📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 বড় ও মর্যাদাবান লোকদের সম্মান করে

📄 বড় ও মর্যাদাবান লোকদের সম্মান করে


ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ مَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।

ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ mَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ভালো মানুষদের সান্নিধ্যে থাকে

📄 ভালো মানুষদের সান্নিধ্যে থাকে


প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম সৎগুণ হলো, নেককারদের সাথে সম্পর্ক রাখা; তাদের নৈকট্য অর্জন করা এবং তাদের থেকে দুআ চাওয়া। উচ্চ পদমর্যাদা, উন্নত সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ মহৎ গুণের পথে তার প্রতিবন্ধক হয় না কখনো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
'আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।'৫০১
নেককার লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখাটা এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এতে মানুষের মাঝে কল্যাণ, তাকওয়া ও কথায়-কাজে যথার্থতা সৃষ্টি হয়। দ্বীনি বোধশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। সত্যের প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। এভাবে একসময় তারাও নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কবি বলেন :
بِعِشْرَتِكَ الْكِرَامَ تَعُدَّ مِنْهُمْ * فَلَا تُرَيِنَّ لِغَيْرِهِمْ أَلُوفًا 'ভালো মানুষের সংশ্রবে থাকলে তুমি ভালো মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই ভালো মানুষ ছাড়া অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা অবলম্বন কোরো না।'
আল্লাহর নবি মুসা আল্লাহর নেককার বান্দার সংশ্রবে থেকে ইলম অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে গিয়ে তিনি বিনয় ও আদব সহকারে বলেছেন : هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا 'আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, সত্যপথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন?'৫০২
উত্তরে নেককার সে বান্দা বললেন : إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِيَ صَبْرًا
'আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। '৫০৩
এর উত্তরে মুসা আরও বিনয়াবনত হয়ে বললেন: سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا 'আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না। '৫০৪
প্রকৃত মুসলমান ভালো মানুষ ব্যতীত অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা করে না। কারণ তার শরীয়ত তাকে বলে, মানুষ হলো খনির মতো, যার কিছু থেকে মূল্যবান পদার্থ বের হয়, আর কিছু থেকে বের হয় নিম্নমানের পদার্থ। তা ছাড়া ভালো মানুষ তো কেবল ভালো মানুষের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ، خِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا، وَالْأَرْوَاحُ جُنُودُ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا اخْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
'মানুষ সোনা ও রুপার খনির মতো। তাদের মধ্যে জাহিলি যুগে যারা উত্তম, ইসলামের যুগেও তারাই উত্তম প্রমাণিত হতে পারে—যদি তারা তা (ইসলাম) সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারে। আত্মারা রুহের জগতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। যারা সেখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরিচিত ছিল, দুনিয়াতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং যারা সেখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন ছিল, এখানে তারা সম্পর্কহীন থাকে। '৫০৫
প্রকৃত মুসলমান এটাই জানে যে, সঙ্গী দুধরনের রয়েছে। ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গী। ভালো সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। তার পাশে থাকলে সুঘ্রাণ ও আনন্দ পাওয়া যায়। মন্দ সঙ্গী হাপরে ফুঁকদানকারী কামারের মতো। তার পাশে থাকলে পাওয়া যায় আগুনের তেজ, ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও কষ্ট।
হাদিসে ভালো ও মন্দ সঙ্গীর এমন যথার্থ উদাহরণই দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةٌ
'ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তা-ও না হলে অন্তত সুগন্ধি নিজেই তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে অথবা তোমাকে দুর্গন্ধ দেবে।'৫০৬
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতেন এমন নেককার লোকদের সাক্ষাৎলাভ ও সুহবতের, যারা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন; যাদের অন্তর হতো কোমল ও নরম; আর যাদের চোখ থেকে প্রবাহিত হতো আল্লাহভীতির অশ্রুধারা।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আনাস বর্ণনা করেছেন:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، بَعْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُمَرَ : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى أُمَّ أَيْمَنَ نَزُورُهَا، كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزُورُهَا ، فَلَمَّا انْتَهَيْنَا إِلَيْهَا بَكَتْ، فَقَالَا لَهَا: مَا يُبْكِيكِ؟ مَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَتْ: مَا أَبْكِي أَنْ لَا أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَكِنْ أَبْكِي أَنَّ الْوَحْيَ قَدِ انْقَطَعَ مِنَ السَّمَاءِ، فَهَيَّجَتْهُمَا عَلَى الْبُكَاءِ. فَجَعَلَا يَبْكِيَانِ مَعَهَا
‘রাসুলুল্লাহ-এর মৃত্যুর পর আবু বকর উমর-কে বললেন, রাসুলুল্লাহ যেভাবে উম্মে আইমান-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন, চলুন আমরাও অদ্রূপ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে আসি। (বর্ণনাকারী বলেন,) আমরা যখন তাঁর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। আবু বকর ও উমর তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর কাছে তো তাঁর রাসুল-এর জন্য কল্যাণকর জিনিসই রয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ-এর জন্য কল্যাণ রয়েছে, তা না জানা থাকার কারণে কাঁদছি না। বরং আমি এজন্যই কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। (বর্ণনাকারী বলেন,) তাঁর এ কথায় তাঁদের দুজনের (আবু বকর ও উমর) কান্না এসে গেল এবং তাঁরাও তাঁর সাথে কাঁদতে লাগলেন। '৫০৭
তা ছাড়া নেককারদের সাথে সুহবতের মজলিসকে ফেরেশতারা বেষ্টন করে রাখেন। আল্লাহ তাআলা সে মজলিসকে তাঁর রহমতের ছায়ায় ঢেকে নেন। তারপর এতে মানুষের ইমান মজবুত হয়। আত্মা পরিচ্ছন্ন হয়। কলব পরিশুদ্ধ হয়। মোটকথা, নেককার লোকদের সুহবতে থাকলে কল্যাণই কল্যাণ। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য—সবার জন্যই কল্যাণ। ইসলাম মানুষদের ব্যক্তিগতভাবে ও সামগ্রিকভাবে এ কল্যাণের দিকেই আহ্বান করে।

প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম সৎগুণ হলো, নেককারদের সাথে সম্পর্ক রাখা; তাদের নৈকট্য অর্জন করা এবং তাদের থেকে দুআ চাওয়া। উচ্চ পদমর্যাদা, উন্নত সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ মহৎ গুণের পথে তার প্রতিবন্ধক হয় না কখনো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرْطًا
'আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।'৫০১
নেককার লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখাটা এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এতে মানুষের মাঝে কল্যাণ, তাকওয়া ও কথায়-কাজে যথার্থতা সৃষ্টি হয়। দ্বীনি বোধশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। সত্যের প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। এভাবে একসময় তারাও নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কবি বলেন :
بِعِشْرَتِكَ الْكِرَامَ تَعُدَّ مِنْهُمْ * فَلَا تُرَيِنَّ لِغَيْرِهِمْ أَلُوفًا 'ভালো মানুষের সংশ্রবে থাকলে তুমি ভালো মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই ভালো মানুষ ছাড়া অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা অবলম্বন কোরো না।'
আল্লাহর নবি মুসা আল্লাহর নেককার বান্দার সংশ্রবে থেকে ইলম অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে গিয়ে তিনি বিনয় ও আদব সহকারে বলেছেন : هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا 'আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, সত্যপথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন?'৫০২
উত্তরে নেককার সে বান্দা বললেন : إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِيَ صَبْرًا
'আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। '৫০৩
এর উত্তরে মুসা আরও বিনয়াবনত হয়ে বললেন: سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا 'আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না। '৫০৪
প্রকৃত মুসলমান ভালো মানুষ ব্যতীত অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা করে না। কারণ তার শরীয়ত তাকে বলে, মানুষ হলো খনির মতো, যার কিছু থেকে মূল্যবান পদার্থ বের হয়, আর কিছু থেকে বের হয় নিম্নমানের পদার্থ। তা ছাড়া ভালো মানুষ তো কেবল ভালো মানুষের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ، خِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا، وَالْأَرْوَاحُ جُنُودُ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا اخْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
'মানুষ সোনা ও রুপার খনির মতো। তাদের মধ্যে জাহিলি যুগে যারা উত্তম, ইসলামের যুগেও তারাই উত্তম প্রমাণিত হতে পারে—যদি তারা তা (ইসলাম) সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারে। আত্মারা রুহের জগতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। যারা সেখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরিচিত ছিল, দুনিয়াতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং যারা সেখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন ছিল, এখানে তারা সম্পর্কহীন থাকে। '৫০৫
প্রকৃত মুসলমান এটাই জানে যে, সঙ্গী দুধরনের রয়েছে। ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গী। ভালো সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। তার পাশে থাকলে সুঘ্রাণ ও আনন্দ পাওয়া যায়। মন্দ সঙ্গী হাপরে ফুঁকদানকারী কামারের মতো। তার পাশে থাকলে পাওয়া যায় আগুনের তেজ, ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও কষ্ট।
হাদিসে ভালো ও মন্দ সঙ্গীর এমন যথার্থ উদাহরণই দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةٌ
'ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তা-ও না হলে অন্তত সুগন্ধি নিজেই তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে অথবা তোমাকে দুর্গন্ধ দেবে।'৫০৬
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতেন এমন নেককার লোকদের সাক্ষাৎলাভ ও সুহবতের, যারা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন; যাদের অন্তর হতো কোমল ও নরম; আর যাদের চোখ থেকে প্রবাহিত হতো আল্লাহভীতির অশ্রুধারা।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আনাস বর্ণনা করেছেন:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، بَعْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُمَرَ : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى أُمَّ أَيْمَنَ نَزُورُهَا، كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزُورُهَا ، فَلَمَّا انْتَهَيْنَا إِلَيْهَا بَكَتْ، فَقَالَا لَهَا: مَا يُبْكِيكِ؟ مَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَتْ: مَا أَبْكِي أَنْ لَا أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَكِنْ أَبْكِي أَنَّ الْوَحْيَ قَدِ انْقَطَعَ مِنَ السَّمَاءِ، فَهَيَّجَتْهُمَا عَلَى الْبُكَاءِ. فَجَعَلَا يَبْكِيَانِ مَعَهَا
‘রাসুলুল্লাহ-এর মৃত্যুর পর আবু বকর উমর-কে বললেন, রাসুলুল্লাহ যেভাবে উম্মে আইমান-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন, চলুন আমরাও অদ্রূপ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে আসি। (বর্ণনাকারী বলেন,) আমরা যখন তাঁর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। আবু বকর ও উমর তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর কাছে তো তাঁর রাসুল-এর জন্য কল্যাণকর জিনিসই রয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ-এর জন্য কল্যাণ রয়েছে, তা না জানা থাকার কারণে কাঁদছি না। বরং আমি এজন্যই কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। (বর্ণনাকারী বলেন,) তাঁর এ কথায় তাঁদের দুজনের (আবু বকর ও উমর) কান্না এসে গেল এবং তাঁরাও তাঁর সাথে কাঁদতে লাগলেন। '৫০৭
তা ছাড়া নেককারদের সাথে সুহবতের মজলিসকে ফেরেশতারা বেষ্টন করে রাখেন। আল্লাহ তাআলা সে মজলিসকে তাঁর রহমতের ছায়ায় ঢেকে নেন। তারপর এতে মানুষের ইমান মজবুত হয়। আত্মা পরিচ্ছন্ন হয়। কলব পরিশুদ্ধ হয়। মোটকথা, নেককার লোকদের সুহবতে থাকলে কল্যাণই কল্যাণ। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য—সবার জন্যই কল্যাণ। ইসলাম মানুষদের ব্যক্তিগতভাবে ও সামগ্রিকভাবে এ কল্যাণের দিকেই আহ্বান করে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মানুষের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট লাঘব করতে সচেষ্ট থাকে

📄 মানুষের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট লাঘব করতে সচেষ্ট থাকে


প্রকৃত মুসলমান-যে ইসলামি শরিয়ার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী লালিত হয়েছে এবং ইসলামের পবিত্র সরোবরে সিক্ত হয়েছে-সমাজে লোকদের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে সদা সচেষ্ট থাকে। কারণ, সত্য ও কল্যাণের যে নীতিমালার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত, সে নীতিমালাই তাকে এ মহৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ভালো কাজ করার জন্য সে সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না। যখন তখন, যেখানে সেখানে সে ভালো কাজ করে চলে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, ভালো কাজ সফলতা বয়ে আনে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'আর সৎকাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'৫০৮
প্রকৃত মুসলমান ভালো কাজের দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়। কারণ, সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ভালো কাজে তার প্রতি কদমে কদমে সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، قَالَ: تَعْدِلُ بَيْنَ الاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، قَالَ: وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَمْشِيهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের প্রতিটি গ্রন্থির ওপর প্রতিদিনের জন্য সদকা ধার্য রয়েছে। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করে দেওয়া একটি সদকা। কোনো ব্যক্তিকে বাহনের ওপর আরোহণে সাহায্য করা অথবা তার মালামাল বাহনের ওপর তুলে দেওয়া একটি সদকা। তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার ভালো কথাই এক একটি সদকা। নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে যতটি পদক্ষেপ ফেলা হয় তার প্রতিটিই এক একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সদকা।'৫০৯
মুসলমানের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ আর নামাজের জন্য মসজিদে গমন করার মধ্যে কী অদ্ভুত মিল। এজন্যই রাসুলুল্লাহ বলেছেন, দ্বীন মানবজাতির দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়ের কল্যাণ ও যথার্থতার জন্য প্রবর্তিত হয়েছে। দ্বীন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত; একাকী জীবন ও সামষ্টিক জীবন—সকল ক্ষেত্রেই কার্যকর। তাই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের ওপর চলে এমন প্রকৃত মুসলমানের সকল কাজই ইবাদতে পরিণত হয়, যখন সে তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে।
ফলে প্রকৃত মুসলমানের সামনে কল্যাণের অনেক দরজা উন্মুক্ত থাকে, যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে সে। তার ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া বিস্তৃত থাকে। অর্জন করতে পারে অনেক অনেক সাওয়াব।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। '৫১০
আবু হুরাইরা রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: الكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ 'ভালো কথা সদকা। '৫১১
শুধু তাই নয়, যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দিয়েছে এবং নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিয়েছে, সে ভালো কাজ করতে পারলে তো সাওয়াব পায়-ই, করতে না পারলেও সাওয়াব পায়। তবে শর্ত হলো, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে আবু মুসা সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ يَعْتَمِلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ قَالَ قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ قَالَ قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ أَوِ الْخَيْرِ قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যদি কেউ সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তখন কী করবে? বললেন, সে হাত দ্বারা কাজ করবে। এতে তার উপকারও হবে এবং সদকা করারও সামর্থ্য আসবে। তারা বললেন, যদি তারও সামর্থ্য না রাখে; অথবা বললেন, যদি তা-ও করতে না পারে, তখন কী করবে? বললেন, সে অভাবী দুঃখী মানুষকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও না করে, তখন কী করবে? বললেন, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তখন কী করবে? তিনি বললেন, সে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কারণ এটাও তার জন্য সদকা হবে।'৫১২
রাসুলুল্লাহ প্রথমে 'সকল মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব' বলে কথা শুরু করলেন। তারপর একের পর এক ভালো ও নেক আমলের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বান্দা সে সদকার ক্ষতিপূরণ করতে পারবে। সুতরাং মুসলমানের ওপর সদকা করা ওয়াজিব মানে তার ওপর সমাজে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করা ওয়াজিব। যদি তা করতে সক্ষম না হয়, কিংবা কোনো কারণে না করে, তাহলে সে অন্তত তার জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এটাও তার সদকার ক্ষতিপূরণ করবে। এজন্যই বলা হয়, প্রকৃত মুসলমানের কর্মতৎপরতা (অর্থাৎ ভালো কাজ করা) এবং অবসর (অর্থাৎ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা) - উভয়টিই সমাজের জন্য কল্যাণকর।
এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন :
المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
'প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত (-এর অনিষ্ট) থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। '৫১৩
এতটুকুই নয় শুধু, রাসুলুল্লাহ তো সেই ব্যক্তিকেই সমাজের সর্বোত্তম মুসলমান বলেছেন, যার থেকে কল্যাণের আশা করা যায় এবং যার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
হাদিসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ عَلَى نَاسٍ جُلُوسٍ، فَقَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِكُمْ مِنْ شَرِّكُمْ؟» فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ ، وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ، وَشَرُّكُمْ مَنْ لَا يُرْجَى خَيْرُهُ، وَلَا يُؤْمَنُ شَرُّهُ
'বসে থাকা একদল লোকের সামনে দাঁড়িয়ে নবিজি বললেন, আমি কি তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি কে, তা জানিয়ে দেবো? লোকজন চুপ করে রইল। নবিজি প্রশ্নটি একে একে তিনবার করলেন। তারপর তাদের একজন বলল, অবশ্যই জানাবেন হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সে ব্যক্তি, যার কল্যাণের আশা করা যায় এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হলো, যার কল্যাণের আশা করা যায় না এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। '৫১৪
মুসলমান সমাজের কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু করে না। তা করতে না পারলে অন্তত খারাপ কাজ ও কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর প্রকৃত মুসলমান সব সময় ভালো ও কল্যাণকর কাজ করে। খারাপ কোনো কাজ তার থেকে প্রকাশ পায় না। কারণ, সে সব সময় রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসের ওপর আমল করে:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৫১৫
যে মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে অর্থাৎ নিজের উপকার লাভের জন্য ও নিজের কষ্ট দূর করার জন্য যেমন চেষ্টা করে, তেমনই অন্য ভাইয়ের উপকারের জন্য এবং তাদের কষ্ট দূর করার জন্য ও চেষ্টা করে, সে ইসলামি সমাজে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত হয়। মুসলমান ভাইদের প্রতি তার এ খিদমতের কারণে স্বয়ং আল্লাহকেই সে তার সাহায্যকারী হিসাবে পেয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ اللَّهُ فِي حَاجَةِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ
'আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার প্রয়োজনে পাশে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকে। '৫১৬
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন :
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ، مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً، فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। একজন আরেকজনের প্রতি জুলুম করতে পারে না এবং শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে না। যে ব্যক্তি তার (মুসলমান) ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকবে, তার প্রয়োজনে আল্লাহ তার পাশে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের কষ্টসমূহ থেকে তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। '৫১৭
অন্য হাদিসে বলেন:
مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفْسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য সহজ করবেন। '৫১৮
রাসুলুল্লাহ সমাজে পারস্পরিক সাহায্য করার ফজিলতকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এটাকে তিনি দীর্ঘ ইতিকাফের চেয়েও উত্তম বলেছেন। যেমন ইবনে আব্বাস রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ مَشَى فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ خَيْرًا لَهُ مِنَ اعْتِكَافِ عَشْرِ سِنِينَ، وَمَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلَاثَ خَنَادِقَ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخَافِقَيْنِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য হাঁটবে, এ হাঁটা তার জন্য বিশ বছর ইতিকাফে অবস্থান করার চেয়েও উত্তম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন পরিখার আড়াল করে দেন। প্রত্যেক পরিখার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দূরত্বের সমান। '৫১৯
শক্তি ও সামর্থ্য থাকার পরেও মানুষের সেবা করতে বিরক্তিবোধ করলে নিয়ামত চলে যাওয়ার হুমকি এসেছে। যেমন ইবনে আব্বাস -এর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
‘যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা কোনো নিয়ামত দান করলেন, অতঃপর তা পূর্ণ করলেন, তারপর তার সামনে মানুষের প্রয়োজন পেশ করা হলে সে তাতে বিরক্তিবোধ করল, সে যেন তার সেই নিয়ামত চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দিল। '৫২০
সহিহ হাদিসে জান্নাতবাসীদের সুখের যেসব চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো, এক ব্যক্তি জান্নাতের নিয়ামত ও সুখের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। কারণ, সে মুসলমানদের রাস্তা থেকে একটি গাছ কেটে ফেলেছিল, যে গাছ থাকার কারণে মুসলমানদের পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিল। হাদিসটি হলো :
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلًا يَتَقَلَّبُ فِي الْجَنَّةِ، فِي شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَّرِيقِ، كَانَتْ تُؤْذِي النَّاسُ
'আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে জান্নাতে (নিয়ামতসমূহের ওপর) গড়াগড়ি খাচ্ছে। এটা (নিয়ামতপ্রাপ্তি) রাস্তার ওপর থেকে এমন একটি গাছ কাটার প্রতিদানস্বরূপ, যেটার কারণে মুসলমানদের কষ্ট হতো। ৫২১
কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের উপকার করার একটি পদ্ধতি হলো, তাদের থেকে কষ্ট দূর করে দেওয়া। যে ব্যক্তি মুসলমানদের থেকে কষ্ট দূর করে এবং যে তাদের উপকার করে—উভয়জনই সমান। উভয়জনই মুসলমানদের উপকার করে। সাওয়াব, রহমত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে উভয়জন বরাবর। এজন্য রাসুলুল্লাহ -এর নির্দেশনার মধ্যে উভয় বিষয় উঠে এসেছে। সমাজের উন্নতি ও সদস্যদের পারস্পরিক হৃদ্যতা উভয় বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে।
মুসলমানদের কষ্ট দূর করা সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, আবু বারজা বর্ণনা করেন:
قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ عَلَّمْنِي شَيْئًا أَنْتَفِعُ بِهِ، قَالَ: اعْزِلِ الْأَذَى، عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
'আমি বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা থেকে আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, مسلمانوں রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।' ৫২২
আরেক রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে:
يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ؟ قَالَ: أَمِطِ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন আমল বাতলে দেন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরাও।'
যে সমাজ ইসলামের দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যে সমাজের প্রতিজন সদস্য বিশ্বাস করে যে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেললে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় এবং জান্নাত অর্জিত হয়, সে সমাজের চেয়ে উন্নত আর কোনো সমাজ কি থাকতে পারে? নিঃসন্দেহে ইসলামি সমাজই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ। কারণ, এ সমাজের সদস্যরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা, খাবারের পচা উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি ফেলার কথা কল্পনাই করতে পারে না, যে বিষয়গুলোর কারণে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ লোকদের শাস্তি দিয়ে থাকে এবং রাস্তা থেকে এসব নোংরা-আবর্জনা সরানোর জন্য বিরাট অঙ্কের ব্যয় বহন করে।
আল্লাহর দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত সমাজ আর অন্যান্য সমাজের মাঝে কত বড় পার্থক্য! ইসলামি সমাজে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং সাওয়াবের আশায় রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলে। আর অন্যান্য সমাজে লোকজন নিজেরাই বাড়ির জানালা ও ছাদ থেকে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তায় নিক্ষেপ করে।
পাশ্চাত্য সমাজ এসব বিষয়ের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে এবং জনগণের মনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করার ও তা বাস্তবায়ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইসলামি সমাজে মানুষের মনে আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং যেরূপ আন্তরিকতার সহিত তারা তা বাস্তবায়ন করে, পাশ্চাত্য সমাজে তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না। কারণ, ইসলামি সমাজের সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, এ আইন লঙ্ঘন করা মানে আল্লাহর নাফরমানি করা। এ আইন লঙ্ঘন করলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ আর সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। তবে যে পরিুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে, সে ব্যতিক্রম। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সমাজের সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করাকে এত বড় গুনাহ বা অপরাধ মনে করে না। আইন অমান্য করতে গেলে তাদের বিবেক কখনো তিরস্কার করে, কখনো করে না। শেষমেষ অবশ্য আইন অমান্য করেই ফেলে। বিশেষ করে কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

প্রকৃত মুসলমান-যে ইসলামি শরিয়ার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী লালিত হয়েছে এবং ইসলামের পবিত্র সরোবরে সিক্ত হয়েছে-সমাজে লোকদের উপকার করতে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে সদা সচেষ্ট থাকে। কারণ, সত্য ও কল্যাণের যে নীতিমালার ওপর সে প্রতিষ্ঠিত, সে নীতিমালাই তাকে এ মহৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ভালো কাজ করার জন্য সে সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না। যখন তখন, যেখানে সেখানে সে ভালো কাজ করে চলে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, ভালো কাজ সফলতা বয়ে আনে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'আর সৎকাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।'৫০৮
প্রকৃত মুসলমান ভালো কাজের দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়। কারণ, সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ভালো কাজে তার প্রতি কদমে কদমে সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، قَالَ: تَعْدِلُ بَيْنَ الاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، قَالَ: وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَمْشِيهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরের প্রতিটি গ্রন্থির ওপর প্রতিদিনের জন্য সদকা ধার্য রয়েছে। দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফ করে দেওয়া একটি সদকা। কোনো ব্যক্তিকে বাহনের ওপর আরোহণে সাহায্য করা অথবা তার মালামাল বাহনের ওপর তুলে দেওয়া একটি সদকা। তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার ভালো কথাই এক একটি সদকা। নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে যতটি পদক্ষেপ ফেলা হয় তার প্রতিটিই এক একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সদকা।'৫০৯
মুসলমানের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ আর নামাজের জন্য মসজিদে গমন করার মধ্যে কী অদ্ভুত মিল। এজন্যই রাসুলুল্লাহ বলেছেন, দ্বীন মানবজাতির দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয়ের কল্যাণ ও যথার্থতার জন্য প্রবর্তিত হয়েছে। দ্বীন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত; একাকী জীবন ও সামষ্টিক জীবন—সকল ক্ষেত্রেই কার্যকর। তাই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের ওপর চলে এমন প্রকৃত মুসলমানের সকল কাজই ইবাদতে পরিণত হয়, যখন সে তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে।
ফলে প্রকৃত মুসলমানের সামনে কল্যাণের অনেক দরজা উন্মুক্ত থাকে, যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারে সে। তার ওপর আল্লাহর রহমতের ছায়া বিস্তৃত থাকে। অর্জন করতে পারে অনেক অনেক সাওয়াব।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ 'প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। '৫১০
আবু হুরাইরা রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: الكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ 'ভালো কথা সদকা। '৫১১
শুধু তাই নয়, যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দিয়েছে এবং নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিয়েছে, সে ভালো কাজ করতে পারলে তো সাওয়াব পায়-ই, করতে না পারলেও সাওয়াব পায়। তবে শর্ত হলো, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ সম্পর্কে আবু মুসা সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ قِيلَ : أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ يَعْتَمِلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ قَالَ قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ قَالَ قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ أَوِ الْخَيْرِ قَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ
'প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যদি কেউ সদকা করার সামর্থ্য না রাখে, তখন কী করবে? বললেন, সে হাত দ্বারা কাজ করবে। এতে তার উপকারও হবে এবং সদকা করারও সামর্থ্য আসবে। তারা বললেন, যদি তারও সামর্থ্য না রাখে; অথবা বললেন, যদি তা-ও করতে না পারে, তখন কী করবে? বললেন, সে অভাবী দুঃখী মানুষকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও না করে, তখন কী করবে? বললেন, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তারা বললেন, যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তখন কী করবে? তিনি বললেন, সে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কারণ এটাও তার জন্য সদকা হবে।'৫১২
রাসুলুল্লাহ প্রথমে 'সকল মুসলমানের ওপর সদকা ওয়াজিব' বলে কথা শুরু করলেন। তারপর একের পর এক ভালো ও নেক আমলের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বান্দা সে সদকার ক্ষতিপূরণ করতে পারবে। সুতরাং মুসলমানের ওপর সদকা করা ওয়াজিব মানে তার ওপর সমাজে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করা ওয়াজিব। যদি তা করতে সক্ষম না হয়, কিংবা কোনো কারণে না করে, তাহলে সে অন্তত তার জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এটাও তার সদকার ক্ষতিপূরণ করবে। এজন্যই বলা হয়, প্রকৃত মুসলমানের কর্মতৎপরতা (অর্থাৎ ভালো কাজ করা) এবং অবসর (অর্থাৎ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা) - উভয়টিই সমাজের জন্য কল্যাণকর।
এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন :
المُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ المُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
'প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত (-এর অনিষ্ট) থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। '৫১৩
এতটুকুই নয় শুধু, রাসুলুল্লাহ তো সেই ব্যক্তিকেই সমাজের সর্বোত্তম মুসলমান বলেছেন, যার থেকে কল্যাণের আশা করা যায় এবং যার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
হাদিসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ عَلَى نَاسٍ جُلُوسٍ، فَقَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِكُمْ مِنْ شَرِّكُمْ؟» فَسَكَتَ الْقَوْمُ، فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ ، وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ، وَشَرُّكُمْ مَنْ لَا يُرْجَى خَيْرُهُ، وَلَا يُؤْمَنُ شَرُّهُ
'বসে থাকা একদল লোকের সামনে দাঁড়িয়ে নবিজি বললেন, আমি কি তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি কে, তা জানিয়ে দেবো? লোকজন চুপ করে রইল। নবিজি প্রশ্নটি একে একে তিনবার করলেন। তারপর তাদের একজন বলল, অবশ্যই জানাবেন হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সে ব্যক্তি, যার কল্যাণের আশা করা যায় এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হলো, যার কল্যাণের আশা করা যায় না এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। '৫১৪
মুসলমান সমাজের কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু করে না। তা করতে না পারলে অন্তত খারাপ কাজ ও কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর প্রকৃত মুসলমান সব সময় ভালো ও কল্যাণকর কাজ করে। খারাপ কোনো কাজ তার থেকে প্রকাশ পায় না। কারণ, সে সব সময় রাসুলুল্লাহ-এর এ হাদিসের ওপর আমল করে:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৫১৫
যে মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে অর্থাৎ নিজের উপকার লাভের জন্য ও নিজের কষ্ট দূর করার জন্য যেমন চেষ্টা করে, তেমনই অন্য ভাইয়ের উপকারের জন্য এবং তাদের কষ্ট দূর করার জন্য ও চেষ্টা করে, সে ইসলামি সমাজে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত হয়। মুসলমান ভাইদের প্রতি তার এ খিদমতের কারণে স্বয়ং আল্লাহকেই সে তার সাহায্যকারী হিসাবে পেয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ اللَّهُ فِي حَاجَةِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ
'আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার প্রয়োজনে পাশে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকে। '৫১৬
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন :
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ، مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً، فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। একজন আরেকজনের প্রতি জুলুম করতে পারে না এবং শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে না। যে ব্যক্তি তার (মুসলমান) ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকবে, তার প্রয়োজনে আল্লাহ পাশে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের কষ্টসমূহ থেকে তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। '৫১৭
অন্য হাদিসে বলেন:
مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفْسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য সহজ করবেন। '৫১৮
রাসুলুল্লাহ সমাজে পারস্পরিক সাহায্য করার ফজিলতকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এটাকে তিনি দীর্ঘ ইতিকাফের চেয়েও উত্তম বলেছেন। যেমন ইবনে আব্বাস রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ مَشَى فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ خَيْرًا لَهُ مِنَ اعْتِكَافِ عَشْرِ سِنِينَ، وَمَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلَاثَ خَنَادِقَ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخَافِقَيْنِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য হাঁটবে, এ হাঁটা তার জন্য বিশ বছর ইতিকাফে অবস্থান করার চেয়েও উত্তম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন পরিখার আড়াল করে দেন। প্রত্যেক পরিখার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের দূরত্বের সমান। '৫১৯
শক্তি ও সামর্থ্য থাকার পরেও মানুষের সেবা করতে বিরক্তিবোধ করলে নিয়ামত চলে যাওয়ার হুমকি এসেছে। যেমন ইবনে আব্বাস -এর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
‘যে বান্দাকে আল্লাহ তাআলা কোনো নিয়ামত দান করলেন, অতঃপর তা পূর্ণ করলেন, তারপর তার সামনে মানুষের প্রয়োজন পেশ করা হলে সে তাতে বিরক্তিবোধ করল, সে যেন তার সেই নিয়ামত চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দিল। '৫২০
সহিহ হাদিসে জান্নাতবাসীদের সুখের যেসব চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো, এক ব্যক্তি জান্নাতের নিয়ামত ও সুখের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। কারণ, সে মুসলমানদের রাস্তা থেকে একটি গাছ কেটে ফেলেছিল, যে গাছ থাকার কারণে মুসলমানদের পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিল। হাদিসটি হলো :
لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلًا يَتَقَلَّبُ فِي الْجَنَّةِ، فِي شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَّرِيقِ، كَانَتْ تُؤْذِي النَّاسُ
'আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে জান্নাতে (নিয়ামতসমূহের ওপর) গড়াগড়ি খাচ্ছে। এটা (নিয়ামতপ্রাপ্তি) রাস্তার ওপর থেকে এমন একটি গাছ কাটার প্রতিদানস্বরূপ, যেটার কারণে মুসলমানদের কষ্ট হতো। ৫২১
কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের উপকার করার একটি পদ্ধতি হলো, তাদের থেকে কষ্ট দূর করে দেওয়া। যে ব্যক্তি মুসলমানদের থেকে কষ্ট দূর করে এবং যে তাদের উপকার করে—উভয়জনই সমান। উভয়জনই মুসলমানদের উপকার করে। সাওয়াব, রহমত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে উভয়জন বরাবর। এজন্য রাসুলুল্লাহ -এর নির্দেশনার মধ্যে উভয় বিষয় উঠে এসেছে। সমাজের উন্নতি ও সদস্যদের পারস্পরিক হৃদ্যতা উভয় বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে।
মুসলমানদের কষ্ট দূর করা সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, আবু বারজা বর্ণনা করেন:
قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ عَلَّمْنِي شَيْئًا أَنْتَفِعُ بِهِ، قَالَ: اعْزِلِ الْأَذَى، عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ
'আমি বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা থেকে আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, مسلمانوں রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।' ৫২২
আরেক রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে:
يَا رَسُولَ اللَّهِ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ؟ قَالَ: أَمِطِ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন আমল বাতলে দেন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরাও।'
যে সমাজ ইসলামের দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যে সমাজের প্রতিজন সদস্য বিশ্বাস করে যে, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেললে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় এবং জান্নাত অর্জিত হয়, সে সমাজের চেয়ে উন্নত আর কোনো সমাজ কি থাকতে পারে? নিঃসন্দেহে ইসলামি সমাজই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ। কারণ, এ সমাজের সদস্যরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা, খাবারের পচা উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি ফেলার কথা কল্পনাই করতে পারে না, যে বিষয়গুলোর কারণে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ লোকদের শাস্তি দিয়ে থাকে এবং রাস্তা থেকে এসব নোংরা-আবর্জনা সরানোর জন্য বিরাট অঙ্কের ব্যয় বহন করে।
আল্লাহর দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত সমাজ আর অন্যান্য সমাজের মাঝে কত বড় পার্থক্য! ইসলামি সমাজে মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং সাওয়াবের আশায় রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলে। আর অন্যান্য সমাজে লোকজন নিজেরাই বাড়ির জানালা ও ছাদ থেকে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি কষ্টদায়ক বস্তু রাস্তায় নিক্ষেপ করে।
পাশ্চাত্য সমাজ এসব বিষয়ের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে এবং জনগণের মনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করার ও তা বাস্তবায়ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইসলামি সমাজে মানুষের মনে আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং যেরূপ আন্তরিকতার সহিত তারা তা বাস্তবায়ন করে, পাশ্চাত্য সমাজে তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না। কারণ, ইসলামি সমাজের সদস্যরা বিশ্বাস করে যে, এ আইন লঙ্ঘন করা মানে আল্লাহর নাফরমানি করা। এ আইন লঙ্ঘন করলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে, যেদিন ধন-সম্পদ আর সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। তবে যে পরিুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে, সে ব্যতিক্রম। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য সমাজের সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করাকে এত বড় গুনাহ বা অপরাধ মনে করে না। আইন অমান্য করতে গেলে তাদের বিবেক কখনো তিরস্কার করে, কখনো করে না। শেষমেষ অবশ্য আইন অমান্য করেই ফেলে। বিশেষ করে কর্তৃপক্ষ যদি এ ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মুসলমানদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার চেষ্টা করে

📄 মুসলমানদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার চেষ্টা করে


মুসলমানদের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দিলে মীমাংসা করে দেওয়া উপকার করা এবং কষ্ট দূর করে দেওয়ার-ই প্রকারভুক্ত। এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিস অসংখ্য রয়েছে, যার সবগুলো এখানে একত্র করা সম্ভব নয়। তন্মধ্যে একটি হলো, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। ’৫২৩
আয়াতটি লড়াইরত দুই দলের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া সম্পর্কে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা। এমনকি সন্ধি ও মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য অত্যাচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপনীত হতে হলেও তা করতে হবে।
এরপর مسلمانوں পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। ’৫২৪
রাসুলুল্লাহ দাওয়াতের কষ্ট ও ব্যস্ততার ফাঁকেও লড়াইরত দুই দলের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এর মাধ্যমে মুসলমানদের সামনে তিনি মীমাংসা করে দেওয়ার আবশ্যকতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এ সম্পর্কে আবুল আব্বাস সাহল বিন সাদ সায়িদি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট খবর পৌঁছল যে, বনু আমর বিন আওফের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। তখন তিনি কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বের হলেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত ঘটনা একটি দীর্ঘ সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ মুমিনদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। এজন্য তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে ভালো কাজ, উদারতা, নম্রতা ইত্যাকার উত্তম গুণাবলি সৃষ্টি করার চেষ্টা করতেন। তারবিয়াতের সময় এ দিকটির প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, কঠোরতা ইত্যাদি বিষয়কে মুচকি হাসি, উদারতা ইত্যাদি দ্বারা পরিবর্তন করে দিতেন।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
سَمِعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَوْتَ خُصُومٍ بِالْبَابِ عَالِيَةٍ أَصْوَاتُهُمَا، وَإِذَا أَحَدُهُمَا يَسْتَوْضِعُ الْآخَرَ، وَيَسْتَرْفِقُهُ فِي شَيْءٍ، وَهُوَ يَقُولُ: وَاللهِ لَا أَفْعَلُ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَيْنَ المُتَأَلِّي عَلَى اللهِ، لَا يَفْعَلُ المَعْرُوفَ؟، فَقَالَ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَهُ أَيُّ ذَلِكَ أَحَبَّ
'রাসুলুল্লাহ দরজার পাশে দুই বিবাদমান ব্যক্তির উঁচু স্বর শুনতে পেলেন। তাদের একজন অপরজনকে ঋণের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বলছে এবং তার সহানুভূতি কামনা করছে। প্রত্যুত্তরে অপরজন বলছে, আল্লাহর শপথ! আমি তা করব না। রাসুলুল্লাহ তাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, সে লোকটি কোথায় যে আল্লাহর শপথ করে বলছে যে, সে ভালো কাজ করবে না? প্রতিপক্ষ লোকটি (লজ্জা পেয়ে) বলল, আমি, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার ভুল হয়ে গেছে; অতএব) সে যা চায় তা-ই হবে।'৫২৫
মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সহজ করার জন্য রাসুলুল্লাহ এমন অনেক কথার অনুমতি দিয়েছেন, যেসব কথায় ঘৃণাপূর্ণ ও কঠোর অন্তরকে নরম করার জন্য একটু বাড়িয়ে বলা হয়। এসব কথাকে নিষিদ্ধ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করেননি। যারা এ উদ্দেশ্যে একটু বাড়িয়ে বলে তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেননি। উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত -এর হাদিসে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, :
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيُنْمِي خَيْرًا، أَوْ يَقُولُ خَيْرًا
'ওই ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে উত্তম কথা বলে। '৫২৬
মুসলিমের রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত এসেছে:
وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ : الْحَرْبُ، وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
'আমি রাসুলুল্লাহ -কে তিনটি জায়গা ব্যতীত আর কোনো জায়গায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে দেখিনি। সে জায়গাগুলো হলো-যুদ্ধ, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া এবং স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে (ভালোবাসা সৃষ্টি বা বিশেষ প্রয়োজনে মিথ্যা) কোনো কথা বলা। '৫২৭

মুসলমানদের মাঝে মনোমালিন্য দেখা দিলে মীমাংসা করে দেওয়া উপকার করা এবং কষ্ট দূর করে দেওয়ার-ই প্রকারভুক্ত। এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিস অসংখ্য রয়েছে, যার সবগুলো এখানে একত্র করা সম্ভব নয়। তন্মধ্যে একটি হলো, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। ’৫২৩
আয়াতটি লড়াইরত দুই দলের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া সম্পর্কে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা। এমনকি সন্ধি ও মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য অত্যাচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপনীত হতে হলেও তা করতে হবে।
এরপর مسلمانوں পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। ’৫২৪
রাসুলুল্লাহ দাওয়াতের কষ্ট ও ব্যস্ততার ফাঁকেও লড়াইরত দুই দলের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এর মাধ্যমে مسلمانوں সামনে তিনি মীমাংসা করে দেওয়ার আবশ্যকতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এ সম্পর্কে আবুল আব্বাস সাহল বিন সাদ সায়িদি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট খবর পৌঁছল যে, বনু আমর বিন আওফের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছে। তখন তিনি কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বের হলেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত ঘটনা একটি দীর্ঘ সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ মুমিনদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। এজন্য তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে मुसलमानों মাঝে ভালো কাজ, উদারতা, নম্রতা ইত্যাকার উত্তম গুণাবলি সৃষ্টি করার চেষ্টা করতেন। তারবিয়াতের সময় এ দিকটির প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, কঠোরতা ইত্যাদি বিষয়কে মুচকি হাসি, উদারতা ইত্যাদি দ্বারা পরিবর্তন করে দিতেন।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
سَمِعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَوْتَ خُصُومٍ بِالْبَابِ عَالِيَةٍ أَصْوَاتُهُمَا، وَإِذَا أَحَدُهُمَا يَسْتَوْضِعُ الْآخَرَ، وَيَسْتَرْفِقُهُ فِي شَيْءٍ، وَهُوَ يَقُولُ: وَاللهِ لَا أَفْعَلُ، فَخَرَجَ عَلَيْهِمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَيْنَ المُتَأَلِّي عَلَى اللهِ، لَا يَفْعَلُ المَعْرُوفَ؟، فَقَالَ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَهُ أَيُّ ذَلِكَ أَحَبَّ
'রাসুলুল্লাহ দরজার পাশে দুই বিবাদমান ব্যক্তির উঁচু স্বর শুনতে পেলেন। তাদের একজন অপরজনকে ঋণের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বলছে এবং তার সহানুভূতি কামনা করছে। প্রত্যুত্তরে অপরজন বলছে, আল্লাহর শপথ! আমি তা করব না। রাসুলুল্লাহ তাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, সে লোকটি কোথায় যে আল্লাহর শপথ করে বলছে যে, সে ভালো কাজ করবে না? প্রতিপক্ষ লোকটি (লজ্জা পেয়ে) বলল, আমি, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার ভুল হয়ে গেছে; অতএব) সে যা চায় তা-ই হবে।'৫২৫
মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সহজ করার জন্য রাসুলুল্লাহ এমন অনেক কথার অনুমতি দিয়েছেন, যেসব কথায় ঘৃণাপূর্ণ ও কঠোর অন্তরকে নরম করার জন্য একটু বাড়িয়ে বলা হয়। এসব কথাকে নিষিদ্ধ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করেননি। যারা এ উদ্দেশ্যে একটু বাড়িয়ে বলে তাদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেননি। উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত -এর হাদিসে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, :
لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ، فَيُنْمِي خَيْرًا، أَوْ يَقُولُ خَيْرًا
'ওই ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে উত্তম কথা বলে। '৫২৬
মুসলিমের রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত এসেছে:
وَلَمْ أَسْمَعْ يُرَخَّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ : الْحَرْبُ، وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ، وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
'আমি রাসুলুল্লাহ -কে তিনটি জায়গা ব্যতীত আর কোনো জায়গায় মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে দেখিনি। সে জায়গাগুলো হলো-যুদ্ধ, মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া এবং স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে (ভালোবাসা সৃষ্টি বা বিশেষ প্রয়োজনে মিথ্যা) কোনো কথা বলা। '৫২৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00