📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ক্ষমাশীল

📄 ক্ষমাশীল


প্রকৃত মুসলমান ক্ষমাশীল হয়ে থাকে। কেননা, ক্ষমা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তম চরিত্র। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এ উত্তম গুণটির প্রতি খুব জোর দেওয়া হয়েছে। যাদের মাঝে এ গুণটি আছে, আল্লাহ তাআলা তাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তাদের তিনি ভালোবাসেন।
মুমিনদের গুণাবলির বর্ণনায় তিনি ইরশাদ করেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'আর যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '৪০১
এর কারণ হলো, তারা নিজেদের রাগ সংবরণ করেছে। হিংসা ও ঘৃণার বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ নেয়নি; বরং ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। এতেই তারা নিজেদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতার পরিচয় দিয়েছেন। তাই পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
ক্ষমা করার এ মহৎ গুণটি অর্জন করা অনেক কঠিন। কারণ, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে থাকে। তবে যারা প্রকৃত অর্থে ইসলাম মেনে চলে, ইসলামের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিজেদের ভেতর ধারণ করে, তারা এ গুণে গুণান্বিত হতে পারে।
এ গুণটি ধারণ করা খুব কঠিন বিধায় পবিত্র কুরআন সকল ক্ষেত্রে ক্ষমা করাকে বাধ্যতামূলক করেনি। তবে প্রতিশোধ বা বদলা নেওয়ার পরিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবার জুলুম হয়ে না যায়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ ٣٩ وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ ٤٠ وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلٍ ٤١ إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٤٢ وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ٤٣
'যারা আক্রান্ত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। আর মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। অতঃপর যে ক্ষমা করে ও আপস করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। নিশ্চয় যে অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। অবশ্য যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ। ৪০২
ক্ষমা করা বাধ্যতামূলক নয়। পরিসীমার ভেতর থেকে প্রতিশোধ ও বদলা নেওয়া যায়, তবে ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম। এজন্যই আয়িশা -এর ওপর অপবাদ আরোপের ঘটনার পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অপবাদকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিলে আল্লাহ তাআলা নিচের আয়াতটি নাজিল করলেন : وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
‘তোমাদের মধ্যে যারা উচ্চমর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এ শপথ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। ৪০৩
মুমিনদের সমাজ পারস্পরিক ছোট বড় সকল সমস্যায় জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরস্পর ক্ষমা করে দেওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদিসে এর প্রতি মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ
‘সমান নয় ভালো ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান। ৪০৪
মন্দের বিপরীতে যদি মন্দ করা হয়, তখন হিংসা-বিদ্বেষের আগুনে ঘি পড়ে। পক্ষান্তরে মন্দের বিপরীতে যদি ভালো কাজ করা হয়, তখন হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্রোধের আগুন নিভে যায়। পারস্পরিক শত্রুতা মুহূর্তেই বন্ধুত্বে পরিণত হয়। ফলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই কুরআন মাজিদে মন্দের বিপরীতে উত্তম আচরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর ওপর মূল্যবান পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, হিংসার বিপরীতে কল্যাণকামিতা, শত্রুতার বিপরীতে বন্ধুত্ব, কষ্টদানের বিপরীতে ক্ষমা—এভাবে সকল মন্দের বিপরীতে উত্তম বিনিময় প্রদান করাই মুমিনের স্বভাব। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে এ ধরনের মানসিকতা থাকা জরুরি। কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে তাই এর প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন :
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
‘অতএব পরম ঔদাসীন্যের সাথে ওদের ক্রিয়াকর্ম উপেক্ষা করো।’ ৪০৫
অনেক হাদিসে ক্ষমা করার গুণ অর্জন করার প্রতি মুসলমানদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً، وَلَا خَادِمًا، إِلَّا أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَيْءٌ قَطُّ، فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ، إِلَّا أَنْ يُنْتَهَكَ شَيْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ، فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
'রাসুলুল্লাহ কাউকে কোনোদিন নিজ হাতে প্রহার করেননি। এমনকি কোনো স্ত্রী ও খাদিমকেও প্রহার করেননি। কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্রে ছিলেন এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া তাঁর ওপর কখনো (ব্যক্তিগতভাবে) কোনো আঘাত আসলে তিনি প্রতিপক্ষ থেকে কখনো প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই তার প্রতিশোধ নিতেন। '৪০৬
কেননা, আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ-জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো। '৪০৭
অন্য আয়াতে তিনি বলেন: ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
'জবাবে তাই বলো, যা উৎকৃষ্ট। '৪০৮
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كُنْتُ أَمْشِي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَعَلَيْهِ رِدَاءً نَجْرَانِي غَلِيظُ الْحَاشِيَةِ، فَأَدْرَكَهُ أَعْرَابِيُّ، فَجَبَذَهُ بِرِدَائِهِ جَبْدَةً شَدِيدَةً، نَظَرْتُ إِلَى صَفْحَةِ عُنُقِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ أَثَرَتْ بِهَا حَاشِيَةُ الرِّدَاءِ، مِنْ شِدَّةِ جَبْدَتِهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ مُرْ لِي مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي عِنْدَكَ ، فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَحِكَ، ثُمَّ أَمَرَ لَهُ بِعَطَاءٍ
‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে পথ চলছিলাম। তাঁর পরনে ছিল নাজরানের তৈরি মোটা আঁচলবিশিষ্ট চাদর। এক বেদুইন তাঁর কাছে আসলো। সে তাঁর চাদর ধরে সজোরে তাঁকে টান দিল। আমি দেখলাম, এর ফলে তাঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে গেল। সজোরে তার এই টানের কারণে চাদরের আঁচলও পড়ে গেল। সে (বেদুইন) বলল, হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর দেওয়া যেসব মাল তোমার কাছে আছে, তা থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার জন্য নির্দেশ দাও। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু মাল দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। '৪০৯
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষমার আরেকটি আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্ত হলো, তিনি সেই মহিলাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যে তাঁকে বিষমেশানো ছাগলের গোশত হাদিয়া দিয়েছিল।
ঘটনাটি সহিহ বুখারি, মুসলিমসহ আরও অনেক হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে :
أَنَّ امْرَأَةً يَهُودِيَّةً أَهْدَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَاةٌ مَصْلِيَّةً بِخَيْبَرَ، فَقَالَ لَهَا : مَا هَذِهِ ؟ قَالَتْ: هَدِيَّةٌ، وَتَخَدَّرَتْ أَنْ تَقُولَ مِنَ الصَّدَقَةِ فَلَا يَأْكُلُهَا، فَأَكَلَهَا وَأَكَلَ أَصْحَابُهُ، ثُمَّ قَالَ لَهُمْ: «أَمْسِكُوا»، فَقَالَ لِلْمَرْأَةِ: «هَلْ سَمَّمْتِ هَذِهِ الشَّاةَ؟» قَالَتْ: نَعَمْ قَالَتْ: مَنْ أَخْبَرَكَ؟ قَالَ: «هَذَا الْعَظْمُ ، لِسَاقِهَا وَهُوَ فِي يَدِهِ قَالَتْ: نَعَمْ قَالَ: «لِمَ؟» قَالَتْ: أَرَدْتُ إِنْ تَكُنْ كَاذِبًا يَسْتَرِيحُ النَّاسُ مِنْكَ، وَإِنْ كُنْتَ نَبِيًّا لَمْ يَضْرُرْكَ قَالَ: وَاحْتَجَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْكَاهِلِ، وَأَمَرَ أَنْ يَحْتَجِمُوا، فَمَاتَ بَعْضُهُمْ. قَالَ الزُّهْرِيُّ: وَأَسْلَمَتْ فَتَرَكَهَا، قَالَ مَعْمَرُ: وَأَمَّا النَّاسُ فَيَذْكُرُونَ أَنَّهُ قَتَلَهَا
'খাইবারে অবস্থানকালীন এক ইহুদি মহিলা নবিজি-এর নিকট ভুনা ছাগলের গোশত হাদিয়া পাঠাল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী? মহিলা বলল, হাদিয়া। সদকা বলা থেকে বিরত থাকল, অন্যথায় তিনি তা খাবেন না। অতঃপর তিনি ও তাঁর সঙ্গীসাথিগণ খাওয়া শুরু করলেন। একটু পরেই তাদের উদ্দেশে তিনি বলে উঠলেন, সবাই থামো। অতঃপর মহিলাকে বললেন, তুমি কি এ গোশতে বিশ মিশ্রিত করেছ? মহিলা বলল, হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে তা জানাল কে? তিনি তাঁর হাতে থাকা ছাগলের পায়ের নলা দেখিয়ে বললেন, এ হাড্ডি। মহিলা বলল, হ্যাঁ, ঠিক আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেন এমনটি করলে? সে বলল, আমি চাইছিলাম, আপনি যদি নবুওয়াতের দাবিতে মিথ্যাবাদী হোন, তাহলে মানুষ আপনার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি আপনি প্রকৃতই নবি হোন, তাহলে এ বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি তাঁর গ্রীবাসন্ধিতে হিজামা লাগালেন এবং সঙ্গীসাথিদেরও এর আদেশ দিলেন। এরপর তাঁর সঙ্গীদের কেউ (বিষক্রিয়ায়) মৃত্যুবরণ করল। জুহরি বলেন, মহিলা ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ তাকে ছেড়ে দেন। মামার বলেন, কিন্তু লোকেরা বলে বেড়ায় যে, নবিজি তাঁকে হত্যা করেছেন। '৪১০
যখন দাওস গোত্রের লোকেরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-এর কর্তৃত্ব মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দিল, তখন তুফাইল বিন আমর দাওসি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন:
إِنَّ دَوْسًا قَدْ عَصَتْ وَأَبَتْ، فَادْعُ اللهَ عَلَيْهِمْ. فَاسْتَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقِبْلَةَ، وَرَفَعَ يَدَيْهِ، فَقَالَ النَّاسُ: هَلَكُوا. فَقَالَ: اللهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَائْتِ بِهِمْ، اللهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَائْتِ بِهِمْ
‘দাওস গোত্র অবাধ্যতা করেছে এবং (ইসলাম গ্রহণে) অস্বীকৃতি জানিয়েছে; অতএব আপনি আল্লাহর নিকট তাদের জন্য বদদুআ করুন। তখন রাসুলুল্লাহ কিবলামুখী হয়ে দুই হাত উত্তোলন করলেন। সাহাবিগণ বলতে লাগলেন, এবার তাদের ধ্বংস অনিবার্য। (কিন্তু রাসুলুল্লাহ ছিলেন দয়া ও ক্ষমার মূর্তপ্রতীক। তিনি তাদের ধ্বংসের দুআ না করে উল্টো তাদের থেকে আজাব দূর করার দুআ করলেন।) তিনি দুআয় বললেন, হে আল্লাহ, দাওস গোত্রের লোকদের আপনি হিদায়াত দান করুন এবং তাদের ইসলামে নিয়ে আসুন। হে আল্লাহ, দাওস গোত্রের লোকদের আপনি হিদায়াত দান করুন এবং তাদের ইসলামে নিয়ে আসুন। '৪১১
রাসুলুল্লাহ সব সময় مسلمانوں ক্ষমার গুণ অবলম্বন করার সবক দিতেন। কারণ, ক্ষমা ও নম্রতার দ্বারা লোকদের যতটুকু আকৃষ্ট করা যায়, রূঢ়তা ও কঠোরতা দ্বারা ততটুকু পারা যায় না। এজন্যই উকবা বিন আমির যখন রাসুলুল্লাহ-এর নিকট ফজিলতপূর্ণ আমল বাতলে দেওয়ার আরজ করলেন, তখন তিনি বললেন :
يَا عُقْبَةُ، صِلْ مَنْ قَطَعَكَ، وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ، وَأَعْرِضْ عَمَّنْ ظَلَمَكَ
'হে উকবা, তোমার সাথে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক কায়েম করো। যে তোমাকে বঞ্চিত করে, তুমি তাকে দান করো। যে তোমার প্রতি জুলুম করে, তাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। '৪১২

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 উদারচিত্তের অধিকারী

📄 উদারচিত্তের অধিকারী


প্রকৃত মুসলমান মানুষদের সাথে লেনদেনে উদারতার পরিচয় দেয়। কারণ, সে জানে, দুনিয়া ও আখিরাতের সমূহ কল্যাণ অর্জন করার জন্য উদারতার বিকল্প নেই। তার উদারচিত্ততার কারণে মানুষ তাকে হৃদয়ে জায়গা দেয়। তাকে ভালোবাসে। আল্লাহও এ গুণের কারণে তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং তার প্রতি দয়া করেন। বিভিন্ন হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: رَحِمَ اللهُ رَجُلًا سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى 'বেচাকেনা ও দাবি-দাওয়ার সময় যে ব্যক্তি উদারতার পরিচয় দেয়, আল্লাহ তার প্রতি রহম করেন। '৪১৩
আবু মাসউদ আনসারি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : حُوسِبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، وَكَانَ مُوسِرًا، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ، قَالَ: قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ 'তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক লোকের হিসাব গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনো প্রকার ভালো আমল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং সে ছিল সচ্ছল। তাই দরিদ্র লোকদের প্রতি উদার থাকার জন্য সে তার কর্মচারীদের নির্দেশ দিত। রাসুলুল্লাহ বলেন, আল্লাহ বললেন, এ ব্যাপারে (অর্থাৎ উদারতার ব্যাপারে) আমি তার চেয়ে অধিক যোগ্য। একে ক্ষমা করে দাও।'৪১৪
দেখুন, আমল পরিমাপের মানদণ্ডে এই গুণটির কত ওজন! কিয়ামতের দিন মানুষ এ গুণটির প্রতি কত মুখাপেক্ষী হবে! আমাদের ভেতর কি এ গুণটি আছে?

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল

📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল


নম্রতা ও উদারতা প্রকাশের জন্য মানুষের সাথে সহাস্যবদনে কথা বলা জরুরি। এটিও স্বতন্ত্র একটি উত্তম গুণ ও উত্তম আমল। ইসলাম মানুষকে এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেন: لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
'কোনো উত্তম আমলকে তুচ্ছ মনে কোরো না; যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার মতো (ছোট আমল) হোক।'৪১৫
সহিহাইনে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: مَا حَجَبَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَآنِي
'আমি যখনই রাসুলুল্লাহ -কে সালাম দিয়েছি, কোনোবারেই তিনি আমাকে জবাব না দিয়ে থাকেননি। আর আমাকে দেখে সর্বদাই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন।'৪১৬
যে সমাজ পারস্পরিক ভালোবাসা, উদারতা ও সহাস্য দেখা-সাক্ষাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেটিই আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ। সে সমাজে মানুষকে সম্মান করা হয়। উত্তম চরিত্রের মূল্যায়ন করা হয়। উন্নত মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে মানুষ মূল্যায়িত হয়। এটাই ইসলামি সমাজ। সমাজজীবনের এ রূপরেখাই ইসলাম দিয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব সমাজে চরিত্রের কোনো দাম নেই, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আলাদা কোনো মূল্যায়ন নেই; বরং জাগতিক বিষয় ও ধন-সম্পদের ওপর মানুষের মূল্যায়ন করা হয়, তা বস্তুবাদী সমাজ; ইসলামি সমাজ নয়। এ সমাজে ঐক্য থাকে না। থাকে না তাতে কোনো নিরাপত্তা ও শান্তির হাওয়া।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 রসিক

📄 রসিক


প্রকৃত মুসলমান একটু রসিক প্রকৃতির হয়। তবে রসিকতার ক্ষেত্রে কখনো সীমালঙ্ঘন করে না। এ ধরনের রসিকতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রাসুলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরের সাথে বৈধতার সীমার ভেতর থেকে রসিকতা করতেন।
একদিন সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন:
قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا؟ قَالَ: «إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا»
'আপনি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন। তিনি বললেন, সব সময় সত্য কথাই তো বলি। (অর্থাৎ রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিই না।)'৪১৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করতেন, তবে রসিকতা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। সাহাবায়ে কিরামও এমনই ছিলেন। বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের মাঝে কৌতুক ও রসিকতার ঘটনা বিবৃত হয়েছে।
তন্মধ্যে একটি ঘটনা বিভিন্ন সিরাত ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু উমাইর নামে একটি শিশুর সাথে প্রায় সময় রসিকতা করতেন। তার একটি পাখি ছিল, যার সাথে সে খেলা করত। একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে চিন্তিত দেখতে পেয়ে বললেন, কী ব্যাপার? আবু উমাইরকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? সাহাবিগণ বললেন, তার খেলার সাথি নুগাইর পাখিটি মারা গেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে রসিকতা করে বলতে লাগলেন, আবু উমাইর, কী করল নুগাইর?'৪১৯
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি উট চাইল।' রাসুলুল্লাহ ﷺ রসিকতা করে তাকে বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দেবো। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, উষ্ট্রীর বাচ্চার ওপর আমি কী করে সওয়ার হব? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, (বড়) উট কি তাহলে উষ্ট্রীর বাচ্চা নয়?'৪২০
ইমাম আহমাদ আনাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, জাহির নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি গ্রাম থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য হাদিয়া পাঠাতেন। (একদিন হাদিয়া দিয়ে) যখন তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য বের হতে লাগলেন, তখন রাসুলুল্লাহ তার জন্য সামান তৈরি করে দিতে দিতে বললেন, নিশ্চয় জাহির আমাদের গ্রাম্য ভাই, আর আমরা তার শহুরে ভাই। রাসুলুল্লাহ তাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি দেখতে খুব কুৎসিত ছিলেন। একদিন রাসুলুল্লাহ তার কাছে গেলেন, তখন তিনি মালপত্র বিক্রি করছিলেন। রাসুলুল্লাহ পেছন দিক থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি কে বুঝতে না পেরে বললেন, এই, কে রে, আমাকে ছেড়ে দাও বলছি! পরে ফিরে যখন রাসুলুল্লাহ -কে চিনতে পারলেন, তখন তার পিঠের যে অংশ রাসুলুল্লাহ -এর বক্ষের সাথে লেগেছে, সে অংশের প্রতি খুব আগ্রহী হয়ে উঠলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, এই গোলামটিকে কেনার কেউ আছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, শপথ করে বলছি, আমার দাম অনেক সস্তা হবে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তুমি মোটেই স্বল্পমূল্যের নও। অথবা বলেছেন, আল্লাহর নিকট তোমার মূল্য অনেক বেশি। '৪২১
এক বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে জান্নাত দান করেন। রাসুলুল্লাহ কৌতুক করে বললেন, হে অমুকের মা, কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না! তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, তাকে বলো যে, বৃদ্ধারা বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে যাবে না। কেননা, আল্লাহ বলেছেন, 'আমি জান্নাতি রমণীগণকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী।'
আয়িশা বলেন, কোনো এক সফরে আমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে ছিলাম। আমি তখন খুব হালকা গড়নের কিশোরী ছিলাম। (যাওয়ার পথে একসময়) রাসুলুল্লাহ লোকদের বললেন, তোমরা আগে আগে চলো। তারা আগে চলে গেলেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি জিতলাম। রাসুলুল্লাহ কিছুই বলেননি। এরপর (কিছু কাল অতিক্রম হলে) আমি মোটা হলাম এবং প্রতিযোগিতার ঘটনাটি ভুলে গেলাম। তারপর আরেক সফরে আমি তাঁর সাথে বের হলাম। (চলার পথে) তিনি লোকদের বললেন, তোমরা সামনে চলতে থাকো। তারা সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর আমাকে বললেন, চলো, দৌড় প্রতিযোগিতা করি। এবার আমি হেরে গেলাম। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আগের হারের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।'
সাহাবায়ে কিরামও পরস্পর রসিকতা করতেন। এটাকে তারা খারাপ মনে করতেন না। কেননা, তারা স্বয়ং তাদের নেতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তা করতে দেখেছেন। তিনি তাদের সাথে রসিকতা করতেন। প্রাণবন্ত হয়ে কথা বলতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের মাঝে এসব ছিল বলেই সে যুগটা এতটা সুন্দর ও সুখের ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে রুক্ষতা চলে এসেছে, তখন থেকে মুসলিম সমাজের শান্তি ক্রমেই বিনষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইমাম বুখারি রহ. আল-আদাবুল মুফরাদে বকর বিন আব্দুল্লাহ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَتَبَادَحُونَ بالبطيخ، فإِذا كانَتِ الحَقَائِقُ كَانُوا هُمُ الرِّجَالُ
'নবিজি ﷺ-এর সাহাবিগণ তো একে অপরের প্রতি তরমুজ নিক্ষেপ করেও রসিকতা করতেন। কিন্তু যখন তাঁরা কঠোর বাস্তবতার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁরা বীরপুরুষই প্রতিপন্ন হতেন। (অর্থাৎ অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতেন।) '৪২২
এটাই ইসলাম-সমর্থিত রসিকতা। এখানে রসিকতা করতে গিয়ে হকের পথ থেকে বিচ্যুত হতে হয় না। পৌরুষের বহ্নিশিখা নিভে যায় না। এ রসিকতা কেবল অন্তরের বিনোদনের জন্য এবং মন ফ্রেশ করার জন্য করা হয়।
মজার বিষয় হলো, সাহাবায়ে কিরামের অনেক রসিকতায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ হেসে দিতেন। এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ রহ. উম্মে সালামা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর রা. বসরার উদ্দেশে সফরে বের হলেন। তাঁর সাথে নুয়াইমান রা. ও সুয়াইবিত বিন হারমালা রা.-ও ছিলেন। উভয়ই ছিলেন বদরি। সাহাবি। (সফরের) পাথেয় সুয়াইবিত -এর হাতে ছিল। তাই নুয়াইমান তাঁকে বললেন, আমাকে কিছু খাওয়ান। তিনি বললেন, আবু বকর আসুক, তারপর খাওয়াব। নুয়াইমান রসিকপ্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি লোকদের নিকট গিয়ে বললেন, তোমরা কি আমার থেকে একটা দক্ষ আরবি গোলাম ক্রয় করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, কিনব। তিনি বললেন, গোলামটি ভালোই কথা বলতে পারে, তাই নিজেকে স্বাধীনও দাবি করতে পারে। এটা মাথায় নিয়ে তোমরা যদি তাকে ছেড়ে দাও, তাহলে আমাকে দোষ দিতে যেয়ো না আবার। তারা বলল, না, না, আমরা (তার কথায় কর্ণপাত করব না) তাকে আমরা কিনবই। অতঃপর তারা তাকে দশটি উটের বিনিময়ে কিনে নিল। তারপর তিনি উটগুলোকে হাঁকিয়ে আনতে আনতে (সুয়াইবিত -এর দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এই হলো তোমাদের ক্রয়কৃত গোলাম। সুয়াইবিত বলতে লাগলেন, এ মিথ্যা বলছে, আমি স্বাধীন। লোকেরা বলল, আমরা তোমার ব্যাপারে আগে থেকেই জানি বাপু! বলেই তারা তার গলায় রশি বেঁধে তাকে নিয়ে গেল। তখন আবু বকর আসলেন। তিনি খবর পেয়ে সঙ্গীদের নিয়ে তাদের নিকট গিয়ে উটগুলো ফিরিয়ে দিয়ে তাকে মুক্ত করে আনলেন। এ খবর যখন রাসুলুল্লাহ -কে জানানো হয়, তখন তিনি খুব হাসলেন। সাহাবিরাও তাঁর সাথে হাসলেন। '৪২৩
এক বেদুইন রাসুলুল্লাহ -এর নিকট আসলেন। তিনি মসজিদের পাশে উটটি বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলেন। কয়েকজন সাহাবি নুয়াইমান বিন আমর আনসারি -কে বললেন, তুমি যদি এই উটটিকে জবাই করে দিতে, তাহলে আমরা গোশত খেতে পারতাম। আমাদের খুব গোশত খেতে ইচ্ছে করছে। মূল্য নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, তা রাসুলুল্লাহ চুকিয়ে দেবেন। নুয়াইমান উটটি জবাই করে দিলেন। বেদুইন লোকটি বের হয়ে যখন তার বাহনের এমন হাল দেখলেন, তখন চিৎকার দিয়ে উঠলেন, হায় আমার উট, হে মুহাম্মাদ! রাসুলুল্লাহ বের হয়ে এলেন। বললেন, এটা কার কাজ? সাহাবিগণ বললেন, নুয়াইমান করেছে। কারণ দর্শানোর জন্য তাকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিলেন রাসুলুল্লাহ। তাকে দুবাআ বিনতে জুবাইর -এর বাড়িতে পাওয়া গেল। সেখানে তিনি একটি গর্তে লুকিয়ে ওপরে খেজুর গাছের পাতা ও ডালপালা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। এক ব্যক্তি সেদিকে আঙুল দ্বারা ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিলেন, কিন্তু মুখে বড় আওয়াজে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে দেখিনি। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সেখান থেকে বের করে আনলেন। খেজুর পাতা ও ডালপালা লেগে তার চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, তুমি এমন কাজ করতে গেলে কেন? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, যারা আপনাকে আমার ব্যাপারে অবহিত করেছে, তারাই আমাকে তা করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন তার চেহারা মুছতে মুছতে হেসে দিলেন। তারপর তিনিই উটের মূল্য চুকিয়ে দিলেন। '৪২৪
উপর্যুক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা এ কথা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়ে গেল যে, ইসলাম চায়, তার অনুসারীরা অন্তরের বিনোদনের জন্য একটু কৌতুক করুক, একটু রসিকতা করুক। কেননা, রসিকতা মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে নরম ও কোমল করে তোলে, যা মানুষের হৃদয়সমূহ জয় করে নিতে সক্ষম হয়। এ ধরনের ব্যক্তিসত্তা মুসলমানদের মাঝে থাকাটা আজ খুব জরুরি।

টিকাঃ
৪১৮. চড়ুই পাখির মতো দেখতে একটি ছোট্ট পাখি। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00