📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 লাজুক ও দোষ গোপনকারী

📄 লাজুক ও দোষ গোপনকারী


প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম উত্তম গুণ হলো, সে লাজুক ও গোপনকারী হয়ে থাকে। ইসলামি সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তা সে চায় না। কেননা, মানুষের দোষ চর্চা করে তাদের ইজ্জত-আবরুর ক্ষতি করে, এ ধরনের অনিষ্টকারী লোকদের জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি এসেছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
'যারা পছন্দ করে যে, ইমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। '৪৪৪
এজন্যই যে ব্যক্তি সমাজে অশ্লীলতার খবর প্রকাশ করে, সেও অশ্লীলতাকারীর সমান পাপের ভাগী হবে।
এ সম্পর্কে আলি বিন আবু তালিব থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :
الْقَائِلُ الْفَاحِشَةَ، وَالَّذِي يُشِيعُ بِهَا، فِي الْإِثْمِ سَوَاءٌ
'অশ্লীল কথা যে বলে এবং যে তা প্রকাশ করে—দুজনই সমান অপরাধী।'৪৪৫
ইসলামি সমাজের সদস্যকে লাজুক ও দোষ গোপনকারী হতে হবে। ছোট ছোট অপরাধ থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ইসলাম তাকে এ শিক্ষা দেয় যে, সে নিজের এবং অন্যের কোনো অপরাধ মানুষের সামনে প্রকাশ করবে না। বাইরে বাইরে বলে বেড়াবে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا المُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ المُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ، فَيَقُولَ: يَا فُلَانُ، عَمِلْتُ البَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
'আমার সকল উম্মত মাফ পাবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। নিশ্চয় এ বড়ই ধৃষ্টতা যে, কোনো ব্যক্তি রাতে অপরাধ করল, যা আল্লাহ তাআলা গোপন রাখলেন, কিন্তু ভোর হলে সে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক, আমি আজ রাতে এমন এমন কর্ম করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত অতিবাহিত করল যে, আল্লাহ তার কর্ম গোপন রেখেছিলেন, আর ভোরে উঠে সে তার ওপর থেকে আল্লাহর পর্দা খুলে ফেলল।'৪৪৬
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَسْتُرُ عَبْدُ عَبْدًا فِي الدُّنْيَا، إِلَّا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'দুনিয়াতে যে বান্দা অপর বান্দার দোষ গোপন করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।'৪৪৭
একদল লোক উকবা বিন আমির -এর নিকট এসে বলল:
إِنَّ لَنَا جِيرَانًا يَشْرَبُونَ وَيَفْعَلُونَ، أَفَنَرْفَعُهُمْ إِلَى الْإِمَامِ؟ قَالَ: لَا ، سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ رَأَى مِنْ مُسْلِمٍ عَوْرَةٌ فَسَتَرَهَا، كَانَ كَمَنْ أَحْيَا مَوْءُودَةٌ مِنْ قَبْرِهَا
'আমাদের কিছু প্রতিবেশী মদ পান করে এবং খারাপ কর্ম করে। তাদের কি আমরা ইমামের (রাষ্ট্রপ্রধানের) হাতে তুলে দেবো? তিনি বললেন, তা কোরো না। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ দেখার পর তা গোপন রাখল, সে যেন জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা মেয়ে শিশুকে জীবিত উদ্ধার করল।'৪৪৮
মানুষের মাঝে যে মানবিক দুর্বলতাগুলো থাকে, সেগুলোর চিকিৎসা করার জন্য গোপনীয়তা অবলম্বন করা চাই। লোকসম্মুখে তাদের দোষত্রুটি ও অপরাধ ফাঁস করে দিলে চিকিৎসা হবে না। এতে হিতে বিপরীত হবে। এর কার্যকর চিকিৎসা করতে হলে উত্তম উপায়ে তাদের কানে সত্যের বাণী শুনিয়ে দিতে হবে। তাদের সামনে ইবাদতকে সুন্দররূপে এবং গুনাহকে কদর্যরূপে তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, নম্রতা হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিনয়ভাব সৃষ্টি করে। মন নরম করে দেয়। এজন্যই ইসলাম আড়ি পাতা ও গোয়েন্দাগিরি করতে নিষেধ করেছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন: وَلَا تَجَسَّسُوْا 'তোমরা মানুষের দোষ অন্বেষণ কোরো না।'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর নিকট এক ব্যক্তিকে আনা হলো এবং তার ব্যাপারে বলা হলো:
هَذَا فُلَانٌ تَقْطُرُ لِحِيَتُهُ خَمْرًا، فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ: «إِنَّا قَدْ نُهِينَا عَنِ التَّجَسُّسِ وَلَكِنْ إِنْ يَظْهَرْ لَنَا شَيْءٌ نَأْخُذْ بِهِ»
'এ লোকটার দাড়ি থেকে শরাব ঝরে ঝরে পড়ে (অর্থাৎ অতিরিক্ত মদ্যপান করে)। তখন তিনি বললেন, মানুষের দোষ অন্বেষণ করতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমাদের সামনে যা স্পষ্টরূপে প্রকাশ পায়, আমরা তার শাস্তি কার্যকর করি। '৪৪৯
এর কারণ হলো, মুসলমানদের দোষ খুঁজে বেড়ালে এবং তাদের পেছনে গোয়েন্দার মতো লেগে থেকে তাদের দুর্বলতা ও গোপন অপরাধগুলো প্রকাশ করে দিলে তাদের খুব কষ্ট হয়। সমাজের জন্যও এটা ক্ষতিকর। কারণ, বিভিন্ন অপরাধের কথা যখন সমাজের মানুষের মাঝে চর্চা হতে থাকে, তখন এক সময় তা মানুষের সামনে সাধারণ বিষয় মনে হয়। এভাবে নিঃশব্দে সেই অপরাধ অন্যের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া অন্যের গোপনীয়তা ফাঁস করলে সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা বেড়ে যায়। ঝগড়া-ফাসাদ বৃদ্ধি পায়।
এ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّكَ إِنِ اتَّبَعْتَ عَوْرَاتِ النَّاسِ أَفْسَدْتَهُمْ، أَوْ كِدْتَ أَنْ تُفْسِدَهُمْ
'তুমি যদি مسلمانوں দোষ খুঁজে বেড়াও, তাহলে তুমি তাদের ধ্বংস করে দিচ্ছ, অথবা অচিরেই ধ্বংস করে দেবে। '৪৫০
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের ইজ্জত-আবরুর পেছনে পড়া ও তাদের দোষ খুঁজে বেড়ানো থেকে مسلمانوںকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তিনি বলেন: لَا تُؤْذُوا عِبَادَ اللهِ، وَلَا تُعَيّرُوهُمْ، وَلَا تَطْلُبُوا عَوْرَاتِهِمْ؛ فَإِنَّهُ مَنْ طَلَبَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ طَلَبَ اللهُ عَوْرَتَهُ حَتَّى يَفْضَحَهُ فِي بَيْتِهِ
'আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দিয়ো না, তাদের লজ্জিত কোরো না, তাদের দোষ খুঁজে বেড়িও না। কেননা, যে ব্যক্তি মুসলমানের দোষ খুঁজে বেড়াবে, আল্লাহ তার দোষ খুঁজবেন এবং এক পর্যায়ে তাকে নিজের বাড়িতেই লাঞ্ছিত করবেন।'৪৫১
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস -এর রিওয়ায়াতে এদের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর আরও কঠোরতা বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন :
خَطَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خُطْبَةً أَسْمَعَ الْعَوَائِقَ فِي خُدُورِهِنَّ فَقَالَ: «يَا مَعْشَرَ مَنْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ، لَا تُؤْذُوا الْمُؤْمِنِينَ، وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ، فَإِنَّهُ مَنْ يَتَّبِعْ عَوْرَةَ أَخِيهِ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ، وَلَوْ فِي جَوْفِ بَيْتِهِ
'রাসুলুল্লাহ একদিন এমনভাবে খুতবা দিলেন যে, তা অন্দরমহলের মেয়েরা পর্যন্ত শুনতে পেল। তিনি বললেন, যারা মুখে ইমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ইমান প্রবেশ করেনি, তারা শোনো! মুমিনদের কষ্ট দিয়ো না এবং তাদের গোপন দোষ-ত্রুটি খুঁজো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের গোপন দোষ খোঁজার পেছনে পড়ে, আল্লাহ তার গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেন। যে অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন; যদিও সে নিজের ঘরে অবস্থান করুক।'৪৫২
এখানে অন্যের দোষচর্চাকারীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ -এর কঠোরতা লক্ষ করুন। তিনি বলেছেন, যারা মুখে ইমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ইমান প্রবেশ করেনি! যে গুনাহের কারণে তিনি অন্তরকে ইমানশূন্য বলেছেন, সে গুনাহ কত মারাত্মক হতে পারে? লোকেরা তা ছোট মনে করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর নিকট অনেক বড় সে গুনাহ।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না

📄 অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না


প্রকৃত মুসলমান—যে উত্তম ইসলাম পালনে আগ্রহী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে উদগ্রীব—কখনো অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়সমূহে নাক গলায় না। যা-ই বলা হয় এবং যা-ই প্রচারিত হয়, সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করে না। কারণ, ইসলাম তাকে এসব সস্তা পরচর্চা ও বে-ফায়দা ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
'বে-ফায়দা বিষয় বর্জন করা মানুষের উত্তম ইসলামি চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।' ৪৫৩
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا ، وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلَاثًا، فَيَرْضَى لَكُمْ: أَنْ تَعْبُدُوهُ، وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا، وَيَكْرَهُ لَكُمْ: قِيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةِ الْمَالِ
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের তিন কাজের প্রতি সন্তুষ্ট, আর তিন কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট। তোমরা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না এবং সম্মিলিতভাবে তাঁর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরবে আর বিচ্ছিন্ন হবে না—তোমাদের এ তিন কাজের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। সব বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন, অধিক প্রশ্ন করা ও ধন-সম্পদ ধ্বংস করা—এ তিন কাজের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট।' ৪৫৪
যে সমাজ ইসলামের দেওয়া রূপরেখা অনুযায়ী চলে, সে সমাজে সব বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন, অধিক প্রশ্ন এবং মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়সমূহে অন্যের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, এ সমাজের যারা সদস্য, তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও বড় দায়িত্বে মশগুল থাকে। তারা জমিনে আল্লাহর কালিমা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর বিধানের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় ব্রত থাকে। তারা আল্লাহর বিধান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অবিরাম পরিশ্রম করে যায়। এসব বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে যারা ব্যস্ত থাকে, তাদের ওই সব বাজে কাজ করার সময় কোথায়?

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 গিবত ও চোগলখোরি থেকে দূরে থাকে

📄 গিবত ও চোগলখোরি থেকে দূরে থাকে


প্রকৃত মুসলমান গিবত (পরনিন্দা) ও চোগলখোরি (পরচর্চা) থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। কারণ, তার ভেতর যে ইসলামি মূল্যবোধ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, তা-ই তাকে এসব বাজে কাজ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। তা ছাড়া কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলে যে উন্নত নীতিবোধ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা সে অবলম্বন করে; আর যেসব অনৈতিক বিষয় থেকে নিষেধ করা হয়েছে, সেসব থেকে বেঁচে থাকে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন :
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابُ رَحِيمُ
'তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত, তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।'৪৫৫
প্রকৃত মুসলমান যখন আয়াতটি পড়ে, তখন গিবত বা পরনিন্দার প্রতি তার অন্তরে প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মায়। পরনিন্দাকারীকে আল্লাহ মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণকারীর সাথে তুলনা করেছেন—এ বিষয়টা তার ভেতর ভীতির সঞ্চার করে। তাই কখনো সে কারও গিবত করে ফেললে সাথে সাথে তাওবা করে নেয়। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা তাওবার প্রতি যে ইঙ্গিত করেছেন, তা এজন্যই করেছেন, যেন কেউ গিবত করে ফেললে দ্রুতই তাওবা করে নেয়।
প্রকৃত মুসলমান নিজেকে রাসুলুল্লাহ -এর নিম্নের হাদিস অনুযায়ী গড়ে তোলে। হাদিসটি হলো: إِنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّ الْمُسْلِمِينَ خَيْرٌ؟ قَالَ: مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
'এক প্রশ্নকারী রাসুলুল্লাহ -কে প্রশ্ন করলেন, সর্বোত্তম মুসলমান কে? উত্তরে তিনি বললেন, যার জিহ্বা (কথা) ও হাত (কাজ) থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।'৪৫৬
এজন্য প্রকৃত মুসলমান নিজেকে কখনো গিবত বা পরনিন্দার মতো জঘন্য কাজে জড়ায় না। সমাজের কাউকে কোনোরূপ কষ্ট দেয় না; বরং এক ধাপ এগিয়ে সে মানুষের গিবতের লক্ষ্যবস্তু হওয়া মুসলমান ভাইকে উদ্ধার করে নেয়। তার ব্যাপারে বলা খারাপ কথাগুলোর প্রতিবাদ করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ উম্মতকে এ শিক্ষাই দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: مَنْ ذَبَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ بِالْمَغِيبِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَعْتِقَهُ مِنَ النَّارِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার ইজ্জত-আবরুর ওপর আসা আঘাত প্রতিহত করে, আল্লাহর ওপর তার অধিকার হলো, তাকে তিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।'৪৫৭
প্রকৃত মুসলমান সমাজে চোগলখোরি বা পরচর্চা করে না। কারণ, তার ধর্ম তার মাঝে এ বোধ সৃষ্টি করে দিয়েছে যে, পরনিন্দাকারীরা হলো সমাজের নিকৃষ্ট জীব। মানুষের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি করা ও বন্ধুত্বের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই।
মুসনাদে আহমাদে আসমা বিনতে ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخِيَارِكُمْ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا، ذُكِرَ اللَّهُ تَعَالَى ثُمَّ قَالَ: أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشِرَارِكُمْ الْمَشَّاءُونَ بِالنَّمِيمَةِ، الْمُفْسِدُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ، الْبَاغُونَ لِلْبُرَاءِ الْعَنَتَ
'আমি কি বলব না, তোমাদের মাঝে কারা উত্তম? সাহাবিগণ বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, যাদের দেখলে আল্লাহকে স্মরণ হয় (তারা উত্তম)। তারপর বললেন, আমি কি বলব না, তোমাদের মাঝে সর্বনিকৃষ্ট কারা? যারা পরচর্চা করে, বন্ধুদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করে এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের দোষ তালাশ করে বেড়ায়, তারাই হলো সর্বনিকৃষ্ট। '৪৫৮
চোগলখোর বা পরচর্চাকারীদের দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর আখিরাতের কঠোর পরিণতির প্রমাণের জন্য নিম্নোল্লিখিত একটি হাদিসই যথেষ্ট। যদি তারা নিজেদের এ পাপকর্ম থেকে ফিরে না আসে, তাহলে এ হাদিসটি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সকল পথই রুদ্ধ করে দেয়।
হাদিসটি হলো :
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامُ
'পরচর্চাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।'৪৫৯
এ ছাড়াও পরচর্চাকারীকে কবরে রাখার পর থেকেই তার ওপর নেমে আসে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক আজাব। বুখারি-মুসলিমসহ অনেক হাদিসগ্রন্থে ইবনে আব্বাস সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
مَرَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرَيْنِ، فَقَالَ: إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ، وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا هَذَا: فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَأَمَّا هَذَا: فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ، ثُمَّ دَعَا بِعَسِيبٍ رَطْبٍ فَشَقَّهُ بِاثْنَيْنِ، فَغَرَسَ عَلَى هَذَا وَاحِدًا، وَعَلَى هَذَا وَاحِدًا، ثُمَّ قَالَ: «لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا»
‘রাসুলুল্লাহ ﷺ দুটি কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন। তখন বললেন, এ দুই কবরবাসীর ওপর আজাব হচ্ছে। বড় কোনো অপরাধের কারণে তাদের আজাব হচ্ছে এমন নয়। এদের একজন পরচর্চা করে বেড়াত। অপরজন প্রস্রাব করে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করত না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ কাঁচা খেজুরের একটি ডাল আনিয়ে তা দুই টুকরো করলেন। তারপর উভয় কবরের ওপর একটি করে গেঁড়ে দিলেন। তারপর বললেন, অন্তত এ দুই ডال শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আজাব একটু নমনীয় হওয়ার আশা করা যায়।’৪৬০

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মিথ্যা বলে না

📄 মিথ্যা বলে না


প্রকৃত মুসলমান মিথ্যা কথা বলে না এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। কারণ, এটা হারাম। আল্লাহ বলেন :
وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
‘আর মিথ্যা কথন থেকে দূরে সরে থাকো।’৪৬১
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হারাম তো বটেই, পাশাপাশি এটা ব্যক্তির পুরুষত্ব, আমানতদারিতা ও মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কাজেই এটা কখনো মুমিনদের স্বভাব হতে পারে না। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের মাঝে এ স্বভাব না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেন :
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
‘আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।‘৪৬২
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া যে কত বড় মারাত্মক গুনাহ, তা আমরা রাসুলুল্লাহ -এর হাদিস থেকেও জানতে পারি, যেখানে তিনি আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্যতার পর সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ এটাকেই বলেছেন। তারপরও এর ভয়াবহতা বুঝাতে রাসুলুল্লাহ খুব উত্তেজিত হয়ে কয়েকবার করে বললেন এ কথা।
তিনি ইরশাদ করেছেন: أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ ثَلَاثًا، الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ - أَوْ قَوْلُ الرُّورِ - وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُتَّكِيًّا، فَجَلَسَ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا: لَيْتَهُ سَكَتَ
'আমি কি সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ কী, তা তোমাদের বলে দেবো না? (প্রশ্নটি তিনবার করলেন।) আমরা বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলেন, সেখান থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন, আরেকটি হচ্ছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া-অথবা বললেন-মিথ্যা কথা বলা। (গুরুত্ব বুঝানোর উদ্দেশ্যে) শেষের কথাটি তিনি বারবার বলতে থাকলেন। একপর্যায়ে আমরা (তাঁর অবস্থা দেখে ভীত হয়ে মনেমনে) বলতে থাকলাম, ইশ্! তিনি যদি এবার চুপ হতেন!'৪৬৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00