📄 সত্যবাদী
আদর্শ সামাজিক মুসলমান সবার সাথে সদা সত্য কথা বলে। কারণ, ইসলাম বলে, সত্য হচ্ছে সকল উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির মূল। সত্য মানুষকে পুণ্যের দিকে নিয়ে নিয়ে যায়, যা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়। আর মিথ্যা পাপাচারে নিমজ্জিত করে, যেখান থেকে সে সোজা জাহান্নামের গভীরে তলিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا
‘সত্য পুণ্যের পথ প্রদর্শন করে এবং পুণ্য জান্নাতের পথ দেখায়। কোনো ব্যক্তি সত্য বলতে থাকে; এমনকি তার নাম আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসাবে লেখা হয়। আর মিথ্যা পাপাচারের পথ প্রদর্শন করে এবং পাপাচার দোজখের পথ দেখায়। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলতে থাকে; একপর্যায়ে আল্লাহর কাছে তার নাম মিথ্যুক হিসাবে লেখা হয়।’ ৩৩৬
প্রকৃত মুসলমান সত্যবাদী হয়ে থাকে। তার কথা ও কাজ থেকে সত্য প্রকাশ পায়। কারণ, আল্লাহর কাছে সত্যবাদীদের তালিকায় নাম থাকা মানুষের জন্য অনেক মর্যাদার বিষয়।
📄 প্রতারক নয়
সত্যবাদী মুসলমান—যার নাম আল্লাহর দরবারে সত্যবাদী হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে—কখনো ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করে না। কারণ, সত্য ও সত্যবাদিতার দাবি হলো, পরোপকার ও ওয়াদা রক্ষা করা। প্রতারণা, খিয়ানত ও ধোঁকাবাজি সত্যবাদিতার পরিপন্থী।
প্রকৃত সত্যবাদী মুসলমান কখনো ধোঁকাবাজ ও প্রতারক হতে পারে না। কারণ, সে জানে, প্রতারণা মানুষকে ইসলামের পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السَّلَاحَ فَلَيْسَ مِنَّا، وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا 'যে আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।'৩৩৭
অপর হাদিসে এসেছে: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيهَا، فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلًا فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ؟ قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ، مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي»
'রাসুলুল্লাহ ﷺ খাদ্যদ্রব্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাতে হাত ঢুকিয়ে দিলে তার আঙুল ভিজে গেল। তখন তিনি বললেন, হে খাদ্যওয়ালা, এটা কী? খাদ্যওয়ালা উত্তর দিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, বৃষ্টির পানি পড়েছে। তিনি বললেন, তাহলে যেগুলো ভিজে গেছে, সেগুলো ওপরে তুলে দিচ্ছ না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পারে? (মনে রেখো,) যে ধোঁকাবাজি করে, সে আমার (আদর্শ উম্মতের) অন্তর্ভুক্ত নয়।'৩৩৮
প্রকৃত মুসলমানদের সমাজ পারস্পরিক ভালোবাসা ও পরোপকারিতায় ভরপুর থাকে। তার প্রত্যেক সদস্য সত্যবাদিতা ও ওয়াদা রক্ষা করার গুণে গুণান্বিত হয়। এ সমাজে গাদ্দার, ধোঁকাবাজ ও মিথ্যাবাদীদের কোনো স্থান থাকে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ধোঁকাবাজি, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। ধোঁকাবাজদের দুনিয়াতে مسلمانوں দল থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি তিনি; বরং পরকালে তাদের পরিণতি কী হবে তা-ও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, প্রত্যেক ধোঁকাবাজকে কিয়ামতের দিন একত্র করা হবে। ধোঁকাবাজির পতাকাতলে তাদের সমবেত করে সবার সামনে ধোঁকাবাজ হিসাবে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يُقَالُ: هَذِهِ غَدْرَةُ فُلَانٍ
'কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ধোঁকাবাজের জন্য পতাকা উত্তোলিত হবে। আর বলা হবে, এটা অমুকের ধোঁকাবাজির প্রতীক।'৩৩৯
তখন ধোঁকাবাজ ও বিশ্বাসঘাতকদের লজ্জা পাওয়া ও আফসোস করা ছাড়া কিছুই থাকবে না। তাদের লজ্জা ও আফসোস তখন আরও বৃদ্ধি পাবে, যখন স্বয়ং আল্লাহকেই তাদের প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখতে পাবে।
হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন:
ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ القِيَامَةِ: رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ
'কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির সরাসরি প্রতিপক্ষ হব। এক. যে আমার নামে প্রতিজ্ঞা করল, তারপর তা ভঙ্গ করল। দুই. যে স্বাধীন মানুষ বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। তিন. যে শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাজ পুরোপুরি আদায় করে নিল, কিন্তু তার পারিশ্রমিক দিল না।'৩৪০
প্রকৃত মুসলমান ধোঁকা, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকা, মিথ্যা-এসব খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে দূরে রাখে; এসবে যতই উপকার ও লাভ থাকুক না কেন। কেননা, ইসলাম এগুলোকে মুনাফিকের গুণাবলি বলে অভিহিত করেছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَلَّةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَلَّةٌ مِنْ نِفَاقٍ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
'চারটি দোষ যার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে, সে খাঁটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ দোষগুলোর একটি বিদ্যমান রয়েছে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব থাকে। এক. যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। দুই. সে সন্ধিচুক্তি করলে তার বিপরীত করে। তিন. সে ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। চার. সে ঝগড়া করলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে। '৩৪১
মুনাফিকদের পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন :
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا 'নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তুমি কখনো তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না। '৩৪২
📄 হিংসুক নয়
যেসব খারাপ অভ্যাস থেকে দ্বীনদার মুসলমানদের বেঁচে থাকা জরুরি, তার একটি হচ্ছে হাসাদ বা হিংসা। রাসুলুল্লাহ এ অভ্যাস থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدِ الْإِيمَانُ وَالْحَسَدُ 'কোনো বান্দার অন্তরে ইমান ও হিংসা একত্র হয় না।'৩৪৩
দামরা বিন সালাবা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَتَحَاسَدُوا
'মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর হিংসা করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকে। '৩৪৪
প্রকৃত মুসলমান নিজেকে প্রতারণা ও হিংসা থেকে, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্বেষ থেকে বিরত রাখে। এসব খারাপ অভ্যাস থেকে যে বিরত থাকে, সে অধিক নফল ইবাদতকারী না হলেও জান্নাতে যাবে।
এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ও ইমাম নাসায়ি আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
كُنَّا جُلُوسًا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَطَلَعَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، تَنْطِفُ لِحِيَتُهُ مِنْ وُضُوئِهِ، قَدْ تَعَلَّقَ نَعْلَيْهِ فِي يَدِهِ الشَّمَالِ، فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ ذَلِكَ، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ مِثْلَ الْمَرَّةِ الْأُولَى. فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الثَّالِثُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ مَقَالَتِهِ أَيْضًا، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ عَلَى مِثْلِ حَالِهِ الْأُولَى، فَلَمَّا قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَبِعَهُ عَبْدُ اللهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ فَقَالَ: إِنِّي لَاحَيْتُ أَبِي فَأَقْسَمْتُ أَنْ لَا أَدْخُلَ عَلَيْهِ ثَلَاثًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُؤْوِيَنِي إِلَيْكَ حَتَّى تَمْضِيَ فَعَلْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ أَنَسُ : وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ يُحَدِّثُ أَنَّهُ بَات مَعَهُ تِلْكَ اللَّيَالِي الثَّلَاثَ، فَلَمْ يَرَهُ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّهُ إِذَا تَعَارَّ وَتَقَلَّبَ عَلَى فِرَاشِهِ ذَكَرَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَبَّرَ، حَتَّى يَقُومَ لِصَلَاةِ الْفَجْرِ. قَالَ عَبْدُ اللهِ: غَيْرَ أَنِّي لَمْ أَسْمَعْهُ يَقُولُ إِلَّا خَيْرًا، فَلَمَّا مَضَتِ الثَّلَاثُ لَيَالٍ وَكِدْتُ أَنْ أَحْقِرَ عَمَلَهُ، قُلْتُ: يَا عَبْدَ اللَّهِ إِنِّي لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَ أَبِي غَضَبٌ وَلَا هَجْرُ ثَمَّ ، وَلَكِنْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَكَ ثَلَاثَ مِرَارٍ: يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَطَلَعْتَ أَنْتَ الثَّلَاثَ مِرَارٍ، فَأَرَدْتُ أَنْ آوِيَ إِلَيْكَ لِأَنْظُرَ مَا عَمَلُكَ، فَأَقْتَدِيَ بِهِ، فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَثِيرَ عَمَلٍ، فَمَا الَّذِي بَلَغَ بِكَ مَا قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ. قَالَ: فَلَمَّا وَلَّيْتُ دَعَانِي، فَقَالَ : مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ، غَيْرَ أَنِّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غِشًا، وَلَا أَحْسُدُ أَحَدًا عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللهُ إِيَّاهُ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ، وَهِيَ الَّتِي لَا نُطِيقُ
‘আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে উপবিষ্ট ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি বললেন, এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতি ব্যক্তির আগমন ঘটবে। তখন একজন আনসারি সাহাবি আসলেন, যার দাড়ি থেকে অজুর পানি ঝরছিল এবং তিনি বাম হাতে পায়ের জুতো বহন করছিলেন। পরের দিনও নবিজি ﷺ একই কথা বললেন। এইদিনে সে একই ব্যক্তি প্রথমদিনের মতো করে আসলেন। তৃতীয় দিনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। নবিজি ﷺ যখন মজলিস থেকে উঠলেন, তখন আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস র্ লোকটির পিছু নিলেন। তার কাছে গিয়ে বললেন, আমি পিতার সাথে ঝগড়া করেছি এবং কসম করেছি যে, তিন দিন তার কাছে যাব না। আপনি কি এ সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাকে আপনার কাছে থাকতে দেবেন? লোকটি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আনাস র্ বলেন, তার কাছে তিন রাত থাকার পর আব্দুল্লাহ র্ বলেন, আমি তাকে রাতে নফল নামাজ পড়তে দেখিনি। তবে যখন ঘুম ভেঙে যেত এবং পাশ পরিবর্তন করতেন, তখন আল্লাহর জিকির করতেন এবং তাকবির বলতেন। এরপর ফজরের নামাজের জন্য উঠতেন। আমি তাকে উত্তম কথা ছাড়া কড়া কথা বলতে দেখিনি। যখন তিনদিন পূর্ণ হলো, আমার মনে হচ্ছিল এ ব্যক্তি তো খুব কমই আমল করে। তাই আমি তাকে শোধালাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমি ও আমার পিতার মাঝে কোনোরূপ মনোমালিন্য ও সম্পর্কছিন্নতার ঘটনা ঘটেনি। আপনার কাছে আমার আসার কারণ হলো, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তিনবার এ কথা বলতে শুনেছি, তোমাদের সামনে এখন জান্নাতি লোকের আগমন ঘটবে। আর প্রতিবারেই আপনার আগমন ঘটেছে। তাই আমি আপনার কাছে এসে আপনি কী আমল করেন, তা দেখে নিজেও আমল করার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো তেমন বড় কোনো আমল করতে দেখলাম না! তাহলে আপনি কী এমন আমল করেন, যার কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ আপনার ব্যাপারে এমন কথা বলেছেন? তিনি বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া তো আমি আর কোনো আমল করি না। এরপর আমি (আব্দুল্লাহ) যখন ফিরে আসছিলাম, তখন ডেকে বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো আমল আমি করি না, তবে আমি অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না এবং কোনো বান্দাকে আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেছেন, তা দেখে তার প্রতি হিংসা করি না। তখন আব্দুল্লাহ বললেন, এটাই আপনাকে এমন উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিয়েছে এবং এই অভ্যাসটাই আমাদের ভেতর আনতে পারছি না। '৩৪৫
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি মন্দ স্বভাব থেকে অন্তর পরিষ্কার রাখা আখিরাতের কামিয়াবি নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর দরবারে মর্যাদা বৃদ্ধি করে। কারণ, তখন আমল কম হলেও তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। হাদিসে বর্ণিত লোকটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার কারণে এবং মানুষকে কষ্টদান থেকে বিরত থাকার কারণে কম আমল করেও জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন। পক্ষান্তরে, একটি মেয়ে—যে রাতে নফল ইবাদত করত এবং দিনে রোজা রাখত, কিন্তু প্রতিবেশীদের কষ্ট দিতো—তার সম্পর্কে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি উত্তরে বললেন : لَا خَيْرَ فِيهَا، هِيَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ অর্থাৎ ‘তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, সে নির্ঘাত জাহান্নামি।’৩৪৬
এর কারণ হলো, ইসলামের মানদণ্ডে ওই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠত্ব পায়, যে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাকার মন্দ স্বভাব থেকে পবিত্র হয়; যদিও তার ইবাদত কম হোক। ইবাদত কম হলেও এ ব্যক্তি ইসলামি সমাজের ভিত্তি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে শক্ত ও পরিচ্ছন্ন ইটের ন্যায়। পক্ষান্তরে যার অন্তরে এ মন্দ স্বভাবগুলো আছে, সে যত বেশি ইবাদত করুক, ইসলামি সমাজে তার উদাহরণ ফোকলা ইটের মতো, যার ওপর ইসলামি সমাজের ভিত্তি খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। অনেক সময় তা ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।
সত্যিকারের আদর্শ মুসলিম উত্তম ইবাদতের পাশাপাশি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখে এবং মানুষের সাথে লেনদেন ঠিক রেখে চলে। তার ভেতরের অবস্থা বাইরের অবস্থার অনুরূপ হয়। কথায় কাজে মিল থাকে। এ ধরনের মুসলমান দ্বারাই ইসলাম-নির্দেশিত আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে। যে সমাজ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী একটি প্রাসাদ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।
📄 কল্যাণকামী
প্রকৃত মুসলমান উল্লিখিত মন্দ স্বভাবগুলো থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন ইতিবাচক গুণাবলি দ্বারাও সজ্জিত থাকে। তন্মধ্যে একটি উত্তম গুণ হলো, সমাজের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা। হাদিস শরিফে এটিকে দ্বীন অভিহিত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ
‘দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য। '৩৪৭
সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ -এর হাতে নামাজ ও জাকাতের ব্যাপারে যেভাবে আনুগত্যের শপথ করেছিলেন, তেমনই প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি কল্যাণকামিতার ব্যাপারেও আনুগত্যের শপথ করেছিলেন।
জারির বিন আব্দুল্লাহ বলেন :
بَايَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ
'আমি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা ও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। '৩৪৮
নামাজ ও জাকাতের সাথে مسلمانوں কল্যাণকামিতাকে যুক্ত করার কারণে ইসলামে এ বিষয়টির গুরুত্ব কতটুকু, তা অনুমান করা যায়। এজন্য যুগে যুগে প্রত্যেক আদর্শ মুসলমান এ গুণে গুণান্বিত ছিলেন।
কল্যাণকামিতার গুরুত্ব এতটুকুতেই শেষ নয়; বরং হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী এ কল্যাণকামিতার অভাবেই অনেক সময় মানুষ জাহান্নামে যাবে। যেমন এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللهُ رَعِيَّةً ، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشُ لِرَعِيَّتِهِ، إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
'যদি কোনো বান্দাকে আল্লাহ জনগণের শাসক নিযুক্ত করেন, আর সে তাদের অধিকার হরণ করে এবং খিয়ানতকারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।'৩৪৯
অপর রিওয়ায়াতে আছে:
فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ، إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ 'অতঃপর সে (শাসক) তাদের কল্যাণ কামনা করেনি, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।'৩৫০
মুসলিম শরিফের অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
مَا مِنْ أَمِيرٍ يَلِي أَمْرَ الْمُسْلِمِينَ، ثُمَّ لَا يَجْهَدُ لَهُمْ، وَيَنْصَحُ إِلَّا لَمْ يَدْخُلْ مَعَهُمُ الْجَنَّةَ 'যে ব্যক্তি মুসলমানদের যাবতীয় ব্যাপারে শাসক নিযুক্ত হয়ে তাদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিধান করল না, সে তাদের সাথে জান্নাতে যেতে পারবে না।'৩৫১
হাদিস শরিফের ভাষ্য থেকে বাহ্যিকভাবে কল্যাণকামিতা শাসকদের দায়িত্ব মনে হলেও এটি আসলে সকল মুসলমানের জন্যই প্রযোজ্য। কেননা, প্রত্যেক মুসলমান নিজের অধীনস্থ লোকের জিম্মাদার। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকই জিম্মাদার এবং প্রত্যেকই নিজেদের অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।' তাহলে বুঝা গেল, সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। এ দায়িত্ববোধ যতদিন মুসলমানদের মাঝে থাকবে, ততদিন ইসলামি আদর্শ সমাজ অটুট থাকবে।