📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তার চরিত্র সুন্দর

📄 তার চরিত্র সুন্দর


প্রকৃত মুসলমানের চরিত্র সুন্দর। সে নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলে। কারণ, এটাই ইসলামের শিক্ষা ও রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ।
রাসুলুল্লাহ -এর খাদিম আনাস বর্ণনা করেন : كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا ‘উন্নত চরিত্রের বিচারে নবিজি ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ। '৩৫৮
এখানে আনাস রাসুলুল্লাহ-এর প্রতি ভালোবাসাবশত মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। তিনি আসলেই রাসুলুল্লাহ-এর মাঝে অদৃশ্যপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব উত্তম চরিত্রের সমাহার দেখেছিলেন।
অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন: خَدَمْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي: أُفَّ، وَلَا : لِمَ صَنَعْتَ؟ وَلَا : أَلَّا صَنَعْتَ ‘আমি দশ বছর যাবৎ নবিজি-এর খিদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে “উফ” পর্যন্ত বলেননি। “এটা কেন করেছ, ওটা কেন করোনি”-এমন কথাও কোনোদিন বলেননি। '৩৫৯
আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ অশ্লীলভাষী ছিলেন না। তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বারবার বলতেন :
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا 'তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর, তারাই সর্বোত্তম।'৩৬০
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : إِنَّ الْفُحْشَ، وَالتَّفَحُشَ لَيْسَا مِنَ الْإِسْلَامِ، وَإِنَّ أَحْسَنَ النَّاسِ إِسْلَامًا، أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا 'অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা এবং অশ্লীলতার আশ্রয় গ্রহণ করা ইসলামে নেই। সেই ব্যক্তির ইসলাম সবচেয়ে সুন্দর, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।'৩৬১
অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ التَّرْتَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ 'নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে বেশি সুন্দর, তারাই আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং তারাই কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করবে। আর যারা বেশি কথা বলে, কথা বলতে বলতে মানুষকে বিরক্ত করে ফেলে এবং অহংকার করে, তাদের আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি এবং তারা কিয়ামতের দিন আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে।'৩৬২
সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ-এর চারিত্রিক মাধুর্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর দেখাদেখি তাঁরাও সেসব চরিত্র অবলম্বন করেছিলেন।
এভাবে মানবজাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন একটি আদর্শ সমাজ গড়ে উঠেছিল।
আনাস রা. বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَحِيمًا، وَكَانَ لَا يَأْتِيهِ أَحَدٌ إِلَّا وَعَدَهُ، وَأَنْجَزَ لَهُ إِنْ كَانَ عِنْدَهُ، وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ، وَجَاءَهُ أَعْرَابِيُّ فَأَخَذَ بِثَوْبِهِ فَقَالَ: إِنَّمَا بَقِيَ مِنْ حَاجَتِي يَسِيرَةُ، وَأَخَافُ أَنْسَاهَا، فَقَامَ مَعَهُ حَتَّى فَرَغَ مِنْ حَاجَتِهِ، ثُمَّ أَقْبَلَ فَصَلَّى
‘নবিজি ﷺ ছিলেন অতি দয়ালু। তাঁর কাছে যে ব্যক্তিই আসত, তিনি তাকেই দানের প্রতিশ্রুতি দিতেন। তাঁর কাছে তৎক্ষণাৎ দেওয়ার মতো কিছু থাকলে সাথে সাথে সে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতেন। একদিন নামাজের ইকামত শেষ হয়েছে, এমন সময় জনৈক বেদুইন তাঁর কাপড় টেনে ধরে বললেন, আমার সামান্য একটি কাজ রয়ে গেছে এবং তার কথা আমি ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। তখন নবিজি ﷺ তাঁর সাথে গেলেন এবং তার কাজ সম্পন্ন করলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন।’৩৬৩
নামাজের ইকামত হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলুল্লাহ ﷺ বেদুইন লোকটার কথা শুনতে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। বেদুইন লোকটা যে তাঁর কাপড় টেনে ধরলেন এবং নামাজের আগেই প্রয়োজন পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করলেন, এতেও তিনি বিরক্ত হননি। কারণ, তাঁর মাঝে অনুপম চরিত্রের সমাবেশ ছিল। সকল উত্তম গুণ তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল। কথা ও কাজের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে তা শিখিয়ে গেছেন তিনি। সুখ ও সমৃদ্ধিময় সমাজগঠনে তাঁর শিখিয়ে যাওয়া চরিত্রগুলোর বিকল্প নেই কোথাও।
অমুসলিমদের মাঝে তখনই উত্তম চরিত্র আসে, যখন তাকে উত্তমরূপে লালনপালন করা হয় এবং উন্নত শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু مسلمانوں স্বয়ং তাদের ধর্মই চরিত্র শিক্ষা দেয়। ইসলাম ধর্ম উত্তম চরিত্রকে এত মর্যাদা দেয়।
দিয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আমল পরিমাপের পাল্লায় এটাই সবচেয়ে ভারী হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَا شَيْءٌ أَنْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ، وَإِنَّ اللَّهَ لَيُبْغِضُ الفَاحِشَ البَدِيءَ
'কিয়ামাতের দিন মুমিনের (আমল পরিমাপের) পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো বস্তু রাখা হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও দুশ্চরিত্র লোকের প্রতি বেজায় অসন্তুষ্ট।'৩৬৪
শুধু তাই নয়, ইসলাম উত্তম চরিত্রকে ইমানের পূর্ণতা আখ্যা দিয়েছে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ xُلُقًا
'মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তির ইমানই সবচেয়ে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সর্বোত্তম।'৩৬৫
এ ছাড়াও উত্তম চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তিকে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা বলা হয়েছে। যেমন উসামা বিন শুরাইক -এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
'আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে স্থির হয়ে বসে ছিলাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছিল না। এমন অবস্থায় কিছু লোক এসে জিজ্ঞাসা করল, আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা কে? রাসুলুল্লাহ ﷺ উত্তর দিলেন, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।'৩৬৬
উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার কারণ হলো, উত্তম চরিত্র ইসলামের অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অধিকন্তু ইতিপূর্বে আমরা হাদিসও পড়ে এসেছি যে, 'কিয়ামতের দিন মুমিনের আমল পরিমাপের পাল্লায় এটিই সর্বাধিক ভারী বস্তু হবে।' এ ছাড়াও হাদিস শরিফে উত্তম চরিত্রকে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দুই রুকন নামাজ ও রোজার সমান বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ صَاحِبَ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ '(আমল পরিমাপের) পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো বস্তু রাখা হবে না। আর উত্তম চরিত্রের কারণে বান্দা (নফল) রোজাদার ও (নফল) নামাজ আদায়কারীর সমান মর্যাদায় পৌঁছে যায়। '৩৬৭
এজন্যই রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে উত্তম চরিত্র অবলম্বন করার প্রতি বেশি জোর দিতেন। কথা ও কাজের মাধ্যমে তাঁদের উত্তম চরিত্রের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন।
এক হাদিসে এসেছে, তিনি আবু জার -কে বললেন :
يَا أَبَا ذَرٍّ، أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى خَصْلَتَيْنِ هُمَا أَخَفُ عَلَى الظَّهْرِ وَأَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ غَيْرِهَا؟ قَالَ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ. قَالَ: «عَلَيْكَ بِحُسْنِ الْخُلُقِ وَطُولِ الصَّمْتِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، مَا تَجَمَّلَ الْخَلَائِقُ بِمِثْلِهِمَا 'হে আবু জার, আমি কি তোমাকে এমন দুটি বিষয় জানিয়ে দেবো, যা খুবই হালকা কিন্তু (আমল পরিমাপের) পাল্লায় সবচেয়ে ভারী? তিনি বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ বললেন, উত্তম চরিত্র অবলম্বন করো এবং (অহেতুক কথা বলা থেকে) চুপ থাকো। কেননা, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য এই দুই বিষয়ের মাঝেই নিহিত। '৩৬৮
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْخُلُقِ نَمَاءُ، وَسُوءُ الْخُلُقِ شُومُ، وَالْبِرُّ زِيَادَةُ فِي الْعُمُرِ، وَالصَّدَقَةُ تَمْنَعُ مِيتَةَ السَّوْءِ
'উত্তম চরিত্র উন্নতির কারণ, আর খারাপ চরিত্র অশুভ পরিণাম ডেকে আনে। উত্তম আমল বয়স বৃদ্ধি করে এবং সদকা খারাপ মৃত্যু থেকে বাঁচায়।'৩৬৯
রাসুলুল্লাহ-এর একটি দুআ ছিল : اللَّهُمَّ حَسَّنْتَ خَلْقِي فَأَحْسِنُ خُلُقِي 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গঠন সুন্দর করেছেন; সুতরাং আমার চরিত্রও সুন্দর করে দিন।'৩৭০
লক্ষ করুন, রাসুলুল্লাহ উত্তম চরিত্রের জন্য দুআ করতেন; অথচ তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।'৩৭১ এ থেকে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার আধিক্য প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া তিনি খুব করে চাইতেন যে, উম্মত যেন অধিক হারে উত্তম চরিত্র অবলম্বন করে। এজন্য তার গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তা অর্জন করার দুআও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাহকে।
'উত্তম চরিত্র' একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। মানুষের সকল সুন্দর ও উত্তম গুণাবলি—যেগুলো মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির পরিচয় বহন করে—সবগুলোকে এ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করে। লজ্জা, সহনশীলতা, ক্ষমাগুণ, নম্রতা, বদান্যতা, মানবিকতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, কল্যাণকামিতা, অটলতা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সকল উত্তম গুণ 'উত্তম চরিত্র'-এর অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামি সমাজবিষয়ক কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করতে গেলে অনুভব হয়, উল্লিখিত গুণাবলির প্রতি ইসলাম কতটা গুরুত্ব দিয়েছে! এগুলো অবলম্বন করার প্রতি মুসলমানদের কীরূপ উদ্বুদ্ধ করেছে!! আসলে একটি আদর্শ সমাজ গঠনে কী কী প্রয়োজন, তার সবটুকুই ইসলাম বাতলে দিয়েছে। এ গুণগুলো তারই অন্তর্ভুক্ত। আদর্শ সমাজ গঠনের এত সুন্দর রূপরেখা ও পদ্ধতি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম প্রণয়ন করতে পারেনি।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তার ভেতর লজ্জাবোধ আছে

📄 তার ভেতর লজ্জাবোধ আছে


প্রকৃত মুসলমান লাজুক হয়। কেননা, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ লজ্জাশীলতার মূর্তপ্রতীক ছিলেন।
আবু সাইদ খুদরি রা. বর্ণনা করেন :
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَشَدَّ حَيَاءً مِنَ العَذْرَاءِ فِي خِدْرِهَا، فَإِذَا رَأَى شَيْئًا يَكْرَهُهُ عَرَفْنَاهُ فِي وَجْهِهِ
‘নবিজি ﷺ কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। অপছন্দনীয় কোনো বিষয়ের প্রতি যখন তার নজর পড়ত, (তিনি লজ্জার কারণে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারতেন না, কিন্তু) আমরা তাঁর চেহারায় তার লক্ষণ দেখতে পেতাম।’৩৭২
লজ্জা এমন একটি গুণ, যা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই বিভিন্ন হাদিসে লজ্জাকে কল্যাণ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
ইমরান বিন হুসাইন রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
الحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ
‘লজ্জা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে।’৩৭৩
মুসলিম শরিফের অপর বর্ণনায় এসেছে:
الحَيَاءُ خَيْرُ كُلُّهُ قَالَ: أَوْ قَالَ: الْحَيَاءُ كُلُّهُ خَيْرُ
'লজ্জা পুরোটাই কল্যাণজনক অথবা বলেছেন, লজ্জা সকল কল্যাণের উৎস। '৩৭৪
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
الْإِيمَانُ بِضْعُ وَسَبْعُونَ - أَوْ بِضْعُ وَسِتُّونَ - شُعْبَةٌ، فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةُ مِنَ الْإِيمَانِ
'ইমানের সাতাত্তর বা সাতষট্টিরও অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। '৩৭৫
প্রকৃত মুসলমান ভদ্র স্বভাবের হয়। তার থেকে খারাপ কাজ প্রকাশ পায় না। কোনো মানুষকে সে কষ্ট দেয় না। কারও অধিকার হরণ করে না। এসবের কারণ হলো, প্রকৃত মুসলমানের মাঝে লজ্জার গুণ সক্রিয় থাকে। তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ থাকে। লজ্জা পরিত্যাগ করে সে ইমানকে অঙ্গহীন করতে চায় না। কারণ, লজ্জা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আসলে এই বোধটাই মানুষের অন্তরে লজ্জাকে জিইয়ে রাখে।
এ উত্তম চরিত্রগুলো অনেক সময় অমুসলিমদের মাঝেও পাওয়া যায়, তবে ইখলাস, অটলতা ও ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে مسلمانوں সাথে এদের পার্থক্য সৃষ্টি হয়। যত কঠিন সময়ই আসুক এবং যত কঠিন অবস্থার মুখোমুখিই হোক-প্রকৃত মুসলমান এসব অভ্যাস পরিত্যাগ করে না। আর লজ্জার ক্ষেত্রে অন্যরা লজ্জা পায় কেবল মানুষকে। তাই যখন একাকী থাকে, তখন গুনাহ বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে না। কিন্তু প্রকৃত মুসলমান মানুষকে যেমন লজ্জা পায়, তার চেয়েও অধিক লজ্জা পায় আল্লাহকে। তাই একাকিত্বের মুহূর্তেও সে গুনাহ থেকে বিরত থাকে। আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধই লজ্জার গুণে গুণান্বিত প্রকৃত মুসলমানকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মানুষের সাথে কোমল আচরণ করে

📄 মানুষের সাথে কোমল আচরণ করে


প্রকৃত মুসলমান কোমলতা ও নম্রতার গুণে গুণান্বিত হয়। কেননা, এ গুণটি মুমিনের উত্তম স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত, যা বান্দার মাঝে থাকাটা আল্লাহ পছন্দ করেন। তা ছাড়া এ গুণটির কারণে মানুষ সমাজে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।
পবিত্র কুরআনে এ গুণ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ - وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَقٌّ عَظِيمٍ 'সমান নয় ভালো ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান।'৩৭৬
একাধিক হাদিসে কোমলতা ও বিনম্রতার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং তা অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক জীবনের জন্য এ গুণটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এসব হাদিস থেকে তা অনুমান করা যায়। তা ছাড়া স্বয়ং আল্লাহ-ই এই গুণে গুণান্বিত।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে : إِنَّ اللهَ رَفِيقُ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ 'নিশ্চয় আল্লাহ কোমল। তিনি সব বিষয়ে কোমলতাকে পছন্দ করেন। ৩৭৭
এটি এমন এক উত্তম চরিত্র, যার কারণে আল্লাহ তাআলা এমন সাওয়াব দান করেন, যা অন্য কোনো গুণের কারণে দান করেন না।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে: إِنَّ اللهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ، وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ، وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ
'নিশ্চয় আল্লাহ কোমল। তিনি কোমলতাকে পছন্দ করেন। আর কোমলতার কারণে এমন সাওয়াব দান করেন, যা রুষ্টতা বা অন্য কোনো কারণে দান করেন না।'৩৭৮
শুধু এতটুকুই নয়; বরং রাসুলুল্লাহ এ গুণটিকে প্রত্যেক বিষয়ের সৌন্দর্যের কারণ আখ্যা দিয়ে বলেন: إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
'নিশ্চয় কোমলতা যখন কোনো বিষয়ের সাথে থাকে, তখন সেটাকে সুন্দর করে তোলে; আর যখন কোনো বিষয় থেকে কোমলতা দূর হয়ে যায়, তখন তা অসুন্দর হয়ে পড়ে। '৩৭৯
রাসুলুল্লাহ কথার মাধ্যমে যেভাবে কোমলতার প্রতি উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তেমনই কাজের মাধ্যমেও কোমলতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
হাদিস শরিফে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে: قَامَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي المَسْجِدِ، فَتَنَاوَلَهُ النَّاسُ، فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: دَعُوهُ وَهَرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ، أَوْ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ، فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ، وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ
'এক বেদুইন লোক মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করে দিল। উপস্থিত সাহাবিগণ তাকে মারার জন্য উদ্যত হলে নবিজি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে পরিষ্কার করে নাও। কেননা, তোমরা কোমলতা প্রদর্শন করার জন্য প্রেরিত হয়েছ, কঠোরতা দেখানোর জন্য নয়। '৩৮০
নম্রতা ও কোমলতা মানুষের পাষাণ হৃদয়ও গলিয়ে দিতে পারে। খুলে ফেলতে পারে অন্তরের বদ্ধতালা। কঠোরতা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যা কখনো সম্ভব হয় না। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ হকের প্রতি লোকদের আহ্বান করার ক্ষেত্রে কোমলতার পন্থা অবলম্বন করতেন। এ ব্যাপারে উম্মতকেও একই নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তিনি।
তিনি ইরশাদ করেছেন : بَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا، وَيَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا 'সুসংবাদ দাও, আতঙ্কিত কোরো না; সহজ করো, কঠিন কোরো না। ৩৮১
এর কারণ হলো, মানুষ কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের লোকদের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তাদের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। পক্ষান্তরে কোমল ও নরম স্বভাবের মানুষের সাথে মানুষ স্বস্তি অনুভব করে। তাদের কাছাকাছি থাকতে চায়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহ তাআলা রুক্ষ স্বভাবের না হতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন : وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ 'পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। '৩৮২
এটাই সর্বযুগের দ্বীনের দায়িদের স্বভাব ছিল। কারণ, এর মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করা সহজ হয়। এজন্য মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালাম-কেও আল্লাহ তাআলা নম্র কথার মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى - فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
'তোমরা উভয়ে ফিরআওনের কাছে যাও; সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বলো। এতে হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।'৩৮৩
মোটকথা, নম্রতা ও কোমলতার মধ্যে রয়েছে কল্যাণই কল্যাণ। যার মাঝে এ গুণ আছে, তার মাঝে কল্যাণ আছে। আর যার ভেতর কোমলতা নেই, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।
জারির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
مَنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ، يُحْرَمِ الْخَيْرَ
'যে নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।'৩৮৪
অন্য হাদিসে আয়িশা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন :
يَا عَائِشَةُ، ارْفُقِي، فَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَرَادَ بِأَهْلِ بَيْتٍ خَيْرًا، دَلَّهُمْ عَلَى بَابٍ الرفق
'হে আয়িশা, নম্রতার গুণে গুণান্বিত হও। কেননা, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো পরিবারের সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদের নম্রতার দিকে পথ প্রদর্শন করেন।'৩৮৫
অপর এক বর্ণনায় আছে:
إِذَا أَرَادَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِأَهْلِ بَيْتٍ خَيْرًا، أَدْخَلَ عَلَيْهِمُ الرِّفْقَ
'যখন আল্লাহ কোনো পরিবারের সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদের মাঝে নম্রতার গুণ ঢুকিয়ে দেন। '৩৮৬
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ خَيْرًا أَدْخَلَ عَلَيْهِمُ الرِّفْقَ
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতির সাথে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তাদেরকে নম্রতার গুণ দান করেন। '৩৮৭
নম্রতা এমন এক উত্তম গুণ, যা অবলম্বন করলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيِّنٍ سَهْلٍ
'আমি কি তোমাদের এমন ব্যক্তির পরিচয় দেবো না, যে জাহান্নামের জন্য হারাম আর জাহান্নাম তার জন্য হারাম? প্রত্যেক মিশুক, নম্র, কোমল ও সহজ সরল ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম। '৩৮৮
ইসলাম শুধু মানবের প্রতি নম্র হওয়ার কথা বলে না; বরং প্রত্যেক জীবের প্রতিই নম্রতার সবক দেয়। আর এটাকে 'ইহসান' (উত্তমরূপে আমল করা) এর অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, যা সাধারণত নেককার ও পরহেজকার লোকদের মাঝে থাকে।
এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ বলেন: إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ
‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিষয়ের মধ্যে ইহসান বাধ্যতামূলক করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন (হদ বা কিসাস হিসাবে) কাউকে হত্যা করবে, তখন উত্তমরূপে হত্যা করবে। আর যখন কোনো জন্তু জবাই করবে, তখন উত্তমরূপে জবাই করবে। তার জন্য জবাই করার পূর্বে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেবে এবং জবাইকৃত জন্তুকে যথাসম্ভব আরাম দেবে। ১৩৮৯
বাকহীন পশুর প্রতি এ দয়াপ্রদর্শন জবাইকারীর কোমলতা গুণের পরিচায়ক। বুঝা গেল, এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ জীবজন্তুর প্রতিও কোমল হওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 দয়ালু

📄 দয়ালু


প্রকৃত মুসলমান দয়ালু হয়। তার হৃদয় থেকে অনবরত প্রবাহিত হয় দয়া ও করুণার ফল্গুধারা। কারণ, সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে আসমানবাসী (আল্লাহ) তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন : ارْحَمْ مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكَ مَنْ فِي السَّمَاءِ ‘পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো; তাহলে আসমানের ওপর যিনি আছেন (আল্লাহ), তিনিও তোমার প্রতি দয়া করবেন।’৩৯০
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: مَنْ لَمْ يَرْحَمِ النَّاسَ لَمْ يَرْحَمُهُ اللَّهُ ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না।’৩৯১
আরেক হাদিসে এসেছে :
إِنَّ الرَّحْمَةَ لَا تُنْزَعُ إِلَّا مِنْ شَقِيٌّ 'দয়া থাকে না শুধু কপালপোড়াদের অন্তরে।'৩৯২
প্রকৃত মুসলমানের দয়ার পরিধি শুধু স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের অন্তর্ভুক্ত করে তা নয়; বরং সকল মানুষকেই অন্তর্ভুক্ত করে। সকলের প্রতিই সে দয়া করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ রহমতের ব্যাপকতাকে ইমানের শর্ত বলেছেন।
এ সম্পর্কে আবু মুসা আশআরি থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تَرَاحَمُوا قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، كُلُّنَا رَحِمٌ، قَالَ: «إِنَّهُ لَيْسَ بِرَحْمَةٍ أَحَدُكُمْ خَاصَّتَهَ، وَلَكِنْ رَحْمَةُ الْعَامَّةِ» 'তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না পরস্পরকে দয়া করবে। সাহাবিগণ বললেন, আমরা সবাই তো দয়াবান। তিনি বললেন, শুধু প্রিয়জনদের প্রতি দয়া করলে হবে না; বরং সাধারণভাবে সকল মানুষের প্রতিই দয়া করতে হবে।'৩৯৩
ব্যাপকভাবে দয়া প্রদর্শনের এ শিক্ষা ইসলাম এজন্যই দিয়ে থাকে, যেন এর মাধ্যমে ভালোবাসায় ভরপুর একটি সমাজ গড়ে ওঠে। যে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের অন্তরে অপর সদস্যদের প্রতি থাকবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নিখাদ সহমর্মিতা ও গভীর সৌহার্দ্য।
রাসুলুল্লাহ নিজেই দয়ার অনন্য উদাহরণ ছিলেন। দয়ার গুণ তাঁর মননে ও দেহের প্রতিটি রক্তক্ষণিকায় মিশ্রিত ছিল। তাঁর দয়া-সম্পর্কিত কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো।
আনাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেন:
إِنِّي لَأَدْخُلُ الصَّلَاةَ أُرِيدُ إِطَالَتَهَا فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأُخَفِّفُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ بِهِ
'আমি নামাজ শুরু করে তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা করলাম। এমতাবস্থায় আমি একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেলাম। তখন তার মায়ের (ওই মা রাসুলুল্লাহ-এর পেছনে নামাজ আদায় করছিলেন) অস্থিরতার কথা চিন্তা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করলাম।'৩৯৪
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَ أَعْرَابِيُّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَتُقَبِّلُونَ صِبْيَانَكُمْ؟ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَوَ أَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ؟»
'জনৈক বেদুইন নবিজি-এর নিকট এসে বললেন, আপনারা দেখি, বাচ্চাদের চুমু খান! আমরা তো আমাদের বাচ্চাদের চুমু খাই না। তখন নবিজি বললেন, তোমাদের অন্তর থেকে আল্লাহ দয়ামায়া তুলে নিয়েছেন বলে কি আমাদের অন্তর থেকেও তুলে নেবেন?'৩৯৫
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন :
قَبَّلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الحَسَنَ بْنَ عَلِيَّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسِ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الْأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ»
'রাসুলুল্লাহ হাসান-কে চুমু খেলেন। তখন তাঁর নিকট আকরা বিন হাবিস তামিমি ছিলেন। তিনি বললেন, আমার দশটি বাচ্চা আছে, আমি তাদের কখনো চুমু খাইনি। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, যে দয়া (আদর-স্নেহ) করে না, তাকে দয়া করা হবে না। '৩৯৬
উমর এক ব্যক্তিকে مسلمانوں একটি জনপদের প্রশাসক বানাতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় আকরা বিন হাবিস বললেন, এ ব্যক্তি তো তার বাচ্চাদের চুমু খায় না। তখন উমর তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে বললেন, তোমার অন্তরে তো সন্তানদের প্রতিই দয়া নেই, জনগণের প্রতি দয়া কোত্থেকে আসবে? আল্লাহর কসম, আমি কখনো তোমাকে কোনো দায়িত্ব দেবো না। তারপর নিয়োগপত্রটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন।
রাসুলুল্লাহ দয়ার পরিধি আরও বিস্তৃত করে জীবজন্তুর প্রতি দয়াপরায়ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন উপদেশবাণী ও শিক্ষণীয় ঘটনা বলে অবুঝ জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقِ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ، فَوَجَدَ بِثْرًا، فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ، ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَتُ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَقَالَ الرَّجُلُ لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبَ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي، فَنَزَلَ الْبِئْرَ فَمَلَا خُفَّهُ مَاءً، ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ حَتَّى رَقِيَ فَسَقَى الْكَلْبَ فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنَّ لَنَا فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ لَأَجْرًا؟ فَقَالَ: فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ
'এক ব্যক্তি পথ চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লেগে গেল। কূপ দেখতে পেল। কূপে নেমে সে পানি পান করল। অতঃপর ওপরে উঠে আসলো। তখন সে দেখল, একটা কুকুর জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসার কারণে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে বলল, পিপাসায় কুকুরটির এমনই অবস্থা হয়েছে, যেমনটি ইতিপূর্বে আমার হয়েছিল। অতঃপর সে কূপে নেমে মোজায় পানি ভরল এবং মুখ দিয়ে তা কামড়ে ধরে ওপরে উঠে আসলো। তারপর কুকুরকে পানি পান করতে দিল। তার এ কাজ আল্লাহ তাআলা ভীষণ পছন্দ করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, জীবজন্তুরে পানাহার করানোতেও কি আমাদের সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর সেবা-যত্নেই সাওয়াব রয়েছে। '৩৯৭
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ বলেন:
عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ، لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا، إِذْ حَبَسَتْهَا، وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ
'একটি বিড়াল মারার কারণে একটি নারীকে আজাব দেওয়া হয়েছে। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, ফলে (খাবার খেতে না পেরে) বিড়ালটি মারা যায়। এ কারণেই সে জাহান্নামে গেছে। যখন সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল, তখন সে এটাকে না দিয়েছিল খাবার, না দিয়েছিল পানি; আর না তাকে ছেড়ে দিয়েছিল, যেন বাইরে গিয়ে কীটপতঙ্গ খেতে পারে। '৩৯৮
আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَزَلَ مَنْزِلًا فَأَخَذَ رَجُلٌ بَيْضَ حُمَّرَةٍ، فَجَاءَتْ تَرِفُ عَلَى رَأْسِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَيُّكُمْ فَجَعَ هَذِهِ بِبَيْضَتِهَا ؟ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا أَخَذْتُ بَيْضَتَهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ارْدُدْ، رَحْمَةً لَهَا»
নবিজি একদা সফরকালে যাত্রাবিরতি করলেন। তখন এক ব্যক্তি হুম্মারা পাখির ডিম (তার নীড় থেকে) পেড়ে আনলেন। পাখিটি তখন রাসুলুল্লাহ -এর মাথার ওপর দিয়ে উড়তে লাগল। নবিজি বললেন, তোমাদের মধ্য থেকে কে পাখিটির ডিম পেড়ে এনে ওকে ব্যথাতুর করেছে? এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ওর ডিম পেড়ে এনেছি। তিনি বললেন, ওর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ওর ডিম রেখে এসো।'৩৯৯
রাসুলুল্লাহ মানুষের প্রতি যেমন দয়ালু ছিলেন, তেমনই অন্যান্য প্রাণীর প্রতিও দয়ালু ছিলেন। কথা ও কাজের মাধ্যমে मुसलमानोंও তিনি সেই শিক্ষা দিয়েছেন। তাই প্রকৃত মুসলমান হতে হলে আমাদের মাঝে অবশ্যই দয়া থাকতে হবে। তা ছাড়া পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করলে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি দয়া করবেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
ارْحَمْ مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمُكَ مَنْ فِي السَّمَاءِ
'জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো; তাহলে আসমানে যিনি আছেন (অর্থাৎ আল্লাহ) তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।'৪০০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00