📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 সখী ভালোবাসা কারে কয়?

📄 সখী ভালোবাসা কারে কয়?


ধরো, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে ক্লাস শেষে ফিরছিলে ঘরে। মন এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত। হঠাৎ রাস্তার অপর পাশের ফুটপাতের একটা দৃশ্য দেখে কৌতূহলী হয়ে গেলে। মাথায় সবুজ ওড়না দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক অষ্টাদশী। বৃদ্ধা এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইলো তার কাছে। স্নিগ্ধ একটা হাসি ফুটে উঠলো অষ্টাদশীর মুখে। কিন্তু অতলান্ত দুই চোখে বেদনার, সহানুভূতির ছাপ স্পষ্ট। পার্স থেকে ১০ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিলো বৃদ্ধার দিকে। তার সবুজ ওড়না, হাসি, তাকানো, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা সবকিছু মুগ্ধ করলো তোমাকে। তুমি ভাবলে-হ্যাঁ, একেই তো আমি খুঁজছিলাম এতোদিন! সে-ই আমার জন্য একদম পারফেক্ট। তোমার এই অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়-Love at first Sight বলে। প্রথম দেখায় প্রেম। কিন্তু এটাই কি ভালোবাসা?

রবি ঠাকুর বহু বছর আগে প্রশ্ন করেছিল ভালোবাসা কাকে বলে? প্রশ্নটা এখনো প্রাসঙ্গিক। চারদিক আজ ভালোবাসায় সয়লাব। ভালোবাসার বাম্পার ফলনে এমন অবস্থা যে রাস্তাঘাটে বিশেষ দিবসগুলোতে চোখ তুলে তাকানো যায় না। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো প্রেম না করলে, ভালোবাসার একটা মানুষ না থাকলে অন্যদের ক্ষ্যাত, ব্যাকডেইটেড মনে করা এই আমরা আসলে ভালোবাসার সংজ্ঞাটাই জানি না!

এর পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। সিনেমা, নাটক, সাহিত্য, মিডিয়া'র ব্রেইনওয়াশিং আছে, নষ্ট সভ্যতার নষ্ট দর্শনের প্রভাব আছে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লাভক্ষতির হিসেব আছে, সুশীল-প্রগতিশীল গোষ্ঠী, এককথায় সাংস্কৃতিক জমিদারদের ধোঁকাবাজি আছে, আছে ভাষার সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচে। ঘটা করে ভালোবাসা সাংস্কৃতিক জমিদাররা তোমাকে শেখাবে না ভালোবাসার সংজ্ঞা। তোমরা যে প্রেম করছো, জীবন দিয়ে দিচ্ছো, ক্যারিয়ার নষ্ট করছো, পরিবার, সমাজ ও জাতির বোঝা হচ্ছো-সরি টু সে, সেগুলো ভালোবাসা না। সেগুলো স্রেফ মোহ বা দৈহিক আকর্ষণ (lust-কামনা)। যদি তোমরা জানতে, যেই ছেলেগুলো প্রেমাতাল হয়ে জীবন নষ্ট করছে, যেই মেয়েগুলো ভালোবাসার প্রমাণ দেবার জন্য বরিশালের লঞ্চের কেবিনে উঠছে-তারা যদি জানতো, তাহলে এভাবে তারুণ্যের অপচয় হতো না, এভাবে বিষাদ সাগরে হাবুডুবু খেতো না পুরো একটা প্রজন্ম, ডুবতে থাকতো না পুরো একটা জাতি। অবস্থানের কারণে পুরো একটা সভ্যতা!

ভালোবাসার সাথে যে দুইটি জিনিস সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে ফেলা হয় তা হলো মোহ (infatuation) এবং কামনা (lust)। বাঁচতে হলে ভালোবাসা, মোহ এবং কামনা/দৈহিক আকর্ষণ-এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত ভালোমতো বুঝতে হবে। তাহলে এসো দেখে নেওয়া যাক, এই বিষয়গুলোর মধ্যে পার্থক্যগুলো কী কী।

মোহ: ড. লরেন ফৌগল মারসি একজন মনোবিজ্ঞানী এবং সেক্স থেরাপিস্ট। তার মতে মোহ হলো-কাউকে ভালোমতো না জেনেই তার প্রতি তীব্র আকর্ষণ, মুগ্ধতার অনুভূতি। এই অনুভূতি খুবই তীব্র হয়। কিন্তু এর পুরোটাই শারীরিক আকর্ষণ এবং সেই ব্যক্তিকে নিয়ে নিজের করা কাল্পনিক ফ্যান্টাসির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে।

গ্রেইস সা, একজন লাইসেন্সড হেলথ কাউন্সেলর। তার মতে, কোনো একজন ব্যক্তির সাথে দেখা হবার পর খুব দ্রুতই মোহ তৈরি হয়ে যেতে পারে। প্রথমবারের মতো দেখা হয়েছে, কিন্তু মনে হতে পারে-যাক, অবশেষে আমি তাকে খুঁজে পেলাম। কারো শরীর, চুল, চোখ, হাসি, কোনো নির্দিষ্ট আচার-আচরণ, কথাবার্তার স্টাইল, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চেহারা... যেকোনো কিছু দেখেই মানুষ একদম নিমিষেই, প্রথম দেখাতেই তার মোহে পড়ে যেতে পারে। মোহের তীব্রতা বেশি হলেও এটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এবং রঙ্গমঞ্চে অন্য মানুষ চলে আসলে আগেরজনকে বাদ দিয়ে মোহের অনুভূতিগুলো তার দিকে চলে যায়। মোহের এই তীব্র অনুভূতির কারণে অনেকেই এটাকে ভালোবাসার সাথে গুলিয়ে ফেলে। মোহে হাবুডুবু খেয়ে ভাবে, আমি তাকে ভালোবাসি।

বিশেষজ্ঞদের মতে মোহের কিছু লক্ষণ:
১। তুমি সবসময় তার কথা ভাবো। তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ো।
২। তার সাথে বাস্তবে তেমন কোনো ইন্টার্যাকশন হয়নি। কথাবার্তাও তেমন হয়নি।
৩। তুমি মনে করো রূপেগুণে, চরিত্রে সে একদম পারফেক্ট একজন মানুষ।
৪। তুমি মনে করো সে তোমার জন্য একদম পারফেক্ট ম্যাচ, তোমার আদর্শ জীবনসাথী।
৫। তার প্রতি তীব্র শারীরিক আকর্ষণ বোধ করো। এই দৈহিক আকর্ষণের কারণে তুমি তার সম্পর্কে অন্য জিনিসগুলো (তার ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, গুণ) জানার ব্যাপারে মনোযোগ দিতে পারো না। বা দাও না।
৬। তার পাবলিক জীবন সম্পর্কে টুকটাক কিছু জানলেও ব্যক্তিগত জীবনে সে কেমন, তা নিয়ে তোমার তেমন কোনো জানাশোনা নেই। তুমি যা জানো তার বেশির ভাগই তার পোশাক-আশাক, মানুষের সঙ্গে তার আচরণ ইত্যাদি দেখে ধারণা করা। আর যেগুলো জানো সেগুলোও বিশেষ কিছু না।
৭। দূর থেকে দেখে তুমি তাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করো, তার সাথে কোথায় ঘুরতে যাবে, কীভাবে সময় কাটাবে ইত্যাদি।
৮। যদি সে তোমার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে তাহলে তুমি একটু অসন্তুষ্ট হও।
৯। তার ভুল ত্রুটি কোনো কিছু কেউ দেখিয়ে দিলেও তুমি সেগুলোকে পাত্তা দাও না, কারণ সেগুলো তাকে নিয়ে তোমার ফ্যান্টাসির সাথে যায় না।
১০। তাকে মুগ্ধ করার জন্য তোমার চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না।
১১। তার প্রতি তুমি খুবই দ্রুত দুর্বল হয়ে যাবে। অনুভূতি হবে অত্যন্ত তীব্র। তুমি সবসময় তার সাথে সময় কাটাতে চাও। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, কাজকর্মের ভয়ংকর ক্ষতি হলেও কুছ পরোয়া নেহি!
১২। সবকিছু অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হবে। তুমি অস্থিরতায় ভুগবে। ঠিকমতো খেতে পারবে না, ঘুমাতে পারবে না। কোন কাজ করতে পারবে না। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তুমি রিলেশনশিপের চূড়ান্ত রূপ দেখতে চাইবে।

ভালোবাসা: ভালোবাসা হলো কারো প্রতি মায়ামমতা, অন্তরঙ্গতা আর দায়বদ্ধতার মিশেলে তৈরি হওয়া তীব্র শক্তিশালী এক অনুভূতি। ভালোবাসা আসতে কিছুটা সময় লাগে। তবে মোহের মতো এটা খুব দ্রুতই হয়ে যায় না।
হ্যাইলি নেইডিক, একজন সাইকোথেরাপিস্ট এবং রিলেশনশিপ এক্সপার্ট। তার মতে, ভালোবাসা হলো নিরাপত্তা, সম্মান, শ্রদ্ধা ও প্রশংসার এক অনুভূতি। একটা বন্ধনের মধ্যে দায়বদ্ধ এবং নিরাপদ থাকার অনুভূতি।

সিমৌন হামফ্রি ও সিনা সাইমন মনোবিজ্ঞানী এবং নিউইয়র্ক সিটি ভিত্তিক কাপল থেরাপিস্ট। ভালোবাসার সংজ্ঞা পাওয়া যাচ্ছে তাদের কাছে এভাবে—ভালোবাসা হলো মানুষের সেই মৌলিক চাহিদা যা তাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সাথে একটা বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। ভালোবাসার বন্ধনে থাকে তীব্র মায়ামমতা, বিশ্বাস আর সেই মানুষকে তার সকল দুর্বলতা, অপূর্ণতাসহ গ্রহণ করে নেওয়া। রিলেশনশিপ এক্সপার্ট অ্যালেক্স্যান্ড্রা স্টকওয়েল, সিমৌন হামফ্রি, সিনা সাইমন ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে মোহ এবং ভালোবাসার মধ্যে কিছু পার্থক্য।

মোহ/ভালোলাগা: সে আশেপাশে আসলে তুমি নার্ভাস হয়ে যাবে। মন চঞ্চল, অস্থির হয়ে যাবে। তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে, তোমার পোশাক-আশাক, চুল ইত্যাদির ব্যাপারে সচেতন হয়ে যাবে। তার সামনে সেজেগুজে যাবে সবসময়। তাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করবে, মিথ্যার ভান ধরে হলেও। তার সামনে হিরো সাজবে। তার সাথে শুদ্ধ ভাষায়, স্টাইল করে, ঢং করে, ন্যাকামি করে মাঝে মাঝে দুই একটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলবে। আপনার বাবা-মা পরিবার যদি তথাকথিত স্মার্ট না হয়, তাহলে তাদের নিয়ে তার সামনে হীনম্মন্যতায় ভুগবে। তাদেরকে সেই মানুষটার কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চাইবে। আপনার মধ্যে সবসময় একটা অস্থিরতা কাজ করবে। আপনার ভুলত্রুটি, কমতি, দোষ, দুর্বলতা এগুলো গোপন করে তার সামনে নিজের বাকী অংশ দেখাও—যে বাকী অংশ সবসময় সুন্দর পোশাক-আশাক পরে, স্মার্টভাবে চলাফেরা করে। সে তোমাকে ছেড়ে অন্য মানুষের কাছে চলে যেতে পারে এই ভয়ে থাকো তুমি। তাই তার জন্য তার মনমতো পারফেক্ট হতে চাও। এমনকি প্রতারণা করে, মিথ্যা বলে ভান ধরে হলেও।

ভালোবাসা: সেই মানুষটা পাশে থাকলে তুমি শান্তিবোধ করবে। মন শান্ত হবে। স্নিগ্ধ, শান্ত, নিরাপদ, আরামদায়ক, উষ্ণ এক অভিজ্ঞতা হবে তোমার। তোমার তুমিটাকে তার কাছ থেকে লুকানোর কোনো চেষ্টা করবে না। পারফেক্ট সাজার ভান করবে না। তোমার শক্তি, তোমার দুর্বলতা সবই সে জানে। তোমার দোষ লুকানোর চেষ্টা করবে না। মিথ্যা কথা বলে, ভান ধরে তার সামনে হিরো সাজতে যাবে না। তার সামনে হীনম্মন্যতায় ভুগবে না।

মোহ/ভালোলাগা: তার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা লাগবে, ডেটিং-এ নিয়ে যাওয়া লাগবে, গিফট দেওয়া লাগবে... না হলে তাকে হারানোর ভয় করবে।

ভালোবাসা: কিছুটা সময় দিলেই হবে। কাজকর্ম, পড়াশোনা, সবকিছুর ক্ষতি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত সময় দেবার দরকার পড়বে না। তাকে দামি গিফট কিনে না দিলে বা ঘনঘন ঘুরতে না নিয়ে গেলেই সে তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে, এমন ভয় থাকবে না।

মোহ/ভালোলাগা: মোহের ঘোরলাগা চোখে সাধারণত দুর্বলতা, কমতি চোখে পড়ে না। ওকে সম্পূর্ণ পারফেক্ট একজন মানুষ মনে হয় তোমার। যার কোনো ভুল নেই। ওকে মনে করো রূপকথার পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসা রাজকুমার। অথবা মনে হয় সকল মানবিক দোষত্রুটি মুক্ত প্রাচীন রহস্যঘেরা কোনো নগরী থেকে আসা ডানাকাটা পরী!

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ২০০৪ সালে একটি গবেষণা চালিয়ে দেখলো—হ্যাঁ, যা বলা হয় তা-ই সত্য। প্রেম আসলে অন্ধই। প্রেমে পড়া প্রেমিক/প্রেমিকারা চোখে দেখতে পায় না। কোনো কারণে যদি পর্দার ওপাশের এই জগৎটা তুমি জেনে ফেলো তাহলে তুমি তার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলবে। তাকে আর আগের মতো আকর্ষণীয় মনে হবে না। সম্পর্ক চালিয়ে নেবার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ পাবে না। সবার সামনে নাক খোঁটানো, জোরে জোরে নাকের সর্দি টানা, ঘুমের ঘোরে নাক ডাকা... এমন ছোট ছোট বদঅভ্যাসও একে অপরের প্রতি মোহ দূর করে দেয়। আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।

ভালোবাসা: তার দুর্বলতা, কমতি, অপূর্ণতা দেখে তুমি তার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলবে না। বরং এসব গ্রহণ করে নিয়েই তার সাথে দিন কাটাবে। তাকে ভালোবাসবে।

মোহ/ভালোলাগা: সেই মানুষটার প্রতি নয়, বরং তোমার আকর্ষণের পুরোটাই হবে শরীর ও চেহারা কেন্দ্রিক। তার চেহারা, চুল, চোখ আর ঠোঁট, তার শরীর, তার পোশাক, তার কথা বলার স্টাইল, তার কণ্ঠস্বর... এসব থাকবে তোমার মনোযোগের কেন্দ্রে। যদি তার চুল পড়ে যায়, চেহারা খারাপ হয়ে যায়, যদি মুটিয়ে যায়, যদি ফিগার নষ্ট হয়ে যায়, যদি সুন্দর করে সেজেগুজে না থাকে, তাহলে তুমি তার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলবে। তুমি সবসময় তাকে সুন্দর সুন্দর পোশাকে সেজেগুজে থাকা অবস্থায় দেখো, কোনো কারণে তাকে সাধারণ পোশাকে, সাজগোজবিহীন অবস্থায় দেখলে আকর্ষণ কমে যাবে।

ভালোবাসা: ভালোবাসা শুধু শরীর কেন্দ্রিক না। ভালোবাসা সেই মানুষটার চেহারা বা পোশাক কেন্দ্রিকও না। তার চেহারা নষ্ট হয়ে গেলেও, তার মাথার চুল পড়ে গেলেও, সে মোটা ধুমসি হয়ে গেলেও, আগের মতো 'হট' না লাগলেও তুমি তাকে ভালোবাসবে। সুন্দর পোশাকে সাজগোজ করা অবস্থায় তুমি তাকে যেমন ভালোবাসবে, তেমনি কালিঝুলি মাখা নোংরা পোশাকে, গা বা মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসা অবস্থাতেও তুমি তাকে ভালোবাসবে। কারণ তুমি তার চেহারা বা শরীরটাকে নয় বরং সেই মানুষটাকে, তার আত্মাকে ভালোবেসেছো।

মোহ/ভালোলাগা: তার কোনো আচরণ বা কোনো ভুল চোখে পড়লেও সে কী মনে করবে, বা ব্রেকআপ করে ফেলবে কি না, এই ভেবে তুমি তার ভুল সংশোধনের চেষ্টা করো না। ধরো সে রিকশাওয়ালার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। তোমার এটা ভালো লাগে না। কিন্তু তুমি ভয়ে বলতেও পারো না, কারণ কিছু বললে হয়তো সে তোমার সাথে সম্পর্কের ইতি ঘটাবে।

ভালোবাসা: তার ভুল ধরিয়ে দেবে। সে কী মনে করবে, এটা চিন্তা না করে তাকে সংশোধন করে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইবে। কারণ তুমি তাকে ভালোবাসো।

মোহ/ভালোলাগা: তুমি তার প্রতি তীব্র আকর্ষণবোধ করো। কারণ তুমি ভাবো সে পারফেক্ট। মাথার মধ্যে তুমি তার একটা পারফেক্ট ইমেজ বানিয়ে নিয়েছো। ঠিক তুমি যেমন চাও সে তেমনই। তোমার স্বপ্নের রাজকন্যা বা রাজকুমার। এটা বিশ্বাস করেই তুমি দিনের পর দিন পার করে দাও। সে আসলেই তেমন কিছু কি না, তা যাচাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করো না।

ভালোবাসা: তুমি জানো, তুমি বোঝো সে একজন মানুষ। তার পক্ষে পারফেক্ট হওয়া সম্ভব না। তার কমতি আছে। তুমি সেগুলো গ্রহণ করে নিয়েছো।

মোহ/ভালোলাগা: যতোই কাছাকাছি হবে, যতোই একে অপরকে বেশি করে জানবে, তোমাদের মধ্যকার আকর্ষণ ততোই কমতে থাকবে। প্রথমদিকে সে ছিল একটা রহস্যের মতো। কিন্তু আস্তে আস্তে রহস্যের উন্মোচন হয়ে যাওয়ায় সেই প্রথম দিককার মতো উত্তেজনা, রোমাঞ্চকর অনুভূতি আর থাকবে না।

ভালোবাসা: দিন যতো যেতে থাকবে, বন্ধন ততো মজবুত হবে।

মোহ/ভালোলাগা: সে তোমার উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সবসময় তোমার সঙ্গ পেতে চাইবে। তোমার কষ্ট বা ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখবে না। ধরো, তুমি পড়াশোনা বা কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরেছো। প্রচুর বিশ্রাম দরকার। কিন্তু সারাদিন কেন তুমি তার খোঁজ নিলে না, এটা নিয়েই সে তোমাকে প্যারা দেবে। তোমার ক্লান্তি নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যাথা থাকবে না। অথবা ধরো, পরীক্ষার আগের রাতে হুট করে তুচ্ছ কারণে সে তোমার সাথে ঝগড়া করবে। অভিমান করে থাকবে। আপনার যে পরীক্ষা আগামীকাল, এটা তার মাথাতে থাকবে না। হুটহাট করে গিফটের আবদার করবে বা দামি রেস্টুরেন্টের বিলের দায় তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে।

ভালোবাসা: সে তোমার উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। উল্টো অনুপ্রেরণা দেবে। সাহস যোগাবে। সে সুখ পাচ্ছে কিনা এটার চাইতে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে সে তোমাকে সুখী করতে পারছে কিনা। তোমার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখবে। কোনো কথা বলা বা কোনো কাজ করার আগে বা পরে চিন্তা করবে এটা করলে তোমার কষ্ট হবে না তো, তোমার ক্ষতি হবে না তো? কোনো কিছু চাইবার আগে মাথায় রাখবে সেটা পূরণ করার সামর্থ্য তোমার আসলেই আছে কিনা।
খুব সুন্দর একটা উক্তি আছে—তোমার যখন কোনো ফুল ভালো লাগবে, তুমি তাকে ছিঁড়ে নেবে। যখন তুমি ফুলকে ভালোবাসবে, তখন গাছটাতে প্রতিদিন পানি দেবে।

মোহ/ভালোলাগা: অনেকটাই দুধের মাছির মতো। সুসময়ে থাকে। বিপদ-আপদে পাশে থাকে না। তোমার চাইতে বেশি সুন্দরী, বেশি হট, বেশি টাকাপয়সাওয়ালা, বেশি হ্যান্ডসাম কাউকে দেখলে আল্লাহ হাফেয বলতে সময় নেবে না।

ভালোবাসা: শত ঝড়ঝাপ্টা, বিপদ-আপদেও পাশে থাকে, আগলে রাখে, ভেঙে পড়লে অনুপ্রেরণা যোগায়, সাহস যোগায়। বেশি সুন্দরী বা বেশি টাকাপয়সাওয়ালা, হ্যান্ডসাম কাউকে দেখলেই ছেড়ে চলে যায় না।

মোহের মতো আরো একটি বিষয় আছে যাকে ভালোবাসার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। আর তা হচ্ছে কামনা (lust)। কামনা অনেকটা মোহের মতোই। একই মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ আরকি।

কামনা (Lust): কারো প্রতি তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত যৌন আকর্ষণ অনুভব করাই হলো কামনা। সাইকোথেরাপিস্ট এবং রিলেশনশিপ এক্সপার্ট হ্যাইলি নেইডিকের মতে, কামনা হলো কারো প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে শারীরিক ভাবে উত্তেজিত হওয়া। রিলেশনশিপ এক্সপার্ট অ্যালেক্স্যান্ড্রা স্টকওয়েলের মতে কামনার কিছু লক্ষণ—
১। তার কথা মনে পড়া মাত্রই তুমি শরীরের কথা চিন্তা করবে, তার কথা ভাবলে শারীরিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়বে।
২। তাকে দেখা মাত্রই স্পর্শ করতে চাইবে।
৩। শারীরিক ব্যাপারস্যাপার বাদে তার অন্য ব্যাপারগুলোর প্রতি বা তাকে জানার ব্যাপারে তোমার ততোটা আগ্রহ থাকবে না।

কামনার ব্যাপারে স্টকওয়েল আরো বলছেন, এটা এমন এক তীব্র অনুভূতি যা আমাদের চিন্তাচেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বোধ-বিবেচনা হারিয়ে কামনা পূরণ করার জন্য এমন কাজে বাধ্য করতে পারে যা আমাদের স্বাভাবিক বোধ-বিবেচনার বিপরীত।

এই পর্যন্ত পড়ার পর আশা করি কামনা এবং ভালোবাসার মধ্যে মূল পার্থক্যটা তুমি ধরে ফেলেছো। কামনার মূল লক্ষ্যই হলো অন্যের ক্ষতি করে হলেও যে কোনো মূল্যে নিজেকে সুখী করা। ভালোবাসার পুরো বিপরীত।
ভালোবাসার মধ্যেও যে কামনা থাকে না, দৈহিক আকর্ষণ থাকে না—তা না। বরং ভালোবাসার ক্ষেত্রেও দৈহিক আকর্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। দৈহিক আকর্ষণ না থাকলে, অন্তরঙ্গতা না থাকলে ভালোবাসার উপর একটা পলেস্তরা পড়ে যায়। তবে ভালোবাসার কামনা ধ্বংসাত্মক না, স্বার্থপর না, দায়দায়িত্বহীন না। ভালোবাসার কামনা অন্যের অনুভূতিকে, ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে, সম্মান করার কামনা। এই কামনা পূরণ হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় না। ভালোবাসার কামনা শান্ত, সৌম্য, মিষ্টি পানির বহতা নদীর মতো। শুধু মোহের মতো ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতের সমুদ্র না। ভালোবাসার কামনা একটা সুদৃঢ় বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। ভালোবাসা পড়ন্ত বয়সেও দুটো মানুষকে এক করে রাখে। অন্যদিকে ভালোবাসাহীন দৈহিক আকর্ষণের কামনা, নিজের খায়েশ পূরণ করার জন্য যতোটুকু ক্ষণস্থায়ী বন্ধন তৈরির প্রয়োজন ততোটুকুই করে। ইচ্ছেপূরণ শেষ হলে, একটা শরীর খেতে খেতে পানসে হয়ে গেলে, দৈহিক সৌন্দর্য শেষ হওয়া মাত্রই দু'জনার পথ দুটি হয়ে যায়।

ভালোলাগা, কাউকে স্রেফ কামনা করা আর কাউকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। রাস্তাঘাটে, ক্লাসে, ক্যাম্পাসে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো হাসি, চেহারা, কোনো আচার-আচরণ দেখে মুগ্ধ হতে পারো, কারো শরীর ভালো লাগতে পারে, দৈহিক উত্তেজনা অনুভব করতে পারো—তার মানে এই নয় যে তাকে তুমি ভালোবেসে ফেলেছো। কিন্তু এই ভালোলাগাকেই, এই মোহকেই, এই কামনাকেই ভাষার মারপ্যাঁচে ফেলে ভালোবাসা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আশা করি, সাংস্কৃতিক জমিদাররা তোমার মাথায় যে আবর্জনা ঢুকিয়েছিল তা এখন পরিষ্কার হয়েছে। বুঝতে পেরেছো যে এই তথাকথিত প্রেম, ট্রু লাভ কোনোটাই ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা তৈরি হয় বিয়ের মাধ্যমে।

কিন্তু ভাইয়া, বিয়ে কীভাবে ভালোবাসা তৈরি করে? হুট করেই তো দুজন অচেনা মানুষের দেখা হয়ে যায়, কেউ কাউকে তেমন চেনে না। মোহ হতে পারে, কামনা বাসনা থাকতে পারে, কিন্তু এতো দ্রুত ভালোবাসা কীভাবে তৈরি হবে?
ধরেন, আমি প্রেম করলাম, এরপর বিয়ে করে নিলাম তাহলেই তো হয়ে গেল, মোহ থেকে ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল, ধ্বংসাত্মক পরিণতি হলো না। ঝামেলা ঢুকে গেল।

প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরগুলো পাওয়া যাবে পরবর্তী লেখাগুলোতে ইন শা আল্লাহ।

টিকাঃ
[২৩] এ অংশের আলোচনাটা সাজানো হয়েছে বিভিন্ন সেক্যুলার বিশেষজ্ঞদের গবেষণার আলোকে। নারীপুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারে সেক্যুলার চিন্তা এবং ইসলামের অবস্থানের মধ্যে মৌলিক বেশ কিছু পার্থক্য আছে, যে কারণে তাদের সব অবস্থানের সাথে আমরা একমত না, তবে মোটাদাগে প্রাথমিক কিছু ধারণা এখান থেকে নেওয়া যেতে পারে। সেক্যুলার আর ইসলামী অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা আসছে একটু পরেই।
[২৪] Infatuation vs. Love: How To Tell If You're Just Infatuated, mindbodygreen. com, - tinyurl.com/3dcppky8
[২৫] The Chemistry of Love, howstuffworks.com-tinyurl.com/ymct7hhf
Zou et al., (2016). Romantic love vs. drug addiction may inspire a new treatment for addiction. Frontiers in psychology, 1436
How to tell the difference between lust and love, Insider, Jan 27, 2021- tinyurl. com/4xs9hnnt
[২৬] Infatuation vs. Love - tinyurl.com/3dcppky8_ 8 Ways To Tell The Difference Between Love & Lust, amp.mindbodygreen.com February 21, 2021- tinyurl.com/44avyuvw
[২৭] Infatuation vs. Love, Diffen.com -tinyurl.com/2z76pvn2 8 Ways To Tell The Difference... - tinyurl.com/44avyuvw How to tell..., Insider - tinyurl.com/4xs9hnnt_ "Love vs Like: 25 Differences between I Love You and I Like You, marriage. com, Jul 5, 2022- tinyurl.com/5n9adbzn
[২৮] Arranged marriages, and happiness of a nation, livemint.com, April 12, 2018- tinyurl.com/yc2ucbsh
[২৯] The Chemistry of Love - tinyurl.com/ymct7hhf How to tell..., Insider - tinyurl.com/4xs9hnnt
[৩০] Lust vs. Love, Diffen.com - tinyurl.com/mw7vd5te

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 আলকেমি

📄 আলকেমি


এক.
চৈত্রের অলস দুপুর। সূর্য বেশ ভালোমতোই তার দায়িত্ব পালন করছে। রুক্ষ একটা বাতাস হচ্ছে থেমে থেমে। গরম তাতে কমছে না, বরং আরো বাড়ছে। সাধারণত বাধ্য না হলে এমন সময় কেউ বাইরে বের হয় না। একটা জরুরি কাজ পড়ে গিয়েছিল, বাধ্য হয়ে বেরুতে হয়েছে। এখন ঘরে ফিরছি। বাসার কাছাকাছি আসতেই বেশ মজার একটা ঘটনা চোখে পড়লো। ১৮/১৯ বছরের এক তরুণ বেশ সাজগোজ করে একটা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের সানগ্লাস, বুকে শার্টের মধ্যে গুঁজে রেখেছে। হাতে প্রেমফুল—টকটকে লাল গোলাপ। কৌতূহল হলো। তরুণের চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম এক ব্যালকনির দিকে। স্কার্ট পরা ষোড়শী এক মিষ্টি কিশোরী। মাথায় কাপড়ের ব্যান্ড দিয়ে চুল বাঁধা। মুচকি মুচকি হাসছে!

প্রচণ্ড গরমে মাথা গরম হয়ে ছিল। হাত চালিয়ে চুলের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ঘামগুলো গ্রেফতার করতে করতে মুখ দিয়ে অটোমেটিক বের হয়ে গেল, “হায়রে মরার প্রেম! এই গরমে ঠায় দাঁড়িয়ে প্রেম করছে!”

এই ঘটনা মনে করিয়ে দিলো ১২/১৩ বছর আগের একটা ঘটনা। প্রচণ্ড শীত। আমার ঠাণ্ডাও লাগে একটু বেশি। দু'টো সোয়েটারের উপর একটা জ্যাকেট চাপিয়ে বের হয়েছি স্কুলে যাবার জন্য। এর মাঝে দেখি এক তরুণী আপু স্রেফ একটা শাড়ি আর অনেক সাজগোজ করে হাতে ফুল নিয়ে বাসার দিকে ফিরছে। চোখে মুখে খুশির একটা ঝিলিক। ডেট থেকে ফিরছে।

এরকম অনেক ঘটনা দেখেছি, মশার কামড় খেয়ে সারারাত ফোনে কথা বলা, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে ভালোবাসার কথা লেখা, ফেইসবুক 'ফ্রেন্ডকে' স্রেফ একবার দেখার জন্য অল্প সময়ের নোটিশে দেশের এ মাথা থেকে ও মাথায় চলে যাওয়া! হাত কাটা, ইঁদুর মারা বিষ খাওয়াসহ আরো অনেক কিছু! প্রেমের এই যে পাগলামি, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, ঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করা—এগুলো কেন হয়? নারী পুরুষের এমন তীব্র আকর্ষণের কারণ কী? এমন প্রশ্ন ছিল মনের মধ্যে। উত্তরটা পেলাম বই লিখতে গিয়ে!

আমাদের দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যোগাযোগের জন্য এক ধরনের বার্তাবাহক আছে। এরা আমাদের রক্তে, টিস্যুতে, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভ্রমণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের নাম হলো হরমোন। এই হরমোনগুলো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বেড়ে উঠা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, শরীরের মেটাবলিসম, যৌনতা, প্রজনন, মন ভালো-খারাপ, হতাশা, অনুপ্রেরণা—জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখে এই হরমোনগুলো। প্রেম ভালোবাসার আলোচনাতেও এই হরমোনগুলো মোটামুটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই আবির্ভূত হবার দাবি রাখে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, প্রেম, মোহ, কামনা, যৌনতা, ভালোবাসা—এসব ক্ষেত্রে হৃদয়ের ভূমিকাকে হাইলাইট করা হলেও মস্তিষ্কে এবং দেহে রিলিজ হওয়া হরমোনের আলোচনা তেমন আসে না। প্রেমের জগৎটাকে ঠিকমতো বুঝতে না পেরে একের পর এক ভুল করে যাবার পেছনে এই হরমোনের ভূমিকাগুলো না বোঝা অনেকাংশেই দায়ী বলেই মনে হয়।

ভালোবাসার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয় এমন দুইটি বিষয় আমরা ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছি—মোহ এবং কামনা।
ওকে দেখলেই বুক ধুকপুক করা, বুকে সুখের মতো ব্যথা হওয়া, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া, পেটের ভেতর প্রজাপতি নাচানাচি করা, হাত পা ঘেমে যাওয়া, নাক-কান চেহারা লাল হয়ে যাওয়া—গবেষকরা বলছেন, মোহের এই শারীরিক পরিবর্তনগুলোর কারণ হলো 'ফিল গুড' হরমোন—ডোপামিন, নরেপিনেফ্রিন আর সেরাটোনিন রিলিজ হওয়া। এই হরমোনগুলো নিঃসৃত হলে আমাদের ভালো লাগে, আনন্দের অনুভূতি হয়—দিল খুশ হয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য যেমন, কোকেইন সেবন করলেও ডোপামিন নিঃসৃত হয়, পিনিক উঠে।

আসলে ক্ষণিকের এই মোহ, এই ভালোলাগা মাদকের মতোই ভয়াবহ। চীনের একদল গবেষক গবেষণা করে দেখিয়েছেন, মাদকাসক্তি এবং প্রেমের মধ্যে আচরণগত এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন কেমিক্যাল প্রবাহের দিক থেকে অনেক মিল।
NCBI (The National Center for Biotechnology Information)-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ব্রেইন স্ক্যান করে দেখা গেছে, মাদকাসক্ত মানুষ হঠাৎ করে কোকেইনের মাদক নেওয়া বন্ধ করলে তার শরীর যেভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়, ব্রেকআপের পরেও প্রেমিক প্রেমিকাদের মস্তিষ্কে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ছ্যাঁকা খাওয়া মানুষের মস্তিষ্কের এমআরআই করা হলো। আবার শারীরিক ব্যথায় আছে এমন মানুষের মস্তিষ্কেরও এমআরআই করা হলো। দেখা গেল, দুই ক্ষেত্রেই ব্রেইনের একই ধরনের ছবি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ ব্রেকআপে শুধু মানসিক কষ্ট হয় না, গবেষকরা বলছেন, ব্রেকআপের ফলে শারীরিক কষ্টও অনুভূত হয়।

ব্রেকআপের সময় ফিল গুড হরমোনগুলো আর রিলিজ হয় না, সেই সাথে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায় করোটিসল (cortisol) নামের একটা হরমোন রিলিজ হয়ে। করোটিসল বাবাজির কাজ হলো—প্যারা দেওয়া, এটা হলো স্ট্রেস হরমোন। এই যে ব্রেইনে খুশি থাকার হরমোনগুলোর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের প্রবাহ হচ্ছে, এ কারণে ব্রেকআপের পর খুব কষ্ট হয়।
স্বভাবতই মানুষ এই কষ্টগুলো এড়াতে চায়। অবচেতন মন অন্তর থেকে চায় ব্রেইনে আবার সেই খুশির হরমোনগুলোর বন্যা বয়ে যাক। তাই বারবার সে মনে করিয়ে দেয় সেই মানুষটার কথা, যার কারণে একসময় সেই হরমোনগুলো রিলিজ হয়েছিল। প্রাক্তনকে ভোলা তাই খুব একটা সহজ হয় না।

অন্যদিকে কারো প্রতি ভালোবাসা জন্মালে ব্রেইনে অক্সিটোসিন এবং ভ্যাসোপ্রেসিন হরমোন নির্গত হয়। এই ধরনের হরমোন সাধারণত দুজন মানুষের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন (যেমন মা এবং সন্তানের মধ্যে বন্ধন) গড়ার ক্ষেত্রে বের হয়। আর কামনার সময় সেক্স হরমোন যেমন টেস্টোসটেরন ও এস্ট্রোজেন রিলিজ হয়।
তো মস্তিষ্কের এমন পরিবর্তন, হরমোন রিলিজের এই রহস্যময় ব্যাপারগুলো শুধু প্রেমিক প্রেমিকাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সম্পূর্ণ আগন্তুক থেকে শুরু করে স্বল্প পরিচিত কিংবা পরিচিত কিন্তু প্রেমের সম্পর্ক নেই, এমন যে কারো ক্ষেত্রে এর চাইতেও ব্যাপক রহস্যময় ব্যাপার ঘটতে পারে।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের গবেষক ২১-২৮ বছর বয়সী কয়েকজন পুরুষকে সুন্দরী নারীদের ছবি দেখায়। দেখা গেল, ছবি দেখা মাত্রই তাদের ব্রেইনের রিওয়ার্ড সেন্টার (reward center) সক্রিয় হয়ে গেল। কোকেইনের মতো মাদকও ঠিক একইভাবে মস্তিষ্কের এই অংশকে সক্রিয় করে ক্ষণিকের ভালো লাগা তৈরি করে। আসক্তি তৈরি করে। অর্থাৎ মোটামুটি সুন্দরী নারীদের একবার দেখলে, বারবার দেখার জন্য পুরুষের ব্রেইনে আসক্তি তৈরি হয়।

আসলে সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষ এমন যে আশপাশে কোনো নারী থাকলে অবচেতনভাবেই সেদিকে তার চোখ চলে যায়। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ফ্র্যান্সিসকোর সাইকিয়াট্রির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ড. লুঅ্যান ব্রিযেনডাইন। ভদ্রমহিলা অ্যামেরিকান বোর্ড অফ সাইকিয়্যাট্রি অ্যান্ড নিওরোলজিরও একজন সদস্য। মস্তিষ্কের যে অংশ যৌনতার অনুভূতি তৈরি করে তা নারীদের তুলনায় পুরুষের মস্তিষ্কে ২.৫ গুণ বড়। ড. ব্রিযেনডাইনের মতে, এটাই সম্ভবত নারী আর পুরুষের ব্রেইনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। তিনি আরো বলেন, 'আশেপাশে মেয়ে থাকলে পুরুষের চোখ সেদিকে যায়। তাদের শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সম্মোহিত ব্যক্তির মতো নজর আটকে যায়। আমি যদি বলতে পারতাম যে এই সম্মোহিত হওয়া থেকে পুরুষরা নিজেদের রক্ষা করতে পারে!
কিন্ত না, বাস্তবতা হলো তাদের পক্ষে এটা করা সম্ভব না। তাদের ভিসুয়াল ব্রেইন সার্কিট এমন ভাবেই তৈরি যে, তা সবসময় প্রজননের জন্য উর্বর সঙ্গী খুঁজতে থাকে। আশেপাশে দিয়ে যে নারীই যাক, ইচ্ছা না থাকলেও অবচেতন ভাবেই পুরুষ তাদের দিকে তাকায়—প্রজননের জন্য উর্বর সঙ্গী খোঁজে'।

সৌন্দর্য দেখে নারীরাও প্রভাবিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, কোনো কাজের আগে যদি নারীরা সুদর্শন পুরুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে কাজে যাবার সময় তারা বেশি উত্তেজক পোশাক পরে নেয়।
গবেষকরা বলেছেন, চেহারার সৌন্দর্যের চেয়ে পুরুষ বেশি গুরুত্ব দেয় শরীরের সৌন্দর্যকে, ফিগারকে। বিশেষ করে 'বালুঘড়ি'র মতো গড়ন (hourglass figures, কোমর ও নিতম্বের অনুপাত ০.৭) পুরুষের পছন্দ। কারণ পুরুষের মস্তিষ্ক ধরে নেয় এ ধরনের শরীরের অধিকারী নারীরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং প্রজননের জন্য উর্বর। নিউযিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েলিংটনের নৃতাত্ত্বিক ড. বার্নাবি ডিক্সনের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়—সব পুরুষের চোখ প্রথমেই নারীর যে অঙ্গে আটকায় তা হলো বুক আর কোমর। সবচেয়ে বেশি সময় দৃষ্টি আটকে থাকেও এই দুই জায়গায়।

পুরুষ উত্তেজিত হয় দেখার দ্বারা (visuo-sexual), বিপরীতে নারী উত্তেজিত হয় স্পর্শ দ্বারা। একটা পা, বুক বা ঠোঁটের ছবি দেখেও পুরুষ উত্তেজিত হয়ে কাম মেটাতে পারে, যে কামের মধ্যে প্রেমের কোনো বালাই নেই। তাই পর্নোগ্রাফির ভোক্তা মূলত পুরুষ। কোটি কোটি টাকা খরচ করে পুরুষ নারীর নগ্ন দেহ দেখে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীর পা, পিঠ, পেট, বুক, হাত, হিপ ব্যবহার করা ডালভাতের মতো হলেও, পুরুষের পা পিঠ হিপ ব্যবহার করে কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না—কারণ এটা আকর্ষণ জাগাতে পারে না। আলাদা করে পুরুষদেহ বা পুরুষাঙ্গ নারীর আগ্রহের জায়গা না।

নারীর কণ্ঠ শুনেও পুরুষ আকর্ষণ বোধ করে। কণ্ঠের মাধুর্য থেকেই প্রথম সেক্সের সময় সেই নারীর বয়স কতো ছিল, যৌনসঙ্গীর সংখ্যা কতো, অবৈধ যৌনসঙ্গী আছে কিনা তাকে পটানো যাবে কি না—ইত্যাদি নানা ব্যাপারে অনেক পুরুষ ধারণা করে নেয়। শিকাগোর স্মেল অ্যান্ড টেইস্ট ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশানের ডিরেক্টর অ্যালান হার্শ দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন, 'সুগন্ধি মস্তিষ্কের সেই জায়গাগুলোকে উত্তেজিত করে যেগুলো যৌনাকাঙ্ক্ষার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আর এর ফলে পুরুষের মনে যৌনচিন্তা চলে আসে'।

অসংখ্য পুরুষের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে গার্লফ্রেন্ড, এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত নারীর দেহের সুগন্ধি তাদেরকে যৌনতার জন্য পাগল করে দেয়। লাল লিপস্টিক, লাল রঙের পোশাক, স্লিভলেস পোশাক, হাই হিল, মিনি স্কার্ট, লেগিংস, স্কিনি জিন্স, ডেনিম জ্যাকেট, লনজারে, নাইট গাউন এসব পোশাক পরা নারীদের বিজ্ঞাপনে যেমন অহরহ দেখা যায়, তেমনি ফ্যাশন হিসেবেও এগুলোর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। কারণ ঐ একটাই—এই পোশাকগুলো পরা নারীদের প্রতি পুরুষেরা তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে।
যেসব নারীরা লিপস্টিক দেয় না, তাদের চেয়ে লিপস্টিক দেওয়া নারীদের ছেলেরা প্রেমের প্রস্তাব বেশি দেয়। গবেষকরা বলছেন—নারীর যৌন হেনস্থার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করে তা হলো নারীকে রক্ত মাংসের মানুষ না ভেবে, একদলা মাংসপিণ্ড বা বস্তু মনে করা। নারীকে যখন বস্তু মনে করা হয়, তখন তার যে আবেগ অনুভূতি আছে, সে যে কষ্ট পায়—এই বিষয়গুলো আর মাথায় কাজ করে না। একজন মানুষ (পুরুষ/নারী) কেন একজন নারীকে বস্তু মনে করে, তার একটা উত্তর পাওয়া যাচ্ছে ইতালির, ইউনিভার্সিটি অফ ট্রেনটো'র সাইকোলজি এবং কগনিটিভ সায়েন্স বিভাগের (CiMEC) গবেষকদের কাছে। তারা বলছেন, বিকিনি বা অন্তর্বাস পরা মেয়েদেরকে অন্য পুরুষ এবং নারীদের মস্তিষ্ক বস্তু হিসেবে দেখে। একই কথা বলছেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির প্রফেসর সুস্যান ফিস্ক। তিনি আরো বলছেন, পুরো শরীর কাপড়ে ঢাকা আছে এমন মহিলাদের চেয়ে, বিকিনি পরা নারীদেহ পুরুষদের মাথায় বেশিক্ষণ থাকে।

একটি গবেষণায় পুরুষদের প্রথমে উত্তেজক পোশাক পরা নারীদের ছবি দেখানো হয়। তারপর অন্য সেটাপে অন্য একজন নারীর সাথে বসানো হয়। দেখা যায়, উত্তেজক পোশাকের নারীর ছবি দেখার কারণে পুরুষদের মাথায় তখন শুধু যৌনতার চিন্তা ঘোরাফেরা করছে। তারা সেই নারীর কাছাকাছি গিয়ে বসছে।
এরকম অসংখ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, নারী খোলামেলা পোশাক পরলে পুরুষেরা তাকে বেশি সেক্সি, বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে। ধরে নিয়েছে, এই মেয়ে অলরেডি সেক্স করে ফেলেছে, এ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সেক্স করে। এর সাথে সহজেই প্রেম করা যাবে, বিয়ের বাইরেও যৌনতায় লিপ্ত হওয়া যাবে, যৌন হেনস্থা করা যাবে... এমনকি ধর্ষণও করা যাবে। কিন্তু রক্ষণশীল পোশাকের ক্ষেত্রে এমন হয়নি।

বিজ্ঞানমনস্ক, সুশীল প্রগতিশীলরা সবক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে কষ্টিপাথর মানলেও নারী পুরুষের সাইকোলজি এবং হিউম্যান বায়োলজির এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের দেওয়া উপসংহারগুলো মানতে চায় না। সরাসরি অস্বীকার করে। নারীর শরীর, অবাধ মেলামেশা, পোশাক, কথাবার্তা, নারীপুরুষের সহজাত আকর্ষণ, যৌনতার প্রভাবক, মানুষকে যে এভাবেই বানানো হয়েছে—এ বাস্তবতাগুলো তারা অস্বীকার করে। নারীরা যা খুশি তাই পরুক, পুরুষ কেন তাদের দিকে তাকাবে, ‘মন পবিত্র’ রেখে নারী-পুরুষ স্রেফ বন্ধু হয়ে থাকতে পারে—এমন অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক সব দাবিও তারা জোরেশোরে প্রচার করে। কেউ ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে গেলে ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী ইত্যাদি ট্যাগ মেরে দেয়।

কিন্তু ইসলাম এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং বাস্তবতা অনুযায়ী বিধান দেয়। নারীপুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান এবং শরীয়াহর মূলনীতিগুলো নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। তবে উপরের এটুকু আলোচনা থেকেই আল্লাহর দেওয়া বিধানগুলোর পেছনে থাকা গভীর হিকমাহ আমরা কিছুটা হলেও ধরতে পারি। পর্দার বিধান, নজর নিয়ন্ত্রণের আদেশ, নারীপুরুষের মেলামেশাকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, রাস্তাঘাটে আড্ডা দেওয়াকে অনুৎসাহিত করা, বিয়ে সহজ করা, নারীর কণ্ঠের ব্যাপারে সতর্কতা, এমনকি ঘরের বাইরে নারীর সুগন্ধি ব্যবহারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাসহ ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের ফিতরাহ এবং নারী ও পুরুষের জৈবিক আকর্ষণের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম শুধু মানুষকে নিষেধ করে না, বরং এমন এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা দেয়, যা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে এবং আল্লাহর আনুগত্য করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে আধুনিক সেক্যুলার বিশ্বকাঠামো এমন এক চিন্তাধারা এবং ব্যবস্থা তৈরি করে যা ক্রমাগত মানুষকে গুনাহর দিকে ঠেলে দেয়।

দুই.
প্রেমের আলকেমির পেছনে খুব শক্তিশালী, খুব বড় একটা ফ্যাক্টর সেক্স। যৌনতা এমন একটা বিষয় যার ছায়া এবং সীমানা থেকে নারীপুরুষের সম্পর্ক কখনোই বের হতে পারে না। নারী পুরুষের সম্পর্ককে যতোই রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা হোক না কেন, যতোই নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব কিংবা ভাইবোন পাতানো হোক না কেন, যতোই 'পবিত্র মন' বা 'পবিত্র সম্পর্কের' বুলি আওড়ানো হোক না কেন—তাতে বাস্তবতা বদলায় না। বিষয়টার উপর মানুষের সবসময় নিয়ন্ত্রণও থাকে না। যৌনতার কলকব্জাকে মানুষের মন সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নারী এবং পুরুষকে পাশাপাশি রাখা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হয়ে যায় যৌনতার রসায়ন।

আসলে প্রত্যেক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর 'ট্রু লাভে'র অনুভূতিকে চালিত করে যৌনতা। শরীরী চাহিদা। আর শারীরিক এই ক্ষুধা আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে নানাভাবে। 'প্রেমে পড়া'র সময়টাতে এক দিকে মস্তিষ্কে চলতে থাকে হরমোনের বন্যা। অন্যদিকে শরীরী চাহিদার বাস্তবতা অস্বীকার কিংবা আড়াল করতে গিয়ে চলে নিজের সাথে নিজের মিথ্যাচার। দুইয়ে মিলে তৈরি হয় এক বিচিত্র মানসিক অবস্থা। হরমোনের স্রোত আর যৌনতার জোয়ারে ঠিকভাবে চিন্তা করাই কঠিন হয়ে যায়। তীব্র আবেগের এক কল্পজগতে মানুষ হাবুডুবু খেতে শুরু করে। যেটাকে আমরা প্রেম বলছি, যেটাকে আমরা পবিত্র বলে মহিমান্বিত করছি, তা আসলে শরীরী ক্ষুধা আর পিটুইটারির খেলা কেবল। সব কথা, কবিতা আর কল্পনার খেলাঘর পার হবার পর সত্য হলো, এই যে প্রেম—যার জন্য তুমি আকাশ-পৃথিবীর সীমারেখা ভুলতে বসেছো, তা আসলে তোমার মস্তিষ্ক আর যৌনাঙ্গের মিথস্ক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই না।

জাপানে কিছু সস্তা হোটেল আছে। শরীরের উষ্ণতা ভাগাভাগি করতে উদগ্রীব যুগলদের জন্য চারদেওয়ালের ভেতরে একটা বিছানার ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো এসব হোটেলের মূল কাজ। এই হোটেলগুলোতে পতিতাও মেলে সুলভ মূল্যে। সব দেশেই এ ধরনের হোটেল আছে, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই বাংলাদেশেও এখন আছে অনেক। তবে মজার এবং আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক দিক হলো, এই হোটেলগুলোকে জাপানে বলা হয় 'লাভ হোটেল'। সাময়িক যৌন সুখের জন্য ঘণ্টা হিসেবে বিছানা ভাড়া দেওয়া ব্যবসার নাম হলো ভালোবাসার হোটেল! এই তো ভালোবাসা! এক দিক থেকে এই নামটা প্রেমের বাস্তবতাকে খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলে। কারণ দিন শেষে প্রেমের শতো শতো গল্পের পেছনে মূল বাস্তবতা হলো যৌনতা। সরাসরি স্বীকার না করলেও একটা পর্যায়ে আমরা সবাই এ বাস্তবতা জানি। উপলব্ধি করি।

এজন্যই তো ভালোবাসা দিবসগুলোতে কনডমের বিক্রি বেড়ে যায়, বিশেষ ছাড় কিংবা প্যাকেজ দেওয়া হয়, তাই না? বিশেষ দিবসগুলোতে আবাসিক হোটেলগুলোতে থাকে বিশেষ অফার। এজন্যই ক্লোজআপ কাছে আসার গল্পের মার্কেটিং এর জন্য বেছে নেয় হুড তোলা রিকশাকে। এজন্যই তো রিলেশনশিপের ওয়াজিব অংশ হয়ে যায় বিছানায় যাওয়া। এজন্যই তো ভালোবাসার নামে শুরু হওয়া পবিত্র সম্পর্ক ভাঙার কিছুদিনের মধ্যে আরেক 'পবিত্র ভালোবাসা' খুঁজে নিতে দেরি হয় না। তাই না?

কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগছে? কষ্ট হচ্ছে মেনে নিতে?
আচ্ছা ধরো, তোমার কাছে দুইজন মেয়ে ম্যাথ বুঝতে আসলো। একজন ভোম্বলের মতো মোটা, দাঁত উঁচু। আরেকজন মোটামুটি সুন্দরী, ভালো ফিগারের। কাকে ম্যাথ বোঝাতে তোমার বেশি ভালো লাগবে? কার মুখে 'ভাইয়া' ডাক শোনার জন্য তোমার মন আঁকুপাঁকু করবে?

ক্যাম্পাসের একটা সুন্দরী জুনিয়র মেয়েকে সাহায্য করতে যেভাবে উতলা হয়ে যাও, কোনো ছেলেকে সাহায্য করার জন্য সেভাবে পাগল হও না কেন? কেন বেচারা ছেলেগুলোকে ধরে ধরে সিনিয়রদের সালাম দেবার নিয়মকানুন শেখাও? মেয়েদের দিকে যেভাবে মনোযোগ দাও ছেলেদের কেন সেভাবে দাও না?

ঘরের মধ্যে তুমি এলোমেলো এলোচুলে ঘরোয়া পোশাকে থাকো। কিন্তু বাইরে বের হলে, ক্যাম্পাসে গেলে কেন সাজগোজ করে, মেকআপ করে, সুন্দর আকর্ষণীয় পোশাক পরে যাও?

পুরো দৃশ্যপট থেকে শারীরিক সৌন্দর্য এবং যৌনতার ব্যাপারটা ডিলিট করে দাও। এবার চিন্তা করো। সমীকরণ মেলাতে পারছো?

গার্লফ্রেন্ড যদি কখনোই সেক্স করতে না দেয়, শরীরে হাত দিতে না দেয়, তুমি তার সাথে প্রেম করবে? বয়ফ্রেন্ড যদি নপুংসক হয় তুমি তার সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাবে? যৌনতাবিহীন কোনো সম্পর্ক কী হবে?

সৎ হও। আমাকে বলতে হবে না, তুমি নিজের কাছে স্বীকার করে নাও যে এই ভালোলাগা, এই আকর্ষণ, এই প্রেমের মূলে রয়েছে যৌনতা।

সেক্স আসলে মানুষের ফিতরাহর একটা ব্যাপার। আলোবাতাস, পানি, খাবারের মতো আরেকটা প্রয়োজন। খাবার না খেলে যেমন ক্ষুধা লাগে তেমনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সেক্স করতে না পারলে শরীরের ক্ষুধা জাগবে, এটা অতি স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তাছাড়া নারী পুরুষের ভালোবাসা, যৌনতা কেবল নিছক বিনোদন কিংবা শারীরিক ক্ষুধা মেটানোর পদ্ধতি না, প্রাণীজগতে জন্মের প্রক্রিয়াকেও এর সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা। ব্যক্তি মানুষ থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, সভ্যতা সবকিছুকে যৌনতা প্রভাবিত করে।
নারীপুরুষের আদিম সম্পর্কের এই বাস্তবতাগুলোকে ইসলাম অস্বীকার করে না। ইসলাম আমাদের কাছে অতিমানবীয় কোনো কিছু দাবি করে না। তবে ইসলাম সুনির্দিষ্ট পথ দেখিয়ে দেয়। আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা যৌনতা ও আকর্ষণের বিষয়গুলোকে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে, শৃঙ্খলের মধ্যে বেঁধে দিয়েছেন — যেন শয়তান মানুষকে প্রতারিত করতে না পারে। যেন যৌনতার ফাঁদে পড়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে না যায়। যৌনতার জন্য আল্লাহ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলা নির্ধারণ করেছেন বিয়ের বন্ধনকে। নারীপুরুষের পর্দার বিধান দিয়েছেন, চোখের হিফাযত করতে বলেছেন। সমাজে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করেছেন। অশ্লীলতা থেকে দূরে সরে থাকার প্রতিদান হিসেবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যিনা-ব্যভিচারের সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে বলেছেন, 'তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ এবং তা কত না মন্দ পথ! (যা অন্যান্য নিকৃষ্ট কর্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়)।'

কিন্তু যৌনতার এই দিকটা আধুনিক বিশ্ব কেন যেন স্বীকার করতে চায় না। উল্টো নানা অজুহাত আর রোমান্টিক রহস্যের চাদরে আড়াল করতে চায় নারীপুরুষের চিরাচরিত আকর্ষণের এই আলকেমিকে। একই সাথে ক্রমাগত সবক দিয়ে যায় ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা আর যেমন খুশি তেমন যৌনতার। শায়খ আলী তানতাউয়ী (রহ.) ছিলেন গত শতাব্দীর একজন বিখ্যাত আলিম, বিচারক। বিশ হাজারের মতো বিয়ে সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা করেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, 'মনে রাখবে, প্রেম শুধু যৌন সম্পর্কের আগ্রহেরই নাম। কবিরা যতোই প্রেমকে সুসজ্জিত ও অলঙ্কৃত করে উপস্থাপন করুক, ভদ্র ও নিষ্কাম প্রেম ফালতু কথা। এর সমাদর শুধু পাগল ও যুবকদের কাছে।
যুবক যুবতীর প্রেম হলো যৌনমিলনের আকাঙ্ক্ষা, এ আকাঙ্ক্ষা শেষ হলে তাদের প্রেমও শেষ হয়ে যায়। প্রেমপাগল মজনুর তখন হুঁশ ফেরে। তার চোখে লায়লা তখন অন্য সাধারণ নারীর মতোই ধরা দেয়। পেট ভরে গেলে ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাবারের প্রতি যেমন কোনো আগ্রহ থাকে না, তেমন মেয়েটির প্রতিও তারও কোনো আগ্রহ থাকে না।
প্রেম এক সাময়িক বন্ধন। যা প্রথম স্পর্শেই ছিন্ন হয়ে যায়। স্পর্শ বলে কী বোঝাচ্ছি আশা করি বুঝতে পেরেছো।'

টিকাঃ
[৩১] Hormones, medlineplus.gov- tinyurl.com/4dds7a67
[৩২] The Chemistry of Love - tinyurl.com/ymct7hhf Zou Z, Song H, Zhang Y, Zhang X. Romantic Love vs. Drug Addiction May Inspire a New Treatment for Addiction. Front Psychol. Sep 22, 2016-tinyurl.com/ y3eu7tj6 How to tell the difference between lust and love, Insider, Jan 27, 2021- tinyurl. com/4xs9hnnt
[৩৩] Romantic Love vs. Drug Addiction May Inspire a New Treatment for Addiction. Front Psychol. Sep 22, 2016- tinyurl.com/y3eu7tj6
[৩৪] Teenage Heartbreak Doesn't Just Hurt, It Can Kill, scitechconnect.elsevier. com, September 18, 2017-tinyurl.com/36b46ejx
Collins, W. A., Welsh, D. P., & Furman, W. (2009). Adolescent romantic relationships. Annual review of psychology, 60(1), 631-652.
[৩৫] Gunther Moor, B., Crone, E. A., & van der Molen, M. W. (2010). The heartbrake of social rejection: Heart rate deceleration in response to unexpected peer rejection. Psychological science, 21(9), 1326-1333.
Fisher, H. E., Brown, L. L., Aron, A., Strong, G., & Mashek, D. (2010). Reward, addiction, and emotion regulation systems associated with rejection in love. Journal of neurophysiology, 104(1), 51-60.
Schwartz, Barry. "The paradox of choice: Why more is less." (2004).
Witt, J. K., & Dorsch, T. E. (2009). Kicking to bigger uprights: Field goal kicking performance influences perceived size. Perception, 38(9), 1328-1340.
[৩৬] Why Breaking Up Is Like Getting Over A Cocaine Addiction, Says Science, yourtango.com, Jul 31, 2021- tinyurl.com/35pshj4k
5 Scientific Reasons Why Breakups Are Devastating, huffpost.com, Nov 17, 2011- tinyurl.com/3wvxktur
[৩৭] Infatuation vs. Love, Diffen.com -tinyurl.com/2z76pvn2 8 Ways To Tell The Difference Between Love & Lust, amp.mindbodygreen.com- tinyurl.com/44avyuvw How to tell..., Insider - tinyurl.com/4xs9hnnt Love vs Like: 25 Differences between I Love You and I Like You, marriage.com,Jul 5, 2022- tinyurl.com/5n9adbzn How Love Works. howstuffworks.com - tinyurl.com/zvh4b8x8
[৩৮] The Chemistry of Love - tinyurl.com/ymct7hhf How to tell...- tinyurl.com/4xs9hnnt
[৩৯] Beautiful Faces Trigger Reward Center of Brain, ABC News- tinyurl.com/34frurf9
[৪০] Love, sex and the male brain, CNN, March 25, 2010- https://archive.is/5ZEE0
[৪১] Durante, K. M., Griskevicius, V., Hill, S. E., Perilloux, C., & Li, N. P. (2011). Ovulation, female competition, and product choice: Hormonal influences on consumer behavior. Journal of Consumer Research, 37(6).
[৪২] Why Science Says Men Go for Women with Hourglass Figures, menshealth. com, Jun 18,2019- tinyurl.com/d2xzfwmv
[৪৩] Dixson, B. J., et al. (2011). Eye tracking of men's preferences for female breast size and areola pigmentation. Archives of Sexual Behavior, 40(1).
[৪৪] Men and the Power of the Visual, PragerU, - tinyurl.com/y3c9yvy4
[৪৫] Hughes, S. M., Dispenza, F., & Gallup Jr, G. G. (2004). Ratings of voice attractiveness predict sexual behavior and body configuration. Evolution and Human Behavior, 25(5), 295-304. O'Connor, J. J., Re, D. E., & Feinberg, D. R. (2011). Voice pitch influences perceptions of sexual infidelity. Evolutionary Psychology, 9(1).
[৪৬] Hirsch, A., & Gruss, J. (1999). Human male sexual response to olfactory stimuli. J Neurol Orthop Med Surg, 19, 14-19. Scents That (Really!) Seduce Him, Cosmopolitoan- tinyurl.com/mz92r4h4
[৪৭] এরকম আরও অনেক গবেষণা রয়েছে। সেগুলোর জন্য দেখা যেতে পারে চিকিৎসক, লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ডা. শামসুল আরেফিন শক্তি রচিত 'মানসাংক' বইটি। আমাদের এই লেখার বেশ কিছু তথ্য মানসাংক বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে।
[৪৮] Elliot, A. J., & Niesta, D. (2008). Romantic red: red enhances men's attraction to women. Journal of personality and social psychology, 95(5). The Red-Dress Effect Men see women wearing red as more open to romantic advances, science.org- tinyurl.com/mhd5vkh5 3 Universally Attractive Outfits, According to Science, whowhatwear.com, tinyurl.com/2p99pr3w 5 Items That Make Women Scientifically More Attractive to Men, whowhatwear. co.uk - tinyurl.com/yc6s3e4v Do Men Like a Woman in Red Lipstick? The Answer May Surprise You, stylecaster. com, Sep 04, 2013- tinyurl.com/yckzbvw8
[৪৯] Guéguen, N. (2012). Does red lipstick really attract men? An evaluation in a bar. International Journal of Psychological Studies, 4(2), 206.
[৫১] Awasthi, B. (2017). From Attire to Assault: Clothing, Objectification, and De-humanization-A Possible Prelude to Sexual Violence?. Frontiers in psychology, 8, 338.
Guéguen (2011). The Effect of Women's Suggestive Clothing on Men's Behavior and Judgment: A Field Study
Researchers study sexual objectification in brain processes, medicalxpress.com, May 1, 2019-https://archive.is/aQpVa
Johnson, K., Lennon, S. J., & Rudd, N. (2014). Dress, body and self: Research in the social psychology of dress. Fashion and Textiles, 1(1)
Men see bikini-clad women as objects, psychologists say, CNN, tinyurl.com/3uvcm42c
[৫২] ‘...তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে পরপুরুষের সঙ্গে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়...’। [সূরা আহযাব, আয়াত ৩২] Woman's Voice in Quran, Islamweb - tinyurl.com/5bx6vwyf নবী (ﷺ) বলেছেন – প্রত্যেক চোখই ব্যভিচারী। আর মহিলা যদি (কোনো প্রকার) সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তবে সে ব্যভিচারিণী।’ তিরমিযী ২৭৮৬, আবু দাউদ ৪১৭৩ (আংশিক), সহীহুল জামে ৪৫৪০। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
[৫৩] ইসলামী শরীআহর আলোকে আমরা জানি, এটা ঘটে স্বপ্নদোষ বা মাসিক (মেয়েদের ক্ষেত্রে) হবার মাধ্যমে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হবার সময় থেকে। শরীআহ অনুযায়ী (স্বপ্নদোষ, মাসিক ইত্যাদি) বালেগ হওয়ার আলামত প্রকাশ হওয়ার পর থেকে তার ওপর সাবালকের বিধান প্রয়োগ হবে। এবং সাধারণত: এই সময় তার মধ্যে যৌনতার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এক রকম নাও হতে পারে। কারো ওপর সাবালকের বিধান প্রয়োগ হওয়ার পরও তার কাম না থাকতে পারে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে বালেগ হবার আগেই কোনভাবে তার মধ্যে কাম তৈরি হয়ে যেতে পারে।
[৫৪] নবী (ﷺ) বলেছেন— 'হে যুবকের দল, তোমারদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। (বুখারী ৫০৬৫, মুসলিম ১৪০০ ইফা. ৩২৬৮)'
[৫৫] সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২
[৫৬] লাভ ম্যারেজ, শায়খ আলী তানতাউয়ী, বইঘর পাবলিকেশন, পৃষ্ঠা ১৫-১৬

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 মিথ্যায় বসত

📄 মিথ্যায় বসত


প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে আমরা একটা মোহের মধ্যে থাকি। শত বাস্তবতা আর তথ্য উপেক্ষা করে বুঁদ হয়ে থাকি কল্পনার এক জগতে। প্রশ্ন হলো, এই কল্পজগৎ কীভাবে তৈরি হলো?

আমরা এমন এক কালচারের মধ্যে বসবাস করছি যা ছোটবেলা থেকেই মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রেম খুঁজে ফেরা, প্রেমের মাঝে জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া, প্রেমকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নেওয়া, প্রেমের জন্য জীবন দেওয়া, প্রেমের জন্য মারামারি করা ইত্যাদি। গল্প, উপন্যাস, সিনেমা, নাটক, টিভি সিরিয়াল, মিউযিক ভিডিও, বিজ্ঞাপন, পত্রিকার পাতা, বিলবোর্ড—সবগুলো মাধ্যম থেকে প্রচারিত হচ্ছে একই গল্পের নানা সংস্করণ।

ছোটকাল থেকে শুনে আসা ডিযনির সবচেয়ে বিখ্যাত কিছু গল্পের কথা চিন্তা করুন। সিনডারেলা, বিউটি অ্যান্ড দা বিস্ট, রাপুনযেল, স্নো ওয়াইট, লিটল মারমেইড—প্রত্যেকটা গল্পে একটা কমন থিম পাবেন। গল্পের মূল চরিত্রের জীবন ছিল মলিন, কষ্টের। হঠাৎ পবিত্র ভালোবাসার জাদু স্পর্শে সেই জীবন সুন্দর, উপভোগ্য আর মোহনীয় হয়ে গেল। মেসেজটা স্পষ্ট। প্রেমের কষ্টিপাথরে মরচে পড়া জীবন আমূল বদলে স্বর্ণ হয়ে যায়। কোনো মানুষ গল্পের প্রথম অংশের মনমরা ফিকে হওয়া জীবন চায় না। সবাই চায় গল্প শেষের ঘোরলাগা চোখের সুখের দিনগুলো। ঠিক একই ধরনের মেসেজ পাওয়া যায় বলিউডের হাজারো সিনেমা আর দেশের নাটক-সিনেমা, উপন্যাস আর গল্পগুলোতে।

কথাগুলো কাউকে বলে দিতে হয় না। লিখে দিতে হয় না বানান করে করে। আমাদের মন ও মস্তিষ্ক সহজাতভাবে মেসেজটা ধরতে এবং এর মর্মোদ্ধার করতে পারে। প্রেম শুধু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ না, প্রেম ছাড়া জীবন রঙহীন, নিষ্প্রাণ। রূপকথার রাজপুত্রের গল্প রাজকন্যাকে ছাড়া অপূর্ণ। রাজপুত্রের প্রেম ছাড়া রাজকন্যার অস্তিত্ব অর্থহীন। মানবজন্মের স্বার্থকতা হলো প্রেমে। জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার চূড়ো হলো প্রেম। প্রেমই মুখ্য, প্রেম ছাড়া বাকি সব কিছু সাইডস্টোরি, বাকি সবাই এবং সব কিছু পার্শ্বচরিত্র।

আর এভাবেই এক সময় এই বিচিত্র বিশ্বাস প্রচলিত হয়ে যায়। রাস্তায়, রিকশায়, পার্কে, বাসে উপচে পড়া প্রেমের ভিড়ে চলাফেরা একসময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। একুশে থেকে পহেলা বৈশাখ, শোক দিবস থেকে বিজয় দিবস, সব ছুটির দিন একসময় পরিণত হয় ভ্যালেন্টাইনে। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, সমাজ, সংস্কৃতি সব আমাদের এই দিকে ঠেলে দেয়। হাইস্কুলের ছাত্র থেকে চল্লিশের ঘরে পা দেওয়া বিবাহিত মানুষগুলো পর্যন্ত সবাই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় ঐ 'পবিত্র প্রেম'কে, যা তাদের অর্থহীন জীবনকে অর্থ এনে দেবে।

কিন্তু এই কল্পজগতের সাথে বাস্তবতার মিল কতোটুকু? রূপকথা আর রূপালি পর্দা থেকে ধার করা এই স্বপ্নগুলোর বাস্তব পরিণতি আসলে কী?

প্রেমের এই গল্প যে মিথ্যে তার কয়েকটা দিক আমরা এরই মধ্যে আলোচনা করেছি। প্রেমে পড়ার উথালপাথাল অনুভূতি আর বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গ পাবার তীব্র ইচ্ছের পেছনে থাকে হরমোন আর যৌনতার প্রভাব। কিন্তু প্রেমের এই মিথগুলোর মিথ্যে হবার আরো কিছু দিক আছে।

প্রেমের মিথের আরেকটা বড় মিথ্যা হলো সাময়িক মোহকে চিরন্তন হিসেবে দেখানো। সেই অনাদিকাল থেকে মোহ আর প্রেমের কতো ফুল ফুটলো! কতো প্রেমিক-প্রেমিকা প্রেমের শপথ করে কবিতা আউড়ে কসম খেলো—ভালোবাসার জন্যে তারা জীবন বিলিয়ে দেবে নিঃশঙ্কচিত্তে, আপন করে নেবে দুঃখের প্রত্যেকটি দ্বীপকে, দরকার হলে দাঁড়িয়ে যাবে পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে, তবুও ভালোবাসার অসম্মান হতে দেবে না। পরম আদরে ভালোবাসাকে বুকে জড়িয়ে রাখবে আজীবন, আকাশ বাতাস আর যমীনকে সাক্ষী রেখে তারা উদাত্ত কণ্ঠে জানান দিলো—জীবন চলে গেলেও অন্য কাউকে মেনে নেবে না জীবনসঙ্গী হিসেবে। অথচ কক্ষপথে কিছুটা পরিভ্রমণ শেষে একটু বুড়ো হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে বসে সেইসব বোকা, মিথ্যুক প্রেমিকের দল অন্য কারো চোখে চোখে রেখে আবারো খেলো সেই একই পুরোনো কবিতার মিথ্যা কসম!

ফিযিক্সের থিওরি, ফেইসবুকের ট্রেন্ড, রাজনীতি, সিংহাসন, নিয়ন আলোর রাজপথ... আল্লাহর কালাম আর দ্বীন ছাড়া সবকিছুই বদলে যায় সময়ের সাথে সাথে। প্রেমও তাই। মোহ কেটে গেলে, নেশা কেটে যায়। প্রেমও হারিয়ে যায় খুব দ্রুত। কিন্তু তার আগে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় একেকটা জীবন... উহু, শুধু জীবন না। ছারখার করে দেয় পরিবার, সমাজ... এবং সভ্যতা!

📘 আকাশের ওপারে আকাশ লস্ট মডেস্টি 📄 ওর সাথে পালালাম

📄 ওর সাথে পালালাম


এক.
পরপর বেশ অদ্ভূত কয়েকটা ঘটনা ঘটলো সেদিন। অল্প সময়ের ব্যবধানে। তবে ঘটনাগুলো থেকে কোনো উপসংহার টানার মতো বয়স ছিলো না আমার। বেশ ছোট ছিলাম, ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ি কেবল।

নদীর ধারেই ছিল আমাদের স্কুল। হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল পাশাপাশি। কমন মাঠ। মনে আছে সেদিন বাতাস হচ্ছিল ব্যাপক। একটা বাবলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম হাইস্কুলের মেয়েদের কমন রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শিউলি আপা। একটু উসখুস করছে। হঠাৎ করে মাটি ফুঁড়েই যেন উদয় হলো হাসান ভাই। আমাদের এলাকার স্ট্রাইক বোলার। সে সময়ের ক্রেজ শোয়েব আখতারের মতো বোলিং অ্যাকশান। প্রথম ওভারে একটা বোল্ড আউট করবেই করবে। হাসান ভাইকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। স্কুলে তার কাজ কী? সে তো স্কুল পাশ দিয়ে ফেলেছে!

হাসান ভাই শিউলি আপার দিকে এগিয়ে গেলো। ম্যাজিকের মতো শিউলি আপার হাতে একটা ট্রাভেল ব্যাগ বের হয়ে আসতে দেখলাম। হাসান ভাই ব্যাগটা নিয়ে একটা দৌড় দিলো। বল ছোড়ার আগে রানআপ নেবার সময় যে স্পিডে দৌড়াতো, তার চাইতেও বেশি জোরে। দেখলাম ব্যাগ নিয়ে সে দৌড়ে স্কুলের পেছনের রাস্তায় চলে গেল। সেখানে তার সাথে যোগ দিল আপন ভাই।

এরপর তারা কী করলো, কোথায় গেল, তা আর খেয়াল করিনি। স্কুলে একটা নতুন লাইব্রেরি হচ্ছে। সেটা নিয়েই বেশ উত্তেজিত ছিলাম আমরা। লাইব্রেরির আলোচনায় মজে গেলাম। একটু পর ক্লাসের ঘণ্টা পড়লো।

স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরে ভাত খাচ্ছি। আমি, আমার বোন, আম্মু। আকাশ কালো করে বৃষ্টি ঝরেছে ঘণ্টাখানেক। এখন বৃষ্টিটা ধরে আসলেও মাঝে মাঝে মেঘ গর্জন করে জানান দিচ্ছে—আরে আমি আছি, যাই নাই এখনো। দক্ষিণ দিকের দরজাটা খোলাই ছিল। সে দরজায় উদয় হলো ভীষণ দুঃখিত এক মূর্তি। মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব দুঃখ সিন্দাবাদের ভূতের মতো তার উপর এসে ভর করেছে।

'আম্মাজান, আমার মেয়েটা কোথায়, বলতে পারিস? ওকে খুঁজে পাচ্ছি না'—বুক ফাটা আর্তনাদ করে আমার বোনকে প্রশ্ন করলো লোকটা। আরে, এ যে বকুল কাকু! শিউলি আপার বাবা!

ভরদুপুর, কিন্তু মেঘ আর বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যার মতো মনে হচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকের আলো-আঁধারিতে আমাদের দরজায় দাঁড়ানো পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেলা এক পিতা, তার অসহায় আর্তনাদ...এ দৃশ্যের কথা আমি ভুলতে পারি না। সেই ঘটনার পর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের প্রলেপে সব ক্ষতই সেরে উঠে। কিন্তু এই দৃশ্য, সেই বুক চেরা আর্তনাদের স্মৃতি এখনো বিষণ্ণতায় ভোগায় আমাকে। দম ফেলার সময় নেই এমন কর্মব্যস্ত দিনেও উদ্যমহীন করে ফেলে।

শিউলি আপাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুল থেকে বাসায় ফেরেনি। আলমারি থেকে জামা কাপড় সোনার গহনা সব মিসিং! আপন ভাইয়ের সাথে শিউলি আপার প্রেম ওপেন সিক্রেট। এটা পাড়ার যেকোনো ছাগলকে জিজ্ঞাসা করলেও কাঁঠাল পাতা চিবানোর ফাঁকে ফাঁকে সে বিস্তারিত সব বলে দিতে পারবে! কাজেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো কোনো কঠিন কাজ ছিল না।

আম্মু আর আপুর পরামর্শে আমাদের বাসার কাছেই শিউলি আপার অন্য এক বান্ধবী টিনা আপার বাসায় গেল বকুল কাকু। তার পিছু পিছু গেল হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা কাকী।

পরে জেনেছিলাম সেই বাসাতেই লুকিয়েছিল শিউলি আপা। টিনা আপা আর তার পরিবার বকুল কাকুকে মিথ্যা বলে। সেখানেও খুঁজে না পেয়ে বকুল কাকু পাগলের মতো হয়ে যায়। বুক চাপড়ে কান্না করতে করতে এর ওর বাড়িতে খুঁজতে থাকে। মেয়েকে হারানোর ভয়ে ভীত বকুল কাকুকে যখন টিনা আপা ভূগোল বোঝাচ্ছিল, তখন ধানের গোলায় লুকানো শিউলি আপা সব শুনছিল, উঁকি মেরে দেখছিলও। বুঝতে শেখার পরে অনেকবার মনে হয়েছিল শিউলি আপাকে একবার প্রশ্ন করি— বাবার এমন অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা দেখার পরেও আপনার মনে এতোটুকুও দয়া হলো না? একবার মনে হলো না, বের হয়ে বাবার হাত ধরে বলি—বাবা ভুল হয়ে গেছে, চলো বাড়ি চলো! বাবার এতো ভালোবাসা, এতো মায়া, এতো মমতার কি কোনো দাম নেই? প্রেম কি এতোটাই অন্ধ?

দুই.
ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার মোড়। সন্ধ্যা।
রাস্তায় পড়ে আছে ১৯-এ পা দেওয়া এক তরুণী। শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। কাতর কন্ঠে সাহায্য চাইলো পথচারীদের কাছে। একজন তাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। হঠাৎ করেই দুনিয়ার নির্মম কুৎসিত দিকটা উন্মোচিত হয়ে গেছে তার সামনে। অথচ তিন দিন আগেও সম্পূর্ণ অন্য জীবন ছিল তার।

তামজিদ হোসেন আদর (২২) মেয়েটার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। যাত্রাবাড়িতেই থাকে দুজন। দুজনই আবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। এক বছর তিন মাস ধরে প্রেম করছিল তারা। তিন দিন আগে বিয়ে করবে বলে বাসা থেকে চলে আসে দুজন। রোমাঞ্চকর জীবনের স্বপ্নের আবির নেমেছিল তরুণীর চোখে। তিন দিন তারা বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে দেয়। সব শেষ সোমবার বেলা তিনটার দিকে তাকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার একটি হোটেলে নিয়ে যায় তামজিদ।

হোটেল রুমটিতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আরো তিন জন। প্রেমিক তামজিদ আশ্বস্ত করে, ' ওরা বিয়ের সাক্ষী হতে এসেছে, জান' । নিশ্চিন্ত হয় সে। কিন্তু তারপর নরক নেমে আসে হোটেলের সেই রুমে...
...ওরা চারজন মিলে ধর্ষণ করে তাকে। এক পর্যায়ে ভয় দেখায়—কাউকে কিছু জানালে জানে মেরে ফেলবো, আর তোর নগ্ন ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ধর্ষিত, প্রতারিত, মৃত্যুভয়ে ভীত তরুণী কাউকে কিছু জানাবে না বলে আশ্বস্ত করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরে এসে রাস্তায় পড়ে যায় সে।

সিলেট। ওসমানীনগর।
***
মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক। তারপর প্রেমিককে বিয়ে করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় ১৭ বছরের কিশোরী। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখে প্রেমিক নেই। হতাশ কিশোরীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে গ্যারেজে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে এক সিএনজি চালক।

***
ঘাটাইল উপজেলার গৌরিশ্বর গ্রামের আসকরের ছেলে আল আমিন (২৫) এর সঙ্গে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এক স্কুলছাত্রীর। ঈদুল আযহার সময় প্রেমিকের ফোন পেয়ে ওই কিশোরী নানার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে ঘাটাইল উপজেলার চেংটা গ্রামে যায়। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একটি বাড়িতে রেখে একটানা ২৫ দিন ওর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় প্রেমিক। পরে আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে আসে। বাসস্ট্যান্ডে আল আমিনের বন্ধু, পাচারকারী চক্রের সদস্য ট্রাকচালক মাসুদের ট্রাকে উঠে তাদের গন্তব্যে রওনা হয়। পরদিন ভোর ৫টার দিকে একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ওই স্কুলছাত্রীকে। সেখানে চার-পাঁচজন মিলে তাকে গণধর্ষণ করে। পরে তাদের আলাপচারিতায় কিশোরী বুঝতে পারে, তাকে ভারতে পাচার করার পরিকল্পনা করছে ওরা। পরে সে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ড আসে। সেখান থেকে বাড়িতে ফেরে সে।

***
ধর্ষণ, প্রতারণা, আত্মহত্যা বা খুনের এমন ঘটনা খুবই কমন। তুমি হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। হয়তো ভাববে, 'আরেহ! আমার সাথে কখনোই এমন কিছু হবে না। ও আমাকে এতো ভালোবাসে, আমাকে করবে ধর্ষণ! আমার সাথে করবে প্রতারণা! এসব বিশ্বাস করতে বলেন আমাকে?'

আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, তুমি গুগলে ৫/১০ মিনিট একটু সার্চ করে দেখো। ধর্ষণ, খুনের ঘটনা পড়তে পড়তে অসুস্থ হয়ে যাবে। এরাও সবাই তোমার মতো উপেক্ষা করেছিল সকল সতর্ক সংকেত। প্রেমে মোহান্ধ মন আপাদমস্তক বিশ্বাস করেছিল এমন মানুষকে যাদের হাতেই অসংখ্যবার খুন হয়েছে তারা।

সমাজ তথাকথিত আধুনিক, প্রগতিশীল, মুক্তমনা হবার সাথে সাথে ধর্ষণ খুনের মতো ঘটনাগুলোও বাড়ছে হু হু করে। তবে সংবাদ মাধ্যমে আসার চাইতে, না আসা ঘটনার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি ধর্ষিত হয়েছি এটা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে চায় না অনেকেই। বাড়ি থেকে পালানোর পর প্রেমিকের হাতে, প্রেমিকের বন্ধুদের কাছে বা হোটেলের ম্যানেজার, কর্মচারী, বাসের ড্রাইভার, হেল্পার বা যেখানে বাসা ভাড়া নিয়েছিল সেখানকার কারো হাতে ধর্ষণের শিকার হবার পর, কিংবা প্রেমিক পালানোর পর চুপি চুপি ঘরে ফিরে আসার ঘটনা নেহায়েত কম নয়। মফস্বল বা গ্রামগুলোতে এসব ঘটনা চাপা না থাকলেও ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের স্বার্থপর নাগরিক জীবনে এমন অজস্র ঘটনা চাপা পড়ে থাকে। কেউই হয়তো জানছে না, সামাজিকভাবে লজ্জিত, লাঞ্ছিতও হতে হচ্ছে না, বিয়েও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু থেকে যাচ্ছে দুঃসহ সব স্মৃতি। সারাটা জীবন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বোবা কান্না, গ্লানিবোধ আর বিষাদ কুরে কুরে খাচ্ছে বাকি জীবনটা। কেলেঙ্কারির ভয়ে বিচারও চাওয়া যায় না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো ধর্ষণ বা শারীরিক মিলনের ভিডিও করে রাখার ট্রেন্ড। একবার ভিডিও বা ছবি তুলে রাখার পর সেটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে চলে সিরিজ আকারে ধর্ষণ, গণধর্ষণ। টাকাপয়সা দিয়েও পার পাওয়া যায় না!

আর গ্রাম বা মফঃস্বল হলে কী ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি যে হতে হয়, তা ভূক্তভোগী ছাড়া আর কেউ কল্পনা করতে পারে না। প্রতিনিয়ত প্রতিবেশীদের কাছে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় পরিবারের সবাইকে। বিয়ে হতে চায় না। পতিতা, বাজারি মেয়ে টাইপের চিরস্থায়ী ট্যাগ লেগে যায়... একটা পরিবার আসলে একদম শেষ হয়ে যায়। ঘরে ফিরে আসলেও জীবনে আর ফেরা হয় না।

আপু, তুমি হয়তো বুঝতে পারবে না তোমার বাবার কাছে, তোমার ভাইয়ের কাছে তোমার স্থান কোথায়। তোমার জন্য কতোটা ভালোবাসা, কতোটা স্নেহ, কতোটা আবেগ জমানো রয়েছে তাদের বুকে! তোমার এক বিন্দু অসম্মান হবে, তোমাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলা দূরে থাক বাজে চিন্তা করবে এটাও তারা মেনে নিতে পারেন না। একজন সত্যিকারের গায়রত সম্পন্ন মুসলিম ভাই বা বাবা তোমার সম্মান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। মদীনার এক ইহুদি একজন মুসলিম নারীর সম্মানহানির চেষ্টা করেছিল শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারণ করেন। যুদ্ধের পোশাক পরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। দূর ভারত মহাসাগরের বুকে মুসলিম বোনের সম্মান রক্ষার জন্য ১৭ বছরের মুহাম্মাদ বিন কাসিম সেনাবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। অত্যাচারী শাসক মুহতাসিম পর্যন্ত মুসলিম বোনের আহ্বানে সাড়া উমর নামে পরিচিত মাদ্রাসার এক শিক্ষক ধর্ষিতা বোনের সম্মানের প্রতিশোধ নেবার জন্য বেরিয়ে পড়েন ছাত্রদের নিয়ে। বদলে ফেলেন আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস! এখনো মেয়ের ধর্ষককে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণের ঘটনাও মাঝে মাঝেই শোনা যায়!

আর সেই তুমিই নিজে যেচে পড়ে তোমার ইজ্জত অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছো। অন্যরা তোমাকে ব্যবহার করে ছেড়ে দিচ্ছে, তুমি গুমরে গুমরে কাঁদছো, তোমার ভিডিও, ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইনে। পত্রিকার শিরোনাম বা সম্পাদকীয়তে তোমাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে, তোমার বিয়ে হচ্ছে না, তুমি ঝুলে পড়ছো ফ্যানের সাথে... এমন পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থাটা কী হয় একবার চিন্তা করো!

তোমার বাবার কলিগ, তোমার পাশের বাসার আন্টি-ওরা কি তোমার আব্বু আম্মুকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেবে? টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে আদরের যেই ভাইটাকে তুমি চকলেট কিনে দিতে, সেই ভাইটা স্কুলে যাবে কীভাবে সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছো? যখন আশেপাশে মানুষজন আড়ালে আবডালে তোমাকে পতিতা হিসেবে সম্বোধন করে, যখন তোমাকে নিয়ে রসালো আলোচনা চলে-তোমার ভাই বা বাবা উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা বদলে ফেলে, কলজের মধ্যে ছুরি মারা টিটকিরির রহস্যময় হাসি হাসে, যখন তোমার সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো করে...তখন তাদের অবস্থা কেমন হয়? কীভাবে সহ্য করে তারা?

তুমি এতো স্বার্থপর কেন? বাবার প্রতি, ভাইয়ের প্রতি, পরিবারের প্রতি তোমার ভালোবাসা কোথায়? কোন অধিকারে তুমি তাদের ভালোবাসা তুচ্ছ করছো? এতোদিন ধরে কোলে পিঠে, খেয়ে না খেয়ে তোমাকে মানুষ করেছে তারা। সেই ভালোবাসাকে তুমি কীভাবে অস্বীকার করছো? কোন ভালোবাসা পায়ে ঠেলে কোন ভালোবাসার জন্য ঘর ছাড়ছো তুমি? ভালোবাসার কিছু বোঝো তুমি?

ভাইয়া, একবার ভাবো তোমার বোনের সাথে যদি কেউ এমন করতো, তোমার বোনকে যদি কেউ এভাবে 'খেয়ে ছেড়ে দিতো' বা তোমার মেয়েকে যদি কেউ ব্যবহার করে, তোমার কেমন লাগবে? তুমি মেনে নিতে পারতে? জানোয়ারটাকে খুন করে ফেলতে না? তুমি কি চাইবে তোমার বোন কোনো ছেলের সাথে বিছানায় যাক? তাহলে কীভাবে আরেকজনের আদরের মেয়ে, আরেকজনের বোনের সাথে তুমি এমন করার কথা চিন্তা করো?

দেখো, তোমাদের এই বয়সটাতে আসলে সংসার জগৎ সম্পর্কে তেমন ধারণা থাকে না। তোমরা ভাবো যে অনেক বড় হয়ে গেছো, অনেক কিছু বুঝে ফেলেছো; কিন্তু আদতে সংসারের অলিগলি সম্পর্কে তোমাদের ধারণা থাকে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
প্রেম করা আর বিয়ে করে এক ছাদের নিচে থাকা আসলে এক জিনিস না। তোমার কি মনে হয় রোমিও-জুলিয়েট বা লাইলী-মজনু ঘর বাঁধার সুযোগ পেলে রূপকথার মতো সুখে শান্তিতে বসবাস করতো? বিয়ের পাঁচ বছর পর বা দুই বাচ্চার মা হবার পর বিয়ের আগে প্রেম করা অবস্থায় তারা যেমন জীবনের স্বপ্ন দেখতো তেমন জীবন যাপন করতে পারতো? আচ্ছা বলো তো, বেশির ভাগ নাটক কিংবা সিনেমায় শুধু বিয়ের আগের প্রেম থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত কেন দেখানো হয়? কেন পরের অংশ দেখানো হয় না?

একটু খোলাখুলি কথা বলি। সত্য প্রকাশে আসলে লজ্জা করতে হয় না। 'একে অন্যকে ছাড়া বাঁচবো না', 'ওকে ছাড়া আমি কাউকে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না', একদিন না দেখলে পাগলের মতো হয়ে যাওয়া (হালের আঁতেল সাহিত্যিকরা যাকে 'তোমাকে দেখার অসুখ' হিসেবে ব্যাখ্যা করে), এক ঘণ্টা ইনবক্সে আপডেট না পেলে অস্থির লাগা—এসব কিছুর পেছনেই শরীরের রহস্য একটা বড় ফ্যাক্টর।
বিয়ের আগে একজন অপরকে পরিপূর্ণরূপে আসলে পায় না। একটা রহস্য, একটা রোমাঞ্চ থেকেই যায়। বিয়ের পর এই রহস্যের জট আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। মাথা ঠাণ্ডা হয়। কৌতূহল মিটে যায়। সেই সাথে কমতে থাকে আগেকার আবেগ- অনুভূতিগুলোর তীব্রতা। পাশাপাশি বিয়ের আগে প্রায় সকল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে একটা ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে—'ওকে আমার বউ বানাতেই হবে' বা 'ওকে আমার স্বামী করতেই হবে'। বিয়ের পরে তো এ ইচ্ছা পূর্ণ হয়ে যায়। শরীরের রহস্য উন্মোচিত, নিজের তীব্র ইচ্ছাও পূর্ণ...মোহ, আবেগ কমে যায়, একসময় একেবারে হারিয়েই যায়। মোহের চশমা খুলে তখন বাস্তবতার চোখে পরিষ্কারভাবে সব কিছু দেখা শুরু হয়।

বাসা থেকে পালানোর সময় সঙ্গে করে কিছু টাকা, স্বর্ণের গহনা ইত্যাদি নিয়ে যাবে হয়তো। কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা হোটেলে উঠবে। কয়েকদিন পর যখন আত্মীয়ের বাসায় আর থাকা সম্ভব হবে না, বা টাকা ফুরিয়ে যাবে তখন ভালোবাসাটাও আস্তে আস্তে ফুরাতে শুরু করবে।
ভাইয়া, প্রেম করার সময় বাপের হোটেলে খেতে তুমি। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করা লাগতো না, এখন টাকা কামানোর জন্য তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে। অনেক অড জব করতে হবে। একদিন হয়তো ভালো লাগবে, দুইদিন হয়তো মনে হবে যে, তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষের জন্য কষ্ট করছো, আত্মতৃপ্তি আসবে... কিন্তু কিছুদিন পর পরিশ্রমের ধকল সামলাতে পারবে না।

আপু, বাসায় থাকতে হয়তো তুমি জীবনেও রান্নাঘরের চৌকাঠেও পা রাখোনি, খাবার জন্য হয়তো বিছানা থেকেও নামোনি, বিছানাতে খাবার দিয়ে গেছে। তোমাকে এখন কালিঝুলি মেখে রান্না করা লাগবে, হয়তো বস্তি টাইপের বাসায় থাকা লাগবে। ঘরের সব কাজ করা লাগবে। একদিন দুইদিন ভালো লাগলেও বেশিদিন এমন জীবন যাপন সহ্য করতে পারবে না। তোমাদের আগে যে লাইফস্টাইল ছিল, যে খাবার দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদে অভ্যস্ত ছিলে, সেটা আর পাবে না। অনেক, অনেক, আবারো বলি, অনেক সংগ্রাম করতে হবে। সংসারে অভাব অনটন আসবে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে শরীরে ক্লান্তি আসবে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাবে। শুরু হবে সংসারে অশান্তি, গণ্ডগোল, মারামারি! এখান থেকেই শুরু হবে বিচ্ছেদের পথ!

দেখো, মানুষের অন্তর শুধু প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ভালোবেসে বা ভালোবাসা পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না। আল্লাহ মানুষকে এভাবে বানাননি। মানুষের অন্তরে বাবা, মা, ভাই, বোনের জন্য ভালোবাসার একটা স্থান আছে। এই ভালোবাসা অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হবে না। খালিই থেকে যাবে। পরিবার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে পালিয়ে গিয়ে তুমি ভালোবাসার এই স্থানটা অপূর্ণ রেখে দিচ্ছো। মোহ কেটে যাবার পরপরই হৃদয়ের এই অপূর্ণ স্থান থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হবে তোমার। বিশেষ করে সংসারের প্রকৃত নির্মম, কঠোর বাস্তবতা তোমার সামনে এসে হাজির হবার পর। মানুষের জীবনে পরিবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে নিজেকেই আল্লাহর আসনে বসানো পাশ্চাত্য সভ্যতা পরিবারকে টুকরো করতে করতে এখন 'নাই' করে ফেলেছে। এতে ভেঙে পড়েছে তাদের জীবন ব্যবস্থা। হতাশা আর চরম অবসাদে ভুগে নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেও দেরি হয়ে গিয়েছে। সুপারসনিক গতিতে তারা এগুচ্ছে পতনের দিকে।

বাসার আরাম আয়েশ, বাবা-মার আদর ভালোবাসার কথা বারবার মনে পড়তে থাকবে তোমার। প্রতিবার টাকার অভাবে পড়লে, কাজের কঠোর পরিশ্রমের সময় তোমার মনে পড়বে বাবার কথা, বড় ভাইয়ের কথা... ইশ! তারা যদি থাকতো, এভাবে মানুষের ঝাড়ি খেয়ে কাজ করা লাগতো না সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য। ইশ! তারা থাকলে আমাকে টাকার জন্য এতো চিন্তা করা লাগতো না!

দুপুরে বা রাতে খেতে বসে তোমার বারবার মনে পড়বে বাসার সেই মজার খাবারগুলোর কথা। মা আদর করে, যত্ন করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন। মনে হবে ভাইয়ের সাথে খুনসুটি, দুষ্টুমির কথা। বোনের কপট শাসন, রাগের কথা। হয়তো ভীষণ ভাবে মিস করবে বাড়ির বেড়াল, পাশের বাসার ফোকলা দাঁতের পিচ্চি বা ছক্কা হাঁকানো সেই ক্রিকেট মাঠ, অথবা বাড়ির সামনের বকুল গাছটার কথা। অতীত স্মৃতির ডালপালা সাজিয়ে হাজির হবে ঈদের দিনগুলো। এক অদৃশ্য কারাগারের কয়েদি মনে হবে নিজেকে। চোখ ভিজে যাবে জলে।

এই হাহাকার, অভাব-অনটন, পালানোর পরে দুজনে একসাথে রূপকথার মতো সুখী জীবন যাপনের স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে যাওয়া, ঝগড়া, অশান্তি-সবকিছুর জন্য তখন দায়ী মনে হবে ওকে। অভিযোগের আঙুল উঠে যাবে সেই মানুষটার দিকে যার জন্য তুমি বাকি সব কিছুকে, বাকি সবাইকে তুচ্ছ করেছিলে। তখন তোমার মনে হবে-ওর জন্যই আমার আজকে এই অবস্থা!
অনেকেই হয়তো ভাবে, পালিয়ে গিয়ে বিয়েটা একবার করে ফেললেই বাবা-মা মেনে নিতে বাধ্য হবে। বিয়ে যেহেতু করেই ফেলেছে এখন তো আর কিছু করার নেই মেনে নেওয়া ছাড়া। মানসম্মান আরো বেশি হারানোর ভয়ে মেনে নেবে, বা একটা বাচ্চা হয়ে গেলে নাতিনাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা আর রাগ করে থাকতে পারবে না। এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যি। তবে সবসময় যে এমন হয়, তা না। আর উপরে উপরে মেনে নিলেও আজীবন বাবা-মা'র মনে আক্ষেপ থেকেই যায়। সন্তান পালিয়ে গিয়ে মানসম্মানের যে ক্ষতি করেছে, যে কষ্ট দিয়েছে, বাবা-মা'র উপর প্রেমিক/প্রেমিকাকে প্রাধান্য দেবার বিষয়টা সবার সামনে প্রমাণ করেছে—এই বিষয়গুলো তারা ভুলতে পারেন না। মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। একটা অনতিক্রম্য দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় সন্তানদের সাথে। দু'আ, ভালোবাসা, আদর, মায়ামমতার সুতো আলগা হয়ে যায়। মনে হয় বাবা-মা আর সন্তানদের নিয়ে একটা ধারাবাহিক নাটক চলছে। সবাই যে যার ভূমিকায় সুনিপুণ অভিনয় করে চলেছে। কিন্তু বাইরে থেকে সবকিছু দেখলে স্বাভাবিক মনে হলেও কিছুই স্বাভাবিক থাকে না। সুখ থাকে না।

আর এভাবে উপরে উপরে মেনে নিতেও যে সময়টা লাগে এই সময়ের ভেতরেই সংসারের গুঁতা খেয়ে হালুয়া টাইট হয়ে 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' টাইপের অবস্থা হয়ে যায়। কড়ায় গণ্ডায় মিটে যায় বিয়ের শখ। প্রেমিক, প্রেমিকাকে ছেড়ে পালায় বা ডিভোর্স হয়ে যায়।

তিন.
শিউলি আপা আর আপন ভাইয়ের সংসার সুখের হয়নি। আপন ভাই বেকার ছিল। কাজকর্ম করার ব্যাপারে তার তেমন কোনো গরজ ছিল না। ফুটবল আর ক্যারাম খেলা নিয়েই পড়ে থাকতো। সংসারে অভাব আসলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়— সেই পুরোনো প্রবাদটা আবারো তার সত্যতা জানান দিলো। ছ'মাস না পেরুতেই ঝগড়া, অশান্তি, অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেল শিউলি আপার সংসারে। কিছুদিন পর একটা মেয়ে হলো আপার। মেয়েকে দুধ কিনে খাওয়ানোর পয়সা পর্যন্ত ছিল না। না খেয়ে খেয়ে বাচ্চাটার কঙ্কাল বের হয়ে যাবার অবস্থা! শিউলি আপা অনেক রূপবতী ছিলেন। উনার অবস্থাও সহ্য করার মতো না। সংসারের কাজের চাপে, উপোস, আধপেটা খেয়ে খেয়ে, বাচ্চা হবার ধাক্কা সামলানোর মতো অবস্থা ছিল না তার শরীরের। শরীর ভেঙে পড়ে। চোখের নিচে জমে চিরস্থায়ী গ্লানির কালি। মেয়ে আর নাতনির অবস্থা দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বকুল কাকুরা সম্পর্ক মেনে নেন। সাধ্যমতো সাহায্য করতে থাকেন। তবে সুদিন আর ফেরেনি।

হতাশায় ভুগে আপন ভাই গাঁজার নেশায় ডুব দিলো। বাপের কাছ থেকে মেয়েকে দুধ কিনে দেবার কথা বলে টাকা নিতো। তারপর চিপায় বসে দিনরাত গাঁজা টানতো। মাঝে মাঝে বিকেলে মাঠে গিয়ে ফুটবল শটাতো।
এভাবেই চললো বেশ কয়েক বছর। ততোদিনে অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছি। প্রাইমারি শেষ করে অন্য এলাকার স্কুলে ভর্তি হয়েছি। একদিন খবর পেলাম, আপন ভাইয়া হসপিটালে ভর্তি। শিউলি আপার সাথে রাগারাগি করে কীটনাশক খেয়েছে কয়েক বোতল। তিনদিন দুইরাত হসপিটালে ভর্তি ছিল সে। তারপর হসপিটাল থেকে ছুটি মেলে তার। তবে বাড়ি ফেরা হয় না। ঠাঁই হয় পুরোনো এক অশ্বত্থ গাছের নিচে। কবরে। শুনেছিলাম, শিউলি আপার পরে অন্য এক জায়গায় বিয়ে হয়েছিল। পরের কোনো খবর আর জানি না। জানার ইচ্ছেও হয়নি কোনো দিন।

বকুল কাকুদের খুব সুখের সংসার ছিল। শিউলি আপার ঘটনায় একেবারে ছারখার হয়ে গেল সব। শিউলি আপা পালিয়ে বিয়ে করার কারণে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে অনেক বাঁকা কথা শুনতে হলো তাদের। গ্রামে যারা থাকেনি, তাদের আসলে বলে বোঝানো যাবে না—এ ধরনের ঘটনাগুলোর কারণে কী ধরনের কথা শুনতে হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেনি শিউলি আপার ঘটনার চেইন ইফেক্ট।

শিউলি আপার একটা ছোট বোন ছিল। ধরি, তার নাম রূপা। আমার চাইতে বছর দুয়েকের বড়, যা মনে পড়ে। অসম্ভব রূপবতী। রূপবতীদের রূপের ধার আশপাশ তছনছ করে দেয়। তার বেলাতেও ব্যতিক্রম ছিল না। সে হেঁটে গেলে পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচ থেমে যেতো। একটু লাজুক, গুডবয় টাইপের ছেলেরা আফসোস ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। পেকে যাওয়া ছেলেরা শ্রবণ অযোগ্য এমন সব কথা বলতো যা সভ্য সমাজে উচ্চারণ করা যায় না।
শিউলি আপার ঘটনার কারণে এই মেয়েকে নিয়ে খুব ভয় করতো বকুল কাকুরা। আরেকবার অমন কিছু হলে সেই শোক সহ্য করার মতো শক্তি ছিল না তাদের। রূপাকে খুব কড়া শাসনে রাখতো, একেবারে চোখে চোখে। 'শাসন ভালো, তবে এতো কড়া শাসন ভালো না। বিশেষ করে মেয়েদের। শিউলির মতো কিছু করার মেয়ে না রূপা। অসম্ভব পার্সোনালিটি ওর'—আমার বাবা, কাকুকে মাঝে মাঝে বোঝাতো। কিন্তু কাকু বুঝতে চাইতো না। বাবা ঠিকই বলেছিলেন। শিউলি আপার মতো কিছু করেনি রূপা। তবে যা করেছে তা আমরা কেউই ভাবতে পারিনি।

এসএসসির পর শহরে একা একা পড়তে আসতে চাইলো রূপা। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো বকুল কাকুরা। বেঁচে থাকার অবলম্বন রূপাকে একা ছাড়তে চাইলো না। কিন্তু রূপা শহরে পড়বেই। কোনো কথা শুনতে চায় না। প্রায়ই এ নিয়ে রূপার অভিমান, ঝগড়া, অশান্তির খবর শোনা যেতো। বকুল কাকুরাও কড়া শাসন করতো। মে মাসের এক সন্ধ্যায় লোডশেডিং এর ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়ে ছাদে উঠবো কি না ভাবছি। এমন সময় বাবার ফোন আসলো —
'রূপাকে চিনিস না তুই? ও গলায় দড়ি দিয়েছে! বকুলের সাথে ঝগড়া করে।'
***
রাস্তায় বকুল কাকুর সাথে দেখা হয় হঠাৎ হঠাৎ। প্রতিবারই ভাবি—ইশ, কেন যে দেখা হলো! একসময়ের হাসিখুশি, গোলগাল বকুল কাকু এখন একেবারেই চুপচাপ, নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। মাথার চুল পেকে গেছে। হাঁটেন মাথা নিচু করে, কুঁজো হয়ে। অচেনা আগন্তুক কেউ দেখলেও চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবে—জীবনের ঘাটে ঘাটে মার খেয়ে একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছে এই লোক। হারানোর আর কিছুই নেই তার।

'কাকু কেমন আছেন?' —প্রতিবার এই প্রশ্নের উত্তরে চোখ তুলে আমার দিকে তাকান। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে শূন্য চোখে চেয়ে থাকেন। যেন চেনার চেষ্টা করছেন আমি কে! তারপর ম্লান হেসে বলেন, 'আচ্ছা কাকু, তুমি! হ্যাঁ আছি ভালোই, এইতো চলছে যেমন চলার'।
তারপর আবার আগের মতোই কুঁজো হয়ে, মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করেন। বিড়বিড় করেন কী যেন। যতক্ষণ দেখা যায় আমি তাকিয়ে থাকি। বহু বছর আগের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে আমাদের দক্ষিণের দরজায় দাঁড়ানো সদ্য সন্তান হারিয়ে ফেলা এক পিতার কলজে চেরা হাহাকার, আমার কানে বাজে। মনে হয় মহাকাব্যিক কোন ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য মঞ্চস্থ হচ্ছে আমার সামনে!

টিকাঃ
[৫৭] ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সবার নাম বদলে দেওয়া হলো। বাকি ঘটনা সত্য।
[৫৮] শিউলি আপা আর আমার বোন একই ক্লাসে পড়তো।
[৫১] বিয়ের প্রলোভনে হোটেলে নিয়ে চার বন্ধু মিলে ধর্ষণ, dhakamail.com, মার্চ ০৮, ২০২২- tinyurl.com/bryx2ftp
[৬০] প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে সিএনজি চালকের হাতে ধর্ষিত কিশোরী, gmnewsbd, নভেম্বর ২১, ২০১৭- tinyurl.com/m6k85awy
[৬১] ৪-৫ জন মিলে কিশোরী প্রেমিকাকে ৩৪ দিন ধরে ধর্ষণ, উদ্দেশ্য ছিল পাচারের, news24bd. tv, অক্টোবর ২২, ২০২১- tinyurl.com/bdhanjz9
[৬২] লালমনিরহাটে মুসলিম কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভারতে পাচার করে এক হিন্দু কিশোর। ভারত থেকে সেই কিশোরীর হৃদয়বিদারক কান্না দেখে স্থির থাকা কঠিন— SK media ইউটিউব ভিডিও, Aug ১২, ২০২২- tinyurl.com/24v9tsft jamuna Tv ইউটিউব ভিডিও, Aug ১২, ২০২২- tinyurl.com/mur9sxam প্রেমিককে বিয়ে করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, বাংলাভিশন, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২২ tinyurl.com/ya3hurjb বিয়ের আশ্বাসে বন্ধুর সাথে হোটেলে উঠে গণধর্ষণের শিকার তরুণী, হোটেল ম্যানেজারসহ গ্রেফতার ৬, ২৪ghonta.news, অক্টোবর ১২, ২০২০- tinyurl.com/muec63ar ১৩ ধর্ষণ গণধর্ষণ, দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম, জুলাই ৯, ২০২২- tinyurl.com/msxv57n9
[৬৩] শুধু বাংলাদেশ না, ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতেও ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট খুবই কম হয়। সামনে আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।
[৬৪] ধর্ষণের বিচার না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাবার আত্মহত্যা!, ntvbd.com, এপ্রিল ২৯, ২০১৭- tinyurl.com/2mm49zjs তুমি একবার কি বোঝার চেষ্টা করবে তোমার সম্মান তোমার বাবা, ভাই বা পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?
[৬২] যদি যিনা-ব্যভিচারে না জড়ায়, বা অল্প কয়েকবার জড়ায়। আর যারা বিয়ের আগেই ফুলটাইম স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপন করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের পরপরই তাদের সম্পর্কের বারোটা বেজে যায়।
[৬৬] সামনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px