📄 সত্যের দিকে আহ্বান করে
প্রকৃত মুসলমান দ্বীনের দাওয়াত দেওয়াকে নিজের ব্রত বানিয়ে নেয়। সব সময় সে দাওয়াত দেয়। কোনো বিপদ বা বাধা তাকে দাওয়াতের এ মেহনত থেকে বিরত রাখতে পারে না। একনিষ্ঠ দায়িদের জন্য আল্লাহ যে পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন, তার আশায় সে অবিরাম দাওয়াতের মেহনতে লিপ্ত থাকে।
দায়িদের পুরস্কার সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ আলি -কে বলেন:
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। '৫২৮
পথচ্যুত ব্যক্তির কানে দ্বীনের প্রকৃত দায়ি যখন উত্তম কথা শোনায় এবং এর মাধ্যমে তার অন্তরে হিদায়াতের বীজ বপিত হয়, তখন দায়ি এমন সাওয়াব পায়, যা লাল উটের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখনকার সময়ে লাল উট সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হতো। এ ছাড়াও হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেসব সাওয়াব অর্জন করতে থাকবে, দায়িও তার অনুরূপ সাওয়াব পেতে থাকবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا
'যে হিদায়াতের পথের দিকে দাওয়াত দেয়, সে তার অনুসারীদের (যারা তার দাওয়াত পেয়ে হিদায়াতের পথে এসেছে) সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব পাবে। কিন্তু এতে তাদের সাওয়াব থেকেও কোনো অংশ কমবে না। '৫২৯
দায়িদের ধৈর্য ও আল্লাহর রাস্তার কঠিন পরীক্ষায় দৃঢ়পদ থাকা সত্যিই ঈর্ষণীয়। তারা নিজেদের সম্পদ ও সময় পথচ্যুত ব্যক্তিদের দাওয়াতের পেছনে ব্যয় করে চলে। এজন্যই তাদের প্রতি ঈর্ষা করতে রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে:
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ حِكْمَةً، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
'কেবল দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা যায়। এক. যাকে আল্লাহ ধন- সম্পদ দান করেছেন, আর সে তা হকের পথে ব্যয় করে। দুই. যাকে আল্লাহ হিকমত বা প্রজ্ঞা দান করেছেন, আর সে তা দ্বারা ফয়সালা করে এবং লোকজনকে তা শিক্ষা দেয়। '৫৩০
প্রকৃত মুসলমান দাওয়াতের জন্য দ্বীনি ইলমের কোনো অংশকেই ছোট মনে করে না। সত্যের একটি বাণীও যদি তার নিকট পৌঁছে, তা সে অপরজনের কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমনই নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন: بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةٌ 'তোমরা আমার নিকট থেকে লোকদের মাঝে প্রচার করো; যদিও তা একটি আয়াতই হোক। '৫৩১
এর কারণ হলো, অনেক সময় মানুষের হিদায়াত একটিমাত্র আয়াতের ওপর নির্ভর করে থাকে। যখনই সে আয়াত উক্ত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যায়, তখনই তার অন্তর হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
প্রকৃত মুসলমান পরোপকারী হয়। সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে। সব সময় মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ফিকির করে। এভাবেই সে আল্লাহ, রাসুল, مسلمانوں নেতৃস্থানীয় লোক এবং সাধারণ مسلمانوں প্রতি কল্যাণকামী সাব্যস্ত হয়। যেমনটি উপরোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ বোধ থেকেই সে নিজের হিদায়াতের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য লোকসহ সকল মানুষের হিদায়াতের ফিকির করে। কারণ, সে নিজের ও পরিবারের জন্য যেমন জান্নাত পছন্দ করে, তেমনই সকল মানুষের জন্যও জান্নাত পছন্দ করে। এজন্য সে সর্বদা তাদের এমন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতে থাকে, যা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। একজন দায়ির মাঝে এ বোধ ও গুণাবলি থাকে বলেই তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা মর্যাদার অধিকারী হয়। দাওয়াত দেওয়া এতই উত্তম ও উন্নত কাজ যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ দায়িদের প্রশংসা ও তাদের জন্য দুআ করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ .
‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল করুন, যে আমার কাছ থেকে কোনো কিছু শুনে তা যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, যাদের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়, তাদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তিও থাকতে পারে, যারা আমার থেকে সরাসরি শ্রবণকারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।' ৫৩২
ইসলামি সমাজটাই এমন যে, সেখানে একজনের প্রতি অন্যজনের দায়িত্ব রয়েছে। এ ছাড়াও প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে তাদের এ দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। কিন্তু এ দায়িত্ববোধ আজ مسلمانوں মাঝে নেই বিধায় তাদের সমাজে শান্তি উধাও হয়ে গেছে। আজ যদি তাদের মাঝে সামাজিক সেই দায়িত্ববোধ থাকত এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভয় থাকত, তাহলে مسلمانوں আজকের এ অধঃপতন হতো না। নিজেদের দ্বীন থেকেও তারা এত দূর সরে আসত না।
এজন্যই দাওয়াতের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে ইলম দান করেছেন, তা অন্যের নিকট থেকে গোপন করে (অর্থাৎ অন্যদের শিক্ষা না দিয়ে) পার্থিব মর্যাদা বৃদ্ধি ও ধ্বংসশীল দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বানায়, তার জন্য কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِّمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيْبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَعْنِيْ رِيْحَهَا
‘যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করেছে, যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কিন্তু সে তা অর্জন করেছে কেবল দুনিয়াবি সম্পদ। অর্জন করার জন্য, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৫৩৩
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কারও কাছ থেকে ইলম জানতে চাওয়া হলো, আর সে (জানা সত্ত্বেও) তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'৫৩৪
প্রকৃত মুসলমান দ্বীনের দাওয়াত দেওয়াকে নিজের ব্রত বানিয়ে নেয়। সব সময় সে দাওয়াত দেয়। কোনো বিপদ বা বাধা তাকে দাওয়াতের এ মেহনত থেকে বিরত রাখতে পারে না। একনিষ্ঠ দায়িদের জন্য আল্লাহ যে পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন, তার আশায় সে অবিরাম দাওয়াতের মেহনতে লিপ্ত থাকে।
দায়িদের পুরস্কার সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ আলি -কে বলেন:
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। '৫২৮
পথচ্যুত ব্যক্তির কানে দ্বীনের প্রকৃত দায়ি যখন উত্তম কথা শোনায় এবং এর মাধ্যমে তার অন্তরে হিদায়াতের বীজ বপিত হয়, তখন দায়ি এমন সাওয়াব পায়, যা লাল উটের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখনকার সময়ে লাল উট সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হতো। এ ছাড়াও হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেসব সাওয়াব অর্জন করতে থাকবে, দায়িও তার অনুরূপ সাওয়াব পেতে থাকবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا
'যে হিদায়াতের পথের দিকে দাওয়াত দেয়, সে তার অনুসারীদের (যারা তার দাওয়াত পেয়ে হিদায়াতের পথে এসেছে) সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব পাবে। কিন্তু এতে তাদের সাওয়াব থেকেও কোনো অংশ কমবে না। '৫২৯
দায়িদের ধৈর্য ও আল্লাহর রাস্তার কঠিন পরীক্ষায় দৃঢ়পদ থাকা সত্যিই ঈর্ষণীয়। তারা নিজেদের সম্পদ ও সময় পথচ্যুত ব্যক্তিদের দাওয়াতের পেছনে ব্যয় করে চলে। এজন্যই তাদের প্রতি ঈর্ষা করতে রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে:
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ حِكْمَةً، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
'কেবল দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা যায়। এক. যাকে আল্লাহ ধন- সম্পদ দান করেছেন, আর সে তা হকের পথে ব্যয় করে। দুই. যাকে আল্লাহ হিকমত বা প্রজ্ঞা দান করেছেন, আর সে তা দ্বারা ফয়সালা করে এবং লোকজনকে তা শিক্ষা দেয়। '৫৩০
প্রকৃত মুসলমান দাওয়াতের জন্য দ্বীনি ইলমের কোনো অংশকেই ছোট মনে করে না। সত্যের একটি বাণীও যদি তার নিকট পৌঁছে, তা সে অপরজনের কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমনই নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন: بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةٌ 'তোমরা আমার নিকট থেকে লোকদের মাঝে প্রচার করো; যদিও তা একটি আয়াতই হোক। '৫৩১
এর কারণ হলো, অনেক সময় মানুষের হিদায়াত একটিমাত্র আয়াতের ওপর নির্ভর করে থাকে। যখনই সে আয়াত উক্ত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যায়, তখনই তার অন্তর হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
প্রকৃত মুসলমান পরোপকারী হয়। সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে। সব সময় মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ফিকির করে। এভাবেই সে আল্লাহ, রাসুল, مسلمانوں নেতৃস্থানীয় লোক এবং সাধারণ مسلمانوں প্রতি কল্যাণকামী সাব্যস্ত হয়। যেমনটি উপরোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ বোধ থেকেই সে নিজের হিদায়াতের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য লোকসহ সকল মানুষের হিদায়াতের ফিকির করে। কারণ, সে নিজের ও পরিবারের জন্য যেমন জান্নাত পছন্দ করে, তেমনই সকল মানুষের জন্যও জান্নাত পছন্দ করে। এজন্য সে সর্বদা তাদের এমন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতে থাকে, যা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। একজন দায়ির মাঝে এ বোধ ও গুণাবলি থাকে বলেই তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা মর্যাদার অধিকারী হয়। দাওয়াত দেওয়া এতই উত্তম ও উন্নত কাজ যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ দায়িদের প্রশংসা ও তাদের জন্য দুআ করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ .
‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল করুন, যে আমার কাছ থেকে কোনো কিছু শুনে তা যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, যাদের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়, তাদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তিও থাকতে পারে, যারা আমার থেকে সরাসরি শ্রবণকারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।' ৫৩২
ইসলামি সমাজটাই এমন যে, সেখানে একজনের প্রতি অন্যজনের দায়িত্ব রয়েছে। এ ছাড়াও প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে তাদের এ দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। কিন্তু এ দায়িত্ববোধ আজ مسلمانوں মাঝে নেই বিধায় তাদের সমাজে শান্তি উধাও হয়ে গেছে। আজ যদি তাদের মাঝে সামাজিক সেই দায়িত্ববোধ থাকত এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভয় থাকত, তাহলে مسلمانوں আজকের এ অধঃপতন হতো না। নিজেদের দ্বীন থেকেও তারা এত দূর সরে আসত না।
এজন্যই দাওয়াতের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে ইলম দান করেছেন, তা অন্যের নিকট থেকে গোপন করে (অর্থাৎ অন্যদের শিক্ষা না দিয়ে) পার্থিব মর্যাদা বৃদ্ধি ও ধ্বংসশীল দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বানায়, তার জন্য কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِّمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيْبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَعْنِيْ رِيْحَهَا
‘যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করেছে, যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কিন্তু সে তা অর্জন করেছে কেবল দুনিয়াবি সম্পদ। অর্জন করার জন্য, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৫৩৩
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কারও কাছ থেকে ইলম জানতে চাওয়া হলো, আর সে (জানা সত্ত্বেও) তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'৫৩৪
📄 সৎ কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে
আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম দিক হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। এজন্য প্রকৃত দায়ি মুসলমান হিকমত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সৎ কাজের আদেশ দেয় আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পাপাচার বা মন্দ কাজ দূরীভূত করার চেষ্টা করে। পাপাচার ও মন্দ কাজ দূর করতে গিয়ে নতুন ফিতনা সৃষ্টি করে না। সামর্থ্য থাকলে হাত দিয়ে দূরীভূত করে। আর যদি সে পরিমাণ সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান ও কথার মাধ্যমে তা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দিয়ে অস্বীকার ও ঘৃণা করে এবং তা সমূলে মূলোৎপাটন করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এটাই রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটির মর্ম:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
'তোমাদের কেউ যদি গর্হিত কাজ দেখতে পায়, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান দ্বারা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দ্বারা যেন ঘৃণা করে। আর এটা হচ্ছে ইমানের দুর্বলতম স্তর।'৫৩৫
আসলে মুসলমান যখন সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করে। আর দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা করা। যেহেতু কল্যাণকামনার নামই দ্বীন। তাই সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধ করে কল্যাণকামনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ কল্যাণকামনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য।'৫৩৬
এ কল্যাণকামিতা এবং সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার গুণ প্রকৃত স্বাধীনচেতা মুসলমানকে জালিমের সামনে প্রকাশ্যে সত্যের বাণী উচ্চারণ করার সাহস জোগায়। মুসলিম উম্মাহ শৌর্যবীর্য নিয়ে বেঁচে থাকার কারণও এমন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব, যারা জালিমের সামনে বুক চেতিয়ে বলতে পারে, 'তুমি জালিম'। উম্মাহর মধ্যে যখন এ ধরনের বীর- সাহসীরা আর থাকবে না, তখন তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে, তাদের আর কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না।
এটাই রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসটির মর্ম: إِذَا رَأَيْتَ أُمَّتِي تَهَابُ الظَّالِمَ أَنْ تَقُولَ لَهُ: أَنْتَ ظَالِمٌ، فَقَدْ تُوُدِّعَ مِنْهُمْ
'যখন তুমি উম্মতকে দেখবে, তারা জালিমকে জালিম বলতে ভয় পাচ্ছে, তখন (জেনে নিও) তাদের (আসমানি নুসরাত ও সাহায্য করা থেকে) বিদায় জানানো হবে।' ৫৩৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনেক হাদিস مسلمانوں অন্তরে বাতিলের বিরুদ্ধে সাহসিকতার বীজ বুনে দেয়। তাদের এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয় যে, জালিম বাতিলের সামনে সাহসিকতা দেখালে কারও রিজিক কমে যায় না এবং কারও মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় না।
একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ، أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ
'মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য বলা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, তা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিক থেকেও দূরে রাখে না।'৫৩৮
অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
قَامَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرُ؟ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ النَّاسِ أَقْرَؤُهُمْ وَأَتْقَاهُمْ وَآمَرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ، وَأَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَأَوْصَلُهُمْ لِلرَّحِيمِ
'নবিজি মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন, ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ কারি, শ্রেষ্ঠ মুত্তাকি, সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী।'৫৩৯
প্রকৃত মুসলমানদের অন্তরে ইসলামি সমাজে সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ও মজলুমের পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্ত মনোবল থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَامِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا عِنْدَ مَوْطِنٍ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ
'যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে না, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন না, যেখানে সে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে।' ৫৪০
এজন্য বিচার করার অধিকারপ্রাপ্ত প্রকৃত মুসলমান বাতিলের মোকাবেলায় চুপ থাকে না। সত্যকে সাহায্য না করে বসে থাকে না। সমাজে জুলুমের প্রসার সে একদম সহ্য করতে পারে না। সমাজ থেকে অশ্লীলতা ও পাপাচার দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ, সমাজ থেকে পাপাচার ও অশ্লীলতা দূরীকরণের চেষ্টা করা না হলে পুরা সমাজের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
কাইস বিন আবু হাজিম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قَامَ أَبُو بَكْرٍ فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ} [المائدة: ١٠٥]، وَإِنَّا سَمِعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْمُنْكَرَ لَا يُغَيِّرُونَهُ، أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِهِ
'আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা করে বললেন, হে লোকসকল, তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাকো : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।” [সুরা আল-মায়িদা : ১০৫] কিন্তু আমরা রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, মানুষ অশ্লীল কাজ দেখার পর তা প্রতিরোধ না করলে অচিরেই তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। '৫৪১
প্রকৃত মুসলমান-যার ইসলাম সত্য ও ইমান জীবন্ত-দ্বীনি কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে না। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া থেকে উদাসীন থাকে না। মন্দ কাজ ও পাপাচারে স্বস্তিবোধ করে না। সমাজে তা টিকে থাকতে দেয় না। যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেয়। কারণ, দ্বীনের সকল বিষয় দৃঢ় সংকল্প ও চাহিদা অনুযায়ী হতে হয়; হাসি ও ঠাট্টার ছলে নয়। রাসুলুল্লাহ আমাদের ইহুদিদের মতো দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন হওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। যেন এ কারণে তাদের ওপর যে আজাব এসেছিল, তা আমাদের ওপর না আসে।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আবু মুসা ৫৪২ রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا إِذَا عَمِلَ الْعَامِلُ مِنْهُمْ بِالْخَطِيئَةِ نَهَاهُ النَّاهِي تعذيرًا، حَتَّى إِذَا كَانَ الْغَدُ جَالَسَهُ وَوَاكَلَهُ وَشَارَبَهُ، كَأَنَّهُ لَمْ يَرَهُ عَلَى خَطِيئَةٍ بِالْأَمْسِ، فَلَمَّا رَأَى اللَّهُ ذَلِكَ مِنْهُمْ ضَرَبَ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِمْ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ، وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا، أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ
'তোমাদের পূর্ববর্তী বনি ইসরাইলের মধ্যে যখন কেউ পাপকর্ম করত, তখন কোনো নিষেধকারী তিরস্কার করে তা থেকে বাধা দিত। কিন্তু পরেরদিন সেই নিষেধকারীই তাদের সাথে ওঠাবসা করতে শুরু করত এবং তাদের সাথে পানাহার করত, যেন আগের দিন তাদের কোনো পাপকর্ম সে দেখেইনি! তাদের এ অবস্থা দেখে আল্লাহ তাআলা তাদের এক দলের অন্তরকে অন্য দলের অন্তরের ওপর চাপিয়ে দিলেন। অতঃপর তাদের নবি দাউদ ও ঈসা -এর জবানে তাদের অভিসম্পাত করলেন। এটা একমাত্র তাদের পাপের কারণেই হয়েছে। আর তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী জাতি। সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অপরাধীকে শক্তভাবে প্রতিহত করবে। সত্য পথে দৃঢ়পদ ও অবিচল থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মাঝে অমিল ও অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন এবং তাদের ওপর যেভাবে অভিসম্পাত করেছিলেন, তেমনই তোমাদের ওপরও করবেন।'৫৪৩
আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম দিক হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। এজন্য প্রকৃত দায়ি মুসলমান হিকমত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সৎ কাজের আদেশ দেয় আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পাপাচার বা মন্দ কাজ দূরীভূত করার চেষ্টা করে। পাপাচার ও মন্দ কাজ দূর করতে গিয়ে নতুন ফিতনা সৃষ্টি করে না। সামর্থ্য থাকলে হাত দিয়ে দূরীভূত করে। আর যদি সে পরিমাণ সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান ও কথার মাধ্যমে তা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দিয়ে অস্বীকার ও ঘৃণা করে এবং তা সমূলে মূলোৎপাটন করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এটাই রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটির মর্ম:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
'তোমাদের কেউ যদি গর্হিত কাজ দেখতে পায়, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান দ্বারা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দ্বারা যেন ঘৃণা করে। আর এটা হচ্ছে ইমানের দুর্বলতম স্তর।'৫৩৫
আসলে মুসলমান যখন সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করে। আর দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা করা। যেহেতু কল্যাণকামনার নামই দ্বীন। তাই সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধ করে কল্যাণকামনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ কল্যাণকামনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য।'৫৩৬
এ কল্যাণকামিতা এবং সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার গুণ প্রকৃত স্বাধীনচেতা মুসলমানকে জালিমের সামনে প্রকাশ্যে সত্যের বাণী উচ্চারণ করার সাহস জোগায়। মুসলিম উম্মাহ শৌর্যবীর্য নিয়ে বেঁচে থাকার কারণও এমন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব, যারা জালিমের সামনে বুক চেতিয়ে বলতে পারে, 'তুমি জালিম'। উম্মাহর মধ্যে যখন এ ধরনের বীর- সাহসীরা আর থাকবে না, তখন তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে, তাদের আর কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না।
এটাই রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসটির মর্ম: إِذَا رَأَيْتَ أُمَّتِي تَهَابُ الظَّالِمَ أَنْ تَقُولَ لَهُ: أَنْتَ ظَالِمٌ، فَقَدْ تُوُدِّعَ مِنْهُمْ
'যখন তুমি উম্মতকে দেখবে, তারা জালিমকে জালিম বলতে ভয় পাচ্ছে, তখন (জেনে নিও) তাদের (আসমানি নুসরাত ও সাহায্য করা থেকে) বিদায় জানানো হবে।' ৫৩৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনেক হাদিস مسلمانوں অন্তরে বাতিলের বিরুদ্ধে সাহসিকতার বীজ বুনে দেয়। তাদের এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয় যে, জালিম বাতিলের সামনে সাহসিকতা দেখালে কারও রিজিক কমে যায় না এবং কারও মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় না।
একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ، أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ
'মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য বলা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, তা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিক থেকেও দূরে রাখে না।'৫৩৮
অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
قَامَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرُ؟ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ النَّاسِ أَقْرَؤُهُمْ وَأَتْقَاهُمْ وَآمَرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ، وَأَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَأَوْصَلُهُمْ لِلرَّحِيمِ
'নবিজি মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন, ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ কারি, শ্রেষ্ঠ মুত্তাকি, সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী।'৫৩৯
প্রকৃত مسلمانوں অন্তরে ইসলামি সমাজে সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ও মজলুমের পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্ত মনোবল থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَامِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا عِنْدَ مَوْطِنٍ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ
'যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে না, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন না, যেখানে সে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে।' ৫৪০
এজন্য বিচার করার অধিকারপ্রাপ্ত প্রকৃত মুসলমান বাতিলের মোকাবেলায় চুপ থাকে না। সত্যকে সাহায্য না করে বসে থাকে না। সমাজে জুলুমের প্রসার সে একদম সহ্য করতে পারে না। সমাজ থেকে অশ্লীলতা ও পাপাচার দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ, সমাজ থেকে পাপাচার ও অশ্লীলতা দূরীকরণের চেষ্টা করা না হলে পুরা সমাজের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
কাইস বিন আবু হাজিম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قَامَ أَبُو بَكْرٍ فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ} [المائدة: ١٠٥]، وَإِنَّا سَمِعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْمُنْكَرَ لَا يُغَيِّرُونَهُ، أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِهِ
'আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা করে বললেন, হে লোকসকল, তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাকো : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।” [সুরা আল-মায়িদা : ১০৫] কিন্তু আমরা রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, মানুষ অশ্লীল কাজ দেখার পর তা প্রতিরোধ না করলে অচিরেই তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। '৫৪১
প্রকৃত মুসলমান-যার ইসলাম সত্য ও ইমান জীবন্ত-দ্বীনি কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে না। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া থেকে উদাসীন থাকে না। মন্দ কাজ ও পাপাচারে স্বস্তিবোধ করে না। সমাজে তা টিকে থাকতে দেয় না। যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেয়। কারণ, দ্বীনের সকল বিষয় দৃঢ় সংকল্প ও চাহিদা অনুযায়ী হতে হয়; হাসি ও ঠাট্টার ছলে নয়। রাসুলুল্লাহ আমাদের ইহুদিদের মতো দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন হওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। যেন এ কারণে তাদের ওপর যে আজাব এসেছিল, তা আমাদের ওপর না আসে।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আবু মুসা ৫৪২ রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا إِذَا عَمِلَ الْعَامِلُ مِنْهُمْ بِالْخَطِيئَةِ نَهَاهُ النَّاهِي تعذيرًا، حَتَّى إِذَا كَانَ الْغَدُ جَالَسَهُ وَوَاكَلَهُ وَشَارَبَهُ، كَأَنَّهُ لَمْ يَرَهُ عَلَى خَطِيئَةٍ بِالْأَمْسِ، فَلَمَّا رَأَى اللَّهُ ذَلِكَ مِنْهُمْ ضَرَبَ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِمْ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ، وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا، أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ
'তোমাদের পূর্ববর্তী বনি ইসরাইলের মধ্যে যখন কেউ পাপকর্ম করত, তখন কোনো নিষেধকারী তিরস্কার করে তা থেকে বাধা দিত। কিন্তু পরেরদিন সেই নিষেধকারীই তাদের সাথে ওঠাবসা করতে শুরু করত এবং তাদের সাথে পানাহার করত, যেন আগের দিন তাদের কোনো পাপকর্ম সে দেখেইনি! তাদের এ অবস্থা দেখে আল্লাহ তাআলা তাদের এক দলের অন্তরকে অন্য দলের অন্তরের ওপর চাপিয়ে দিলেন। অতঃপর তাদের নবি দাউদ ও ঈসা -এর জবানে তাদের অভিসম্পাত করলেন। এটা একমাত্র তাদের পাপের কারণেই হয়েছে। আর তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী জাতি। সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অপরাধীকে শক্তভাবে প্রতিহত করবে। সত্য পথে দৃঢ়পদ ও অবিচল থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মাঝে অমিল ও অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন এবং তাদের ওপর যেভাবে অভিসম্পাত করেছিলেন, তেমনই তোমাদের ওপরও করবেন।'৫৪৩
টিকাঃ
৫৪২. এখানে বর্ণনকারী হিসাবে আবু মুসা রা.-এর নাম বলা হয়েছে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। এ হাদিসের বর্ণনকারী হলেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা., যা তাবারানির বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এসেছে। (অনুবাদক)
📄 দাওয়াতের সময় চতুরতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়
প্রকৃত মুসলমান লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করে। প্রচুর সময় নিয়ে তাদের দ্বীনের বিধানসমূহ শিক্ষা দেয়। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সে আল্লাহর এ বাণীর ওপর পূর্ণাঙ্গ আমল করে :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'আপন পালনকর্তার পথে আহবান করুন উত্তমরূপে জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে। '৫৪৪
এর কারণ হলো, আল্লাহর পথের দায়িদের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হলো, অন্তরসমূহে খুব ভালোভাবে কথা ঢুকিয়ে দিতে পারা। যাতে তাদের নিকট ইমান পছন্দনীয় হয়ে ওঠে এবং দ্বীন কবুল করার প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। মানুষের বিরক্তিবোধ, কষ্ট বা রাগ আসে—এমন কোনো কাজ দায়িরা করে না। তাই সে একবারেই সব কথা বলে দেয় না। একদিনেই টেনে হিঁচড়ে হিদায়াতের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করে না। কয়েকবার করে ধাপে ধাপে দাওয়াত দেয়। একটু একটু করে অন্তরে অনুভূতি জাগ্রত করে। যাদের দাওয়াত দিচ্ছে, তাদের মাঝে বিরক্তিবোধ যেন না আসে, তার প্রতি খুব সজাগ থাকে। দাওয়াতের সময় রাসুলুল্লাহ-এর কর্মপন্থা এমনই ছিল।
আবু ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ عَبْدُ اللهِ يُذَكِّرُ النَّاسَ فِي كُلِّ خَمِيسٍ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ لَوَدِدْتُ أَنَّكَ ذَكَرْتَنَا كُلَّ يَوْمٍ؟ قَالَ: أَمَا إِنَّهُ يَمْنَعُنِي مِنْ ذَلِكَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أُمِلَّكُمْ، وَإِنِّي أَتَخَوَّلُكُمْ بِالْمَوْعِظَةِ، كَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِهَا، مَخَافَةَ السَّامَةِ عَلَيْنَا
'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের ওয়াজ করতেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দুর রহমান, আমি চাই, আপনি প্রতিদিন আমাদের ওয়াজ করবেন। তিনি বললেন, আমি এজন্যই তা করি না যে, এতে তোমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ সৃষ্টি হবে। আমি তোমাদের কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করি, যেভাবে নবিজি আমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ আসার আশঙ্কায় কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করতেন। '৫৪৫
দায়িদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার অন্যতম দিক হলো, খুতবা বা ওয়াজ বেশি দীর্ঘ না করা; বিশেষ করে তা যদি বড় সমাবেশের সামনে হয়, যেখানে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) ও রোগীও উপস্থিত থাকে। তাই খুতবা বা ওয়াজ সংক্ষিপ্ত করতে পারার যোগ্যতা দাওয়াতের ক্ষেত্রে খতিব বা ওয়াজকারীর ইলমি তাত্ত্বিকতার পরিচয় বহন করে।
এজন্য আম্মার বিন ইয়াসির-কে রাসুলুল্লাহ নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
إِنَّ طُولَ صَلَاةِ الرَّجُلِ ، وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ، مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ، فَأَطِيلُوا الصَّلَاةَ، وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ
'নিশ্চয় নামাজ দীর্ঘ করা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তাই নামাজকে দীর্ঘ করো আর খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করো।'৫৪৬
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ দায়িদের অন্যতম কর্মপন্থা হলো, তারা দাওয়াতের সময় খুব নম্রতা অবলম্বন করে। লোকদের অজ্ঞতা, ভুল ও বিরক্তিকর প্রশ্নগুলো বরদাশত করে। দাওয়াতের বিষয় তাদের সামনে পরিপূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেয়, কোনোরূপ অস্পষ্টতা রাখে না। দায়িরা আসলে এ ক্ষেত্রে দায়িদের সর্দার সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ-এর অনুসরণ করে। প্রশ্নকারীদের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তাদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নম্র ও কোমল থাকতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও স্বস্তিবোধ নিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দান করতেন। যতক্ষণ তারা পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম না হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের বিরক্তিবোধ ছাড়াই উদারচিত্তে তাদের বুঝিয়ে দিতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা মুআবিয়া বিন হাকাম সুলামি বর্ণনা করেছেন :
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ: يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ: وَاتُكْلَ أُمِّيَاهُ، مَا شَأْنُكُمْ؟ تَنْظُرُونَ إِلَيَّ، فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكِنِّي سَكَتُ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي، مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ، فَوَاللهِ، مَا كَهَرَنِي وَلَا ضَرَبَنِي وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ: «إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ» أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ، وَقَدْ جَاءَ اللهُ بِالْإِسْلَامِ، وَإِنَّ مِنَّا رِجَالًا يَأْتُونَ الْكُهَانَ، قَالَ: «فَلَا تَأْتِهِمْ» قَالَ: وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ، قَالَ: « ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ، فَلَا يَصُدَّنَّهُمْ - قَالَ ابْنُ الصَّبَّاحِ فَلَا يَصُدَّنَّكُمْ
'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে নামাজ পড়ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে আমি তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন!) বললাম। লোকেরা আমার দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, আমার মা আমার বিয়োগব্যথায় কাতর হোক। (অর্থাৎ এভাবে আমি নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলাম।) তোমাদের কী হলো? আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন? তখন তারা তাদের হাত দিয়ে উরুর ওপর আঘাত করে শব্দ করতে লাগল। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ হতে বলছে, তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ শেষ করলে আমি তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। আমার পিতা ও মা তার জন্য কুরবান হোক! আমি ইতিপূর্বে বা এর পরে আর কখনো কাউকে তার চেয়ে উত্তম পন্থায় শিক্ষা দিতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে ধমকালেন না, মারলেন না, বকাঝকাও করলেন না; বরং বললেন, নামাজের মধ্যে কথাবার্তা ধরনের কিছু বলা যথোচিত নয়; বরং নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন পাঠ করার নাম। অথবা রাসুলুল্লাহ যেরূপ বলেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সবেমাত্র জাহিলিয়াত বর্জন করেছি এবং আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা গণকদের কথায় বিশ্বাস করে। তিনি বললেন, তুমি গণকদের কাছে যেয়ো না। আমি বললাম, আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা শুভ-অশুভ নির্ধারণ করে থাকে। তিনি বললেন, এটা তাদের হৃদয়ের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এজন্য তারা এ থেকে বিরত থাকে না (আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই)। ৫৪৭
মানুষের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর কোমলতা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মন্দ কাজকারীকে তার মন্দ কাজের ব্যাপারে সরাসরি বলতেন না। কারণ, এতে তার অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা তার মর্যাদাহানি ঘটতে পারে। বরং তিনি তাওরিয়া বা পরোক্ষ উল্লেখের আশ্রয় নিয়ে তার মন্দ কাজের প্রতিবাদ করতেন এবং তাকে সতর্ক করতেন। এ পদ্ধতি অন্তরে খুব প্রভাব ফেলে এবং ভুল শুধরাতে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আয়িশা সিদ্দিকা বলেন: 'রাসুলুল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির (কোনো খারাপ কথার) ব্যাপারে জানলে “কী হলো অমুকের? সে এমন বলল কেন?”- এমনটি বলতেন না; বরং বলতেন, “লোকদের কী হলো? তারা এমন কথা বলছে কেন?” ৫৪৮
সফল দায়িদের আরেকটি গুণ হলো, শ্রোতার সামনে স্পষ্ট কথা বলা। একাধিকবার বলে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ এমনটাই করতেন।
আনাস বর্ণনা করেন :
إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلَاثًا، حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ، وَإِذَا أَتَى عَلَى قَوْمٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ কোনো কথা বললে তা তিনবার বলতেন, যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারে। আর কোনো জাতির নিকট গেলে তাদের তিনবার সালাম দিতেন। '৫৪
আয়িশা বলেন: كَانَ كَلَامُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلَامًا فَصْلًا يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ سَمِعَهُ
'রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন। প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা হৃদয়ংগম করতে পারত। ৫৫০
প্রকৃত মুসলমান লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করে। প্রচুর সময় নিয়ে তাদের দ্বীনের বিধানসমূহ শিক্ষা দেয়। দাওয়াতের ক্ষেত্রে সে আল্লাহর এ বাণীর ওপর পূর্ণাঙ্গ আমল করে :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'আপন পালনকর্তার পথে আহবান করুন উত্তমরূপে জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে। '৫৪৪
এর কারণ হলো, আল্লাহর পথের দায়িদের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হলো, অন্তরসমূহে খুব ভালোভাবে কথা ঢুকিয়ে দিতে পারা। যাতে তাদের নিকট ইমান পছন্দনীয় হয়ে ওঠে এবং দ্বীন কবুল করার প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। মানুষের বিরক্তিবোধ, কষ্ট বা রাগ আসে—এমন কোনো কাজ দায়িরা করে না। তাই সে একবারেই সব কথা বলে দেয় না। একদিনেই টেনে হিঁচড়ে হিদায়াতের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করে না। কয়েকবার করে ধাপে ধাপে দাওয়াত দেয়। একটু একটু করে অন্তরে অনুভূতি জাগ্রত করে। যাদের দাওয়াত দিচ্ছে, তাদের মাঝে বিরক্তিবোধ যেন না আসে, তার প্রতি খুব সজাগ থাকে। দাওয়াতের সময় রাসুলুল্লাহ-এর কর্মপন্থা এমনই ছিল।
আবু ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ عَبْدُ اللهِ يُذَكِّرُ النَّاسَ فِي كُلِّ خَمِيسٍ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ لَوَدِدْتُ أَنَّكَ ذَكَرْتَنَا كُلَّ يَوْمٍ؟ قَالَ: أَمَا إِنَّهُ يَمْنَعُنِي مِنْ ذَلِكَ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أُمِلَّكُمْ، وَإِنِّي أَتَخَوَّلُكُمْ بِالْمَوْعِظَةِ، كَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِهَا، mَخَافَةَ السَّامَةِ عَلَيْنَا
'আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের ওয়াজ করতেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, হে আবু আব্দুর রহমান, আমি চাই, আপনি প্রতিদিন আমাদের ওয়াজ করবেন। তিনি বললেন, আমি এজন্যই তা করি না যে, এতে তোমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ সৃষ্টি হবে। আমি তোমাদের কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করি, যেভাবে নবিজি আমাদের মাঝে বিরক্তিবোধ আসার আশঙ্কায় কয়েকদিন পর পর ওয়াজ করতেন। '৫৪৫
দায়িদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার অন্যতম দিক হলো, খুতবা বা ওয়াজ বেশি দীর্ঘ না করা; বিশেষ করে তা যদি বড় সমাবেশের সামনে হয়, যেখানে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) ও রোগীও উপস্থিত থাকে। তাই খুতবা বা ওয়াজ সংক্ষিপ্ত করতে পারার যোগ্যতা দাওয়াতের ক্ষেত্রে খতিব বা ওয়াজকারীর ইলমি তাত্ত্বিকতার পরিচয় বহন করে।
এজন্য আম্মার বিন ইয়াসির-কে রাসুলুল্লাহ নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন:
إِنَّ طُولَ صَلَاةِ الرَّجُلِ ، وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ، مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ، فَأَطِيلُوا الصَّلَاةَ، وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ
'নিশ্চয় নামাজ দীর্ঘ করা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তাই নামাজকে দীর্ঘ করো আর খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করো।'৫৪৬
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ দায়িদের অন্যতম কর্মপন্থা হলো, তারা দাওয়াতের সময় খুব নম্রতা অবলম্বন করে। লোকদের অজ্ঞতা, ভুল ও বিরক্তিকর প্রশ্নগুলো বরদাশত করে। দাওয়াতের বিষয় তাদের সামনে পরিপূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেয়, কোনোরূপ অস্পষ্টতা রাখে না। দায়িরা আসলে এ ক্ষেত্রে দায়িদের সর্দার সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ-এর অনুসরণ করে। প্রশ্নকারীদের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং তাদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই নম্র ও কোমল থাকতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও স্বস্তিবোধ নিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দান করতেন। যতক্ষণ তারা পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম না হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের বিরক্তিবোধ ছাড়াই উদারচিত্তে তাদের বুঝিয়ে দিতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা মুআবিয়া বিন হাকাম সুলামি বর্ণনা করেছেন :
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ: يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ: وَاتُكْلَ أُمِّيَاهُ، مَا شَأْنُكُمْ؟ تَنْظُرُونَ إِلَيَّ، فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكِنِّي سَكَتُ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي، مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ، فَوَاللهِ، مَا كَهَرَنِي وَلَا ضَرَبَنِي وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ: «إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ» أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ، وَقَدْ جَاءَ اللهُ بِالْإِسْلَامِ، وَإِنَّ مِنَّا رِجَالًا يَأْتُونَ الْكُهَانَ، قَالَ: «فَلَا تَأْتِهِمْ» قَالَ: وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ، قَالَ: « ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ، فَلَا يَصُدَّنَّهُمْ - قَالَ ابْنُ الصَّبَّاحِ فَلَا يَصُدَّنَّكُمْ
'একদিন আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে নামাজ পড়ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে আমি তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন!) বললাম। লোকেরা আমার দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, আমার মা আমার বিয়োগব্যথায় কাতর হোক। (অর্থাৎ এভাবে আমি নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলাম।) তোমাদের কী হলো? আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন? তখন তারা তাদের হাত দিয়ে উরুর ওপর আঘাত করে শব্দ করতে লাগল। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ হতে বলছে, তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। পরে রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ শেষ করলে আমি তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম। আমার পিতা ও মা তার জন্য কুরবান হোক! আমি ইতিপূর্বে বা এর পরে আর কখনো কাউকে তার চেয়ে উত্তম পন্থায় শিক্ষা দিতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে ধমকালেন না, মারলেন না, বকাঝকাও করলেন না; বরং বললেন, নামাজের মধ্যে কথাবার্তা ধরনের কিছু বলা যথোচিত নয়; বরং নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন পাঠ করার নাম। অথবা রাসুলুল্লাহ যেরূপ বলেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি সবেমাত্র জাহিলিয়াত বর্জন করেছি এবং আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা গণকদের কথায় বিশ্বাস করে। তিনি বললেন, তুমি গণকদের কাছে যেয়ো না। আমি বললাম, আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা শুভ-অশুভ নির্ধারণ করে থাকে। তিনি বললেন, এটা তাদের হৃদয়ের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এজন্য তারা এ থেকে বিরত থাকে না (আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই)। ৫৪৭
মানুষের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর কোমলতা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মন্দ কাজকারীকে তার মন্দ কাজের ব্যাপারে সরাসরি বলতেন না। কারণ, এতে তার অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা তার মর্যাদাহানি ঘটতে পারে। বরং তিনি তাওরিয়া বা পরোক্ষ উল্লেখের আশ্রয় নিয়ে তার মন্দ কাজের প্রতিবাদ করতেন এবং তাকে সতর্ক করতেন। এ পদ্ধতি অন্তরে খুব প্রভাব ফেলে এবং ভুল শুধরাতে খুব সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আয়িশা সিদ্দিকা বলেন: 'রাসুলুল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির (কোনো খারাপ কথার) ব্যাপারে জানলে “কী হলো অমুকের? সে এমন বলল কেন?”- এমনটি বলতেন না; বরং বলতেন, “লোকদের কী হলো? তারা এমন কথা বলছে কেন?” ৫৪৮
সফল দায়িদের আরেকটি গুণ হলো, শ্রোতার সামনে স্পষ্ট কথা বলা। একাধিকবার বলে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ এমনটাই করতেন।
আনাস বর্ণনা করেন :
إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلَاثًا، حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ، وَإِذَا أَتَى عَلَى قَوْمٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ، سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا
'রাসুলুল্লাহ কোনো কথা বললে তা তিনবার বলতেন, যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারে। আর কোনো জাতির নিকট গেলে তাদের তিনবার সালাম দিতেন। '৫৪
আয়িশা বলেন: كَانَ كَلَامُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلَامًا فَصْلًا يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ sَمِعَهُ
'রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন। প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা হৃদয়ংগম করতে পারত। ৫৫০
📄 শঠতা করে না
প্রকৃত মুসলমান শঠতা, চাটুকারিতা, আপাত সৌহার্দ্য দেখানো, মিথ্যা প্রশংসা ইত্যাকার হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা, তার দ্বীনের শিক্ষা তাকে এ ধরনের হীন ও গর্হিত কর্মের প্রতি যেতে বাধা প্রদান করে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ এসব হীন ও গর্হিত কর্মে লিপ্ত। আজ মানবসমাজ যে এত নিচে চলে এসেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ধ্বংসকারী শঠতা।
শঠতা ও চাটুকারিতার ধোঁকায় পড়ে অধঃপতনে না যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বনু আমির যখন রাসুলুল্লাহ -এর প্রশংসা করে বলল, আপনি আমাদের সর্দার, তখন তিনি বললেন, সর্দার হলেন আল্লাহ। তারা বলল, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান আর সবচেয়ে বেশি সামর্থ্যবান। তিনি বললেন, তোমরা সংযত কথা বলো (বাড়িয়ে কথা বলো না)। এ ক্ষেত্রে তোমরা শয়তানের প্রতিনিধি হয়ো না (অর্থাৎ শয়তানের কথা অনুযায়ী বাড়িয়ে কথা বলো না)। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে স্তরে রেখেছেন, সেখান থেকে তোমরা আমাকে ওপরে তোলো—তা আমি চাই না। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ এবং আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। ৫৫১
এই হাদিসটির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ প্রশংসা্য় অতিরঞ্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সর্দার, মর্যাদাবান ও সামর্থ্যবান হওয়ার গুণ নিয়ে প্রশংসাকারীদের নিষেধ করেছেন; অথচ নিঃসন্দেহে তিনি مسلمانوں সর্দার ও সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি। কারণ, তিনি জানতেন যে, প্রশংসার ধারা যদি শুরুতেই বন্ধ করে দেওয়া না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সে দরজা দিয়ে নিফাক বা শঠতার মতো মারাত্মক বিষয় প্রবেশ করবে, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামে যার কোনো জায়গা নেই।
রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে কারও সামনাসামনি প্রশংসা করতে বারণ করতেন। কারণ, এতে প্রশংসাকারীর ভেতর নিফাক বা শঠতা ঢুকে যেতে পারে। কিংবা প্রশংসিতের মাঝে আত্মতুষ্টি ও নিজেকে বড় মনে করার বিধ্বংসী মানসিকতা তৈরি হতে পারে।
ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু বাকরা থেকে বর্ণনা করেছেন :
أَثْنَى رَجُلٌ عَلَى رَجُلٍ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ: «وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ مِرَارًا، ثُمَّ قَالَ: «مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَادِحًا أَخَاهُ لَا مَحَالَةَ، فَلْيَقُلْ أَحْسِبُ فُلَانًا، وَاللَّهُ حَسِيبُهُ، وَلَا أُزَنِّي عَلَى اللَّهِ أَحَدًا أَحْسِبُهُ كَذَا وَكَذَا، إِنْ كَانَ يَعْلَمُ ذَلِكَ مِنْهُ»
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন, ধিক! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গর্দান কেটে দিয়েছ! কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, যদি তোমাদের কেউ তার সঙ্গীর একান্তই প্রশংসা করতে হয়, তবে তার এরূপ বলা উচিত, “অমুক সম্পর্কে আমার ধারণা এমন, তবে আল্লাহ-ই তার প্রকৃত অবস্থা নিরূপণকারী। আমি কাউকে আল্লাহর ওপর দিয়ে পবিত্রতা ঘোষণা করছি না। আমি শুধু তার সম্পর্কে এরূপ এরূপ ধারণা করি”-যদি সে (বাস্তবেই) তদ্রূপ জানে।'৫৫২
সুতরাং একান্তই যদি কারও প্রশংসা করতে হয়, তাহলে সত্য, যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন করা যাবে না। অন্যথায় সমাজে নিফাক, মিথ্যা, লৌকিকতা, কপটতা, ছলনা ইত্যাকার সমাজবিধ্বংসী বিষয়সমূহ ছড়িয়ে পড়বে।
ইমাম বুখারি তাঁর আল-আদাবুল মুফরাদে মিহজান আসলামি থেকে বর্ণনা করেন :
'একদিন রাসুলুল্লাহ ও মিহজান আসলামি মসজিদে ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ মসজিদে এক ব্যক্তিকে নামাজ, রুকু ও সিজদারত অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি কে? তখন মিহজান তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলতে লাগলেন, এ ব্যক্তির এমন এমন গুণ আছে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, থামো, তাকে শুনিয়ো না, নতুবা তুমি তার সর্বনাশ করে ফেলবে।'৫৫৩
মুসনাদে আহমাদের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
'হে আল্লাহর নবি, এ হচ্ছে মদিনার সর্বাধিক উত্তম আমলকারী ব্যক্তি। অথবা বললেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে সর্বাধিক নামাজ আদায়কারী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে শুনিয়ো না; নচেৎ তুমি তার সর্বনাশ করবে। কথাটি দুবার বা তিনবার বললেন। (তারপর বললেন,) তোমরা এমন উম্মত, যাদের সাথে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহজ ও সরলতার ইচ্ছা করা হয়েছে।
কাউকে শুনিয়ে তার প্রশংসা করাকে রাসুলুল্লাহ তাকে ধ্বংস করার নামান্তর বলেছেন। কেননা, এতে মানুষের মাঝে নিজের প্রশংসা শোনার যে মানবিক দুর্বলতা আছে, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন প্রশংসিত ব্যক্তিটি মিথ্যে অহমিকায় ডুবে যায়। তার মাঝে সৃষ্টি হয় অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও আত্মতুষ্টি। মুনাফিক ও প্রতারক প্রশংসাকারীরা যখন বারবার প্রশংসা করতে থাকে—তারা অধিকাংশ সময় প্রশাসক, উচ্চ দায়িত্বশীল ও শাসকদের প্রশংসা করে থাকে—তখন প্রশংসা শোনাটা তাদের নেশায় পরিণত হয়। প্রশংসা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তারা বসে থাকে। এজন্য উপদেশ ও বাস্তবভিত্তিক সমালোচনা তাদের মোটেও পছন্দ হয় না। প্রশংসায় যত বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন হয়, ততই তাদের ভালো লাগে। এই যদি হয়ে যায় মানুষের অবস্থা, তখন সত্য, ইনসাফ, মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু হবে না।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে অতিরঞ্জিত প্রশংসাকারীদের মুখে বালি নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সমাজে এ ধরনের লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায় এবং তাদের কারণে সমাজে নিফাক, চাটুকারিতা ও বালা-মুসিবত বৃদ্ধি না পায়।
ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিজি একাধিক সনদে বর্ণনা করেছেন:
'এক ব্যক্তি জনৈক শাসকের সম্মুখে তার প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ রাঃ তার মুখে বালি নিক্ষেপ করলেন। আর বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমরা (অতিরঞ্জিত) প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে বালি নিক্ষেপ করবে।' ৫৫৪
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম রাঃ প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। কাউকেই তাঁদের প্রশংসা করতে দিতেন না; অথচ নিঃসন্দেহে তাঁরা ছিলেন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ও হকদার। তবুও চাটুকারিতার ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। তাঁরা বাস্তবভিত্তিক ইসলামি চরিত্রে নিজেদের সাজাতেন, যা এ ধরনের সস্তা প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা নাফি রঃ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'এক ব্যক্তি ইবনে উমর রাঃ-কে “হে সর্বোত্তম লোক” অথবা “হে সর্বোত্তম লোকের ছেলে” বলে সম্বোধন করল। তখন ইবনে উমর রাঃ বললেন, আমি সর্বোত্তম লোক বা সর্বোত্তম লোকের সন্তান নই। আমি আল্লাহর একজন বান্দা। আল্লাহর নিকট (রহমতের) আশা করি এবং তাঁকে (অর্থাৎ তাঁর আজাবকে) ভয় করি। আল্লাহর শপথ! তোমরা তো দেখছি, কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করতে করতে তাকে ধ্বংসই করে ছাড়বে! ৫৫৫
এটি মহান ইসলামের মর্ম অনুধাবনকারী এবং ভেতরে ও বাইরে রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শে সজ্জিত এক মহান সাহাবির প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী।
আসলে রাসুলুল্লাহ তাঁর কথা ও কাজকে নিফাক থেকে দূরে রাখার কারণে সাহাবিদের মাঝে একটি সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারতেন, কোনটি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য আর কোনটিতে নিফাক ও তোষামোদ মিশ্রিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে বলল, আমরা যখন আমাদের শাসকদের নিকট যাই, তখন তাদের এমন কথা বলি, যা তাদের অগোচরে বলা কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ইবনে উমর বললেন «كُنَّا نَعُدُّ هَذَا نِفَاقًا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» “নবিজি -এর জীবদ্দশায় আমরা এটাকে নিফাক মনে করতাম। ৫৫৬
প্রকৃত মুসলমান শঠতা, চাটুকারিতা, আপাত সৌহার্দ্য দেখানো, মিথ্যা প্রশংসা ইত্যাকার হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা, তার দ্বীনের শিক্ষা তাকে এ ধরনের হীন ও গর্হিত কর্মের প্রতি যেতে বাধা প্রদান করে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ এসব হীন ও গর্হিত কর্মে লিপ্ত। আজ মানবসমাজ যে এত নিচে চলে এসেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ধ্বংসকারী শঠতা।
শঠতা ও চাটুকারিতার ধোঁকায় পড়ে অধঃপতনে না যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বনু আমির যখন রাসুলুল্লাহ -এর প্রশংসা করে বলল, আপনি আমাদের সর্দার, তখন তিনি বললেন, সর্দার হলেন আল্লাহ। তারা বলল, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান আর সবচেয়ে বেশি সামর্থ্যবান। তিনি বললেন, তোমরা সংযত কথা বলো (বাড়িয়ে কথা বলো না)। এ ক্ষেত্রে তোমরা শয়তানের প্রতিনিধি হয়ো না (অর্থাৎ শয়তানের কথা অনুযায়ী বাড়িয়ে কথা বলো না)। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে স্তরে রেখেছেন, সেখান থেকে তোমরা আমাকে ওপরে তোলো—তা আমি চাই না। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ এবং আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। ৫৫১
এই হাদিসটির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ প্রশংসা্য় অতিরঞ্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সর্দার, মর্যাদাবান ও সামর্থ্যবান হওয়ার গুণ নিয়ে প্রশংসাকারীদের নিষেধ করেছেন; অথচ নিঃসন্দেহে তিনি مسلمانوں সর্দার ও সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি। কারণ, তিনি জানতেন যে, প্রশংসার ধারা যদি শুরুতেই বন্ধ করে দেওয়া না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সে দরজা দিয়ে নিফাক বা শঠতার মতো মারাত্মক বিষয় প্রবেশ করবে, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামে যার কোনো জায়গা নেই।
রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে কারও সামনাসামনি প্রশংসা করতে বারণ করতেন। কারণ, এতে প্রশংসাকারীর ভেতর নিফাক বা শঠতা ঢুকে যেতে পারে। কিংবা প্রশংসিতের মাঝে আত্মতুষ্টি ও নিজেকে বড় মনে করার বিধ্বংসী মানসিকতা তৈরি হতে পারে।
ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু বাকরা থেকে বর্ণনা করেছেন :
أَثْنَى رَجُلٌ عَلَى رَجُلٍ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ: «وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ، قَطَعْتَ عُنُقَ صَاحِبِكَ مِرَارًا، ثُمَّ قَالَ: «مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَادِحًا أَخَاهُ لَا مَحَالَةَ، فَلْيَقُلْ أَحْسِبُ فُلَانًا، وَاللَّهُ حَسِيبُهُ، وَلَا أُزَنِّي عَلَى اللَّهِ أَحَدًا أَحْسِبُهُ كَذَا وَكَذَا، إِنْ كَانَ يَعْلَمُ ذَلِكَ مِنْهُ»
'এক ব্যক্তি নবিজি-এর নিকট অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন, ধিক! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গর্দান কেটে দিয়েছ! কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেন, যদি তোমাদের কেউ তার সঙ্গীর একান্তই প্রশংসা করতে হয়, তবে তার এরূপ বলা উচিত, “অমুক সম্পর্কে আমার ধারণা এমন, তবে আল্লাহ-ই তার প্রকৃত অবস্থা নিরূপণকারী। আমি কাউকে আল্লাহর ওপর দিয়ে পবিত্রতা ঘোষণা করছি না। আমি শুধু তার সম্পর্কে এরূপ এরূপ ধারণা করি”-যদি সে (বাস্তবেই) তদ্রূপ জানে।'৫৫২
সুতরাং একান্তই যদি কারও প্রশংসা করতে হয়, তাহলে সত্য, যথার্থ ও বাস্তবভিত্তিক প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন করা যাবে না। অন্যথায় সমাজে নিফাক, মিথ্যা, লৌকিকতা, কপটতা, ছলনা ইত্যাকার সমাজবিধ্বংসী বিষয়সমূহ ছড়িয়ে পড়বে।
ইমাম বুখারি তাঁর আল-আদাবুল মুফরাদে মিহজান আসলামি থেকে বর্ণনা করেন :
'একদিন রাসুলুল্লাহ ও মিহজান আসলামি মসজিদে ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ মসজিদে এক ব্যক্তিকে নামাজ, রুকু ও সিজদারত অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি কে? তখন মিহজান তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলতে লাগলেন, এ ব্যক্তির এমন এমন গুণ আছে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, থামো, তাকে শুনিয়ো না, নতুবা তুমি তার সর্বনাশ করে ফেলবে।'৫৫৩
মুসনাদে আহমাদের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
'হে আল্লাহর নবি, এ হচ্ছে মদিনার সর্বাধিক উত্তম আমলকারী ব্যক্তি। অথবা বললেন, মদিনাবাসীদের মধ্যে সর্বাধিক নামাজ আদায়কারী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে শুনিয়ো না; নচেৎ তুমি তার সর্বনাশ করবে। কথাটি দুবার বা তিনবার বললেন। (তারপর বললেন,) তোমরা এমন উম্মত, যাদের সাথে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহজ ও সরলতার ইচ্ছা করা হয়েছে।
কাউকে শুনিয়ে তার প্রশংসা করাকে রাসুলুল্লাহ তাকে ধ্বংস করার নামান্তর বলেছেন। কেননা, এতে মানুষের মাঝে নিজের প্রশংসা শোনার যে মানবিক দুর্বলতা আছে, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তখন প্রশংসিত ব্যক্তিটি মিথ্যে অহমিকায় ডুবে যায়। তার মাঝে সৃষ্টি হয় অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও আত্মতুষ্টি। মুনাফিক ও প্রতারক প্রশংসাকারীরা যখন বারবার প্রশংসা করতে থাকে—তারা অধিকাংশ সময় প্রশাসক, উচ্চ দায়িত্বশীল ও শাসকদের প্রশংসা করে থাকে—তখন প্রশংসা শোনাটা তাদের নেশায় পরিণত হয়। প্রশংসা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তারা বসে থাকে। এজন্য উপদেশ ও বাস্তবভিত্তিক সমালোচনা তাদের মোটেও পছন্দ হয় না। প্রশংসায় যত বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন হয়, ততই তাদের ভালো লাগে। এই যদি হয়ে যায় মানুষের অবস্থা, তখন সত্য, ইনসাফ, মনুষ্যত্বের মর্যাদা ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু হবে না।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে অতিরঞ্জিত প্রশংসাকারীদের মুখে বালি নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সমাজে এ ধরনের লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায় এবং তাদের কারণে সমাজে নিফাক, চাটুকারিতা ও বালা-মুসিবত বৃদ্ধি না পায়।
ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিজি একাধিক সনদে বর্ণনা করেছেন:
'এক ব্যক্তি জনৈক শাসকের সম্মুখে তার প্রশংসা শুরু করলে মিকদাদ রাঃ তার মুখে বালি নিক্ষেপ করলেন। আর বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমরা (অতিরঞ্জিত) প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে বালি নিক্ষেপ করবে।' ৫৫৪
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম রাঃ প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। কাউকেই তাঁদের প্রশংসা করতে দিতেন না; অথচ নিঃসন্দেহে তাঁরা ছিলেন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ও হকদার। তবুও চাটুকারিতার ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা প্রশংসা এড়িয়ে চলতেন। তাঁরা বাস্তবভিত্তিক ইসলামি চরিত্রে নিজেদের সাজাতেন, যা এ ধরনের সস্তা প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা নাফি রঃ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: 'এক ব্যক্তি ইবনে উমর রাঃ-কে “হে সর্বোত্তম লোক” অথবা “হে সর্বোত্তম লোকের ছেলে” বলে সম্বোধন করল। তখন ইবনে উমর রাঃ বললেন, আমি সর্বোত্তম লোক বা সর্বোত্তম লোকের সন্তান নই। আমি আল্লাহর একজন বান্দা। আল্লাহর নিকট (রহমতের) আশা করি এবং তাঁকে (অর্থাৎ তাঁর আজাবকে) ভয় করি। আল্লাহর শপথ! তোমরা তো দেখছি, কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করতে করতে তাকে ধ্বংসই করে ছাড়বে! ৫৫৫
এটি মহান ইসলামের মর্ম অনুধাবনকারী এবং ভেতরে ও বাইরে রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শে সজ্জিত এক মহান সাহাবির প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী।
আসলে রাসুলুল্লাহ তাঁর কথা ও কাজকে নিফাক থেকে দূরে রাখার কারণে সাহাবিদের মাঝে একটি সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারতেন, কোনটি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য আর কোনটিতে নিফাক ও তোষামোদ মিশ্রিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে বলল, আমরা যখন আমাদের শাসকদের নিকট যাই, তখন তাদের এমন কথা বলি, যা তাদের অগোচরে বলা কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ইবনে উমর বললেন «كُنَّا نَعُدُّ هَذَا نِفَاقًا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» “নবিজি -এর জীবদ্দশায় আমরা এটাকে নিফাক মনে করতাম। ৫৫৬