📄 গোপনীয়তা রক্ষাকারী
প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি উত্তম গুণ হলো, সে গোপনীয়তা রক্ষা করে। অন্যের গোপনীয়তা-যা তার কাছে আমানত রাখা হয়েছে-কারও সামনে প্রকাশ করে না। গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারা মানুষের পৌরুষ, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক। আর এটাই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও নারী-যাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শের অমীয় সুধা পান করেছেন এবং নিজেদের তাঁর আদর্শ অনুযায়ী পরিচলিত করেছেন-তাঁদের অন্যতম গুণ ছিল। তাঁদের অসংখ্য উত্তম গুণের মধ্যে এই গুণটিও ছিল। অগণিত সুন্দর অভ্যাসের মধ্যে এই অভ্যাসটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হাফসা রা.-এর স্বামী মারা যাওয়ার পর উমর রা. তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবু বকর রা. ও উসমান রা.-এর নিকট। তখন তারা সুকৌশলে এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর একটি গোপন কথা রক্ষা করেছিলেন। এখান থেকে গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে সাহাবিগণ কতটা সুদৃঢ় ছিলেন, তা অনুমান করা যায়।
বিস্তারিত ঘটনা ইমাম বুখারি ইবনে উমর সূত্রে বর্ণনা করেছেন :
'উমর বলেন, আমার মেয়ে হাফসা -এর স্বামীর মৃত্যুর পর উসমান বিন আফফান -এর সাথে দেখা করে তার নিকট হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব করলাম। বললাম, আপনি রাজি থাকলে আমি হাফসা বিনতে উমর -কে আপনার সাথে বিবাহ দিতে চাই। তিনি বললেন, আমি একটু ভেবে দেখি। কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। তারপর আমার সাথে দেখা করে বললেন, আমার মনে হচ্ছে, আমার এ সময়ে বিয়ে করা ঠিক হবে না। তারপর আমি আবু বকর -এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তাকে বললাম, আপনি রাজি থাকলে আমি হাফসা বিনতে উমর -কে আপনার সাথে বিয়ে দিতে চাই। তিনি চুপ করে থাকলেন, কোনো উত্তর দিলেন না। এতে উসমান -এর চেয়ে তাঁর ওপর আমার বেশি রাগ আসলো। কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। তারপর রাসুলুল্লাহ হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন। আমি হাফসা -কে তাঁর সাথে বিয়ে দিয়ে দিলাম। তারপর আবু বকর আমার সাথে দেখা করে বললেন, আপনি হাফসা -কে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আর আমি কোনো উত্তর দিইনি—এতে আপনি মনে হয় আমার ওপর খুব রেগে আছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ হাফসা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন, আর রাসুলুল্লাহ -এর গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাক, তা আমি চাইনি। এজন্যই আপনাকে কোনো উত্তর দিইনি। যদি রাসুলুল্লাহ তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব না দিতেন, আমি অবশ্যই তাকে গ্রহণ করে নিতাম।
গোপনীয়তা রক্ষা করার এ গুণ শুধু সালাফের পুরুষদের মাঝে ছিল তা নয়, নারী ও শিশুদের মাঝেও ছিল, যারা ইসলামকে নিজেদের মাঝে দ্রবীভূত করে নিয়েছিলেন এবং যাদের হৃদয় ও বিবেক ইসলামের উজ্জ্বল নুর দ্বারা আলোকিত ছিল।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা সহিহ মুসলিমে আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: أَتَى عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَنَا أَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ، قَالَ: فَسَلَّمَ عَلَيْنَا، فَبَعَثَنِي إِلَى حَاجَةٍ، فَأَبْطَأْتُ عَلَى أُمِّي، فَلَمَّا جِئْتُ قَالَتْ: مَا حَبَسَكَ؟ قُلْتُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِحَاجَةٍ، قَالَتْ: مَا حَاجَتُهُ؟ قُلْتُ: إِنَّهَا سِرٌّ، قَالَتْ: لَا تُحَدِّثَنَّ بِسِرِّ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدًا قَالَ أَنَسُ: وَاللَّهِ لَوْ حَدَّثْتُ بِهِ أَحَدًا لَحَدَّثْتُكَ يَا ثَابِتُ
'আনাস বলেন, আমার নিকট রাসুলুল্লাহ আসলেন। তখন আমি (সমবয়সী) বালকদের সাথে খেলছিলাম। এসেই তিনি আমাদের সালাম দিলেন। তারপর আমাকে একটা কাজে পাঠালেন। এতে মায়ের কাছে পৌঁছতে আমার দেরি হলো। যখন তার কাছে গেলাম, তখন তিনি বললেন, (এত দেরি কেন?) কীসে তোমাকে বন্দী করে রেখেছিল? আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ আমাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজ? আমি বললাম, এটা গোপনীয় কাজ (বলা যাবে না)। তিনি বললেন, (ঠিক আছে,) রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা কখনো কারও সামনে প্রকাশ করবে না। আনাস বলেন, হে সাবিত, (তাঁর ছাত্রের নাম, যাকে আনাস এ হাদিসটি বর্ণনা করেছিলেন) আল্লাহর কসম! সেই কাজ সম্পর্কে যদি আমি কাউকে বলে থাকতাম, আজ তোমাকে অবশ্যই তা বলতাম। '৪৭১
এখানে আনাস-এর মা যখন তার ছেলের মাঝে রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা রক্ষা করার দৃঢ়তা দেখলেন, তখন তা আরও পাকাপোক্ত করে দিলেন তিনি। কখনো কারও সামনে রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা ফাঁস না করার প্রতি উৎসাহিত করলেন। এজন্য আনাস কখনো কাউকে এ গোপনীয়তা ফাঁস করেননি। এমনকি তাবিয়ি সাবিত বুনানি-কেও বলেননি, যাকে তিনি এ হাদিসটি বর্ণনা করেছিলেন। গোপন বিষয় জানার সহজাত প্রবণতা আনাস-এর মাকে ছোট বাচ্চাকে ভুলিয়ে কথা বের করে নেওয়ার প্রতি লালায়িত করেনি। এটাই ইসলামের শিক্ষা। এই শিক্ষাই পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে মানুষকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করায়।
গোপনীয়তা প্রকাশ করা মানুষের অন্যতম খারাপ অভ্যাস। এ জীবনে যা জানা থাকে, সবই বলে দেওয়া যায় না। এমন কিছু বিষয়ও থাকে, যেগুলো গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখাই পুরুষত্ব ও মনুষ্যত্বের দাবি। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবন-সম্পর্কিত গোপনীয় বিষয় কারও সামনেই প্রকাশ করা যাবে না। এসব বিষয় কেবল সেই প্রকাশ করতে পারে, যার মাথায় গণ্ডগোল আছে এবং যার ব্যক্তিত্ব খুবই তরল ও পাতলা। এজন্যই এ ধরনের কথা রাখতে না পারা ব্যক্তিদের রাসুলুল্লাহ মন্দ লোকদের দলভুক্ত বলেছেন। আল্লাহর কাছে সর্বনিকৃষ্ট লোক এদেরকেই বলেছেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এমন লোক হবে, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়, অতঃপর সে স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়। '৪৭২
📄 তৃতীয় জনের উপস্থিতিতে দুজনে কানে কানে কথা বলে না
প্রকৃত মুসলমান মানুষের অনুভূতির মর্যাদা দেয়। মানুষের খারাপ লাগে এমন কাজ করা থেকে বেঁচে থাকে। এজন্য সে কথা বলার সময় খুব সতর্কতা ও বিচক্ষণতা অবলম্বন করে। কথা বলার সময় বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠতম দিক হলো, তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে সে কানে কানে কথা বলে না। এটা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةٌ، فَلَا يَتَنَاجَى رَجُلَانِ دُونَ الْآخَرِ حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ، أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ
'যখন তোমরা তিনজন হবে, তখন একজনকে বাদ দিয়ে দুজন ব্যক্তি কানে কানে কথা বলবে না, যতক্ষণ না মানুষের সাথে মিশে যাও। কারণ, এতে তৃতীয় ব্যক্তি কষ্ট পায়। '৪৭৩
ইসলাম যে মুসলমানের অনুভূতিকে শাণিত করেছে এবং যার মাঝে সৃষ্টি করেছে উন্নত মানসিকতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা, সে কখনো এমন স্থানে কানে কানে কথা বলে না, যেখানে তিনজনের বেশি মানুষ উপস্থিত না থাকে। যেন তৃতীয় ব্যক্তির অনুভূতিতে আঘাত না আসে। অবশ্য দুই ব্যক্তির কথা বলা খুব বেশি জরুরি হলে তৃতীয় জনের অনুমতি নিয়ে কথা বলা যায়। তবে কথা খুব সংক্ষেপ করতে হবে এবং তৃতীয় ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
সাহাবায়ে কিরাম—ইসলাম যাঁদের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করেছিল এবং ইসলামের চরিত্র ও শিক্ষা যাঁদের রক্তের সাথে মিশে গিয়েছিল—মানুষের সাথে সম্পর্ক ও দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয় থেকে কখনো উদাসীন থাকতেন না। অসংখ্য হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি ইমাম মালিক তাঁর রচিত মুয়াত্তায় আব্দুল্লাহ বিন দিনার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
আব্দুল্লাহ বিন দিনার বলেন:
كُنْتُ أَنَا وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ عِنْدَ دَارِ خَالِدِ بْنِ عُقْبَةَ الَّتِي بِالسُّوقِ، فَجَاءَ رَجُلٌ يُرِيدُ أَنْ يُنَاجِيَهُ، وَلَيْسَ مَعَ عَبْدُ اللهِ بن عمر أَحَدٌ غَيْرِي وَغَيْرُ الرَّجُلِ الَّذِي يُرِيدُ أَنْ يُنَاجِيَهُ، فَدَعَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ رَجُلًا حَتَّى كُنَّا أَرْبَعَةً، فَقَالَ لِي وَلِلرَّجُلِ الَّذِي دَعَا اسْتَأْخِرَا، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم يَقُولُ: لَا يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُونَ وَاحِدٍ.
‘আমি ও আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ খালিদ বিন উকবা রাঃ-এর বাড়ির নিকট ছিলাম। বাড়িটি বাজারের মধ্যে ছিল। এমন অবস্থায় এক ব্যক্তি এসে তার সাথে কানে কানে কথা বলতে চাইলেন। সেখানে ইবনে উমর রাঃ-এর সাথে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। তখন ইবনে উমর রাঃ আরেকজন ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন যেন আমরা চারজন হয়ে যাই। তারপর আমাকে এবং ডেকে আনা লোকটিকে বললেন, তোমরা এখানে থাকো। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, তৃতীয়জনকে বাদ দিয়ে দুই ব্যক্তি কানে কানে কথা বলো না। [৪৮৪
এখানে ইবনে উমর রাঃ তৃতীয় ব্যক্তির সামনে হঠাৎ আসা লোকটির সাথে কানে কানে কথা বলতে রাজি হননি; বরং আরেকজন লোক ডেকে চারজন করে তারপর কথা বললেন। কারণ, তৃতীয় ব্যক্তির সামনে দুই ব্যক্তি কানে কানে কথা বললে তৃতীয় ব্যক্তির কষ্ট হয়। তার অনুভূতিতে আঘাত লাগে। তাই তিনি প্র্যাক্টিক্যালি আমল করার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস সবাইকে শুনিয়ে প্রমাণ করে দিলেন, এটাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত।
📄 অহংকারী নয়
প্রকৃত মুসলমান অহংকারী নয়। মানুষকে অবজ্ঞা করে না। লজ্জা দেয় না। কারণ, কুরআনের বাণী তার কানে ও হৃদয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, এ নশ্বর পৃথিবীতে যারা অহংকারী, অবিনশ্বর আখিরাতে তাদের ধ্বংস অনিবার্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
‘এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। আর আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম। [৪৮৫
তার কানে এ বাণীও বাজে যে, আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না, যে মানুষকে অবজ্ঞা করে এবং দম্ভভরে পৃথিবীতে বিচরণ করে।
তিনি ইরশাদ করেন:
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
'অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।'৪৭৬
অন্তরসমূহ থেকে অহংকার সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য হাদিসে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, এ সম্পর্কিত হাদিসসমূহ অধ্যয়ন করলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। এসব হাদিসে অহংকারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়েছে। অণু পরিমাণ অহংকার থাকলেই আখিরাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। জান্নাত হারাম হয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
'যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি আরজ করলেন, মানুষ তো নিজের কাপড় ও জুতো উত্তম হওয়াকে পছন্দ করে! (তাহলে এটাও কি অহংকারের অন্তর্ভুক্ত হবে?) রাসুলুল্লাহ বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। (তাই এটাকে অহংকার বলা যাবে না। প্রকৃত অর্থে) অহংকার তো সত্যকে গোপন করা ও মানুষকে অবজ্ঞা করাকে বলা হয়।'৪৭৭
হারিসা বিন ওয়াহাব বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ قَالُوا : بَلَى، قَالَ: كُلُّ عُتُلٌ جَوَاطٍ مُسْتَكْبِرٍ 'আমি কি তোমাদের জাহান্নামবাসী লোকদের পরিচয় দেবো না? (তারা হলো) প্রত্যেক রুক্ষ স্বভাবের, দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তি। '৪৭৮
কিয়ামতের দিন অহংকারীদের লাঞ্ছনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সেদিন আল্লাহ তাআলা তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না। এটা হবে তাদের অহংকার ও দাম্ভিকতার মানসিক শাস্তি। এ শাস্তি শারীরিক শান্তির চেয়ে অনেকগুণ বেশি কষ্টদায়ক ও যন্ত্রণাদায়ক হবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: لَا يَنْظُرُ اللهُ يَوْمَ القِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا 'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির দিকে তাকাবেন না, যে ব্যক্তি অহংকারবশত তার নিম্নবস্ত্র মাটিতে হেঁচড়ে টেনে চলে। '৪৭৯
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন :
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ - قَالَ أَبُو مُعَاوِيَةَ: وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ - وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخُ زَانٍ، وَمَلِكُ كَذَّابٌ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرُ 'তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না (গুনাহ ক্ষমা করবেন না), তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হলো) এক. ব্যভিচারী বৃদ্ধ, দুই. মিথ্যুক শাসক, তিন. অহংকারী দরিদ্র। '৪৮০
অহংকার এত জঘন্য অপরাধ হওয়ার কারণ হলো, তা আল্লাহর একক বৈশিষ্ট্য। এটা মানবজাতির সাথে সম্পর্কিত কোনো বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব নয়। তাই যারা অহংকার করে, তারা যেন মানবত্বের সীমা ছাড়িয়ে প্রভুত্বের সীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে চায়। মহান প্রভুর একক অধিকার নিয়ে টানাটানি শুরু করে। ফলে তাদের কঠিন ও মর্মন্তুদ শাস্তি দেওয়া মোটেই অবিচার হবে না।
এ সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা বলেন :
الْعِزُّ إِزَارِي، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَانِي، فَمَنْ نَازَعَنِي بِشَيْءٍ مِنْهُمَا عَذَّبْتُهُ
'গৌরব আমার নিম্নবস্ত্র। অহংকার আমার চাদর। এ দুবিষয়ে যে ব্যক্তি আমার সাথে ঝগড়া করবে, তাকে আমি শাস্তি প্রদান করব। '৪৮১
এজন্য পবিত্র সুন্নাহর অসংখ্য জায়গায় মুমিনদের অহংকার পরিত্যাগ করার প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং তা বর্জন না করলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَعَظَّمَ فِي نَفْسِهِ ، أَوِ اخْتَالَ فِي مِشْيَتِهِ، لَقِيَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ
'যে নিজেকে বড় মনে করে অথবা দম্ভভরে চলাফেরা করে, সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন। '৪৮২
📄 বিনয়ী
অহংকারীদের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে যেমন অসংখ্য আয়াত ও হাদিস রয়েছে, তেমনই বিনয়ীদের পুরস্কারের ব্যাপারেও এমন অনেক বাণী রয়েছে। এতে বিনয়-নম্রতার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে আর বলা হয়েছে, যে যত বিনয়ী, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে তত বেশি। বিনয়-সম্পর্কিত নুসুস থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
مَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'কেউ আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করলে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।' ৪৮৩
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ اللهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ
'আল্লাহ তাআলা আমার নিকট এ মর্মে ওহি প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যেন তোমাদের একজন অপরজনের সাথে অহংকার না করে এবং একজন আরেকজনের প্রতি অন্যায় না করে।' ৪৮৪
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও মূর্তপ্রতীক। দয়া, বিনম্রতা ও উদারতা তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তিনি যখন খেলাধুলায় মত্ত শিশুদের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন তাদের সালাম দিতেন। তাদের সাথে উদারচিত্তে সহাস্যে কথা বলতেন। নবুওয়াতের শান এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা তাঁর বিনয়ী ও উদার আচরণ করায় প্রতিবন্ধক হতো না। এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে যে, একবার আনাস রা. বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও এমন করতেন।
আনাস রা. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিনয় সম্পর্কে আরেক হাদিসে বর্ণনা করেন :
إِنْ كَانَتِ الأَمَةُ مِنْ إِمَاءِ أَهْلِ المَدِينَةِ، لَتَأْخُذُ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَنْطَلِقُ بِهِ حَيْثُ شَاءَتْ
‘(রাসুলুল্লাহ এতই বিনয়ী ছিলেন যে,) মদিনার কোনো দাসী (নিজের প্রয়োজন জানানোর জন্য) রাসুলুল্লাহ -এর হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। '৪৮৫
তামিম বিন উসাইদ ইসলামের বিবিবিধান সম্পর্কে জানতে মদিনায় এলেন। একজন অপরিচিত ভিনদেশি হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি রাষ্ট্রের বাদশা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। রাসুলুল্লাহ মিম্বরে বসে লোকদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তামিম বিন উসাইদ সরাসরি রাসুলুল্লাহ -এর কাছে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করলেন। রাসুলুল্লাহ তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুবই বিনয় ও উদারতার সাথে তার জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন।
চলুন, বিস্তারিত ঘটনা খোদ তামিম বিন উসাইদ -এর মুখেই শুনি :
اِنْتَهَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَخْطُبُ، قَالَ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ رَجُلٌ غَرِيبٌ، جَاءَ يَسْأَلُ عَنْ دِينِهِ، لَا يَدْرِي مَا دِينُهُ، قَالَ: فَأَقْبَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَرَكَ خُطْبَتَهُ حَتَّى انْتَهَى إِلَيَّ، فَأُتِيَ بِكُرْسِيُّ، حَسِبْتُ قَوَائِمَهُ حَدِيدًا، قَالَ: فَقَعَدَ عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَجَعَلَ يُعَلِّمُنِي مِمَّا عَلَّمَهُ اللهُ، ثُمَّ أَتَى خُطْبَتَهُ، فَأَتَمَّ آخِرَهَا
‘আমি যখন নবিজি -এর নিকট আসলাম, তখন তিনি লোকদের ভাষণ দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, এক ভিনদেশি তার দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছে। সে দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তখন রাসুলুল্লাহ আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং ভাষণ বন্ধ করে আমার নিকট আসলেন। একটি চেয়ার এনে তাতে বসে আমাকে জ্ঞান দান করলেন, যা তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছেন। তারপর আবার লোকদের মাঝে ফিরে গিয়ে বাকি ভাষণ শেষ করলেন। '৪৮৬
বিনয়ের এ মহান গুণ-যা ব্যক্তির উদারতা, দয়া ও সাদা মনের পরিচয় দেয়-রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবিদের মাঝেও বিকশিত করার চেষ্টা করেছেন। তাই তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন:
لَوْ دُعِيتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ، وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعٌ أَوْ كُرَاعُ لَقَبِلْتُ
'আমাকে যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি খাওয়ারও দাওয়াত দেওয়া হয়, তবুও আমি সে দাওয়াত কবুল করি। আর যদি কেবল একটি হাত অথবা পায়ের একটি হাড্ডি হাদিয়া দেওয়া হয়, তা-ও আমি গ্রহণ করি। '৪৮৭
সুবহানাল্লাহ! বিনয়ের কী উজ্জ্বল নমুনা! উন্নত মনুষ্যত্বের কী জ্যোতির্ময় দৃষ্টান্ত! কী আলোকিত আদর্শ!