📄 ঈদায়নের সলাতে রফ‘উল ইয়াদায়ন
ঈদায়নের সলাতে অতিরিক্ত তাকবীরসমূহে রফ'উল ইয়াদায়ন করা সম্পূর্ণরূপে সঠিক। কেননা নাবী রুকূ'র পূর্বে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (আবূ দাউদ হাঃ ৭২২; মুসনাদে আহমাদ ২/১৩৩, হাঃ ৬১৭৫; মুনতাক্বা ইবনুল জারূদ পৃঃ ৬৯, হাঃ ১৭৮)
শায়খ যুবায়র 'আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন : এ হাদীসের সানাদ সম্পূর্ণরূপে সহীহ। বর্তমান যুগে কতিপয় ব্যক্তির এ হাদীসের সমালোচনা করা প্রত্যাখ্যাত। ইমাম বায়হাক্বী ও ইমাম ইবনুল মুনযির এ হাদীস দ্বারা প্রামাণ করেছেন যে, ঈদায়নের তাকবীরসমূহেও রফ'উল ইয়াদায়ন করা উচিত। (দেখুন: আত্ তালখীসুল হাবীর ১/৮৬, হাঃ ৬৯২, বায়হাক্বী আস সুনানুল কুবরা ৩/২৯২, ২৯৩, ইবনুল মুনযির আল আওসাত্ব ৫৪/২৮২)
ঈদুল ফিত্রর তাকবীরসমূহের ব্যাপারে 'আত্বা ইবনু আবূ রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, «نعم، ويرفع الناس أيضا» “হ্যাঁ, ঐ তাকবীরগুলোতে রফ'উল ইয়াদায়ন করা উচিত এবং সকল মানুষও রফ'উল ইয়াদায়ন করবে"। (মুসান্নাফ 'আবদুর রাযযাক্ব ৩/২৯৬, হাঃ ৫৬৯৯: সানাদ সহীহ)
সিরিয়াবাসীর ইমাম আওযা'ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, «نعم، ارفع يديك مع كلهن» “হ্যাঁ, ঐ সকল তাকবীরগুলোর সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন কর”। (ফিরয়াবী, আহকামুল ঈদায়ন হাঃ ১৩৬: সানাদ সহীহ)
মাদীনার ইমাম মালিক ইবনু আনাস (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: «نعم، ارفع يديك مع كل تكبيرة، ولم أسمع فيه شيئا» “হ্যাঁ, প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন কর। এ ব্যাপারে (এর বিপরীত) কোন কিছু আমি শুনিনি।” (ঐ, হাঃ ১৩৭, সানাদ সহীহ)
এই সহীহ উক্তির বিপরীতে মালিকীদের অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থ “মুদা'ওয়ানা”তে (১/১৫৫) একটি সানাদবিহীন উক্তি উল্লেখিত রয়েছে। সানাদবিহীন এই উদ্ধৃতিটি প্রত্যাখ্যাত। মুদা'ওয়ানার জবাবের জন্য হাফিয যুবায়র 'আলী যাঈ-এর "আল ক্বওলুল মাতীন ফিল জাহির বিত্ তা'মীন” পৃঃ ৭৩ গ্রন্থটি দেখুন।
অনুরূপভাবে সানাদবিহীন হওয়ার কারেণ ইমাম নাবাবীর উদ্ধৃতিও প্রত্যাখ্যাত। (আল মাজমূ' শারহুল মুহাযযাব ৫/২৬)
মাক্কাবাসীর ইমাম শাফি'ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও ঈদায়নের তাকবীরসমূহে রফ'উল ঈয়াদায়ন-এর প্রবক্তা ছিলেন। (কিতাবুল উম্ম ১/২৩৭)
আহলুস সুন্নাতের ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন »يرفع يديه في كل كبيرة« “(ঈদায়নের) প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করবে"। (মাসায়িলু আহমাদ, আবু দাউদ-এর বর্ণনা, পৃঃ ৬০, 'ঈদের সলাতে তাকবীর' অনুচ্ছেদ)
সালফে সলিহীন-এর এ সকল আসারের বিপরীতে মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ্ শায়বানী লিখেছেন যে, »ولا يرفع يديه ")ঈদায়ন তাকবীরসমূহে) রফ'উল ইয়াদায়ন করবে না”। (কিতাবুল আসল ১/৩৭৪, ৩৭৫; ইবনুল মুনযির, আল আওসাত্ব ৪/২৮২)
এ উক্তিটি দু'টি কারণে প্রত্যাখ্যাত:
১. মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ্ শায়বানী মিথ্যুক- ('উক্বায়লী, কিতাবু যু'আফা ৪/৫২: সানাদ সহীহ; বুখারী, জুযউ রফ'ইল ইয়াদায়ন, তাহক্বীক্ব: যুবায়র 'আলী যাঈ, পৃঃ ৩২)। তাঁর সত্যায়ন কোন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস থেকে সুস্পষ্টভাবে সহীহ সনদে প্রমাণিত নেই।
হাফিয যুবায়র 'আলী যাঈ এ বিষয়ে "النصر الربانی" "আন্ নাসরুর্ রব্বানী” নামে একটি পুস্তক লিখেছেন যেখানে প্রমাণ করেছেন যে, উল্লেখিত শায়বানী মিথ্যুক ও ন্যায়পরায়ণ নন। (ওয়াল হামদুলিল্লা-হ)
২. এই মিথ্যুকের বক্তব্য সালফে সলিহীনের ইজমা ও ঐকমত্যের বিপরীত হওয়ার কারণেও প্রত্যাখ্যাত।
📄 জানাযার সলাতে রফ‘উল ইয়াদায়ন
জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরে রফ'উল ইয়াদায়ন করা ইবনু 'উমার থেকে প্রমাণিত আছে। (বুখারী'র জুযউ রফ'ইল ইয়াদায়ন হাঃ ১১১; মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩/২৯৮, হাঃ ১১৩৮৮: সানাদ সহীহ)
মাকহুল (রহিমাহুল্লাহ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (বুখারী'র জুযউ রাফ'ইল ইয়াদায়ন হাঃ ১১৬: সানাদ হাসান)
ইমাম যুহরী (রহিমাহুল্লাহ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (ঐ, হাঃ ১১৮: সানাদ সহীহ)
ক্বায়স ইবনু আবূ হাযিম (রহিমাহুল্লাহ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরে সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (ঐ, হাঃ ১১২: সানাদ সহীহ; মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩/২৯৬, হাঃ ১১৩৮৫)
নাফি' ইবনু জুবায়র (রহিমাহুল্লাহ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (জুযউ রফ'উল ইয়াদায়ন হাঃ ১১৪: সানাদ হাসান)
হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন। (ঐ, হাঃ ১২২: সানাদ সহীহ)
নিম্নলিখিত 'উলামায়ে সালফে সলিহীনও জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করার প্রবক্তা ও 'আমালকারী ছিলেন। 'আত্বা ইবনু আবূ রবাহ। (মুসান্নাফ 'আবদুর রাযযাক্ব ৩/৪৬৮, হাঃ ৬৩৫৮: সানাদ শক্তিশালী)
'আবদুর রাযযাক্ব (ঐ হাঃ ৬৩৪৭), মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩/২৯৭, হাঃ ১১৩৮৯: সানাদ সহীহ)।
সালফে সলিহীনের এ সকল আসারের বিপরীতে ইবরাহীম নাখ'ঈ (তাবি'ঈ) জানাযার সলাতে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতেন না। (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩/২৯৬, হাঃ ১১৩৮৬ : সানাদ হাসান)
প্রমাণিত হল যে, জামহুর সালফে সলিহীনের মাসলাক এটাই যে, জানাযার প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফ'উল ইয়াদায়ন করতে হবে। যেমনটি সূত্রসহ পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। আর এটাই সঠিক ও প্রাধান্যযোগ্য মত। (ওয়াল হামদুলিল্লা-হ)
📄 তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা
হাদীস নং- ১ :
أَخْبَرَنِي أَحْمَدُ بْنُ يَحْيَى الصُّوفِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عِصَامُ بْنُ قُدَامَةَ الْجَدَلِي، قَالَ: حَدَّثَنِي مَالِكُ بْنُ نُمَيْرٍ الْخُزَاعِيُّ - مِنْ أَهْلِ الْبَصْرَةِ - أَنَّ أَبَاهُ حَدَّثَهُ، أَنَّهُ رَأَى رَسُولَ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الصَّلَاةِ، وَاضِعًا ذِرَاعَهُ الْيُمْنَى عَلَى فَخِذِهِ الْيُمْنَى رَافِعًا أَصْبُعَهُ السَّبَّابَةَ، قَدْ أَحْنَاهَا شَيْئًا وَهُوَ يَدْعُو».
আহমাদ ইবনু ইয়াহইয়া আস্ সূফী (রহিমাহুল্লাহ) ..... মালিক ইবনু নুমায়র (রহিমাহুল্লাহ)-এর পিতা বলেন, আমি রসূলুল্লাহ -কে সলাতে বসা অবস্থায় ডান হাত ডান উরুর উপর রেখে শাহাদাত আঙ্গুল উঁচু করে কিছুটা ঝুঁকিয়ে রেখে ইশারা করতে দেখেছি। (আবূ দাউদ হাঃ ৯৯১; নাসায়ী হাঃ ১২৭৪; ইবনু খুযায়মাহ্, হাঃ ৭১৬; ইবনু হিব্বান হাঃ ১৯৪৬)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
ইমাম ইবনু খুযায়মাহ্ তাঁর "সহীহ খুযায়মাহ্”-তে (হাঃ ৭১৬) হাদীসটি এনেছেন। অর্থাৎ তার নিকট এ হাদীসটি সহীহ এবং এর রাবীগণ সিক্বাহ্।
ইমাম ইবনু হিব্বান তাঁর “সহীহ ইবনু হিব্বান”-এ (হাঃ ১৯৪৬) হাদীসটি এনেছেন। অর্থাৎ তার নিকট এ হাদীসটি সহীহ এবং এর রাবীগণ সিক্বাহ্।
এ হাদীসের রাবী মালিক ইবনু নুমায়র-কে মাজহুল মনে করা হয়। কিন্তু আসলে তিনি মাজহুল নন বরং হাসানুল হাদীস।
কেননা ইমাম ইবনু খুযায়মাহ্ ও ইমাম ইবনু হিব্বান তাদের “সহীহ” গ্রন্থে এ হাদীসটি এনে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে উক্ত হাদীসের রাবীগণ তাদের নিকট সিক্বাহ্। (আল্হাম্মদুলিল্লা-হ)
অতএব উক্ত হাদীসটির সানাদ হাসান। (আল্হাম্মদুলিল্লা-হ)
হাদীস নং- ২:
عَنْ نَافِعٍ قَالَ: كَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ إِذَا جَلَسَ فِي الصَّلَاةِ وَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى رُكْبَتَيْهِ، وَأَشَارَ بِإِصْبَعِهِ، وَأَتْبَعَهَا بَصَرَهُ، ثُمَّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَهِيَ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنَ الْحَدِيدِ يَعْنِي السَّبَّابَةَ.
নাফি' (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার যখন সলাতে বসতেন, তখন নিজের দুই হাত নিজের দুই হাঁটুর উপর রাখতেন। আর শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন এবং তার চোখের দৃষ্টি থাকতো (শাহাদাত) আঙ্গুলের দিকে। 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: এটি (শাহাদাত আঙ্গুল) শায়ত্বনের ওপর লোহার থেকেও বেশী কষ্টদায়ক। 'আনহু (মুসনাদে আহমাদ ২/১১৯, হাঃ ৬৪২; মিশকাত হাঃ ৯১৭: সানাদ হাসান)
হাদীস নং- ৩ :
عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ لا يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ، وَإِذَا رَكَعَ، وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ، وَإِذَا جَلَسَ أَضْجَعَ الْيُسْرَى، وَنَصَبَ الْيُمْنَى، وَوَضَعَ يَدَهُ الْيُسْرَى عَلَى فَخِذِهِ الْيُسْرَى، وَيَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى فَخِذِهِ الْيُمْنَى، وَعَقَدَ ثِنْتَيْنِ الْوُسْطَى وَالْإِبْهَامَ وَأَشَارَ»
ওয়ায়িল ইবনু হুজরা বলেন, আমি রসূলুল্লাহ-কে দেখেছি, সলাতে (বসা অবস্থায়) বাম হাত বাম উরুর উপর ও ডান হাত ডান উরুর উপর রাখলেন। অতঃপর তিনি তাঁর ডান হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা আঙ্গুলদ্বয় আবদ্ধ করে রাখলেন এবং মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুল একত্রে করে বৃত্তাকার করলেন এবং শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন। (আবূ দাউদ হাঃ ৭২৬, নাসায়ী হাঃ ১২৬৩: সানাদ সহীহ)
এছাড়াও রসূলুল্লাহ ﷺ «فَرَأَيْتُهُ يُحَرِّكُهَا يَدْعُو بِهَا» শাহাদাত আঙ্গুল নাড়াতেন ও এর মাধ্যমে দু'আ করতেন। (নাসায়ী হাঃ ১২৬৮; ইবনু খুযায়মাহ্ হাঃ ৭১৪; ইবনু হিব্বান হাঃ ১৮৬০, ইবনুল জারূদ, মুনতাক্বা হাঃ ২০৮: সানাদ সহীহ)
শুধুমাত্র “লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ” এর সময় শাহাদাত আঙ্গুল উঠিয়ে তা আবার নামিয়ে ফেলানো কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। (আল্হাম্মদুলিল্লা-হ)
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে কয়েকটি বিষয় বুঝা যায়। তাশাহ্হুদের সময় বাম হাত বাম হাঁটু বা উরুর উপর এবং ডান হাত ডান হাঁটু বা উরুর উপর রাখতে হয়। মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুল একত্রে করে বৃত্তাকার করতে হয়। বিশেষ করে দু'আর সময় শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতে হয় ও নাড়াতে হয়। আর ইশারা করার সময় চোখের দৃষ্টি থাকবে শাহাদাত আঙ্গুলের দিকে। এ পদ্ধতিই রসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত। (আল্হাম্মদুলিল্লা-হ)
📄 সাহ্উ সাজদাহ্
সাহু সাজদাহ্ সালামের পূর্বেও জায়িয আছে। (সহীহুল বুখারী ১/১৬৩, হাঃ ১২২৪; সহীহ মুসলিম ১/২১১)
আর সালামের পরেও জায়িয আছে। (সহীহুল বুখারী হাঃ ১২২৬; সহীহ মুসলিম হাঃ ৫৭৪)
সাহু সাজদার পূর্বে শুধু একদিকে সালাম ফিরানোর কোন প্রমাণ হাদীসসমূহ নেই।