📄 মজলিসে যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বিরত থাকে
প্রকৃত ভদ্র মুসলমান মজলিসে যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বেঁচে থাকে। আর যদি এসেই যায়, তখন তা যেকেনো উপায়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমন নির্দেশই দিয়েছেন। তিনি বলেন:
فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَكْظِمْ مَا اسْتَطَاعَ
'যদি তোমাদের কারও হাই আসে, তখন যথাসাধ্য তাকে দমন করার চেষ্টা করবে।'৭৪৭
হাই যদি তীব্র হয় এবং প্রতিহত করা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখে হাত দেবে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ، فَلْيُمْسِكْ بِيَدِهِ عَلَى فِيهِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ
'যদি তোমাদের কারও হাই আসে, তখন মুখে হাত দিয়ে তা দমন করবে। কেননা, (হাই তোলার সময় মুখ দিয়ে) শয়তান ঢুকে যায়।' ৭৪৮
মজলিসে লোকসম্মুখে হাই তোলা অনেক ঘৃণিত একটি বিষয়। কোনো ভদ্র মানুষের মাঝে এটা মোটেই শোভা পায় না। এজন্য যেকোনো উপায়ে তা দমন করা উচিত এবং মুখ খুলে গেলে হাত দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত। যেন হাই তোলার সময় খোলা মুখগহ্বর দেখে মানুষের মাঝে ঘৃণা ও অস্বস্তিবোধ সৃষ্টি না হয়। প্রকৃত মুসলমান সমাজজীবনে এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকে, যেন তার প্রতি মানুষের মাঝে ঘৃণাবোধ ও অনাগ্রহ পয়দা না হয়।
📄 হাঁচি দেওয়ার সময় ইসলামি শিষ্টাচার মেনে চলে
ইসলামে হাই তোলার ব্যাপারে যেমন আদব ও শিষ্টাচার রয়েছে, তেমনই হাঁচি দেওয়ার ব্যাপারেও ইসলামি শিষ্টাচার রয়েছে। হাঁচি আসলে কী করতে হবে, কী পড়তে হবে, কীভাবে হাঁচিদাতার জবাব দিতে হবে, কীভাবে তার জন্য দুআ করতে হবে-সব বিষয় শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ، وَيَكْرَهُ التَّثَاؤُبَ، وَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وحمد اللهَ كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ. فَأَمَّا التَّتَاؤُبُ فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا تَثَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ
'হাঁচি দেওয়া আল্লাহ তাআলার নিকট পছন্দনীয়, আর হাই তোলা অপছন্দনীয়। সুতরাং তোমাদের কেউ হাঁচি দিয়ে “আল-হামদুলিল্লাহ” (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) বললে, তখন যেসব মুসলমান তা শুনতে পাবে, তাদের ওপর “ইয়ারহামুকাল্লাহ” (তোমার প্রতি আল্লাহ রহম করুন) বলা আবশ্যক। আর হাই আসে শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং তোমাদের কারও হাই আসলে সে যথাসাধ্য তা দমনের চেষ্টা করবে। কেননা, তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে, তখন শয়তান (খুশিতে) হাসে।'৭৪৯
এ ধরনের ছোট ছোট প্রকৃতিগত সকল মানবিক বিষয়ের আদব ও শিষ্টাচার প্রণয়ন করে দিয়েছে ইসলাম। প্রকৃত মুসলমান বিশ্বাস করে, এ সকল আদব-শিষ্টাচারের মাঝেই নিহিত আছে তার সমূহ কল্যাণ। তাই সে ছোট বড় কোনো আদব ও শিষ্টাচার বাদ দেয় না।
হাঁচি সম্পর্কে ইসলামের আদব হলো, কেউ হাঁচি দিলে তার উচিত 'আল-হামদুলিল্লাহ' (সকল প্রশংসা আল্লাহর) বলা। যে তার 'আল-হামদুলিল্লাহ' বলা শুনতে পাবে, তার উচিত 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' (তোমার প্রতি আল্লাহ রহম করুন) বলা। এর বিনিময়ে হাঁচিদাতা 'ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বা- লাকুম' (আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত দান করুন এবং তোমার অন্তর পরিশুদ্ধ করে দিন) বলে উত্তরদাতার জন্য দুআ করবে।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَلْيَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ، فَإِذَا قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ، فَلْيَقُلْ لَهُ أَخُوهُ أَوْ صَاحِبُهُ: يَرْحَمُكَ اللهُ، وَلْيَقُلْ هُوَ: يَهْدِيكُمُ اللَّهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ
'তোমাদের কেউ হাঁচি দিলে সে বলবে, 'আল-হামদুলিল্লাহ' (সকল প্রশংসা আল্লাহর)। এর উত্তরে তার ভাই বা সঙ্গী বলবে, 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' (তোমার প্রতি আল্লাহ রহম করুন)। যখন জবাবে তা বলবে, তখন সে বলবে, 'ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম' (আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত দান করুন এবং তোমার অন্তর পরিশুদ্ধ করে দিন)। '৭৫০
হাঁচির জবাবে যে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' (তোমার প্রতি আল্লাহ রহম করুন) বলা হয়, শরিয়তের পরিভাষায় এটাকে 'তাশমিত' বলে। হাঁচিদাতা হাঁচি দেওয়ার পর 'আল-হামদুলিল্লাহ' বললে তার জবাবে এটা বলবে। 'আল-হামদুলিল্লাহ' না বললে 'তাশমিত' করা যাবে না।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمِّتُوهُ، وَإِنْ لَمْ يَحْمَدِ اللَّهَ فَلَا تُشَمِّتُوهُ
'যদি তোমাদের কেউ হাঁচি দেওয়ার পর 'আল-হামদুলিল্লাহ' বলে, তোমরা তার উত্তর দেবে। আর যদি 'আল-হামদুলিল্লাহ' না বলে, তাহলে উত্তর দেবে না। '৭৫১
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: عَطَسَ رَجُلَانِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَشَمَّتَ أَحَدَهُمَا وَلَمْ يُشَمِّتِ الآخَرَ، فَقَالَ الرَّجُلُ : يَا رَسُولَ اللهِ، شَمَّتَ هَذَا وَلَمْ تُشَمِّتْنِي، قَالَ: إِنَّ هَذَا حَمِدَ اللهَ، وَلَمْ تَحْمَدِ اللَّهَ
'নবিজি-এর সামনে দুজন ব্যক্তি হাঁচি দিল। তিনি একজনের হাঁচির উত্তর দিলেন, আরেকজনের উত্তর দিলেন না। তখন যার উত্তর দেওয়া হয়নি সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, অমুকের হাঁচির উত্তর দিয়েছেন, আমার হাঁচির উত্তর দেননি কেন? তিনি বললেন, সে হাঁচি দেওয়ার পর “আল-হামদুলিল্লাহ” বলেছে, কিন্তু তুমি তা বলোনি। '৭৫২
হাঁচি-সংক্রান্ত যেসব দুআ রাসুলুল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলোর শব্দ নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দুআগুলোর মাঝে অনেক কল্যাণ ও উপকারিতা রয়েছে। দুআর শব্দ চয়নের যৌক্তিকতাও বিস্ময়কর। হাঁচিদাতা হাঁচি দেওয়ার পর 'আল-হামদুলিল্লাহ' বলে। কারণ, হাঁচি দেওয়ার কারণে তার মাথার ভেতরের এক ধরনের অস্বস্তিকর অনুভূতির অবসান হয়েছে। এজন্য সে আল্লাহর প্রশংসা করে। তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলার কারণ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে, সে আল্লাহর রহমতের যোগ্য হয়। তারপর উত্তরদাতা হাঁচিদাতার জন্য আরও বড় ও ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যে দুআ করে। এভাবে হাঁচিকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসা বারবার নবায়ন হতে থাকে।
এভাবে ইসলাম مسلمانوں জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন সব সুন্দর বিধান সাজিয়ে রেখেছে, যার কারণে প্রকৃতিগত ছোট ছোট মানবিক বিষয়গুলোও তাদের আল্লাহর স্মরণ ও প্রশংসা করার সুযোগ করে দেয় এবং مسلمانوں পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করে দেয়।
হাঁচি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি আদব হলো, হাঁচি দেওয়ার সময় মুখে হাত রাখবে এবং যথাসাধ্য শব্দকে নিচু করার চেষ্টা করবে। রাসুলুল্লাহ এভাবেই হাঁচি দিতেন।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا عَطَسَ وَضَعَ يَدَهُ أَوْ ثَوْبَهُ عَلَى فِيهِ، وَخَفَضَ أَوْ غَضَّ بِهَا صَوْتَهُ
'রাসুলুল্লাহ হাঁচি দেওয়ার সময় হাত অথবা কাপড় তাঁর মুখে রাখতেন এবং আওয়াজ নিচু করতেন।'৭৫৩
📄 অন্যের ঘরে উঁকি দেয় না
মুসলমানদের জন্য আরেকটি সামাজিক আদব হলো, অন্যের ঘরে উঁকি দেবে না এবং তাদের গোপনীয় বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করবে না। এটা প্রকৃত ভদ্র মুসলমানের স্বভাব নয়। যারা অন্যের ঘরে উঁকি মারে, তাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ কঠোর হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করেছেন। তাদের চক্ষু ফুঁড়ে দেওয়ার বৈধতা দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন :
مَنِ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ، فَقَدْ حَلَّ لَهُمْ أَنْ يَفْقَثُوا عَيْنَهُ
'যে ব্যক্তি কোনো গোত্রের বাড়িতে তাদের অনুমতি ছাড়া উঁকি দেয়, তার চোখ উৎপাটন করা তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়। '৭৫৪
📄 বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য অবলম্বন করে না
বিশুদ্ধ ইসলামি সমাজে কোনো পুরুষ মহিলার সাদৃশ্য অবলম্বন করে না এবং কোনো মহিলা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করে না। কারণ, বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য অবলম্বন করা পরিষ্কার হারাম। ইসলামি সমাজে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে দুই লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যগত ব্যবধান লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। নারীর সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষ এবং পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী—এ দুই শ্রেণির ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান খুবই কঠোর।
ইবনে আব্বাস বলেন: لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وَالمُتَرَجِّلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ
‘নবিজি নারীর সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষ এবং পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারীদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন। ’৭৫৫
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ، وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ
‘রাসুলুল্লাহ এমন পুরুষের প্রতি লানত করেছেন, যে মেয়েদের পোশাকের মতো পোশাক পরিধান করে এবং এমন মেয়েদের প্রতি লানত করেছেন, যে পুরুষদের পোশাকের মতো পোশাক পরিধান করে। ’৭৫৬
বর্তমান সময়ে অনেক মুসলিম যুবকদের দেখা যায়, তারা মাথায় মেয়েদের মতো লম্বা চুল রাখে। অনেক সময় চিনতে কষ্ট হয়ে যায় যে, তারা ছেলে নাকি মেয়ে! বিশেষ করে যখন গলায় মেয়েদের মতো স্বর্ণের চেইন বেঁধে উন্মুক্ত বক্ষে ঝুলিয়ে দেয়। একইভাবে অনেক মুসলিম মেয়েদের দেখা যায়, তারা শরীরের অবয়ব ফুটে ওঠে, এমন টাইটফিট প্যান্ট ও শার্ট পরে। তাদের মাথা খোলা থাকে, বাহু থাকে উন্মুক্ত। দেখতে যুবকদের মতোই লাগে তাদের। বিভিন্ন ইসলামি সমাজে এসব নোংরা দৃশ্য পাশ্চ্যত্য কুফরি সভ্যতার প্রভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এ কুফরি সভ্যতা আরও বিভিন্ন গোমরাহি مسلمانوں সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে মুসলমান যুবকদের বিরাট এক অংশ হতাশার তিথ ময়দানে দিকভ্রান্তের মতো ছুটছে। তারা কখন কী করে বসতে পারে, তার কোনো ধারণা নেই। এভাবে বিনষ্ট হতে চলছে ইসলামি সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা। ইসলামি সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হলে রাসুলুল্লাহ ﷺ যেসব সামাজিক আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন, প্রত্যেক মুসলমানকে সামাজিক জীবনে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।