📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 আহলে হাদীসগণের ফাযীলাত

📄 আহলে হাদীসগণের ফাযীলাত


এটা সম্পূর্ণ সঠিক যে, কুরআন মাজীদ উম্মাতে মুহাম্মাদীকে মুসলিম উপাধি দিয়েছে। কিন্তু এ বাস্তবতাকেও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, মুসলিমদের একটি বিশেষ দল, রসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের সাথে যাদের জ্ঞানগত ও 'আমালগত ভালোবাসা বিদ্যমান, তারা নিজেদেরকে আহলে হাদীস উপাধিতে ভূষিত করে আসছেন। (খাতিমায়ে ইখতিলাফ পৃঃ ১০৭-১০৮)
মুসলিমদের জন্য আহলে সুন্নাত, আহলে হাদীস প্রভৃতি উপাধি অসংখ্য ইমাম থেকে প্রমাণিত। যেমন মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন, ইবনুল মাদীনী, বুখারী, আহমাদ ইবনু সীনান, ইবনুল মুবারক, তিরমিযী প্রমুখ। কোন একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম বা 'আলিম থেকে এর অস্বীকৃতি বর্ণিত নেই। এজন্য উক্ত উপাধিগুলো সঠিক হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। সকল নির্ভরযোগ্য 'আলিম 'আহলে হাদীস' ও 'আসহাবুল হাদীস'কে সাহায্যপ্রাপ্ত দলের হাদীসের হাক্বদার বলে আখ্যা দিয়েছেন। (তিরমিযী হাঃ ২২২৯)
জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ বলেছেন:
«لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِّنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ»
“আমার উম্মাতের একটি দল ক্বিয়ামাত পর্যন্ত সর্বদা হাক্বের উপর বিজয়ী অবস্থায় লড়াই করবে”।
(মুসলিম হাঃ ১৯২৩; ইবনুল জারূদ, মুনতাক্বা হাঃ ১০৩১, মুস্তাদরাক আবী আওয়ানাহ্ হাঃ ৩১৭, ৭৫০০; ইবনু হিব্বান হাঃ ৬৮১৯: সানাদ সহীহ, মাজমুল আওসাত্ব হাঃ ৯০৭৭, ৯২৭৮; বায়হাক্বী'র সুনানুল কুবরা হাঃ ১৯৬০, ২২৯৩; সহীহুল জামি' হাঃ ৭২৯৩, মিশকাত হাঃ ৫৫০৭)
এ হাদীস সম্পর্কে আমীরুল মু'মিনীন ফিল হাদীস ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
" يعنى أهل الحديث"
অর্থাৎ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল আহলে হাদীস। (মালাতুল ইহতিজাজ বিশ্ শাফি'ঈ, পৃঃ ৩৫: সানাদ সহীহ)
আসহাবুল হাদীস ও আহলে হাদীস দু'টিই একই জামা'আতের বৈশিষ্ট্যগত নাম। ইমাম আহমাদ ইবনু সীনান আল ওয়াসিত্বী (মৃত ২৫৯ হিঃ) বলেছেন:
«لَيْسَ فِي الدُّنْيَا مُبْتَدِعْ إِلَّا وَهُوَ يُبْغِضُ أَهْلَ الْحَدِيثِ، وَإِذَا ابْتَدَعَ الرَّجُلُ نُزِعَ حَلَاوَةُ الْحَدِيثِ مِنْ قَلْبِهِ»
'দুনিয়াতে এমন কোন বিদ'আতী নেই যে, আহলে হাদীসদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। যখন কোন ব্যক্তি বিদ'আত করে, তখন তার অন্তর থেকে হাদীসের স্বাদ ছিনিয়ে নেয়া হয়'।
[হাকিম- মা'রিফাতু উলুমিল হাদীস পৃঃ ৪: সানাদ সহীহ]
বিস্তারিত জানার জন্য যুবায়র 'আলী যাঈ প্রণীত "আহলে হাদীস একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম” পুস্তকটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 হাদীসের মুহাদ্দিসগণ কি শুধুমাত্র ‘আহলে হাদীস’?

📄 হাদীসের মুহাদ্দিসগণ কি শুধুমাত্র ‘আহলে হাদীস’?


‘আহলে হাদীস’ দ্বারা দুই শ্রেণীর সহীহ ‘আক্বীদাসম্পন্ন মুসলিম উদ্দেশ্য।
(ক) সম্মানিত মুহাদ্দিসগণ।
(খ) তাদের অনুসারী ‘আম জনতা, যারা হাদীসের উপরে ‘আমাল করে থাকে।
হাফিয ইবনু হিব্বান আহলে হাদীসদের ৩টি আলামত বর্ণনা করেছেন:
(ক) তারা হাদীসের উপর ‘আমাল করেন।
(খ) তারা সুন্নাত তথা হাদীসের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত থাকেন।
(গ) তারা সুন্নাত বিরোধীদের মূলোৎপাটন করেন। (সহীহ ইবনু হিব্বান, আল ইহসান হাঃ ৬১২৯, অন্য একটি কপিতে হাঃ ৬১৬২)
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: আমার নিকটে ঐ ব্যক্তিই আহলে হাদীস, যিনি হাদীসের উপর ‘আমাল করেন। (ইমাম খতীব বাগদাদী, আল জামি’ ১/৪৪ পৃষ্ঠা, হাঃ ১৮৩)
শায়খুল ইসলাম হাফিয ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসের উপর ‘আমালকারী সাধারণ লোকেদেরকেও ‘আহলে হাদীস’ আখ্যা দিয়েছেন। (মাজমূউ ফাতাওয়া, ইবনু তায়মিয়াহ্, ৪/৯৫)
হাফিয ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) আহলে হাদীসদের একটি ফাযীলাত উদ্ধৃত করে বলেছেন: কতিপয় সালফে সলিহীন এ আয়াতটি (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭: ৭১) সম্পর্কে বলেছেন :
هذا أَكْبَرُ شَرَفٍ لِأَصْحَابِ الْحَدِيثِ لِأَنَّ إِمَامَهُمُ النَّبِيُّ
“এটি আহলে হাদীসের জন্য সবচেয়ে বড় ফাযীলাত। কেননা তাদের ইমাম হচ্ছেন স্বয়ং নাবী।"
নোট : যেমনিভাবে মুহাম্মাদ ﷺ মুহাদ্দিসগণের ইমামে আ'যম (মহান ইমাম), তদ্রূপ তিনি সাধারণ আহলে হাদীসগণেরও ইমামে আ'যম। এটা কোন লুকোচুরি কথা নয়; বরং আহলে হাদীসদের খ্যাতিমান বাগ্মী ও সাধারণ বক্তাদের আলোচনা থেকেও এটা সুস্পষ্ট।
রফিকুল ইসলাম মাদানী, বাংলাদেশী [বর্তমানে জীবিত] দেওবন্দী 'আলিম; তিনি লিখেছেন, আহলে হাদীস বলতে ঐ সমস্ত ব্যক্তি উদ্দেশ্য করে, যারা হাদীস সংরক্ষণ ও অনুধাবনে এবং হাদীস অনুসরণে প্রবল অনুরাগী। চায় সে যে মাযহাবেরই হোক না কেন। (আহলে হাদীসের আসল রূপ ৬০ পৃষ্ঠা, আহলে হাদীসের ভ্রান্তি নিরসন ২২ পৃষ্ঠা)
সরফরায খান সফদর গাখডুভী [বর্তমানে জীবিত] দেওবন্দী 'আলিমদের ইমাম, তিনি লিখেছেন, 'আহলে হাদীস' বলতে ঐ সমস্ত ব্যক্তি উদ্দেশ্য করে, যারা হাদীস সংরক্ষণ ও অনুধাবনে এবং হাদীস অনুসরণে প্রবল অনুরাগী। (ত্বায়িফাহ মানসূরাহ্ পৃঃ ৩৮, আল কালামুল মুফীদ পৃঃ ۱۳۹)
আহমাদ ইবনু 'আলী লাহোরী দেওবন্দী স্বীয় 'মালফুযাত'-এ লিখেছেন, 'আমি ক্বাদিরী ('আবদুল কাদের জিলানী-এর তরীকা) এবং হানাফী'। আহলে হাদীসগণ ক্বাদিরীও নয়, আবার হানাফীও নয়। কিন্তু তারা আমার মাসজিদে চল্লিশ বছর যাবৎ সলাত আদায় করে আসছে। আমি তাদেরকে হাক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত মনে করি। (মালফুযাতে ত্বাইয়িবাহ্ পৃঃ ১১৫; অন্য একটি সংস্করণে পৃঃ ১২৬)
উপরোল্লিখিত উক্তি থেকে চারটি বিষয় সাব্যস্ত হয়েছে:
১- আহলে হাদীসগণ হাক্বের উপরে প্রতিষ্ঠিত আছেন।
২- ‘আহলে হাদীস' সহীহ 'আক্বীদাসম্পন্ন মুসলিমদের উপাধি। এজন্য শী'আ ও অন্যান্য দলসমূহ 'আহলে হাদীস' নয়। তারা তো আহলে বিদ'আত-এর অন্তর্ভুক্ত।
৩- শুধু মুহাদ্দিসগণকেই 'আহলে হাদীস' বলা হয় না। বরং মুহাদ্দিসগণের অনুসারী সাধারণ জনগণকেও 'আহলে হাদীস' বলা হয়।
নতুবা মুহাদ্দিসগণের কোন্ জামা'আতটি লাহোরী সাহেবের মাসজিদে চল্লিশ বছর যাবৎ সলাত আদায় করেছেন?
৪- মানুষ যদি হানাফী বা ক্বাদিরী নাও হয়, তথাপি সে আহলে হাক্ব তথা হাক্বপন্থী হতে পারেন।
নোট : আহমাদ ইবনু 'আলী লাহোরী-এর বক্তব্য দ্বারা এটি একেবারেই পরিষ্কার যে, শুধুমাত্র মুহাদ্দিসগণই আহলে হাদীস নন। বরং তাদের অনুসারী সাধারণ লোকজনও আহলে হাদীস।
দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ক্বাসিম নানুতুবীর পছন্দনীয় গ্রন্থ “হাক্কানী 'আক্বায়িদে ইসলাম” গ্রন্থে 'আবদুল হাক্ব হাক্কানী দেহলভী বলেছেন: শাফি'ঈ, হাম্বালী, মালিকী, হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আহলে হাদীসগণও আহলে সুন্নাতের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। (হাক্কানী 'আক্বায়িদে ইসলাম পৃঃ ৩)
নোট: এ বক্তব্যে যেমনভাবে হানাফী, শাফি'ঈ, হাম্বালী, মালিকী নামগুলো দ্বারা তাদের 'আম জনতাকেও বুঝানো হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে উক্ত বক্তব্যে 'আহলে হাদীস' দ্বারা মুহাদ্দিসীনে কিরামের সাধারণ অনুসারীদেরকেও বুঝানো হয়েছে।
ফুরফুরার পীর শায়খুল ইসলাম 'আবদুল হাক্ব সিদ্দীক্বী (রহিমাহুল্লাহ) তিনি প্রায় বলতেন: "শাফি'ঈ, হাম্বালী, মালিকী, হানাফী- আমরা চার ভাই না, আমরা হলাম পাঁচ ভাই আহলে হাদীসও আমাদের ভাই”। [ওপেন সিক্রেট ৯০, ৯২ পৃঃ; আল মাওযু'আত ۱۳۹ পৃঃ, ফুরফুরা পীর শায়খুল ইসলাম আবূ জা'ফার সিদ্দীক্ব (রহিমাহুল্লাহ), অনুবাদ ব্যাখ্যা- ড. খন্দকার 'আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহিমাহুল্লাহ)]
মুফতী কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (দেওবন্দী) একটি প্রশ্নের জবাবে লিখেছেন, হ্যাঁ, আহলে হাদীসগণ মুসলিম এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সাথে বিয়ে-শাদীর বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়িয। শুধু তাক্বলীদ বর্জন করাতে ইসলামের কোন যায় আসে না। এমনকি তাক্বলীদ বর্জনকারী ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত হতেও বের হয়ে যায় না। (কিফায়াতুল মুফতী ১/৩২৫)
নোট : এই ফাতাওয়া ও পূর্বোক্ত ফাতাওয়া দ্বারা সুস্পষ্ট হল যে, 'আহলে হাদীস' আহলে সুন্নাতেরই অন্তর্ভুক্ত এবং হাদীসের উপরে 'আমালকারী সাধারণ লোকেদেরকেও 'আহলে হাদীস' উপাধিতে ভূষিত করা সম্পূর্ণ সঠিক।
চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর ইতিহাসবিদ বিশারী মাকদিসী (মৃত ৩৭৫ হিঃ) মানসূরার (সিন্ধুর) অধিবাসীদের সম্পর্কে বলেছেন: "أَكْثَرُهُمْ أَصْحَابُ حَدِيثٍ" “তাদের অধিকাংশই আহলে হাদীস”। (আহসানুত্ তাক্বাসীম ফী মা'রিফাতিল আক্বালীম পৃঃ ৪৮১)
নোট : আর যুক্তির নিরীখে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সে সময় সিন্ধু প্রদেশের সকল অধিবাসী মুহাদ্দিস ছিলেন না। বরং তাদের মধ্যে মুহাদ্দিসগণের অনুসারী বহু সাধারণ লোক ছিলেন।
এমনিভাবে আরো অসংখ্য উদ্ধৃতি রয়েছে যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, মুহাদ্দিস হোক কিংবা হাদীসের অনুসারী সাধারণ জনতা হোক, 'আহলে হাদীস' দ্বারা 'আহলে সুন্নাত' তথা সহীহ 'আক্বীদাসম্পন্ন মানুষ উদ্দেশ্য। আর বিদ'আতীরা আদৌ 'আহলে হাদীস' উপাধিতে শামিল নয়। বরং তারা তো 'আহলে হাদীসের' প্রতি কেবল বিদ্বেষই পোষণ করে থাকে।
দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ মুহাদ্দিসগণের অনুসারী এবং হাদীসের উপরে 'আমালকারী সাধারণ জনতার ব্যাপারে বক্তব্য হল, কতিপয় লোক এ অপপ্রচার চালিয়ে থাকেন যে, 'আহলে হাদীস' দ্বারা কেবল সম্মানিত মুহাদ্দিসগণ উদ্দেশ্য, এর দ্বারা সাধারণ জনতা উদ্দেশ্য নয়।

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 মুহাদ্দিসগণ কি মাযহাব মানতেন?

📄 মুহাদ্দিসগণ কি মাযহাব মানতেন?


জনৈক ব্যক্তি শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করেন যে, বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, আবূ দাউদ, তায়ালিসী, দারিমী, বাযযার, দারাকুত্বনী, বায়হাক্বী, ইবনু খুযায়মাহ্, আবূ ইয়া'লা মুসিলী (রহিমাহুমুল্লাহ) মুজতাহিদগণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, না কোন ইমামের মুক্বাল্লিদ ছিলেন? তিনি আলহাম্দুলিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন বলে উত্তর দেন,
أَمَّا الْبُخَارِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ فَإِمَامَانِ فِي الْفِقْهِ مِنْ أَهْلِ الْإِجْتِهَادِ. وَأَمَّا مُسْلِمٌ وَالتَّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهُ وَابْنُ خُزَيْمَةَ وَأَبُو يَعْلَى وَالْبَزَّارُ وَنَحْوُهُمْ . فَهُمْ عَلَى مَذْهَبِ أَهْلِ الْحَدِيثِ. لَيْسُوا مُقَلِدِينَ لَوَاحِدٍ بِعَيْنِهِ مِنَ الْعُلَمَاءِ... وَهَؤُلَائِ كُلُّهُمْ يُعَلِّمُونَ السُّنَّةَ وَالْحَدِيثَ.
'ইমাম বুখারী ও আবূ দাঊদ দু'জনেই ফিক্বহের ইমাম ও মুজতাহিদ (মুত্বলাক্ব)। পক্ষান্তরে ইমাম মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, ইবনু খুযায়মাহ্, আবূ ইয়া'লা, বাযযার প্রমুখ আহলে হাদীস মাযহাবের উপরে ছিলেন। তারা কোন নির্দিষ্ট 'আলিমের মুক্বাল্লিদ ছিলেন না। এরা সবাই সুন্নাহ ও হাদীসকে সম্মান করতেন'। (ইবনু তায়মিয়াহ্-এর "মাজমূ' ফাতাওয়া” ২০/৪০)
বিস্তারিত জানার জন্য লেখকের স্বরচিত 'তাকলীদ বিভ্রান্তি নিরসন' পুস্তকটি পাঠ করুন।
ইমাম বায়হাক্বী স্বীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আস্ সুনানুল কুবরা'তে (১০/১১৩) তাক্বলীদের বিরুদ্ধে অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। এজন্য মুহাদ্দিসগণের উপর অযথা মিথ্যারোপ করতে গিয়ে এবং নিজেদের নম্বর বাড়ানোর জন্য তাদেরকে মুক্বাল্লিদদের মধ্যে শামিল করা ভুল। স্মর্তব্য যে, আহলে হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য মুহাদ্দিসগণ এবং তাদের অনুসারীগণ। (ইবনু তায়মিয়াহ্'র "মাজমূ' ফাতাওয়া” ৪/৯৫)

📘 আহলে হাদীস ও হানাফী মাযাহাবের ইখতিলাফ ও তার নিরসন > 📄 তাক্বলীদ

📄 তাক্বলীদ


নাবী নন এমন ব্যক্তির কথা বিনা দলীলে মানাকে তাক্বলীদ বলে। (মুসাল্লামুস্ সুবৃত পৃঃ ২৮৯)
এ সংজ্ঞার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে- (ইবনু হাযম-এর “আল ইহকাম” পৃঃ ৮৩৬)। 'আল ক্বামূসুল ওয়াহীদ' অভিধানে তাক্বলীদের নিম্নোক্ত অর্থ লিপিবদ্ধ রয়েছে, 'চিন্তা-ভাবনা না করে বা বিনা দলীলে অনুসরণ, অনুকরণ ও সোপর্দ করা। বিনা দলীলে অনুসরণ, চোখ বন্ধ করে কারো পিছে চলা, কারো অনুকরণ করা। যেমন:
"قَلَّدَ الْقِرْدُ الْإِنْسَانَ" ‘বানরটি লোকটির অনুকরণ করল’। (আল কামূসুল ওয়াহীদ পৃঃ ১৩৪৬, আরো দেখুন: আল মু'জামুল ওয়াসীত্ব পৃঃ ৭৫৪)।
জনাব মুফতী আহমাদ ইয়ার না'ঈমী বাদায়ূনী ব্রেলভী ইমাম গাযালী থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে,
"التَّقْلِيدُ هُوَ قَبُولُ قَوْلٍ بِلَا حُجَّةٍ"
'বিনা দলীলে কারো কোন কথা মেনে নেয়াই হল তাক্বলীদ'। (জাআল হাক্ব ১/১৫, পুরাতন সংস্করণ)
আশরাফ 'আলী থানবী দেওবন্দীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, 'তাক্বলীদের স্বরূপ কি এবং তাক্বলীদ কাকে বলে? তিনি জবাবে বলেন, 'বিনা দলীলে উম্মাতের কারো কথা মেনে নেয়াকে তাক্বলীদ বলে।' তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, 'আল্লাহ ও রসূল-এর কথা মান্য করাকেও কি তাক্বলীদ বলা হবে?' তিনি বলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল -এর হুকুম মানাকে তাক্বলীদ বলা হবে না। সেটাকে ইত্তিবা' (অনুসরণ) বলা হয়।' (আল ইফাযাতুল ইয়াওমিয়াহ/মালফুযাতে হাকীমুল উম্মাত ৩/১৫৯, বচন নং ২২৮)
স্মর্তব্য যে, উসূলে ফিক্বহে লিখিত আছে যে, কুরআন মানা, রসূলুল্লাহ -এর হাদীস মানা, ইজমা মানা, সাক্ষীদের সাক্ষ্যর ভিত্তিতে বিচার ফায়সালা করা, সাধারণ মানুষের 'আলিমদের নিকট প্রত্যাবর্তন করা (এবং মাআলাহ্ জিজ্ঞেস করে 'আমাল করা) তাক্বলীদ নয়। (মুসাল্লামুস্ সুবৃত পৃঃ ২৮৯, আত্ তাকরীর ওয়াত্ তাহবীর ৩/৪৫৩)
মুহাম্মাদ 'উবায়দুল্লাহ আস্'আদী দেওবন্দী তাক্বলীদের পারিভাষিক অর্থ সম্পর্কে লিখেছেন যে, “বিনা দলীলে কারো কথা মেনে নেয়া। তাক্বলীদের প্রকৃত স্বরূপ এটাই। কিন্তু...” (উসূলুল ফিক্বহ, পৃঃ ২৬৭)। প্রকৃত স্বরূপকে বাদ দিয়ে তথাকথিত দেওবন্দী ফাকীহদের অপব্যাখ্যা কে শোনে।
আহমাদ ইয়ার না'ঈমী সাহেব লিখছেন যে, 'এ সংজ্ঞা থেকে জানা গেল যে, রসূলুল্লাহ-এর অনুসরণ করাকে তাক্বলীদ বলতে পারি না। কেননা তাঁর প্রত্যেকটি কথা ও কাজ শার'ঈ দলীল। এজন্য আমরা রসূলুল্লাহ-এর উম্মাত বলব, মুক্বাল্লিদ নয়। অনুরূপভাবে সাধারণ মুসলিমরা 'আলিমের অনুসরণ যেটা করে থাকে তাকেও তাক্বলীদ বলা যাবে না। কেননা কেউই ঐ 'আলিমদের কথা বা তাদের কাজকে নিজের জন্য হুজ্জাত (দলীল) বানায় না'। (জা-আল হাক্ব ২/৩০ পৃষ্ঠা বাংলা অনুবাদ, জা-আল হাক্ব ১/১৬)
যে সম্পর্কে জানা নেই আল্লাহ সে কথার অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন- (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭ : ৩৬)। অর্থাৎ দলীলবিহীন কথার অনুসরণ নিষিদ্ধ। যেহেতু আল্লাহ ও রসূল-এর কথা স্বয়ং দলীল এবং ইজমার হুজ্জাত হওয়ার ব্যাপারে দলীল ক্বায়িম রয়েছে; সেজন্য কুরআন, হাদীস ও ইজমাকে মানা তাক্বলীদ নয়। (ইবনু হুমام-এর “আত্ তাহরীর" ৪/২৪১, ২৪২; ফাওয়াতিহুর রহমৃত ২/৪০০)
আল্লাহ এবং রসূল-এর বিপরীতে যে কোন ব্যক্তির তাক্বলীদ করা রিসালাতে শির্ক (شرك فى الرسالة)। রসূলুল্লাহ দীনের মধ্যে রায়ের আলোকে ফাতাওয়া দেয়ার নিন্দা করেছেন। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৭৩০৭, ২/১০৮৬)
'উমার আহলুর রায়কে রসূলুল্লাহ -এর সুন্নাতের দুশমন আখ্যা দিয়েছেন, (أَصْبَحَ أَهْلُ الرَّأْيِ أَعْدَاءَ السُّنَنِ)। (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন ১/৫৫)
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, এ আসারসমূহের সানাদ অত্যন্ত বিশুদ্ধ। (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন ১/৫৫)
মু'আয ইবনু জাবাল বলেছেন: وَأَمَّا زَلَّهُ عَالِمٍ، فَإِنِ اهْتَدَى فَلَا تُقَلِّدُوهُ دِينَكُمْ.
'আলিমের ভুলের ব্যাপারে বক্তব্য হল, যদি তিনি হিদায়াতের উপরেও থাকেন, তবুও তোমাদের দীনের ব্যাপারে তার তাক্বলীদ করো না'। (ইমাম ওয়াকী'-এর “কিতাবুয যুহদ” ১/৩০০, হাঃ ৭১ : সানাদ হাসান; আবু দাউদ-এর "কিতাবুয যুহদ” পৃঃ ১৭৭, হাঃ ১৯৩; হিলয়াতুল আওলিয়া ৫/৯৭, ইবনু 'আবদিল বার, জামি'উ বায়ানিল 'ইল্ল্ম ওয়া ফাযলিহী ২/১৩৬, ইবনু হাযম-এর "আল ইহকাম” ৬/২৩৬, ইবনুল কাইয়িম 'ইলামুল মুওয়াক্কিঈন [২/২৩৯] গ্রন্থে একে সহীহ বলেছেন।)
উক্ত বর্ণনা সম্পর্কে ইমাম দারাকুত্বনী বলেছেন : والموقوف هو" "الصحيح ‘আর (এটি) মাওকুফ (বর্ণনা) হওয়াই সঠিক'। (আল ইলালুল ওয়ারিদাহ্ ৬/৮১, প্রশ্ন নং ৯৯২)
'আবদুল্লাহ ইবনু মাস্'ঊদ ও তাক্বলীদ থেকে নিষেধ করেছেন। (আস্ সুনানুল কুবরা ২/১০, হাঃ ২০৭০: সানাদ সহীহ)
চার ইমামও (ইমাম আবূ হানীফাহ্, মালিক, শাফি'ঈ ও আহমাদ ইবনু হাম্বাল) তাদের নিজেদের এবং অন্যদের তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেছেন। (মাজমূ' ফাতাওয়া ২/১০, ২১১; 'ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/১৯০, ২০০, ২০৭, ২১১, ২২৮)
কোন ইমাম থেকেও এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নেই যে, তিনি বলেছেন 'আমার তাক্বলীদ করো'। এর বিপরীতে এ কথা প্রমাণিত রয়েছে যে, চার মাযহাবের তাক্বলীদের বিদ্‌'আত হিজরী চতুর্থ শতকে শুরু হয়েছে। (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন ২/২০৮)
এ ব্যাপারে মুসলিমদের ইজমা রয়েছে যে, মূর্খতার অপর নাম তাক্বলীদ এবং মুক্বাল্লিদ জাহিল (মূর্খ) হয়ে থাকে। (জামিউ বায়ানিল ইলম ২/১১৭, ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/১৮৮, ১/৭)
ইমামগণ তাক্বলীদের খণ্ডনে বই-পুস্তক লিখেছেন। যেমন ইমাম আবু মুহাম্মাদ ক্বাসিম ইবনু মুহাম্মাদ আল কুরতুবীর (মৃঃ ২৭৬ হিঃ) " الإيضاح" (আল ঈযাহ ফিরাদ্দি 'আলাল মুক্বাল্লিদীন) গ্রন্থটি। (যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ১৩/৩২৯)
পক্ষান্তরে কোন একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নেই যে, তিনি তাক্বলীদের আবশ্যকতা বা বৈধতার ব্যাপারে কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন। মুক্বাল্লিদরা পরস্পরের সাথে রক্তাক্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। (মু'জামুল বুলদান ১/২০৯, ৩/১১৭; ইবনুল আসীর-এর “আল কামিল" ৮/৩০৭, ৩০৮; ওয়াফায়াতুল 'আয়ান ৩/২০৮)
একজন আরেকজনকে কাফির আখ্যা দিতে থাকে। (যাহাবী-এর “মীযানুল ই'তিদাল” ৪/৫২, আল ফাওয়ায়িদুল বাহিয়াহ্ পৃঃ ১৫২, ১৫৩)
তারা বায়তুল্লাহতে চার মুসল্লা ক্বায়িম করে মুসলিম উম্মাহকে চার ভাগে বিভক্ত করেছে। চার আযান, চার ইক্বামাত এবং চার ইমামাত! যেহেতু প্রত্যেক মুক্বাল্লিদ নিজ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে নিজ ইমাম ও অনুসরণীয় ব্যক্তির সাথে বন্ধনযুক্ত রয়েছে, সেজন্য তাক্বলীদের কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কখনো ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই আসুন! আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কুরআন ও সুন্নাহ্র রজ্জুকে আঁকড়ে ধরি। কুরআন ও সুন্নাহ্ মধ্যেই দুনিয়া-আখিরাতের সফলতার পূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে।
বিস্তারিত জানার জন্য লেখকের রচিত 'তাক্বলীদ বিভ্রান্তি নিরসন' পুস্তকটি পাঠ করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00