📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 উদারচিত্ত ও দানশীল

📄 উদারচিত্ত ও দানশীল


প্রকৃত মুসলমান-যে দ্বীনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একনিষ্ঠভাবে তা বাস্তবায়ন করে-উদারচিত্ত ও দানশীল হয়। তার উভয় হাত উন্মুক্ত থাকে এবং সেগুলো থেকে সমাজের লোকদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের কল্যাণ ও উপকার ঝরে ঝরে পড়ে।
সে বিশ্বাস করে, দান কখনো ধ্বংস হয় না; বরং তা সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
'আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, সে সম্পর্কে আল্লাহ জ্ঞান রাখেন।'৬২৪
দান করার সময় সে নিশ্চিত থাকে যে, যা দান করা হচ্ছে, তা বড় উপকার ও ব্যাপক কল্যাণের রূপ নিয়ে তার কাছে পুনরায় ফিরে আসবে। দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলা এ দানকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবেন।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে:
مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আর আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ। '৬২৫
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন: وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ 'তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেন। '৬২৬
অন্যত্র ইরশাদ করেন: وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُونَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ 'যে মাল তোমরা ব্যয় করো, তা নিজ উপকারার্থেই করো। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যয় কোরো না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তার পুরস্কার পুরোপুরি পেয়ে যাবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না। '৬২৭
প্রকৃত মুসলমান এ বিশ্বাস নিয়ে দান করে যে, এ দানের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই তাকে বরকত, প্রবৃদ্ধি ও উত্তম বদলা দান করবেন। আর যদি সে কৃপণতা করে এবং দানের হাত প্রসারিত না করে গুটিয়ে রাখে, তখন আল্লাহ তাআলা সম্পদে ক্ষতি ও লোকসান দিয়ে তাকে বিপদে ফেলবেন।
নিম্নের হাদিসটি তার বিশ্বাসের সত্যায়ন করে: مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ العِبَادُ فِيهِ، إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا 'প্রতিদিন বান্দারা যখন সকালে উপনীত হয়, তখন দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ দানশীল ব্যক্তিকে উত্তম বদলা দান করুন। অপরজন বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণ ব্যক্তির ক্ষতি করুন। '৬২৮
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: أَنْفِقْ أُنْفِقْ عَلَيْكَ 'দান করো, বিনিময়ে আমিও তোমাকে (উত্তম বদলা) দান করব।'৬২৯
আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল মুসলমানের অন্তরে কখনো এ সন্দেহ উদ্রেক হয় না যে, আল্লাহর রাস্তায় দান করলে তার সম্পদ কমে যাবে। কারণ, সদকা করলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়; কমে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ 'সম্পদ থেকে সদকা করলে সম্পদ কমে না। '৬৩০
এ ছাড়াও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা দান করা হয়, তার সাওয়াব বর্ণনা ও গণনার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তাআলা তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। এজন্যই রাসুলুল্লাহ সেই সম্পদকে জমা আছে মনে করতেন, যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়েছে।
এ সম্পর্কিত হাদিসটি আয়িশা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : أَنَّهُمْ ذَبَحُوا شَاةً، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا بَقِيَ مِنْهَا؟ قَالَتْ: مَا بَقِيَ مِنْهَا إِلَّا كَتِفَهَا قَالَ: بَقِيَ كُلُّهَا غَيْرَ كَتِفِهَا 'সাহাবিগণ একটি ছাগল জবাই করলেন (এবং তার কাঁধের অংশ ছাড়া সবকিছু সদকা করে দিলেন)। তখন নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বাকি আছে? আয়িশা উত্তর দিলেন, কাঁধ ব্যতীত কিছুই অবশিষ্ট নেই। নবিজি বললেন, বস্তুত কাঁধ ব্যতীত সবকিছুই (আল্লাহর নিকট) অবশিষ্ট আছে।'৬৩১
রাসুলুল্লাহ্ মুসলমানদের মাঝে বদান্যতার গুণ সৃষ্টি করার প্রতি খুব জোর দিয়েছেন। এ গুণের ব্যাপারে পরস্পর প্রতিযোগিতা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالًا فَسُلِّطَ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْحِكْمَةَ فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
'কেবল দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়া যাবে। প্রথমত, সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন, আর সে হকের পথে তা ব্যয় করেছে। দ্বিতীয়ত, সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন, আর তার মাধ্যমে সে উত্তম বিচার-ফয়সালা করে এবং লোকদের তা শিক্ষা দেয়। '৬৩২
রাসুলুল্লাহ হকের পথে সম্পদ ব্যয় করা এবং হিকমত অনুযায়ী ফয়সালা করা ও তা শিক্ষা দেওয়া—এ দুই বিষয়কে এক সমান বলেছেন। তিনি বলেছেন, এ দুই বিষয়ে ঈর্ষা করা বৈধ। এর কারণ হলো, হকের পথে সম্পদ ব্যয় করার মধ্যে মুসলমানদের সামাজিক জীবনের অনেক উপকারিতা নিহিত রয়েছে। সম্পদ জীবনের জাগতিক সমস্যা সমাধানের উপকরণ। আর হকের পথে তা ব্যয় করা অনেক বড় আমল। একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞার সাহায্যে মানুষের যে উপকার সাধিত করে, হকের পথে ব্যয়িত সম্পদের উপকার তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
প্রকৃত মুসলমান সম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রে লক্ষ রাখে, কোথায় ব্যয় করলে সাওয়াব বেশি হবে। এজন্য এমনভাবে দান করে, যেভাবে দান করলে সাওয়াব বেশি পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ওয়ারিশদের একেবারে বঞ্চিত করে সব সম্পদ দান করে দেয় না, আবার একদম দান না করে হাত গুটিয়ে বসেও থাকে না। এ ক্ষেত্রে সে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম চায়, বান্দার নিকট ওয়ারিশদের জন্য মিরাস হিসাবে (প্রয়োজনাতীত) ধনাঢ্যতা রেখে যাওয়ার চেয়ে আল্লাহর রাস্তায় দান করা পছন্দনীয় হোক। কারণ, আল্লাহর রাস্তায় যা দান করা হবে, তা তার আমলনামায় সংরক্ষিত থাকবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَيُّكُمْ مَالُ وَارِثِهِ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ مَالِهِ؟ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا مِنَّا أَحَدٌ إِلَّا مَالُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ، قَالَ: فَإِنَّ مَالَهُ مَا قَدَّمَ، وَمَالٌ وَارِثِهِ مَا أَخَّرَ
'তোমাদের মধ্যে কার কাছে নিজের সম্পদের চেয়ে ওয়ারিশদের সম্পদ অধিক প্রিয়? সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রত্যেকের নিকট নিজের সম্পদই অধিক প্রিয়। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, (তাহলে শোনো) নিজের সম্পদ হলো, যা আল্লাহর রাস্তায় দান করা হয়েছে। আর ওয়ারিশদের সম্পদ হলো, যা দান করা হয়নি।'৬৩৩
বদান্যতা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ও সামাজিক জীবনে মুসলমানদের অন্যতম সুন্দর স্বভাব। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে যখন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন:
أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرٌ؟ قَالَ: تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
'সর্বোত্তম ইসলাম কী? তিনি উত্তরে বললেন, খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম করা।'৬৩৪
তবে লক্ষ রাখতে হবে, বদান্যতার ক্ষেত্রে যেন বাড়াবাড়ি করা না হয়। ওয়ারিশদের জন্য কিছুই না রেখে সব সম্পদ দান করে দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের সকল বিধান ভারসাম্যপূর্ণ। একজনের প্রতি উদার হতে গিয়ে আরেকজনের ওপর জুলুম করার নীতি অবলম্বন করা ইসলামি শিক্ষা নয়। তাই ভালো কাজে দান করা যেমন কর্তব্য, তেমনিই সন্তান-সন্ততিদের দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখাও জরুরি। এজন্য সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস-এর মৃত্যুপূর্ববর্তী অসুস্থতার সময় রাসুলুল্লাহ যখন তাকে দেখতে গেলেন, তখন তিনি রাসুলুল্লাহ-কে বললেন:
يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ لِي مَالًا كَثِيرًا، وَلَيْسَ يَرِثُنِي إِلَّا ابْنَتِي، أَفَأَتَصَدَّقُ بِثُلُثَيْ مَالِي؟ قَالَ: لَا قَالَ: قُلْتُ: فَالشَّطْرُ؟ قَالَ: لَا قُلْتُ: الثُّلُثُ؟ قَالَ: الثُّلُثُ كَبِيرٌ، إِنَّكَ إِنْ تَرَكْتَ وَلَدَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَتْرُكَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ، وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى اللُّقْمَةَ تَرْفَعُهَا إِلَى فِي امْرَأَتِكَ
'হে আল্লাহর রাসুল, আমার অনেক সম্পদ রয়েছে। এদিকে আমার ওয়ারিশ বলতে কেবল একটি মেয়েই আছে। আমি কি আমার দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদ সদকা করে দেবো? রাসুলুল্লাহ বললেন, না। সাদ বললেন, তাহলে অর্ধেক? রাসুলুল্লাহ বললেন, তা-ও না। সাদ বললেন, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ? রাসুলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, এক-তৃতীয়াংশ সদকা করবে পারবে, যদিও এক-তৃতীয়াংশ সম্পদও বেশি হয়ে যায়। তারপর রাসুলুল্লাহ বললেন, তোমার সন্তানদের ধনী হিসাবে রেখে যাওয়া তাদের গরিব ও মানুষের নিকট হাত পাতার অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। তা ছাড়া তুমি (বৈধ ক্ষেত্রে) যা-ই ব্যয় করবে, তার সাওয়াব দেওয়া হবে। এমনকি খাবারের যে লুকমা তুমি স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তারও সাওয়াব দান করা হবে। '৬৩৫
রাসুলুল্লাহ বদান্যতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি দান না করে হাত গুটিয়ে বসে থেকেছেন কিংবা কোনো ভিখারিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এমনটি কখনোই হয়নি।
এ সম্পর্কে জাবির বলেন:
مَا سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا قَطُّ فَقَالَ لَا
'কখনো এমন হয়নি যে, রাসুলুল্লাহ থেকে কোনো কিছু চাওয়া হয়েছে আর তিনি "না" বলেছেন। '৬৩৬
মানুষের অন্তরে সম্পদের কী প্রভাব পড়ে, তা রাসুলুল্লাহ জানতেন; তাই তিনি দান করাকে তার প্রতি অন্তরসমূহ আকৃষ্ট করার এবং ইসলামের প্রতি তাদের দুর্বল করার উপায় হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।
দাওয়াতের জন্য অধিক থেকে অধিকতর সম্পদ ব্যয় করতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রাথমিকভাবে সম্পদের টানে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও হিদায়াতের গভীরে যখন সে প্রবেশ করবে, তখন তার ইমান সবচেয়ে মজবুত হয়ে যাবে এবং তার ইসলাম সবার চেয়ে সুন্দর হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কে আনাস বিন মালিক বর্ণনা করেন :
مَا سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْإِسْلَامِ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ، قَالَ: فَجَاءَهُ رَجُلٌ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ، فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ، فَقَالَ: يَا قَوْمِ أَسْلِمُوا، فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءً لَا يَخْشَى الْفَاقَةَ وفي رواية له : فَقَالَ أَنَسٌ : إِنْ كَانَ الرَّجُلُ لَيُسْلِمُ مَا يُرِيدُ إِلَّا الدُّنْيَا، فَمَا يُسْلِمُ حَتَّى يَكُونَ الْإِسْلَامُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا
'রাসুলুল্লাহ-এর কাছে ইসলামের শর্ত সাপেক্ষে যা কিছু চাওয়া হয়েছে, তিনি অবশ্যই তা দান করেছেন। তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এসে কিছু চাইলে তিনি তাকে এত বিপুল সংখ্যক বকরি দান করলেন যে, সেগুলো দ্বারা দুই পাহাড়ের মাঝখান ভরে যাবে। লোকটি তা নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মাদ এমন উজাড় করে দান করেন যে, অভাব-অনটনের কোনো পরোয়া করেন না। (আনাস বলেন) কোনো ব্যক্তি যখন কেবল দুনিয়ার উদ্দেশ্যেই ইসলাম গ্রহণ করত (প্রকৃতপক্ষে আন্তরিকতা দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করত না), কিছুদিন যেতে না যেতেই ইসলাম তার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ থেকে অধিকতর প্রিয় হয়ে যেত। '৬৩৭
এজন্য রাসুলুল্লাহ তাঁর কাছে যা আসত, সবটুকু লোকদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। নিজের জন্য ও নিজের পরিবারের জন্য কিছুই রাখতেন না। এভাবে তিনি মানুষের বদ্ধ হৃদয়ের তালা খুলতেন এবং মানুষের মনে বদান্যতার গুণ আনার চেষ্টা করতেন। এজন্যই পৃথিবীর বুকে বদান্যতা ও দানশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে রাসুলুল্লাহ-কে উপস্থাপন করা মোটেই বাড়াবাড়ি হবে না।
জুবাইর বিন মুতইম বর্ণনা করেন:
أَنَّهُ بَيْنَا هُوَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ النَّاسُ، مُقْبِلًا مِنْ حُنَيْنٍ، عَلِقَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سَمُرَةٍ ، فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ، فَوَقَفَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَعْطُونِي رِدَائِي، فَلَوْ كَانَ عَدَدُ هَذِهِ العِضَاءِ نَعَمًا، لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ، ثُمَّ لَا تَجِدُونِي بَخِيلًا، وَلَا كَذُوبًا، وَلَا جَبَانًا
'হুনাইন থেকে ফেরার পথে তিনি রাসুলুল্লাহ-এর সাথে পথ চলছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও অনেক সাহাবি ছিলেন। এমন সময় কিছু গ্রাম্য লোক এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল এবং তাদের কিছু দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। এমনকি তারা তাঁকে একটি গাছের কাছে নিয়ে গেল এবং তাঁর চাদর (গাছের কাঁটায়) আটকে গেল। নবিজি সেখানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি ফিরিয়ে দাও। আমার কাছে যদি এ সব কাঁটাযুক্ত গাছের সমপরিমাণ বকরি থাকত, তাহলে এর সবই তোমাদের ভাগ করে দিতাম। অতঃপর তোমরা আমাকে কৃপণ, মিথ্যাবাদী ও কাপুরুষ হিসাবে দেখতে পাবে না। '৬৩৮
বদান্যতার যে উন্নত রূপের ওপর রাসুলুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সেটাই স্বার্থ ও লোভ থেকে মুক্ত নির্ভেজাল বদান্যতা। রাসুলুল্লাহ বাস্তব জীবনে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন, যেন মানবতার জন্য তা আদর্শ হয়। তিনি এ গুণের উচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পন্থাও জানিয়ে দিয়েছেন। তা হলো, মানুষের অন্তরে ইমান যত গভীর হবে, বদান্যতার গুণে সে তত এগিয়ে যাবে। এজন্য বান্দা যতই আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল হয়, ততই তার কাছ থেকে বদান্যতার গুণ প্রকাশ পায়। যখনই সে তার প্রতি আল্লাহর নিয়ামতরাজিকে অনুভব করে, তখনই বদান্যতার গুণ তার মাঝে প্রকট হয়ে ওঠে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক যার যত গভীরে পৌঁছায়, ততই সে বদান্যতার গুণে উন্নতি করতে থাকে। রমজান মাসে জিবরাইল যখন রাসুলুল্লাহ-এর সাথে বিশেষ সাক্ষাৎ করতেন, তখন রাসুলুল্লাহ-এর বদান্যতার অবস্থাও এমনই হতো। অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মুবারক মাসটিতে তিনি বেশি বেশি দান করতেন। রমজান মাসের প্রতি রাতে জিবরাইল যখন রাসুলুল্লাহ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন রাসুলুল্লাহ থেকে কল্যাণমূলক সকল বিষয় বেশি বেশি প্রকাশ পেত। তার উদারতা, দানশীলতা ও বদান্যতা সে সময় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলত।
এ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ يَلْقَاهُ، فِي كُلِّ سَنَةٍ، فِي رَمَضَانَ حَتَّى يَنْسَلِخَ، فَيَعْرِضُ عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقُرْآنَ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ
'রাসুলুল্লাহ কল্যাণকর বস্তু দান করার ব্যাপারে সবার চেয়ে অগ্রসর ছিলেন। আর তিনি সর্বাধিক দানশীলতার পরিচয় দিতেন রমজান মাসে। জিবরাইল প্রতি বছর রমজানে তাঁর সাথে মিলিত হতেন। মাসের সমাপ্তি পর্যন্ত এভাবে নিয়মিত সাক্ষাৎ হতো। তখন রাসুলুল্লাহ জিবরাইল-এর নিকট কুরআন উপস্থাপন করতেন। যে সময় জিবরাইল রাসুলুল্লাহ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, সে সময় রাসুলুল্লাহ-এর দানশীলতা প্রবল বেগে বয়ে চলা বাতাসের গতির চেয়েও গতিশীল হতো।'৬৩৯
আমরা প্রাথমিক প্রজন্মের মুসলমানগণকে বদান্যতার এ শীর্ষ স্তরের নিকটবর্তী দেখতে পাই। তাদের কাউকে আমরা দেখি, তিনি তার সমুদয় সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিচ্ছেন; যেমনটি আবু বকর করেছেন। কাউকে দেখি, তার অর্ধেক সম্পদ দান করে দিচ্ছেন; যেমনটি উমর করেছেন। আর কাউকে দেখি, সৈন্যদলের রসদপাতি একাই জোগাড় করে দিচ্ছেন; যেমনটি উসমান করেছেন। কাউকে দেখা যায়, তিনি তার সম্পদের সবচেয়ে উত্তম ও উন্নত বস্তুটাই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিচ্ছেন; যেমনটি করেছেন আবু দাহদাহ। তিনি তার সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন। যখন তার স্ত্রী এ কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় আনন্দচিত্তে বললেন, আবু দাহদাহ, তুমি সত্যিই অনেক লাভজনক ব্যবসা করেছ! এ ছাড়াও যারা আখিরাতকে দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দিতেন, তাদের মাঝে এ ধরনের নজির ভুরিভুরি আছে। তারা তাদের ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতেন।
এর কারণ হলো, তারা ছিলেন আল্লাহর সাথে সত্যবাদী। সব সময় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখতেন। এজন্যই তারা বদান্যতার আসল স্বরূপ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং বাস্তব জীবনে তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। বর্তমান সময়ের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি একাধিকবার দান করতে যেভাবে কুণ্ঠাবোধ করে, তারা এমন ছিলেন না। আবার দান করে খ্যাতি ও সুনামও অর্জন করতে চাইতেন না তারা—যেমনটি বর্তমান সময়ের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির মাঝে দেখা যায়।
বর্তমান সময়ে যারা মিলিয়ন বিলিয়ন সম্পত্তির মালিক, তারা যদি অন্তত ফরজ জাকাত আদায় করত, সমাজ থেকে আজ দারিদ্র্যের অভিশাপ দূর হয়ে যেত। কিন্তু আফসোস, তারা জাকাত আদায় করা থেকে হাত গুটিয়ে বসে আছে। অথচ তারা জানে, এটা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এক ফরজ বিধান এবং ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ। তবে তাদের বিভিন্ন মৌসুম ও উৎসব উপলক্ষে নির্দিষ্ট সংখ্যক টাকা দান করতে দেখা যায়। অথবা কোনো মুসলিম ভূখণ্ডে সীমিত সংখ্যক গরিবদের মাঝে খাদ্যদ্রব্য বণ্টন করতে দেখা যায়। তারা যখন দান করে, তখন তাদের বাড়ির সামনে গরিব-মিসকিনদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে। এর মাধ্যমে তারা আবার নিজেদের 'মহান দানবীর' ও 'গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের পরম বন্ধু' ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করতে ভালোবাসে। অথচ হিসাব করলে দেখা যাবে, তারা যা দান করছে, তা তাদের ওপর যে পরিমাণ সম্পদ দান করা ফরজ হয়েছে, তার ক্ষুদ্র একটা অংশের সমানও নয়। আসলে এসব ধনীরা মাঝেমধ্যে গরিবদের মাঝে সীমিত সংখ্যক যা টাকা-পয়সা দান করে, তা নিজেদের আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা ও আল্লাহর রাস্তায় দানকারী মহান দানবীর হিসাবে পরিচয় দেওয়ার জন্য করে থাকে। তাদের এসব বিষয় সম্পর্কে গরিব-ধনীর প্রভু ও গোটা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহ অজ্ঞ নন।
এ ধরনের লোকদের ব্যাপারেই তো তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ - يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ
'আর যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আজাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা রেখেছিলে; সুতরাং এক্ষণে জমা করে রাখার স্বাদ গ্রহণ করো। '৬৪০
ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করে যারা সম্পদশালী হয়েছে, তাদের কৃপণতা ও সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার কারণেই আজ ইসলামি দেশসমূহে অন্যান্য অর্থব্যবস্থা ও বামপন্থী চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যদি তারা তাদের সম্পদে আল্লাহর অধিকার কী, তা জেনে পুরোপুরি আদায় করে দিত, তাহলে মুসলমানদের সমাজে কমিউনিজম ও সমাজতন্ত্রের দিকে দাওয়াত দেওয়ার দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারত না। বামপন্থী দলসমূহ যখন ধনী-গরিবের মাঝে শ্রেণিবৈষম্যের বীজ বপন করল, তখন সমাজতন্ত্র এসে মিলিয়নারদের এবং তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ফতুর করে ছাড়ল। তাদের মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা ছিনিয়ে নিল। তারা তলিয়ে গেল ধ্বংসের অতল গহ্বরে। অথচ তাদের সমৃদ্ধির সময়ে তারা অধিকাংশ সময় গরিব শ্রমিকদের তাদের সাপ্তাহিক বা মাসিক বেতনের সাথে বোনাস হিসাবে অর্ধ লিরা বাড়িয়ে দিতে কার্পণ্য করত লাভ কমে যাওয়ার ভয়ে। শ্রমিকরা অতিরিক্ত কিছুর বাইনা করলে দুনিয়া ওলটপালট করে দিত তারা। অথচ যখন তাদের সন্তানরা আমোদ-প্রমোদ ও বেশ্যাদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ওড়াত, তখন দেখেও না দেখার ভান করে থাকত। কখনো কখনো তাদের কোনো সন্তান নাচের একটি শোর সব টিকিট একাই কিনে নিয়েছিল যেন সুন্দরী নর্তকীদের কোমরদোলানো নৃত্য সে একাই উপভোগ করতে পারে।
প্রকৃত ইসলামি সমাজের অভিধানে ধনী কর্তৃক গরিবকে শোষণ করা এবং ধনীর প্রতি গরিবের ঘৃণা ও হিংসার কোনো শব্দ নেই। প্রকৃত ইসলামি সমাজে ধনী হয় উদার ও দানশীল। সে তার সম্পদে গরিবের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তাই তার অধিকার হরণ করে না। গরিবের প্রতি সাহায্য, সহযোগিতা ও ইনসাফের হাত বাড়াতে অবহেলা করে না। অপরদিকে গরিব ব্যক্তি ধনী ব্যক্তির দিকে সে তার চেয়ে বেশি সম্পদশালী বলে হিংসা ও ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায় না। এর কারণ হলো, ইসলামি সমাজে ধনী হারাম পন্থায় সম্পদশালী হয় না। হালাল ও বৈধ পন্থায় চেষ্টা-মেহনত করে সম্পদের অধিকারী হয়। তা ছাড়া ইসলামি সমাজ তার সকল সদস্যকে সমান সুযোগ প্রদান করে। ফলে গরিব ব্যক্তি ইচ্ছা করলে কঠোর অধ্যবসায় ও চেষ্টা- মেহনতের মাধ্যমে সে-ও ধনী হতে পারে। দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। উচ্চাঙ্গ ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ও কর্মঠ ব্যক্তিমাত্রই তা দিয়ে অর্থের জগতে প্রবেশ করে সম্পদশালী হতে পারে। ফলে কাউকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তার প্রতি হিংসা ও ঘৃণাবোধ লালন করার কোনো সুযোগ এখানে নেই। ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সমাজে হিংসুক, ঘৃণা পোষণকারী ও প্রতিশোধপরায়ণ লোকদের কোনো ঠাঁই নেই।
রাসুলুল্লাহ ﷺ সব সময় সাহাবিগণকে দান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। সম্পদ জমা করার ভালোবাসা তাঁদের অন্তর থেকে সমূলে উপড়ে ফেলতেন। যাতে ধনাঢ্যতা সকল মানুষের মাঝে বণ্টিত হয়ে ব্যাপকভাবে সবার জীবনে সচ্ছলতা আসে। যেন জমা করে রাখা সম্পদ তার মালিকের দিকে অশুভ আজাব ও আল্লাহর ক্রোধের রূপ নিয়ে ফিরে না আসে কিয়ামত দিবসে। আবার এ বিষয়ে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ-ই তাদের কাছে উত্তম আদর্শ ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন।
একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ জান্নাতুল বাকি নামক কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু জার ﷺ-ও তাঁর সাথে মিলিত হলেন। চলার পথে রাসুলুল্লাহ বললেন, إِنَّ الْمُكْثِرِينَ هُمُ الْمُقِلُّونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، إِلَّا مَنْ قَالَ هَكَذَا وَهَكَذَا فِي حَقٌّ 'আজ যাদের দুনিয়ায় সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে, কাল কিয়ামতে তারা হবে দৈন্যগ্রস্ত। অবশ্য যারা এরূপ এরূপ দান-খয়রাত করবে, তাদের অবস্থা এমন হবে না।' অতঃপর তাদের সামনে উহুদ পাহাড় পড়ল। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, হে আবু জার। আবু জার বললেন, আমি হাজির হে আল্লাহর রাসুল! আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি হোক! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক! তারপর বললেন, مَا يَسُرُّنِي أَنَّ أُحُدًا لِآلِ مُحَمَّدٍ ذَهَبًا، فَيُمْسِي عِنْدَهُمْ دِينَارُ - أَوْ قَالَ: مِنْقَالُ এ উহুদ পাহাড় যদি মুহাম্মাদ ﷺ-এর পরিবারের জন্য স্বর্ণ হয়ে যায়, তবে সন্ধ্যার সময় তাদের নিকট তা থেকে এক দিনার বা এক মিসকালও অবশিষ্ট থাকবে, তা-ও আমি পছন্দ করি না।'৬৪১
সম্পদ জমা করা যে ইসলামে অপছন্দীয়, তা কুরাইশের ধনীদের ব্যাপারে উমর -এর অবস্থান থেকে আরও স্পষ্ট হয়। যুদ্ধের ব্যস্ততা থেকে ফারেগ হয়ে কুরাইশের ধনীরা যখন ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ বাড়ানোয় মনোনিবেশ করল এবং তাদের সম্পদে সমৃদ্ধি আসতে লাগল, তখন উমর তাদের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন এবং ঘোষণা দিলেন, 'সাবধান! কুরাইশরা আল্লাহর সম্পদকে তাদের মাঝে পুঞ্জিভূত করে নিতে চায়। সাবধান! খাত্তাবের পুত্র এখনো জীবিত আছে। সাবধান! আমি মদিনার প্রস্তরময় মরুপথে দাঁড়িয়ে থাকব এবং তাদের জমা করে রাখা সম্পদ কেড়ে নেব, যা তারা জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করতে যাচ্ছে।'৬৪২
উমর -এর এমন অবস্থানের কারণ দুটি। একটি হলো, সীমিত সংখ্যক মানুষের হাতে অধিকাংশ সম্পদ জমা করে রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারণ, তাদের হাতে এ সম্পদ জমা করে রাখা মানে সমাজের অধিকাংশ লোকদের হাত থেকে তা ছিনিয়ে নেওয়া। যার ফলশ্রুতিতে প্রতারণা, শ্রেণিবৈষম্য, সম্পদশালী হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জুলুম সমাজে বিস্তার লাভ করে, যে বিষয়গুলো ইসলামি সমাজে নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় কারণ হলো, উমর ঘোষণা দিলেন যে, তিনি মদিনার মরুপথে দাঁড়িয়ে থাকবেন এবং কুরাইশের ধনীদের হাত থেকে মাল কেড়ে নেবেন। তাদের সম্পদ মজুতদারি করতে দেবেন না তিনি। তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতেই তিনি এমনটি করলেন। তাদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে নয়; যেভাবে বস্তুবাদী সমাজে গরিবদের অন্তরে ধনীদের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা বিরাজ করে। সমানভাবে ধনী-গরিব উভয়ের কল্যাণের জন্য ইসলাম সমাজ থেকে ইনসাফ ও ন্যায় দাবি করে। এভাবে সম্পদ পুঞ্জিভূত করা ও মজুতদারি নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শ্রেণিবৈষম্য, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই বন্ধ করে দিয়েছে ইসলাম।
সারকথা হলো, ধনী ও গরিব উভয়ের জন্য দুটি ক্ষতির কারণে উমর সম্পদ মজুতদারি করতে নিষেধ করেছেন। একটি দুনিয়াবি ক্ষতি, যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আরেকটি দ্বীনি ক্ষতি, যা এখন আলোচনা করা হয়েছে। অর্থনীতির বিশ্বে দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে এমন সমন্বয় ও ভারসাম্য কেবল ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দেখাতে পেরেছে।
প্রকৃত মুসলমান উদার ও দানশীল হয়; যদিও সে অভাবী হয়। ইসলাম তার মাঝে তার চেয়ে অভাবী লোকদের প্রতি দয়া ও করুণা সৃষ্টি করে। সে অন্যের কষ্ট-দুর্দশা ও বঞ্চিত থাকার হতাশা অনুভব করতে পারে। এজন্য ইসলাম গরিব ও অভাবী লোকদেরও সাধ্যমতো দান করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। যাতে তারা ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য রক্ষার মহান কাজে নিজেদের শামিল করতে পারে। আর যারা নিজেদের অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের সদকার প্রতিদান দেওয়ার ও সম্পদ বাড়িয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। তবে শর্ত হলো, সদকা করতে হবে হালাল উপায়ে কামাইকৃত পবিত্র মাল থেকে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: مَنْ تَصَدَّقَ بِعَدْلِ تَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ، وَلَا يَقْبَلُ اللَّهُ إِلَّا الطَّيِّبَ، وَإِنَّ اللهَ يَتَقَبَّلُهَا بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يُرَبِّيهَا لِصَاحِبِهِ، كَمَا يُرَبِّي أَحَدُكُمْ فَلُوهُ، حَتَّى تَكُونَ مِثْلَ الجَبَلِ
'যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সদকা করবে, (আল্লাহ তা কবুল করবেন) এবং আল্লাহ কেবল পবিত্র মাল কবুল করেন আর তাঁর ডান হাত দিয়ে তা গ্রহণ করেন। এরপর আল্লাহ দাতার কল্যাণার্থে তা প্রতিপালন করেন, যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্বশাবক প্রতিপালন করে থাকে। অবশেষে সেই সদকা পাহাড় বরাবর হয়ে যাবে। '৬৪৩
সামাজিক কর্মে সবাইকে শরিক করার জন্য; পারস্পরিক ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার পথ বন্ধ না হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ গরিব ও অভাবী লোকদেরও সাধ্যমতো দান করতে উৎসাহিত করেছেন। অভাব-অনটনের অজুহাতে নিজেদের দান-খয়রাত ও সামাজিক কর্ম থেকে একদম দূরে থাকতে নিষেধ করেছেন। কেননা, এর কারণে ধ্বংস ও আজাব নেমে আসতে পারে।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
اِتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ 'জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকো; খেজুরের একটি অংশ সদকা করার মাধ্যমে হলেও। '৬৪৪
আল্লাহ তাআলা চান যে, মুসলমান ধনী হোক বা গরিব, সে যেন সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কর্মে নিজেকে শরিক করে। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ ধনী-গরিব সকল মুসলমানকে নিজেদের সাধ্যমতো ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রত্যেক ভালো কাজকে তিনি সদকা বলে অভিহিত করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ: يَعْتَمِلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ قَالَ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ قَالَ قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: يَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ أَوِ الْخَيْرِ قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যদি কেউ সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তখন কী করবে? বললেন, সে হাত দ্বারা কাজ করবে। এতে তার উপকারও হবে এবং সদকা করারও সামর্থ্য আসবে। তারা বললেন, যদি তারও সামর্থ্য না রাখে, অথবা বললেন, যদি তা-ও করতে না পারে, তখন কী করবে? বললেন, সে অভাবী দুঃখী মানুষকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদিও তা-ও না করে, তখন কী করবে? বললেন, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তখন কী করবে? তিনি বললেন, সে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কারণ, এটাও তার জন্য সদকা হবে। '৬৪৫
ইসলাম কল্যাণের পরিধিকে অনেক প্রশস্ত করেছে, যেন প্রত্যেক মুসলমান তাতে প্রবেশ করতে পারে। ফলে গরিব ব্যক্তি ধন-সম্পদ না থাকার কারণে নিজেকে সমাজের কল্যাণমূলক কাজ থেকে বঞ্চিত মনে করে না। সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে শরিক হওয়ার দরজা তার জন্যও উন্মুক্ত রেখেছে ইসলাম। তা এভাবে যে, গরিব ব্যক্তি কোনো উপকারী ভালো কর্ম করলে সেটা তার জন্য সদকা বলে অভিহিত করা হয়েছে, যার ওপর সাওয়াব দেওয়া হবে, যেভাবে ধনীকে তার দানের বিনিময়ে সাওয়াব দান করা হয়।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে: كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা। '৬৪৬
এভাবে ইসলাম ধনী-গরিব সকলকে সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে এবং সমাজসেবামূলক কাজে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রত্যেকের মনে একপ্রকার আনন্দের সঞ্চার করেছে, যা সে সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করার গৌরব অর্জন ও এর বিনিময়স্বরূপ সাওয়াব পাওয়ার মাঝে অনুভব করে।
ইসলাম বরাবরের মতো এ বিষয়েও مسلمانوں প্রতি সদয় থেকেছে। তাদের কাছ থেকে এমন কোনো কিছুর দাবি করেনি, যা দিতে তারা অসমর্থ। তাদের নিকট কেবল প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার দাবি জানিয়েছে। আর অভাবী লোকদের দান না করার কারণে তিরস্কার করা হয়নি। তবে তাদেরকে অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা, ইসলামে ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। তবে প্রয়োজন পূরণ করার পর যে সম্পদ অতিরিক্ত থাকে, তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করার কথা বলে ইসলাম। প্রকৃত মুসলমান সকল কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করে থাকে। কারণ, তার ধর্ম তাকে এ সবক দেয় যে, ব্যয় করলে কল্যাণ আর ব্যয় না করলে অকল্যাণ।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ أَنْ تَبْذُلَ الْفَضْلَ خَيْرٌ لَكَ، وَأَنْ تُمْسِكَهُ شَرُّ لَكَ، وَلَا تُلَامُ عَلَى كَفَافٍ، وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
'হে আদম-সন্তান, তোমার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে মালামাল রয়েছে, তা খরচ করতে থাকো। এটা তোমার জন্য উত্তম হবে। আর যদি তুমি তা দান না করে কুক্ষিগত করে রাখো, তাহলে এটা তোমার জন্য অকল্যাণ বয়ে আনবে। তবে প্রয়োজন পরিমাণ রাখায় কোনো দোষ নেই। এজন্য তোমাকে ভর্ৎসনাও করা হবে না। যাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব তোমার ওপর রয়েছে, তাদের দিয়েই দান শুরু করো। ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।'৬৪৭
প্রকৃত মুসলমান তার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা সাথে সাথে দান করে দেয়। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অভাবের কথা ভেবে অথবা প্রাচুর্যতায় এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য জমা করে রাখে না; বরং সে মনে করে, এমন অবস্থায় সদকা করলে তা সর্বোত্তম সদকা হবে এবং এর সাওয়াবও বেশি পাওয়া যাবে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরাইরা বলেন:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيُّ الصَّدَقَةِ أَعْظَمُ أَجْرًا؟ قَالَ: أَنْ تَصَدَّقَ وَأَنْتَ صَحِيحُ شَحِيحُ تَخْشَى الفَقْرَ، وَتَأْمُلُ الغِنَى، وَلَا تُمْهِلُ حَتَّى إِذَا بَلَغَتِ الخَلْقُومَ، قُلْتَ لِفُلَانٍ كَذَا، وَلِفُلَانٍ كَذَا وَقَدْ كَانَ لِفُلَانٍ
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, সাওয়াবের দিক বিবেচনায় কোন সদকা বেশি উত্তম? তিনি বললেন, সে সদকাই সর্বোত্তম, যা তুমি সুস্থ অবস্থায় করো, যখন তোমার অন্তরে কার্পণ্যভাব থাকে; তুমি দৈন্যতার ভয় করো এবং (দান না করলে) ধনাঢ্যতার আশা রাখো। দানের ব্যাপারে তুমি এমন সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকো না, যখন তোমার প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, তখন তুমি বলবে, অমুকের জন্য এতটা আর তমুকের জন্য অতটা; অথচ প্রকৃতপক্ষে তা অমুক-তমুকের জন্যই হয়েই গিয়েছে।'৬৪৮
প্রকৃত দানশীল মুসলমান তার দানের জন্য ওই শ্রেণির লোকদের নির্দিষ্ট করে, যারা দান ও সাহায্য-সহযোগিতার যথোপযুক্ত। তাই সে অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী এমন বঞ্চিত মিসকিনদের খুঁজে বের করে, যারা কাকুতি-মিনতি করে মানুষের কাছে ভিক্ষা চায় না এবং কারও নিকট সাহায্য না চাওয়ার কারণে লোকেরা তাদের সচ্ছল মনে করে। সে তাদের ঘরে গিয়ে দরজার কড়া নাড়ে। অতঃপর তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য পর্যাপ্ত হাদিয়া দেয়। আর এ সবকিছু লোকদের অগোচরে করে, যেন সমাজে তাদের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
কারণ, এ ধরনের মিসকিনরাই-যারা কারও নিকট সাহায্য চেয়ে বেড়ায় না-অনুদান ও উপহার পাওয়ার অধিক হকদার। এ ধরনের মিসকিনদের দান করার প্রতি রাসুলুল্লাহ গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন : 'মিসকিন সে নয়, যে একটি বা দুটি খেজুর অথবা একটি বা দুটি খাবারের লুকমা পেলে (খুশি হয়ে) ফিরে যায়। (প্রকৃত) মিসকিন তো সে ব্যক্তি, যে যাচনা করা তথা কারও নিকট কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকে।'
বুখারি ও মুসলিমের রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে :
لَيْسَ المِسْكِينُ الَّذِي يَطُوفُ عَلَى النَّاسِ تَرُدُّهُ اللُّقْمَةُ وَاللُّقْمَتَانِ، وَالتَّمْرَةُ وَالتَّمْرَتَانِ، وَلَكِنِ المِسْكِينُ الَّذِي لَا يَجِدُ غِنِّى يُغْنِيهِ، وَلَا يُفْطَنُ بِهِ، فَيُتَصَدَّقُ عَلَيْهِ وَلَا يَقُومُ فَيَسْأَلُ النَّاسَ
‘প্রকৃত মিসকিন সে নয়, যে মানুষের কাছে ভিক্ষার জন্য ঘুরে বেড়ায় এবং এক-দুই লুকমা অথবা এক-দুটি খেজুর পেলে ফিরে যায়। বরং প্রকৃত মিসকিন সে ব্যক্তি, যার এতটুকু সম্পদ নেই, যাতে তার প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে বুঝা যায় না যে, সে সদকার যোগ্য; আবার এদিকে সে মানুষের কাছে যাচনাও করে বেড়ায় না।’৬৪৯
প্রকৃত মুসলমান তার দান-খয়রাতের পাত্র হিসাবে এতিমকে বেছে নেয়। যথাসাধ্য এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। তার খোরপোশসহ বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করার জিম্মাদারি নেয়। চাই সে এতিম তার নিকটাত্মীয় হোক, কিংবা না হোক। এ কাজ করে সে এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া লোকের জন্য আল্লাহ তাআলা যে উচ্চ মর্যাদা নির্ধারিত করেছেন, তা পাওয়ার আশা রাখে এবং জান্নাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিবেশিত্বের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন করে।
সাহল বিন সাদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
أَنَا وَكَافِلُ اليَتِيمِ فِي الجَنَّةِ هَكَذَا وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالوُسْطَى، وَفَرَّجَ بَيْنَهُمَا شَيْئًا
‘আমি ও এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে থাকব। কথাটি বলার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ শাহাদাত আঙুল ও মধ্যমা আঙুলের মাঝে সামান্য ফাঁক রেখে আঙুলদ্বয় দিয়ে ইশারা করেন।’৬৫০
একইভাবে মুত্তাকি, পরোপকারী ও দানশীল মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় বিধবা ও নিঃস্বদের উপকার সাধনের চেষ্টা করে। কারণ, তার দ্বীন তাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তা ছাড়া বিধবা ও মিসকিনদের উপকার সাধন করলে আল্লাহ তাআলা এমন সাওয়াব দান করেন, যা রোজাদার, নফল ইবাদতকারী, এমনকি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী ব্যক্তির সাওয়াবের চেয়েও বেশি।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
السَّاعِي عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأَحْسِبُهُ قَالَ : كَالقَائِمِ لَا يَفْتُرُ، وَكَالصَّائِمِ لَا يُفْطِرُ
'বিধবা ও নিঃস্বের উপকার সাধনকারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য। (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা, তিনি এ কথাও বলেছেন, সেই নফল নামাজ আদায়কারীর সমতুল্য, যে নিরলসভাবে নামাজ আদায় করতে থাকে এবং সেই রোজাদারের সমতুল্য, যে বিরতিহীনভাবে রোজা রাখে। '৬৫১
প্রকৃত দানশীল মুসলমান তার দানশীলতা ও বদান্যতা এভাবে প্রকাশ করে। তার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। আসলে এভাবে দান করলেই তা নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত হবে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। বর্তমান সময়ে ওলিমাসহ বিভিন্ন উপলক্ষে ধনী ও সম্পদশালী লোকদের দাওয়াত করে প্রচুর ব্যয়বহুল যে খাবারের আয়োজন করা হয়—এ ধরনের বদান্যতা প্রকৃত মুসলমানের স্বভাব নয়। এ ধরনের আয়োজনের উদ্দেশ্য মোটেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নয়; বরং খ্যাতি, সুনাম ও উপকার-উপঢৌকন পাওয়ার জন্যই এমন আয়োজন করা হয়। এজন্য রাসুলুল্লাহ এমন আয়োজনের নিন্দা করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
بِئْسَ الطَّعَامُ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ، يُدْعَى إِلَيْهِ الْأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْمَسَاكِينُ
'সবচেয়ে খারাপ খাবার হলো সেই ওলিমার খাবার, যেখানে ধনীদের দাওয়াত করা হয় আর গরিবদের বঞ্চিত করা হয়।'
বিধবা ও নিঃস্বের উপকার সাধন করা, এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া ও তার প্রতি অনুগ্রহ করা—এসব কাজে বড় ধরনের সাওয়াব তো অর্জিত হয়-ই, পাশাপাশি এ ধরনের কাজ দানকারীর অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করে এবং তার মাঝে মানবতাবোধ বৃদ্ধি করে। তার হৃদয়কে নরম ও কোমল করে। দান করার মাঝে যে স্বাদ রয়েছে, তা সে অনুভব করতে পারে। এভাবে সে আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হয়। এজন্য রাসুলুল্লাহ অন্তরের কঠোরতা রোগের চিকিৎসাস্বরূপ উক্ত কাজগুলো করার নির্দেশ দিতেন। এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-এর নিকট অন্তরের কঠোরতার অভিযোগ করলে তিনি বললেন :
امْسَحُ رَأْسَ الْيَتِيمِ، وَأَطْعِمِ الْمِسْكِينَ 'এতিমের মাথায় হাত বুলাও এবং নিঃস্বকে খাবার খাওয়াও। '৬৫২

টিকাঃ
৬৪৮. শেষোক্ত কথাটির ব্যাখ্যা হলো, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে যখন নিজের ভোগ-দখলের সময় অতিবাহিত হয়ে সম্পত্তি অন্যের ভোগ-দখলে যাওয়ার সময় হয়, তখন আর দান করার স্বার্থকতা কোথায়? দান যা করার, সুস্থ অবস্থায় করা উচিত, মৃত্যুশয্যায় নয়। (অনুবাদক)

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 দান করার পর খোঁটা দেয় না

📄 দান করার পর খোঁটা দেয় না


প্রকৃত মুসলমান দান করার পর সে দানের খোঁটা দেয় না। প্রকৃত মুসলমান সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
الَّذِينَ يُنْfِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مَنَّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ 'যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, এরপর ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো ভয় নেই আর তারা চিন্তিতও হবে না। '৬৫৩
তা ছাড়া সে জানে যে, খোঁটা দেওয়া ও কষ্ট দেওয়া-এ দুটি বিষয় আমলকে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করে এবং সাওয়াবকে সবচেয়ে বেশি বিনষ্ট করে দেয়। খোঁটা দিলে আমল ও সাওয়াব ধ্বংস হয়ে যায়, এ কথা স্বয়ং আল্লাহ-ই পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর সে নিষেধবাণী ও ঘোষণা তার কানে বাজতে থাকে এবং তার ভেতরকে আন্দোলিত করে। ফলে সে খোঁটা দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার কথা কল্পনাই করতে পারে না।
আয়াতটি হলো :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى 'হে ইমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ কোরো না। '৬৫৪
গরিব অভাবী মানুষকে দান করার পর খোঁটা দিলে তার মানবসত্তাকে চরমভাবে অপমানিত করা হয় এবং তার সম্মানের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়। এ বিষয়গুলো ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ। ইসলাম দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে পরস্পর ভাই বলে। তাকওয়া ও নেক আমলের তারতম্য ব্যতীত তাদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই। আর ভাই তার ভাইকে কী করে খোঁটা দিতে পারে? কীভাবে তার সম্মানে আঘাত হানতে পারে? এজন্য যারা উপকার করার পর খোঁটা দেয়, তাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ কঠিন হুমকি বাণী উচ্চারণ করেছেন। তাদের তিনি সেসব কপালপোড়া লোকের দলভুক্ত বলেছেন, যাদের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, যাদের দিকে তাকাবেন না, যাদের গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না এবং যাদের জন্য থাকবে মর্মন্তুদ শাস্তি।
হাদিসটি হলো, আবু জার বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ قَالَ: فَقَرَأَهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَ مِرَارًا ، قَالَ أَبُو ذَرٍّ : خَابُوا وَخَسِرُوا مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الْمُسْبِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ 'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের (গুনাহ থেকে) পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন, রাসুলুল্লাহ এ কথাটি তিনবার বললেন। আবু জার বললেন, তারা তো ধ্বংস হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে! হে আল্লাহর রাসুল, এরা কারা? তিনি বললেন, যে লোক পায়ের গোছার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখে, যে লোক দান করার পর তার খোঁটা দেয় এবং যে লোক মিথ্যা শপথ করে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে। '৬৫৫

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অতিথিপরায়ণ

📄 অতিথিপরায়ণ


প্রকৃত মুসলমান-যার মাঝে সত্যিকার অর্থে বদান্যতার গুণ আছে-অবশ্যই অতিথিপরায়ণ হয়। মেহমানকে হর্ষোৎফুল্লতার সহিত বরণ করে নেয় এবং সম্মান করে। কারণ, ইসলাম এ গুণটিকে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ইমান থাকার অন্যতম আলামত সাব্যস্ত করেছে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ইমান রাখে, যে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। '৬৫৬
অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি তার কর্মের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ইমান রাখে। মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে মেহমানের ন্যায্য অধিকার বলা হয়েছে ইসলামে। এটা মেহমানের প্রতি মেজবানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশও বটে। কারণ, মেহমান আসায় সে একটি নেক আমল (মেহমানকে সম্মান প্রদর্শন) করতে পেরেছে এবং তার ইমানকে সত্যায়িত করার সুযোগ পেয়েছে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ قَالَ: وَمَا جَائِزَتُهُ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: يَوْمُ وَلَيْلَةٌ، وَالضَّيَافَةُ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ، فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের (কিয়ামতের) ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন মেহমানকে সম্মান করার মাধ্যমে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে দেয়। লোকেরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তার ন্যায্য অধিকার কী? তিনি বললেন, এক দিন ও এক রাত তার মেহমানদারি করা। মেহমানদারি হলো (সর্বোচ্চ) তিন দিন। এর অতিরিক্ত করলে তা হবে সদকা অর্থাৎ অতিরিক্ত বদান্যতা’।
আতিথেয়তা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল, যা প্রকৃত মুসলমানের নিকট খুবই প্রিয়। এ আমলের জন্য সাওয়াব প্রদান করা হয়। তাই ইসলাম এর জন্য বিধান প্রণয়ন করে দিয়েছে। এক দিন, এক রাত মেহমানদারি করা মেহমানের অধিকার। তিন দিন, তিন রাত মেহমানদারি করা ওয়াজিব। এর চেয়ে অতিরিক্ত সময় মেহমানদারি করা সদকা বা অতিরিক্ত বদান্যতা। মেজবানের আমলনামায় তার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে।
আতিথেয়তা ইসলামে ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। ব্যক্তি স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে কারও মেহমানদারি করবে, আর কারও করবে না—এ সুযোগ ইসলামে নেই। এটা मुसलमानों উপর ওয়াজিব ও আবশ্যক। কোনো মেহমান বাড়িতে উপস্থিত হলে অবশ্যই তার মেহমানদারি করতে হবে মুসলমানকে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
لَيْلَةَ الضَّيْفِ حَقٌّ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ، فَمَنْ أَصْبَحَ بِفِنَائِهِ فَهُوَ دَيْنُهُ، إِنْ شَاءَ اقْتَضَاهُ، وَإِنْ شَاءَ تَرَكَهُ
‘রাতের বেলায় আগত মেহমানের মেহমানদারি করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব। আর যদি তার নিকট মেহমানের ভোর হয় (অর্থাৎ ভোর পর্যন্ত যদি মেহমান সেখানে অবস্থান করে), তখন সকালের মেহমানদারি মেজবানের নিকট মেহমানের পাওনা স্বরূপ। মেহমান ইচ্ছা করলে এ পাওনা শোধ করে নিতে পারে, ইচ্ছা করলে তা ছেড়ে দিতে পারে’।
যারা মেহমানদারি করতে কুণ্ঠাবোধ করে এবং বাড়ির দরজা মেহমানের জন্য খুলে দেয় না, তাদের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।
হাদিস শরিফে এমনটাই বলা হয়েছে: لَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يُضِيفُ 'সে লোকের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, যে মেহমানদারি করে না।'৬৫৯
ইসলাম প্রত্যেক মুসলমানের ওপর মেহমানদারি আবশ্যক করেছে। এটাকে মেহমানের হক ও অধিকার সাব্যস্ত করেছে। এ অধিকার আদায়ে অবহেলা করা মুসলমানের জন্য উচিত নয়। কোনো গোত্রের লোকেরা যদি কৃপণতা করে মেহমানদারি করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে ইসলাম মেহমানকে এ অনুমতি দেয় যে, সে চাইলে তার অধিকার আদায় করতে তাদের বাধ্য করতে পারবে।
এ সম্পর্কিত একটি হাদিস ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উকবা বিন আমির থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন :
إِنَّكَ تَبْعَثُنَا، فَنَنْزِلُ بِقَوْمٍ لَا يَقْرُونَا، فَمَا تَرَى فِيهِ؟ فَقَالَ لَنَا: إِنْ نَزَلْتُمْ بِقَوْمٍ، فَأُمِرَ لَكُمْ بِمَا يَنْبَغِي لِلضَّيْفِ فَاقْبَلُوا، فَإِنْ لَمْ يَفْعَلُوا، فَخُذُوا مِنْهُمْ حَقَّ الضَّيْفِ '(আমি রাসুলুল্লাহ -কে বললাম,) আপনি কখনো কখনো আমাদের এমন সম্প্রদায়ের লোকের নিকট প্রেরণ করেন, যারা আমাদের মেহমানদারি করে না। এমতাবস্থায় আমরা কী করব? উত্তরে রাসুলুল্লাহ বললেন, যদি তোমরা কোনো এলাকায় গিয়ে পৌঁছো, তখন মেহমানদারিস্বরূপ তারা যা কিছু তোমাদের দেয়, তা সাদরে গ্রহণ করবে। আর যদি তারা তা না করে, তখন মেহমানদারির অধিকার তাদের থেকে (যেকোনো উপায়ে) আদায় করে নেবে।'৬৬০
মেহমানদারি ইসলামের একটি মৌলিক উত্তম চরিত্র। এজন্য প্রকৃত মুসলমানকে—তার আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক—মেহমানদারি করতে কার্পণ্য করতে দেখা যায় না। কারণ, ইসলাম তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট হয়, আর তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট হয়। ফলে সে হঠাৎ আসা মেহমানের মেহমানদারি করতেও কোনোরূপ সংকোচবোধ করে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : طَعَامُ الاثْنَيْنِ كَافِي الثَّلَاثَةِ، وَطَعَامُ الثَّلَاثَةِ كَافِي الْأَرْبَعَةِ 'দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট হয়, আর তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট হয়।'৬৬১
জাবির বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
طَعَامُ الرَّجُلِ يَكْفِي رَجُلَيْنِ، وَطَعَامُ رَجُلَيْنِ يَكْفِي أَرْبَعَةً، وَطَعَامُ أَرْبَعَةٍ يَكْفِي ثَمَانِيَةً 'একজনের খাবার দুজনের জন্য যথেষ্ট, দুজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট, আর চারজনের খানা আটজনের জন্য যথেষ্ট হয়।'৬৬২
প্রকৃত মুসলমান তার সাথে বেশি মানুষ খানা খাওয়াকে ভয় পায় না। অথচ পাশ্চাত্য সমাজে পূর্ব-আমন্ত্রণ ব্যতীত হঠাৎ কেউ উপস্থিত হলে মেজবান বিব্রতবোধ করে। এমন কোনো ব্যক্তিকে সে আপ্যায়ন করে না, যার জন্য পূর্ব থেকে খাবার তৈরি করা হয়নি। কিন্তু মুসলমান অপ্রত্যাশিত মেহমানকে সাদরে বরণ করে নেয় এবং তার সাথে খাবারে শরিক করে। এতে তার পেটে কয়েক লুকমা খাবার কম গেলেও সে কোনো সমস্যা অনুভব করে না। কেননা, প্রকৃত মুসলমানের কাছে ক্ষুধার চেয়ে মেহমানের মেহমানদারি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-এর নির্দেশ। তা ছাড়া আল্লাহ তাআলা একজনের খাবারে বরকত দান করে দুজনের জন্য যথেষ্ট করেছেন, দুজনের খাবারে বরকত দান করে চারজনের জন্য যথেষ্ট করেছেন। কিন্তু বস্তুবাদী সমাজের লোকেরা অপ্রত্যাশিত মেহমানকে মেহমানদারি করার কোনো প্রেরণা তাদের সমাজব্যবস্থা থেকে পায় না। তাই তারা প্রকৃত মুসলমানের মতো মেহমানদারির এমন নজির দেখাতে পারে না।
আমাদের সালাফে সালিহিন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এমনকি সালাফের মধ্য হতে কারও মেহমানদারি দেখে খোদ আল্লাহ তাআলাই আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন। ঘটনাটি ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন:
أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبَعَثَ إِلَى نِسَائِهِ فَقُلْنَ: مَا مَعَنَا إِلَّا المَاءُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَضُمُّ أَوْ يُضِيفُ هَذَا ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ: أَنَا، فَانْطَلَقَ بِهِ إِلَى امْرَأَتِهِ، فَقَالَ: أَكْرِمِي ضَيْفَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: مَا عِنْدَنَا إِلَّا قُوتُ صِبْيَانِي، فَقَالَ: هَيِّنِي طَعَامَكِ، وَأَصْبِحِي سِرَاجَكِ، وَنَوْمِي صِبْيَانَكِ إِذَا أَرَادُوا عَشَاءً، فَهَيَّأَتْ طَعَامَهَا، وَأَصْبَحَتْ سِرَاجَهَا، وَنَوَّمَتْ صِبْيَانَهَا، ثُمَّ قَامَتْ كَأَنَّهَا تُصْلِحُ سِرَاجَهَا فَأَطْفَأَتْهُ، فَجَعَلَا يُرِيَانِهِ أَنَّهُمَا يَأْكُلَانِ، فَبَاتَا طَاوِيَيْنِ، فَلَمَّا أَصْبَحَ غَدَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: ضَحِكَ اللهُ اللَّيْلَةَ، أَوْ عَجِبَ، مِنْ فَعَالِكُمَا فَأَنْزَلَ اللهُ: {وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} [الحشر: ٩]
'এক ব্যক্তি নবিজি -এর নিকট আসলো। তিনি তাঁর স্ত্রীদের নিকট (মেহমানের জন্য খাবার আনতে) লোক পাঠালেন। তারা জানালেন যে, আমাদের নিকট পানি ছাড়া খাওয়ার মতো কিছুই নেই। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, কে এ ব্যক্তিকে মেহমান বানাবে? তখন আনসার সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বললেন, আমি। তারপর তিনি তাকে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসুলুল্লাহ -এর মেহমানের আপ্যায়ন করো। স্ত্রী বললেন, 'ছেলেমেয়ের রাতের খাবার ছাড়া ঘরে তো আর কিছুই নেই। তিনি বললেন, খাবার প্রস্তুত করো এবং বাতি জ্বালিয়ে রাখো। আর ছেলেমেয়েরা রাতের খাবার খেতে চাইলে তাদের প্রবোধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। মহিলাটি স্বামীর কথামতো খাবার প্রস্তুত করলেন, বাতি জ্বালিয়ে রাখলেন এবং সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তারপর মেহমানের সামনে বাতি ঠিক করার ছুতোয় তা নিভিয়ে দিলেন; যেন মেহমান মনে করে, অন্ধকারে তারাও খাচ্ছে। এভাবে তারা স্বামী-স্ত্রী উপোস থেকে রাত কাটালেন। অতঃপর যখন সকালে রাসুলুল্লাহ -এর দরবারে গেলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের গতরাতের কার্যকলাপে হেসে দিয়েছেন অর্থাৎ তা খুবই পছন্দ করেছেন এবং আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, 'আর নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম [সুরা আল-হাশর : ৯]।'৬৬৩
এখানে বাতি নিভিয়ে দিয়ে খুবই বুদ্ধিমত্তার কাজ করেছেন তিনি। যদি তা না করতেন, তাহলে মেহমান বুঝতে পারতেন যে, তাদের খাওয়ার মতো আসলে কিছুই নেই। তখন তার কারণে মেজবান কষ্ট পাচ্ছে দেখে তিনি খুব ব্যথা পেতেন এবং বিব্রতবোধ করতেন। কেননা, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন : وَلَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ مُسْلِمٍ أَنْ يُقِيمَ عِنْدَ أَخِيهِ حَتَّى يُؤْثِمَهُ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَكَيْفَ يُؤْثِمُهُ؟ قَالَ: يُقِيمُ عِنْدَهُ وَلَا شَيْءَ لَهُ يَقْرِيهِ بِهِ
'কোনো মুসলমানের জন্য এটা হালাল নয় যে, তার কোনো ভাইকে পাপে লিপ্ত করে তার নিকট অবস্থান করবে। সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তাকে পাপে লিপ্ত করার অর্থ কী? উত্তরে তিনি বললেন, তার কাছে এমন অবস্থায় মেহমান হওয়া, যখন মেহমানাদারি করার মতো কোনো বস্তুই তার কাছে থাকে না। '৬৬৪
বুখারি শরিফের রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে : وَلَا يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَثْوِيَ عِنْدَهُ حَتَّى يُخْرِجَهُ
‘তার জন্য এটা হালাল নয় যে, অপর ভাইকে কষ্ট দিয়ে তার নিকট অবস্থান করবে। '৬৬৫
আর প্রকৃত মুসলমান কখনো তার মেজবান ভাইকে পাপে লিপ্ত করতে বা কষ্ট দিতে চায় না। মুসলমান মেহমান ভদ্র ও চরিত্রবান হয়। একজন মেহমানের কী কী চরিত্র ও আদব থাকা চাই, সে শিক্ষা ইসলাম তাকে দিয়েছে। সুতরাং সে মেজবানের ওপর যথাসম্ভব সহজ করার চেষ্টা করে। মেজবান তার সাধ্য অনুযায়ী যা দিয়েই আপ্যায়ন করে, তা-ই বিনাদ্বিধায় ও কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করে নেয়।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়

📄 নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়


প্রকৃত মুসলমান অন্যকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেয়; যদিও এতে নিজের ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকুক। কারণ, ইসলাম তার অনুসারীদের এ গুণ অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটাকেই প্রকৃত মুসলমানের একটি মৌলিক চরিত্র বলে অভিহিত করেছে ইসলাম। এ চরিত্রের মাধ্যমেই অন্যান্য মানুষের মাঝে প্রকৃত মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।
অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পরে সবচেয়ে বেশি ছিল আনসার সাহাবিদের মাঝে। তাদের এ গুণের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার যে মহান কর্ম তারা সম্পাদন করেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানবতার ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আহ, কেমন সে অগ্রাধিকার! মুহাজিরগণ তাদের নিকট গিয়েছিলেন কোনো কিছু ছাড়াই, কিন্তু আনসারগণ তাদের সবকিছুই দিয়ে দিয়েছেন!
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।'৬৬৬
রাসুলুল্লাহ-এর মাঝে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এজন্য তিনি প্রাথমিক যুগের مسلمانوں মাঝে এ গুণটি বদ্ধমূল করে দিতে এবং এটাকে তাদের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ সম্পর্কে সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন : أَنَّ امْرَأَةً جَاءَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبُرْدَةٍ مَنْسُوجَةٍ، فِيهَا حَاشِيَتُهَا، أَتَدْرُونَ مَا البُرْدَةُ؟ قَالُوا : الشَّمْلَةُ، قَالَ: نَعَمْ، قَالَتْ: نَسَجْتُهَا بِيَدِي فَجِئْتُ لِأَكْسُوَكَهَا، فَأَخَذَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْتَاجًا إِلَيْهَا، فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَإِنَّهَا إِزَارُهُ، فَحَسَّنَهَا فُلَانٌ، فَقَالَ: اكْسُنِيهَا، مَا أَحْسَنَهَا، قَالَ القَوْمُ: مَا أَحْسَنْتَ لَبِسَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْتَاجًا إِلَيْهَا ، ثُمَّ سَأَلْتَهُ، وَعَلِمْتَ أَنَّهُ لَا يَرُدُّ، قَالَ: إِنِّي وَاللَّهِ، مَا سَأَلْتُهُ لِأَلْبَسَهُ، إِنَّمَا سَأَلْتُهُ لِتَكُونَ كَفَنِي، قَالَ سَهْلُ: فَكَانَتْ كَفَنَهُ
‘এক মহিলা নবিজি-এর নিকট ঝালরবিশিষ্ট একটি বুরদাহ আনলেন। সাহল বললেন, তোমরা জানো, বুরদাহ কী? তারা বলল, চাদর। সাহল বললেন, হ্যাঁ। মহিলাটি বলল, চাদরটি আমি নিজ হাতে বুনেছি এবং তা আপনার পরিধানের জন্য নিয়ে এসেছি। রাসুলুল্লাহ তা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর চাদরের প্রয়োজনও ছিল। তারপর তিনি তা ইজাররূপে (লুঙ্গি) পরিধান করে আমাদের সামনে আসলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করে বললেন, বাহ! এ যে কত সুন্দর! আমাকে তা পরার জন্য দান করুন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এরপর নবিজি মজলিসে কিছুক্ষণ বসে আবার ফিরে গেলেন। তারপর চাদরটি খুলে সে ব্যক্তির নিকট পাঠিয়ে দিলেন। সাহাবিগণ তাকে বললেন, কাজটি তুমি ভালো করোনি। নবিজি তা তাঁর প্রয়োজনে পরেছেন, তবুও তুমি তা চেয়ে বসলে! অথচ তুমি জানো যে, তিনি কাউকে বিমুখ করেন না। লোকটি বলল, আল্লাহর কসম! আমি তা পরার উদ্দেশ্যে চাইনি। আমার চাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, যেন তা আমার কাফন হয়। সাহল বলেন, শেষে এ চাদরটাই তার কাফন হয়েছিল। '৬৬৭
রাসুলুল্লাহ অগ্রাধিকার প্রদানের যে চারা মুসলমানদের অন্তরে বপন করেছেন, তার ফল দেখতে পেলে তিনি মনে খুব আনন্দ পেতেন। কারও ভেতর এ গুণটি দেখতে পেলে তার প্রশংসা করতেন এবং তাকে আরও উৎসাহিত করতেন। যেমন আশআরি গোত্রের লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার গুণ সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الأَشْعَرِيِّينَ إِذَا أَرْمَلُوا فِي الغَزْوِ، أَوْ قَلَّ طَعَامُ عِيَالِهِمْ بِالْمَدِينَةِ جَمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَهُمْ فِي ثَوْبِ وَاحِدٍ ، ثُمَّ اقْتَسَمُوهُ بَيْنَهُمْ فِي إِنَاءٍ وَاحِدٍ بِالسَّوِيَّةِ، فَهُمْ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُمْ
'মদিনায় আশআরি গোত্রের লোকেরা যখন যুদ্ধে অপারগ হয়ে পড়ে অথবা তাদের পরিবার ও সন্তানদের খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছের অবশিষ্ট খাদ্য একটি কাপড়ে জমা করে। অতঃপর তা পরস্পরের মধ্যে সমান অংশে বণ্টন করে নেয়। এরা আমারই লোক, আর আমিও তাদের লোক (অর্থাৎ তাদের এ কর্মটি আমারই আদর্শ)। '৬৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00