📄 বিনয়ী
অহংকারীদের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে যেমন অসংখ্য আয়াত ও হাদিস রয়েছে, তেমনই বিনয়ীদের পুরস্কারের ব্যাপারেও এমন অনেক বাণী রয়েছে। এতে বিনয়-নম্রতার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে আর বলা হয়েছে, যে যত বিনয়ী, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে তত বেশি। বিনয়-সম্পর্কিত নুসুস থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
مَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'কেউ আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করলে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।' ৪৮৩
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ اللهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
'আল্লাহ তাআলা আমার নিকট এ মর্মে ওহি প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যেন তোমাদের একজন অপরজনের সাথে অহংকার না করে এবং একজন আরেকজনের প্রতি অন্যায় না করে।' ৪৮৪
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও মূর্তপ্রতীক। দয়া, বিনম্রতা ও উদারতা তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তিনি যখন খেলাধুলায় মত্ত শিশুদের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন তাদের সালাম দিতেন। তাদের সাথে উদারচিত্তে সহাস্যে কথা বলতেন। নবুওয়াতের শান এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তাঁর বিনয়ী ও উদার আচরণ করায় প্রতিবন্ধক হতো না। এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে যে, একবার আনাস রা. বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও এমন করতেন।
আনাস রা. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিনয় সম্পর্কে আরেক হাদিসে বর্ণনা করেন :
إِنْ كَانَتِ الأَمَةُ مِنْ إِمَاءِ أَهْلِ المَدِينَةِ، لَتَأْخُذُ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَنْطَلِقُ بِهِ حَيْثُ شَاءَتْ
‘(রাসুলুল্লাহ এতই বিনয়ী ছিলেন যে,) মদিনার কোনো দাসী (নিজের প্রয়োজন জানানোর জন্য) রাসুলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। '৪৮৫
তামিম বিন উসাইদ ইসলামের বিবিবিধান সম্পর্কে জানতে মদিনায় এলেন। একজন অপরিচিত ভিনদেশি হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি রাষ্ট্রের বাদশা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। রাসুলুল্লাহ মিম্বরে বসে লোকদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তামিম বিন উসাইদ সরাসরি রাসুলুল্লাহ -এর কাছে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করলেন। রাসুলুল্লাহ তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুবই বিনয় ও উদারতার সাথে তার জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন।
চলুন, বিস্তারিত ঘটনা খোদ তামিম বিন উসাইদ -এর মুখেই শুনি :
اِنْتَهَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَخْطُبُ، قَالَ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ رَجُلٌ غَرِيبٌ، جَاءَ يَسْأَلُ عَنْ دِينِهِ، لَا يَدْرِي مَا دِينُهُ، قَالَ: فَأَقْبَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَرَكَ خُطْبَتَهُ حَتَّى انْتَهَى إِلَيَّ، فَأُتِيَ بِكُرْسِيُّ، حَسِبْتُ قَوَائِمَهُ حَدِيدًا، قَالَ: فَقَعَدَ عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَجَعَلَ يُعَلِّمُنِي مِمَّا عَلَّمَهُ اللهُ، ثُمَّ أَتَى خُطْبَتَهُ، فَأَتَمَّ آخِرَهَا
‘আমি যখন নবিজি -এর নিকট আসলাম, তখন তিনি লোকদের ভাষণ দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, এক ভিনদেশি তার দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছে। সে দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তখন রাসুলুল্লাহ আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং ভাষণ বন্ধ করে আমার নিকট আসলেন। একটি চেয়ার এনে তাতে বসে আমাকে জ্ঞান দান করলেন, যা তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছেন। তারপর আবার লোকদের মাঝে ফিরে গিয়ে বাকি ভাষণ শেষ করলেন। '৪৮৬
বিনয়ের এ মহান গুণ-যা ব্যক্তির উদারতা, দয়া ও সাদা মনের পরিচয় দেয়-রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবিদের মাঝেও বিকশিত করার চেষ্টা করেছেন। তাই তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন:
لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ، وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعُ لَقَبِلْتُ
'আমাকে যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি খাওয়ারও দাওয়াত দেওয়া হয়, তবুও আমি সে দাওয়াত কবুল করি। আর যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি হাদিয়া দেওয়া হয়, তা-ও আমি গ্রহণ করি। '৪৮৭
সুবহানাল্লাহ! বিনয়ের কী উজ্জ্বল নমুনা! উন্নত মনুষ্যত্বের কী জ্যোতির্ময় দৃষ্টান্ত! কী আলোকিত আদর্শ!
📄 কারও সাথে বিদ্রূপ করে না
প্রকৃত মুসলমান-যার মাঝে বিনয়ের মহান গুণ বিদ্যমান—কখনো কাউকে অবজ্ঞা করে না এবং কারও সাথে বিদ্রূপ করে না। কারণ, তার কুরআন তাকে বিনয় অবলম্বন করতে যেমন নির্দেশ দেয়, তেমনই অহংকার, অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'হে মুমিনগণ, কোনো দল যেন অপর দলকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী যেন অপর নারীকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গুনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তাওবা না করে, তারাই জালিম। '৪৮৮
তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ কোনো মুসলমানকে হেয় প্রতিপন্ন করাকে আগাগোড়া মন্দ বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন : بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ 'মানুষ মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো মুসলমানকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। '৪৮৯
📄 বড় ও মর্যাদাবান লোকদের সম্মান করে
ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ مَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।
ইসলাম মানুষকে সম্মান করার প্রতি উৎসাহিত করে, অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রতি নয়। বিশেষ করে যারা সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, তাদের সম্মান করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয়; বরং বয়স্ক, আলিম ও মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে ইসলাম তার চারিত্রিক মূলনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলে অভিহিত করেছে, যে মূলনীতির ওপর ইসলামি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত। যার মধ্যে এ গুণ অনুপস্থিত, তাকে ইসলামি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর উম্মত হওয়ার গর্বিত পরিচয় তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا، وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا 'যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলিমদের মর্যাদা ও অধিকার বুঝে না, সে আমার (সত্যিকার) উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ৪৯০
সমাজে বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের চেয়ে বড়দের বেশি মূল্যায়ন করা সমাজের উন্নতির আলামত। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে মানবিক চরিত্র বিদ্যমান এবং মানসিকতা উন্নত, সে সমাজেই বড়দের সম্মান করা হয় এবং তাদের বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এজন্য ইসলামি সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারক রাসুলুল্লাহ বড়দের সম্মান করার এ মহান গুণটির প্রতি মুসলমানদের খুব তাগিদ দিয়েছেন।
তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ -এর নিকট একদল লোক আসলেন। তাদের পক্ষ থেকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আব্দুর রহমান বিন সাহল রাসুলুল্লাহ -এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যে লোক সবার বড়, সে-ই কথা বলো। তখন আব্দুর রহমান চুপ হয়ে গেলেন এবং বড় আরেকজন কথা বললেন। '৪৯১
রাসুলুল্লাহ বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বড়দের সম্মান করাকে তিনি আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর বলেছেন।
তিনি বলেন:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।'৪৯২
আগের প্রজন্মের মুসলমানদের মাঝে রাসুলুল্লাহ -এর এ প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এজন্য তাদের মাঝে এসব মহান গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিকে সম্মান করার বিষয়ে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ আবু সাইদ সামুরা বিন জুনদুব-এর কথাটা শোনা যাক। তিনি বলেন:
لَقَدْ كُنْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا، فَكُنْتُ أَحْفَظُ عَنْهُ، فَمَا يَمْنَعُنِي مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا أَنَّ هَا هُنَا رِجَالًا هُمْ أَسَنُّ مِنِّي
'রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখতে পারতাম। তবে একমাত্র এ কারণে তা আলোচনা করতে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিত যে, তখন রাসুলুল্লাহ-এর কাছে আমার চেয়ে বয়সে বড় অনেক লোক উপস্থিত থাকতেন। '৪৯৩
বড় ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন উমর। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ-এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন সেখানে আবু বকর ও উমর-ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার উত্তর ইবনে উমর-এর জানা ছিল। কিন্তু আবু বকর ও উমর-এর প্রতি সম্মানবশত তিনি উত্তর দেননি।
বিস্তারিত খোদ ইবনে উমর-এর মুখেই শুনুন :
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْبِرُونِي بِشَجَرَةٍ mَثَلُهَا مَثَلُ المُسْلِمِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا، وَلَا تَحْتُ وَرَقَهَا فَوَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَهُ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَكَلَّمَ، وَثَمَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ، فَلَمَّا لَمْ يَتَكَلَّمَا ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ النَّخْلَةُ»، فَلَمَّا خَرَجْتُ مَعَ أَبِي قُلْتُ: يَا أَبَتَاهُ، وَقَعَ فِي نَفْسِي أَنَّهَا النَّخْلَةُ، قَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَهَا، لَوْ كُنْتَ قُلْتَهَا كَانَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: مَا مَنَعَنِي إِلَّا أَنِّي لَمْ أَرَكَ وَلَا أَبَا بَكْرٍ تَكَلَّمْتُمَا فَكَرِهْتُ
'রাসুলুল্লাহ (একদিন উপস্থিত সবাইকে) বললেন, বলো তো দেখি সে কোন গাছ, যার উপমা মুসলমানের সাথে দেওয়া চলে। সব সময় সে তার প্রভুর নির্দেশে ফলদান করে এবং তার পাতা কখনো ঝরে যায় না। তখন আমার মনে আসলো, নিশ্চয় তা খেজুর গাছ। তবে আবু বকর ও উমর-এর উপস্থিতিতে আমি কথা বলা সংগত মনে করলাম না। যখন তাঁরা (আবু বকর ও উমর *) কোনো উত্তর দিলেন না, তখন নবিজি বললেন, তা হচ্ছে খেজুর গাছ। এরপর যখন আমি আমার পিতার সাথে মজলিস থেকে বের হয়ে আসলাম, তখন তাঁকে বললাম, আব্বু, আমার মনে এসেছিল যে, ওটা খেজুর গাছ। তখন তিনি বললেন, তাহলে তা বলতে কী বাধা ছিল তোমার? তুমি যদি তা বলতে, তাহলে অমুক অমুক বস্তুর চেয়েও আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। আমি বললাম, তেমন কোনো বাধা ছিল না, তবে আমি দেখলাম, আপনি আর আবু বকর কেউ-ই উত্তর দিচ্ছেন না, তাই (আপনাদের সম্মানার্থে) আমি উত্তর দেওয়া সমীচীন মনে করিনি। '৪৯৪
ইসলাম সমাজে মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার কথা বলে। সহিহ মুসলিমে আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
'রাসুলুল্লাহ মানুষকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। '৪৯৫
যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করে, সে অনুযায়ী স্তরবিন্যাস করে মূল্যায়ন করা। সুতরাং প্রথম মূল্যায়ন করতে হবে ক্রমান্বয়ে উলামায়ে ইসলাম, কুরআনের হাফিজ ও সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন লোকদের।
কেননা, ইসলামি সমাজে আলিমদের মর্যাদা সবার ওপরে। তবে শর্ত হলো, তাদের আল্লাহর শরিয়তের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, সত্যপথে অবিচল থাকতে হবে এবং ইসলামের নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। স্বয়ং আল্লাহ-ই আলিমদের এ মর্যাদা দিয়েছেন।
তিনি বলেন: قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। '৪৯৬
অনুরূপভাবে ইসলামি সমাজে কুরআনের বাহক তথা কারি ও হাফিজদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সহিহ হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদেরকে নামাজের ইমামতির অধিক যোগ্য এবং সভা-মজলিসে সভাপতিত্বের অধিক হকদার বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةً، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءً ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا ، وَلَا يَؤُمَنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدْ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'যে সর্বাপেক্ষা বেশি কুরআনি জ্ঞানের অধিকারী, সে লোকজনের ইমামতি করবে। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমপর্যায়ের হয়, সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে, সে ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী, সে ইমামতি করবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিজস্ব প্রভাবাধীন এলাকায় ইমামতি করবে না কিংবা তার অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। '৪৯৭
একটু পূর্বে আমরা এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেছি। তা হলো:
إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ، وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
'আল্লাহকে সম্মান করার একটি উপায় হলো, বৃদ্ধ মুসলমান, কুরআনের বাহক—যে কুরআনের সীমা লঙ্ঘন করে না এবং তার তিলাওয়াত ও তদনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত থাকে না এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা।' ৪৯৮
বর্ণিত আছে :
'উহুদ যুদ্ধের শহিদগণকে এক কবরে দুজন করে দাফন করা হয়েছিল। কবর দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করতেন, أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذَا لِلْقُرْآنِ؟ 'এ দুজনের মধ্যে কুরআন কার আয়ত্তে বেশি ছিল? যার দিকে ইশারা করা হতো, তাকেই প্রথমে কবরে রাখতেন।' ৪৯৯
মানুষকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে ও মূল্যায়ন করতে রাসুলুল্লাহ -এর আরেকটি বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নির্দেশনা তিনি নামাজের পূর্বমুহূর্তে কাতার সোজা করার সময় দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন :
لِيَلِنِي مِنْكُمْ أُولُو الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى
'মর্যাদাসম্পন্ন বিবেকবানরাই (নামাজে) আমার কাছাকাছি থাকবে।' ৫০০
এ একটিমাত্র নির্দেশনায় রয়েছে অনেক শিক্ষা। সর্বপ্রথম শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে এবং সে অনুসারেই স্তরবিন্যাস করত হবে। নামাজের মধ্যে সুষ্ঠু বিবেকসম্পন্ন লোকদের রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে প্রথমে রাখার মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের বিভিন্ন দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন। প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, শক্তি ও বিশেষত্ব অনুযায়ী ইসলামি সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ আদব প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে এবং কোনো কিছু বণ্টন করার ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে মর্যাদা ও ফজিলতসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতেন। প্রত্যেক জাতির সম্মানিত ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন। তাকেই সে জাতির গভর্নর নিযুক্ত করতেন। রাসুলুল্লাহ-এর মজলিসে শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়বান মুমিনদের অগ্রাধিকার ছিল, যারা তাকওয়ার দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন। ছোটদের স্নেহ করতেন। অভাবীদের স্বার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। ভিনদেশি অপরিচিতজনদের হিফাজত করতেন।
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত বাস্তবসম্মত বিষয়সমূহ পূর্ণরূপে অনুধাবন করে সাধারণভাবে সমাজের সকল মানুষের সাথে; বিশেষভাবে আলিম-উলামা, মুত্তাকি ও মর্যাদাবান মানুষদের সাথে সে অনুযায়ী সমাজজীবন পরিচালনা করে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।
📄 ভালো মানুষদের সান্নিধ্যে থাকে
প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম সৎগুণ হলো, নেককারদের সাথে সম্পর্ক রাখা; তাদের নৈকট্য অর্জন করা এবং তাদের থেকে দুআ চাওয়া। উচ্চ পদমর্যাদা, উন্নত সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ মহৎ গুণের পথে তার প্রতিবন্ধক হয় না কখনো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
'আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।'৫০১
নেককার লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখাটা এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এতে মানুষের মাঝে কল্যাণ, তাকওয়া ও কথায়-কাজে যথার্থতা সৃষ্টি হয়। দ্বীনি বোধশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। সত্যের প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। এভাবে একসময় তারাও নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কবি বলেন :
بِعِشْرَتِكَ الْكِرَامَ تَعُدَّ مِنْهُمْ * فَلَا تُرَيِنَّ لِغَيْرِهِمْ أَلُوفًا 'ভালো মানুষের সংশ্রবে থাকলে তুমি ভালো মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই ভালো মানুষ ছাড়া অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা অবলম্বন কোরো না।'
আল্লাহর নবি মুসা আল্লাহর নেককার বান্দার সংশ্রবে থেকে ইলম অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে গিয়ে তিনি বিনয় ও আদব সহকারে বলেছেন : هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا 'আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, সত্যপথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন?'৫০২
উত্তরে নেককার সে বান্দা বললেন : إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِيَ صَبْرًا
'আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। '৫০৩
এর উত্তরে মুসা আরও বিনয়াবনত হয়ে বললেন: سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا 'আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না। '৫০৪
প্রকৃত মুসলমান ভালো মানুষ ব্যতীত অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা করে না। কারণ তার শরীয়ত তাকে বলে, মানুষ হলো খনির মতো, যার কিছু থেকে মূল্যবান পদার্থ বের হয়, আর কিছু থেকে বের হয় নিম্নমানের পদার্থ। তা ছাড়া ভালো মানুষ তো কেবল ভালো মানুষের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ، خِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا، وَالْأَرْوَاحُ جُنُودُ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا اخْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
'মানুষ সোনা ও রুপার খনির মতো। তাদের মধ্যে জাহিলি যুগে যারা উত্তম, ইসলামের যুগেও তারাই উত্তম প্রমাণিত হতে পারে—যদি তারা তা (ইসলাম) সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারে। আত্মারা রুহের জগতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। যারা সেখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরিচিত ছিল, দুনিয়াতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং যারা সেখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন ছিল, এখানে তারা সম্পর্কহীন থাকে। '৫০৫
প্রকৃত মুসলমান এটাই জানে যে, সঙ্গী দুধরনের রয়েছে। ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গী। ভালো সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। তার পাশে থাকলে সুঘ্রাণ ও আনন্দ পাওয়া যায়। মন্দ সঙ্গী হাপরে ফুঁকদানকারী কামারের মতো। তার পাশে থাকলে পাওয়া যায় আগুনের তেজ, ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও কষ্ট।
হাদিসে ভালো ও মন্দ সঙ্গীর এমন যথার্থ উদাহরণই দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةٌ
'ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তা-ও না হলে অন্তত সুগন্ধি নিজেই তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে অথবা তোমাকে দুর্গন্ধ দেবে।'৫০৬
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতেন এমন নেককার লোকদের সাক্ষাৎলাভ ও সুহবতের, যারা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন; যাদের অন্তর হতো কোমল ও নরম; আর যাদের চোখ থেকে প্রবাহিত হতো আল্লাহভীতির অশ্রুধারা।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আনাস বর্ণনা করেছেন:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، بَعْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُمَرَ : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى أُمَّ أَيْمَنَ نَزُورُهَا، كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزُورُهَا ، فَلَمَّا انْتَهَيْنَا إِلَيْهَا بَكَتْ، فَقَالَا لَهَا: مَا يُبْكِيكِ؟ مَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَتْ: مَا أَبْكِي أَنْ لَا أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَكِنْ أَبْكِي أَنَّ الْوَحْيَ قَدِ انْقَطَعَ مِنَ السَّمَاءِ، فَهَيَّجَتْهُمَا عَلَى الْبُكَاءِ. فَجَعَلَا يَبْكِيَانِ مَعَهَا
‘রাসুলুল্লাহ-এর মৃত্যুর পর আবু বকর উমর-কে বললেন, রাসুলুল্লাহ যেভাবে উম্মে আইমান-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন, চলুন আমরাও অদ্রূপ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে আসি। (বর্ণনাকারী বলেন,) আমরা যখন তাঁর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। আবু বকর ও উমর তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর কাছে তো তাঁর রাসুল-এর জন্য কল্যাণকর জিনিসই রয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ-এর জন্য কল্যাণ রয়েছে, তা না জানা থাকার কারণে কাঁদছি না। বরং আমি এজন্যই কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। (বর্ণনাকারী বলেন,) তাঁর এ কথায় তাঁদের দুজনের (আবু বকর ও উমর) কান্না এসে গেল এবং তাঁরাও তাঁর সাথে কাঁদতে লাগলেন। '৫০৭
তা ছাড়া নেককারদের সাথে সুহবতের মজলিসকে ফেরেশতারা বেষ্টন করে রাখেন। আল্লাহ তাআলা সে মজলিসকে তাঁর রহমতের ছায়ায় ঢেকে নেন। তারপর এতে মানুষের ইমান মজবুত হয়। আত্মা পরিচ্ছন্ন হয়। কলব পরিশুদ্ধ হয়। মোটকথা, নেককার লোকদের সুহবতে থাকলে কল্যাণই কল্যাণ। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য—সবার জন্যই কল্যাণ। ইসলাম মানুষদের ব্যক্তিগতভাবে ও সামগ্রিকভাবে এ কল্যাণের দিকেই আহ্বান করে।
প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম সৎগুণ হলো, নেককারদের সাথে সম্পর্ক রাখা; তাদের নৈকট্য অর্জন করা এবং তাদের থেকে দুআ চাওয়া। উচ্চ পদমর্যাদা, উন্নত সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ মহৎ গুণের পথে তার প্রতিবন্ধক হয় না কখনো।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرْطًا
'আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।'৫০১
নেককার লোকদের সাথে সম্পর্ক রাখাটা এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এতে মানুষের মাঝে কল্যাণ, তাকওয়া ও কথায়-কাজে যথার্থতা সৃষ্টি হয়। দ্বীনি বোধশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। সত্যের প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়। এভাবে একসময় তারাও নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কবি বলেন :
بِعِشْرَتِكَ الْكِرَامَ تَعُدَّ مِنْهُمْ * فَلَا تُرَيِنَّ لِغَيْرِهِمْ أَلُوفًا 'ভালো মানুষের সংশ্রবে থাকলে তুমি ভালো মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই ভালো মানুষ ছাড়া অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা অবলম্বন কোরো না।'
আল্লাহর নবি মুসা আল্লাহর নেককার বান্দার সংশ্রবে থেকে ইলম অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে গিয়ে তিনি বিনয় ও আদব সহকারে বলেছেন : هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا 'আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, সত্যপথের যে জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন?'৫০২
উত্তরে নেককার সে বান্দা বললেন : إِنَّكَ لَنْ تَسْتَطِيعَ مَعِيَ صَبْرًا
'আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। '৫০৩
এর উত্তরে মুসা আরও বিনয়াবনত হয়ে বললেন: سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا 'আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না। '৫০৪
প্রকৃত মুসলমান ভালো মানুষ ব্যতীত অন্য কারও সাথে ঘনিষ্ঠতা করে না। কারণ তার শরীয়ত তাকে বলে, মানুষ হলো খনির মতো, যার কিছু থেকে মূল্যবান পদার্থ বের হয়, আর কিছু থেকে বের হয় নিম্নমানের পদার্থ। তা ছাড়া ভালো মানুষ তো কেবল ভালো মানুষের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ، خِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا، وَالْأَرْوَاحُ جُنُودُ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا اخْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ
'মানুষ সোনা ও রুপার খনির মতো। তাদের মধ্যে জাহিলি যুগে যারা উত্তম, ইসলামের যুগেও তারাই উত্তম প্রমাণিত হতে পারে—যদি তারা তা (ইসলাম) সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারে। আত্মারা রুহের জগতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। যারা সেখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরিচিত ছিল, দুনিয়াতে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং যারা সেখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন ছিল, এখানে তারা সম্পর্কহীন থাকে। '৫০৫
প্রকৃত মুসলমান এটাই জানে যে, সঙ্গী দুধরনের রয়েছে। ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গী। ভালো সঙ্গী সুগন্ধি বিক্রেতার মতো। তার পাশে থাকলে সুঘ্রাণ ও আনন্দ পাওয়া যায়। মন্দ সঙ্গী হাপরে ফুঁকদানকারী কামারের মতো। তার পাশে থাকলে পাওয়া যায় আগুনের তেজ, ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও কষ্ট।
হাদিসে ভালো ও মন্দ সঙ্গীর এমন যথার্থ উদাহরণই দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ، وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ، كَحَامِلِ الْمِسْكِ، وَنَافِخِ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةٌ، وَنَافِخُ الْكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةٌ
'ভালো সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো, সুগন্ধি বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁকদানকারী। সুগন্ধিওয়ালা হয়তো তোমাকে উপহারস্বরূপ সুগন্ধি দেবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিনে নেবে। তা-ও না হলে অন্তত সুগন্ধি নিজেই তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। আর হাপরে ফুঁকদানকারী হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে অথবা তোমাকে দুর্গন্ধ দেবে।'৫০৬
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতেন এমন নেককার লোকদের সাক্ষাৎলাভ ও সুহবতের, যারা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন; যাদের অন্তর হতো কোমল ও নরম; আর যাদের চোখ থেকে প্রবাহিত হতো আল্লাহভীতির অশ্রুধারা।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আনাস বর্ণনা করেছেন:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، بَعْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُمَرَ : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى أُمَّ أَيْمَنَ نَزُورُهَا، كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزُورُهَا ، فَلَمَّا انْتَهَيْنَا إِلَيْهَا بَكَتْ، فَقَالَا لَهَا: مَا يُبْكِيكِ؟ مَا عِنْدَ اللهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَتْ: مَا أَبْكِي أَنْ لَا أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَكِنْ أَبْكِي أَنَّ الْوَحْيَ قَدِ انْقَطَعَ مِنَ السَّمَاءِ، فَهَيَّجَتْهُمَا عَلَى الْبُكَاءِ. فَجَعَلَا يَبْكِيَانِ مَعَهَا
‘রাসুলুল্লাহ-এর মৃত্যুর পর আবু বকর উমর-কে বললেন, রাসুলুল্লাহ যেভাবে উম্মে আইমান-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন, চলুন আমরাও অদ্রূপ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে আসি। (বর্ণনাকারী বলেন,) আমরা যখন তাঁর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। আবু বকর ও উমর তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহর কাছে তো তাঁর রাসুল-এর জন্য কল্যাণকর জিনিসই রয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ-এর জন্য কল্যাণ রয়েছে, তা না জানা থাকার কারণে কাঁদছি না। বরং আমি এজন্যই কাঁদছি যে, আসমান থেকে ওহি আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। (বর্ণনাকারী বলেন,) তাঁর এ কথায় তাঁদের দুজনের (আবু বকর ও উমর) কান্না এসে গেল এবং তাঁরাও তাঁর সাথে কাঁদতে লাগলেন। '৫০৭
তা ছাড়া নেককারদের সাথে সুহবতের মজলিসকে ফেরেশতারা বেষ্টন করে রাখেন। আল্লাহ তাআলা সে মজলিসকে তাঁর রহমতের ছায়ায় ঢেকে নেন। তারপর এতে মানুষের ইমান মজবুত হয়। আত্মা পরিচ্ছন্ন হয়। কলব পরিশুদ্ধ হয়। মোটকথা, নেককার লোকদের সুহবতে থাকলে কল্যাণই কল্যাণ। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য—সবার জন্যই কল্যাণ। ইসলাম মানুষদের ব্যক্তিগতভাবে ও সামগ্রিকভাবে এ কল্যাণের দিকেই আহ্বান করে।