক ড. রবার্ট এপস্টিনের মতে অ্যামেরিকার এই উচ্চ বিচ্ছেদের হারের কারণ হলো লাভ ম্যারেজ। এই বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে এমন মতও এসেছে যে-যে দেশ বিয়ের ক্ষেত্রে অ্যামেরিকার মডেল অনুসরণ করবে, সেই দেশে বিয়ে ততো ব্যর্থ হবে। [১৪৭] ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী সৌল-জুর-ডন এর মাঠ পর্যায়ের একটি গবেষণার ফলাফল হচ্ছে: “যে বিয়ের পাত্র-পাত্রী বিয়ের আগে প্রেমে পড়েনি, এমন বিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সফল।”

অপর এক সমাজবিজ্ঞানী 'আব্দুল বারী' কর্তৃক ১৫০০ টি পরিবারের উপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল হচ্ছে: ৭৫% এর বেশি প্রেমঘটিত বিয়ের তালাকের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটেছে। অথচ অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে, তালাকের হার ৫% এরও নিচে!! [১৪৮] মুম্বাই হাইকোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে দাবি করেছে-ভারতে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের তুলনায় লাভ ম্যারেজে ডিভোর্সের হার অনেক বেশি। [১৪৯]

শায়খ আলী তানতাউয়ী (রহ.)-র পরিচয় আমরা আগেই দিয়েছি। বিশ হাজারের মতো বৈবাহিক মামলার সমাধান করা এই আলেম বিচারক বলেন, 'তোমাদের চোখে তো রঙের ফানুস। তাই আমার অভিজ্ঞতার কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি না, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। সত্যি কথা হলো, এসব (প্রেমের) বিয়ের পরিণতি হলো বিবাদ ও বিচ্ছেদ। [১৫০]

পর্দায় যা-ই দেখানো হোক না কেন, প্রেমের বিয়েগুলো সাধারণত টেকে না। সুখের হয় না। দাম্পত্য কলহ, অশান্তি, বিচ্ছেদ এগুলো প্রেমের বিয়ের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ ঘটনা। মিডিয়ার যারা আমাদের প্রেম শেখায়, ভালোবাসার সবক দেয়, যারা আমাদের কাছে আসার গল্প শেখায়, মজার ব্যাপার হলো তাদের জীবনেই বিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, অশান্তি বেশি।

বাঙালির রোমান্টিকতার আদি ও অকৃত্রিম রোল মডেল, মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে শুরু করে প্রেমের নিয়মকানুনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন ফরিদী [১৫১], গুরু জেমস, শ্রাবন্তী, জয়া আহসান, এককালের হার্টথ্রব অপি করিম, তারিন, শখ, সারিকা, বাঁধন, শাকিব খান আর অপু বিশ্বাস, তাহসান আর মিথিলা-ভালোবেসে বিয়ে করে সংসার টেকাতে পারেনি কেউই। এটা শুধু বাংলাদেশ, ভারত বা উপমহাদেশের ঘটনা না। পাশ্চাত্যের হলিউড, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে প্রেম শেখানো সব ইন্ডাস্ট্রির একই অবস্থা। আরো বেশি ভয়ঙ্কর অবস্থা। আরো বেশি বিচ্ছেদ, হতাশা, আত্মহত্যা। [১৫২]

এরা তো একে অপরের সাথে প্রেম করে জেনেশুনে তারপর বিয়ে করেছিল। এদের কেন ডিভোর্স হলো? পাশ্চাত্যের ওরা তো একেবারে বিছানায় শুয়ে পড়ে লিভ টুগেদার করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চিনে তারপর বিয়ে করে। ওদের কেন এতো বিচ্ছেদ?

দেখো, এভাবে প্রেম করে আসলে মানুষ চেনা যায় না। বাস্তবতাও বোঝা যায় না। প্রেম একটা মুখোশ পরে থাকে। মোহ নিয়ে শুরু হয়, একে অপরকে পাওয়ার মাধ্যমে মোহটা শেষ হয়ে যায়। একটা ব্যাপার খেয়াল করো। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও এই অবাধ প্রেম-ভালোবাসা সমাজে আজকের মতো গ্রহণযোগ্য ছিলো না। বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কেউই প্রেমের বিয়ে মানতে চাইতেন না। সে সময় সমাজে এতো বিচ্ছেদ ছিলো না, সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলতো না। এখন তো প্রেমের বিয়ের ভরা মৌসুম। বিয়ে দেবার আগে বাবা-মা ছেলে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করে নেন পছন্দের কেউ আছে কি না। পছন্দের কেউ থাকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন-যাক, পাত্র পাত্রী খোঁজার ঝামেলা থেকে বেঁচে গেলাম! প্রেমের বিয়ের এই ভরা মৌসুমে দেখো, বিবাহ বিচ্ছেদের হার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে, সংসারগুলো ভেঙে পড়ছে। [১৫৩] ঘরে ঘরে অশান্তি।

দিনাজপুর পৌরসভায় তালাক-সংক্রান্ত সালিশী পরিষদে বৈঠক বসে মাসে দুইবার। ২০২১ সালের পহেলা মার্চে ৪০টি তালাক-সংক্রান্ত বৈঠক ডাকা হয়। এই ৪০টি বিয়ের বেশিরভাগই ছিল প্রেমঘটিত। কারো বিয়ে হয়েছে পরিবারের সম্মতিতে, আবার কেউ কেউ বিয়ে করেন গোপনে। মেয়েদের চাপাচাপিতেই পরিবারের অজান্তে বিয়ে করে বসেন তারা। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা এসব বিয়ে মেনে নেন। তালাক দেওয়া দম্পতিদের তালিকায় ছিলেন চিকিৎসক, আইনজীবী, পুলিশ সদস্যসহ সাধারণ দম্পতিরা। [১৫৪]

এসব কিছুর জন্য যে প্রেমই একমাত্র দায়ী, এমন না। নারীবাদের উত্থান, ভোগবাদী মানসিকতাসহ আরো অনেক ফ্যাক্টর রয়েছে। তবে অন্যতম নাটের গুরু হলো প্রেম।

এখানে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করি। ডিভোর্স মানেই খারাপ, তা না। সাহাবীদের মধ্যেও ডিভোর্সের উদাহরণ আছে। কাজেই ডিভোর্স হওয়া মানেই সেই নারী বা সেই পুরুষের মধ্যে কোনো সমস্যা আছে, এটা ইসলামের অবস্থান না। আদর্শ ইসলামী সমাজেও উপযুক্ত কারণে ডিভোর্স হতে পারে। কাজেই ডিভোর্স হচ্ছে, তাই লাভ ম্যারেজ খারাপ—এটা আমরা বলছি না। আমরা যা বলছি তা হল, লাভ ম্যারেজের ব্যাপারে যে ধারণা আছে, উপরের তথ্যগুলো সেগুলোকে ভুল প্রমাণিত করে। যেসব যুক্তি আর অজুহাত তুলে ধরে লাভ ম্যারেজের পক্ষের লোকেরা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের বিরোধিতা করে, পরিসংখ্যান এবং গবেষণার আলোকে সেগুলো নিরেট ভুল। কাজেই লাভ ম্যারেজের যে মিথ তোমাদের গেলানো হয়েছে, তা কল্পকথাই, সত্য না。

এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসতে পারে। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে কি সংসারে অশান্তি হয় না? মারামারি, খুনোখুনি হয় না?

হ্যাঁ, হয়। তবে সেটা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের সিস্টেমে সমস্যা না। সিস্টেমের প্রয়োগে সমস্যা। এই বিষয়টি খুব ভালোমতো বোঝা যাবে যদি আমরা আগে বুঝে নেই প্রেমের বিয়ে কেন ভাঙে, প্রেমের বিয়ে এবং অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের মধ্যেকার অনালোচিত কিন্তু মৌলিক পার্থক্যগুলো কী।

'প্রেমের বিয়ে ভাঙে কেন?' নামে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট। লেখক ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আলগিন। [১৫৫] উনি ছাড়াও দেশ বিদেশের অনেক প্রখ্যাত গবেষক, আলেম, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণা [১৫৬] থেকে ঠিক ঐ কথাগুলোই বারবার উঠে এসেছে যেগুলো আমরা বইয়ের একদম শুরুতে বলেছি। প্রেম মনে করে মানুষ যে বিষয়ের পেছনে ছুটছে অহর্নিশ, তা হলো আকর্ষণ আর মোহ।

বিয়ের পর অষ্টপ্রহর একসঙ্গে নিবিড়ভাবে থাকার কারণে প্রেমিক/প্রেমিকার চোখে একে অপরের দোষ ধরা পড়ে। মোহ কেটে যায়। প্রেমের সময়টাতে একটা স্বপ্নের জগতে থাকে প্রেমিক প্রেমিকারা। ভাবে বাকি জীবনটাও এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু বিয়ের পরে স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তব দুনিয়ায় আছাড় খেয়ে পড়ে তারা।

অধিকাংশ প্রেমেই এখন বিয়ের আগে যিনা হয়। জঘন্য একটা পাপের মাধ্যমে বিয়ে শুরু হয়। সংসারে অশান্তি নেমে আসে যা আমরা আগেই বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দেখেছি।

বিয়ের আগে কোনো রকমের দায়দায়িত্ব নেওয়া ছাড়াই শরীরের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছিল। এখন সেই একই জিনিস পাবার জন্য একটা দায়িত্ব নেওয়া লাগছে। এই ঝামেলাটাও সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করে।

প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রেমিক/প্রেমিকা যা বলে, তাই বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়। নম্রতা, ভদ্রতা, আত্মত্যাগ থাকে। কিন্তু বিয়ের পর এই দাস-মনিব সম্পর্ক চালিয়ে যাবার মানসিকতা আর থাকে না—ওকে পাবার জন্য আমি আগে এমনটা করেছিলাম... এখন তো আমি ওকে পেয়েই গেছি। আগে অনেক প্যারা সহ্য করেছি... এখন আর করবো না। এই হয় চিন্তাভাবনা।

এবার অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের দিকে তাকাও। মোহ বা কামনার ফাঁদে ফেলে ভুল মানুষ বাছার সম্ভাবনা এখানে শূন্যের কাছাকাছি। কাউকে দেখে মোহে পড়ে গেলেও তার সাথেই যে বিয়ে হয়, এমন না। ছেলে মেয়ের মোহান্ধ চোখ ভুল করলেও বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন খোঁজখবর নিয়ে পাত্র/পাত্রীর এবং পরিবারের মন মানসিকতা, পরিবেশ, দ্বীনদারিতা (শরীয়াহ অনুযায়ী যেটা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত), রূপ-সৌন্দর্য, অর্থনৈতিক অবস্থা সব বিবেচনা করে তাদের ছেলে বা মেয়ের জন্য উপযুক্ত মানুষকে নিয়ে আসতে পারেন। এর ফলে প্রতারণার সুযোগ যেমন কম থাকে তেমনি বিয়ের পরে হানিমুন পিরিয়ড শেষে মোহ বা কামনা কেটে গেলেও মানিয়ে নিতে সমস্যা হয় না।

আদর্শ ইসলামী বিয়েতে কী হয়?
মেয়ের পুরুষ অভিভাবকের উপস্থিতিতে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী পাত্র/পাত্রীরা একে অপরকে দেখে, দোষগুণ, প্রাপ্তি, প্রত্যাশা সব জেনে, দায়িত্ব-কর্তব্য জেনে বুঝে বিয়ে করে। আলগা ফ্যান্টাসি থাকার সুযোগ খুবই কমে আসে। এখানে প্রেমের নামে যিনা করে আল্লাহর আইন অমান্য করা হয় না। ইস্তিখারা সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করার সুযোগ থাকে। [১৫৭] দেনমোহরের ব্যাপারে ঠকানো যায় না।

এখানে একটা কথা বলা বেশ জরুরি- অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের গায়ে একটা তকমা বেশ ভালোভাবে সেঁটে দেওয়া হয়েছে যে, এখানে জোর করে মেয়ে বা ছেলের অমতে তার অপছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে দেওয়া যায়। কাজেই এটা একটা দাসত্বের প্রতীক। অথচ বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর অনুমতি অবশ্যই নিতে হবে। ছেলে বা মেয়ে না চাইলে অভিভাবকরা জোর করতে পারবেন না। এটাই ইসলামের বিধান। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
“যে নারীর পূর্বে বিয়ে হয়েছিল, বিয়ের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার অভিভাবকের তুলনায় বেশি এবং একজন কুমারী মেয়ের বিয়েতে তার অনুমতি নেওয়া আবশ্যিক, (তবে) নীরবতাই তার সম্মতি।” [১৫৮]

তাছাড়া বিয়ে মানে শুধু দু' জন মানুষের মিলন নয়। বরং দুইটি পরিবার, দুইটি বংশের মিলন। লাভ ম্যারেজের বেলায় অনেক ক্ষেত্রেই দুই পরিবারের মাঝে মন-মানসিকতা, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি সহ আরো অনেক কারণে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে হবার সম্ভাবনা থাকে। হয়ও। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা অনেক কম। দুই পরিবারের সম্পর্কে তিক্ততা থাকলে স্বামী-স্ত্রীর জীবন যে কতোটা দুর্বিষহ হয়ে যায়, নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়া বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়।

পাপের উপর প্রতিষ্ঠিত: এই বিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাপের উপর। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা এই বিয়ে থেকে বারাকাহও তুলে নেন।
'যে ব্যক্তি আমার যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার জন্য রয়েছে কষ্টের জীবন। [১৫৯]
'যে তার গৃহের ভিত্তি আল্লাহর তাকওয়া ও সন্তুষ্টির উপর প্রতিষ্ঠা করলো, সে কি উত্তম না ঐ ব্যক্তি যে তার গৃহের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে এক গর্তের পতনোন্মুখ কিনারায়? অতঃপর তাকে নিয়ে তা ধসে পড়লো জাহান্নামের আগুনে। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না।' [১৬০]

অন্যদিকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে বিয়ে করা হলে তাতে নেমে আসে আসমানী বরকত। এটি মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।
'যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে তাকে আমি উত্তম জীবন দান করবো এবং অবশ্যই তাদেরকে তাদের শ্রেষ্ঠ কাজের পুরস্কার দেবো। [১৬১]

রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন মনোবিজ্ঞানী ঊষা গুপ্তা এবং পুষ্পা সিং পাশ্চাত্যের মতো প্রেমের বিয়ে আর উপমহাদেশের গতানুগতিক অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ নিয়ে বেশ চমৎকার একটা গবেষণা করে ১৯৮২ সালে। সেই গবেষণায় দেখা যায়-অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে দিন দিন ভালোবাসা শক্তিশালী হতে থাকে। ড. রবার্ট এপস্টিনের কথা আমরা আগেই বলেছি। তার মতে, প্রেমের বিয়ের ক্ষেত্রে ভালোবাসা মোটামুটি দুই বছর পর কমতে শুরু করে। কিন্তু অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে এটা দিন দিন বাড়তে থাকে। [১৬২]

প্রকৃতপক্ষে লাভ ম্যারেজে ভালোবাসাটাই তৈরি হতে পারছে না ঠিকঠাক মতো। যা হচ্ছে তা খুবই স্বল্প পরিমাণ, ক্ষণিকের ভালোবাসা। বাকিটা জুড়ে আছে মোহ আর কামনা।

কিন্তু অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে কি আসলেই ভালোবাসা তৈরি হয়? দু'জন স্বল্প পরিচিত মানুষ এক ছাদের নিচে আসলেই ভালোবাসা তৈরি হয়? ভালোবাসা কি তৈরি হবার জিনিস? এটা তো একটা অনুভূতি...- প্রশ্ন আসতে পারে।

ড. রবার্ট এপস্টিনের মত হলো-ভালোবাসা তৈরি করা যায়। প্রথমে হয় বিয়ে আর তারপর ভালোবাসা তৈরি হয়। [১৬৩]
ভালোবাসার উপাদানগুলো আর অনুভূতিগুলো দেখো-সামাজিক স্বীকৃতি, দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা, শান্তি, শ্রদ্ধা, মায়া, মমতা, বন্ধন, দায়বদ্ধতা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সন্তান বড় করে তুলবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। এসব কি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ ছাড়া হয়?

তবে ভালোবাসা একদিনেই তৈরি হয় না। একটু সময় নিয়ে কয়েকটা স্তর পেরিয়ে তৈরি হয়। তবে এই স্তর নিয়ে মতভেদ আছে। [১৬৪] কেউ বলে তিনটি, কেউ বলে ৪টি, আবার কেউ বলে ৫টি। তবে সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, সবার মূলকথা এক। সেসবের আলোকেই ভালোবাসা তৈরি হবার ধাপ হিসেবে আমরা রাখছি -
১) মোহ ও কামনা অর্থাৎ আকর্ষণ (Attraction)
২) দয়া, মায়া, মমতা (Affection)
৩) বন্ধন, ভালোবাসা (Attachment, love)

অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের সম্ভাব্য পাত্র/পাত্রীকে দেখে মোহ বা দৈহিক আকর্ষণ অনুভব হয়। তবে প্রেমের বিয়ের মতো এটা অন্ধ হয় না, পরিবার, অভিভাবকরা এই মোহান্ধ মনের চোখ হিসেবে কাজ করে। ইসলামের কষ্টিপাথরে ঘষে সম্ভাব্য ভুল সংশোধন করে দেওয়ার সুযোগ থাকে—এসব আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

অভিভাবকের সম্মতি নিয়ে একে অপরকে পছন্দ করার ধাপ পেরিয়ে আসে বিয়ের ধাপ। এবং বিয়ের মাধ্যমেই তৈরি হয় দয়া, মায়া, মমতা। যার প্রমাণ দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা, যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা - 'আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।' [১৬৫]
'...তারা তোমাদের জন্য আবরণ এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ।' [১৬৬]

দয়া, মমতার ধাপ পেরিয়ে ভালোবাসা চূড়ান্ত পরিণতিতে প্রবেশ করে। একসঙ্গে থাকা, গল্প করা, সুখদুঃখ ভাগাভাগি করা, শারীরিক অন্তরঙ্গতা, উষ্ণতা, ইমোশনাল সাপোর্ট, নিরাপত্তা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা, ...সবকিছুই নিখাদ, নির্ভেজাল ভালোবাসার বৃষ্টি নামায়。

তবে একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করা যে একেবারেই হারাম, এমন না। একে অপরকে ভালো লাগতেই পারে। এবং একে অপরকে ভালো লাগলে যদি সব শর্ত পূরণ হয় এবং এর মধ্যে হারাম কিছু না থাকে, তাহলে ইসলামের নির্দেশ তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যারা একে অপরকে পছন্দ করে তাদের মধ্যে বিয়ে দেওয়ার মতো উত্তম কিছু আছে বলে আমরা মনে করি না।' [১৬৭]

কিন্তু এখন এই পছন্দ করা মানে আমাদের সময়ের গতানুগতিক পছন্দ করা, প্রেম করার মতো না। একে অপরের সাথে কথা বলা, চ্যাট করা, রিকশাবিলাস, বৃষ্টিবিলাস করা বা ট্যুরে গিয়ে একই রুমে থাকা না। এই পছন্দ করার অর্থ হলো-একজন অপরজনকে শুধু দেখেছে... ভালো লেগেছে, এরপর নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করে ছেলে, মেয়ের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে বা মেয়ে মাহরামের মাধ্যমে ছেলের বাসায় প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

যারা এভাবে ইসলাম মেনে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে তাদের পক্ষে এমন কাউকে পছন্দ করা সম্ভব হবে না, যে তাঁর দ্বীনের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, চারটি কারণে একজন নারীকে বিবাহ করা হয়- সম্পদ, বংশমর্যাদা, রূপ ও দ্বীনদারিতা। তিনি বেঁছে নিতে বলেছেন দ্বীনদার নারীকে। না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবার কথা বলেছেন। [১৬৮] এখন একজন দাড়িওয়ালা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ছেলের হিজাববিহীন সুন্দরী ক্লাসমেটের দিকে হঠাৎ চোখ পড়ে ভালো লেগেই যেতে পারে। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা মাথায় রেখে সেই ছেলে ঐ মেয়ের বাসায় প্রস্তাব পাঠাবে না। সেই সাথে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর আগে সে ইস্তিখারা করবে। এটাও তাকে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে রক্ষা করবে ইনশাআল্লাহ। [১৬৯]

পল জেইমস ডিউক ছিল ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের হাইকোর্টের বিচারপতি। ২০১২ সালে ম্যারেজ ফাউন্ডেশন নামের এক থিঙ্কট্যাঙ্ক চালু হয় তার উদ্যোগে। দীর্ঘস্থায়ী সুখী সফল দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য বেশ কিছু কাজ করে যাচ্ছে এই থিঙ্কট্যাঙ্ক। পল জেইমস ডিউকের মতে, 'মুসলিমদের বিয়েতে একটা দীর্ঘস্থায়ী সফল বিয়ের জন্য অসংখ্য উপাদান রয়েছে। [১৭০]

বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের শর্তগুলো মানা হয় না। দ্বীনদারিতা না বরং ছেলের ক্যারিয়ারের সাথে মেয়ের রূপের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে দল বেঁধে সবাই পাত্রী দেখতে যায়। পাত্র ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের পাত্রীকে দেখা জায়েয নয়, অথচ পাত্রের মামা, চাচা, খালু, দুলাভাই সবাই দেখছে। পর্দার কোন বালাই থাকে না। বিয়ের আগে 'পরিচিত হবার' নাম করে পাত্রপাত্রীরা ডেট করে, ইনবক্সে খোলামেলা হয়, অনেকে আবার পরিচিত হতে গিয়ে শুয়েই পড়ে। অথচ ইসলামের অনুমোদিত নিয়ম হচ্ছে মেয়ের পুরুষ মাহরামের উপস্থিতিতে ছেলের সাথে শুধু প্রয়োজনীয় ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে বিয়েতে খরচ যতো কম হয় সে বিয়েতে বারাকাহ ততো বেশি। [১৭১] অথচ আমাদের দেশের বিয়েগুলোতে ভারতীয় সিরিয়াল আর সিনেমায় অনুপ্রাণিত হয়ে হালদি নাইটস, মেহেন্দী নাইটস এই সেই করে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হচ্ছে। সুন্দর, আকর্ষণীয় পোশাকে সেজে নারী পুরুষের সেই লেভেলের ফ্রি- মিক্সিং, অশ্লীল নাচগান, এমনকি মদ পান করা হচ্ছে। ওয়েডিং ফটোগ্রাফির নামে বর- কনের প্রকাশ্যে জড়াজড়ি ছবি, ভিডিও হচ্ছে। সেগুলো আবার আপলোড হয়ে চলে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে লক্ষ লক্ষ লোকের সামনে। বিয়ের পরেও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বীন পালনের তেমন বালাই দেখা যাচ্ছে না। উল্টো ভারতীয় আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ চলছে। এভাবে শরীয়াহর বাইরে গিয়ে বিয়ে সফল হবার প্রত্যেকটি উপাদানকে নষ্ট করে দেওয়া হলে সংসারে অশান্তি, বিচ্ছেদ হওয়া স্বাভাবিক।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে বিয়ের ব্যাপারে শরীয়াহর বিধি-বিধান উপেক্ষা করা হয়। নানা অর্থহীন হিসেব-নিকেশের জালে জড়িয়ে বিয়েকে কঠিন করে ফেলা হয়। সঠিক ইসলামী শিক্ষার অভাবের ফলে উপমহাদেশীয় অনেক কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং ভুল ধ্যানধারণার কারণে নানা ধরনের অবিচারও হয়। বিশেষ করে নারীদের সাথে। কিন্তু এগুলোর সমাধান পশ্চিমের যৌন বিপ্লবের অনুকরণ করে পাওয়া যাবে না। সেই চেষ্টা করা হয়েছে এবং ফলাফলও আমাদের সামনেই আছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান আসবে পরিপূর্ণভাবে শরীয়াহর নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে। সুন্নাহকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে。

তথাকথিত এই লাভ ম্যারেজ সিস্টেম হিসেবে ব্যর্থ। মানে এই সিস্টেম হুবহু অনুসরণ করলেও ব্যর্থতা আসবে-যার প্রমাণ আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট। কিন্তু অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ সিস্টেম হিসেবে ব্যর্থ না। ইসলামী শরীয়াহ, নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে মধুময় সফল দাম্পত্য জীবন তৈরি হয়। এটাই আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি, এটাই হাজার বছর ধরে অনুসরণ করে আসা একমাত্র সফল পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ছাড়া অন্য সকল পদ্ধতি ব্যর্থ হতে বাধ্য। গত কয়েক দশকের বাস্তবতা থেকে এ সত্য স্পষ্ট। লিভ টুগেদার, লাভ ম্যারেজ সহ যা যা আছে সবই মুখ থুবড়ে পড়েছে হতাশার ধূসর, মলিন, স্যাঁতস্যাতে রাজপথের মাঝখানে।

টিকাঃ
[১৪৩] Too Risky to Wed in Your 20s? Not if You Avoid Cohabiting First, The Wall Street Journal. Feb. 5 2022- tinyurl.com/yjkdjh6n
[১৪৪] Married people have happier, healthier relationships than unmarried couples who live together, Washingtonpost, November 20, 2019 - tinyurl.com/bdsewcp9 Cohabiting parents differ from married ones in three big ways, brookings.edu, April 5, 2017- tinyurl.com/ymyrfnv4 Marriage, Living Together, or Staying Single, psychologytoday.com-tinyurl.com/2p9n9ze4 Brown, S. L. (2005). How cohabitation is reshaping American families. Contexts, 4(3), 33-37.
[১৪৫] Men! Would You Prefer To Marry A Virgin? thestudentroom.co.uk-tinyurl.com/d58urrfx Americans must finally get a grip on the sexual revolution's excesses, thehill.com, January 6,2018- tinyurl.com/4rxty8wm The 10 Worst Impacts of the 1960s Sexual Revolution, movieguide.org-tinyurl.com/bdz5rs2s Nation of broken families: One in three children lives with a single-parent or with step mum or dad, Daily Mail- tinyurl.com/2p8p6jw9
[১৪৬] 4 facts about love and marriage in America, weforum.org, February 19, 2018- tinyurl.com/35xde4u3 What Modern Arranged Marriages Really Look Like, brides.com, February 23, 2022- tinyurl.com/prvwvbcd
[১৪৭] What's love got to do with it? Timesofindia, March 12, 2010- tinyurl.com/4h8n6hys
[১৪৮] যে প্রেমের শেষ পরিণতি হচ্ছে বিয়ে: সেটা কি হারাম? islamqa- tinyurl.com/yc4ub88y
[১৪৯] Why is the divorce rate higher in love marriages than in arranged marriages? inforanjan.com, June 9, 2021- tinyurl.com/3dcyw2r4
[১৫০] লাভ ম্যারেজ, শায়খ আলী তানতাউয়ী, বইঘর প্রকাশনী, পৃষ্ঠা, ১৬
[১৫১] বেচারা হুমায়ূন ফরিদী তো শোকে মদ খেতে খেতে মারাই গেল।
[১৫২] তারকা দম্পত্তিদের যত বিচ্ছেদ, একুশে টিভি, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭- tinyurl.com/mw8d9d7b আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন উত্তম! তখন গৌরীদেবীর গয়নার বিল ঢুকিয়েছিলেন সুপ্রিয়াদেবী, oddbangla.com, নভেম্বর ২৬, ২০১৯- tinyurl.com/bdzxhyut
[১৫৩] ঢাকায় প্রতি ৩৭ মিনিটে একটা করে তালাক হচ্ছে, প্রথম আলো ডিসেম্বর ২১, ২০২০- tinyurl.com/4cxy9mnb বাড়ছে তালাকের প্রবণতা, দৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি ৩১, ২০২২- tinyurl.com/438x36ru
[১৫৪] প্রেমের বিয়ের বিচ্ছেদে এগিয়ে নারীরা, জাগো নিউজ, মার্চ ০৮, ২০২১- tinyurl.com/35upbp9r
[১৫৫] প্রেমের বিয়ে ভাঙে কেন? প্রথম আলো, আগস্ট ৯, ২০১৬- tinyurl.com/4c97bdhw
[১৫৬] Why is the divorce rate higher in love marriages than in arranged marriages? inforanjan.com, June 9, 2021- tinyurl.com/3dcyw2r4 How Do Arrange Marriages Last Longer Than Love Marriges,yourdost.com- tinyurl.com/dxjra3p7 Debate on Love Marriage and Arranged Marriage, aplustopper.com, March 16, 2022- tinyurl.com/bdehk578 যে প্রেমের শেষ পরিণতি হচ্ছে বিয়ে: সেটা কি হারাম? islamqa - tinyurl.com/yc4ub88y Arranged Marriages Can Be Real Love Connection, scientificamerican.com, March 11, 2010- tinyurl.com/4cpf4pdy
[১৫৭] ইস্তিখারার নামাযের পদ্ধতি, Islamqa- tinyurl.com/4s7bfnk8
[১৫৮] সহীহ মুসলিম ১৪২১ [ইফা. ৩৩৪৫] ইবনু আব্বাস রা. হতে। সহীহ বুখারীতে (৬৯৪৬) আইশা রা. হতে অনুরূপ বর্ণনা আছে, তবে তাতে হাদিসের প্রথম অংশটি নেই।
[১৫৯] সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪
[১৬০] সূরা আত-তাওবা, ৯: ১০৯
[১৬১] সূরা আন-নাহল, ১৬: ৯৭
[১৬২] What's love got to do with it? - tinyurl.com/4h8n6hys Arranged Marriages Can Be Real Love Connection, scientificamerican.com, March 11, 2010- tinyurl.com/4cpf4pdy
[১৬৩] ভালোবাসা কীভাবে তৈরি করতে হয় তা জানার জন্য রাসূলুল্লাহ'র (ﷺ) জীবনী পড়ো। আম্মাজান আয়েশা (রা.) সহ অন্যান্য আম্মাজানদের সাথে তাঁর সংসার জীবন কেমন ছিল সেগুলো জানো। তাঁর আদর্শই আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য শুধুমাত্র ও একমাত্র আদর্শ। আর-রাহিকুল মাখতুম, রেইনড্রন্সের সীরাহ ইত্যাদি দিয়ে শুরু করতে পারো।
[১৬৪] The 3 Phases of Love, John Gottman- tinyurl.com/mvj53xwn 3 Stages of love in psychology, PsychMechanics.com, January 25, 2021- tinyurl.com/ytkxw3c7 The 3 Stages of Love, scienceofpeople.com- tinyurl.com/ms3hr675
[১৬৫] সূরা আর-রুম ৩০: ২১
[১৬৬] সুরা আল-বাকারাহ ২: ১৮৭
[১৬৭] ইবনু মাজাহ: ১৮৪৭, মুসতাদরাক আল-হাকিম: ২৬৭৭, সহীহুল জামে': ৫২০০। হাকিম নাইসাবুরি, এবং আলবানী রহ. হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৬৮] সহীহ বুখারী: ৫০৯০
[১৬৯] Love and Correspondence Before Marriage, Islamqa-tinyurl.com/3sfy8ujf Love Marriage or Arranged Marriage: Which Is Better in Islam? Islamqa, - tinyurl.com/2bsb9y4n
[১৭০] Vow To Be Happy: Arranged marriages lead to happier relationships..., The Sun, November 19,2016- tinyurl.com/fsye9fs5
[১৭১] মুসনাদ আহমাদ: ২৫৫২৯। বুহুতী, আলবানী প্রমুখ আলিমগণ হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন। (কাশশাফুল কিনা' ৫/১২৯, যঈফাহ: ১১১৭)।

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 বিপ্লব ও অবক্ষয়

📄 বিপ্লব ও অবক্ষয়


এক।

যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে আজকের এই অবস্থা, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন-এই সবকিছুই ষাট ও সত্তরের দশকের সেক্সুয়াল রেভোলুশান বা যৌন বিপ্লবের ফসল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে অ্যামেরিকার। এ সময়কার অ্যামেরিকান প্রজন্মকে বলা হয় 'দা গ্রেটেস্ট জেনারেশান'। ১৯০০ থেকে ১৯২০ এর মাঝে জন্ম নেওয়া এই 'গ্রেটেস্ট জেনারেশন'ই দূরদেশে গিয়ে মহাযুদ্ধে লড়াই করেছিল। যুদ্ধকালীন অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছিল। এ প্রজন্ম ছিল পরিশ্রমী, বাস্তবমুখী। তাদের নৈতিকতা ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক প্রগাঢ় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঝড় সবকিছু আমূল বদলে দেয়।

পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন আগের প্রজন্মের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চিন্তা ও মূল্যবোধগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করে। এর মধ্যে পঞ্চাশের বিট জেনারেশান আর ষাটের দশকের হিপি মুভমেন্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বুদ্ধিজীবি, বিশ্ববিদ্যালয় আর ম্যাস মিডিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। 'শ্রেষ্ঠ' প্রজন্মের পিতামাতার সন্তানরা বেড়ে ওঠে জীবন ও নৈতিকতার প্রতি সম্পূর্ণ নতুন, প্রায় বিপরীতমুখী এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। চিন্তা, চেতনা, আদর্শ ও দর্শনে দুই প্রজন্মের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর বিভাজন। এ বিভক্তি তুঙ্গে পৌঁছায় ষাটের দশকের যৌনবিপ্লব বা সেক্সুয়াল রেভোলুশানের মাধ্যমে। এসময় যৌনতার ব্যাপারে ধর্মীয় নৈতিকতা ছুঁড়ে ফেলে অ্যামেরিকা আলিঙ্গন করে নেয় ফ্রি সেক্সের দর্শনকে। তৈরি হয় সব ধরনের যৌনাচার আর বিকৃতির অবাধ প্রচলন ও বৈধতার এক দর্শন।

পরবর্তী ৬০ বছরে এই যৌনবিপ্লব অ্যামেরিকা থেকে রপ্তানি করা হয়েছে বাকি বিশ্বে। মিডিয়া, আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষাব্যবস্থা, বৈশ্বিক কর্পোরেশন...সেই পুরনো কালপ্রিটদের মাধ্যমে। আজ প্রেম, যৌনতা, পরিবার ও সমাজের ক্ষেত্রে যে বিকৃত চিন্তা আমরা দেখছি তা এই বিপ্লবেরই ফসল。

দুই।

ষাটের দশকের শেষদিকে শুরু হওয়া সেক্সুয়াল রেভোলুশানের ভিত স্থাপিত হয় আরো আগে। যৌনবিপ্লব নামের সভ্যতার অবৈধ এ সন্তানের বংশগতিকে সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করা যায়:
মানুষের মনোদৈহিক প্রায় সব ধরনের সমস্যার কারণ হিসেবে অবদমিত কামনাবাসনা তথা যৌনতাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে সেক্সুয়াল রেভ্যুলুশানের প্রাথমিক কাঠানো দাঁড় করায় সাইকোঅ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড (মৃত্যু. ১৯৩৯)। মানুষের ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অনুপ্রেরণা-প্রায় সবকিছুর পেছনে ফ্রয়েড যৌনতা খুঁজে পায়। ফ্রয়েডের মতে, মানবজীবনের সব আনন্দ ও কষ্টের সম্পর্ক লিবিডোর (যৌনতাড়না) সাথে। এমনকি শিশুকেও ফ্রয়েড আবিষ্কার করে যৌন প্রাণী হিসেবে। ফ্রয়েডের চিন্তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় উইলহেম রাইশ এবং হার্বার্ট মারক্যুসার মতো লোকেরা।

জার্মান মার্ক্সিস্ট মনোবিদ ডাক্তার উইলহেম রাইশ (মৃত্যু. ১৯৫৭) নিজ বইয়ে সর্বপ্রথম যৌনবিপ্লব বা 'Sexual Revolution' কথাটি ব্যবহার করে। উইলহেম রাইশের বইটির নাম ছিল 'Die Sexualität im Kulturkampf', যার অর্থ দাঁড়ায়- “সাংস্কৃতিক যুদ্ধে যৌনতার ভূমিকা”। ফ্রয়েডের ছাত্র রাইশের মূল বক্তব্য ছিল, যৌনতার ব্যাপারে রক্ষণশীল মনোভাব [১৭২] আসলে স্বৈরাচারী শাসনের শোষণযন্ত্রের অংশ। এই শোষণ থেকে বের হয়ে আসতে হলে কয়েকটা কাজ করতে হবে। যেমন –
■ সমকামিতাসহ অন্য সব বিকৃত যৌনাচারকে সামাজিক ও আইনীভাবে গ্রহণ করে নিতে হবে।
■ কোলের শিশুর সাথেও যৌন সম্পর্ককে মেনে নিতে হবে। শিশুর যৌনতাকে জোর করে দমন করা যাবে না।
■ গর্ভপাতকে বৈধ এবং সহজলভ্য করতে হবে।
■ কিশোর-কিশোরীদের খোলামেলা যৌন শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
■ কিশোর বয়স থেকেই সবাইকে যৌন স্বাধীনতা দিতে হবে।

রাইশের মতে শোষণমুক্ত, আদর্শ সমাজ গঠনে উপরের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। উইলহেম রাইশের এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। গত আট দশকে রাইশের এই প্রেসক্রিপশান প্রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জীবনে তার নাম না শুনলেও এই বাংলাদেশের অনেক তরুণ-তরুণীও আজ উইলহেম রাইশের চিন্তাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তার বিকৃত চিন্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে অনেকে তাকে ‘যৌনবিপ্লবের ধাত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

তবে ফ্রয়েডের তৈরি করা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সত্যিকার অর্থে সেক্সুয়াল রেভোলুশান এবং আজকের এই যৌনোন্মাদ সমাজের জন্ম দেয় তার নাম অ্যালফ্রেড কিনসি (মৃত্যু. ১৯৫৬)। রকাফেলার ফাউন্ডেশানের সমর্থন নিয়ে ফ্রয়েড এবং রাইশের চিন্তার সাথে কিনসি যুক্ত করে নতুন এক দিক।

কিনসি দাবি করে, মানুষের যৌনতা নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোতে আবদ্ধ না। যৌনতা ক্রমপরিবর্তনশীল, এখানে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। মানুষের যৌনতা রঙধনুর মতো। এখানে আছে অনেক রঙ, অনেক মাত্রা। রঙধনুর একপ্রান্তে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা, আর অন্য প্রান্তে সমকামিতা। এ দুইয়ের মাঝে আছে শিশুকামিতা, পশুকামিতা, উভকামিতা থেকে শুরু করে সব ধরনের বিকৃতি। সমাজের মানুষেরা এই রঙধনু বা বর্ণালীর মধ্যে একেক অবস্থানে থাকতে পারে। আবার একজন মানুষ তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বর্ণালীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারে। কিনসির মতে, অধিকাংশ মানুষের অবস্থান রঙধনুর মাঝামাঝি, উভকামিতায়। কিন্তু সমাজ, সংস্কার ও ধর্মের মাধ্যমে আরোপিত নৈতিকতার কারণে মানুষ এই স্বাভাবিক অবাধ যৌনতার প্রবণতাকে চেপে রাখে। একে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে অথবা নিজের আসল যৌনাচারকে গোপন রেখে সমাজের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে থাকে।

কিনসি তার কুখ্যাত দুটি বইয়ের (Sexual Behavior In The Human Male/Female) মাধ্যমে ‘প্রমাণ’ করে দেখায় যে যেগুলোকে আমরা বিকৃত যৌনতা বলি সেগুলো আসলে অনেক বেশি প্রচলিত। সমকামিতা, উভকামিতা, বহুগামিতাসহ অনেক কিছুই সমাজের অনেকেই করে। যদিও তারা লোকলজ্জার ভয়ে সেটা গোপন রাখে। এই দাবির পক্ষে কিনসি বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। কিন্তু আসল ফাঁকিটা ছিল তার পরিসংখ্যানেই। কিনসি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল তাদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ ছিল পতিতা, ধর্ষক, সমকামী, সমকামী পুরুষ পতিতা, যৌন অপরাধের কারণে কারাভোগকারী এবং শিশু ধর্ষক। অর্থাৎ কিনসি গবেষণার জন্য এমনভাবে মানুষ বেছে নিয়েছিল যাতে বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত মানুষদের অনুপাত বেশি হয়। কিনসি ঠিক এ কাজটাই করেছিল। [১৭৩]

চল্লিশের দশকের শেষ দিকে আর পঞ্চাশের দশকে কিনসির 'রিসার্চ' ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। রকাফেলার ফাউন্ডেশানের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও সমর্থনে অ্যামেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে নিজের আবিষ্কৃত 'বৈজ্ঞানিক সত্য'গুলো প্রচার করে বেড়ায় কিনসি। তার বইগুলো পরিণত হয় বেস্টসেলারে। কিনসির এই জালিয়াতি ভরা গবেষণার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে যৌনতার ব্যাপারে আধুনিক পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি। কিনসির উপসংহারের উপর ভিত্তি করে স্কুলের যৌনশিক্ষা বই এবং আইন পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে যৌনবিপ্লবের দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, প্লেবয় ম্যাগাযিনের হিউ হেফনার এবং সমকামী অধিকার আন্দোলনের হ্যারি হেই- গভীরভাবে কিনসির দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

অন্যদিকে ফ্রয়েড, মার্ক্স আর রাইশের চিন্তার সমন্বয় করে কালচারাল মার্ক্সিসম ও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ছাঁচে সমকামিতাসহ অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারের স্বাভাবিকীকরণের আন্দোলনের জন্য একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের নিও-মার্ক্সিস্ট তাত্ত্বিক হার্বাট মারক্যুসা (মৃত্যু. ১৯৭৯)। ১৯৫৫ সালে লেখা Eros and Civilization বইয়ে সে বলে - 'যৌনতার ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা বা দমন করার মানসিকতা, মানবজাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আর যৌনতার ক্ষেত্রে ভিক্টোরিয়ান (অর্থাৎ রক্ষণশীল) মানসিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই একটি উন্নত বিশ্ব নির্মাণ সম্ভব!' [১৭৪]

কিনসির দেওয়া ন্যায়-অন্যায় থেকে মুক্ত যৌনতার বর্ণালীতে নতুন একটি অক্ষ যোগ করে জন্ম হপকিন্সের ড. জন মানি। যৌনতা (sexual preference), লিঙ্গ (gender) ও লৈঙ্গিক পরিচিতির (gender identity) মাঝে মানি পার্থক্য খুঁজে বের করে। সে বলে বসে মানুষের ধরাবাঁধা কোন যৌনতা তো নেই-ই, কোন ধরাবাঁধা লৈঙ্গিক পরিচয়ও নেই। আজ আমরা যে পুরুষের দেহে নারী, নারীর দেহে পুরুষ-জাতীয় বিভ্রান্তি এবং বিকৃতি দেখছি (transgender movement/ রূপান্তরকামীতা), সেটার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জন মানির এই ধারণাগুলো।

কিনসি, ও বিশেষ করে মানির কাছ থেকে আসা ধারণাগুলো লুফে নেয় ষাট ও সত্তরের দশকে তুঙ্গে থাকা ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট। এই যে "বৈজ্ঞানিক প্রমাণ' পাওয়া গেছে-নারী ও পুরুষ আসলে একই। তাদের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষ ও নারীর চিন্তা, সামর্থ্য, সামাজিক ও পারিবারিক ভূমিকার যে পার্থক্য সমাজে আছে তা আসলে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। এসব ধারণা আসলে গড়ে উঠেছে পুরুষতন্ত্রের মাধ্যমে। প্রথা, ধর্ম, সংস্কার ব্যবহার করে পুরুষরা আসলে নারীদের ঘরে বন্দী করে রেখেছে। নারীবাদ আক্রমণ করে পরিবারকে। নারীবাদের চোখে পরিবার হলো একটি 'পুরুষতান্ত্রিক' কাঠামো যার উদ্দেশ্য নারীকে ঘরে আটকে রেখে পুরুষের আধিপত্য নিশ্চিত করা। নারীবাদে এসে সাইকোলজি, সেক্সোলজি, বিকৃতি, মানবিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভূত এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়। নারীবাদ নারীকে শেখাতে শুরু করে, 'একজন নারীর জন্য পুরুষের কোনো দরকার নেই। প্রয়োজন নেই পরিবারের মধ্যে নিজের পরিচয় বা পূর্ণতা খোঁজার। পরিবার, সন্তান এগুলো তোমাকে শুধু আরো পিছিয়ে দেবে। বরং তোমার উচিত নিজের স্বাতন্ত্র্য, নিজের ব্যক্তিত্ব, নিজের ক্যারিয়ারের মাঝে সাফল্য খোঁজা।'

যৌনবিপ্লব এসে নারী ও পুরুষ, দুজনকেই দীক্ষা দিতে শুরু করে-শরীরের চাহিদা পূরণের জন্য বিয়ের কী দরকার? সেক্স শুধু শরীরের জন্য, আনন্দের জন্য। যা ইচ্ছে করো, কিন্তু এর সাথে আর কোনো কিছু জড়ানোর প্রয়োজন নেই। যখন ইচ্ছা, যার সাথে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা শুয়ে পড়তে পারাই তো স্বাধীনতা। এটাই তো প্রগতি, এটাই তো সভ্যতা!

ষাট ও সত্তরের দশকে যা ছিল (নৈতিকতা, পরিবার, যৌনতা ইতাদির ব্যাপারে) খুব র‍্যাডিকাল 'বিপ্লবী চিন্তা', পরের দশকগুলোতে সেগুলোই ধীরে ধীরে স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। কিনসি, মানি ও মারক্যুসাদের চিন্তাধারা এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত তত্ত্বগুলো শেখানো হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর উপর এই চিন্তাধারা প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। একই সাথে সাধারণ মানুষের চিন্তায় এ বিশ্বাসগুলো বিভিন্নভাবে গেঁথে দিতে থাকে মিডিয়া। এই কলুষিত দর্শন, চিন্তার বিকৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা বিশ্বে। আর এভাবেই ধাপে ধাপে সব শেকল থেকে মুক্ত হয়ে যৌনতা পরিণত হয় নিছক আনন্দের এক অতৃপ্ত অন্বেষণে。

যৌনতার ব্যাপারে এই দর্শনকে এই বিশ্বব্যবস্থা আজ মোটাদাগে গ্রহণ করে নিয়েছে। যৌনতাকে এখন এভাবেই দেখা হচ্ছে, সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। অবাধ যিনার পাশাপাশ সমকামী অধিকার, ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকারের নামে বিকৃতির স্বাভাবিকীকরণ চলছে জাতিসঙ্ঘের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উন্নয়ন, মানবাধিকার আর স্বাধীনতার নামে মুসলিম বিশ্বে এই চিন্তাধারা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। সোজা কথায় কাজ না হলে, নানাভাবে বাধ্য করছে। বিকৃতি ও অবক্ষয় সমগ্র সভ্যতার উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে。

এভাবেই আমরা এমন এক বিচিত্র সময়ে এসে পৌঁছেছি যখন অ্যামেরিকাতে বছরে সাড়ে ছয় লক্ষ আর বাংলাদেশে বছরে সাড়ে ৭ লক্ষের উপর গর্ভপাত হয়। [১৭৫] এভাবেই বিবাহপূর্ব ও বিবাহ বহির্ভূত যৌনতা সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়। সিনেমা, সাহিত্য, টেলিভিশন, ইউটিউব সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে নকশা, অধুনা আর পরামর্শের কলাম সন্তান আর সন্তানদের অভিভাবককে শিখিয়ে দেয় উঠতি বয়সে 'প্রেম করা' আর 'শারীরিক ঘনিষ্ঠতা' স্বাভাবিক ব্যপার। আর এমন কিছু ঘটে যা পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি-পর্নোগ্রাফি ঢুকে পড়ে প্রতিটি ঘরে, চলে আসে প্রতিটি মানুষের হাতের নাগালে, পরিণত হয় শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক ইন্ডাস্ট্রিতে। আর সেক্সুয়াল রেভোলুশানের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে অ্যামেরিকার কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের টেবিলে রাখার পত্রিকার পাতাতে।

টিকাঃ
[১৭২] রক্ষণশীল বলতে সে মূলত ইহুদী-খ্রিষ্ট ধর্মীয় মূল্যবোধকে বুঝিয়েছে
[১৭৩] অ্যালফ্রেড কিনসির ধাপ্পাবাজি নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ে যেতে পারে এই বইটি - Kinsey, Sex and Fraud: The Indoctrination of a People. পিডিএফ লিঙ্ক tinyurl.com/yc2phsve
[১৭৪] পৃ. ২২৭-২২৮
[১৭৫] Total abortions in the United States in 2020, Guttmacher Institute- tinyurl.com/j5rpmhnc Zaidi et al., (2014). Achievements of the FIGO initiative for the prevention of unsafe abortion and its consequences in South-Southeast Asia. International Journal of Gynecology & Obstetrics, 126, S20-S23.

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 অগ্নুৎসব

📄 অগ্নুৎসব


এক.
ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উপর প্রেম এবং অবাধ যৌনতার কিছু কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু এতোক্ষণের আলোচনা ছিল মূলত স্বল্পমেয়াদী প্রভাবগুলো নিয়ে। কিন্তু যৌনবিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নের আছে গভীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। যা বর্তমানের সীমানা ছেড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ক্ষত এঁকে দিতে থাকে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে অতিক্রম করে যা বিচ্যুত করে সভ্যতাকে।
অবাধ প্রেম ও যৌনতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে এবং পরিবারকে দুর্বল করে। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল যৌনবিপ্লবের জন্মস্থান অ্যামেরিকার বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা। ক্ষয় হতে হতে অ্যামেরিকার অধিকাংশ পরিবার আজ ফাঁপা খোলসে পরিণত হয়েছে। অ্যামেরিকায় জন্ম হওয়া মোট শিশুর প্রায় ৪১%-ই হলো বিয়ে বহির্ভূত প্রেমের ফসল। অর্থাৎ, আজ অর্ধেকের কাছাকাছি অ্যামেরিকান শিশু আক্ষরিক অর্থেই জারজ। যেসব ক্ষেত্রে বিয়ের পর বাচ্চা হচ্ছে, সেই বিয়েগুলোরও বড় একটা অংশ টিকছে না। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে প্রতি ৪ জনে ১ জনের ঘরে বাবা নেই। আফ্রিকান অ্যামেরিকানদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি, ১০০ জন শিশুর মধ্যে ৬৫ জনের ঘরেই বাবা নেই।
এই শিশুরা বড় হচ্ছে ভাঙা পরিবারে, বাবার ছায়া ছাড়া। সন্তানদের সঠিক মানসিক এবং আত্মিক গঠনের জন্য বাবা এবং মা, দুজনের উপস্থিতিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের অস্থিরতা আর অসুখ। বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের অপরাধে জড়িত হবার প্রবণতা বেশি থাকে। এরা পড়াশোনায় খারাপ করে, স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। দরিদ্রতা, বৈষম্যের মধ্যে বড় হয়। গবেষণার পর গবেষণা জানালো অল্প বয়স্ক খুনি, সিরিয়াল কিলার, 'ভালো লাগছে না, যাই ক্লাসরুমে, শপিং মলে কিংবা জনসমাবেশে গুলি করে পাখির মতো মানুষ মেরে আসি'-মানসিকতার ম্যাস কিলার, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, ধর্ষক, মাস্তান, গ্যাং মেম্বার [১৭৬], বাসায় বউ পেটানো, বাচ্চাদের মারধর করা, বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় ভোগা মানুষদের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য কমন-তাদের ঘরে বাবা নেই, তাদের বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে। শুধু তাই না, লিভ টুগেদার করা যুগলদের বাচ্চাদের ৪২% এর মধ্যে বন্ধুদের ধরে মারপিট করার প্রবণতা দেখা যায়, যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এদের কারাগারে যাবার সম্ভাবনাও স্বাভাবিক পরিবারের বাচ্চাদের তুলনায় ১২ গুণ বেশি![১৭৭]
একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবার জন্য এমন বাবা-মা ছাড়া, বিবাহ বহির্ভূতভাবে জন্ম নেওয়া, স্থায়ী পরিবার ছাড়া বেড়ে ওঠা একটা জেনারেশনই যথেষ্ট। বেগতিক অবস্থা দেখে বিবাহ বহির্ভূত যৌনতাকে পূজা করা পশ্চিমারাই এখন বলতে শুরু করেছে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা হলো বিয়ের পবিত্র বন্ধনে গড়ে ওঠা পরিবার।
সস্তা প্রেম আর যৌনতাকেন্দ্রিক চিন্তাধারা সমাজেও অস্থিরতা তৈরি করে। জন্ম দেয় নানা সামাজিক অসুখের। পারিবারিক বন্ধনের মতো পশ্চিমে সমাজ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ওদের তরুণ-তরুণীরা ক্ষুব্ধ, একা। ওরা বিভ্রান্তিতে ভুগছে আত্মপরিচয়, নিজের দেহ, পৃথিবীতে নিজের অবস্থান ও ভূমিকা-সবকিছু নিয়েই। নারীর দেহে আটকা পড়া পুরুষ, পুরুষের দেহে আটকা পড়া নারী, সাদার দেহে আটকা পড়া কালো, মানুষের দেহে আটকা পড়া পশু-এমন হাস্যকর সব বিভ্রান্তিতে দিন পার করছে ওরা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য, অস্থিরতা, সহিংসতা। যৌনরোগ, গর্ভপাত, বিচ্ছেদ, মাদকাসক্তি, পর্ন আসক্তি, খুনোখুনি, সহিংসতা আগের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ছোটবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষ করা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। করোনার সময় অ্যামেরিকাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে বৃদ্ধাশ্রমে।[১৭৮]
অথবা বৃদ্ধ বাবা-মা কোনোমতে একা ফ্ল্যাটে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন। ঘরের কোণে পড়ে থাকছে তাদের বিস্মৃত জীবনের বিস্মৃত লাশ। কেউ জানছে না, খোঁজও নিচ্ছে না। পচেগলে গন্ধ বের হবার পর প্রতিবেশীদের টেলিফোনে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করছে। এভাবেই পশ্চিমা সমাজ তার প্রবীণ সদস্যদের সাথে আচরণ করে। এই বুঝি আধুনিকতা?
পতনোন্মুখ সভ্যতায় যেসব বৈশিষ্ট্য থাকে, দেখা যাচ্ছে তার সবক'টিই। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মাত্রায় হতাশা আর বিষণ্ণতায় ভুগছে তারা। মেয়েদের মধ্যে এ সংখ্যা অনেক বেশি। হতাশার অনিবার্য পরিণতি সুইসাইডকেও আপন করে নিচ্ছে তারা। আত্মহত্যার হার তরুণ-তরুণীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। প্রতি ৫ জনে ১ জন আত্মহত্যা করার কথা ভাবছে। ২০০৭ সালের তুলনায় সুইসাইড বেড়ে গিয়েছে প্রায় ৬০%। অ্যামেরিকার টিনেজারদের মৃত্যুর দুই নম্বর কারণই হচ্ছে সুইসাইড![১৭৯]
স্বপ্নের দেশ কানাডার অবস্থাও একই রকম। প্রতি ৩ জন কানাডিয়ানের ১ জন ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ভয়াবহ। ছোট্ট বয়সটাতেই হতাশা, অবসাদ, ক্লেদ জাঁকিয়ে বসেছে এমন কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। প্রতি ৫ জনে একজন মনোযাতনায় ভুগছে। এদের সামনে লম্বা একটা সময় পড়ে আছে, জীবন শুরুই হয়নি কিন্তু এরই মধ্যে তাদের পৃথিবী এতোটাই সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে যে অনেকেই আত্মহত্যা করে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। এই বয়সের কানাডিয়ানদের মৃত্যুবরণের দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ হলো আত্মহত্যা।
এই বিষণ্ণতা আর হতাশার প্রভাব পড়ছে সমাজে। সমাজের তরুণদের বড় একটা অংশ যদি বিষাদে মগ্ন থাকে, যদি স্বেচ্ছায় ডুব দেয় মাদক আর সহিংসতার জগতে, যদি জীবনকে তাদের কাছে অর্থহীন, শূন্য আর স্রেফ সাময়িক সুখের খোঁজ করার মাধ্যম মনে হয়—তাহলে অবধারিতভাবেই ঐ সমাজ খারাপ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে।
সমাজের সংহতি নষ্ট হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে—এটুকু বুঝতে আসলে বিজ্ঞানী হতে হয় না।
ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জন ক্লিনটন সতর্ক সঙ্কেত জানিয়ে বলেছেন, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আমাদের সমাজ এক মহা সঙ্কটের ভেতর পড়েছে।[১৮০]
পশ্চিমের তরুণ সমাজকে যে বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রাস করে নিচ্ছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল-অপরিপক্কতা (immaturity), আত্মকেন্দ্রিকতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ঔদ্ধত্য, অস্থিরতা এবং আত্মমুগ্ধতা। আর এই অসুখগুলো দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মাঝেও।
দুই.
যৌনবিপ্লবের অন্যতম ফিচার ছিল নারীমুক্তি। কিন্তু নারীদের উপরই ঝড় ঝাপটা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সাদা চামড়ার সব দেশগুলোতেতেই প্রচণ্ড মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা। যৌন নির্যাতনের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না পুরুষরাও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, মিলিটারি, চার্চ, পাবলিক প্লেইস, বয়ফ্রেন্ডদের সাথে ডেইট করতে গিয়ে... সবখানেই ধর্ষিত, যৌন নির্যাতিত, নিপীড়িত হচ্ছে নারীরা। যার অধিকাংশেরই কোনো বিচার হয় না। বা রিপোর্ট করা হয় না।
যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের আদর্শ নারীকে পরিবার আর বিয়ে থেকে 'মুক্ত' করেছে। তাকে শিখিয়েছে, তোমার পরিবারের দরকার নেই, তোমার জীবনের সাফল্য হলো পুরুষের মতো যা ইচ্ছে তা করতে পারায়। তোমার সাফল্য নিহিত তোমার ক্যারিয়ারে, তোমার ডিগ্রিতে, তোমার আত্মপরিচয়ে। তুমি স্বাধীন, শক্তিশালী নারী, যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। যে কারো সাথে শুতে পারো।
স্বপ্নালু চোখের তরুণীরা যৌনবিপ্লবের প্রেসক্রিপশান মেনে চলেছে অক্ষরে অক্ষরে। শতভাগ কাজে লাগিয়েছে নতুন পাওয়া 'স্বাধীনতা'কে। যৌবনে চুটিয়ে প্রেম করেছে। নিজের সৌন্দর্য আর আর শরীর প্রদর্শন করেছে। লোলুপ চোখের পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া মনোযোগ উপভোগ করেছে তারিয়ে তারিয়ে। নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে অনেককে। নিজের যৌন চাহিদা মেটাতে বিছানায় গেছে অনেকের সাথে। সেই সাথে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে নিজেদের পড়াশুনা, চাকরি, ক্যারিয়ারকে।
কিছুদিন ব্যাপারটা ভালোই চলছে। কিন্তু একপর্যায়ে তারা আবিষ্কার করছে এই স্বাধীনতা, এই অবাধ যৌনতা সাময়িক আনন্দ দিলেও, বুকের ভেতরের শূন্যতা দূর করতে পারছে না। আরো কিছুদিন যাবার পর দেখছে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের কদর কমে আসছে। চোখগুলো আর আগের মতো তাদের দিকে ফিরছে না। পুরুষগুলো আর আকৃষ্ট হচ্ছে না আগের মতো। তাদের সন্ধানী চোখগুলো খুঁজে ফিরছে কমবয়সী শিকারকে।
একজন পুরুষ পরিবার শুরু করতে পারে মোটামুটি যেকোনো বয়সে। ৬০ বছর বয়সের পুরুষও নতুন বিয়ে করা বাবা হতে পারে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। শারীরিকভাবে নারীর উর্বরতা, অর্থাৎ মা হবার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে কৈশোরের শেষ দিক থেকে শুরু করে মোটামুটি ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর খুব দ্রুত এই সক্ষমতা কমতে থাকে। আগে কখনো মা হয়নি, এমন কারো পক্ষে ৩৫ বছরের পর নতুন করে মা হওয়া কঠিন। ৪৫ বছরের পর মোটামুটি অসম্ভব। সহজ ভাষায়, ৩৫ এর আগে পরিবার শুরু না করলে, এর পর পরিবার শুরু করে সফল হওয়া, মা হওয়া একজন নারীর জন্য কঠিন।
কিন্তু যৌনবিপ্লব আর নারীবাদের মন্ত্রে মুগ্ধ হওয়া নারীরা এ সময়টা কাটিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতার সুখে মজে, ক্যারিয়ার নিয়ে। সুখের তীব্রতা একটু ভোঁতা হয়ে আসার পর হঠাৎ আবিষ্কার করছে, তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এমন একটা সময় পার হয়ে গেছে, যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। যৌবনে অনেক পুরুষের মনে ঝড় তোলা, অনেকের নির্ঘুম রাতের কারণ হওয়া, অনেক বান্ধবীর ঈর্ষার পাত্র হওয়া নারী চল্লিশের কোঠায় এসে নিজেকে একা, শূন্য আবিষ্কার করছে। মদের বারগুলোতে, মনোবিদের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে, পর্নসাইটে মধ্যবয়স্ক একাকী নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে, স্বামীর ভালোবাসার স্পর্শ শরীরে মেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সৌভাগ্য ওদের হয় না, ওদের ঘুমাতে হয় পোষা কুকুর আর বিড়ালকে জড়িয়ে।
নারীর ভূমিকা শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া না। কিন্তু সন্তান নারীত্বের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। নারীর শরীর, মন, মস্তিষ্ক সবকিছু গড়ে ওঠে তার মাতৃত্বের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে। এগুলো অনস্বীকার্য বাস্তবতা। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী নারীত্বকে কেবল নারীর যৌবন, যৌনতা এবং শরীরে সীমাবদ্ধ করেছে। মিডিয়া, গল্পে, সিনেমায় কিশোরী, তরুণী, বেশি হলে মধ্য ত্রিশের কোঠায় থাকা একাকী, স্বাধীন নারীর গল্প তোমাকে বলবে, কিন্তু মধ্যবয়স্ক নারীর জন্য সেই একাকীত্ব আর স্বাধীনতার অর্থ কী-সেটা বলবে না। পরিবারে নারীকে শুধু তার শরীর আর যৌবন দিয়ে মাপা হয়্বা না। আধুনিকতার চোখে একটা বিগতযৌবনা নারী কেবল অতোটুকুই-বিগতযৌবনা, পুরনো মাল। ডেইটওভার।
কিন্তু পরিবারে সেই নারী হলো সম্মানিতা স্ত্রী, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মা, সংসার নামের জাহাজের দায়িত্বশীল কর্ত্রী। আরো বয়স হলে তিনি দাদীমা-নানীমা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আধার। পরিবারে যৌবন ফুরালে নারীর প্রয়োজন ফুরায় না। বরং বয়সের সাথে সাথে তার সম্মান ও মর্যাদা বাড়ে। পরিবার ও বিয়ে নারীকে সম্মান করে তার শৈশব, তারুণ্য, মধ্যবয়স এবং বার্ধক্যে। আধুনিকতা কেবল নারীর যৌবনের দান দেয়। আধুনিক সমাজ নারীর কাছে রঙিন, চকচকে একটা স্বপ্ন বিক্রি করেছে। কিন্তু বরাবরের মতোই সেই স্বপ্নের বাস্তবতা দুঃস্বপ্নের মতো হয়েই রয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো শুধু নারীকে না, প্রভাবিত করে পুরো সমাজ ও সভ্যতাকেই।
তিন.
যৌনবিপ্লবের এবং অবাধ যিনার খুব ভয়াবহ একটা দিক হলো জন্মহার কমে যাওয়া। টেসলার সিইও ইলন মাস্ককে তো চেনো, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনীদের একজন। জন্মহার কমে যাবার এই ব্যাপার নিয়ে মাস্ক বেশ সোচ্চার। সে জোর দিয়ে বলেছে পুরো সভ্যতার জন্য এটা এক বিশাল হুমকি। এটা শুধু ইলন মাস্কের কথা না। অনেক গবেষক, বিশেষজ্ঞ, ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। দিন দিন তাদের সংখ্যা বাড়ছে।[১৮১] কিন্তু জন্মহারের গুরুত্বটা আসলে ঠিক কোন জায়গায়?
একটা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে সেই সমাজের পরিবারগুলোতে কমসেকম গড়ে ২.১ জন সন্তান থাকতে হয়। ধরো, তুমি বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। তুমি যাকে বিয়ে করলে সেও তার বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। অর্থাৎ চার জন মানুষ থেকে তুমি আর তোমার স্ত্রী বা স্বামী, এই দু'জন আসলো। এখন তোমরা সন্তান নিলে একটা। তাহলে দু' জন মানুষ থেকে আসলো এক জন। দুই প্রজন্মের ব্যবধানেই (৫০ বছর) চার থেকে সংখ্যাটা নেমে আসলো একে। এ ব্যাপারটা যদি পুরো সমাজ জুড়ে হয় তাহলে দিন দিন শিশু ও তরুণদের সংখ্যা কমে আসবে আর বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়বে। আবার প্রতি প্রজন্মে সমস্যাটা আরো গুরুতর হতে থাকবে।
এ ব্যাপারটাই এখন ঘটছে বৈশ্বিকভাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে জন্মহার গড়ে ১.৬। কানাডা আর অ্যামেরিকাতে জন্মহার ঘোরাফেরা করে ১.৩ থেকে ১.৮ এর মাঝে। প্রায় সবগুলো উন্নত দেশে জনসংখ্যার হার এমন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোও তাদেরকে অনুসরণ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এ একটা গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। সেই গবেষণাতে বলা হচ্ছে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জন্মহার নেমে আসবে ১.৭-এ! বিশ্বব্যাপী জন্মহার কমার এই প্রবণতা নিয়ে গবেষক প্রফেসর ক্রিস্টোফার মারে বলছেন,
'এটা বিস্ময়কর। আসলে এটা যে আসলে কতো বিশাল তা নিয়ে ঠিক মতো চিন্তা করা এবং সমস্যাটাকে চিনতে পারাই অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন। সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে...'
তুমি বলতে পারো, মানুষ কম হলে পরিবেশ দূষণ হবে না। অনেক কৃষিজমি থাকবে... এগুলো সবই সত্য। কিন্তু সেই কৃষি জমি চাষ করবে কে? নতুন মানুষ না জন্মালে পুরোনোরা তো সবাই একসময় বৃদ্ধ হয়ে যাবে। তারা তো কাজ করতে পারবে ভাবনা। কোনো উৎপাদন করতে পারবে না। উল্টো তাদেরই দেখাশোনা করা লাগবে। কে তাদের দেখাশোনা করবে? কলকারখানায় কে কাজ করবে? অর্থনীতির চাকা কে চালু রাখবে? নতুন করে নির্মাণ করবে কে?[১৮২] একটা সমাজে যদি শিশু ও তরুণদের তুলনায় বৃদ্ধদের সংখ্যা বেশি হয়, দিন দিন যদি সন্তান জন্ম দেওয়ার হার কমতে থাকে, তাহলে সময়ের সাথে সাথে বিষয়টা কোন দিকে যাবে? বুঝতে পারছো, কেমন ভয়ংকর একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে?
ছোট থেকেই সমাজবিজ্ঞান বইয়ের জনসংখ্যা চ্যাপ্টার পড়ে, দেশীয় এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রোপ্যাগান্ডার ফলে আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে জনসংখ্যা মানেই বোঝা। কিন্তু আসলে জনসংখ্যা হলো সম্পদ। মানুষ শুধু সম্পদ ভোগ করেই শেষ করে না। সম্পদ তৈরিও করে। আল্লাহর দেওয়া উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে পৃথিবীকে কল্যাণের পথে, সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করে।
১৭৯৮ সালে থমাস ম্যালথাস তার মারাত্মক প্রভাব বিস্তারকারী বই Essay on the Principle of Population প্রকাশ করে। সে দাবি করে, জনসংখ্যার দ্রুতগতির সাথে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে না। কাজেই জন্মহার কমানো না গেলে মানুষ না খেয়ে, দুর্ভিক্ষে, রোগব্যাধির শিকার হয়ে মারা যাবে। সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। ধ্রুব সত্য হিসেবে ম্যালথাসের এই দাবির রেফারেন্স আজও টানা হয়। কিন্তু ম্যালথাস মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেছে বহু আগেই। গত কয়েক শতাব্দীতে বিশ্বের জনসংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। কিন্তু ম্যালথাস যেসব দাবি করেছিল তার প্রায় কিছুই হয়নি। বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে অভাবনীয় মাত্রায়। উন্নতি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে, শিশুদের অসুখ-বিসুখ কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। একটু নিরপেক্ষ মন নিয়ে চিন্তা করলে ম্যালথাসের দাবির অসারতা বুঝতে কোনো কষ্টই হবার কথা না।
মহান আল্লাহ হলেন আর-রাযযাক, তিনি রিযকদাতা। তাঁর সৃষ্টির জন্য যা প্রয়োজন তাঁর ব্যবস্থা তিনি করে দেন। কিন্তু আধুনিক পৃথিবী একদিকে ম্যালথাসের বক্তব্য গ্রহণ করে জন্মহার কমাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। অন্যদিকে যৌনবিপ্লবের মাধ্যমে নারীপুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক এবং পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। যৌনবিপ্লবের আদর্শ ও অবাধ প্রেম কীভাবে এই সভ্যতাগত বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রাখছে, এক নজর দেখে নেওয়া যাক। যে কারণে জন্মহার কমে যাচ্ছে:
১। ডিভোর্সের উচ্চ হার। অ্যামেরিকাতে প্রায় ৫০ শতাংশের মতো বিয়েতে তালাক হয়ে যায়। অন্যদিকে বিয়ে স্থায়ী হওয়া নিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্বভাবতই সন্তান জন্মদানের ইচ্ছা কমে আসে।
২। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিয়ে করার হার এখন অনেক কমে গেছে। জাপানে তো বিবাহে অনিচ্ছুকদের জন্য একটা নামই বরাদ্দ করা হয়েছে- ‘শো’। যাদের বয়স ৩০ এর কোঠায়, কিন্তু বিয়ে করার ধারেকাছেও নেই তাদের বলা হয় শো। জাপানে এমনিতেই বৃদ্ধ লোকের সংখ্যা বেশি। বিয়েতে এমন অনীহা জন্মহার কমে যাওয়া সমস্যার আগুনে একেবারে ঘি ঢালার মতো। কেবিনেট অফিসের জেন্ডার রিপোর্ট ২০২২ বলছে- ৩০+ বয়সীদের প্রতি ৪ জনে ১ জন বিয়ে করতে চায় না। ২০+ বয়সীদের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
কেন বিয়েতে আগ্রহী না এই প্রশ্নের উত্তরে জরিপে অংশ নেওয়া মেয়েদের উত্তরগুলো পরিচিত। তথাকথিত প্রগতিশীলতা আর স্বাধীনতার সেই মুখস্থ বুলি-বিয়ে করলে আমরা স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলবো, আমাদের সামনে সুন্দর ক্যারিয়ার আছে, গতানুগতিক গৃহিণীরা যে ঝামেলাগুলো নেয় যেমন, বাড়ির দেখভাল করা, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা, ঘরের বয়স্কদের দেখাশোনা করা... আমরা সেগুলো করতে চাই না। পুরুষরাও নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বললো। সেই সাথে বললো চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট আয় রোজগার না থাকার কথা।[১৮৩]
৩। যিনা। ক্যাসুয়াল সেক্সকে সারা বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছে। যৌনতাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বিয়ে থেকে। পরিবার গড়াকে অনেকেই উটকো ঝামেলা মনে করে。
৪। যারা বিয়ে করছে তারাও করছে বেশি বয়সে। ত্রিশের ঘরে বয়স না গেলে বিয়ে হচ্ছে না। দাম্পত্য জীবনের সময়সীমা কমে আসছে। বয়স পঁয়ত্রিশ হবার পর প্রথমবারের মতো মা হওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বাচ্চা কম হচ্ছে।
৫। পঙ্গপালের মতো নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। প্রেগন্যান্সি, ডেলিভারি, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ঠিক পরের সময়টাতে নারীদের কাজ থেকে ছুটি নিতে হয়। এটা তাদের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো না। কাজেই ক্যারিয়ারের স্বার্থে নারীরা সন্তান নিতে চাচ্ছে না। একটা বা খুব বেশি হলে কষ্টেমষ্টে দু'টা। বাচ্চা পালনের সময় বের করাই মুশকিল, তিন-চারটা বাচ্চা মানুষ করার কথা তো কল্পনাও করা যায় না।
৬। মহামারির মতো বাড়ছে বিভিন্ন যৌন-মানসিক বিকৃতি: সমকামিতা, নারী থেকে পুরুষ, পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হওয়া সহ আর কতো কী!
আর এর সবকিছুই যৌন বিপ্লবের ফল। অবাধ ভালোবাসা আর যৌনতার সংস্কৃতি।
জন্মহার কমে যাওয়া একটা সভ্যতাগত সমস্যা। মানুষ ছাড়া সভ্যতা কীভাবে টিকে থাকবে? তরুণরা না থাকলে সমাজকে কে এগিয়ে নেবে? কে কাজ করবে? কে সভ্যতা গড়বে? কারা নিত্য নতুন উদ্ভাবন করবে? বৃদ্ধদের দেখাশোনা কারা করবে? পাশ্চাত্যের তরুণেরা এই সবকিছুতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এসব দূরে থাক, পৃথিবীতে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আসার ব্যাপারেই তাদের কোনো আগ্রহ নেই। সন্তান মানুষ করা বিশাল স্যাক্রিফাইসের কাজ। টাকাপয়সা, সময়, মনোযোগ, ধৈর্য, মানসিক শক্তি... অনেক কিছুর প্রয়োজন হয় এতে। পাশ্চাত্যের ওরা তো সর্বোচ্চ মাত্রায় ভোগ নিয়ে ব্যস্ত, নিজের প্রতিটা ইচ্ছা মেটাতে অস্থির। সন্তানের জন্য এতো স্যাক্রিফাইস করার, এতো কষ্ট সহ্য করার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। তারা আজ এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর হয়ে গেছে যে সন্তানকেও বোঝা মনে করছে।
ভয়ংকর নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে পশ্চিমাদের। ধর্ম পারতো এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে। কিন্তু ধর্ম থেকেও ক্রমাগত দূরে সরে গেছে ওরা। মড়মড় করে ভাঙছে পরিবার, সামাজিক সংহতি। মরণ ডেকে আনা এক চোরাবালিতে ফেঁসে গেছে আজ পশ্চিমা বিশ্ব।[১৮৪] যন্ত্রণাদায়ক ধীর গতির এক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পুরো পশ্চিমা সভ্যতা।[১৮৫] আর আমরা? আসমানী দিকনির্দেশনা ভুলে আমরা অন্ধের মতো পশ্চিমকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি ওদের মতোই ধ্বংসের চোরাবালির দিকে।
চার.
যৌনতা, মানব মানবীর একে অপরের প্রতি আকর্ষণ যেমন পৃথিবীতে মানুষ টিকিয়ে রাখার শর্ত তেমনি এর ব্যাপক ধংসাত্মক শক্তিও রয়েছে। প্রত্যেক সমাজই এই প্রবল ক্ষমতাকে বিভিন্ন নিয়মকানুনের কাঠামোর ভেতরে রাখার চেষ্টা করেছে। এর উপর বাঁধ দিয়ে এই স্রোতকে ব্যবহার করতে চেয়েছে সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণে। কিন্তু যখনই যৌনতার লাগাম ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তখনই অবক্ষয় ও পতন হয়েছে সমাজ ও সভ্যতার।
সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলোজিস্ট জন ড্যানিয়েল আনউইন ৫,০০০ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র এবং ৬টি সভ্যতার উপর এক পর্যালোচনা করেন।[১৮৬] কিন্তু ফলাফল দেখে হকচকিয়ে যান আনউইন নিজেই। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Sex & Culture বইতে দীর্ঘ এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন সভ্যতা ও সেগুলোর পতনে আনউইন দেখতে পান একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন-কোনো সভ্যতার বিকাশ সেই সভ্যতার যৌনসংযমের সাথে সম্পর্কিত। যৌনতার ব্যাপারে কোনো সমাজ যতো বেশি সংযমী হবে ততো বৃদ্ধি পাবে বিকাশ ও অগ্রগতির হার।
বিস্মিত আনউইন আবিষ্কার করলেন-সুমেরিয়, ব্যাবিলনীয়, গ্রীক, রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সনসহ প্রতিটি সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে এমন সময়ে যখন যৌনসংযম ও নৈতিকতাকে এসব সমাজে কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। পুরুষত্বকে মহিমান্বিত করা হতো। সফলতা পাবার পর সভ্যতাগুলো হারানো শুরু করে নিজেদের নৈতিকতা। পুরুষত্ব, পরিবার, যৌনসঙ্গমের বদলে মহিমান্বিত করা হয় যৌনবিকৃতিকে। বহুগামিতা, সমকামিতা, উভকামিতার মতো ব্যাপারগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয় সমাজ।
যৌনাচার ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার, সমাজে এর কোনো নৈতিক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না-আজকের আধুনিক সভ্যতার আধুনিক মানুষগুলোর মতো এ মিথ্যে কথাটা বিশ্বাস করেছিল আগেকার সভ্যতাগুলোও। অবধারিতভাবেই একসময় সবার ভুল ধারণা ভাঙে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যায় অনেক। একবার শুরু হয়ে গেলে আর থামানো যায় না অবক্ষয়ের চেইন রিঅ্যাকশান। অবাধ, উচ্ছৃঙ্খল যৌনাচারের সাথে সাথে কমতে থাকে সামাজিক শক্তি। কমতে থাকে সভ্যতার রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা। ক্রমশ কমতে থাকে সমাজের মানুষের সংহতি, দৃঢ়তা ও আগ্রাসী মনোভাব। আর একবার এই অবস্থায় পৌঁছোবার পর সভ্যতার পতন ঘটে দুটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে-অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা অথবা আগ্রাসী শত্রুর আক্রমণ।
আনউইন উপসংহার টানেন, বিয়ে পূর্ববর্তী ও বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা এবং অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার যে সমাজে যতো বেশি সে সমাজের সামাজিক শক্তি ততো কম। যৌনতার উপর যে সমাজ যতো বেশি বাধানিষেধ আরোপ করে, তার সামাজিক শক্তি ততো বাড়ে。
'যেকোনো সমাজকে সামাজিক শক্তি অথবা যৌন স্বাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর এর পক্ষে প্রমাণ হলো কোনো সমাজ এক প্রজন্মের বেশি এ দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে পারে না।'
আনউইনের মতে ৫,০০০ বছরের ইতিহাস জুড়ে, প্রতিটি সভ্যতা ও সমাজের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য।
ঠিক একই রকম উপসংহার টানেন ঐতিহাসিক জন গ্লাব। তিন হাজারের বছরের প্রায় দশটিরও বেশি সাম্রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে প্রকাশ করেন তার সাড়া জাগানো গবেষণা- The Fate of Empire। এই গবেষণায় তিনি দেখান প্রতিটি সাম্রাজ্যের তখনই পতন ঘটেছে যখন তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ভোগবাদী বিলাসী জীবনযাপনে। যখন তারা বিকৃত যৌনতার পূজা শুরু করে। বুঁদ হয়ে যায় মদ আর শরীরের নেশায়![১৮৭]
বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা কখনোই দুজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে একটা সমাজের, একটা জাতির, একটা সভ্যতার উত্থান-পতনের গল্প। এজন্যই আমরা দেখি ইসলামী শরীয়াহতে যিনা-ব্যভিচার এবং অশ্লীলতার প্রচার-প্রসারের শাস্তি অনেক গুরুতর। এর জন্য আল্লাহ আখিরাতে যেমন ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা জানিয়েছেন, তেমনি দুনিয়াতেও শাস্তি নির্ধারণ করেছেন—যিনাকারী অবিবাহিত হলে প্রকাশ্যে ১০০ বেত্রাঘাত ও নির্বাসন দেওয়া, আর বিবাহিত হলে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা![১৮৮] কি কঠোর শাস্তি একবার চিন্তা করো! আল্লাহ আমাদেরকে মা-বাবার চাইতেও বহুগুণে বেশি ভালোবাসেন। সেই তিনিই এমন কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছেন। যেন মানুষ এর থেকে ১০০ হাত দূরে থাকে।
যিনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতাকে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত অঙ্গনের অপরাধ হিসেবে দেখে না, বরং একে সামাজিক অপরাধ হিসেবেও দেখে। এজন্যই শরীয়াহর বিধান অনুযায়ী এই শাস্তি প্রয়োগ হবে প্রকাশ্যে এবং কিছু মানুষকে দর্শক হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে।
বুঝতেই পারছো অশ্লীলতা, যিনা-ব্যভিচার ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতোটা ভয়াবহ! এটা পৃথিবীর ও মানুষের টিকে থাকার প্রশ্ন! আল্লাহ বলেছেন, 'যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।'[১৮৯]
মানুষ যেন অশ্লীলতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে নিজেকে এবং পৃথিবীকে নষ্ট করে না ফেলে, পৃথিবীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ না হয়, তাই তিনি মানুষকে বিভিন্নভাবে অশ্লীলতা ও যিনা-ব্যভিচার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সতর্ক করেছেন তাঁর রাসূল (ﷺ)-
যখনই কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (ব্যভিচার) প্রকাশ্যভাবে ব্যাপক হবে তখনই সেই জাতির মধ্যে প্লেগ এবং এমন রোগব্যাধি ব্যাপক হবে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।[১৯০]
আল্লাহ এবং তার রাসূলের সতর্ক সংকেতকে উপেক্ষা করেছে এই বিশ্বব্যবস্থা। আল্লাহর পরিবর্তে খোদা মেনেছে অন্য মানুষকে, সিস্টেমকে, আইনকে। নবীর নির্দেশনার বদলে অনুসরণ করেছে শয়তানের পদাঙ্কের। ফলাফল পেয়েছে হাতেনাতে। মানবতা হারিয়ে আজ মানুষ নেমে গেছে পশুত্বের পর্যায়ে। যৌনবিপ্লবের গডফাদার আর কলুষতার কারিগররা বলেছিল মানুষ মুক্ত হবে, কিন্তু আধুনিক মানুষ আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বন্দী। নিজের নফসের কাছে বন্দী, সরকারের কাছে বন্দী, কর্পোরেট আর গ্লোবাল এজেন্ডাধারীদের কাছে বন্দী। পচে গেছে সমাজ ও সভ্যতা। চোরাবালিতে আটকা পড়া মানুষের মতো আজ সবাই যেন হাল ছেড়ে দিয়ে মেনে নিয়েছে পতনের বাস্তবতা। নিশ্চিত মৃত্যুতে তলিয়ে যেতে যেতেও মেতে উঠছে সাময়িক সুখের উত্তেজনাতে।
আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ আজ আশরাফুল মাখলুকাত থেকে পরিণত হয়েছে পেট আর প্রবৃত্তির পূজায় লিপ্ত কুকুর আর শূকরবৃত্তির সংকরে।

টিকাঃ
[১৭৬] বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বাবার অভাব পূরণ করার জন্য, নিজের পরিচয়, স্বীকৃতি প্রটেকশনের জন্য শিশু কিশোররা গ্যাং কালচারে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
[১৭৭] The Fury of the Fatherless, firstthings.com, December 2020- tinyurl.com/yrunzhwn
Americans must finally get a grip on the sexual revolution's excesses, thehill.com - tinyurl.com/4rxty8wm
Married Parenthood Remains the Best Path to a Stable Family, Institute for Family Studies, March 8, 2017- tinyurl.com/3av4chna
পরকীয়া ও শিশুদের মানসিক চাপ, ntvbd.com, জানুয়ারি ২৫, ২০১৭- tinyurl.com/ms3p2x28
Consequences of the Sexual Revolution -tinyurl.com/mr3bsupb
Family status of delinquents in juvenile correctional facilities in Wisconsin, Division of Youth Services (1994) - tinyurl.com/yuwjkhb9
[১৭৮] Nearly One-Third of U.S. Coronavirus Deaths Are Linked to Nursing Homes, The New York Times, Updated June 1, 2021
[১৭৯] More young people are dying by suicide, and experts aren't sure why, USA TODAY, September 11,2020-tinyurl.com/akprw45x
Suicide rate highest among teens and young adults, ULCA health, March 15, 2022 -tinyurl.com/2p8kvftb
Suicide Replaces Homicide as Second-Leading Cause of Death Among U.S. Teenagers, www.prb.org, June 9, 2016 -tinyurl.com/y3sjrvpz
Why are American teens the most depressed they've ever been? globaltimes. cn,Apr 15, 2022- tinyurl.com/n6c8ry7m
Depression Is on the Rise in the U.S., Especially Among Young Teens, publichealth. columbia.edu,Oct. 30 2017- tinyurl.com/4hdr6yw8
[১৮০] Young Minds: Stress, anxiety plaguing Canadian youth, globalnews.ca, May 6, 2013- tinyurl.com/ycps7wur
Why more Canadian millennials than ever are at 'high risk' of mental health issues. globalnews.ca, May 2, 2017- tinyurl.com/ya6uc68p
One-third of Canadians at 'high risk' for mental health concerns: poll, globalnews. ca, April 29, 2015- tinyurl.com/yazjssqw
[১৮১] Elon Musk: Declining birth rate one of 'biggest' threats to civilization, The Hill, July 12, 2021 - tinyurl.com/27hh94dj
[১৮২] Fertility rate: 'Jaw-dropping' global crash in children being born, July 15, 2020 - tinyurl.com/yaframnv
[১৮৩] Why are young Japanese rejecting marriage?, DW, June 24, 2022 - tinyurl. com/bdf85nxf
[১৮৪] Americans must finally get a grip on the sexual revolution's excesses - tinyurl.com/4rxty8wm
The Sexual Revolution Ruined Everything It Touched | The Matt Walsh Show Ep. 32, May 17, 2018- tinyurl.com/mufu943c
Consequences of the Sexual Revolution, upliftingeducation.com- tinyurl.com/mr3bsupb
[১৮৫] The End Of The American Empire Is Here, The Jimmy Dore Show Youtube Video, May 26, 2022- tinyurl.com/5n7hdser
[১৮৬] বিস্তারিত জানার জন্য দেখো, চিন্তাপরাধ, আসিফ আদনান, পৃষ্ঠা নম্বর, ১৫০। ইলমহাউস পাবলিকেশন, ২০১৯।
[১৮৭] The Fate Of Empires And Search For Survival, Sir John Glubb- tinyurl. com/kfzvjjcp
[১৮৮] Who is the one who should carry out the hadd punishment for zina? IslamQA - tinyurl.com/4m7akr6e
Punishment for Rape in Islam, IslamQA- tinyurl.com/2p8d3tjy
[১৮৯] সূরা নূর, ২৪: ১৯ আয়াত
[১৯০] ইবনু মাজাহ: ৪০১৯, তারগীব ৫১৭২। ইমাম সাখাবী বলেছেন, হাদিসটির সনদে দুর্বলতা আছে কিন্তু তার স্বপক্ষে শাহেদ আছে (যা তাকে শক্তিশালি করে।) ইবনু হাজারও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। আলবানী হাদিসটিকে হাসান সনদে বর্ণিত বলেছেন। (আল-আজউয়িবাতুল মারদ্বিয়্যাহ হা: ৩৩১, ফাতহুল বারী হা: ৫৭৩৪ এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য, সহীহাহ: ১০৬)

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 কলুষতার কারিগর

📄 কলুষতার কারিগর


প্রেমের এতো ভয়াবহ দিক থাকার পরেও, ফ্রি সেক্স কালচার, অশ্লীলতা এতো ধ্বংসাত্মক হবার পরেও, কোটি কোটি মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যাবার পরেও কেন এগুলোকে প্রমোট করা হয়? বিশ্বব্যাপী এগুলোকে মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মহান হিসেবে কেন উপস্থাপন করা হয়? এই মৌলিক প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু বইয়ের কলেবর ছোট রাখার উদ্দেশ্যে আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে বাধ্য হলাম।
সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। মানুষ অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে, প্রেম-ভালোবাসার নামে অবাধ যৌনতায় মেতে উঠলে কার লাভ? এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দা'ঈ এবং অ্যাক্টিভিস্ট ড্যানিয়েল হাকিকাতযু 'আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেন যৌনতা ফেরি করে'-শিরোনামের প্রবন্ধে বলেন:
'অশ্লীলতা আর অবাধ যৌনতা ছড়িয়ে পড়লে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে। এর মধ্যে এক নাম্বার হলো ভোগবাদ। কেউ যখন নিজের সব শারীরিক কামনাবাসনা, সব ফ্যান্টাসি চরিতার্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে কোনো ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কাজ করে না। এ ধরনের মানুষ খুব ভালো ভোক্তা আর ক্রেতা হয়। পকেটে যতোক্ষণ টাকা থাকে ততোক্ষণ যা ইচ্ছে তা-ই সে কেনে। যা ইচ্ছে তা-ই সে করে। কাজেই অশ্লীলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রভাবে ভোগবাদ বাড়ে। ভোগবাদ বাড়লে লাভ বিভিন্ন করপোরেশান আর সরকারগুলোর, যারা এই নিরন্তর ভোগ থেকে মুনাফা অর্জন করে। কোনো শহরের অধিবাসীদের মধ্যে মদের আসক্তি বাড়লে যেমন মদবিক্রেতার লাভ, তেমনি মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কামনাবাসনা পূরণে অভ্যস্ত করে তুলতে পারায় করপোরেশানগুলোর লাভ।
এভাবে আত্মকেন্দ্রিক সমাজ গড়ে ওঠে। বিচ্ছিন্ন, একাকী মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। সংঘবদ্ধ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সমাজে অশ্লীলতা এবং অবাধ যৌনতার প্রসার ঘটানোর আরেকটা উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া। মানুষের যখন তাকওয়া থাকে না, তখন সত্যমিথ্যা আর ভালোমন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ নিয়ে রাজাদের তখন আর মাথা ঘামাতে হয় না। মানুষ যদি মন্দকে চিনতেই না পারে তাহলে মন্দকে প্রতিরোধ করবে কীভাবে? তাছাড়া মানুষ যখন ইচ্ছেমতো কামনাবাসনা চরিতার্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন অন্যায়কে চিনতে পারলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে কথা বলতে চায় না। অন্যায়ের প্রতিরোধ করার মতো ইচ্ছাশক্তি আর সাহস তার মধ্যে থাকে না। তার মধ্যে এক ধরনের অভ্যস্ত আলস্য কাজ করে। আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, তাঁর বেঁধে দেওয়া সীমানা লঙ্ঘন করে ক্রমাগত নফসকে সন্তুষ্ট করার কারণে, তার মধ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো আত্মিক শক্তি আর থাকে না... [১৯১]
সহজ ভাষায়, যৌনতা, অশ্লীলতা আর সহজলভ্য প্রেম হল মানুষকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। জনগণকে প্রেমের মাদকে, শরীরী নেশার মায়াজালে আর অশ্লীল বিনোদনে ডুবিয়ে রাখতে পারলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।[১৯২] মনমতো আইনকানুন, জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া যায়। শোষণ করা যায়। বিশ্বব্যবস্থার রাজারা তাই প্রজাদের জন্য অসীম প্রেম, বিনোদন, শরীরী নেশার স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছে—তোমার মন যা চায় তুমি তাই করো—বিনিময়ে তারা প্রজাদের পায়ে পরিয়ে দেয় পরাধীনতার এক অদৃশ্য শেকল। বানিয়ে ফেলে হাতের পুতুল!
এসো, আমাদেরকে বন্দীত্বের শেকল পরানো কলুষতার এই সব কারিগর আর তাদের নানা কারিগরি চিনে নেওয়া যাক।
শয়তান: কলুষতার প্রথম কারিগর ইবলিস। মানুষের আদি এবং চির শত্রু। দুনিয়াতে পাঠানোর আগে আল্লাহ আদম (আ.), হাওয়া (আ.) এবং শয়তানকে বলেছিলেন— তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু।[১৯৩]
সেই থেকে ইবলিস আমাদের সাথে শত্রুতা করে যাচ্ছে। ইবলিস ঔদ্ধত্যভরে মহান আল্লাহকে বলেছিল, মানবজাতিকে সে পথভ্রষ্ট করবে। সেই প্রতিশ্রুতি সে আজও নিষ্ঠা ভরে পালন করে যাচ্ছে। আর মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য শয়তানের মোক্ষম হাতিয়ার হলো যিনা। যৌনতার প্রতি মানুষের ফিতরাতি আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে যুগে যুগে শয়তান মানুষকে অনবরত কুমন্ত্রণা দিয়ে গেছে। পাশাপাশি মানুষের ভেতর তার দোসরদের সে পরামর্শ দিয়ে গেছে অশ্লীলতার প্রচার ও প্রসারের জন্য। আল্লাহ আমাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন – হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছে-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়।[১৯৪] 'আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো পণ্ডিত না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো এ নির্দেশই তোমাদেরকে দেবে যে, তোমরা অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে থাকো।' [১৯৫]
'শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় আর তোমাদেরকে অশ্লীল কাজ করতে তাগাদা দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং প্রাচুর্যের নিশ্চয়তা দেন। আল্লাহ তো সবকিছু ঘিরে আছেন, তিনি সব জানেন।‘[১৯৬] কিন্তু এতো সতর্কবাণীর পরও মানবজাতি বারবার শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। স্থান-কাল-পাত্রের ব্যবধানে পুনরাবৃত্তি হয়েছে একই ভুলের।
পশ্চিমা বিশ্ব: অবাধ যৌনতা তথা যৌনবিপ্লবের আদর্শ প্রচারকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে। যেসব যৌন বিকৃতি ও অবক্ষয় পশ্চিমে আজ স্বাভাবিক হয়ে গেছে, সেগুলো তারা ছড়িয়ে দিতে চায় বাকি পৃথিবীতেও। [১৯৭] এ উদ্দেশ্যে নিষ্ঠার সাথে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকাসহ সারা বিশ্বে তাদের কাজ চলছে। এর জন্য তারা ব্যবহার করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও, থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিভিন্ন সেলিব্রেটি এবং নারীবাদী আন্দোলনকে। [১৯৮] অবাধ যৌনতার আদর্শকে উপস্থাপন করছে মানবাধিকার এবং উন্নয়নের মোড়কে। [১৯৯] সর্বোপরি, সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে যৌনশিক্ষার নামে শিশু-কিশোরদের যৌনবিপ্লবের আদর্শ শেখানো হচ্ছে [২০০] একইসাথে তাদের মাথা থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে যৌনতার ব্যাপারে ধর্মীয় নৈতিকতা ও বিধিবিধান। বিভিন্ন দেশকে সমকামিতাসহ অন্যান্য যৌন বিকৃতির আইনী বৈধতা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। না মানলে ভয় দেখানো হচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার। [২০১]
এনজিও, লিবারেল মিশনারী: উপনিবেশবাদের সময় কোনো জায়গায় ঘাঁটি গাড়তে গেলে পশ্চিমারা সাথে করে খ্রিষ্টান মিশনারীদের নিয়ে যেতো। খাদ্য, চিকিৎসা ইত্যাদি সাহায্য দেওয়ার নাম করে মিশনারীরা খ্রিষ্টধর্মের প্রচার করতো। তারা মনে করতো, স্থানীয় লোকেরা মিশনারীদের দাওয়াহ গ্রহণ করতে শুরু করলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
এই পশ্চিমা আগ্রাসন আর মিশনারীদের এই পার্টনারশিপ আজও আছে। শুধু খ্রিস্টান মিশনারীর বদলে এসেছে লিবারেল মিশনারী। আজকের পশ্চিমা বিশ্ব খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করে না, প্রচার করে লিবারেল-সেক্যুলারিসম। যৌনবিপ্লবের আদর্শ রপ্তানি করে। বাপ-দাদাদের মতো আজকের পশ্চিমারাও লক্ষ্য করেছে, কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে লিবারেল-সেক্যুলার ধারার চিন্তা প্রচলিত হয়ে গেলে সেই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আজকের উপনিবেশবাদ তাই এনজিও, অ্যাকটিভিস্ট, কালচারাল আইকন, ইয়ুথ আইকন ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল লিবারেল মিশনারী বাহিনী গড়ে তুলেছে। এদের কাজ হলো বিভিন্ন সাহায্য দেওয়ার নাম করে যৌনবিপ্লবের মতো নানা পশ্চিমা দর্শনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা। দাসত্বকে স্বাধীনতা হিসেবে দেখানো। লিবারেল- সেক্যুলারিসমের দাওয়াহ করা।
সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা: সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা একদিকে নারী পুরুষকে কাছাকাছি এনেছে, সহজাত লজ্জা ভেঙে দিয়েছে। পাশাপাশি আসমানী শিক্ষা ও নৈতিকতা থেকে শিশুদের দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দিয়েছে। শিখিয়েছে- বস্তুগত লাভক্ষতির মাপকাঠিতে সব কিছু মাপতে, শিখিয়েছে You only live once – জীবন তো একটাই। যেকোনো মূল্যে ভোগ করাই হলো জীবনের সফলতা। সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ব্রেইনওয়াশ করেছে পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া সেক্যুলার ব্যবস্থা ও দর্শনের অন্ধ অনুসরণের জন্য।
পপ কালচার: মানুষকে ব্রেইনওয়াশ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো মিডিয়া। অসংখ্য গবেষক, গবেষণা, বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন-মিডিয়া মানুষকে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে খুবই প্রভাবিত করে। মিডিয়া কিশোর-তরুণদের সামনে নতুন নতুন ট্রেন্ড নিয়ে আসে, অনুসরণীয় ‘আইডল’ তৈরি করে। তুলে ধরে ভোগবাদী লাইফস্টাইলের রঙিন ছবি। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে এর প্রভাবটা আরো ব্যাপক। প্রেমের নিয়মকানুন, প্রেমের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশই আসে এই মিডিয়া থেকে। মানুষ পর্দায় যা দেখে বাস্তবেও তাই করতে চায়।[২০২]
করপোরেট ব্যবসা: কথিত প্রেম ভালোবাসা, ফ্রি সেক্স কালচার, সমকামিতা, অশ্লীলতার সাথে জড়িত রয়েছে বাঘা বাঘা করপোরেশন আর ইন্ডাস্ট্রির ভাগ্য। বার্ষিক প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের সিনেমা, ওয়েবসিরিজ, টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি, ৫৩ বিলিয়ন ডলারের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, ১৮৬ বিলিয়ন ডলারের সেক্স ইন্ডাস্ট্রি, ৯৭ বিলিয়ন ডলারের পর্ন ইন্ডাস্ট্রি, ৫০৭ বিলিয়ন ডলারের কসমেটিকস ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রি, ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ড্রাগ ইন্ডাস্ট্রি, প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ডিপ্রেশনের চিকিৎসা সেক্টর, ৪৭ বিলিয়ন ডলারের যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা মার্কেট, টেস্টিং কিটের ৯৫ বিলিয়ন মার্কেট... অধিকাংশই কোনো না কোনো মাত্রায় টিকে আছে এই প্রেম ভালোবাসা আর ফ্রি সেক্স কালচারের উপর ভর করে। [২০৩]
প্রেম, অশ্লীলতা, যিনা-ব্যভিচারকে লাল কার্ড দেখালে এগুলোর কী হবে? বিশ্ব পরিচালনার নিয়মনীতি, বিশ্ব রাজনীতির হিসেব-নিকেশ, সবক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী খেলোয়াড়। তাই বিদ্যমান বিশ্বকাঠামো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ব্যবস্থা, সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেলেও কথিত প্রেম ভালোবাসা, ফ্রি সেক্স কালচার, সমকামিতা, অশ্লীলতাকে প্রগতিশীলতা, উন্নতি, আধুনিকতা, স্মার্টনেস ইত্যাদির প্যাকেটে মুড়িয়ে প্রমোট করে যাচ্ছে এবং যাবে। এটা কখনোই বন্ধ হবে না। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসকে এই বিশ্বব্যবস্থার কেউই খুন করবে না।
এটা ছিল বৈশ্বিক ছবি। এবার এসো বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক। দেখা যাক, প্রেম ও যৌনতার মহামারির ফলে বাংলাদেশের সমাজ আজ যে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছে।
১। বলিউড, আকাশ সংস্কৃতি: ৯০ দশকের সিনেমা, নাটক, গানগুলো ছিল ভীষণ রোমান্টিক। প্রেম সম্পর্কে সমাজের রক্ষণশীল ধারণাগুলো দূর করে দেয় শাহরুখ খান, সালমান খান, আমির খান আর এদেশের সালমান শাহ, রিয়াজ, মাহফুজ আহমেদ, জাহিদ হাসানেরা। মানুষ দেখলো, পর্দার প্রেমিক পুরুষরা অনেক স্মার্ট, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, মারপিট করে, কঠিন ভাব নিয়ে চলে, আবার প্রেমও করে, নাচগান করে। অন্যদিকে গুন্ডা, ভিলেন, বাপ-বড় ভাইদের দেখানো হলো প্রেমের বিরোধিতাকারী হিসেবে। নায়করা পবিত্র প্রেমের পক্ষে, ভিলেনরা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ আর রক্ষণশীলতার পক্ষে। স্বভাবতই দর্শকদের মস্তিস্ক দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নিল-যারা হিরো, তারাই প্রেম করে। প্রেম মহান। প্রেমে বাধা দেওয়াটা ভিলেনের কাজ, শয়তানের কাজ। অভিনেতারা হয়তো নিছক টাকা আর খ্যাতির জন্যেই এমন করেছে, হয়তো পরিচালকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল টিকেট বেচে টাকা কামানো। কিন্তু ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়, পুরো উপমহাদেশের সমাজকে তারা অপরিবর্তনীয়ভাবেই বদলে দিলো।
২। নাটক, সিরিজ, গান, কবিতা, সাহিত্য: সুদীর্ঘকাল ধরেই এগুলো সমাজের মনস্তত্ত্বের ওপর ভূমিকা রেখে এসেছে। তবে হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরী লেখার স্পর্শে প্রেম আমাদের জাতীয় দুঃখবিলাসে পরিণত হলো। তরুণ, তরুণীরা প্রেম ছাড়া জীবনকে অর্থহীন মনে করা শুরু করলো। এছাড়া বিভিন্ন জনপ্রিয় লেখকদের কিশোর উপন্যাস কিশোর-তরুণদের সামনে প্রেম, ফ্রি-মিক্সিং আর সেক্যুলার চিন্তাধারাকে সুকৌশলে উপস্থাপন করলো আকর্ষণীয়ভাবে। তারপর বড় একটা পরিবর্তন আনে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি আর তার ভাইবেরাদররা। নতুন সহস্রাব্দে টেলিফিল্ম, আইটেম সং[২০৪], আর ওয়েবসিরিযের ফেরিওয়ালারা নব্বই দশকের রোমান্টিক মিষ্টি প্রেমের মধ্যে উদারভাবে যৌনতার মশলা মিশিয়ে সেগুলো সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে। লিভ টুগেদার, পরকীয়া, লিটনের ফ্ল্যাট, গার্লফ্রেন্ডকে লঞ্চের কেবিনে নিয়ে যাওয়া, ছেলে মেয়ে একসাথে ট্যুর দেওয়া, মারামারি, সহিংসতা, জাস্ট ফ্রেন্ড বা যার তার সাথে শুয়ে পড়া, মাদক-সবকিছু তারা স্বাভাবিক এবং আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সাথে আগের প্রজন্মের বন্ধনকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। তরুণদের বোঝায়-বাবা, মা, পরিবারের চাইতেও বন্ধু বান্ধবেরাই বেশি আপন।
২। লিবারেল মিশনারী: বাংলাদেশে অবাধ যৌনতা ও সেক্যুলার আদর্শ প্রচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এনজিওসহ বিভিন্ন লিবারেল মিশনারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি। এর উদাহরণ অনেক, সংক্ষেপে শুধু একটার দিকে তাকানো যাক।
বেশ কয়েক বছর যাবত রবি টেন মিনিট স্কুল বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন উপকারি অনলাইন কোর্স পরিচালনা করে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে চলেছে। এ ধরনের কাজ অবশ্যই সাধুবাদ পাবার যোগ্য। তবে প্রশংসনীয় এসব কাজের পাশাপাশি এই ধরনের উদ্যোগের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের এমন কিছু কথা ও কাজ আছে, যা বেশ বড়সড় প্রশ্নের জন্ম দেয়।
রবি টেন মিনিট স্কুলের চিফ ইন্সট্রাক্টর জনপ্রিয় শিক্ষক সাকিব বিন রশীদকে যেমন এক ভিডিওতে দেখা যায় বাচ্চাদের উপদেশ দিচ্ছে- তুমি যদি ফ্রেন্ডদের সাথে রাতে স্লিপ ওভার করতে চাও তোমার এটা করতে পারা উচিত! অন্য এক ভিডিওতে সে বলছে- ভ্যালেন্টাইনে তুমি তোমার জাস্ট ফ্রেন্ড, বয় ফ্রেন্ড, অনলি ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে যাও, মজা করো।
অভিভাবকরা কেন ছেলেদের সাথে ঘুরলে মেয়ে সন্তানদের বকাবকি করে, কেন দূরে একা একা ছাড়তে দিতে চায় না, ট্যুরে যেতে দিতে রাজি না এটা নিয়ে অভিভাবকদের চার্জ করতে দেখা যাচ্ছে আরেক ভিডিওতে। অন্য একটা ভিডিওতে তাকে দেখা যাচ্ছে সেক্স এডুকেশনের নামে কিশোর তরুণদের সামনে পর্নোগ্রাফি নিয়ে মজা করছে। আরেক সেলিব্রেটি মিথিলার সাথে মিলে এক ভিডিওতে সে শেখাচ্ছে- নারী পুরুষের মধ্যে সম্মতি থাকলেই যৌন মিলন করা যায়। এটাই একমাত্র শর্ত। পারস্পরিক সম্মতি থাকলে যিনা করো। সমস্যা নেই।
সে যে সমাজের মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার পরিবর্তন করতে চায় এমন কথা সাকিব বিন রশিদ নিজের মুখেই স্বীকার করেছে। টেন মিনিট স্কুলের আরেক শিক্ষক, তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় মুনজেরিন শহীদের সঙ্গে এক অনলাইন আলোচনায় সে যা বলে তার সারমর্ম হলো-
'আমি কমেডির মাধ্যমে কিছু জিনিস সমাজে প্রচলন করতে চাই, আমার গোপন এজেন্ডা আছে, এমনি স্বাভাবিকভাবে বললে পাবলিক আমাকে মাইর দিবে।' সাকিব বিন রশীরা সমাজে কীসের প্রচলন চায়, কোন মূল্যবোধ আমদানি করতে চায়, তা স্পষ্ট।
টেন মিনিট স্কুলের সহপ্রতিষ্ঠাতা, সাবেক শিক্ষক শামির মোন্তাজিদ সমকামিতাকে সমর্থন করে পোস্ট দেয়। সেই পোস্টে আবার লাইক দিয়ে সমর্থন জানায় সাকিব বিন রশীদ। শামির বিভিন্ন সময় তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে আকারে ইঙ্গিতে ইসলাম এবং ইসলামের শিক্ষাকে তাচ্ছিল্য করে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভাঙ্গার নাম করে নিয়মিত নির্লজ্জতা ছড়িয়ে বেড়ায়। রবি টেন মিনিট স্কুল, সাকিব বিন রশীদ, আয়মান সাদিক... সবারই লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে, যারা সবাই বয়সে কিশোর বা তরুণ। যারা তাদেরকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে।
এতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরেও সাকিব বিন রশীদকে টেন মিনিট স্কুল থেকে বহিষ্কার না করা, টেন মিনিট স্কুল সমকামিতার সমর্থন করে-এমন শক্ত অভিযোগের সুস্পষ্ট জবাবে 'আমরা সমকামিতার সমর্থন করি না' এমনটা না বলে কথা ঘোরানো ইত্যাদি কারণে আয়মান সাদিক এবং টেন মিনিট স্কুল নব্য মিশনারীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে কিনা এমন শক্ত অভিযোগ উঠেছে বেশ কিছুদিন যাবত! [২০৫] এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এ ধরনের সেলিব্রেটিরা যৌনবিপ্লবের আদর্শগুলোকে সূক্ষ্ম কৌশলে প্রচার করছে।
আরো বেশ কিছু অনলাইন সেলিব্রেটি, ইউটিউবার, ট্রল পেইজ প্রকাশ্যে অশ্লীলতার প্রচার প্রসার এবং স্বাভাবিকীকরণের কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একনিষ্ঠ বাহিনী এনজিওগুলো তো আছেই।
৩। সংবাদ মাধ্যম: প্রগতিশীলতার নামে অবাধ যৌনতা ও প্রেমের সবক দেওয়ার ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর রকমের কার্যকরী আরেকটি মাধ্যম হলো নিউস মিডিয়া। পত্রিকাগুলোর বিনোদন পাতা, দেশীবিদেশী সেলিব্রেটিদের ছবি, ব্যক্তিগত জীবনের নানা গসিপ, যিনা আর প্রেমের গল্পকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ উপস্থাপন করে গেছে আকর্ষণীয়ভাবে।
ভারতীয় এক বিশেষ পর্ন অভিনেত্রীকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভাইরাল করার দায়িত্ব খুব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে। প্রথম আলোর ফিচার পাতা নকশা আর অধুনা নারীদের উগ্র, অশালীন পোশাক-আশাক পরার তালিম দিয়েছে, বিয়ে বহির্ভূত যৌনতাকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরেছে, পরকীয়ার সবক দিয়েছে, ইসলামী শিক্ষা ও বিধি-বিধানকে সেকেলে হিসেবে উপস্থাপন করেছে বিভিন্ন প্রবন্ধ, ফিচার আর লেখায়।[২০৬] অন্যান্য পত্রিকাগুলোও হেঁটেছে একই পথে। প্রথম আলোর কিশোর ম্যাগাজিন কিশোর আলো (কিআ) বাচ্চাদের শিখিয়েছে-প্রেমের প্রপোজ করে তুমি খুব সাহসী কাজ করেছো। আরো শিখিয়েছে জিন্স-টপস পরে ছেলেদের সাথে বৃষ্টিতে ভেজাই হলো ভালো থাকার নমুনা। বন্ধুসভা, কিশোর আলোর বিভিন্ন প্রোগ্রামে ছেলেমেয়েদের শেখানো ফ্রি-মিক্সিং, জুটি বেঁধে নাচ গান, মডেলিং করা![২০৭] এ ধরনের কার্যক্রম শুধু প্রথম আলো না, অন্যান্য অধিকাংশ মিডিয়াই করছে। পিছিয়ে নেই বিদেশী সংবাদমাধ্যমগুলোও।
লিভ টুগেদার: বিয়ে না করেও একসাথে থাকছেন বাংলাদেশের যে নারী-পুরুষেরা। ব্রিটেনে এশীয় মুসলিম পরিবারে সমকামী এক নারীর অভিজ্ঞতা: 'মুসলিম হলেও সমকামী হওয়া যায়'।
সমকাম বিদ্বেষ কী কোনো রোগ? চিকিৎসা করিয়ে কি একে সারিয়ে তোলা যায়? 'ভুল দেহে' জন্ম নিয়ে লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের বিড়ম্বনায় নিশাত... কেমন আছেন বাংলাদেশের সমকামীরা
কোভিড: ব্রিটেনের লকডাউনে তরুণরা কীভাবে তাদের যৌন অভ্যাস বদলাচ্ছে এ ধরনের বিভিন্ন সংবাদ বিবিসি বাংলা ও জার্মানি ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়েচেভেল তাদের ফেইসবুক পেইজ থেকে টাকা খরচ করে স্পনসরড পোস্ট দিয়ে প্রচার করছে।[২০৮] উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। যিনা, লিভ টুগেদারের মতো কাজগুলো সমাজে স্বাভাবিক করে তোলা। সমকামিতার মতো বিকৃতির প্রতি সহানুভূতি তৈরি করা। মানুষ পুরুষের শরীরে জন্মগ্রহণ করলেও সে যে নারী হতে পারে বা নারীর শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করেও পুরুষ হতে পারে-এমন বিকৃত, মিথ্যা, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাকে প্রমোট করা। সর্বোপরি যৌনবিপ্লবের তত্ত্ব আর আকীদাহ উন্নতি আর প্রগতি হিসেবে তরুণদের গেলানো।
৪। বিজ্ঞাপন: বিজ্ঞাপন বিশেষ করে, কমসেকম গত পনেরো বছর ধরে মোবাইল সিম কোম্পানিগুলোর [২০৯] বিজ্ঞাপনের মূল কথাই হলো- ছেলেমেয়ের কোনো ভেদাভেদ নেই; জড়াজড়ি, হাতাহাতি করো কোনো সমস্যা নেই। বাঁধ ভাঙো, সীমানা ছাড়াও, বন্ধু-আড্ডা-গানে হারিয়ে যাও। এদের বিজ্ঞাপনের ধরাবাঁধা ফরম্যাটই হলো ক্যাচি গান আর ট্রেন্ডি নাচের সাথে তরুণ-তরুণীদের 'মজা করার' নানা দৃশ্য জুড়ে দেওয়া। মোবাইল সিম কোম্পানীগুলো ছাড়াও অন্যান্য আরো বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভালোবাসার বাতিক উস্কে নিজেদের পকেট ভারী করার এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
প্রতিবছর ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষ্যে জাতীয়ভাবে যিনার মহা উৎসব হয়। ২০১০-১২ সালের দিকেও অবস্থা এতোটা ভয়াবহ ছিল শাস্ত্র। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-কে জনপ্রিয় করা হয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে। এদিন কেবল ফুলই বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকার। কনডম, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ব্যবসা সহ অন্যান্যগুলো তো বাদই থাকলো। ভ্যালেন্টাইন্স ডে, একটা নিখুঁত করপোরেট হলিডে। পুঁজি ও প্রফিটের স্বার্থে বোকা জনগণের যৌনতাকে উস্কে দেওয়ার উজ্জ্বল উদাহরণ।
বহুজাতিক করপোরেশনের প্রফিটের হিসেব আর আন্তর্জাতিক এজেন্ডার মিশেলে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-কে জাতীয় ক্রেজে পরিণত করার ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে গেল, তার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ সম্ভবত বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার। ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষ্যে ইউনিলিভার ২০১১-১২ সাল থেকে নাটক বানানোর ব্যাপক জনপ্রিয় এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেরা 'কাছে আসার গল্প' নিয়ে প্রথম সারির অভিনেতা অভিনেত্রীদের দিয়ে নির্মাণ করে নাটক।[২১০] যেমনটা আমরা ইতিমধ্যে বলেছি যিনা-ব্যভিচারের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে এই নাটকগুলোর ভূমিকা ব্যাপক!
প্রথমদিকে কাছে আসার গল্পের নামে যিনা প্রমোট করলেও ২০২২ সালে এসে এই স্লোগান বদলে যায়। এবার বলা হয় দ্বিধাহীনভাবে কাছে আসার গল্প। বোরখা পরা এক মেয়ের সাথে ক্রুশ পরা এক ছেলের কাছে আসার গল্প বলে ওরা। মজার ব্যাপার হলো ইউনিলিভার এই ক্যাম্পেইনটা শুধু বাংলাদেশে না, আরো অনেক দেশে করে। সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় আপাতত বাংলাদেশে শুধু যিনা আর 'ধর্ম ভুলে ভালোবাসা'র গল্প শোনালেও, একই ধরনের স্লোগান দিয়ে অন্যান্য দেশে ইউনিলিভার সমকামিতা আর ট্যান্সজেন্ডারিসমের পক্ষেও প্রচারণা চালায়। দেশে দেশে এই ক্যাম্পেইনগুলো চলে #FREETOLOVE - হ্যাশট্যাগ দিয়ে। আর এই ক্যাম্পেইনগুলোর উদ্দেশ্য হলো ষাটের দশকের যৌনবিপ্লবের আদর্শগুলো বাস্তবায়ন করা। যার স্বীকৃতি তারা তাদের ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন পাবলিকেশনে দিয়ে রেখেছে।[২১১]
৫। যৌন শিক্ষা: যৌন শিক্ষা সব মানুষেরই দরকার। তবে যৌন শিক্ষার নামে অবাধ যৌনতার দীক্ষা না। যৌন শিক্ষার নামে আজ যা চলছে তা মূলত যৌনবিপ্লবের আদর্শ শেখানোর মাধ্যম। যেখানে 'সেইফ সেক্স' আর 'কনসেন্ট'ই শেষ কথা, সেই যৌন শিক্ষার মূল বক্তব্য হলো-যা খুশি, যেমন খুশি করো, শুধু যৌনতা 'নিরাপদ' এবং পরস্পরের সম্মতিতে হতে হবে। বাংলাদেশে পশ্চিমাদের অর্থায়নে এই শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে স্কুলে। ছেলেমেয়েদেরকে পাশাপাশি বসিয়ে কনডম আর মাসিক-এর ব্যাপারে জানানো হচ্ছে। মেয়েরা জানাচ্ছে, আগে তারা ছেলেদের সাথে মিশতে লজ্জা পেতো, যৌন শিক্ষা ক্লাসের পর এখন আর মিশতে লজ্জা পায় না। প্রেমের সবক দেবার পাশাপাশি শেখানো হচ্ছে দুজনের সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ দোষের কিছু না।[২১২]
৬। ইসলামবিদ্বেষ: বাংলাদেশের সমাজে অবাধ যৌনতা প্রচার ও প্রসারের আরেকটি বাহন হলো ইসলামবিদ্বেষ। পশ্চিমারা এবং তাদের দেশীয় গোলামরা জানে অশ্লীলতা এবং অবক্ষয়ের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ইসলাম। তাই তারা ইসলামের শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। সরাসরি করলে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়বে, তাই কাজটা তারা করে একটু ঘুরিয়ে।
প্রথমে ইসলামের বিভিন্ন দিককে 'উগ্রবাদ' বা 'চরমপন্থা' নাম দেয়। তারপর উগ্রবাদ থেকে মুক্তির পথ হিসেবে, ইসলামী চরমপন্থার দাওয়াই হিসেবে পেশ করে অবাধ যৌনতার আদর্শকে। কিছু উদাহরণ দেই, দেখো হিসেবটা মেলাতে পারো কি না।
২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ঘোষণা দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রবাদের প্রভাব প্রকট। কারণ এই গবেষকরা দেখেছেন ছাত্রছাত্রীরা সম্ভাষণ, বিদায়সহ দৈনন্দিন নানা বিষয়ে কিছু আরবি শব্দের ব্যবহার করছেন। যেমন, আলহামদুলিল্লাহ, ইনশাআল্লাহ, ইত্যাদি। তাদের মধ্যে হিজাব, নিকাব কিংবা গোড়ালির ওপর প্যান্ট পরার প্রবণতা বাড়ছে। সেই সাথে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করার ব্যাপারে আগ্রহের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ছাত্রছাত্রীরা ইসলামের কিছু বিষয় মানার চেষ্টা করছে। আর তা থেকেই প্রমাণ হয়ে গেছে যে উগ্রবাদের প্রভাব বাড়ছে।[২১৩]
২০১৯ সালে সম্প্রীতি বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন দেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দেয়। সেই বিজ্ঞাপনে বলা হয়- দাড়ি টুপি রাখা, টাখনুর উপর প্যান্ট পরা, ইসলামের অনুশাসন মেনে চলা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয় এমন অনুষ্ঠানে না যাওয়া নাকি জঙ্গিবাদের লক্ষণ![২১৪]
পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর বলে বসে, শুদ্ধভাবে সালাম দেওয়া – আসসালামু আলাইকুম বলা নাকি জামাত শিবির, জঙ্গিবাদের লক্ষণ![২১৫]
এমনকি এমন বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে যে, পাশের বাসার ভাবির দিকে না তাকানো, মেয়েদের সাথে ঢলাঢলি না করে জন্মদিন পালন না করা, প্রেম না করা, লুতুপুতু না করা, গুনাহর জীবন ছেড়ে ইসলামের পথে ফিরে আসা এগুলোও জঙ্গিবাদের লক্ষণ! হিসেবটা কি মেলাতে পারলে?
ইসলাম পালন = উগ্রবাদ
আর উগ্রবাদ থেকে বাঁচার উপায় হলো প্রগতিশীল, মুক্তমনা হয়ে অবাধ যৌনতার দর্শনে ঈমান আনা।
৭। ক্যারিয়ার ক্লাব, সোসাইটি: ডিবেট সার্কিট, করপোরেট ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি শেখানো স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির বিভিন্ন সোসাইটি, ক্যারিয়ার ক্লাবের মতো উদ্যোগগুলোর বিভিন্ন ইতিবাচক দিক আছে। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার মতো হারাম উপাদানগুলো থেকে মুক্ত হলে শর্তসাপেক্ষে এগুলো জায়েজও হতে পারে। কিন্তু এখন এগুলো পুরোপুরিভাবে তরুণ প্রজন্মকে সেক্যুলার-লিবারেল আদর্শে দীক্ষিত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ব্রেইনওয়াশ করা হচ্ছে। ফ্রি- মিক্সিং শেখানো হচ্ছে। সূক্ষ্মভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। এজন্যই এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো 'হুকআপ' করার এবং অশ্লীলতার উপলক্ষ হয়ে গেছে। মডেল জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে মেয়ে ছেলের কোলে বসে নাচছে।[২১৬] আশেপাশের সবাই উৎসাহ দিচ্ছে। ডিবেট সার্কিটে অশ্লীলতা, সমকামিতা, অবাধ যৌনতাসহ বিভিন্ন সেক্যুলার ধ্যানধারণা প্রমোট করা হচ্ছে।[২১৭]
এভাবে লিবারেলিসমের ঝান্ডাবাহী মিডিয়া, নব্য মিশনারী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, শাহবাগী সাংস্কৃতিক জমিদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশটা অশ্লীলতা, যিনা-ব্যভিচার, খুন, ধর্ষণ, সমকামিতা, যৌন বিকৃতিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, প্রেম, যিনা-ব্যভিচার, নারীবাদ, সমকামিতাকে আমাদের দেশের সেক্যুলার গোষ্ঠী উন্নতির পূর্বশর্ত মনে করে। ইউরোপ-অ্যামেরিকা উন্নত কারণ তারা পর্দা করে না, ফ্রি-মিক্সিং, ফ্রি সেক্সকে বৈধতা দিয়ে রেখেছে। ওদের মতো উন্নত হতে হলে আমাদেরও তেমন হতে হবে- এই হলো তাদের যুক্তি。
কিন্তু ঘোড়ার আগে গাড়িকে জুড়ে দিলে কি গাড়ি চলে? এনলাইটেনমেন্ট, শিল্পবিপ্লব, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি, জীবনযাত্রার উন্নতমান, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ফ্রি সেক্স...এগুলো ফলাফল, কারণ না। পশ্চিমের উত্থানের মূল কারণ ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ অ্যামেরিকা, অ্যামেরিকার প্রকৃত মালিক রেড ইন্ডিয়ানদের উপর চালানো তাদের ঔপনিবেশিক লুটপাট, সামরিক শক্তি আর কূটনীতি। ধর্ম নিরপেক্ষতা না। কাব্য, সাহিত্য, শিল্প প্রতিভা কিংবা আর্মচেয়ারের কল্পনাবিলাস না। নারীবাদ, সমকামিতা, ফ্রি সেক্স কালচার ইত্যাদির ব্যাপারে সহনশীলতা না। বরং এগুলো পতনের চিহ্ন। পতোনোন্মুখ জাতির বৈশিষ্ট্যই এগুলো-পাশ্চাত্যেরও পতন ঘটছে এই কারণগুলোর জন্য। যার প্রমাণ আমরা দিয়ে এসেছি।
কলুষতার কারিগরেরা আজ নিপুণভাবে মানবজাতির নফসকে উস্কে দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে চরম মাপের আত্মকেন্দ্রিক, বস্তুবাদী আর ভোগবাদী সমাজ। মানুষকে শেখানো হচ্ছে-ভোগ করো, নিজেকে তৃপ্ত করো। নিজেকে সন্তুষ্ট করো- নাফসী নাফসী নাফসী। এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে সভ্যতা। আর সভ্যতার এই অসুখ ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের দেশেও। আক্রান্ত করেছে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
আল আকসাকে মুক্ত করা মহান বীর সুলতান সালাহউদ্দীন আইউবী (রহ.) বলেছিলেন-
'কোন জাতিকে যদি যুদ্ধ ছাড়া ধ্বংস করে দিতে চাও তাহলে তাদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দাও'।
চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায় আমরা সেই ধ্বংসের দিকেই আগাচ্ছি...

টিকাঃ
[১৯১] সংশয়বাদী, ড্যানিয়েল হাকিকাতযু। ইলমহাউস পাবলিকেশন, ২০২১।
[১৯২] ইসরাঈল ফিলিস্তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা সামরিক আগ্রাসন চালানোর সময় ফিলিস্তিনের শহর দখল করে টিভিতে পর্নমুভি ছেড়ে দেয়। মুসলিমদের দেখতে বাধ্য করে। আমেরিকার কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এর সাথে হলিউডের মাখামাখি সম্পর্ক তো ওপেন সিক্রেট। বলিউডকেও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের প্রোপ্যাগান্ডার জন্য ব্যবহার করে এমন অভিযোগ বহু পুরোনো।
Pornography as Israel's Weapon of Choice, muslimskeptic.com, January 10, 2019- tinyurl.com/2urp9j69
How CIA Spies Infiltrated Movies, Music, Art and More, spyscape.com- tinyurl. com/286cue3h
[১৯৩] সূরা আল আ'রাফ, ৭:২৪
[১৯৪] সূরা আল-আরাফ, ৭:২৭
[১৯৫] সুরা আল-বাকারাহ, ২: ১৬৮-১৬৯
[১৯৬] সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬৮
[১৯৭] US State Department advances LGBT equality globally with first Special Envoy for LGBT Persons, GLAAD, Febr 27, 2015 - tinyurl.com/2p9y65u9
US Department of State, LGBT Rights - https://www.state.gov/subjects/lgbt-rights/
[১৯৮] Eliminating Discrimination Against Children And Parents Based On Sexual Orientation And/ Or Gender Identity, Unicef Current Issues, No 9, November 14- tinyurl.com/2p8aabmh
International Groups Seeking to Impose Sexual Revolution on Africa, The Ruth Institute, Dec 11, 2020 - tinyurl.com/3bddeuk5
The New Colonialism of the Sexual Revolution, Dr. Jennifer Roback Morse, tinyurl.com/2s3njwj9
[১৯৯] জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা Sustainable Development Goals (এসডিজি) এর ভেতরে অবাধ যৌনতা, সমকামিতা, ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকারসহ নানা বিষয় ঢোকানো হয়েছে। এসডিজির মধ্যে ১৭টি লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ নম্বর হল "অসমতার হ্রাস”। আপাতভাবে নিরীহ মনে হলেও, মূলত এর মাধ্যমে সারা বিশ্বজুড়ে অবাধ ও বিকৃত যৌনতার স্বাভাবিকীকরণের ক্যাম্পেইন চলছে।
LGBTI and the Sustainable Development Goals: Fostering Economic Well-Being, Brieanna Scolaro, June 24, 2020 - tinyurl.com/ve6s7fjh
LGBT Inclusion and the Sustainable Development Goals, Stonewall.org, January 2016 - tinyurl.com/bd48dn3k
Ban calls for efforts to secure equal rights for LGBT community, UN.org, Sep 21, 2016 - tinyurl.com/mvvua678
[২০০] The War on Children. The Comprehensive Sexuality Education Agenda, carlistas tv ইউটিউব ভিডিও, Apr 19, 2017- tinyurl.com/3fub6sbu
[২০১] US imposes sanctions on Uganda for anti-gay law, BBC, June 19, 2014- tinyurl.com/mryv4t9m
Hungary threatened with EU sanction over anti-LGBT law, Euronews, Oct 4, 2021 - tinyurl.com/yc5d2cn9
[২০২] Nandini Jagadeesan, Jemmy Suthandiradas, “Exposure Time to Romance Depicted in Media and its Influence on Beliefs about Romantic Relationships among Adults", The International Journal of Indian Psychology, Volume 6, Issue 4, october-December, 2018- tinyurl.com/3h2n39dn
Banjo, O.O., "The effects of media consumption on the perception of romantic relationships", Penn State McNair Journal, 9, 9-33,2002- tinyurl.com/542795t4
Myrien Eulah Kezia G. Banaag, "The Influence of Media on Young People's Attitudestowards their Love and Beliefs on Romantic andRealistic Relationships", International Journal of Academic Research in PsychologyJuly 2014, Vol. 1, No. 2- tinyurl.com/37fwbzuc
Why Bollywood movies ruined my idea of love and marriage! Times of India, January 11,2019- tinyurl.com/2p89wvxr
[২০৩] The Film Industry Made A Record-Breaking $100 Billion Last Year, forbes. com, 12 March, 2020- tinyurl.com/y55rkdjd
১ বিলিয়ন = ১০০ কোটি, ১ ট্রিলিয়ন = ১ লাখ কোটি, ২৩ জুলাই ২০২২ তারিখে সরকারি তথ্যমতে বাংলাদেশের মোট রিজারভের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। প্রেম, যিনা-ব্যভিচারের উপর নির্ভর করে যে বাজারগুলো দাঁড়িয়ে আছে তাদের বার্ষিক বাজারমূল্যের উপর আর একবার চোখ বুলাও। বুঝতে পারছো- সংখ্যাটা কতো বড়?
Music industry revenue worldwide from 2012 to 2023, statista.com, August 10, 2021- tinyurl.com/45u8xkn4
Depression Treatment Market Outlook (2022-2032), futuremarketinsights.com, May 2022- tinyurl.com/2ctr7pa8
Spending on illegal drugs this year, worldometers.info, September, 20, 2022- tinyurl.com/3kcfrrbp
Things Are Looking Up in America's Porn Industry, nbcnews.com, January 20, 2015- tinyurl.com/22esh2kk
Prostitution Revenue By Country, havocscope.com- tinyurl.com/hxddzunp
Sexually Transmitted Diseases (STDs) Drug - Global Market Trajectory & Analytics, researchandmarkets.com, April 2021- tinyurl.com/4twyykxf
Family Planning & Abortion Clinics in the US - Market Size 2003–2028, ibisworld. com, June 24, 2022- tinyurl.com/2ayd2ywv
Fashion Industry Statistics: The 4th Biggest Sector Is Way More Than Just About Clothing, fashinnovation.nyc- tinyurl.com/3sz4bmun
STD Testing Market Size Was Valued at USD 95 Billion in 2021 and Will Achieve USD 141 Billion by 2030 growing at 4.7% CAGR due to the Increasing Rates of STDs Globally- Exclusive Report by Acumen Research and Consulting, July 28, 2022- tinyurl.com/4mu2z5jw
[২০৪] মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইয়ে পাবে বিস্তারিত-tinyurl.com/4rarahs2
[২০৫] কিশোরী আনুশকা হত্যার জন্য দায়ী অসভ্য সংস্কৃতি, বিচার হোক সংশ্লিষ্টদের - শায়খ আহমাদুল্লাহ, As-Sunnah Foundation আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ইউটিউব ভিডিও, জানুয়ারি ৯, ২০২১- tinyurl.com/4tu7cru2
Sakib Bin Rashid | Sex education in BD | standup comedy | 10 minute school, Md. Mohiminul Islam Himo ইউটিউব ভিডিও, এপ্রিল ৪,২০১৭- tinyurl.com/yc42pf4s
Requests to all parents | Rafiath Rashid Mithila & Sakib Bin Rashid, ALL VIDEO 2018/12 ইউটিউব ভিডিও, ডিসেম্বর ৮, ২০১৮ – tinyurl.com/2sm3r4vc
Consent Sakib Bin Rashid & Rafiath Rashid Mithila, Rimon Hassan Raihan ইউটিউব ভিডিও, মার্চ ২৫,২০১৯- tinyurl.com/yrepphzu
আপনি কি একটি বিষাক্ত প্রেমে আটকে আছেন? Sakib Bin Rashid ফেইসবুক পোস্ট, ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২০ - tinyurl.com/msse32jw
Honestly Speaking with SBR Episode ০১: Social Media Content Making| Guest: Munzereen Shahid, MSF Company ইউটিউব ভিডিও, জুন ১২,২০২০-tinyurl. com/ycx2bbk4
দুনিয়াটা তোমার প্লে-গ্রাউন্ড... প্লে উইথ কনফিডেন্স, Sakib Bin Rashid ফেইসবুক পোস্ট, মার্চ ২০,২০২২- tinyurl.com/4e7cnnej
বি.দ্র.- প্রতিবাদের মুখে দুই একটি ভিডিও টেন মিনিট স্কুল তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। তাই অন্য চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিও লিংক দেওয়া হলো。
[২০৬] কীভাবে বুঝবেন আপনি প্রেমে পড়েছেন? প্রথম আলো, জুন ১৩, ২০১৭- tinyurl.com/2p8b6wnh
টিন টিন প্রেম, প্রথম আলো, মার্চ ২০,২০১৮- tinyurl.com/yxx9hutz
[২০৭] প্রপোজ করে তুমি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছ, কিশোর আলো, মে ২৫, ২০২২- tinyurl.com/ffybtcah
কিশোর আলোঃ ফ্রি-মিক্সিং প্রপাগাণ্ডা, Lost Modesty ফেইসবুক পোস্ট, আগস্ট ১৩, ২০১৭-tinyurl.com/yyn6adss
[২০৮] বাংলাদেশে সমকামিতার প্রচারকদের কর্মকৌশল নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য অবশ্যই পড়ো- সমকামী এজেন্ডাঃ ব্ল-প্রিন্ট, lostmodesty.com, আগস্ট ৩০, ২০১৮ tinyurl. com/3dzxbuaw
[২০৯] বিশেষ করে ভারতীয় কোম্পানি এয়ারটেল, রবি, বাংলালিংক
[২১০] 'ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প'-এর আরও একটি বছর, প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১- tinyurl.com/yb5755bt
[২১১] বিস্তারিত দেখ- ক্লোজআপের দ্বিধাহীন ভালোবাসার গল্প আয়োজনে উত্তপ্ত সোশ্যাল মিডিয়া, The Global Affairs, জানুয়ারি ২৭,২০২২- tinyurl.com/mr455by8
Dr. Holly Parker (Ph.D). "Closeup Freedom to Love Campaign White Paper", 2018- tinyurl.com/4px4bcjf
Closeup Philippines @CloseupPH টুইটার পোস্ট, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮- tinyurl.com/393tduh5
#freetolove presents 3 JOURNEYS OF LOVE, close-up.com -tinyurl.com/mretcaxa
[২১২] পশ্চিমা বিশ্বের সেক্স এডুকেশনের মতোই 'জেনারেশন ব্রেকথ্রু' প্রকল্পটি, বিবিসি বাংলা, মার্চ ২৫, ২০১৯- tinyurl.com/bdzf7bte
পাঠ্যবইয়ে কী শিখছে শিশুরা >> দুইজনের সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ দোষের নয়! বিডিটুডে. নেট, জুলাই ২৫, ২০১৪- tinyurl.com/yd7r6v6n
[২১৩] বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রবাদের প্রভাব প্রকট। প্রথম আলো, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ - tinyurl.com/yu2au5jc
[২১৪] 'সম্প্রীতি বাংলাদেশ' দেননি, তাহলে বিজ্ঞাপনটা দিলো কে? আওয়ার নিউজ ডেস্ক | মে ১৬, ২০১৯- tinyurl.com/ym5j6nw2
[২১৫] শুদ্ধ করে সালাম দেওয়া, কথা শেষে আল্লাহ হাফেজ বলা জঙ্গিবাদের লক্ষণ – ঢাবি প্রফেসর জিয়া রহমান, SI MEDIA, October 20, 2020- tinyurl.com/2mwmt4fe
[২১৬] #VIRAL Model United Nations Turning into Lap-Dancing session at IMUN 2019| TNEC, The North-Eastern Chronicle, March 4, 2019- tinyurl.com/rv2uhcne
নীল নকশা (চতুর্থ কিস্তি), lostmodesty.com, মার্চ ৬, ২০১৯- tinyurl.com/5n8k9wy6
[২১৭] ডিবেটিং সোসাইটিস: বাংলাদেশে সমকামিতা প্রচারের কেন্দ্র, Lost Modest ফেইসবুক পেইজ, June ৫,২০২১ ও June ২, ২০২১ tinyurl.com/5n8ednnr, tinyurl.com/mr3b7b59

ফন্ট সাইজ
15px
17px