📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল
নম্রতা ও উদারতা প্রকাশের জন্য মানুষের সাথে সহাস্যবদনে কথা বলা জরুরি। এটিও স্বতন্ত্র একটি উত্তম গুণ ও উত্তম আমল। ইসলাম মানুষকে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেন: لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
'কোনো উত্তম আমলকে তুচ্ছ মনে কোরো না; যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার মতো (ছোট আমল) হোক।'৪১৫
সহিহাইনে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: مَا حَجَبَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَآنِي
'আমি যখনই রাসুলুল্লাহ -কে সালাম দিয়েছি, কোনোবারেই তিনি আমাকে জবাব না দিয়ে থাকেননি। আর আমাকে দেখে সর্বদাই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন।'৪১৬
যে সমাজ পারস্পরিক ভালোবাসা, উদারতা ও সহাস্য দেখা-সাক্ষাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেটিই আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ। সে সমাজে মানুষকে সম্মান করা হয়। উত্তম চরিত্রের মূল্যায়ন করা হয়। উন্নত মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে মানুষ মূল্যায়িত হয়। এটাই ইসলামি সমাজ। সমাজজীবনের এ রূপরেখাই ইসলাম দিয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব সমাজে চরিত্রের কোনো দাম নেই, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আলাদা কোনো মূল্যায়ন নেই; বরং জাগতিক বিষয় ও ধন-সম্পদের ওপর মানুষের মূল্যায়ন করা হয়, তা বস্তুবাদী সমাজ; ইসলামি সমাজ নয়। এ সমাজে ঐক্য থাকে না। থাকে না তাতে কোনো নিরাপত্তা ও শান্তির হাওয়া।
📄 রসিক
প্রকৃত মুসলমান একটু রসিক প্রকৃতির হয়। তবে রসিকতার ক্ষেত্রে কখনো সীমালঙ্ঘন করে না। এ ধরনের রসিকতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরের সাথে বৈধতার সীমার ভেতর থেকে রসিকতা করতেন।
একদিন সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন:
قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا؟ قَالَ: «إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا»
'আপনি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন। তিনি বললেন, সব সময় সত্য কথাই তো বলি। (অর্থাৎ রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিই না।)'৪১৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করতেন, তবে রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। সাহাবায়ে কিরামও এমনই ছিলেন। বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের মাঝে কৌতুক ও রসিকতার ঘটনা বিবৃত হয়েছে।
তন্মধ্যে একটি ঘটনা বিভিন্ন সিরাত ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু উমাইর নামে একটি শিশুর সাথে প্রায় সময় রসিকতা করতেন। তার একটি পাখি ছিল, যার সাথে সে খেলা করত। একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে চিন্তিত দেখতে পেয়ে বললেন, কী ব্যাপার? আবু উমাইরকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? সাহাবিগণ বললেন, তার খেলার সাথি নুগাইর পাখিটি মারা গেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে রসিকতা করে বলতে লাগলেন, আবু উমাইর, কী করল নুগাইর?'৪১৯
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি উট চাইল।' রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করে তাকে বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দেবো। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, উষ্ট্রীর বাচ্চার ওপর আমি কী করে সওয়ার হব? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, (বড়) উট কি তাহলে উষ্ট্রীর বাচ্চা নয়?'৪২০
ইমাম আহমাদ আনাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, জাহির নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি গ্রাম থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য হাদিয়া পাঠাতেন। (একদিন হাদিয়া দিয়ে) যখন তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য বের হতে লাগলেন, তখন রাসুলুল্লাহ তার জন্য সামান তৈরি করে দিতে দিতে বললেন, নিশ্চয় জাহির আমাদের গ্রাম্য ভাই, আর আমরা তার শহুরে ভাই। রাসুলুল্লাহ তাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি দেখতে খুব কুৎসিত ছিলেন। একদিন রাসুলুল্লাহ তার কাছে গেলেন, তখন তিনি মালপত্র বিক্রি করছিলেন। রাসুলুল্লাহ পেছন দিক থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি কে বুঝতে না পেরে বললেন, এই, কে রে, আমাকে ছেড়ে দাও বলছি! পরে ফিরে যখন রাসুলুল্লাহ -কে চিনতে পারলেন, তখন তার পিঠের যে অংশ রাসুলুল্লাহ -এর বক্ষের সাথে লেগেছে, সে অংশের প্রতি খুব আগ্রহী হয়ে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, এই গোলামটিকে কেনার কেউ আছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, শপথ করে বলছি, আমার দাম অনেক সস্তা হবে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তুমি মোটেই স্বল্পমূল্যের নও। অথবা বলেছেন, আল্লাহর নিকট তোমার মূল্য অনেক বেশি। '৪২১
এক বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে জান্নাত দান করেন। রাসুলুল্লাহ কৌতুক করে বললেন, হে অমুকের মা, কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না! তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে বলো যে, বৃদ্ধারা বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে যাবে না। কেননা, আল্লাহ বলেছেন, 'আমি জান্নাতি রমণীগণকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী।'
আয়িশা বলেন, কোনো এক সফরে আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে ছিলাম। আমি তখন খুব হালকা গড়নের কিশোরী ছিলাম। (যাওয়ার পথে একসময়) রাসুলুল্লাহ লোকদের বললেন, তোমরা আগে আগে চলো। তারা আগে চলে গেলেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি জিতলাম। রাসুলুল্লাহ কিছুই বলেননি। এরপর (কিছু কাল অতিক্রম হলে) আমি মোটা হলাম এবং প্রতিযোগিতার ঘটনাটি ভুলে গেলাম। তারপর আরেক সফরে আমি তাঁর সাথে বের হলাম। (চলার পথে) তিনি লোকদের বললেন, তোমরা সামনে চলতে থাকো। তারা সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। এবার আমি হেরে গেলাম। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আগের হারের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।'
সাহাবায়ে কিরামও পরস্পর রসিকতা করতেন। এটাকে তারা খারাপ মনে করতেন না। কেননা, তারা স্বয়ং তাদের নেতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তা করতে দেখেছেন। তিনি তাদের সাথে রসিকতা করতেন। প্রাণবন্ত হয়ে কথা বলতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের মাঝে এসব ছিল বলেই সে যুগটা এতটা সুন্দর ও সুখের ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে রুক্ষতা চলে এসেছে, তখন থেকে মুসলিম সমাজের শান্তি ক্রমেই বিনষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইমাম বুখারি রহ. আল-আদাবুল মুফরাদে বকর বিন আব্দুল্লাহ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَتَبَادَحُونَ بالبطيخ، فإِذا كانَتِ الحَقَائِقُ كَانُوا هُمُ الرِّجَالُ
'নবিজি ﷺ-এর সাহাবিগণ তো একে অপরের প্রতি তরমুজ নিক্ষেপ করেও রসিকতা করতেন। কিন্তু যখন তাঁরা কঠোর বাস্তবতার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁরা বীরপুরুষই প্রতিপন্ন হতেন। (অর্থাৎ অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতেন।) '৪২২
এটাই ইসলাম-সমর্থিত রসিকতা। এখানে রসিকতা করতে গিয়ে হকের পথ থেকে বিচ্যুত হতে হয় না। পৌরুষের বহ্নিশিখা নিভে যায় না। এ রসিকতা কেবল অন্তরের বিনোদনের জন্য এবং মন ফ্রেশ করার জন্য করা হয়।
মজার বিষয় হলো, সাহাবায়ে কিরামের অনেক রসিকতায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ হেসে দিতেন। এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ রহ. উম্মে সালামা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর রা. বসরার উদ্দেশে সফরে বের হলেন। তাঁর সাথে নুয়াইমান রা. ও সুয়াইবিত বিন হারমালা রা.-ও ছিলেন। উভয়ই ছিলেন বদরি। সাহাবি। (সফরের) পাথেয় সুয়াইবিত -এর হাতে ছিল। তাই নুয়াইমান তাঁকে বললেন, আমাকে কিছু খাওয়ান। তিনি বললেন, আবু বকর আসুক, তারপর খাওয়াব। নুয়াইমান রসিকপ্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি লোকদের নিকট গিয়ে বললেন, তোমরা কি আমার থেকে একটা দক্ষ আরবি গোলাম ক্রয় করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, কিনব। তিনি বললেন, গোলামটি ভালোই কথা বলতে পারে, তাই নিজেকে স্বাধীনও দাবি করতে পারে। এটা মাথায় নিয়ে তোমরা যদি তাকে ছেড়ে দাও, তাহলে আমাকে দোষ দিতে যেয়ো না আবার। তারা বলল, না, না, আমরা (তার কথায় কর্ণপাত করব না) তাকে আমরা কিনবই। অতঃপর তারা তাকে দশটি উটের বিনিময়ে কিনে নিল। তারপর তিনি উটগুলোকে হাঁকিয়ে আনতে আনতে (সুয়াইবিত -এর দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এই হলো তোমাদের ক্রয়কৃত গোলাম। সুয়াইবিত বলতে লাগলেন, এ মিথ্যা বলছে, আমি স্বাধীন। লোকেরা বলল, আমরা তোমার ব্যাপারে আগে থেকেই জানি বাপু! বলেই তারা তার গলায় রশি বেঁধে তাকে নিয়ে গেল। তখন আবু বকর আসলেন। তিনি খবর পেয়ে সঙ্গীদের নিয়ে তাদের নিকট গিয়ে উটগুলো ফিরিয়ে দিয়ে তাকে মুক্ত করে আনলেন। এ খবর যখন রাসুলুল্লাহ -কে জানানো হয়, তখন তিনি খুব হাসলেন। সাহাবিরাও তাঁর সাথে হাসলেন। '৪২৩
এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ -এর নিকট আসলেন। তিনি মসজিদের পাশে উটটি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলেন। কয়েকজন সাহাবি নুয়াইমান বিন আমর আনসারি -কে বললেন, তুমি যদি এই উটটিকে জবাই করে দিতে, তাহলে আমরা গোশত খেতে পারতাম। আমাদের খুব গোশত খেতে ইচ্ছে করছে। মূল্য নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, তা রাসুলুল্লাহ চুকিয়ে দেবেন। নুয়াইমান উটটি জবাই করে দিলেন। বেদুইন লোকটি বের হয়ে যখন তার বাহনের এমন হাল দেখলেন, তখন চিৎকার দিয়ে উঠলেন, হায় আমার উট, হে মুহাম্মাদ! রাসুলুল্লাহ বের হয়ে এলেন। বললেন, এটা কার কাজ? সাহাবিগণ বললেন, নুয়াইমান করেছে। কারণ দর্শানোর জন্য তাকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিলেন রাসুলুল্লাহ। তাকে দুবাআ বিনতে জুবাইর -এর বাড়িতে পাওয়া গেল। সেখানে তিনি একটি গর্তে লুকিয়ে ওপরে খেজুর গাছের পাতা ও ডালপালা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি সেদিকে আঙুল দ্বারা ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিলেন, কিন্তু মুখে বড় আওয়াজে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে দেখিনি। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সেখান থেকে বের করে আনলেন। খেজুর পাতা ও ডালপালা লেগে তার চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, তুমি এমন কাজ করতে গেলে কেন? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যারা আপনাকে আমার ব্যাপারে অবহিত করেছে, তারাই আমাকে তা করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন তার চেহারা মুছতে মুছতে হেসে দিলেন। তারপর তিনিই উটের মূল্য চুকিয়ে দিলেন। '৪২৪
উপর্যুক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা এ কথা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়ে গেল যে, ইসলাম চায়, তার অনুসারীরা অন্তরের বিনোদনের জন্য একটু কৌতুক করুক, একটু রসিকতা করুক। কেননা, রসিকতা মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে নরম ও কোমল করে তোলে, যা মানুষের হৃদয়সমূহ জয় করে নিতে সক্ষম হয়। এ ধরনের ব্যক্তিসত্তা মুসলমানদের মাঝে থাকাটা আজ খুব জরুরি।
টিকাঃ
৪১৮. চড়ুই পাখির মতো দেখতে একটি ছোট্ট পাখি। (অনুবাদক)
📄 সহনশীল
প্রকৃত মুসলমান সহনশীল ও রাগ হজমকারী হয়ে থাকে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'আর যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '৪২৫
এর কারণ হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে শক্ত পেশিবহুল শরীরের অধিকারী এবং লোকদের মল্লযুদ্ধে অনায়াসে হারিয়ে দেওয়া ব্যক্তি বাহাদুর নয়। বাহাদুর তো সে ব্যক্তি, যে রাগের সময় ধৈর্য ধরতে পারে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ
'(মল্লযুদ্ধে প্রতিপক্ষকে) ধরাশায়ী করতে পারা ব্যক্তি বাহাদুর নয়; বরং বাহাদুর তো সে ব্যক্তি, সে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। '৪২৬
রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তির বীরত্ব ও পৌরুষের মানদণ্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আছে বলে রাগের মাথায় যা ইচ্ছা তাই করা চরম নির্বুদ্ধিতা ও অপরিণামদর্শিতা। এতে কোনো বীরত্ব নেই। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকার পরও রাগ হজম করে নিলে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলে অনেক ফিতনা ও ঝগড়া শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। লক্ষ্য অর্জনের পথ মসৃণ হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হয়। এজন্যই এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট উপদেশ চাইলে তিনি তাকে কেবল একটি উপদেশই দিলেন যে, রাগ কোরো না। কয়েকবার আবেদন করলে প্রতিবারেই রাসুলুল্লাহ ﷺ এ একটি বাক্যই বললেন, রাগ কোরো না। ৪২৭
এর কারণ হলো, এ একটি বাক্যেই সকল উত্তম গুণ নিহিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ আব্দুল কাইস গোত্রের আশাজ-কে বললেন:
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ
'তোমার ভেতর দুটি গুণ আছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন। গুণ দুটি হলো, সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা। '৪২৮
প্রকৃত মুসলমানও রাগান্বিত হয়, তবে তা নিজ স্বার্থের জন্য নয়; বরং আল্লাহর জন্যই কেবল সে রাগান্বিত হয়। আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত আসলে, দ্বীনের নিদর্শনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখলে কিংবা আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘিত হতে দেখলে তার রাগ চরমে ওঠে। সীমালঙ্ঘনকারী, অপরাধী, আল্লাহর মর্যাদায় আঘাতকারী এবং আল্লাহর দ্বীন নিয়ে তামাশাকারী লোকেরা তার রাগের আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসের ভাষ্যমতে রাসুলুল্লাহ -ও হুবহু এমনই ছিলেন।
বর্ণিত হয়েছে : 'রাসুলুল্লাহ নিজের স্বার্থের জন্য প্রতিশোধ নিতেন না। তবে যখন আল্লাহর মর্যাদা বিনষ্ট হয়-এমন কিছু প্রত্যক্ষ করতেন, তখন আল্লাহর জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন।'
দ্বীনের সুখ্যাতি বিনষ্ট হয়-এমন কিছু দেখলে, দ্বীনের বিধান পালন করার ক্ষেত্রে ভুল হতে দেখলে বা দ্বীনের হুদুদ কায়েম করার ব্যাপারে শিথিলতা করতে দেখলে রাসুলুল্লাহ রাগন্বিত হতেন। তাঁর মুবারক চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যেত।
সেদিন রাসুলুল্লাহ -এর খুব রাগ এসেছিল, যেদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলেছিলেন, অমুক লোকের কারণে আমি ফজরের নামাজে দেরিতে উপস্থিত হই। কারণ, সে খুব লম্বা কিরাআত পাঠ করে। সেদিনের মতো আর কোনোদিনের ওয়াজে রাসুলুল্লাহ -কে এত রাগান্বিত হতে কেউ দেখেনি। তিনি বললেন :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِينَ، فَمَنْ أَمَّ النَّاسَ فَلْيَتَجَوَّزْ، فَإِنَّ خَلْفَهُ الضَّعِيفَ وَالكَبِيرَ وَذَا الحَاجَةِ
'হে লোকসকল, তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা মানুষদের ভাগিয়ে দেয়। তোমাদের যে কেউ ইমামতি করবে, সে যেন নামাজ সংক্ষেপ করে। কেননা, তার পেছনে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) এবং বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত লোক থাকে। ১৪২৯
সেদিন রাসুলুল্লাহ খুব রাগান্বিত হয়েছিলেন, যেদিন তিনি সফর থেকে ফিরে আয়িশা -এর ঘরে একটি পাতলা চাদর দেখতে পেয়েছিলেন, যেটার ওপর ছবি আঁকা ছিল। দেখার পর তিনি সাথে সাথে তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং রাগে তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। এরপর বললেন :
يَا عَائِشَةُ أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللهِ
'হে আয়িশা, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি তাদের হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতিকৃতি তৈরি করে।'৪৩০
সেদিনও রাসুলুল্লাহ -এর খুব রাগ এসেছিল, যেদিন উসামা বিন জাইদ মাখজুম গোত্রের জনৈকা মহিলার পক্ষে তাঁর নিকট সুপারিশ করেছিলেন। মহিলাটি চুরি করেছিল। রাসুলুল্লাহ তার ওপর হদ (শরিয়ত নির্ধারিত হাত কাটার শাস্তি) প্রয়োগ করার দৃঢ় সংকল্প করলেন। লোকেরা বলল, এই মেয়ের পক্ষে রাসুলুল্লাহ -এর সামনে কথা বলার কি কেউ নেই? তারা বলল, রাসুলুল্লাহ -এর প্রিয়পাত্র একমাত্র উসামা বিন জাইদ-ই বলতে পারবেন। তখন উসামা কথা বললেন। এতে রাসুলুল্লাহ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন :
أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللهِ؟ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ، فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمِ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمِ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا
'তুমি কি আল্লাহর হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? তারপর তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা এজন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের সম্ভ্রান্ত কোনো লোক চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার ওপর হদ জারি করত!
আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবুও আমি তার হাত কেটে ফেলতাম। '৪৩১
এমনিই ছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রাগান্বিত হওয়ার কারণ। ইসলামি শরিয়তে রাগান্বিত হওয়ার মাপকাঠিও এটাই। অর্থাৎ রাগ করতে হবে আল্লাহর জন্য; নিজ স্বার্থের জন্য নয়।
📄 গালিগালাজ ও অশ্লীল কথা থেকে বিরত থাকে
মুসলমান যখন রাগ নিয়ন্ত্রণ করার গুণ অর্জন করে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার জবান থেকে গালিগালাজ, অসংলগ্ন ও অশ্লীল কথাবার্তা বের হয় না। এ গুণটি মুসলমানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের জিহ্বা গালিগালাজ ও অশ্লীল ভাষা থেকে মুক্ত থাকা চাই। ইসলাম বিভিন্ন ভাষায় এ গুণ অর্জন করার প্রতি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেছে।
আবু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرُ
'মুসলমানকে গালি দেওয়া ফিসকি (অর্থাৎ কবিরা গুনাহ), আর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরি।'৪৩২
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন: إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ فَاحِشِ مُتَفَحِّشٍ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সকল অশ্লীলভাষী ব্যক্তিকে অপছন্দ করেন। '৪৩৩
অন্য হাদিসে বলেন: وَإِنَّ اللَّهَ لَيُبْغِضُ الفَاحِشَ البَدِيءَ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অশ্লীলভাষী ও দুশ্চরিত্র লোককে ঘৃণা করেন। '৪৩৪
আরেক হাদিসে বলেন: لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَانِ، وَلَا اللَّعَانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَدِيءِ
'মুমিন অধিক নিন্দাকারী, অধিক অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী ও দুশ্চরিত্র নয়। '৪৩৫
যে মুসলমান ইমানি শোভায় শোভিত, ইসলামের উদারনীতি যাকে স্পর্শ করেছে, তার উচিত এসব খারাপ অভ্যাস থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা। প্রকৃত মুসলমান যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মহান আদর্শের মাঝে দেখতে পায় যে, তিনি কোনোদিন এমন কথা উচ্চারণ করেননি, যা শুনতে খারাপ লাগে বা শ্রোতার আবেগ ও মর্যাদায় আঘাত হানে, তখন সে এসব খারাপ অভ্যাস থেকে আরও দূরত্ব বজায় রেখে চলে।
আনাস বলেন: لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm فَاحِشًا، وَلَا لَعَانًا، وَلَا سَبَّابًا، كَانَ يَقُولُ عِنْدَ المَعْتَبَةِ: «مَا لَهُ تَرِبَ جَبِينُهُ»
'রাসুলুল্লাহ ﷺ অশ্লীলভাষী ছিলেন না, অধিক অভিসম্পাত করতেন না, গালিগালাজ করতেন না। কাউকে শাসানোর প্রয়োজন হলে বলতেন, কী হলো তার? ধুলায় মিশ্রিত হোক৪৩৬ তার কপাল!'৪৩৭
এমনকি রাসুলুল্লাহ ﷺ কাফিরদের—যাদের অন্তরসমূহ তাঁর দাওয়াত ঠেকাতে রুদ্ধ করে রেখেছিল—অভিশাপ দেওয়া থেকেও বিরত থাকতেন।
আবু হুরাইরা বলেন: قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ، ادْعُ اللَّهَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ، قَالَ: «إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعَانًا، وَلَكِنْ بُعِثْتُ رَحْمَةٌ
'রাসুলুল্লাহ-কে বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, মুশরিকদের জন্য বদদুআ করুন। তিনি বললেন, আমি অভিশাপকারী হিসাবে প্রেরিত হইনি; বরং রহমত হিসাবে প্রেরিত হয়েছি। '৪৩৮
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন :
أُتِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ، قَالَ: «اضْرِبُوهُ» قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: فَمِنَّا الضَّارِبُ بِيَدِهِ، وَالضَّارِبُ بِنَعْلِهِ، وَالضَّارِبُ بِثَوْبِهِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ، قَالَ بَعْضُ القَوْمِ : أَخْرَاكَ اللَّهُ، قَالَ: «لَا تَقُولُوا هَكَذَا، لَا تُعِينُوا عَلَيْهِ الشَّيْطَانَ»
'এক ব্যক্তি মদ পান করল। তাকে নবিজি-এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি লোকদের বললেন, একে প্রহার করো। তখন আমাদের কেউ হাত দিয়ে, কেউ জুতা দিয়ে, আবার কেউ কাপড় দিয়ে তাকে পিটাতে লাগলাম। যখন সে নড়াচড়া করতে লাগল, তখন কেউ কেউ তাকে বলল, তোকে আল্লাহ লাঞ্ছিত করুক। তখন নবিজি বললেন, এমন কথা বলো না এবং তার ব্যাপারে শয়তানকে সহযোগিতা করো না। '৪৩৯
মানবিকতার কী প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত! মানুষ গোমরাহ ও চরম পাপিষ্ঠ হতে পারে, কিন্তু রাসুলুল্লাহ তার প্রতিও অভিসম্পাত করতেন না।
অন্তরসমূহ থেকে মন্দ কাজের প্রবণতা, হিংসা, শত্রুতা ইত্যাদি খারাপ অভ্যাসের মূল উপড়ে ফেলার জন্য রাসুলুল্লাহ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
এজন্য মুসলমানদের সামনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি কথার মাধ্যমে মানুষের সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত হানবে, তার পরিণতি খুব ভয়াবহ হবে। তার সকল ভালো কর্মের ওপর গালিগালাজ, দোষচর্চা ও জুলুম-অত্যাচার প্রকট হয়ে দেখা দেবে। তখন সে দেউলিয়া ও রিক্তহস্ত হয়ে যাবে। জাহান্নামের আগুন থেকে তাকে বাঁচানোর কেউ থাকবে না।
এ সম্পর্কিত হাদিসটি হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ ؟ قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ، فَقَالَ: «إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَلاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةِ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ»
'তোমরা কি জান দেউলিয়া ও কাঙাল কে? লোকেরা বলল, আমাদের মধ্যে তো কাঙাল ওই ব্যক্তি, যার না আছে কোনো টাকা-পয়সা আর না আছে কোনো আসবাবপত্র। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে তারাই কাঙাল ও দেউলিয়া, যারা কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, পাশাপাশি দুনিয়ায় সে কাউকে গালি দিয়ে এসেছে, কাউকে হয়তো মিথ্যা দোষারোপ করে এসেছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে মেরে দিয়েছে। এসব মাজলুমদের মধ্যে তার সব নেক আমল বণ্টন করে দেওয়া হবে। এরপর যদি তার সব পুণ্য শেষ হয়ে যায় এবং মাজলুমদের পাওনা তখনও বাকি থেকে থাকে, তাহলে ওদের পাপ তার ভাগে ফেলে দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।'880
তাই মুসলমানদের এমন তুচ্ছ কাজ ও ঝগড়া-ফাসাদ থেকে বিরত থাকতে হবে, যেগুলো গালিগালাজ ও অশ্লীল ভাষার দিকে নিয়ে যায়। এ বিষয়গুলোই মুসলমানদের সমাজ ধ্বংস করার জন্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রকৃত ইসলামি ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজের সদস্যরা গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে, তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত সকল শব্দের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই তাদের মুখ থেকে কখনো খারাপ কথা বের হতে চাইলে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে; রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটি স্মরণ করে: الْمُسْتَبَّانِ مَا قَالَا، فَعَلَى الْبَادِي، حَتَّى يَعْتَدِيَ الْمَظْلُومُ ‘ঝগড়ারত দুই ব্যক্তি পরস্পরকে যত (খারাপ) কথা বলে, উভয়জনের কথার পাপ ঝগড়া সূচনাকারীর ঘাড়ে চাপবে; অবশ্য যদি মাজলুম সীমালঙ্ঘন না করে থাকে।’৪৪১
তাই প্রকৃত মুসলিম নিজের জিহ্বাকে গালিগালাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখে, যদিও তার যথাযথ কারণ পাওয়া যায়। রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখে, যেন গুনাহে পতিত না হতে হয়। অনুরূপ সে অত্যাচারী হওয়া থেকেও বিরত থাকে।
প্রকৃত মুসলমান জীবিতদের গালি দেওয়া থেকে যেমন বিরত থাকে, তেমনই মৃতদের প্রতিও তার জিহ্বা সংযত রাখে। কিন্তু নির্বোধ মূর্খরা জীবিতদের গালিগালাজ তো করেই, মৃতদেরও রেহাই দেয় না। অথচ রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: لَا تَسُبُّوا الأَمْوَاتَ، فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوا ‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ো না। কেননা, তারা যা (দুনিয়ার জীবনে ভালো-মন্দ আমল) পেশ করেছে, তার নিকট তা পৌঁছে গেছে।’৪৪২
টিকাঃ
৪৩৬. এ অংশের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এ শব্দের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির জন্য দুআ করতেন, যেন সে বেশি করে সিজদা করার মাধ্যমে তার কপাল ধুলামিশ্রিত করতে পারে, যেখানে তার পরিশুদ্ধি ও হিদায়াত নিহিত আছে। (অনুবাদক)