📄 তার ভেতর লজ্জাবোধ আছে
প্রকৃত মুসলমান লাজুক হয়। কেননা, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ লজ্জাশীলতার মূর্তপ্রতীক ছিলেন।
আবু সাইদ খুদরি রা. বর্ণনা করেন :
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَشَدَّ حَيَاءً مِنَ العَذْرَاءِ فِي خِدْرِهَا، فَإِذَا رَأَى شَيْئًا يَكْرَهُهُ عَرَفْنَاهُ فِي وَجْهِهِ
‘নবিজি ﷺ কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। অপছন্দনীয় কোনো বিষয়ের প্রতি যখন তার নজর পড়ত, (তিনি লজ্জার কারণে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারতেন না, কিন্তু) আমরা তাঁর চেহারায় তার লক্ষণ দেখতে পেতাম।’৩৭২
লজ্জা এমন একটি গুণ, যা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই বিভিন্ন হাদিসে লজ্জাকে কল্যাণ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
ইমরান বিন হুসাইন রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
الحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ
‘লজ্জা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে।’৩৭৩
মুসলিম শরিফের অপর বর্ণনায় এসেছে:
الحَيَاءُ خَيْرُ كُلُّهُ قَالَ: أَوْ قَالَ: الْحَيَاءُ كُلُّهُ خَيْرُ
'লজ্জা পুরোটাই কল্যাণজনক অথবা বলেছেন, লজ্জা সকল কল্যাণের উৎস। '৩৭৪
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
الْإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ - أَوْ بِضْعُ وَسِتُّونَ - شُعْبَةٌ، فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةُ مِنَ الْإِيمَانِ
'ইমানের সাতাত্তর বা সাতষট্টিরও অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। '৩৭৫
প্রকৃত মুসলমান ভদ্র স্বভাবের হয়। তার থেকে খারাপ কাজ প্রকাশ পায় না। কোনো মানুষকে সে কষ্ট দেয় না। কারও অধিকার হরণ করে না। এসবের কারণ হলো, প্রকৃত মুসলমানের মাঝে লজ্জার গুণ সক্রিয় থাকে। তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ থাকে। লজ্জা পরিত্যাগ করে সে ইমানকে অঙ্গহীন করতে চায় না। কারণ, লজ্জা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আসলে এই বোধটাই মানুষের অন্তরে লজ্জাকে জিইয়ে রাখে।
এ উত্তম চরিত্রগুলো অনেক সময় অমুসলিমদের মাঝেও পাওয়া যায়, তবে ইখলাস, অটলতা ও ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে مسلمانوں সাথে এদের পার্থক্য সৃষ্টি হয়। যত কঠিন সময়ই আসুক এবং যত কঠিন অবস্থার মুখোমুখিই হোক-প্রকৃত মুসলমান এসব অভ্যাস পরিত্যাগ করে না। আর লজ্জার ক্ষেত্রে অন্যরা লজ্জা পায় কেবল মানুষকে। তাই যখন একাকী থাকে, তখন গুনাহ বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে না। কিন্তু প্রকৃত মুসলমান মানুষকে যেমন লজ্জা পায়, তার চেয়েও অধিক লজ্জা পায় আল্লাহকে। তাই একাকিত্বের মুহূর্তেও সে গুনাহ থেকে বিরত থাকে। আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধই লজ্জার গুণে গুণান্বিত প্রকৃত মুসলমানকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে।
📄 মানুষের সাথে কোমল আচরণ করে
প্রকৃত মুসলমান কোমলতা ও নম্রতার গুণে গুণান্বিত হয়। কেননা, এ গুণটি মুমিনের উত্তম স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত, যা বান্দার মাঝে থাকাটা আল্লাহ পছন্দ করেন। তা ছাড়া এ গুণটির কারণে মানুষ সমাজে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।
পবিত্র কুরআনে এ গুণ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَقٌّ عَظِيمٍ 'সমান নয় ভালো ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান।'৩৭৬
একাধিক হাদিসে কোমলতা ও বিনম্রতার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং তা অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক জীবনের জন্য এ গুণটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এসব হাদিস থেকে তা অনুমান করা যায়। তা ছাড়া স্বয়ং আল্লাহ-ই এই গুণে গুণান্বিত।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে : إِنَّ اللهَ رَفِيقُ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ 'নিশ্চয় আল্লাহ কোমল। তিনি সব বিষয়ে কোমলতাকে পছন্দ করেন। ৩৭৭
এটি এমন এক উত্তম চরিত্র, যার কারণে আল্লাহ তাআলা এমন সাওয়াব দান করেন, যা অন্য কোনো গুণের কারণে দান করেন না।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে: إِنَّ اللهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ، وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ، وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ
'নিশ্চয় আল্লাহ কোমল। তিনি কোমলতাকে পছন্দ করেন। আর কোমলতার কারণে এমন সাওয়াব দান করেন, যা রুষ্টতা বা অন্য কোনো কারণে দান করেন না।'৩৭৮
শুধু এতটুকুই নয়; বরং রাসুলুল্লাহ এ গুণটিকে প্রত্যেক বিষয়ের সৌন্দর্যের কারণ আখ্যা দিয়ে বলেন: إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
'নিশ্চয় কোমলতা যখন কোনো বিষয়ের সাথে থাকে, তখন সেটাকে সুন্দর করে তোলে; আর যখন কোনো বিষয় থেকে কোমলতা দূর হয়ে যায়, তখন তা অসুন্দর হয়ে পড়ে। '৩৭৯
রাসুলুল্লাহ কথার মাধ্যমে যেভাবে কোমলতার প্রতি উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তেমনই কাজের মাধ্যমেও কোমলতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
হাদিস শরিফে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে: قَامَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي المَسْجِدِ، فَتَنَاوَلَهُ النَّاسُ، فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: دَعُوهُ وَهَرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ، أَوْ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ، فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ، وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ
'এক বেদুইন লোক মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করে দিল। উপস্থিত সাহাবিগণ তাকে মারার জন্য উদ্যত হলে নবিজি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে পরিষ্কার করে নাও। কেননা, তোমরা কোমলতা প্রদর্শন করার জন্য প্রেরিত হয়েছ, কঠোরতা দেখানোর জন্য নয়। '৩৮০
নম্রতা ও কোমলতা মানুষের পাষাণ হৃদয়ও গলিয়ে দিতে পারে। খুলে ফেলতে পারে অন্তরের বদ্ধতালা। কঠোরতা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যা কখনো সম্ভব হয় না। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ হকের প্রতি লোকদের আহ্বান করার ক্ষেত্রে কোমলতার পন্থা অবলম্বন করতেন। এ ব্যাপারে উম্মতকেও একই নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তিনি।
তিনি ইরশাদ করেছেন : بَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا، وَيَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا 'সুসংবাদ দাও, আতঙ্কিত কোরো না; সহজ করো, কঠিন কোরো না। ৩৮১
এর কারণ হলো, মানুষ কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের লোকদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তাদের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। পক্ষান্তরে কোমল ও নরম স্বভাবের মানুষের সাথে মানুষ স্বস্তি অনুভব করে। তাদের কাছাকাছি থাকতে চায়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা রুক্ষ স্বভাবের না হতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন : وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ 'পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। '৩৮২
এটাই সর্বযুগের দ্বীনের দায়িদের স্বভাব ছিল। কারণ, এর মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করা সহজ হয়। এজন্য মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালাম-কেও আল্লাহ তাআলা নম্র কথার মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى - فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
'তোমরা উভয়ে ফিরআওনের কাছে যাও; সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বলো। এতে হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।'৩৮৩
মোটকথা, নম্রতা ও কোমলতার মধ্যে রয়েছে কল্যাণই কল্যাণ। যার মাঝে এ গুণ আছে, তার মাঝে কল্যাণ আছে। আর যার ভেতর কোমলতা নেই, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।
জারির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
مَنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ، يُحْرَمِ الْخَيْرَ
'যে নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।'৩৮৪
অন্য হাদিসে আয়িশা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন :
يَا عَائِشَةُ، ارْفُقِي، فَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَرَادَ بِأَهْلِ بَيْتٍ خَيْرًا، دَلَّهُمْ عَلَى بَابٍ الرفق
'হে আয়িশা, নম্রতার গুণে গুণান্বিত হও। কেননা, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো পরিবারের সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদের নম্রতার দিকে পথ প্রদর্শন করেন।'৩৮৫
অপর এক বর্ণনায় আছে:
إِذَا أَرَادَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِأَهْلِ بَيْتٍ خَيْرًا، أَدْخَلَ عَلَيْهِمُ الرِّفْقَ
'যখন আল্লাহ কোনো পরিবারের সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদের মাঝে নম্রতার গুণ ঢুকিয়ে দেন। '৩৮৬
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ خَيْرًا أَدْخَلَ عَلَيْهِمُ الرِّفْقَ
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতির সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদেরকে নম্রতার গুণ দান করেন। '৩৮৭
নম্রতা এমন এক উত্তম গুণ, যা অবলম্বন করলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيِّنٍ سَهْلٍ
'আমি কি তোমাদের এমন ব্যক্তির পরিচয় দেবো না, যে জাহান্নামের জন্য হারাম আর জাহান্নাম তার জন্য হারাম? প্রত্যেক মিশুক, নম্র, কোমল ও সহজ সরল ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম। '৩৮৮
ইসলাম শুধু মানবের প্রতি নম্র হওয়ার কথা বলে না; বরং প্রত্যেক জীবের প্রতিই নম্রতার সবক দেয়। আর এটাকে 'ইহসান' (উত্তমরূপে আমল করা) এর অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, যা সাধারণত নেককার ও পরহেজকার লোকদের মাঝে থাকে।
এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ বলেন: إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ
‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিষয়ের মধ্যে ইহসান বাধ্যতামূলক করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন (হদ বা কিসাস হিসাবে) কাউকে হত্যা করবে, তখন উত্তমরূপে হত্যা করবে। আর যখন কোনো জন্তু জবাই করবে, তখন উত্তমরূপে জবাই করবে। তার জন্য জবাই করার পূর্বে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেবে এবং জবাইকৃত জন্তুকে যথাসম্ভব আরাম দেবে। ১৩৮৯
বাকহীন পশুর প্রতি এ দয়াপ্রদর্শন জবাইকারীর কোমলতা গুণের পরিচায়ক। বুঝা গেল, এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ জীবজন্তুর প্রতিও কোমল হওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
📄 দয়ালু
প্রকৃত মুসলমান দয়ালু হয়। তার হৃদয় থেকে অনবরত প্রবাহিত হয় দয়া ও করুণার ফল্গুধারা। কারণ, সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে আসমানবাসী (আল্লাহ) তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন : ارْحَمْ مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكَ مَنْ فِي السَّمَاءِ ‘পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো; তাহলে আসমানের ওপর যিনি আছেন (আল্লাহ), তিনিও তোমার প্রতি দয়া করবেন।’৩৯০
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: مَنْ لَمْ يَرْحَمِ النَّاسَ لَمْ يَرْحَمُهُ اللَّهُ ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না।’৩৯১
আরেক হাদিসে এসেছে :
إِنَّ الرَّحْمَةَ لَا تُنْزَعُ إِلَّا مِنْ شَقِيٌّ 'দয়া থাকে না শুধু কপালপোড়াদের অন্তরে।'৩৯২
প্রকৃত মুসলমানের দয়ার পরিধি শুধু স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের অন্তর্ভুক্ত করে তা নয়; বরং সকল মানুষকেই অন্তর্ভুক্ত করে। সকলের প্রতিই সে দয়া করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ রহমতের ব্যাপকতাকে ইমানের শর্ত বলেছেন।
এ সম্পর্কে আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تَرَاحَمُوا قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، كُلُّنَا رَحِمٌ، قَالَ: «إِنَّهُ لَيْسَ بِرَحْمَةٍ أَحَدُكُمْ خَاصَّتَهَ، وَلَكِنْ رَحْمَةُ الْعَامَّةِ» 'তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না পরস্পরকে দয়া করবে। সাহাবিগণ বললেন, আমরা সবাই তো দয়াবান। তিনি বললেন, শুধু প্রিয়জনদের প্রতি দয়া করলে হবে না; বরং সাধারণভাবে সকল মানুষের প্রতিই দয়া করতে হবে।'৩৯৩
ব্যাপকভাবে দয়া প্রদর্শনের এ শিক্ষা ইসলাম এজন্যই দিয়ে থাকে, যেন এর মাধ্যমে ভালোবাসায় ভরপুর একটি সমাজ গড়ে ওঠে। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের অন্তরে অপর সদস্যদের প্রতি থাকবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নিখাদ সহমর্মিতা ও গভীর সৌহার্দ্য।
রাসুলুল্লাহ নিজেই দয়ার অনন্য উদাহরণ ছিলেন। দয়ার গুণ তাঁর মননে ও দেহের প্রতিটি রক্তক্ষণিকায় মিশ্রিত ছিল। তাঁর দয়া-সম্পর্কিত কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো।
আনাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنِّي لَأَدْخُلُ الصَّلَاةَ أُرِيدُ إِطَالَتَهَا فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأُخَفِّفُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ بِهِ
'আমি নামাজ শুরু করে তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা করলাম। এমতাবস্থায় আমি একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেলাম। তখন তার মায়ের (ওই মা রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে নামাজ আদায় করছিলেন) অস্থিরতার কথা চিন্তা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করলাম।'৩৯৪
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَ أَعْرَابِيُّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَتُقَبِّلُونَ صِبْيَانَكُمْ؟ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَوَ أَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ؟»
'জনৈক বেদুইন নবিজি-এর নিকট এসে বললেন, আপনারা দেখি, বাচ্চাদের চুমু খান! আমরা তো আমাদের বাচ্চাদের চুমু খাই না। তখন নবিজি বললেন, তোমাদের অন্তর থেকে আল্লাহ দয়ামায়া তুলে নিয়েছেন বলে কি আমাদের অন্তর থেকেও তুলে নেবেন?'৩৯৫
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন :
قَبَّلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الحَسَنَ بْنَ عَلِيَّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسِ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الْأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ»
'রাসুলুল্লাহ হাসান-কে চুমু খেলেন। তখন তাঁর নিকট আকরা বিন হাবিস তামিমি ছিলেন। তিনি বললেন, আমার দশটি বাচ্চা আছে, আমি তাদের কখনো চুমু খাইনি। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, যে দয়া (আদর-স্নেহ) করে না, তাকে দয়া করা হবে না। '৩৯৬
উমর এক ব্যক্তিকে مسلمانوں একটি জনপদের প্রশাসক বানাতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় আকরা বিন হাবিস বললেন, এ ব্যক্তি তো তার বাচ্চাদের চুমু খায় না। তখন উমর তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে বললেন, তোমার অন্তরে তো সন্তানদের প্রতিই দয়া নেই, জনগণের প্রতি দয়া কোত্থেকে আসবে? আল্লাহর কসম, আমি কখনো তোমাকে কোনো দায়িত্ব দেবো না। তারপর নিয়োগপত্রটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন।
রাসুলুল্লাহ দয়ার পরিধি আরও বিস্তৃত করে জীবজন্তুর প্রতি দয়াপরায়ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন উপদেশবাণী ও শিক্ষণীয় ঘটনা বলে অবুঝ জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقِ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ، فَوَجَدَ بِثْرًا، فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ، ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَتُ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَقَالَ الرَّجُلُ لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي، فَنَزَلَ الْبِئْرَ فَمَلَا خُفَّهُ مَاءً، ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ حَتَّى رَقِيَ فَسَقَى الْكَلْبَ فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنَّ لَنَا فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ لَأَجْرًا؟ فَقَالَ: فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ
'এক ব্যক্তি পথ চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লেগে গেল। কূপ দেখতে পেল। কূপে নেমে সে পানি পান করল। অতঃপর ওপরে উঠে আসলো। তখন সে দেখল, একটা কুকুর জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসার কারণে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে বলল, পিপাসায় কুকুরটির এমনই অবস্থা হয়েছে, যেমনটি ইতিপূর্বে আমার হয়েছিল। অতঃপর সে কূপে নেমে মোজায় পানি ভরল এবং মুখ দিয়ে তা কামড়ে ধরে ওপরে উঠে আসলো। তারপর কুকুরকে পানি পান করতে দিল। তার এ কাজ আল্লাহ তাআলা ভীষণ পছন্দ করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, জীবজন্তুরে পানাহার করানোতেও কি আমাদের সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর সেবা-যত্নেই সাওয়াব রয়েছে। '৩৯৭
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ বলেন:
عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ، لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا، إِذْ حَبَسَتْهَا، وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ
'একটি বিড়াল মারার কারণে একটি নারীকে আজাব দেওয়া হয়েছে। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, ফলে (খাবার খেতে না পেরে) বিড়ালটি মারা যায়। এ কারণেই সে জাহান্নামে গেছে। যখন সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল, তখন সে এটাকে না দিয়েছিল খাবার, না দিয়েছিল পানি; আর না তাকে ছেড়ে দিয়েছিল, যেন বাইরে গিয়ে কীটপতঙ্গ খেতে পারে। '৩৯৮
আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَزَلَ مَنْزِلًا فَأَخَذَ رَجُلٌ بَيْضَ حُمَّرَةٍ، فَجَاءَتْ تَرِفُ عَلَى رَأْسِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَيُّكُمْ فَجَعَ هَذِهِ بِبَيْضَتِهَا ؟ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا أَخَذْتُ بَيْضَتَهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ارْدُدْ، رَحْمَةً لَهَا»
নবিজি একদা সফরকালে যাত্রাবিরতি করলেন। তখন এক ব্যক্তি হুম্মারা পাখির ডিম (তার নীড় থেকে) পেড়ে আনলেন। পাখিটি তখন রাসুলুল্লাহ -এর মাথার ওপর দিয়ে উড়তে লাগল। নবিজি বললেন, তোমাদের মধ্য থেকে কে পাখিটির ডিম পেড়ে এনে ওকে ব্যথাতুর করেছে? এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ওর ডিম পেড়ে এনেছি। তিনি বললেন, ওর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ওর ডিম রেখে এসো।'৩৯৯
রাসুলুল্লাহ মানুষের প্রতি যেমন দয়ালু ছিলেন, তেমনই অন্যান্য প্রাণীর প্রতিও দয়ালু ছিলেন। কথা ও কাজের মাধ্যমে मुसलमानोंও তিনি সেই শিক্ষা দিয়েছেন। তাই প্রকৃত মুসলমান হতে হলে আমাদের মাঝে অবশ্যই দয়া থাকতে হবে। তা ছাড়া পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করলে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি দয়া করবেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
ارْحَمْ مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمُكَ مَنْ فِي السَّمَاءِ
'জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো; তাহলে আসমানে যিনি আছেন (অর্থাৎ আল্লাহ) তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।'৪০০
📄 ক্ষমাশীল
প্রকৃত মুসলমান ক্ষমাশীল হয়ে থাকে। কেননা, ক্ষমা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তম চরিত্র। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এ উত্তম গুণটির প্রতি খুব জোর দেওয়া হয়েছে। যাদের মাঝে এ গুণটি আছে, আল্লাহ তাআলা তাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তাদের তিনি ভালোবাসেন।
মুমিনদের গুণাবলির বর্ণনায় তিনি ইরশাদ করেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'আর যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '৪০১
এর কারণ হলো, তারা নিজেদের রাগ সংবরণ করেছে। হিংসা ও ঘৃণার বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ নেয়নি; বরং ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। এতেই তারা নিজেদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতার পরিচয় দিয়েছেন। তাই পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
ক্ষমা করার এ মহৎ গুণটি অর্জন করা অনেক কঠিন। কারণ, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে থাকে। তবে যারা প্রকৃত অর্থে ইসলাম মেনে চলে, ইসলামের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিজেদের ভেতর ধারণ করে, তারা এ গুণে গুণান্বিত হতে পারে।
এ গুণটি ধারণ করা খুব কঠিন বিধায় পবিত্র কুরআন সকল ক্ষেত্রে ক্ষমা করাকে বাধ্যতামূলক করেনি। তবে প্রতিশোধ বা বদলা নেওয়ার পরিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবার জুলুম হয়ে না যায়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ ٣٩ وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ ٤٠ وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلٍ ٤١ إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ٤٢ وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ٤٣
'যারা আক্রান্ত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। আর মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। অতঃপর যে ক্ষমা করে ও আপস করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না। নিশ্চয় যে অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। অবশ্য যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ। ৪০২
ক্ষমা করা বাধ্যতামূলক নয়। পরিসীমার ভেতর থেকে প্রতিশোধ ও বদলা নেওয়া যায়, তবে ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম। এজন্যই আয়িশা -এর ওপর অপবাদ আরোপের ঘটনার পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু অপবাদকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিলে আল্লাহ তাআলা নিচের আয়াতটি নাজিল করলেন : وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
‘তোমাদের মধ্যে যারা উচ্চমর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এ শপথ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। ৪০৩
মুমিনদের সমাজ পারস্পরিক ছোট বড় সকল সমস্যায় জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরস্পর ক্ষমা করে দেওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদিসে এর প্রতি মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ
‘সমান নয় ভালো ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান। ৪০৪
মন্দের বিপরীতে যদি মন্দ করা হয়, তখন হিংসা-বিদ্বেষের আগুনে ঘি পড়ে। পক্ষান্তরে মন্দের বিপরীতে যদি ভালো কাজ করা হয়, তখন হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্রোধের আগুন নিভে যায়। পারস্পরিক শত্রুতা মুহূর্তেই বন্ধুত্বে পরিণত হয়। ফলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই কুরআন মাজিদে মন্দের বিপরীতে উত্তম আচরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর ওপর মূল্যবান পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, হিংসার বিপরীতে কল্যাণকামিতা, শত্রুতার বিপরীতে বন্ধুত্ব, কষ্টদানের বিপরীতে ক্ষমা—এভাবে সকল মন্দের বিপরীতে উত্তম বিনিময় প্রদান করাই মুমিনের স্বভাব। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে এ ধরনের মানসিকতা থাকা জরুরি। কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে তাই এর প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন :
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
‘অতএব পরম ঔদাসীন্যের সাথে ওদের ক্রিয়াকর্ম উপেক্ষা করো।’ ৪০৫
অনেক হাদিসে ক্ষমা করার গুণ অর্জন করার প্রতি মুসলমানদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً، وَلَا خَادِمًا، إِلَّا أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَيْءٌ قَطُّ، فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ، إِلَّا أَنْ يُنْتَهَكَ شَيْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ، فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
'রাসুলুল্লাহ কাউকে কোনোদিন নিজ হাতে প্রহার করেননি। এমনকি কোনো স্ত্রী ও খাদিমকেও প্রহার করেননি। কেবল আল্লাহর পথে জিহাদের ক্ষেত্রে ছিলেন এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া তাঁর ওপর কখনো (ব্যক্তিগতভাবে) কোনো আঘাত আসলে তিনি প্রতিপক্ষ থেকে কখনো প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি কেবল আল্লাহর জন্যই তার প্রতিশোধ নিতেন। '৪০৬
কেননা, আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
'আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ-জাহিলদের থেকে দূরে সরে থাকো। '৪০৭
অন্য আয়াতে তিনি বলেন: ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
'জবাবে তাই বলো, যা উৎকৃষ্ট। '৪০৮
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كُنْتُ أَمْشِي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَعَلَيْهِ رِدَاءً نَجْرَانِي غَلِيظُ الْحَاشِيَةِ، فَأَدْرَكَهُ أَعْرَابِيُّ، فَجَبَذَهُ بِرِدَائِهِ جَبْدَةً شَدِيدَةً، نَظَرْتُ إِلَى صَفْحَةِ عُنُقِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ أَثَرَتْ بِهَا حَاشِيَةُ الرِّدَاءِ، مِنْ شِدَّةِ جَبْدَتِهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ مُرْ لِي مِنْ مَالِ اللَّهِ الَّذِي عِنْدَكَ ، فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَحِكَ، ثُمَّ أَمَرَ لَهُ بِعَطَاءٍ
‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে পথ চলছিলাম। তাঁর পরনে ছিল নাজরানের তৈরি মোটা আঁচলবিশিষ্ট চাদর। এক বেদুইন তাঁর কাছে আসলো। সে তাঁর চাদর ধরে সজোরে তাঁকে টান দিল। আমি দেখলাম, এর ফলে তাঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে গেল। সজোরে তার এই টানের কারণে চাদরের আঁচলও পড়ে গেল। সে (বেদুইন) বলল, হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর দেওয়া যেসব মাল তোমার কাছে আছে, তা থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার জন্য নির্দেশ দাও। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু মাল দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। '৪০৯
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষমার আরেকটি আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্ত হলো, তিনি সেই মহিলাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যে তাঁকে বিষমেশানো ছাগলের গোশত হাদিয়া দিয়েছিল।
ঘটনাটি সহিহ বুখারি, মুসলিমসহ আরও অনেক হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে :
أَنَّ امْرَأَةً يَهُودِيَّةً أَهْدَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَاةٌ مَصْلِيَّةً بِخَيْبَرَ، فَقَالَ لَهَا : مَا هَذِهِ ؟ قَالَتْ: هَدِيَّةٌ، وَتَخَدَّرَتْ أَنْ تَقُولَ مِنَ الصَّدَقَةِ فَلَا يَأْكُلُهَا، فَأَكَلَهَا وَأَكَلَ أَصْحَابُهُ، ثُمَّ قَالَ لَهُمْ: «أَمْسِكُوا»، فَقَالَ لِلْمَرْأَةِ: «هَلْ سَمَّمْتِ هَذِهِ الشَّاةَ؟» قَالَتْ: نَعَمْ قَالَتْ: مَنْ أَخْبَرَكَ؟ قَالَ: «هَذَا الْعَظْمُ ، لِسَاقِهَا وَهُوَ فِي يَدِهِ قَالَتْ: نَعَمْ قَالَ: «لِمَ؟» قَالَتْ: أَرَدْتُ إِنْ تَكُنْ كَاذِبًا يَسْتَرِيحُ النَّاسُ مِنْكَ، وَإِنْ كُنْتَ نَبِيًّا لَمْ يَضْرُرْكَ قَالَ: وَاحْتَجَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْكَاهِلِ، وَأَمَرَ أَنْ يَحْتَجِمُوا، فَمَاتَ بَعْضُهُمْ. قَالَ الزُّهْرِيُّ: وَأَسْلَمَتْ فَتَرَكَهَا، قَالَ مَعْمَرُ: وَأَمَّا النَّاسُ فَيَذْكُرُونَ أَنَّهُ قَتَلَهَا
'খাইবারে অবস্থানকালীন এক ইহুদি মহিলা নবিজি-এর নিকট ভুনা ছাগলের গোশত হাদিয়া পাঠাল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী? মহিলা বলল, হাদিয়া। সদকা বলা থেকে বিরত থাকল, অন্যথায় তিনি তা খাবেন না। অতঃপর তিনি ও তাঁর সঙ্গীসাথিগণ খাওয়া শুরু করলেন। একটু পরেই তাদের উদ্দেশে তিনি বলে উঠলেন, সবাই থামো। অতঃপর মহিলাকে বললেন, তুমি কি এ গোশতে বিশ মিশ্রিত করেছ? মহিলা বলল, হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে তা জানাল কে? তিনি তাঁর হাতে থাকা ছাগলের পায়ের নলা দেখিয়ে বললেন, এ হাড্ডি। মহিলা বলল, হ্যাঁ, ঠিক আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেন এমনটি করলে? সে বলল, আমি চাইছিলাম, আপনি যদি নবুওয়াতের দাবিতে মিথ্যাবাদী হোন, তাহলে মানুষ আপনার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি আপনি প্রকৃতই নবি হোন, তাহলে এ বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি তাঁর গ্রীবাসন্ধিতে হিজামা লাগালেন এবং সঙ্গীসাথিদেরও এর আদেশ দিলেন। এরপর তাঁর সঙ্গীদের কেউ (বিষক্রিয়ায়) মৃত্যুবরণ করল। জুহরি বলেন, মহিলা ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ তাকে ছেড়ে দেন। মামার বলেন, কিন্তু লোকেরা বলে বেড়ায় যে, নবিজি তাঁকে হত্যা করেছেন। '৪১০
যখন দাওস গোত্রের লোকেরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-এর কর্তৃত্ব মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দিল, তখন তুফাইল বিন আমর দাওসি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন:
إِنَّ دَوْسًا قَدْ عَصَتْ وَأَبَتْ، فَادْعُ اللهَ عَلَيْهِمْ. فَاسْتَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقِبْلَةَ، وَرَفَعَ يَدَيْهِ، فَقَالَ النَّاسُ: هَلَكُوا. فَقَالَ: اللهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَائْتِ بِهِمْ، اللهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَائْتِ بِهِمْ
‘দাওস গোত্র অবাধ্যতা করেছে এবং (ইসলাম গ্রহণে) অস্বীকৃতি জানিয়েছে; অতএব আপনি আল্লাহর নিকট তাদের জন্য বদদুআ করুন। তখন রাসুলুল্লাহ কিবলামুখী হয়ে দুই হাত উত্তোলন করলেন। সাহাবিগণ বলতে লাগলেন, এবার তাদের ধ্বংস অনিবার্য। (কিন্তু রাসুলুল্লাহ ছিলেন দয়া ও ক্ষমার মূর্তপ্রতীক। তিনি তাদের ধ্বংসের দুআ না করে উল্টো তাদের থেকে আজাব দূর করার দুআ করলেন।) তিনি দুআয় বললেন, হে আল্লাহ, দাওস গোত্রের লোকদের আপনি হিদায়াত দান করুন এবং তাদের ইসলামে নিয়ে আসুন। হে আল্লাহ, দাওস গোত্রের লোকদের আপনি হিদায়াত দান করুন এবং তাদের ইসলামে নিয়ে আসুন। '৪১১
রাসুলুল্লাহ সব সময় مسلمانوں ক্ষমার গুণ অবলম্বন করার সবক দিতেন। কারণ, ক্ষমা ও নম্রতার দ্বারা লোকদের যতটুকু আকৃষ্ট করা যায়, রূঢ়তা ও কঠোরতা দ্বারা ততটুকু পারা যায় না। এজন্যই উকবা বিন আমির যখন রাসুলুল্লাহ-এর নিকট ফজিলতপূর্ণ আমল বাতলে দেওয়ার আরজ করলেন, তখন তিনি বললেন :
يَا عُقْبَةُ، صِلْ مَنْ قَطَعَكَ، وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ، وَأَعْرِضْ عَمَّنْ ظَلَمَكَ
'হে উকবা, তোমার সাথে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক কায়েম করো। যে তোমাকে বঞ্চিত করে, তুমি তাকে দান করো। যে তোমার প্রতি জুলুম করে, তাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। '৪১২