📄 মানুষের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট লাঘব করতে সচেষ্ট থাকে
প্রকৃত মুসলমান-যে ইসলামি শরিয়ার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী লালিত হয়েছে এবং ইসলামের পবিত্র সরোবরে সিক্ত হয়েছে-সমাজে লোকদের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে সদা সচেষ্ট থাকে। কারণ, সত্য ও কল্যাণের যে নীতিমালার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত, সে নীতিমালাই তাকে এ মহৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ভালো কাজ করার জন্য সে সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না। যখন তখন, যেখানে সেখানে সে ভালো কাজ করে চলে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, ভালো কাজ সফলতা বয়ে আনে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'আর সৎকাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'৫০৮
প্রকৃত মুসলমান ভালো কাজের দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়। কারণ, সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ভালো কাজে তার প্রতি কদমে কদমে সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، قَالَ: تَعْدِلُ بَيْنَ الاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، قَالَ: وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَمْشِيهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের প্রতিটি গ্রন্থির ওপর প্রতিদিনের জন্য সদকা ধার্য রয়েছে। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করে দেওয়া একটি সদকা। কোনো ব্যক্তিকে বাহনের ওপর আরোহণে সাহায্য করা অথবা তার মালামাল বাহনের ওপর তুলে দেওয়া একটি সদকা। তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার ভালো কথাই এক একটি সদকা। নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে যতটি পদক্ষেপ ফেলা হয় তার প্রতিটিই এক একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সদকা।'৫০৯
মুসলমানের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ আর নামাজের জন্য মসজিদে গমন করার মধ্যে কী অদ্ভুত মিল। এজন্যই রাসুলুল্লাহ বলেছেন, দ্বীন মানবজাতির দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়ের কল্যাণ ও যথার্থতার জন্য প্রবর্তিত হয়েছে। দ্বীন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত; একাকী জীবন ও সামষ্টিক জীবন—সকল ক্ষেত্রেই কার্যকর। তাই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের ওপর চলে এমন প্রকৃত মুসলমানের সকল কাজই ইবাদতে পরিণত হয়, যখন সে তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে।
ফলে প্রকৃত মুসলমানের সামনে কল্যাণের অনেক দরজা উন্মুক্ত থাকে, যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে সে। তার ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া বিস্তৃত থাকে। অর্জন করতে পারে অনেক অনেক সাওয়াব।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। '৫১০
আবু হুরাইরা রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: الكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ 'ভালো কথা সদকা। '৫১১
শুধু তাই নয়, যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দিয়েছে এবং নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিয়েছে, সে ভালো কাজ করতে পারলে তো সাওয়াব পায়-ই, করতে না পারলেও সাওয়াব পায়। তবে শর্ত হলো, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে আবু মুসা সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ يَعْتَمِلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ قَالَ قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ قَالَ قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ أَوِ الْخَيْرِ قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যদি কেউ সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তখন কী করবে? বললেন, সে হাত দ্বারা কাজ করবে। এতে তার উপকারও হবে এবং সদকা করারও সামর্থ্য আসবে। তারা বললেন, যদি তারও সামর্থ্য না রাখে; অথবা বললেন, যদি তা-ও করতে না পারে, তখন কী করবে? বললেন, সে অভাবী দুঃখী মানুষকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও না করে, তখন কী করবে? বললেন, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তখন কী করবে? তিনি বললেন, সে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কারণ এটাও তার জন্য সদকা হবে।'৫১২
রাসুলুল্লাহ প্রথমে 'সকল মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব' বলে কথা শুরু করলেন। তারপর একের পর এক ভালো ও নেক আমলের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বান্দা সে সদকার ক্ষতিপূরণ করতে পারবে। সুতরাং মুসলমানের ওপর সদকা করা ওয়াজিব মানে তার ওপর সমাজে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করা ওয়াজিব। যদি তা করতে সক্ষম না হয়, কিংবা কোনো কারণে না করে, তাহলে সে অন্তত তার জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এটাও তার সদকার ক্ষতিপূরণ করবে। এজন্যই বলা হয়, প্রকৃত মুসলমানের কর্মতৎপরতা (অর্থাৎ ভালো কাজ করা) এবং অবসর (অর্থাৎ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা) - উভয়টিই সমাজের জন্য কল্যাণকর।
এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন :
المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
'প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত (-এর অনিষ্ট) থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। '৫১৩
এতটুকুই নয় শুধু, রাসুলুল্লাহ তো সেই ব্যক্তিকেই সমাজের সর্বোত্তম মুসলমান বলেছেন, যার থেকে কল্যাণের আশা করা যায় এবং যার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
হাদিসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ عَلَى نَاسٍ جُلُوسٍ، فَقَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِكُمْ مِنْ شَرِّكُمْ؟» فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ ، وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ، وَشَرُّكُمْ مَنْ لَا يُرْجَى خَيْرُهُ، وَلَا يُؤْمَنُ شَرُّهُ
'বসে থাকা একদল লোকের সামনে দাঁড়িয়ে নবিজি বললেন, আমি কি তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি কে, তা জানিয়ে দেবো? লোকজন চুপ করে রইল। নবিজি প্রশ্নটি একে একে তিনবার করলেন। তারপর তাদের একজন বলল, অবশ্যই জানাবেন হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সে ব্যক্তি, যার কল্যাণের আশা করা যায় এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হলো, যার কল্যাণের আশা করা যায় না এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। '৫১৪
মুসলমান সমাজের কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু করে না। তা করতে না পারলে অন্তত খারাপ কাজ ও কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর প্রকৃত মুসলমান সব সময় ভালো ও কল্যাণকর কাজ করে। খারাপ কোনো কাজ তার থেকে প্রকাশ পায় না। কারণ, সে সব সময় রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসের ওপর আমল করে:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৫১৫
যে মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে অর্থাৎ নিজের উপকার লাভের জন্য ও নিজের কষ্ট দূর করার জন্য যেমন চেষ্টা করে, তেমনই অন্য ভাইয়ের উপকারের জন্য এবং তাদের কষ্ট দূর করার জন্য ও চেষ্টা করে, সে ইসলামি সমাজে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত হয়। মুসলমান ভাইদের প্রতি তার এ খিদমতের কারণে স্বয়ং আল্লাহকেই সে তার সাহায্যকারী হিসাবে পেয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ اللَّهُ فِي حَاجَةِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ
'আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার প্রয়োজনে পাশে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকে। '৫১৬
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন :
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ، مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً، فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। একজন আরেকজনের প্রতি জুলুম করতে পারে না এবং শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে না। যে ব্যক্তি তার (মুসলমান) ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকবে, তার প্রয়োজনে আল্লাহ তার পাশে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের কষ্টসমূহ থেকে তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। '৫১৭
অন্য হাদিসে বলেন:
مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفْسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য সহজ করবেন। '৫১৮
রাসুলুল্লাহ সমাজে পারস্পরিক সাহায্য করার ফজিলতকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এটাকে তিনি দীর্ঘ ইতিকাফের চেয়েও উত্তম বলেছেন। যেমন ইবনে আব্বাস রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ مَشَى فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ خَيْرًا لَهُ مِنَ اعْتِكَافِ عَشْرِ سِنِينَ، وَمَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلَاثَ خَنَادِقَ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخَافِقَيْنِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য হাঁটবে, এ হাঁটা তার জন্য বিশ বছর ইতিকাফে অবস্থান করার চেয়েও উত্তম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন পরিখার আড়াল করে দেন। প্রত্যেক পরিখার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দূরত্বের সমান। '৫১৯
শক্তি ও সামর্থ্য থাকার পরেও মানুষের সেবা করতে বিরক্তিবোধ করলে নিয়ামত চলে যাওয়ার হুমকি এসেছে। যেমন ইবনে আব্বাস -এর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
‘যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা কোনো নিয়ামত দান করলেন, অতঃপর তা পূর্ণ করলেন, তারপর তার সামনে মানুষের প্রয়োজন পেশ করা হলে সে তাতে বিরক্তিবোধ করল, সে যেন তার সেই নিয়ামত চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দিল। '৫২০
সহিহ হাদিসে জান্নাতবাসীদের সুখের যেসব চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো, এক ব্যক্তি জান্নাতের নিয়ামত ও সুখের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। কারণ, সে মুসলমানদের রাস্তা থেকে একটি গাছ কেটে ফেলেছিল, যে গাছ থাকার কারণে মুসলমানদের পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিল। হাদিসটি হলো :
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلًا يَتَقَلَّبُ فِي الْجَنَّةِ، فِي شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَّرِيقِ، كَانَتْ تُؤْذِي النَّاسُ
'আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে জান্নাতে (নিয়ামতসমূহের ওপর) গড়াগড়ি খাচ্ছে। এটা (নিয়ামতপ্রাপ্তি) রাস্তার ওপর থেকে এমন একটি গাছ কাটার প্রতিদানস্বরূপ, যেটার কারণে মুসলমানদের কষ্ট হতো। ৫২১
কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের উপকার করার একটি পদ্ধতি হলো, তাদের থেকে কষ্ট দূর করে দেওয়া। যে ব্যক্তি মুসলমানদের থেকে কষ্ট দূর করে এবং যে তাদের উপকার করে—উভয়জনই সমান। উভয়জনই মুসলমানদের উপকার করে। সাওয়াব, রহমত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে উভয়জন বরাবর। এজন্য রাসুলুল্লাহ -এর নির্দেশনার মধ্যে উভয় বিষয় উঠে এসেছে। সমাজের উন্নতি ও সদস্যদের পারস্পরিক হৃদ্যতা উভয় বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে।
মুসলমানদের কষ্ট দূর করা সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, আবু বারজা বর্ণনা করেন:
قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ عَلَّمْنِي شَيْئًا أَنْتَفِعُ بِهِ، قَالَ: اعْزِلِ الْأَذَى، عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
'আমি বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা থেকে আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, مسلمانوں রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।' ৫২২
আরেক রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে:
يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ؟ قَالَ: أَمِطِ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন আমল বাতলে দেন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরাও।'
যে সমাজ ইসলামের দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যে সমাজের প্রতিজন সদস্য বিশ্বাস করে যে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেললে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় এবং জান্নাত অর্জিত হয়, সে সমাজের চেয়ে উন্নত আর কোনো সমাজ কি থাকতে পারে? নিঃসন্দেহে ইসলামি সমাজই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ। কারণ, এ সমাজের সদস্যরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা, খাবারের পচা উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি ফেলার কথা কল্পনাই করতে পারে না, যে বিষয়গুলোর কারণে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ লোকদের শাস্তি দিয়ে থাকে এবং রাস্তা থেকে এসব নোংরা-আবর্জনা সরানোর জন্য বিরাট অঙ্কের ব্যয় বহন করে।
আল্লাহর দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত সমাজ আর অন্যান্য সমাজের মাঝে কত বড় পার্থক্য! ইসলামি সমাজে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং সাওয়াবের আশায় রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলে। আর অন্যান্য সমাজে লোকজন নিজেরাই বাড়ির জানালা ও ছাদ থেকে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তায় নিক্ষেপ করে।
পাশ্চাত্য সমাজ এসব বিষয়ের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে এবং জনগণের মনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করার ও তা বাস্তবায়ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইসলামি সমাজে মানুষের মনে আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং যেরূপ আন্তরিকতার সহিত তারা তা বাস্তবায়ন করে, পাশ্চাত্য সমাজে তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না। কারণ, ইসলামি সমাজের সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, এ আইন লঙ্ঘন করা মানে আল্লাহর নাফরমানি করা। এ আইন লঙ্ঘন করলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ আর সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। তবে যে পরিুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে, সে ব্যতিক্রম। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সমাজের সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করাকে এত বড় গুনাহ বা অপরাধ মনে করে না। আইন অমান্য করতে গেলে তাদের বিবেক কখনো তিরস্কার করে, কখনো করে না। শেষমেষ অবশ্য আইন অমান্য করেই ফেলে। বিশেষ করে কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
প্রকৃত মুসলমান-যে ইসলামি শরিয়ার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী লালিত হয়েছে এবং ইসলামের পবিত্র সরোবরে সিক্ত হয়েছে-সমাজে লোকদের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে সদা সচেষ্ট থাকে। কারণ, সত্য ও কল্যাণের যে নীতিমালার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত, সে নীতিমালাই তাকে এ মহৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ভালো কাজ করার জন্য সে সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না। যখন তখন, যেখানে সেখানে সে ভালো কাজ করে চলে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, ভালো কাজ সফলতা বয়ে আনে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'আর সৎকাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'৫০৮
প্রকৃত মুসলমান ভালো কাজের দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়। কারণ, সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ভালো কাজে তার প্রতি কদমে কদমে সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، قَالَ: تَعْدِلُ بَيْنَ الاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، قَالَ: وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَمْشِيهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের প্রতিটি গ্রন্থির ওপর প্রতিদিনের জন্য সদকা ধার্য রয়েছে। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করে দেওয়া একটি সদকা। কোনো ব্যক্তিকে বাহনের ওপর আরোহণে সাহায্য করা অথবা তার মালামাল বাহনের ওপর তুলে দেওয়া একটি সদকা। তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার ভালো কথাই এক একটি সদকা। নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে যতটি পদক্ষেপ ফেলা হয় তার প্রতিটিই এক একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সদকা।'৫০৯
মুসলমানের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ আর নামাজের জন্য মসজিদে গমন করার মধ্যে কী অদ্ভুত মিল। এজন্যই রাসুলুল্লাহ বলেছেন, দ্বীন মানবজাতির দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়ের কল্যাণ ও যথার্থতার জন্য প্রবর্তিত হয়েছে। দ্বীন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত; একাকী জীবন ও সামষ্টিক জীবন—সকল ক্ষেত্রেই কার্যকর। তাই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের ওপর চলে এমন প্রকৃত মুসলমানের সকল কাজই ইবাদতে পরিণত হয়, যখন সে তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে।
ফলে প্রকৃত মুসলমানের সামনে কল্যাণের অনেক দরজা উন্মুক্ত থাকে, যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে সে। তার ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া বিস্তৃত থাকে। অর্জন করতে পারে অনেক অনেক সাওয়াব।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। '৫১০
আবু হুরাইরা রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: الكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ 'ভালো কথা সদকা। '৫১১
শুধু তাই নয়, যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দিয়েছে এবং নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিয়েছে, সে ভালো কাজ করতে পারলে তো সাওয়াব পায়-ই, করতে না পারলেও সাওয়াব পায়। তবে শর্ত হলো, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে আবু মুসা সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ يَعْتَمِلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ قَالَ قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ قَالَ قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ أَوِ الْخَيْرِ قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যদি কেউ সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তখন কী করবে? বললেন, সে হাত দ্বারা কাজ করবে। এতে তার উপকারও হবে এবং সদকা করারও সামর্থ্য আসবে। তারা বললেন, যদি তারও সামর্থ্য না রাখে; অথবা বললেন, যদি তা-ও করতে না পারে, তখন কী করবে? বললেন, সে অভাবী দুঃখী মানুষকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও না করে, তখন কী করবে? বললেন, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তখন কী করবে? তিনি বললেন, সে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কারণ এটাও তার জন্য সদকা হবে।'৫১২
রাসুলুল্লাহ প্রথমে 'সকল মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব' বলে কথা শুরু করলেন। তারপর একের পর এক ভালো ও নেক আমলের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বান্দা সে সদকার ক্ষতিপূরণ করতে পারবে। সুতরাং মুসলমানের ওপর সদকা করা ওয়াজিব মানে তার ওপর সমাজে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করা ওয়াজিব। যদি তা করতে সক্ষম না হয়, কিংবা কোনো কারণে না করে, তাহলে সে অন্তত তার জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এটাও তার সদকার ক্ষতিপূরণ করবে। এজন্যই বলা হয়, প্রকৃত মুসলমানের কর্মতৎপরতা (অর্থাৎ ভালো কাজ করা) এবং অবসর (অর্থাৎ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা) - উভয়টিই সমাজের জন্য কল্যাণকর।
এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন :
المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
'প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত (-এর অনিষ্ট) থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। '৫১৩
এতটুকুই নয় শুধু, রাসুলুল্লাহ তো সেই ব্যক্তিকেই সমাজের সর্বোত্তম মুসলমান বলেছেন, যার থেকে কল্যাণের আশা করা যায় এবং যার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
হাদিসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ عَلَى نَاسٍ جُلُوسٍ، فَقَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِكُمْ مِنْ شَرِّكُمْ؟» فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ ، وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ، وَشَرُّكُمْ مَنْ لَا يُرْجَى خَيْرُهُ، وَلَا يُؤْمَنُ شَرُّهُ
'বসে থাকা একদল লোকের সামনে দাঁড়িয়ে নবিজি বললেন, আমি কি তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি কে, তা জানিয়ে দেবো? লোকজন চুপ করে রইল। নবিজি প্রশ্নটি একে একে তিনবার করলেন। তারপর তাদের একজন বলল, অবশ্যই জানাবেন হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সে ব্যক্তি, যার কল্যাণের আশা করা যায় এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হলো, যার কল্যাণের আশা করা যায় না এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। '৫১৪
মুসলমান সমাজের কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু করে না। তা করতে না পারলে অন্তত খারাপ কাজ ও কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর প্রকৃত মুসলমান সব সময় ভালো ও কল্যাণকর কাজ করে। খারাপ কোনো কাজ তার থেকে প্রকাশ পায় না। কারণ, সে সব সময় রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসের ওপর আমল করে:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৫১৫
যে মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে অর্থাৎ নিজের উপকার লাভের জন্য ও নিজের কষ্ট দূর করার জন্য যেমন চেষ্টা করে, তেমনই অন্য ভাইয়ের উপকারের জন্য এবং তাদের কষ্ট দূর করার জন্য ও চেষ্টা করে, সে ইসলামি সমাজে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত হয়। মুসলমান ভাইদের প্রতি তার এ খিদমতের কারণে স্বয়ং আল্লাহকেই সে তার সাহায্যকারী হিসাবে পেয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ اللَّهُ فِي حَاجَةِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ
'আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার প্রয়োজনে পাশে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকে। '৫১৬
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন :
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ، مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً، فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। একজন আরেকজনের প্রতি জুলুম করতে পারে না এবং শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে না। যে ব্যক্তি তার (মুসলমান) ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকবে, তার প্রয়োজনে আল্লাহ পাশে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের কষ্টসমূহ থেকে তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। '৫১৭
অন্য হাদিসে বলেন:
مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفْسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য সহজ করবেন। '৫১৮
রাসুলুল্লাহ সমাজে পারস্পরিক সাহায্য করার ফজিলতকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এটাকে তিনি দীর্ঘ ইতিকাফের চেয়েও উত্তম বলেছেন। যেমন ইবনে আব্বাস রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ مَشَى فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ خَيْرًا لَهُ مِنَ اعْتِكَافِ عَشْرِ سِنِينَ، وَمَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلَاثَ خَنَادِقَ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخَافِقَيْنِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য হাঁটবে, এ হাঁটা তার জন্য বিশ বছর ইতিকাফে অবস্থান করার চেয়েও উত্তম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন পরিখার আড়াল করে দেন। প্রত্যেক পরিখার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দূরত্বের সমান। '৫১৯
শক্তি ও সামর্থ্য থাকার পরেও মানুষের সেবা করতে বিরক্তিবোধ করলে নিয়ামত চলে যাওয়ার হুমকি এসেছে। যেমন ইবনে আব্বাস -এর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
‘যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা কোনো নিয়ামত দান করলেন, অতঃপর তা পূর্ণ করলেন, তারপর তার সামনে মানুষের প্রয়োজন পেশ করা হলে সে তাতে বিরক্তিবোধ করল, সে যেন তার সেই নিয়ামত চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দিল। '৫২০
সহিহ হাদিসে জান্নাতবাসীদের সুখের যেসব চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো, এক ব্যক্তি জান্নাতের নিয়ামত ও সুখের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। কারণ, সে মুসলমানদের রাস্তা থেকে একটি গাছ কেটে ফেলেছিল, যে গাছ থাকার কারণে মুসলমানদের পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিল। হাদিসটি হলো :
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلًا يَتَقَلَّبُ فِي الْجَنَّةِ، فِي شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَّرِيقِ، كَانَتْ تُؤْذِي النَّاسُ
'আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে জান্নাতে (নিয়ামতসমূহের ওপর) গড়াগড়ি খাচ্ছে। এটা (নিয়ামতপ্রাপ্তি) রাস্তার ওপর থেকে এমন একটি গাছ কাটার প্রতিদানস্বরূপ, যেটার কারণে মুসলমানদের কষ্ট হতো। ৫২১
কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের উপকার করার একটি পদ্ধতি হলো, তাদের থেকে কষ্ট দূর করে দেওয়া। যে ব্যক্তি মুসলমানদের থেকে কষ্ট দূর করে এবং যে তাদের উপকার করে—উভয়জনই সমান। উভয়জনই মুসলমানদের উপকার করে। সাওয়াব, রহমত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে উভয়জন বরাবর। এজন্য রাসুলুল্লাহ -এর নির্দেশনার মধ্যে উভয় বিষয় উঠে এসেছে। সমাজের উন্নতি ও সদস্যদের পারস্পরিক হৃদ্যতা উভয় বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে।
মুসলমানদের কষ্ট দূর করা সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, আবু বারজা বর্ণনা করেন:
قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ عَلَّمْنِي شَيْئًا أَنْتَفِعُ بِهِ، قَالَ: اعْزِلِ الْأَذَى، عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
'আমি বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা থেকে আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, مسلمانوں রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।' ৫২২
আরেক রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে:
يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ؟ قَالَ: أَمِطِ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন আমল বাতলে দেন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরাও।'
যে সমাজ ইসলামের দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যে সমাজের প্রতিজন সদস্য বিশ্বাস করে যে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেললে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় এবং জান্নাত অর্জিত হয়, সে সমাজের চেয়ে উন্নত আর কোনো সমাজ কি থাকতে পারে? নিঃসন্দেহে ইসলামি সমাজই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ। কারণ, এ সমাজের সদস্যরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা, খাবারের পচা উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি ফেলার কথা কল্পনাই করতে পারে না, যে বিষয়গুলোর কারণে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ লোকদের শাস্তি দিয়ে থাকে এবং রাস্তা থেকে এসব নোংরা-আবর্জনা সরানোর জন্য বিরাট অঙ্কের ব্যয় বহন করে।
আল্লাহর দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত সমাজ আর অন্যান্য সমাজের মাঝে কত বড় পার্থক্য! ইসলামি সমাজে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং সাওয়াবের আশায় রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলে। আর অন্যান্য সমাজে লোকজন নিজেরাই বাড়ির জানালা ও ছাদ থেকে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তায় নিক্ষেপ করে।
পাশ্চাত্য সমাজ এসব বিষয়ের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে এবং জনগণের মনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করার ও তা বাস্তবায়ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইসলামি সমাজে মানুষের মনে আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং যেরূপ আন্তরিকতার সহিত তারা তা বাস্তবায়ন করে, পাশ্চাত্য সমাজে তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না। কারণ, ইসলামি সমাজের সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, এ আইন লঙ্ঘন করা মানে আল্লাহর নাফরমানি করা। এ আইন লঙ্ঘন করলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ আর সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। তবে যে পরিুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে, সে ব্যতিক্রম। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সমাজের সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করাকে এত বড় গুনাহ বা অপরাধ মনে করে না। আইন অমান্য করতে গেলে তাদের বিবেক কখনো তিরস্কার করে, কখনো করে না। শেষমেষ অবশ্য আইন অমান্য করেই ফেলে। বিশেষ করে কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
📄 মুসলমানদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার চেষ্টা করে
মুসলমানদের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দিলে মীমাংসা করে দেওয়া উপকার করা এবং কষ্ট দূর করে দেওয়ার-ই প্রকারভুক্ত। এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিস অসংখ্য রয়েছে, যার সবগুলো এখানে একত্র করা সম্ভব নয়। তন্মধ্যে একটি হলো, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। ’৫২৩
আয়াতটি লড়াইরত দুই দলের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া সম্পর্কে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা। এমনকি সন্ধি ও মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য অত্যাচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপনীত হতে হলেও তা করতে হবে।
এরপর مسلمانوں পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। ’৫২৪
রাসুলুল্লাহ দাওয়াতের কষ্ট ও ব্যস্ততার ফাঁকেও লড়াইরত দুই দলের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এর মাধ্যমে মুসলমানদের সামনে তিনি মীমাংসা করে দেওয়ার আবশ্যকতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এ সম্পর্কে আবুল আব্বাস সাহল বিন সাদ সায়িদি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট খবর পৌঁছল যে, বনু আমর বিন আওফের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। তখন তিনি কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বের হলেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত ঘটনা একটি দীর্ঘ সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ মুমিনদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। এজন্য তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে ভালো কাজ, উদারতা, নম্রতা ইত্যাকার উত্তম গুণাবলি সৃষ্টি করার চেষ্টা করতেন। তারবিয়াতের সময় এ দিকটির প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, কঠোরতা ইত্যাদি বিষয়কে মুচকি হাসি, উদারতা ইত্যাদি দ্বারা পরিবর্তন করে দিতেন।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
سَمِعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَوْتَ خُصُومٍ بِالْبَابِ عَالِيَةٍ أَصْوَاتُهُمَا، وَإِذَا أَحَدُهُمَا يَسْتَوْضِعُ الْآخَرَ، وَيَسْتَرْفِقُهُ فِي شَيْءٍ، وَهُوَ يَقُولُ: وَاللهِ لَا أَفْعَلُ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَيْنَ المُتَأَلِّي عَلَى اللهِ، لَا يَفْعَلُ المَعْرُوفَ؟، فَقَالَ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَهُ أَيُّ ذَلِكَ أَحَبَّ
'রাসুলুল্লাহ দরজার পাশে দুই বিবাদমান ব্যক্তির উঁচু স্বর শুনতে পেলেন। তাদের একজন অপরজনকে ঋণের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বলছে এবং তার সহানুভূতি কামনা করছে। প্রত্যুত্তরে অপরজন বলছে, আল্লাহর শপথ! আমি তা করব না। রাসুলুল্লাহ তাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, সে লোকটি কোথায় যে আল্লাহর শপথ করে বলছে যে, সে ভালো কাজ করবে না? প্রতিপক্ষ লোকটি (লজ্জা পেয়ে) বলল, আমি, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার ভুল হয়ে গেছে; অতএব) সে যা চায় তা-ই হবে।'৫২৫
মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সহজ করার জন্য রাসুলুল্লাহ এমন অনেক কথার অনুমতি দিয়েছেন, যেসব কথায় ঘৃণাপূর্ণ ও কঠোর অন্তরকে নরম করার জন্য একটু বাড়িয়ে বলা হয়। এসব কথাকে নিষিদ্ধ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করেননি। যারা এ উদ্দেশ্যে একটু বাড়িয়ে বলে তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেননি। উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত -এর হাদিসে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, :
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيُنْمِي خَيْرًا، أَوْ يَقُولُ خَيْرًا
'ওই ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে উত্তম কথা বলে। '৫২৬
মুসলিমের রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত এসেছে:
وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ : الْحَرْبُ، وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
'আমি রাসুলুল্লাহ -কে তিনটি জায়গা ব্যতীত আর কোনো জায়গায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে দেখিনি। সে জায়গাগুলো হলো-যুদ্ধ, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া এবং স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে (ভালোবাসা সৃষ্টি বা বিশেষ প্রয়োজনে মিথ্যা) কোনো কথা বলা। '৫২৭
মুসলমানদের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দিলে মীমাংসা করে দেওয়া উপকার করা এবং কষ্ট দূর করে দেওয়ার-ই প্রকারভুক্ত। এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিস অসংখ্য রয়েছে, যার সবগুলো এখানে একত্র করা সম্ভব নয়। তন্মধ্যে একটি হলো, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। ’৫২৩
আয়াতটি লড়াইরত দুই দলের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া সম্পর্কে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা। এমনকি সন্ধি ও মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য অত্যাচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপনীত হতে হলেও তা করতে হবে।
এরপর مسلمانوں পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। ’৫২৪
রাসুলুল্লাহ দাওয়াতের কষ্ট ও ব্যস্ততার ফাঁকেও লড়াইরত দুই দলের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এর মাধ্যমে مسلمانوں সামনে তিনি মীমাংসা করে দেওয়ার আবশ্যকতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এ সম্পর্কে আবুল আব্বাস সাহল বিন সাদ সায়িদি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট খবর পৌঁছল যে, বনু আমর বিন আওফের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। তখন তিনি কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বের হলেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত ঘটনা একটি দীর্ঘ সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ মুমিনদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। এজন্য তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে मुसलमानों মাঝে ভালো কাজ, উদারতা, নম্রতা ইত্যাকার উত্তম গুণাবলি সৃষ্টি করার চেষ্টা করতেন। তারবিয়াতের সময় এ দিকটির প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, কঠোরতা ইত্যাদি বিষয়কে মুচকি হাসি, উদারতা ইত্যাদি দ্বারা পরিবর্তন করে দিতেন।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
سَمِعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَوْتَ خُصُومٍ بِالْبَابِ عَالِيَةٍ أَصْوَاتُهُمَا، وَإِذَا أَحَدُهُمَا يَسْتَوْضِعُ الْآخَرَ، وَيَسْتَرْفِقُهُ فِي شَيْءٍ، وَهُوَ يَقُولُ: وَاللهِ لَا أَفْعَلُ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَيْنَ المُتَأَلِّي عَلَى اللهِ، لَا يَفْعَلُ المَعْرُوفَ؟، فَقَالَ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَهُ أَيُّ ذَلِكَ أَحَبَّ
'রাসুলুল্লাহ দরজার পাশে দুই বিবাদমান ব্যক্তির উঁচু স্বর শুনতে পেলেন। তাদের একজন অপরজনকে ঋণের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বলছে এবং তার সহানুভূতি কামনা করছে। প্রত্যুত্তরে অপরজন বলছে, আল্লাহর শপথ! আমি তা করব না। রাসুলুল্লাহ তাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, সে লোকটি কোথায় যে আল্লাহর শপথ করে বলছে যে, সে ভালো কাজ করবে না? প্রতিপক্ষ লোকটি (লজ্জা পেয়ে) বলল, আমি, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার ভুল হয়ে গেছে; অতএব) সে যা চায় তা-ই হবে।'৫২৫
মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সহজ করার জন্য রাসুলুল্লাহ এমন অনেক কথার অনুমতি দিয়েছেন, যেসব কথায় ঘৃণাপূর্ণ ও কঠোর অন্তরকে নরম করার জন্য একটু বাড়িয়ে বলা হয়। এসব কথাকে নিষিদ্ধ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করেননি। যারা এ উদ্দেশ্যে একটু বাড়িয়ে বলে তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেননি। উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত -এর হাদিসে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, :
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيُنْمِي خَيْرًا، أَوْ يَقُولُ خَيْرًا
'ওই ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে উত্তম কথা বলে। '৫২৬
মুসলিমের রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত এসেছে:
وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ : الْحَرْبُ، وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
'আমি রাসুলুল্লাহ -কে তিনটি জায়গা ব্যতীত আর কোনো জায়গায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে দেখিনি। সে জায়গাগুলো হলো-যুদ্ধ, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া এবং স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে (ভালোবাসা সৃষ্টি বা বিশেষ প্রয়োজনে মিথ্যা) কোনো কথা বলা। '৫২৭
📄 সত্যের দিকে আহ্বান করে
প্রকৃত মুসলমান দ্বীনের দাওয়াত দেওয়াকে নিজের ব্রত বানিয়ে নেয়। সব সময় সে দাওয়াত দেয়। কোনো বিপদ বা বাধা তাকে দাওয়াতের এ মেহনত থেকে বিরত রাখতে পারে না। একনিষ্ঠ দায়িদের জন্য আল্লাহ যে পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন, তার আশায় সে অবিরাম দাওয়াতের মেহনতে লিপ্ত থাকে।
দায়িদের পুরস্কার সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ আলি -কে বলেন:
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। '৫২৮
পথচ্যুত ব্যক্তির কানে দ্বীনের প্রকৃত দায়ি যখন উত্তম কথা শোনায় এবং এর মাধ্যমে তার অন্তরে হিদায়াতের বীজ বপিত হয়, তখন দায়ি এমন সাওয়াব পায়, যা লাল উটের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখনকার সময়ে লাল উট সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হতো। এ ছাড়াও হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেসব সাওয়াব অর্জন করতে থাকবে, দায়িও তার অনুরূপ সাওয়াব পেতে থাকবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا
'যে হিদায়াতের পথের দিকে দাওয়াত দেয়, সে তার অনুসারীদের (যারা তার দাওয়াত পেয়ে হিদায়াতের পথে এসেছে) সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব পাবে। কিন্তু এতে তাদের সাওয়াব থেকেও কোনো অংশ কমবে না। '৫২৯
দায়িদের ধৈর্য ও আল্লাহর রাস্তার কঠিন পরীক্ষায় দৃঢ়পদ থাকা সত্যিই ঈর্ষণীয়। তারা নিজেদের সম্পদ ও সময় পথচ্যুত ব্যক্তিদের দাওয়াতের পেছনে ব্যয় করে চলে। এজন্যই তাদের প্রতি ঈর্ষা করতে রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে:
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ حِكْمَةً، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
'কেবল দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা যায়। এক. যাকে আল্লাহ ধন- সম্পদ দান করেছেন, আর সে তা হকের পথে ব্যয় করে। দুই. যাকে আল্লাহ হিকমত বা প্রজ্ঞা দান করেছেন, আর সে তা দ্বারা ফয়সালা করে এবং লোকজনকে তা শিক্ষা দেয়। '৫৩০
প্রকৃত মুসলমান দাওয়াতের জন্য দ্বীনি ইলমের কোনো অংশকেই ছোট মনে করে না। সত্যের একটি বাণীও যদি তার নিকট পৌঁছে, তা সে অপরজনের কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমনই নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন: بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةٌ 'তোমরা আমার নিকট থেকে লোকদের মাঝে প্রচার করো; যদিও তা একটি আয়াতই হোক। '৫৩১
এর কারণ হলো, অনেক সময় মানুষের হিদায়াত একটিমাত্র আয়াতের ওপর নির্ভর করে থাকে। যখনই সে আয়াত উক্ত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যায়, তখনই তার অন্তর হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
প্রকৃত মুসলমান পরোপকারী হয়। সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে। সব সময় মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ফিকির করে। এভাবেই সে আল্লাহ, রাসুল, مسلمانوں নেতৃস্থানীয় লোক এবং সাধারণ مسلمانوں প্রতি কল্যাণকামী সাব্যস্ত হয়। যেমনটি উপরোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ বোধ থেকেই সে নিজের হিদায়াতের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য লোকসহ সকল মানুষের হিদায়াতের ফিকির করে। কারণ, সে নিজের ও পরিবারের জন্য যেমন জান্নাত পছন্দ করে, তেমনই সকল মানুষের জন্যও জান্নাত পছন্দ করে। এজন্য সে সর্বদা তাদের এমন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতে থাকে, যা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। একজন দায়ির মাঝে এ বোধ ও গুণাবলি থাকে বলেই তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা মর্যাদার অধিকারী হয়। দাওয়াত দেওয়া এতই উত্তম ও উন্নত কাজ যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ দায়িদের প্রশংসা ও তাদের জন্য দুআ করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ .
‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল করুন, যে আমার কাছ থেকে কোনো কিছু শুনে তা যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, যাদের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়, তাদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তিও থাকতে পারে, যারা আমার থেকে সরাসরি শ্রবণকারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।' ৫৩২
ইসলামি সমাজটাই এমন যে, সেখানে একজনের প্রতি অন্যজনের দায়িত্ব রয়েছে। এ ছাড়াও প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে তাদের এ দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। কিন্তু এ দায়িত্ববোধ আজ مسلمانوں মাঝে নেই বিধায় তাদের সমাজে শান্তি উধাও হয়ে গেছে। আজ যদি তাদের মাঝে সামাজিক সেই দায়িত্ববোধ থাকত এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভয় থাকত, তাহলে مسلمانوں আজকের এ অধঃপতন হতো না। নিজেদের দ্বীন থেকেও তারা এত দূর সরে আসত না।
এজন্যই দাওয়াতের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে ইলম দান করেছেন, তা অন্যের নিকট থেকে গোপন করে (অর্থাৎ অন্যদের শিক্ষা না দিয়ে) পার্থিব মর্যাদা বৃদ্ধি ও ধ্বংসশীল দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বানায়, তার জন্য কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِّمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيْبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَعْنِيْ رِيْحَهَا
‘যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করেছে, যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কিন্তু সে তা অর্জন করেছে কেবল দুনিয়াবি সম্পদ। অর্জন করার জন্য, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৫৩৩
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কারও কাছ থেকে ইলম জানতে চাওয়া হলো, আর সে (জানা সত্ত্বেও) তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'৫৩৪
প্রকৃত মুসলমান দ্বীনের দাওয়াত দেওয়াকে নিজের ব্রত বানিয়ে নেয়। সব সময় সে দাওয়াত দেয়। কোনো বিপদ বা বাধা তাকে দাওয়াতের এ মেহনত থেকে বিরত রাখতে পারে না। একনিষ্ঠ দায়িদের জন্য আল্লাহ যে পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন, তার আশায় সে অবিরাম দাওয়াতের মেহনতে লিপ্ত থাকে।
দায়িদের পুরস্কার সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ আলি -কে বলেন:
فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। '৫২৮
পথচ্যুত ব্যক্তির কানে দ্বীনের প্রকৃত দায়ি যখন উত্তম কথা শোনায় এবং এর মাধ্যমে তার অন্তরে হিদায়াতের বীজ বপিত হয়, তখন দায়ি এমন সাওয়াব পায়, যা লাল উটের চেয়ে বেশি মূল্যবান। তখনকার সময়ে লাল উট সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হতো। এ ছাড়াও হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেসব সাওয়াব অর্জন করতে থাকবে, দায়িও তার অনুরূপ সাওয়াব পেতে থাকবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا
'যে হিদায়াতের পথের দিকে দাওয়াত দেয়, সে তার অনুসারীদের (যারা তার দাওয়াত পেয়ে হিদায়াতের পথে এসেছে) সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব পাবে। কিন্তু এতে তাদের সাওয়াব থেকেও কোনো অংশ কমবে না। '৫২৯
দায়িদের ধৈর্য ও আল্লাহর রাস্তার কঠিন পরীক্ষায় দৃঢ়পদ থাকা সত্যিই ঈর্ষণীয়। তারা নিজেদের সম্পদ ও সময় পথচ্যুত ব্যক্তিদের দাওয়াতের পেছনে ব্যয় করে চলে। এজন্যই তাদের প্রতি ঈর্ষা করতে রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে:
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ: رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٍ آتَاهُ اللهُ حِكْمَةً، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
'কেবল দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা যায়। এক. যাকে আল্লাহ ধন- সম্পদ দান করেছেন, আর সে তা হকের পথে ব্যয় করে। দুই. যাকে আল্লাহ হিকমত বা প্রজ্ঞা দান করেছেন, আর সে তা দ্বারা ফয়সালা করে এবং লোকজনকে তা শিক্ষা দেয়। '৫৩০
প্রকৃত মুসলমান দাওয়াতের জন্য দ্বীনি ইলমের কোনো অংশকেই ছোট মনে করে না। সত্যের একটি বাণীও যদি তার নিকট পৌঁছে, তা সে অপরজনের কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ এমনই নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন: بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةٌ 'তোমরা আমার নিকট থেকে লোকদের মাঝে প্রচার করো; যদিও তা একটি আয়াতই হোক। '৫৩১
এর কারণ হলো, অনেক সময় মানুষের হিদায়াত একটিমাত্র আয়াতের ওপর নির্ভর করে থাকে। যখনই সে আয়াত উক্ত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যায়, তখনই তার অন্তর হিদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
প্রকৃত মুসলমান পরোপকারী হয়। সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে। সব সময় মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ফিকির করে। এভাবেই সে আল্লাহ, রাসুল, مسلمانوں নেতৃস্থানীয় লোক এবং সাধারণ مسلمانوں প্রতি কল্যাণকামী সাব্যস্ত হয়। যেমনটি উপরোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ বোধ থেকেই সে নিজের হিদায়াতের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য লোকসহ সকল মানুষের হিদায়াতের ফিকির করে। কারণ, সে নিজের ও পরিবারের জন্য যেমন জান্নাত পছন্দ করে, তেমনই সকল মানুষের জন্যও জান্নাত পছন্দ করে। এজন্য সে সর্বদা তাদের এমন বিষয়ের প্রতি আহ্বান করতে থাকে, যা তাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। একজন দায়ির মাঝে এ বোধ ও গুণাবলি থাকে বলেই তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা মর্যাদার অধিকারী হয়। দাওয়াত দেওয়া এতই উত্তম ও উন্নত কাজ যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ দায়িদের প্রশংসা ও তাদের জন্য দুআ করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ .
‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল করুন, যে আমার কাছ থেকে কোনো কিছু শুনে তা যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়। কারণ, যাদের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়, তাদের মাঝে এমন অনেক ব্যক্তিও থাকতে পারে, যারা আমার থেকে সরাসরি শ্রবণকারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।' ৫৩২
ইসলামি সমাজটাই এমন যে, সেখানে একজনের প্রতি অন্যজনের দায়িত্ব রয়েছে। এ ছাড়াও প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে তাদের এ দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। কিন্তু এ দায়িত্ববোধ আজ مسلمانوں মাঝে নেই বিধায় তাদের সমাজে শান্তি উধাও হয়ে গেছে। আজ যদি তাদের মাঝে সামাজিক সেই দায়িত্ববোধ থাকত এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভয় থাকত, তাহলে مسلمانوں আজকের এ অধঃপতন হতো না। নিজেদের দ্বীন থেকেও তারা এত দূর সরে আসত না।
এজন্যই দাওয়াতের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যে ইলম দান করেছেন, তা অন্যের নিকট থেকে গোপন করে (অর্থাৎ অন্যদের শিক্ষা না দিয়ে) পার্থিব মর্যাদা বৃদ্ধি ও ধ্বংসশীল দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের মাধ্যম বানায়, তার জন্য কঠিন শাস্তির হুমকি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِّمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيْبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَعْنِيْ رِيْحَهَا
‘যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করেছে, যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, কিন্তু সে তা অর্জন করেছে কেবল দুনিয়াবি সম্পদ। অর্জন করার জন্য, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৫৩৩
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ أَلْجَمَهُ اللهُ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কারও কাছ থেকে ইলম জানতে চাওয়া হলো, আর সে (জানা সত্ত্বেও) তা গোপন করল, কিয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।'৫৩৪
📄 সৎ কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে
আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম দিক হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। এজন্য প্রকৃত দায়ি মুসলমান হিকমত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সৎ কাজের আদেশ দেয় আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পাপাচার বা মন্দ কাজ দূরীভূত করার চেষ্টা করে। পাপাচার ও মন্দ কাজ দূর করতে গিয়ে নতুন ফিতনা সৃষ্টি করে না। সামর্থ্য থাকলে হাত দিয়ে দূরীভূত করে। আর যদি সে পরিমাণ সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান ও কথার মাধ্যমে তা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দিয়ে অস্বীকার ও ঘৃণা করে এবং তা সমূলে মূলোৎপাটন করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এটাই রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটির মর্ম:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
'তোমাদের কেউ যদি গর্হিত কাজ দেখতে পায়, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান দ্বারা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দ্বারা যেন ঘৃণা করে। আর এটা হচ্ছে ইমানের দুর্বলতম স্তর।'৫৩৫
আসলে মুসলমান যখন সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করে। আর দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা করা। যেহেতু কল্যাণকামনার নামই দ্বীন। তাই সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধ করে কল্যাণকামনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ কল্যাণকামনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য।'৫৩৬
এ কল্যাণকামিতা এবং সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার গুণ প্রকৃত স্বাধীনচেতা মুসলমানকে জালিমের সামনে প্রকাশ্যে সত্যের বাণী উচ্চারণ করার সাহস জোগায়। মুসলিম উম্মাহ শৌর্যবীর্য নিয়ে বেঁচে থাকার কারণও এমন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব, যারা জালিমের সামনে বুক চেতিয়ে বলতে পারে, 'তুমি জালিম'। উম্মাহর মধ্যে যখন এ ধরনের বীর- সাহসীরা আর থাকবে না, তখন তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে, তাদের আর কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না।
এটাই রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসটির মর্ম: إِذَا رَأَيْتَ أُمَّتِي تَهَابُ الظَّالِمَ أَنْ تَقُولَ لَهُ: أَنْتَ ظَالِمٌ، فَقَدْ تُوُدِّعَ مِنْهُمْ
'যখন তুমি উম্মতকে দেখবে, তারা জালিমকে জালিম বলতে ভয় পাচ্ছে, তখন (জেনে নিও) তাদের (আসমানি নুসরাত ও সাহায্য করা থেকে) বিদায় জানানো হবে।' ৫৩৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনেক হাদিস مسلمانوں অন্তরে বাতিলের বিরুদ্ধে সাহসিকতার বীজ বুনে দেয়। তাদের এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয় যে, জালিম বাতিলের সামনে সাহসিকতা দেখালে কারও রিজিক কমে যায় না এবং কারও মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় না।
একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ، أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ
'মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য বলা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, তা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিক থেকেও দূরে রাখে না।'৫৩৮
অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
قَامَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرُ؟ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ النَّاسِ أَقْرَؤُهُمْ وَأَتْقَاهُمْ وَآمَرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ، وَأَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَأَوْصَلُهُمْ لِلرَّحِيمِ
'নবিজি মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন, ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ কারি, শ্রেষ্ঠ মুত্তাকি, সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী।'৫৩৯
প্রকৃত মুসলমানদের অন্তরে ইসলামি সমাজে সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ও মজলুমের পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্ত মনোবল থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَامِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا عِنْدَ مَوْطِنٍ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ
'যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে না, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন না, যেখানে সে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে।' ৫৪০
এজন্য বিচার করার অধিকারপ্রাপ্ত প্রকৃত মুসলমান বাতিলের মোকাবেলায় চুপ থাকে না। সত্যকে সাহায্য না করে বসে থাকে না। সমাজে জুলুমের প্রসার সে একদম সহ্য করতে পারে না। সমাজ থেকে অশ্লীলতা ও পাপাচার দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ, সমাজ থেকে পাপাচার ও অশ্লীলতা দূরীকরণের চেষ্টা করা না হলে পুরা সমাজের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
কাইস বিন আবু হাজিম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قَامَ أَبُو بَكْرٍ فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ} [المائدة: ١٠٥]، وَإِنَّا سَمِعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْمُنْكَرَ لَا يُغَيِّرُونَهُ، أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِهِ
'আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা করে বললেন, হে লোকসকল, তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাকো : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।” [সুরা আল-মায়িদা : ১০৫] কিন্তু আমরা রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, মানুষ অশ্লীল কাজ দেখার পর তা প্রতিরোধ না করলে অচিরেই তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। '৫৪১
প্রকৃত মুসলমান-যার ইসলাম সত্য ও ইমান জীবন্ত-দ্বীনি কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে না। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া থেকে উদাসীন থাকে না। মন্দ কাজ ও পাপাচারে স্বস্তিবোধ করে না। সমাজে তা টিকে থাকতে দেয় না। যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেয়। কারণ, দ্বীনের সকল বিষয় দৃঢ় সংকল্প ও চাহিদা অনুযায়ী হতে হয়; হাসি ও ঠাট্টার ছলে নয়। রাসুলুল্লাহ আমাদের ইহুদিদের মতো দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন হওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। যেন এ কারণে তাদের ওপর যে আজাব এসেছিল, তা আমাদের ওপর না আসে।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আবু মুসা ৫৪২ রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا إِذَا عَمِلَ الْعَامِلُ مِنْهُمْ بِالْخَطِيئَةِ نَهَاهُ النَّاهِي تعذيرًا، حَتَّى إِذَا كَانَ الْغَدُ جَالَسَهُ وَوَاكَلَهُ وَشَارَبَهُ، كَأَنَّهُ لَمْ يَرَهُ عَلَى خَطِيئَةٍ بِالْأَمْسِ، فَلَمَّا رَأَى اللَّهُ ذَلِكَ مِنْهُمْ ضَرَبَ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِمْ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ، وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا، أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ
'তোমাদের পূর্ববর্তী বনি ইসরাইলের মধ্যে যখন কেউ পাপকর্ম করত, তখন কোনো নিষেধকারী তিরস্কার করে তা থেকে বাধা দিত। কিন্তু পরেরদিন সেই নিষেধকারীই তাদের সাথে ওঠাবসা করতে শুরু করত এবং তাদের সাথে পানাহার করত, যেন আগের দিন তাদের কোনো পাপকর্ম সে দেখেইনি! তাদের এ অবস্থা দেখে আল্লাহ তাআলা তাদের এক দলের অন্তরকে অন্য দলের অন্তরের ওপর চাপিয়ে দিলেন। অতঃপর তাদের নবি দাউদ ও ঈসা -এর জবানে তাদের অভিসম্পাত করলেন। এটা একমাত্র তাদের পাপের কারণেই হয়েছে। আর তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী জাতি। সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অপরাধীকে শক্তভাবে প্রতিহত করবে। সত্য পথে দৃঢ়পদ ও অবিচল থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মাঝে অমিল ও অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন এবং তাদের ওপর যেভাবে অভিসম্পাত করেছিলেন, তেমনই তোমাদের ওপরও করবেন।'৫৪৩
আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম দিক হলো সৎ কাজের আদেশ দেওয়া আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। এজন্য প্রকৃত দায়ি মুসলমান হিকমত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সৎ কাজের আদেশ দেয় আর মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী পাপাচার বা মন্দ কাজ দূরীভূত করার চেষ্টা করে। পাপাচার ও মন্দ কাজ দূর করতে গিয়ে নতুন ফিতনা সৃষ্টি করে না। সামর্থ্য থাকলে হাত দিয়ে দূরীভূত করে। আর যদি সে পরিমাণ সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান ও কথার মাধ্যমে তা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দিয়ে অস্বীকার ও ঘৃণা করে এবং তা সমূলে মূলোৎপাটন করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এটাই রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটির মর্ম:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
'তোমাদের কেউ যদি গর্হিত কাজ দেখতে পায়, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে জবান দ্বারা প্রতিহত করে। তারও সামর্থ্য না থাকলে অন্তর দ্বারা যেন ঘৃণা করে। আর এটা হচ্ছে ইমানের দুর্বলতম স্তর।'৫৩৫
আসলে মুসলমান যখন সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করে। আর দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা করা। যেহেতু কল্যাণকামনার নামই দ্বীন। তাই সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধ করে কল্যাণকামনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ কল্যাণকামনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ বলেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য।'৫৩৬
এ কল্যাণকামিতা এবং সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার গুণ প্রকৃত স্বাধীনচেতা মুসলমানকে জালিমের সামনে প্রকাশ্যে সত্যের বাণী উচ্চারণ করার সাহস জোগায়। মুসলিম উম্মাহ শৌর্যবীর্য নিয়ে বেঁচে থাকার কারণও এমন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বদের অস্তিত্ব, যারা জালিমের সামনে বুক চেতিয়ে বলতে পারে, 'তুমি জালিম'। উম্মাহর মধ্যে যখন এ ধরনের বীর- সাহসীরা আর থাকবে না, তখন তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে, তাদের আর কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না।
এটাই রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসটির মর্ম: إِذَا رَأَيْتَ أُمَّتِي تَهَابُ الظَّالِمَ أَنْ تَقُولَ لَهُ: أَنْتَ ظَالِمٌ، فَقَدْ تُوُدِّعَ مِنْهُمْ
'যখন তুমি উম্মতকে দেখবে, তারা জালিমকে জালিম বলতে ভয় পাচ্ছে, তখন (জেনে নিও) তাদের (আসমানি নুসরাত ও সাহায্য করা থেকে) বিদায় জানানো হবে।' ৫৩৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনেক হাদিস مسلمانوں অন্তরে বাতিলের বিরুদ্ধে সাহসিকতার বীজ বুনে দেয়। তাদের এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয় যে, জালিম বাতিলের সামনে সাহসিকতা দেখালে কারও রিজিক কমে যায় না এবং কারও মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় না।
একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ، أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ
'মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে সত্য বলা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, তা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিক থেকেও দূরে রাখে না।'৫৩৮
অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
قَامَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ النَّاسِ خَيْرُ؟ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ النَّاسِ أَقْرَؤُهُمْ وَأَتْقَاهُمْ وَآمَرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ، وَأَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَأَوْصَلُهُمْ لِلرَّحِيمِ
'নবিজি মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন, ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ কারি, শ্রেষ্ঠ মুত্তাকি, সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী এবং সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী।'৫৩৯
প্রকৃত مسلمانوں অন্তরে ইসলামি সমাজে সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলের বিরুদ্ধে ও মজলুমের পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্ত মনোবল থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَامِنْ امْرِئٍ يَخْذُلُ امْرَأَ مُسْلِمًا عِنْدَ مَوْطِنٍ تُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنْ امْرِئٍ يَنْصُرُ امْرَأَ مُسْلِمًا فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَيُنْتَهَكُ فِيهِ مِنْ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ
'যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে না, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন না, যেখানে সে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন জায়গায় সাহায্য করে, যেখানে তার ইজ্জত-আবরু ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা এমন জায়গায় সাহায্য করবেন, যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে।' ৫৪০
এজন্য বিচার করার অধিকারপ্রাপ্ত প্রকৃত মুসলমান বাতিলের মোকাবেলায় চুপ থাকে না। সত্যকে সাহায্য না করে বসে থাকে না। সমাজে জুলুমের প্রসার সে একদম সহ্য করতে পারে না। সমাজ থেকে অশ্লীলতা ও পাপাচার দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ, সমাজ থেকে পাপাচার ও অশ্লীলতা দূরীকরণের চেষ্টা করা না হলে পুরা সমাজের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
কাইস বিন আবু হাজিম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قَامَ أَبُو بَكْرٍ فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ} [المائدة: ١٠٥]، وَإِنَّا سَمِعْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْمُنْكَرَ لَا يُغَيِّرُونَهُ، أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِهِ
'আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা করে বললেন, হে লোকসকল, তোমরা এ আয়াতটি পড়ে থাকো : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।” [সুরা আল-মায়িদা : ১০৫] কিন্তু আমরা রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, মানুষ অশ্লীল কাজ দেখার পর তা প্রতিরোধ না করলে অচিরেই তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। '৫৪১
প্রকৃত মুসলমান-যার ইসলাম সত্য ও ইমান জীবন্ত-দ্বীনি কোনো বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে না। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া থেকে উদাসীন থাকে না। মন্দ কাজ ও পাপাচারে স্বস্তিবোধ করে না। সমাজে তা টিকে থাকতে দেয় না। যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেয়। কারণ, দ্বীনের সকল বিষয় দৃঢ় সংকল্প ও চাহিদা অনুযায়ী হতে হয়; হাসি ও ঠাট্টার ছলে নয়। রাসুলুল্লাহ আমাদের ইহুদিদের মতো দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন হওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। যেন এ কারণে তাদের ওপর যে আজাব এসেছিল, তা আমাদের ওপর না আসে।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আবু মুসা ৫৪২ রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا إِذَا عَمِلَ الْعَامِلُ مِنْهُمْ بِالْخَطِيئَةِ نَهَاهُ النَّاهِي تعذيرًا، حَتَّى إِذَا كَانَ الْغَدُ جَالَسَهُ وَوَاكَلَهُ وَشَارَبَهُ، كَأَنَّهُ لَمْ يَرَهُ عَلَى خَطِيئَةٍ بِالْأَمْسِ، فَلَمَّا رَأَى اللَّهُ ذَلِكَ مِنْهُمْ ضَرَبَ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِمْ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ، وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ، وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا، أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ، ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ
'তোমাদের পূর্ববর্তী বনি ইসরাইলের মধ্যে যখন কেউ পাপকর্ম করত, তখন কোনো নিষেধকারী তিরস্কার করে তা থেকে বাধা দিত। কিন্তু পরেরদিন সেই নিষেধকারীই তাদের সাথে ওঠাবসা করতে শুরু করত এবং তাদের সাথে পানাহার করত, যেন আগের দিন তাদের কোনো পাপকর্ম সে দেখেইনি! তাদের এ অবস্থা দেখে আল্লাহ তাআলা তাদের এক দলের অন্তরকে অন্য দলের অন্তরের ওপর চাপিয়ে দিলেন। অতঃপর তাদের নবি দাউদ ও ঈসা -এর জবানে তাদের অভিসম্পাত করলেন। এটা একমাত্র তাদের পাপের কারণেই হয়েছে। আর তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী জাতি। সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অপরাধীকে শক্তভাবে প্রতিহত করবে। সত্য পথে দৃঢ়পদ ও অবিচল থাকবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মাঝে অমিল ও অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন এবং তাদের ওপর যেভাবে অভিসম্পাত করেছিলেন, তেমনই তোমাদের ওপরও করবেন।'৫৪৩
টিকাঃ
৫৪২. এখানে বর্ণনকারী হিসাবে আবু মুসা রা.-এর নাম বলা হয়েছে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। এ হাদিসের বর্ণনকারী হলেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা., যা তাবারানির বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এসেছে। (অনুবাদক)