📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অভাবগ্রস্তকে সময় দেয়

📄 অভাবগ্রস্তকে সময় দেয়


প্রকৃত মুসলমান লেনদেনের ক্ষেত্রে উদারমনস্ক ও চরিত্রবান হয়। গরিব অভাবী মানুষ থেকে ঋণ পেয়ে থাকলে আদায় করার ক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় দেয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ 'যদি ঋণী ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। '৬৬৯
ইসলাম মুসলমানকে হকের অধিকারী হওয়ার পূর্বে একজন মানুষ হতে বলে। তাই যখন সে তার ঋণগ্রহীতা ভাইয়ের মাঝে অভাব দেখতে পায়, তখন তার ওজর কবুল করে নেয় এবং সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দেয়। অথবা পারলে ঋণের কিছু অংশ বা পুরো অংশ ক্ষমা করে দেয়। এর মাধ্যমে সে মূলত আল্লাহর নির্দেশই পালন করে। তাই তার এ উত্তম আমলের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে তাকে মুক্তি দান করবেন এবং আরশে আজিমের ছায়াতলে স্থান দেবেন। সেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُنْجِيَهُ اللهُ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، فَلْيُنَفِّسْ عَنْ مُعْسِرٍ، أَوْ يَضَعْ عَنْهُ 'যে ব্যক্তি কামনা করে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন, সে যেন অভাবী ঋণগ্রস্তকে সময় দেয় অথবা ঋণের কিছু অংশ বা পুরো অংশ ক্ষমা করে দেয়। '৬৭০
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا، أَوْ وَضَعَ لَهُ ، أَظَلَّهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ تَحْتَ ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ 'যে ব্যক্তি অভাবী ঋণগ্রস্তকে সময় দেয় অথবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। '৬৭১
এ বিষয়ের ওপর অনেক আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি আয়াত ও হাদিস এ কথা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে, ঋণদাতা যদি অভাবী ঋণগ্রহীতাকে সময় দেয় বা ঋণ মাফ করে দেয়, তাহলে তার এ আমল আল্লাহর নিকট নিষ্ফল প্রতিপন্ন হবে না। এর সাওয়াব তার আমলনামায় অবশ্যই লিপিবদ্ধ হবে। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের কষ্ট, দুর্দশা ও ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দান করবেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো।
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
كَانَ رَجُلٌ يُدَايِنُ النَّاسَ، فَكَانَ يَقُولُ لِفَتَاهُ: إِذَا أَتَيْتَ مُعْسِرًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ، لَعَلَّ اللَّهَ يَتَجَاوَزُ عَنَّا، فَلَقِيَ اللَّهَ فَتَجَاوَزَ عَنْهُ
'এক ব্যক্তি মানুষকে ঋণ দিত, আর তার কর্মচারীকে বলে রাখত, কোনো অভাবী লোকের কাছে যদি ঋণ আদায় করতে যাও, তাহলে তার ঋণ মাফ করে দেবে। আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে আমাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন। এরপর লোকটি আল্লাহর সাথে মিলিত হলো (মৃত্যুবরণ করল) এবং সত্যিই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। '৬৭২
আবু মাসউদ বদরি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
حُوسِبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ: قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল সচ্ছল। তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য সে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিত। রাসুলুল্লাহ বললেন, আল্লাহ বললেন, এ ব্যাপারে (অর্থাৎ ক্ষমা করার ব্যাপারে) আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও। '৬৭৩
হুজাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أُتِيَ اللهُ بِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِهِ آتَاهُ اللهُ مَالًا ، فَقَالَ لَهُ: مَاذَا عَمِلْتَ فِي الدُّنْيَا؟ قَالَ: وَلَا يَكْتُمُونَ اللهَ حَدِيثًا ، قَالَ: يَا رَبِّ آتَيْتَنِي مَالَكَ، فَكُنْتُ أُبَايِعُ النَّاسَ، وَكَانَ مِنْ خُلُقِي الْجَوَازُ، فَكُنْتُ أَتَيَسَّرُ عَلَى الْمُوسِرِ، وَأُنْظِرُ الْمُعْسِرَ ، فَقَالَ اللهُ: أَنَا أَحَقُّ بِذَا مِنْكَ، تَجَاوَزُوا عَنْ عَبْدِي، فَقَالَ عُقْبَةُ بْنُ عَامِرٍ الْجُهَنِيُّ، وَأَبُو مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيُّ، هَكَذَا سَمِعْنَاهُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে কোনো এক বান্দাকে তাঁর নিকট উপস্থিত করা হলো, যাকে তিনি ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুনিয়াতে তুমি কী কাজ করেছ? হুজাইফা বলেন, অথচ লোকেরা আল্লাহর নিকট থেকে কোনো কথাই গোপন করতে পারে না। উত্তরে সে বলল, হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে আপনার ধনভান্ডার থেকে দান করেছিলেন, আমি লোকদের সাথে কেনাবেচা করতাম। আর আমার দেনাদারদের সাথে উদার ব্যবহার করাই ছিল আমার অভ্যাস। আমি সচ্ছল ব্যক্তির সাথে উদার ব্যবহার করতাম এবং গরিব অসচ্ছল ব্যক্তিকে মাফ করে দিতাম। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তখন বললেন, ক্ষমা করার ব্যাপারে তোমার চেয়ে আমি অধিক হকদার। (হে ফেরেশতাগণ,) আমার এ বান্দাকে তোমরা মাফ করে দাও। উকবা বিন আমির জুহানি ও আবু মাসউদ আনসারি বলেন, আমরাও রাসুলুল্লাহ -এর মুখে এরূপই শুনেছি। '৬৭৪

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 যাচন ও ভিক্ষাবৃত্তি করে না

📄 যাচন ও ভিক্ষাবৃত্তি করে না


প্রকৃত মুসলমান স্বনির্ভর ও অমুখাপেক্ষী হয়। মানুষের কাছে হাত পাতে না। অভাব-অনটনের সময় ধৈর্যধারণ করে। যতটুকু পারে নিজে চেষ্টা করে কামাই করে। কারও নিকট অনুগ্রহ ও সাহায্য প্রার্থনা করে না। কারণ, তার দ্বীন তাকে এ তুচ্ছ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয় এবং ধৈর্য ধরতে বলে। তা ছাড়া সে বিশ্বাস করে, মানুষের কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করলে এবং স্বনির্ভর ও ধৈর্যশীল থাকতে চাইলে আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করেন এবং সাহায্য করেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللهُ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
'আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পরের কাছে হাত পাতার অভিশাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। আর যে ব্যক্তি স্বনির্ভর হতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বনির্ভরতা দান করেন। আর যে ব্যক্তি ধৈর্যের পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যধারণের ক্ষমতা দান করেন। বস্তুত, আল্লাহর দেওয়া দানসমূহের মধ্যে ধৈর্যশক্তির চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত দান আর কিছু নেই।'৬৭৫
ইসলাম ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার রেখেছে এবং ধনীদের নিকট ইসলাম দাবি পেশ করেছে, তারা যেন কোনো ধরনের খোঁটা না দিয়ে, কষ্ট না দিয়ে এবং অমর্যাদা না করে গরিবদের সে হক ও অধিকার আদায় করে দেয়। অপরদিকে গরিবদের থেকে ইসলাম প্রত্যাশা করে, তারা যেন ধনীদের সম্পদে তাদের যে হক রয়েছে, তার প্রতি মুখাপেক্ষী না থাকে। আরও ঘোষণা দিয়েছে, ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। তাই প্রকৃত মুসলমানকে সব সময় চেষ্টা করতে হবে, তার হাত যেন নিচের হাত না হয়। এটাই তার জন্য যথোপযুক্ত। এজন্য যাদের নিকট ধন-সম্পদ কম, তাদের একটু বেশি মেহনত করে নিজের প্রয়োজনের উপকরণ জোগাড় করতে হবে। সদকা ও অনুদানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না। কারণ, এতে মনুষ্যত্বের মর্যাদা ব্যাহত হয়। এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের সদকা করার প্রতি ও মানুষের নিকট হাত না পাতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেছেন :
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى ، فَاليَدُ الْعُلْيَا: هِيَ المُنْفِقَةُ، وَالسُّفْلَى: هِيَ السَّائِلَةُ
‘ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। ওপরের হাত হলো দানকারীর হাত, আর নিচের হাত হলো ভিক্ষুকের হাত। '৬৭৬

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ, আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ

📄 সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ, আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ


ইসলামের আলোয় আলোকিত প্রকৃত মুসলমান কোমল স্বভাবের হয়। সে নিজে অন্তরঙ্গ, অন্যরাও তার সাথে অন্তরঙ্গ। মানুষের সাথে অন্তরঙ্গতা ও সম্প্রীতির সাথে মিলেমিশে থাকে। তারাও তার প্রতি অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ হয় এবং তাকে ভালোবাসে। এটি একটি উন্নত সামাজিক চরিত্র। প্রকৃত মুসলমান— যে নিজের মাঝে দ্বীনের বার্তা বহন করে চলে—এ গুণটিকে নিজের ভেতর ফিট করে নেয়। সে বিশ্বাস করে, সমাজের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা ও তাদের ভরসা অর্জন করা একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য এবং তাদের নিকট সত্যের বাণী পৌঁছে দিতে অত্যন্ত সহায়ক। যে সত্য ও আদর্শ সে বহন করে চলছে, তা লোকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হলে অবশ্যই এ গুণ অবলম্বন করতে হবে। কেননা, মানুষ এমন মানুষের কথা শুনতে চায় না, যার সাথে তারা অন্তরঙ্গ নয় এবং যার প্রতি তাদের ভরসা নেই। পক্ষান্তরে যার সাথে তাদের অন্তরঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠতা আছে এবং যার প্রতি তাদের ভরসা আছে, তার কথা শুনতে ও মানতে তারা দ্বিধাবোধ করে না। এজন্য ইসলামের অনেক আয়াত-হাদিসে এ গুণটি অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং যাদের মাঝে গুণটি বিদ্যমান, তাদের একটি বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা ও কিয়ামতের দিন তাঁর নিকট অবস্থান করার নিয়ামত লাভে ধন্য হবে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، قَالَ الْقَوْمُ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: أَحْسَنُكُمْ خُلُقًا وزادت بعض الروايات : الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافُهُمْ الَّذِينَ يَأْلَفُونَ وَيُؤْلَفُونَ
'আমি কি তোমাদের বলব, কারা আমার নিকট অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার অধিক নিকটবর্তী হবে? উপস্থিত সাহাবিগণ চুপ করে রইলেন। অতঃপর আরও তিনবার অথবা দুবার বললেন। তখন সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল। বললেন, (তারা হলো,) তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।' আরেকটি রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে, 'আর যাদের অন্তর প্রশস্ত, মানুষের সাথে তারা অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তাদের সাথে অন্তরঙ্গ।'৬৭৭
মুমিনের অন্যতম গুণ হলো, সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ হবে আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ হবে। মানুষকে সে ভালোবাসবে, তারাও তাকে ভালোবাসবে। তাদের প্রতি সে মনোযোগী হবে এবং তারাও তার প্রতি মনোযোগী হবে। মুমিনের মাঝে যদি এ গুণটি না থাকে, তাহলে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তার নিকট থেকে কোনো কল্যাণেরও আশা করা যাবে না।
এজন্য হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
الْمُؤْمِنُ يَأْلَفُ وَيُؤْلَفُ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلُفُ، وَلَا يُؤْلَفُ 'মুমিন সে ব্যক্তি, যে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ। আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ নয় এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ নয়—এমন ব্যক্তির মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।'৬৭৮
রাসুলুল্লাহ মানুষের সাথে উত্তম আচরণের মাধ্যমে উম্মাহর জন্য মহান আদর্শরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। উম্মাহকে কথা, কাজ ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সে আদর্শের অনুকরণ করার দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি উম্মাহকে শিখিয়ে দিয়েছেন, কী করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়, কীভাবে তাদের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। রাসুলুল্লাহ ছিলেন সদা হাস্যমুখ, সহজ- সরল ও কোমল স্বভাবের অধিকারী। তিনি রূঢ় ও কঠোর ছিলেন না। কোনো সম্প্রদায়ের নিকট গেলে তাদের মজলিসের শেষে যেখানে জায়গা পেতেন, সেখানে বসতেন এবং অন্যদেরও এমন করার নির্দেশ দিতেন। তাঁর মজলিসে আগত প্রত্যেক সদস্যকে সমানভাবে জায়গা দিতেন। মজলিসে যারা বসত, তাদের কেউ এ কথা মনে করার সুযোগ পেত না যে, এ মজলিসে অন্যজন তার চেয়ে বেশি সম্মান পাচ্ছে। কেউ তাঁর নিকট কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরতে হতো না। সবার সাথে তিনি সহজ-সরল ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর চরিত্র ও দয়া সকল মানুষের জন্য ব্যাপক ও সমান ছিল। এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার জন্য স্নেহশীল এক পিতা। অধিকারের ক্ষেত্রে সবাই তাঁর কাছে সমান ছিল। তাঁর মজলিসে যারা বসতেন, তাদের পরস্পরের মাঝে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একমাত্র তাকওয়ার মাধ্যমে তাদের মর্যাদার তারতম্য হতো। তারা ছিলেন নম্র ও ভদ্র। তারা বড়দের সম্মান করতেন, ছোটদের স্নেহ করতেন, অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
রাসুলুল্লাহ -এর কাছে কোনো কিছুর আশা করে কখনো নিরাশ ও হতাশ হতে হয়নি কাউকে। তিনি তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। এক. অহেতুক বিতর্ক করা, দুই. বেশি কথা বলা, তিন. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ। আর মানুষের ব্যাপারে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতেন। এক. কারও নিন্দা করতেন না, দুই. কাউকে লজ্জা দিতেন না, তিন. কারও দোষ তালাশ করতেন না। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন তাঁর শ্রোতাগণ এমন তন্ময় হয়ে যেতেন, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর যখন তিনি চুপ হতেন, তখন তারা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তাঁরা পরস্পর ঝগড়া করতেন না। তাঁদের হাসিতে তিনি হাসতেন এবং তাঁদের আনন্দে তিনি আনন্দিত হতেন। অপরিচিত মূর্খ ব্যক্তির অবাঞ্ছিত কথা ও প্রশ্নে তিনি ধৈর্য ধরতেন। তিনি তাঁর সাহাবিদের বলতেন, যদি কোনো অভাবীকে তোমরা দেখো, তাহলে তার সাহায্য করবে। তিনি অতিরঞ্জিত প্রশংসা গ্রহণ করতেন না। কেউ তাঁর সাথে কথা বললে তার সম্পূর্ণ কথা শুনতেন। কথার মাঝখানে তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিতেন না।
আয়িশা বর্ণনা করেন যে, তিনি দুষ্ট লোকদের থেকে বেঁচে থাকতেন। তাদের সাথে সুন্দর কথা ও আচরণের মাধ্যমে তাদের দমিয়ে রাখতেন।
এ ধরনের এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন :
ائْذَنُوا لَهُ، فَلَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيرَةِ، أَوْ بِئْسَ رَجُلُ الْعَشِيرَةِ فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ أَلَانَ لَهُ الْقَوْلَ ، قَالَتْ عَائِشَةُ : فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْتَ لَهُ الَّذِي قُلْتَ ، ثُمَّ أَلَنْتَ لَهُ الْقَوْلَ؟ قَالَ: يَا عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ وَدَعَهُ، أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
'তাকে অনুমতি দাও। সে তার বংশের নিকৃষ্ট সন্তান। অথবা বললেন, সে তার গোত্রের নিকৃষ্টতম ভাই। যখন সে প্রবেশ করল, তখন তিনি তার সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বললেন। আমি (আয়িশা ) বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এর সম্পর্কে যা বলার তা বলেছেন, এখন আপনি তার সাথে নম্রভাবে কথা বললেন যে! তিনি বললেন, হে আয়িশা, আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার অশালীন আচরণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার সংস্রব ত্যাগ করে। '৬৭৯
প্রকৃত মুসলমান মানুষের সাথে আচরণে রাসুলুল্লাহ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে, যেন সে সবার নিকট প্রিয়, ঘনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ইসলামি ভীতির সামনে ব্যক্তিগত স্বভাব বিসর্জন দেয়

📄 ইসলামি ভীতির সামনে ব্যক্তিগত স্বভাব বিসর্জন দেয়


প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সমাজে ইসলামি রীতির সামনে ব্যক্তিগত প্রিয় অভ্যাসসমূহ সমর্পণ করে দেয়। এজন্য প্রকৃত مسلمانوں সমাজ সম্পূর্ণরূপে ইসলামি মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
সুতরাং সে স্বর্ণের আংটি পরিধান করে না। কেননা, পুরুষদের জন্য স্বর্ণের আংটি পরিধান করা ইসলামি শরিয়তে হারাম। এক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে রাসুলুল্লাহ ﷺ এ ঘোষণা দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন: يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ 'তোমাদের কেউ কি আগুনের জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় নিতে চাইবে?'৬৮০
তারপর তিনি লোকটির আঙুল থেকে আংটিটি খুলে মাটিতে ফেলে দিলেন। এখানে লোকটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। কারণ, যখন তার সঙ্গীরা তাকে নিক্ষিপ্ত আংটি তুলে নিয়ে বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা উপকৃত হতে বলল, তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এমন বস্তুকে তুলে নেব না, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ নিক্ষেপ করেছেন।
প্রকৃত মুসলমান সোনা ও রুপার পাত্রে পানাহার করে না। রেশমি পোশাক পরিধান করে না। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ অনেক হাদিসে এ থেকে নিষেধ করেছেন। কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো।
হুজাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: وَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَانَا عَنِ الحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَالشَّرْبِ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَقَالَ: هُنَّ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا ، وَهِيَ لَكُمْ فِي الآخِرَةِ 'নবিজি ﷺ আমাদের রেশমি পোশাক পরিধান করতে এবং সোনা ও রুপার পাত্রে পান করতে নিষেধ করেছেন। আর বলেছেন, এগুলো দুনিয়াতে তাদের (কাফিরদের) জন্য, আর আখিরাতে তোমাদের জন্য।'৬৮১
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الَّذِي يَشْرَبُ فِي إِنَاءِ الفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ
'যে ব্যক্তি রুপার পাত্রে পান করে, সে ঘড়ঘড় করে তার পেটের ভেতর জাহান্নামের আগুন ভরে।'৬৮২
মুসলিম শরিফের আরেক বর্ণনায় এসেছে :
أَنَّ الَّذِي يَأْكُلُ أَوْ يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ وفي رواية له : مَنْ شَرِبَ فِي إِنَاءٍ مِنْ ذَهَبٍ، أَوْ فِضَّةٍ، فَإِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارًا مِنْ جَهَنَّمَ
'নিশ্চয় যে ব্যক্তি সোনা ও রুপার পাত্রে খায় এবং পান করে, মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি সোনা বা রুপার পাত্রে পান করে, সে (এর মাধ্যমে) ঘড়ঘড় করে তার পেটের ভেতর জাহান্নামের আগুন ভরে।'৬৮৩
উমর বিন খাত্তাব বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি :
إِنَّمَا يَلْبَسُ الحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا مَنْ لَا خَلَاقَ لَهُ فِي الآخِرَةِ
'(দুনিয়াতে একমাত্র) সে ব্যক্তিই রেশমের পোশাক পরিধান করে, যার জন্য আখিরাতে কোনো অংশ নেই।'৬৮৪
আলি বলেন, আমি দেখেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ ডান হাতে রেশমি কাপড় নিলেন এবং বাম হাতে স্বর্ণ নিলেন, তারপর বললেন :
إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي
'এ দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের ওপর হারাম।'৬৮৫
আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: حُرِّمَ لِبَاسُ الحَرِيرِ وَالذَّهَبِ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي وَأُحِلَّ لِإِنَائِهِمْ 'রেশমি পোশাক আর স্বর্ণ আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে, আর মহিলাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। '৬৮৬
হুজাইফা বলেন : نَهَانَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَأَنْ نَأْكُلَ فِيهَا، وَعَنْ لُبْسِ الحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ 'নবিজি আমাদের সোনা ও রুপার পাত্রে পানাহার করতে এবং রেশমি বস্ত্র পরিধান করতে ও তার ওপর বসতে নিষেধ করেছেন। '৬৮৭
প্রকৃত মুসলমান রাসুলুল্লাহ-এর কথা মেনে নিয়ে এগুলোকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়। এ বস্তুগুলো কেন হারাম করা হলো, তার কারণ সে খুঁজে বেড়ায় না। কারণ, হালাল-হারামের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, পবিত্র কুরআনের এ আয়াত: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا 'রাসুল তোমাদের (বিধানস্বরূপ) যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। '৬৮৮
বর্তমান আমাদের বিয়ে-শাদিতে যেসব পাশ্চাত্য রীতি ও কুসংস্কৃতি প্রবেশ করেছে, প্রকৃত মুসলমান সেগুলো মেনে চলে না। যেমন: বাগদানের সময় ডান হাতে আংটি পরিয়ে দেওয়া, আবার বাসর রাতে তা বাম হাতে স্থানান্তর করা, বাসর রাতে নবদম্পতির ঘরে মাহরাম-গাইরে মাহরাম আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব মিলে স্মৃতির জন্য গ্রুপ ছবি তোলা ইত্যাদি অপসংস্কৃতি, যা কাফিররা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। এগুলো সবই বিজাতীয় অপসংস্কৃতি। প্রকৃত মুসলমান এসব বিষয়কে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
আরও যেসব অপসংস্কৃতি সমাজে প্রচলিত আছে, প্রকৃত মুসলমান সেসবকেও প্রত্যাখ্যান করে। যেমন: দেয়ালে ছবি রাখা, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করা, ঘরে পাহারাদারির উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা ইত্যাদি বিষয়। এসব বিষয় ইসলামে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। মুমিনদের জন্য কোনো অজুহাতেই এসব বিষয় বৈধ নয়। এ সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
ইবনে উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذِّبُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
'যারা ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের আজাব দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, যা তোমরা বানিয়েছ, তাতে প্রাণ দান করো। '৬৮৯
আয়িশা বলেন, রাসুলুল্লাহ কোনো এক সফর থেকে ফিরলেন। তখন আমি ভেন্টিলেটরের ওপর একটি পর্দা টেনে রেখেছিলাম, যার ওপর ছবি আঁকা ছিল। রাসুলুল্লাহ-এর দৃষ্টি যখন তার ওপর পড়ল, রাগে তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। অতঃপর বললেন:
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللَّهِ قَالَتْ: فَجَعَلْنَاهُ وِسَادَةً أَوْ وِسَادَتَيْنِ
'হে আয়িশা, কিয়ামতের দিন সেসব লোকের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্য তৈরি করে। আয়িশা বলেন, এরপর আমি পর্দাটি ছিঁড়ে তা দিয়ে একটি বা দুটি বালিশ বানিয়ে নিলাম। '৬৯০
ইবনে আব্বাস বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يَجْعَلُ لَهُ، بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا، نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ، وقَالَ: إِنْ كُنْتَ لَا بُدَّ فَاعِلًا، فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ
'সকল ছবি অঙ্কনকারী জাহান্নামে যাবে। আর প্রত্যেক ছবির পরিবর্তে একটি জীবিত প্রাণী বানানো হবে, যে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেবে। ইবনে আব্বাস বলেন, যদি একান্তই তোমাদের ছবি আঁকতে হয়, তাহলে গাছ ও প্রাণহীন বস্তুর ছবি আঁকবে। '৬৯১
আয়িশা বর্ণনা করেন:
وَاعَدَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي سَاعَةٍ يَأْتِيهِ فِيهَا، فَجَاءَتْ تِلْكَ السَّاعَةُ وَلَمْ يَأْتِهِ، وَفِي يَدِهِ عَصَّا، فَأَلْقَاهَا مِنْ يَدِهِ، وَقَالَ: مَا يُخْلِفُ اللهُ وَعْدَهُ وَلَا رُسُلُهُ، ثُمَّ الْتَفَتَ، فَإِذَا جِرْوُ كَلْبٍ تَحْتَ سَرِيرِهِ، فَقَالَ: يَا عَائِشَةُ، مَتَى دَخَلَ هَذَا الْكَلْبُ هَاهُنَا؟ فَقَالَتْ: وَاللهِ، مَا دَرَيْتُ، فَأَمَرَ بِهِ فَأُخْرِجَ، فَجَاءَ جِبْرِيلُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاعَدْتَنِي فَجَلَسْتُ لَكَ فَلَمْ تَأْتِ، فَقَالَ: مَنَعَنِي الْكَلْبُ الَّذِي كَانَ فِي بَيْتِكَ، إِنَّا لَا نَدْخُلُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبُ وَلَا صُورَةٌ
'এক সময় জিবরাইল রাসুলুল্লাহ-এর নিকট আসার ওয়াদা করলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তিনি আসলেন না। তখন রাসুলুল্লাহ-এর হাতে একটি লাঠি ছিল, তা ফেলে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত দূতগণ ওয়াদা খেলাফ করেন না। অতঃপর তিনি এদিক সেদিক তাকালেন এবং চৌকির নিচে একটা কুকুরের বাচ্চা দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, আয়িশা, এখানে কুকুর কখন ঢুকেছে? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি জানি না। রাসুলুল্লাহ-এর নির্দেশে তা বের করে দেওয়া হলো। তখনই জিবরাইল আসলেন। রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন,
আপনি আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন, আর আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু আপনি আসেননি! জিবরাইল বললেন, যে কুকুরটা আপনার ঘরে ছিল সেটাই আমাকে আসতে বাধা দিয়েছিল। কেননা, যে ঘরে কুকুর কিংবা ছবি থাকে, সে ঘরে আমরা প্রবেশ করি না। ৬৯২
এ সম্পর্কে আরও অনেক হাদিস রয়েছে। প্রতিটি হাদিস ঘরে ছবি রাখা ও ভাস্কর্য স্থাপন করাকে হারাম প্রমাণিত করে। পরবর্তীকালে সময়ই এ হারামকরণের হিকমত ও রহস্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে আমাদের সামনে। বিশেষ করে বর্তমান যুগে; যখন মুনাফিক, দুষ্ট ও প্রবৃত্তিপূজারি লোকেরা পাপাচারের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে এবং তাদের পাপাচারের ওপর অটল থাকার জন্য মানুষের সামনে তা উত্তমরূপে উপস্থাপন করছে—এ যুগে ছবি ও ভাস্কর্যকে তাদের অপকর্মের সমর্থন আদায়ের মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে তারা। জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর তাদের ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করে মানুষের সামনে তাদের মডেল হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্মান, মর্যাদা ও উপাসনার আসনে বসানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। গরিবের পেট মেরে এসব ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণের খরচ জোগাড় করা হয়। অর্থাৎ গরিবের করের টাকা দিয়ে অথবা গরিবদের মৌলিক অধিকার পূরণ না করে এসব ফালতু খাতে রাষ্ট্রের টাকা উড়িয়ে চলছে তারা। তাই বলা যায়, রাসুলুল্লাহ ছবি তোলা ও ভাস্কর্য নির্মাণ করাকে কেন নিষিদ্ধ করেছিলেন, তার হিকমত ও রহস্য বর্তমান সময় সবার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
পনেরো শতক ধরে চলে আসা শিরক ও জাহিলিয়াত বিতাড়ন করে একত্ববাদের আকিদা নিয়ে ইসলাম আগমন করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিভিন্ন নেতা, গুণীজন, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক ইত্যাদি প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামে সেই বিতাড়িত শিরক ও জাহিলিয়াত আবার আসতে শুরু করেছে মুসলমানদের জীবনে। অথচ ইসলামি সমাজ একটি একত্ববাদী সমাজ। এখানে চূড়ান্ত সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার আসন ইসলামি সমাজে নেই।
কুকুর পালনের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান হলো, শিকারের কাজে লাগানোর জন্য অথবা গবাদিপশু ও খেত-খামার পাহারা দেওয়ার জন্য কুকুর পালন করা বৈধ। যেমন ইবনে উমর-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
مَنِ اقْتَنَى كَلْبًا، إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ، أَوْ مَا شِيَةٍ، نَقَصَ مِنْ أَجْرِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ
'যে ব্যক্তি গবাদি পশুর রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা শিকারের কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো কারণে কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে দুই কিরাত করে নেকি হ্রাস পায়। '৬৯৩
পক্ষান্তরে পশ্চিমাদের মতো ঘরের ভেতর কুকুর পোষা, তাদের আলাদা যত্ন নেওয়া, তাদের জন্য বিশেষ খাবার তৈরি করা, শ্যাম্পু মাখিয়ে গোসল করিয়ে দেওয়া, তাদের জন্য আলাদা বাথরুম রাখা ইত্যাদি বিষয়, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়- এভাবে কুকুর পালন ইসলামে নিষিদ্ধ। আসলে পশ্চিমা সমাজে মানুষের জীবন খুব বেশি বস্তুবাদী হয়ে ওঠায় মানুষ তার স্বজাতির মাঝে এখন আনন্দ ও বিনোদন খুঁজে পায় না। তাদের সমাজে মানুষ মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা পায় না এখন। তাই তারা কুকুর পালন করে, তাদের যত্ন নিয়ে, আদর করে হারানো সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু ইসলামি সমাজে মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, সহমর্মিতা অটুট আছে। তাই প্রকৃত मुसलमानों এ বিষয়গুলো কুকুরের মাঝে খুঁজতে হয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00