📄 সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ, আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ
ইসলামের আলোয় আলোকিত প্রকৃত মুসলমান কোমল স্বভাবের হয়। সে নিজে অন্তরঙ্গ, অন্যরাও তার সাথে অন্তরঙ্গ। মানুষের সাথে অন্তরঙ্গতা ও সম্প্রীতির সাথে মিলেমিশে থাকে। তারাও তার প্রতি অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ হয় এবং তাকে ভালোবাসে। এটি একটি উন্নত সামাজিক চরিত্র। প্রকৃত মুসলমান— যে নিজের মাঝে দ্বীনের বার্তা বহন করে চলে—এ গুণটিকে নিজের ভেতর ফিট করে নেয়। সে বিশ্বাস করে, সমাজের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা ও তাদের ভরসা অর্জন করা একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য এবং তাদের নিকট সত্যের বাণী পৌঁছে দিতে অত্যন্ত সহায়ক। যে সত্য ও আদর্শ সে বহন করে চলছে, তা লোকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হলে অবশ্যই এ গুণ অবলম্বন করতে হবে। কেননা, মানুষ এমন মানুষের কথা শুনতে চায় না, যার সাথে তারা অন্তরঙ্গ নয় এবং যার প্রতি তাদের ভরসা নেই। পক্ষান্তরে যার সাথে তাদের অন্তরঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠতা আছে এবং যার প্রতি তাদের ভরসা আছে, তার কথা শুনতে ও মানতে তারা দ্বিধাবোধ করে না। এজন্য ইসলামের অনেক আয়াত-হাদিসে এ গুণটি অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং যাদের মাঝে গুণটি বিদ্যমান, তাদের একটি বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা ও কিয়ামতের দিন তাঁর নিকট অবস্থান করার নিয়ামত লাভে ধন্য হবে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، قَالَ الْقَوْمُ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: أَحْسَنُكُمْ خُلُقًا وزادت بعض الروايات : الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافُهُمْ الَّذِينَ يَأْلَفُونَ وَيُؤْلَفُونَ
'আমি কি তোমাদের বলব, কারা আমার নিকট অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার অধিক নিকটবর্তী হবে? উপস্থিত সাহাবিগণ চুপ করে রইলেন। অতঃপর আরও তিনবার অথবা দুবার বললেন। তখন সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল। বললেন, (তারা হলো,) তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।' আরেকটি রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে, 'আর যাদের অন্তর প্রশস্ত, মানুষের সাথে তারা অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তাদের সাথে অন্তরঙ্গ।'৬৭৭
মুমিনের অন্যতম গুণ হলো, সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ হবে আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ হবে। মানুষকে সে ভালোবাসবে, তারাও তাকে ভালোবাসবে। তাদের প্রতি সে মনোযোগী হবে এবং তারাও তার প্রতি মনোযোগী হবে। মুমিনের মাঝে যদি এ গুণটি না থাকে, তাহলে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তার নিকট থেকে কোনো কল্যাণেরও আশা করা যাবে না।
এজন্য হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
الْمُؤْمِنُ يَأْلَفُ وَيُؤْلَفُ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلُفُ، وَلَا يُؤْلَفُ 'মুমিন সে ব্যক্তি, যে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ। আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ নয় এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ নয়—এমন ব্যক্তির মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।'৬৭৮
রাসুলুল্লাহ মানুষের সাথে উত্তম আচরণের মাধ্যমে উম্মাহর জন্য মহান আদর্শরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। উম্মাহকে কথা, কাজ ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সে আদর্শের অনুকরণ করার দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি উম্মাহকে শিখিয়ে দিয়েছেন, কী করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়, কীভাবে তাদের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। রাসুলুল্লাহ ছিলেন সদা হাস্যমুখ, সহজ- সরল ও কোমল স্বভাবের অধিকারী। তিনি রূঢ় ও কঠোর ছিলেন না। কোনো সম্প্রদায়ের নিকট গেলে তাদের মজলিসের শেষে যেখানে জায়গা পেতেন, সেখানে বসতেন এবং অন্যদেরও এমন করার নির্দেশ দিতেন। তাঁর মজলিসে আগত প্রত্যেক সদস্যকে সমানভাবে জায়গা দিতেন। মজলিসে যারা বসত, তাদের কেউ এ কথা মনে করার সুযোগ পেত না যে, এ মজলিসে অন্যজন তার চেয়ে বেশি সম্মান পাচ্ছে। কেউ তাঁর নিকট কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরতে হতো না। সবার সাথে তিনি সহজ-সরল ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর চরিত্র ও দয়া সকল মানুষের জন্য ব্যাপক ও সমান ছিল। এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার জন্য স্নেহশীল এক পিতা। অধিকারের ক্ষেত্রে সবাই তাঁর কাছে সমান ছিল। তাঁর মজলিসে যারা বসতেন, তাদের পরস্পরের মাঝে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একমাত্র তাকওয়ার মাধ্যমে তাদের মর্যাদার তারতম্য হতো। তারা ছিলেন নম্র ও ভদ্র। তারা বড়দের সম্মান করতেন, ছোটদের স্নেহ করতেন, অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
রাসুলুল্লাহ -এর কাছে কোনো কিছুর আশা করে কখনো নিরাশ ও হতাশ হতে হয়নি কাউকে। তিনি তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। এক. অহেতুক বিতর্ক করা, দুই. বেশি কথা বলা, তিন. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ। আর মানুষের ব্যাপারে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতেন। এক. কারও নিন্দা করতেন না, দুই. কাউকে লজ্জা দিতেন না, তিন. কারও দোষ তালাশ করতেন না। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন তাঁর শ্রোতাগণ এমন তন্ময় হয়ে যেতেন, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর যখন তিনি চুপ হতেন, তখন তারা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তাঁরা পরস্পর ঝগড়া করতেন না। তাঁদের হাসিতে তিনি হাসতেন এবং তাঁদের আনন্দে তিনি আনন্দিত হতেন। অপরিচিত মূর্খ ব্যক্তির অবাঞ্ছিত কথা ও প্রশ্নে তিনি ধৈর্য ধরতেন। তিনি তাঁর সাহাবিদের বলতেন, যদি কোনো অভাবীকে তোমরা দেখো, তাহলে তার সাহায্য করবে। তিনি অতিরঞ্জিত প্রশংসা গ্রহণ করতেন না। কেউ তাঁর সাথে কথা বললে তার সম্পূর্ণ কথা শুনতেন। কথার মাঝখানে তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিতেন না।
আয়িশা বর্ণনা করেন যে, তিনি দুষ্ট লোকদের থেকে বেঁচে থাকতেন। তাদের সাথে সুন্দর কথা ও আচরণের মাধ্যমে তাদের দমিয়ে রাখতেন।
এ ধরনের এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন :
ائْذَنُوا لَهُ، فَلَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيرَةِ، أَوْ بِئْسَ رَجُلُ الْعَشِيرَةِ فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ أَلَانَ لَهُ الْقَوْلَ ، قَالَتْ عَائِشَةُ : فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْتَ لَهُ الَّذِي قُلْتَ ، ثُمَّ أَلَنْتَ لَهُ الْقَوْلَ؟ قَالَ: يَا عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ وَدَعَهُ، أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
'তাকে অনুমতি দাও। সে তার বংশের নিকৃষ্ট সন্তান। অথবা বললেন, সে তার গোত্রের নিকৃষ্টতম ভাই। যখন সে প্রবেশ করল, তখন তিনি তার সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বললেন। আমি (আয়িশা ) বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এর সম্পর্কে যা বলার তা বলেছেন, এখন আপনি তার সাথে নম্রভাবে কথা বললেন যে! তিনি বললেন, হে আয়িশা, আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার অশালীন আচরণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার সংস্রব ত্যাগ করে। '৬৭৯
প্রকৃত মুসলমান মানুষের সাথে আচরণে রাসুলুল্লাহ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে, যেন সে সবার নিকট প্রিয়, ঘনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
📄 ইসলামি ভীতির সামনে ব্যক্তিগত স্বভাব বিসর্জন দেয়
প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সমাজে ইসলামি রীতির সামনে ব্যক্তিগত প্রিয় অভ্যাসসমূহ সমর্পণ করে দেয়। এজন্য প্রকৃত مسلمانوں সমাজ সম্পূর্ণরূপে ইসলামি মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
সুতরাং সে স্বর্ণের আংটি পরিধান করে না। কেননা, পুরুষদের জন্য স্বর্ণের আংটি পরিধান করা ইসলামি শরিয়তে হারাম। এক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে রাসুলুল্লাহ ﷺ এ ঘোষণা দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন: يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ 'তোমাদের কেউ কি আগুনের জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় নিতে চাইবে?'৬৮০
তারপর তিনি লোকটির আঙুল থেকে আংটিটি খুলে মাটিতে ফেলে দিলেন। এখানে লোকটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। কারণ, যখন তার সঙ্গীরা তাকে নিক্ষিপ্ত আংটি তুলে নিয়ে বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা উপকৃত হতে বলল, তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এমন বস্তুকে তুলে নেব না, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ নিক্ষেপ করেছেন।
প্রকৃত মুসলমান সোনা ও রুপার পাত্রে পানাহার করে না। রেশমি পোশাক পরিধান করে না। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ অনেক হাদিসে এ থেকে নিষেধ করেছেন। কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো।
হুজাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: وَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَانَا عَنِ الحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَالشَّرْبِ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَقَالَ: هُنَّ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا ، وَهِيَ لَكُمْ فِي الآخِرَةِ 'নবিজি ﷺ আমাদের রেশমি পোশাক পরিধান করতে এবং সোনা ও রুপার পাত্রে পান করতে নিষেধ করেছেন। আর বলেছেন, এগুলো দুনিয়াতে তাদের (কাফিরদের) জন্য, আর আখিরাতে তোমাদের জন্য।'৬৮১
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الَّذِي يَشْرَبُ فِي إِنَاءِ الفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ
'যে ব্যক্তি রুপার পাত্রে পান করে, সে ঘড়ঘড় করে তার পেটের ভেতর জাহান্নামের আগুন ভরে।'৬৮২
মুসলিম শরিফের আরেক বর্ণনায় এসেছে :
أَنَّ الَّذِي يَأْكُلُ أَوْ يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ وفي رواية له : مَنْ شَرِبَ فِي إِنَاءٍ مِنْ ذَهَبٍ، أَوْ فِضَّةٍ، فَإِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارًا مِنْ جَهَنَّمَ
'নিশ্চয় যে ব্যক্তি সোনা ও রুপার পাত্রে খায় এবং পান করে, মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি সোনা বা রুপার পাত্রে পান করে, সে (এর মাধ্যমে) ঘড়ঘড় করে তার পেটের ভেতর জাহান্নামের আগুন ভরে।'৬৮৩
উমর বিন খাত্তাব বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি :
إِنَّمَا يَلْبَسُ الحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا مَنْ لَا خَلَاقَ لَهُ فِي الآخِرَةِ
'(দুনিয়াতে একমাত্র) সে ব্যক্তিই রেশমের পোশাক পরিধান করে, যার জন্য আখিরাতে কোনো অংশ নেই।'৬৮৪
আলি বলেন, আমি দেখেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ ডান হাতে রেশমি কাপড় নিলেন এবং বাম হাতে স্বর্ণ নিলেন, তারপর বললেন :
إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي
'এ দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের ওপর হারাম।'৬৮৫
আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: حُرِّمَ لِبَاسُ الحَرِيرِ وَالذَّهَبِ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي وَأُحِلَّ لِإِنَائِهِمْ 'রেশমি পোশাক আর স্বর্ণ আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে, আর মহিলাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। '৬৮৬
হুজাইফা বলেন : نَهَانَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَأَنْ نَأْكُلَ فِيهَا، وَعَنْ لُبْسِ الحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ 'নবিজি আমাদের সোনা ও রুপার পাত্রে পানাহার করতে এবং রেশমি বস্ত্র পরিধান করতে ও তার ওপর বসতে নিষেধ করেছেন। '৬৮৭
প্রকৃত মুসলমান রাসুলুল্লাহ-এর কথা মেনে নিয়ে এগুলোকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়। এ বস্তুগুলো কেন হারাম করা হলো, তার কারণ সে খুঁজে বেড়ায় না। কারণ, হালাল-হারামের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, পবিত্র কুরআনের এ আয়াত: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا 'রাসুল তোমাদের (বিধানস্বরূপ) যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। '৬৮৮
বর্তমান আমাদের বিয়ে-শাদিতে যেসব পাশ্চাত্য রীতি ও কুসংস্কৃতি প্রবেশ করেছে, প্রকৃত মুসলমান সেগুলো মেনে চলে না। যেমন: বাগদানের সময় ডান হাতে আংটি পরিয়ে দেওয়া, আবার বাসর রাতে তা বাম হাতে স্থানান্তর করা, বাসর রাতে নবদম্পতির ঘরে মাহরাম-গাইরে মাহরাম আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব মিলে স্মৃতির জন্য গ্রুপ ছবি তোলা ইত্যাদি অপসংস্কৃতি, যা কাফিররা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো সবই বিজাতীয় অপসংস্কৃতি। প্রকৃত মুসলমান এসব বিষয়কে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
আরও যেসব অপসংস্কৃতি সমাজে প্রচলিত আছে, প্রকৃত মুসলমান সেসবকেও প্রত্যাখ্যান করে। যেমন: দেয়ালে ছবি রাখা, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করা, ঘরে পাহারাদারির উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা ইত্যাদি বিষয়। এসব বিষয় ইসলামে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। মুমিনদের জন্য কোনো অজুহাতেই এসব বিষয় বৈধ নয়। এ সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
ইবনে উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذِّبُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
'যারা ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের আজাব দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, যা তোমরা বানিয়েছ, তাতে প্রাণ দান করো। '৬৮৯
আয়িশা বলেন, রাসুলুল্লাহ কোনো এক সফর থেকে ফিরলেন। তখন আমি ভেন্টিলেটরের ওপর একটি পর্দা টেনে রেখেছিলাম, যার ওপর ছবি আঁকা ছিল। রাসুলুল্লাহ-এর দৃষ্টি যখন তার ওপর পড়ল, রাগে তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। অতঃপর বললেন:
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللَّهِ قَالَتْ: فَجَعَلْنَاهُ وِسَادَةً أَوْ وِسَادَتَيْنِ
'হে আয়িশা, কিয়ামতের দিন সেসব লোকের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য তৈরি করে। আয়িশা বলেন, এরপর আমি পর্দাটি ছিঁড়ে তা দিয়ে একটি বা দুটি বালিশ বানিয়ে নিলাম। '৬৯০
ইবনে আব্বাস বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يَجْعَلُ لَهُ، بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا، نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ، وقَالَ: إِنْ كُنْتَ لَا بُدَّ فَاعِلًا، فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ
'সকল ছবি অঙ্কনকারী জাহান্নামে যাবে। আর প্রত্যেক ছবির পরিবর্তে একটি জীবিত প্রাণী বানানো হবে, যে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেবে। ইবনে আব্বাস বলেন, যদি একান্তই তোমাদের ছবি আঁকতে হয়, তাহলে গাছ ও প্রাণহীন বস্তুর ছবি আঁকবে। '৬৯১
আয়িশা বর্ণনা করেন:
وَاعَدَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي سَاعَةٍ يَأْتِيهِ فِيهَا، فَجَاءَتْ تِلْكَ السَّاعَةُ وَلَمْ يَأْتِهِ، وَفِي يَدِهِ عَصَّا، فَأَلْقَاهَا مِنْ يَدِهِ، وَقَالَ: مَا يُخْلِفُ اللهُ وَعْدَهُ وَلَا رُسُلُهُ، ثُمَّ الْتَفَتَ، فَإِذَا جِرْوُ كَلْبٍ تَحْتَ سَرِيرِهِ، فَقَالَ: يَا عَائِشَةُ، مَتَى دَخَلَ هَذَا الْكَلْبُ هَاهُنَا؟ فَقَالَتْ: وَاللهِ، مَا دَرَيْتُ، فَأَمَرَ بِهِ فَأُخْرِجَ، فَجَاءَ جِبْرِيلُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاعَدْتَنِي فَجَلَسْتُ لَكَ فَلَمْ تَأْتِ، فَقَالَ: مَنَعَنِي الْكَلْبُ الَّذِي كَانَ فِي بَيْتِكَ، إِنَّا لَا نَدْخُلُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبُ وَلَا صُورَةٌ
'এক সময় জিবরাইল রাসুলুল্লাহ-এর নিকট আসার ওয়াদা করলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তিনি আসলেন না। তখন রাসুলুল্লাহ-এর হাতে একটি লাঠি ছিল, তা ফেলে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত দূতগণ ওয়াদা খেলাফ করেন না। অতঃপর তিনি এদিক সেদিক তাকালেন এবং চৌকির নিচে একটা কুকুরের বাচ্চা দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, আয়িশা, এখানে কুকুর কখন ঢুকেছে? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি জানি না। রাসুলুল্লাহ-এর নির্দেশে তা বের করে দেওয়া হলো। তখনই জিবরাইল আসলেন। রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন,
আপনি আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন, আর আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু আপনি আসেননি! জিবরাইল বললেন, যে কুকুরটা আপনার ঘরে ছিল সেটাই আমাকে আসতে বাধা দিয়েছিল। কেননা, যে ঘরে কুকুর কিংবা ছবি থাকে, সে ঘরে আমরা প্রবেশ করি না। ৬৯২
এ সম্পর্কে আরও অনেক হাদিস রয়েছে। প্রতিটি হাদিস ঘরে ছবি রাখা ও ভাস্কর্য স্থাপন করাকে হারাম প্রমাণিত করে। পরবর্তীকালে সময়ই এ হারামকরণের হিকমত ও রহস্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে আমাদের সামনে। বিশেষ করে বর্তমান যুগে; যখন মুনাফিক, দুষ্ট ও প্রবৃত্তিপূজারি লোকেরা পাপাচারের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে এবং তাদের পাপাচারের ওপর অটল থাকার জন্য মানুষের সামনে তা উত্তমরূপে উপস্থাপন করছে—এ যুগে ছবি ও ভাস্কর্যকে তাদের অপকর্মের সমর্থন আদায়ের মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে তারা। জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর তাদের ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে মানুষের সামনে তাদের মডেল হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্মান, মর্যাদা ও উপাসনার আসনে বসানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। গরিবের পেট মেরে এসব ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণের খরচ জোগাড় করা হয়। অর্থাৎ গরিবের করের টাকা দিয়ে অথবা গরিবদের মৌলিক অধিকার পূরণ না করে এসব ফালতু খাতে রাষ্ট্রের টাকা উড়িয়ে চলছে তারা। তাই বলা যায়, রাসুলুল্লাহ ছবি তোলা ও ভাস্কর্য নির্মাণ করাকে কেন নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার হিকমত ও রহস্য বর্তমান সময় সবার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
পনেরো শতক ধরে চলে আসা শিরক ও জাহিলিয়াত বিতাড়ন করে একত্ববাদের আকিদা নিয়ে ইসলাম আগমন করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিভিন্ন নেতা, গুণীজন, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক ইত্যাদি প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামে সেই বিতাড়িত শিরক ও জাহিলিয়াত আবার আসতে শুরু করেছে মুসলমানদের জীবনে। অথচ ইসলামি সমাজ একটি একত্ববাদী সমাজ। এখানে চূড়ান্ত সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার আসন ইসলামি সমাজে নেই।
কুকুর পালনের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান হলো, শিকারের কাজে লাগানোর জন্য অথবা গবাদিপশু ও খেত-খামার পাহারা দেওয়ার জন্য কুকুর পালন করা বৈধ। যেমন ইবনে উমর-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
مَنِ اقْتَنَى كَلْبًا، إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ، أَوْ مَا شِيَةٍ، نَقَصَ مِنْ أَجْرِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ
'যে ব্যক্তি গবাদি পশুর রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা শিকারের কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো কারণে কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে দুই কিরাত করে নেকি হ্রাস পায়। '৬৯৩
পক্ষান্তরে পশ্চিমাদের মতো ঘরের ভেতর কুকুর পোষা, তাদের আলাদা যত্ন নেওয়া, তাদের জন্য বিশেষ খাবার তৈরি করা, শ্যাম্পু মাখিয়ে গোসল করিয়ে দেওয়া, তাদের জন্য আলাদা বাথরুম রাখা ইত্যাদি বিষয়, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়- এভাবে কুকুর পালন ইসলামে নিষিদ্ধ। আসলে পশ্চিমা সমাজে মানুষের জীবন খুব বেশি বস্তুবাদী হয়ে ওঠায় মানুষ তার স্বজাতির মাঝে এখন আনন্দ ও বিনোদন খুঁজে পায় না। তাদের সমাজে মানুষ মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা পায় না এখন। তাই তারা কুকুর পালন করে, তাদের যত্ন নিয়ে, আদর করে হারানো সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু ইসলামি সমাজে মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, সহমর্মিতা অটুট আছে। তাই প্রকৃত मुसलमानों এ বিষয়গুলো কুকুরের মাঝে খুঁজতে হয় না।
📄 ইসলামি আদব ও শিষ্টাচার অনুযায়ী পানাহার করে
প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, আদব সহকারে পানাহার করা। যখন সে খাবার খেতে বসে, তখন তার মাঝে পানাহারের সেসব আদব দেখা যায়, যা রাসুলুল্লাহ হাদিসে বর্ণনা করেছেন এবং মুসলমানদের তা অর্জন করতে উৎসাহিত করেছেন।
সুতরাং সে বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করে, ডান হাত দিয়ে খায় এবং তার সামনের খাবার থেকে খায় (অর্থাৎ প্লেটের সবখানে হাত ঘোরায় না)। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سْمِ الله، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ
'আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার খাও, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের অংশ থেকে খাবার খাও।'৬৯৪
খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তে ভুলে গেলে বিকল্প হিসাবে بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ (অর্থ: খাবারের শুরু ও শেষ আল্লাহর নামে) এ দুআটি পড়ে। কেননা, হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى، فَإِنْ نَسِيَ أَنْ يَذْكُرَ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى فِي أَوَّلِهِ فَلْيَقُلْ بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ
'যখন তোমাদের কেউ খাবার খাবে, তখন সে আল্লাহর নাম নিয়ে খানা শুরু করবে। যদি শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায়, তখন (স্মরণ আসলে) بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ (অর্থ: খাবারের শুরু ও শেষ আল্লাহর নামে) পড়বে।'৬৯৫
রাসুলুল্লাহ ﷺ খাবারের শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' পড়ার প্রতি খুব বেশি গুরুত্বারোপ করতেন। সাহাবিগণকে এর প্রতি খুব উৎসাহিত করতেন। কেননা, এতে খাবার গ্রহণকারী লোকদের জন্য অনেক কল্যাণ রয়েছে এবং এর মাধ্যমে খাবার ও খাবার গ্রহণকারীদের থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করা হয়।
হুজাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كُنَّا إِذَا حَضَرْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا لَمْ نَضَعْ أَيْدِيَنَا حَتَّى يَبْدَأَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَضَعَ يَدَهُ، وَإِنَّا حَضَرْنَا مَعَهُ مَرَّةً طَعَامًا، فَجَاءَتْ جَارِيَةٌ كَأَنَّهَا تُدْفَعُ، فَذَهَبَتْ لِتَضَعَ يَدَهَا في الطَّعَامِ، فَأَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهَا، ثُمَّ جَاءَ أَعْرَابِيُّ كَأَنَّمَا يُدْفَعُ فَأَخَذَ بِيَدِهِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ الشَّيْطَانَ يَسْتَحِلُّ الطَّعَامَ أَنْ لَا يُذْكَرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ، وَإِنَّهُ جَاءَ بِهَذِهِ الْجَارِيَةِ لِيَسْتَحِلَّ بِهَا فَأَخَذْتُ بِيَدِهَا، فَجَاءَ بِهَذَا الْأَعْرَابِي لِيَسْتَحِلَّ بِهِ فَأَخَذْتُ بِيَدِهِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّ يَدَهُ فِي يَدِي مَعَ يَدِهَا، وفي رواية لمسلم أيضا : ثُمَّ ذَكَرَ اسْمَ اللَّهِ وَأَكَلَ
'যখন আমরা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে খাবারের মজলিসে উপস্থিত হতাম, রাসুলুল্লাহ খাবারের মধ্যে হাত রেখে তা খাওয়া শুরু না করা পর্যন্ত আমরা খাবারে হাত রাখতাম না। একদা আমরা তাঁর সঙ্গে খেতে বসলাম, এ সময় একটি মেয়ে দ্রুতবেগে আসলো, যেন কেউ তার পশ্চাদ্ধাবন করছে। সে খাবারে হাত দিতে যাচ্ছিল। তৎক্ষণাৎ রাসুলুল্লাহ তার হাত ধরে ফেললেন। অতঃপর এক বেদুইন দ্রুতবেগে দৌড়ে আসলো, যেন কেউ তার পশ্চাদ্ধাবন করছে। সে-ও প্লেটে হাত ঢুকিয়ে দিতে উদ্যত হলো। রাসুলুল্লাহ তার হাতও ধরে ফেললেন। অতঃপর তিনি বললেন, যে খাবারে বিসমিল্লাহ পড়া না হয়, তা শয়তানের জন্য হালাল হয়ে যায়। সে এ খাবার নিজের জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে এ মেয়েটিকে নিয়ে আসলো। তাই আমি তার হাত ধরে ফেললাম। অনুরূপভাবে সে এ খাবার নিজের জন্য বৈধ করার জন্য এ বেদুইনকে নিয়ে আসলো। তাই আমি তার হাত ধরে ফেললাম। সে সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এ দুজনের হাতের সাথে শয়তানের হাতও আমার হাতের মুঠোর ভেতর ছিল। তারপর বিসমিল্লাহ পড়ে তিনি খানা শুরু করলেন। '৬৯৬
খাওয়ার দ্বিতীয় আদব হলো, ডান হাত দিয়ে খাওয়া। ইসলামি আদবে দীক্ষিত মুসলমান ডান হাত দিয়ে খাবার খায়, বাম হাতে খায় না। কেননা, অনেক হাদিসে স্পষ্টভাবে ডান হাতে খাওয়ার নির্দেশ এবং বাম হাতে খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।
এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ، وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ، وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ 'তোমাদের কেউ খাবার খেলে ডান হাত দিয়ে খাবে, আর পান করলে ডান হাত দিয়ে পান করবে। কেননা, শয়তান বাম হাতে খায় এবং বাম হাতে পান করে। '৬৯৭
আরেক হাদিসে বলেন:
لَا يَأْكُلَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ بِشِمَالِهِ، وَلَا يَشْرَبَنَّ بِهَا، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ، وَيَشْرَبُ بِهَا، قَالَ: وَكَانَ نَافِعُ يَزِيدُ فِيهَا: وَلَا يَأْخُذُ بِهَا، وَلَا يُعْطِي بِهَا 'তোমাদের কেউই বাম হাতে পানাহার করবে না। কেননা, শয়তান বাম হাতে পানাহার করে। নাফি -এর বর্ণনায় আরও আছে, বাম হাতে কেউ যেন কাউকে কোনো কিছু না দেয় এবং গ্রহণ না করে। '৬৯৮
রাসুলুল্লাহ ﷺ কাউকে বাম হাতে খেতে দেখলে নিষেধ করতেন এবং তাকে খাওয়ার আদব শিক্ষা দিতেন। আর কাউকে অহংকারবশত এরূপ করতে দেখলে আরও জোরালোভাবে নিষেধ করতেন।
সালামা বিন আকওয়া বর্ণনা করেন :
أَنَّ رَجُلًا أَكَلَ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشِمَالِهِ، فَقَالَ: كُلْ بِيَمِينِكَ، قَالَ: لَا أَسْتَطِيعُ، قَالَ: لَا اسْتَطَعْتَ، مَا مَنَعَهُ إِلَّا الْكِبْرُ، قَالَ: فَمَا رَفَعَهَا إِلَى فِيهِ
'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট বসে বাম হাতে খানা খাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেন, ডান হাতে খাও। সে বলল, আমি (ডান হাতে) খেতে পারি না। তখন তিনি (বদদুআ করে) বললেন, কখনো তোমার সে সামর্থ্য না হোক! অহংকারই তাকে ডান হাতে খাওয়া থেকে বিরত রেখেছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর সে কখনো ডান হাত মুখ পর্যন্ত ওঠাতে সক্ষম হয়নি। ৬৯৯
এর কারণ হলো, রাসুলুল্লাহ সকল ক্ষেত্রে ডানকে পছন্দ করেন এবং অন্যদেরও এর প্রতি উৎসাহিত করতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা ইমাম মালিক ও শাইখাইন৭০০ আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِلَبَنٍ قَدْ شِيبَ بِمَاءٍ، وَعَنْ يَمِينِهِ أَعْرَابِيُّ، وَعَنْ شِمَالِهِ أَبُو بَكْرٍ، فَشَرِبَ ثُمَّ أَعْطَى الأَعْرَابِيَّ، وَقَالَ: الأَيْمَنَ فَالأَيْمَنَ
'রাসুলুল্লাহ -এর নিকট পানিমিশ্রিত কিছু দুধ আনা হলো। তাঁর ডানপাশে এক বেদুইন বসা ছিল, আর বামপাশে ছিলেন আবু বকর । রাসুলুল্লাহ পান করার পর বেদুইনকে পান করতে দিলেন এবং বললেন, ডানদিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। '৭০১
আরেকবার তাঁর নিকট পানীয় আনা হলো। তখন তাঁর ডানপাশে একটি বালক (ইবনে আব্বাস) ছিলেন, আর বামপাশে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ ছিলেন।
তিনি পান করার পর বালককে বললেন, এবার পান করার অধিকার তোমার। তুমি কি তোমার অধিকার বড়দের জন্য ছেড়ে দেবে? বালকটি বলল, না, আল্লাহর কসম! আপনার উচ্ছিষ্টের ক্ষেত্রে আমি কাউকে অগ্রাধিকার দিতে রাজি নই, হে আল্লাহর রাসুল।
হাদিসটি সাহল বিন সাদ বর্ণনা করেছেন। তাঁর হাদিসের ভাষ্য নিম্নরূপ:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أُتِيَ بِشَرَابٍ فَشَرِبَ مِنْهُ، وَعَنْ يَمِينِهِ غُلَامٌ، وَعَنْ يَسَارِهِ أَشْيَاخُ، فَقَالَ لِلْغُلَامِ: أَتَأْذَنُ لِي أَنْ أُعْطِيَ هَؤُلَاءِ؟ فَقَالَ الْغُلَامُ: لَا وَاللَّهِ ، لَا أُوثِرُ بِنَصِيبِي مِنْكَ أَحَدًا، قَالَ: فَتَلَّهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي يَدِهِ
'রাসুলুল্লাহ -এর নিকট পানীয় আনা হলো। তিনি সেখান থেকে পান করলেন। তাঁর ডানপাশে একজন বালক ছিল, আর বামপাশে কয়েকজন বয়স্ক লোক ছিলেন। তিনি বালককে বললেন, তুমি কি আমাকে এদের দেওয়ার অনুমতি দেবে? বালকটি বলল, না, আল্লাহর কসম! আমি আপনার পক্ষ থেকে পাওয়া অংশের ব্যাপারে কাউকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেবো না। তখন রাসুলুল্লাহ তা তার হাতে দিয়ে দিলেন।'৭০২
এ সম্পর্কিত আরও অনেক স্পষ্ট নস, প্রমাণ ও উদাহরণ রয়েছে। এগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ডানদিক অবলম্বন করা ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদব। প্রকৃত মুসলমান সকল বিষয়ে ডানদিক অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা ও শিথিলতা করে না। সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়িগণের অভ্যাসও এমনই ছিল। আমিরুল মুমিনিন উমর বিন খাত্তাব ডানদিককে অবলম্বন করার প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। এ বিষয়ে কেউ অবহেলা করলে তাকে একদমই ছাড় দিতেন না।
একদিন তিনি প্রজাদের সার্বিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে বের হলেন। তখন এক ব্যক্তিকে বাম হাতে খেতে দেখে বললেন, আল্লাহর বান্দা, ডান হাতে খাও। তারপর দ্বিতীয়বার তাকে বাম হাতে খেতে দেখলে তাকে চাবুক দিয়ে একটি আঘাত করে বললেন, আল্লাহর বান্দা, ডান হাতে খাও। তৃতীয়বার তাকে বাম হাতে খেতে দেখে চাবুকের একটি বাড়ি দিয়ে গলায় তেজ দিয়ে বললেন, ওহে আল্লাহর বান্দা, ডান হাত দিয়ে খাও। তখন লোকটি উত্তর দিল, হে আমিরুল মুমিনিন, ডান হাত ব্যস্ত (অর্থাৎ কাজ করতে অক্ষম)।
উমর বললেন, কী তার ব্যস্ততা? বলল, মুতার যুদ্ধ তাকে ব্যস্ত করে দিয়েছে (অর্থাৎ মুতার যুদ্ধে হাতটি কেটে গিয়েছে)। তখন উমর কেঁদে দিলেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আহ! তোমাকে অজু কে করিয়ে দেয়? তোমার প্রয়োজনগুলো কে পূরণ করে দেয়? তোমার সকল বিষয়ে কে তোমাকে সহযোগিতা করে? তারপর লোকটির প্রতি ইনসাফ করতে এবং তার বিশেষ যত্ন নিতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিলেন।
প্রজাদের মাঝে একজন ব্যক্তির আচরণে ইসলামি শিষ্টাচারের এই একটি অংশ (ডান অবলম্বন করা) না দেখে উমর যা করলেন, তা এ অংশের গুরুত্বকে আরও বেশি দৃঢ় করে। উমর আদব ও শিষ্টাচারের এ অংশটিকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এর ব্যাপারে কোনো ধরনের শিথিলতা তিনি বরদাশত করতেন না।
এ পরিচ্ছেদে সেসব মুসলমানের কথা উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি, যারা পশ্চিমাদের খাবার রীতি অনুসরণ করে। রীতিটা হলো, খাওয়ার সময় চামচ রাখবে বাম হাতে, আর ছুরি রাখবে ডান হাতে, যাতে ডান হাতে কেটে বাম হাতে খেতে পারে। কোনোকিছু না ভেবেই মুসলমানরা পশ্চিমাদের এ রীতির অনুসরণ করছে। এভাবে তারা যে বাম হাতে খেয়ে ধর্মের বিরোধিতা করছে, তা তাদের মাথায় আসে না। ছুরিটা বাম হাতে রেখে, চামচ ডান হাতে নেওয়ার সামান্য কষ্টটুকু তারা করতে চায় না; পাছে পশ্চিমাদের বেঁধে দেওয়া খাবার-রীতির উল্টো হয়ে না যায়! এটা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে مسلمانوں পরাজয়ের অন্যতম ফল। আমাদের মানসিকতাই এমন হয়ে গেছে যে, পশ্চিমারা যা করে আমাদেরও তাই করতে হবে। এতে আমাদের ধর্মের রীতিনীতি গোল্লায় গেলে যাক। কিন্তু প্রকৃত মুসলমান এমন নয়। সে সকল বিষয়ে ইসলামি রীতিকেই অনুসরণ করে। পাশ্চাত্য রীতির এমন অন্ধ ও পরাজিতের অনুকরণ তার মাঝে নেই।
প্রকৃত মুসলমান সর্বদা ডান হাতে খাবার গ্রহণে থাকে বদ্ধপরিকর। অন্যদেরও এর প্রতি দাওয়াত দেয়। এমন কোনো অনুষ্ঠানে যদি সে উপস্থিত হয়, যেখানে সবাই পশ্চিমাদের থেকে আমদানিকৃত রীতি অনুযায়ী খাবার খাচ্ছে, সেখানে সে ইসলামি রীতি অনুযায়ী ডান হাতে খাবার খেতে লজ্জাবোধ করে না। উল্টো সে দ্বীনের প্রতি উদাসীন ও অবহেলাকারী লোকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে। রাসুলুল্লাহ-এর পানাহারের সুন্নাত ডান হাতে পানাহার করার প্রতি তাদের উৎসাহিত করে।
পানাহারের তৃতীয় আদব হলো, নিজের সামনে থেকে খাওয়া। অসংখ্য হাদিসে স্পষ্টভাবে এ নির্দেশ এসেছে।
উমর বিন আবু সালামা বর্ণনা করেন:
كُنْتُ غُلَامًا فِي حَجْرٍ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانَتْ يَدِي تَطِيشُ فِي الصَّحْفَةِ، فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا غُلَامُ، سَمَّ اللهَ، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ
'আমি বালক অবস্থায় রাসুলুল্লাহ-এর তত্ত্বাবধানে ছিলাম। খাওয়ার সময় আমার হাত প্লেটের সবখানে ঘুরত। তাই রাসুলুল্লাহ আমাকে বললেন, বালক, (খাওয়ার শুরুতে) বিসমিল্লাহ বলবে, ডান হাতে খাবে এবং তোমার সামনে থেকে খাবে।'৭০৩
প্রকৃত মুসলমান যখন খাবার খায়, তখন খুবই নম্রতা ও ভদ্রতার সহিত খায়। রাসুলুল্লাহ-ও এভাবেই খেতেন। তিনি খাবার খেতেন তিন আঙুলে। পুরো হাত খানার মাঝে ডুবিয়ে দিতেন না, যেন অন্যদের খারাপ না লাগে।
এ সম্পর্কে কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْكُلُ بِثَلَاثِ أَصَابِعَ، فَإِذَا فَرَغَ لَعِقَهَا
'রাসুলুল্লাহ ﷺ তিন আঙুলে খাবার খেতেন। আর খাওয়া শেষ হলে আঙুলগুলো চেটে খেতেন। '৭০৪
রাসুলুল্লাহ ﷺ খাওয়ার পর আঙুল ও প্লেট চেটে খেতে নির্দেশ দিতেন। জাবির থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِلَعْقِ الْأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ، وَقَالَ: إِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيِّهِ الْبَرَكَةُ
'নবিজি ﷺ আঙুল ও প্লেট চেটে খেতে নির্দেশ দিতেন এবং বলতেন, খাবারের কোন অংশে বরকত নিহিত রয়েছে, তা তো তোমরা জানো না (তাই খাবারের কোনো অংশই ফেলে দেওয়া উচিত নয়)। '৭০৫
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَكَلَ طَعَامًا لَعِقَ أَصَابِعَهُ الثَّلَاثَ، وَقَالَ: إِذَا مَا وَقَعَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الْأَذَى وَلْيَأْكُلْهَا، وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ، وَأَمَرَنَا أَنْ نَسْلِتَ الصَّحْفَةَ، وَقَالَ: إِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيَّ طَعَامِكُمُ البَرَكَةُ
'নবিজি খাবার শেষ করে তিনটি আঙুল চেটে খেতেন। নবিজি আরও বলেছেন, যখন তোমাদের কারও লুকমা নিচে পড়ে যায়, সে যেন ময়লা দূর করে তা খেয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য ফেলে না রাখে। তিনি আমাদের আরও নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন খাবারের থালা ভালো করে চেটে খেয়ে নিই। আর বলেছেন, কেননা, তোমাদের জানা নেই যে, তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত নিহিত রয়েছে। '৭০৬
'রাসুলুল্লাহ-এর এ নির্দেশনায় খাবারের বরকত অনুসন্ধানের বিষয়টি তো আছেই, তার পাশাপাশি হাত ও পাত্র পরিষ্কার করার প্রতিও উৎসাহ পাওয়া যায়। তা ছাড়া খাওয়ার পর হাত ও পাত্র ভালো করে পরিষ্কার করে ফেলা পরিচ্ছন্ন ও সভ্য লোকের স্বভাবের অনুকূল। পশ্চিমারা পনেরো শত বছর পর এসে রাসুলুল্লাহ-এর এ উত্তম অভ্যাসটি গ্রহণ করছে। ফিরিঙ্গিরাও এখন খানা শেষ হওয়ার পর প্লেট খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেয়।
প্রকৃত মুসলমান-যার ভেতর ইসলামি শিষ্টাচার আছে-খাওয়ার সময় ছপছপ শব্দ করে না। খানা চিবানোর সময় শব্দ করে না। কারণ, এগুলো দেখতে খারাপ লাগে। মুখে বড় বড় লুকমা দেয় না। কেননা, এটাও খুব বিশ্রি দেখায়।
যখন খাওয়া শেষ হয়, তখন রাসুলুল্লাহ-এর শিখিয়ে দেওয়া বাক্য বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।
এ সম্পর্কে আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ যখন তাঁর দস্তরখান উঠিয়ে ফেলতেন, তখন বলতেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ، غَيْرَ مَكْفِيَّ وَلَا مُوَدَّعٍ وَلَا مُسْتَغْنِّى عَنْهُ، رَبَّنَا
'পবিত্র বরকতময় অনেক অনেক প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে আমাদের রব, এ থেকে কখনো বিমুখ হতে পারব না, বিদায় নিতে পারব না এবং এ থেকে অমুখাপেক্ষীও হতে পারব না।' ৭০৭
মুআজ বিন আনাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ أَكَلَ طَعَامًا فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا، وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي، وَلَا قُوَّةٍ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
'যে ব্যক্তি খাবার শেষে الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا، وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي، وَلَا قُوَّةٍ (অর্থ : সকল প্রশংসা সে আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের এ খাবার খাইয়েছেন এবং আমাদের সামর্থ্য ও শক্তির বাইরে থেকে রিজিক দান করেছেন।) এ দুআটি পড়বে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। '৭০৮
প্রকৃত মুসলমান খাবারের দোষ ধরে না, তা যেমনই হোক না কেন। কেননা, এটাই রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: مَا عَابَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا قَطُّ، كَانَ إِذَا اشْتَهَى شَيْئًا أَكَلَهُ، وَإِنْ كَرِهَهُ تَرَكَهُ
'রাসুলুল্লাহ কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেননি। কোনো খাবার পছন্দ হলে তা খেতেন, আর পছন্দ না হলে রেখে দিতেন। '৭০৯
পান করা সম্পর্কেও ইসলামের আদব রয়েছে। ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য উত্তম আদব প্রণয়ন করেছে।
সুতরাং প্রকৃত মুসলমান 'বিসমিল্লাহ' বলে দুই বা তিন নিশ্বাসে পান করে। পাত্রের ভেতর নিশ্বাস ফেলে না। যথাসম্ভব বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করে না। পানীয়তে ফুঁক দেয় না। বসে পান করে, যদি তা সম্ভব হয়।
দুই বা তিন নিশ্বাসে পান করা রাসুলুল্লাহ থেকে প্রমাণিত। যেমন আনাস বলেন: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَنَفَّسُ فِي الشَّرَابِ ثَلَاثًا 'রাসুলুল্লাহ পান করার সময় তিনবার নিশ্বাস নিতেন। '৭১০
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ এক নিশ্বাসে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
لَا تَشْرَبُوا وَاحِدًا كَشُرْبِ البَعِيرِ، وَلَكِنْ اشْرَبُوا مَثْنَى وَثُلَاثَ، وَسَمُّوا إِذَا أَنْتُمْ شَرِبْتُمْ، وَاحْمَدُوا إِذَا أَنْتُمْ رَفَعْتُمْ
'উটের মতো এক নিশ্বাসে পান করো না। দুই বা তিন নিশ্বাসে পান করো। আর পান করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলবে এবং শেষে আল- হামদুলিল্লাহ বলবে।'৭১১
রাসুলুল্লাহ পানিতে ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি বর্ণনা করেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ النَّفْخِ فِي الشُّرْبِ فَقَالَ رَجُلٌ: القَذَاةُ أَرَاهَا فِي الإِنَاءِ؟ قَالَ: أَهْرِقُهَا، قَالَ: فَإِنِّي لَا أَرْوَى مِنْ نَفْسٍ وَاحِدٍ؟ قَالَ: فَأَبِنِ القَدَحَ إِذَنْ عَنْ فِيكَ
'নবিজি পানিতে ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন। এক ব্যক্তি বলল, পানিতে ময়লা দেখা গেলে কী করব? নবিজি বললেন, তা ফেলে দেবে। লোকটি বলল, এক নিশ্বাসে আমার প্রাণ ভরে না। নবিজি বললেন, পাত্রকে তোমার মুখ থেকে সরিয়ে নেবে, তারপর প্রাণভরে নিশ্বাস নেবে।'৭১২
পান করার আদব-সম্পর্কিত হাদিসসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, পান করার সুন্দর ও আদর্শ পদ্ধতি হলো, যথাসম্ভব বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবে না এবং যথাসম্ভব বসে পান করবে। এটাই পান করার সঠিক পদ্ধতি। যদিও বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করা ও দাঁড়িয়ে পান করা জায়িজ। কেননা, রাসুলুল্লাহ থেকে এভাবে পান করাটাও প্রমাণিত আছে।
টিকাঃ
৭০০. মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় ইমাম বুখারি রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ.-কে একসাথে শাইখাইন বলা হয়। (অনুবাদক)
📄 সালামের প্রসার করে
মুসলমানের অন্যতম সামাজিক আদব হলো, সালামের প্রসার করা। সালামের প্রসার হলে সমাজের রূপ পাল্টে যায়। তবে সালাম করা নিছক একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইসলামের এমন এক মৌলিক আদব, যার নির্দেশ সরাসরি আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে দিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ অসংখ্য হাদিসে তার ফজিলত ও বিধিবিধান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যার ফলে মুহাদ্দিসগণ হাদিসের কিতাবে সালামের জন্য স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় রচনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সালামের নির্দেশ দিয়ে বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ কোরো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না করো। '৭১৩
আরেক আয়াতে সালামের জবাব সালামের চেয়ে উত্তমভাবে অথবা সমানভাবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এজন্য সালাম শুনলে সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। অবহেলা করা জায়িজ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
'আর তোমাদের যদি কেউ সালাম করে, তাহলে তোমরাও তাকে সালাম দাও; তার চেয়ে উত্তম সালাম অথবা তারই মতো জবাব দাও। '৭১৪
হাদিসেও সালাম দেওয়ার প্রতি খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
আমর বিন আস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرُ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفُ
'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করল, সর্বোত্তম ইসলাম কী? তিনি উত্তরে বললেন, খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম করা।' ৭১৫
সালাম করা সেই বিশেষ সাত অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত, যে অসিয়ত সামাজিক জীবনে আবশ্যিকভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সাহাবিগণ সে নির্দেশ পালনের পর তাবিয়িগণও তা নিজেদের জন্য আবশ্যিকভাবে পালন করেছিলেন।
সে সাতটি অসিয়ত বারা বিন আজিব কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন :
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعٍ بِعِيَادَةِ المَرِيضِ، وَاتَّبَاعِ الجنائِزِ، وَتَشْمِيتِ العَاطِسِ، وَنَصْرِ الضَّعِيفِ، وَعَوْنِ المَظْلُومِ، وَإِفْشَاءِ السَّلَامِ، وَإِبْرَارِ المُقْسِمِ
'রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাতটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। যথা : এক. রোগী দেখতে যাওয়া, দুই. জানাজার অনুসরণ করা (মৃত ব্যক্তিকে জানাজা ও দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে চলা), তিন. হাঁচিদাতার জবাব দেওয়া (হাঁচিদাতা আল-হামদুলিল্লাহ বললে তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা), চার. দুর্বলের সাহায্য করা, পাঁচ. মাজলুমের সহযোগিতা করা, ছয়. সালামের প্রসার করা, সাত. প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা।' ৭১৬
রাসুলুল্লাহ ﷺ সালামের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। অসংখ্য হাদিসে সালামের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। কারণ, সালামের কারণে মানুষের হৃদয়সমূহে ভালোবাসার ফোয়ারা প্রবাহিত হয়। সমাজে পরস্পরের মাঝে হৃদ্যতা, নৈকট্য ও নির্মল সম্পর্ক তৈরি হয়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাম করাকে ভালোবাসার উপকরণ বলেছেন, যে ভালোবাসা মানুষের মাঝে ইমানের সঞ্চার করে, যা তাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَفَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
'সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মাঝে ইমান থাকবে। আর তোমাদের মাঝে ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) ইমান আসবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন আমল বলে দেবো না, যা করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (সে বিষয়টি হলো,) তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার করো।'৭১৭
সবার আগে যে সালাম দেয়, তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মর্যাদার সর্বাধিক যোগ্য বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِاللَّهِ مَنْ بَدَأَهُمْ بِالسَّلَامِ
'আল্লাহর কাছে (সন্তুষ্টি, নিয়ামত ও অনুগ্রহ পাওয়ার) সর্বাধিক যোগ্য ওই ব্যক্তি, যে সবার আগে সালাম দেয়।'৭১৮
এজন্য আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সকালে বাজারে যেতেন এবং যার সাথেই সাক্ষাৎ হতো, তাকেই সালাম দিতেন।
'একদিন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি বাজারে কী করেন? আপনাকে তো কিছু বিক্রি করতে বা কোনো বস্তুর দাম জিজ্ঞেস করতে ও দরাদরি করতে দেখা যায় না। বাজারের কোনো মজলিসেও আপনি বসেন না। তিনি উত্তর দিলেন, আমি সকালে এজন্যই বাজারে যাই, যেন যাদের সাথে দেখা হবে, তাদের প্রত্যেককে সালাম করতে পারি।'৭১৯
ইসলামি সমাজে সম্ভাষণ জানানোর জন্য একটিই বাক্য রয়েছে। প্রকৃত মুসলমান এ বাক্যটির মাধ্যমে সালাম করে। তা হলো : السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ (অর্থ : আপনাদের ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক)। যে সালাম দেবে, সে এভাবেই বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করে সালাম করবে, যদিও সালাম একজনকে দেওয়া হোক। আর উত্তরদাতা বলবে, وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ (অর্থ : আপনাদের ওপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবর্তীর্ণ হোক)।
প্রকৃত মুসলমান সম্ভাষণের এ ইসলামি বাক্যের জায়গায় পূর্বেকার যুগের বাক্য - صَبَاحًا (সুপ্রভাত) এবং বর্তমান সময়ে প্রচলিত সম্ভাষণ صَبَاحَ الْخَيْرِ। (শুভ সকাল), গুড মর্নিং ইত্যাদি বাক্য বলে না।
ইসলামের সম্ভাষণ-বাক্যটি স্বয়ং আল্লাহ-ই তাঁর মাখলুকের জন্য চয়ন করেছেন। আদম -কে সৃষ্টি করার পর তাঁকে এ বাক্য শিখিয়ে দিলেন এবং ফেরেশতাগণকে সে বাক্যের মাধ্যমে সম্ভাষণ জানানোর নির্দেশ দিলেন। আর এটাকেই সর্বযুগে সর্বজায়গায় তাঁর সন্তানদের পরস্পর সম্ভাষণের বাক্য হিসাবে নির্ধারণ করে দিলেন। কারণ, এ বাক্যটিতে শান্তি কামনা করার কথা আছে, যা সর্বযুগে ও সকল জায়গায় মানবজাতির একান্ত কাঙ্ক্ষিত বস্তু। সম্ভাষণের এ আদি বাক্যটির ওপর এখনও অটল আছে একমাত্র মুসলিম উম্মাহ। তারা এতে কোনোরূপ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেনি।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ: اذْهَبْ فَسَلَّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ، وَهُمْ نَفَرٌ مِنَ الْمَلَائِكَةِ جُلُوسٌ، فَاسْتَمِعْ مَا يُجِيبُونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ، قَالَ: فَذَهَبَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللهِ، قَالَ فَزَادُوهُ: وَرَحْمَةُ اللهِ
'আল্লাহ তাআলা আদম-কে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের উপবিষ্ট একটি দল দেখিয়ে বললেন, যাও, ওদের সালাম করো। আর তারা তোমাকে কী উত্তর দেয়, তা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
কেননা, এটিই তোমার ও তোমার সন্তানদের সম্ভাষণ হবে। তখন আদম বললেন, (السَّلَامُ عَلَيْكُمْ ) অর্থাৎ আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)। ফেরেশতারা উত্তরে বললেন, (السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ الله ) (আপনার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)। তাঁরা (وَرَحْمَةُ اللهِ ) (আল্লাহর রহমত) শব্দটি বাড়িয়ে উত্তর দিয়েছেন। '৭২০
এ হাদিস থেকে বুঝা গেল, এ বাক্যটিই পবিত্র সম্ভাষণের বাক্য। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ এটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আমাদের সম্ভাষণের জন্য তাঁর নির্ধারিত বাক্যটি ব্যবহার করতে এবং এটি ব্যতীত অন্যগুলো পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ تَحِيَّةٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً 'অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করো, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র সম্ভাষণ। '৭২১
এ কারণে জিবরাইল যখন আয়িশা-কে সালাম দিয়েছিলেন, তখন এ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। আর উত্তরে আয়িশা-ও এ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ لَهَا: يَا عَائِشَةُ هَذَا جِبْرِيلُ يَقْرَأُ عَلَيْكِ السَّلَامَ، فَقَالَتْ: وَعَلَيْهِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে নবিজি বললেন, জিবরাইল তোমাকে সালাম দিচ্ছেন। আয়িশা বলেন, তখন আমি বললাম, (তাঁর উপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক)। '৭২২
ইসলাম সালাম দেওয়ার বিভিন্ন নিয়ম-কানুনও প্রণয়ন করেছে। প্রকৃত মুসলমান তার সামাজিক জীবনে সেসব নিয়ম-কানুন মেনে চলতে চেষ্টা করে। সহিহ বুখারিতে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে সালামের নিয়ম- কানুন সংক্ষেপে বিবৃত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى المَاشِي، وَالمَاشِي عَلَى القَاعِدِ، وَالقَلِيلُ عَلَى الكثير - وفي رواية للبخاري - يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الكَبِيرِ
'আরোহী ব্যক্তি পদাতিক ব্যক্তিকে সালাম দেবে। চলন্ত ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেবে। কমসংখ্যক লোক বেশিসংখ্যক লোককে সালাম দেবে। '৭২৩ সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় এটাও আছে, 'ছোট বড়কে সালাম দেবে।'৭২৪
পুরুষদের মতো নারীদেরও সালাম দেওয়া যায়। এর স্বপক্ষে দলিল হলো, আসমা বিনতে ইয়াজিদ-এর হাদিস : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ فِي الْمَسْجِدِ يَوْمًا وَعُصْبَةٌ مِنَ النِّسَاءِ قُعُودُ، فَأَلْوَى بِيَدِهِ بِالتَّسْلِيمِ
'রাসুলুল্লাহ একদিন মসজিদে গমন করলেন। তখন মহিলাদের একটি দল সেখানে বসা ছিল। তিনি তাদের উদ্দেশে হাত উত্তোলন করে সালাম দিলেন। '৭২৫
বাচ্চাদেরও সালাম দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে তাদের সালামের শিক্ষা দেওয়াটাও হয়ে যায়।
আনাস থেকে বর্ণিত আছে:
أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَقَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَفْعَلُهُ
'তিনি (আনাস) বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, নবিজি এমন করতেন।'৭২৬
সালাম দেওয়ার আরেকটি আদব হলো, রাতের বেলা নরম, কোমল ও নিচু স্বরে সালাম দেওয়া। যেন শুধু জাগ্রতরা শুনতে পায়, আর ঘুমন্তরা জেগে না যায়।
মিকদাদ থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ -এর ব্যাপারে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
'আমরা নবিজি-এর দুধের অংশ তাঁর জন্য তুলে রাখতাম। তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন, যেন ঘুমন্তরা না জাগে আর জাগ্রতরা শুনতে পায়। (সেদিনও) নবিজি আসলেন এবং পূর্বেকার মতো সালাম দিলেন...।'৭২৭
কোনো মজলিসে প্রবেশ করার সময় এবং সেখান থেকে উঠে আসার সময় মোট দুবার সালাম দিতে হয়।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ، فَلْيُسَلَّمْ فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ، فَلْيُسَلِّمْ فَلَيْسَتِ الْأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الْآخِرَةِ
'যখন তোমরা কোনো মজলিসে প্রবেশ করবে, তখন সালাম করবে। আবার সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময়েও সালাম করবে। প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালামের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় (অর্থাৎ উভয় সালামের গুরুত্ব সমান)।'৭২৮