📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 সলাত

📄 সলাত


'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে,
لَمَّا بَعَثَ النَّبِيُّ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ إِلَى نَحْوِ أَهْلِ اليَمَنِ قَالَ لَهُ: «إِنَّكَ تَقْدَمُ عَلَى قَوْمٍ مِنْ أَهْلِ الكِتَابِ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَى أَنْ يُوَحِدُوا الله تَعَالَى، فَإِذَا عَرَفُوا ذُلِكَ، فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي يَوْمِهِمْ وَلَيْلَتِهِمْ، فَإِذَا صَلَّوْا ...
"নাবী যখন মু'আয ইবনু জাবাল-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেন, তুমি আহলে কিতাবদের নিকট যাচ্ছ। অতএব তাদেরকে সর্বপ্রথম তাওহীদের দা'ওয়াত দিবে। যখন তারা তাওহীদের পরিচয় লাভ করবে তখন তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ দিনে-রাতে তাদের ওপরে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফার্য করেছেন। যখন তারা সলাত আদায় করতে শুরু করবে...।" (সহীহুল বুখারী ১/১৯৬, হাঃ ১৪৫৮, ২/১০৯৬, হাঃ ৭৩৭২; মুসলিম ১/৩৬, হাঃ ১৯৬, হাঃ ১৯; শব্দ বুখারী)
ফার্য ও নাফ্ল সলাতের সংখ্যা, রাক্'আত এবং বিস্তারিত বিবরণ রসূলুল্লাহ বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং স্বীয় উম্মাতকে হুকুম দিয়েছেন যে, «وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلَّى» “আর তোমরা যেভাবে আমাকে সলাত আদায় করতে দেখেছ, সেভাবে সলাত আদায় করো”। (সহীহুল বুখারী ১/৮৮, ৬৩১; ২/৮৮৮, ৬০০৮; ২/১০৭৬, ৭২৪৬; ইবনু খুযায়মাহ্ ৩৯৭, ৫৮৬; ইবনু হিব্বান ১৬৫৮, ১৮৭২; দারিমী ১২৮৮, দারাকুত্বনী ১০৬৮, ১০৬৯, ১৩১১; বায়হাক্বী ৩৮৫৬, ৫২৯৩; আদাবুল মুফরাদ ২১৩, মুসনাদ শাফি'ঈ ২৯৪, মুশকিলুল আসার ১৭২৫, মারিফাতুস্ সুনান ৪৬০৪, ৫৮৯৩, ৫৮৯৫)
সহাবীগণ নাবী-এর নিকট থেকে সলাতের পদ্ধতি শিখেছেন। তাঁরা সেই বারাকাতময় পদ্ধতিকে হাদীসরূপে মানুষের নিকট পৌঁছিয়েছেন। এজন্য প্রমাণিত হল যে, মুসলিম উম্মাহ হাদীসসমূহ থেকে সলাতের পদ্ধতি শিখেছে। উম্মাতের যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সলাতের পদ্ধতি ঐ হাদীসসমূহের বিপরীত [যেমন মালিকীদের হাত ছেড়ে দিয়ে সলাত আদায় প্রভৃতি] তাদের উচিত হ'ল সহীহ হাদীসসমূহের আলোকে নিজেদের সলাতকে সংশোধন করে নেয়া।

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 সলাতের ওয়াক্তসমূহ

📄 সলাতের ওয়াক্তসমূহ


(সলাতের ওয়াক্তসমূহের ব্যাপারে) হাদীসে জিবরীলে আছে যে, তিনি রসূলুল্লাহ -কে সূর্য ঢলে যাওয়ার পরে যুহরের সলাত আদায় করান। অতঃপর বস্তুর ছায়া একগুণ হলে 'আসর আদায় করান... এবং দ্বিতীয় দিন বস্তুর ছায়া একগুণ হলে যুহর এবং দুইগুণ হলে 'আসর'র সলাত আদায় করান। গতকালের মতো সূর্যাস্তের পর মাগরিব আদায় করান এবং বলেন যে,
يَا مُحَمَّدُ، هَذَا وَقْتُ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِكَ، وَالوَقْتُ فِيمَا بَيْنَ هَذَيْنِ الوَقْتَيْنِ. “হে মুহাম্মাদ! এটাই হল আপনার পূর্ববর্তী নাবীগণের সলাতের ওয়াক্ত। আর সলাতের সময় এই দুই সময়ের মধ্যবর্তী।” (এ হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী [হাঃ ১৪৯, মুসনাদে শাফি'ঈ হাঃ ১৪৫, ইবনুল জারূদ, মুনতাক্বা হাঃ ১৪৯] প্রমুখ বর্ণনা করেছেন এবং এর সানাদ হাসান। নিমবী হানাফী, আসারুস্ সুনান পৃঃ ১২২, হাঃ ১৯৪। তিনি বলেন, 'এর সানাদ হাসান')
এ জাতীয় হাদীসসমূহ জাবির প্রমুখ থেকেও উত্তম সানাদসমূহে বর্ণিত আছে। নিমবী হানাফী বলেছেন, 'আমি কোন সুস্পষ্ট সহীহ বা য'ঈফ হাদীস পাইনি, যা এ কথার প্রতি নির্দেশ করে যে, বস্তুর ছায়া দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত যুহরের ওয়াক্ত'। (আসারুস সুনান [উর্দু অনুবাদ], পৃঃ ১৬৮, হাঃ ১৯৯)
স্মর্তব্য যে, কিছু দেওবন্দী ও ব্রেলভী এ বিষয়ে অস্পষ্ট সন্দেহ পেশ করে থাকেন। অথচ উসূলে ফিক্বহে এ স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম রয়েছে যে, মানতুক (منطوق) মাফহুম (مفهوم)-এর উপর প্রাধান্য লাভ করে। (ফাতহুল বারী ২/২৪২, ২৯৭, ৪৩০, ৪/৩৮২, ৩৮৬, ৯/৩৬৯, ১২/২০৩)

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 মোজার উপরে মাসাহ

📄 মোজার উপরে মাসাহ


ইমাম আবূ দাঊদ আস্ সিজিস্তানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন :
وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ عَلَى بْنُ أَبِي طَالِبٍ، وَابْنُ مَسْعُودٍ، وَالْبَرَاءُ بْنُ عَازِبٍ، وَأَنَسُ بْنُ مَالِكٍ، وَأَبُو أُمَامَةَ، وَسَهْلُ بْنُ سَعْدٍ، وَعَمْرُو بْنُ حُرَيْثٍ وَرُوِيَ ذَلِكَ، عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ، وَابْنِ عَبَّاسٍ.
'আলী ইবনু আবূ ত্বালিব, ইবনু মাস্'ঊদ, বারা ইবনু 'আযিব, আনাস ইবনু মালিক, আবূ উমামাহ্, সাহল ইবনু সা'দ, 'আম্র ইবনু হুরায়স মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। 'উমার ইবনুল খাত্ত্বাব ও ইবনু 'আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকেও মোজার পরে মাসাহ বর্ণিত আছে'। (আবূ দাউদ ১/২৪, হাঃ ১৫৯)
সহাবায়ে কিরামের এ আসারগুলো মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ (১/১৮৮, ১৮৯), মুসান্নাফ 'আবদুর রায্যাক্ব (১/১৯৯, ২০০), ইবনু হাযম-এর মুহাল্লা (২/৮৪), দূলীবীর আল কুনা (১/১৮১) প্রভৃতি গ্রন্থে সানাদসহ মওজুদ রয়েছে। 'আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -এর আসারটি ইবনুল মুনযির-এর 'আল আওসাত্ব' গ্রন্থে (১/৪৬২) সহীহ সানাদে মওজুদ রয়েছে। যেমনটি সামনে আসছে। ইমাম ইবনু কুদামাহ্ বলছেন,
وَلِأَنَّ الصَّحَابَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ مَسَحُوا عَلَى الْجَوَارِبِ، وَلَمْ يَظْهَرُ لَهُمْ مُخَالِفٌ فِي عَصْرِهِمْ، فَكَانَ إِجْمَاعًا.
'যেহেতু সহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মোজার উপরে মাসাহ করেছেন এবং তাদের যুগে তাদের কোন বিরোধিতাকারী পরিদৃষ্ট হয়নি, সেজন্য এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, মোজার উপরে মাসাহ করা সঠিক'। (আল মুগনী ১/১৮১, মাসআলাহ্ নং- ৪২৬)
সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) -এর উক্ত ইজমার সমর্থনে মারফু' বর্ণনাসমূহও মওজুদ রয়েছে। (আল মুসতাদরাক ১/১৬৯, হাঃ ৬০২)
মোজার (খফিন) উপরে মাসাহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে। জাওরাবও (জুব) মোজার (খফ) একটি প্রকার। যেমনটা আনাস, ইবরাহীম নাখ'ঈ, নাফি' প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে। যারা মোজার (জুব) উপরে মাসাহকে অস্বীকার করেন, তাদের নিকটে কুরআন, হাদীস ও ইজমার একটিও সুস্পষ্ট দলীল নেই।
ইমাম ইবনুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন :
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْوَهَّابِ، ثَنَا جَعْفَرُ بْنُ عَوْنٍ، ثَنَا يَزِيدُ بْنُ مَرْدَانَبَةَ، ثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ سَرِيعٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ، قَالَ : رَأَيْتُ عَلِيًّا بَالَ، ثُمَّ تَوَضَّأَ، وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ.
মর্মার্থ: ১- 'আলী প্রস্রাব করলেন। অতঃপর উযূ করলেন এবং মোজার উপরে মাসাহ করলেন। (ইবনুল মুনযির, আল আওসাত্ব ১/৪৬২, হাঃ ৪৫৮; এর সানাদ সহীহ।
২- আবূ উমামাহ্ মোজার উপর মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৮, হাঃ ১৯৭৯; এর সানাদ হাসান)
৩- বারা ইবনু 'আযিব মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৯, হাঃ ১৯৮৪; এর সানাদ সহীহ)
৪- 'উক্ববাহ্ ইবনু 'আম্র মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৯, হাঃ ১৯৮৭; এর সানাদ সহীহ)
৫- সাহল ইবনু সা'দ মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৯, হাঃ ১৯৯০; এর সানাদ হাসান)
ইবনুল মুনযির বলেছেন যে, ইমাম ইসহাক্ব ইবনু রহওয়াহ বলেছেন : 'এ মাসআলায় সাহাবীগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই'- (ইবনুল মুনযির, আল আওসাত্ব ১/৪৬৪, ৪৬৫)। ইবনু হায্যও প্রায় এরূপই বলেছেন- (আল মুহাল্লা ২/৮৬, মাসআলাহ্ নং- ২১২)।
ইবনু কুদামাহ্ বলেছেন: 'এ ব্যাপারে সহাবীগণের ইজমা রয়েছে'। (আল মুগনী ১/১৮১, মাসআলাহ্ নং- ৪২৬)
জানা গেল যে, মোজার উপরে মাসাহ জায়িয হওয়ার ব্যাপারে সাহাবীগণ -এর ইজমা রয়েছে। আর ইজমা শার'ঈ দলীল। রসূলুল্লাহ বলেছেন:
«لَا يَجْمَعُ اللَّهُ هُذِهِ الْأُمَّةَ عَلَى الضَّلَالَةِ أَبَدًا» 'আল্লাহ আমার উম্মাতকে কখনো ভ্রষ্টতার উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না'। (হাকিম, আল মুস্তাদরাক ১/১১৬, হাঃ ৩৯৭, ৩৯৮)
আরো দেখুন : সাইয়িদ নাযীর হুসায়ন মুহাদ্দিস দেহলভী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ছাত্র হাফিয 'আবদুল্লাহ গাযীপুরী (মৃত ১৩৩৭ হিঃ) রচিত 'ইবরাউ আহলিল হাদীস ওয়াল কুরআন মিম্মা ফিশ্ শাওয়াহিদ মিনাত্ তুহমাতি ওয়াল বুহতান' পৃঃ ৩২।
অতিরিক্ত তথ্য তাবি'ঈ (রহিমাহুমুল্লাহ) থেকে :
১. ইবরাহীম নাখ'ঈ (রহিমাহুল্লাহ) মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৮, হাঃ ১৯৭৭: এর সানাদ সহীহ)
২. সা'ঈদ ইবনু জুবায়র (রহিমাহুল্লাহ) মোজার উপরে মাসাহ করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ১/১৮৯, হাঃ ১৯৮৯ এর সানাদ সহীহ)
৩. 'আত্বা ইবনু আবী রবাহ মোজার উপরে মাসাহ-এর প্রবক্তা ছিলেন। (আল মুহাল্লা ২/৮৬)
প্রমাণিত হল যে, মোজার উপরে মাসাহ জায়িয হওয়ার ব্যাপারে তাবি'ঈগণেরও ইজমা রয়েছে। (আলহামদুলিল্লাহ-হ)
১- ক্বাযী আবূ ইউসুফ মোজার উপরে মাসাহ-এর প্রবক্তা ছিলেন। (আল হিদায়াহ্ ১/৬১)
২- মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ্ শায়বানীও মোজার উপরে মাসাহ- এর প্রবক্তা ছিলেন। (ঐ ১/৬১, 'মোজার উপরে মাসাহ' অনুচ্ছেদ)
৩- ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) প্রথমে মোজার উপরে মাসাহ- এর প্রবক্তা ছিলেন না। কিন্তু পরে তিনি তাঁর মত পরিবর্তন করেছিলেন। وعنه أنه رجع إلى قولهما وعليه الفتوى. “ইমাম সাহেব থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি সাহেবায়েনেরে মতের দিকে ফিরে এসেছিলেন। আর এর উপরেই ফাতাওয়া।” (ঐ ১/৬১, 'মোজার উপরে মাসাহ' অনুচ্ছেদ)
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলছেন: সুইয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক, শাফি'ঈ, আহমাদ এবং ইসহাক্ব (বিন রহওয়াহ) মোজার উপরে মাসাহ-এর প্রবক্তা ছিলেন (এই শর্তে যে, সেটা মোটা হবে)। (তিরমিযী হাঃ ৯৯)
سوتا یا اول کے موزوں کو کھتے ھیں. : (جورب)
'সুতা বা পশমের মোজাকে জাওরাব বলা হয়'। (মুহাম্মাদ তাক্বী 'উসমানী দেওবন্দী, দারসে তিরমিযী ১/৩৩৪; আরো দেখুন: আয়নী, আল বিনায়াহ্ ফী শারহিল হিদায়া ১/৫৯৭)

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 সলাতে বুকের উপরে হাত বাঁধা

📄 সলাতে বুকের উপরে হাত বাঁধা


দলীল-১ :
ওয়ায়িল ইবনু হু হতে বর্ণিত যে, ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى ظَهْرِ كَفِّهِ الْيُسْرَى وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ. “আমি রসূলুল্লাহ-কে সলাত আদায় করতে দেখেছি। অতঃপর তিনি ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন।”
(সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ১/২৪৩, হাঃ ৪৮০, ৭১৪; সহীহ ইবনু হিব্বান ৩/১৬৭, হাঃ ১৮৫৭; আল মাওয়ারিদ হাঃ ৪৮৫, মুসনাদে আহমাদ ৪/৩১৮, হাঃ ১৯০৭৫; সুনান নাসায়ী ২/১২৬, হাঃ ৮৯০; সুনান আবূ দাউদ, বাযলুল মাজহৃদ সহ ৪/৪৩৭, ৪৩৮, হাঃ ৭২৭; এর সানাদ সহীহ)
পর্যালোচনা – ব্যাখ্যা :
الكف وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ.
কাফফুন (হাতের তালু), রুড়্গ (কজি) এবং সা'ইদ (বাহু) মূলত 'যিরা' (বুখারী, হাঃ ৭৪০)-এর ব্যাখ্যা।
আল মু'জামুল ওয়াসিত্ব (১/৪৩০) গ্রন্থে আছে, "الساعد : ما بين المرفق والكف من العلى" “কনুই থেকে হাতের পাতা পর্যন্ত (উপরের দিকে থেকে) অংশকে সা'ইদ (বাহু) বলা হয়”।
সতর্কীকরণ : الساعد )বাহু) দ্বারা উদ্দেশ্য হল সম্পূর্ণ বাহু। বাহুর কতিপয় অংশ নয়।
হাফিয ইবনু হাজার 'আসক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন : لِأَنَّ الْعِبْرَةَ بِعُمُومِ اللَّفْظِ حَتَّى يَقُوْمَ دَلِيلٌ عَلَى التَّخْصِيصِ. “যতক্ষণ 'খাস-এর দলীল প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত 'আম (সার্বজনীন বিধান সম্বলিত) শব্দেরই গ্রহণযোগ্যতা থাকবে।” (ফাতহুল বারী ১২/২৬১, হাঃ ২৯১৫ দ্রঃ)
'বাহুর কতিপয় অংশ'-এর নির্দিষ্টকরণ কোন হাদীসে নেই। অতএব সম্পূর্ণ الساعد তথা বাহুর উপর হাত রাখা আবশ্যক। অভিজ্ঞতা সাক্ষী যে, এভাবে হাত রাখা হলে স্বতন্ত্রভাবেই বুকের উপরে হাত রাখা হয়ে যায়।
দলীল-২:
ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘মুসনাদ’-এ বলেছেন।
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ سُفْيَانَ، حَدَّثَنِي سِمَاكٌ، عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَنْصَرِفُ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ يَسَارِهِ، وَرَأَيْتُهُ، قَالَ، يَضَعُ هَذِهِ عَلَى صَدْرِهِ وَصَفَّ يَحْيَى: الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فَوْقَ الْمِفْصَلِ.
ক্ববীসাহ্ ইবনু হুল্‌ব (আত্ব ত্বাঈ) হতে বর্ণিত আছে যে, ‘আমি নাবী ﷺ -কে (সলাত হতে অবসর হওয়ার পর) ডানে এবং বামে উভয়দিকে সালাম ফিরাতে দেখেছি। আর দেখেছি যে, তিনি এটি (হাতকে) বুকের উপর রাখতেন। (রাবী) ইয়াহইয়া (আল ক্বত্ত্বান) ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে দেখিয়ে দিলেন’। (মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৬, হাঃ ২২৩১৩; এর সানাদ হাসান, তাহক্বীক্ব: ইবনুল জাওযী ১/২৮৩)
‘উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
এর সানাদে সিমাক ইবনু হার্‌ব রয়েছে। তার ব্যাপারে কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করেন। কিন্তু না জেনে মন্তব্য করা কখনোই ঠিক নয়। ইমাম বুখারী সিমাক ইবনু হাব-কে (তারীখুল কাবীর ৪/১৭৩, রাবী নং ২৩৮২) গ্রন্থে এনেছেন এবং কোন সমালোচনা করেননি। জা’ফার আহমাদ থানভী হানাফী এর মতে, ইমাম বুখারী যেহেতু তার সমালোচনা করেননি, তাই সিমাক ইবনু হাব ইমাম বুখারীর নিকট সিক্বাহ্। (জা’ফার আহমাদ থানভী, ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমিল হাদীস পৃঃ ২২৩)
ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে সিমাক ইবনু হাব-এর হাদীস ৪০ বারেরও বেশি এনেছেন। বর্ণিত হাদীসগুলোর নম্বর দেয়া হল :
২২৪, ১২৮/৪৩৬, ৪৫৮, ৪৫৯, ৪৯৯, ৬০৬, ৬১৮, ৬৪৩, ৬৭০, ৭৩৮, ৮৬২, ৮৬৬, ৯৬৫, ৯৭৮, ১৭৩/১০৭৫, ১৬৮০, ১৬৯২, ১৬৯৩, ১৭৪৮, ৬, ৭/১৮২১, ১৮৪৬, ১৯২২, ১৯৮৪, ২০৫৩, ২১৩৫, ২২৪৮, ২২৭৭, ৪৪/২৩০৫, ২৩২২, ২৩২৯, ২৩৩৯, ২৩৪৪, ২৩৬১, ২৭৪৫, ৪২, ৪৩/২৭৬৩, ৭৮/২৯১৯, ২৯২৩, ২৯৭৭, ২৯৭৮।
ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তার কোন হাদীসই গ্রহণযোগ্য নয়। (তারীখে বাগদাদ ১০/২৯৭, রাবী নং ৪৭৪৫; এর সানাদ হাসান)
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি সিক্বাহ্। (কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১২০৩)
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: 'আবদুল মালিক ইবনু উমাইর থেকে সিমাক ইবনু হারব এর হাদীস বেশী সঠিক। (কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১২০৩)
ইমাম আবু ইসহাক্ব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তোমরা সিমাক ইবনু হারব থেকে ইলম গ্রহণ কর। (কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১২০৩)
ইমাম আবূ হাতিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি সত্যবাদী ও সিক্বাহ্। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১২০৩)
ইমাম দারাকুত্বনী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর সুনানে (হাঃ ২২৩৩) হাসান সহীহ বলেছেন। ইমাম হাকিম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মুস্তাদরাকে (হাঃ ১১০৪) সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনি সত্যবাদী ও সম্মানিত- (যাহাবী, আল মুগনী, রাবী নং ২৬৪৯)। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর সুনানে (হাঃ ২৫২) হাসান বলেছেন।
ক্ববীসাহ্ ইবনু হুল্‌ব (আত্ব ত্বাঈ) সম্পর্কে ইজলী বলেছেন : তিনি আস্থাভাজন। ইবনু হিব্বান নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাঝে গণ্য করেছেন- (তাহযীবুত্ তাহযীব ৮/৩১৪)। তিরমিযী তার একটি হাদীসকে 'হাসান' বলেছেন- (সুনান তিরমিযী হাঃ ২৫২)। আর আবূ দাউদ তার হাদীসের উপর চুপ থেকেছেন- (সুনান আবূ দাউদ ৪/১৪৭, হাঃ ৩৭৮৪)। জা'ফার আহমাদ থানবী দেওবন্দীর তাহক্বীক্ব এই যে, আবু দাউদ-এর চুপ থাকা হাদীসের 'সালিহুল ইহতিজাজ' হওয়ার দলীল। আর এর সানাদ রাবীদের 'সালিহ' হওয়ারও দলীল- (ক্বওয়ায়িদ আদ্‌ দেওবন্দিয়া ফী উলূমিল হাদীস পৃঃ ৮৩, ২২২)।
ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) তাকে 'আত্ তারীখুল কাবীর' গ্রন্থে (৭/১৭৭) উল্লেখ করেছেন এবং তার উপর কোন সমালোচনা করেননি। থানবী সাহেবের তাহক্বীক্ব মোতাবেক “যদি ইমাম বুখারী কোন ব্যক্তির উপর স্বীয় 'তারীخ' গ্রন্থসমূহে সমালোচনা না করেন তবে ঐ ব্যক্তি নির্ভরযোগ্য হয়ে থাকেন”। (ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমিল হাদীস পৃঃ ২২৩, বৈরুত ছাপা)
ইবনু আবূ হাতিম “কিতাবুল জারহি ওয়াত্ তা'দীল” গ্রন্থে (৭/১২৫) তাকে উল্লেখ করে চুপ থেকেছেন। থানবী সাহেবের নিকটে ইবনু আবূ হাতিম-এর চুপ থাকা রাবীর 'তাওসীক্ব' হয়ে থাকে। (ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমিল হাদীস, পৃঃ ৩৫৮)
দলীল-৩:
نَا أَبُو مُوسَى، نَا مُؤَمَّلٌ، نَا سُفْيَانُ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَوَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى عَلَى صَدْرِهِ.
ওয়ায়িল ইবনু হুজর বলেন: "আমি রসূলুল্লাহ -এর সাথে সলাত আদায় করেছি। তিনি বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে বুকের উপর স্থাপন করলেন।” (ইবনু খুযায়মাহ্ হাঃ ৪৭৯, বায়হাক্বী'র সুনানুল কুবরা হাঃ ২৩৩৬)
ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) “সলাতের মধ্যে বুকের উপর হাত বাঁধা সুন্নাত” নামক একটি অধ্যায় লিখেছেন। (বায়হাক্বী'র সুনানুল কুবরা হাঃ ২৩৩৫ এর পূর্বে)
ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন: বুকের নিচে নাভীর উপর হাত বাঁধা সুন্নাত। (আহমাদ ইবনু ফারাহ আল ইশবিলী, মুখতাসারুল খিলাফিয়াত লিল বায়হাক্বী ২/৩৩, মাআলাহ্ নং ৭৫)
'উলামাদের জন্য লক্ষণীয়
এর সানাদে মুয়াম্মাল ইবনু ইসমা'ঈল রয়েছে যাকে অনেকে দুর্বল বলে থাকে। অনেকে বলে থাকে যে, ইমাম বুখারী তাকে “মুনকারুল হাদীস” বলেছেন। আসলে এটি সত্যি নয়। ইমাম বুখারীর কোন গ্রন্থে তাকে দুর্বল বলা হয়নি। এমনকি তিনি তাঁর “কিতাবুয যু'আফা আস্ সগীর'-এ মুয়াম্মালের কথা উল্লেখ করেননি। এমনিক তার থেকে সানাদসহ অন্য কেউ তা বর্ণনা করেননি। মূলত ইমাম বুখারী মুয়াম্মাল ইবনু ইসমা'ঈলকে (তারীখুল কাবীর, ৮/৪৯, রাবী নং ২১০৭) গ্রন্থে এনেছেন কিন্তু কোন সমালোচনা করেননি।
জা'ফার আহমাদ থানভী হানাফী-এর মতে, ইমাম বুখারী যেহেতু তার সমালোচনা করেননি, তাই মুয়াম্মাল ইবনু ইসমা'ঈল ইমাম বুখারীর নিকট সিক্বাহ্। (জা'ফার আহমাদ থানভী, ক্বওয়ায়িদ ফী উলূমিল হাদীস, পৃঃ ২৩৩)
মূলত তিনি মুয়াম্মাল ইবনু সা'ঈদকে “মুনকারুল হাদীস” বলেছেন- (তারীখুল কাবীর ৮/৪৯, রাবী নং ২১০৮)। তিনি যদি মুয়াম্মাল ইবনু ইসমা'ঈল-কে মুনকারুল হাদীস বলতেন তবে তার 'সহীহ বুখারী'তে মুয়াম্মাল-এর বর্ণিত হাদীস মুতাবাআ'ত হিসেবে বর্ণনা করতেন না- (হাঃ ২৭০০, ৭০৮৩)।
ইমাম ইবনু হাজার 'আসক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি সত্যবাদী কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি খারাপ। (ইবনু হাজার 'আসক্বালানী, তাক্বরীবুত্ তাহযীব, রাবী নং ৭০২৯)
এছাড়াও তিনি উক্ত হাদীস ফাতহুল বারী (হাঃ ৭৪০ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)-তে এনেছেন এবং কোন সমালোচনা করেননি। আর যেসব হাদীস তিনি ফাতহুল বারীতে এনেছেন, সেগুলো তার কাছে সহীহ অথবা হাসান যেমনটি তিনি ফাতহুল বারীর ভূমিকাতে লিখেছেন। (ইবনু হাজার 'আসক্বালানী'র ফাতহুল বারী, ভূমিকা দ্রষ্টব্য; জা'ফার আহমাদ থানভী, কুওয়ায়িদ ফী উলূমিল হাদীস, পৃঃ ৮৯)
ইমাম আবূ হাতিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি সত্যবাদী, সুন্নাতের প্রতি দৃঢ়, তবে অত্যধিক ভুল করতেন, তার হাদীস লেখা যাবে। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১৭০৯)
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি সিক্বাহ্। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১৭০৯)
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন: মুয়াম্মাল যখন সুইয়ান সাওরী থেকে বর্ণনা করেন, তখন তিনি সিক্বাহ্। (ইবনু আবূ হাতিম, কিতাবুল জারহু ওয়াত্ তা'দীল, রাবী নং ১৭০৯)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00