📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 দাওয়াতের সময় চতুরতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়

📄 দাওয়াতের সময় চতুরতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়


প্রকৃত মুসলমান লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করে। প্রচুর সময় নিয়ে তাদের দ্বীনের বিধানসমূহ শিক্ষা দেয়। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সে আল্লাহর এ বাণীর ওপর পূর্ণাঙ্গ আমল করে :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'আপন পালনকর্তার পথে আহবান করুন উত্তমরূপে জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে। '৫৪৪
এর কারণ হলো, আল্লাহর পথের দায়িদের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হলো, অন্তরসমূহে খুব ভালোভাবে কথা ঢুকিয়ে দিতে পারা। যাতে তাদের নিকট ইমান পছন্দনীয় হয়ে ওঠে এবং দ্বীন কবুল করার প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। মানুষের বিরক্তিবোধ, কষ্ট বা রাগ আসে—এমন কোনো কাজ দায়িরা করে না। তাই সে একবারেই সব কথা বলে দেয় না। একদিনেই টেনে হিঁচড়ে হিদায়াতের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করে না। কয়েকবার করে ধাপে ধাপে দাওয়াত দেয়। একটু একটু করে অন্তরে অনুভূতি জাগ্রত করে। যাদের দাওয়াত দিচ্ছে, তাদের মাঝে বিরক্তিবোধ যেন না আসে, তার প্রতি খুব সজাগ থাকে। দাওয়াতের সময় রাসুলুল্লাহ-এর কর্মপন্থা এমনই ছিল।
আবু ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ عَبْدُ اللهِ يُذَكِّرُ النَّاسَ فِي كُلِّ خَمِيسٍ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ لَوَدِدْتُ أَنَّكَ ذَكَرْتَنَا كُلَّ يَوْمٍ؟ قَالَ: أَمَا إِنَّهُ يَمْنَعُنِي مِنْ ذَلِكَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أُمِلَّكُمْ، وَإِنِّي أَتَخَوَّلُكُمْ بِالْمَوْعِظَةِ، كَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِهَا، مَخَافَةَ السَّامَةِ عَلَيْنَا
'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের ওয়াজ করতেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দুর রহমান, আমি চাই, আপনি প্রতিদিন আমাদের ওয়াজ করবেন। তিনি বললেন, আমি এজন্যই তা করি না যে, এতে তোমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ সৃষ্টি হবে। আমি তোমাদের কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করি, যেভাবে নবিজি আমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ আসার আশঙ্কায় কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করতেন। '৫৪৫
দায়িদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার অন্যতম দিক হলো, খুতবা বা ওয়াজ বেশি দীর্ঘ না করা; বিশেষ করে তা যদি বড় সমাবেশের সামনে হয়, যেখানে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) ও রোগীও উপস্থিত থাকে। তাই খুতবা বা ওয়াজ সংক্ষিপ্ত করতে পারার যোগ্যতা দাওয়াতের ক্ষেত্রে খতিব বা ওয়াজকারীর ইলমি তাত্ত্বিকতার পরিচয় বহন করে।
এজন্য আম্মার বিন ইয়াসির-কে রাসুলুল্লাহ নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
إِنَّ طُولَ صَلَاةِ الرَّجُلِ ، وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ، مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ، فَأَطِيلُوا الصَّلَاةَ، وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ
'নিশ্চয় নামাজ দীর্ঘ করা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তাই নামাজকে দীর্ঘ করো আর খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করো।'৫৪৬
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ দায়িদের অন্যতম কর্মপন্থা হলো, তারা দাওয়াতের সময় খুব নম্রতা অবলম্বন করে। লোকদের অজ্ঞতা, ভুল ও বিরক্তিকর প্রশ্নগুলো বরদাশত করে। দাওয়াতের বিষয় তাদের সামনে পরিপূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেয়, কোনোরূপ অস্পষ্টতা রাখে না। দায়িরা আসলে এ ক্ষেত্রে দায়িদের সর্দার সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ-এর অনুসরণ করে। প্রশ্নকারীদের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তাদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নম্র ও কোমল থাকতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও স্বস্তিবোধ নিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দান করতেন। যতক্ষণ তারা পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম না হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের বিরক্তিবোধ ছাড়াই উদারচিত্তে তাদের বুঝিয়ে দিতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা মুআবিয়া বিন হাকাম সুলামি বর্ণনা করেছেন :
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ: يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ: وَاتُكْلَ أُمِّيَاهُ، مَا شَأْنُكُمْ؟ تَنْظُرُونَ إِلَيَّ، فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكِنِّي سَكَتُ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي، مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ، فَوَاللهِ، مَا كَهَرَنِي وَلَا ضَرَبَنِي وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ: «إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ» أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ، وَقَدْ جَاءَ اللهُ بِالْإِسْلَامِ، وَإِنَّ مِنَّا رِجَالًا يَأْتُونَ الْكُهَانَ، قَالَ: «فَلَا تَأْتِهِمْ» قَالَ: وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ، قَالَ: « ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ، فَلَا يَصُدَّنَّهُمْ - قَالَ ابْنُ الصَّبَّاحِ فَلَا يَصُدَّنَّكُمْ
'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে নামাজ পড়ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে আমি তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন!) বললাম। লোকেরা আমার দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, আমার মা আমার বিয়োগব্যথায় কাতর হোক। (অর্থাৎ এভাবে আমি নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলাম।) তোমাদের কী হলো? আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন? তখন তারা তাদের হাত দিয়ে উরুর ওপর আঘাত করে শব্দ করতে লাগল। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ হতে বলছে, তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ শেষ করলে আমি তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। আমার পিতা ও মা তার জন্য কুরবান হোক! আমি ইতিপূর্বে বা এর পরে আর কখনো কাউকে তার চেয়ে উত্তম পন্থায় শিক্ষা দিতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে ধমকালেন না, মারলেন না, বকাঝকাও করলেন না; বরং বললেন, নামাজের মধ্যে কথাবার্তা ধরনের কিছু বলা যথোচিত নয়; বরং নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন পাঠ করার নাম। অথবা রাসুলুল্লাহ যেরূপ বলেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সবেমাত্র জাহিলিয়াত বর্জন করেছি এবং আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা গণকদের কথায় বিশ্বাস করে। তিনি বললেন, তুমি গণকদের কাছে যেয়ো না। আমি বললাম, আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা শুভ-অশুভ নির্ধারণ করে থাকে। তিনি বললেন, এটা তাদের হৃদয়ের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এজন্য তারা এ থেকে বিরত থাকে না (আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই)। ৫৪৭
মানুষের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর কোমলতা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মন্দ কাজকারীকে তার মন্দ কাজের ব্যাপারে সরাসরি বলতেন না। কারণ, এতে তার অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা তার মর্যাদাহানি ঘটতে পারে। বরং তিনি তাওরিয়া বা পরোক্ষ উল্লেখের আশ্রয় নিয়ে তার মন্দ কাজের প্রতিবাদ করতেন এবং তাকে সতর্ক করতেন। এ পদ্ধতি অন্তরে খুব প্রভাব ফেলে এবং ভুল শুধরাতে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আয়িশা সিদ্দিকা বলেন: 'রাসুলুল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির (কোনো খারাপ কথার) ব্যাপারে জানলে “কী হলো অমুকের? সে এমন বলল কেন?”- এমনটি বলতেন না; বরং বলতেন, “লোকদের কী হলো? তারা এমন কথা বলছে কেন?” ৫৪৮
সফল দায়িদের আরেকটি গুণ হলো, শ্রোতার সামনে স্পষ্ট কথা বলা। একাধিকবার বলে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ এমনটাই করতেন।
আনাস বর্ণনা করেন :
إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلَاثًا، حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ، وَإِذَا أَتَى عَلَى قَوْمٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ কোনো কথা বললে তা তিনবার বলতেন, যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারে। আর কোনো জাতির নিকট গেলে তাদের তিনবার সালাম দিতেন। '৫৪
আয়িশা বলেন: كَانَ كَلَامُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلَامًا فَصْلًا يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ سَمِعَهُ
'রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন। প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা হৃদয়ংগম করতে পারত। ৫৫০

প্রকৃত মুসলমান লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করে। প্রচুর সময় নিয়ে তাদের দ্বীনের বিধানসমূহ শিক্ষা দেয়। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সে আল্লাহর এ বাণীর ওপর পূর্ণাঙ্গ আমল করে :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'আপন পালনকর্তার পথে আহবান করুন উত্তমরূপে জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে। '৫৪৪
এর কারণ হলো, আল্লাহর পথের দায়িদের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হলো, অন্তরসমূহে খুব ভালোভাবে কথা ঢুকিয়ে দিতে পারা। যাতে তাদের নিকট ইমান পছন্দনীয় হয়ে ওঠে এবং দ্বীন কবুল করার প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। মানুষের বিরক্তিবোধ, কষ্ট বা রাগ আসে—এমন কোনো কাজ দায়িরা করে না। তাই সে একবারেই সব কথা বলে দেয় না। একদিনেই টেনে হিঁচড়ে হিদায়াতের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করে না। কয়েকবার করে ধাপে ধাপে দাওয়াত দেয়। একটু একটু করে অন্তরে অনুভূতি জাগ্রত করে। যাদের দাওয়াত দিচ্ছে, তাদের মাঝে বিরক্তিবোধ যেন না আসে, তার প্রতি খুব সজাগ থাকে। দাওয়াতের সময় রাসুলুল্লাহ-এর কর্মপন্থা এমনই ছিল।
আবু ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ عَبْدُ اللهِ يُذَكِّرُ النَّاسَ فِي كُلِّ خَمِيسٍ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ لَوَدِدْتُ أَنَّكَ ذَكَرْتَنَا كُلَّ يَوْمٍ؟ قَالَ: أَمَا إِنَّهُ يَمْنَعُنِي مِنْ ذَلِكَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أُمِلَّكُمْ، وَإِنِّي أَتَخَوَّلُكُمْ بِالْمَوْعِظَةِ، كَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِهَا، mَخَافَةَ السَّامَةِ عَلَيْنَا
'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের ওয়াজ করতেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দুর রহমান, আমি চাই, আপনি প্রতিদিন আমাদের ওয়াজ করবেন। তিনি বললেন, আমি এজন্যই তা করি না যে, এতে তোমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ সৃষ্টি হবে। আমি তোমাদের কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করি, যেভাবে নবিজি আমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ আসার আশঙ্কায় কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করতেন। '৫৪৫
দায়িদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার অন্যতম দিক হলো, খুতবা বা ওয়াজ বেশি দীর্ঘ না করা; বিশেষ করে তা যদি বড় সমাবেশের সামনে হয়, যেখানে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) ও রোগীও উপস্থিত থাকে। তাই খুতবা বা ওয়াজ সংক্ষিপ্ত করতে পারার যোগ্যতা দাওয়াতের ক্ষেত্রে খতিব বা ওয়াজকারীর ইলমি তাত্ত্বিকতার পরিচয় বহন করে।
এজন্য আম্মার বিন ইয়াসির-কে রাসুলুল্লাহ নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
إِنَّ طُولَ صَلَاةِ الرَّجُلِ ، وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ، مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ، فَأَطِيلُوا الصَّلَاةَ، وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ
'নিশ্চয় নামাজ দীর্ঘ করা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তাই নামাজকে দীর্ঘ করো আর খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করো।'৫৪৬
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ দায়িদের অন্যতম কর্মপন্থা হলো, তারা দাওয়াতের সময় খুব নম্রতা অবলম্বন করে। লোকদের অজ্ঞতা, ভুল ও বিরক্তিকর প্রশ্নগুলো বরদাশত করে। দাওয়াতের বিষয় তাদের সামনে পরিপূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেয়, কোনোরূপ অস্পষ্টতা রাখে না। দায়িরা আসলে এ ক্ষেত্রে দায়িদের সর্দার সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ-এর অনুসরণ করে। প্রশ্নকারীদের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তাদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নম্র ও কোমল থাকতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও স্বস্তিবোধ নিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দান করতেন। যতক্ষণ তারা পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম না হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের বিরক্তিবোধ ছাড়াই উদারচিত্তে তাদের বুঝিয়ে দিতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা মুআবিয়া বিন হাকাম সুলামি বর্ণনা করেছেন :
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ: يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ: وَاتُكْلَ أُمِّيَاهُ، مَا شَأْنُكُمْ؟ تَنْظُرُونَ إِلَيَّ، فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكِنِّي سَكَتُ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي، مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ، فَوَاللهِ، مَا كَهَرَنِي وَلَا ضَرَبَنِي وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ: «إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ» أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ، وَقَدْ جَاءَ اللهُ بِالْإِسْلَامِ، وَإِنَّ مِنَّا رِجَالًا يَأْتُونَ الْكُهَانَ، قَالَ: «فَلَا تَأْتِهِمْ» قَالَ: وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ، قَالَ: « ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ، فَلَا يَصُدَّنَّهُمْ - قَالَ ابْنُ الصَّبَّاحِ فَلَا يَصُدَّنَّكُمْ
'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে নামাজ পড়ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে আমি তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন!) বললাম। লোকেরা আমার দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, আমার মা আমার বিয়োগব্যথায় কাতর হোক। (অর্থাৎ এভাবে আমি নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলাম।) তোমাদের কী হলো? আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন? তখন তারা তাদের হাত দিয়ে উরুর ওপর আঘাত করে শব্দ করতে লাগল। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ হতে বলছে, তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ শেষ করলে আমি তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। আমার পিতা ও মা তার জন্য কুরবান হোক! আমি ইতিপূর্বে বা এর পরে আর কখনো কাউকে তার চেয়ে উত্তম পন্থায় শিক্ষা দিতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে ধমকালেন না, মারলেন না, বকাঝকাও করলেন না; বরং বললেন, নামাজের মধ্যে কথাবার্তা ধরনের কিছু বলা যথোচিত নয়; বরং নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন পাঠ করার নাম। অথবা রাসুলুল্লাহ যেরূপ বলেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সবেমাত্র জাহিলিয়াত বর্জন করেছি এবং আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা গণকদের কথায় বিশ্বাস করে। তিনি বললেন, তুমি গণকদের কাছে যেয়ো না। আমি বললাম, আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা শুভ-অশুভ নির্ধারণ করে থাকে। তিনি বললেন, এটা তাদের হৃদয়ের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এজন্য তারা এ থেকে বিরত থাকে না (আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই)। ৫৪৭
মানুষের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর কোমলতা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মন্দ কাজকারীকে তার মন্দ কাজের ব্যাপারে সরাসরি বলতেন না। কারণ, এতে তার অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা তার মর্যাদাহানি ঘটতে পারে। বরং তিনি তাওরিয়া বা পরোক্ষ উল্লেখের আশ্রয় নিয়ে তার মন্দ কাজের প্রতিবাদ করতেন এবং তাকে সতর্ক করতেন। এ পদ্ধতি অন্তরে খুব প্রভাব ফেলে এবং ভুল শুধরাতে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আয়িশা সিদ্দিকা বলেন: 'রাসুলুল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির (কোনো খারাপ কথার) ব্যাপারে জানলে “কী হলো অমুকের? সে এমন বলল কেন?”- এমনটি বলতেন না; বরং বলতেন, “লোকদের কী হলো? তারা এমন কথা বলছে কেন?” ৫৪৮
সফল দায়িদের আরেকটি গুণ হলো, শ্রোতার সামনে স্পষ্ট কথা বলা। একাধিকবার বলে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ এমনটাই করতেন।
আনাস বর্ণনা করেন :
إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلَاثًا، حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ، وَإِذَا أَتَى عَلَى قَوْمٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ কোনো কথা বললে তা তিনবার বলতেন, যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারে। আর কোনো জাতির নিকট গেলে তাদের তিনবার সালাম দিতেন। '৫৪
আয়িশা বলেন: كَانَ كَلَامُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلَامًا فَصْلًا يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ sَمِعَهُ
'রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন। প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা হৃদয়ংগম করতে পারত। ৫৫০

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 শঠতা করে না

📄 শঠতা করে না


প্রকৃত মুসলমান শঠতা, চাটুকারিতা, আপাত সৌহার্দ্য দেখানো, মিথ্যা প্রশংসা ইত্যাকার হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা, তার দ্বীনের শিক্ষা তাকে এ ধরনের হীন ও গর্হিত কর্মের প্রতি যেতে বাধা প্রদান করে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ এসব হীন ও গর্হিত কর্মে লিপ্ত। আজ মানবসমাজ যে এত নিচে চলে এসেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ধ্বংসকারী শঠতা।
শঠতা ও চাটুকারিতার ধোঁকায় পড়ে অধঃপতনে না যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বনু আমির যখন রাসুলুল্লাহ -এর প্রশংসা করে বলল, আপনি আমাদের সর্দার, তখন তিনি বললেন, সর্দার হলেন আল্লাহ। তারা বলল, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান আর সবচেয়ে বেশি সামর্থ্যবান। তিনি বললেন, তোমরা সংযত কথা বলো (বাড়িয়ে কথা বলো না)। এ ক্ষেত্রে তোমরা শয়তানের প্রতিনিধি হয়ো না (অর্থাৎ শয়তানের কথা অনুযায়ী বাড়িয়ে কথা বলো না)। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে স্তরে রেখেছেন, সেখান থেকে তোমরা আমাকে ওপরে তোলো—তা আমি চাই না। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ এবং আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। ৫৫১
এই হাদিসটির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ প্রশংসা্য় অতিরঞ্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সর্দার, মর্যাদাবান ও সামর্থ্যবান হওয়ার গুণ নিয়ে প্রশংসাকারীদের নিষেধ করেছেন; অথচ নিঃসন্দেহে তিনি مسلمانوں সর্দার ও সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি। কারণ, তিনি জানতেন যে, প্রশংসার ধারা যদি শুরুতেই বন্ধ করে দেওয়া না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সে দরজা দিয়ে নিফাক বা শঠতার মতো মারাত্মক বিষয় প্রবেশ করবে, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামে যার কোনো জায়গা নেই।
রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে কারও সামনাসামনি প্রশংসা করতে বারণ করতেন। কারণ, এতে প্রশংসাকারীর ভেতর নিফাক বা শঠতা ঢুকে যেতে পারে। কিংবা প্রশংসিতের মাঝে আত্মতুষ্টি ও নিজেকে বড় মনে করার বিধ্বংসী মানসিকতা তৈরি হতে পারে।
ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু বাকরা থেকে বর্ণনা করেছেন :
أَثْنَى رَجُلٌ عَلَى رَجُلٍ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ: «وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ مِرَارًا، ثُمَّ قَالَ: «مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَادِحًا أَخَاهُ لَا مَحَالَةَ، فَلْيَقُلْ أَحْسِبُ فُلَانًا، وَاللَّهُ حَسِيبُهُ، وَلَا أُزَنِّي عَلَى اللَّهِ أَحَدًا أَحْسِبُهُ كَذَا وَكَذَا، إِنْ كَانَ يَعْلَمُ ذَلِكَ مِنْهُ»
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন, ধিক! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গর্দান কেটে দিয়েছ! কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, যদি তোমাদের কেউ তার সঙ্গীর একান্তই প্রশংসা করতে হয়, তবে তার এরূপ বলা উচিত, “অমুক সম্পর্কে আমার ধারণা এমন, তবে আল্লাহ-ই তার প্রকৃত অবস্থা নিরূপণকারী। আমি কাউকে আল্লাহর ওপর দিয়ে পবিত্রতা ঘোষণা করছি না। আমি শুধু তার সম্পর্কে এরূপ এরূপ ধারণা করি”-যদি সে (বাস্তবেই) তদ্রূপ জানে।'৫৫২
সুতরাং একান্তই যদি কারও প্রশংসা করতে হয়, তাহলে সত্য, যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন করা যাবে না। অন্যথায় সমাজে নিফাক, মিথ্যা, লৌকিকতা, কপটতা, ছলনা ইত্যাকার সমাজবিধ্বংসী বিষয়সমূহ ছড়িয়ে পড়বে।
ইমাম বুখারি তাঁর আল-আদাবুল মুফরাদে মিহজান আসলামি থেকে বর্ণনা করেন :
'একদিন রাসুলুল্লাহ ও মিহজান আসলামি মসজিদে ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ মসজিদে এক ব্যক্তিকে নামাজ, রুকু ও সিজদারত অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি কে? তখন মিহজান তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলতে লাগলেন, এ ব্যক্তির এমন এমন গুণ আছে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, থামো, তাকে শুনিয়ো না, নতুবা তুমি তার সর্বনাশ করে ফেলবে।'৫৫৩
মুসনাদে আহমাদের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
'হে আল্লাহর নবি, এ হচ্ছে মদিনার সর্বাধিক উত্তম আমলকারী ব্যক্তি। অথবা বললেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে সর্বাধিক নামাজ আদায়কারী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে শুনিয়ো না; নচেৎ তুমি তার সর্বনাশ করবে। কথাটি দুবার বা তিনবার বললেন। (তারপর বললেন,) তোমরা এমন উম্মত, যাদের সাথে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহজ ও সরলতার ইচ্ছা করা হয়েছে।
কাউকে শুনিয়ে তার প্রশংসা করাকে রাসুলুল্লাহ তাকে ধ্বংস করার নামান্তর বলেছেন। কেননা, এতে মানুষের মাঝে নিজের প্রশংসা শোনার যে মানবিক দুর্বলতা আছে, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন প্রশংসিত ব্যক্তিটি মিথ্যে অহমিকায় ডুবে যায়। তার মাঝে সৃষ্টি হয় অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও আত্মতুষ্টি। মুনাফিক ও প্রতারক প্রশংসাকারীরা যখন বারবার প্রশংসা করতে থাকে—তারা অধিকাংশ সময় প্রশাসক, উচ্চ দায়িত্বশীল ও শাসকদের প্রশংসা করে থাকে—তখন প্রশংসা শোনাটা তাদের নেশায় পরিণত হয়। প্রশংসা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তারা বসে থাকে। এজন্য উপদেশ ও বাস্তবভিত্তিক সমালোচনা তাদের মোটেও পছন্দ হয় না। প্রশংসায় যত বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন হয়, ততই তাদের ভালো লাগে। এই যদি হয়ে যায় মানুষের অবস্থা, তখন সত্য, ইনসাফ, মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু হবে না।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে অতিরঞ্জিত প্রশংসাকারীদের মুখে বালি নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সমাজে এ ধরনের লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায় এবং তাদের কারণে সমাজে নিফাক, চাটুকারিতা ও বালা-মুসিবত বৃদ্ধি না পায়।
ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিজি একাধিক সনদে বর্ণনা করেছেন:
'এক ব্যক্তি জনৈক শাসকের সম্মুখে তার প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ রাঃ তার মুখে বালি নিক্ষেপ করলেন। আর বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমরা (অতিরঞ্জিত) প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে বালি নিক্ষেপ করবে।' ৫৫৪
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম রাঃ প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। কাউকেই তাঁদের প্রশংসা করতে দিতেন না; অথচ নিঃসন্দেহে তাঁরা ছিলেন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ও হকদার। তবুও চাটুকারিতার ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। তাঁরা বাস্তবভিত্তিক ইসলামি চরিত্রে নিজেদের সাজাতেন, যা এ ধরনের সস্তা প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা নাফি রঃ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'এক ব্যক্তি ইবনে উমর রাঃ-কে “হে সর্বোত্তম লোক” অথবা “হে সর্বোত্তম লোকের ছেলে” বলে সম্বোধন করল। তখন ইবনে উমর রাঃ বললেন, আমি সর্বোত্তম লোক বা সর্বোত্তম লোকের সন্তান নই। আমি আল্লাহর একজন বান্দা। আল্লাহর নিকট (রহমতের) আশা করি এবং তাঁকে (অর্থাৎ তাঁর আজাবকে) ভয় করি। আল্লাহর শপথ! তোমরা তো দেখছি, কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করতে করতে তাকে ধ্বংসই করে ছাড়বে! ৫৫৫
এটি মহান ইসলামের মর্ম অনুধাবনকারী এবং ভেতরে ও বাইরে রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শে সজ্জিত এক মহান সাহাবির প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী।
আসলে রাসুলুল্লাহ তাঁর কথা ও কাজকে নিফাক থেকে দূরে রাখার কারণে সাহাবিদের মাঝে একটি সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারতেন, কোনটি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য আর কোনটিতে নিফাক ও তোষামোদ মিশ্রিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে বলল, আমরা যখন আমাদের শাসকদের নিকট যাই, তখন তাদের এমন কথা বলি, যা তাদের অগোচরে বলা কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ইবনে উমর বললেন «كُنَّا نَعُدُّ هَذَا نِفَاقًا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» “নবিজি -এর জীবদ্দশায় আমরা এটাকে নিফাক মনে করতাম। ৫৫৬

প্রকৃত মুসলমান শঠতা, চাটুকারিতা, আপাত সৌহার্দ্য দেখানো, মিথ্যা প্রশংসা ইত্যাকার হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা, তার দ্বীনের শিক্ষা তাকে এ ধরনের হীন ও গর্হিত কর্মের প্রতি যেতে বাধা প্রদান করে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ এসব হীন ও গর্হিত কর্মে লিপ্ত। আজ মানবসমাজ যে এত নিচে চলে এসেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ধ্বংসকারী শঠতা।
শঠতা ও চাটুকারিতার ধোঁকায় পড়ে অধঃপতনে না যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বনু আমির যখন রাসুলুল্লাহ -এর প্রশংসা করে বলল, আপনি আমাদের সর্দার, তখন তিনি বললেন, সর্দার হলেন আল্লাহ। তারা বলল, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান আর সবচেয়ে বেশি সামর্থ্যবান। তিনি বললেন, তোমরা সংযত কথা বলো (বাড়িয়ে কথা বলো না)। এ ক্ষেত্রে তোমরা শয়তানের প্রতিনিধি হয়ো না (অর্থাৎ শয়তানের কথা অনুযায়ী বাড়িয়ে কথা বলো না)। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে স্তরে রেখেছেন, সেখান থেকে তোমরা আমাকে ওপরে তোলো—তা আমি চাই না। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ এবং আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। ৫৫১
এই হাদিসটির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ প্রশংসা্য় অতিরঞ্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সর্দার, মর্যাদাবান ও সামর্থ্যবান হওয়ার গুণ নিয়ে প্রশংসাকারীদের নিষেধ করেছেন; অথচ নিঃসন্দেহে তিনি مسلمانوں সর্দার ও সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি। কারণ, তিনি জানতেন যে, প্রশংসার ধারা যদি শুরুতেই বন্ধ করে দেওয়া না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সে দরজা দিয়ে নিফাক বা শঠতার মতো মারাত্মক বিষয় প্রবেশ করবে, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামে যার কোনো জায়গা নেই।
রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে কারও সামনাসামনি প্রশংসা করতে বারণ করতেন। কারণ, এতে প্রশংসাকারীর ভেতর নিফাক বা শঠতা ঢুকে যেতে পারে। কিংবা প্রশংসিতের মাঝে আত্মতুষ্টি ও নিজেকে বড় মনে করার বিধ্বংসী মানসিকতা তৈরি হতে পারে।
ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু বাকরা থেকে বর্ণনা করেছেন :
أَثْنَى رَجُلٌ عَلَى رَجُلٍ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ: «وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ مِرَارًا، ثُمَّ قَالَ: «مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَادِحًا أَخَاهُ لَا مَحَالَةَ، فَلْيَقُلْ أَحْسِبُ فُلَانًا، وَاللَّهُ حَسِيبُهُ، وَلَا أُزَنِّي عَلَى اللَّهِ أَحَدًا أَحْسِبُهُ كَذَا وَكَذَا، إِنْ كَانَ يَعْلَمُ ذَلِكَ مِنْهُ»
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন, ধিক! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গর্দান কেটে দিয়েছ! কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, যদি তোমাদের কেউ তার সঙ্গীর একান্তই প্রশংসা করতে হয়, তবে তার এরূপ বলা উচিত, “অমুক সম্পর্কে আমার ধারণা এমন, তবে আল্লাহ-ই তার প্রকৃত অবস্থা নিরূপণকারী। আমি কাউকে আল্লাহর ওপর দিয়ে পবিত্রতা ঘোষণা করছি না। আমি শুধু তার সম্পর্কে এরূপ এরূপ ধারণা করি”-যদি সে (বাস্তবেই) তদ্রূপ জানে।'৫৫২
সুতরাং একান্তই যদি কারও প্রশংসা করতে হয়, তাহলে সত্য, যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন করা যাবে না। অন্যথায় সমাজে নিফাক, মিথ্যা, লৌকিকতা, কপটতা, ছলনা ইত্যাকার সমাজবিধ্বংসী বিষয়সমূহ ছড়িয়ে পড়বে।
ইমাম বুখারি তাঁর আল-আদাবুল মুফরাদে মিহজান আসলামি থেকে বর্ণনা করেন :
'একদিন রাসুলুল্লাহ ও মিহজান আসলামি মসজিদে ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ মসজিদে এক ব্যক্তিকে নামাজ, রুকু ও সিজদারত অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি কে? তখন মিহজান তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলতে লাগলেন, এ ব্যক্তির এমন এমন গুণ আছে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, থামো, তাকে শুনিয়ো না, নতুবা তুমি তার সর্বনাশ করে ফেলবে।'৫৫৩
মুসনাদে আহমাদের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
'হে আল্লাহর নবি, এ হচ্ছে মদিনার সর্বাধিক উত্তম আমলকারী ব্যক্তি। অথবা বললেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে সর্বাধিক নামাজ আদায়কারী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে শুনিয়ো না; নচেৎ তুমি তার সর্বনাশ করবে। কথাটি দুবার বা তিনবার বললেন। (তারপর বললেন,) তোমরা এমন উম্মত, যাদের সাথে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহজ ও সরলতার ইচ্ছা করা হয়েছে।
কাউকে শুনিয়ে তার প্রশংসা করাকে রাসুলুল্লাহ তাকে ধ্বংস করার নামান্তর বলেছেন। কেননা, এতে মানুষের মাঝে নিজের প্রশংসা শোনার যে মানবিক দুর্বলতা আছে, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন প্রশংসিত ব্যক্তিটি মিথ্যে অহমিকায় ডুবে যায়। তার মাঝে সৃষ্টি হয় অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও আত্মতুষ্টি। মুনাফিক ও প্রতারক প্রশংসাকারীরা যখন বারবার প্রশংসা করতে থাকে—তারা অধিকাংশ সময় প্রশাসক, উচ্চ দায়িত্বশীল ও শাসকদের প্রশংসা করে থাকে—তখন প্রশংসা শোনাটা তাদের নেশায় পরিণত হয়। প্রশংসা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তারা বসে থাকে। এজন্য উপদেশ ও বাস্তবভিত্তিক সমালোচনা তাদের মোটেও পছন্দ হয় না। প্রশংসায় যত বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন হয়, ততই তাদের ভালো লাগে। এই যদি হয়ে যায় মানুষের অবস্থা, তখন সত্য, ইনসাফ, মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু হবে না।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে অতিরঞ্জিত প্রশংসাকারীদের মুখে বালি নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সমাজে এ ধরনের লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায় এবং তাদের কারণে সমাজে নিফাক, চাটুকারিতা ও বালা-মুসিবত বৃদ্ধি না পায়।
ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিজি একাধিক সনদে বর্ণনা করেছেন:
'এক ব্যক্তি জনৈক শাসকের সম্মুখে তার প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ রাঃ তার মুখে বালি নিক্ষেপ করলেন। আর বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমরা (অতিরঞ্জিত) প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে বালি নিক্ষেপ করবে।' ৫৫৪
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম রাঃ প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। কাউকেই তাঁদের প্রশংসা করতে দিতেন না; অথচ নিঃসন্দেহে তাঁরা ছিলেন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ও হকদার। তবুও চাটুকারিতার ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। তাঁরা বাস্তবভিত্তিক ইসলামি চরিত্রে নিজেদের সাজাতেন, যা এ ধরনের সস্তা প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা নাফি রঃ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'এক ব্যক্তি ইবনে উমর রাঃ-কে “হে সর্বোত্তম লোক” অথবা “হে সর্বোত্তম লোকের ছেলে” বলে সম্বোধন করল। তখন ইবনে উমর রাঃ বললেন, আমি সর্বোত্তম লোক বা সর্বোত্তম লোকের সন্তান নই। আমি আল্লাহর একজন বান্দা। আল্লাহর নিকট (রহমতের) আশা করি এবং তাঁকে (অর্থাৎ তাঁর আজাবকে) ভয় করি। আল্লাহর শপথ! তোমরা তো দেখছি, কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করতে করতে তাকে ধ্বংসই করে ছাড়বে! ৫৫৫
এটি মহান ইসলামের মর্ম অনুধাবনকারী এবং ভেতরে ও বাইরে রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শে সজ্জিত এক মহান সাহাবির প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী।
আসলে রাসুলুল্লাহ তাঁর কথা ও কাজকে নিফাক থেকে দূরে রাখার কারণে সাহাবিদের মাঝে একটি সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারতেন, কোনটি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য আর কোনটিতে নিফাক ও তোষামোদ মিশ্রিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে বলল, আমরা যখন আমাদের শাসকদের নিকট যাই, তখন তাদের এমন কথা বলি, যা তাদের অগোচরে বলা কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ইবনে উমর বললেন «كُنَّا نَعُدُّ هَذَا نِفَاقًا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» “নবিজি -এর জীবদ্দশায় আমরা এটাকে নিফাক মনে করতাম। ৫৫৬

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 রিয়া ও অহংকার থেকে দূরে থাকে

📄 রিয়া ও অহংকার থেকে দূরে থাকে


প্রকৃত মুসলমান রিয়া (লৌকিকতা) থেকে অনেক দূরে থাকে। কারণ, রিয়া প্রতিদান ধ্বংস করে দেয়; আমল বাতিল করে দেয় এবং রাব্বুল আলামিনের সামনে দাঁড়ানোর দিনে লাঞ্ছনাকে আবশ্যক করে।
দ্বীন ইসলামের মগজ হলো, কথা ও কাজে ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। আর ইনসান ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত।
কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’৫৫৭
এ ইবাদত তখনই কবুল করা হবে, যখন তা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হবে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ 'তাদের এ ছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।'৫৫৮
তাই ইবাদতের সাথে রিয়া (লৌকিকতা) ও প্রকাশ পাওয়ার আগ্রহ যখনই মিশ্রিত হবে, সাথে সাথে তা বাতিল হয়ে যাবে এবং তার প্রতিদান নষ্ট হয়ে যাবে। এর প্রমাণ আমরা সেসব লোকের প্রতি আল্লাহর ভীতিপ্রদর্শনের মধ্যে পাই, যারা গরিবদের দান করার পর খোঁটা দেয় এবং বলে, আমরাই তোমাদের স্বাবলম্বী করেছি, তোমাদের অভাব আমরাই দূর করেছি, তোমাদের প্রয়োজনগুলো আমরাই পূরণ করেছি। এভাবে খোঁটা দিয়ে তারা গরিবদের সম্মানে আঘাত হানতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابُ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ 'হে ইমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ কোরো না সে ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর ওপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ওই বস্তুর কোনো সাওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।'৫৫৯
আয়াত থেকে বুঝা গেল, গরিবদের দান করার পর তাদেরকে খোঁটা দেওয়া দানের সাওয়াবকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দেয়, যেমনিভাবে প্রবাহিত পানি মসৃণ পাথরের ওপর থাকা ধুলোবালি নিঃশেষ করে দেয়। আয়াতের শেষে সবচেয়ে ভীতিকর কথাটি বলেছেন আল্লাহ তাআলা। যার মর্ম হলো, খোঁটা দেওয়া লোকেরা অর্থাৎ লোক দেখানোর জন্য যারা আমল করে, তারা আল্লাহর হিদায়াতের অযোগ্য এবং কাফিরদের দলভুক্ত।
তিনি বলেছেন:
وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
'আর আল্লাহ কাফির-সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।'
এর কারণ হলো, লোক দেখানো ইবাদতকারী এসব লোকের আসল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের সামনে নেক আমলের প্রদর্শনী। আল্লাহর সন্তুষ্টি তাদের উদ্দেশ্য নয়।
এদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
'(তারা নামাজ পড়ে) লোক দেখানোর জন্য। বস্তুত, তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।'৫৬০
তাদের আমল তাদের দিকেই ছুড়ে মারা হয়। কেননা, তারা আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করে। আর আল্লাহ তাআলা কেবল সে আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য করা হয়।
আবু হুরাইরা -এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি :
قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আমি শরিকদের শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে, যাতে আমার সাথে অন্যকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি।'৫৬১
এ বিষয়টিকে রাসুলুল্লাহ আরও খোলাখুলিভাবে আলোচনা করেছেন। কিয়ামতের ভয়ংকর দিনে—যেদিন পরিশুদ্ধ কলব ছাড়া সম্পদ ও সন্তানাদি কোনো কাজে আসবে না—এসব লোক দেখানো ইবাদতকারীর কী ধরনের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিকার হতে হবে, তা তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসটিও আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ، وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ، وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمُ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِيُّ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ: هُوَ جَوَادٌ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ، ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ،
'কিয়ামতের দিন প্রথমে এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে ফয়সালা হবে, যে শহিদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও তার সামনে পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কী কাজ করেছ? সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহিদ হয়েছি।
তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর-বাহাদুর বলবে! আর তা বলা হয়ে গেছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পরবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি তোমার নিয়ামতের সদ্ব্যবহার করেছ? সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এ উদ্দেশ্যেই বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলিম বা বিদ্বান বলবে এবং কুরআন এজন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে কারি বলা হবে। আর তা বলাও হয়ে গেছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে অজস্র ধন-দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ সম্পদ দ্বারা তুমি কী কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যয় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন, এমন কোনো খাত আমি বাদ দিইনি; বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এজন্যই দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দানবীর বলবে। আর তা বলাও হয়ে গেছে। অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে। '৫৬২
হাদিসে এমন বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোতে সাধারণত রিয়া, অহংকার এবং আমলের মাধ্যমে দাম্ভিকতা প্রদর্শন বেশি সংঘটিত হয়। অর্থাৎ বীরত্ব, ইলম ও দানশীলতা। এসব বিষয়ে যারা রিয়া করে, তাদেরকে লোকদের সামনে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে, যাদের মধ্যে এমন লোকও থাকবে, যারা এদেরকে প্রশংসিত স্থানের অধিকারী মনে করত। হাদিসে তাদের বড় ধ্বংসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদেরকে তাদের আমলের বিনিময়ে চিরস্থায়ী জান্নাতের আরাম-আয়েশে রাখা তো দূরের কথা, উল্টো তাদেরকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
প্রকৃত মুসলমান—যে দ্বীনের বিধানাবলির ব্যাপারে সচেতন এবং ইসলামের আদর্শ সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করে—সে তার সকল আমলে রিয়া থেকে বেঁচে থাকে। সকল আমল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করার চেষ্টা করে। কারণ, সে পরিপূর্ণরূপে রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিস অনুযায়ী আমল করে, যে হাদিসে ইরশাদ করা হয়েছে :
مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَانِي اللهُ بِهِ
‘যে ব্যক্তি লোক-শোনানো আমল করবে, আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) তার লোক-শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক-দেখানো আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তার লোক- দেখানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন।’ ৫৬৩

প্রকৃত মুসলমান রিয়া (লৌকিকতা) থেকে অনেক দূরে থাকে। কারণ, রিয়া প্রতিদান ধ্বংস করে দেয়; আমল বাতিল করে দেয় এবং রাব্বুল আলামিনের সামনে দাঁড়ানোর দিনে লাঞ্ছনাকে আবশ্যক করে।
দ্বীন ইসলামের মগজ হলো, কথা ও কাজে ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। আর ইনসান ও জিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত।
কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’৫৫৭
এ ইবাদত তখনই কবুল করা হবে, যখন তা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হবে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ 'তাদের এ ছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।'৫৫৮
তাই ইবাদতের সাথে রিয়া (লৌকিকতা) ও প্রকাশ পাওয়ার আগ্রহ যখনই মিশ্রিত হবে, সাথে সাথে তা বাতিল হয়ে যাবে এবং তার প্রতিদান নষ্ট হয়ে যাবে। এর প্রমাণ আমরা সেসব লোকের প্রতি আল্লাহর ভীতিপ্রদর্শনের মধ্যে পাই, যারা গরিবদের দান করার পর খোঁটা দেয় এবং বলে, আমরাই তোমাদের স্বাবলম্বী করেছি, তোমাদের অভাব আমরাই দূর করেছি, তোমাদের প্রয়োজনগুলো আমরাই পূরণ করেছি। এভাবে খোঁটা দিয়ে তারা গরিবদের সম্মানে আঘাত হানতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابُ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ 'হে ইমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ কোরো না সে ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর ওপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ওই বস্তুর কোনো সাওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।'৫৫৯
আয়াত থেকে বুঝা গেল, গরিবদের দান করার পর তাদেরকে খোঁটা দেওয়া দানের সাওয়াবকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দেয়, যেমনিভাবে প্রবাহিত পানি মসৃণ পাথরের ওপর থাকা ধুলোবালি নিঃশেষ করে দেয়। আয়াতের শেষে সবচেয়ে ভীতিকর কথাটি বলেছেন আল্লাহ তাআলা। যার মর্ম হলো, খোঁটা দেওয়া লোকেরা অর্থাৎ লোক দেখানোর জন্য যারা আমল করে, তারা আল্লাহর হিদায়াতের অযোগ্য এবং কাফিরদের দলভুক্ত।
তিনি বলেছেন:
وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
'আর আল্লাহ কাফির-সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।'
এর কারণ হলো, লোক দেখানো ইবাদতকারী এসব লোকের আসল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের সামনে নেক আমলের প্রদর্শনী। আল্লাহর সন্তুষ্টি তাদের উদ্দেশ্য নয়।
এদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
'(তারা নামাজ পড়ে) লোক দেখানোর জন্য। বস্তুত, তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।'৫৬০
তাদের আমল তাদের দিকেই ছুড়ে মারা হয়। কেননা, তারা আল্লাহর সাথে অন্যকে শরিক করে। আর আল্লাহ তাআলা কেবল সে আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য করা হয়।
আবু হুরাইরা -এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি :
قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي، تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আমি শরিকদের শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে, যাতে আমার সাথে অন্যকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি।'৫৬১
এ বিষয়টিকে রাসুলুল্লাহ আরও খোলাখুলিভাবে আলোচনা করেছেন। কিয়ামতের ভয়ংকর দিনে—যেদিন পরিশুদ্ধ কলব ছাড়া সম্পদ ও সন্তানাদি কোনো কাজে আসবে না—এসব লোক দেখানো ইবাদতকারীর কী ধরনের লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিকার হতে হবে, তা তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসটিও আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ، وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ، وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمُ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِيُّ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ: هُوَ جَوَادٌ، فَقَدْ قِيلَ ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ، ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ،
'কিয়ামতের দিন প্রথমে এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে ফয়সালা হবে, যে শহিদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও তার সামনে পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কী কাজ করেছ? সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহিদ হয়েছি।
তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর-বাহাদুর বলবে! আর তা বলা হয়ে গেছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পরবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি তোমার নিয়ামতের সদ্ব্যবহার করেছ? সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এ উদ্দেশ্যেই বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলিম বা বিদ্বান বলবে এবং কুরআন এজন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে কারি বলা হবে। আর তা বলাও হয়ে গেছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে অজস্র ধন-দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ সম্পদ দ্বারা তুমি কী কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যয় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন, এমন কোনো খাত আমি বাদ দিইনি; বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এজন্যই দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দানবীর বলবে। আর তা বলাও হয়ে গেছে। অতঃপর নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে। '৫৬২
হাদিসে এমন বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোতে সাধারণত রিয়া, অহংকার এবং আমলের মাধ্যমে দাম্ভিকতা প্রদর্শন বেশি সংঘটিত হয়। অর্থাৎ বীরত্ব, ইলম ও দানশীলতা। এসব বিষয়ে যারা রিয়া করে, তাদেরকে লোকদের সামনে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে, যাদের মধ্যে এমন লোকও থাকবে, যারা এদেরকে প্রশংসিত স্থানের অধিকারী মনে করত। হাদিসে তাদের বড় ধ্বংসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদেরকে তাদের আমলের বিনিময়ে চিরস্থায়ী জান্নাতের আরাম-আয়েশে রাখা তো দূরের কথা, উল্টো তাদেরকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
প্রকৃত মুসলমান—যে দ্বীনের বিধানাবলির ব্যাপারে সচেতন এবং ইসলামের আদর্শ সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করে—সে তার সকল আমলে রিয়া থেকে বেঁচে থাকে। সকল আমল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করার চেষ্টা করে। কারণ, সে পরিপূর্ণরূপে রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিস অনুযায়ী আমল করে, যে হাদিসে ইরশাদ করা হয়েছে :
مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَانِي اللهُ بِهِ
‘যে ব্যক্তি লোক-শোনানো আমল করবে, আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) তার লোক-শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক-দেখানো আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তার লোক- দেখানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন।’ ৫৬৩

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অন্যের বিপদে খুশি হয় না

📄 অন্যের বিপদে খুশি হয় না


প্রকৃত মুসলমান অন্যের বিপদ ও দুর্দশা দেখে আনন্দিত ও উল্লসিত হয় না। কারণ, অন্যের বিপদ দেখে খুশি হওয়া খুব খারাপ স্বভাব, যা থেকে ইসলাম নিষেধ করেছে এবং এর শাস্তিস্বরূপ আনন্দিত ব্যক্তিকে উক্ত বিপদে পতিত হওয়ার ভয় দেখিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
لَا تُظْهِرِ الشَّمَائَةَ لِأَخِيكَ فَيَرْحَمَهُ اللَّهُ وَيَبْتَلِيكَ
'তোমার ভাইয়ের বিপদ দেখে আনন্দ প্রকাশ কোরো না। তাহলে আল্লাহ তার প্রতি সদয় হয়ে তোমাকেই সে বিপদে আক্রান্ত করবেন। '৬২৩
প্রকৃত মুসলমান-যার অন্তর ইসলামি আদর্শের সুধা পান করেছে-কখনো অন্যের বিপদে আনন্দিত হতে পারে না; বরং সে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে এবং তার বিপদ লাঘব করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। অন্যের বিপদে কেবল তারাই আনন্দিত হয়, যাদের অন্তর অসুস্থ এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ থেকে বঞ্চিত। যাদের অন্তর চরম আকারের প্রতিশোধপরায়ণ ও অন্যকে কষ্ট দেওয়ার জন্য লালায়িত, কেবল তারাই অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ প্রকাশ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00