📄 উদারচিত্তের অধিকারী
প্রকৃত মুসলমান মানুষদের সাথে লেনদেনে উদারতার পরিচয় দেয়। কারণ, সে জানে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণ অর্জন করার জন্য উদারতার বিকল্প নেই। তার উদারচিত্ততার কারণে মানুষ তাকে হৃদয়ে জায়গা দেয়। তাকে ভালোবাসে। আল্লাহও এ গুণের কারণে তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং তার প্রতি দয়া করেন। বিভিন্ন হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: رَحِمَ اللهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى 'বেচাকেনা ও দাবি-দাওয়ার সময় যে ব্যক্তি উদারতার পরিচয় দেয়, আল্লাহ তার প্রতি রহম করেন। '৪১৩
আবু মাসউদ আনসারি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : حُوسِبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ: قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ 'তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনো প্রকার ভালো আমল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল সচ্ছল। তাই দরিদ্র লোকদের প্রতি উদার থাকার জন্য সে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিত। রাসুলুল্লাহ বলেন, আল্লাহ বললেন, এ ব্যাপারে (অর্থাৎ উদারতার ব্যাপারে) আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।'৪১৪
দেখুন, আমল পরিমাপের মানদণ্ডে এই গুণটির কত ওজন! কিয়ামতের দিন মানুষ এ গুণটির প্রতি কত মুখাপেক্ষী হবে! আমাদের ভেতর কি এ গুণটি আছে?
📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল
নম্রতা ও উদারতা প্রকাশের জন্য মানুষের সাথে সহাস্যবদনে কথা বলা জরুরি। এটিও স্বতন্ত্র একটি উত্তম গুণ ও উত্তম আমল। ইসলাম মানুষকে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেন: لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
'কোনো উত্তম আমলকে তুচ্ছ মনে কোরো না; যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার মতো (ছোট আমল) হোক।'৪১৫
সহিহাইনে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: مَا حَجَبَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَآنِي
'আমি যখনই রাসুলুল্লাহ -কে সালাম দিয়েছি, কোনোবারেই তিনি আমাকে জবাব না দিয়ে থাকেননি। আর আমাকে দেখে সর্বদাই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন।'৪১৬
যে সমাজ পারস্পরিক ভালোবাসা, উদারতা ও সহাস্য দেখা-সাক্ষাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেটিই আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ। সে সমাজে মানুষকে সম্মান করা হয়। উত্তম চরিত্রের মূল্যায়ন করা হয়। উন্নত মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে মানুষ মূল্যায়িত হয়। এটাই ইসলামি সমাজ। সমাজজীবনের এ রূপরেখাই ইসলাম দিয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব সমাজে চরিত্রের কোনো দাম নেই, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আলাদা কোনো মূল্যায়ন নেই; বরং জাগতিক বিষয় ও ধন-সম্পদের ওপর মানুষের মূল্যায়ন করা হয়, তা বস্তুবাদী সমাজ; ইসলামি সমাজ নয়। এ সমাজে ঐক্য থাকে না। থাকে না তাতে কোনো নিরাপত্তা ও শান্তির হাওয়া।
📄 রসিক
প্রকৃত মুসলমান একটু রসিক প্রকৃতির হয়। তবে রসিকতার ক্ষেত্রে কখনো সীমালঙ্ঘন করে না। এ ধরনের রসিকতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরের সাথে বৈধতার সীমার ভেতর থেকে রসিকতা করতেন।
একদিন সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন:
قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا؟ قَالَ: «إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا»
'আপনি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন। তিনি বললেন, সব সময় সত্য কথাই তো বলি। (অর্থাৎ রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিই না।)'৪১৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করতেন, তবে রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। সাহাবায়ে কিরামও এমনই ছিলেন। বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের মাঝে কৌতুক ও রসিকতার ঘটনা বিবৃত হয়েছে।
তন্মধ্যে একটি ঘটনা বিভিন্ন সিরাত ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু উমাইর নামে একটি শিশুর সাথে প্রায় সময় রসিকতা করতেন। তার একটি পাখি ছিল, যার সাথে সে খেলা করত। একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে চিন্তিত দেখতে পেয়ে বললেন, কী ব্যাপার? আবু উমাইরকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? সাহাবিগণ বললেন, তার খেলার সাথি নুগাইর পাখিটি মারা গেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে রসিকতা করে বলতে লাগলেন, আবু উমাইর, কী করল নুগাইর?'৪১৯
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি উট চাইল।' রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করে তাকে বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দেবো। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, উষ্ট্রীর বাচ্চার ওপর আমি কী করে সওয়ার হব? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, (বড়) উট কি তাহলে উষ্ট্রীর বাচ্চা নয়?'৪২০
ইমাম আহমাদ আনাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, জাহির নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি গ্রাম থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য হাদিয়া পাঠাতেন। (একদিন হাদিয়া দিয়ে) যখন তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য বের হতে লাগলেন, তখন রাসুলুল্লাহ তার জন্য সামান তৈরি করে দিতে দিতে বললেন, নিশ্চয় জাহির আমাদের গ্রাম্য ভাই, আর আমরা তার শহুরে ভাই। রাসুলুল্লাহ তাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি দেখতে খুব কুৎসিত ছিলেন। একদিন রাসুলুল্লাহ তার কাছে গেলেন, তখন তিনি মালপত্র বিক্রি করছিলেন। রাসুলুল্লাহ পেছন দিক থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি কে বুঝতে না পেরে বললেন, এই, কে রে, আমাকে ছেড়ে দাও বলছি! পরে ফিরে যখন রাসুলুল্লাহ -কে চিনতে পারলেন, তখন তার পিঠের যে অংশ রাসুলুল্লাহ -এর বক্ষের সাথে লেগেছে, সে অংশের প্রতি খুব আগ্রহী হয়ে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, এই গোলামটিকে কেনার কেউ আছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, শপথ করে বলছি, আমার দাম অনেক সস্তা হবে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তুমি মোটেই স্বল্পমূল্যের নও। অথবা বলেছেন, আল্লাহর নিকট তোমার মূল্য অনেক বেশি। '৪২১
এক বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে জান্নাত দান করেন। রাসুলুল্লাহ কৌতুক করে বললেন, হে অমুকের মা, কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না! তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে বলো যে, বৃদ্ধারা বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে যাবে না। কেননা, আল্লাহ বলেছেন, 'আমি জান্নাতি রমণীগণকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী।'
আয়িশা বলেন, কোনো এক সফরে আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে ছিলাম। আমি তখন খুব হালকা গড়নের কিশোরী ছিলাম। (যাওয়ার পথে একসময়) রাসুলুল্লাহ লোকদের বললেন, তোমরা আগে আগে চলো। তারা আগে চলে গেলেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি জিতলাম। রাসুলুল্লাহ কিছুই বলেননি। এরপর (কিছু কাল অতিক্রম হলে) আমি মোটা হলাম এবং প্রতিযোগিতার ঘটনাটি ভুলে গেলাম। তারপর আরেক সফরে আমি তাঁর সাথে বের হলাম। (চলার পথে) তিনি লোকদের বললেন, তোমরা সামনে চলতে থাকো। তারা সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। এবার আমি হেরে গেলাম। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আগের হারের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।'
সাহাবায়ে কিরামও পরস্পর রসিকতা করতেন। এটাকে তারা খারাপ মনে করতেন না। কেননা, তারা স্বয়ং তাদের নেতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তা করতে দেখেছেন। তিনি তাদের সাথে রসিকতা করতেন। প্রাণবন্ত হয়ে কথা বলতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের মাঝে এসব ছিল বলেই সে যুগটা এতটা সুন্দর ও সুখের ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে রুক্ষতা চলে এসেছে, তখন থেকে মুসলিম সমাজের শান্তি ক্রমেই বিনষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইমাম বুখারি রহ. আল-আদাবুল মুফরাদে বকর বিন আব্দুল্লাহ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَتَبَادَحُونَ بالبطيخ، فإِذا كانَتِ الحَقَائِقُ كَانُوا هُمُ الرِّجَالُ
'নবিজি ﷺ-এর সাহাবিগণ তো একে অপরের প্রতি তরমুজ নিক্ষেপ করেও রসিকতা করতেন। কিন্তু যখন তাঁরা কঠোর বাস্তবতার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁরা বীরপুরুষই প্রতিপন্ন হতেন। (অর্থাৎ অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতেন।) '৪২২
এটাই ইসলাম-সমর্থিত রসিকতা। এখানে রসিকতা করতে গিয়ে হকের পথ থেকে বিচ্যুত হতে হয় না। পৌরুষের বহ্নিশিখা নিভে যায় না। এ রসিকতা কেবল অন্তরের বিনোদনের জন্য এবং মন ফ্রেশ করার জন্য করা হয়।
মজার বিষয় হলো, সাহাবায়ে কিরামের অনেক রসিকতায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ হেসে দিতেন। এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ রহ. উম্মে সালামা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর রা. বসরার উদ্দেশে সফরে বের হলেন। তাঁর সাথে নুয়াইমান রা. ও সুয়াইবিত বিন হারমালা রা.-ও ছিলেন। উভয়ই ছিলেন বদরি। সাহাবি। (সফরের) পাথেয় সুয়াইবিত -এর হাতে ছিল। তাই নুয়াইমান তাঁকে বললেন, আমাকে কিছু খাওয়ান। তিনি বললেন, আবু বকর আসুক, তারপর খাওয়াব। নুয়াইমান রসিকপ্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি লোকদের নিকট গিয়ে বললেন, তোমরা কি আমার থেকে একটা দক্ষ আরবি গোলাম ক্রয় করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, কিনব। তিনি বললেন, গোলামটি ভালোই কথা বলতে পারে, তাই নিজেকে স্বাধীনও দাবি করতে পারে। এটা মাথায় নিয়ে তোমরা যদি তাকে ছেড়ে দাও, তাহলে আমাকে দোষ দিতে যেয়ো না আবার। তারা বলল, না, না, আমরা (তার কথায় কর্ণপাত করব না) তাকে আমরা কিনবই। অতঃপর তারা তাকে দশটি উটের বিনিময়ে কিনে নিল। তারপর তিনি উটগুলোকে হাঁকিয়ে আনতে আনতে (সুয়াইবিত -এর দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এই হলো তোমাদের ক্রয়কৃত গোলাম। সুয়াইবিত বলতে লাগলেন, এ মিথ্যা বলছে, আমি স্বাধীন। লোকেরা বলল, আমরা তোমার ব্যাপারে আগে থেকেই জানি বাপু! বলেই তারা তার গলায় রশি বেঁধে তাকে নিয়ে গেল। তখন আবু বকর আসলেন। তিনি খবর পেয়ে সঙ্গীদের নিয়ে তাদের নিকট গিয়ে উটগুলো ফিরিয়ে দিয়ে তাকে মুক্ত করে আনলেন। এ খবর যখন রাসুলুল্লাহ -কে জানানো হয়, তখন তিনি খুব হাসলেন। সাহাবিরাও তাঁর সাথে হাসলেন। '৪২৩
এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ -এর নিকট আসলেন। তিনি মসজিদের পাশে উটটি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলেন। কয়েকজন সাহাবি নুয়াইমান বিন আমর আনসারি -কে বললেন, তুমি যদি এই উটটিকে জবাই করে দিতে, তাহলে আমরা গোশত খেতে পারতাম। আমাদের খুব গোশত খেতে ইচ্ছে করছে। মূল্য নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, তা রাসুলুল্লাহ চুকিয়ে দেবেন। নুয়াইমান উটটি জবাই করে দিলেন। বেদুইন লোকটি বের হয়ে যখন তার বাহনের এমন হাল দেখলেন, তখন চিৎকার দিয়ে উঠলেন, হায় আমার উট, হে মুহাম্মাদ! রাসুলুল্লাহ বের হয়ে এলেন। বললেন, এটা কার কাজ? সাহাবিগণ বললেন, নুয়াইমান করেছে। কারণ দর্শানোর জন্য তাকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিলেন রাসুলুল্লাহ। তাকে দুবাআ বিনতে জুবাইর -এর বাড়িতে পাওয়া গেল। সেখানে তিনি একটি গর্তে লুকিয়ে ওপরে খেজুর গাছের পাতা ও ডালপালা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি সেদিকে আঙুল দ্বারা ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিলেন, কিন্তু মুখে বড় আওয়াজে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে দেখিনি। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সেখান থেকে বের করে আনলেন। খেজুর পাতা ও ডালপালা লেগে তার চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, তুমি এমন কাজ করতে গেলে কেন? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যারা আপনাকে আমার ব্যাপারে অবহিত করেছে, তারাই আমাকে তা করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন তার চেহারা মুছতে মুছতে হেসে দিলেন। তারপর তিনিই উটের মূল্য চুকিয়ে দিলেন। '৪২৪
উপর্যুক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা এ কথা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়ে গেল যে, ইসলাম চায়, তার অনুসারীরা অন্তরের বিনোদনের জন্য একটু কৌতুক করুক, একটু রসিকতা করুক। কেননা, রসিকতা মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে নরম ও কোমল করে তোলে, যা মানুষের হৃদয়সমূহ জয় করে নিতে সক্ষম হয়। এ ধরনের ব্যক্তিসত্তা মুসলমানদের মাঝে থাকাটা আজ খুব জরুরি।
টিকাঃ
৪১৮. চড়ুই পাখির মতো দেখতে একটি ছোট্ট পাখি। (অনুবাদক)
📄 সহনশীল
প্রকৃত মুসলমান সহনশীল ও রাগ হজমকারী হয়ে থাকে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'আর যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '৪২৫
এর কারণ হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে শক্ত পেশিবহুল শরীরের অধিকারী এবং লোকদের মল্লযুদ্ধে অনায়াসে হারিয়ে দেওয়া ব্যক্তি বাহাদুর নয়। বাহাদুর তো সে ব্যক্তি, যে রাগের সময় ধৈর্য ধরতে পারে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ
'(মল্লযুদ্ধে প্রতিপক্ষকে) ধরাশায়ী করতে পারা ব্যক্তি বাহাদুর নয়; বরং বাহাদুর তো সে ব্যক্তি, সে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। '৪২৬
রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তির বীরত্ব ও পৌরুষের মানদণ্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আছে বলে রাগের মাথায় যা ইচ্ছা তাই করা চরম নির্বুদ্ধিতা ও অপরিণামদর্শিতা। এতে কোনো বীরত্ব নেই। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকার পরও রাগ হজম করে নিলে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলে অনেক ফিতনা ও ঝগড়া শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। লক্ষ্য অর্জনের পথ মসৃণ হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হয়। এজন্যই এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট উপদেশ চাইলে তিনি তাকে কেবল একটি উপদেশই দিলেন যে, রাগ কোরো না। কয়েকবার আবেদন করলে প্রতিবারেই রাসুলুল্লাহ ﷺ এ একটি বাক্যই বললেন, রাগ কোরো না। ৪২৭
এর কারণ হলো, এ একটি বাক্যেই সকল উত্তম গুণ নিহিত আছে।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ আব্দুল কাইস গোত্রের আশাজ-কে বললেন:
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ، وَالْأَنَاةُ
'তোমার ভেতর দুটি গুণ আছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন। গুণ দুটি হলো, সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা। '৪২৮
প্রকৃত মুসলমানও রাগান্বিত হয়, তবে তা নিজ স্বার্থের জন্য নয়; বরং আল্লাহর জন্যই কেবল সে রাগান্বিত হয়। আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত আসলে, দ্বীনের নিদর্শনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখলে কিংবা আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘিত হতে দেখলে তার রাগ চরমে ওঠে। সীমালঙ্ঘনকারী, অপরাধী, আল্লাহর মর্যাদায় আঘাতকারী এবং আল্লাহর দ্বীন নিয়ে তামাশাকারী লোকেরা তার রাগের আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসের ভাষ্যমতে রাসুলুল্লাহ -ও হুবহু এমনই ছিলেন।
বর্ণিত হয়েছে : 'রাসুলুল্লাহ নিজের স্বার্থের জন্য প্রতিশোধ নিতেন না। তবে যখন আল্লাহর মর্যাদা বিনষ্ট হয়-এমন কিছু প্রত্যক্ষ করতেন, তখন আল্লাহর জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন।'
দ্বীনের সুখ্যাতি বিনষ্ট হয়-এমন কিছু দেখলে, দ্বীনের বিধান পালন করার ক্ষেত্রে ভুল হতে দেখলে বা দ্বীনের হুদুদ কায়েম করার ব্যাপারে শিথিলতা করতে দেখলে রাসুলুল্লাহ রাগন্বিত হতেন। তাঁর মুবারক চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যেত।
সেদিন রাসুলুল্লাহ -এর খুব রাগ এসেছিল, যেদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলেছিলেন, অমুক লোকের কারণে আমি ফজরের নামাজে দেরিতে উপস্থিত হই। কারণ, সে খুব লম্বা কিরাআত পাঠ করে। সেদিনের মতো আর কোনোদিনের ওয়াজে রাসুলুল্লাহ -কে এত রাগান্বিত হতে কেউ দেখেনি। তিনি বললেন :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِينَ، فَمَنْ أَمَّ النَّاسَ فَلْيَتَجَوَّزْ، فَإِنَّ خَلْفَهُ الضَّعِيفَ وَالكَبِيرَ وَذَا الحَاجَةِ
'হে লোকসকল, তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা মানুষদের ভাগিয়ে দেয়। তোমাদের যে কেউ ইমামতি করবে, সে যেন নামাজ সংক্ষেপ করে। কেননা, তার পেছনে বৃদ্ধ, দুর্বল (বালক) এবং বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত লোক থাকে। ১৪২৯
সেদিন রাসুলুল্লাহ খুব রাগান্বিত হয়েছিলেন, যেদিন তিনি সফর থেকে ফিরে আয়িশা -এর ঘরে একটি পাতলা চাদর দেখতে পেয়েছিলেন, যেটার ওপর ছবি আঁকা ছিল। দেখার পর তিনি সাথে সাথে তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং রাগে তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। এরপর বললেন :
يَا عَائِشَةُ أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخَلْقِ اللهِ
'হে আয়িশা, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি তাদের হবে, যারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতিকৃতি তৈরি করে।'৪৩০
সেদিনও রাসুলুল্লাহ -এর খুব রাগ এসেছিল, যেদিন উসামা বিন জাইদ মাখজুম গোত্রের জনৈকা মহিলার পক্ষে তাঁর নিকট সুপারিশ করেছিলেন। মহিলাটি চুরি করেছিল। রাসুলুল্লাহ তার ওপর হদ (শরিয়ত নির্ধারিত হাত কাটার শাস্তি) প্রয়োগ করার দৃঢ় সংকল্প করলেন। লোকেরা বলল, এই মেয়ের পক্ষে রাসুলুল্লাহ -এর সামনে কথা বলার কি কেউ নেই? তারা বলল, রাসুলুল্লাহ -এর প্রিয়পাত্র একমাত্র উসামা বিন জাইদ-ই বলতে পারবেন। তখন উসামা কথা বললেন। এতে রাসুলুল্লাহ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন :
أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللهِ؟ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ، فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمِ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمِ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا
'তুমি কি আল্লাহর হদের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? তারপর তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা এজন্যই ধ্বংস হয়েছে যে, তাদের সম্ভ্রান্ত কোনো লোক চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার ওপর হদ জারি করত!
আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবুও আমি তার হাত কেটে ফেলতাম। '৪৩১
এমনিই ছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রাগান্বিত হওয়ার কারণ। ইসলামি শরিয়তে রাগান্বিত হওয়ার মাপকাঠিও এটাই। অর্থাৎ রাগ করতে হবে আল্লাহর জন্য; নিজ স্বার্থের জন্য নয়।