📄 তাবি‘ঈনদের আসারসমূহ
(১) 'আমি কি ইমামের পিছে ক্বিরাআত করবো' এ প্রশ্নটির জবাব সা'ঈদ ইবনু জুবায়র (এভাবে) দিয়েছেন যে, জী হ্যাঁ, যদিও তুমি তার ক্বিরাআত শুনতে পাও'। (জুযউল ক্বিরাআত হাঃ ২৭৩ : সানাদ হাসান)
অন্য আরেকটি রিওয়ায়াতে বলেছেন, لَا بُدَّ أَنْ تَقْرَأَ بِأُمِّ الْقُرْآنِ مَعَ الْإِمَامِ ...
“অবশ্যই তোমাকে ইমামের পিছে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়তে হবে”। (মুসান্নাফ 'আবদুর রাযযাক্ব হাঃ ২৭৮৯, ২/১৩৩; তাওযীহুল কালাম ১/৫৩০; বায়হাক্বী, কিতাবুল ক্বিরাআত হাঃ ২৩৭, শেষ ছত্র, 'আবদুর রায্যাক্ব হাদীস শ্রবণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন)
(২) হাসান বাসরী বলেছেন : اقْرَأْ خَلْفَ الْإِمَامِ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فِي نَفْسِكَ»
“ইমামের পিছে প্রত্যেক রাক্'আতে তুমি মনে মনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পাঠ করবে”। (বায়হাক্বী- কিতাবুল ক্বিরাআত হাঃ ২৪২, পৃঃ ১০৫; বায়হাক্বী- আস্ সুনানুল কুবরা ২/১৭১: সানাদ সহীহ; তাওযীহুল কালাম ১/৫৩৮; তাওযীহুল কালাম ১/৫৩৮, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৬২, ১/৩৭৪)
(৩) 'আমির আশ্ শা'বী বলেছেন: اقْرَأْ خَلْفَ الْإِمَامِ فِي الظُّهْرِ وَالْعَصْرِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَسُورَةِ، وَفِي الْأُخْرَيَيْنِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ»
“যুহর এবং 'আস্ত্রের মধ্যে ইমামের পিছে ফাতিহাতুল কিতাব এবং অন্য আরেকটি সূরাহ্ পড়বে। আর শেষের দু' রাক্'আতে শুধু ফাতিহাহ্ পাঠ করবে।” (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৬৪, ১/৩৭৪ : সানাদ সহীহ)
ইমাম শা'বী ইমামের পিছনে ক্বিরাআতকে ভালো মনে করতেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৭২, ১/৩৭৫: সানাদ সহীহ)
(৪) 'উবায়দুল্লাহ ইবনু 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উতবাহ্ ইমামের পিছনে (ফাতিহাহ্) পাঠ করতেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৫০, ১/৩৭৩ : সানাদ সহীহ)
(৫) আবুল মালীহ উসামাহ্ ইবনু 'উমায়র ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়তেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৬৮, ১/৩৭৫ : সানাদ সহীহ; জুযউল ক্বিরাআত হাঃ ৪৬)
(৬) হাকাম ইবনু 'উতায়বাহ্ বলেছেন : "যে সলাতে ইমাম উচ্চৈঃস্বরে পড়ে না তার প্রথম দু' রাক্'আতে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ এবং (অন্য কোন) একটি সূরাহ্ পড় এবং শেষ রাক্'আতে (শুধু) সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়"। (মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৭৬৬, ১/৩৭৪ : সানাদ সহীহ; তাওযীহুল কালাম ১/৫৫৫)
(৭) 'উরওয়াহ্ ইবনুয যুবায়র ইমামের পিছনে সিরী সলাতসমূহে (ফাতিহাহ্ এবং ফাতিহার পরে আরো একটি সূরাহ্) পড়তেন। (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালিক হাঃ ১৮৬, ১/৮৫: সানাদ সহীহ)
(৮) ক্বাসিম ইবনু মুহাম্মাদ ইমামের পিছে অনুচ্চস্বরে (সিরী) সলাতসমূহে (ফাতিহাহ্ এবং ফাতিহার পরে যা পাঠ করা হয়) পড়তেন। (মুওয়াত্ত্বা মালিক হাঃ ১৮৭, ১/৮৫: সানাদ সহীহ)
(৯) নাফি' ইবনু জুবায়র ইবনু মুত্ব'ইম ইমামের পিছে সিরী সলাতে (ফাতিহাহ্ এবং তারও অতিরিক্ত সূরা) পড়তেন। (মুওয়াত্ত্বা মালিক হাঃ ১৮৭, ১/৮৫: সানাদ সহীহ)
জ্ঞাতব্য: বন্ধনীতে ফাতিহাহ্ এবং 'মা যাদা আলাল ফাতিহাহ্' তথা ফাতিহার পরে যা পাঠ করা হয়-এর স্পষ্টতা অন্যান্য দলীলসমূহের দ্বারা করা হয়েছে।
📄 ‘আলিমদের আসারসমূহ
(১) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনুল মুনযির নীসাপূরী (মৃঃ ৩১৮ হিঃ) সাকতাসমূহের (ইমামের পাঠ করার ফাঁকে ফাঁকে) মধ্যে ইমামের পিছে ফাতিহাহ্ পড়ার প্রবক্তা ছিলেন। (দেখুন: ইবনুল মুনযির, আল আওসাত্ব ৩/১১০, ১১১)
(২) ইমাম আওযা'ঈ জেহরী সলাতে ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়ার হুকুম দিয়েছেন। (দেখুন: জুযউল ক্বিরাআতের টীকা হাঃ ৬৬; বায়হাক্বী, কিতাবুল ক্বিরাআত হাঃ ২৪৭ : সানাদ সহীহ; তাওযীহুল কালাম ১/৫৫৬)
(৩) ইমাম শাফি'ঈ বলেছেন: কোন ব্যক্তির সলাত জায়িয নয় যতক্ষণ সে প্রতিটি রাক্'আতে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ না পড়বে। চাই সে ইমাম হোক বা মুক্তাদী, ইমাম জেহরী ক্বিরাআত পড়ুক বা আস্তে; মুক্তাদীর ওপর এটি অপরিহার্য যে, সিরী এবং জেহরী উভয় সলাতে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়তে হবে। (হাশিয়া জুযউল ক্বিরাআত হাঃ ২২৬; বায়হাক্বী, মারিফাতুস্ সুনান হাঃ ৯২৮, ২/৫৮: সানাদ সহীহ)স
এ উক্তিটি রাবী রবী' ইবনু সুলায়মান আল মুরাদী বলেছেন : এটি ইমাম শাফি'ঈ হতে শ্রুত সর্বশেষ উক্তি। (ঐ)
এই সর্বশেষ উক্তির মোকাবেলায় 'কিতাবুল উম্ম' ইত্যাদির কোন মুজমাল এবং মুবহাম উক্তির কোনই গ্রহণযোগ্যতা নেই। বরং সেগুলোকে এই পরিষ্কার দলীলের কারণে মানসূখ বা রহিত মনে করতে হবে।
(৪) ইমাম 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক 'ক্বিরাআত খলফাল ইমাম'- এর প্রবক্তা ছিলেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, »يَرَوْنَ القِرَاءَةَ خَلْفَ الإِمَامِ« “তারা (ইবনুল মুবারক প্রমুখ বিদ্বানগণ( ইমামের পিছনে ফাতিহাহ্ পাঠের প্রবক্তা ছিলেন”। (সুনান তিরমিযী হাঃ ৩১১, “ইমামের পিছে ক্বিরাআত পড়া"র অনুচ্ছেদ)
ইমাম তিরমিযী 'কিতাবুল ইলাল' গ্রন্থে ঐ সকল সহীহ সানাদগুলো উল্লেখ করে দিয়েছেন যেগুলোর দ্বারা ইমাম 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের ফিক্বহী উক্তিসমূহ তাঁর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেগুলোর মধ্য হতে একটি সানাদও য'ঈফ নয়। (প্রকাশ: দারুস সালাম, পৃঃ ৮৮৯)
(৫) ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রহওয়াহও ক্বিরাআত খলফাল ইমামের প্রবক্তা ছিলেন। (সুনানুত্ তিরমিযী হাঃ ৩১১; কিতাবুল ইলাল পৃঃ ৮৮৯)
(৬) ইমাম বুখারীও জেহরী সলাতসমূহে ইমামের পিছনে ফাতিহাহ্ পড়ার প্রবক্তা ছিলেন। যার পক্ষে এই 'জুযউল ক্বিরাআত' গ্রন্থটি এবং بَابُ وُجُوبِ القِرَاءَةِ لِلْإِمَامِ وَالمَأْمُومِ فِي الصَّلَوَاتِ [كُلِّهَا، فِي الحَضَرِ وَالسَّفَرِ، وَمَا يُجْهَرُ فِيهَا وَمَا يُخَافَتُ] অধ্যায় নং- ৯৫ : ইমাম মুক্তাদী সবার জন্যই প্রত্যেক সলাতে ক্বিরাআত ওয়াজিব তা সফরের সলাত, নিজগৃহে অবস্থানের সময়ের সলাত প্রকাশ্য বা গোপনীয় সলাত যাই হোক) (হাঃ ৭৫৫) সাক্ষী রয়েছে।
(৭) ইমামদের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব ইবনু খুযায়মাহ নীসাপূরীও (মৃত ৩১১ হিঃ) জাহরী সলাতসমূহে ইমামের পিছনে ক্বিরাআতের প্রবক্তা ছিলেন।
(দেখুন : সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ৩/৩৬, হাঃ ১৫৮০১-এর পূর্বে; অনুচ্ছেদ: ইমামের পিছনে ক্বিরাআত পাঠ করা যদিও ইমাম উচ্চৈঃস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করে)
(৮) হাফিয ইবনু হিব্বান আল বুসতীও ফাতিহাহ্ খলফাল ইমামের প্রবক্তা ছিলেন। (দেখুন : সহীহ ইবনু হিব্বান, আল ইহসান হাঃ ১৭৯১-এর পূর্বে, ৩/১৪২ ذِكْرُ الزَّجْرِ عَنْ تَرْكِ قِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ لِلْمُصَلَّى فِي صَلَاتِهِ مَأْمُومًا كَانَ، أَوْ إِمَامًا، أَوْ مُنْفَرِدًا
(৯) ইমাম বায়হাক্বীও ক্বিরাআত খলফাল ইমামের প্রবক্তা ছিলেন। যার পক্ষে কিতাবুল ক্বিরাআত খলফাল ইমাম, আস্ সুনানুল কুবরা এবং মা'রিফাতুস্ সুনানি ওয়াল আসার ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ উত্তম সাক্ষীরূপে রয়েছে।
এই উদ্ধৃতিসমূহ থেকে প্রতীয়মান হল যে, ক্বিরাআত (ফাতিহাহ্) খলফাল ইমামের প্রমাণ-
(১) রসূলুল্লাহ , (২) সহাবায়ে কিরাম , (৩) তাবি'ঈনে ইযাম (রহিমাহুমুল্লাহ), (৪) নির্ভরযোগ্য ইসলামের ইমামদের থেকে কথায় ও কাজে প্রমাণিত আছে। অতএব এ উক্তি ও কাজ না কুরআনের বিরোধী আর না হাদীসের আর না ইজমার। আলহামদুলিল্লা-হ।
যে রিওয়ায়াতগুলোতে ক্বিরাআত হতে নিষেধ করা হয়েছে এবং চুপ থাকার হুকুম দেয়া হয়েছে সেগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য শুধু এই যে,
১. ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ ছাড়া অতিরিক্ত পড়া যাবে না। (তাকবীরে তাহরীমা, ফাতিহার পূর্বে আ'ঊযুবিল্লা-হ ও বিস্মিল্লা-হ পড়া এবং ভুল ধরিয়ে দেয়া এই [হুকুম] থেকে পৃথক)
২. জাহরী সলাতে সূরাহ্ ফাতিহার চাইতে অতিরিক্ত পড়া যাবে না। (তাকবীরে তাহরীমা, ফাতিহার পূর্বে আ'ঊযুবিল্লা-হ ও বিস্মিল্লা-হ পড়া এবং ভুল ধরিয়ে দেয়া এই [হুকুম] থেকে পৃথক) ক
কোন সহাবী থেকেও ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়ার নিষিদ্ধতা প্রমাণিত নেই। ইমাম ইবনু 'আবদুল বার এ বিষয়ে 'আলিমদের ইজমা উল্লেখ করেছেন যে, 'যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়ল তার সলাত পরিপূর্ণ হল এবং তাকে পুনরায় সলাত ঘুরিযে পড়ার প্রয়োজন নেই।' (ফাতাওয়া সুবকী ১/১৩৮)
ইমাম ইবনু হিব্বানও উক্ত ইজমারই সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। (আল মাজরূহীন ২/১৩)
ইমাম বাগাবী বলেছেন যে, 'সহাবায়ে কিরামের একটি জামা'আত জাহরী ও সিরী সলাতসমূহে ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পড়া ফার্য হওয়ার প্রবক্তা। এ কথাই 'উমার, 'উসমান, 'আলী, ইবনু 'আব্বাস, মু'আয, উবাই ইবনু কা'ব থেকে বর্ণিত আছে'। 'আনুহুম (শারহুস্ সুন্নাহ্ ৩/৮৪, ৮৫, হাঃ ৬০৭)
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন : وَالعَمَلُ عَلَى هَذَا الْحَدِيثِ فِي القِرَاءَةِ خَلْفَ الْإِمَامِ عِنْدَ أَكْثَرِ أَهْلِ العِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ، وَالتَّابِعِينَ، وَهُوَ قَوْلُ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ، وَابْنِ المُبَارَكِ، وَالشَّافِعِي، وَأَحْمَدَ، وَإِسْحَاقَ يَرَوْنَ الْقِرَاءَةَ خَلْفَ الْإِمَامِ".
“এ হাদীসের ভিত্তিতে ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পাঠ করার ব্যাপারে অধিকাংশ সহাবী ও তাবি‘ঈ-এর 'আমাল চালু আছে। আর এটাই মালিক ইবনু আনাস, ইবনুল মুবারক, শাফি'ঈ, আহমাদ ও ইসহাক্ব ইবনু রহওয়াইহ-এর মত। এঁরা ইমামে পিছনে ফাতিহাহ্ পড়ার প্রবক্তা।” (তিরমিযী ১/৭০, ৭১, হাঃ ৩১১)