📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সালামের প্রসার করে

📄 সালামের প্রসার করে


মুসলমানের অন্যতম সামাজিক আদব হলো, সালামের প্রসার করা। সালামের প্রসার হলে সমাজের রূপ পাল্টে যায়। তবে সালাম করা নিছক একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইসলামের এমন এক মৌলিক আদব, যার নির্দেশ সরাসরি আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে দিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ অসংখ্য হাদিসে তার ফজিলত ও বিধিবিধান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যার ফলে মুহাদ্দিসগণ হাদিসের কিতাবে সালামের জন্য স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সালামের নির্দেশ দিয়ে বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ কোরো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না করো। '৭১৩
আরেক আয়াতে সালামের জবাব সালামের চেয়ে উত্তমভাবে অথবা সমানভাবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এজন্য সালাম শুনলে সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। অবহেলা করা জায়িজ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
'আর তোমাদের যদি কেউ সালাম করে, তাহলে তোমরাও তাকে সালাম দাও; তার চেয়ে উত্তম সালাম অথবা তারই মতো জবাব দাও। '৭১৪
হাদিসেও সালাম দেওয়ার প্রতি খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
আমর বিন আস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرُ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفُ
'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করল, সর্বোত্তম ইসলাম কী? তিনি উত্তরে বললেন, খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম করা।' ৭১৫
সালাম করা সেই বিশেষ সাত অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত, যে অসিয়ত সামাজিক জীবনে আবশ্যিকভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সাহাবিগণ সে নির্দেশ পালনের পর তাবিয়িগণও তা নিজেদের জন্য আবশ্যিকভাবে পালন করেছিলেন।
সে সাতটি অসিয়ত বারা বিন আজিব কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন :
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعٍ بِعِيَادَةِ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعِ الجنائِزِ، وَتَشْمِيتِ العَاطِسِ، وَنَصْرِ الضَّعِيفِ، وَعَوْنِ المَظْلُومِ، وَإِفْشَاءِ السَّلَامِ، وَإِبْرَارِ المُقْسِمِ
'রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাতটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। যথা : এক. রোগী দেখতে যাওয়া, দুই. জানাজার অনুসরণ করা (মৃত ব্যক্তিকে জানাজা ও দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে চলা), তিন. হাঁচিদাতার জবাব দেওয়া (হাঁচিদাতা আল-হামদুলিল্লাহ বললে তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা), চার. দুর্বলের সাহায্য করা, পাঁচ. মাজলুমের সহযোগিতা করা, ছয়. সালামের প্রসার করা, সাত. প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা।' ৭১৬
রাসুলুল্লাহ ﷺ সালামের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। অসংখ্য হাদিসে সালামের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। কারণ, সালামের কারণে মানুষের হৃদয়সমূহে ভালোবাসার ফোয়ারা প্রবাহিত হয়। সমাজে পরস্পরের মাঝে হৃদ্যতা, নৈকট্য ও নির্মল সম্পর্ক তৈরি হয়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাম করাকে ভালোবাসার উপকরণ বলেছেন, যে ভালোবাসা মানুষের মাঝে ইমানের সঞ্চার করে, যা তাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَفَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
'সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মাঝে ইমান থাকবে। আর তোমাদের মাঝে ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) ইমান আসবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন আমল বলে দেবো না, যা করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (সে বিষয়টি হলো,) তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার করো।'৭১৭
সবার আগে যে সালাম দেয়, তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্যাদার সর্বাধিক যোগ্য বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِاللَّهِ مَنْ بَدَأَهُمْ بِالسَّلَامِ
'আল্লাহর কাছে (সন্তুষ্টি, নিয়ামত ও অনুগ্রহ পাওয়ার) সর্বাধিক যোগ্য ওই ব্যক্তি, যে সবার আগে সালাম দেয়।'৭১৮
এজন্য আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সকালে বাজারে যেতেন এবং যার সাথেই সাক্ষাৎ হতো, তাকেই সালাম দিতেন।
'একদিন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি বাজারে কী করেন? আপনাকে তো কিছু বিক্রি করতে বা কোনো বস্তুর দাম জিজ্ঞেস করতে ও দরাদরি করতে দেখা যায় না। বাজারের কোনো মজলিসেও আপনি বসেন না। তিনি উত্তর দিলেন, আমি সকালে এজন্যই বাজারে যাই, যেন যাদের সাথে দেখা হবে, তাদের প্রত্যেককে সালাম করতে পারি।'৭১৯
ইসলামি সমাজে সম্ভাষণ জানানোর জন্য একটিই বাক্য রয়েছে। প্রকৃত মুসলমান এ বাক্যটির মাধ্যমে সালাম করে। তা হলো : السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ (অর্থ : আপনাদের ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক)। যে সালাম দেবে, সে এভাবেই বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করে সালাম করবে, যদিও সালাম একজনকে দেওয়া হোক। আর উত্তরদাতা বলবে, وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ (অর্থ : আপনাদের ওপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবর্তীর্ণ হোক)।
প্রকৃত মুসলমান সম্ভাষণের এ ইসলামি বাক্যের জায়গায় পূর্বেকার যুগের বাক্য - صَبَاحًا (সুপ্রভাত) এবং বর্তমান সময়ে প্রচলিত সম্ভাষণ صَبَاحَ الْخَيْرِ। (শুভ সকাল), গুড মর্নিং ইত্যাদি বাক্য বলে না।
ইসলামের সম্ভাষণ-বাক্যটি স্বয়ং আল্লাহ-ই তাঁর মাখলুকের জন্য চয়ন করেছেন। আদম -কে সৃষ্টি করার পর তাঁকে এ বাক্য শিখিয়ে দিলেন এবং ফেরেশতাগণকে সে বাক্যের মাধ্যমে সম্ভাষণ জানানোর নির্দেশ দিলেন। আর এটাকেই সর্বযুগে সর্বজায়গায় তাঁর সন্তানদের পরস্পর সম্ভাষণের বাক্য হিসাবে নির্ধারণ করে দিলেন। কারণ, এ বাক্যটিতে শান্তি কামনা করার কথা আছে, যা সর্বযুগে ও সকল জায়গায় মানবজাতির একান্ত কাঙ্ক্ষিত বস্তু। সম্ভাষণের এ আদি বাক্যটির ওপর এখনও অটল আছে একমাত্র মুসলিম উম্মাহ। তারা এতে কোনোরূপ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেনি।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ: اذْهَبْ فَسَلَّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ، وَهُمْ نَفَرٌ مِنَ الْمَلَائِكَةِ جُلُوسٌ، فَاسْتَمِعْ مَا يُجِيبُونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ، قَالَ: فَذَهَبَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللهِ، قَالَ فَزَادُوهُ: وَرَحْمَةُ اللهِ
'আল্লাহ তাআলা আদম-কে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের উপবিষ্ট একটি দল দেখিয়ে বললেন, যাও, ওদের সালাম করো। আর তারা তোমাকে কী উত্তর দেয়, তা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
কেননা, এটিই তোমার ও তোমার সন্তানদের সম্ভাষণ হবে। তখন আদম বললেন, (السَّلَامُ عَلَيْكُمْ ) অর্থাৎ আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)। ফেরেশতারা উত্তরে বললেন, (السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ الله ) (আপনার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)। তাঁরা (وَرَحْمَةُ اللهِ ) (আল্লাহর রহমত) শব্দটি বাড়িয়ে উত্তর দিয়েছেন। '৭২০
এ হাদিস থেকে বুঝা গেল, এ বাক্যটিই পবিত্র সম্ভাষণের বাক্য। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ এটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আমাদের সম্ভাষণের জন্য তাঁর নির্ধারিত বাক্যটি ব্যবহার করতে এবং এটি ব্যতীত অন্যগুলো পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ تَحِيَّةٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً 'অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করো, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র সম্ভাষণ। '৭২১
এ কারণে জিবরাইল যখন আয়িশা-কে সালাম দিয়েছিলেন, তখন এ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। আর উত্তরে আয়িশা-ও এ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ لَهَا: يَا عَائِشَةُ هَذَا جِبْرِيلُ يَقْرَأُ عَلَيْكِ السَّلَامَ، فَقَالَتْ: وَعَلَيْهِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে নবিজি বললেন, জিবরাইল তোমাকে সালাম দিচ্ছেন। আয়িশা বলেন, তখন আমি বললাম, (তাঁর উপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক)। '৭২২
ইসলাম সালাম দেওয়ার বিভিন্ন নিয়ম-কানুনও প্রণয়ন করেছে। প্রকৃত মুসলমান তার সামাজিক জীবনে সেসব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে চেষ্টা করে। সহিহ বুখারিতে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে সালামের নিয়ম- কানুন সংক্ষেপে বিবৃত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى المَاشِي، وَالمَاشِي عَلَى القَاعِدِ، وَالقَلِيلُ عَلَى الكثير - وفي رواية للبخاري - يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الكَبِيرِ
'আরোহী ব্যক্তি পদাতিক ব্যক্তিকে সালাম দেবে। চলন্ত ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেবে। কমসংখ্যক লোক বেশিসংখ্যক লোককে সালাম দেবে। '৭২৩ সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় এটাও আছে, 'ছোট বড়কে সালাম দেবে।'৭২৪
পুরুষদের মতো নারীদেরও সালাম দেওয়া যায়। এর স্বপক্ষে দলিল হলো, আসমা বিনতে ইয়াজিদ-এর হাদিস : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ فِي الْمَسْجِدِ يَوْمًا وَعُصْبَةٌ مِنَ النِّسَاءِ قُعُودُ، فَأَلْوَى بِيَدِهِ بِالتَّسْلِيمِ
'রাসুলুল্লাহ একদিন মসজিদে গমন করলেন। তখন মহিলাদের একটি দল সেখানে বসা ছিল। তিনি তাদের উদ্দেশে হাত উত্তোলন করে সালাম দিলেন। '৭২৫
বাচ্চাদেরও সালাম দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে তাদের সালামের শিক্ষা দেওয়াটাও হয়ে যায়।
আনাস থেকে বর্ণিত আছে:
أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَقَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَفْعَلُهُ
'তিনি (আনাস) বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, নবিজি এমন করতেন।'৭২৬
সালাম দেওয়ার আরেকটি আদব হলো, রাতের বেলা নরম, কোমল ও নিচু স্বরে সালাম দেওয়া। যেন শুধু জাগ্রতরা শুনতে পায়, আর ঘুমন্তরা জেগে না যায়।
মিকদাদ থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ -এর ব্যাপারে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
'আমরা নবিজি-এর দুধের অংশ তাঁর জন্য তুলে রাখতাম। তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন, যেন ঘুমন্তরা না জাগে আর জাগ্রতরা শুনতে পায়। (সেদিনও) নবিজি আসলেন এবং পূর্বেকার মতো সালাম দিলেন...।'৭২৭
কোনো মজলিসে প্রবেশ করার সময় এবং সেখান থেকে উঠে আসার সময় মোট দুবার সালাম দিতে হয়।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ، فَلْيُسَلَّمْ فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ، فَلْيُسَلِّمْ فَلَيْسَتِ الْأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الْآخِرَةِ
'যখন তোমরা কোনো মজলিসে প্রবেশ করবে, তখন সালাম করবে। আবার সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময়েও সালাম করবে। প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালামের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় (অর্থাৎ উভয় সালামের গুরুত্ব সমান)।'৭২৮

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অনুমতি ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করে না

📄 অনুমতি ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করে না


প্রকৃত মুসলমান নিজের রুম ব্যতীত অন্য কারও রুমে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে না। অনুমতি চাওয়ার এ নির্দেশ সরাসরি আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, যাঁর নির্দেশ পালনে কোনোরূপ শিথিলতা ও অবহেলা করার অবকাশ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যগৃহে প্রবেশ কোরো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদের সালাম না করো। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো। যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ কোরো না। যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।'৭২৯
অন্য আয়াতে তিনি বলেন: وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ
'তোমাদের সন্তান-সন্ততিরা যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হয়, তখন তারাও যেন তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় অনুমতি চায়।'৭৩০
মানুষের ঘরে প্রবেশ করা উদ্দেশ্যমূলক ও সন্দেহজনক। তা ছাড়া ঘরওয়ালা এতে খুব বিব্রতবোধ করেন। তবে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলে সন্দেহ ও বিব্রতবোধ আর থাকে না। এজন্য চুরির উদ্দেশ্যে সিঁধ কেটে ঘরে ঢোকা, ঘরওয়ালার অবহেলার সুযোগ নিয়ে চুপিসারে ঘরে প্রবেশ করা ইত্যাদি সন্দেহমূলক অবৈধ প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই।
ঘরওয়ালা ও আগন্তুক উভয়ের প্রাইভেসি ও মান-সম্মানের জন্য এটা খুবই জরুরি। অনুমতি নেওয়ার বিধান প্রণয়নের পেছনে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যও এটাই। অনুমতি চাওয়ার অনেক আদব ও নিয়ম-কানুন রয়েছে। ইসলাম মুসলমানদের প্রতি এসব অর্জন করার দাবি জানায়।
প্রথম আদব : প্রবেশের অনুমতি নেওয়ার সময় দরজার সোজাসুজি সামনে দাঁড়াবে না। একটু ডানে অথবা বামে দাঁড়াবে। রাসুলুল্লাহ -এর অভ্যাস এমনই ছিল।
আব্দুল্লাহ বিন বুসর বর্ণনা করেন: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَتَى بَابًا يُرِيدُ أَنْ يَسْتَأْذِنَ لَمْ يَسْتَقْبِلْهُ، جَاءَ يَمِينًا وَشِمَالًا، فَإِنْ أُذِنَ لَهُ وَإِلَّا انْصَرَفَ
'নবিজি কোনো দরজার সামনে গেলে সোজাসুজি দরজার সামনে দাঁড়াতেন না। একটু ডানদিকে অথবা বামদিকে দাঁড়াতেন। তারপর প্রবেশের অনুমতি পেলে প্রবেশ করতেন। আর অনুমতি না পেলে ফিরে যেতেন।' ৭১১
কারণ, অনুমতি নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, দৃষ্টিকে অপ্রীতিকর ও বিব্রতকর দৃশ্য থেকে বাঁচানো।
এ সম্পর্কে সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّمَا جُعِلَ الِاسْتِعْذَانُ مِنْ أَجْلِ البَصَرِ
‘অনুমতি চাইতে হয় কেবল দৃষ্টির (অপপ্রয়োগ থেকে বেঁচে থাকার) কারণে। ’৭৩২
আর দরজার সোজাসুজি সামনে দাঁড়ালে এ উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এজন্য অনুমতিপ্রার্থীর জন্য দরজার সোজাসুজি সামনে দাঁড়ানো জায়িজ নয়, যাতে দরজা খুললে ভেতরে দৃষ্টি না পড়ে।
দ্বিতীয় আদব : প্রথমে সালাম করবে, তারপর অনুমতি চাইবে। সালামের পূর্বে অনুমতি চাওয়া ঠিক নয়। রিবয়ি বিন হিরাস থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ -এর এমন নির্দেশনাই বর্ণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাকে বনি আমিরের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন : أَنَّهُ اسْتَأْذَنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي بَيْتٍ فَقَالَ: أَلِجُ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِحَادِمِهِ: اخْرُجْ إِلَى هَذَا فَعَلَّمْهُ الاسْتِثْذَانَ، فَقُلْ لَهُ: قُلِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، أَأَدْخُلُ؟ فَسَمِعَهُ الرَّجُلُ، فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، أَأَدْخُلُ؟ فَأَذِنَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَدَخَلَ
‘সে নবিজি -এর নিকট প্রবেশ করার অনুমতি চাইল। তখন নবিজি ঘরের ভেতরে ছিলেন। অনুমতি চাওয়ার সময় সে বলল, আমি কি প্রবেশ করব? নবিজি তাঁর খাদিমকে বললেন, ওই ব্যক্তির নিকট গিয়ে অনুমতি চাওয়ার নিয়ম শিখিয়ে দিয়ে আসো। তাকে এভাবে বলতে বলো, আস-সালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পারি? লোকটি তা শুনে বলল, আস-সালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পারি? তখন নবিজি তাকে অনুমতি দিলেন এবং সে প্রবেশ করল। ৭৩৩
তৃতীয় আদব: আসল নাম বা ডাকনাম—যে নামে তাকে মানুষ বেশি চেনে, সে নাম বলবে। যখন জিজ্ঞেস করা হবে, আপনি কে? তখন 'আমি' বা এ ধরনের কোনো অস্পষ্ট শব্দ বলবে না। রাসুলুল্লাহ -কে এক ব্যক্তি 'আমি' বলে পরিচয় দিলে তিনি খুব নাখোশ হন এবং পরিচিত নাম বলে পরিচয় দিতে নির্দেশ দেন।
জাবির বলেন: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي دَيْنٍ كَانَ عَلَى أَبِي، فَدَقَقُتُ البَابَ، فَقَالَ: «مَنْ ذَا» فَقُلْتُ: أَنَا، فَقَالَ: «أَنَا أَنَا» كَأَنَّهُ كَرِهَهَا
'আমি নবিজি -এর নিকট যাওয়ার জন্য তাঁর দরজার কড়া নাড়লাম। তিনি বললেন, কে? আমি বললাম, আমি। তখন তিনি বললেন, আমিও তো আমি! বুঝতে পারলাম, আমার অস্পষ্ট উত্তরটি তিনি অপছন্দ করেছেন।' ৭৩৪
রাসুলুল্লাহ এই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের অনুমতি চাওয়ার একটি সুন্নাত শিক্ষা দিয়েছেন যে, অনুমতি গ্রহণের সময় স্পষ্ট নাম উচ্চারণ করা। রাসুলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবিদের মাঝে এ সুন্নাত বিদ্যমান ছিল।
আবু জার বলেন: خَرَجْتُ لَيْلَةٌ مِنَ اللَّيَالِي، فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمْشِي وَحْدَهُ، لَيْسَ مَعَهُ إِنْسَانُ، قَالَ: فَظَنَنْتُ أَنَّهُ يَكْرَهُ أَنْ يَمْشِي مَعَهُ أَحَدٌ، قَالَ: فَجَعَلْتُ أَمْشِي فِي ظِلَّ الْقَمَرِ، فَالْتَفَتَ فَرَآنِي، فَقَالَ: «مَنْ هَذَا؟ فَقُلْتُ: أَبُو ذَرَّ
'এক রাতে আমি বের হলাম। তখন রাসুলুল্লাহ -কে একাকী হাঁটতে দেখলাম। কেউ তাঁর সাথে ছিল না। আমি মনে মনে ভাবলাম, হয়তো এ মুহূর্তে কারও সঙ্গ তিনি চাইছেন না। (তাই আমি তাঁর পাশে না গিয়ে) চাঁদের আলোয় হাঁটতে লাগলাম। রাসুলুল্লাহ পেছনে ফিরলে আমাকে দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, কে? আমি বললাম, আমি আবু জার। '৭৩৫
উম্মে হানি বলেন: ذَهَبْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الفَتْحِ فَوَجَدْتُهُ يَغْتَسِلُ وَفَاطِمَةُ تَسْتُرُهُ فَقَالَ: «مَنْ هَذِهِ؟» فَقُلْتُ: أَنَا أُمُّ هَانِي
'আমি মক্কা বিজয়ের বছর রাসুলুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি গোসল করছিলেন, আর ফাতিমা তাঁকে আড়াল করছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে এসেছে? আমি বললাম, আমি উম্মে হানি। '৭৩৬
চতুর্থ আদব : যদি ফিরে যেতে বলা হয়, তাহলে বিনা সংকোচে ফিরে যাবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এ নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন : وَإِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
'যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন। '৭৩৭
রাসুলুল্লাহ-ও এমন শিক্ষাই দিয়েছেন। আবু মুসা আশআরি -এর হাদিসে তা বর্ণিত হয়েছে।
তিনি ইরশাদ করেছেন: الاسْتِنْذَانُ ثَلَاثُ، فَإِنْ أُذِنَ لَكَ، وَإِلَّا فَارْجِعْ
'তিনবার পর্যন্ত অনুমতি চাইবে। এরপর অনুমতি পেলে প্রবেশ করবে, না পেলে ফিরে যাবে।'৭৩৮
একবার আবু মুসা আশআরি রাঃ উমর রাঃ-এর নিকট অনুমতি চেয়ে পাননি। তাই তিনি ফিরে আসলেন। তখন উমর রাঃ তাঁর নিকট ফিরে যাওয়ার কৈফিয়ত চাইলেন। এ ব্যাপারে উভয়ের মাঝে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হলো। সম্পূর্ণ ঘটনাটি এখানে তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি। যাতে পাঠক জানতে পারেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়নে সাহাবায়ে কিরাম কীরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
আবু মুসা আশআরি রাঃ বলেন :
اسْتَأْذَنْتُ عَلَى عُمَرَ، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي - ثَلَاثًا - فَأَدْبَرْتُ، فَأَرْسَلَ إِلَيَّ فَقَالَ: يَا عَبْدَ اللَّهِ، اشْتَدَّ عَلَيْكَ أَنْ تُحْتَبَسَ عَلَى بَابِي؟ اعْلَمْ أَنَّ النَّاسَ كَذَلِكَ يَشْتَدُّ عَلَيْهِمْ أَنْ يُحْتَبَسُوا عَلَى بَابِكَ، فَقُلْتُ: بَلِ اسْتَأْذَنْتُ عَلَيْكَ ثَلَاثًا، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي، فَرَجَعْتُ، فَقَالَ: مِمَّنْ سَمِعْتَ هَذَا؟ فَقُلْتُ: سَمِعْتُهُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَسَمِعْتَ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ نَسْمَعْ؟ لَئِنْ لَمْ تَأْتِنِي عَلَى هَذَا بِبَيِّنَةٍ لَأَجْعَلَنَّكَ نَكَالًا، فَخَرَجْتُ حَتَّى أَتَيْتُ نَفَرًا مِنَ الْأَنْصَارِ جُلُوسًا فِي الْمَسْجِدِ فَسَأَلْتُهُمْ، فَقَالُوا: أَوَيَشُكُ فِي هَذَا أَحَدٌ؟ فَأَخْبَرْتُهُمْ مَا قَالَ عُمَرُ، فَقَالُوا: لَا يَقُومُ مَعَكَ إِلَّا أَصْغَرُنَا، فَقَامَ مَعِي أَبُو سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ - أَوْ أَبُو مَسْعُودٍ - إِلَى عُمَرَ، فَقَالَ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يُرِيدُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ، حَتَّى أَتَاهُ فَسَلَّمَ، فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، ثُمَّ سَلَّمَ الثَّانِيَةَ، ثُمَّ الثَّالِثَةَ، فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، فَقَالَ: «قَضَيْنَا مَا عَلَيْنَا» ، ثُمَّ رَجَعَ، فَأَدْرَكَهُ سَعْدُ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا سَلَّمْتَ مِنْ مَرَّةٍ إِلَّا وَأَنَا أَسْمَعُ، وَأَرُدُّ عَلَيْكَ، وَلَكِنْ أَحْبَبْتُ أَنْ تُكْثِرَ مِنَ السَّلَامِ عَلَيَّ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِي، فَقَالَ أَبُو مُوسَى: وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لَأَمِينًا عَلَى حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَجَلْ، وَلَكِنْ أَحْبَبْتُ أَنْ أَسْتَثْبِتَ
'একদা আমি উমর -এর নিকট প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারপর আমি ফিরে আসলে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, হে- আল্লাহর বান্দা, আমার দরজায় অপেক্ষা করা তোমার জন্য যেমন কষ্টকর ঠেকেছে? মনে রেখো, ঠিক তেমনই তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাও লোকদের জন্য কষ্টকর ঠেকবে। আমি বললাম, আমি তিনবার আপনার অনুমতি চেয়ে অনুমতি পাইনি বিধায় ফিরে এসেছি। কারণ, আমাদের এমনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, এমন বিধানের কথা তুমি কার কাছে শুনেছ? আমি বললাম, নবিজি -এর নিকট থেকে শুনেছি। তিনি বললেন, তুমি কি নবিজি থেকে এমন একটি কথা শুনেছ, যা আমি শুনিনি? যদি তুমি তার প্রমাণ দিতে না পারো, তবে তোমাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবো।
তখন আমি বের হলাম এবং মসজিদে উপবিষ্ট কয়েকজন আনসার সাহাবিদের নিকট গিয়ে এ ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন, এ ব্যাপারে কি কারও কোনো সন্দেহ থাকতে পারে? তখন আমি তাদের উমর -এর ব্যাপারে জানালাম। তারা বললেন, আমাদের সর্বকনিষ্ঠজনই আপনার সঙ্গে যাবে। তখন আবু সাঈদ খুদরি অথবা আবু মাসউদ আমার সঙ্গে উমর -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, একদা আমরা নবিজি -এর সাথে বের হলাম। তিনি সাদ বিন উবাদা -এর বাড়ির দিকে রওনা হয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ তাকে সালাম দিলেন, কিন্তু অনুমতির সাড়া পাননি। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার সালাম দিলেন, তবুও অনুমতি পাওয়া যায়নি। অবশেষে তিনি বললেন, আমাদের দায়িত্ব আমরা সম্পন্ন করলাম। অতঃপর তিনি ফিরে যেতে লাগলেন। এমন সময় সাদ পেছন থেকে এসে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যে পবিত্র সত্তা আপনাকে সত্য নবি বানিয়ে প্রেরণ করেছেন, তাঁর নামে কসম করে বলছি, আপনি যতবারই সালাম করেছেন, প্রতিবারই আমি তা শুনতে পেয়েছি এবং (নিম্নস্বরে) প্রত্যেকটার জবাবও দিয়েছি। কিন্তু আপনার পাক জবান থেকে আমার ও আমার গৃহবাসীদের প্রতি বেশি সালাম পাওয়ার আশায় সশব্দে উত্তর দিইনি। অতঃপর আবু মুসা বললেন, আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসের ব্যাপারে আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত। তখন উমর বললেন, সত্য বটে, তবে আমি তার প্রমাণ সংগ্রহ করতে চেয়েছিলাম আর কি!'৭৩৯
মুসলিম শরিফের বর্ণনায় এসেছে, হাদিসের প্রমাণ পাওয়ার পর উমর আফসোস করে বললেন : خَفِيَ عَلَيَّ هَذَا مِنْ أَمْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَلْهَانِي عَنْهُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ 'হায়, রাসুলুল্লাহ -এর একটি নির্দেশনা আমার জানার বাইরে রয়ে গিয়েছিল! এটা ব্যবসার উদ্দেশ্যে আমার বাজারে বাজারে ঘোরার ফল!'৭৪০

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মজলিসের যেখানে জায়গা পায়, সেখানেই বসে পড়ে

📄 মজলিসের যেখানে জায়গা পায়, সেখানেই বসে পড়ে


প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো মজলিসে গেলে যেখানে জায়গা পায়, সেখানেই বসে পড়ে। লোকদের ডিঙিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা করে না কিংবা তাদের মাঝে গিয়ে ভিড় করে না, যেন তারা নড়েচড়ে তার বসার জায়গা করে দেয়। এটা এমন এক উন্নত সামাজিক আদব, যা রাসুলুল্লাহ কথা ও কাজের মাধ্যমে সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন।
জাবির বিন সামুরা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: كُنَّا إِذَا أَتَيْنَا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، جَلَسَ أَحَدُنَا حَيْثُ يَنْتَهِي
'আমরা নবিজি -এর মজলিসে গেলে মজলিসের শেষে (যেখানে জায়গা পেতাম সেখানেই) বসতাম।'৭৪১
সুতরাং যে মুসলমানের মাঝে এ উন্নত আদব বিদ্যমান রয়েছে, সে দুজনের মাঝে ঢুকে তাদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করে না। একান্ত প্রয়োজন হলে তাদের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে। কেননা, এভাবে দুজন মানুষের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে ঢুকে ফাটল সৃষ্টি করা থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يُفَرِّقَ بَيْنَ اثْنَيْنِ، إِلَّا بِإِذْنِهِمَا
'কোনো ব্যক্তির জন্য দুজন মানুষের মাঝে (অপ্রত্যাশিতভাবে অনুপ্রবেশ করে) ফাটল সৃষ্টি করা বৈধ নয়।'৭৪২
কেননা, মজলিসে বা মজলিসের বাইরে যেখানেই হোক, দুজন মানুষের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে তৃতীয় ব্যক্তির ঢুকে পড়াটা খুবই বিব্রতকর ও অভদ্রজনোচিত ব্যাপার। ইসলাম এ থেকে কঠিনভাবে নিষেধ করেছে। অসংখ্য হাদিস ও আসারে (সাহাবিদের কথা ও কাজে) এ গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাঈদ মাকবুরি বলেন: مَرَرْتُ عَلَى ابْنِ عُمَرَ، وَمَعَهُ رَجُلٌ يَتَحَدَّثُ، فَقُمْتُ إِلَيْهِمَا، فَلَطَمَ فِي صَدْرِي فَقَالَ: إِذَا وَجَدْتَ اثْنَيْنِ يَتَحَدَّثَانِ فَلَا تَقُمُّ مَعَهُمَا، وَلَا تَجْلِسُ مَعَهُمَا، حَتَّى تَسْتَأْذِنَهُمَا، فَقُلْتُ: أَصْلَحَكَ اللَّهُ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، إِنَّمَا رَجَوْتُ أَنْ أَسْمَعَ مِنْكُمَا خَيْرًا
'আমি ইবনে উমর -এর নিকট গেলাম। তখন এক ব্যক্তির সাথে তিনি কথা বলছিলেন। আমি দুজনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইবনে উমর আমার বুকে একটা চড় মেরে বললেন, দুজন ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখলে অনুমতি না নিয়ে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে না এবং তাদের নিকট বসবে না। আমি বললাম, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, হে আবু আব্দুর রহমান। আসলে আমি আপনাদের দুজন থেকে ভালো কিছু শোনার আশায় এসেছিলাম। '৭৪৩
প্রকৃত মুসলমানের জন্য কেউ নিজের আসন ছেড়ে দিলে তাতে বসতে অস্বীকৃতি জানায় সে। এটা ভদ্রতা। সাহাবায়ে কিরাম এমনই ছিলেন।
ইবনে উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يُقِيمَنَّ أَحَدُكُمُ الرَّجُلَ مِنْ مَجْلِسِهِ، ثُمَّ يَجْلِسُ فِيهِ، وَلَكِنْ تَفَسَّحُوا وَتَوَسَّعُوا
'তোমরা কোনো ব্যক্তিকে তার আসন থেকে উঠিয়ে দিয়ে সে জায়গায় বোসো না। তবে মজলিসে স্থান প্রশস্ত করতে পারবে।'৭৪৪
অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ، إِذَا قَامَ لَهُ رَجُلٌ عَنْ مَجْلِسِهِ، لَمْ يَجْلِسْ فِيهِ
'ইবনে উমর-এর জন্য কেউ নিজের আসন ছেড়ে দিলে তিনি তাতে বসতেন না।'৭৪৫
রাসুলুল্লাহ থেকে মজলিস ও মানুষের সাথে বসবাস-সংক্রান্ত যেসব আদব হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রকৃত মুসলমান সেগুলোর অনুসরণ করে চলতে চেষ্টা করে। এ সংক্রান্ত রাসুলুল্লাহ -এর কতিপয় আদব হলো, তিনি তাঁর মজলিসে আগত প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অংশ প্রদান করতেন। তাঁর মজলিসে কেউ এটা ভাবার অবকাশ পেত না যে, এ মজলিসে অন্যজন তার চেয়ে বেশি মর্যাদা পাচ্ছে। তিনি কারও নিন্দা করতেন না। কাউকে লজ্জা দিতেন না। কারও দোষ খুঁজে বেড়াতেন না। সাওয়াব পাওয়া যায়, এমন কথা ব্যতীত অন্য কোনো কথা বলতেন না। কারও সাথে কথা বলার সময় মাঝখানে কথা কেটে নিতেন না, যতক্ষণ না তার কথা পুরোপুরি শেষ হয়। '৭৪৬

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মজলিসে যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বিরত থাকে

📄 মজলিসে যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বিরত থাকে


প্রকৃত ভদ্র মুসলমান মজলিসে যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বেঁচে থাকে। আর যদি এসেই যায়, তখন তা যেকেনো উপায়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমন নির্দেশই দিয়েছেন। তিনি বলেন:
فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَكْظِمْ مَا اسْتَطَاعَ
'যদি তোমাদের কারও হাই আসে, তখন যথাসাধ্য তাকে দমন করার চেষ্টা করবে।'৭৪৭
হাই যদি তীব্র হয় এবং প্রতিহত করা সম্ভব না হয়, তাহলে মুখে হাত দেবে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ، فَلْيُمْسِكْ بِيَدِهِ عَلَى فِيهِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ
'যদি তোমাদের কারও হাই আসে, তখন মুখে হাত দিয়ে তা দমন করবে। কেননা, (হাই তোলার সময় মুখ দিয়ে) শয়তান ঢুকে যায়।' ৭৪৮
মজলিসে লোকসম্মুখে হাই তোলা অনেক ঘৃণিত একটি বিষয়। কোনো ভদ্র মানুষের মাঝে এটা মোটেই শোভা পায় না। এজন্য যেকোনো উপায়ে তা দমন করা উচিত এবং মুখ খুলে গেলে হাত দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত। যেন হাই তোলার সময় খোলা মুখগহ্বর দেখে মানুষের মাঝে ঘৃণা ও অস্বস্তিবোধ সৃষ্টি না হয়। প্রকৃত মুসলমান সমাজজীবনে এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকে, যেন তার প্রতি মানুষের মাঝে ঘৃণাবোধ ও অনাগ্রহ পয়দা না হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00