📄 সম্পাদকের কথা
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
মানুষ ঘুমন্ত, মৃত্যুতে সে জেগে ওঠে...
এক অর্থে, আমাদের পুরো জীবনটাই বিক্ষিপ্ততা আর বিস্মৃতির নানা উপকরণের মিশেল। পৃথিবীর জীবন মানুষকে তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য আর চূড়ান্ত গন্তব্য ভুলিয়ে রাখে। এই জীবনের পরে যে আরেকটা জীবন আছে, যেখানে আমাদের সত্যিকারের আবাসস্থল আর সেই চিরস্থায়ী জীবনের খোরাকি সংগ্রহ করাই যে পৃথিবীতে আমাদের কাজ—দুনিয়া আমাদের এ সত্যগুলো ভুলিয়ে রাখে। পার্থিব জীবন আমাদের সামনে আসে বিক্ষিপ্ততা, বিস্মৃতি আর ভোগের ডালি সাজিয়ে। আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে মানুষ ভুলে থাকে নশ্বর পৃথিবীর সাময়িক আনন্দ আর তুচ্ছ সব ভোগের জন্যে।
নবী (ﷺ) বলেছেন, পৃথিবীতে মুসাফিরের মতো থাকতে। আমাদের অবস্থা হয়েছে সেই মুসাফিরের মতো, গন্তব্যকে ভুলে সফরকেই যে উদ্দেশ্য মনে করে বসে আছে। তার সব মনোযোগ সফর নিয়ে, সব আয়োজন যাত্রাকে উপভোগ করার জন্যে।
মানুষকে ভুলিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণগুলোর একটা হলো প্রেম। প্রেমের ব্যাপারে এই সমাজ ও সভ্যতার মনোভাব ইতিবাচক বললে কম বলা হবে। প্রেমকে রীতিমতো মহিমান্বিত করা হয়। একদম ছোটবেলা থেকেই আমাদের মাথায় গেঁথে যায়— প্রেম ছাড়া জীবন আসলে জীবনই না।
সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, মিডিয়া সবকিছু মিলে প্রেমের ব্যাপারে এক প্রচণ্ড রকমের মাদকতাময় মিথ গড়ে তোলে। আমাদের সামষ্টিক কল্পনায় তৈরি হয় মানব ও মানবীর মধ্যকার অদম্য আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা বিস্ময় জাগানো এক জগৎ। যেখানে আছে পারস্য গালিচা, রঙিন পর্দা, চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতি আর নিটোল মুক্তো-প্রবাল দিয়ে সাজানো ভালোবাসার সুরম্য প্রাসাদ। যেখানে প্রত্যেক ক্লান্ত প্রাণের জন্য অপেক্ষা করে থাকে কোনো না কোনো নিখুঁত মানবী। যেখানে পুরুষ মাত্রই নিজ নিজ গল্পের রাজপুত্র, নারী মাত্রই রাজকন্যা। এই কল্পরাজ্যে আজ আমরা সবাই ঢুকে গেছি। অথবা বলা যায়, মাথার ভেতর এই কল্পরাজ্যের টুকরো নিয়ে ঘুরছি আমরা সবাই। কোন এক সামষ্টিক স্বপ্নের মতো।
কিন্তু কল্পরাজ্যের অস্তিত্ব কল্পনাতেই। বাস্তবতা ভিন্ন। গত একশো বছরে প্রেম আর নরনারী সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ১৯০০ সালে, অ্যামেরিকায় ১৯ বছর বয়সের আগে বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৬% নারীর। ১৯৬৮ সাল নাগাদ এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০%-এ। ২০১৪ সালে ৭৫%। তথ্যগুলো অ্যামেরিকার। তবে আমাদের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিকতা, প্রগতি আর উন্নতির নামে আমরা তো তাদেরই অনুসরণ করছি। তারা যে পথে হেঁটে গেছে, সে পথেই তো আমরা হাঁটছি কিছুটা দূর থেকে।
এই পরিবর্তনের ফলাফল কী? সমাজ ও সভ্যতায় আমরা কী দেখছি আজ? হতাশা, বিচ্ছেদ, বিকৃতি, অবক্ষয়, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, পরকীয়া, পরিবারের ভাঙন, মা-বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠা ক্রুদ্ধ প্রজন্ম, কোটি কোটি গর্ভপাত, 'উন্নত' বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকা জন্মহার, যৌন বিকৃতি, যৌন রোগ, নৈরাশ্যবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, বিচ্ছিন্নতা, ভেঙে পড়া সমাজ... আধুনিকতা আর প্রগতির তৈরি অসুখের তালিকা অনেক লম্বা। আমাদের সেই সামষ্টিক কল্পরাজ্যের পরিণতি হলো আজকের এই দুঃস্বপ্ন।
নারী ও পুরুষের মধ্যকার অদম্য আকর্ষণ অস্বীকার করা বা চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং পরিবার কাঠামো মানুষের সহজাত তাড়নাকে এমনভাবে চালিত করে যাতে তা ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার জন্য কল্যাণকর হয়। আত্মকেন্দ্রিক সুখের বদলে সামগ্রিক কল্যাণ অর্জিত হয়। কিন্তু আধুনিকতা এই কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা আর প্রগতির নামে যৌনতা এবং/অথবা প্রেমকে বিচ্ছিন্ন করেছে পরিবার, বিয়ে, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা থেকে। চূড়ান্ত মাপকাঠি বানিয়েছে ব্যক্তির সুখ, উপযোগ আর সম্মতিকে। এর অনিবার্য প্রভাব পড়েছে সমাজ, পরিবার এবং সভ্যতায়। তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সভ্যতার জীবনীশক্তি। মাঝসাগরে আলগা হয়ে গেছে অতিকায় জাহাজের গাঁথুনি। কিন্তু বেখবর যাত্রীরা এখনো আত্মকেন্দ্রিক উল্লাসে মত্ত...
একজন মানুষ মাদক ব্যবহার করলে সেটাকে হয়তো তার ব্যক্তিগত সমস্যা বলা যেতে পারে। কিন্ত সমাজ ও সভ্যতা যদি মাদকাসক্তিকে মহিমান্বিত করে, সাফল্যের মাপকাঠি, জীবনের আবশ্যকীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রচণ্ড আকর্ষণীয় করে একে তুলে ধরে এবং মাদককে সহজলভ্য করে দেয়, এবং কোটি কোটি মানুষ সেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে-তাহলে সমাজের চিন্তার অক্ষকে বদলে দেওয়া ছাড়া, কেবল ব্যক্তির উপর মনোযোগ দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করা যায় না।
সবকিছু যেভাবে চলছে, সেভাবেই যদি চলে তাহলে পশ্চিমকে গ্রাস করা অন্ধকার, যার ছায়া এরই মধ্যে এ মাটিতেও দীর্ঘ হয়ে গেছে-একদিন আমাদেরও পুরোপুরিভাবে গ্রাস করে নেবে। এ পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে প্রেম, ভালোবাসা, নর ও নারীর সম্পর্ক নিয়ে সমাজ ও সভ্যতার শেখানো চিন্তার ধরনটা বদলে ফেলতে হবে। বের হয়ে আসতে হবে কল্পরাজ্য থেকে। কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে, নিজেদের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও আইনকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশনার সমান্তরালে আনতে হবে। তা না হলে গভীর অন্ধকারের এই ঘুম থেকে কোনো দিন আর জেগে ওঠা হবে না আমাদের। এক দুঃস্বপ্ন থেকে আরো গভীর, গভীরতর দুঃস্বপ্নের অন্তহীন অন্ধকারে আমরা তলিয়ে যেতে থাকবো নিরন্তর।
সমাজের চিন্তা আর মানুষগুলোকে বদলানোর কাজটা সহজ না। সংক্ষিপ্ত না। তবে অসম্ভবও না। হাজার মাইলের দুর্গম পথচলাও একটি পদক্ষেপ দিয়েই শুরু হয়। 'আকাশের ওপারে আকাশ' সেই প্রথম পদক্ষেপের নাম। আমরা আশা করি, মহান আল্লাহ এই বইয়ের মাধ্যমে তাঁর আন্তরিক বান্দাদের উদ্বুদ্ধ করবেন জমাট বাঁধা অন্ধকারে আলোর মশাল জ্বালাতে।
মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদের পক্ষ থেকে এই বইটি আমলে জারিয়াহ হিসেবে কবুল করে নিন। কাজটিকে এ জাতির জন্য উপকারী বানিয়ে নিন। আমরা দু'আ করি, আর-রাহমানুর রাহীম এই বইটিকে বিচারের দিন তাঁর দুর্বল গুনাহগার বান্দাদের জন্য নাজাতের উসিলা বানিয়ে দিন। আমাদের রব সাক্ষী, আমরা চেষ্টা করেছি পৌঁছে দিতে। নিশ্চয় সাফল্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং সকল প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের উপর।
আসিফ আদনান
রবিউল আওয়্যাল ১৪৪৪, অক্টোবর ২০২২।
টিকাঃ
[১] "তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি (অল্প সময়ের জন্যে) একজন প্রবাসী বা মুসাফির!' [সহীহ বুখারী: ৬৪১৬, তিরমিযী: ২৩৩৩]
[২] Villaverde et al., (2014). From shame to game in one hundred years: An economic model of the rise in premarital sex and its de-stigmatization. Journal of the European Economic Association, 12(1), 25-61.
📄 কেন এই বই?
এক.
ছেলেটা পড়তো আমার কাছে। মনোযোগী, মেধাবী। খুব ভালো রেসাল্ট ছিল তার। করোনার মাঝে দুই বছর কোনো খোঁজ খবর নেই। একদিন শুনি হুট করে আত্মহত্যা করেছে প্রেমঘটিত ঝামেলায়। খুব খারাপ লাগলো। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় কয়েকদিনের মাঝে আবার ভুলেও গেলাম।
জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কাটাতে হয়েছে হোস্টেলে, হলে, ব্যাচেলর বাসায়। উঠাবসা হয়েছে প্রচুর কিশোর আর তরুণদের সাথে। তাই এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার কাছে নতুন না। শুরুর দিকে অবশ্য খুব শকড হতাম। মনের মধ্যে পাথরের মতো ভার হয়ে চেপে বসতো বিভিন্ন চিন্তা। কিন্তু এখন আর তেমন কিছু মনে হয় না। কিশোর তরুণদের কাছে ভাইয়া থেকে আংকেল হয়ে যাবার বয়সটাতে পা দেবার সন্ধিক্ষণে অনেক আবেগই আজ মরে যাবার পথে, বহু আগেই চিরতরে নির্বাসনে চলে গেছে অনেক কোমল অনুভূতি।
ভেবেছিলাম শুরুর লেখাটা ব্যাপক তথ্যপ্রমাণ আর পরিসংখ্যান নিয়ে এসে, সাহিত্যরস ঢেলে ঢেলে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে লিখবো। এই বইটা আমরা কেন লিখছি, কেন প্রেম নিয়ে ব্যাপক আকারে কাজ হওয়া দরকার তা প্রমাণের চেষ্টা করবো। তাই সম্পাদকের নরম, কিন্তু সূঁচের চেয়েও তীক্ষ্ণ ঝাড়ি খাবার ঝুঁকি নিয়েও অনেক সময় কাটিয়ে দিলাম শুধু লেখার প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু লিখতে বসে কেন যেন শুধু সহজ সরল গল্প বলতে ইচ্ছা করছে। মনের মধ্যে যে গল্পগুলো বহু আগেই হারিয়ে গিয়েছিল, তারা একে একে এসে হাজির হয়ে আবদার জানাচ্ছে-আমার কথা বলতে ভুলে যেও না প্লিজ! কতো বীভৎস গল্প বলবো?
একদিন দুপুরবেলা লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় এসে খেতে বসেছি। পাশের রুমের ছোট ভাই ত্রস্ত পায়ে আমাদের রুমে ঢুকলো। 'ভাই একটু আসেন'-বলেই আবার চলে গেল। কী যেন ছিল ওর চেহারায়। ভাতের প্লেট ফেলে কোনোমতে হাত ধুয়ে গেলাম ওদের রুমে। গিয়ে দেখি সে রুমের আরেক ছোট ভাই গার্লফ্রেন্ডকে ভিডিও কলে রেখে সার্জিক্যাল ব্লেইড দিয়ে হাত কাটা শুরু করেছে!
'মুক্ত বাতাসের খোঁজে' বই লেখা হয়েছে। বাসায় নতুন এক ছোট ভাই আসলো। আমার টেবিলে বইয়ের কয়েকটা কপি দেখে বললো—একটা কপি সে নিতে পারে কি না, তার এক বন্ধুকে দেবে। প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে সেই বন্ধু প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষী হয়ে গিয়েছে। গাঁজা মদের সাথে সখ্য গড়েছে। সাথে সাথে চলছে একটার পর একটা মেয়েকে "ধরে, খেয়ে ছেড়ে দেওয়া"!
একদিন সন্ধ্যার বাসায় ফিরে দেখি গেইটে তালা। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম চাবি নেই। ভুলে গেছি। ছোট ভাইকে ফোন দিলাম। ওরা সবাই মিলে ঘুরতে গেছে, আসতে ১০-১৫ মিনিট লাগবে। প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম। গেইটের সামনের সিঁড়িতে বসেই অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সামনের ফ্ল্যাটেও আমাদের মতো ব্যাচেলর থাকে। হাই হ্যালো হয়। ওদের গেইটেও তালা দেওয়া। একটু পর সিঁড়িতে ধুপধাপ সতর্ক আওয়াজ। দেখি আমাদেরই বয়সী সাজগোজ করা একটা মেয়ে উঠে আসছে। টপ ফ্লোরের সবগুলো ফ্ল্যাটে ব্যাচেলর থাকে। তাহলে এখানে মেয়ে কেন? চার-পাঁচ সেকেন্ড পরে দেখি সামনের ফ্ল্যাটেরই একটা ছেলে ঘামতে ঘামতে প্রায় উড়ে আসছে। আমাকে দেখেই সে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তারপর যন্ত্রের দক্ষতায় তালা খুলে ওর গার্লফ্রেন্ডকে ফ্ল্যাটের ভেতর নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো!
পরের দিন পরীক্ষা ছিল। কিছুই পড়া হয়নি। সকালে উঠে পড়তে হবে ভেবে শুয়ে পড়লাম। রাত প্রায় ২ টার দিকে ফোন আসলো এক আত্মীয়ের কাছ থেকে। উনাদের পরিচিত এক মেয়ের সাথে বয়ফ্রেন্ডের গ্যাঞ্জাম। বয়ফ্রেন্ড ফেইসবুক আইডির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঐ মেয়ের ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করে দিয়েছে। কুৎসিত সব ক্যাপশন। সাথে ফোন নাম্বারও দিয়েছে। বিভিন্ন মানুষজন তাদের ফোন করে বাজে বাজে কথা বলছে। মেয়ে, মেয়ের বাবা-মার পাগলপ্রায় দশা! কিছু করা যায় কি না, এজন্যেই আমাকে ফোন দেওয়া। রাত ৪ টা পর্যন্ত এই সেই করে এক বড় ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে আইডির নিয়ন্ত্রণ পাওয়া গেল। ছবি ডিলিট করে ঘুমালাম। পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না।
একজন নিকটাত্মীয় মারা গিয়েছে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ চলার সময়। কবর দিতে গিয়েছি। সেখানে দেখা হলো আমাদের এলাকার এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে, এলাকার ক্রিকেট টিমের মেইন বোলারদের একজন ছিল সে। সে ভাই আড়াল হতেই এলাকার আর এক বন্ধুর কাছে শুনলাম-ঐ সিনিয়র ভাই পাশের বাসার গৃহবধূকে নিয়ে ভেগে গিয়েছিল কিছুদিন আগে। ঐ ভাইয়ের বাচ্চাকাচ্চা আছে, সেই গৃহবধূরও বাচ্চাকাচ্চা আছে!
কতো কিছু হয়ে যাচ্ছে আজকাল। এলাকায় যাওয়া হয় না তেমন। খবরও রাখা হয় না। তাই খবর পেলাম না আমাদের পাশের বাড়ির, আমাদের চেয়ে ২/৩ বছরের বড় আন্টি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। প্রেমিক বিয়ের আশ্বাস দিয়েছিল, বিছানায় নিয়ে গিয়েছিল অনেক বার। এখন আর বিয়ে করতে রাজি নয়। আমি জানতে পারলাম না...
ক্রিকেট খেলা, ফুটবল খেলা, ভলি খেলা যাকে হাতে ধরিয়ে ধরিয়ে শিখিয়েছিলাম, আমি দুই টাকার একটা বরফ খেলেও যাকে খাওয়াতাম, সেই ছোট ভাই ২ সন্তানের জননীর সাথে চুটিয়ে পরকীয়া করছে। আমি জানতে পারলাম না, আমার ছোটবেলার বন্ধু হোটেলে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছে মাঝেমাঝেই。
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি এক সন্ধ্যায়, মাগরিবের আযান দিচ্ছে। কয়েকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। বড়জোর ক্লাস ৭/৮ এ পড়ে। একজন উচ্চস্বরে সবিস্তারে বলছে কীভাবে সে তাদেরই আরেক বন্ধুর বোনকে বিছানায় নিয়ে গিয়েছিল, বিছানায় কী কী করেছিল, মেয়েটা তাকে শ্রবণ অযোগ্য কী বলেছিল...
এর আগে না পরে ঠিক খেয়াল নেই, তবে খুব কাছাকাছি সময়ের ঘটনা... বাসায় ফেরার পথে উঁচু একটা জায়গা পড়ে। রিকশাওয়ালাদের টানতে কষ্ট হয়। মানুষজন নেমে যায়, আমিও নেমে গেলাম। দেখি কলেজ ড্রেস পরা ৪ জন ছেলেমেয়ে (কাপল খুব সম্ভবত, মেয়ে দুটোর হাতে গোলাপ ফুল) হেঁটে যাচ্ছে। এক জীবনে ভালোবেসে ভরবে না এই মন... বিখ্যাত এই গানের সুরে হঠাৎ একটা ছেলে গেয়ে উঠলো “এক জীবনে *** করে ভরবে না এই মন"। মেয়ে দুটো খিলখিল করে হেসে উঠলো। আমি আর রিকশাওয়ালা মামা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।
পৃথিবীর পথে চলতে চলতে এমন কতো কী যে দেখা হয়ে গেল! মুক্ত বাতাসের খোঁজে বই পড়ার পর কতো অসংখ্য মানুষ আমাদের সাথে যোগাযোগ করে অন্ধকার জীবনের গল্প শোনালো... সবকিছু বলা সম্ভব না। বলা উচিতও না। বিশ্বাস করার, হজম করার সামর্থ্যও আমাদের অনেকেরই আর নেই। শুধু একটা কথা বলি... কোনো মানুষকেই এখন আর বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারি না।
শুধু যে দেখেই গিয়েছি, চুপচাপ থেকেছি-এমন না। অভিভাবকদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে দেখেছি বাবা-মারাও এগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন। এই যুগে, এই বয়সে ছেলেমেয়েরা এমন করবেই, এটাতে তেমন ক্ষতির কিছু নেই-এমনই তাদের চিন্তাভাবনা। অথচ ছোট থাকতে আমি নিজেই কতো অভিভাবকের হয়ে চকলেট, সন্দেশের বিনিময়ে গোয়েন্দাগিরি করেছি। বড় আপু, বড় ভাইয়াদের কোচিং, প্রাইভেটে যাবার পথে আড়ি পেতে থেকেছি, পিছু নিয়েছি। চিঠি উদ্ধার করেছি।
১৫-২০ বছরের ব্যবধানেই সমাজ কতো বদলে গেছে! আজকাল মনে হয় এই পৃথিবীকে আমি আর চিনি না। এই পৃথিবীতে আমি স্রেফ একজন আগন্তুক!
দুই।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বাদ দেই। কিছু সামাজিক বাস্তবতার কথা বলি। এক বিভাগীয় শহরে ১৬-১৯ বছর বয়সী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জরিপ চালান শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহরিন। জরিপের পর তিনি দেখতে পান তাদের মধ্যে (ছেলে মেয়ে উভয়ই) শতকরা প্রায় ৬০ জন যৌন মিলন করেছে। বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী হবার কারণে সাংবাদিকদের অবাক হবার ক্ষমতা সাধারণত নষ্ট হয়ে যায়। তবে শাবনাজ জাহরিনের এই বক্তব্য শুনে এটিএন বাংলার সাংবাদিকও নিজের বিস্ময় গোপন রাখতে পারলেন না।
ঠিক একই রকম ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন ড. সাইয়েদ জাহাঙ্গীর হায়দার ও তার গবেষক দল। তারা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, ১৯+ বছর বয়সী অবিবাহিত ছেলেদের প্রতি ১০ জনে ৬ জনই যৌন মিলন করে ফেলেছে। একই বয়সী প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে ২৪ জনই বিছানায় শুয়ে পড়েছে। শহরাঞ্চলের নারীদের মধ্যে এই হার প্রতি ১০ জনে প্রায় ৫ জন!
গর্ভপাত, ডাস্টবিনে কুকুরের মুখে নবজাতক লাশের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ অনিরাপদ গর্ভপাত করানো হয়। আর এর বেশিরভাগই অবিবাহিতদের। আমাদের দেশে বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিত কিশোরীদের গর্ভপাত করানোর হার পঁয়ত্রিশ ভাগ বেশি!
এই গা শিউরে উঠা পরিসংখ্যানগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে রয়েছে একাধিক মনোরোগবিদ আর চিকিৎসকের বক্তব্য। তারা বলছেন, এই প্রজন্ম ১৫/১৬ বছর বয়স থেকেই যৌনতায় লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডদের সাথে, কাজিনদের সাথে। প্রেমের সম্পর্কগুলোতে আজ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত হয়ে পড়ছে যৌনতা!
কিছুদিন আগেও প্রেম করার জন্য পাগল ছিল তরুণ প্রজন্ম। এখন এক লেভেল আপডেট হয়ে শুরু হয়েছে যৌনতা নিয়ে উন্মাদনা। যৌনতাই যেন জীবনের সবকিছু। এক-দু'দিনের প্রেম, অনলাইনে পরিচয়, তবু বিছানায় যেতে দুইবার ভাবছে না। যিনা করছে, ছবি তুলে রাখছে, ইনবক্সে অশ্লীল ছবি শেয়ার করছে, ব্ল্যাকমেইল করছে। পোকামাকড়ের মতো ছুটে যাচ্ছে আগুনের দিকে। মরছেও দলে দলে।
লিটনের ফ্ল্যাটের পর্ব শেষ করে এখন শুরু হয়েছে লঞ্চের কেবিন আর ছেলেমেয়েদের একসাথে গ্রুপ ট্যুর পর্ব। অভিভাবককে না জানিয়ে, এমনকি অভিভাবকের সম্মতিতে চলে যাচ্ছে দূরদূরান্তের ট্যুরে। গ্রুপ ট্যুর এখন আলাদা একটা কালচার, আলাদা একটা লাইফস্টাইলে পরিণত হয়েছে। হয়ে উঠেছে জাতে ওঠার, স্মার্ট হবার সিঁড়ি!
তাই তো আজ গ্রুপ স্টাডির কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়া স্কুলছাত্রী আনুশকা (১৭) বিকৃত যৌনাচারের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায় বন্ধু দিহানের বাসায়। বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাবার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়া আরেক স্কুল শিক্ষার্থীর লাশ পাওয়া যায় কুয়াকাটার সস্তা হোটেলের বদ্ধ রুমে। মোবাইল ফোনে মাত্র তিন দিনের প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে প্রেমিক ও তার বন্ধুর হাতে ধর্ষিত হয়ে খুন হয় ফুলতলার মেয়ে মুসলিমা খাতুন। খুন হবার পরও রেহাই মেলেনি তার। মৃতদেহের উপরেই চলে আরো একবার ধর্ষণের তাণ্ডব! মামার বাড়িতে যাবার কথা বলে ১০/১১ জন বন্ধুর সাথে কক্সবাজারে হোটেলে মাদকের আসরে মারা যায় ২১ বছরের স্বর্ণা।
প্রতিনিয়ত শ'য়ে শ'য়ে, হাজারে হাজারে ঘটছে এমন ঘটনা। আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযান চালালেই দলে দলে ধরা পড়ছে স্কুলের ছাত্রছাত্রী। ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশ হিসেবে বড়াই করা বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীর এই হলো অবস্থা!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শেষদিনগুলোকে এক সময় বলা হতো বিদায় অনুষ্ঠান। শিক্ষকদের কাছে মাফ চেয়ে, দু'আ নিয়ে, কান্নাকাটি করে আমরা বিদায় নিতাম। এই তো কয়েক বছর আগেই! এখন এটাকে বলা হয় র্যাগ ডে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাগ ডে-তে এখন গাঁজার আসর বসিয়ে, ভারতীয় বাইজী আর নর্তকীদের মতো পোশাক পরে আইটেম সং-এ ছেলেমেয়ে একসাথে নাচগান করে! জড়াজড়ি করে। স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরাও কম যায় না। অশ্লীল নাচানাচি, ছেলে মেয়ে একে অপরের গায়ে, বুকে, হিপে হাত দিয়ে রঙ মাখামাখি করা, একে অপরের টিশার্টে প্রচণ্ড মাত্রার অশ্লীল মন্তব্য লেখা–বাদ যায় না কোনো কিছুই! ছেলে মেয়ের মাঝে আজ আর কোনো ফারাক নেই। সবাই ফ্রেন্ড। জাস্ট ফ্রেন্ড! একটা ছেলেও মেয়ের গায়ে অনায়াসে হাত দিতে পারে, জড়িয়ে ধরতে পারে। শরীর নিয়ে জোক করতে পারে। কোনো ব্যাপারই না। এই চরম অপবিত্র যুগে সবার মন খুব পবিত্র হয়ে গেছে!
শুরু হয়েছে হিপহপ কালচার, কর্পোরেট কারখানাতে তৈরি কে-পপ ট্রেন্ড নিয়ে উন্মাদনা, বিটিএসের প্রতি ক্রাশ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধীদের মতো আচরণ, নাচ গান। এদের পোশাকের অবস্থা দেখে জিন্স, টি-শার্টও এখন অনেক শালীন মনে হয়। পোশাক-আশাক নিয়ে কিছু বলাও আবার সমস্যা। কালচাড়াল এলিটেরা মামলা দিয়ে বসবে। সব ব্যাপারে বাঙালি সংস্কৃতির কথা মনে থাকলেও কেন জানি পাশ্চাত্যের অশ্লীল পোশাকের ক্ষেত্রে বাঙালি সংস্কৃতির কথা সাংস্কৃতিক জমিদারদের মনে থাকে না!
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাড়ছে মানসিকতার বিকৃতি। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফিতরাত। অনলাইনে, ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা ভাইবোন, আত্মীয় স্বজন সবার সামনে চলছে অশ্লীল ট্রল। দেদারসে চলছে ছবি কিংবা ভিডিও শেয়ার। রাতের ইন্টারনেটের অর্ধেকই চলে যাচ্ছে পর্ন দেখা, টিকটক আর পাবজির পেছনে। ৭৭ ভাগ স্কুলগামী শিক্ষার্থী আজ পর্নে আসক্ত। টিকটক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবের শর্ট রিল-এ চলছে চরম লেভেলের অশ্লীলতা, সহিংসতা আর শরীর প্রদর্শনী। পর্ন দেখা, যিনা-ব্যভিচার নিয়েও চলছে মজা। ছেলেরা তো বটেই, মেয়েরাও। কেউ কোনো কিছুই মনে করছে না।
ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে মাদকের ব্যবহার। আসক্তি বাড়ছে মেয়েদের মধ্যেও। বসছে পুল পার্টি নামের সেক্স পার্টি আর মাদকের আসর। ধর্ষণ মহামারি আকারে বাড়ছে, বাড়ছে সমকামিতা, ছেলেদের মেয়ে সেজে থাকার প্রবণতা, পরকীয়া আর লিভ টুগেদারের পক্ষেও জোরালো বক্তব্য আসছে মাঝেমাঝেই!
অবাধ যৌনতা আর অবক্ষয়ের পেছনে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে পতনের অন্যান্য চিহ্ন। পাড়ায় পাড়ায় এখন কিশোর গ্যাং! মাদক, অস্ত্র, মারামারি আর খুনোখুনিরা প্রতিযোগিতা! তুচ্ছ কারণে এ ওকে মেরে চলে আসছে। প্রেমিকার সামনে ভাব নেওয়ার জন্য শিক্ষককে পর্যন্ত পিটিয়ে মেরে ফেলছে। বিষণ্ণতায় ভুগছে তারুণ্যের ৬১ শতাংশ। মাসে গড়ে আত্মহত্যা করছে ৪৫ জন শিক্ষার্থী। প্রেমঘটিত কারণেই বেশি!!
এভাবেই কলুষতার অজগর আস্তে আস্তে গিলে নিচ্ছে কতো ছেলে, কতো মেয়েকে। বেনি দোলানো কতো আদুরে বোন প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। একসময়ের ভীষণ ডানপিটে পাড়ার ছোট ভাইটা আজ বুক ভরা বড় বড় ব্যথা নিয়ে এলোমেলো ফুটপাতে হেঁটে বেড়ায়, পেছনের বেঞ্চিতে বসে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে। কতো বোবা হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস কীবোর্ডের ব্যাকস্পেইসে মুছে যায়, কতো দলবদ্ধ কান্না ভিজিয়ে দেয় স্মার্টফোনের স্ক্রিন-কেউ কি রেখেছে সেসবের খবর? রাখার সময় কি হয়েছে?
তিন।
এ অবস্থার জন্য শুধু ওদের দায়ী করা যায় না। শুধু ওদের দায়ী করা অপরাধ। এ অবস্থার জন্য দায়ী আমাদের পচে যাওয়া সমাজ, কামনাবাসনা ক্রমাগত উস্কে দেওয়া মিডিয়া আর বিনোদন জগৎ, সীমালঙ্ঘনের অজুহাত তৈরি করা বুদ্ধিজীবি, রাষ্ট্র নামের অতিকায় যুলুমযন্ত্র, পুঁজি আর প্রফিটের ক্যালকুলাস, সস্তা সুখ আর সাময়িক আরামকে সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে ফেলার মনস্তত্ত্ব, আর জীবন থেকে আসমানী নৈতিকতাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার সবক দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থা।
এ অবস্থার জন্য দায়ী নষ্ট সভ্যতার নষ্ট বিশ্বকাঠামো।
সবাই মিলে এক নিপুণ ষড়যন্ত্রে যিনা-ব্যভিচারের উপর চাপিয়ে দিয়েছে ‘পবিত্র প্রেম’-এর পোশাক, গুণকীর্তন করে চলেছে বছরের পর বছর। রোমান্টিকতার প্রলেপ জড়িয়েছে পরতের পর পরত। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের সমাজের কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে অভিভাবকদের মধ্যেও যে ন্যারেটিভ দাঁড় হয়ে গেছে তা হচ্ছে- ১। প্রেম করতেই হবে। বিশেষ করে তারুণ্যে। ২। সফলতার মাপকাঠি হলো যৌনতা, অর্থ, খ্যাতি, ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মান। যার কাছে এগুলো যতো বেশি আছে তার জীবন ততো বেশি সফল, ততো বেশি পরিপূর্ণ। ৩। ইনবক্সে ফ্লার্ট করা, ভিডিও কলে কাপড় খোলা, বৃষ্টি বিলাস, হুড তোলা রিকশা বিলাস, অন্ধকারে রেস্টুরেন্ট বিলাস আর লিটনের ফ্ল্যাটে শরীরের উত্তাপ মাপা--সবই এখন পবিত্র প্রেমের অংশ। আর প্রেম এই বয়সের স্বাভাবিক ধর্ম। যারা এগুলো করে না তারা সেকেলে, আধুনিকতার মাঝে বেমানান। তারা গান্ধা, ক্ষ্যাত। তারা একেকটা লুযার। এমন ছেলেরা আসল পুরুষ নয়। এমন মেয়েদের কেউ চায় না। তাদের জীবনে সুখ, আনন্দ বলে কিছু নেই। জীবনের রঙ-রূপ-রস-গন্ধ তারা কিছুই পায়নি। তাদের জীবন হলো ষাট সত্তর দশকের সাদাকালো ঝিরঝির কষ্টের সিনেমার মতো। আর প্রেমাতাল জীবন হলো আইটেম সং আর মালমশলায় ভরা হাউসফুল রঙিন সিনেমা, মারভেলের সুপারহিরো সিনেমা, কিংবা নেটফ্লিক্সের ৮k স্ট্রিমিং। খালি সুখ, মজা আর এক্সাইটমেন্ট।
বিশ্বকাঠামোর দ্বারা প্রচণ্ডভাবে ব্রেইনওয়াশ হবার ফলে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষেরা যেমন বিয়ে বহির্ভূত প্রেম, যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে গেছে, তেমনি এই জঘন্য অপরাধের ব্যাপারে সমাজের মানুষগুলোর মনেও তৈরি হয়ে গেছে একটা গ্রহণযোগ্যতা।
তাই আজ রাস্তায়, পার্কে, রিকশায়, ফেইসবুক-টিকটকে জড়াজড়ি, চুমাচুমি কিংবা অন্য কোনোভাবে সবার সামনে শরীরের ওম ভাগাভাগি করলেও মানুষজন উপেক্ষা করে চলে যায়। মফস্বলের কোনো মুরুব্বি চাচাকে এখন আর দেখা যায় না 'হলের এক টিকিটের দুই ছবি: যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়' টাইপের প্রতিবাদী মতামত লিখে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় পাঠাতে কিংবা ফেইসবুকে পোস্ট দিতে। সবাই কেন জানি সবকিছুকে মেনে নিয়েছে। সবাই কেমন যেন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এখানে কোনো হইচই নেই। পরিবেশটা একদম শান্ত!
অথচ হাজার বছরের ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দেয় অবাধ যৌনতার প্রসার সমাজ ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে। তা সেটা প্রেম, ভালোবাসা, রিলেশনশিপ কিংবা অন্য যেকোনো নামেই হোক না কেন। আজ প্রেম, ভালোবাসা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে যৌনতার বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। চারিদিকে আজ শুধু ভাঙনের সুর। হতাশা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা, যিনা-ব্যভিচার, খুন, ধর্ষণ, ডাস্টবিনে নবজাতকের লাশ, পরকীয়া, বিচ্ছেদ... সমকামীদের রঙধনু মিছিল! নারীপুরুষ নিজের পরিচয় সম্পর্কে ভুগছে অবিশ্বাস্য বিভ্রান্তিতে। এই তীব্র অসুখগুলোকে বলা হচ্ছে স্বাধীনতা আর ক্ষমতায়ন। যৌন মানসিক বিকৃতির প্রচারক, প্রসারকদের উপস্থাপন করা হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্ক আর মহান বুদ্ধিজীবী হিসেবে। আজ পতনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়ত!
উচ্ছৃঙ্খল স্রোতে গা ভাসানো কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের অনেকে এক সময় থমকে দাঁড়ায়। পিচ্ছিল এই অন্ধকার স্রোত থেকে ফিরে আসতে চায়। কেন তাদের জীবনে এতো হতাশা, এতো অশান্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চায়। কিন্তু প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলে না। উল্টো সবক দেওয়া হয়-প্রেম করলে, সেক্স করতে পারলে, আরো টাকা কামালে, তোমার জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যেই প্রেম, যিনা-ব্যভিচার, ভোগের যে অন্ধ নেশা-তাদের জীবনের বারোটা বাজিয়েছে, তাকেই আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে বলা হয় ওদেরকে। ওরাও তাই করে। আরো ক্ষতবিক্ষত হয়। কেউ কেউ বুঝতে পারে, চিনতে পারে আসল সমস্যা। কিন্তু অন্ধকার এই জগৎটা থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে পায় না। অভিভাবকরা কিংবা সমাজ হয়তো তাদের সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু তারাও ব্রেইনওয়াশড হয়ে গেছেন। তাদের মূল মনোযোগ এখন ছেলেমেয়েকে কীভাবে বিসিএস ক্যাডার বানানো যায়, অথবা বিদেশে সেটেল করানো যায়-তার দিকে。
কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী, প্রৌঢ় অভিভাবক সকলের অবস্থার কথা চিন্তা করেই এই বই সাজানো হয়েছে। এই জেনারেশনের এতো হতাশা, আত্মহত্যা, এতো দুঃসময়ের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি আমরা। প্রেম ভালোবাসার রঙিন বায়োস্কোপের পেছনের যে গল্পগুলো কেউ দেখাতে চায় না, আমরা সেই দুনিয়া দেখানোর চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি সেই দুনিয়া থেকে বের হয়ে আসার পথ চিনিয়ে দেবার। সেই দুনিয়াকে চিরতরে শেষ করে দেবার জন্য অভিভাবক, সমাজ, রাষ্ট্র সবার ভূমিকা কী হতে পারে, সংক্ষিপ্ত আকারে তা-ও আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে। রেফারেন্স, তথ্যপ্রমাণ ইত্যাদির জন্য বিশুদ্ধ উৎসগুলোর উপর নির্ভর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। তবু ভুলত্রুটি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আশা করি, আমাদের ভুলত্রুটিগুলো পাঠকরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
এই বইয়ের সংগে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ঘাম আর আত্মত্যাগ জড়িত। বহু মানুষ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, লেখা দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে, বইয়ের কাজ কতোদূর বারবার জিজ্ঞাসা করে, ঝাড়ি মেরে... চিরকৃতজ্ঞতার বাঁধনে জড়িয়ে নিয়েছেন আমাদের। তাঁদের প্রতিদান দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। আল্লাহর কাছে বিনীত নিবেদন এই সাহায্যের বিনিময়ে আল্লাহ যেন তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন। সেই সঙ্গে এই বইয়ের উসীলায় আল্লাহ যেন আমাদেরকে কবুল করে নেন。
বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার প্রতিটি উপাদান যখন বিবাহ বহির্ভূত প্রেম-ভালোবাসা, যিনা-ব্যভিচারকে মহিমান্বিত করে চলেছে সকল শক্তি বিনিয়োগ করে, তখন আমাদের মতো অতি ক্ষুদ্র, নগণ্য, দুর্বল কয়েকজন যুবক আর কী করতে পারে! তবুও আমরা বিশ্বাস রাখি ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দেওয়া আল্লাহর প্রতিশ্রুতির উপর। জনবিরল মরুভূমিতে দাঁড়ানো ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ বলেছিলেন আযান দাও। আযান পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আমার। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আযান দিলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি আনাচ-কানাচ থেকে, বহু জনপদ, সাগর, পাহাড় পাড়ি দিয়ে কোটি কোটি মানুষ কিয়ামত পর্যন্ত ছুটে চলবে সেই মরুর বুকের মক্কায়। আমরাও সেই আল্লাহর উপরই ভরসা করে আযান দিলাম...
লস্ট মডেস্টি
১১.০৯.২০২২
টিকাঃ
[৩] পতনের আওয়াজ পাওয়া যায়– LostModesty, ইউটিউব ভিডিও, মার্চ ১৪, ২০১৯- tinyurl.com/poton
[৪] Pre-marital sex prevalent among male adolescents, The Daily Star, June 20, 2013 - tinyurl.com/yzbyyh46
[৫] সমাজ কি তাহলে চূড়ান্ত ধ্বংসের পথে? যুগান্তর, মে ২৩, ২০১৮ tinyurl.com/2p8nef3h অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণে দ্বিগুণ বেড়েছে গর্ভপাত, নিউজবাংলা২৪, মার্চ ১৫, ২০২১- tinyurl.com/yvwmebnm
[৬] Lost Modesty ফেইসবুক পোস্ট, মার্চ ২৭, ২০২২-tinyurl.com/LMmonobid
[৭] Mohammad Mohsin PPM ফেইসবুক পোস্ট, মার্চ ৬,২০২২-tinyurl.com/BLnude (দেখা জরুরি)
[৮] নৌপথে লঞ্চের কেবিনগুলো যেন তরুণ-তরুণীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল, চাঁদপুর টাইমস, মার্চ ৬, ২০১৯- tinyurl.com/ymrb৪kbk ফেসবুকে প্রেমের পর ৭ দিনের ট্যুর, অতঃপর.., আরটিভি নিউজ, মে ৩০, ২০২১tinyurl.com/8ynuhdvr কক্সবাজারে বন্ধুদের সাথে ভ্রমণে এসে তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু, গ্রেফতার ২, সিটিজি নিউজ, মে ১৮, ২০২২- tinyurl.com/৩fx২cj৬z লঞ্চের কেবিনে তরুণীর লাশ, বাংলা ট্রিবিউন, ডিসেম্বর ১০, ২০২১-tinyurl.com/88wwxwcu দুই বন্ধুর সঙ্গে বান্দরবনে ঘুরতে গিয়ে তরুণীর মৃত্যু, নরসিংদী জার্নাল, জুন ৮, ২০২২- tinyurl.com/৩৭ub৭৬৫we
[৯] আনুশকার মৃত্যু বিকৃত যৌনাচারেই, দৈনিক জনকণ্ঠ, জানুয়ারি ৯, ২০২১-tinyurl.com/৫৭ru৮৬৫p দিহানের ডাকে ফাঁকা বাসায় একাই গিয়েছিল আনুশকা, আরটিভি নিউজ, জানুয়ারি ১২, ২০২১- tinyurl.com/mwvndoju
[১০] দম্পতি পরিচয়ে কুয়াকাটার হোটেলে ৪ স্কুল শিক্ষার্থী, বন্ধ রুমে মিললো কিশোরীর ঝুলন্ত লাশ, যমুনা টিভি, জুলাই ১৯,২০২২-tinyurl.com/mr৩৩৮rad
[১১] জীবিত ও মৃত প্রেমিকাকে ধর্ষণ, দৈনিক ইনকিলাব, জানুয়ারি ৩০, ২০২২-tinyurl.com/ jibitoomrito
[১২] মামা বাড়ির কথা বলে কক্সবাজার এসে তরুণীর মৃত্যু, বন্ধু আটক, চ্যানেল আই, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯- tinyurl.com/২৫nbpt৯ বান্দরবানে ঘুরতে গিয়ে নারী পর্যটকের মৃত্যু, প্রেমিকসহ আটক ২, ঢাকা ট্রিবিউন, ০৮ জুন, ২০২২- tinyurl.com/@cv8kh৯w
[১৩] নবম শ্রেণির ছাত্রের বাড়িতে ৭ম শ্রেণির ছাত্রীর অনশন, যুগান্তর, আগস্ট ০১, ২০২২- tinyurl.com/mr২৩be৪h, আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কাজ, স্কুল-কলেজের ১০ শিক্ষার্থী আটক, সময় নিউজ, জুলাই ২৮, ২০২২ tinyurl.com/d9tcdndu
[১৪] ব্যাগ ডে নামক উচ্ছৃঙ্খলতায় জৌলুশ হারাতে বসেছে বিদায় অনুষ্ঠান, Rtv News, Nov ১৩, ২০২১- tinyurl.com/yc4r8nc3
ব্যাগ ডে'র নামে লীলাখেলা! | Rag Day, Somoy TV, Nov ২৩, ২০২১- tinyurl.com/4mxjzyav
Rag Day Viral Dance Video | Jahangirnagar University, চলনবিল রাইডার, Mar ১৬, ২০২২- tinyurl.com/58ksrhax
Jahangirnagar University Radhag Day Students cheering on the couple dance] জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, DEEP SIDE, Mar ১২, ২০২২- tinyurl.com/yzawj33u (চোখের গুনাহ হবে)
টি-শার্টে অশ্লীল মন্তব্যের ছড়া-ছড়ি, বিব্রত শিক্ষকরা, be.bangla.report, জানুয়ারি ১৬, ২০২০- tinyurl.com/2ntprsyv
র্যাগ ডে'তে অশিষ্ট নৃত্য, তীব্র সমালোচনায় ৫ শিক্ষককে শোকজ, অধিকার নিউজ, আগস্ট ০৭,২০২২- tinyurl.com/3ecze599
বান্দরবানে র্যাগ-ডে উদযাপন করতে গিয়ে অশ্লীল অটোগ্রাফ: ফেসবুকে নিন্দার ঝড়!, kholachokh. press, মার্চ ২৯, ২০১৮- tinyurl.com/bdecn2w5
[১৫] কোরিয়ান সংস্কৃতি প্রেম, নাচে গানে মুখর দেশের তরুণ-তরুণীরা, Rtv News ইউটিউব ভিডিও, May ২০, ২০২২- tinyurl.com/mtw5c3v5
বাংলাদেশে হিপহপ? | Hip Hop | Hip Hop Festival in Dhaka, SOMOY TV ইউটিউব ভিডিও, Aug ২৭, ২০২২- tinyurl.com/mwu79wm5
বিটিএস আর্মি কী ও কারা? | BTS Army | K-pop Fans, Somoy TV ইউটিউব ভিডিও, Mar ২৯, ২০২২- tinyurl.com/5ddywcu6
[১৬] টিকটক: ক্রিয়েটিভিটি নাকি মানসিক রোগ? Somoy TV ইউটিউব ভিডিও, Jan ১৩, ২০২২- tinyurl.com/4fsx895e
তারকা হবার নেশায় অপরাধের অন্ধকারে ডুবসাঁতার! | TikTok | Somoy TV ইউটিউব ভিডিও, Oct ৮, ২০২০- tinyurl.com/3xj72fjd
রাতে ইন্টারনেটের অর্ধেকই খরচ পর্নোগ্রাফি, টিকটক, লাইকিতে, চ্যানেল২৪, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১- tinyurl.com/32yujdrc
পর্নোগ্রাফিতে বুঁদ কিশোর-তরুণরা, একুশে টেলিভিশন, এপ্রিল ২৬, ২০১৮- tinyurl.com/4j57zrzt
[১৭] Lost Modesty ফেইসবুক পোস্ট, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮-tinyurl.com/4852zhet
বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে পর্ন তারকার নামে বইয়ের স্টল দিয়ে বিপাকে তিন শিক্ষার্থী, বিবিসি বাংলা, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮- tinyurl.com/bdf9xrun
[১৮] নেশার পেছনে বছরে ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা, নয়া দিগন্ত, আগস্ট ৩০, ২০২০-tinyurl.com/bp55w24t
[১৯] স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ এবং..., প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০- tinyurl.com/3wtzpsx9
বাড়ছে সমকামীর সংখ্যা, বাংলা ইনসাইডার, জুলাই ১৮, ২০১৭- https://archive.is/3I4KB
[২০] প্রেমিকার কাছে হিরো সাজতে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্র জিতু, বঙ্গবাণী, জুন ৩০, ২০২২- tinyurl.com/5n6vshwe
[২১] তারুণ্যের ৬১ শতাংশই ভুগছে বিষণ্ণনতায়, newsbangla24.com, জুলাই ১০, ২০২১-টি- nyurl.com/umn7rw8x
মাসে গড়ে ৪৫ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, প্রেমঘটিত কারণে বেশি, আরটিভি নিউজ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২২- tinyurl.com/2282v97w
[২২] বইয়ের রেফারেন্স-এ দেওয়া সংবাদপত্রের লিংক-এ গিয়ে ঘটনাগুলো পড়ার বিশেষ অনুরোধ রইলো। অবস্থার ভয়াবহতা বোঝার জন্য এটি জরুরি।