📄 মিথ্যা বলে না
প্রকৃত মুসলমান মিথ্যা কথা বলে না এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। কারণ, এটা হারাম। আল্লাহ বলেন :
وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
‘আর মিথ্যা কথন থেকে দূরে সরে থাকো।’৪৬১
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম তো বটেই, পাশাপাশি এটা ব্যক্তির পুরুষত্ব, আমানতদারিতা ও মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কাজেই এটা কখনো মুমিনদের স্বভাব হতে পারে না। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের মাঝে এ স্বভাব না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
‘আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।‘৪৬২
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া যে কত বড় মারাত্মক গুনাহ, তা আমরা রাসুলুল্লাহ -এর হাদিস থেকেও জানতে পারি, যেখানে তিনি আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্যতার পর সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ এটাকেই বলেছেন। তারপরও এর ভয়াবহতা বুঝাতে রাসুলুল্লাহ খুব উত্তেজিত হয়ে কয়েকবার করে বললেন এ কথা।
তিনি ইরশাদ করেছেন: أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ ثَلَاثًا، الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ - أَوْ قَوْلُ الرُّورِ - وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُتَّكِيًّا، فَجَلَسَ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا: لَيْتَهُ سَكَتَ
'আমি কি সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ কী, তা তোমাদের বলে দেবো না? (প্রশ্নটি তিনবার করলেন।) আমরা বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলেন, সেখান থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন, আরেকটি হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া-অথবা বললেন-মিথ্যা কথা বলা। (গুরুত্ব বুঝানোর উদ্দেশ্যে) শেষের কথাটি তিনি বারবার বলতে থাকলেন। একপর্যায়ে আমরা (তাঁর অবস্থা দেখে ভীত হয়ে মনেমনে) বলতে থাকলাম, ইশ্! তিনি যদি এবার চুপ হতেন!'৪৬৩
📄 নেতিবাচক ধারণা থেকে বেঁচে থাকে
প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি উত্তম গুণ হলো, সে কারও ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে না। সে নিজের কল্পনার লাগামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, যেন তা মানুষের দোষের পেছনে ছুটতে না পারে। কারণ, এর মাধ্যমে সে মানুষের ব্যাপারে এমন সব অপবাদ রটাতে শুরু করবে, যেগুলো তাদের মাঝে বিলকুল নেই। এ শিক্ষাই পবিত্র কুরআন আমাদের দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمُ
'হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গুনাহ। '৪৬৪
নেতিবাচক ধারণা ও বিচার-বিশ্লেষণ না করে কারও ব্যাপারে ধারণাপ্রসূত কথা বলা থেকে রাসুলুল্লাহ আরও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন: إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ
'তোমরা অবশ্যই কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা বলা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। '৪৬৫
অনুমাননির্ভর কথাকে রাসুলুল্লাহ সবচেয়ে বড় মিথ্যা আখ্যা দিয়েছেন। যেখানে প্রকৃত মুসলমান মিথ্যার গন্ধ পাওয়া যায়-এমন কথা থেকেও বিরত থাকে, সেখানে সবচেয়ে বড় মিথ্যায় নিজেকে জড়ানো তার পক্ষে কী করে সম্ভব!?
রাসুলুল্লাহ-এর শিক্ষা হলো, অনুমাননির্ভর কথা বলা থেকে বাঁচতে হবে। তদুপরি তিনি সেটাকে বলেছেন সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তাই প্রকৃত মুসলমান মানুষের বাহ্যিক কাজকর্মই শুধু দেখে, তাদের ভেতরের বিষয় নিয়ে কোনোরূপ ধারণা, সন্দেহ, সংশয় ইত্যাদি করা থেকে বেঁচে থাকে। কাজেই মানুষের গোপনীয় ও ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করা এবং তাদের প্রাইভেসিতে আঘাত করা কখনো একজন মুসলমানের স্বভাব হতে পারে না।
তাদের গোপন বিষয় সম্পর্কে যা করার তা আল্লাহ-ই করবেন। তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জানেন। মানুষের দায়িত্ব হলো, তারা শুধু বাইরেরটা দেখবে। আমাদের সালাফে সালিহিন—যাদের গায়ে ধুলোবালিমুক্ত দ্বীনের স্বচ্ছ বাতাস লেগেছিল—এমনটাই করতেন।
আব্দুর রাজ্জাক আব্দুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসউদ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন :
'আমি উমর-কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ -এর জীবদ্দশায় মানুষ ওহির মাধ্যমে ফয়সালা করতেন। এখন ওহি বন্ধ, তাই এখন তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখেই আমরা ফয়সালা করব। যার বাহ্যিক অবস্থা ভালো, তাকে নিরাপত্তা দেবো এবং কাছে টানব। তার ভেতরে কী আছে, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। তার ভেতরের বিষয়ের হিসাব-নিকাশ আল্লাহ করবেন। আর যার বাহ্যিক অবস্থা খারাপ, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমরা নেব না। সে যদি দাবি করে যে, তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো, আমরা তা বিশ্বাস করব না।'৪৬৬
এজন্যই প্রকৃত মুসলমান প্রতিটি শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার সময় খুবই সতর্ক থাকে। পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে কোনো ফয়সালা করে না। কারণ, আল্লাহর অমীয় এ বাণীটি সম্পর্কে কখনো সে বিস্মৃত হয় না : وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
'যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ—এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।'৪৬৭
মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার এ নিষেধবাণী প্রকৃত মুসলমান অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সুতরাং জ্ঞান ছাড়া সে কোনো কথা বলে না এবং নিশ্চিত না হয়ে কখনো কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে না।
মানুষের গোপনীয়তা অনুসন্ধান করা ও তাদের ব্যাপারে ধারণাপ্রসূত কথা বলার পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচতে হলে কুরআনের নিম্নোল্লিখিত আয়াতটি নিয়ে ফিকির করতে হবে। এ আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষের মুখ দিয়ে যে কথাই বের হোক, তা সাথে সাথে রেকর্ড করে নেওয়ার জন্য ফেরেশতা নিয়োজিত আছেন।
ইরশাদ হয়েছে: مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
'সে যে কথাই উচ্চারণ করুক, তা গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।'৪৬৮
যে মুসলমান এসব আয়াত ও হাদিসের অর্থ জানে, সে কথা বলার ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকে। মেপে মেপে কথা বলে। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার পূর্বে প্রতিটা শব্দ ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। কারণ, সে ইসলামের এ নির্দেশনা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে যে, কথা-ই অনেক সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাড়ায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ، مَا كَانَ يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، يَكْتُبُ اللهُ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ، مَا كَانَ يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ يَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ
'অনেক সময় মানুষ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এমন কথা বলে, সে কথা তাকে কোথায় পৌঁছে দেয়, তা সে জানেই না। সে কথার কারণে আল্লাহ তাআলা তার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন। আবার কোনো সময় আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এমন কথা কেউ বলে, সে কথা কোথায় গিয়ে ক্রিয়া করে, সে তা জানে না। সে কথার কারণে আল্লাহ তাআলা তার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত স্বীয় অসন্তুষ্টি লিখে দেন। '৪৬৯
ওপরের আলোচনা থেকে বুঝা গেল, কথা বলা কঠিন এক দায়িত্ব। আর শ্রুতিনির্ভর ও ধারণাপ্রসূত কথা নিয়ে বকবককারী জিহ্বার কারণে যে গুনাহ হয়, তা অনেক বড় গুনাহ।
মুত্তাকি ও স্বচ্ছ হৃদয়ের মুসলমান কখনো মানুষের আজেবাজে কথায় কান দেয় না। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে অসার কথা ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের সয়লাব প্রবহমান। এসব তাকে প্রভাবিত করে না। যাচাই বাছাই না করে শ্রুতিনির্ভর ও ধারণাপ্রসূত কোনো কথা সে বলে না। সে মনে করে, যাচাই বাছাই না করে যা শোনে, তাই বলে বেড়ানো নিষিদ্ধ মিথ্যা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ হাদিস শরিফে ইরশাদ করেছেন: كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
'যা শোনে তাই বলে বেড়ানো মানুষের মিথ্যুক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। '৪৭০
📄 গোপনীয়তা রক্ষাকারী
প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি উত্তম গুণ হলো, সে গোপনীয়তা রক্ষা করে। অন্যের গোপনীয়তা-যা তার কাছে আমানত রাখা হয়েছে-কারও সামনে প্রকাশ করে না। গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারা মানুষের পৌরুষ, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক। আর এটাই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও নারী-যাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শের অমীয় সুধা পান করেছেন এবং নিজেদের তাঁর আদর্শ অনুযায়ী পরিচলিত করেছেন-তাঁদের অন্যতম গুণ ছিল। তাঁদের অসংখ্য উত্তম গুণের মধ্যে এই গুণটিও ছিল। অগণিত সুন্দর অভ্যাসের মধ্যে এই অভ্যাসটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হাফসা রা.-এর স্বামী মারা যাওয়ার পর উমর রা. তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবু বকর রা. ও উসমান রা.-এর নিকট। তখন তারা সুকৌশলে এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ -এর একটি গোপন কথা রক্ষা করেছিলেন। এখান থেকে গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে সাহাবিগণ কতটা সুদৃঢ় ছিলেন, তা অনুমান করা যায়।
বিস্তারিত ঘটনা ইমাম বুখারি ইবনে উমর সূত্রে বর্ণনা করেছেন :
'উমর বলেন, আমার মেয়ে হাফসা -এর স্বামীর মৃত্যুর পর উসমান বিন আফফান -এর সাথে দেখা করে তার নিকট হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব করলাম। বললাম, আপনি রাজি থাকলে আমি হাফসা বিনতে উমর -কে আপনার সাথে বিবাহ দিতে চাই। তিনি বললেন, আমি একটু ভেবে দেখি। কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। তারপর আমার সাথে দেখা করে বললেন, আমার মনে হচ্ছে, আমার এ সময়ে বিয়ে করা ঠিক হবে না। তারপর আমি আবু বকর -এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তাকে বললাম, আপনি রাজি থাকলে আমি হাফসা বিনতে উমর -কে আপনার সাথে বিয়ে দিতে চাই। তিনি চুপ করে থাকলেন, কোনো উত্তর দিলেন না। এতে উসমান -এর চেয়ে তাঁর ওপর আমার বেশি রাগ আসলো। কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। তারপর রাসুলুল্লাহ হাফসাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন। আমি হাফসা -কে তাঁর সাথে বিয়ে দিয়ে দিলাম। তারপর আবু বকর আমার সাথে দেখা করে বললেন, আপনি হাফসা -কে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আর আমি কোনো উত্তর দিইনি—এতে আপনি মনে হয় আমার ওপর খুব রেগে আছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ হাফসা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন, আর রাসুলুল্লাহ -এর গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাক, তা আমি চাইনি। এজন্যই আপনাকে কোনো উত্তর দিইনি। যদি রাসুলুল্লাহ তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব না দিতেন, আমি অবশ্যই তাকে গ্রহণ করে নিতাম।
গোপনীয়তা রক্ষা করার এ গুণ শুধু সালাফের পুরুষদের মাঝে ছিল তা নয়, নারী ও শিশুদের মাঝেও ছিল, যারা ইসলামকে নিজেদের মাঝে দ্রবীভূত করে নিয়েছিলেন এবং যাদের হৃদয় ও বিবেক ইসলামের উজ্জ্বল নুর দ্বারা আলোকিত ছিল।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা সহিহ মুসলিমে আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: أَتَى عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَنَا أَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ، قَالَ: فَسَلَّمَ عَلَيْنَا، فَبَعَثَنِي إِلَى حَاجَةٍ، فَأَبْطَأْتُ عَلَى أُمِّي، فَلَمَّا جِئْتُ قَالَتْ: مَا حَبَسَكَ؟ قُلْتُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِحَاجَةٍ، قَالَتْ: مَا حَاجَتُهُ؟ قُلْتُ: إِنَّهَا سِرٌّ، قَالَتْ: لَا تُحَدِّثَنَّ بِسِرِّ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدًا قَالَ أَنَسُ: وَاللَّهِ لَوْ حَدَّثْتُ بِهِ أَحَدًا لَحَدَّثْتُكَ يَا ثَابِتُ
'আনাস বলেন, আমার নিকট রাসুলুল্লাহ আসলেন। তখন আমি (সমবয়সী) বালকদের সাথে খেলছিলাম। এসেই তিনি আমাদের সালাম দিলেন। তারপর আমাকে একটা কাজে পাঠালেন। এতে মায়ের কাছে পৌঁছতে আমার দেরি হলো। যখন তার কাছে গেলাম, তখন তিনি বললেন, (এত দেরি কেন?) কীসে তোমাকে বন্দী করে রেখেছিল? আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ আমাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজ? আমি বললাম, এটা গোপনীয় কাজ (বলা যাবে না)। তিনি বললেন, (ঠিক আছে,) রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা কখনো কারও সামনে প্রকাশ করবে না। আনাস বলেন, হে সাবিত, (তাঁর ছাত্রের নাম, যাকে আনাস এ হাদিসটি বর্ণনা করেছিলেন) আল্লাহর কসম! সেই কাজ সম্পর্কে যদি আমি কাউকে বলে থাকতাম, আজ তোমাকে অবশ্যই তা বলতাম। '৪৭১
এখানে আনাস-এর মা যখন তার ছেলের মাঝে রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা রক্ষা করার দৃঢ়তা দেখলেন, তখন তা আরও পাকাপোক্ত করে দিলেন তিনি। কখনো কারও সামনে রাসুলুল্লাহ-এর গোপনীয়তা ফাঁস না করার প্রতি উৎসাহিত করলেন। এজন্য আনাস কখনো কাউকে এ গোপনীয়তা ফাঁস করেননি। এমনকি তাবিয়ি সাবিত বুনানি-কেও বলেননি, যাকে তিনি এ হাদিসটি বর্ণনা করেছিলেন। গোপন বিষয় জানার সহজাত প্রবণতা আনাস-এর মাকে ছোট বাচ্চাকে ভুলিয়ে কথা বের করে নেওয়ার প্রতি লালায়িত করেনি। এটাই ইসলামের শিক্ষা। এই শিক্ষাই পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে মানুষকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করায়।
গোপনীয়তা প্রকাশ করা মানুষের অন্যতম খারাপ অভ্যাস। এ জীবনে যা জানা থাকে, সবই বলে দেওয়া যায় না। এমন কিছু বিষয়ও থাকে, যেগুলো গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রাখাই পুরুষত্ব ও মনুষ্যত্বের দাবি। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবন-সম্পর্কিত গোপনীয় বিষয় কারও সামনেই প্রকাশ করা যাবে না। এসব বিষয় কেবল সেই প্রকাশ করতে পারে, যার মাথায় গণ্ডগোল আছে এবং যার ব্যক্তিত্ব খুবই তরল ও পাতলা। এজন্যই এ ধরনের কথা রাখতে না পারা ব্যক্তিদের রাসুলুল্লাহ মন্দ লোকদের দলভুক্ত বলেছেন। আল্লাহর কাছে সর্বনিকৃষ্ট লোক এদেরকেই বলেছেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا
'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এমন লোক হবে, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়, অতঃপর সে স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়। '৪৭২
📄 তৃতীয় জনের উপস্থিতিতে দুজনে কানে কানে কথা বলে না
প্রকৃত মুসলমান মানুষের অনুভূতির মর্যাদা দেয়। মানুষের খারাপ লাগে এমন কাজ করা থেকে বেঁচে থাকে। এজন্য সে কথা বলার সময় খুব সতর্কতা ও বিচক্ষণতা অবলম্বন করে। কথা বলার সময় বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠতম দিক হলো, তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে সে কানে কানে কথা বলে না। এটা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةٌ، فَلَا يَتَنَاجَى رَجُلَانِ دُونَ الْآخَرِ حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ، أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ
'যখন তোমরা তিনজন হবে, তখন একজনকে বাদ দিয়ে দুজন ব্যক্তি কানে কানে কথা বলবে না, যতক্ষণ না মানুষের সাথে মিশে যাও। কারণ, এতে তৃতীয় ব্যক্তি কষ্ট পায়। '৪৭৩
ইসলাম যে মুসলমানের অনুভূতিকে শাণিত করেছে এবং যার মাঝে সৃষ্টি করেছে উন্নত মানসিকতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা, সে কখনো এমন স্থানে কানে কানে কথা বলে না, যেখানে তিনজনের বেশি মানুষ উপস্থিত না থাকে। যেন তৃতীয় ব্যক্তির অনুভূতিতে আঘাত না আসে। অবশ্য দুই ব্যক্তির কথা বলা খুব বেশি জরুরি হলে তৃতীয় জনের অনুমতি নিয়ে কথা বলা যায়। তবে কথা খুব সংক্ষেপ করতে হবে এবং তৃতীয় ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
সাহাবায়ে কিরাম—ইসলাম যাঁদের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করেছিল এবং ইসলামের চরিত্র ও শিক্ষা যাঁদের রক্তের সাথে মিশে গিয়েছিল—মানুষের সাথে সম্পর্ক ও দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয় থেকে কখনো উদাসীন থাকতেন না। অসংখ্য হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি ইমাম মালিক তাঁর রচিত মুয়াত্তায় আব্দুল্লাহ বিন দিনার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
আব্দুল্লাহ বিন দিনার বলেন:
كُنْتُ أَنَا وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ عِنْدَ دَارِ خَالِدِ بْنِ عُقْبَةَ الَّتِي بِالسُّوقِ، فَجَاءَ رَجُلٌ يُرِيدُ أَنْ يُنَاجِيَهُ، وَلَيْسَ مَعَ عَبْدُ اللهِ بن عمر أَحَدٌ غَيْرِي وَغَيْرُ الرَّجُلِ الَّذِي يُرِيدُ أَنْ يُنَاجِيَهُ، فَدَعَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ رَجُلًا حَتَّى كُنَّا أَرْبَعَةً، فَقَالَ لِي وَلِلرَّجُلِ الَّذِي دَعَا اسْتَأْخِرَا، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم يَقُولُ: لَا يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُونَ وَاحِدٍ.
‘আমি ও আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ খালিদ বিন উকবা রাঃ-এর বাড়ির নিকট ছিলাম। বাড়িটি বাজারের মধ্যে ছিল। এমন অবস্থায় এক ব্যক্তি এসে তার সাথে কানে কানে কথা বলতে চাইলেন। সেখানে ইবনে উমর রাঃ-এর সাথে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। তখন ইবনে উমর রাঃ আরেকজন ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন যেন আমরা চারজন হয়ে যাই। তারপর আমাকে এবং ডেকে আনা লোকটিকে বললেন, তোমরা এখানে থাকো। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, তৃতীয়জনকে বাদ দিয়ে দুই ব্যক্তি কানে কানে কথা বলো না। [৪৮৪
এখানে ইবনে উমর রাঃ তৃতীয় ব্যক্তির সামনে হঠাৎ আসা লোকটির সাথে কানে কানে কথা বলতে রাজি হননি; বরং আরেকজন লোক ডেকে চারজন করে তারপর কথা বললেন। কারণ, তৃতীয় ব্যক্তির সামনে দুই ব্যক্তি কানে কানে কথা বললে তৃতীয় ব্যক্তির কষ্ট হয়। তার অনুভূতিতে আঘাত লাগে। তাই তিনি প্র্যাক্টিক্যালি আমল করার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস সবাইকে শুনিয়ে প্রমাণ করে দিলেন, এটাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত।