📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 হিংসুক নয়

📄 হিংসুক নয়


যেসব খারাপ অভ্যাস থেকে দ্বীনদার মুসলমানদের বেঁচে থাকা জরুরি, তার একটি হচ্ছে হাসাদ বা হিংসা। রাসুলুল্লাহ এ অভ্যাস থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدِ الْإِيمَانُ وَالْحَسَدُ 'কোনো বান্দার অন্তরে ইমান ও হিংসা একত্র হয় না।'৩৪৩
দামরা বিন সালাবা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَتَحَاسَدُوا
'মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর হিংসা করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকে। '৩৪৪
প্রকৃত মুসলমান নিজেকে প্রতারণা ও হিংসা থেকে, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্বেষ থেকে বিরত রাখে। এসব খারাপ অভ্যাস থেকে যে বিরত থাকে, সে অধিক নফল ইবাদতকারী না হলেও জান্নাতে যাবে।
এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ও ইমাম নাসায়ি আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
كُنَّا جُلُوسًا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَطَلَعَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، تَنْطِفُ لِحِيَتُهُ مِنْ وُضُوئِهِ، قَدْ تَعَلَّقَ نَعْلَيْهِ فِي يَدِهِ الشَّمَالِ، فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ ذَلِكَ، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ مِثْلَ الْمَرَّةِ الْأُولَى. فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الثَّالِثُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ مَقَالَتِهِ أَيْضًا، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ عَلَى مِثْلِ حَالِهِ الْأُولَى، فَلَمَّا قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَبِعَهُ عَبْدُ اللهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ فَقَالَ: إِنِّي لَاحَيْتُ أَبِي فَأَقْسَمْتُ أَنْ لَا أَدْخُلَ عَلَيْهِ ثَلَاثًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُؤْوِيَنِي إِلَيْكَ حَتَّى تَمْضِيَ فَعَلْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ أَنَسُ : وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ يُحَدِّثُ أَنَّهُ بَات مَعَهُ تِلْكَ اللَّيَالِي الثَّلَاثَ، فَلَمْ يَرَهُ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّهُ إِذَا تَعَارَّ وَتَقَلَّبَ عَلَى فِرَاشِهِ ذَكَرَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَبَّرَ، حَتَّى يَقُومَ لِصَلَاةِ الْفَجْرِ. قَالَ عَبْدُ اللهِ: غَيْرَ أَنِّي لَمْ أَسْمَعْهُ يَقُولُ إِلَّا خَيْرًا، فَلَمَّا مَضَتِ الثَّلَاثُ لَيَالٍ وَكِدْتُ أَنْ أَحْقِرَ عَمَلَهُ، قُلْتُ: يَا عَبْدَ اللَّهِ إِنِّي لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَ أَبِي غَضَبٌ وَلَا هَجْرُ ثَمَّ ، وَلَكِنْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَكَ ثَلَاثَ مِرَارٍ: يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَطَلَعْتَ أَنْتَ الثَّلَاثَ مِرَارٍ، فَأَرَدْتُ أَنْ آوِيَ إِلَيْكَ لِأَنْظُرَ مَا عَمَلُكَ، فَأَقْتَدِيَ بِهِ، فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَثِيرَ عَمَلٍ، فَمَا الَّذِي بَلَغَ بِكَ مَا قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ. قَالَ: فَلَمَّا وَلَّيْتُ دَعَانِي، فَقَالَ : مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ، غَيْرَ أَنِّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غِشًا، وَلَا أَحْسُدُ أَحَدًا عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللهُ إِيَّاهُ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ، وَهِيَ الَّتِي لَا نُطِيقُ
‘আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে উপবিষ্ট ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি বললেন, এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতি ব্যক্তির আগমন ঘটবে। তখন একজন আনসারি সাহাবি আসলেন, যার দাড়ি থেকে অজুর পানি ঝরছিল এবং তিনি বাম হাতে পায়ের জুতো বহন করছিলেন। পরের দিনও নবিজি ﷺ একই কথা বললেন। এইদিনে সে একই ব্যক্তি প্রথমদিনের মতো করে আসলেন। তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। নবিজি ﷺ যখন মজলিস থেকে উঠলেন, তখন আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস র্‌ লোকটির পিছু নিলেন। তার কাছে গিয়ে বললেন, আমি পিতার সাথে ঝগড়া করেছি এবং কসম করেছি যে, তিন দিন তার কাছে যাব না। আপনি কি এ সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাকে আপনার কাছে থাকতে দেবেন? লোকটি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আনাস র্‌ বলেন, তার কাছে তিন রাত থাকার পর আব্দুল্লাহ র্‌ বলেন, আমি তাকে রাতে নফল নামাজ পড়তে দেখিনি। তবে যখন ঘুম ভেঙে যেত এবং পাশ পরিবর্তন করতেন, তখন আল্লাহর জিকির করতেন এবং তাকবির বলতেন। এরপর ফজরের নামাজের জন্য উঠতেন। আমি তাকে উত্তম কথা ছাড়া কড়া কথা বলতে দেখিনি। যখন তিনদিন পূর্ণ হলো, আমার মনে হচ্ছিল এ ব্যক্তি তো খুব কমই আমল করে। তাই আমি তাকে শোধালাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমি ও আমার পিতার মাঝে কোনোরূপ মনোমালিন্য ও সম্পর্কছিন্নতার ঘটনা ঘটেনি। আপনার কাছে আমার আসার কারণ হলো, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তিনবার এ কথা বলতে শুনেছি, তোমাদের সামনে এখন জান্নাতি লোকের আগমন ঘটবে। আর প্রতিবারেই আপনার আগমন ঘটেছে। তাই আমি আপনার কাছে এসে আপনি কী আমল করেন, তা দেখে নিজেও আমল করার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো তেমন বড় কোনো আমল করতে দেখলাম না! তাহলে আপনি কী এমন আমল করেন, যার কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ আপনার ব্যাপারে এমন কথা বলেছেন? তিনি বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া তো আমি আর কোনো আমল করি না। এরপর আমি (আব্দুল্লাহ) যখন ফিরে আসছিলাম, তখন ডেকে বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো আমল আমি করি না, তবে আমি অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না এবং কোনো বান্দাকে আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেছেন, তা দেখে তার প্রতি হিংসা করি না। তখন আব্দুল্লাহ বললেন, এটাই আপনাকে এমন উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিয়েছে এবং এই অভ্যাসটাই আমাদের ভেতর আনতে পারছি না। '৩৪৫
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি মন্দ স্বভাব থেকে অন্তর পরিষ্কার রাখা আখিরাতের কামিয়াবি নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর দরবারে মর্যাদা বৃদ্ধি করে। কারণ, তখন আমল কম হলেও তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। হাদিসে বর্ণিত লোকটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার কারণে এবং মানুষকে কষ্টদান থেকে বিরত থাকার কারণে কম আমল করেও জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন। পক্ষান্তরে, একটি মেয়ে—যে রাতে নফল ইবাদত করত এবং দিনে রোজা রাখত, কিন্তু প্রতিবেশীদের কষ্ট দিতো—তার সম্পর্কে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি উত্তরে বললেন : لَا خَيْرَ فِيهَا، هِيَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ অর্থাৎ ‘তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, সে নির্ঘাত জাহান্নামি।’৩৪৬
এর কারণ হলো, ইসলামের মানদণ্ডে ওই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠত্ব পায়, যে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাকার মন্দ স্বভাব থেকে পবিত্র হয়; যদিও তার ইবাদত কম হোক। ইবাদত কম হলেও এ ব্যক্তি ইসলামি সমাজের ভিত্তি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে শক্ত ও পরিচ্ছন্ন ইটের ন্যায়। পক্ষান্তরে যার অন্তরে এ মন্দ স্বভাবগুলো আছে, সে যত বেশি ইবাদত করুক, ইসলামি সমাজে তার উদাহরণ ফোকলা ইটের মতো, যার ওপর ইসলামি সমাজের ভিত্তি খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। অনেক সময় তা ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।
সত্যিকারের আদর্শ মুসলিম উত্তম ইবাদতের পাশাপাশি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখে এবং মানুষের সাথে লেনদেন ঠিক রেখে চলে। তার ভেতরের অবস্থা বাইরের অবস্থার অনুরূপ হয়। কথায় কাজে মিল থাকে। এ ধরনের মুসলমান দ্বারাই ইসলাম-নির্দেশিত আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে। যে সমাজ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী একটি প্রাসাদ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 কল্যাণকামী

📄 কল্যাণকামী


প্রকৃত মুসলমান উল্লিখিত মন্দ স্বভাবগুলো থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন ইতিবাচক গুণাবলি দ্বারাও সজ্জিত থাকে। তন্মধ্যে একটি উত্তম গুণ হলো, সমাজের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা। হাদিস শরিফে এটিকে দ্বীন অভিহিত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
‘দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য। '৩৪৭
সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ -এর হাতে নামাজ ও জাকাতের ব্যাপারে যেভাবে আনুগত্যের শপথ করেছিলেন, তেমনই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি কল্যাণকামিতার ব্যাপারেও আনুগত্যের শপথ করেছিলেন।
জারির বিন আব্দুল্লাহ বলেন :
بَايَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ
'আমি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা ও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। '৩৪৮
নামাজ ও জাকাতের সাথে مسلمانوں কল্যাণকামিতাকে যুক্ত করার কারণে ইসলামে এ বিষয়টির গুরুত্ব কতটুকু, তা অনুমান করা যায়। এজন্য যুগে যুগে প্রত্যেক আদর্শ মুসলমান এ গুণে গুণান্বিত ছিলেন।
কল্যাণকামিতার গুরুত্ব এতটুকুতেই শেষ নয়; বরং হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী এ কল্যাণকামিতার অভাবেই অনেক সময় মানুষ জাহান্নামে যাবে। যেমন এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللهُ رَعِيَّةً ، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشُ لِرَعِيَّتِهِ، إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
'যদি কোনো বান্দাকে আল্লাহ জনগণের শাসক নিযুক্ত করেন, আর সে তাদের অধিকার হরণ করে এবং খিয়ানতকারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।'৩৪৯
অপর রিওয়ায়াতে আছে:
فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ، إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ 'অতঃপর সে (শাসক) তাদের কল্যাণ কামনা করেনি, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৩৫০
মুসলিম শরিফের অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
مَا مِنْ أَمِيرٍ يَلِي أَمْرَ الْمُسْلِمِينَ، ثُمَّ لَا يَجْهَدُ لَهُمْ، وَيَنْصَحُ إِلَّا لَمْ يَدْخُلْ مَعَهُمُ الْجَنَّةَ 'যে ব্যক্তি মুসলমানদের যাবতীয় ব্যাপারে শাসক নিযুক্ত হয়ে তাদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিধান করল না, সে তাদের সাথে জান্নাতে যেতে পারবে না।'৩৫১
হাদিস শরিফের ভাষ্য থেকে বাহ্যিকভাবে কল্যাণকামিতা শাসকদের দায়িত্ব মনে হলেও এটি আসলে সকল মুসলমানের জন্যই প্রযোজ্য। কেননা, প্রত্যেক মুসলমান নিজের অধীনস্থ লোকের জিম্মাদার। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকই জিম্মাদার এবং প্রত্যেকই নিজেদের অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।' তাহলে বুঝা গেল, সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। এ দায়িত্ববোধ যতদিন মুসলমানদের মাঝে থাকবে, ততদিন ইসলামি আদর্শ সমাজ অটুট থাকবে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ওয়াদা রক্ষাকারী

📄 ওয়াদা রক্ষাকারী


প্রকৃত মুসলমানের আরেকটি উত্তম স্বভাব হলো ওয়াদা রক্ষা করা। যদি বলি, এটাই সমাজজীবনে মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তাহলে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।
অন্যান্য অনেক মানুষের মধ্যেও এ গুণটি আছে, তবে প্রকৃতপক্ষে এটি ইসলামি চরিত্র। তাই প্রকৃত আমলদার মুসলমানের মাঝে যখন এ গুণটি থাকে, তখন সে এ গুণের দিক দিয়ে সবার সেরা হয়ে ওঠে। এটিই তার ইমান ও ইসলামের পরিচয় বহন করে। অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে মুসলমানদের ওয়াদা রক্ষা করার গুণ অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটাকে ইমানি চরিত্র অভিহিত করা হয়েছে এবং ওয়াদা ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের আলামত বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ 'মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।'৩৫২
অন্য আয়াতে বলেন: وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا 'আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। '৩৫৩
আয়াত থেকে বুঝা গেল, ওয়াদা নিছক মুখের কথা নয়; বরং ওয়াদা একটি দায়িত্ব ও জিম্মাদারি। এটি অবশ্যই পালন করতে হবে। এটি সম্পর্কে কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশ হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মুসলমান এটিকে মৌখিক একটি আশ্বাস মনে করে। ওয়াদা রক্ষা করার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয় না। এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য খুবই দুঃখজনক বিষয়।
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন: وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدْتُمْ 'আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণ করো। '৩৫৪
এ আয়াতে ওয়াদাকে আল্লাহ নিজের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। এখান থেকে ওয়াদার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং তা পালন করা যে ওয়াজিব, তা অনুধাবন করা যায়।
অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।'৩৫৫
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, ওয়াদা পালন না করা আল্লাহর ক্রোধকে আবশ্যক করে, যা বান্দার জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ : إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
'মুনাফিকের আলামত তিনটি। এক. যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে। দুই. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। তিন. (তার কাছে) আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।'৩৫৬
সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে :
وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمُ
'...যদিও সে নামাজ-রোজা আদায় করে এবং নিজেকে মুসলমান দাবি করে।'৩৫৭
নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি ইবাদত পালন করলেই মানুষের ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় না। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হওয়ার জন্য ইসলামের উন্নত স্বভাব ও চরিত্রসমূহ অবলম্বন করাও বাঞ্ছনীয়। এজন্যই প্রকৃত মুসলমান এ চরিত্রগুলো অবলম্বন করে থাকে। মিথ্যা, ওয়াদাভঙ্গ, আমানতের খিয়ানত ইত্যাকার খারাপ স্বভাব থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রাখে। কেননা, এগুলো ইসলামি চরিত্রের পরিপন্থী এবং মুনাফিকদের স্বভাব।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তব যে, বর্তমান সময়ে অনেক চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ওয়াদা ভঙ্গ করার এ দোষ খুব বেশি পাওয়া যায়। যেকোনো বিষয়ে তারা চট করে ওয়াদা দিয়ে বসে, কিন্তু পালন করার ক্ষেত্রে খুবই শিথিলতা করে। আমানত জমা রাখার প্রতি খুব আগ্রহ দেখায়, কিন্তু তাতে বিনা দ্বিধায় খিয়ানত করে। এ ধরনের খারাপ অভ্যাস থেকে বাঁচা খুবই জরুরি। কারণ, এগুলো মুনাফিকদের স্বভাব। আর মুনাফিকদের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। তারা জাহান্নামের একদম নিচের স্তরে অবস্থান করবে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তার চরিত্র সুন্দর

📄 তার চরিত্র সুন্দর


প্রকৃত মুসলমানের চরিত্র সুন্দর। সে নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলে। কারণ, এটাই ইসলামের শিক্ষা ও রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ।
রাসুলুল্লাহ -এর খাদিম আনাস বর্ণনা করেন : كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا ‘উন্নত চরিত্রের বিচারে নবিজি ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ। '৩৫৮
এখানে আনাস রাসুলুল্লাহ-এর প্রতি ভালোবাসাবশত মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। তিনি আসলেই রাসুলুল্লাহ-এর মাঝে অদৃশ্যপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব উত্তম চরিত্রের সমাহার দেখেছিলেন।
অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন: خَدَمْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي: أُفَّ، وَلَا : لِمَ صَنَعْتَ؟ وَلَا : أَلَّا صَنَعْتَ ‘আমি দশ বছর যাবৎ নবিজি-এর খিদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে “উফ” পর্যন্ত বলেননি। “এটা কেন করেছ, ওটা কেন করোনি”-এমন কথাও কোনোদিন বলেননি। '৩৫৯
আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ অশ্লীলভাষী ছিলেন না। তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বারবার বলতেন :
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا 'তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর, তারাই সর্বোত্তম।'৩৬০
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : إِنَّ الْفُحْشَ، وَالتَّفَحُشَ لَيْسَا مِنَ الْإِسْلَامِ، وَإِنَّ أَحْسَنَ النَّاسِ إِسْلَامًا، أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا 'অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা এবং অশ্লীলতার আশ্রয় গ্রহণ করা ইসলামে নেই। সেই ব্যক্তির ইসলাম সবচেয়ে সুন্দর, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।'৩৬১
অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا، وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ التَّرْتَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ 'নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র সবচেয়ে বেশি সুন্দর, তারাই আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং তারাই কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করবে। আর যারা বেশি কথা বলে, কথা বলতে বলতে মানুষকে বিরক্ত করে ফেলে এবং অহংকার করে, তাদের আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি এবং তারা কিয়ামতের দিন আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে।'৩৬২
সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ-এর চারিত্রিক মাধুর্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর দেখাদেখি তাঁরাও সেসব চরিত্র অবলম্বন করেছিলেন।
এভাবে মানবজাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন একটি আদর্শ সমাজ গড়ে উঠেছিল।
আনাস রা. বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَحِيمًا، وَكَانَ لَا يَأْتِيهِ أَحَدٌ إِلَّا وَعَدَهُ، وَأَنْجَزَ لَهُ إِنْ كَانَ عِنْدَهُ، وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ، وَجَاءَهُ أَعْرَابِيُّ فَأَخَذَ بِثَوْبِهِ فَقَالَ: إِنَّمَا بَقِيَ مِنْ حَاجَتِي يَسِيرَةُ، وَأَخَافُ أَنْسَاهَا، فَقَامَ مَعَهُ حَتَّى فَرَغَ مِنْ حَاجَتِهِ، ثُمَّ أَقْبَلَ فَصَلَّى
‘নবিজি ﷺ ছিলেন অতি দয়ালু। তাঁর কাছে যে ব্যক্তিই আসত, তিনি তাকেই দানের প্রতিশ্রুতি দিতেন। তাঁর কাছে তৎক্ষণাৎ দেওয়ার মতো কিছু থাকলে সাথে সাথে সে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতেন। একদিন নামাজের ইকামত শেষ হয়েছে, এমন সময় জনৈক বেদুইন তাঁর কাপড় টেনে ধরে বললেন, আমার সামান্য একটি কাজ রয়ে গেছে এবং তার কথা আমি ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। তখন নবিজি ﷺ তাঁর সাথে গেলেন এবং তার কাজ সম্পন্ন করলেন। অতঃপর তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন।’৩৬৩
নামাজের ইকামত হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলুল্লাহ ﷺ বেদুইন লোকটার কথা শুনতে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। বেদুইন লোকটা যে তাঁর কাপড় টেনে ধরলেন এবং নামাজের আগেই প্রয়োজন পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করলেন, এতেও তিনি বিরক্ত হননি। কারণ, তাঁর মাঝে অনুপম চরিত্রের সমাবেশ ছিল। সকল উত্তম গুণ তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল। কথা ও কাজের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে তা শিখিয়ে গেছেন তিনি। সুখ ও সমৃদ্ধিময় সমাজগঠনে তাঁর শিখিয়ে যাওয়া চরিত্রগুলোর বিকল্প নেই কোথাও।
অমুসলিমদের মাঝে তখনই উত্তম চরিত্র আসে, যখন তাকে উত্তমরূপে লালনপালন করা হয় এবং উন্নত শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু مسلمانوں স্বয়ং তাদের ধর্মই চরিত্র শিক্ষা দেয়। ইসলাম ধর্ম উত্তম চরিত্রকে এত মর্যাদা দেয়।
দিয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আমল পরিমাপের পাল্লায় এটাই সবচেয়ে ভারী হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مَا شَيْءٌ أَنْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ، وَإِنَّ اللَّهَ لَيُبْغِضُ الفَاحِشَ البَدِيءَ
'কিয়ামাতের দিন মুমিনের (আমল পরিমাপের) পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো বস্তু রাখা হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও দুশ্চরিত্র লোকের প্রতি বেজায় অসন্তুষ্ট।'৩৬৪
শুধু তাই নয়, ইসলাম উত্তম চরিত্রকে ইমানের পূর্ণতা আখ্যা দিয়েছে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ xُلُقًا
'মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তির ইমানই সবচেয়ে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সর্বোত্তম।'৩৬৫
এ ছাড়াও উত্তম চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তিকে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা বলা হয়েছে। যেমন উসামা বিন শুরাইক -এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
'আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে স্থির হয়ে বসে ছিলাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছিল না। এমন অবস্থায় কিছু লোক এসে জিজ্ঞাসা করল, আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা কে? রাসুলুল্লাহ ﷺ উত্তর দিলেন, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।'৩৬৬
উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার কারণ হলো, উত্তম চরিত্র ইসলামের অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অধিকন্তু ইতিপূর্বে আমরা হাদিসও পড়ে এসেছি যে, 'কিয়ামতের দিন মুমিনের আমল পরিমাপের পাল্লায় এটিই সর্বাধিক ভারী বস্তু হবে।' এ ছাড়াও হাদিস শরিফে উত্তম চরিত্রকে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দুই রুকন নামাজ ও রোজার সমান বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ، وَإِنَّ صَاحِبَ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلَاةِ '(আমল পরিমাপের) পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো বস্তু রাখা হবে না। আর উত্তম চরিত্রের কারণে বান্দা (নফল) রোজাদার ও (নফল) নামাজ আদায়কারীর সমান মর্যাদায় পৌঁছে যায়। '৩৬৭
এজন্যই রাসুলুল্লাহ সাহাবিগণকে উত্তম চরিত্র অবলম্বন করার প্রতি বেশি জোর দিতেন। কথা ও কাজের মাধ্যমে তাঁদের উত্তম চরিত্রের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন।
এক হাদিসে এসেছে, তিনি আবু জার -কে বললেন :
يَا أَبَا ذَرٍّ، أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى خَصْلَتَيْنِ هُمَا أَخَفُ عَلَى الظَّهْرِ وَأَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ غَيْرِهَا؟ قَالَ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ. قَالَ: «عَلَيْكَ بِحُسْنِ الْخُلُقِ وَطُولِ الصَّمْتِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، مَا تَجَمَّلَ الْخَلَائِقُ بِمِثْلِهِمَا 'হে আবু জার, আমি কি তোমাকে এমন দুটি বিষয় জানিয়ে দেবো, যা খুবই হালকা কিন্তু (আমল পরিমাপের) পাল্লায় সবচেয়ে ভারী? তিনি বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ বললেন, উত্তম চরিত্র অবলম্বন করো এবং (অহেতুক কথা বলা থেকে) চুপ থাকো। কেননা, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য এই দুই বিষয়ের মাঝেই নিহিত। '৩৬৮
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন :
حُسْنُ الْخُلُقِ نَمَاءُ، وَسُوءُ الْخُلُقِ شُومُ، وَالْبِرُّ زِيَادَةُ فِي الْعُمُرِ، وَالصَّدَقَةُ تَمْنَعُ مِيتَةَ السَّوْءِ
'উত্তম চরিত্র উন্নতির কারণ, আর খারাপ চরিত্র অশুভ পরিণাম ডেকে আনে। উত্তম আমল বয়স বৃদ্ধি করে এবং সদকা খারাপ মৃত্যু থেকে বাঁচায়।'৩৬৯
রাসুলুল্লাহ-এর একটি দুআ ছিল : اللَّهُمَّ حَسَّنْتَ خَلْقِي فَأَحْسِنُ خُلُقِي 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গঠন সুন্দর করেছেন; সুতরাং আমার চরিত্রও সুন্দর করে দিন।'৩৭০
লক্ষ করুন, রাসুলুল্লাহ উত্তম চরিত্রের জন্য দুআ করতেন; অথচ তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।'৩৭১ এ থেকে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার আধিক্য প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া তিনি খুব করে চাইতেন যে, উম্মত যেন অধিক হারে উত্তম চরিত্র অবলম্বন করে। এজন্য তার গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তা অর্জন করার দুআও শিখিয়ে দিয়েছেন উম্মাহকে।
'উত্তম চরিত্র' একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। মানুষের সকল সুন্দর ও উত্তম গুণাবলি—যেগুলো মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির পরিচয় বহন করে—সবগুলোকে এ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করে। লজ্জা, সহনশীলতা, ক্ষমাগুণ, নম্রতা, বদান্যতা, মানবিকতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, কল্যাণকামিতা, অটলতা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সকল উত্তম গুণ 'উত্তম চরিত্র'-এর অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামি সমাজবিষয়ক কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করতে গেলে অনুভব হয়, উল্লিখিত গুণাবলির প্রতি ইসলাম কতটা গুরুত্ব দিয়েছে! এগুলো অবলম্বন করার প্রতি মুসলমানদের কীরূপ উদ্বুদ্ধ করেছে!! আসলে একটি আদর্শ সমাজ গঠনে কী কী প্রয়োজন, তার সবটুকুই ইসলাম বাতলে দিয়েছে। এ গুণগুলো তারই অন্তর্ভুক্ত। আদর্শ সমাজ গঠনের এত সুন্দর রূপরেখা ও পদ্ধতি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম প্রণয়ন করতে পারেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00