📄 নাভীর নিচে হাত বাঁধা হাদীসের জবাব
নাবী এবং কোন একজন সহাবী থেকে নাভির নিচে হাত বাঁধা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নেই। পুরুষদের নাভির নিচে এবং মহিলাদের বুকের উপরে হাত বাঁধা কোন সহীহ তো দূরের কথা য'ঈফ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত নেই।
দলীল-১ : সাইয়িদুনা আবূ হুরায়রাহ্ এবং সাইয়িদুনা 'আলী হতে রিওয়ায়াত আছে যে, “সলাতে সুন্নাত এই যে, (ডান) হাতকে (বাম) হাতের উপর নাভীর নিচে রাখতে হবে"। (সুনান আবূ দাউদ ১/৪৮০, ৪৮১, হাঃ ৭৫৬, ৭৫৮)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয় পর্যালোচনা : এ রিওয়ায়াতটি 'আবদুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব আল কূফীর ওপর ভিত্তিশীল।
'আবদুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব আল ওয়াসিত্বী আল কূফী আসমাউর রিজালের 'আলিমদের দৃষ্টিতে-
(১) আবূ যুর্'আহ্ আর্ রাযী বলেছেন : "لَيْسَ بِقَوْى “তিনি শক্তিশালী নন।” (আল জারহু ওয়াত্ তা'দীল ৫/২১৩)
(২) আবূ হাতিম আর্ রাযী বলেছেন : "هو ضعيف الحديث منكر" "তিনি য'ঈফুল হাদীস, মুনকারুল হাদীস, الحديث يكتب حديثه ولا يحتج به" তার হাদীস লেখা যাবে। কিন্তু তার দ্বারা হুজ্জাত তথা দলীল পেশ করা যাবে না”। (আল জারহু ওয়াত্ তা'দীল ৫/২১৩)
(৩) ইবনু খুযায়মাহ্ বলেছেন : "ضعيف الحديث" "তিনি য'ঈফ হাদীস বর্ণনাকারী”। (কিতাবুত্ তাওহীদ পৃঃ ২২০)
(৪) ইবনু মা'ঈন বলেছেন : "ضعيف ليس بشئ" "তিনি য'ঈফ, কিছুই নন”। (আল জারহু ওয়াত্ তা'দীল ৫/২১৩, এর সানাদ সহীহ; তারীখে ইবনু মা'ঈন, জীবনী ক্রমিক নং ১৫৫৯, ৩০৭০)
(৫) আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন : "منكر الحديث" "তিনি মুনকারুল হাদীস”। (ইমাম বুখারী, কিতাবুয যু'আফা, জীবনী ক্রমিক নং ২০৩; আত্ তারীখুল কাবীর ৫/২৫৯)
(৬) বায্যার বলেছেন : "ليس حديثه حديث حافظ" "তার (বর্ণিত) হাদীস হাফিযের হাদীসের মতো নয়”। (কাশফুল আসতার, জীবনী ক্রমিক নং ৮৫৯)
(৭) ইয়া'কূব ইবনু সুফ্ইয়ান বলেছেন : "ضَعِيفٌ" "তিনি য'ঈফ”। (কিতাবুল মা'রিফাতি ওয়াত্ তারীখ, ৩/৫৯)
(৮) 'উক্বায়লী বলেছেন : "ذكره في كتاب الضعفاء" "তিনি তাকে 'কিতাবুয যু'আফা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন”। (২/৩২২)
(৯) ইজলী বলেছেন : "جائز الحديث" "তিনি য'ঈফ””, জায়িযুল হাদীস। তার হাদীস লিপিবদ্ধ করা যাবে'। (তারীখুল ইজলী, জীবনী ক্রমিক নং ৯৩০)
(১০) বুখারী বলেছেন : "ضعيف الحديث" "তিনি য'ঈফুল হাদীস”। (ইমাম তিরমিযী, আল ইলাল ১/২২৭)
আর তিনি বলেছেন : "فيه نظر" "তার মাঝে চিন্তার অবকাশ আছে” তথা বর্ণনা ভুল। (ইমাম ইবনু 'আদী, আল কামিল ৪/১৬১৩, এর সানাদ সহীহ)
(১১) নাসায়ী বলেছেন: "ضعیف" "তিনি য'ঈফ”। (ইমাম নাসায়ী, কিতাবুয যু'আফা, নাসায়ী জীবনী ক্রমিক নং ৩৫৮)
আর বলেছেন : "ليس بثقة" "তিনি নির্ভরযোগ্য নন"। (সুনান নাসায়ী ৬/৯, হাঃ ৩১০১)
(১২) ইবনু সা'দ বলেছেন : "ضَعِيف الحَدِيث" "তিনি য'ঈফুল হাদীস”। (ত্ববাক্বাতে ইবনু সা'দ ৬/৩৬১)
(১৩) ইবনু হিব্বান বলেছেন : كَانَ مِمَّنْ يقلب الْأَخْبَارِ وَالْأَسَانِيد “তিনি তাদের এককভাবে প্রসিদ্ধদের হতে মুনকার রিওয়ায়াতসমূহ বর্ণনা করতেন। তার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হালাল নয়”। (কিতাবুল মাজরূহীন, ২/৫৪)
(১৪) দারাকুত্বনী বলেছেন: "ضعیف" "তিনি য'ঈফ”। (সুনান দারাকুত্বনী ২/১২১, ১৯৮২)
(১৫) বায়হাক্বী বলেছেন : "مَثْرُوكُ" "তিনি মাতরূক” তথা পরিত্যাজ্য। (আস্ সুনানুল ২/৩২)
(১৬) ইবনু জাওযী তাকে "আয যু'আফা ওয়াল মাতরূকীন” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আর বলেছেন, ويحدث عن النُّعْمَانِ عَنِ الْمُغيرة “তিনি 'নু'মান হতে, তিনি মুগীরাহ্ হতে (সানাদে) মুনকার হাদীসসমূহ বর্ণনা করতেন- (২/৮৯ নং, ১৮৫০) আর বলেছেন: "المتهم به عبد الرحمن بن إسحاق “আবদুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব (হাদীস জালকরণের দোষে) অভিযুক্ত”- (আল মাওযূ'আত, ৩/২৫৭)।
(১৭) যাহাবী বলেছেন : "ضَعَفُوهُ" "মুহাদ্দিসগণ তাকে য'ঈফ বলেছেন”। (আল কাশিফ ২/২৬৫)
(১৮) ইবনু হাজার বলেছেন : "كوفى ضعيف" “তিনি কুফার অধিবাসী, য’ঈফ”। (তাক্বরীবুত্ তাহযীব, জীবনী ক্রমিক নং ৩৭৯৯)
(১৯) নাবাবী বলেছেন, "وَهُوَ ضَعِيفٌ بِالْإِتِّفَاقِ" “তিনি ঐকমত্যানুসারে য’ঈফ”। (শারহে মুসলিম ৪/১১৫; নাসবুর রায়াহ ১/৩১৪)
(২০) ইবনুল মুলাক্বিন বলেছেন, "فإنه ضعیف" “নিশ্চয় তিনি য’ঈফ”। (আল বাদরুল মুনীর ৪/১৭৭)
আয যারক্বানীও ‘শারহে মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালিক’ গ্রন্থে (১/৩২১) বলেছেন, "وإسناده ضعیف" এবং এর সানাদ য’ঈফ।
এই পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হতে প্রতীয়মান হল যে, ‘আবদুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব’ জামহুর মুহাদ্দিস কিরামদের নিকটে য’ঈফ এবং সমালোচিত। কতিপয় তাকে (হাদীস জাল করার দোষে) অভিযুক্ত এবং পরিত্যাজ্যও বলেছেন। অতএব তার রিওয়ায়াত প্রত্যাখ্যাত।
দলীল-২:
عن علقمة بن وائل بن حجر ، عن أبيه ، قال : رأيت النبي وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة.
ওয়ায়িল ইবনু হুজ্ বলেন, আমি নাবী-কে দেখেছি, তিনি সলাতে ডান হাত বাম হাতের উপরে নাভীর নিচে রেখেছেন। (মুসান্নাফ আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৯৩৮: মাকতাবাহ্ রশিদ; মুসান্নাফ আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৯৫৫, ৩৯৫৯, তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম; মুসান্নাফ আবূ শায়বাহ্ হাঃ ৩৯৬২, তাহক্বীক্ব: ‘উসমান ইবনু ইবরাহীম)
‘উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
জবাব : تَحْتَ السُّرَّةِ বা “নাভীর নিচে” হাদীসের মাতান ঢুকিয়ে দিয়ে নিচের মাযহাবের পক্ষে দলীল বানিয়েছে! এই تَحْتَ السُّرَّةِ “নাভীর নিচে” কথাটি কিছু হাদীস জালকারীরা যুক্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ عَزِيرٌ حَكِيمٌ “অতিশয় সম্মানিত এবং মহাজ্ঞানী”- (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯: ৭১)। হাদীস জালকারীদের এই ধূর্ততাকে আল্লাহ মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন।
জবাব : ওয়ায়িল ইবনু হুজর-এর উক্ত হাদীসটি একই সানাদে (মুসনাদ আহমাদ হাঃ ১৮৮৪৬, সুনান দারাকুত্বনী হাঃ ১১০১, শারহুস্ সুন্নাহ হাঃ ৫৬৯) এনেছেন কিন্তু কেউ এই تَحْتَ السُّرَّةِ “নাভীর নিচে” কথাটি আনেননি। ফলে ভারতের চাঁদপুরী সাহেবরা হাদীস জাল করেছেন, এটা প্রমাণিত হলো।
ইমাম সুয়ূতী (রহিমাহুল্লাহ) মুসান্নাফ আবূ শায়বাহ্ থেকে হাদীসটি নকল করেছেন তাতেও تَحْتَ السُّرَّةِ “নাভীর নিচে” কথাটি আনেনি। (কানযুল উম্মাল হাঃ ২২০৯৯)
এ কারণেই অনোয়ার শাহ কাশ্মীরি হানাফী দেওবন্দী স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, উক্ত হাদীসের تَحْتَ السُّرَّةِ “নাভীর নিচে” কথাটি বাতিল প্রমাণিত নয়। (ফাইজুল বারী ২/২৬৭ পৃষ্ঠা)
তাক্বী 'উসমানী ও দেওবন্দী হানাফী তিনিও স্বীকার করেছেন। (দারসে তিরমিযী ২/২৩-২৪ পৃষ্ঠা)
📄 ইমামের পিছনে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ পাঠ না করার দলীলের জবাব
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾
“আর যখন কুরআন পঠিত হয় তখন তা শোনো, আর চুপ করে থেকো, যেন তোমাদের প্রতি করুণা বর্ষিত হয়।” (সূরাহ্ আল আ'রাফ ৭ : ২০৪)
عن بشير بن جابر قال: صلى ابن مسعود، فسمع ناسا يقرؤون مع الإمام، فلما انصرف قال : أما آن لكم أن تفقهوا! أما آن لكم أن تعقلوا؟ وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا ، كما أمركم الله.
বাশির ইবনু জাবির বলেন, ইবনু মাস্ঊদ লোকেদের ইমামতি করলেন ও তিনি কিছু লোককে ইমামের পিছনে কুরআন পড়তে শুনলেন, তিনি সালাম ফেরার পরে বললেন : এখনও কি সময় হয়নি যে, তোমরা বুঝবে? এখনও কি সময় আসেনি যে, তোমরা অনুধাবন করবে? “শুনে রাখ যখন কুরআন পড়া হয় তখন তোমাকে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং চুপ থাকবে”- (সূরাহ্ আল আ'রাফ ৭ : ২০৪)। যেমনটি আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। (তাফসীর আত্ ত্ববারী ১৫৫৮৪)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
তাহক্বীক্ব : এ হাদীসটি য'ঈফ, কারণ উক্ত সানাদ দাউদ ইবনু আবূ হিন্দ ছোট তাবি'ঈ (মৃত্যু ১৩৯/১৪০) কেবলমাত্র আনাস -কে দেখেছেন কিন্তু তার থেকেও শ্রবণ সাব্যস্ত নেই। (মাশাহির 'উলামা ১১৮৭, সিক্কাত ইবনু হিব্বান ৭৭২৮, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬/৩৭৬-৩৭৮)
অতএব সানাদে ইনক্বিতা' আছে।
আল মাহরাবী হচ্ছেন মুদাল্লিস রাবী- (তাবাকাত আল মুদাল্লিসিন, রাবী নং ৮০, আসমাউ মুদাল্লিসিন রাবী- ৩৫) এবং তিনি আন আন শব্দে হাদীস বর্ণনা করেন, ফলে হাদীসটি য'ঈফ। মুদাল্লিস রাবীর عن ওয়ালা বর্ণনা য'ঈফ হয়- (মুক্বাদ্দামা ইবনুস্ সলাহ্ পৃঃ ৯৯, আল কিফায়াহ্ পৃঃ ৩৬৪)।
مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ، فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ
জাবির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন : যার ইমাম আছে ইমামের ক্বিরাআতই তার ক্বিরাআত। (সুনান ইবনু মাজাহ হাঃ ৮৫০, মুসনাদে আহমাদ হাঃ ১৪৬৫৫, মুওয়াত্ত্বা মুহাম্মাদ ৯৮ পৃষ্ঠা, সুনান দারাকুত্বনী হাঃ ১২৫৩; ইমাম দারাকুত্বনী হাদীসটি আনার পর য'ঈফ বলেছেন)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
তাহক্বীক্ব : এ হাদীসের সানাদে হাসান ও আবুয যুবায়র-এর মাঝে জাবীর আল জু'ফী ও কোন কোন বর্ণনায় লায়স ইবনু আবূ সুলায়মান আছে। (দারাকুত্বনী হাঃ ১২৫৩,১২৫৪, বায়হাক্কী হাঃ ২৮৯৮, মা'আনিল আসার হাঃ ১২৯৭)
১) লায়স ইবনু আবূ সুলায়মান য'ঈফ মুদাল্লিস রাবী, শেষ জীবনে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল। (তাহযীবুল আসমা রাবী ৫৩৭, জারাহ ও তা'দীল রাবী ১০১৪, ইবনু হিব্বান-এর "মাজরূহীন” ৯০৬)
২) জাবির আল জু'ফী সম্পর্কে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনি সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। (নাস্তাবুর রায়হা ২/২৪৯)
৩) আবুয যুবায়র তিনি বিখ্যাত মুদাল্লিস রাবী। (মুদাল্লিসিন ৫৯, তাবি'ঈন ৭২, তাবাকাতু মুদাল্লিসিন ১০১)
মুদাল্লিস রাবীর عن ওয়ালা বর্ণনা য'ঈফ হয়। (মুক্বাদ্দামাহ্ ইবনুস্ সালাহ্ পৃঃ ৯৯; আল কিফায়াহ্ পৃঃ ৩৬৪)
অতএব এ হাদীসের কোন সানাদই সহীহ নয় সবগুলোই য'ঈফ।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: "إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ، وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَقُولُوا: اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ".
আবূ হুরায়রাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: মূলত ইমামকে নির্ধারণ করা হয় তাকে অনুসরণ করার জন্য। যখন সে তাকবীর বলবে তখন তোমরাও তাকবীর দিবে। আর যখন সে পাঠ করবে তখন তোমরা নীরব থাকবে। এবং যখন সে “সামি'আল্ল-হু লিমান হামিদাহ্” বলবে তখন তোমরা বলবে “আল্ল-হুম্মা রব্বানা- লাকাল হাম্দ”। (নাসায়ী হাঃ ৯২১)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
জবাব : এ রিওয়ায়াতটি মানসূখ বা রহিত। এ হাদীসের রাবী সাইয়িদুনা আবূ হুরায়রাহ্ জেহরী সলাতসমূহেও ইমামের পিছনে ফাতিহাহ্ পাঠের হুকুম দিতেন। (দেখুন: আসারুস্ সুনান হাঃ ৩৫৮, মুসনাদুল হুমায়দী, দেওবন্দী নুসখা হাঃ ৯৭৪)
রাবী যদি নিজের রিওয়ায়াতের বিরোধী ফাতাওয়া দেন তবে ঐ রিওয়ায়াতটি দেওবন্দীদের নিকটে মানসূখ হয়। (দেখুন : ত্বাহাবী, শারহু মা'আনিল আসার ১/২৩; আসারুস সুনান মাআত তালীক্ব, নং ২০; তাওযীহুস্ সুনান ১/১০৭; খাযায়িনুস সুনান ১/১৯১, ১৯২; উমদাতুল ক্বারী ৩/৪১; হাক্বায়িকুস সুনান ১/৪০৫; হুসায়ন আহমাদ, তাক্বরীরে তিরমিযী পৃঃ ২১০)
ত্বহাবী এবং আইনীর উদ্ধৃতি এজন্য পেশ করা হল যে, দেওবন্দীদের নিকটে তাদের উচ্চ স্থান রয়েছে। স্বীয় আকাবেরদের মূলনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অত্র হাদীসটি স্বপক্ষে পেশ করা হয়ে থাকে।
📄 সশব্দে ‘আ-মীন’
ওয়ায়িল ইবনু হুজর থেকে বর্ণিত আছে যে, كَانَ رَسُولُ اللهِ لا إِذَا قَرَأَ وَلَا الضَّالِّينَ﴾ [الفاتحة: 7]، قَالَ: «آمِينَ»، وَرَفَعَ بِهَا صَوْتَهُ.
“রসূলুল্লাহ যখন 'ওয়ালায্যো-ল্লীন' পড়তেন, তখন উচ্চৈঃস্বরে ‘আ-মীন’ বলতেন”। (আবূ দাউদ ১/১৪২, হাঃ ৯৩২; তিরমিযী হাঃ ২৪৮; দারাকুতনী হাঃ ১২৬৭; দারিমী হাঃ ১২৮৩; মুসনাদে আহমাদ ৪/৩১৬, হাঃ ১৮৮৪২)
‘উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
ইমাম তিরমিযী বলেন : হাদীসটি হাসান। (তিরমিযী হাঃ ২৪৮)
ইমাম দারাকুতনী বলেন: এটি (হাদীসটি) সহীহ। (দারাকুতনী হাঃ ১২৬৭)
ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন : হাদীসটি সহীহ। (আবূ দাউদ হাঃ ৯৩২, তাহক্বীক্ব: নাসিরুদ্দীন আলবানী)
হামযাহ্ আহমাদ যাঈন বলেন: এর সানাদ সহীহ। (মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩১৬, হাঃ ১৮৭৪৪; তাহক্বীক্ব: হামযাহ্ আহমাদ যাঈন)
ইয়াসির হাসান বলেন: এর সানাদ সহীহ। (আবূ দাউদ হাঃ ৯৩২, তাহক্বীক্ব: ইয়াসির হাসান)
শু'আয়ব আরনাউত্ব বলেন: এর সানাদ সহীহ। (আবূ দাউদ হাঃ ৯৩২, তাহক্বীক্ব: শু'আয়ব আরনাউত্ব)
হাফিয যুবায়র 'আলী যাঈ বলেন: এর সানাদ সহীহ। (তিরমিযী হাঃ ২৪৮, তাহক্বীক্ব: যুবায়র 'আলী যাঈ)
হুসায়ন সালিম আসাদ দারানী বলেন: এর সানাদ সহীহ। (দারিমী হাঃ ১২৮৩, তাহক্বীক্ব: হুসায়ন সালিম আসাদ্ দারানী)
মাজদী ইবনু মানসূর ইবনু সা'ঈদ আশ্ শাওরী বলেন: এর সানাদ হাসান। (দারাকুতনী হাঃ ১২৫৩, তাহক্বীক্ব: মাজদী ইবনু মানসূর ইবনু সা'ঈদ আশ্ শাওরী)
উক্ত হাদীসটি সর্বসম্মতিক্রমে সহীহ। এ হাদীসটির প্রতি বিন্দুমাত্র ভুল ধারণা রাখাই যাবে না। সূরাহ্ ফাতিহার পর জোরে 'আ-মীন' বলা সুন্নাত। 'আ-মীন' হল দু'আ। এর অর্থ (হে আল্লাহ!) তুমি ক্ববূল করো। আমরা যে কোন দু'আ করে 'আ-মীন' বলি যাতে আল্লাহ আমাদের উক্ত দু'আ কবুল করেন। তাই আমাদের সকলের এই সুন্নাত মেনে চলতে হবে। তাই আমাদের সকলের উচিত তাক্বলীদ মুক্ত হয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীস দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করা এবং মেনে চলা। আল্লাহ আমাদের সকলকে হিদায়াত দান করুক। আ-মীন!
আর একটি বর্ণনায় আছে, »فَجَهَرَ بِآمِينَ« “অতঃপর তিনি সশব্দে 'আ-মীন' বললেন”। (ঐ, হাঃ ৯৩৩)
»يَرْفَعُ صَوْتَهُ بِآمِينَ« হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম দারাকুত্বনী বলেছেন : صَحِيحٌ 'সহীহ'। (দারাকুত্বনী হাঃ ১২৫৩, ১২৫৪(
ইবনু হাজার বলেছেন : وَسَنَدَهُ صَحِيحٌ “এর সানাদ সহীহ”। (ইবনু হাজার 'আসক্বালানী, আত্ তালখীসুর হাবীর ১/২৩৬, হাঃ ৩৫৩)
ইবনু হিব্বান ও ইবনুল ক্বাইয়িম প্রমুখ সহীহ বলেছেন। কোন নির্ভরযোগ্য ইমাম একে য'ঈফ বলেননি। এ মর্মের অন্যান্য সহীহ বর্ণনাগুলো 'আলী, আবূ হুরায়রাহ্ প্রমুখ থেকেও বর্ণিত আছে। যেগুলোকে 'আ-মীন' প্রসঙ্গে মিথ্যাচারের জবাব পুস্তকে উল্লেখ করেছি আল্হাম্মদুলিল্লা-হ।
‘আত্বা ইবনু আবূ রবাহ বর্ণনা করেছেন যে,
أَمَّنَ ابْنُ الزُّبَيْرِ: وَمَنْ وَرَاءَهُ حَتَّى إِنَّ لِلْمَسْجِدِ لَلَجَّةٌ
“আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র এবং তাঁর মুক্তাদীরা এত উচ্চৈঃস্বরে 'আ-মীন' বলেন যে, মাসজিদ গুঞ্জরিত হয়ে উঠে”। (সহীহুল বুখারী ১/১০৭, হাঃ ৭৮০ এর পূর্বে, 'আযান' অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১১১; মুসান্নাফ 'আবদুর রাযযাক্ব হাঃ ২৬৪০)
এর সানাদ সহীহ (রিজাল ও উসূলে হাদীসের গ্রন্থাবলী দেখুন)। ইবনু 'উমার এবং তাঁর সাথী ও ইমামের পিছনে 'আ-মীন' বলতেন এবং এটাকে সুন্নাত আখ্যায়িত করতেন। (সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ১/২৮৭, হাঃ ৫৭২) আলবানী হাদীসটিকে য'ঈফ বলেছেন [اسنده ضعیف]
কোন একজন সহাবী থেকেও সহীহ সানাদে নীরবে 'আ-মীন' বলা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নেই।
মু'আয ইবনু জাবাল থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ বলেছেন:
... إِنَّ الْيَهُودَ قَوْمٌ سَئِمُوا دِينَهُمْ، وَهُمْ قَوْمٌ حُسَّدٌ، وَلَمْ يَحْسِدُوا الْمُسْلِمِينَ عَلَى أَفْضَلَ مِنْ ثَلَاثٍ: رَبِّ السَّلَامِ، وَإِقَامَةِ الصُّفُوفِ، وَقَوْلِهِمْ خَلْفَ إِمَامِهِمْ فِي الْمَكْتُوبَةِ: آمِينَ
“নিশ্চয় ইয়াহুদীরা তাদের ধর্ম সম্পর্কে বিরক্ত হয়ে গেছে এবং তারা হিংসুক জাতি। তারা যেসব 'আমালের ব্যাপারে মুসলিমদের সাথে হিংসা করে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল (১) সালামের উত্তর দেয়া (২) কাতারসমূহ সোজা করা এবং (৩) ফার্য সলাতে ইমামের পিছনে মুসলিমদের আ-মীন বলা।” (মাজমা'উয যাওয়ায়িদ ২/১১৩, হাঃ ২৬৬৩; হায়সামী বলেছেন: اسناده حسن এর সানাদ হাসান', ত্ববারানী আওসাত্ব ৫/৪৭৩, হাঃ ৪৯১০)
📄 নিম্নস্বরে ‘আ-মীন’ বলা হাদীসের জবাব
ওয়ায়িল ইবনু হুজ্র বলেন, “রসূলুল্লাহ যখন (সূরাহ্ ফাতিহার শেষ আয়াত( )غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ﴿ পাঠ করতেন, তখন আ-মীন বলতেন এবং তার কণ্ঠস্বর নীচু করতেন।” (তিরমিযী হাঃ ২৪৮-এর শেষাংশ; মুসনাদে আহমাদ ৪/৩১৬, হাঃ ১৮৮৫৪)
‘উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
তাহক্বীক্ব : হাদীসটি শায। কেননা ওয়ায়িল ইবনু হুজ্র থেকে আ-মীন উচ্চৈঃস্বরে বলার সহীহ হাদীস রয়েছে। (তিরমিযী হাঃ ২৪৮, আবূ দাউদ হাঃ ৯৩২; দারাকুতনী হাঃ ১২৮৩; মুসনাদে আহমাদ ৪/৩১৬, হাঃ ১৮৮৪২: সানাদ সহীহ)
ইমাম বুখারী বলেন: “শু‘বাহ্-এর হাদীসের তুলনায় সুফইয়ান-এর [দীর্ঘস্বরে আ-মীন বলার] হাদীসটি বেশি সহীহ। কেননা শু‘বাহ্ এ হাদীসের কয়েকটি জায়গায় [৩টি] ভুল করেছেন। (১) তিনি সানাদে হুজর আবুল আম্বাস এর কথা বলেছেন অথচ তিনি হলেন হুজর ইবনু আম্বাস। তার উপনাম হল আবুস্ সাকান। (২) ‘আলক্বামাহ্ ইবনু ওয়ায়িল-এর নাম অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন অথচ এই সানাদে ‘আলক্বামাহ্ উল্লেখ হবে না। প্রকৃত সানাদটি হল, ওয়ায়িল ইবনু হুজ্র থেকে হুজর ইবনু আম্বাস। (৩) শু‘বাহ্-এর বর্ণনায় আছে, »خَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ« “তাঁর কণ্ঠস্বর নীচু করতেন” অথচ প্রকৃত কথা হল »مَدَّ بِهَا صَوْتَهُ« “তার কণ্ঠস্বর দীর্ঘ করতেন।” (তিরমিযী হাঃ ২৪৮-এর শেষাংশ)
ইমাম আবূ যুর্‘আহ্ বলেন: “শু‘বাহ্-এর হাদীসের তুলনায় সুফইয়ান-এর (দীর্ঘস্বরে আ-মীন বলার) হাদীসটি বেশি সহীহ।” (তিরমিযী হাঃ ২৪৮-এর শেষাংশ)
ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন: হাদীসটি শায। (তিরমিযী হাঃ ২৪৮, তাহক্বীক্ব: নাসিরুদ্দীন আলবানী)
শু'আয়ব আরনাউত্ব বলেন: “তার কণ্ঠস্বর নীচু করতেন” ব্যতীত হাদীসটি সহীহ। কেননা শু'বাহ এখানে ভুল করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩১৬, হাঃ ১৮৮৫৪; তাহক্বীক্ব: শু'আয়ব আরনাউত্ব)
হাফিয যুবায়র 'আলী যাঈ বলেন: শু'বাহ্-এর হাদীসটি শায। (তিরমিযী হাঃ ২৪৮, তাহক্বীক্ব: যুবাইর 'আলী যাঈ) দ্বিতীয় দলীল:
'উমার বলেন: “ইমাম চারটি বিষয় অনুচ্চস্বরে পড়বে : আ'ঊযুবিল্লা-হ, বিসমিল্লা-হ, আ-মীন ও রব্বানা- লাকাল হাম্দ।” (কানযুল উম্মাল ৮/২৭৪, হাঃ ২২৮৯৩)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
তাহক্বীক্ব : এ হাদীসটি মুনক্বাতি' হওয়ার কারণে দুর্বল। কারণ 'আবদুর রহমান ইবনু আবূ লায়লা এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন 'উমার থেকে। আর তিনি 'উমার থেকে শুনেননি। ইমাম ইবনু আবূ হাতিম বলেন, “এটি কি সঠিক যে, 'আবদুর রহমান ইবনু আবূ লায়লা 'উমার থেকে শুনেছেন?” তার পিতা ইমাম আবূ হাতিম বললেন, “না”। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল মারাসীল, রাবী নং ২১৩)
এছাড়াও ইবরাহীম নাখ'ঈ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন 'উমার থেকে। আর তিনিও 'উমার থেকে শুনেননি। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল মারাসীল, রাবী নং ১)
أَبِي حَمْزَةَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِي عَنْ عَلْقَمَةَ، وَالْأَسْوَدِ، كِلَاهُمَا عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: يُخْفِي الْإِمَامُ ثَلَاثًا : الاسْتِعَاذَةُ، وَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ وَآمِينَ.
'আবদুল্লাহ ইবনু মাস্ঊদ বলেন : "ইমাম তিনটি বিষয় অনুচ্চস্বরে পড়বে: আ'উযুবিল্লা-হ, বিসমিল্লা-হ ও আ-মীন।” (ইবনু হাযম, আল মুহাল্লা, ২/২৮০, মাআলাহ্ নং ৩৬৩)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
তাহক্বীক্ব : হাদীসটি দুর্বল। কারণ হাদীসটির সানাদে আবূ হামযাহ্ মায়মূন নামে এক রাবী রয়েছেন।
ইমাম বুখারী বলেন : তিনি কিছুই নন। (বুখারী, কিতাবুয যু'আফা আছে আস্ সগীর, রাবী নং ৩৬৮)
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেন: তিনি মাতরূকুল হাদীস। ('উক্বাইলী, যু'আফা আল কাবীর, রাবী নং ১৭৬৪)
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন বলেন: তিনি কিছুই নন। তার হাদীস লেখা যাবে না। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১০৬১)
ইমাম আবূ হাতিম বলেন: তিনি শক্তিশালী নন। তার হাদীস লেখা যাবে। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১০৬১)
ইমাম নাসায়ী বলেন: তিনি সিক্বাহ্ নন। (নাসায়ী, কিতাবুয যু'আফা ওয়াল মাতরূকুত্বনী, রাবী নং ৫৮১)
ইমাম দারাকুত্বনী বলেন: তিনি হাদীসের ক্ষেত্রে দুর্বল। (দারাকুত্বনী হাঃ ১৯৫৫)
ইমাম ইবনু 'আদী বলেন: তার (হাদীসের) অনুসরণ করা হয় না। (ইবনু 'আদী, আল কামিল, রাবী নং ১৮৯৪)
ইমাম ইবনু হিব্বান বলেন: তিনি গুরুতর ভুল করতেন এবং অত্যধিক বিভ্রান্তিতে পড়তেন। (ইবনু হিব্বান, আল মাজরূহীন ৩/৬, রাবী নং ১০২৭)
ইমাম 'উক্বায়লী তাকে দুর্বলদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ('উক্বাইলী, যু'আফা আল কাবীর, রাবী নং ১৭৬৪)
ইমাম ইবনুল জাওযী তাকে দুর্বলদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (ইবনুল জাওযী, কিতাবুয যু'আফা ওয়াল মাতরূকীন, রাবী নং ৩৪৮৪)
এছাড়াও আরো অনেকেই এ রাবীর সমালোচনা করেছেন। (মিযযী, তাহযীবুল কামাল, রাবী নং ৬৩৪৬)
এ হাদীসের অপর রাবী ইবরাহীম নাখ'ঈ মুদাল্লিস ছিলেন। (ইবনু হাজার 'আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ৩৫)
আর একজন মুদাল্লিসের হাদীস তখনই গ্রহণ করা যাবে যখন উক্ত রাবী হাদ্দাসানা- বা সামি'তু বা আখবারানা- বা সানা- বলবে অথবা উক্ত রাবীর বর্ণিত হাদীসের শাওয়াহিদ সহীহ হাদীস থাকবে। কিন্তু উক্ত হাদীসের কোন শাওয়াহিদ সহীহ হাদীস নেই। যেগুলো রয়েছে তা সবই দুর্বল।