📘 আদর্শ মুসলিম 📄 নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়

📄 নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়


প্রকৃত মুসলমান অন্যকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেয়; যদিও এতে নিজের ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকুক। কারণ, ইসলাম তার অনুসারীদের এ গুণ অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটাকেই প্রকৃত মুসলমানের একটি মৌলিক চরিত্র বলে অভিহিত করেছে ইসলাম। এ চরিত্রের মাধ্যমেই অন্যান্য মানুষের মাঝে প্রকৃত মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।
অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পরে সবচেয়ে বেশি ছিল আনসার সাহাবিদের মাঝে। তাদের এ গুণের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার যে মহান কর্ম তারা সম্পাদন করেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবতার ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আহ, কেমন সে অগ্রাধিকার! মুহাজিরগণ তাদের নিকট গিয়েছিলেন কোনো কিছু ছাড়াই, কিন্তু আনসারগণ তাদের সবকিছুই দিয়ে দিয়েছেন!
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।'৬৬৬
রাসুলুল্লাহ-এর মাঝে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এজন্য তিনি প্রাথমিক যুগের مسلمانوں মাঝে এ গুণটি বদ্ধমূল করে দিতে এবং এটাকে তাদের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ সম্পর্কে সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন : أَنَّ امْرَأَةً جَاءَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبُرْدَةٍ مَنْسُوجَةٍ، فِيهَا حَاشِيَتُهَا، أَتَدْرُونَ مَا البُرْدَةُ؟ قَالُوا : الشَّمْلَةُ، قَالَ: نَعَمْ، قَالَتْ: نَسَجْتُهَا بِيَدِي فَجِئْتُ لِأَكْسُوَكَهَا، فَأَخَذَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْتَاجًا إِلَيْهَا، فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَإِنَّهَا إِزَارُهُ، فَحَسَّنَهَا فُلَانٌ، فَقَالَ: اكْسُنِيهَا، مَا أَحْسَنَهَا، قَالَ القَوْمُ: مَا أَحْسَنْتَ لَبِسَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْتَاجًا إِلَيْهَا ، ثُمَّ سَأَلْتَهُ، وَعَلِمْتَ أَنَّهُ لَا يَرُدُّ، قَالَ: إِنِّي وَاللَّهِ، مَا سَأَلْتُهُ لِأَلْبَسَهُ، إِنَّمَا سَأَلْتُهُ لِتَكُونَ كَفَنِي، قَالَ سَهْلُ: فَكَانَتْ كَفَنَهُ
‘এক মহিলা নবিজি-এর নিকট ঝালরবিশিষ্ট একটি বুরদাহ আনলেন। সাহল বললেন, তোমরা জানো, বুরদাহ কী? তারা বলল, চাদর। সাহল বললেন, হ্যাঁ। মহিলাটি বলল, চাদরটি আমি নিজ হাতে বুনেছি এবং তা আপনার পরিধানের জন্য নিয়ে এসেছি। রাসুলুল্লাহ তা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর চাদরের প্রয়োজনও ছিল। তারপর তিনি তা ইজাররূপে (লুঙ্গি) পরিধান করে আমাদের সামনে আসলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করে বললেন, বাহ! এ যে কত সুন্দর! আমাকে তা পরার জন্য দান করুন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এরপর নবিজি মজলিসে কিছুক্ষণ বসে আবার ফিরে গেলেন। তারপর চাদরটি খুলে সে ব্যক্তির নিকট পাঠিয়ে দিলেন। সাহাবিগণ তাকে বললেন, কাজটি তুমি ভালো করোনি। নবিজি তা তাঁর প্রয়োজনে পরেছেন, তবুও তুমি তা চেয়ে বসলে! অথচ তুমি জানো যে, তিনি কাউকে বিমুখ করেন না। লোকটি বলল, আল্লাহর কসম! আমি তা পরার উদ্দেশ্যে চাইনি। আমার চাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, যেন তা আমার কাফন হয়। সাহল বলেন, শেষে এ চাদরটাই তার কাফন হয়েছিল। '৬৬৭
রাসুলুল্লাহ অগ্রাধিকার প্রদানের যে চারা মুসলমানদের অন্তরে বপন করেছেন, তার ফল দেখতে পেলে তিনি মনে খুব আনন্দ পেতেন। কারও ভেতর এ গুণটি দেখতে পেলে তার প্রশংসা করতেন এবং তাকে আরও উৎসাহিত করতেন। যেমন আশআরি গোত্রের লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণ সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الأَشْعَرِيِّينَ إِذَا أَرْمَلُوا فِي الغَزْوِ، أَوْ قَلَّ طَعَامُ عِيَالِهِمْ بِالْمَدِينَةِ جَمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَهُمْ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ ، ثُمَّ اقْتَسَمُوهُ بَيْنَهُمْ فِي إِنَاءٍ وَاحِدٍ بِالسَّوِيَّةِ، فَهُمْ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُمْ
'মদিনায় আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন যুদ্ধে অপারগ হয়ে পড়ে অথবা তাদের পরিবার ও সন্তানদের খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছের অবশিষ্ট খাদ্য একটি কাপড়ে জমা করে। অতঃপর তা পরস্পরের মধ্যে সমান অংশে বণ্টন করে নেয়। এরা আমারই লোক, আর আমিও তাদের লোক (অর্থাৎ তাদের এ কর্মটি আমারই আদর্শ)। '৬৬৮

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 অভাবগ্রস্তকে সময় দেয়

📄 অভাবগ্রস্তকে সময় দেয়


প্রকৃত মুসলমান লেনদেনের ক্ষেত্রে উদারমনস্ক ও চরিত্রবান হয়। গরিব অভাবী মানুষ থেকে ঋণ পেয়ে থাকলে আদায় করার ক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় দেয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ 'যদি ঋণী ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। '৬৬৯
ইসলাম মুসলমানকে হকের অধিকারী হওয়ার পূর্বে একজন মানুষ হতে বলে। তাই যখন সে তার ঋণগ্রহীতা ভাইয়ের মাঝে অভাব দেখতে পায়, তখন তার ওজর কবুল করে নেয় এবং সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দেয়। অথবা পারলে ঋণের কিছু অংশ বা পুরো অংশ ক্ষমা করে দেয়। এর মাধ্যমে সে মূলত আল্লাহর নির্দেশই পালন করে। তাই তার এ উত্তম আমলের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে তাকে মুক্তি দান করবেন এবং আরশে আজিমের ছায়াতলে স্থান দেবেন। সেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُنْجِيَهُ اللهُ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، فَلْيُنَفِّسْ عَنْ مُعْسِرٍ، أَوْ يَضَعْ عَنْهُ 'যে ব্যক্তি কামনা করে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন, সে যেন অভাবী ঋণগ্রস্তকে সময় দেয় অথবা ঋণের কিছু অংশ বা পুরো অংশ ক্ষমা করে দেয়। '৬৭০
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا، أَوْ وَضَعَ لَهُ ، أَظَلَّهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ تَحْتَ ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ 'যে ব্যক্তি অভাবী ঋণগ্রস্তকে সময় দেয় অথবা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। '৬৭১
এ বিষয়ের ওপর অনেক আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি আয়াত ও হাদিস এ কথা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে, ঋণদাতা যদি অভাবী ঋণগ্রহীতাকে সময় দেয় বা ঋণ মাফ করে দেয়, তাহলে তার এ আমল আল্লাহর নিকট নিষ্ফল প্রতিপন্ন হবে না। এর সাওয়াব তার আমলনামায় অবশ্যই লিপিবদ্ধ হবে। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের কষ্ট, দুর্দশা ও ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দান করবেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো।
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
كَانَ رَجُلٌ يُدَايِنُ النَّاسَ، فَكَانَ يَقُولُ لِفَتَاهُ: إِذَا أَتَيْتَ مُعْسِرًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ، لَعَلَّ اللَّهَ يَتَجَاوَزُ عَنَّا، فَلَقِيَ اللَّهَ فَتَجَاوَزَ عَنْهُ
'এক ব্যক্তি মানুষকে ঋণ দিত, আর তার কর্মচারীকে বলে রাখত, কোনো অভাবী লোকের কাছে যদি ঋণ আদায় করতে যাও, তাহলে তার ঋণ মাফ করে দেবে। আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে আমাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন। এরপর লোকটি আল্লাহর সাথে মিলিত হলো (মৃত্যুবরণ করল) এবং সত্যিই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। '৬৭২
আবু মাসউদ বদরি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
حُوسِبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ: قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ
'তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনো ভালো আমল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল সচ্ছল। তাই দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য সে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিত। রাসুলুল্লাহ বললেন, আল্লাহ বললেন, এ ব্যাপারে (অর্থাৎ ক্ষমা করার ব্যাপারে) আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও। '৬৭৩
হুজাইফা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أُتِيَ اللهُ بِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِهِ آتَاهُ اللهُ مَالًا ، فَقَالَ لَهُ: مَاذَا عَمِلْتَ فِي الدُّنْيَا؟ قَالَ: وَلَا يَكْتُمُونَ اللهَ حَدِيثًا ، قَالَ: يَا رَبِّ آتَيْتَنِي مَالَكَ، فَكُنْتُ أُبَايِعُ النَّاسَ، وَكَانَ مِنْ خُلُقِي الْجَوَازُ، فَكُنْتُ أَتَيَسَّرُ عَلَى الْمُوسِرِ، وَأُنْظِرُ الْمُعْسِرَ ، فَقَالَ اللهُ: أَنَا أَحَقُّ بِذَا مِنْكَ، تَجَاوَزُوا عَنْ عَبْدِي، فَقَالَ عُقْبَةُ بْنُ عَامِرٍ الْجُهَنِيُّ، وَأَبُو مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيُّ، هَكَذَا سَمِعْنَاهُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে কোনো এক বান্দাকে তাঁর নিকট উপস্থিত করা হলো, যাকে তিনি ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুনিয়াতে তুমি কী কাজ করেছ? হুজাইফা বলেন, অথচ লোকেরা আল্লাহর নিকট থেকে কোনো কথাই গোপন করতে পারে না। উত্তরে সে বলল, হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে আপনার ধনভান্ডার থেকে দান করেছিলেন, আমি লোকদের সাথে কেনাবেচা করতাম। আর আমার দেনাদারদের সাথে উদার ব্যবহার করাই ছিল আমার অভ্যাস। আমি সচ্ছল ব্যক্তির সাথে উদার ব্যবহার করতাম এবং গরিব অসচ্ছল ব্যক্তিকে মাফ করে দিতাম। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তখন বললেন, ক্ষমা করার ব্যাপারে তোমার চেয়ে আমি অধিক হকদার। (হে ফেরেশতাগণ,) আমার এ বান্দাকে তোমরা মাফ করে দাও। উকবা বিন আমির জুহানি ও আবু মাসউদ আনসারি বলেন, আমরাও রাসুলুল্লাহ -এর মুখে এরূপই শুনেছি। '৬৭৪

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 যাচন ও ভিক্ষাবৃত্তি করে না

📄 যাচন ও ভিক্ষাবৃত্তি করে না


প্রকৃত মুসলমান স্বনির্ভর ও অমুখাপেক্ষী হয়। মানুষের কাছে হাত পাতে না। অভাব-অনটনের সময় ধৈর্যধারণ করে। যতটুকু পারে নিজে চেষ্টা করে কামাই করে। কারও নিকট অনুগ্রহ ও সাহায্য প্রার্থনা করে না। কারণ, তার দ্বীন তাকে এ তুচ্ছ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয় এবং ধৈর্য ধরতে বলে। তা ছাড়া সে বিশ্বাস করে, মানুষের কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করলে এবং স্বনির্ভর ও ধৈর্যশীল থাকতে চাইলে আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করেন এবং সাহায্য করেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللهُ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءٌ خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
'আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পরের কাছে হাত পাতার অভিশাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। আর যে ব্যক্তি স্বনির্ভর হতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বনির্ভরতা দান করেন। আর যে ব্যক্তি ধৈর্যের পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তাকে ধৈর্যধারণের ক্ষমতা দান করেন। বস্তুত, আল্লাহর দেওয়া দানসমূহের মধ্যে ধৈর্যশক্তির চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত দান আর কিছু নেই।'৬৭৫
ইসলাম ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার রেখেছে এবং ধনীদের নিকট ইসলাম দাবি পেশ করেছে, তারা যেন কোনো ধরনের খোঁটা না দিয়ে, কষ্ট না দিয়ে এবং অমর্যাদা না করে গরিবদের সে হক ও অধিকার আদায় করে দেয়। অপরদিকে গরিবদের থেকে ইসলাম প্রত্যাশা করে, তারা যেন ধনীদের সম্পদে তাদের যে হক রয়েছে, তার প্রতি মুখাপেক্ষী না থাকে। আরও ঘোষণা দিয়েছে, ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। তাই প্রকৃত মুসলমানকে সব সময় চেষ্টা করতে হবে, তার হাত যেন নিচের হাত না হয়। এটাই তার জন্য যথোপযুক্ত। এজন্য যাদের নিকট ধন-সম্পদ কম, তাদের একটু বেশি মেহনত করে নিজের প্রয়োজনের উপকরণ জোগাড় করতে হবে। সদকা ও অনুদানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না। কারণ, এতে মনুষ্যত্বের মর্যাদা ব্যাহত হয়। এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের সদকা করার প্রতি ও মানুষের নিকট হাত না পাতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেছেন :
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى ، فَاليَدُ الْعُلْيَا: هِيَ المُنْفِقَةُ، وَالسُّفْلَى: هِيَ السَّائِلَةُ
‘ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। ওপরের হাত হলো দানকারীর হাত, আর নিচের হাত হলো ভিক্ষুকের হাত। '৬৭৬

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ, আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ

📄 সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ, আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ


ইসলামের আলোয় আলোকিত প্রকৃত মুসলমান কোমল স্বভাবের হয়। সে নিজে অন্তরঙ্গ, অন্যরাও তার সাথে অন্তরঙ্গ। মানুষের সাথে অন্তরঙ্গতা ও সম্প্রীতির সাথে মিলেমিশে থাকে। তারাও তার প্রতি অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ হয় এবং তাকে ভালোবাসে। এটি একটি উন্নত সামাজিক চরিত্র। প্রকৃত মুসলমান— যে নিজের মাঝে দ্বীনের বার্তা বহন করে চলে—এ গুণটিকে নিজের ভেতর ফিট করে নেয়। সে বিশ্বাস করে, সমাজের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা ও তাদের ভরসা অর্জন করা একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য এবং তাদের নিকট সত্যের বাণী পৌঁছে দিতে অত্যন্ত সহায়ক। যে সত্য ও আদর্শ সে বহন করে চলছে, তা লোকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হলে অবশ্যই এ গুণ অবলম্বন করতে হবে। কেননা, মানুষ এমন মানুষের কথা শুনতে চায় না, যার সাথে তারা অন্তরঙ্গ নয় এবং যার প্রতি তাদের ভরসা নেই। পক্ষান্তরে যার সাথে তাদের অন্তরঙ্গতা ও ঘনিষ্ঠতা আছে এবং যার প্রতি তাদের ভরসা আছে, তার কথা শুনতে ও মানতে তারা দ্বিধাবোধ করে না। এজন্য ইসলামের অনেক আয়াত-হাদিসে এ গুণটি অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং যাদের মাঝে গুণটি বিদ্যমান, তাদের একটি বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসা ও কিয়ামতের দিন তাঁর নিকট অবস্থান করার নিয়ামত লাভে ধন্য হবে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، قَالَ الْقَوْمُ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: أَحْسَنُكُمْ خُلُقًا وزادت بعض الروايات : الْمُوَطَّئُونَ أَكْنَافُهُمْ الَّذِينَ يَأْلَفُونَ وَيُؤْلَفُونَ
'আমি কি তোমাদের বলব, কারা আমার নিকট অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার অধিক নিকটবর্তী হবে? উপস্থিত সাহাবিগণ চুপ করে রইলেন। অতঃপর আরও তিনবার অথবা দুবার বললেন। তখন সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল। বললেন, (তারা হলো,) তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।' আরেকটি রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে, 'আর যাদের অন্তর প্রশস্ত, মানুষের সাথে তারা অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তাদের সাথে অন্তরঙ্গ।'৬৭৭
মুমিনের অন্যতম গুণ হলো, সে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ হবে আর মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ হবে। মানুষকে সে ভালোবাসবে, তারাও তাকে ভালোবাসবে। তাদের প্রতি সে মনোযোগী হবে এবং তারাও তার প্রতি মনোযোগী হবে। মুমিনের মাঝে যদি এ গুণটি না থাকে, তাহলে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তার নিকট থেকে কোনো কল্যাণেরও আশা করা যাবে না।
এজন্য হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
الْمُؤْمِنُ يَأْلَفُ وَيُؤْلَفُ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلُفُ، وَلَا يُؤْلَفُ 'মুমিন সে ব্যক্তি, যে মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ। আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ নয় এবং মানুষও তার সাথে অন্তরঙ্গ নয়—এমন ব্যক্তির মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।'৬৭৮
রাসুলুল্লাহ মানুষের সাথে উত্তম আচরণের মাধ্যমে উম্মাহর জন্য মহান আদর্শরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। উম্মাহকে কথা, কাজ ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সে আদর্শের অনুকরণ করার দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি উম্মাহকে শিখিয়ে দিয়েছেন, কী করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়, কীভাবে তাদের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। রাসুলুল্লাহ ছিলেন সদা হাস্যমুখ, সহজ- সরল ও কোমল স্বভাবের অধিকারী। তিনি রূঢ় ও কঠোর ছিলেন না। কোনো সম্প্রদায়ের নিকট গেলে তাদের মজলিসের শেষে যেখানে জায়গা পেতেন, সেখানে বসতেন এবং অন্যদেরও এমন করার নির্দেশ দিতেন। তাঁর মজলিসে আগত প্রত্যেক সদস্যকে সমানভাবে জায়গা দিতেন। মজলিসে যারা বসত, তাদের কেউ এ কথা মনে করার সুযোগ পেত না যে, এ মজলিসে অন্যজন তার চেয়ে বেশি সম্মান পাচ্ছে। কেউ তাঁর নিকট কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরতে হতো না। সবার সাথে তিনি সহজ-সরল ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর চরিত্র ও দয়া সকল মানুষের জন্য ব্যাপক ও সমান ছিল। এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার জন্য স্নেহশীল এক পিতা। অধিকারের ক্ষেত্রে সবাই তাঁর কাছে সমান ছিল। তাঁর মজলিসে যারা বসতেন, তাদের পরস্পরের মাঝে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। একমাত্র তাকওয়ার মাধ্যমে তাদের মর্যাদার তারতম্য হতো। তারা ছিলেন নম্র ও ভদ্র। তারা বড়দের সম্মান করতেন, ছোটদের স্নেহ করতেন, অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
রাসুলুল্লাহ -এর কাছে কোনো কিছুর আশা করে কখনো নিরাশ ও হতাশ হতে হয়নি কাউকে। তিনি তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। এক. অহেতুক বিতর্ক করা, দুই. বেশি কথা বলা, তিন. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ। আর মানুষের ব্যাপারে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতেন। এক. কারও নিন্দা করতেন না, দুই. কাউকে লজ্জা দিতেন না, তিন. কারও দোষ তালাশ করতেন না। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন তাঁর শ্রোতাগণ এমন তন্ময় হয়ে যেতেন, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর যখন তিনি চুপ হতেন, তখন তারা কথা বলতেন। তাঁর সামনে তাঁরা পরস্পর ঝগড়া করতেন না। তাঁদের হাসিতে তিনি হাসতেন এবং তাঁদের আনন্দে তিনি আনন্দিত হতেন। অপরিচিত মূর্খ ব্যক্তির অবাঞ্ছিত কথা ও প্রশ্নে তিনি ধৈর্য ধরতেন। তিনি তাঁর সাহাবিদের বলতেন, যদি কোনো অভাবীকে তোমরা দেখো, তাহলে তার সাহায্য করবে। তিনি অতিরঞ্জিত প্রশংসা গ্রহণ করতেন না। কেউ তাঁর সাথে কথা বললে তার সম্পূর্ণ কথা শুনতেন। কথার মাঝখানে তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিতেন না।
আয়িশা বর্ণনা করেন যে, তিনি দুষ্ট লোকদের থেকে বেঁচে থাকতেন। তাদের সাথে সুন্দর কথা ও আচরণের মাধ্যমে তাদের দমিয়ে রাখতেন।
এ ধরনের এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন :
ائْذَنُوا لَهُ، فَلَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيرَةِ، أَوْ بِئْسَ رَجُلُ الْعَشِيرَةِ فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ أَلَانَ لَهُ الْقَوْلَ ، قَالَتْ عَائِشَةُ : فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْتَ لَهُ الَّذِي قُلْتَ ، ثُمَّ أَلَنْتَ لَهُ الْقَوْلَ؟ قَالَ: يَا عَائِشَةُ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ وَدَعَهُ، أَوْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتَّقَاءَ فُحْشِهِ
'তাকে অনুমতি দাও। সে তার বংশের নিকৃষ্ট সন্তান। অথবা বললেন, সে তার গোত্রের নিকৃষ্টতম ভাই। যখন সে প্রবেশ করল, তখন তিনি তার সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বললেন। আমি (আয়িশা ) বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এর সম্পর্কে যা বলার তা বলেছেন, এখন আপনি তার সাথে নম্রভাবে কথা বললেন যে! তিনি বললেন, হে আয়িশা, আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার অশালীন আচরণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার সংস্রব ত্যাগ করে। '৬৭৯
প্রকৃত মুসলমান মানুষের সাথে আচরণে রাসুলুল্লাহ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে, যেন সে সবার নিকট প্রিয়, ঘনিষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px