📄 ওর সাথে পালালাম
এক.
পরপর বেশ অদ্ভূত কয়েকটা ঘটনা ঘটলো সেদিন। অল্প সময়ের ব্যবধানে। তবে ঘটনাগুলো থেকে কোনো উপসংহার টানার মতো বয়স ছিলো না আমার। বেশ ছোট ছিলাম, ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ি কেবল।
নদীর ধারেই ছিল আমাদের স্কুল। হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল পাশাপাশি। কমন মাঠ। মনে আছে সেদিন বাতাস হচ্ছিল ব্যাপক। একটা বাবলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম হাইস্কুলের মেয়েদের কমন রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শিউলি আপা। একটু উসখুস করছে। হঠাৎ করে মাটি ফুঁড়েই যেন উদয় হলো হাসান ভাই। আমাদের এলাকার স্ট্রাইক বোলার। সে সময়ের ক্রেজ শোয়েব আখতারের মতো বোলিং অ্যাকশান। প্রথম ওভারে একটা বোল্ড আউট করবেই করবে। হাসান ভাইকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। স্কুলে তার কাজ কী? সে তো স্কুল পাশ দিয়ে ফেলেছে!
হাসান ভাই শিউলি আপার দিকে এগিয়ে গেলো। ম্যাজিকের মতো শিউলি আপার হাতে একটা ট্রাভেল ব্যাগ বের হয়ে আসতে দেখলাম। হাসান ভাই ব্যাগটা নিয়ে একটা দৌড় দিলো। বল ছোড়ার আগে রানআপ নেবার সময় যে স্পিডে দৌড়াতো, তার চাইতেও বেশি জোরে। দেখলাম ব্যাগ নিয়ে সে দৌড়ে স্কুলের পেছনের রাস্তায় চলে গেল। সেখানে তার সাথে যোগ দিল আপন ভাই।
এরপর তারা কী করলো, কোথায় গেল, তা আর খেয়াল করিনি। স্কুলে একটা নতুন লাইব্রেরি হচ্ছে। সেটা নিয়েই বেশ উত্তেজিত ছিলাম আমরা। লাইব্রেরির আলোচনায় মজে গেলাম। একটু পর ক্লাসের ঘণ্টা পড়লো।
স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরে ভাত খাচ্ছি। আমি, আমার বোন, আম্মু। আকাশ কালো করে বৃষ্টি ঝরেছে ঘণ্টাখানেক। এখন বৃষ্টিটা ধরে আসলেও মাঝে মাঝে মেঘ গর্জন করে জানান দিচ্ছে—আরে আমি আছি, যাই নাই এখনো। দক্ষিণ দিকের দরজাটা খোলাই ছিল। সে দরজায় উদয় হলো ভীষণ দুঃখিত এক মূর্তি। মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব দুঃখ সিন্দাবাদের ভূতের মতো তার উপর এসে ভর করেছে।
'আম্মাজান, আমার মেয়েটা কোথায়, বলতে পারিস? ওকে খুঁজে পাচ্ছি না'—বুক ফাটা আর্তনাদ করে আমার বোনকে প্রশ্ন করলো লোকটা। আরে, এ যে বকুল কাকু! শিউলি আপার বাবা!
ভরদুপুর, কিন্তু মেঘ আর বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যার মতো মনে হচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকের আলো-আঁধারিতে আমাদের দরজায় দাঁড়ানো পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেলা এক পিতা, তার অসহায় আর্তনাদ...এ দৃশ্যের কথা আমি ভুলতে পারি না। সেই ঘটনার পর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের প্রলেপে সব ক্ষতই সেরে উঠে। কিন্তু এই দৃশ্য, সেই বুক চেরা আর্তনাদের স্মৃতি এখনো বিষণ্ণতায় ভোগায় আমাকে। দম ফেলার সময় নেই এমন কর্মব্যস্ত দিনেও উদ্যমহীন করে ফেলে।
শিউলি আপাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুল থেকে বাসায় ফেরেনি। আলমারি থেকে জামা কাপড় সোনার গহনা সব মিসিং! আপন ভাইয়ের সাথে শিউলি আপার প্রেম ওপেন সিক্রেট। এটা পাড়ার যেকোনো ছাগলকে জিজ্ঞাসা করলেও কাঁঠাল পাতা চিবানোর ফাঁকে ফাঁকে সে বিস্তারিত সব বলে দিতে পারবে! কাজেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো কোনো কঠিন কাজ ছিল না।
আম্মু আর আপুর পরামর্শে আমাদের বাসার কাছেই শিউলি আপার অন্য এক বান্ধবী টিনা আপার বাসায় গেল বকুল কাকু। তার পিছু পিছু গেল হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা কাকী।
পরে জেনেছিলাম সেই বাসাতেই লুকিয়েছিল শিউলি আপা। টিনা আপা আর তার পরিবার বকুল কাকুকে মিথ্যা বলে। সেখানেও খুঁজে না পেয়ে বকুল কাকু পাগলের মতো হয়ে যায়। বুক চাপড়ে কান্না করতে করতে এর ওর বাড়িতে খুঁজতে থাকে। মেয়েকে হারানোর ভয়ে ভীত বকুল কাকুকে যখন টিনা আপা ভূগোল বোঝাচ্ছিল, তখন ধানের গোলায় লুকানো শিউলি আপা সব শুনছিল, উঁকি মেরে দেখছিলও। বুঝতে শেখার পরে অনেকবার মনে হয়েছিল শিউলি আপাকে একবার প্রশ্ন করি— বাবার এমন অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা দেখার পরেও আপনার মনে এতোটুকুও দয়া হলো না? একবার মনে হলো না, বের হয়ে বাবার হাত ধরে বলি—বাবা ভুল হয়ে গেছে, চলো বাড়ি চলো! বাবার এতো ভালোবাসা, এতো মায়া, এতো মমতার কি কোনো দাম নেই? প্রেম কি এতোটাই অন্ধ?
দুই.
ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার মোড়। সন্ধ্যা।
রাস্তায় পড়ে আছে ১৯-এ পা দেওয়া এক তরুণী। শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। কাতর কন্ঠে সাহায্য চাইলো পথচারীদের কাছে। একজন তাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। হঠাৎ করেই দুনিয়ার নির্মম কুৎসিত দিকটা উন্মোচিত হয়ে গেছে তার সামনে। অথচ তিন দিন আগেও সম্পূর্ণ অন্য জীবন ছিল তার।
তামজিদ হোসেন আদর (২২) মেয়েটার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। যাত্রাবাড়িতেই থাকে দুজন। দুজনই আবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। এক বছর তিন মাস ধরে প্রেম করছিল তারা। তিন দিন আগে বিয়ে করবে বলে বাসা থেকে চলে আসে দুজন। রোমাঞ্চকর জীবনের স্বপ্নের আবির নেমেছিল তরুণীর চোখে। তিন দিন তারা বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে দেয়। সব শেষ সোমবার বেলা তিনটার দিকে তাকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার একটি হোটেলে নিয়ে যায় তামজিদ।
হোটেল রুমটিতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আরো তিন জন। প্রেমিক তামজিদ আশ্বস্ত করে, ' ওরা বিয়ের সাক্ষী হতে এসেছে, জান' । নিশ্চিন্ত হয় সে। কিন্তু তারপর নরক নেমে আসে হোটেলের সেই রুমে...
...ওরা চারজন মিলে ধর্ষণ করে তাকে। এক পর্যায়ে ভয় দেখায়—কাউকে কিছু জানালে জানে মেরে ফেলবো, আর তোর নগ্ন ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ধর্ষিত, প্রতারিত, মৃত্যুভয়ে ভীত তরুণী কাউকে কিছু জানাবে না বলে আশ্বস্ত করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরে এসে রাস্তায় পড়ে যায় সে।
সিলেট। ওসমানীনগর।
***
মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক। তারপর প্রেমিককে বিয়ে করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় ১৭ বছরের কিশোরী। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখে প্রেমিক নেই। হতাশ কিশোরীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে গ্যারেজে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে এক সিএনজি চালক।
***
ঘাটাইল উপজেলার গৌরিশ্বর গ্রামের আসকরের ছেলে আল আমিন (২৫) এর সঙ্গে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এক স্কুলছাত্রীর। ঈদুল আযহার সময় প্রেমিকের ফোন পেয়ে ওই কিশোরী নানার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে ঘাটাইল উপজেলার চেংটা গ্রামে যায়। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একটি বাড়িতে রেখে একটানা ২৫ দিন ওর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় প্রেমিক। পরে আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে আসে। বাসস্ট্যান্ডে আল আমিনের বন্ধু, পাচারকারী চক্রের সদস্য ট্রাকচালক মাসুদের ট্রাকে উঠে তাদের গন্তব্যে রওনা হয়। পরদিন ভোর ৫টার দিকে একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ওই স্কুলছাত্রীকে। সেখানে চার-পাঁচজন মিলে তাকে গণধর্ষণ করে। পরে তাদের আলাপচারিতায় কিশোরী বুঝতে পারে, তাকে ভারতে পাচার করার পরিকল্পনা করছে ওরা। পরে সে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ড আসে। সেখান থেকে বাড়িতে ফেরে সে।
***
ধর্ষণ, প্রতারণা, আত্মহত্যা বা খুনের এমন ঘটনা খুবই কমন। তুমি হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। হয়তো ভাববে, 'আরেহ! আমার সাথে কখনোই এমন কিছু হবে না। ও আমাকে এতো ভালোবাসে, আমাকে করবে ধর্ষণ! আমার সাথে করবে প্রতারণা! এসব বিশ্বাস করতে বলেন আমাকে?'
আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, তুমি গুগলে ৫/১০ মিনিট একটু সার্চ করে দেখো। ধর্ষণ, খুনের ঘটনা পড়তে পড়তে অসুস্থ হয়ে যাবে। এরাও সবাই তোমার মতো উপেক্ষা করেছিল সকল সতর্ক সংকেত। প্রেমে মোহান্ধ মন আপাদমস্তক বিশ্বাস করেছিল এমন মানুষকে যাদের হাতেই অসংখ্যবার খুন হয়েছে তারা।
সমাজ তথাকথিত আধুনিক, প্রগতিশীল, মুক্তমনা হবার সাথে সাথে ধর্ষণ খুনের মতো ঘটনাগুলোও বাড়ছে হু হু করে। তবে সংবাদ মাধ্যমে আসার চাইতে, না আসা ঘটনার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি ধর্ষিত হয়েছি এটা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে চায় না অনেকেই। বাড়ি থেকে পালানোর পর প্রেমিকের হাতে, প্রেমিকের বন্ধুদের কাছে বা হোটেলের ম্যানেজার, কর্মচারী, বাসের ড্রাইভার, হেল্পার বা যেখানে বাসা ভাড়া নিয়েছিল সেখানকার কারো হাতে ধর্ষণের শিকার হবার পর, কিংবা প্রেমিক পালানোর পর চুপি চুপি ঘরে ফিরে আসার ঘটনা নেহায়েত কম নয়। মফস্বল বা গ্রামগুলোতে এসব ঘটনা চাপা না থাকলেও ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের স্বার্থপর নাগরিক জীবনে এমন অজস্র ঘটনা চাপা পড়ে থাকে। কেউই হয়তো জানছে না, সামাজিকভাবে লজ্জিত, লাঞ্ছিতও হতে হচ্ছে না, বিয়েও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু থেকে যাচ্ছে দুঃসহ সব স্মৃতি। সারাটা জীবন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বোবা কান্না, গ্লানিবোধ আর বিষাদ কুরে কুরে খাচ্ছে বাকি জীবনটা। কেলেঙ্কারির ভয়ে বিচারও চাওয়া যায় না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো ধর্ষণ বা শারীরিক মিলনের ভিডিও করে রাখার ট্রেন্ড। একবার ভিডিও বা ছবি তুলে রাখার পর সেটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে চলে সিরিজ আকারে ধর্ষণ, গণধর্ষণ। টাকাপয়সা দিয়েও পার পাওয়া যায় না!
আর গ্রাম বা মফঃস্বল হলে কী ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি যে হতে হয়, তা ভূক্তভোগী ছাড়া আর কেউ কল্পনা করতে পারে না। প্রতিনিয়ত প্রতিবেশীদের কাছে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় পরিবারের সবাইকে। বিয়ে হতে চায় না। পতিতা, বাজারি মেয়ে টাইপের চিরস্থায়ী ট্যাগ লেগে যায়... একটা পরিবার আসলে একদম শেষ হয়ে যায়। ঘরে ফিরে আসলেও জীবনে আর ফেরা হয় না।
আপু, তুমি হয়তো বুঝতে পারবে না তোমার বাবার কাছে, তোমার ভাইয়ের কাছে তোমার স্থান কোথায়। তোমার জন্য কতোটা ভালোবাসা, কতোটা স্নেহ, কতোটা আবেগ জমানো রয়েছে তাদের বুকে! তোমার এক বিন্দু অসম্মান হবে, তোমাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলা দূরে থাক বাজে চিন্তা করবে এটাও তারা মেনে নিতে পারেন না। একজন সত্যিকারের গায়রত সম্পন্ন মুসলিম ভাই বা বাবা তোমার সম্মান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। মদীনার এক ইহুদি একজন মুসলিম নারীর সম্মানহানির চেষ্টা করেছিল শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারণ করেন। যুদ্ধের পোশাক পরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। দূর ভারত মহাসাগরের বুকে মুসলিম বোনের সম্মান রক্ষার জন্য ১৭ বছরের মুহাম্মাদ বিন কাসিম সেনাবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। অত্যাচারী শাসক মুহতাসিম পর্যন্ত মুসলিম বোনের আহ্বানে সাড়া উমর নামে পরিচিত মাদ্রাসার এক শিক্ষক ধর্ষিতা বোনের সম্মানের প্রতিশোধ নেবার জন্য বেরিয়ে পড়েন ছাত্রদের নিয়ে। বদলে ফেলেন আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস! এখনো মেয়ের ধর্ষককে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণের ঘটনাও মাঝে মাঝেই শোনা যায়!
আর সেই তুমিই নিজে যেচে পড়ে তোমার ইজ্জত অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছো। অন্যরা তোমাকে ব্যবহার করে ছেড়ে দিচ্ছে, তুমি গুমরে গুমরে কাঁদছো, তোমার ভিডিও, ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইনে। পত্রিকার শিরোনাম বা সম্পাদকীয়তে তোমাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে, তোমার বিয়ে হচ্ছে না, তুমি ঝুলে পড়ছো ফ্যানের সাথে... এমন পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থাটা কী হয় একবার চিন্তা করো!
তোমার বাবার কলিগ, তোমার পাশের বাসার আন্টি-ওরা কি তোমার আব্বু আম্মুকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেবে? টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে আদরের যেই ভাইটাকে তুমি চকলেট কিনে দিতে, সেই ভাইটা স্কুলে যাবে কীভাবে সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছো? যখন আশেপাশে মানুষজন আড়ালে আবডালে তোমাকে পতিতা হিসেবে সম্বোধন করে, যখন তোমাকে নিয়ে রসালো আলোচনা চলে-তোমার ভাই বা বাবা উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা বদলে ফেলে, কলজের মধ্যে ছুরি মারা টিটকিরির রহস্যময় হাসি হাসে, যখন তোমার সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো করে...তখন তাদের অবস্থা কেমন হয়? কীভাবে সহ্য করে তারা?
তুমি এতো স্বার্থপর কেন? বাবার প্রতি, ভাইয়ের প্রতি, পরিবারের প্রতি তোমার ভালোবাসা কোথায়? কোন অধিকারে তুমি তাদের ভালোবাসা তুচ্ছ করছো? এতোদিন ধরে কোলে পিঠে, খেয়ে না খেয়ে তোমাকে মানুষ করেছে তারা। সেই ভালোবাসাকে তুমি কীভাবে অস্বীকার করছো? কোন ভালোবাসা পায়ে ঠেলে কোন ভালোবাসার জন্য ঘর ছাড়ছো তুমি? ভালোবাসার কিছু বোঝো তুমি?
ভাইয়া, একবার ভাবো তোমার বোনের সাথে যদি কেউ এমন করতো, তোমার বোনকে যদি কেউ এভাবে 'খেয়ে ছেড়ে দিতো' বা তোমার মেয়েকে যদি কেউ ব্যবহার করে, তোমার কেমন লাগবে? তুমি মেনে নিতে পারতে? জানোয়ারটাকে খুন করে ফেলতে না? তুমি কি চাইবে তোমার বোন কোনো ছেলের সাথে বিছানায় যাক? তাহলে কীভাবে আরেকজনের আদরের মেয়ে, আরেকজনের বোনের সাথে তুমি এমন করার কথা চিন্তা করো?
দেখো, তোমাদের এই বয়সটাতে আসলে সংসার জগৎ সম্পর্কে তেমন ধারণা থাকে না। তোমরা ভাবো যে অনেক বড় হয়ে গেছো, অনেক কিছু বুঝে ফেলেছো; কিন্তু আদতে সংসারের অলিগলি সম্পর্কে তোমাদের ধারণা থাকে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
প্রেম করা আর বিয়ে করে এক ছাদের নিচে থাকা আসলে এক জিনিস না। তোমার কি মনে হয় রোমিও-জুলিয়েট বা লাইলী-মজনু ঘর বাঁধার সুযোগ পেলে রূপকথার মতো সুখে শান্তিতে বসবাস করতো? বিয়ের পাঁচ বছর পর বা দুই বাচ্চার মা হবার পর বিয়ের আগে প্রেম করা অবস্থায় তারা যেমন জীবনের স্বপ্ন দেখতো তেমন জীবন যাপন করতে পারতো? আচ্ছা বলো তো, বেশির ভাগ নাটক কিংবা সিনেমায় শুধু বিয়ের আগের প্রেম থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত কেন দেখানো হয়? কেন পরের অংশ দেখানো হয় না?
একটু খোলাখুলি কথা বলি। সত্য প্রকাশে আসলে লজ্জা করতে হয় না। 'একে অন্যকে ছাড়া বাঁচবো না', 'ওকে ছাড়া আমি কাউকে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না', একদিন না দেখলে পাগলের মতো হয়ে যাওয়া (হালের আঁতেল সাহিত্যিকরা যাকে 'তোমাকে দেখার অসুখ' হিসেবে ব্যাখ্যা করে), এক ঘণ্টা ইনবক্সে আপডেট না পেলে অস্থির লাগা—এসব কিছুর পেছনেই শরীরের রহস্য একটা বড় ফ্যাক্টর।
বিয়ের আগে একজন অপরকে পরিপূর্ণরূপে আসলে পায় না। একটা রহস্য, একটা রোমাঞ্চ থেকেই যায়। বিয়ের পর এই রহস্যের জট আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। মাথা ঠাণ্ডা হয়। কৌতূহল মিটে যায়। সেই সাথে কমতে থাকে আগেকার আবেগ- অনুভূতিগুলোর তীব্রতা। পাশাপাশি বিয়ের আগে প্রায় সকল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে একটা ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে—'ওকে আমার বউ বানাতেই হবে' বা 'ওকে আমার স্বামী করতেই হবে'। বিয়ের পরে তো এ ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে যায়। শরীরের রহস্য উন্মোচিত, নিজের তীব্র ইচ্ছাও পূর্ণ...মোহ, আবেগ কমে যায়, একসময় একেবারে হারিয়েই যায়। মোহের চশমা খুলে তখন বাস্তবতার চোখে পরিষ্কারভাবে সব কিছু দেখা শুরু হয়।
বাসা থেকে পালানোর সময় সঙ্গে করে কিছু টাকা, স্বর্ণের গহনা ইত্যাদি নিয়ে যাবে হয়তো। কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা হোটেলে উঠবে। কয়েকদিন পর যখন আত্মীয়ের বাসায় আর থাকা সম্ভব হবে না, বা টাকা ফুরিয়ে যাবে তখন ভালোবাসাটাও আস্তে আস্তে ফুরাতে শুরু করবে।
ভাইয়া, প্রেম করার সময় বাপের হোটেলে খেতে তুমি। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করা লাগতো না, এখন টাকা কামানোর জন্য তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে। অনেক অড জব করতে হবে। একদিন হয়তো ভালো লাগবে, দুইদিন হয়তো মনে হবে যে, তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষের জন্য কষ্ট করছো, আত্মতৃপ্তি আসবে... কিন্তু কিছুদিন পর পরিশ্রমের ধকল সামলাতে পারবে না।
আপু, বাসায় থাকতে হয়তো তুমি জীবনেও রান্নাঘরের চৌকাঠেও পা রাখোনি, খাবার জন্য হয়তো বিছানা থেকেও নামোনি, বিছানাতে খাবার দিয়ে গেছে। তোমাকে এখন কালিঝুলি মেখে রান্না করা লাগবে, হয়তো বস্তি টাইপের বাসায় থাকা লাগবে। ঘরের সব কাজ করা লাগবে। একদিন দুইদিন ভালো লাগলেও বেশিদিন এমন জীবন যাপন সহ্য করতে পারবে না। তোমাদের আগে যে লাইফস্টাইল ছিল, যে খাবার দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদে অভ্যস্ত ছিলে, সেটা আর পাবে না। অনেক, অনেক, আবারো বলি, অনেক সংগ্রাম করতে হবে। সংসারে অভাব অনটন আসবে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে শরীরে ক্লান্তি আসবে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে। শুরু হবে সংসারে অশান্তি, গণ্ডগোল, মারামারি! এখান থেকেই শুরু হবে বিচ্ছেদের পথ!
দেখো, মানুষের অন্তর শুধু প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ভালোবেসে বা ভালোবাসা পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না। আল্লাহ মানুষকে এভাবে বানাননি। মানুষের অন্তরে বাবা, মা, ভাই, বোনের জন্য ভালোবাসার একটা স্থান আছে। এই ভালোবাসা অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হবে না। খালিই থেকে যাবে। পরিবার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে পালিয়ে গিয়ে তুমি ভালোবাসার এই স্থানটা অপূর্ণ রেখে দিচ্ছো। মোহ কেটে যাবার পরপরই হৃদয়ের এই অপূর্ণ স্থান থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হবে তোমার। বিশেষ করে সংসারের প্রকৃত নির্মম, কঠোর বাস্তবতা তোমার সামনে এসে হাজির হবার পর। মানুষের জীবনে পরিবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে নিজেকেই আল্লাহর আসনে বসানো পাশ্চাত্য সভ্যতা পরিবারকে টুকরো করতে করতে এখন 'নাই' করে ফেলেছে। এতে ভেঙে পড়েছে তাদের জীবন ব্যবস্থা। হতাশা আর চরম অবসাদে ভুগে নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেও দেরি হয়ে গিয়েছে। সুপারসনিক গতিতে তারা এগুচ্ছে পতনের দিকে।
বাসার আরাম আয়েশ, বাবা-মার আদর ভালোবাসার কথা বারবার মনে পড়তে থাকবে তোমার। প্রতিবার টাকার অভাবে পড়লে, কাজের কঠোর পরিশ্রমের সময় তোমার মনে পড়বে বাবার কথা, বড় ভাইয়ের কথা... ইশ! তারা যদি থাকতো, এভাবে মানুষের ঝাড়ি খেয়ে কাজ করা লাগতো না সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য। ইশ! তারা থাকলে আমাকে টাকার জন্য এতো চিন্তা করা লাগতো না!
দুপুরে বা রাতে খেতে বসে তোমার বারবার মনে পড়বে বাসার সেই মজার খাবারগুলোর কথা। মা আদর করে, যত্ন করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন। মনে হবে ভাইয়ের সাথে খুনসুটি, দুষ্টুমির কথা। বোনের কপট শাসন, রাগের কথা। হয়তো ভীষণ ভাবে মিস করবে বাড়ির বেড়াল, পাশের বাসার ফোকলা দাঁতের পিচ্চি বা ছক্কা হাঁকানো সেই ক্রিকেট মাঠ, অথবা বাড়ির সামনের বকুল গাছটার কথা। অতীত স্মৃতির ডালপালা সাজিয়ে হাজির হবে ঈদের দিনগুলো। এক অদৃশ্য কারাগারের কয়েদি মনে হবে নিজেকে। চোখ ভিজে যাবে জলে।
এই হাহাকার, অভাব-অনটন, পালানোর পরে দুজনে একসাথে রূপকথার মতো সুখী জীবন যাপনের স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে যাওয়া, ঝগড়া, অশান্তি-সবকিছুর জন্য তখন দায়ী মনে হবে ওকে। অভিযোগের আঙুল উঠে যাবে সেই মানুষটার দিকে যার জন্য তুমি বাকি সব কিছুকে, বাকি সবাইকে তুচ্ছ করেছিলে। তখন তোমার মনে হবে-ওর জন্যই আমার আজকে এই অবস্থা!
অনেকেই হয়তো ভাবে, পালিয়ে গিয়ে বিয়েটা একবার করে ফেললেই বাবা-মা মেনে নিতে বাধ্য হবে। বিয়ে যেহেতু করেই ফেলেছে এখন তো আর কিছু করার নেই মেনে নেওয়া ছাড়া। মানসম্মান আরো বেশি হারানোর ভয়ে মেনে নেবে, বা একটা বাচ্চা হয়ে গেলে নাতিনাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা আর রাগ করে থাকতে পারবে না। এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যি। তবে সবসময় যে এমন হয়, তা না। আর উপরে উপরে মেনে নিলেও আজীবন বাবা-মা'র মনে আক্ষেপ থেকেই যায়। সন্তান পালিয়ে গিয়ে মানসম্মানের যে ক্ষতি করেছে, যে কষ্ট দিয়েছে, বাবা-মা'র উপর প্রেমিক/প্রেমিকাকে প্রাধান্য দেবার বিষয়টা সবার সামনে প্রমাণ করেছে—এই বিষয়গুলো তারা ভুলতে পারেন না। মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। একটা অনতিক্রম্য দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় সন্তানদের সাথে। দু'আ, ভালোবাসা, আদর, মায়ামমতার সুতো আলগা হয়ে যায়। মনে হয় বাবা-মা আর সন্তানদের নিয়ে একটা ধারাবাহিক নাটক চলছে। সবাই যে যার ভূমিকায় সুনিপুণ অভিনয় করে চলেছে। কিন্তু বাইরে থেকে সবকিছু দেখলে স্বাভাবিক মনে হলেও কিছুই স্বাভাবিক থাকে না। সুখ থাকে না।
আর এভাবে উপরে উপরে মেনে নিতেও যে সময়টা লাগে এই সময়ের ভেতরেই সংসারের গুঁতা খেয়ে হালুয়া টাইট হয়ে 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' টাইপের অবস্থা হয়ে যায়। কড়ায় গণ্ডায় মিটে যায় বিয়ের শখ। প্রেমিক, প্রেমিকাকে ছেড়ে পালায় বা ডিভোর্স হয়ে যায়।
তিন.
শিউলি আপা আর আপন ভাইয়ের সংসার সুখের হয়নি। আপন ভাই বেকার ছিল। কাজকর্ম করার ব্যাপারে তার তেমন কোনো গরজ ছিল না। ফুটবল আর ক্যারাম খেলা নিয়েই পড়ে থাকতো। সংসারে অভাব আসলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়— সেই পুরোনো প্রবাদটা আবারো তার সত্যতা জানান দিলো। ছ'মাস না পেরুতেই ঝগড়া, অশান্তি, অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেল শিউলি আপার সংসারে। কিছুদিন পর একটা মেয়ে হলো আপার। মেয়েকে দুধ কিনে খাওয়ানোর পয়সা পর্যন্ত ছিল না। না খেয়ে খেয়ে বাচ্চাটার কঙ্কাল বের হয়ে যাবার অবস্থা! শিউলি আপা অনেক রূপবতী ছিলেন। উনার অবস্থাও সহ্য করার মতো না। সংসারের কাজের চাপে, উপোস, আধপেটা খেয়ে খেয়ে, বাচ্চা হবার ধাক্কা সামলানোর মতো অবস্থা ছিল না তার শরীরের। শরীর ভেঙে পড়ে। চোখের নিচে জমে চিরস্থায়ী গ্লানির কালি। মেয়ে আর নাতনির অবস্থা দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বকুল কাকুরা সম্পর্ক মেনে নেন। সাধ্যমতো সাহায্য করতে থাকেন। তবে সুদিন আর ফেরেনি।
হতাশায় ভুগে আপন ভাই গাঁজার নেশায় ডুব দিলো। বাপের কাছ থেকে মেয়েকে দুধ কিনে দেবার কথা বলে টাকা নিতো। তারপর চিপায় বসে দিনরাত গাঁজা টানতো। মাঝে মাঝে বিকেলে মাঠে গিয়ে ফুটবল শটাতো।
এভাবেই চললো বেশ কয়েক বছর। ততোদিনে অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছি। প্রাইমারি শেষ করে অন্য এলাকার স্কুলে ভর্তি হয়েছি। একদিন খবর পেলাম, আপন ভাইয়া হসপিটালে ভর্তি। শিউলি আপার সাথে রাগারাগি করে কীটনাশক খেয়েছে কয়েক বোতল। তিনদিন দুইরাত হসপিটালে ভর্তি ছিল সে। তারপর হসপিটাল থেকে ছুটি মেলে তার। তবে বাড়ি ফেরা হয় না। ঠাঁই হয় পুরোনো এক অশ্বত্থ গাছের নিচে। কবরে। শুনেছিলাম, শিউলি আপার পরে অন্য এক জায়গায় বিয়ে হয়েছিল। পরের কোনো খবর আর জানি না। জানার ইচ্ছেও হয়নি কোনো দিন।
বকুল কাকুদের খুব সুখের সংসার ছিল। শিউলি আপার ঘটনায় একেবারে ছারখার হয়ে গেল সব। শিউলি আপা পালিয়ে বিয়ে করার কারণে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে অনেক বাঁকা কথা শুনতে হলো তাদের। গ্রামে যারা থাকেনি, তাদের আসলে বলে বোঝানো যাবে না—এ ধরনের ঘটনাগুলোর কারণে কী ধরনের কথা শুনতে হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেনি শিউলি আপার ঘটনার চেইন ইফেক্ট।
শিউলি আপার একটা ছোট বোন ছিল। ধরি, তার নাম রূপা। আমার চাইতে বছর দুয়েকের বড়, যা মনে পড়ে। অসম্ভব রূপবতী। রূপবতীদের রূপের ধার আশপাশ তছনছ করে দেয়। তার বেলাতেও ব্যতিক্রম ছিল না। সে হেঁটে গেলে পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ থেমে যেতো। একটু লাজুক, গুডবয় টাইপের ছেলেরা আফসোস ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। পেকে যাওয়া ছেলেরা শ্রবণ অযোগ্য এমন সব কথা বলতো যা সভ্য সমাজে উচ্চারণ করা যায় না।
শিউলি আপার ঘটনার কারণে এই মেয়েকে নিয়ে খুব ভয় করতো বকুল কাকুরা। আরেকবার অমন কিছু হলে সেই শোক সহ্য করার মতো শক্তি ছিল না তাদের। রূপাকে খুব কড়া শাসনে রাখতো, একেবারে চোখে চোখে। 'শাসন ভালো, তবে এতো কড়া শাসন ভালো না। বিশেষ করে মেয়েদের। শিউলির মতো কিছু করার মেয়ে না রূপা। অসম্ভব পার্সোনালিটি ওর'—আমার বাবা, কাকুকে মাঝে মাঝে বোঝাতো। কিন্তু কাকু বুঝতে চাইতো না। বাবা ঠিকই বলেছিলেন। শিউলি আপার মতো কিছু করেনি রূপা। তবে যা করেছে তা আমরা কেউই ভাবতে পারিনি।
এসএসসির পর শহরে একা একা পড়তে আসতে চাইলো রূপা। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো বকুল কাকুরা। বেঁচে থাকার অবলম্বন রূপাকে একা ছাড়তে চাইলো না। কিন্তু রূপা শহরে পড়বেই। কোনো কথা শুনতে চায় না। প্রায়ই এ নিয়ে রূপার অভিমান, ঝগড়া, অশান্তির খবর শোনা যেতো। বকুল কাকুরাও কড়া শাসন করতো। মে মাসের এক সন্ধ্যায় লোডশেডিং এর ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়ে ছাদে উঠবো কি না ভাবছি। এমন সময় বাবার ফোন আসলো —
'রূপাকে চিনিস না তুই? ও গলায় দড়ি দিয়েছে! বকুলের সাথে ঝগড়া করে।'
***
রাস্তায় বকুল কাকুর সাথে দেখা হয় হঠাৎ হঠাৎ। প্রতিবারই ভাবি—ইশ, কেন যে দেখা হলো! একসময়ের হাসিখুশি, গোলগাল বকুল কাকু এখন একেবারেই চুপচাপ, নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। মাথার চুল পেকে গেছে। হাঁটেন মাথা নিচু করে, কুঁজো হয়ে। অচেনা আগন্তুক কেউ দেখলেও চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবে—জীবনের ঘাটে ঘাটে মার খেয়ে একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছে এই লোক। হারানোর আর কিছুই নেই তার।
'কাকু কেমন আছেন?' —প্রতিবার এই প্রশ্নের উত্তরে চোখ তুলে আমার দিকে তাকান। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে শূন্য চোখে চেয়ে থাকেন। যেন চেনার চেষ্টা করছেন আমি কে! তারপর ম্লান হেসে বলেন, 'আচ্ছা কাকু, তুমি! হ্যাঁ আছি ভালোই, এইতো চলছে যেমন চলার'।
তারপর আবার আগের মতোই কুঁজো হয়ে, মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করেন। বিড়বিড় করেন কী যেন। যতক্ষণ দেখা যায় আমি তাকিয়ে থাকি। বহু বছর আগের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে আমাদের দক্ষিণের দরজায় দাঁড়ানো সদ্য সন্তান হারিয়ে ফেলা এক পিতার কলজে চেরা হাহাকার, আমার কানে বাজে। মনে হয় মহাকাব্যিক কোন ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য মঞ্চস্থ হচ্ছে আমার সামনে!
টিকাঃ
[৫৭] ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সবার নাম বদলে দেওয়া হলো। বাকি ঘটনা সত্য।
[৫৮] শিউলি আপা আর আমার বোন একই ক্লাসে পড়তো।
[৫১] বিয়ের প্রলোভনে হোটেলে নিয়ে চার বন্ধু মিলে ধর্ষণ, dhakamail.com, মার্চ ০৮, ২০২২- tinyurl.com/bryx2ftp
[৬০] প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে সিএনজি চালকের হাতে ধর্ষিত কিশোরী, gmnewsbd, নভেম্বর ২১, ২০১৭- tinyurl.com/m6k85awy
[৬১] ৪-৫ জন মিলে কিশোরী প্রেমিকাকে ৩৪ দিন ধরে ধর্ষণ, উদ্দেশ্য ছিল পাচারের, news24bd. tv, অক্টোবর ২২, ২০২১- tinyurl.com/bdhanjz9
[৬২] লালমনিরহাটে মুসলিম কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করে এক হিন্দু কিশোর। ভারত থেকে সেই কিশোরীর হৃদয়বিদারক কান্না দেখে স্থির থাকা কঠিন— SK media ইউটিউব ভিডিও, Aug ১২, ২০২২- tinyurl.com/24v9tsft jamuna Tv ইউটিউব ভিডিও, Aug ১২, ২০২২- tinyurl.com/mur9sxam প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, বাংলাভিশন, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২২ tinyurl.com/ya3hurjb বিয়ের আশ্বাসে বন্ধুর সাথে হোটেলে উঠে গণধর্ষণের শিকার তরুণী, হোটেল ম্যানেজারসহ গ্রেফতার ৬, ২৪ghonta.news, অক্টোবর ১২, ২০২০- tinyurl.com/muec63ar ১৩ ধর্ষণ গণধর্ষণ, দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম, জুলাই ৯, ২০২২- tinyurl.com/msxv57n9
[৬৩] শুধু বাংলাদেশ না, ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতেও ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট খুবই কম হয়। সামনে আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।
[৬৪] ধর্ষণের বিচার না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাবার আত্মহত্যা!, ntvbd.com, এপ্রিল ২৯, ২০১৭- tinyurl.com/2mm49zjs তুমি একবার কি বোঝার চেষ্টা করবে তোমার সম্মান তোমার বাবা, ভাই বা পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?
[৬২] যদি যিনা-ব্যভিচারে না জড়ায়, বা অল্প কয়েকবার জড়ায়। আর যারা বিয়ের আগেই ফুলটাইম স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপন করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের পরপরই তাদের সম্পর্কের বারোটা বেজে যায়।
[৬৬] সামনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।
📄 প্রেম কয়েদি
প্রেমে পড়ার সময়টা বেশ মজার। তাকে দেখলেই বুক ধুক ধুক করে, তার কথা মনে হলেই পেটের মধ্যে কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠে (প্রেমের বইয়ের ভাষায় যাকে বলে প্রজাপতি নাচা)। তার সামনে দাঁড়াতে হবে, প্রপোজ করতে হবে এসব ভাবলেই ভীষণ ভালোলাগায় মন ভরে যায়। প্রায় অহর্নিশি চলতে থাকে হরমোনের খেলা।
প্রেমের শুরুটাও দারুণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা, রিকশায় করে ঝুম বৃষ্টির দিনে একসঙ্গে ঘোরা, সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে একটা কাঠগোলাপ জোগাড় করা, ফুটপাতে এলোমেলো হেঁটে বেড়ানো—প্রণয়ের কতো আয়োজন! সত্যিকার অর্থেই সুখের সাগরে ভেসে চলা। মিডিয়া আর তথাকথিত লাভগুরুরা তোমাকে ঠিক এ পর্যন্ত দেখায়। কিন্তু এরপর কী হয়, তা আর দেখায় না।
কিন্তু যেমনটা আমরা এরই মধ্যে বলেছি। সুখ সাগরের প্রমোদতরীতে ভেসে চলা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। নিকষ কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশে সদলবলে হাজির হয় রুদ্র ঝড়েরা। মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে নিমিষেই সুখ পলাতক হয়ে যায়।
নারীপুরুষের সম্পর্কের এক অবাস্তব এবং অতিমানবীয় ছবি মিডিয়া আমাদের সবার মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে। প্রেমের যেই ছবিটা মিডিয়াতে দেখানো হয়, বাস্তবে দুনিয়াতে তার দেখা মেলে না, মেলা সম্ভবও না। মিডিয়া ভালোবাসা ও যৌনতাকে বিয়ে এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখায়। পাশাপাশি প্রেমের নানা কল্পকাহিনী দিয়ে মানুষের মধ্যে এমন সব প্রত্যাশা তৈরি করে, বাস্তবের মানুষের পক্ষে যা মেটানো সম্ভব হয় না। এর সাথে আবার যুক্ত হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা অন্যদের 'লাভ স্টোরি'র সাথে তুলনার অসুখ। সবকিছু মিলে 'রিলেশন'গুলো শুরু থেকেই গড়ে ওঠে ভঙ্গুর হয়ে।
কেবল একে অপরের প্রতি আকর্ষণ পুঁজি করে, বছরের পর বছর, দশকের পর দশক একজন মানুষের সাথে কাটিয়ে দেওয়া যায় না। সবচেয়ে রঙিন গোলাপের রঙও একসময় ফিকে হয়ে আসে। পৃথিবীর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং মানুষের মধ্যেও একসময় আর কোনো নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। নারীপুরুষের সম্পর্কের পূর্ণতা আসে বিয়ে ও পরিবারের মধ্য দিয়ে। এই সম্পর্ক পরিপূর্ণ হয় উঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, মমতা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে। পরিবারে স্বামী ও স্ত্রীর ভালোবাসায় জন্ম হয় সন্তানের। আনন্দ ও বেদনায় তাকে বড় করে তোলে মানব ও মানবী। জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্য প্রগাঢ় আবেগের অভিযানের সাথী হয় তারা একসাথে। পরিবার থেকে তারা গড়ে সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি। বিয়ে ও পরিবার, সন্তান ও অভিভাবক, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এই গভীর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন স্রেফ 'প্রেমের' সম্পর্কে সবসময় শূন্যতা থেকে যায়। এ শূন্যতাকে ভরাট করার জন্য যোগ করা হয় বিচিত্র সব কারিকুরি, কৃত্রিমতা, আর ভালোবাসা প্রমাণের আরোপিত নানা রীতিরেওয়াজ।
অসংখ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, কিশোর কিশোরীদের আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, হতাশা, বিষণ্ণতা, অবসাদ, অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাস-আত্মসম্মান কমে যাওয়া, কাজকর্মের উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, ক্রোধ, ভীতি, নিদ্রাহীনতা, ধ্বংসাত্মক চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড এবং ক্ষুধামন্দার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রেম এবং ব্রেকআপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনোবিদদের কাছে যে বিষয়গুলোর কারণে সাহায্য নেন তার প্রথম তিনটির একটি হলো 'রিলেশনশিপ' সমস্যা।
প্রেম আর ঝগড়া হলো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রেম করবে আর ঝগড়া করবে না, তা হবে না। গবেষকরা বলছেন, অল্প বয়স্কদের প্রেমের অনিবার্য পরিণতি হলো ঘন ঘন ব্রেকআপ, ঝগড়া, আত্মহত্যার চেষ্টা ইত্যাদি।
কী সব হাস্যকর, তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে যে ঝগড়া হয় তা কল্পনাও করা সম্ভব না। তুমি আমার ফোন ধরতে দেরি করলা কেন, তুমি এতোবার কেন ফোন দাও, তুমি এতো কম কেন ফোন দাও, আমাকে সন্দেহ করো নাকি, ঐ মেয়ের ছবিতে তুমি লাভ রিয়্যাক্ট দিলা ক্যান? ঐ ছেলে তোমার ছবিতে কমেন্ট করলো কেন? তুমি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাও না—তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তুমি আমাকে গিফট দাও না, তুমি আমাকে ফুচকা খাওয়াও না...
এমন কতো হাস্যকর সব কার্যকারণ, গুণে শেষ করা যাবে না।
একবার ঝগড়া লাগলে মান-অভিমান ভাঙাতে ব্যাপক পরিমাণ সময়, শ্রম, মেধা বিনিয়োগ করতে হয়। একটা দেশ চালানোর জন্যেও মনে হয় এতো টেনশন করতে হয় না। হাজার বার সরি বলা, কান ধরে উঠবস করা থেকে শুরু করে রাত তিনটার সময় প্রেমিকার বাসার সামনে গোলাপ ফুল, আইসক্রিম বা চকলেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা, আরো কতো কী! অনেক প্রেমিকই অনৈতিক আবদার করে। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও আদায় করে নেয় বা আরো খারাপ কোনো কাজ করিয়ে নেয় প্রেমিকাকে দিয়ে। হাতের কাছে ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও থাকলে সেগুলো ভাইরালও করে দেয় অনেকেই।
মাঝে মাঝে কোনো কারণও লাগে না। হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই সে বললো, আজকে আমার মন ভালো নেই। দেখবে তোমারও সেদিন আর মন ভালো রাখা সম্ভব হবে না। তার মন ভালো করার চেষ্টায় পার করতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা!
ঝগড়া শুধু মন খারাপ, দুঃখকষ্ট পাওয়া, হতাশায় ভোগার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় প্রাণঘাতী রূপও ধারণ করে। অভিমানে হাত কেটে ফেলা, ঘুমের ওষুধ খাওয়া, ইঁদুর মারা বিষ খাওয়া—এগুলো আবহমান কাল ধরেই প্রেমিক প্রেমিকার নিত্য সঙ্গী ছিল। বর্তমানে এক্ষেত্রে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে আত্মহত্যা। ভিডিও কলে ঝগড়া করে আত্মহত্যা, প্রেমিকা 'মরতে বলেছে' তাই আত্মহত্যার মতো ঘটনা আজ অসংখ্য।
কী ভয়ঙ্কর অবস্থা চিন্তা করো! যে আত্মহত্যা করলো সে কি জঘন্য একটা কাজ করলো! তার পুরো জীবনের অর্থ এবং সমাপ্তি শুধু একজন মানুষের সাথে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে? মান-অভিমান নিয়ে? এই মানুষটা মহান আল্লাহর সামনে কী জবাব দেবে? ভেবে দেখো, তার বাবা মা, ভাইবোন, পরিবারকে কতোটা কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে!
বাবা-মা'র কাছ থেকে প্রেম লুকিয়ে রাখা, সারাক্ষণ ধরা পড়ার ভয়, তার সাথে ঝগড়া, ঝগড়া পরবর্তী মানসিক কষ্ট, মান-অভিমান ভাঙানো, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, গিফট কিনে দেওয়া, ওকে ইম্প্রেস করার জন্য ভালো পোশাক পরা, দামি পারফিউম ব্যবহার করা, প্রেম টিকিয়ে রাখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা, চ্যাট করা—সব মিলিয়ে একটা রিলেশন চালাতে গেলে বহুত প্যারা নিতে হয়, সময় দিতে হয়, প্রচুর টাকার দরকার পড়ে। এই লাইফস্টাইল মেইনটেইন করার মতো টাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে জীবন তেজপাতা হয়ে যায়। বাবার কাছ থেকে মিথ্যা বলে টাকা নেওয়া, টিউশানির টাকা মেরে দেওয়া, “দোস্ত, বাবা টাকা পাঠালেই সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেবো” —বলে টাকা ধার নিয়ে আর বন্ধুর ফোন না ধরা। বন্ধুর মোবাইল নিজের মনে করে নিয়ে বিক্রি করে ফেলা, মানিব্যাগ নিজের মনে করে নিয়ে নেওয়া ইত্যাদি করেও কুল কিনারা পাওয়া যায় না। প্রেম বিষম ভার হয়ে বুকের মাঝে চেপে বসে। অস্থিরতা, উদ্বেগ টেনশনে মাথার চুল পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।
বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে—প্রেমের জটিলতায় পড়ে প্রেমিক প্রেমিকাদের মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। শক্তিশালী, কল্যাণকর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে না। সমাজ ও জাতির জন্য তারা তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না। মানুষজনের সাথে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রেমের কারণে যারা সহিংস আচার-আচরণের মুখোমুখি হয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তারা সেটা টেনে নিয়ে যায়। ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গীর সাথে একটা স্বাস্থ্যকর, সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
ঝগড়ার মতো প্রেমের আরেক, একেবারে অপরিহার্য অংশ ব্রেকআপ। বর্তমান এই হাইপার সেক্সুয়ালাইজড সমাজ বাস্তবতায় তো এটা রীতিমতো মহামারি আকার ধারণ করেছে। অল্প বয়সের অধিকাংশ প্রেম স্বল্পস্থায়ী হয়। নিছক ভালোলাগা, হরমোনের জোয়ার আর শরীরী চাহিদার ভিত্তির উপর গড়ে ওঠার ফলে এ ধরনের সম্পর্কগুলো স্বাভাবিকভাবেই নড়বড়ে হয়। বয়ঃসন্ধিকালের প্রথম প্রেমের মাত্র ২% বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। ব্রেকআপ একটা মানুষের জীবনকে এলোমেলো করে দেয়।
জার্নাল অফ পারসোন্যালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শতকরা ৪০ ভাগ উত্তরদাতা জানাচ্ছে ব্রেকআপের পর তারা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে ভুগছে। পাশাপাশি আরো ১২ ভাগ মাঝারি থেকে তীব্র মানের হতাশায় ভোগার কথা জানাচ্ছে। ব্রেকআপ আসলে একজন মানুষকে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে তীব্রভাবে ধাক্কা দেয়। শুরু হয় এলোমেলো জীবনযাপন। ঘুমের ঠিক নেই, খাবার ঠিক নেই, পড়াশোনা, কাজকামের খবর নেই। চলে তিলে তিলে নিজের জীবনকে শেষ করে ফেলা, বাবা-মা'র স্বপ্নকে চূর্ণ বিচূর্ণ করার প্রক্রিয়া।
ভারত সরকার পরিচালিত একটা হেল্পলাইনের নাম আরোগ্যবাণী। গত তিন বছরে এখানে কিশোর ও তরুণরা ফোন করে যেসব বিষয়ে সাহায্য চেয়েছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেল হৃদয়ঘটিত সমস্যা, বিশেষ করে ব্যর্থ প্রেম হলো সেই কালপ্রিট যার কারণে তারা সুইসাইড করার কথা চিন্তা করছে। এই তথ্যের সাথে একমত হয়েছেন ভারতের মনোবিদরাও। তারা বলছেন, 'আত্মহত্যার একটা বড় উস্কানিদাতা হলো ব্যর্থ প্রেম। এদেরই একজন ড. জগদীশ। তার মতে, 'আমি বহু শিশু এবং কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের কাউন্সেলিং করিয়েছি। আমি মনে করি অর্ধেকেরও বেশি আত্মহত্যার কারণ হলো প্রেমঘটিত সমস্যা। এটা আত্মসম্মান একেবারে ধ্বংস করে দেয়।'
অন্যান্য অনেক গবেষণাও প্রমাণ করছে—ব্রেকআপ, টিনেজারদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ। আমাদের দেশেও একই অবস্থা। প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাই মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে চিরকুট লিখে কিশোরীর আত্মহত্যা, ঢাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা—পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে এমন অনেক খবর।
ব্রেকআপের এবং ঝগড়ার ভয়াবহ এক দিক হলো এটা প্রেমিক প্রেমিকাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান একেবারে ধ্বসিয়ে দেয়। মধুর মধুর কথা বলে ঝগড়া বা ব্রেকআপ হয় না। ঝগড়ায় থাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, মারাত্মক অপমানজনক কথা। এসব শুনতে শুনতে ও বলতে বলতে মন বিষিয়ে যায়। প্রেমিক/প্রেমিকার কথায় মানুষ অনেক বেশি প্রভাবিত হয়। তুই সুন্দর না, তুই শেওড়া গাছের পেত্নী, তুই হট না, তুই একটা ভোটকা, তুই একটা ক্ষ্যাত, তুই জীবনে কিছুই করতে পারবি না, আয়নায় চেহারা দেখছিস নিজের, তোর সাত পুরুষের ভাগ্য আমার মতো মানুষ তোর সাথে প্রেম করে, আমি চলে গেলে তুই কোনো মেয়ে পাবি না—ব্রেকআপ বা ঝগড়ার সময়ে এই জাতীয় কথাগুলো অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলে মানুষের মনের উপর।
এ ধরনের কথা হয়তো ১০% সত্য কিন্তু বাকি ৯০% একেবারেই মিথ্যা। কিন্ত রাগের মাথায় পরিস্থিতির কারণে বলে ফেলা এই মিথ্যাগুলোই অপরপক্ষ সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রিয় মানুষের মুখে নিজের সম্পর্কে এই নেতিবাচক মূল্যায়ন তার আত্মবিশ্বাসকে একেবারেই গুঁড়িয়ে দেয়। তীব্রভাবে বিশ্বাস করে নেয় যে, সে একজন ব্যর্থ মানুষ। জীবনের পথচলা বিজয় সরণির সিগনালে আটকে যায়। নিজের চেহারা, শরীর, আচার-আচরণ, ব্যক্তিত্ব নিয়ে মানুষ তখন চরম অস্থিরতা, উদ্বেগে ভোগে। মানুষজনের সামনে সহজ হতে পারে না। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাবে নিজের উপর প্রেশার নিয়ে নিজেকে বদলে ফেলতে চায়। কেউ না খেয়ে, ডায়েট করে, বমি করে শুকনো হতে চায়। রূপচর্চায় পানির মতো টাকা খরচ করে, অশালীন পোশাক-আশাক পরে হট হতে চায়। কেউ বাইক কিনে, বিড়ি সিগারেট বাবা ধরে, ডিএসএলআর দিয়ে মাঞ্জা মারা ছবি তুলে নম্রতা, ভদ্রতা, শালীনতা, সততার আদর্শ ভুলে গিয়ে চাপাবাজি আর প্রতারণার কৌশল শিখে নিজেকে ক্ষ্যাত থেকে স্মার্ট বানাতে চায়।
পড়াশোনা এবং কাজের ক্ষেত্রেও থাকে নেতিবাচক নানা প্রভাব। প্রেমের এতো প্যারা খেয়ে পড়াশোনা-ক্যারিয়ার গাব গাছে ওঠাই স্বাভাবিক। বেশ কয়েকটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেম পড়াশোনায় বেশ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যারা প্রেম করে তাদের অনেকের অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্স খারাপ হয়। খারাপ অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্স নিজের মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়, আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়, পরিবারেও অশান্তি দেখা দেয়।
ইবনুল জাওযী (রহ.) ছিলেন অসাধারণ একজন আলেম। তাঁর গ্রন্থগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে সারা পৃথিবীতে পড়ানো হচ্ছে। তাঁর অসংখ্য বিখ্যাত গ্রন্থের মধ্যে একটি হলো—যাম্মুল হাওয়া। হৃদয়ঘটিত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ক্লাসিক্যাল মাস্টারপিস এই গ্রন্থে। প্রেমের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিকগুলোর সারমর্ম বেশ সুন্দর করে তুলে ধরে তিনি বলেছেন,
প্রেম-ভালোবাসার ক্ষতি জানার জন্য এতোটুকুই যথেষ্ট যে, এটা হলো হৃদয়ের বন্দীদশা। প্রেম ভালোবাসা অসম্মান, অপদস্থতা ও কষ্টের দরজা।
তিনি আরো বলেন, 'প্রেমের পার্থিব ক্ষতি হলো স্থায়ী দুঃখ, লাগাতার দুশ্চিন্তা, সংশয়, দুঃস্বপ্ন, ক্ষুধামন্দা, অনিদ্রা প্রভৃতির শিকার হওয়া। তারপর এগুলো শরীরের উপরও চড়াও হয়। ফলে দেহ দুর্বল ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ক্রমশ বিচার-বিবেচনাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। মানুষ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। অবিরত দুঃখ, জ্বালা, হা-হুতাশ, অশ্রুপাতের পাশাপাশি অন্তর মরে যায়। অবশেষে অন্তর যখন পুরোপুরি অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন হয়, তখন উন্মাদনা প্রকাশ পায় এবং তাকে ধ্বংসের কিনারায় এনে দাঁড় করায়। এরকম অনেক প্রেমিক চলে গেছে যারা এই উন্মাদনায় লিপ্ত হয়ে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। সমাজে নিজের মান মর্যাদা নষ্ট করেছে এবং বেশিরভাগই দৈহিক- মানসিক দুঃখভোগের সাথে সাথে পাপাচারের প্রচলিত শাস্তিও পেয়েছে।
এ পর্যন্ত পড়ার পর আশা করি তুমিও বুঝতে পেরেছো প্রেমের ফ্যান্টাসির সাথে বাস্তবতার মিল খুবই কম। যারা প্রেম করে তাদের অধিকাংশই সুখে থাকে না। ভয়ংকর এক অশান্তির মধ্য দিয়ে দিন পার করে তারা। অস্থিরতা, উদ্বেগ, আতঙ্ক, অশান্তির মধ্য দিয়ে দিন যায় তাদের। গবেষণার পর গবেষণা প্রমাণ করেছে প্রেম একজন মানুষের জীবনটাকে কি পরিমাণ প্যারাময় করে দিতে পারে।
প্রেমের সূচনা হয় আবেগের ঝড়ে। সমাজ, সভ্যতা ও মিডিয়ার ব্রেইনওয়াশিং-এ বিভ্রান্ত মানুষ ধরে নেয় এই ধুলোয় ধূসর পৃথিবী থেকে প্রেম বুঝি তাকে স্থানান্তরিত করে দেবে ডিজনির রূপকথার মতো সুখে শান্তিতে টইটম্বুর কোনো এক জগতে। কিন্তু প্রেম শেষ পর্যন্ত মানুষকে বন্দী করে তার নিজের বানানো খাঁচাতেই।
টিকাঃ
[৬৭] মোহ এবং কামনায় ব্রেইন কেমিক্যালের ওলটপালট-মাত্রই আলকেমি লেখাটাতে পড়ে আসলে।
[৬৮] Heartbreak tops reasons for youngsters contemplating suicide: Government helpline, Times of India, Sep 13, 2016,- tinyurl.com/5n6s46jd
Teenage Heartbreak Doesn't Just Hurt, It Can Kill, Elseviar, Sitech Connect, September 18, 2017- tinyurl.com/4fapd695
Research finds men at increased risk of anxiety, depression, suicide after breakup, The Daily Guardian, February 7, 2022 - tinyurl.com/3ydaeu6x
Verhallen et al., (2019). Romantic relationship breakup: An experimental model to study effects of stress on depression (-like) symptoms. PloS one, 14(5), e0217320.
Dealing with Depression After a Breakup, healthline.com-tinyurl.com/mjscnh2y
Field et al., (2010). Breakup distress and loss of intimacy in university students. Psychology, 1(03), 173.
[৬৯] Surviving A Relationship Break-Up -Top 20 Strategies, Dr. Kim Maertz, Mental Health Centre University of Alberta- tinyurl.com/4ytkh37h
[৭০] The Negative Effects of Teenage Dating, Sean D. Foster, Bellevue University- tinyurl.com/2yb5zp5k
[৭১] Rogers et al., (2018). Adolescents' daily romantic experiences and negative mood: A dyadic, intensive longitudinal study. Journal of Youth and Adolescence, 47(7), 1517-1530.
[৭২] ভিডিও কলে ঝগড়া, প্রেমিকের সামনেই প্রেমিকার আত্মহত্যা, একাত্তর, মার্চ ৪, ২০২২- tinyurl.com/4dazuxrd
ঝগড়ার সময় প্রেমিকা 'মরতে' বলেছিলেন, ফেসবুক লাইভে আত্মহত্যা প্রেমিকের, আনন্দবাজার, অগস্ট ০৮, ২০২১- tinyurl.com/mr3ybsp9
প্রেমিকের সঙ্গে ঝগড়া করে সুবাস্তু টাওয়ারে প্রেমিকার আত্মহত্যা, দৈনিক ইনকিলাব, মার্চ ০৪, ২০২২- tinyurl.com/3hmmwcmm
প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়ার জেরে কলেজছাত্রের আত্মহত্যার অভিযোগ, সময় নিউজ, মার্চ ৩১, ২০২২- tinyurl.com/wp5y887v
[৭৩] Consequences of Teen Dating Violence, youth.gov-tinyurl.com/25dk4nw3 The Negative Effects of Teenage Dating, studymoose.com- tinyurl.com/5yx8ytsh
[৭৪] The Negative Effects of Teenage Dating, Sean D. Foster, Bellevue University- tinyurl.com/2yb5zp5k
[৭৫] High School Sweetheart Relationship Trends, midlifedivorcerecovery.com- tinyurl.com/dr3kvm53
কেন এমন হয়? সম্ভাব্য একটি কারণ পড়ো এই লেখায়-আততায়ী ভালোবাসা, Lostmodesty.com, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮- tinyurl.com/bddpcrw2
[৭৬] Teenage Heartbreak Doesn't Just Hurt, It Can Kill, Elseviar, Sitech Connect, September 18, 2017- tinyurl.com/4fapd695
Heartbreak tops reasons for youngsters contemplating suicide: Government helpline,times of india, Sep 13, 2016 -tinyurl.com/4csrh43c
Mearns, J. (1991). Coping with a breakup: negative mood regulation expectancies and depression following the end of a romantic relationship. Journal of Personality and Social Psychology, 60(2), 327.
[৭৭] প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা!, ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম, জানুয়ারি ২, ২০২০-tinyurl.com/mpbsmftf
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে চিরকুট লিখে কিশোরীর আত্মহত্যা, যুগান্তর, ডিসেম্বর ১৩, ২০২১- tinyurl.com/4jptrh8w প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, যমুনা নিউজ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২২- tinyurl.com/pzx2ec3j
[৭৮] Slotter et al., (2010). Who Am I Without You? The Influence of Romantic Breakup on the Self-Concept. Personality and Social Psychology Bulletin, 36(2), 147-160-tinyurl.com/mr3wjcm4 Consequences of Teen Dating Violence, youth.gov-tinyurl.com/25dk4nw3 Silverman et al., (2001). Dating violence against adolescent girls and associated substance use, unhealthy weight control, sexual risk behavior, pregnancy, and suicidality. jama, 286(5), 572-579.
[৭৯] Teen Dating,courses.lumenlearning.com- tinyurl.com/bdh2j5s9 Brendgen, Vitaro, Doyle, Markiewicz and Bukowski, 2002; Crissey, 2006; Giordano, Phelps, Manning and Longmore, 2008; Longmore, 2006. Consequences of Teen Dating Violence, youth.gov-tinyurl.com/25dk4nw3
[৮০] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা নামে যাম্মুল হাওয়া গ্রন্থটি অনুদিত হয়েছে বাংলায়, দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৬৫।
[৮১] ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ভালোবাসা, ইবনুল জাওযী (র.), দারুস সালাম বাংলাদেশ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮
[৮২] Anderson, Salk, & Hyde, 2015; Simon & Barrett, 2010; Drum, Brownson, Burton Denmark, & Smith, 2009
Brendgen, Vitaro, Doyle, Markiewicz and Bukowski, 2002; Chow, Ruhl and Buhremester, 2015; Jouriles, Garrido, Rosenfield and McDonald, 2009; Leung, Moore, Karnilowicz and Lung, 2011; Seiffge and Burk, 2012; Soller, 2014; Westcott, 1987
Green, Lowry, & Kopta, 2003; Cairns, Massfeller, & Deeth, 2010; Barr, Krylowicz, Reetz, Mistler, & Rando, 2011
📄 ঘুণপোকা
২০০৭ সাল থেকে শুরু করে পরের দু'বছরে ১১ টা লাশ পাওয়া যায় চাঁদপুরের ডোবা, নর্দমা, খালগুলোর পাশে। ভিকটিমরা সবাই নারী। কাউকে খুন করা হয়েছে শ্বাসরোধ করে, কাউকে গলা টিপে, কাউকে পানিতে চুবিয়ে। সবাইকে খুন করার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। খুনের ধরন দেখে পুলিশের ধারণা হলো সবগুলো খুন এবং ধর্ষণের হোতা একজনই। দেশজুড়ে আলোড়ন পড়ে গেল। কে সেই সিরিয়াল কিলার? কেন সে মেতে উঠেছে এমন হত্যাযজ্ঞে?
২০০৯ সালের জুলাই মাসে পারভীন নামের এক নারীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে দেখা মিললো চাঁদপুরের এক মসজিদে ফ্যান চুরির ঘটনায় আটক রসু খাঁ নামের এক মধ্যবয়স্ক লোকের। শুরু হলো জেরা। প্রথমে অস্বীকার না করলেও একসময় রসু খাঁ স্বীকার করলো যে, পারভীনকে সে-ই খুন করেছে। একে একে আরো ১০ জন নারীকে ধর্ষণের পর খুনের স্বীকারোক্তিও দিলো সে। পুলিশকে রসু খাঁ জানালো, তার জীবনের টার্গেট এভাবে ১০১ জন নারীকে হত্যা করা। তারপর সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে বাকী জীবন কাটিয়ে দেওয়া।
কিন্তু কেন এমন বিকৃত রুচির উন্মাদ খুনি হলো রসু খাঁ?
রসু খাঁ'র স্ত্রী গার্মেন্টসে চাকরি করতো। সেই সুবাদে বিভিন্ন গার্মেন্টস কর্মী মেয়েদের সঙ্গে তার পরিচয়। একপর্যায়ে এক নারী কর্মীর সঙ্গে প্রেম হয় তার। কিন্তু সেই নারী তার সঙ্গে প্রতারণা করে এলাকার অন্য এক ছেলের সঙ্গে প্রেমে জড়ায়। রসু খাঁ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ওই কর্মী তার প্রেমিকের সহযোগিতায় ৫-৬ জন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে ১টি পাঁচতলা ভবনের ছাদে তুলে বেদম মারধর করে তাকে। সেদিনই রসু খাঁ প্রতিজ্ঞা করে—১০১ জন নারীকে ধর্ষণ শেষে খুন করবে সে। শুরু হয় বিভিন্ন নারীদের সঙ্গে প্রেমের ভাব গড়া। এদের মধ্যে গার্মেন্টস কর্মীই বেশি। একপর্যায়ে সে ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করতে শুরু করে। ১১ জনকে হত্যার কথা স্বীকার করলেও আসলেই সে ১১ জনকে হত্যা করেছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
আদালতে ফাঁসির রায় হয় রসু খাঁ'র।
বলা হয়—অর্থই সব অনর্থের মূল। অনর্থের মূলের লিস্টে প্রথম স্থানটা অর্থের দখলে থাকলে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানটা নির্ঘাত প্রেমের দখলে যাবে। প্রেমের নামে হত্যা, যুদ্ধবিগ্রহ, বিশৃঙ্খলা আর ধ্বংসের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিখ্যাত ট্রয়ের যুদ্ধ যেমন হয়েছিল হেলেন নামের এক মানবীর প্রেমের জন্য, তেমনি আজও 'পবিত্র প্রেম' জন্ম দিয়ে যাচ্ছে নানা ধ্বংসযজ্ঞের। এই যেমন বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ'র আবির্ভাব হয়েছে ব্যর্থ প্রেমের ধ্বংসস্তূপ থেকে। নিঃসন্দেহে রসু খাঁ'র চালানো হত্যাগুলোর জন্য তার সেই প্রেমিকা দায়ী না। অবশ্যই একজন রসু খাঁ'র সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে অনেক সামাজিক, পারিবারিক এবং অন্যান্য ফ্যাক্টর কাজ করে। কিন্তু ব্যর্থ প্রেমের একটা ভূমিকা যে এখানে ছিল, সেই সত্যটা এতে বদলায় না।
অনেক সময়ই ব্রেকআপ তীব্র ক্রোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় প্রেমিক/প্রেমিকাসহ আরো অসংখ্য মানুষের জীবন। প্রেমে ব্যর্থ হওয়ায় প্রাক্তনকে ধর্ষণ, বন্ধুদের নিয়ে গণধর্ষণ, খুন, যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তাকেও খুন, আপত্তিকর ছবি অনলাইনে ভাইরাল করে দেওয়া, এসিড মারা, এমনকি প্রেমিকার বাড়িতে বোমা নিক্ষেপ, বড় বোনের সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ছোট বোনকে অপহরণ এর মতো অনেক ঘটনা এদেশে ঘটেছে। প্রাক্তনের উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য অনেকে অন্য মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন আর হয়রানিও শুরু করে।
পিছিয়ে নেই মেয়েরাও। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিককে খুন করার মতো ঘটনাও ঘটায় তারা। এই প্রেমের কারণে যে কতো পরিবার শেষ হয়ে যায়, মৃত্যু ঘটে কতো স্বপ্ন, আশা, ভালোবাসার; তার কতোটুকু খবরই বা আমরা রাখি!
শুধু যে ব্রেকআপ বা ঝগড়ার কারণেই প্রেমের সম্পর্ক এমন সহিংস রূপ ধারণ করে, এমন না। সহিংসতা এমনিতেই প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে মারামারি, একে অপরকে শারীরিক নির্যাতন করা, ধর্ষণ করা, ব্ল্যাকমেইল করা, এমনকি খুন করাও খুবই সাধারণ ঘটনা।
বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত তথ্য উপাত্তের হিসেব তেমন একটা রাখা হয় না, তাই আমরা চোখ বুলাবো সুশীল প্রগতিশীলদের 'বেহেশত', অ্যামেরিকার দিকে। দেশব্যাপী জরিপ চালিয়ে অ্যামেরিকার Centers for Disease Control and Prevention Center, ২০১১ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়—প্রায় প্রতি ১০ জনে ১ জন হাইস্কুল স্টুডেন্ট তাদের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের হাতে গত বারো মাসের মধ্যে অন্তত একবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মেয়েদের মধ্যে প্রতি ৫ জনে ১ জন এবং ছেলেদের মধ্যে প্রতি ৭ জনে ১ জন ১১ থেকে ১৭ বছরের বয়সের মধ্যে তাদের সঙ্গী/সঙ্গীনীদের হাতে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুসারে দেখা যাচ্ছে প্রায় প্রতি ৫ জন হাইস্কুল ছাত্রীদের মধ্যে ১ জন তাদের প্রেমিকের দ্বারা শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এছাড়া প্রেমিক বা প্রেমিকার দখল নিয়ে অন্যের সাথে মারামারি, খুনোখুনি, গার্লফ্রেন্ডের আত্মীয়স্বজনের হাতে মারধোর ডালভাতের মতোই সাধারণ ঘটনা।
ভালোবাসার খুব ট্যাশ, তাই না?
প্রেমের সাথে হাত ধরাধরি করে আসে মাদকও। প্রেমে বা ব্রেকআপের ভয়াবহ স্ট্রেস থেকে সাময়িক মুক্তি পাবার জন্য অনেকেই মাদকের শরণাপন্ন হয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সেন্টার অন অ্যাডিকশান অ্যান্ড সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউস-এর চালানো এক গবেষণায় দেখা যায় গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে যে যতো বেশি সময় কাটায় সে ততো বেশি মদ, গাঁজা, বিড়ি সিগারেটের নেশায় পড়ে যায়। অনেকেই হয়তো প্রেম চলার সময় মাদকে আসক্ত হয় না। কিন্তু ব্রেকআপের পর ছ্যাঁকার কষ্ট ভুলতে মাদকে আসক্ত হয়ে যায়। প্রেম পিছু ছাড়লেও মাদক পিছু ছাড়ে না।
স্রেফ এই মাদকই একটা জাতিকে ধ্বংস করে দেবার জন্য যথেষ্ট। জাতির যুবশক্তিকে মাদক একেবারে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেয়ে নিঃশেষ করে দেয়। মাদককে কেন্দ্র করে সমাজে ব্যাপক অপরাধ সংঘটিত হয়। মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য বাবা-মাকে খুন করা, চুরি, ছিনতাই করা, ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবে কাজ করা, মাদকের প্রভাবে ধর্ষণ করা—এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুল হাকিম সরকার বলেন, আমাদের সমাজে ৮০ শতাংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে মাদকের কারণে। সমাজ পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে পারলেই অপরাধ এমনিতেই কমে যাবে।
কেউ হয়তো, এখন আপত্তি তুলতে পারো—
এ ধরনের ঘটনা সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। অনেকেই প্রেম করে দিব্যি সুখে আছে। এমন কোনো কিছুর মুখোমুখি তাদের হতে হয়নি।
হ্যাঁ, একথা সত্য। প্রেম করলেই যে সব ক্ষেত্রে এমন হবে, এটা আমরাও বলছি না। আমরা যা বলছি তা হলো, প্রেমের জন্য এতো দুঃখ, কষ্ট, অপরাধ, ভোগান্তি, এতো ধ্বংস—তবু কেন সবসময় প্রেমকে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি ও সুখের পথ হিসেবে দেখানো হয়? কেন আমাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় প্রেম পবিত্র, প্রেম মহান, প্রেম স্বর্গ থেকে আসা? কেন মিডিয়া থেকে শুরু করে আমাদের সুশীল প্রগতিশীলরা সারাদিন এরই গুণকীর্তন করে যায়, কিন্তু এই কথাগুলো আমাদের বলে না? তোমাদেরকে শেখায় না?
একটু ভেবে দেখো তো, কোনো একটা খাবারের কারণে যদি এতোগুলো খারাপ জিনিস ঘটতো, তাহলে কি সেই খাবারটার ব্যাপারে সতর্ক করা হতো না? সেই খাবারের প্যাকেটে বড় বড় অক্ষরে সতকর্তাবাণী লেখা থাকতো না, যেমনটা লেখা থাকে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে? কোনো একটা কাজের কারণে যদি এতো এতো নেতিবাচক ফল আসতো তাহলে সেই কাজটার ব্যাপারে কি সতর্ক করা হতো না? কিন্তু প্রেমের ব্যাপারে হয় ঠিক উল্টোটা।
বিষয়টা অদ্ভুত না?
টিকাঃ
[৮৩] যেভাবে রসু খাঁ সিরিয়াল কিলার, বাংলাদেশ জার্নাল, মার্চ ৬, ২০১৮- tinyurl.com/59n2rzs6 প্রেমে ব্যর্থ সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ'র ফাঁসি, সংবাদবিডি- tinyurl.com/54n5bbeu
[৮৪] প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আড়ং এর নারীকর্মীদের গোপন ভিডিও ধারণ করতেন সজীব, সময় নিউজ, জানুয়ারি ১৮,২০২০- tinyurl.com/ycyzyxch বিয়ে না করায় প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ছাড়লেন প্রেমিক, বাংলাভিশন, মার্চ ২৭, ২০২২- tinyurl.com/nc9dz3sz বড়বোনের সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ছোট বোনকে অপহরণ! Somoy TV ইউটিউব ভিডিও, Aug ১৯, ২০২২-tinyurl.com/5b97kytb
[৮৫] রাঙ্গুনিয়ায় প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এসিড ছুঁড়ে ঝলসে দিল প্রেমিকার শরীর, প্রেমিক গ্রেপ্তার, aazkaalbangla.com, মে ৮, ২০২২ - tinyurl.com/522s5spj প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বন্ধুকে হত্যা, রাইজিংবিডি.কম, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২২- tinyurl.com/yup777tu প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ের কথা, তরুণীকে মেরে নিজেকেও শেষ করল প্রেমিক, ঢাকা পোস্ট, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২২- tinyurl.com/mrxuynrz
[৮৬] প্রেমিকাকে নির্মমভাবে হত্যা করলো প্রেমিক, লোমহর্ষক বর্ণনা | Sanjida Murder, Jamuna TV ইউটিউব ভিডিও, Aug ১৭, ২০২২- tinyurl.com/46u6tzwx
[৮৭] Youth Risk Behavior Surveillance - United States, 2011, Center for Disease Control and Prevention, June 8, 2012 - tinyurl.com/cz42nacm
[৮৮] এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই জরিপে দেখা যায় নারীরা প্রেমের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় ব্যাপক মাত্রায় সহিংসতা প্রকাশ করে।
The Sexual Assault Statistics Everyone Should Know, campussafetymagazine. com, March 05, 2018- tinyurl.com/bdfefeva
[৮৯] মিন্নির দায় স্বীকারের সেই লোমহর্ষক জবানবন্দী!বার্তা২৪.কম, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০- tinyurl.com/bdzkf56d
প্রেমিকা নিয়ে দ্বন্দের জের নীলফামারীতে বন্ধুর ছুরিকাঘাতে শিক্ষার্থী খুন, uttorbangla.com, জুলাই ৪, ২০২০-tinyurl.com/yzu75822
[৯০] Angulski, K., Armstrong, T., & Bouffard, L. A. (2018). The influence of romantic relationships on substance use in emerging adulthood. Journal of Drug Issues, 48(4), 572-589. Consequences of Teen Dating Violence, youth.gov- https://archive.is/B2xkO com/5yx8ytsh
[৯১] The Negative Effects of Teenage Dating, studymoose.com- tinyurl. com/5yx8ytsh
[৯২] ধর্ষণ, খুনসহ অধিকাংশ অপরাধের পেছনেই মাদক, ড. অরূপ রতন চৌধুরী, মানবকণ্ঠ, ডিসেম্বর ০৬, ২০২০- tinyurl.com/3rp6sam7 মাদকের টাকার জন্য মাকে হত্যা করেছে ছেলে, অভিযোগ বাবার, এনটিভি, ০৫ নভেম্বর, ২০২১- tinyurl.com/2p842uea মাদকের টাকা না দেওয়ায় মাকে খুন করলো মেয়ে! দৈনিক ইত্তেফাক, মার্চ ০১, ২০২১- tinyurl.com/38ycvxvu
[৯৩] বন্ধুর মাধ্যমেই মাদক জগতে ঢুকছে বেশিরভাগ তরুণ, বাংলা নিউজ২৪, মে ৬, ২০১২- tinyurl.com/yb4992fr
📄 মুখোশ
২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি রাত দুইটার সময় চট্টগ্রামের ওলি আহমেদ কলোনিতে রহস্যময় নড়াচড়া দেখা গেল। আলো আঁধারিতে নিঃশব্দ সতর্কতায় সারি বেঁধে হেঁটে যেতে দেখা গেল একদল মানুষকে। রাত আড়াইটায় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেল উর্দি পরা লোকগুলো। আগে থেকেই ব্রিফ করা ছিল কার কী দায়িত্ব, সংক্ষিপ্ত সময়ে মিশন শেষ করে ফেললো তারা। ওপক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিরোধই এলো না। জব্দের তালিকায় উঠলো দেশে তৈরি একটা শর্ট রাইফেল, গুলি, লোহার চেইন, চাকু, ৪টি মোবাইল সেট এবং নগদ ৫ হাজার টাকা। সেই সাথে হাতকড়া পড়লো ৬ জন মানুষের হাতে, যাদের মধ্যে ৫ জনই নারী। বয়স ২০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে যারা গড়ে তুলেছিল অনলাইন মধুচক্র। অনলাইন চ্যাটিং অ্যাপস ও সামাজিক মাধ্যমে প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক গড়তো তারা। পরে বাসায় ডেকে এনে নগ্ন ছবি তুলতো। বিশাল অঙ্কের টাকা দাবি করে ব্ল্যাকমেইল করতো।
প্রেমে পড়ার বড় একটা মাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো। স্কুল কলেজের কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে চল্লিশোর্ধ মধ্যবয়সীরাও আজ প্রেম খুঁজছে এবং খুঁজে পাচ্ছে ডিজিটাল জগতে। সেই সাথে মুখোমুখি হচ্ছে নানা হয়রানির, জড়িয়ে পড়ছে কেলেঙ্কারিতে।
ফেসবুকে প্রেম তারপর...
বাসায় ডেকে প্রেমিককে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ। দুই সন্তানের মায়ের সঙ্গে স্কুলছাত্রীর বিয়ে! চলন্ত ট্রেনে তরুণী ধর্ষণ। অপহরণ, মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা। দলবদ্ধ ধর্ষণ। সর্বনাশা পরিণতি।
এরকম অসংখ্য সংবাদ রোজকার পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই দেখা যায়। অনলাইনে প্রেমে জড়িয়ে কতো মানুষকে যে চরম মাশুল গুণতে হয়, তার ইয়ত্তা নেই। টাকাপয়সা, ধনসম্পদ, মানসম্মানের পাশাপাশি অনেকে জীবনটাও হারায়। বাস্তব জীবনে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের পাশাপাশি ব্যাপক আকারে অনলাইন যৌন নির্যাতনের শিকার হয় অনেকেই।
এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ জগৎটাই আসলে ফেইক। মিথ্যা, প্রতারণা আর ছলনায় ভরা। কেউ কাউকে সামনাসামনি দেখতে পারে না, খুব সহজেই অন্যজনের ছবি আর ভুয়া তথ্য দিয়ে ছদ্মবেশ ধরা যায়। ছেলে সাজা যায়, মেয়ে সেজে মেয়ের সাথে প্রেম করা যায়। ক্রমাগত ভাব মারা, রঙঢঙ এর ছবি দিয়ে খুব সহজেই একটা ফেইক পারসোনালিটি ধারণ করা যায়। ইসলামিক পোস্ট শেয়ার করে দ্বীনি ভাই, দ্বীনি বোন সাজা যায়, বাস্তব জীবনে জায়েদ খান হয়ে সালমান খানের ভাব ধরা যায়, টিনা-মিনা- রিনারাও বিশ্ব সুন্দরী সেজে থাকতে পারে—কেউ বুঝতেও পারে না। এই জগতে করা সম্পর্কে প্রতারণা হবে না, ব্ল্যাকমেইল হবে না, তো কোথায় হবে বলো?
আর এই অন্ধকারে গিলে খাবার জগৎটাতেই তোমার আনাগোনা... কালচাড়াল এলিট, মিডিয়াসাহা আর নব্য মিশনারীদের ক্রমাগত প্রোপাগ্যান্ডার ফলে জীবনের অর্থ খুঁজতে তুমি হাজির হও প্রেমের খোঁজে। নানান জাতের, নানান রঙের, নানান বয়সের, গর্জিয়াস কিংবা সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস মানুষের সাথে অতি সহজেই অনলাইনে যোগাযোগ করা যায়। বাস্তব জীবনে যার সামনে দাঁড়িয়ে একটা কথা বলতে হবে—এমনটা ভাবলেই হাঁটু কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়, তার সাথেও এখানে হিরোগিরি করা যায়। নিজের পরিচয় গোপন করে সেক্স চ্যাট, ন্যুডস আদান প্রদান করে যৌনসুখ পাওয়া যায়। তাই প্রতারিত হবার চান্স আছে জেনেও, ঐপাশের আইডিটা ফেইক হতে পারে জেনেও, তোমার খোঁজ, দ্যা সার্চ মিশন চলতেই থাকে।
পুরো প্রক্রিয়াটা একবার চিন্তা করো—একের পর এক প্রোফাইল ঘেঁটে যাচ্ছো তুমি। যাকে একটু ভালো লাগছে, যার কাছ থেকে রিপ্লাই পাবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে তাকেই নক করছো। প্রত্যেকটা ছবিতে লাভ রিয়্যাক্ট দিচ্ছো। 'এই মেয়ে তুমি এতো সুন্দর কেন, এতো সুন্দর হয়ে আমাকে কষ্ট দিয়ে তুমি যে পাপ করছো সেই পাপে জাহান্নামে চলে যেতে পারো জানো?'—এই টাইপের কমেন্ট করছো। মেসেজ দেওয়ার পর সেই মেসেজের রিপ্লাই আসলো কি না, তা ভেবে একটু পর পর ইনবক্স চেক করছো। মেসেজের রিপ্লাই আসলে আরো ব্যাপক উৎসাহে কথাবার্তা চালিয়ে নিচ্ছো, তাকে ইম্প্রেস করার জন্য মাথা খাটিয়ে মিথ্যার ডালি সাজাচ্ছ...
চিন্তা করো কী বিপুল পরিমাণ সময় নষ্ট, কী লজ্জাজনক, আত্মমর্যাদাহীন আচরণ! কারো আত্মসম্মান থাকলে সে যার তার ইনবক্সে এভাবে হামলে পড়তে পারে না, না বলার পরেও ছ্যাঁচড়ার মতো বারবার বিরক্ত করতে পারে না। এমন কাজ করার মাধ্যমে তুমি প্রথমেই তোমার আত্মসম্মান নষ্ট করে ফেলছো। অন্যের কাছে নিজেকে ছোট করছো।
অনলাইনে প্রচুর পরিমাণে সময় কাটানো আর প্রচুর মেয়ে/ছেলের টাইমলাইনে ঘোরাঘুরি করার কারণে তোমার মধ্যে সবসময় একটা অস্থিরতা, একটা অশান্তি কাজ করবে। তুমি হীনম্মন্যতায় ভুগবে। অনলাইনে সবাই জীবনের একটা সিলেক্টিভ অংশ রঙচঙ লাগিয়ে উপস্থাপন করে। জীবন যেমন সেভাবে সেটাকে মানুষ অনলাইনে তুলে ধরে না। সে অনলাইনে ঐ জীবনকে তুলে ধরার চেষ্টা করে যেমন জীবন সে চায়। অনলাইনে মানুষ এক ধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি করে। সবাই প্রত্যেকদিন দামী রেস্তোরায় খেতে যায় না, গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ট্যুর দেয় না—কিন্তু অনলাইনে ছবি, আপডেট ভিডিও দিয়ে এমন ভাব মারে মনে হয় যে সে রোজ রোজ ট্যুর দিচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে ময়লা নিয়ে, লুঙ্গি-স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে এলোচুলের ছবি মানুষ আপলোড করে না। মানুষ সেজেগুজে মেকআপ করে, মাঞ্জা মেরে, ছবি তুলে সেটাকে নানা ফিল্টারে এডিট করে তারপর ছবি আপলোড করে।
আর সেই ছবি দেখে তুমি ভাবো ওরা আসলেই কতো সুন্দর, কতো স্মার্ট, হ্যান্ডসাম আর আমি একটা ক্ষ্যাত! ওদের জীবনটা কতো অসাধারণ, আমার জীবনটা কতো বোরিং। এভাবে শুরু হয় হীনমন্যতা, হতাশা, নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে তুচ্ছ ভাবা, মানসিক অশান্তি, অস্থিরতা। হৃদয়ে জমে বিষকাঁটা। ছোট ছোট সুখগুলোও তখন চলে যায় দিগন্ত পেরিয়ে।
কিন্তু নিজের এতো ক্ষতি করার পর রিলেশন করতে পারলেও এই অনলাইন রিলেশন বেশিদিন টেকে না। খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষে অনেকেই সপ্তাহে সপ্তাহে গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড পাল্টায়। সকালে একজনকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না বলে মেসেজ দেয়, তো বিকেলে তাকে ব্লক করে আরেকজনকে মেসেজে বলে, তাকে না পেলে সে মরেই যাবে! রাতে আবার অন্য একজনের সাথে তাদের প্রথম বাবুর নাম কী হবে তা নিয়ে খুনসুটি করে। গবেষণাও সেইম কথা বলে।
রিলেশন টিকে গিয়ে কোনোমতে বিয়ে পর্যন্ত গড়ালেও বিচ্ছেদ হতে সময় লাগে না। যুক্তরাজ্যের ম্যারেজ ফাউন্ডেশন দু'হাজার দম্পতিকে নিয়ে গবেষণার পর বললো, অনলাইনে প্রেমের পর বিয়ে করা দম্পতিদের মধ্যে বিয়ের ৩ বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদের হার ছয় গুণ বেশি! এমনকি বিয়ে যদি ৭ বছর পর্যন্ত টিকেও যায় তারপরও অনলাইন দম্পতিদের মধ্যে ডিভোর্সের হার অফলাইন দম্পতিদের তুলনায় দেড়গুণের চেয়েও বেশি!
যে সম্পর্ক একেবারেই ভঙ্গুর, যে সম্পর্কের ভিত্তি হলো মিথ্যে আর ফ্যান্টাসি, যেখানে বিয়ে হবার চান্স খুবই কম, বিয়ে হলেও বিচ্ছেদের সম্ভাবনাই অনেক বেশি—সেই সম্পর্ক গড়ার জন্য তোমার কেন এতো আগ্রহ? জীবন যৌবন সময় সব ব্যয় করে, নিজের আত্মসম্মান নষ্ট করে কেন যাকে তাকে মেসেজ দিয়ে বেড়াও? ক্ষণিকের যৌনসুখ, 'মজা নেওয়া' ছাড়া এই প্রশ্নগুলোর আর কোনো উত্তর কী আসলে আছে?
এই সস্তা সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে তুমি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছো, জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছো, নিজেকে অপমানিত এবং কলুষিত করছো—এটা কেন বুঝতে পারছো না?
এভাবে মরীচিকার পেছনে ছুটে কী লাভ হলো তোমার? ঠাণ্ডা মাথায় একবার পেছন ফিরে দেখো—কতোবার তোমার শান্ত, নিরুপদ্রব জীবন ছারখার হয়ে গিয়েছে! দীর্ঘ নির্ঘুম রাত, একলা শুকতারা, নিকোটিনের ধোঁয়া, পুরোনো ইনবক্স, গভীর দীর্ঘশ্বাস, ঝাঁকড়া চুল, শূন্য মানিব্যাগ, শূন্য পরীক্ষার খাতা, চিড় ধরা ভ্রাতৃত্বের মতো বন্ধুত্ব, মায়ের চোখের জল, বাবার ভীষণ আক্ষেপ। টেনশান, অস্থিরতা আর উদ্বিগ্নতায় কাটানো কত দিন, কত রাত। নিজের সঙ্গে একটু সৎ হও। সত্যি করে বলো তো আসলেই কী সুখ পেয়েছো? জীবনের এই লেনদেনে তুমি কি জিততে পেরেছো?
টিকাঃ
[৯৪] অনলাইনে প্রেমের ফাঁদ, ৫ নারীর মধুচক্র ইপিজেডে, চট্টগ্রাম প্রতিদিন, জানুয়ারী ২২, ২০২০- tinyurl.com/4fs2u9x8
[৯৫] ফেসবুকে প্রেম, বাসায় ডেকে প্রেমিককে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ, আরটিভি নিউজ, আগস্ট ২১, ২০২২-tinyurl.com/548vjjvx
[৯৬] ফেসবুকে প্রেম, দুই সন্তানের মায়ের সঙ্গে স্কুলছাত্রের বিয়ে! dhakapost.com, জুলাই ২৪, ২০২২- tinyurl.com/mrx8m5ub
[৯৭] ফেসবুকে প্রেমের পরিণতি, চলন্ত ট্রেনে তরুণী ধর্ষণ, প্রতিদিনের সংবাদ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২০- tinyurl.com/5dbvfjfr
[৯৮] অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ, মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা, প্রবাসীর দিগন্ত, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২- tinyurl.com/4cuhnbyp
[৯৯] অনলাইনে প্রেম, অতঃপর দলবদ্ধ ধর্ষণ, starsangbad.com, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২- tinyurl.com/cbpjjs6b
[১০০] ফেসবুকে পরিচয়, প্রেম, অতঃপর সর্বনাশা পরিণতি, Prothom Alo ইউটিউব ভিডিও, Dec ৫, ২০১৮- tinyurl.com/2w6ksxrv
[১০১] বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে অনলাইন প্রেমে যৌন হেনস্থা হবার হার অনেক অনেক বেশী, The Darkest Side Of Online Dating, BBC News-tinyurl.com/mrxm9x73
[১০২] এগুলোর স্ক্রিনশট ফাঁস হয়ে গেলে তোমার অবস্থা কী হবে একবার ভাবো তো। এগুলোর কারণে অনেকেই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়। হ্যাকাররাও সুযোগ কাজে লাগাতে দ্বিধাবোধ করে না।
[১০৩] Instagram Is Ruining Your Self Esteem and You May Not Even Be Aware, saseye.com, June 8, 2020-tinyurl.com/2funb67u
[১০৪] Online Dating and Its Effects on Mental Health, thriveglobal.com- tinyurl. com/y26pzx3a
Facebook has known for a year and a half that Instagram is bad for teens despite claiming otherwise - theconversation.com, September 16, 2021- tinyurl.com/z9ntjz6j
[১০৫] Kee, A. W. A., & Yazdanifard, R. (2015). The review of the ugly truth and negative aspects of online dating. Global Journal of Management and Business Research.
[১০৬] Couples who meet online are 'six times more likely to get divorced, metro. co.uk, Nov 1, 2021- tinyurl.com/ya588v2p